📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 তৃতীয়ত, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 তৃতীয়ত, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. প্রশ্নকারীর অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা, যখন সে প্রশ্ন করতে লজ্জাবোধ করে এবং প্রশ্নের সময় মুফতির দিকটিরও খেয়াল রাখা
মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো, তার দ্বীনি বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত শরয়ি বিধানগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া। যে তার ওপর আবশ্যক বিষয়গুলো সম্পর্কে অজ্ঞ, তার জন্য ইলম অর্জন করা জরুরি। আর ইলম অর্জনের একটি উপায় হলো, আলিমদের প্রশ্ন করা। ফরজসমূহ বা যে বিধানের ব্যাপারে জ্ঞান না থাকে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা ওয়াজিব। কারণ, এই অজ্ঞতা অচিরেই হারামে লিপ্ত হওয়ার কারণ হবে। কিন্তু যদি প্রশ্নকারী কোনো কারণে প্রশ্ন করতে লজ্জাবোধ করে, তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো, ফতোয়া জিজ্ঞাসার জন্য উপযুক্ত কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা। তবে এই ক্ষেত্রে শরয়ি আবশ্যগুলোর প্রতি লক্ষ রাখতে হবে।
আলিম ও মুফতির জন্য মানুষের অনুভূতির প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি এবং যথাসম্ভব চেষ্টা করবে তাদেরকে জটিল কোনো পরিস্থিতিতে না ফেলতে। আলি বিন আবু তালিব ﷺ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি এমন লোক ছিলাম, যার সব সময় মজি বের হতো। কিন্তু রাসুল ﷺ-এর কন্যার সাথে দাস্পত্য সম্পর্ক থাকার কারণে আমি ব্যাপারটি তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা করছিলাম। তাই মিকদাদ বিন আসওয়াদকে প্রশ্ন করতে বললাম। নবিজি ﷺ বলেন, (فِيهِ الْوُضُوءُ) “এ ক্ষেত্রে অজু করতে হবে।”৫৮ আরেকটি বর্ণনায় আছে, (يَغْسِلُ ذَكَرَهُ) “তুমি অজু করবে এবং তোমার লজ্জাস্থান ধুয়ে নেবে।”’৫৯
ইবনে হাজার ﷺ বলেন, ‘এখানে সামাজিকভাবে লজ্জার বিষয়গুলো সরাসরি উপস্থাপনে পরোক্ষতার ক্ষেত্রে আদবের ব্যবহার, জামাইদের সাথে উত্তম আচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সাথে সহবাস ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর আলোচনা পরিহারের কথা উল্লেখ হয়েছে। এর মাধ্যমে মুসান্নিফ ﷺ কিতাবুল ইলমে দলীল পেশ করেছেন যে লজ্জাকে অন্যকে প্রশ্নের আদেশ করবে; কারণ, এতে দুটি কল্যাণ একত্রিত হবে : লজ্জার ব্যবহার এবং বিধান জানার ক্ষেত্রে শিথিলতা না করা।’৬০
ইমাম বুখারি ﷺ তার সহিহ বুখারিতে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন :
بَابُ الْحَيَاءِ فِي الْعِلْمِ
‘ইলমের ক্ষেত্রে লজ্জার অধ্যায়’
মুজাহিদ ﷺ বলেন, ‘লজ্জাশীল বা অহংকারী কেউ ইলম শিখতে পারে না।’ আয়েশা ﷺ বলেন, ‘আনসারি নারীগণ কতই না উত্তম নারী! লজ্জা তাদের জন্য দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে প্রতিবন্ধক হয় না।’৬১,৬২
ইবনে হাজার ﷺ বলেন, (بَابُ الْحَيَاءِ) অর্থাৎ লজ্জার বিধান। পেছনে গত হয়েছে যে, লজ্জা হলো ইমানের অংশ। আর এটি শরিয়তসম্মত, যা বড়দের সম্মান ও মর্যাদার কারণে হয়ে থাকে। আর এটি প্রশংসনীয় বিষয়। আর যা কোনো শরয়ি প্রয়োজনের কারণ হয়, তা নিন্দনীয় এবং তা শরিয়তসম্মত কোনো লজ্জা নয়। এটি হলো দুর্বলতা ও হীনতা। এ এমনই লজ্জাই উদ্দেশ্য : কোনো লজ্জাশীল ইলম শিখতে পারে না। যেন তিনি শিক্ষার্থীদের অক্ষমতা ও অহংকার দূর করতে উৎসাহিত করছেন; এই দুটির প্রত্যেকটি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধ তৈরি করে।৬৩
২. অজ্ঞদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা ও তাদের সাথে কোমল আচরণ করা
শিক্ষার বার্তা একটি মহৎ বার্তা। এটি নবিগণের সবচেয়ে বড় কাজ। এটি দ্বীনের প্রচার-প্রসারে সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম।
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখা উচিত, তার একটি হলো, শিক্ষাদানকালীন ছাত্রের প্রতি কোমলতা প্রদর্শন। কেননা, আচরণ, দয়া ও চিন্তাভাবনায় মানুষ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তাই শিক্ষকের জন্য এসব পার্থক্যের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত এবং শিক্ষার্থীর সাথে কোমল আচরণ করা উচিত। বিশেষ করে যখন শিক্ষার্থী কোনো ভুলে পতিত হয়, তখন তার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবে। কারণ, ভুলকারীর মন অধিকাংশ সময় ভাঙা থাকে। আনাস ﷺ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘একদা আমরা রাসুল ﷺ-এর সাথে মসজিদে ছিলাম। ইত্যবসরে এক বেদুঈন আসলো। সে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে লাগল। তা দেখে রাসুল ﷺ-এর সাহাবিগণ বললেন, “থামো, থামো!” রাসুল ﷺ বললেন :
لَا تُزْرِمُوهُ دَعُوهُ
“তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না, তাকে ছেড়ে দাও।”’
এরপর রাসুল ﷺ তাকে ডেকে এনে বললেন :
إِنَّ هَذِهِ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِشَيْءٍ مِنْ هَذَا الْبَوْلِ، وَلَا الْقَذَرِ إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَالصَّلَاةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ
“এটা হলো মসজিদ। এখানে পেশাব করা কিংবা ময়লা আবর্জনা ফেলা যায় না। বরং এ হলো আল্লাহর জিকির, সালাত আদায় ও কুরআন পাঠ করার স্থান।”
অথবা রাসুল ﷺ যেভাবে বলেছেন, অনরূপ। এরপর রাসুল ﷺ সবার মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে এক বালতি পানি আনতে আদেশ করলেন। তারপর সে এক বালতি পানি আনল এবং তা পেশাবের ওপর ঢেলে দিল।’৬৪
ইবনে হাজার ﷺ বলেন :
‘এতে এই বিষয়টি রয়েছে যে, অজ্ঞদের সাথে কোমল আচরণ করতে হবে; যদি তার মধ্যে অকর্মন্যতা না থাকে, তাহলে কঠোরতা না করে যেভাবে তাকে শিক্ষা দেওয়া দরকার, সেভাবে শিক্ষা দেবে। বিশেষ করে যার জন্য বস্তুত্ব প্রয়োজন, তার জন্য বিষয়টি আরও বেশি খেয়াল রাখতে হবে। এখানে নবিজি ﷺ-এর দয়া ও উত্তম চরিত্রের ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে। ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান ﷺ আবু হুরাইরা ﷺ-এর হাদিসে উল্লেখ করেন :
‘বেদুঈন লোকটি ইসলামি জ্ঞান অর্জনের পর রাসুল ﷺ-এর কাছে গিয়ে বলল, “আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক।” তিনি তাকে তিরস্কারও করেননি এবং বকাও দিলেন না।’
প্রিয় মুসলিম ভাই, আপনি কি ভুলকারীর ব্যাপারে রাসুল ﷺ-এর এই মহান আদর্শের প্রতি খেয়াল করেছেন? বিশেষ করে এমন অজ্ঞের ব্যাপারে তাঁর আচরণ কেমন ছিল, যে বুঝতে পারছে না যে, সে ভুল করছে এবং তার ভুলের বিশালতাও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে নিজের কাজকর্মের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপও করেনি; সুতরাং আমরা যেন রাসুল ﷺ-এর জীবনকে উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি।
৩. যে ভুলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, উপদেশ ও শিক্ষাদানের সময় তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
