📄 শিক্ষা
উপনিবেশ আমল শুরু হওয়ার আগে উসমানি-অধীন এলাকা (পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা), পশ্চিম আফ্রিকা (মালি, ঘানা, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া) এবং উপমহাদেশে (পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান) একটা শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। উইলিয়াম হান্টার তার ইন্ডিয়ান মুসলমানস গ্রন্থে লেখেন-
" এ দেশটা আমাদের হুকুমতে আসার আগে মুসলিমরা শুধু শাসনের ব্যাপারেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিল ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতি। ভারতের যে প্রসিদ্ধ (ইংরেজ) রাষ্ট্রনেতা তাদের ভালোভাবে জানেন, তার কথায়: ভারতীয় মুসলিমদের এমন একটা শিক্ষাপ্রণালি ছিল, যেটা আমাদের আমদানি করা (ব্রিটিশ) প্রণালির চেয়ে নিম্ন হলেও (!) কোনো ক্রমেই ঘৃণার যোগ্য ছিল না। তার দ্বারা উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন হতো। সেটা পুরোনো ছাঁচের হলেও তার ভিত্তিমূল সুদৃঢ় ছিল এবং সেকালের অন্য সব প্রণালির চেয়ে নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট ছিল। এই শিক্ষাব্যস্থায়ই তারা মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য সহজেই অধিকার করেছিল।'
সেই শিক্ষাটা কেমন ছিল একটু ধারণা করা যেতে পারে। উপনিবেশ শুরুর ঠিক আগের শতকে আওরঙ্গজেবের মেয়ে শাহজাদি যাইবুন্নিসার সিলেবাস ছিল আরবি গ্রামার, গণিত, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন এবং অন্যান্য বিজ্ঞান সহযোগে। এটা ছিল ঘরোয়া একটা অনানুষ্ঠানিক কারিকুলাম। এ থেকে আনুষ্ঠানিক কারিকুলামের একটা ধারণা নিতে পারি আমরা। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদরাসা ছিল, যেখানে উইলিয়াম হান্টারের বিবরণ অনুযায়ী 'ব্রিটিশ কারিকুলামের মতো না হলেও ঘৃণার যোগ্য ছিল না', বরং 'উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন' হবার জন্য এবং 'মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য' অর্জনের উপযোগী ৮০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল আমাদের ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষের জন্য শুধু 'বাংলায়'।
ফ্রান্সের নিষ্পেষণে নিঃসু আফ্রিকার সোনার দেশ, 'মানসা মুসা'র দেশ মালি। উপনিবেশ হবার আগে টিম্বাকত শহরে ৩টা ভার্সিটি, ১৬শ শতকে। শহরে ১ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২৫ হাজারই ছিল ভার্সিটি স্টুডেন্ট। কুরআন-হাদিস-ফিকহ-সাহিত্য ছিল প্রধান বিষয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে থাকত-মেডিসিন-সার্জারি, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ফিজিক্স, রসায়ন, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস, চিত্রকলা। ভার্সিটির সামনে বহু ট্রেড-শপ থাকত, ছাত্ররা এখানে হাতেকলমে ব্যবসা শিখত। এখানে কাঠের কাজ, কৃষি, মাছ ধরা, চামড়া শিল্প, সূচিকর্ম, নৌবিদ্যা শিখত।
'এনলাইটেনমেন্ট'-এর যুগে ইউরোপ যখন 'খ্রিষ্টধর্ম-সামন্তসমাজ' (রাজতন্ত্র+পোপতন্ত্র) থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষ-পুঁজিবাদ' (গণতন্ত্র+পুঁজিপতি) সেট-আপে আসছে। নতুন করে সবকিছুর সংজ্ঞা ঠিক করা হচ্ছে। ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র- ধর্ম-উদ্দেশ্য-সত্য-নৈতিকতা-সবকিছুর নতুন নতুন ধারণা দিচ্ছেন ইউরোপীয় দার্শনিকরা। পুরোপুরি ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার আলোকে। সুতরাং, 'শিক্ষা'র সংজ্ঞাও বদলে গেল। Encyclopedia Britannica বলছে-
“ The new social and economic changes (এনলাইটেনমেন্ট) also called upon the schools (public and private) to broaden their aims and curricula. Schools were expected not only to promote literacy, mental discipline, and good moral character (শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য) but also to help prepare children for citizenship, for jobs, and for individual development and success. (পরের উদ্দেশ্য)
আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল-লিখতে-পড়তে পারা (promote literacy), শৃঙ্খলা শেখানো (mental discipline) আর নৈতিক চরিত্র গঠন (good moral character)। আর এখন তার সাথে যোগ হলো-
১. নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি (citizenship)
২. নতুন অর্থ-ব্যবস্থার (পুঁজিবাদী) জন্য কর্মী তৈরি, যারা চাকুরিতে আসবে (jobs)
৩. নতুন সংজ্ঞার 'ব্যক্তি' তৈরি (individual development), যারা 'সফলতা'র নতুন সংজ্ঞার (material success) জন্য প্রস্তুত হবে।
তাহলে 'নারীশিক্ষা' মানে কী দাঁড়াচ্ছে?
১. মেয়েদেরকে তাদের দেওয়া রাষ্ট্র-কাঠামোর যোগ্য নাগরিক বানানো
২. পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থার কর্মী বানানো
৩. 'ব্যক্তি' হিসেবে মেয়েদের তৈরি করা, যারা ধর্মকে ঝেড়ে ফেলে নিজের নৈতিকতার মাপকাঠি ঠিক করতে পারে। নিজেকে পশ্চিমাদের সংজ্ঞায় 'সফল' হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। খ্যাতি-অর্থ-পদ-আধুনিকতার দাসে পরিণত হতে পারে।
'শিক্ষা' মানে 'নারীশিক্ষা' মানে যদি হয় 'এই', তাহলে ইউরোপের বাকি সব সংজ্ঞার মতো, ওই 'শিক্ষা' 'নারীশিক্ষা'র সাথেও ইসলাম একমত নয়। এই যে এদেশের বড় বড় আলিমগণ যে এই সেক্যুলar 'শিক্ষা' 'নারীশিক্ষা'র বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং শুরু থেকেই বলে এসেছেন-এই কারণে বলেন। আমরা না বুঝলেও আলিমরা ঠিকই বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা কী করতে যাচ্ছে। বিপদ আঁচ করেই তারা অনেকে 'ইংরেজি শিক্ষার' বিরোধিতা করেছিলেন।
দেশে দেশে উপনিবেশবাদ জেঁকে বসল। ইংরেজরা সুবে বাংলার খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে লক্ষ্য করল যে, ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদরাসা ছিল। এই ৮০ হাজার মক্তব, মাদ্রাসা ও খানকার জন্য বাংলার চার ভাগের এক ভাগ জমি লাখেরাজভাবে বরাদ্দ ছিল। আরে? ৪ ভাগের ১ ভাগ খাজনা হাতছাড়া হবে, তাই কি হয়? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমেই এই লাখেরাজ সম্পত্তি বিভিন্ন আইন, বিধিবিধান প্রণয়ন ও জোরজবরদস্তি করে দেশের হিন্দু জমিদারদের কাছে ইজারা দিতে থাকে। এ-সংক্রান্ত তিনটি বিধান হলো-
(১) ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন-১৯, (২) ১৯১৮ সালের রেগুলেশন-২, (৩) রিজাম্পশান ল' অব ১৮২৮ (লাখেরাজ ভূমি পুনঃগ্রহণ আইন)।
