📄 হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবদানে নতুন পৃথিবী
মানবতার সেবায় নিবেদিত ব্যক্তি ও দলের সংখ্যা প্রচুর। ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক যারা পৃথিবীর নির্মাণ ও উন্নতি সাধনে অকাতরে শ্রম দিয়েছেন, বরং ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, অগণন অসংখ্য মানুষ এসে ভিড় করেছে এবং নিজেদেরকে মানবতার সেবক ও নির্মাতা হিসেবে দাঁড় করাতে যারপরনাই চেষ্টা করছে। তাঁরাও মানবতার সেবা ও নির্মাণের মাপকাঠিতে বিবেচিত ও উত্তীর্ণ হতে চান। আমরাও বলি, পৃথিবী ও মানবতার প্রতি তাঁদের সমূহ চেষ্টা-অবদান বিচার করে দেখা দরকার। সূক্ষ্ম নিক্তিতে মেপে দেখা দরকার মানবতার নির্মাণ, প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের মাপকাঠিতে পরিপূর্ণভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেন কে?
প্রথমেই ভাবতে হয় চিন্তাবিদ, দার্শনিকদের কথা। পরম গাম্ভীর্য আর শ্রদ্ধাস্নাত এই কাফেলাটি রীতিমতই সম্মানিত আদর পেয়ে আসছে মানব সভ্যতায় যুগে যুগে। বড় বড় গ্রীক দার্শনিক আর ভারতবর্ষের নামী-দামী জ্ঞান-গুরুর ছোঁয়ায় এ কাফেলা বরাবরই ছিল অনন্য-বরেণ্য। দর্শন ও বিজ্ঞানের প্রতি দুর্বলচিত্ত আমরা এই কাফেলার প্রতি চোখ তুলতেই আরেকবার নড়ে উঠি। অবলীলায় বলে উঠি, এরাই মানব জাতির মাথা উঁচু করেছে! মানবতার উভয় হাত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মণি-মুক্তায় পূর্ণ করে দিয়েছে, অথচ আমরা যদি একবার একদিকদর্শিতা আর নিজস্ব লালিত বিশ্বাসের গণ্ডিমুক্ত হয়ে ভাবি এবং চিন্তা করি, আচ্ছা, বিজ্ঞানী আর দার্শনিকদের এই কাফেলাটি কি মানবতার জন্য বিশেষ কোন করুণা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে? আচ্ছা, জিজ্ঞেস করি মানবতা তাঁদের কাছে কি পেয়েছে? মানবতার কোন্ কোন্ তৃষ্ণা নিবারণ করেছে এই কাফেলা? মানবতার কোনো যন্ত্রণার চিকিৎসা করেছে এই জ্ঞানগুরুর দল-দার্শনিক কাফেলা?
আমরা এসব প্রশ্ন নিয়ে যতই ভাবি শূন্যতা আর দীনতা ছাড়া কিছুই খুঁজে পাই না। কেবল পাই সাগর সাগর নৈরাশ্য। আপনি নিজেই দর্শনশাস্ত্র পড়ুন। দার্শনিকদের জীবনপাতাগুলো উল্টে দেখুন! মনে হবে, দর্শনের জীবনসমুদ্রের ছোট একটি দ্বীপ ছিল। কিছু রক্ষিত জায়গা ছিল। সীমানা পাতা ক্ষুদ্র একটি এলাকা ছিল। জ্ঞানগুরু-দার্শনিকরা আল্লাহপ্রদত্ত তাঁদের সকল শক্তি ও মেধা সেই ছোট্ট ক্ষুদ্র রক্ষিত ভূমিতেই শেষ করে দিয়েছেন।
মানবতার যেসব চাহিদা ছিল আশু পূরণীয়, যেসব সমস্যাকে এক মুহূর্তের জন্য রেখে দেয়া যায় না, যেসব সমস্যার গ্রন্থি উন্মোচন ব্যতিরেকে মানবতার গাড়ি এক পা এগুতে পারে না, জ্ঞানগুরু দার্শনিকরা সেসব সমস্যার প্রতি একবার চোখ তুলে তাকানও নি। এসব সমস্যা উত্তরণে মানবতাকে সহায়তা করা তো অনেক পরের কথা, এসব সমস্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনাও হয়নি, বাক-বিতণ্ডাও হয়নি। তাঁরা বরং তাঁদের সেই জ্ঞানভূমিতে, চিন্তা ও দর্শনের দ্বীপরাজ্যে নিরাপদ শান্তিময় জীবন যাপন করেছেন; কিন্তু মানবতা তো আর সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপরাজ্যে বন্দী থাকেনি! দার্শনিকদের আবাদভূমি গ্রীকেও তো অদার্শনিক কম ছিল না! এই দার্শনিকগণ আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে খুব ভেবেছেন। নক্ষত্রের বিচরণ পথ, আকাশমণ্ডলী, আরো কত কিছু নিয়ে মাথা ক্ষয় করেছেন; কিন্তু অদার্শনিকদের ওসবের সাথে কি সম্পর্ক! তাছাড়া মানবতাই বা এসব থেকে কি পেয়েছে? মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই বা ওসবের দ্বারা কতটুকু উপকৃত হয়েছে? উদ্ভ্রান্ত, পথহারা, ম্রিয়মাণ মানবতার জন্য তাঁরা কি করেছেন? তাঁরা জীবন যাপন করেছেন, অথচ জীবনের সাথে তাঁদের সম্পর্কই ছিল না। জীবনের চারপাশে জ্ঞান ও দর্শনের প্রাণহীন দেয়াল এঁটে রেখেছিলেন তাঁরা, সম্পর্ক যা ছিল তা কেবল দর্শনের কয়েকটি কেতাবী কথা।