যে একটি বিষয় সব সময় করে আসছে এবং তার সাথে একটি সম্পর্ক হয়ে গেছে এবং সে এটার ওপর অবিচল রয়েছে, তার জন্য বিষয়টি পরিত্যাগ করা কঠিন বটে। তা পরিত্যাগের জন্য তাকে সব সময় ইমান ও দৃঢ় শক্তির অধিকারী হতে হবে; মুক্ত হতে হবে নফসের কামনা-বাসনা থেকে এবং কাজের ক্ষেত্রে সর্বদা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে তাৎক্ষণিক সাড়া প্রদানের তওফিয়ত প্রাপ্ত হতে হবে।৬৫
এ কারণেই মানুষকে উপদেশ ও শরণ করানোর ক্ষেত্রে দারিদ্রকে প্রজ্ঞা পরিচয় দিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে নবিজি ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে। মানুষের অবস্থা অনুযায়ী তাদেরকে শরিয়তের বিকল্প ব্যবস্থার দিকে দিক-নির্দেশনা দিতে হবে। এটিকে বলা হয় তাহলিয়া (সজ্জিত করা)-এর নীতি অবলম্বন। অর্থাৎ শরিয়তের বিপরীত জিনিস থেকে খালি হয়ে যাবে এবং ইমান ও নেক আমলের মাধ্যমে সজ্জিত হবে।
সাইদ বিন আবুল হাসান ﷺ বলেন, ‘জনৈক লোক ইবনে আব্বাস ﷺ-এর নিকট এসে বলল, “আমি এমন এক লোক, যে এই ছবিগুলো অঙ্কন করি। এ ব্যাপারে আমাকে ফতোয়া দিন?” তিনি বললেন, “তুমি আমার কাছে এসো!” সে তাঁর কাছে এল। এরপর তিনি বললেন, “তুমি আমার কাছে এসো।” সে আরও কাছে এল। একপর্যায়ে তিনি তার মাথার ওপর নিজের হাত রেখে বললেন, “আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যা শুনেছি, তা-ই বর্ণনা করছি। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি :
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يَجْعَلُ لَهُ، بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا، نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ
“প্রত্যেক ছবি প্রস্তুতকারী জাহান্নামের অধিবাসী হবে। তৈরিকৃত প্রতিটি ছবিতে জীবন দেওয়া হবে, আর জাহান্নামে তাকে ওইগুলো আজাব দিতে থাকবে।”’
তিনি আরও বললেন : (وَمَا لَا نَفْسَ لَهُ) “একান্তই যদি করতে হয়, তাহলে গাছপালা এবং প্রাণহীন বস্তুর ছবি অঙ্কন করো।”’৬৬
ইবনে আব্বাস ﷺ-এর কথাটি চিন্তা করে দেখুন, ‘আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যা শুনেছি, তা-ই বর্ণনা করছি।’ এটি ছিল ইবনে আব্বাস ﷺ-এর প্রজ্ঞার পরিচয়। কারণ, তিনি প্রশ্নকারীর সামনে সে বিষয়টি প্রস্তুত করেছেন, যার ফলে তার হৃদয় সে ফতোয়া গ্রহণ করবে, যার মাধ্যমে তার প্রিয় ও অত্যন্ত বিষয়টি তার জন্য হারাম করে দেওয়া হবে। ইবনে আব্বাস ﷺ তাকে নিজের পক্ষ থেকে ফতোয়া দেননি। বরং ফতোয়াকে সাহায্য করে দিয়েছেন রাসুল ﷺ-এর দিকে। এরপর তিনি শরিয়তসম্মত বিকল্প পদ্ধতি বলে দিয়েছেন। এটিই হলো ফতোয়ার জ্ঞান।
শরিয়তের নীতিমালা থেকে এটি সর্বজনবিদিত যে, তা যেকোনো হারাম উপকরণের পরিবর্তে বিকল্প সিস্টেম পেশ করে দেয়। জিনা হারাম করে বিয়েকে হালাল করে দেওয়া হয়েছে। সুদকে হারাম করে ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে। যেমন শূকর, মৃতপ্রাণী ও প্রত্যেক হিংস্র প্রাণী হারাম করা হয়েছে, তখন চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য কিছু প্রাণী জবাই হালাল করে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য সকল বিধানের ব্যাপারটিও এমনই। এরপর যদি কোনো ব্যক্তি হারামে পতিত হয়, তাহলে শরিয়ত তাকে তাওবা ও কাফফারার মাধ্যমে তা থেকে বের হওয়ার সিস্টেম বলে দিয়েছে; যেমনটি কাফফারাসংক্রান্ত অধ্যায়গুলোতে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং দায়িত্ব হলো, বিকল্প বিষয় পেশ করা এবং শরয়ি বিষয়সমূহের ব্যাপারে পরিপূর্ণরূপে শরিয়তের অনুসরণ করা।
এখানে এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা উচিত যে, বিকল্প পেশ করতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী। অনেক সময় হতে পারে বিষয়টি ভুল এবং তা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক; কিন্তু তার জন্য উপযুক্ত কোনো বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে না—হয়তো অজ্ঞতা বিশৃঙ্খল হওয়ার কারণে মানুষ শরিয়ত থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে, কিংবা সৎকাজের আদেশকারী ও অসৎকাজে বাধাদানকারী কিছু স্মরণ করতে পারছে না বা অজ্ঞতার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট বিকল্প পদ্ধতিগুলোর ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই—যদি তার কাছে এমন বিকল্প কিছু না থাকে, যে এ ব্যাপারে বলবে বা নির্দেশনা দেবে, তাহলে এই অবস্থায় ওই লোকটি ভেঙে পড়বে এবং ভুল নির্জীবিত হবে। এমনটি সাধারণত আর্থিক লেনদেন ও বিনিময়ের ব্যবস্থায় হয়ে থাকে, যেমন ইসলামি সমাজব্যবস্থা থেকে শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক এমন বিষয়গুলো আমদানি করা হয়েছে। আর মুসলিমদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা হলো শরিয়তসম্মত পদ্ধতির অধিকার করা বা ব্যাপক করে দিতে না পারা। আর এই দুর্বলতা ও অক্ষমতার মাঝে। আল্লাহ তাআলার সিস্টেম বিকল্প পদ্ধতি এবং পথ বিদ্যমান আছে, যা সমস্যা দূর করবে এবং মুসলিমদের থেকে কষ্ট লাঘব করবে। সেগুলোর ব্যাপারে যে জানতে পেরেছে, সে তো জেনছে; আর যে রয়েছে, সে অজ্ঞ রয়েছে।৬৭
৪. ছোট ছোট তালিকা ইলমের প্রতি লক্ষ রাখা, পরিবার থেকে যারা দীর্ঘ সময় দূরে রয়েছে
মালিক বিন হুয়াইরিস ﷺ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
‘আমার নবিজি ﷺ-এর কাছে গেলাম। আমরা সবাই সমবয়সী যুবক ছিলাম। আমরা বিশ দিন রাত তাঁর কাছে অবস্থান করলাম। রাসুল ﷺ ছিলেন দয়ালু কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি যখন অনুমান করলেন যে, আমরা স্ত্রী-পরিবারের প্রতি ঝুঁকে পড়েছি বা আসক্ত হয়ে পড়েছি, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা বাড়িতে কাদের রেখে এসেছি? আমরা তাঁকে তা জানালাম। তিনি বললেন :
ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ، فَأَقِيمُوا فِيهِمْ وَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ
“তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের মাঝে অবস্থান করো। আর তাদের (দ্বীন) শিক্ষা দাও এবং সৎকাজের) আদেশ করো।”’
তিনি তাদের প্রতি দয়াবশত হয়ে এবং পরিবারদের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখে তাদের ফিরে যেতে আদেশ করেছেন। এবং তাদের পরিবারের লোকদের মাঝে ইলম ছড়িয়ে দেওয়া, তাদেরকে ইসলামের বিধিবিধান, আদব ও শরয়ি ইলম শিক্ষা দিতে আদেশ করেছেন।
৫. যখন কেউ করণীয় কোনো বিষয় ভুলে যায়, তখন তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা
মুহাম্মাদ বিন হুমাইদ ﷺ বলেন, ‘আব্দুল্লাহ বিন মুবারকের নিকট এক লোক হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলেনি। ইবনে মুবারক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাঁচিদাতা হাঁচি দিয়ে কী বলবে?” সে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ বলবে।” তিনি তাকে বললেন, “আল্লাহ তোমার ওপর দয়া করুন।” আমরা সবাই তার এত সুন্দর শিষ্টাচার বিস্মিত হলাম।’
এই হলো ইবনুল মুবারকের অবস্থান। তিনি হাঁচিদাতাকে এমন করেছেন তার দুর্বলতা দূর করার জন্য। যেন সে জানতে না যে, হাঁচি দিলে কী বলতে হয় অথবা স্বভাবত সে ভুলে গেছে বা হতে পারে সে নওমুসলিম। এটি হলো আল্লাহ তাআলার দাপ্তরিক ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
‘তিনি যাকে দান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে প্রভূত কল্যাণ করা হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।’৭০

