📄 স্বপ্ন
সামুরাহ ইবনু জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই সহাবিদেরকে বলতেন, ' তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কি?' কেউ স্বপ্ন দেখলে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। এমনই এক সকালে তিনি আমাদেরকে বললেন, 'গত রাতে আমার কাছে দুজন আগন্তুক এসেছিল। তারা আমাকে উঠাল। আর বলল, “চলুন।” আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে পৌঁছুলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার কাছে পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। লোকটির মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথরটি অন্যত্র গিয়ে পড়ছে। এরপর সে আবার পাথরটি নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মতো আবার ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে তেমনি আচরণ করতে থাকে, যা সে পূর্বে প্রথমবার করেছিল।' তিনি বলেন, 'আমি তাদের বললাম, “সুবহান্নাল্লাহ! এরা কারা?” তারা আমাকে বলল, "চলুন, সামনে চলুন।”
তিনি বলেন, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছুলাম। তার কাছে এক লোক লোহার কাঁচি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমণ্ডলের একদিক থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ থেকে মাথার পেছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক থেকে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মতো ভালো হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মতো আচরণ করে। আমি বললাম, “সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?” তারা আমাকে বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং চুলার মতো একটি গর্তের কাছে পৌঁছালাম। তাতে উঁকি মারতেই দেখলাম, বেশ কিছু উলঙ্গ নারী-পুরুষ। নিচ থেকে উঠে আসা আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে ওঠে। আমি সাথিদের বললাম, "এরা কারা?” তারা বলল, "চলুন, সামনে চলুন।””
তিনি বলেন, 'আমরা চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌঁছালাম। নদীটি ছিল রক্তের মতো লাল। দেখলাম, তাতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে আরেক লোক অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। নদীর লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর পাথর একত্র করে রাখা ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। এখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে। আবার তার কাছে ফিরে আসে। যখনই সে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়।' তিনি বলেন, 'আমি জানতে চাইলাম, “এরা কারা?” সাথিরা বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে পৌঁছলাম, যাকে তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। দেখতে পেলাম সে আগুন জ্বালাচ্ছে আর তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “এ লোকটি কে?” তারা বলল, “চলুন, সামনে চলুন।”
আমরা চললাম এবং একটা সজীব-শ্যামল বাগানে হাজির হলাম। যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মধ্যে আকাশসম উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছেন। তার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। তার চারপাশে বহু বালক-বালিকা। এত বেশি বালক-বালিকা আমি আর কখনো দেখিনি। আমি সাথিদে বললাম, "উনি কে? এরা কারা?” তারা বলল, "চলুন, সামনে চলুন।”
'আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌঁছুলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি ইতিপূর্বে দেখিনি। তারা আমাকে বলল, “এর উপরে চড়ুন।” আমরা উপরে চড়লাম। হাজির হলাম স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা তৈরি একটি শহরে। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছে দরজা খুলতে বললাম। দরজা খুলে দেয়া হলো। আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক বেশ কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়। আমার সাথিদ্বয় তাদেরকে বলল, "যাও, ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়ো।” নদীটা ছিল প্রশস্ত ও প্রবাহমান, পানি ছিল দুধের মতো সাদা। তারা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। এরপর আমাদের কাছে ফিরে এল। দেখা গেল তাদের এ কুৎসিত ভাবটুকু দূর হয়ে গেছে। তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে।
'তারা আমাকে বলল, “এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান।”” তিনি বলেন, 'আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মতো একটি প্রাসাদ। তারা আমাকে বলল, "এটা আপনার বাসগৃহ।”
'আমি তাদেরকে বললাম, “আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন! আমাকে সুযোগ দাও, আমি এতে প্রবেশ করি।” তারা বলল, “অবশ্যই আপনি এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।”
'আমি তাদের বললাম, "পেছনে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?” তারা বলল, “আচ্ছা, তাৎপর্য এখন আপনাকে বলি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তি যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে কুরআন জেনে তা ছেড়ে দিয়েছে, আর সে ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকত।
"আর যাকে দেখেছেন, মুখের এক ভাগ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিঁড়ে ফেলা হচ্ছিল সে সকালে ঘর থেকে বের হয়ে কোনো মিথ্যা বলত, যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
"চুলা সদৃশ গর্তের ভেতরে থাকা উলঙ্গ নারী-পুরুষরা ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।
"আর যাকে নদীতে সাঁতার কাটতে ও মুখে পাথর নিতে দেখেছেন, সে হলো সুদখোর। "কুশ্রী লোকটি, যে আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, তিনি হলেন জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশতা।
“বাগানে অবস্থান করা দীর্ঘকায় লোকটি হলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। তার সঙ্গে-থাকা বালক-বালিকারা হলো সেসব শিশু, যারা ফিতরাত তথা স্বভাবজাত ধর্ম ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।” কয়েকজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও কি?' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও।'
(সাহাবিদের এই জিজ্ঞাসার পর নবীজি স্বপ্নের দুই লোকের অসম্পূর্ণ কথা সম্পূর্ণ করতে গিয়ে বললেন,) "যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী দেখেছেন তারা হলো ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।” [১]
প্রথম পাঠ
নবীদের স্বপ্ন ওহি। এটি আমাদের বিশ্বাস ও আকিদা। হাদিসের মাধ্যমেই তা বুঝে আসে। এটাই উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। আর কেউ দ্বিমত পোষণ করলেও কুরআনের মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যাত হবে। কেননা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার ছেলেকে বলেছেন—
