📄 চিন্তার ১০টি ত্রুটি
১. ধারণা করা (Assuming)
ধারণা করা বলতে মূলত বোঝায় প্রথমেই যেকোনো পরিস্থিতি বা ঘটনার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি বা ফলাফল চিন্তা করা, যার আসলে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এ ধরনের চিন্তার ত্রুটিসম্পন্ন মানুষেরা মতামত ও সম্ভাবনাকে প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত থেকে আলাদা করতে পারেন না। এদের ক্ষেত্রে ‘আমি জানি’ কথাটি খুবই প্রযোজ্য। এরা মনে করে, সব সময় খারাপাটিই তার সঙ্গে ঘটবে, এটাই চিরসত্য। কিন্তু এর বিপক্ষে তারা কোনো বাস্তবসম্মত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য খোঁজেন না।
২. বিপর্যয়কর চিন্তা (Catastrophizing)
বিপর্যয়কর চিন্তাকে একটা প্রবাদ দিয়ে খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করা যায়, ‘তিলকে তাল করা’। এটি এমন একটি চিন্তার দুষ্টুচক, যেখানে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নেতিবাচক চিন্তা থেকে আরেকটি নেতিবাচক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবেন। ধরুন, আপনি একটি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। এখন আপনি মনে করছেন, আপনি আর কোনো পরীক্ষাতেই পাস করতে পারবেন না, ফলে আপনি জীবনে যা হতে চেয়েছিলেন তা কখনোই হতে পারবেন না। সুতরাং আপনি ব্যর্থ মানুষ, আপনার বেঁচে থাকার কোনো অর্থই নেই। দেখুন, একটি পরীক্ষায় ফেল করার মতো সামান্য একটা বিষয় থেকে আপনি কত ভয়ংকর আরেকটি পরিণতির কথা ভেবে ফেললেন। Catastrophizing খুবই সাধারণ একটি ত্রুটি এবং আমাদের অনেকের কথার মধ্যেই এর আভাস পাওয়া যায়।
৩. চিন্তার অতিরঞ্জন (Overgeneralization)
চিন্তার অতিরঞ্জন যাদের মধ্যে দেখা যায় তারা মনে করেন, তাদের সঙ্গে একটি নেতিবাচক ঘটনা ঘটার অর্থ সম্পূর্ণ পৃথিবীটাই নেতিবাচক। এদের কথার মধ্যে ‘সব সময়’, ‘সবাই’ — এই শব্দগুলো খুব বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন: ‘সবাই আমাকে ঘৃণা করে’, ‘সব সময় আমার সঙ্গেই এমন হয়’। মানুষের কথা থেকে যেমন চিন্তার অতিরঞ্জন বোঝা যায়, তেমনি ডায়েরি লিখলেও অনেক সময় চিন্তা ধরতে সুবিধা হয়।
৪. অনমনীয় চিন্তা করা (Should/Must)
আমাদের অনেকের মধ্যে এমন ভাবনা আছে ‘আমাকে এটা পারতেই হবে’ বা ‘এই কাজটি আমাকে যেকোনো মূল্যে করতেই হবে’ — এই চিন্তাটি কিন্তু সব সময় আমাদের সাহায্য করে না। কারণ, পৃথিবীতে আমরা কেউই পারফেক্ট নই বা কারও পক্ষেই সবকিছু সব সময় নিখুঁতভাবে করা সম্ভব নয়। তাই সব পারফেক্টভাবে করার মনোভাব অনেক সময় বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. স্বপ্নিল চিন্তা (Fairytale/Fantasy)
আমাদের জীবন কষ্টকর অথচ চরম বাস্তব সত্য হলো— আমাদের জীবনটা কখনোই আদর্শ নয়। সব সময় রোমান্টিক, অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণও ন্যায্য নয়। ছোটোবেলায় আমরা যেমনই স্বপ্ন দেখে থাকি না কেন, বাস্তব জীবন আসলে রূপকথার মতো হয় না। আমরা যখনই এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারব না, তখনই তৈরি হবে নানা সমস্যা। আমাদের অনেকের মধ্যেই এমন চিন্তা থাকে যে, কেন আমার জীবনটা বাকিদের মতো নিখুঁত নয়। এই চিন্তা থেকে হতাশার জন্ম নেওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
৬. ট্যাগ লাগানো (Labelling)
আমরা বাকিদের তো বটেই, কখনো কখনো নিজেকে ট্যাগ লাগাতেও বড়ো ভালোবাসি। কোনো কিছু না পারলেই মনে করে বসি 'আমি একটা বোকা'। 'আমাকে দিয়ে কিছু হবে না'। সব সময় যে এই চিন্তা আমাদের নিজ মস্তিষ্ক প্রসূত তা নয়, মাঝেমাঝে দেখা যায়, ছোটোবেলায় অনেক অভিভাবকই সন্তানদের বলে বসেন— 'তুমি তো একটা ছাগল' বা 'এমন গর্দভের মতো কাজ করছ কেন?'। এই শব্দগুলো যেন চিরসত্যের মতো সন্তানদের মনে বাসা বেঁধে থাকে এবং বড়ো হলেও তারা সারা জীবন নিজের সঙ্গে এই ট্যাগ বহন করে চলে।
