📄 দোয়া
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
ادْعُوْنِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।' [১]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে দোয়া করার আদেশ দিয়েছেন এবং আমাদের দোয়া কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এরপর বলেছেন—
إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دُخِرِينَ
'যারা আমার দাসত্ব থেকে বিমুখ থাকবে অহংকারবশত, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' [২]
আল্লাহ্ তায়ালা কতই না মহান! কতই ব্যাপক তাঁর দয়া! তিনি কতই না উদার! বান্দাদের নিজের প্রয়োজন পূরণে, নিজের কামনা পূরণের জন্য তাঁকে প্রার্থনা করাকে তাঁর ইবাদত বানিয়ে দিয়েছেন। উপরন্তু বান্দাকে চাইতে আদেশ করেছেন। অধিকন্তু অহংকারবশত বিরত থাকলে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন।
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন—
'যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ্ তার ওপর রাগান্বিত হন।' ।৩৷
জনৈক ব্যক্তি কতো সুন্দর বলেছেন, 'মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন চেয়ো না; বরং চাও ওই সত্ত্বার কাছে যার দরজা কখনো বন্ধ হয় না। আল্লাহ্ তায়ালা ক্রোধান্বিত হন যদি তাঁর কাছে না চাও; মানুষের কাছে চাইলে সে নারাজ হয়'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন— امَنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ 'যখন আর্ত ডাক দেয়, কে তার ডাকে সাড়া দেন এবং বিপদ দূর করেন?' [৪]
অন্যত্র বলেন— وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّى فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ 'যখন আমার বান্দারা আপনার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে, আপনি তাদের বলুন, আমি নিকটেই আছি। প্রার্থনাকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে।' [৫]
নুমান বিন বশির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'দোয়াই হলো ইবাদত।' 1 অতঃপর তিনি উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেছেন—'তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।
নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিরত থাকে, অতিশীঘ্রই তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' [৬]
দোয়া অবশ্যই গৃহীত হয়, উপরোক্ত আয়াতসমুহ থেকে তাই স্পষ্ট। নিম্নোক্ত হাদিসগুলোও এ কথার প্রমাণ বহন করে। তবে দোয়া তখনই কবুল হয়, যখন তার সমস্ত শর্ত পাওয়া যায়।
সালমান ফারসি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— 'আল্লাহ্ তায়ালা অত্যন্ত লজ্জাশীল এবং উদার। কেউ তাঁর দরবারে দুই হাত তুললে তিনি তাকে খালি হাতে ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন। '৭]
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তোমরা দোয়া করা থেকে নিবৃত্ত হইয়ো না। কেননা দোয়া করতে থাকলে কেউ ধ্বংস হয় না'। [৮]
আবু সাইদ খুদরি রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- 'কোনো মুসলমান যদি এমন দোয়া করে, যা কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি করে না, তাহলে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে তিনটির একটি প্রতিদান দান করেনঃ ১- হয়তো তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দুনিয়াতে দিয়ে দেন। ২- অথবা আখিরাতের জন্য তা সঞ্চয় করে রাখেন। ৩- অথবা তার পরিবর্তে কোনো বিপদ দূর করে দেন।' [৯]
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-'আমি দোয়া কবুল হওয়ার চিন্তা করি না; বরং দোয়া করতে পারার জন্য চিন্তা করি। কেননা যাকে দোয়া করার তাওফিক দেওয়া হয়, সাড়া তার নিকটেই থাকে।'
টিকাঃ
[১] সুরা গাফির ৬০
[২] সুরা গাফরি ৬০
[৩] জামে তিরমিজি ৩৩৭৩
[৪] সুরা নামল ৬২
[৫] সুরা বাকারা ১৮৬
[৬] জামে তিরমিজি ২৯৬৯
[৭] জামে তিরমিজি ৩৫৫৬
[৮] মুসতাদরাক, হাকিম ১/৪৯৩
[৯] মুসনাদ, আহমদ ১১১৩৩; মিশকাতুল মাসাবিহ ২২৫৯
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন'। [১]
সমস্ত নেককাজের প্রতিদান দশগুন বৃদ্ধি পায়। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করা তো অন্যতম মহিমান্বিত নেক কাজ। তাই একবার দরূদ পাঠ করলে দশটি রহমত পাওয়া যায়। ইবনে আরাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন-
'যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, আল্লাহ্ তায়ালা তো নিম্নোক্ত আয়াতে বলেই দিয়েছেন যে, 'যে ব্যক্তি একটি ভালো কাজ করবে, সে তার মতো দশটির ফল পাবে'।[২] তাহলে এই হাদিসের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য কোথায়?'