এখন চলছে রাজনীতির যুগ। সর্বত্র রাজনীতির হৈ চৈ! আমাদের দেশ এখন স্বাধীন। আশা করি এই উপমাটি দার্শনিকদের অবস্থান নির্ণয়ে যথেষ্ট সাহায্য করবে! আপনারা সকলেই জানেন, আমাদের এই দেশে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস আছে। কোনোটা আমেরিকার দূতাবাস, কোনটা রাশিয়ার। কোনটা মিশরের দূতাবাস, আবার কোনোটা ইরানের। এসব দূতাবাসের ভেতরেও মানুষ আছে। জীবন যাপন-প্রাণচাঞ্চল্য সবই আছে। সেখানে তারা খানাপিনা করে, পড়া-লেখা করে। অনেক বড় বড় শিক্ষিত, রাজনৈতিক বিশ্লেষকের নিবাস এই দূতাবাসগুলো, অথচ আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ের সাথে এদের এক বিন্দু সম্পর্ক নেই। আমাদের পরস্পর ঝগড়া-বিবাদের সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের দারিদ্র্য, ঐশ্বর্য, চারিত্রিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি-অবনতি নিয়েও তাদের কোনো ভাবনা-ব্যথা নেই, বরং তাদের নির্ধারিত কিছু কাজ আছে। তাও সীমিত অঙ্গনে তারা কেবল সেই কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই তারা আমাদের দেশে থেকেও যেন নেই! দর্শনের বিষয়টিও ছিল অনুরূপ। জ্ঞানগুরু দার্শনিকরা সেই দূতাবাসের বদ্ধ নিবাসে বসে জ্ঞান চর্চায় মগ্ন থাকতেন। জীবনযুদ্ধের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
দার্শনিকদের পরেই আসে কবি-সাহিত্যিকদের পালা। কাব্য-সাহিত্যের প্রতি আমাদেরও ঝোঁক আছে। তাই আমরা কাব্য-সাহিত্যকে খাটো করে দেখছি না। তবুও আমাকে মাফ করবেন। আমি বলতে বাধ্য, কবি-সাহিত্যিকরাও মানবতার ব্যথা দূর করতে সচেষ্ট হয়নি। মানবতার দীর্ঘ যন্ত্রণা আর ভয়াল জখম বেদনার চিকিৎসা না করে তারা আমাদেরকে দিয়েছেন কিছু বিনোদন মাত্র, অবসর কাটাবার নিষ্ফল সওদা। সন্দেহ নেই, তারা আমাদের সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন; কিন্তু মানবতার ব্যথায় বিমূঢ় হয়নি তাদের মাথা। মানবতার ইসলাহ্ ও সংশোধনের চিন্তা করতে পারেননি তারা। আর এটা তাদের সাধ্যাতীতও বটে! জীবনের উত্থান-পতন হয়েছে। মানবতা ভেঙেছে-গড়েছে। আর কবি-সাহিত্যিকরা বসে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনিয়েছেন। এর উদাহরণ হলো এমন, মানুষ বিভিন্ন সমস্যায় নিপীড়িত। কেউ জ্বলছে। কেউ লড়াই করে মরছে। আরেকজন বাঁশিওয়ালা মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে আর হাঁটছে। হতে পারে লড়াকু যোদ্ধা আর পীড়িত জনরাও তার সুরে কিছুটা হলেও আমোদিত হবে। ভাবের ভোগে শরীক হবে, কিন্তু তারা সেই সুর মূর্ছনায় জীবনের সমস্যা তো পার হবে না! অধিকন্তু তার সুরে সমস্যার জট খোলার কোনো নির্দেশনাও নেই।
তৃতীয় পর্যায়ে ভাবা যায় বিজয়ীদের কথা, যারা তরবারির আঘাতে ঝরে পতাকা, খান খান হয় সিংহাসন, যারা দেশের পর দেশ জয় করে সৃষ্টি করেন ইতিহাসের নতুন ধারা এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা এই বিজয়ীদের প্রতি অনেকটা দুর্বল থাকি। তাদের তালোয়ারের ঝনঝনানি আজও আমাদের কানে বাজে। বাহ্যত তাদের চিৎকার শুনে মনে হয়, তারা মানবতার জন্য অনেক কিছু করেছেন; কিন্তু তাদের ইতিহাস কি তা-ই বলে? তাদের ইতিহাস কি ন্যায় ও ইনসাফের ইতিহাস, না ত্রাস ও নারকীয়তার? সেকান্দরের নাম শুনতেই মানুষের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে তার নির্যাতনের বর্বরতর কাহিনীগুলো। তাই কোনোক্রমে তাকে মানবতার বন্ধু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। সেকান্দার তো গ্রীক থেকে ভারত পর্যন্ত দেশের পর দেশ উলট-পালট করে দিয়েছিল। শত দেশ, শত জাতি তার অত্যাচারে যাবতীয় শান্তি ও নিরাপত্তা থেকে হয়েছিল বঞ্চিত। তার মৃত্যুর হাজার বছর পরও পতিত-নির্যাতিত জাতিগুলো উঠে দাঁড়াতে পারেনি। তাছাড়া সিজার, চেঙ্গিস খানদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর খ্যাতনামা অন্যান্য বিজয়ীও অনুরূপ জীবনধারায় ছিল বিশ্বস্ত। তাই বিজয়ী যোদ্ধারা হতে পারে স্বীয় জাতি ও দেশের জন্য বন্ধু-পরম বন্ধু; কিন্তু অন্যদের জন্য তো নিঃসন্দেহে আযাব ও বিপদ।