৭. ইতিবাচকতাকে গ্রহণ না করা (Rejecting the Positive)
মানুষ নিন্দা ও প্রশংসাকে একসঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকে। একজনের সবকিছু যেমন ভালো হতে পারে না, তেমনি সবকিছু কখনো খারাপও হতে পারে না। অনেকেই আছেন, যারা মনে করেন, তাদের সঙ্গে ইতিবাচক যা হচ্ছে তা শুধু ভাগ্যের জন্য, কিন্তু নেতিবাচক সবকিছুই হচ্ছে তাদের নিজের জন্য। অর্থাৎ, নেতিবাচক কোনো কিছুকেই তারা গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে মানসিকতাই নেতিবাচক হয়ে যায়। এবং কেউ কোনো প্রশংসা করলেও সে মনে করে বাকিরা মিথ্যা কথা বলছে, কিন্তু প্রতিটি সমালোচনাকেই সত্য হিসেবে ধরে নেয়।
৮. ব্যক্তিগতকরণ (Personalizing)
পৃথিবীতে নিজের কাজের দায়ভার নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই এটা বিশ্বাস করাও জরুরি যে, আসলে আমি চাইলেই সবকিছু পরিবর্তন করতে পারব না, সবকিছুই কখনোই আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। ব্যক্তিগতকরণ বলতে বোঝায় এমন বিশ্বাস, যার ফলে ব্যক্তি সব দোষই নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়। যেমন ধরুন, একটি ১৫ বছরের ছেলে খারাপ রেজাল্ট করেছে এবং মা বিশ্বাস করছেন সম্পূর্ণটাই মার নিজের দোষ। ব্যক্তিগতকরণের কারণে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, ফলে মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বাড়ে।
৯. অন্যকে দোষারোপ করা (Blaming)
অন্যকে দোষারোপ করা হলো ব্যক্তিগতকরণের ঠিক উল্টো। এমন চিন্তার ত্রুটিসম্পন্ন মানুষেরা সবকিছুতেই অন্যের দোষ খুঁজে পান, নিজের মধ্যে কখনোই কোনো সমস্যা দেখতে পান না। ধরুন, একজন পরীক্ষায় ফেল করল। সে মনে মনে ভাবছে নিশ্চয়ই স্যার তাকে ফেল করিয়েছে। কিংবা নিশ্চয়ই তার জীবনের সমস্যার জন্য সম্পূর্ণ অন্য কেউ দায়ী। জীবনের সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না সত্যি। কিন্তু সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কখনোই অন্য কারও হাতে থাকতে পারে না।
১০. সাদা-কালো চিন্তা (All or None Thinking)
কিছু মানুষ পৃথিবীকে হয় সাদা নয় কালো হিসেবে এমনভাবে দেখেন, যেন এদের কাছে মাঝামাঝি রঙগুলো বিদ্যমান নয়। এরা যেকোনো মানুষকে ভালো মনে করলে খুব উচ্ছ্বাসে নিয়ে যান। এরা মনে করেন সেই মানুষটি নিখুঁত। অপরদিকে কাউকে খারাপ মনে করলে তার কোনো গুণ এদের নজরে পড়ে না। কিন্তু আমাদের আশপাশের সবার কাছ থেকেই শিক্ষণীয় কিছু না কিছু আছে। কোনো ব্যক্তি যেমন কখনো ১০০% খারাপ হতে পারেন না, তেমনি ১০০% ভালোও হতে পারেন না। যারা সাদা-কালো চিন্তার ত্রুটি ধারণ করেন, তারা নিজের জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে, বিশেষ করে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে খুবই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে থাকেন।
অধিকাংশ সময়েই এই কগনিটিভ ডিস্টরশনগুলো মানুষের কথায় এবং আচরণে ফুটে ওঠে। আমরা যদি আমাদের কাছের কাউকে সাহায্য করতে চাই, তার সবচেয়ে সহজ কার্যকর পদ্ধতি হলো— সেই ব্যক্তির সঙ্গে বসে সময় নিয়ে কথা বলা এবং ধীরে ধীরে তার চিন্তার ত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনা করা। আমাদের নিজেদের মধ্যেও এসব ত্রুটির কোনোটি থাকলে তা নির্ণয় করে সমাধান করা সম্ভব। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মাধ্যমে মূলত আমরা এই অনিচ্ছাকৃত চিন্তাগুলোই দূর করে থাকি।