'বেটা! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবাই করছি।'
তখন ইসমাইল আলাইহিস সালাম বলেন—
'বাবা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। [১]
এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট একটি আয়াত। এর মাধ্যমে সবধরনের সন্দেহ-অভিযোগ বিদূরিত হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন তিন প্রকার।
উত্তম স্বপ্ন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনকে সুসংবাদ দেওয়া হয় কিংবা মানুষকে ভবিষ্যতের কোনো বিষয় জানিয়ে দেওয়া হয়। যেমন মিশরের বাদশাহর স্বপ্ন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যার ব্যাখ্যা করেছেন।
দুঃস্বপ্ন। এটা শয়তানের পক্ষ থেকে দেখানো হয়। সে এর মাধ্যমে মুমিনকে ভারাক্রান্ত করে দিতে চায়।
মনের জল্পনা। মানুষ যা করে থাকে এবং মনে মনে যা বলে থাকে সেটাই সে ঘুমের মধ্যে দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা যাদেরকে ক্ষমতা দিয়েছেন তারা প্রথম প্রকারের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করতে পারে। স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো ফতোয়ার মতো। আর আমাদেরকে না জেনে কোনো ফতোয়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় পাঠ
স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে একটি প্রশ্ন চলে আসে যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি এমন কোনো জ্ঞান যা আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে? নাকি এটা ব্যাকরণ, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান প্রভৃতি শাস্ত্রের মতোই সাধারণ কোনো শাস্ত্র, চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে যা অর্জিত হয়? এই বিষয়ে দীর্ঘ অধ্যয়নের পর আমি যে সার-নির্যাস বের করেছি তা হলো- স্বপ্নের ব্যাখ্যা এতদুভয়ের মাঝামাঝি একটি বিষয়। তবে অধিকাংশিই আল্লাহ-প্রদত্ত। কিছু কিছু মানুষকে আল্লাহ তাআলা তা দান করে থাকেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলা নিজেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন।
কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে- 'এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন।' [১]
আর কিছু স্বপ্ন এমন রয়েছে যেগুলো বিভিন্ন মূলনীতি এবং নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। এগুলো আমাদের বোঝা জরুরি। তা হলো, দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হবে। এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহিমাহুল্লাহর কাছে এসে বলল, 'স্বপ্নে আমি আজান দিতে দেখেছি।' তিনি বললেন, 'অচিরেই তুমি বাইতুল্লাহ শরিফে হজ করতে যাবে।' আরেক ব্যক্তি এসে বলল, 'স্বপ্নে আমি আজান দিতে দেখেছি।' তিনি তাকে বললেন, 'তুমি চুরি করে কারাগারে বন্দী হবে।'
ছাত্ররা তার এই ব্যাখ্যায় আশ্চর্যবোধ করলে তিনি তাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন। তিনি বলেন, প্রথম ব্যক্তির মধ্যে আমি কল্যাণের বৈশিষ্ট্য দেখতে পেয়েছি। তাই আল্লাহ তাআলার বাণীর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছি-
'এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্যে ঘোষণা প্রচার করো। [১]
আর দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে পাপাচারের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। তাই আমি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছি-
'অতঃপর একজন ঘোষক ডেকে বলল, হে কাফেলার লোকজন, অবশ্যই তোমরা চোর।' [২]
এ ছাড়াও কিছু স্বপ্ন রয়েছে যা সকলেই দেখে না। যেমন মিশরের বাদশাহ দুর্ভিক্ষের স্বপ্ন দেখেছিল। এটি রাজা-বাদশাহ ও প্রশাসকগণের স্বপ্ন। সাধারণ মানুষ তা দেখে না।
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এক স্বপ্ন দেখেন। তখন তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহিমাহুল্লাহর কাছে এক ব্যক্তিকে স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য পাঠান। তাকে বলেন, 'তুমি আমার কথা বলবে না। বলবে, এটা আমার নিজের স্বপ্ন।' সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহিমাহুল্লাহ তাকে বলেন, 'তোমার মতো ব্যক্তি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারে না। স্বপ্নটি কার-আমিই কি তোমাকে তা বলে দেবো না তুমি আমাকে বলবে?' লোকটি বলল, 'আপনিই বলুন।' সাঈদ বললেন, 'স্বপ্নটি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের।' স্বপ্নটি হলো, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখেন যে, তিনি আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের সঙ্গে লড়াই করছেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাকে ধরাশায়ী করে তার শরীরে চারটি পেরেক বসিয়ে দিয়েছে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব এর ব্যাখ্যা করেন এভাবে, আবদুল মালিক অচিরেই ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যা করবে। মারওয়ানের মৃত্যুর পর একে একে তার চার ছেলে খলিফা হবে। আর বাস্তবে এমনটাই ঘটেছে। আবদুল মালিকের গভর্নর হাজ্জাজের হাতে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেন। আর আবদুল মালিকের চার ছেলে ইয়াযিদ, হিশাম, ওয়ালিদ ও সুলাইমান পরবর্তীতে খলিফা হয়েছিলেন।
ঋতু, আরবি ভাষা, প্রবাদ-বাক্য প্রভৃতির মাধ্যমেও স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আমি আমার কিতাব 'হাদিসুস সবাহ'-এ উদাহরণসহ এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। সেগুলো এখানে পুনরায় উল্লেখ করতে চাই না। জ্ঞান-ভাণ্ডারে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হওয়ায় সেগুলো এখানে উল্লেখ করে দিলাম।
তৃতীয় পাঠ
আলিমগণের মতে হাদিসে বারযাখের কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময়টি হলো বারযাখ। কবরের আজাবের ব্যাপারে ১০টি নয় বরং শত শত দলিল রয়েছে। কবর হলো পরকালের সর্বপ্রথম ঘাঁটি। এটা হয়তো জাহান্নামের গর্ত হবে কিংবা জান্নাতের বাগান। যারা কুরআন-হাদিস বাদ দিয়ে যুক্তি খাটায় তারাই কেবল হঠকারিতা বশতঃ কবরের নেয়ামত এবং এর আজাব অস্বীকার করতে পারে। কবরে তারা কেবল চূর্ণ-বিচূর্ণ হাড়গোড় দেখে বলে, কবরের সুখ-শান্তি এবং আজাব-শাস্তি কোথায়? বাস্তবতা হলো, শরীর এবং আত্মার মধ্যকার সংযোগের কথা তারা ভুলে গেছে। অবস্থার স্তরভেদে এ সংযোগে তারতম্য ঘটে থাকে। মৃত্যুর পর আমরা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে থাকি। প্রতিটি স্তরে শরীরের সঙ্গে রুহের সম্পর্কের ভিন্নতা ঘটে। মৃত্যুর পূর্বেই মানুষ বহু স্তর অতিক্রম করে আর মৃত্যুর পর আরও কিছু স্তর রয়ে যায়। নিম্নে এ স্তরগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দাঁড় করানো হলো।