তাহলে তার উত্তরে আমি বলব, 'অনেক বড় একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কুরআনের দাবি হলো, যে একটি ভালো কাজ করবে, তাকে দশগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করাও যেহেতু একটি ভালো কাজ, তাহলে কুরআনের দাবি অনুযায়ী তার প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতে দশটি স্তর উন্নীত হবে। এটি তো সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আরও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলোঃ যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দার কথা স্মরণ করছেন, এর চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য আর কী হতে পারে! আল্লাহ্ তায়ালা যেমন নিজের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, বান্দা তাঁকে স্মরণ করলে তিনিও তাকে স্মরণ করবেন। তদ্রুপ তাঁর রাসুলের স্মরনের প্রতিদানও নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, তিনিও ওই বান্দার কথা স্মরণ করবেন এবং তাঁর ওপর রহমত নাযিল করবেন'।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর একবার দরূদ পাঠ করলে তার প্রতিদান স্বরূপ দশটি রহমত নাযিল হয়- বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার জন্য আরও অনেক ফজিলত রয়েছে। নিম্নে এমন কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো-
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে। যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তাকে দশ স্তর উন্নত করবেন'। [৩]
'যার কাছে আমার আলোচনা করা হবে, সে যেন আমার ওপর দরূদ পাঠ করে'-এখান থেকে একটি কথা প্রতীয়মান হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম শুনলে দরূদ পাঠ করা একটি আদেশ। অন্য একটি হাদিসেও এমন কথা আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'কৃপণ ওই ব্যক্তি, যার কাছে আমার আলোচনা করা হলো, আর সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করলো না'। [৪]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—
'পৃথিবীতে বিচরণকারী আল্লাহ্ তায়ালার কিছু ফেরেশতা আছেন, তাঁরা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন'। [৫]
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করবে ওই ব্যক্তি, যে আমার ওপর অধিক দরূদ পাঠ করে'। [৬]
জুমার দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর প্রচুর পরিমাণ দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। আউস বিন আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'তোমাদের সবচেয়ে উত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে এবং এই দিনেই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। অতএব, এই দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো; কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হবে'।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের দরূদ আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, আপনি তো ইন্তিকাল করবেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—'আল্লাহ্ তায়ালা জমিনের জন্য নবীদের দেহ ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন'। [৭]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ করার শব্দচয়ন কীভাবে হবে, তাও হাদিসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত আছে। নিম্নে দুটি হাদিস উল্লেখ করছি-
আবু মাসউদ আনসারি রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদিন সাদ বিন উবাদা'র মাজলিসে বসে ছিলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে আগমন করলেন। বাশির বিন সাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে আপনার ওপর দরূদ পাঠ করার আদেশ দিয়েছেন। আমরা কীভাবে আপনার ওপর দরূদ পড়বো?
আবু মাসউদ বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। এমনকি আমরা আফসোস করতে লাগলাম যে, সে যদি এই প্রশ্ন না করতো! এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
'তোমরা এভাবে বলবেঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়া আলা আ-লি ইবরাহিম। ওয়া বা-রিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ফিল আলামিন, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।' [৮]
আর সালাম কীভাবে দিতে হয় তা তো তোমরা ইতিমধ্যে জেনেছ'।
কাব বিন উজরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আপনার ওপর সালাম পেশ করবো। কিন্তু আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর দরূদ কীভাবে পাঠ করবো? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা বলবে—
আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আলী মুহাম্মাদ, কামা সল্লাইতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকাতা আলা ইবরাহিম, ওয়ালা আ-লি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ'। [৯]
এছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে দরুদের অনেক ধরণ রয়েছে। আগ্রহী পাঠক হাদিস ভাণ্ডারে খুঁজলেই অনায়াসে পেয়ে যাবেন।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম ৩৮৪
[২] সুরা আনআম ১৬০
[৩] জামে সগির, সুয়ুতি ৮৬৬১; সহিহ নাসাঈ ১২৯৬
[৪] জামে তিরমিজি ৩৫৪৬
[৫] সুনান, নাসাঈ ১২৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ ৯২৪
[৬] জামে তিরমিজি ৪৮৪
[৭] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৮] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
[৯] সুনান, নাসাঈ ১৩৭৪; আবু দাউদ ১০৪৭
📄 কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের সালাত
আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন—
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُوْمُ أَدْنَى مِنْ ثُلُثَيِ الَّيْلِ وَنِصْفَهِ وَ ثُلُثَه
'আপনার রব জানেন যে, আপনি কখনো রাতের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ, কখনো অর্ধেক এবং কখনো তিন ভাগের এক ভাগ জেগে থাকেন' (ইবাদত করেন)। [১]
অন্যত্র আল্লাহ্ তায়ালা নিজ বান্দাদের কিছু গুণাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন-
وَ الَّذِينَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَ قِيَامًا
'আর যারা তাদের প্রভুর উদ্যেশ্যে সিজদারত এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত কাটায়। [২]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'ফরজ নামাযগুলোর পর সবচেয়ে উত্তম নামায হলো কিয়ামুল লাইল।
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশার নামায থেকে ফারেগ হয়ে ফজর নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে এগারো রাকাত নামায আদায় করতেন। প্রতি দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন এবং সর্বশেষে এক রাকাত দিয়ে বেজোড় করে নিতেন'। [৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক লোকের কথা আলোচনা করা হলো, যে সকাল হওয়া পর্যন্ত ঘুমাত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললে-
'এই লোকের কানে শয়তান পেশাব করে দিয়েছে'। [৪]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'তোমাদের কেউ ঘুমিয়ে গেলে শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঠ দেয়। প্রতি গিঁটে সে এই বলে চাপড়ায় যে, তোমার সামনে দীর্ঘ রাত রয়েছে, সুতরাং তুমি শুয়ে থাকো। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হয় এবং আল্লাহেক স্মরণ করে, তাহলে একটি গিঠ খুলে যায়। যদি অজু করে, আরও একটি গিঠ খুলে যায়। যদি নামায আদায় করে, তাহলে শেষ গিঁঠটিও খুলে যায়। ফলে সে উৎফুল্ল এবং নির্মল অন্তর নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। অন্যথায় অলস এবং কপট হৃদয় নিয়ে সকালে পদার্পণ করে। [৫]
সকলে যখন ঘুমের কোলে নিশ্চিন্ত ঢলে পড়তো, ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তখন নামাযে দাঁড়াতেন। ভোর পর্যন্ত তাঁর থেকে মৌমাছির মতো গুঞ্জন শোনা যেত।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ তাহাজ্জুদ গুজরাণ সবার চেয়ে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী হয় কেন? তিনি বললেন, 'কারণ তাঁরা আল্লাহ্ তায়ালার সাথে নিভৃতে অবস্থান করে। আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে নিজ নূর থেকে একটি নূর দিয়ে আলোকিত করে দিয়েছেন'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন—'মানুষ গুনাহ করতে করতে এক পর্যায়ে কিয়ামুল লাইল থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়'।
এক লোক একজন আল্লাহওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো—আমি তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে পারি না। আমাকে কোনো প্রতিষেধক দিন। তিনি বললেন, 'দিনের বেলা তাঁর অবাধ্যতা করো না, তাহলে তিনি রাতের বেলা তোমাকে তাঁর সামনে দণ্ডায়মান করবেন'।
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'আমি একটি গুনাহের কারণে পাঁচ মাস তাহাজ্জুদ নামায থেকে বঞ্চিত ছিলাম'।
আবু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'ফুর্তিবাজ মানুষ নিজেদের প্রমোদে যে পরিমাণ মস্তিতে থাকে, রাতের ইবাদতকারীগণ নিশিতে তাদের চেয়ে অধিক মস্তিতে থাকে; যদি রাত না থাকতো, তাহলে আমি দুনিয়ায় অবশিষ্ট থাকাকে পছন্দ করতাম না'।
ইবনে মুনকাদির রহিমাহুল্লাহ বলেছেন—'দুনিয়ার মধ্যে তিনটি মাত্র আনন্দ অসমাপ্ত রয়েছেঃ কিয়ামুল লাইল, বন্ধুদের সাক্ষাৎ এবং জামাআতের নামায'।