📄 চিন্তার ত্রুটি নির্ণয় (Cognitive Conceptualization)
আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতেই কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির মূলভাব নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা জানি, কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপিতে আমাদের চিন্তাগুলোকে নিয়ে কাজ করা হয়। তার ফলে আমাদের আচরণগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়।
এখন আমরা উদাহরণসহ আলোচনা করব কীভাবে আমাদের চিন্তাগুলো আমাদেরকে প্রভাবিত করে এবং কীভাবে আমরা সেগুলো নির্ণয় করতে পারি।
ঘটনা: সামনে আমার পরীক্ষা এবং আমার তীব্র পরীক্ষাভীতি কাজ করছে।
অনুষঙ্গ চিন্তা: 'নিশ্চয়ই আমি পরীক্ষায় ভালো করব না।' এই চিন্তাগুলোকে বলা হয় নেগেটিভ অটোমেটিক থট (Negative Automatic Thought, NAT), অর্থাৎ এমন নেতিবাচক চিন্তা, যার ওপর বাস্তবিকভাবে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এগুলো অনেকটা কালো মেঘের মতো হুট করে আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তাধারায় ছেয়ে যায়।
অধ্যায়ের এই পর্যায়ে আমরা এই চিন্তাগুলোর আরেকটু ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করব। অর্থাৎ একজন মানুষ কেন এমন চিন্তা করছে, এর ভিত্তি কোথায়, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। কারণ, চিন্তাকে ঠিক করতে হলে আমাকে অবশ্যই এর গোড়ার অংশ খুঁজে বের করে সেখানে কাজ করতে হবে। যেমন, ওপরের উদাহরণটির ক্ষেত্রে ঘটনাটির ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, আমাদের মধ্যে কিছু অবাস্তব চাহিদা বিদ্যমান।
**অবাস্তব চাহিদা (Unhealthy Demands/Rules)**
* আমাকে সব সময় ভালো করতে হবে।
* আমাকে অবশ্যই এমন নম্বর পেতে হবে, যার ফলে সবাই আমার প্রতি খুশি হবে।
* আমাকে পারফেক্ট হতেই হবে।
**মূল বিশ্বাস (Core Belief)**
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কেন আমরা এই চাহিদাগুলোকে অবাস্তব বলছি। একজন মানুষ চাইতেই পারেন যে, তিনি সবার মধ্যে ভালো অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু যখনই ‘সব সময়’, ‘অবশ্যই’— এই শব্দগুলো দিয়ে আপনার কোনো চিন্তা নিয়ন্ত্রিত হবে, অধিকাংশ সময়ই তা বাস্তবিক নয়। কারণ, আমরা কেউই নিখুঁত নই এবং কারও পক্ষে সব সময় সব কাজে নিখুঁত থাকা সম্ভব নয়।
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিতে মূলত আমরা ধীরে ধীরে এই অবাস্তব চাহিদাগুলোকে ঠিক করে তারপর মূলবিশ্বাসে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। মূল বিশ্বাস যেমন ছোটোবেলার কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে তার মনে ঘর বাঁধতে পারে, তেমনি জন্ম নিতে পারে বড়ো হওয়ার পরে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও।
আমরা এর মধ্যে জানি, যে ব্যক্তি বিষণ্নতায় ভুগছেন, তিনি সব সময় মনে করেন, পৃথিবীতে তার কোনো ভূমিকা নেই। এটি ডিপ্রেশনের মূল তিনটি বৈশিষ্ট্যের একটি, যাকে আমরা বলে থাকি ‘ডিপ্রেশনের নেতিবাচক ত্রিভুজ’। এরমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো— বিষণ্ন ব্যক্তি মনে করেন সে নিষ্প্রয়োজন, পৃথিবী অন্যায় এবং ভবিষ্যৎ সব সময়ই হতাশায় ভরা।
**চিন্তার ত্রুটি নির্ণয়ে তিনটি প্রশ্ন**
এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন, আপনার সামনের মানুষটির মধ্যে চিন্তার ত্রুটি থাকলে আপনি কীভাবে বুঝবেন? কাউন্সেলর হিসেবে আমরা যখন কারও সঙ্গে কথা বলি, আমরা কীভাবে চিন্তার ত্রুটি নির্ণয় করি? এর জন্য আমরা মূলত তাকে তিনটি প্রশ্ন করে থাকি—
১. আপনি যখন হতাশ বোধ করেন তখন আপনার মধ্যে কী কী চিন্তা কাজ করে?