প্রথম : অস্তিত্বহীনতার স্তর। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির পূর্বে এই স্তরটি ছিল। তখন একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইলমেই মানুষের অস্তিত্ব ছিল।
দ্বিতীয় : অনু স্তর। আল্লাহ তাআলা এই সময় সকল আদম সন্তানের রুহ একসঙ্গে সৃষ্টি করেন। এসময় তাদের কাছ থেকে তার রুবুবিয়্যাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তারা সকলেই তখন আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের সাক্ষ্য দিয়েছিল। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
'আর যখন তোমার পালনকর্তা বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদেরকে বের করলেন এবং নিজের ওপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। (এট এ জন্য যাতে) কেয়ামতের দিন আবার বলতে শুরু না করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।' [১]
এরপর রুহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মানুষের মধ্যে জীবন সঞ্চার করেন।
তৃতীয় : পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভের স্তর। রুহ ফুঁকে দেওয়া থেকে নিয়ে জন্ম হওয়া পর্যন্ত এ স্তরটি বিস্তৃত।
চতুর্থ : বারযাখের স্তর। এটি মৃত্যু থেকে পুনরুত্থানকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
পঞ্চম : চিরস্থায়ী হওয়ার স্তর। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের হিসাব-নিকাশ শেষ করা থেকে নিয়ে তা শুরু হবে। যা আর কখনো শেষ হবে না। এরপর কেউ জাহান্নামে যাবে, কেউ জান্নাতে।
সন্দেহ নেই, উল্লিখিত স্তরগুলোতে শরীরের সঙ্গে রুহের সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। অস্তিত্বহীনতার স্তরে দেহের সঙ্গে রুহের কোনো সম্পর্ক থাকে না। কেননা এই সময় দেহ ও রুহ কিছুই থাকে না। অনু স্তরে রুহ থাকে কিন্তু দেহ থাকে না। বাস্তব অস্তিত্বের স্তরে দেহ সরাসরিভাবে শাস্তি এবং নেয়ামত ভোগ করে থাকে। রুহ তার অনুগামী হয়। কাউকে প্রহার করলে তার দেহে আঘাত লাগে কিন্তু দেহের সঙ্গে রুহের সম্পর্ক থাকায় রুহ তার যাতনা ভোগ করে। পক্ষান্তরে কবর-জগতে নেয়ামত ও আজাব উভয়টি রুহের ওপর হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দেহ রুহের অনুগামী হয়। আর চিরস্থায়িত্বের স্তরে (জান্নাত-জাহান্নাম) দেহ ও আত্মা উভয়ের ওপর সমান সমান করে নেয়ামত ও শাস্তি প্রদান করা হবে।
চতুর্থ পাঠ
আল্লাহ তাআলার এক এক ইনসাফ হলো-তিনি কাজের ধরন-প্রকৃতি থেকেই প্রতিদান দিয়ে থাকেন। বারযাখে শাস্তি ভোগকারী লোকগুলোর প্রতি লক্ষ করে দেখুন, যে যে ধরনের অপরাধ করেছে তাকে সে ধরনের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কুরআন পাওয়া সত্ত্বেও যে তা পরিত্যাগ করে, নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে তার মাথায় আঘাত করা হচ্ছে। কারণ, মাথা হলো সিজদা দেওয়ার মাধ্যম। তাকে যখন সিজদা করতে বলা হয়েছিল তখন যেহেতু সে সিজদা করতে অস্বীকার করেছে তাই তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি কুরআন পরিত্যাগ করা এবং ফরজ নামাজ ছেড়ে ঘুমিয়ে যাওয়া উভয়টির কারণেই এই শাস্তি হবে। আর কুরআন পরিত্যাগ করার অর্থ হলো কুরআন অনুযায়ী আমল না করা। তেলাওয়াত নয় বরং অন্তরের মাধ্যমে তা পরিত্যাগ করা।
তাই কেউ এ কথা বলতে পারে না যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ, রাসুল, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধান পালন করে কিন্তু কুরআনুল কারিম তেলাওয়াত করে না তাকে শাস্তি দেওয়া হবে! মানুষের অবস্থান এবং তাদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে কুরআনুল কারিম পরিত্যাগের বিষয়টি নির্ণিত হয়। যেমন শাসকের কুরআনুল কারিম পরিত্যাগ হলো বিচারকার্যে তা বাস্তবায়ন না করা। সাধারণ মানুষের কুরআনুল কারিম পরিত্যাগ হলো দৈনন্দিন জীবনে তার বিধি-বিধান পালন না করা। যেমন পুরুষরা মিরাসের (পরিত্যক্ত সম্পদ) বিধি-বিধান পালন না করা। মিরাসের হকদারদের ওপর জুলুম করা। নারীরা পর্দা পালন না করা।
নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকাটা যদিও হালকা কোনো বিষয় নয়, তবু হাদিসের আলোকে বলা যায় যে, এটি কুরআন পরিত্যাগের মতো নয়। হাদিসে এসেছে, ঘুমের কারণে কিংবা ভুলে যাওয়ায় যার নামাজ ছুটে যায় তাহলে স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সে তা আদায় করে নেয়। কেননা এটিই তার কাফফারা। [১]
এক সাহাবির স্ত্রী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তার স্বামী অভিযোগ করেন যে, তার স্বামী ফজর-নামাজের সময় ঘুমিয়ে থাকেন। সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলেন, আমি এমন সম্প্রদায়ের লোক যাদের ঘুম অনেক বেশি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'তাহলে যখন তুমি জাগ্রত হবে তখনই নামাজ পড়ে নিয়ো।' [২]
আল্লাহ মাফ করুন, ঘুমের প্রতি উৎসাহিত করবার জন্য আমি তা বলিনি, বরং এই সংক্রান্ত সঠিক বিষয়টি যাতে গোপন না হয়ে যায়, তাই উল্লেখ করেছি।
মিথ্যা বলার মাধ্যম—চোয়াল বিদির্ণ করে দেওয়াই হলো মিথ্যাবাদীর শাস্তি। ব্যভিচারীরা উলঙ্গ হয়ে হাশর করবে। তাদেরকে চুল্লিতে নিক্ষেপ করা হবে। ব্যভিচারের মাধ্যম লজ্জাস্থান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। সুদখোরকে রক্ত-নদীতে ফেলে তার মুখে পাথর দিয়ে দেওয়া হবে। কারণ সে মুখ দিয়ে সুদ খেয়েছে।
পঞ্চম পাঠ
আল্লাহ তাআলার রহমতের ব্যাপারে কোনোরকম সংশয়ে ভোগা যাবে না। রহমতের পূর্বে এই কথা স্মরণ রাখুন যে, আল্লাহ তাআলা ইনসাফকারী। ইনসাফ গুণের কারণেই তিনি বান্দাদের পরস্পরের মধ্যে কেসাস (সমতা-বিধান) করে থাকেন। যদি মিথ্যুকের প্রতি আপনি দয়াদ্র হয়ে থাকেন তাহলে স্মরণ করুন, মিথ্যা দুনিয়াতে কীসব করেছে! মিথ্যার কারণে কত মানুষের সম্মানহানি হয়েছে! কত মানুষের অধিকার আত্মসাৎ হয়েছে! কত ফেতনা সৃষ্টি হয়েছে! কত ঘরবাড়ি তছনছ হয়েছে! কত রক্ত ঝরানো হয়েছে! আপনি কি চান যে, কোনো হিসাব-নিকাশ আর শাস্তি ছাড়াই এই সকল ব্যক্তি পার পেয়ে যাক? যদি আপনি ব্যভিচারীর প্রতি দয়াদ্র হয়ে থাকেন তাহলে স্মরণ করুন, দুনিয়ার জীবনে ব্যভিচারীরা কী করেছে। কত সন্তান জারজ হয়েছে! কত সম্ভ্রম লুট হয়েছে! কত মর্যাদাহানি ঘটেছে! আপনি কি চান, এরা কোনো হিসাব-নিকাশ আর শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাক? সুদখোরের প্রতি আপনি নমনীয় হলে স্মরণ করুন, সুদ সমাজের কী নাকাল দশা করেছে! কত হতদরিদ্র মানুষ ঋণের দ্বিগুণ সুদ প্রদান করেছে! ঋণ নিয়ে সুদ আদায় করতে না পারায় কত মানুষের ভিটেমাটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! সুদের বিষাক্ত ছোবলে কত বৈধ খাত বন্ধ হয়ে গেছে! মূলধন-স্বল্পতার কারণে কত যুবকের কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে! আপনি কি চান, এ সকল ব্যক্তি কোনো শাস্তি ছাড়াই মুক্তি পেয়ে যাক?