চতুর্থ পর্যায়ে আমরা ভাবতে পারি সেই সব সংগ্রামী জীবন-যোদ্ধাদের কথা-যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। এই শ্রেণীটির কথা ভাবতে গেলেই শ্রদ্ধায় অবনত হই আমরা। সন্দেহ নেই তারা তাদের মাতৃভূমির জন্য অনেক কিছুই করেছেন; কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়: যারা অন্য দেশের বাসিন্দা তাদের জন্য কি করেছেন তারা? আপনি নিশ্চয় আব্রাহাম লিংকনের নাম শুনেছেন। আধুনিক আমেরিকার স্থপতি তিনি; কিন্তু তিনি ভারত, মিসর, ইরাকসহ অন্যান্য দেশের জন্য কী করতে পেরেছেন? সন্দেহ নেই, আমেরিকাকে পৃথিবীর এক সুপার পাওয়ার হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন; কিন্তু বিশাল পৃথিবীর জন্য কি গোলামী ও দাসত্বের নব শৃঙ্খল সৃষ্টি হয়নি এতে? আচ্ছা, সা'দ যাগলুলের কথাই ভাবুন! মিসরবাসীদের জন্য এক আশীর্বাদ-পুরুষ। মিসরের স্বাধীনতা বিপ্লবের সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তিত্ব, কিন্তু মিসরীদের জন্য তো তিনি কিছুই করতে পারেননি। মূলত এই জাতিপূজা স্বদেশের জন্য আশীর্বাদ হলেও অন্য দেশ ও জাতির জন্য এক মহাবিপদ! কারণ জাতিপূজা আর জাতীয়তাবাদের মূল প্রেরণাটাই হলো, নিজের জাতির মাথা উঁচু করা আর মাথা নত করা অন্য সকল জাতির। এই প্রেরণা ও বাসনা পূরণ করতে গিয়ে স্বীয় জাতির মাথা উঁচু করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক জাতিকে দাসত্বের শেকলে আবদ্ধ করতে হয়! এবং একথা সকলেই জানে!
পঞ্চম পর্যায়ে আমরা ভাবতে পারি আধুনিক বিজ্ঞানী ও আবিষ্কারকদের কথা। নিঃসন্দেহে তারা জাতিকে অনেক নতুন বিষয় দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় অনেক অভিনব আসবাবপত্র আবিষ্কার করেছেন। তাদের এ সেবা অনস্বীকার্য। কারণ তাদের এসব সৃষ্টি ও আবিষ্কার রীতিমত আমাদেরকে উপকৃত করে। বিদ্যুৎ, বিমান, ট্রেন, রেডিও তাদের অবদান। এজন্য তাদেরকে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে এবং মানুষ এসব আসবাবপত্র দ্বারা প্রতিনিয়ত আমোদিত আস্বাদিত হচ্ছে। তারপরও একবার ভেবে দেখুন, শুধু এসব আবিষ্কারই কি মানব ও মানবতার জন্য যথেষ্ট? এসব আবিষ্কারের সাথে যদি সদিচ্ছা না থাকে, ধৈর্য ও সংযম না থাকে, সৃষ্টির প্রতি দরদ ও আন্তরিকতা না থাকে, সেবার মনোভাব না থাকে, এর দ্বারা মানবতার মৌলিক সমস্যা ও চাহিদার সমাধান না হয় তাহলে আপনিই বলুন, এই সৃষ্টি মানবতার জন্যে আশীর্বাদ না অভিশাপ! আমাদের বিজ্ঞানীরা মানবগোষ্ঠীকে নতুন নতুন অনেক কিছুই দিয়েছেন; কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের সঠিক চেতনা দিতে পারেননি। এই নব্য আবিষ্কারকে কাজে লাগাবার মত মন ও অনুভূতি দিতে পারেনি তাদেরকে। এসব সৃষ্টি ব্যবহার করে অনাসৃষ্টির সম্ভাব্য পথ পরিহার করার পরামর্শ ও শিক্ষা দিতেও দৈন্যের পরিচয় দিয়েছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা! ইতোমধ্যেই আমরা দু'টি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি। আধুনিক আবিষ্কারের জঘন্য ব্যবহারের প্রদর্শনী আমাদেরকে অনেক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি, চারিত্রিক প্রশিক্ষণ আর আল্লাহ-প্রীতি ছাড়া আধুনিক আবিষ্কার ও সৃষ্টি শুধু অভিশাপই নয়, মানব ও মানবতার জন্য এক মহাত্রাস, ভয়ানক আযাব।
নবীরা কখনও একথা বলেন না, আমি কোনো গুপ্তধনের সন্ধান নিয়ে এসেছি। মানুষের শক্তিকে যাদুর কাঠি বুলিয়ে কাবু করবার মত কোনো চমকও তাঁরা দেখান না। নতুন কোনো আবিষ্কারও তাঁদের স্লোগানের অন্তর্ভুক্ত হয় না। ভূগোল কিংবা খনিজ সম্পদ বিষয়ে বিশেষ কোনো দক্ষতার দাবীও তাঁরা করেন না, বরং তাঁরা বলেন: আমরা এই বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে মানুষকে সঠিক ধারণা দেই-তাঁর দেয়া জ্ঞানের আলোকেই ও আমাদের মাধ্যমেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাঁরা আরও বলেন, এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা একজন। তাঁরই আদেশ ও ইচ্ছাকল্পে এই পৃথিবী চলছে। এই পৃথিবীর শাসন ও সৃষ্টিতে তাঁর কোনো শরীক নেই। এই পৃথিবীকে লক্ষ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি তিনি এবং তাঁর যাত্রাও উদ্দেশ্যহীন নয়। এই জীবনের পর আরেকটি জীবন আছে যে জীবনে এই জীবনের হিসাব নেয়া হবে। সেখানে ভালো কর্মের পুরস্কার আর মন্দ কর্মের জন্য শাস্তি পেতে হবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে আইন ও বিধান যাঁরা নিয়ে এসেছিলেন এবং যাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ বলে দেন তাঁরাই পয়গম্বর, তাঁরাই রাসূল। তাঁরা সকল দেশে, সকল জাতির কাছেই এই আহ্বান নিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের নির্দেশনা ছাড়া কেউ আল্লাহর পথ অতিক্রম করতে পারে না। তাঁদের এই আহ্বান, এই নির্দেশনা শাশ্বত। তাঁদের মত ও পথে কোনো বিরোধ নেই, দ্বিমত নেই, অথচ দু'জন দার্শনিক কোনো একটা বিষয়ে একমত হতে পারেন না।
পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই পৃথিবীতে আগমন করেন তখনও মানবতার গাড়ি চলছিল। তবে লক্ষ্যহীন। দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক, বিজেতা, শাসক, কৃষক ও ব্যবসায়ী সকলেই ছিল প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারোরই মাথা ওঠাবার সুযোগ ছিল না। আপন পেশা ও কর্মে যেন উবু হয়ে পড়ে আছে সকলে! তখন শাসকও ছিল, শাসিতও ছিল। অত্যাচারীও ছিল, অত্যাচারিতও ছিল; কিন্তু তারা জানত না কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তারা খুঁজে দেখেনি কেনই বা তাদের এই পৃথিবীতে পদার্পণ! এই অজ্ঞ লক্ষ্যচ্যুত মানবগোষ্ঠীর কাছেই একজন বিশাল মানবের আগমন হয়। তিনি এসে মানবতার পতাকাবাহীদের জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা বলতো, তুমি মানব জাতির প্রতি কেন এই অত্যাচার করেছ? তাদেরকে তাদের প্রভুর সন্ধানটি পর্যন্ত দাওনি। সারা জাহানের বাদশাহ্ দরবার থেকে টেনে এনে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছ? কোন্ অধিকারে তুমি অপূর্ণ কিশোর মানবতাকে অন্যায় পথে তুলে দিয়েছ? হে অত্যাচারী চালক! তুমি মুসাফিরকে জিজ্ঞেস না করেই কোন্ দিকে জীবনতরী ভাসিয়ে দিয়েছ?
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহীদের যে স্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন তার সুর ও আহ্বানে পৃথিবীর সকল ধর্ম, সকল দর্শন ও সকল চিন্তাই কম-বেশী প্রভাবিত হয়েছে। তিনি সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের প্রভু মাত্র একজন। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করা চরম অপমানের বিষয়। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আদমের সামনে ফিরিশতাদের মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন যাতে আদম সন্তানরা তাদের মাথা আর কারো সামনে নত না করে এবং তারা যেন বুঝতে পারে সৃষ্টির এই মহান গোষ্ঠীর মাথা-ই যখন আমাদের সামনে অবনত, তখন আমরা তো এই পৃথিবীর কারো সামনে নত করতে পারি না আমাদের মাথা। যেদিন থেকে পৃথিবীর মানুষ তাওহীদের এই মর্মকথা শুনেছে সেদিন থেকে 'শিরক' নিজে নিজেই লজ্জায় অবনত হয়েছে। পরাজয় বরণ করেছে নিজে নিজেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কণ্ঠে উচ্চারিত তাওহীদ ও একত্ববাদের সুর-ই ভিন্ন। এখানে শুধু আমলের কথাই নয়, বরং এখানে তাওহীদের রয়েছে নিজস্ব ব্যাখ্যা, রয়েছে তার স্বতন্ত্র দর্শন। কারণ তাওহীদ এখন আত্মার গহীনে আশ্রয় পেয়েছে।
অতঃপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইলম ও বিশ্বাসের সাথে এমন এক শক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন যাতে সহস্র পুলিস, অযুত-লক্ষ আদালত ও প্রশাসনের চাইতে অধিক ক্ষমতা নিহিত। সে শক্তি আত্মার। সত্যের প্রতি অনুরাগ, মন্দের প্রতি অনীহা আর জবাবদিহিতার আত্মউপলব্ধিই সেই শক্তি। মূলত এই চেতনা, এই শক্তির বরকতে এক সাহাবী পাপ কর্মে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনুশোচনায় অস্থির হয়ে পড়েন। কেঁপে ওঠে হৃদয় তাঁর গভীর বেদনায়। দৌড়ে আসেন তিনি নবীজীর খেদমতে। এসে নিবেদন করেন: হে রাসূল! আমাকে পবিত্র করে দিন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা ফিরিয়ে নেন। তিনি আবার মুখোমুখি দাঁড়ান। আরয করেন: আমাকে পবিত্র করুন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নেন। সাহাবী আবার সামনে এসে দাঁড়ান। প্রিয় নবীজী খোঁজ-খবর নেন। সে আবার মানসিক রোগী নয়তো? জানতে পারেন, লোকটি পূর্ণ সুস্থ। নবীজী তাকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রশ্ন হলো: সে কোন্ শক্তি যা তাকে শাস্তি গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল? তিনি কোন্ শক্তি যা তাকে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করেছিল?