এ প্রশ্নের উত্তরে ব্যক্তি তার অসুস্থ চিন্তাভাবনা নিজেই খুঁজে বের করতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে যদি তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া সম্ভব না হয়, আমরা তাকে ডায়েরি লিখতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এতে তিনি ধীরে ধীরে নিজের অসুস্থ চিন্তাভাবনাগুলো খুঁজে বের করতে শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে সঠিক অবস্থানে ফিরে আসতে চেষ্টা করেন।
২. আপনি নিজের কাছ থেকে কী আশা করেন?
এ প্রশ্নটি আমাদের অবাস্তব চাহিদাগুলো নির্ণয় করার জন্য করা হয়ে থাকে। দেখা যায়, ব্যক্তি সব সময়ই মনে করেন, সে নিশ্চিত হবে বা অবশ্যই সফল হবে ইত্যাদি।
৩. এসব আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা ব্যক্তির মূল বিশ্বাস নির্ণয় করার চেষ্টা করি। অধিকাংশ সময়ে থেরাপির এক পর্যায়ে ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারেন যে, তার এই চিন্তাভাবনা আসলে তিনি শিশুকাল থেকে বয়ে নিয়ে এসেছেন, যার বর্তমান কোনো ভিত্তিই নেই বা হতে পারে না। তিনি এমন কারণকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের মধ্যে এমন বিশ্বাসকে লালন করেছেন, যার কথা গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
অনেক সময় ব্যক্তি নিজেই তার চিন্তার ত্রুটিগুলো বুঝতে পারলে সেগুলোকে সঠিক পথে চালিত করতে পারেন। আবার অনেক সময় এতে তার কাছের মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। অপরদিকে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চিন্তার ত্রুটি নির্ণয় করার জন্য এবং সেগুলোকে ঠিক করার জন্য একজন সাইকোথেরাপিস্টের ভূমিকা সরাসরি প্রয়োজন হয়ে থাকে। কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপির মূল চ্যালেঞ্জ হলো ব্যক্তির মূল বিশ্বাস পরিবর্তন।
📄 চিন্তার ত্রুটি এবং প্যারেন্টিং (Parenting)
আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার সময় অহরহ এমন মানুষ দেখি, যারা শিশুকাল থেকেই চিন্তার ত্রুটি বয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব চিন্তার মূল খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তাদের অভিভাবকত্বে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যা তাদের জন্য নেতিবাচক হিসেবে কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে কোনো পিতা- মাতাই সন্তানের খারাপ চান না। কিন্তু অনেক সময় অভিভাবক হিসেবে আমাদের কথা বলার ভঙ্গিমা এবং আচরণের জন্য অথবা নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জন্য সন্তানের মনে এমন কিছু ধারণা বাসা বাঁধে, যা তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এসব ধারণা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের আত্মবিশ্বাসের পথে। তাই সন্তানকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অসুস্থ চিন্তা থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা অধ্যায়ের এই পর্যায়ে জানাব, অভিভাবক হিসেবে কোন চারটি কাজ কখনোই আমাদের করা উচিত নয়।
১. সন্তানকে ত্যাগ লাগাবেন না
