📄 হযরত লূত (আ.)-এর স্ত্রী
দ্বিতীয় মহিলা যার নাম কোরআনে কারিমে হযরত নূহ (আঃ)-এর সাথে উল্লেখ করেছেন এবং কাফেরদের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে হল একজন পয়গাম্বরের পত্নী। সে ধর্মের ব্যাপারে আপন স্বামীর বিরুদ্ধাচারণ করেছিল এবং গোপনে কাফের ও মুশরিকদেরকে সাহায্য করেছিল। ফলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। আল্লাহ তা'আলার প্রিয় পয়গাম্বরের বৈবাহিক সাহচর্য ও তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
এসব দৃষ্টান্ত দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, একজন মুমিনের ঈমান তার কোন কাফের স্বজন ও আত্মীয়ের উপকারে আসতে পারে না। তাই নবী ওলীগণের পত্নীরা যেন নিশ্চিন্ত না হয় যে, তারা তাদের স্বামীদের কারণে মুক্তি পেয়েই যাবে এবং কোন কাফের পাপাচারীর পত্নী যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয় যে, স্বামীর কুফরী ও পাপাচার তার জন্য ক্ষতিকর হবে। বরং প্রত্যেক পুরুষ ও নারীকে নিজেই নিজের ঈমান ও সৎকর্মের চিন্তা করা উচিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
“আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের জন্য নূহ-পত্নী ও লূত পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তারা ছিল আমার দুই ধর্মপরায়ণ বান্দার গৃহে। অতঃপর তারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার কবল থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল : জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও।” (সূরা আত তাহরীম ১০)
উল্লেখিত আয়াতে কারীমে خیانت দ্বারা বিছানার খিয়ানত উদ্দেশ্য নয়।' বরং তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আক্বীদাহ-এর খিয়ানত। কেননা সে নবীর দাওয়াত কবুল না করে আপন গোত্রের অনুগত হয়েছিল এবং নিজ স্বামীর দাওয়াতের বিরুদ্ধে আপন গোত্রের সাহায্য করেছিল।
হযরত লূত (আঃ) এর স্ত্রী 'সদূম' নামক শহরের অধিবাসী ছিল। তার সম্প্রদায় অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত ছিল। আল্লাহ পাক হযরত লূত (আঃ)-কে 'সদম' নামক শহর এবং তার উপকণ্ঠের জন্য নবী করে প্রেরণ করেছিলেন। তাই তিনি তাদেরকে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন-
“তোমরা এত অন্যায় অশ্লীল কাজে লিপ্ত হয়েছ যা পৃথিবীতে তোমাদের পূর্বে আর কেউ করেনি”। (সূরা আনকাবুত-২৮)
হযরত লুত (আঃ) আরও বলেন, “তোমরাই তো পুরুষে উপগত হও, তোমরাই তো ডাকাতি, রাহাজানি করে থাক, তোমরাই তো নিজেদের সভায় প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হও। জবাবে তাঁর সম্প্রদায় শুধু একথা বললো যে, আমাদের উপর আল্লাহর আযাব নিয়ে আস, যদি তুমি সত্যবাদী হও। (সূরা আনকাবুত-২৯)
আলোচ্য আয়াতসমূহে হযরত লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের জঘন্য অপকর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ স্থান পেয়েছে। তারা জঘন্যতম ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হতো, তারা অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে এবং প্রকৃতি বিরুদ্ধ পন্থায় যৌন সম্ভোগ করতো, শুধু তাই নয়, তারা ডাকাতি-রাহাজানি করতো, মানুষের পথ রোধ করে তাদের অর্থ সম্পদ লুট করতো।
হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম ছিল 'ওয়াহিলাহ' সে তার জাতির নিকট সুদর্শন যুবকদের আগমনের খবর দিয়েছিল। হযরত লূত (আঃ) তাঁর জাতির ব্যাপারে যে আশংকা করেছিলেন অবশেষে তা সত্য প্রমাণিত হলো। সুদর্শন যুবকদের আগমনের খবর পেয়ে পাষন্ডরা আত্মহারা হয়ে দ্রুতবেগে ছুটে আসলো। হযরত লুত (আঃ)-এর নিকট আগত মেহমানদেরকে তাদের হস্তে সমর্পণের জন্যে দাবী জানালো। তারা তাঁর মেহমানদেরকে তাদের কুকর্মের যোগ্য শিকার মনে করে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পীড়িপীড়ি শুরু করলো। হযরত লূত (আঃ) তাদেরকে উপদেশ দিয়ে এ ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন-
'তাঁর জাতি তাঁর নিকট ছুটে আসলো উদ্ভ্রান্ত হয়ে, আর তারা পূর্ব থেকেই কুকর্মে লিপ্ত ছিল। লূত বললেন, হে আমার জাতি!