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীকে এই তিনটি অমূল্য সম্পদ দান করেছেন। বিশুদ্ধ জ্ঞান, দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস আর কল্যাণ ও সৎ কর্মের প্রতি আন্তরিক টান, শক্তিমান আকর্ষণ। আজ অবধি পৃথিবীকে কেউ এর চাইতে দামী কোনো কিছু দিতে পারেননি এবং নবীজীর চাইতে অধিক অনুগ্রহও কেউ করতে পারেননি। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে অহংকার করা উচিত, আমাদেরই একজন মানুষ এই নিখিল ভুবনে মানবতার মাথা উঁচু করেছেন। আমাদেরই স্বজাতি এক আরব সন্তান গোটা মানব জাতির নাম আলোকিত করেছেন। তিনি যদি আগমন না করতেন তাহলে এ পৃথিবীর কি দশা হতো? আর আমরা মানব জাতির গর্ব-অহংকার করারই কোনো উপায় থাকত কি? নিশ্চয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত মানব জাতির। তিনি এই পৃথিবীর এক চিরন্তন আলো, মানব জাতির অনন্ত গৌরব। তিনি বিশেষ কোনো জাতির নন, বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের নন, বিশেষ কোনো দেশের সম্পদও নন তিনি। তিনি বরং সমগ্র মানবতার সম্পদ। বিশ্ব মানব জাতির হৃদয়ের ধন তিনি। আজ পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন নাগরিক অন্তত গর্ব আর অসীম আনন্দভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারে, আমি সেই মানুষ-যে মানুষরূপে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো ব্যক্তিত্ব এই পৃথিবীতে এসেছিলেন।
সমগ্র পৃথিবীর প্রতি তাঁর অনুগ্রহ স্বল্প কোথায়! তিনিই তো সর্বপ্রথম ঘোষণা দিলেন: আল্লাহ্ কোনো বিশেষ জাতি, গোষ্ঠী কিংবা বিশেষ কোনো দেশের নন, বরং আল্লাহ্ সারা জাহানের ও সমগ্র মানবগোষ্ঠীর। যে পৃথিবীতে "আর্যদের খোদা, ইহুদীদের খোদা, মিসরীদের খোদা ও ইরানীদের খোদা" বলে আল্লাহকে সংকীর্ণ বলয়ে আবদ্ধ করে রাখত সেই পৃথিবীতেই তিনি ঘোষণা করলেন: "সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর।" অনন্তর এই ঘোষণাকে সালাতের অংশ হিসেবে নির্বাচন করলেন। এই পৃথিবীতে অনেক দার্শনিক এসেছেন, বিজ্ঞানী এসেছেন, কবি-সাহিত্যিক এসেছেন, যোদ্ধা, দেশ বিজেতা, রাজনীতিক নেতা, আবিষ্কারক কতজনই তো এসেছেন; কিন্তু নবীদের আগমনে পৃথিবীতে যে বসন্ত এসেছে তা কি অন্য কারো আগমনে এসেছে? অনন্তর সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনে পৃথিবীতে সৌভাগ্য, কল্যাণ, রহমত, বরকত, শান্তি ও মানবতার যে ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়েছে তা কি অন্য কারও আগমনে ঘটেছে?! ঘটেনি। কারণ মানবতাকে তিনি যা দিয়েছেন তা আর অন্য কেউ দিতে পারেননি।
📄 সমকালীন পৃথিবীর প্রতি সীরাতে মুহাম্মদীর পয়গাম
আমাদের সামনে যখন অন্ধকার যুগের নাম আসে, অনায়াসেই তখন চোখের সামনে প্রতিমূর্ত হয়ে ওঠে খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের সেই তমসাচ্ছন্ন যুগ যাতে বিশ্বনবী (সা.) আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটি তাঁর হিদায়েত ও প্রশিক্ষণের সর্বপ্রথম ও উল্লেখযোগ্য মু'জিযা। জাহিলিয়াত শব্দটি শুনতেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে আরব সম্প্রদায়, তাদের বর্বরোচিত বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও বেপরোয়া চলাফেরার দৃশ্য ঐতিহাসিকগণ যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগ শুধু সে কালের সাথে বিশেষিত নয়, ইসলামের পরিভাষায় ঐ যুগ ওহী ও নববী দিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের আলোক রশ্মি যেখানে হয়ত পৌঁছেছে, কিন্তু লোকেরা তা থেকে বিমুখ থেকেছে, চাই সেটা খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের দিগন্তবিস্তৃত বর্বরতা হোক, সাধারণ অন্ধকার যুগ হিসেবে যাকে স্মরণ করা হয় অথবা বিংশ শতাব্দীর দীপ্তিময় আলোকোজ্জ্বল, সভ্য ও অগ্রগতির যুগ হোক, আমরা যা অতিক্রম করছি।