টিকাঃ
৫৮. সহিহুল বুখারি : ১৩২।
৫৯. সহিহুল বুখারি : ২৬১।
৬০. ফাতহুল বারি : ১/৩৮১।
৬১. সহিহুল বুখারি : ১/১০৫।
৬২. হিলইয়াতুল আউলিয়া : ২/২২০।
৬৩. ফাতহুল বারি : ১/২২৯।
৬৪. সহিহুল বুখারি : ২২১, সহিহু মুসলিম : ২৮৫।
৬৫. ফাতহুল বারি : ১/৩২৯।
৬৬. সহিহুল বুখারি : ২২২৫, সহিহু মুসলিম : ২১৯০।
৬৭. আল-আদাবুন নাবায়িয়্যাহ ফি তিয়ামিল মাআয আখতারিন নাস : ৫০।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 চতুর্থত, অভাবীদের অনুভূতির প্রতি খেয়াল করা

📄 চতুর্থত, অভাবীদের অনুভূতির প্রতি খেয়াল করা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 পঞ্চমত, যে কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 পঞ্চমত, যে কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. যারা কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করতে পারে না, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা) থেকে বর্ণনা করেন। নবীজি (সা) বলেন :

لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ، وَلَكِنْ لَا أَجِدُ حَمُولَةً، وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ، وَيَشُقُّ عَلَيَّ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي...

‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য হবে বলে যদি মনে না করতাম, তবে আমি কোনো যুদ্ধে গমন হতে বিরত থাকতাম না। কিন্তু আমি তো সওয়ারি সংগ্রহ করতে পারছি না এবং আমি এতগুলো সওয়ারি পাচ্ছি না, যার ওপর আমি তাদের আরোহণ করাতে পারি। আর আমার জন্য এটা কষ্টদায়ক হবে যে, তারা আমার থেকে পেছনে পড়ে থাকবে।...’

জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা এক যুদ্ধে রাসূল (সা)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন :

إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا، إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ، حَبَسَهُمُ الْمَرْضُ

‘মদিনাতে এমন কিছু লোক রয়েছে যে, তোমরা এমন কোনো দূরপথ ভ্রমণ করোনি এবং এমন কোনো উপত্যকা অতিক্রম করোনি, যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। অসুস্থতা তাদের আটকিয়ে দিয়েছে।’

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উসমান (রা) বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ছিলেন উসমান (রা)-এর স্ত্রী আর তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ফলে নবীজি (সা) তাঁকে বললেন, (إِنَّ لَكَ أَجْرَ رَجُلٍ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا وَسَهْمَهُ) “বদর যুদ্ধে যোগদানকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব ও (গনিমতের) অংশ তুমি পাবে।”