ফলে মাদ্রাসার আয় কমতে থাকে। বহু মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। ১৭৬৫ সালে বাংলায় মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল আশি হাজার (Max Muller)। ২০০ বছর পর ১৯৬৫ সালে এ সংখ্যা দুই হাজারের নিচে নেমে আসে।
১৮৩০ সালের পর তাদের খেয়াল হলো। কী খেয়াল? এই মূর্খ নেটিভদের শিক্ষিত করা দরকার—এই দয়া? জি না। তাদের খেয়াল হলো, এই বিশাল দেশ দীর্ঘমেয়াদে শাসন করতে হলে আমাদের কিছু অনুগত সেবাদাস তৈরি করা দরকার, আমাদের পণ্যের বিক্রি বাড়াতে এদের রুচি বদলে দেওয়া দরকার। যারা আমাদের আর এই বাদামি নেটিভদের মধ্যস্থতা করবে (দালাল), এদেশে রক্ষা করবে আমাদের স্বার্থ (এমনকি আমরা চলে গেলেও)। ১৮৩৪ সালে ভারতে শিক্ষা প্রসারের জন্য (?) কমিটি করা হয়। এর প্রধান ছিলেন লর্ড মেকলে। স্কিমের রিপোর্টে কমিটির উদ্দেশ্য হিসেবে লেখেন (কথাগুলো খেয়াল করুন)—
বর্তমানে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা নেওয়া উচিত, যারা আমাদের ও আমাদের মিলিয়ন মিলিয়ন প্রজাদের মাঝে ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করবে। (উদ্দেশ্য শিক্ষার প্রসার নয়)
এরা হবে এমন একটা শ্রেণি, যারা রক্তে-গায়ের রঙে তো ভারতীয়, কিন্তু রুচি-মতামত-নীতি-বিচারবুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। (মনোরাজ্যে উপনিবেশ)
এই শ্রেণির কাছে আমরা দায়িত্ব দেবো তাদের দেশের প্রচলিত কথাগুলোকে সংস্কার করার এবং পশ্চিমা পরিভাষা নিয়ে তাদের স্থানীয় ভাষাগুলোকে সমৃদ্ধ করার। (পশ্চিমা দর্শন-সংজ্ঞা-পরিভাষা গ্রহণ ও আত্মীকরণ)
তাদেরকে আমরা বাহন হিসেবে দেবো বিভিন্ন ডিগ্রি, যাতে চড়ে তারা এই জ্ঞান পৌঁছে দেবে বাকি জনগণকে। (ডক্টরেট-নোবেল প্রাইজ-স্যার-রায়বাহাদুর-খানবাহাদুর) [১]
পশ্চিমা শিক্ষা দর্শনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল—
পাশ্চাত্য সভ্যতার মহান ধারণাগুলো (এনলাইটেনমেন্ট থেকে পাওয়া) যেন বুঝিয়ে দেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের। কারণ এই আইডিয়াগুলো চিরন্তন, ধ্রুব সত্য এবং সর্বযুগের সমাধান। [২]
এভাবেই ইউরোপের নিজের অভিজ্ঞতা (আলোকায়নের তরিকা) 'সর্বজনীন পরম সত্য' হিসেবে পুরো দুনিয়ার ওপর চাপানোর এজেন্ডা নেওয়া হলো। যদিও ইসলামি ভূখণ্ডে, চীনের অভিজ্ঞতা ইউরোপ থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। উপনিবেশের মওকায় এভাবেই তারা সেই শ্রেণিটা তৈরি করে ফেলল, 'যারা চামড়ায় ভারতীয়, মগজে ইউরোপীয়'।
যেহেতু শিক্ষার সংজ্ঞা হলো 'ইউরোপের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি শেখা-ধারণ করা ও আত্মীকরণ করে চামড়ায় ভারতীয় মগজে ইউরোপীয় হওয়া'। এই সংজ্ঞায় যারা পড়বে, তারা হচ্ছে 'শিক্ষিত'। আর যারা এই সংজ্ঞায় আসবে না, তারা 'অশিক্ষিত', 'মূর্খ', 'প্রস্তর যুগের লোক', 'পশ্চাৎপদ'। তারা কারা? তারা হচ্ছে, যারা প্যারালাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সেই আগেরটা লালন করে চলে। বিপদ টের পেয়ে ১৮৬৬ সালে আলিমগণ প্রতিষ্ঠা করেন দেওবন্দ মাদরাসা। সমাজের অর্থায়নে টিকে গেল এনলাইটেনমেন্ট-বিরোধী শিক্ষাধারা।
ব্রিটিশরা যখন ক্ষমতা দিয়ে গেল, কাদের কাছে দিয়ে গেল? এই 'চামড়ায় ভারতীয় মগজে ব্রিটিশ'দের হাতেই, যাদের আদর করে ডাকা হয় Children of Macaulay। এরাই আমাদের প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-আমলা-শিক্ষক-বাবা-দাদা হলেন। তারাই আমাদের কারিকুলাম বানালেন, তারাই পলিসি করলেন, তারাই পরস্পর যুদ্ধ করলেন। বলা হয় দেশভাগ নাকি হয়েছিল 'ধর্মের ভিত্তিতে'... বাংলাদেশের জন্মই নাকি প্রমাণ করে দিলো 'ধর্ম' কোথাও ভিত্তি হতে পারে না, ধর্ম ব্যর্থ। বাজারে খুব চলে এই চেতনাটা। আচ্ছা, সেক্যুলার ব্রিটিশ দেশভাগ করল খাবলা খাবলা করে। দেশ দিয়ে গেল সেক্যুলারদের হাতেই: জিন্নাহ-নেহেরু দুজনই বিলাতের ব্যারিস্টারি পড়াকালীন দোস্ত। যুদ্ধ করল সেক্যুলারে-সেক্যুলারে। বাঙালি মা-বোনদের ধর্ষণ করল পাক সেক্যুলার দেশের সেক্যুলার আর্মি। এই পুরো নাটকে 'ধর্ম' 'ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ' 'আলিমসমাজ'-এর দোষটা কোথায়? সব রোল প্লে করল 'চামড়ায় ভারতীয় মগজে ইংরেজ'রা। দোষ হচ্ছে ধর্মের। মজা তো, মজা না?
সেই লর্ড মেকলের শিক্ষায় আমরাও 'শিক্ষিত', আমরা 'Children of Macaulay'। মনেপ্রাণে আমরা ধারণ করি ইউরোপীয় চেতনা। এনলাইটেনমেন্ট থেকে মডার্নিটি হয়ে পাওয়া ইউরোপীয় অভিজ্ঞতাপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্ম মানে যদি হয় 'ধারণ করা', তবে আমাদের ধর্ম 'পাশ্চাত্য দর্শন', কারণ জেনে না-জেনে ওটাই আমরা ধারণ করি। যদিও মুখে বলি 'আমি মুসলিম' বা 'আমি হিন্দু'।
টিকাঃ
[১] Minute on Indian Education, 2nd February, 1935; Thomas Babington Macaulay, point 12.
[২] Perennialism দর্শন। [Philosophical Perspectives in Education, Oregon State University ওয়েবসাইট]
📄 শিল্প ধ্বংস
কীভাবে সর্বোচ্চ জিডিপির দেশে লাগাতার দুর্ভিক্ষ লাগাতে হয়, তা তো দেখেছেনই। এবার দেখুন কীভাবে শিল্পোন্নত একটা দেশকে কৃষিপ্রধান বানাতে হয়। মোগল আমলে ঠিক যে পরিমাণ মানুষের পেশা ছিল কৃষি, প্রায় কাছাকাছি (৪০%) মানুষের পেশা ছিল শিল্প। বাণিজ্যপ্রধান এলাকা ছিল এদেশ। প্রধান রপ্তানিপণ্য ছিল: মসলিন-সিল্ক-কিংখাব-প্রিন্টের কাপড়, অ্যাম্ব্রয়ডারি, পাটের গালিচা, তামা-পিতলের পাত্র, গহনা, লেদার প্রোডাক্ট, অস্ত্রপাতি, পারফিউম, হাতির দাঁতের কারুকাজ, কাগজ যেত ইউরোপ-আমেরিকায়[১]। সুলতান আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ের একটি চিঠি লেখেন ফ্রান্সের অর্থসচিব মশিয়ে কলবার্টকে। তাতে তিনি মুঘল আমলে ভারতের শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লেখেন-
G হিন্দুস্তান প্রসঙ্গে একটি বিষয় লক্ষণীয়। সোনা-রুপা পৃথিবীর অন্য সব জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত হিন্দুস্তানে এসে পৌঁছায় এবং হিন্দুস্থানের গুপ্ত-গহ্বরে অন্তর্ধান হয়ে যায়। আমেরিকা-ইউরোপের সোনা এসে জমে তুরস্কে, তুর্কী পণ্যের বিনিময়ে। আর যেত ইয়ামেনে, ইয়ামেনি কফির বদলে। আর তুরস্ক-ইয়ামেন- পারস্য সবারই দরকার হিন্দুস্তানি পণ্য। ডাচ ব্যবসায়ীরা জাপানের সাথে বাণিজ্য করে যা পেত, তাও এসে জমা হতো ভারতে। যা কিছু পর্তুগাল-ফ্রান্স থেকে আসে, তাও ফেরত যায় না। তার বদলে হিন্দুস্তানের পণ্যের চালান যেত।... এর কারণ হলো, হিন্দুস্তানের বণিকরা সোনা দিয়ে দাম শোধ না করে, পণ্য দিয়েই দাম দিত। আর পণ্যের পসরা নিয়ে দেশ-বিদেশে গেলে, সেই জাহাজেই তাল তাল সোনা বোঝাই করে ফেরত আসত [১]।