কুরআনে কারীমের ভাষায় ভূমণ্ডলে আলোকরশ্মি একটাই এবং এর উৎসও একটাই। ইরশাদ হচ্ছে "আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তাকাশ ও জমিনের আলোকরশ্মি।” তবে আঁধার অসংখ্য অগণিত। যদি আল্লাহ্ তা'আলার আলোকরশ্মির (যা শুধু আম্বিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে বিচ্ছুরিত হয়) দীপ্তি না থাকত, তাহলে থাকত না পৃথিবীতে আঁধারের কোন সুনির্দিষ্ট ঠিকানা, বরং পরিলক্ষিত হতো জীবনের বাঁকে বাঁকে, পরতে পরতে আঁধার আর আঁধার। ইরশাদ হচ্ছে, "অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের ওপর এক অন্ধকার যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহতা'আলা যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতিই নেই।"
একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট, পাশ্চাত্য জগতে যেখানে সূর্য উদিত হয় না, অস্ত যায়, নববী আলোর বিম্বের ছোঁয়া লেগেছে খুব কম। এখানে আসমানী আলোক রশ্মি চিত্রায়ণের প্রচেষ্টা করা হয়েছে প্রতিনিয়ত মানব মস্তিষ্কপ্রসূত আলোকরশ্মি দিয়ে। মানবিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গ্রীস ও রোমানদের সোনালী যুগ নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়; কিন্তু নববী প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনার তুলনায় তা যেন নিষ্প্রভ, তিমিরাবগুণ্ঠিত বর্বর যুগ! আল্লাহ্ তা'আলার যাত, ছিফাতের ব্যাপারে এখানে কোন আলোকরশ্মি ও দিকনির্দেশক ছাড়াই শুধু যুক্তির ঘোড় দৌড়ানো হয়েছে। “এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু আন্দাজের অনুসরণ করে।" বিজ্ঞান ও দর্শনের যে ম্যাজিক তারা বিস্তৃত করেছে, তা কল্পনাপ্রসূত ও বিস্ময়কর।
এতদসত্ত্বেও এ বাস্তবতাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে পাশ্চাত্যে আল্লাহ্ তা'আলায় বিশ্বাস পরকালের চিন্তা-চেতনা খৃস্টবাদেরই অনিবার্য ফল আসমানী ধর্ম যতই রূপান্তরিত হোক, আল্লাহ্ পরকালের কল্পনা শিরায় শিরায় থাকে প্রবাহিত। খৃস্টীয় পনের ও ষোড়শ শতকে ইউরোপে যৌক্তিকতা তথা বস্তুবাদ ও ইন্দ্রিয় পূজার যে বিপ্লব সৃষ্টি হলো, পাশ্চাত্য জগতকে তা দিবালোকে লাগিয়ে দিল জড়পূজায়। ধীরে ধীরে ইউরোপ হয়ে উঠল জড়পূজারী। তাদের জীবনধারা এমন ছাঁচে ঢালা, যাতে না আছে আল্লাহ্, না পরকাল। আজ একথা বলা বিলকুল যথার্থ, ইউরোপের ধর্ম খৃস্টবাদ নয়, বরং বস্তুবাদ।
আল্লাহ্ বিস্মৃতির দ্বিতীয় পরিণাম হলো আত্মবিস্মৃতি। কোরআন কারীম এ বাস্তব সত্যটির বিবরণ দিয়েছে, "আল্লাহ্ বিস্মৃতির শাস্তি আত্মবিস্মৃতি"- ইরশাদ হচ্ছেঃ “তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে যায়। অন্যথায় আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে আত্মবিস্তৃত বানিয়ে দেবেন।” বিংশ শতাব্দীর মানুষ আত্মবিস্মৃতির পরিপূর্ণ মডেল। সে বেমালুম ভুলে গেছে তার মূল সত্তা, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য, জীবনের ও জন্মলাভের মূল উদ্দেশ্য। অবলম্বন করেছে সে পশুসুলভ জড়বাদী জীবন যাপন। রূপান্তরিত হয়েছে সে টাকা তৈরির মেশিনে। এক পশ্চিমা লেখক এর বাস্তবতাকে সুস্পষ্টরূপে স্বীকার করে বলেছেন: আমাদের বিস্ময়কর শৈল্পিক বিজয় ও লজ্জাকর ছেলেমানুষী চরিত্রে যে ব্যবধান, এর কারণে আমাদের জীবনের বাঁকে বাঁকে জন্ম নিচ্ছে প্রচুর সমস্যা। চড়ুই পাখির মত তোমরা আকাশে উড়তে জান, মৎস্যরাজির মত পানিতে সাঁতরাতে জান, কিন্তু এখনও মানুষের মত পৃথিবীতে চলতে জান না।