এই হাদিসে শাস্তি ও ইনসাফের পর রহমতের আলোচনা এসেছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। যেসব শিশুরা শৈশবে মারা গেছে তাদেরকে তিনি দেখাশোনা করছেন। এমনকি মুশরিকদের সন্তানদেরকেও। আল্লাহ তাআলা নিজ রহমতগুণে পিতার শিরকের কারণে সন্তানকে পাকড়াও করেননি। তেমনিভাবে যার কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী পৌঁছেনি তাকেও শাস্তি দেওয়া হবে না।
'কোনো রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি প্রদান কবি না।' [১]
যারা ভালো এবং মন্দ কাজের মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকে তাদের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলার রহমত পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাদিসের বিপরীত দিকের প্রতি লক্ষ করলে বুঝা যায়, যাদেরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তাদের কোনো নেক কাজ নেই। তাদের দুনিয়ার জীবন পুরোটাই ছিল জুলুম আর পাপাচারে ভরপুর।
ষষ্ঠ পাঠ
আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলা শুধু মৃতদের ওপর পাঠ করবার জন্য কুরআন অবতীর্ণ করেননি, বরং জীবিতদের ফায়সালা জন্য অবতীর্ণ করেছেন।
'যাতে তিনি সতর্ক করেন জীবিতকে।' [১]
নিশ্চয় এই কুরআন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কুরআন অনুযায়ী আমল করা ব্যতীত ইসলাম কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আমরা নামাজ পড়ব, রোজা রাখব, হজ করব, জাকাত দেব, কিন্তু এরপর পশ্চিম বা পূর্ব থেকে আমাদের সংবিধান ধার করে আনব, এটা কখনো ইসলাম হতে পারে না।
ভালো লাগুক বা না লাগুক আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী আমাদেরকে জীবনযাপন করতে হবে। অবশ্যই আমাদেরকে আল্লাহর প্রণীত মিরাসের নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, চাই তা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক। যখন তিনি ক্রয়-বিক্রয় হালাল রেখেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা পালন করতে হবে। যখন তিনি বিয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা কার্যকর করতে হবে। যখন তিনি প্রতিবেশীর হক নির্ধারণ করেছেন তখন অবশ্যই আমাদের তা পালন করতে হবে। যেহেতু তিনি নিকটাত্মীয়দের অধিকার নির্ধারণ করেছেন, অবশ্যই আমাদেরকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখতে হবে। কুরআনুল কারিম কবুল করে নেওয়ার অর্থ কখনই এটা নয় যে, তা শুধু তেলাওয়াতই করা হবে। কুরআন কবুল করবার অর্থ হলো তেলাওয়াতের পাশাপাশি এতে বিবৃত বিধি-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করা। যারা বলে, আমরা অবশ্যই নামাজ পড়ব, রোজা রাখব, হজ করব, জাকাত দেব, তবে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুতাবিক, তাহলে এসব লোক এখনও ইসলামকে বুঝতে পারেনি। যে ব্যক্তি ইসলাম-বহির্ভূত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে চায়, সে যেন আল্লাহর উপর মন্দ শরীয়ত প্রণয়নের অপবাদ আরোপ করল। যে ব্যক্তি ইসলাম-বহির্ভূত অন্য কোনো অর্থব্যবস্থা চেয়ে থাকে সে যেন নিজের অজান্তেই বলে যে, নিয়মকানুন তৈরি করার ক্ষেত্রে আল্লাহর চেয়ে মানুষই বেশি জ্ঞান রাখে। নাউজুবিল্লাহ।
সপ্তম পাঠ
মিথ্যা হারাম হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করলেও এটি অবশ্যই মানুষের ব্যক্তিত্বকে কলুষিত করে। জাহেলি যুগের আরবরা অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল লোক ছিল। আবু জেহেলের কথাই ধরুন না! আরবের লোকেরা তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘর ধ্বংস করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন সে বলেছিল, 'তোমরা কি চাচ্ছ যে, আরবের লোকেরা বলুক, আমি মুহাম্মদের মেয়েদের আতঙ্কিত করে তুলেছি?' সে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মেয়ে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে চড় মেরে বলে, 'তোমরা এটা গোপন রাখবে। আরবের লোকেরা যেন তা জানতে না পারে।' আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু'র বিষয়টা দেখুন! তিনি মুশরিক থাকাবস্থায় রোমের বাদশাহ তাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সততা ও বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য দিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কোনো মিথ্যা বলেননি।
কোনো কাজ হারাম হওয়ায় তা পরিত্যাগ করা কিংবা হালাল হওয়ায় তা গ্রহণ করা, ব্যক্তির পূর্ণতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু এর পাশাপাশি যাচাই করলে দেখা যাবে যে, জায়েজ জিনিসের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্ব বৃদ্ধি পায় আর না-জায়েজ কাজের কারণে ব্যক্তিত্ব কলুষিত হয়। একজন ব্যক্তির নিজের প্রতি খারাপ আচরণ করাটাই হলো জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ট্রাজেডি। হাদিসে কত চমৎকার বলা হয়েছে- 'সত্য বলতে থাকলে এবং সত্যের উপর অটল থাকলে একসময় সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সিদ্দিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে যায়।' [১]
অষ্টম পাঠ
মানুষের সম্মানহানি করবেন না। যার শক্তি নেই আল্লাহ তাআলাই তার শক্তি। যার অস্ত্র নেই আল্লাহ তাআলাই তার অস্ত্র। যে ব্যক্তি কারও মানহানি করবে অচিরেই এমন ব্যক্তি আসবে যে তারও মানহানি করবে। দুনিয়া ঋণ গ্রহণ আর পরিশোধের চক্রে চলছে। অর্থাৎ যেমন কর্ম করবেন তেমন ফলই আপনি পাবেন। তাই কারও মানহানি করার মাধ্যমে আপনি নিজের সম্মানের উপর আঘাত করবেন না। স্মরণ করুন, ক্ষমা করার মাধ্যমেই ইউসুফ আলাইহিস সালাম উপরে উঠতে পেরেছেন। তিনি নিকৃষ্ট কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেই রাজত্ব তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে। নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বহু শিক্ষা রয়েছে।
নবম পাঠ
সবচেয়ে কুৎসিত ব্যক্তি জাহান্নামের দারোগা মালেক ফেরেশতার ব্যাপারে একটু বলি। আল্লাহ তাআলা তাকে সুন্দর করে সৃষ্টি করতে অক্ষম ছিলেন বলে কুৎসিত করে সৃষ্টি করেছেন তা নয়। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিশেষ হেকমত রয়েছে।