উপমহাদেশের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্প ছিল ইংল্যান্ডের তাঁতিদের চক্ষুশূল। সপ্তদশ শতকে ইংরেজ তাঁতিদের দাবির মুখে বাধ্য হয়ে আইন করে ভারতীয় কাপড়ের প্রবেশ বন্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। শিল্পবিপ্লব শুরুর পর যন্ত্রচালিত কারখানার নিম্নমানের কাপড় বিক্রির বাজার সৃষ্টি করার জন্য ভারতের বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করে দেবার বিকল্প ছিল না। নিজের বাজার ভারতীয় পণ্যের জন্য বন্ধ, আর ভারতের বাজার তাদের পণ্যের জন্য মুক্ত। ১৭ মার্চ ১৭৬৯-এর এক আদেশবলে কোম্পানি তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে: ভারতে কাঁচা রেশম উৎপাদন বাড়াতে হবে, রেশমবস্ত্র উৎপাদন কমাতে হবে। ঘরে উৎপাদন করতে দেওয়া যাবে না, বলপ্রয়োগে রেশমশিল্পীদের 'কোম্পানির ফ্যাক্টরি'-তে এসে কাজ করতে বাধ্য করা হবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই আদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। বলা হয়াখ—
এই আদেশ একটি নিখুঁত পলিসি-প্ল্যান—একই সাথে বাধ্য করা এবং উৎসাহিত করা। ফলে বাংলার শিল্পকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ধ্বংস করবে। এর ফলে ওই শিল্পোন্নত দেশটির চেহারাই পাল্টে যাবে, বরং গ্রেটব্রিটেনের শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামালের এক ময়দানে পরিণত করাই উদ্দেশ্য।
নিজ ঘরে রেশমশিল্পীরা যেন কাজ করতে না পারে, কোম্পানির স্বার্থে কেবল যেন কোম্পানির ফ্যাক্টরিতেই কাজ করে, এজন্য সরকারি ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হওয়া চাই। পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির দ্বারা সরকারি ক্ষমতাবলে এটা করা হোক তারা চায় (কোম্পানি)।
কারিগরদের বেতনের লোভ দেখিয়ে ফিরিয়ে রাখা হবে তাঁত থেকে, যাতে আমাদের জন্য কাঁচামাল রয়ে যায়। তাদেরকে আমাদের কারখানায় আটকে দেওয়া (locked up) হবে। তাদের যে পণ্য আগে বিকাশলাভ করেছিল, উচ্চমূল্য করে দিয়ে, তা ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ করে দেওয়া হবে গ্রেটব্রিটেনের ক্ষমতাবলে।
এইসব বিধিনিষেধ আর উৎসাহের দ্বারাই বাংলায় আমাদের চাওয়া পূর্ণ হবে। শ্রমকে শিল্প থেকে কাঁচামালের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এই পলিসির ফলে কাঁচা রেশমের উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে।
ব্রিটিশ ব্যবসায়ী William Bolts তার Considerations on India Affairs পত্র সংকলনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভয়াবহ লুটপাটের খতিয়ান তুলে এনেছেন। তিনি লেখেন-
পুরো দেশজুড়ে শিল্পশ্রমিকদের ওপর হেন অত্যাচার নেই, যা করা হতো না। অত্যাচারের পরিমাণ বাড়তেই থাকত, বিশেষ করে তাঁতিদের ওপর। তাঁতি, দালাল ও পাইকারদেরকে উৎপাদন-সংগ্রহের কোটা পূরণ না হবার জন্য গ্রেপ্তার, জেল, মোটা জরিমানা, চাবুকপেটা এবং নিজ ভূমি থেকে বহিষ্কার করা হতো। কম উৎপাদন করলে তাঁতিদের পণ্য ছিনিয়ে নেয়া হতো দাম ছাড়াই। কাঁচা রেশমশিল্পীদের ওপরও এরকম অত্যাচার হতো। এমন ঘটনাও জানা গেছে, এই বাধ্যশ্রম থেকে বাঁচতে তাঁতিরা নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুলিই কেটে ফেলেছে। লর্ড ক্লাইভের সময় তো আর্মেনীয় বণিকদের কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়ে রেশমচাষীদের জোর করে ইংরেজ কারখানায় আনা হয়েছে। (পৃষ্ঠা : ১৯৪)।
শিল্পোন্নত ভারতবর্ষ-বাংলাকে এভাবেই সাম্য-ভ্রাতৃত্ব-স্বাধীনতা দিয়ে কৃষিপ্রধান দেশ বানিয়ে দেওয়া হলো। আর নেটিভরা ভাবল তারা উন্নত হচ্ছে, ব্রিটিশরা তাদের সভ্যতা শেখাচ্ছে। ইউরোপের ফর্মুলা মানলেই নেটিভরা উন্নত হতে পারবে, ঠিক একদিন, তোমরা দেখে নিয়ো।
টিকাঃ
[১] A journey from Madras through the countries of Mysore, Kanara and Malabar, Francis Buchanan MD, Fellow of Royal Society.
[১] বাদশাহি আমল, বিনয় ঘোষ, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭১
[২] Ninth Report of the House of Commons Select Committee on Administration of Justice in India, 1783, আর্টিকেল ৯১-৯২-৯৩.
[১] William Bolts, Merchant And Alderman, Or Judge Of The Hon. The Mayor's Court Of Calcutta, Considerations on India Affairs, 1772
📄 সব টাকার খেলা
প্রজা ও জমিদারের মাঝে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী অংশটার উৎপত্তি ষোড়শ শতক থেকে। উপনিবেশের মাধ্যমে ইউরোপের পুঁজি বাড়ছে, ব্যবসাপাতি বাড়ছে। জমিদারেরা ছিল এদের বিকাশে বাধা। কারণ এই বণিকেরা ছিল উৎপাদক প্রজা আর শোষক জমিদারের মাঝখানে, যাদেরকে জমিদারেরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত, ব্যবসায় বিধিনিষেধ-খাজনাপাতি আরোপ করে।[১] অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড বলেন-
ষোড়শ শতকে এই নতুন শিশু অর্থনীতি (পুঁজিবাদ) থেকে জন্ম নিল নতুন মনোভাব-বাজার-মানসিকতা, যার মূল্যবোধগুলো ভিন্ন ধরনের।... ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেবার প্রচেষ্টা। ভ্রাতৃভাবের চেয়ে প্রতিযোগিতাই দরকারি মানসিকতা এই নতুন ব্যবস্থাতে।... ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।... অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝেই এই নব্য অর্থনৈতিক ধারণা একটা 'সর্বজনীন জীবনধারা'য় পরিণত হয়ে পড়ে (পুঁজিবাদ)। সেক্যুলার ও বস্তুবাদী মূল্যবোধ, যা দ্বারা পশ্চিম ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার মানুষ প্রভাবিত, এই নতুন দর্শনই ছিল তার ভিত্তি।১]
সুতরাং,, জমিদারদের সাথে এই ব্যবসায়ীদের একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ওদিকে জমিদার-রাজাদেরকে হাওয়া দেয় চার্চ। জমিদার-চার্চ-রাজা— এই পুরো সিন্ডিকেটটাই ব্যবসায়ীদের শত্রু। অবশেষে বাটে পাওয়া গেল সিন্ডিকেটকে। যাজকদের অনৈতিকতা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ডাইনি-নিধন, বুবোনিক প্লেগ, চার্চ-সমর্থিত সামন্ততন্ত্রের অত্যাচার, ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট যুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ ইউরোপে শুরু হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন—এনলাইটেনমেন্ট। জমিদারদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেবার দর্শন দেওয়া হতে লাগল: মার্কেটাইল অর্থনীতি, ফিজিওক্রাট, এরপর লিবারেল। ব্যবসাপাতির পক্ষে যা উপকারী, যেমন : ক্রেতার ভোগের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মালিকানা, সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকা ইত্যাদি আলোচনা এনলাইটেনমেন্ট দর্শনে চলতে থাকল। জন্ম নিল পুঁজিবাদ, মুনাফাই যার লক্ষ্য। উপনিবেশ ও শিল্পবিপ্লবের মওকায় পুঁজির বিকাশে বিকশিত হলো এই মধ্যবিত্ত শিল্পপতিরা। শুধু কি তাই, এই এনলাইটেনমেন্ট ফিলোসফারদের একটা বড় অংশ নিজেরাই ছিলেন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী (জন লক, স্টুয়ার্ট মিল)।