২. যে কোনো কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে; কিন্তু অন্যজন তা বাস্তবায়ন করেছে অথবা পরিপূর্ণতা দান করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আমি বদর যুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়সি দুজন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদেের মধ্যে থাকি। তখন তাঁদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী?” সে বলল, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ—যাঁয় হাতে আমার প্রাণ, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়।” আমি তাঁর কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল। তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, “এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে।” তাঁরা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে তা জানাল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে?” তাঁরা উভয়ে দাবি করল, “আমি তাকে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলোনি তো?” তাঁরা উভয়ে বলল, “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, “তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআজ বিন আমর বিন জামুহের জন্য।” তাঁরা দুজন হলো, মুআজ বিন আফরা ও মুআজ বিন আমর বিন জামুহ (রা)।

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক প্রেরিত কোনো এক সামরিক অভিযানকারী দলের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সৈন্যরা (কৌশলগত কারণে) পলায়ন করলে আমিও তাদের সাথে আত্মগোপন করি। অতঃপর বিপদযুক্ত হয়ে বাইরে বের হয়ে এসে পরামর্শ করি, এখন কী করা যায়? আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর কারণে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হয়েছি। আমরা বললাম, “চলো আমরা মদিনায় গিয়ে আত্মগোপন করে থাকি; যেন কেউ আমাদের দেখতে না পায়। দ্বিতীয়বার জিহাদের সুযোগ হলে আমরা তাতে যোগদান করব।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা মদিনায় প্রবেশ করে পরস্পর বলাবলি করলাম, “আমরা যদি নিজেদেরকে রাসূল (সা)-এর সামনে পেশ করি এবং আমাদের জন্য যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তাহলে মদিনায় থেকে যাব। এর বিপরীত কিছু হলে মদিনা ছেড়ে চলে যাব।” তিনি বলেন, ‘আমরা ফজরের সালাতের পূর্বেই (মসজিদে) গিয়ে রাসূল (সা)-এর অপেক্ষায় বসে রইলাম। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলে আমরা দাঁড়িয়ে বললাম, “আমরা তো পলাতক সৈনিক।” তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, (لَا، بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) “না, বরং তোমরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদানকারী।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর হাতে চুমো দিলাম। তিনি বললেন, (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ) “আমিই মুসলিমদের পশ্চাতের দল।”

আওনুল মাবুদ নামক গ্রন্থে এসেছে, (بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধে প্রত্যাগমনকারী।

ইমাম আল-খাত্তাবি (র) নবীজি (সা)-এর বাণী (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবিজি (সা) এর মাধ্যমে তাঁদের ওজরকে সহজ করে দিয়েছেন। আর এটি ছিল আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা :

أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ

“অথবা কোনো দলের কাছে আশ্রয় নিয়ে (যদি তাদের দিকে পিঠ ফেরায়)।”

৩. যে দরিদ্র লোকেরা কল্যাণের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও তা করতে সক্ষম হয়নি, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :

مَا مِنْ غَازِيَةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللهِ فَيُصِيبُونَ الْغَنِيمَةَ، إِلَّا تَعَجَّلُوا ثُلُثَيْ أَجْرِهِمْ مِنَ الْآخِرَةِ، وَيَبْقَى لَهُمْ الثُّلُثُ، وَإِنْ لَمْ يُصِيبُوا غَنِيمَةً، تَمَّ لَهُمْ أَجْرُهُمْ

‘যে বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং তাতে গনিমত লাভ করল, তারা এ দুনিয়াতেই আখিরাতের দুই-তৃতীয়াংশ বিনিময় নগদ পেয়ে গেল। তাদের জন্য কেবল এক-তৃতীয়াংশ বিনিময় অবশিষ্ট রইল। আর যে বাহিনী কোনো গনিমত লাভ করল না, তাদের পূর্ণ বিনিময়ই পাওনা রয়ে গেল।

আমর বিন আবাসাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন :

أَيُّمَا رَجُلٍ مُسْلِمٍ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَبَلَغَ مُخْطِئًا أَوْ مُصِيبًا فَلَهُ مِنَ الْأَجْرِ كَرَقَبَةٍ أَعْتَقَهَا مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ

“যেকোনো মুসলিম আল্লাহর পথে তির নিক্ষেপ করে, সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভুলকারী হোক কিংবা সঠিক, তার জন্য ইসমাইল (আ)-এর বংশধর থেকে একজন গোলাম আজাদ করার প্রতিদান রয়েছে।”

সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূল (সা)-এর সাথে খাইবারে বের হলাম। তখন তাঁদের এক ব্যক্তি বলল, “হে আমির, তুমি আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও।” সে তাঁদের তা গেয়ে শোনাল। তখন নবীজি (সা) বললেন, “চালকটি কে?” তাঁরা বলল, “আমির।” তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন!” লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরেকে তাঁর থেকে দীর্ঘকাল উপকার লাভ করার সুযোগ করে দিন।” পরদিন সকালে আমির নিহত হলো। তখন লোকেরা বলল, “তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সে নিজেকে হত্যা করেছে।” যখন আমি ফিরলাম, আর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, “আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে”, তখন আমি নবীজি (সা)-এর নিকটে এলাম। আমি বললাম, “হে আল্লাহর নবি, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! তারা ধারণা করেছে যে, আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে।” তিনি বললেন :

كَذَبَ مَنْ قَالَهَا، إِنَّ لَهُ لَأَجْرَيْنِ اثْنَيْنِ، إِنَّهُ لَجَاهِدٌ مُجَاهِدٌ

“যে এ কথা বলেছে, সে মিথ্যা বলেছে। নিশ্চয় তাঁর (আমিরের) জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহর পথে সাধ্যমতো চেষ্টাকারী মুজাহিদ।”

টিকাঃ
৭৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৭৫।
৭৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪২৩, সহিহ মুসলিম : ১৯১১।
৭৮. সহিহুল বুখারি : ৩১৩০।
৭৯. সহিহুল বুখারি : ৩১৪১।
৮০. সুনানু আবি দাউদ : ২৬৪৭।
৮১. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ১৬।
৮২. সহিহ মুসলিম : ১৯০৬।
৮৩. মুসনাদু আহমাদ : ১৭০২৩।

১. যারা কল্যাণকর কাজের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা করতে পারে না, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা) থেকে বর্ণনা করেন। নবীজি (সা) বলেন :

لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ، وَلَكِنْ لَا أَجِدُ حَمُولَةً، وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ، وَيَشُقُّ عَلَيَّ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي...

‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য হবে বলে যদি মনে না করতাম, তবে আমি কোনো যুদ্ধে গমন হতে বিরত থাকতাম না। কিন্তু আমি তো সওয়ারি সংগ্রহ করতে পারছি না এবং আমি এতগুলো সওয়ারি পাচ্ছি না, যার ওপর আমি তাদের আরোহণ করাতে পারি। আর আমার জন্য এটা কষ্টদায়ক হবে যে, তারা আমার থেকে পেছনে পড়ে থাকবে।...’

জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা এক যুদ্ধে রাসূল (সা)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বললেন :

إِنَّ بِالْمَدِينَةِ لَرِجَالًا مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا، إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ، حَبَسَهُمُ الْمَرْضُ

‘মদিনাতে এমন কিছু লোক রয়েছে যে, তোমরা এমন কোনো দূরপথ ভ্রমণ করোনি এবং এমন কোনো উপত্যকা অতিক্রম করোনি, যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। অসুস্থতা তাদের আটকিয়ে দিয়েছে।’

ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উসমান (রা) বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা ছিলেন উসমান (রা)-এর স্ত্রী আর তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ফলে নবীজি (সা) তাঁকে বললেন, (إِنَّ لَكَ أَجْرَ رَجُلٍ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا وَسَهْمَهُ) “বদর যুদ্ধে যোগদানকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব ও (গনিমতের) অংশ তুমি পাবে।”

২. যে কোনো কল্যাণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে; কিন্তু অন্যজন তা বাস্তবায়ন করেছে অথবা পরিপূর্ণতা দান করেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আমি বদর যুদ্ধে সারিতে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আমার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম, অল্প বয়সি দুজন আনসার যুবকের মাঝখানে আছি। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাদের চেয়ে শক্তিশালীদেের মধ্যে থাকি। তখন তাঁদের একজন আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। তবে ভাতিজা, তাতে তোমার দরকার কী?” সে বলল, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গালাগালি করে। সে মহান সত্তার শপথ—যাঁয় হাতে আমার প্রাণ, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তবে আমার দেহ তার দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষণ না আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু আগে নির্ধারিত, সে মারা যায়।” আমি তাঁর কথায় আশ্চর্য হলাম। তা শুনে দ্বিতীয়জন আমাকে খোঁচা দিয়ে ওই রকমই বলল। তৎক্ষণাৎ আমি আবু জাহেলকে দেখলাম, সে লোকজনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমি বললাম, “এই যে তোমাদের সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে।” তাঁরা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি নিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে তা জানাল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে?” তাঁরা উভয়ে দাবি করল, “আমি তাকে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের তরবারি তোমরা মুছে ফেলোনি তো?” তাঁরা উভয়ে বলল, “না।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উভয়ের তরবারি দেখলেন এবং বললেন, “তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ। অবশ্য তার নিকট হতে প্রাপ্ত মালামাল মুআজ বিন আমর বিন জামুহের জন্য।” তাঁরা দুজন হলো, মুআজ বিন আফরা ও মুআজ বিন আমর বিন জামুহ (রা)।

আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক প্রেরিত কোনো এক সামরিক অভিযানকারী দলের সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সৈন্যরা (কৌশলগত কারণে) পলায়ন করলে আমিও তাদের সাথে আত্মগোপন করি। অতঃপর বিপদযুক্ত হয়ে বাইরে বের হয়ে এসে পরামর্শ করি, এখন কী করা যায়? আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর কারণে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হয়েছি। আমরা বললাম, “চলো আমরা মদিনায় গিয়ে আত্মগোপন করে থাকি; যেন কেউ আমাদের দেখতে না পায়। দ্বিতীয়বার জিহাদের সুযোগ হলে আমরা তাতে যোগদান করব।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা মদিনায় প্রবেশ করে পরস্পর বলাবলি করলাম, “আমরা যদি নিজেদেরকে রাসূল (সা)-এর সামনে পেশ করি এবং আমাদের জন্য যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তাহলে মদিনায় থেকে যাব। এর বিপরীত কিছু হলে মদিনা ছেড়ে চলে যাব।” তিনি বলেন, ‘আমরা ফজরের সালাতের পূর্বেই (মসজিদে) গিয়ে রাসূল (সা)-এর অপেক্ষায় বসে রইলাম। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলে আমরা দাঁড়িয়ে বললাম, “আমরা তো পলাতক সৈনিক।” তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, (لَا، بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) “না, বরং তোমরা পুনরায় যুদ্ধে যোগদানকারী।” ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘অতঃপর আমরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর হাতে চুমো দিলাম। তিনি বললেন, (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ) “আমিই মুসলিমদের পশ্চাতের দল।”

আওনুল মাবুদ নামক গ্রন্থে এসেছে, (بَلْ أَنْتُمُ الْعَكَّارُونَ) অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধে প্রত্যাগমনকারী।

ইমাম আল-খাত্তাবি (র) নবীজি (সা)-এর বাণী (إِنَّا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘নবিজি (সা) এর মাধ্যমে তাঁদের ওজরকে সহজ করে দিয়েছেন। আর এটি ছিল আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা :

أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ

“অথবা কোনো দলের কাছে আশ্রয় নিয়ে (যদি তাদের দিকে পিঠ ফেরায়)।”

৩. যে দরিদ্র লোকেরা কল্যাণের ইচ্ছা করেছে; কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও তা করতে সক্ষম হয়নি, তাদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :

مَا مِنْ غَازِيَةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللهِ فَيُصِيبُونَ الْغَنِيمَةَ، إِلَّا تَعَجَّلُوا ثُلُثَيْ أَجْرِهِمْ مِنَ الْآخِرَةِ، وَيَبْقَى لَهُمْ الثُّلُثُ، وَإِنْ لَمْ يُصِيبُوا غَنِيمَةً، تَمَّ لَهُمْ أَجْرُهُمْ

‘যে বাহিনী আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং তাতে গনিমত লাভ করল, তারা এ দুনিয়াতেই আখিরাতের দুই-তৃতীয়াংশ বিনিময় নগদ পেয়ে গেল। তাদের জন্য কেবল এক-তৃতীয়াংশ বিনিময় অবশিষ্ট রইল। আর যে বাহিনী কোনো গনিমত লাভ করল না, তাদের পূর্ণ বিনিময়ই পাওনা রয়ে গেল।

আমর বিন আবাসাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন :

أَيُّمَا رَجُلٍ مُسْلِمٍ رَمَى بِسَهْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَبَلَغَ مُخْطِئًا أَوْ مُصِيبًا فَلَهُ مِنَ الْأَجْرِ كَرَقَبَةٍ أَعْتَقَهَا مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ

“যেকোনো মুসলিম আল্লাহর পথে তির নিক্ষেপ করে, সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে ভুলকারী হোক কিংবা সঠিক, তার জন্য ইসমাইল (আ)-এর বংশধর থেকে একজন গোলাম আজাদ করার প্রতিদান রয়েছে।”

সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূল (সা)-এর সাথে খাইবারে বের হলাম। তখন তাঁদের এক ব্যক্তি বলল, “হে আমির, তুমি আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও।” সে তাঁদের তা গেয়ে শোনাল। তখন নবীজি (সা) বললেন, “চালকটি কে?” তাঁরা বলল, “আমির।” তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন!” লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরেকে তাঁর থেকে দীর্ঘকাল উপকার লাভ করার সুযোগ করে দিন।” পরদিন সকালে আমির নিহত হলো। তখন লোকেরা বলল, “তাঁর আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সে নিজেকে হত্যা করেছে।” যখন আমি ফিরলাম, আর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, “আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে”, তখন আমি নবীজি (সা)-এর নিকটে এলাম। আমি বললাম, “হে আল্লাহর নবি, আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! তারা ধারণা করেছে যে, আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে।” তিনি বললেন :

كَذَبَ مَنْ قَالَهَا، إِنَّ لَهُ لَأَجْرَيْنِ اثْنَيْنِ، إِنَّهُ لَجَاهِدٌ مُجَاهِدٌ

“যে এ কথা বলেছে, সে মিথ্যা বলেছে। নিশ্চয় তাঁর (আমিরের) জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। কারণ, সে আল্লাহর পথে সাধ্যমতো চেষ্টাকারী মুজাহিদ।”

টিকাঃ
৭৬. সহিহুল বুখারি : ২৯৭৫।
৭৭. সহিহুল বুখারি : ৪৪২৩, সহিহ মুসলিম : ১৯১১।
৭৮. সহিহুল বুখারি : ৩১৩০।
৭৯. সহিহুল বুখারি : ৩১৪১।
৮০. সুনানু আবি দাউদ : ২৬৪৭।
৮১. সুরা আল-আনফাল, ৮ : ১৬।
৮২. সহিহ মুসলিম : ১৯০৬।
৮৩. মুসনাদু আহমাদ : ১৭০২৩।

📘 অপরের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রেখো 📄 ষষ্ঠত, রোগাক্রান্ত বা এ ধরনের লোকদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

📄 ষষ্ঠত, রোগাক্রান্ত বা এ ধরনের লোকদের অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা


১. যার আকৃতিগত সমস্যা আছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলামি শরিয়তের নীতি হলো, যে রোগাক্রান্ত বা বিকলাঙ্গ অথবা যার দৈহিক খুঁত আছে, তাকে দেখার সময় আল্লাহর প্রশংসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা ও নিরাপত্তার নিয়ামতের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই দুই নিয়ামত তার জন্য পরিপূর্ণ করেছেন। এবং আক্রান্ত মুসলিমের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাকে কষ্ট দেবে না; কেননা, এর ফলে সে নিজের ত্রুটি অনুভব করবে এবং তার মাঝে আফসোসের জন্ম নেবে। এর ফলে সে ধারণা করবে যে, মানুষ তাকে ঘৃণা করে; অন্যেরা তার চেয়ে উত্তম। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যার মাঝে কোনো ব্যাধি রয়েছে, এ ব্যাপারে সে মানুষের অবগতি অপছন্দ করে।

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :

لَا تُحِدُّوا النَّظَرَ إِلَيْهِمْ يَعْنِي الْمَجْذُومِينَ

‘তাদের তথা কুষ্ঠরোগীদের দিকে তোমরা গভীর দৃষ্টি দিয়ো না।’

তাঁর অন্য এক বর্ণনায় আছে, নবীজি (সা) বলেন :

لَا تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمَجْذُومِينَ

“তোমরা কুষ্ঠরোগীদের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিয়ো না।”

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেন :

مَنْ رَأَى مُبْتَلًى، فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا، لَمْ يُصِبْهُ ذَلِكَ الْبَلَاءُ

‘যে লোক কোনো রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে বলে, (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا) “সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সে উক্ত ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না।’

ইমাম নববি (র) বলেন, ‘আমাদের ইমামগণ ও অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন, এই দুআ গোপনে বলবে; যেন পাঠকারী নিজে শুনতে পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে তা শোনাবে না; কেননা, এতে সে মনে কষ্ট পাবে। কিন্তু যদি তার বিপদ গুনাহের কারণে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। এই সময় যদি তার থেকে কোনো বিশৃঙ্খলার ভয় না থাকে, তাহলে তাকে শুনিয়ে বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।

২. কষ্টে পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুল্লাহ বিন মাকিল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

قَعَدْتُ إِلَى كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ يَعْنِي مَسْجِدَ الْكُوفَةِ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ صِيَامٍ، فَقَالَ: حُمِلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْقَمْلُ يَتَنَاثَرُ عَلَى وَجْهِي، فَقَالَ: «مَا كُنْتُ أَرَى أَنَّ الْجُهْدَ قَدْ بَلَغَ بِكَ هَذَا، أَمَا تَجِدُ شَاةً». قُلْتُ: لَا، قَالَ: «صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، أَوْ أَطْعِمْ سِتَّةَ مَسَاكِينَ لِكُلِّ مِسْكِينٍ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ طَعَامٍ، وَاحْلِقْ رَأْسَكَ» فَنَزَلَتْ فِيَّ خَاصَّةً وَهِيَ لَكُمْ عَامَّةً

‘আমি কাব বিন উজরা-এর নিকট কুফার এই মসজিদে বসা থাকাকালে সাওমের ফিদইয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নবীজি (সা)-এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তখন বললেন, “আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরি সংগ্রহ করতে পারবে?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তুমি তিন দিন সাওম পালন করো অথবা ছয়জন নিঃস্বকে খাদ্য দান করো। প্রত্যেক নিঃস্বকে অর্ধ সা’ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেলবে।” তখন আমার জন্য বিশেষভাবে আয়াত নাজিল হয়; অবশ্য তোমাদের সকলের জন্যও এই হুকুম।’

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا نَذْكُرُ إِلَّا الحَجَّ، فَلَمَّا جِئْنَا سَرِفَ طَمِثْتُ، فَدَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِي، فَقَالَ: «مَا يُبْكِيكِ؟» قُلْتُ: لَوَدِدْتُ وَاللَّهِ أَنِّي لَمْ أَحُجَّ العَامَ، قَالَ: «لَعَلَّكِ نُفِسْتِ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «فَإِنَّ ذَلِكَ شَيْءٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ، فَافْعَلِي مَا يَفْعَلُ الحَاجُّ، غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي»

‘আমরা কেবল হজের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে রওনা করলাম। আমরা যখন সারিফ নামক স্থানে পৌঁছলাম, আমার মাসিক ঋতু শুরু হয়ে গেল। রাসূল (সা) আমার কাছে এলেন, আমি তখন কাঁদছিলাম। তিনি বললেন, “তুমি কাঁদছ কেন?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এ বছর হজ না করাই আমার পছন্দনীয়!” তিনি বললেন, “সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “এটি তো এমন একটি বিষয়, আল্লাহ তাআলা যা আদম (আ)-এর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তুমি হজ পালনকারীগণ যা করে, তা-ই করো; কিন্তু পবিত্র হওয়া পর্যন্ত বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কোরো না।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘নবিজি (সা) কোমল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। যখনই আয়িশা (রা) কোনো আবদার করতেন, তখন তা রক্ষা করতেন।’