মালেক দারোগাকে এই আকৃতিতে সৃষ্টি করার হেকমত হলো এর মাধ্যমে জাহান্নামিদের শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া। কারণ মানুষ যেমনভাবে সুন্দর চেহারা এবং উত্তম গঠনাকৃতির মাধ্যমে আনন্দ লাভ করে থাকে তেমনিভাবে কুৎসিত চেহারার দ্বারা কষ্টবোধ করে থাকে। পিলে চমকে যায়। মালেক ফেরেশতা যেন নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে এই আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাহান্নামের দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তাকে উত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করাটা তার দায়িত্বের উপযোগী নয়। এর বিপরীত দিকে রেজওয়ান হলেন জান্নাতের দায়িত্বশীল ফেরেশতা। তিনি সবচেয়ে সুন্দর। জান্নাতিদের নেয়ামত বৃদ্ধির জন্যই এমনটি করা হয়েছে।
কিন্তু দুনিয়াতে সুন্দর হওয়া এবং কালো হওয়া উভয়টাই আল্লাহ তাআলার দান। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বান্দাদের মধ্যে সৌন্দর্য এবং অসৌন্দর্য বন্টন করে দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য কেবল তিনিই জানেন। তাই আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে আমাদেরকে শিষ্টাচার রক্ষা করে চলতে হবে। কারণ শিল্পে খুঁত আছে বললে প্রকৃতপক্ষে শিল্পীকেই দোষারোপ করা হয়। অথচ আমাদের প্রতিপালক অক্ষমতা এবং ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
আমরা রিজিকের প্রতি তাকিয়ে দেখি যে, তাতে মানুষের স্তরভেদ রয়েছে। কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র। কারও সন্তান-সন্ততি রয়েছে আবার কারও সন্তান-সন্ততি নেই। কারও হায়াত অনেক দীর্ঘ হয়ে থাকে আবার কারও হায়াত অত্যন্ত স্বল্প হয়ে থাকে। কেউ খুশি, কেউ দুঃখী। কেউ আনন্দিত, কেউ চিন্তিত। তেমনিভাবে কেউ সুন্দর, কেউ তুলনামূলক অসুন্দর। তাই কেউ সুন্দর হলে সে যেন শুকরিয়া আদায় করে। আর কেউ কুৎসিত আকৃতির হলে সে যেন সবর করে। দুনিয়া তো কেবল পরীক্ষার জায়গা।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৭০৪৭
[১] সুরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ১০২
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম : ৬
[১] সুরা হজ, আয়াত-ক্রম: ২৭
[২] সুরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৭০
[১] সুরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ১৭২
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৬৮৪
[২] সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস-ক্রম: ১৪৮৮
[১] সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত-ক্রম: ১৫
[১] সুরা ইয়াসিন, আয়াত-ক্রম: ৭০
[১] সুনানে তিরমিজি, হাদিস-ক্রম: ১৯৭১
📄 উট হারিয়ে ফেলা সেই ব্যক্তিটি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দার তাওবার কারণে ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে নিজের পাথেয় নিয়ে উটে আরোহণ করে সফরে বের হয়ে যায়। এক বিজন প্রান্তরে পৌঁছে তার ঘুম চলে আসে। সে তখন উট থেকে নেমে এক গাছের নিচে ঘুমিয়ে যায়। এরই মধ্যে তার উটটি চলে যায়। জাগ্রত হওয়ার পর সে একটি টিলায় চড়ে উট খুঁজতে থাকে। কিন্তু উটের কোনো দেখা পায় না। এরপর আরেক টিলায় যায়। সেখান থেকেও কিছু দেখতে পায় না। এরপর তৃতীয় এক টিলায় যায়। সেখানেও কিছু দেখতে পায় না। এর মধ্যেই পিপাসার্ত হয়ে গেলে সে বলে, আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই ফিরে যাব। মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই ঘুমিয়ে থাকব। মৃত্যুর জন্য সে তার মাথা বাহুর উপর রেখে শুয়ে পড়ে। একসময় জাগ্রত হয়ে দেখতে পায়, তার বাহনটি তার পাশেই উপস্থিত রয়েছে। আর তাতে তার খাবার-পানীয় এবং পাথেয়ও রয়েছে। তখন সে আনন্দের অতিশয্যে বলে ওঠে, “হে আল্লাহ, আপনি আমার বান্দা আমি আপনার রব!” আনন্দের আতিশয্যে সে ভুল করে বসে। এই ব্যক্তিটি তার বাহন এবং পাথেয় পেয়ে যে পরিমাণ আনন্দিত হয়েছে আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দার তাওবার কারণে তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।' [১]
প্রথম পাঠ
যদি সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করে তাতে আল্লাহর ক্ষমতার কোনোই ঘাটতি হবে না। আর যদি সমস্ত সৃষ্টি তার আনুগত্য করে তাতেও তার রাজত্বে কোনো প্রবৃদ্ধি ঘটবে না। বান্দার গুনাহ যেমন আল্লাহর কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারে না, তেমনিভাবে আনুগত্যও তার কোনো উপকার বয়ে আনে না।
কিন্তু তিনি অত্যন্ত দয়ালু। অনেক সময় তার দয়া ও অনুগ্রহের আশায় মানুষ গাফেল হয়ে পড়ে। তার বদান্যতায় বান্দা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। দ্বীনের আলোয় পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের তাওবার জন্য তিনি রাতে আপন হস্ত প্রসারিত করে রাখেন। আর রাতের পাপীরা যাতে তাওবা করতে পারে এজন্য তিনি দিনের বেলা সে হাত প্রসারিত করে রাখেন। যদি কেউ পাহাড়সম অপরাধ নিয়ে আসে তবুও তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। যে ব্যক্তি তার দরজায় কড়া নাড়ে তার জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি তার দিকে হেঁটে হেঁটে আসে তিনি (তার রহমত) তার দিকে দৌড়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতেই তিনি ভালোবাসেন। তিনি দয়াময়। অপরাধ এড়িয়ে যেতেই তিনি পছন্দ করেন।
আপনার গুনাহ যত বড় হোক না কেন তার ক্ষমা তারচেয়েও বড়। আপনার অপরাধ যত বেশিই হোক না কেন তার বদান্যতা এরচেয়েও বেশি। বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত তাওবা থেকে বিরক্ত না হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার বদান্যতা থেকে হাত গুটান না। গুনাহ বেশি হয়ে গেলে শয়তান আপনার সামনে অপরাধসমূহকে সুসজ্জিত করে তুলবে। তখন স্মরণ করুন, আপনি আল্লাহ তাআলার দরবারে এসে তাকে ডাক দিলে তিনি কতটা খুশি হন!