পরকাল অস্বীকৃতি কিংবা পরকাল বিস্মৃতির পর আমোদ-প্রমোদ ও উপভোগের এ আবেগ, আমরা মুসলমান যাকে ছেলেমী মনে করি, পরকাল অস্বীকৃতি হিসেবে হুবহু ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি। যারা এ জীবনের পর আরেকটি জীবন আছে তা ভাবতে পারে না তারা কেন ত্রুটি করবে- এ জীবনের স্বাদ উপভোগে, আত্মার দাহ নেভাতে। এ যেন জীবনের এক তীব্র তৃণা, যা নির্বাপিত হবার নয়! এক প্রচণ্ড ক্ষুধা, যা নিবারণ হবার নয়। দিন দিন বাড়তে লাগল জীবনের প্রয়োজন। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মুকাবেলা এতে মদদ যুগিয়েছে।
পরকাল অস্বীকৃতির দ্বিতীয় স্বাভাবিক পরিণাম হলো, দুনিয়ার উপকরণ ও তার কর্ম অত্যধিক সুসজ্জিত, বিবেকসম্মত ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়। জন্ম নেয় বস্তুবাদী মানসিকতা ও স্থূল দৃষ্টি, বাস্তবতা পর্যন্ত যা পৌঁছাতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে, "যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে সুশোভিত করে দিয়েছি। অতএব তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।”
পরকাল অস্বীকৃতির এক বিশেষ গুণ হলো, অহংকার আখেরাত অস্বীকারকারীর দাম্ভিক হওয়ার অন্তরায় হয় না। কোন কিছু যে তার চেয়ে বড় কোন শক্তিধর, এ জীবনের পর অন্য কোন জীবন ও প্রতিদান দেবার প্রতি বিশ্বাস রাখে না, তাকে এক লাগামহীন উদ্ধত মানুষ হওয়া থেকে রুখতে পারে কিসে? এরূপ পরজীবন অস্বীকারকারী, বস্তুবাদী সম্প্রদায়ের হিংস্র থাবা, তাদের অত্যাচারী পাকড়াও এবং তাদের বিজয় যেন এক ভয়াবহ ভূমিকম্প, যা শহরের পর শহর, দেশের পর দেশকে উলট-পালট করে দেয়।
অনুরূপ পাশ্চাত্যবাসীরা রাসূল (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনয়নের দৌলত থেকে বঞ্চিত। যদিও তারা হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে মেনে নিয়েছে কিন্তু তারা তাঁকে জীবনাদর্শ ও অনুসরণীয় রাসূল হিসাবে কার্যত মেনে নেয়নি। খৃস্ট সম্প্রদায় তাদের বাস্তব জীবন মুক্ত করে নিল হযরত ঈসা (আ.)-এর নেতৃত্ব ও গির্জার তত্ত্বাবধান থেকে। জীবন যাপন করতে লাগল বাধাবন্ধনহীন যেন তারা কোন নবীর উম্মত নয়। তারা জাগতিক উপকরণ সঞ্চয় করেছে প্রচুর। কিন্তু কল্যাণপ্রবণতা তো অর্জিত হয় শুধু আম্বিয়ায়ে কেরামের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও সংশোধনেই।
বিগত যুদ্ধ সমাপ্তির পর মাস্টার লয়েড জর্জ বলেছিলেন, "যদি হযরত মাসীহ (আ.) এ ধরায় আগমন করেন তো বেশি দিন বাঁচবেন না।” লক্ষণীয় বিষয় হলো, দু' হাজার বছর পরও মানুষ ফেৎনা-ফাসাদ, রক্তপাত, হত্যা, লুণ্ঠনে নিয়মিত জড়িত, বরং ভয়াবহ এখন তো মানবতার প্রতিবিম্ব থেকে, ইতিহাসের সবচেয়ে মহাযুদ্ধের প্রভাব থেকে ঝরছে তপ্ত খুন লহরী। কী দেখবেন হযরত এসে? ভ্রাতৃত্ববোধে পরস্পর হাত মেলাতে? না তার বিপরীত সেই মহাযুদ্ধের চেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক, বেদনাদায়ক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে? মানুষের কুপ্রবৃত্তির অবস্থা বর্ণনায় ঘোষিত হয়েছে, "তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাল, যে কাজ তারা করছিল।"
আজ থেকে সাড়ে তের শ' বছর পূর্বের সভ্য জগত রোম ও ইরান তথা প্রাচ্যের সম্রাটদের হাতে ছিল যার দিক নির্দেশনা, তা আজকের জগতের সাথে প্রায়ই মিলে যায়। মানুষ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে আত্মবিস্মৃতিতে নিমজ্জিত হয়েছিল। জগত জুড়ে এক আল্লাহ্র পরিবর্তে বহু খোদার পূজা, উপাসনার মায়াজাল বিস্তৃত ছিল। শাসকগোষ্ঠী লিপ্ত ছিল নির্যাতন, নিপীড়ন, বলাৎকার, অন্যায়ভাবে বল প্রয়োগ করে রাজত্ব পরিচালনা, মানুষকে কষ্ট দেয়া ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগতকরণে। ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল আমীরগণ।
