📄 বিষণ্ণতার বহিঃপ্রকাশ
এই অধ্যায়ে আমরা বিষণ্ণতার কিছু অন্যরকম বহিঃপ্রকাশ নিয়ে আলোচনা করব। যেমন, নিম্নোক্ত কিছু শব্দ বা বাক্য বিষণ্ণ ব্যক্তিরা প্রায়শই আমাদের কাছে এসে বলেন—
বিষণ্ণ (Low), হতোদ্যম (Downhearted), গর্তে পড়ে গেছি/ডুবে যাচ্ছি (Blue in the pits), মনমরা (Dejected), দুঃখভারাক্রান্ত (Gloomy), নীরস (Flat), খালি লাগছে (Empty), হতাশাগ্রস্ত (Despondent), করুণ অবস্থা (Miserable), ফালতু লাগছে (Crap)
একইভাবে, বিষণ্ণতায় আচরণও নানারকম হতে পারে। সব সময় বিষণ্ণতার যে উপসর্গগুলো আমরা শিখেছি তার বহিঃপ্রকাশ একই রকম হয় না। নিচে কিছু আচরণ ও সংবেদনের (Sensation) তালিকা দেওয়া হলো, যা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে দেখা যায়—
আচরণ (Behaviour)
* খিটখিটে লাগা
* ঘরের এক কোনায় বসে থাকা
* কারও সঙ্গে মিশতে না চাওয়া
* অন্যান্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা (অতিরিক্ত ব্যায়াম করা, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ইত্যাদি)
* খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন
* ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন
* অলসতা
* দীর্ঘসূত্রতা
সংবেদন (Sensation)
* সারা রাত ঘুমের পরেও সতেজ না লাগা
* ভারী লাগা
* নিরুদ্যম ও অবসন্ন বোধ করা
* টায়ার্ড লাগা
আমাদের বিষণ্ণতা হলো কিছু অসুস্থ চিন্তার উদ্ভব হয়। যেই চিন্তাগুলোর ফলেই মূলত তৈরি হয় কিছু অনুভূতি, এই অনুভূতিগুলো বিষণ্ণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিষণ্ণতা চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাই আমরা প্রথমেই কাজ করি তার এই অনুভূতির পেছনের চিন্তাগুলোকে নিয়ে। যেমন, মিসেস সালেহার ক্ষেত্রে—
মূল অনুভূতি (Primary Emotion): বিষণ্ণতা
চিন্তা:
* আমারই কেন বিষণ্ণতা হবে? (I can't be like this.)
* আমি সব সময়ই অসুস্থ থাকব। (I will always be like this.)
* আমি হতাশ এবং সুস্থতার কোনো আশাই নেই। (I'm hopeless.)
সেকেন্ডারি ইমোশন (Secondary Emotion): তীব্র বিষণ্ণতা
উল্লেখ্য যে, সেকেন্ডারি ইমোশন প্রায় সব সময়ই মূল অনুভূতি থেকে গাঢ় হয়ে থাকে এবং সেকেন্ডারি ইমোশন নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে মূল অনুভূতির আগে। অর্থাৎ তার সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য অবশ্যই এই চিন্তাগুলোকে ঠিক করতে হবে। না হলে চিকিৎসার পরেও বিষণ্ণতা ভালো হতে দেরি হতে পারে বা সুস্থ হওয়ার পরেও ফিরে আসতে পারে।
আবার শুধু বিষণ্ণতা নয়; দুশ্চিন্তা, অবসাদসহ ফলেও সেকেন্ডারি ইমোশন হিসেবে বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সেকেন্ডারি ইমোশনের পেছনের চিন্তা নিয়ে আগে কাজ করতে হবে। এখন আমরা যদি ধাপে ধাপে ব্যক্তির চিন্তাগুলো নিয়ে কাজ করতে চাই, তাহলে কথোপকথনের মাধ্যমে তা কীভাবে সম্ভব?
📄 আমারই কেন বিষণ্ণতা হবে!
থেরাপিস্ট: আপনার কাছে কেন মনে হয়, আপনি বিষণ্ণ হতেই পারেন না?
মি.সা.: অনেকের জীবনেই তো সমস্যা থাকে, কারও তো বিষণ্ণতা হচ্ছে না, আমারই কেন?
থেরাপিস্ট: আচ্ছা, আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে কত শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে?
মি.সা.: না, খুবই কম হবে নিশ্চয়ই।
থেরাপিস্ট: মোটেই নয়। প্রতি ১০০ জনে প্রায় ২০ জন মানুষ জীবনে কোনো না কোনো সময় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন।
মি.সা.: তাই! তাহলে তো আমি একা নই। তবুও...
থেরাপিস্ট: আপনি কি জানেন, পরিবারে বিষণ্ণতা থাকলে আপনার বিষণ্ণতা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
মি.সা.: ওহ্, আমার মায়ের তো বিষণ্ণতা ছিল।
থেরাপিস্ট: জি, এটি আপনার বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ায়। আচ্ছা বলুন তো বিগত কিছু দিনের কোনো ঘটনা কি আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে?
মি.সা.: আসলে, স্বামী মারা যাবার পর থেকে আমার কিছু ভালো লাগছে না, এরপর আমার চাকরিটা চলে গেছে।
থেরাপিস্ট: তাহলে আপনার জীবনে বিষণ্ণ হবার মতো অনেক ঘটনাই ঘটেছে, কেন বলছেন আপনি বিষণ্ণ হতে পারেন না?
মি.সা.: হুম, তা ঠিক। আমি সব সময়ই অসুস্থ থাকব। (I will always be like this.)
থেরাপিস্ট: আচ্ছা, আপনি যে বলছেন, আপনার অবস্থার কখনোই উন্নতি হবে না। এর পেছনে আপনার যুক্তি কী?
মি.সা.: যুক্তি নেই, আমার মনে হচ্ছে আমি আর সুস্থ হব না।
থেরাপিস্ট: আমাদের কাছে কি কোনো জাদুর বল আছে, যার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই, বলুন?
মি.সা.: না, তা ঠিক না, কিন্তু...
থেরাপিস্ট: আপনি কি জানেন, বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, যেকোনো বিষণ্ণতা তিন থেকে ছয় মাস পর ভালো হয়ে যায়।
মি.সা.: তাই!
থেরাপিস্ট: আপনি তো আগেও বিষণ্ণ হয়েছিলেন, তখন কী হয়েছিল বলুন তো?
মি.সা.: আমি পাঁচ-ছয় মাস পর সুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম।
থেরাপিস্ট: আমরাও এটাই বলছিলাম। তাহলে দেখা যাচ্ছে আপনি ভালো হবেন না, এটা সত্যি নয়। আর এই চিন্তা কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করছে?
মি.সা.: না, বরং এই চিন্তা আমাকে আরও হতাশ করে ফেলছে।
থেরাপিস্ট: এই জন্যই এই চিন্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
মি.সা.: জি, আপনি ঠিকই বলেছেন।