৩. ব্যথিত বা পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

নুমান বিন বাশির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، كَمَثَلِ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى

‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন তার বাকি সব অঙ্গ বিনিদ্রা ও জ্বরের শিকার হয়।’

মুসলিম উম্মাহ এক দেহের ন্যায়; যে দেহের একদম ছোট অঙ্গটি আক্রান্ত হলে বড় অঙ্গটিও তাতে প্রভাবিত হয়। যখন কোনো মুসলিম বিপদ বা মন্দ অবস্থায় পতিত হয়, তখন অন্য ভাইদের দায়িত্ব হলো, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার অবস্থা দেখে ব্যথিত হওয়া। ঠাট্টা বা তামাশা করা নয়—এটা অমর্যাদাকর ও মন্দ স্বভাব।

আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কয়েকজন কুরাইশি যুবক আয়িশা (রা)-এর নিকট আগমন করল। তখন তিনি মিনায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় তারা হাসছিল। আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয় তোমাদের হাসাচ্ছে?” তারা বলল, “অমুক ব্যক্তি তাঁবুর রশির ওপর পড়ে গেছে। ফলে তার গর্দান কিংবা চোখ নিষ্পিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।” তিনি বললেন, “তোমরা হেসো না। কেননা, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি :

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ

“যেকোনো মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হয় কিংবা তার চেয়েও অধিক ছোট কোনো আঘাত লাগে, তার বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”

৪. যার লজ্জাজনক কিছু ঘটে গেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলাম হলো শিষ্টাচার ও উত্তম আদর্শের ধর্ম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মুসলিমের কষ্ট ও সমস্যা দূর করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ যখন কোনো মুসলিম ইমাম বা মুক্তাদি হয়ে থাকে এবং সালাতের মাঝেই তার অজু ভেঙে যায়, তখন সে সমস্যায় পড়ে যায়। ইসলাম তার এই পরিস্থিতির বিষয়টি লক্ষ রেখেছে এবং এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে দিয়েছে; যেন তার প্রবৃত্তি তাকে অজুবিহীন সালাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কুমন্ত্রণা না দেয়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেছেন :

إِذَا أَحْدَثَ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَأْخُذْ بِأَنْفِهِ، ثُمَّ لِيَنْصَرِفْ

‘যখন সালাতে তোমাদের কারও অজু নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে যেন নিজের নাক চেপে ধরে বেরিয়ে যায়।’

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে বিষয়টি সমস্যা সৃষ্টি করে, তা গোপন রাখতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে তাওরিয়াহ (দ্ব্যর্থবোধক উক্তি) গ্রহণ করতে হবে। আর এটিকে কপটতাও বলা যাবে না।

তেমনিভাবে ইসলাম ওই ব্যক্তির অনুভূতির প্রতিও লক্ষ করেছে, যার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মজলিশে কোনো দূষণীয় বিষয় প্রকাশ হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ বিন জামআহ (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবিজি (সা) বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেওয়া সম্পর্কে বললেন :

لِمَ يَضْحَكُ أَحَدُكُمْ مِمَّا يَفْعَلُ

“তোমাদের কেউ কেউ সে কাজটির জন্য কেন হাসে, যা সে নিজেও করে।”

টিকাঃ
৮৪. সহিহুল বুখারি : ৬৮৯১।
৮৫. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১৪২৪৭।
৮৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৫৪৩।
৮৭. সুনানুত তিরমিজি : ৩৪৩২।
৮৮. আল-আজকার : ২৫৮।
৮৯. সহিহুল বুখারি : ৪৫১৭, সহিহ মুসলিম : ১২০১।
৯০. সহিহুল বুখারি : ৩০৫।
৯১. সহিহ মুসলিম : ১২১৩।
৯২. সহিহুল বুখারি : ৬০১১।
৯৩. সহিহ মুসলিম : ২৫৭২।
৯৪. সুনানু আবি দাউদ : ১১১৪।
৯৫. সহিহুল বুখারি : ৪৯৪২, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫।

১. যার আকৃতিগত সমস্যা আছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলামি শরিয়তের নীতি হলো, যে রোগাক্রান্ত বা বিকলাঙ্গ অথবা যার দৈহিক খুঁত আছে, তাকে দেখার সময় আল্লাহর প্রশংসা করবে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা ও নিরাপত্তার নিয়ামতের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এই দুই নিয়ামত তার জন্য পরিপূর্ণ করেছেন। এবং আক্রান্ত মুসলিমের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে তাকে কষ্ট দেবে না; কেননা, এর ফলে সে নিজের ত্রুটি অনুভব করবে এবং তার মাঝে আফসোসের জন্ম নেবে। এর ফলে সে ধারণা করবে যে, মানুষ তাকে ঘৃণা করে; অন্যেরা তার চেয়ে উত্তম। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যার মাঝে কোনো ব্যাধি রয়েছে, এ ব্যাপারে সে মানুষের অবগতি অপছন্দ করে।

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন :

لَا تُحِدُّوا النَّظَرَ إِلَيْهِمْ يَعْنِي الْمَجْذُومِينَ

‘তাদের তথা কুষ্ঠরোগীদের দিকে তোমরা গভীর দৃষ্টি দিয়ো না।’

তাঁর অন্য এক বর্ণনায় আছে, নবীজি (সা) বলেন :

لَا تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمَجْذُومِينَ

“তোমরা কুষ্ঠরোগীদের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিয়ো না।”

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেন :

مَنْ رَأَى مُبْتَلًى، فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا، لَمْ يُصِبْهُ ذَلِكَ الْبَلَاءُ

‘যে লোক কোনো রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে বলে, (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا) “সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা হতে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” সে উক্ত ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না।’

ইমাম নববি (র) বলেন, ‘আমাদের ইমামগণ ও অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন, এই দুআ গোপনে বলবে; যেন পাঠকারী নিজে শুনতে পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে তা শোনাবে না; কেননা, এতে সে মনে কষ্ট পাবে। কিন্তু যদি তার বিপদ গুনাহের কারণে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। এই সময় যদি তার থেকে কোনো বিশৃঙ্খলার ভয় না থাকে, তাহলে তাকে শুনিয়ে বলাতে কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।