পরবর্তী শতকগুলোতে ‘এনলাইটেনমেন্ট’-এর যুগে ইউরোপের নৈতিকতার যে বিবর্তন, তা যেন পুষ্টি জুগিয়েছে এই শিশু অর্থনীতিকেই, ব্যবসা-মনোবৃত্তিকেই। বলা হয়েছে—
■ মানুষ স্বভাবগতভাবে স্বার্থপর (Thomas Hobbes)। এমন পরিবেশ করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যাতে প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বার্থ সর্বোচ্চ চরিতার্থ করতে পারে।
■ জীবনের লক্ষ্য হলো সর্বাধিক সুখ চরিতার্থ করা (ভোগ) এবং সর্বনিম্ন কষ্ট পাওয়া (maximizing pleasure and minimizing pain)। [hedonistic principle, John Locke]
∎ এটা করতে চাই সর্বাধিক স্বাধীনতা। জন্তু থেকে ব্যক্তি (human) তখনই হতে পারবেন, যখন হবেন ‘পরিপূর্ণ স্বাধীন’ (Jean-Paul Sartre)।
আর তখনই স্বাধীন বলা হবে-যখন কেউ আগের কোনো মূল্যবোধকে (ধর্ম) মেনে না নেবে। সে মূল্যবোধ-নৈতিকতা নিজে ঠিক করে। (Values are not recognized by you, values are determined by you)।[১] সে-ই স্বাধীন ‘ব্যক্তি’ যে নৈতিকতার স্রষ্টা, নিজের নৈতিকতা নিজেই ঠিক করে (creator of values) [Kierkegaard] [২] বাইরের কোনো নৈতিকতা (ধর্ম) তার ভোগ-ফুর্তিকে বাধা দেয় না।
রাষ্ট্রের কাজ হলো: সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ (ভোগ) নিশ্চিত করা (greatest good for the greatest number)। [utilitarianism, Jeremy Bentham]
এটা করতে গিয়ে কোনো কাজ ততক্ষণই বৈধ, যতক্ষণ তা অন্য কারো ক্ষতি না করছে। [harm principle, John Stuart Mill]
এজন্য যদি কোনো কাজে কারো সম্মতি থাকে, তাহলে তা বৈধ। সম্মতি না থাকলে অবৈধ। [consent-based model]
খেয়াল করলে দেখা যায়, এই প্রতিটি কথাই বৈধ-অবৈধের নতুন ধারণা দিচ্ছে, যা ব্যবসার অবাধ সুযোগ তৈরি করে। যা যা ব্যবসাকে, পণ্য বিক্রয়কে বাধা দেয়; মুনাফা ও ভোগের ওপর নৈতিকতা আরোপ করে, ভোগকে নয়, ত্যাগকে উৎসাহিত করে—এমন সবকিছুকে (ধর্ম, পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ) ভেঙে অকার্যকর করে দিতে পারলে লাভেই লাভ। আর রাষ্ট্র হবে সর্বশক্তিমান, যা সযত্নে রক্ষা করবে পুঁজিপতিদের অবাধ ব্যবসার স্বার্থ। কীভাবে করে—
ক. আগের ধর্মভিত্তিক নৈতিকতা ভোগকে নিরুৎসাহিত করে, ত্যাগকে উৎসাহিত করে। সুতরাং, ‘ব্যক্তি’র নতুন সংজ্ঞা দাও: যে নিজের ভালোমন্দ নিজে ঠিক করে সে human, সেই আলোকিত। বাকি সবাই অন্ধকার যুগের মানুষ। এভাবে ধর্মকে হটিয়ে হিউম্যানিজম, ধর্মনিরপেক্ষতা, লিবারেল ইথিক্সকে আনা হলো।
খ. পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য মানুষ ত্যাগ করে, sacrifice করে, যা ভোগকে কমায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আদর্শের দ্বারা তৈরি হবে স্বার্থপর মানুষ, যার ফোকাস হবে শুধু নিজের ভোগ। পরিবারের পিতা সন্তানকে Deterred consumption শেখায়, কম ভোগ করতে শেখায়। যে পরিবারে বাবা থাকে না, সে পরিবারের সন্তানরা হয় compulsive consumer.[১] সুতরাং, ব্যক্তিসাধীনতা, নারীবাদ প্রভৃতি ব্যবহার করে পরিবার ভেঙে দাও, দুর্বল করে দাও, পরিবার গঠন পিছিয়ে দাও, লিভ-টুগেদারভিত্তিক ভঙ্গুর পরিবার (fragile family) তৈরি করো। বাপকে সন্তান যেন না পায়, নিজের ভোগ স্যাক্রিফাইস করার মতো কেউ যেন না থাকে।
গ. স্বাধীন মানুষ নিজের ইচ্ছার দাসত্ব করবে। ফলে স্বাধীনতা বৃদ্ধি করবে ভোক্তাসংখ্যা। পরাধীন ব্যক্তির ভোগ সীমিত। নেগেটিভ ফ্রিডমকে প্রোমোট করো, সব বাধা ভেঙে দাও। কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না। লিবারেল, সমতা, সমানাধিকার। আগে স্বামী-স্ত্রী মিলে এক গাড়ি কিনত। এখন দুজনের দুটো গাড়ি, ডাবল ডাবল পণ্য বিক্রি হবে।
ঘ. সমতা ও তা থেকে উৎসারিত অন্যান্য আইন প্রত্যেকের ভোগের অধিকার নিশ্চিত করবে।
ঠিক এভাবেই এনলাইটেনমেন্টের পুরো কাঠামোটাই পুঁজিবাদের পক্ষে কাজ করবে। ভোগ বাড়লে ক্রেতা বাড়বে, ক্রেতা বাড়লে পণ্য বেশি বিক্রি হবে, বেশি বিক্রি মানে বেশি মুনাফা-পুঁজিবাদ। যা যা এই ভোগকে নিরুৎসাহিত করে, ভোগের অবাধ স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়: ধর্ম, পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ-সবকিছুকে ভেঙে অকার্যকর করে দিতে পারলে লাভেই লাভ। আর রাষ্ট্র হবে সর্বশক্তিমান, যা সযত্নে রক্ষা করবে পুঁজিপতিদের অবাধ ব্যবসার স্বার্থ।
সমতা-স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দগুলো কেবল শ্রুতিমধুর উন্নত মূল্যবোধ নয়, প্রতিটি শব্দের পেছনে আছে অর্থনৈতিক দর্শন। একটা উদাহরণ দিলেই বাকি সবগুলো একসাথে ধরতে পারবেন। যেমন: পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে মানবিক অর্জনের মাঝে একটি হলো পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিলোপ (?)। আসলেই বিলোপ হয়েছে কি না, সে আলাপ পরে। তারা আইনকানুন বানিয়ে ফুল স্কেল বিলোপ করেছে। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল এই ৩০০ বছর দাসব্যবসা ছিল ইউরোপের অন্যতম লাভের ব্যবসা। Bank of England, Lloyds of London, Barclays Bank এরা সবাই দাসব্যবসার বিনিয়োগকারী। যেমন ধরেন, ব্রিটেনের Royal Africa Company প্রতিটা ট্রিপে ৩৮% লাভ করত ১৬৮০ সালের দিকে, আফ্রিকা থেকে একটা দাস ৩ পাউন্ডে কিনে আমেরিকায় বেচত ২০ পাউন্ডে। কলোনিগুলো থেকে যা রপ্তানি হতো, তার ৭৫% ছিল দাসশ্রম; কিন্তু... কী হলো এরপর?
» ১৮০৩ সালে ডেনমার্ক দাস 'ব্যবসা'কে অবৈধ করে।
» ১৮০৭-০৮ এ আমেরিকা ও ব্রিটেন নিজ নিজ দেশে দাস আমদানিকে অপরাধ সাব্যস্ত করে।
» ডাচরা ১৮১৪ সালে
» পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্স ১৮২০ এর মধ্যে
সালগুলো লক্ষ করুন। ৩০০ বছর ধরে চলা আমেরিকা-ইউরোপের অন্যতম লাভের ব্যবসাটা ১৭ বছরের মধ্যে তারা ধুমধাম গুটিয়ে দিয়েছে। যেসব দেশ দাসব্যবসা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো, তারা সবাই উনিশ শতকের প্রথম ২০ বছরেই কেন ব্যবসা বন্ধ করে দিলো? কী এমন ঘটল যে, পুরোপুরি দাসপ্রথা-নির্ভর অর্থনীতি যাদের তারাই হঠাৎ করে দাসপ্রথাবিরোধী (abolitionist) হয়ে গেল?