'হে আমার রব, আমি গুনাহ করেছি, আপনি ছাড়া আমার আর কোনো রক্ষাকারী নেই। আপনার বান্দা তো অনেক; কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো রব নেই।' তিনি সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। সামান্য সময়ের তাওবার মাধ্যমে তিনি বহু বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তাই শয়তান যেন তার রহমত থেকে আপনাকে নিরাশ করে না রাখে। আপনার অবস্থা যেমনই হোক, তার দরজায় করাঘাতের ব্যাপারে লজ্জাবোধ করবেন না। তিনি তো আল্লাহ! তিনি পৃথিবীর কোনো রাজা-বাদশাহ নন! যাদের প্রতি আপনি এক যুগ ভালো আচরণ করলেও কোনো একবার মন্দ আচরণ করে ফেললে তারা আপনাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বে না। কিন্তু তিনি তো পরম ক্ষমাশীল। পৃথিবীর রাজা বাদশাহদের চরিত্র দিয়ে আসমানের বাদশাহকে পরিমাপ করবেন না।
বর্ণিত আছে, দুনিয়ার কোনো এক বাদশাহর কিছু হিংস্র কুকুর ছিল। যারা বাদশাহর কাজে গাফলতি করত তাদেরকে সেই কুকুরগুলোর মুখে নিক্ষেপ করা হতো। বাদশাহর এক উজির ছিল। বহু বছর সে তার কাজ করেছে। একবার এই উজির বাদশাহর কোনো এক কাজে ভুল করে ফেলল। বাদশাহ তখন তাকে কুকুরের মুখে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উজির বাদশাহর কাছে এক সপ্তাহ সময় চাইল। বাদশাহ তা প্রদান করলেন। উজির তখন কুকুর দেখাশোনাকারী কর্মচারীকে বলল, 'তুমি বাড়ি ফিরে যাও। তোমার পক্ষ থেকে আমি এক সপ্তাহ কুকুরগুলো দেখাশোনা করব।' উজির কুকুরগুলোকে খানা খাওয়াতে থাকে, এগুলোর যত্ন নিতে থাকে। এভাবে কুকুরগুলো তাকে ভালোবাসতে শুরু করে।
এক সপ্তাহ পর বাদশাহ-উজিরকে কুকুরের মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু কুকুর তাকে খেলো না। বাদশাহ তখন আশ্চর্য হয়ে বলল, 'তুমি কি কুকুরকে জাদু করেছ?' উজির বলল, 'কখনোই নয়; বরং আমি এক সপ্তাহ এগুলোর সেবা-যত্ন করেছি। তাই তারা আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। অথচ এক যুগ ধরে আপনার সেবা করলাম কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে এতটুকু ভালো আচরণ করলেন না!' এটাই পৃথিবীর বাদশাহর চরিত্র। আসমানের বাদশাহর চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ যুগ যুগ ধরে তার অবাধ্যতা করলেও তিনি মুহূর্তেই তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কেউ জীবনভর তার প্রতি দুঃসাহসিকতা দেখালেও চোখের পলকেই তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন। তাই আপনি তার থেকে বিমুখ হবেন না, কারণ তিনি তো আপনার থেকে বিমুখ হন না।
দ্বিতীয় পাঠ
দুনিয়া হলো উপায়-উপকরণের জগত। উপকরণ গ্রহণ করাটা মোটেও তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী নয়। বরং আমাদেরকে তো উপকরণ গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব তাকদিরের ভিত্তিতে ঘটে থাকে। যদি ঈমানি শক্তির কারণে কেউ উপকরণ গ্রহণ করার ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী হতো, তাহলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এ ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী হতেন। কারণ কেউই তার চেয়ে অধিক ঈমানদার ছিল না।
হিজরতের সময় মদিনার পথ প্রদর্শনের জন্য তিনি একজন পথপ্রদর্শক ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, আমি তো নবী, তাই যে অবস্থায় থাকি না কেন অবশ্যই আমি মদিনায় পৌঁছতে পারব। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি বর্ম পরিধান করতেন। তিনি বলেননি যে, আমি তো নবী। যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে রক্ষা করবেন। তিনি যুদ্ধে বের হওয়ার সময় এর সংবাদ গোপন রাখতেন। শত্রুর উপর যেন আকস্মিক হামলা করা যায় এজন্য তিনি ভিন্ন পথ গ্রহণ করতেন। তিনি বলেননি যে, আমি তো নবী, যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, এক বেদুইন তার খোসপাঁচড়াযুক্ত উটের সুস্থতার জন্য আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লাহর কাছে দুআ করছে। তখন তিনি বললেন, 'তুমি কিছু আলকাতরার মাধ্যমে তোমার দুআকে শক্তিশালী করো।' অর্থাৎ তুমি উপকরণ গ্রহণ করো। চিকিৎসা অবলম্বন করো। দুআ পরিত্যাগ করো না।
উমর রাদিয়াল্লাহু সিরিয়াতে প্রবেশ করার ইচ্ছে পোষণ করলেন। এমন সময় তার কাছে খবর গেল, সেখানে মহামারি দেখা দিয়েছে। খবর শুনে তিনি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলার তাকদির থেকে কি পালায়ন করতে চাচ্ছেন?' উমর রাদিয়ালহু আনহু তখন বলেন, 'আল্লাহর এক তকদির থেকে অপর তাকদিরের দিকে পলায়ন করছি।'
যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো উপত্যকায় উপনীত হয় যার দুটি উঁচু জায়গা রয়েছে, একটি অনুর্বর অপরটি উর্বর, সে যদি অনুর্বর ভূমিতে পশু চড়ায় তাহলে কি আল্লাহর তাকদিরে সে পশু চড়াল না? আর যদি সে উর্বর ভূমিতে পশু চড়ায় তাহলে কি সে আল্লাহর তাকদিরে পশু চড়াল না?