এ আমার কন্যারা রয়েছে, এরা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্রতমা। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, এবং অতিথিদের ব্যাপারে আমাকে লজ্জিত করো না, তোমাদের মধ্যে কি কোন ভাল মানুষ নেই। (সূরা হুদ ৭৮)
হযরত লুত (আঃ)-এর এসব কথার দুরাত্মা জালেমরা সঠিক পথে আসলো না। তাই হযরত লূত (আঃ)-এর কাকুতি মিনতি তাদের মনে দাগ কাটেনি: বরং তাদের দৌরাত্মা, দুঃসাহস এবং নির্লজ্জতা আরো বেড়ে যায়।
এক পর্যায়ে লূত (আঃ) অত্যন্ত অস্বস্তিকর অবস্থায় বলেছিলেন, “হায়! যদি আমি তোমাদের তুলনায় অধিকতর শক্তির অধিকারী হতাম এবং যদি আমি কোন সুদৃঢ় আশ্রয় পেতাম।" হযরত লূত (আঃ) দুশমনের মোকাবেলায় যখন চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন তখনই একথা বলেছিলেন, এদিকে ফেরেশতাগণও দেখলেন যে, জালেমদের দৌরাত্ম সীমালংঘন করতে যাচ্ছে-এমন অবস্থায় ফেরেশতাগণ যে সুসংবাদ দিলেন, তা কোরআনে কারীমে এভাবে ইরশাদ হয়েছে:
“মেহমানগণ বললেন, হে লূত! আমরা আপনার প্রতিপালকের তরফ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা, তারা কখনই আপনার নিকট পৌঁছতে পারবে না। অতএব, রাতের কোন এক সময় আপনার পরিবারবর্গ সহ বের হয়ে পড়ুন। আর কেহ যেন পিছনে ফিরে না তাকায়। তবে আপনার স্ত্রী, তার ব্যাপারে তাই ঘটবে যা ঘটবে তাদের ব্যাপারে। প্রভাত তাদের জন্য প্রতিশ্রুতির সময়, প্রভাত কি খুব নিকটবর্তী নয়। (সূরা হুদ-৮১)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, إِلَّا امْرَاتَكَ - “তবে হ্যাঁ হে লুত! তোমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিও না।” কেননা, সে কাফের, সে কোপগস্থ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে আছে। আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপত্তি (র.) লিখেছেন, হযরত লূত (আ.)-এর স্ত্রী সম্পর্কে তাফসীরকারগণ এ পর্যায়ে দুটি বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
(১) হযরত লুত (আঃ)-এর স্ত্রী তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হয়েছিল, কিন্তু পূর্বাহ্নে সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ করা সত্ত্বেও সে কোপগ্রস্থ সম্প্রদায়ের দিকে পিছনে ফিরে তাকিয়েছিল, ফলে ধ্বংস হয়।
(২) হযরত লুত (আঃ)-এর উপর এ আদেশ হয়েছিল যেন তার স্ত্রীকে কাফেরদের নিকটই ছেড়ে যান কেননা, তার মন তাদের দিকে আকৃষ্ট ছিল তাই, তার সম্পর্কে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
যে আযাব লূত (আঃ)-এর জাতির প্রতি আপতিত হবে তা হযরত লূত (আঃ)-এর স্ত্রীর উপরও নির্ধারিত হয়ে আছে। যেভাবে হযরত নূহ (আঃ)-এর পুত্র কেনান কাফের হওয়ার কারণে তাকে নূহ (আঃ)-এর পরিবারভুক্ত মনে করা হয়নি, ঠিক তেমনিভাবে লূত (আঃ)-এর স্ত্রী মুমেন না হওয়ার কারণে এবং স্বামীর নাফরমানীর কারণে তাকে কোপগস্থ হতে হয়েছে।
(তাফসীরে নূরুল কোরআন ১২/১২৯)