■ ১৭৬০ এর পরে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হয়। নিত্যনতুন মেশিন আবিষ্কারের ফলে মার্কেটে নতুন দাসের প্রয়োজন কমে আসে, মানবশ্রমের দরকার হ্রাস পায়। ব্যাংকগুলো দাসব্যবসার চেয়ে এখন শিল্প কারখানায় বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
∎ উঠতি শিল্পপতি সমাজ এবং পুরোনো জমিদার সমাজ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। জমিদার সমাজ ছিল এই দাসব্যবসার মূল বিনিয়োগকারী এবং দাস দ্বারা কৃষির (plantation sector) মাধ্যমে লাভবান। যেমন The Royal Adventurers কোম্পানির মাথাদের মধ্যে ছিল ২ জন আন্ডারম্যান, ৩ জন ডিউক, ৮ জন আর্ল, ৭ জন লর্ড, ১ জন কাউন্টেস, ২৭ জন নাইটান। দাসকোম্পানিগুলোর নাম দেখেন : The Royal Adventurers, The Royal African Company ... নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে রাজপরিবারের বা তাদের সমর্থনপুষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতা বা বিনিয়োগ রয়েছে। মানে দাসব্যবসা জমিদারদের, শিল্প-কারখানা পুঁজিপতিদের।
ফলে জমিদারদের শক্তি নিঃশেষ করতে দাসব্যবসা বন্ধ করে দাসপ্রথা বিলোপ করা প্রয়োজন। ওদিকে শিল্পপতিদের দাসের দরকার নেই, তাদের আছে যন্ত্র।
শিল্প প্রোডাক্ট বিক্রি করে আনতে হচ্ছে চিনি, আবার ওদিকে দাসদের দিয়ে উৎপাদন করানো হচ্ছে চিনি, ফলে শিল্পপণ্য বিক্রি ব্যাহত হচ্ছে।
আফ্রিকাতে পণ্য বিক্রির জন্য স্বাধীন ক্রেতা চাই। তাদেরকে দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়াটা জমিদারদের জন্য লাভজনক হলেও, ব্যবসায়ীদের লোকসান। সবদিক দিয়েই দাসপ্রথা শিল্পপতিদের জন্য লোকসান।
ওয়েস্ট ইন্ডিয়া ছাড়াও বিশ্বের নানা জায়গায় ততদিনে ব্রিটেনের উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার ব্যবসাগুলোর কর্ণধার জমিদারেরা, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার হলো ব্যবসায়ীরা। দাসপ্রথার পক্ষে-বিপক্ষে কারা ছিল একটু দেখলেই বুঝতে পারা যায়।
দাসপ্রথার পক্ষে রাজা ৩য় জর্জ রাজা ৪র্থ উইলিয়াম চার্চ
তৎকালীন প্রধান মানবাধিকার কর্মীরা:
» John Cay
» Bryan Blundell
» Foster Cunliffe
» মেয়র Thomas Leyland
» Heywood পরিবার
» Tarlton পরিবার
দাসপ্রথার বিপক্ষে
■ Thornton পরিবার (ইস্ট ইন্ডিয়া স্টকের মালিক)
■ Zachary Macaulay (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার)
■ James Cropper (ইস্ট ইন্ডিয়ার চিনির প্রধান আমদানিকারক)
■ Thomas Whitmore (পার্লামেন্টে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি)
দ্বিতীয়ত : অন্য কিছু বেশি লাভজনক ছিল ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য আফ্রিকার বাজারও প্রয়োজন, যে প্রয়োজনটা আগে ছিল না। সব কর্মক্ষম আফ্রিকানকে ধরে নিয়ে এলে পণ্য কিনবে কে?[১]
■ নতুন অর্থনীতিতে (পুঁজিবাদ) দাসপ্রথার চেয়ে waged labour বা বেতনভুক্ত শ্রমিক বেশি লাভের। কেননা দাস তো স্বাধীন ভোক্তা নয়; বরং বেতনভুক্ত শ্রমিক নিজেই ভোক্তা। আধুনিক অর্থনীতির জনক Adam Smith-এর মতে, যে ব্যক্তি সম্পত্তি অর্জন করতে পারে না, তার প্রবণতাই থাকে : খাবে বেশি, শ্রম দেবে কম। বেশি শ্রম সে কেন দেবে? তার তো লাভ নেই বেশি কষ্ট করে। সুতরাং,, দাসের চেয়ে স্বাধীন ভাড়াটে শ্রমিক বেশি economically superior. দাসের পেছনে যা খরচা হতো, সেটাই বেতনাকারে দেওয়া হবে। শ্রমিক ওভারটাইম করে করে ভোগ বাড়ানোর চেষ্টা করবে। কাজও পাওয়া গেল বেশি, ভোক্তার মার্কেটও বড় হলো।
সুতরাং, ব্যবসায়ীদের নতুন অর্থনীতির জন্য দাসপ্রথা ছিল একটা লস-প্রোজেক্ট। যার কারণে উনিশ শতকের নতুন অর্থনীতি, নতুন রাজনীতি এবং নতুন সমাজের জন্য দাসপ্রথার আর প্রয়োজন নেই। সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসের জন্যও তাদের শক্তির উৎস ধ্বংস করা দরকার ছিল, কারণ এখন শিল্পপতিদের শাসন শুরু হবে, যার নাম গণতন্ত্র। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে এদের হাতেই পতন ঘটল জমিদারতন্ত্রের, এরাই দেশে পত্তন করল গণতন্ত্রের, যাতে নিজেদের ব্যবসার অনুকূলে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করা যায়। সেই সাথে নিজেরাও সরাসরি মন্ত্রী ইত্যাদি হবার দ্বারা শাসনে হস্তক্ষেপ করা যায়।
উপনিবেশ-যুগে তারা যা করেছে, ঠিক একই কাজ তারা নব্য-উপনিবেশি যুগেও করে চলেছে। অষ্টাদশ শতকের সেই মধ্যবিত্ত পুঁজিপতিরা আজকের মাল্টিন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রির মালিক। পার্থক্য হলো, তখন কোম্পানিগুলোরই নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল। আর এখনকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির নিজের বাহিনী থাকে না, তবে গণতন্ত্রের মাধ্যমে যে পুতুল সরকার তারা বানায়, সেই সরকারি বাহিনীকে ব্যবহার করেই একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার জুটিয়ে নেয়। নিজ দেশের সরকার, ইইউ, জাতিসংঘ দিয়ে বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করে, কিংবা তাদের সাপ্লায়ারদের দিয়ে ভেতর থেকে চাপ দিয়ে ৩য় বিশ্বের সরকারকে তাদের মনমতো পলিসি করতে বাধ্য করে। দেশে দেশে সরকার যা আমরা দেখি, এরা পুতুল। সরকারে বসায় এরা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-মিডিয়া-রাষ্ট্র এসবকিছু এই শ্রেণির হাতে। ৫০% সম্পদ যে ১%-এর হাতে, এরা হচ্ছে সেই তারা। পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, যুদ্ধ থেকে নিয়ে রিঅ্যাডুকেশন ক্যাম্প, আইন থেকে নিয়ে নারীবাদ-সবকিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই অংশটাকেই লাভবান করে। এরাই একসময় দাসব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে, এরাই পরে দাসপ্রথা বন্ধে আইন করেছে নিজেদের স্বার্থে, আবার এরাই সীমিত আকারে ভিন্ন নামে দাসপ্রথা টিকিয়ে রেখেছে নিজেদেরই স্বার্থে।
■ উপনিবেশবাদ হলো : গরু পরাধীন, আমিই পালব, আমিই খাওয়াব, আমিই দুধ নেব। আর নব্য-উপনিবেশবাদ হলো : গরু আমি পালব না, গরু স্বাধীন, নিজের মতো চরে খাবে, আমি দিনশেষে শুধু দুধটুকু দুয়ে নেব। আগে ব্রিটিশ দাদন দিয়ে, পিটিয়ে মেরে নীল চাষ করাত, দোষ হতো ব্রিটিশের। এখন নেয় এদেশীয় সরকার দিয়ে পলিসি করিয়ে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, ব্রিটিশের হাত ময়লা হয় না। ম্যাপটা থাকে সাদা সাদা। আর ভারতের ম্যাপ হয় কালো কালো। গরিব দেশের সরকার আইন বানায় গরিব দেশের প্রডিউসার সাপ্লায়ারদের চাপে কিংবা আমেরিকান গ্লোবাল কোম্পানি আমেরিকা সরকারকে দিয়ে গরিব দেশের সরকারকে চাপ দেওয়ায়। গরিব দেশে এই সাপ্লায়াররা-শিল্পপতিরাই মন্ত্রিসভা আলো করে বসে থাকে। Govt. of the Capitalist, by the Capitalist, for the Capitalist. এর নাম 'গণতন্ত্র'। কেউ যদি মনমতো কাজ না করে, পরের টার্মে বদলে দেওয়া যায়। সাপ্লাই চেইন ঠিক রয়ে যায়। দাসরা দাস রয়ে যায়। আর যে দেশে এই মজার সিস্টেমটা নেই, সেখানে গিয়ে জোর করে 'গণতন্ত্র' দেওয়া হয়। অবশ্য স্বৈরশাসক বা বাদশাহ অতখানি সুযোগ দিলে গণতন্ত্র তখন আর জরুরি থাকে না। দেশে দেশে দুনিয়া চালায় পুঁজিপতিরা। এই দুনিয়া ওদের, আমাদের নয়।