২. কষ্টে পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

আব্দুল্লাহ বিন মাকিল (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

قَعَدْتُ إِلَى كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ يَعْنِي مَسْجِدَ الْكُوفَةِ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ صِيَامٍ، فَقَالَ: حُمِلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْقَمْلُ يَتَنَاثَرُ عَلَى وَجْهِي، فَقَالَ: «مَا كُنْتُ أَرَى أَنَّ الْجُهْدَ قَدْ بَلَغَ بِكَ هَذَا، أَمَا تَجِدُ شَاةً». قُلْتُ: لَا، قَالَ: «صُمْ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، أَوْ أَطْعِمْ سِتَّةَ مَسَاكِينَ لِكُلِّ مِسْكِينٍ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ طَعَامٍ، وَاحْلِقْ رَأْسَكَ» فَنَزَلَتْ فِيَّ خَاصَّةً وَهِيَ لَكُمْ عَامَّةً

‘আমি কাব বিন উজরা-এর নিকট কুফার এই মসজিদে বসা থাকাকালে সাওমের ফিদইয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নবীজি (সা)-এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তখন বললেন, “আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরি সংগ্রহ করতে পারবে?” আমি বললাম, “না।” তিনি বললেন, “তুমি তিন দিন সাওম পালন করো অথবা ছয়জন নিঃস্বকে খাদ্য দান করো। প্রত্যেক নিঃস্বকে অর্ধ সা’ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেলবে।” তখন আমার জন্য বিশেষভাবে আয়াত নাজিল হয়; অবশ্য তোমাদের সকলের জন্যও এই হুকুম।’

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :

خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا نَذْكُرُ إِلَّا الحَجَّ، فَلَمَّا جِئْنَا سَرِفَ طَمِثْتُ، فَدَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا أَبْكِي، فَقَالَ: «مَا يُبْكِيكِ؟» قُلْتُ: لَوَدِدْتُ وَاللَّهِ أَنِّي لَمْ أَحُجَّ العَامَ، قَالَ: «لَعَلَّكِ نُفِسْتِ؟» قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: «فَإِنَّ ذَلِكَ شَيْءٌ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَى بَنَاتِ آدَمَ، فَافْعَلِي مَا يَفْعَلُ الحَاجُّ، غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي»

‘আমরা কেবল হজের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা)-এর সঙ্গে রওনা করলাম। আমরা যখন সারিফ নামক স্থানে পৌঁছলাম, আমার মাসিক ঋতু শুরু হয়ে গেল। রাসূল (সা) আমার কাছে এলেন, আমি তখন কাঁদছিলাম। তিনি বললেন, “তুমি কাঁদছ কেন?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, এ বছর হজ না করাই আমার পছন্দনীয়!” তিনি বললেন, “সম্ভবত তুমি ঋতুবতী হয়েছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “এটি তো এমন একটি বিষয়, আল্লাহ তাআলা যা আদম (আ)-এর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তুমি হজ পালনকারীগণ যা করে, তা-ই করো; কিন্তু পবিত্র হওয়া পর্যন্ত বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কোরো না।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘নবিজি (সা) কোমল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। যখনই আয়িশা (রা) কোনো আবদার করতেন, তখন তা রক্ষা করতেন।’

৩. ব্যথিত বা পতিত ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

নুমান বিন বাশির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، كَمَثَلِ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى

‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন তার বাকি সব অঙ্গ বিনিদ্রা ও জ্বরের শিকার হয়।’

মুসলিম উম্মাহ এক দেহের ন্যায়; যে দেহের একদম ছোট অঙ্গটি আক্রান্ত হলে বড় অঙ্গটিও তাতে প্রভাবিত হয়। যখন কোনো মুসলিম বিপদ বা মন্দ অবস্থায় পতিত হয়, তখন অন্য ভাইদের দায়িত্ব হলো, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার অবস্থা দেখে ব্যথিত হওয়া। ঠাট্টা বা তামাশা করা নয়—এটা অমর্যাদাকর ও মন্দ স্বভাব।

আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কয়েকজন কুরাইশি যুবক আয়িশা (রা)-এর নিকট আগমন করল। তখন তিনি মিনায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় তারা হাসছিল। আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয় তোমাদের হাসাচ্ছে?” তারা বলল, “অমুক ব্যক্তি তাঁবুর রশির ওপর পড়ে গেছে। ফলে তার গর্দান কিংবা চোখ নিষ্পিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়।” তিনি বললেন, “তোমরা হেসো না। কেননা, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি :

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ

“যেকোনো মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হয় কিংবা তার চেয়েও অধিক ছোট কোনো আঘাত লাগে, তার বিনিময়ে তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”

৪. যার লজ্জাজনক কিছু ঘটে গেছে, তার অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলাম হলো শিষ্টাচার ও উত্তম আদর্শের ধর্ম। ইসলাম সর্বাবস্থায় মুসলিমের কষ্ট ও সমস্যা দূর করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ যখন কোনো মুসলিম ইমাম বা মুক্তাদি হয়ে থাকে এবং সালাতের মাঝেই তার অজু ভেঙে যায়, তখন সে সমস্যায় পড়ে যায়। ইসলাম তার এই পরিস্থিতির বিষয়টি লক্ষ রেখেছে এবং এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে দিয়েছে; যেন তার প্রবৃত্তি তাকে অজুবিহীন সালাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কুমন্ত্রণা না দেয়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা) বলেছেন :

إِذَا أَحْدَثَ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَأْخُذْ بِأَنْفِهِ، ثُمَّ لِيَنْصَرِفْ

‘যখন সালাতে তোমাদের কারও অজু নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে যেন নিজের নাক চেপে ধরে বেরিয়ে যায়।’

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে বিষয়টি সমস্যা সৃষ্টি করে, তা গোপন রাখতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে তাওরিয়াহ (দ্ব্যর্থবোধক উক্তি) গ্রহণ করতে হবে। আর এটিকে কপটতাও বলা যাবে না।

তেমনিভাবে ইসলাম ওই ব্যক্তির অনুভূতির প্রতিও লক্ষ করেছে, যার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মজলিশে কোনো দূষণীয় বিষয় প্রকাশ হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ বিন জামআহ (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবিজি (সা) বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেওয়া সম্পর্কে বললেন :

لِمَ يَضْحَكُ أَحَدُكُمْ مِمَّا يَفْعَلُ

“তোমাদের কেউ কেউ সে কাজটির জন্য কেন হাসে, যা সে নিজেও করে।”

টিকাঃ
৮৪. সহিহুল বুখারি : ৬৮৯১।
৮৫. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ১৪২৪৭।
৮৬. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৫৪৩।
৮৭. সুনানুত তিরমিজি : ৩৪৩২।
৮৮. আল-আজকার : ২৫৮।
৮৯. সহিহুল বুখারি : ৪৫১৭, সহিহ মুসলিম : ১২০১।
৯০. সহিহুল বুখারি : ৩০৫।
৯১. সহিহ মুসলিম : ১২১৩।
৯২. সহিহুল বুখারি : ৬০১১।
৯৩. সহিহ মুসলিম : ২৫৭২।
৯৪. সুনানু আবি দাউদ : ১১১৪।
৯৫. সহিহুল বুখারি : ৪৯৪২, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px