অভিভাবক হিসেবে আমরা অনেকেই সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময়, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন সব শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে থাকি, যা অপমানজনক, অসম্মানজনক বা তাচ্ছিল্যকর। সব সময় মনে রাখতে হবে যে, বাবা-মা হিসেবে সেই সম্মানটুকু আমার সন্তানকে দিচ্ছি কি না। অনেক সময় দেখা যায়, ছোটোবেলায় বাবা-মার লাগানো ট্যাগ লাইন (যেমন: 'ছাগল', 'গর্দভ' ইত্যাদি) সারা জীবন সন্তান বয়ে নিয়ে চলে যা পরবর্তী সময়ে তার জন্য বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. তুলনা করবেন না
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই আলাদা। ভিন্ন তাদের প্রতিভা, ক্ষমতা। এমনকি ভিন্নতা দেখা যায় সহসীমাতেও। আপনার একজন সন্তান যেমন পড়াশোনায় ভালো হতে পারে, তেমনি হতে পারে অন্য সন্তানের দায়িত্বশীলতা বেশি, হতে পারে অপরজনের মধ্যে সৃজনশীলতা বেশি। কখনোই সন্তানদের এক অপরের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এটি তাদের মনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ছাপ রেখে দেয়, যে দাগ থেকে তারা বড়ো হয়েও সব সময় মুক্তিলাভ করতে পারে না। মনে রাখবেন, সবাই সব কাজ পারবে না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে কিছু কাজ ভালো করার লুকায়িত প্রতিভা আছে। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো— সেই লুকায়িত প্রতিভাকে বের করে নিয়ে আসা এবং ভালো কাজে অবশ্যই সন্তানকে প্রশংসিত করা। তুলনা করা কখনোই ভালো নয়। তুলনার মাধ্যমে বেড়ে ওঠা সন্তানরা অধিকাংশ সময়ই মানসিকভাবে দুর্বল থাকে।
৩. সন্তানের কাছ থেকে সবকিছু নিখুঁত আশা করবেন না
আমরা নিজেরা কেউই পারফেক্ট নই, তাই সন্তানের কাছ থেকে পারফেকশন আশা করাটা অমানবিক। বাচ্চারা কাজ করতে গেলে ছোটোখাটো ভুল হবেই; অনেক কিছু ভেঙে যাবে, হাত থেকে পড়ে যাবে, এমনও হতে পারে সে বারবার একই ভুল করবে। এটাই স্বাভাবিক। তাকে এটা বোঝাতে হবে, জীবনের সবকিছু কখনো নিখুঁতভাবে হবে না। অভিভাবক হিসেবে যারা সবকিছুতে পারফেকশন আশা করেন, তাদের সন্তান বড়ো হলে ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না। একবার হারের পর অধ্যবসায় ধরে রাখা কষ্টকর হয়।
৪. সন্তানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন না
অনেক অভিভাবকই মনে করেন সন্তানের সব কাজ করে দেওয়ার মধ্যে, সব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মধ্যে একধরনের গর্ব করার ব্যাপার আছে। কিন্তু গবেষণা বলে বিষয়টি আসলে এরকম নয়। বরং যে সন্তানেরা ছোটোবেলা থেকেই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম নয় তারা বড়ো হলেও সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়ে থাকে। একইভাবে যারা নিজের কাজ নিজে করে অভ্যস্ত নয়, তারা বড়ো হলেও ছোটোখাটো কাজেই ঘাবড়ে যায়। তাই ছোটোবেলা থেকেই সন্তানকে তার বয়স অনুযায়ী কাজ করতে দিন। সে কোন দিন কোন জামাটি পরবে, কখন পড়াশোনা করবে, কখন কী করতে চায়, কোন বেলা কী দিয়ে ভাত খাবে—এমন ছোটোখাটো সিদ্ধান্ত তাকে নিতে দিন। এতে সন্তানের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে, যা বড়ো হলে তাকে সাহায্য করে। আমাদের সন্তানের সঙ্গে আচরণের সময় সব সময় মনে রাখা উচিত—প্রতিটি শিশু একজন আলাদা মানুষ। একজনের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে উঠবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্যারেন্টিংয়ের ওপর।