একদিকে তারা পুরো দুনিয়াকে এনলাইটেনমেন্টের স্বাধীনতা-সমতা শেখাচ্ছে, অন্যদিকে ৪.৫ কোটি মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছে ব্যবসার খাতিরে।[১]
প্রতি বছর দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে ২০ লক্ষ শিশু ইউরোপে-যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়। [২]
পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রতি বছর বহু নারী ও শিশু আমেরিকাতে পাচার করা হয় পর্নোগ্রাফির জন্য।
ILO-এর মতে, আধুনিক দাসদের কারণে বছরে ১৫০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা হয়। টপ ৫টা ইন্ডাস্ট্রির নাম যদি বলা যায়, যারা এই দাসপ্রথার ওপর মুনাফা করছে এবং টিকে আছে-
• ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি
• গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি
• ফুড এন্ড অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি
• সেক্স ইন্ডাস্ট্রি (বার ও নাইটক্লাব)
• ক্যাসিনো ও হোটেল
Oxfam, UK-এর ethical trade manager Rachel Wilshaw বলেন-
আমরা এখন জানি, অধিকাংশ গ্লোবাল কোম্পানিরই সাপ্লাই চেইনে কোথাও না কোথাও আধুনিক দাসপ্রথা রয়েছে।
■ নব্য-উপনিবেশবাদের ন্যাক্কারজনক খুল্লমখুল্লা প্রদর্শনী করে চলেছে ফ্রান্স।
>> স্বাধীনতার পর গত ৬০ বছর ধরে প্রতি বছর ফরাসি সেন্ট্রাল ব্যাংকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার জমা দেয় ১৪টা আফ্রিকান দেশ colonial debt হিসেবে।
>> ফ্রান্স তাদের এই শর্তে স্বাধীনতা দিয়েছে, মোট বৈদেশিক রিজার্ভের ৮৫% ফ্রান্সে পাঠাতে হবে। আর বাকি ১৫% দিয়ে আফ্রিকা চলবে।
>> না দিলে হয় আর্মি দিয়ে ক্যু করিয়ে বা গুপ্তহত্যা করে সরকার বদলে দেওয়া হবে।
>> আফ্রিকার খনিজের ওপর একচেটিয়া অধিকার থাকবে ফরাসি কোম্পানিগুলোর। পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, টেলিফোন, বন্দর, ব্যাংক, বাণিজ্য, নির্মাণশিল্প, কৃষিসহ সকল সেক্টরে ফরাসি কোম্পানি অগ্রগণ্য থাকবে। 'France Diplomatie' অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ২১০৯টির বেশি কোম্পানি আফ্রিকা মহাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করছে।
'GOLD DIGGERS'
এখন আমাকে বলেন, ২০১৬-১৭ তে আইভরি কোস্টের ২৩ লাখ এডাল্ট যে কোকো ফ্যাক্টরিতে দাসত্ব করে, সে দায় কি আফ্রিকার, না অন্য কারো? সেদেশের ১০-১৭ বছরের ৮৯১,০০০ শিশু যে স্কুলে না গিয়ে কোকো মাঠে নামমাত্র মূল্যে শ্রম দেয়, সে দায় কার?[১] আফ্রিকার, নাকি যারা আফ্রিকার ৮৫% সম্পদ নিয়ে যায় প্রতিবছর, তাদের?
উন্নত মূল্যবোধের নামে, সভ্যতার নামে যেসব মতবাদ তারা ফেরি করছে, চাপিয়ে দিচ্ছে সেগুলো ৩য় বিশ্বে ব্যবসার নতুন নতুন ফ্রন্ট খোলার পাঁয়তারা। তাদের দেশে তো তাদের বাজার আছেই, ৩য় বিশ্বের ধর্ম-পরিবার-সমাজ ধ্বংস করে দিয়ে আমাদেরকে তাদের পণ্য-সেবা গ্রহণে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে আমাদের রুচি-মূল্যবোধ, ভালোমন্দের মাপকাঠি বদলে দেওয়ার চেষ্টা আজও অব্যাহত, সে উপনিবেশ যুগের মতোই। দেখুন...
EMIS-২০১৭ রিপোর্টে এসেছে ইউরোপের ১,২৭,৭৯২ জন গে-পুরুষের ৯৪% অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল প্রোফাইল্যাক্সিস নিচ্ছে। গে, লেসবিয়ানদের জন্য আলাদা কেয়ার আলাদা ডিপার্টমেন্ট করার পরও বছরে ৩০-৪০ হাজার এইডস কেস সমকামীদের ভেতর থেকে।
safer sex এর নামে ডেন্টাল ড্যাম (ওরাল সেক্সের জন্য), সেক্স টয়, লুব্রিকেন্ট দেদারসে ইউজ করতে হয়।
এই লক্ষ লক্ষ সমকামীকে কন্টিনিউয়াস স্ক্রিনিং, প্রোফাইল্যাক্সিস করাতে হয়।
আমেরিকাতে একজন পুরুষকে নারী হতে গড়ে গুনতে হয় ১ লক্ষ ডলার। পেনসিলভ্যানিয়ার Philadelphia Center for Transgender Surgery তাদের খরচ জানিয়েছে: পুরুষ থেকে নারী হতে $১৪০,৪৫০ এবং নারী থেকে পুরুষ হতে $১২৪,৪০০ মাত্র।[২] লিঙ্গ সার্জারিতে লাগে ৩০,০০০ ডলার প্লাস। চেহারার সার্জারিতে লাগে ২৫,০০০-৬০,০০০ ডলার। স্তন সার্জারিতে লাগে ৫,০০০-১০,০০০ ডলার।[৩]
২০১৭ সালে শুধু পুরুষ-টু-নারী সার্জারির মার্কেট ছিল সাড়ে ১১ কোটি ডলারের। ২০১৬ সালে মোট এই সার্জারি হয়েছে ৩২৫০ টা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯% বেশি, মানে মার্কেট ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই মার্কেট গিয়ে দাঁড়াবে বছরে ১৫০ কোটি ডলারে [১]।
শুধু সার্জারির কথা বললাম। বাকিটা জীবন তাকে হরমোন থেরাপি নিতে হয়, যার খরচ বছরে ১৫০০ ডলার।
সমকামিতাকে প্রোমোট করা, জেন্ডার ডিসফোরিয়াকে উসকে দেওয়া, জেন্ডার আইডেনটিটির নামে বায়োলজিক্যাল সেক্স নিয়ে অতৃপ্তি জাগানো এগুলো ১ম বিশ্বের আরেকটা পুঁজিবাদী অ্যাজেন্ডা। মিডিয়া তাদের হাতে, বিজ্ঞান তাদের হাতে। এগুলো ব্যবহার করে ৩য় বিশ্ব থেকে আরো মুনাফা লুটে নেবার একটা 'কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি' প্রকল্প। সেই ১৮১৩ সালে মাদ্রাজের গভর্নর কর্নেল মুনরোর কথাটা মনে করুন, রুচি বদলে না দিলে বিলাতি পণ্য কেনানো যাবে না নেটিভদেরকে দিয়ে। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে রুচি বদলানোর কাজটা করেছিলেন লর্ড মেকলে।
আজও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ দিলো [২]। কোন ইইউ? যার দূতাবাসগুলোয় সমকামিতার পতাকা ওড়ে। যে ইইউ গাম্বিয়াকে চাপ দিয়ে সমকামিতা বৈধ করাতে চেয়েছিল, না পেরে মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রত্যাহার করেছে। সেই ইইউ আমাদের লোন দিয়েছে, কী দাবি তাদের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়? বোঝা যায়?
প্রতিটি নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী, প্রতিটি নারীবাদী, প্রতিটি সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট, প্রতিটি পশ্চিমান্ধ বিজ্ঞানবাদী সজ্ঞানে-অজ্ঞানে নব্য উপনিবেশবাদের রাজাকার... ১ম বিশ্বের দালাল ছাড়া আর কিছুই নয়।
টিকাঃ
[১] অর্থনীতিবিদদের যুগ, ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড
[১] অর্থনীতিবিদদের যুগ, পৃষ্ঠা: ১১-১৭; ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড,
[১] প্রাগুক্ত। দর্শনের সব আলোচনাগুলো এখানে থেকে নেয়া: The Human Person in Contemporary Philosophy, Frederick C. Copleston; PHILOSOPHY; Vol. 25, No. 92 (Jan., 1950), page: 3-19
[২] A man becomes an ‘individual/person’ by exercising his free choice, by freely giving form and direction of his life. - Kierkegaard, father of modern existentialism
[১] Aric Rindfleisch et al. (1997). Family Structure, Materialism And Compulsive Consumption, Jounal of Consumer Research, vol 23, no.4, pp. 312-325
[১] এগুলো অভিজাত পরিবার, সামন্ত ও জমিদারদের নানান পদ-পদবী, মর্যাদার ক্রমধারা রাফলি এমন- duke/duchess > marquess/marchioness > earl/countess > viscount/viscountess > baron/baroness. BRETTE WARSHAW (SEP 17, 2019) What's the Difference.