তৎকালে ঐ সভ্য জগতের (যাতে ঘুণে ধরেছে সম্পূর্ণরূপে) ভিন্ন কিন্তু একেবারেই নিকটবর্তী, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী উভয় সম্রাটের ঠিক মাঝখানে উম্মীদের মাঝে আল্লাহ্ তা'আলা আবির্ভাব ঘটালেন এক উম্মী নবীর। তিনি যেন শতাব্দীভর নিপতিত শাস্তি থেকে উদ্ধার করেন জগতকে। সপ্তম হিজরী সনে নবীয়ে উম্মী (সা.) মদীনা থেকে রোম সম্রাট বরাবর একটি বার্তা পাঠালেন যাতে দাওয়াত ছিল এই, “হে আহলে কিতাবগণ! একটি কালেমা-বিষয়ের দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না।"
হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) ইরানের প্রতাপী সেনাপতি আমীর রুস্তমের আহ্বানে হযরত রাবয়ী ইবনে আমের (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠালেন। হযরত রাবয়ী (রা.) রাজদরবারে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, শরীরে মোটা মোটা পরিচ্ছদ, হাতে নাঙ্গা তালোয়ার, ঢাল। রুস্তম জিজ্ঞেস করলঃ এদেশে কি উদ্দেশে আপনার আগমন? তিনি জবাব দিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ জবাব: আল্লাহ্ তা'আলা এক মহৎ কাজের জন্য আমাদেরকে নিয়োজিত করেছেন। তা হলো, আমরা তাঁর নির্দেশে তাঁর বান্দাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহ্র বন্দেগীতে, পার্থিব সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে প্রশস্ততায়, ধর্মের নামে রকমারি নির্যাতন নিপীড়ন থেকে উদ্ধার করে ইসলামের ন্যায়নীতির ছায়াতলে প্রবেশ করাতে তিনি আমাদেরকে স্বীয় ধর্মসহ মাখলুকের প্রতি পাঠিয়েছেন।
রুস্তম বলল: আপনি কি মুসলমানদের সরদার? হযরত রাবয়ী বললেন: না, সমস্ত মুসলমান এক শরীরসদৃশ। তাদের মধ্যে সর্বনিম্ন জনেরও সর্বোচ্চ জনের মুকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এক রোমীয় রাজদরবারে দূত হিসেবে গেলেন। রাজদরবারে সোনালী কিংখাবের ফরশ বিছানো ছিল। হযরত মুয়াজ (রা.) জমিনে বসে গেলেন এবং বললেন: আমি এমন বিছানায় বসতে চাই না, যা গরীব অসহায়দের অধিকার হরণ করে তৈরি করা হয়েছে। খৃস্টানগণ বলল: আমরা তোমাকে সম্মানিত করতে চাচ্ছিলাম। হযরত মুয়াজ (রা.) বললেন: তোমরা যাকে সম্মান মনে করো, আমার তার পরোয়া নেই। যদি জমিনে বসা দাসদের অভ্যাস হয়ে থাকে, তাহলে আমার চেয়ে আল্লাহ্ বড় দাস আর কে?
এসব সংশোধন, অগ্রগতি, আল্লাহ্ তা'আলাকে একক উপাস্য মেনে নেয়া, নিজেকে তাঁর সমীপে অর্পণ করা এবং এক নিষ্পাপ নবীর তত্ত্বাবধান ও লালন-পালনে নিজেকে সোপর্দ করার অনিবার্য ফল। এ দ্বারা যেন তার জীবনধারা তার আসল ছাঁচে মিলে গেছে। এসে গেছে প্রত্যেকে তার স্ব স্ব স্থানে। যারা ছিল পশুর গুণে গুণান্বিত, তারা বিভূষিত হলো ফেরেস্তার ভূষণে। যারা ছিল লুণ্ঠনকারী ডাকাত, তারাই রক্ষাকারী হয়ে গেল অন্যের সম্পদ, সম্মান, জীবন সম্ভ্রমের। তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা, দ্বেষ, ক্রোধ ছিল তা দূর হয়ে গেল।
ষোল শতাব্দীতে যখন তাদের আঁখিযুগল খুলল, কল্পনায় ভেসে উঠল তখন তাদের সমস্ত বিপর্যয়ের চিকিৎসা হলো গির্জার গোলামী থেকে মুক্তি লাভ করা। কিন্তু 'লা-ইলাহা'-এর পুরো মনযিল তারা অতিক্রম করেনি তখন। বিংশ শতাব্দীর জগতের প্রতি, যার নেতৃত্ব আজ পাশ্চাত্যের হাতে—সীরাতে মুহাম্মদীর মৌলিক বার্তা হলো, "হে আল্লাহ্ থেকে পলায়নকারি! আল্লাহ্র দিকে ধাবিত হও। তাঁকে ছাড়া কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো না।"
অতএব, তোমরা আল্লাহুর দিকে ধাবিত হও। আমি তার তরফ থেকে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহ্র সাথে কোন উপাস্য সাব্যস্ত করো না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রেরিত হওয়ার পর ব্যক্তি, সম্প্রদায়, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, প্রাচীন-আধুনিক-সকলের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার ফয়সালা হলো, সৌভাগ্য ও সফলতা তাঁর আদর্শ অনুকরণেই নিহিত। দুর্ভাগ্য, ধ্বংস, বঞ্চনা আর অকৃতকার্যতা তাঁকে বর্জনেরই অনিবার্য পরিণাম।
সমাপ্ত