টিকাঃ
[১] সুরা মুজ্জাম্মিল ২০
[২] সুরা আল ফুরকানব ৬৪
[৩] সহিহ মুসলিম ১৬০৩
[৪] সহিহ বুখারি ১১৪৪
[৫] সহিহ বুখারি ১১৪২
📄 দুনিয়াবিমুখতা ও তার তুচ্ছতার বর্ণনা
সাহল বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলুন, যা করলে আল্লাহও আমাকে ভালবাসবেন, মানুষের কাছেও আমি পছন্দের পাত্র হতে পারবো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
'দুনিয়া থেকে বিমুখ হও, আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসবেন। মানুষের কাছে যা আছে, তা থেকে নিবৃত্ত হও, মানুষ তোমাকে ভালবাসবে'।[১]
আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত মানুষদের পছন্দ করেন, উক্ত হাদিস থেকে এই কথাই প্রতীয়মান হয়।
সুফিয়ানে কেরাম বলেন-'আল্লাহর ভালোবাসা যেমন সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্তর, তেমনি দুনিয়াবিমুখতা সবচেয়ে উত্তম অবস্থা হিসেবে পরিগণিত'।
দুনিয়াবিমুখতার আরবি শব্দ হলো 'যুহদ'। অর্থ হলো—কোনো জিনিষ থেকে আকর্ষণ সরিয়ে তার চেয়ে উত্তম কোনো জিনিষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। তখন এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, ত্যাগকৃত জিনিষ ত্যাগকারীর দৃষ্টিতে গৃহীত জিনিষের তুলনায় তুচ্ছ এবং নগণ্য হিসেবে দেখা দেয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এই কথা অনুধাবন করতে পারবে যে, আল্লাহ্ তায়ালার কাছে যা আছে, তা চিরস্থায়ী; আখিরাত স্থিতিশীল এবং উত্তম, সে বিশ্বাস করবে যে, দুনিয়া হলো সূর্য কিরণে রাখা বরফের ন্যায়, অস্থায়ী এবং ক্রমনিঃসৃত। আর আখিরাত হলো মণি-জহরতের ন্যায়, স্থিতিশীল এবং স্থায়ী। এমন লোককেই বলা হয় 'যাহিদ' তথা দুনিয়াবিমুখ।
উপরোক্ত বিশ্বাস যার অন্তরে যত দৃঢ় হবে, দুনিয়া ও আখিরাতের পার্থক্য রেখা যার মনে যত বদ্ধমূল হবে, তার দুনিয়া বিক্রি করে, বর্জন করে আখিরাতে নিবিষ্ট হওয়া এবং তা অর্জন করার প্রতি ব্যগ্রতা হবে তেমনি প্রচন্ড অনড়। কুরআনে কারিম দুনিয়া বিমুখতা এবং আখিরাতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার অনেক প্রশংসা করেছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ আখিরাত হলো উত্তম এবং স্থায়ী'। [২]
অন্যত্র বলেন-
تُرِيدُوْنَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ
'তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করো; আর আল্লাহ্ তায়ালা (তোমাদের জন্য) চান আখিরাত'। [৩]
আরও বলেন-
وَ فَرِحُوا بِالْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَ مَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مَتَاعٌ
'তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে আনন্দিত; অথচ দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় ক্ষণিকের ভোগ মাত্র'। [৪]
দুনিয়ার নিন্দা করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার কাছে এর তুচ্ছতা বর্ণনা করে এমন হাদিসের সংখ্যা প্রচুর। নিম্নে কিছু তুলে ধরা হলো—
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাজার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার দুপাশে আরও অনেক লোক ছিল। এমন সময় তিনি ছোট কান বিশিষ্ট মৃত একটি ছাগল ছানার পাস দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি তা নিজ হাতে উঠিয়ে নিলেন এবং তার কান ধরে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে এটাকে এক দিরহামে নিতে ইচ্ছুক? লোকেরা বলল, কোনো জিনিষের বিনিময়ে আমরা এটা নিতে ইচ্ছুক না। তাছাড়া আমরা এটা দিয়ে করব কি? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি পছন্দ করো যে, এটা তোমাদের হোক? তারা বলল, আল্লাহর শপথ, সে যদি জীবিতও থাকতো, তবুও তার মাঝে ত্রুটি দেখা হতো যে, তার কান ছোট। এখন তো সে মৃত! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—
আল্লাহর শপথ, এই ছাগল ছানা তোমাদের নিকট যতটা তুচ্ছ, আল্লাহ্ তায়ালার নিকট তার চেয়েও তুচ্ছ হলো দুনিয়া। [৫]
মুসতাওরিদ বিন শাদ্দাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া এতোটুকু, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রের পানিতে তার একটি আঙ্গুল ডুবিয়ে তুলে আনল। সে দেখুক তার আঙ্গুল কতটুকু পানি নিয়ে ফিরে এসেছে'। [৬]
সাহল বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন—
'দুনিয়া যদি আল্লাহ্ তায়ালার কাছে মাছির একটি ডানা পরিমাণ সমমূল্যের হতো, তাহলে একজন কাফেরকেও সেখান থেকে এক ঢোঁক পানি পান করাতেন না'। [৭]
টিকাঃ
[১] ইবনে মাজাহ ৪১০২; রিয়াদুস সালিহিন ৪৭৫
[২] সুরা আ'লা ১৬-১৭
[৩] সুরা আনফাল ৬৭
[৪] সুরা রাদ ২৬
[৫] সহিহ মুসলিম ২৯৫৭
[৬] জামে তিরমিজি ২৩২৩; ইবনে মাজাহ ৪১০৮
[৭] জামে তিরমিজি ২৩২০