[১] Trevor Getz. Why Was Slavery Abolished? : Three Theories. Khan Academy
[১] Global Slavery Index-2016
[২] Child Sex Trafficking In Latin America, United Nations Human Rights Council.
[১] Global slavery index 2018 report
[২] Alyssa Jackson (July 31, 2015), The high cost of being transgender, CNN Health
[৩] www.teenvogue.com
[১] Sex Reassignment Surgery Market - Global Industry Analysis, Size, Share, Growth, Trends, and Forecast 2018 - 2026, Transparency Market Research
[২] দেশের শিক্ষাখাতে ৪২৮ কোটি টাকা দিয়েছে ইইউ, ইনকিলাব (১৯ মে, ২০২০,)
📄 আধুনিকতা
এনলাইটেনমেন্টের পর ইউরোপের চিন্তাজগৎ প্রবেশ করল রোমান্টিক যুগে (১৮০০-১৮৫০)। এনলাইটেনমেন্ট যুক্তি শিখিয়ে গিয়েছিল, রোমান্টিসিজম সেখানে আবেগের ওপর জোর দিলো। আলোকায়ন শিখিয়েছিল প্রকৃতিতে মুগ্ধ না হয়ে বরং প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ। আর রোমান্টিকতা শেখালো প্রকৃতি নিয়ে বিমুগ্ধতা।
এনলাইটেনমেন্ট বলেছিল গ্রেকো-রোমান যুক্তি-বস্তু-মানববাদে ফেরত যাবার কথা। বিপরীতে রোমান্টিসিজম এসে বলল, মধ্যযুগীয় ভাবালুতার কথা, মধ্যযুগের বীরদের বীরত্বগাথা শুনিয়ে জাতীয়তাকে আবেগের পর্যায়ে নিয়ে গেল (তুলনা করুন আজকের দেশপ্রেম চেতনার সাথে), Romantic nationalism বলে একে।
এনলাইটেনমেন্টের বিরোধিতা করতে গিয়ে সে বরং আলোকায়ন প্রকল্পতেই আরো ঘি ঢেলে গেল। যুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে বরং মানুষকে আরো আত্মমগ্ন করে গেল। অযৌক্তিক আবেগ-কর্মকেও জাস্টিফাই করে দিলো নিয়ম-শৃঙ্খলা-কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ধর্মকে কেবল 'স্রষ্টার সাথে একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এনলাইটেনমেন্টের সেই ধর্মনিরপেক্ষতা কনসেপ্টকেই আরো সাহায্য করে গেল। এমন এক গডের ধারণা দিলো, যে গড কোনো নিয়মকানুন আরোপ করেন না। আপনি নিজে যা বুঝবেন, তাই ধর্ম (ধর্ম যার যার)। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কফিনে শেষ পেরেক বলা যেতে পারে। আলোকায়নের বিরোধিতা করতে গিয়ে আলোকায়ন যুগের ব্যক্তিবাদ (individualism)-কেই আরো ঘনীভূত করল রোমান্টিকতা। বলা হল:
» ধর্ম যার যার বুঝমতো। যে যা বোঝে, সেটাই ধর্ম।
» অন্যের আবেগকে সম্মান করা
» প্রত্যেকের মত প্রকাশের অধিকার
» ঐতিহ্য-প্রথার নিয়ন্ত্রণকে আরো অস্বীকার
আসল কথা হলো, ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যালভিনিজম নামে প্রোটেস্ট্যান্টদের একটা ধার্মিক মতবাদ বেশ প্রসার পাচ্ছিল। একই সাথে যুক্তি-স্বাধীনতা-সমতা এবং ধর্মকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার দরুন ক্যালভিনিজম খ্রিষ্টদুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, যা (ধর্মীয় কর্তৃত্ব অস্বীকারের) এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করছিল। রোমান্টিকতা এসে আটকাল ক্যালভিনিজমকে। ইসলামোফোবিয়া থেকে বাঁচতে আমরা যেমন অনেকে ইসলামকেই কাটছাঁট করে ফেলি, তেমনি এ পর্যায়ে মডার্নিস্ট খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। আত্মার গভীরে আত্মিক বিষয়ের যে অনুভূতি, তাই ধর্ম। খ্রিষ্টবাদের আজ তো এই অবস্থা যে, সমকামী পাদরিও তারা মেনে নিয়েছে।
এরপর এলো আধুনিকতা। এনলাইটেনমেন্টের গাছটা আরো ডালপালা মেলে দিলো, ডালে ডালে ধরল ফল। আধুনিকতার শুরুটা যে ঠিক কখন, সে ব্যাপারে মতানৈক্য আছে। কেউ বলেন সেই রেনেসাঁর সময়ই আধুনিকতার যুগ শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলছেন ১৭শ-১৮শ শতকের এনলাইটেনমেন্ট থেকেই আধুনিকতার শুরু। কেউ আরো কেঁচে এনেছেন, বলছেন আধুনিক যুদ্ধের (দুটো বিশ্বযুদ্ধ) সময়টাই মডার্নিটি। সাধারণভাবে ১৯শ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের শুরুকে (১৮৭০-১৯৩০) মডার্নিটি ধরা হয়। আসলে একেক ফিল্ডে কথিত 'আধুনিক চিন্তাকাঠামো' একেক সময়ে এসেছে। মডার্নিটি হলো সময়কাল, আর মডার্নিজম হলো দৃষ্টিভঙ্গিটা। তাই ব্যাপারটাকে সময়কাল দিয়ে না বুঝে ঠিক কী কী বস্তুকে 'মডার্নিজম' বলা হচ্ছে, তা বুঝলে আপনি নিজেই আঁচ করতে পারবেন-কখন থেকে ইউরোপ মডার্নিটিতে প্রবেশ করেছে। মডার্নিজম বা আধুনিক চিন্তার বিশিষ্ট দিকগুলো হলো-
১. রাষ্ট্রনীতিতে
» রাজতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্রের জনপ্রিয়তা
» সাংবিধানিক ক্ষমতা ভাগাভাগি (আইনসভা, বিচারবিভাগ, নির্বাহী বিভাগ)
» যুদ্ধ-সংঘর্ষের বদলে ফর্মাল রাজনৈতিক সংগ্রাম (মাঠের রাজনীতি) ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা
» জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা
২. অর্থব্যবস্থায়
» জটিল অর্থনীতি
» কৃষির বদলে বৃহৎ শিল্পায়ন
» মার্কেট ইকোনমি
» অর্থনীতির বৈশ্বিক রূপ (economic globalization)
» ব্যাপক শহরায়ণ ও শহরে বসবাসে আগ্রহ
» পুঁজিবাদ ও অধিক ভোগের মানসিকতা
৩. বিশ্বাসগত
» দুনিয়ার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, মানব প্রচেষ্টা (বিজ্ঞান-প্রযুক্তি) দিয়ে দুনিয়া বদলে দেওয়া সম্ভব। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে দুনিয়াকে আরো ভোগ্য করা সম্ভব।
» প্রগতিতে (constant progress) বিশ্বাস। গতকালের চেয়ে আজ মানবজাতি যেকোনো দিক দিয়েই (প্রযুক্তি, রাজনীতি ও নৈতিকতায়) আরো বেশি উন্নত। আমরা এভাবে উন্নত হতেই থাকব।
» ধর্মীয় টেক্সটের সত্যতা অস্বীকার। সত্যের মাপকাঠি হিসেবে ওহি এবং ওহির ব্যাখ্যাদাতাদের কর্তৃত্ব বাতিল। মানুষের নিজ নিজ বিচারবুদ্ধিই সত্যের পথ।
» নতুন যা কিছু, পুরোনোর চেয়ে (ধর্ম) তা কল্যাণকর।
৪. ব্যক্তি পর্যায়ে
» গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ও শক্তিশালী সমাজের বিপরীতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা
» আগের কমন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ (ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক) থেকে সরে আসা
» মানুষে-মানুষে এবং মানবসমাজে বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যাওয়া
৫. জ্ঞানগত