এরপর আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা কোনো ভূখণ্ডে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কথা শুনবে তখন সেখানে যাবে না। আর যখন এমন ভূখণ্ডে মহামারি ছড়াবে যেখানে তোমরা অবস্থান করছ তাহলে তা থেকে পলায়ন করে বের হয়ে যাবে না। [১]
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় স্বরূপ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি উমরের অন্তরে হক ঢেলে দিয়েছেন।' [২]
আমাদের আলোচ্য হাদিসে উল্লিখিত ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে ভুল করেছে। বাহন ছেড়ে দিয়ে তার এভাবে ঘুমিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি। যদি সে তা বেঁধে ঘুমাত তাহলে ঘুম থেকে উঠে তা পেত। তাই যথাসম্ভব উপকরণ গ্রহণ করুন। কিন্তু উপায়-উপকরণকে বিশ্বাস করে বসে থাকবেন না। তরবারি যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় এনে দিতে পারে না, কিন্তু তরবারি ফেলে দেওয়াটা বোকামি। কাজকর্ম মানুষের রিজিক এনে দিতে পারে না, কিন্তু কাজকর্ম ছেড়ে দেওয়াটা নির্বুদ্ধিতা। ঔষধ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে পারে না, কিন্তু এটি সুস্থ হওয়ার মাধ্যম। আমাদেরকে তা গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহায্যকারী, রিজিকদাতা, সুস্থকারী তো আল্লাহ। কিন্তু এই পৃথিবীটা এক বস্তুজগত। তাই বস্তু ও উপায়-উপকরণ থেকে বিমুখ হওয়া যাবে না।
তৃতীয় পাঠ
তাই বলে শব্দে শব্দে অক্ষরে অক্ষরে মানুষের ভুল ধরে বসে থাকবেন না। লাগামহীন উচ্ছ্বাস বিবেক-বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে। আবার তীব্র শোকও মানুষের বিবেক হরণ করে নেয়। হাদিসে উল্লিখিত ব্যক্তিটি বলে ফেলেছে, 'হে আল্লাহ আপনি আমার বান্দা আমি আপনার রব!' এ বাক্যের প্রকৃত অর্থের প্রতি লক্ষ করলে তো এটা সুস্পষ্ট কুফরি। কিন্তু দয়াময়ের চিত্র দেখুন, তিনি সে ব্যক্তির হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলছেন, 'আনন্দের আতিশয্যে সে ভুল করে ফেলেছে।' তাই ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করে কোনো কথার কারণে কাউকে কাফের আখ্যা দেবেন না। কেননা এটি কুফরি বাক্য হওয়ার ব্যাপারে তার জ্ঞান নাও থাকতে পারে। সে কখনো অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কিংবা আনন্দিত অবস্থায় থাকতে পারে।
আমি আনন্দ ও দুঃখাবস্থায় খারাপ কথা বলার সাফাই গাইছি না, বরং বলতে চাচ্ছি, আমরা তো মানুষ, কখনো কখনো আমাদের অন্তর এবং জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের আকিদার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এরপরও এই ব্যক্তির মানসিক অবস্থাকে তিনি বিবেচনায় নিয়েছেন। তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া দরকার? এ হাদিসে আমাদের জন্য আরেকটি শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো অত্যন্ত আনন্দের সময় কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না। আনন্দের সময় আমরা এমন জিনিসের ওয়াদা করে ফেলি, যার সক্ষমতা আমরা রাখি না। আবার কষ্টের সময় আমরা এমন বিষয়ের হুমকি প্রদান করি, যার ক্ষমতা আমরা রাখি না। আনন্দের উচ্ছ্বাস শেষ হতে দিন। রাগের পারদ নেমে আসতে দিন। এরপর নিজের বিষয়াদির প্রতি নজর ফেলুন। সেসব ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবেন না, খারাপ কাজ যাদেরকে পরিচালিত করে থাকে।
চতুর্থ পাঠ
আমাদেরকে কোনো কথার বক্তা এবং তার বর্ণনাকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কোনো কথায় বিশ্বাসকারী এবং সে কথা উদ্ধৃতিকারীর মধ্যে গোলমাল বাঁধানো যাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কুফরি বাক্য উদ্ধৃত করছেন, যার উপর তিনি কস্মিনকালেও বিশ্বাস রাখেন না। কুরআনুল কারিমেও পূর্ববর্তী জাতির কুফরি-কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কি বলেননি-
'আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান!' [১]
তিনি কি বলেননি-
'আর ইহুদিরা বলে আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে।' [২]
মুসলমানদের ব্যাপারে আমাদের উত্তম ধারণা রাখতে হবে। তাদের কথাগুলোর উত্তম ব্যাখ্যা করব আমরা। এক বুজুর্গ বলেছেন, যদি আমি কোনো ভাইকে পাহাড়ে উঠে এটা বলতে শুনি যে-
'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব।'
তাহলে আমি বলব, সে একটি আয়াত তিলাওয়াত করছে। যদি আমি তার দাড়ি থেকে মদ টপকে পড়তে দেখি তাহলে আমি বলব সম্ভবত তার দাড়িতে মদ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২৭৪৪-২৭৪৭
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৬৯৭৩
[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ২২২৯
[১] সুরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৮১
[২] সুরা মায়িদাহ, আয়াত-ক্রম: ৬৪
📄 আসহাবুল উখদুদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
'তোমাদের পূর্ববর্তী যামানায় এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক জাদুকর। বার্ধ্যক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, “আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন বালককে আপনি আমার কাছে প্রেরণ করুন, যাকে আমি জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেব।” অতঃপর জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য বাদশাহ তার কাছে এক বালককে প্রেরণ করল। বালকের যাত্রাপথে ছিলেন এক ধর্মযাজক। বালক তার কাছে বসল এবং তার কথা শুনল। তার কথা যুবকের পছন্দ হলো। তারপর বালক জাদুকরের কাছে যাত্রাকালে সর্বদাই ধর্মযাজকের কাছে যেত এবং তার কাছে বসত। তারপর সে যখন জাদুকরের কাছে যেত তখন সে তাকে মারধর করত। ফলে জাদুকরের ব্যাপারে সে ধর্মযাজকের কাছে অভিযোগ করল। তখন ধর্মযাজক বললেন, “তোমার যদি জাদুকরের ব্যাপারে ভয় হয় তবে