» যা ইন্দ্রিয় দ্বারা বোঝা যাবে, তাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য তথ্য। অতীন্দ্রিয় বা মেটাফিজিক্যাল কোনোকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের জ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতির ফলে একসময় ধর্ম হারিয়ে যাবে; দর্শন ও অপরাপর মানবিক জ্ঞান ক্রমেই বস্তুবাদী হয়ে উঠবে এবং পুরো মানবজ্ঞানই বিজ্ঞানের অধীনে চলে আসবে।
» ২ ধরনের কথার অর্থ হয়- যুক্তি-বিশ্লেষণ (analytical statement) আর পর্যবেক্ষণলব্ধ (empirical statement); এই ছকের বাইরে বাকি সব অনর্থক।
প্রতিটি বিষয়কে আবার বিচার করতে হবে, দেখতে হবে কী কী প্রগতিকে বাধা দিচ্ছে, তদস্থলে নতুন আইডিয়া আনতে হবে, যা বাধাদানকারী বিষয় (ধর্ম)-কে রিপ্লেস করবে। যেমন :
* মানুষের উৎপত্তির উত্তর দেবে ডারউইনবাদ
* প্রতিটি হিউম্যান সায়েন্সকে ‘বিবর্তন’ দিয়ে বুঝতে হবে
* বিশ্বের উৎপত্তির উত্তর দেবে আধুনিক কসমোলজি
* আইন-নৈতিকতার শূন্যস্থান পূরণ করবে লিবারেল ইথিক্স
* আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন পূরণ করবে মেডিটেশন, স্ট্রেস রিলিভিং কাজকর্ম
* আত্মার প্রশ্নের জবার দেবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্স।
চাই এই নতুন রিপ্লেসমেন্ট যতই হাস্যকর শোনাক, যতই অযৌক্তিক হোক। আমেরিকান evolutionary biologist ও জিনবিজ্ঞানী Richard Lewontin-এর সরল স্বীকারোক্তি-
আমরা সর্বদা বিজ্ঞানের পক্ষ নিই, যদিও বিজ্ঞানের কিছু কিছু দাবি হাস্যকর; যদিও বিজ্ঞানীমহল মেনে নিয়েছেন কিছু ছেলে-ভোলানো গাল্পগল্প, যার প্রমাণ নেই। কারণ আমরা আগে থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রকৃতিবাদের কাছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কোনোভাবে বাধ্য করে জাগতিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে; বরং আগে থেকেই (a priori adherence) বস্তুগত কারণ খোঁজার ওয়াদা আমাদেরকে ঠেলে দেয় এমন কিছু উপকরণ ও ধারণা তৈরির দিকে- যা শুধু বস্তুগত ব্যাখ্যাই উৎপাদন করবে। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হোক, আমজনতার কাছে যতই দুর্বোধ্য ঠেকুক। আর যেহেতু আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নেব না, সুতরাং, বস্তুবাদই শেষকথা। [১]
যেকোনো মূল্যে ধর্মের আবেদন-কর্তৃত্ব-অংশগ্রহণকে বাতিল করে জীবনকে ভোগ করে যাওয়ার এই পুরো চিন্তাকাঠামোটাকে বলা হচ্ছে আধুনিকতা বা আধুনিক চিন্তা। এভাবে চিন্তা করতে পারলে আপনি আধুনিক, না পারলে আপনি মধ্যযুগীয়-জঙ্গি।
খ্রিষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক থমাস ওডেনের মতে মডার্নিটির ৪টি বেসিক নীতি হলো—
১. Moral relativism : মানে, নৈতিকতার স্কেল ফিক্সড নয় (যেমনটা ধর্ম বলতে চায়); বরং ব্যক্তিভেদে, সমাজভেদে, অবস্থাভেদে, যুগভেদে ভালোমন্দের ধারণা বদলায়। যেমন: ব্যভিচার-সমকামিতা এখন ভালো।
২. Autonomous individualism : আমার নৈতিকতা (ধর্ম) কেউ ঠিক করে দেবে না। আমি নিজেই নিজের বৈধ-অবৈধ ঠিক করব। আমি আমার ভালোমন্দের নির্ধারক।
৩. Narcissistic hedonism : আত্মপ্রেম; নিজেকে খুশি করার, খুশি রাখার নিরন্তর চেষ্টা। শিশ্লোদরপরায়ণ ভোক্তা।
৪. Reductive naturalism : যা কিছু দেখা যায়, শোনা যায়, ধরা যায় বা অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, তার বাইরে কিছুই নেই।
মডার্নিটির বিপরীত শব্দ হলো ঐতিহ্য (Tradition)। মূল কথা হলো, আগে যা ঘটেছে তা হলো ট্রাডিশন বা প্রথা। প্রথা (মূলত ধর্ম) সমাজকে এগোতে দেয় না, আটকে রাখে। আজকের দিন অতীতের চেয়ে উত্তম, ভবিষ্যৎ আজকের চেয়ে উত্তম। অতীতের চেয়ে আজ যেমন জ্ঞানবিজ্ঞানে মানুষ উন্নত হয়েছে, তেমনি নৈতিকতায়ও উন্নত হয়েছে। আজকের সেক্যুলার-লিবারেল নৈতিকতা আগের ধর্মের নৈতিকতা থেকে উত্তম এবং যত দিন যাচ্ছে আমরা উত্তম হচ্ছি। প্রথাকে ঝেড়ে না ফেলতে পারলে আমরা উন্নত হতে পারব না। ভবিষ্যতে আমরা আরো উন্নত হতে থাকব সমকাম মেনে নিয়ে, ব্যক্তিস্বাধীনতা মেনে নিয়ে, নারীবাদ- বিজ্ঞানবাদ মেনে নিয়ে, ফ্রি-সেক্স মেনে নিয়ে।
আধুনিকতাবাদ একটা স্বতন্ত্র দ্বীন, যা বাকি সব ধর্মকে অকেজো-সেকেলে-বাতিল সাব্যস্ত করে। এমনকি নৈতিকতার ক্ষেত্রেও ধর্মকে নিষ্প্রয়োজন সাব্যস্ত করে নিজেকে ধর্মের আসনে বসায়। মানুষের চিন্তাজগতে ধর্মের আবেদন চিরতরে শেষ করে দেয়। এটা এমন ধর্ম যার সমালোচনা সহ্য করা হয় না। এই ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে আপনার মনুষ্যত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আপনি মধ্যযুগীয়, বর্বর, বিপজ্জনক এবং পটেনশিয়াল জঙ্গি।
পাঠক এবার মিলিয়ে নিন: সেই রেনেসাঁ থেকে শুরু, যাকে বলা হচ্ছিল ir-religion বা অধর্ম। পরের ধাপে এনলাইটেনমেন্টের মূল আহ্বান secularization বা ধর্মকে সব জায়গা থেকে হটিয়ে দেওয়া। রোমান্টিক যুগে এসে ধর্মকে নিছক অনুভবের জায়গায় আটকে দেওয়া। আর মডার্নিটিতে এসে নৈতিকতা ও জ্ঞানতত্ত্বের যে প্রশ্নগুলোর উত্তর ধর্ম ছাড়া আর কারো কাছে ছিল না, সেগুলো থেকেও ধর্মকে বিতাড়িত করল ইউরোপ। ইউরোপের যুদ্ধটাই ধর্মের সাথে। ধর্মের সাথে ব্যবসায়ীদের হাজার বছরের সংগ্রাম শেষে আজকের আধুনিক ইউরোপ আমরা পেলাম। আবার এভাবেও বলতে পারেন ক্যাথলিক কর্তৃত্বের সাথে বণিক সম্প্রদায়ের (প্রধানত ইহুদি) লড়াইয়ের দ্বারা নতুন এক ব্যবসাবান্ধব পৃথিবী তৈরি, পুঁজিবাদী জুলুমের কারাগার তৈরি। মানব-রচিত (সেন্টপল) খ্রিষ্টধর্মের অন্যায়-দুর্নীতির নাগপাশ ছিন্ন করার একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যা প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো-'ধর্মীয় নৈতিকতা অস্বীকার'-এর মাধ্যমে অবাধ ভোগ-লালসার দরজা খুলে দেওয়া। ক্রেতার অবাধ ভোগ তথা বিক্রেতার অবাধ ব্যবসাকে যা যা বাধাগ্রস্ত করে, সবকিছুকে অযৌক্তিক ও অজ্ঞতা বলা হলো। আর মডার্নিটির উদ্দেশ্যই হলো সকল 'অজ্ঞতা-কুসংস্কার' থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দেওয়া। এজন্যই আপনি দেখবেন ব্যবসায়ী-চালিত দেশ (১ম বিশ্ব) সবাইকে লিবারেট করে বেড়ায়।
টিকাঃ
[১] Richard C. Lewontin (1997), Billions and Billions of Demons (a review of Carl sagan's The Demon-Haunted World), The New York Review