বলবে, আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি তোমার গৃহকর্তার ব্যাপারে আশংকাবোধ করো তবে বলবে, জাদুকর আমাকে বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।” এমনিভাবে চলতে থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ সে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হলো, যা লোকেদের পথ আটকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, "আজই জানতে পারব, জাদুকর উত্তম না ধর্মযাজক।” অতঃপর একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, “হে আল্লাহ! যদি জাদুকরের চাইতে ধর্মযাজক আপনার কাছে পছন্দনীয় হয়, তবে এ পাথরে আঘাতে হিংস্র প্রাণীটি নিঃশেষ করে দিন, যেন লোকজন চলাচল করতে পারে।” অতঃপর সে হিংস্র প্রাণীকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ল এবং সেটাকে মেরে ফেলল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত শুরু করল। এরপর সে ধর্মযাজকের কাছে এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা বলল। ধর্মযাজক বলল, “বেটা! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীঘ্রই তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা গোপন রাখবে।"
এদিকে বালক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোেগ্য দান করতে লাগল এবং লোকদের সমুদয় রোগ-ব্যাধির নিরাময় করতে লাগল। বাদশাহর পরিষদবর্গের এক লোক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লোকটি যুবকের ব্যাপারে শুনতে পেয়ে বহু হাদিয়া ও উপঢৌকন নিয়ে তার কাছে এল এবং বলল, “তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পারো তবে এসব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দেব।” এ কথা শুনে বালক বলল, “আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ তাআলা। তুমি যদি আল্লাহর ওপর ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন।” তারপর সে আল্লাহর ওপর ঈমান আনল। আল্লাহ তাআলা তাকে রোগমুক্ত করে দিলেন। এরপর সে বাদশাহর কাছে এসে অন্যান্য দিনের মতোই বসল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার দৃষ্টিশক্তি কে ফিরিয়ে দিল?” সে বলল, "আমার রব।” এ কথা শুনে বাদশাহ্ তাকে আবার প্রশ্ন করল, "আমি ছাড়া তোমার অন্য কোনো রব আছে?” সে বলল, "আমার ও আপনার সকলের রবই আল্লাহ।” অতঃপর বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে লাগল, অবশেষে সে ঐ বালকের সন্ধান দিয়ে দিল।
বালকটিকে নিয়ে আসা হলো। বাদশাহ তাকে বলল, “প্রিয় বেটা! তোমার জাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকেও নিরাময় করতে পার!” বালক বলল, "আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় করেন আল্লাহ।” এ কথা শুনে বাদশাহ এবার বালকটিকে শাস্তি দিতে লাগল। বালক শাস্তি বরদাশত করতে না পেরে অবশেষে ধর্মযাজকের (দরবেশের) কথা বলে দিল। এরপর ধর্মযাজককে ধরে আনা হলো এবং তাকে বলা হলো তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। তিনি অস্বীকার করলেন। ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে সেটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হলো। এতে তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। অবশেষে ঐ বালকটিকে আনা হলো এবং তাকেও বলা হলো-তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সেও অস্বীকার করল। অতঃপর বাদশাহ তাকে তার কিছু সহচরের হাতে অর্পণ করে বলল, “তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকেসহ পাহাড়ে আরোহণ করো। পর্বত শৃঙ্গে পৌঁছার পর সে যদি তার ধর্ম থেকে ফিরে আসে তাহলে তো ভালো। নতুবা তাকে সেখান থেকে ছুঁড়ে মারবে।” তারপর তারা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকেসহ পর্বতে আরোহণ করল। বালক তখন দুআ করে বলল, “হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষ করো।” তৎক্ষণাৎ তাদেরকেসহ পাহাড় কেঁপে উঠল। ফলে তারা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ল। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এল।
তাকে দেখে বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করল, "তোমার সাথিরা কোথায়?” সে বলল, "আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে হেফাজত করেছেন।” বাদশাহ আবারও তাকে তার কতিপয় সহচরের হাতে সমর্পণ করে বলল, “তোমরা তাকে নিয়ে নৌকায় তুলবে। তারপর মাঝ সমুদ্রে যাবার পর সে যদি তার দ্বীন (ধর্ম) থেকে ফিরে আসে তাহলে তো ভালো, নতুবা তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ো।" তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। এবারও সে দুআ করে বলল, “হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা তুমি আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করো।” তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদেরসহ উল্টে গেল। ফলে তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল। আর বালক হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এল। তাকে দেখে বাদশাহ প্রশ্ন করল, “তোমার সঙ্গীগণ কোথায়?” সে বলল, "আল্লাহ আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন।”
অতঃপর সে বাদশাহকে বলল, "তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না আমার নির্দেশিত পদ্ধতি অবলম্বন করবে।” বাদশাহ বলল, “সে আবার কী?” বালক বলল, “একটি ময়দানে তুমি লোকদেরকে জমায়েত করো। অতঃপর একটি কাষ্ঠের শূলীতে আমাকে উঠিয়ে আমার তিরদানি থেকে একটি তির নিয়ে সেটাকে ধনুকের মধ্যে রাখবে। এরপর 'বালকের প্রভুর নামে' বলে আমার দিকে তির নিক্ষেপ কোরো। এভাবে যদি করো তবেই তুমি আমাকে মারতে পারবে।” তার কথা অনুসারে বাদশাহ লোকদেরকে এক মাঠে জমায়েত করল এবং তাকে একটি কাষ্ঠের শূলীতে চড়াল। অতঃপর তার তিরদানি থেকে একটি তির নিয়ে সেটাকে ধনুকের মধ্যে রেখে 'বালকের প্রভুর নামে' বলে তার দিকে তা নিক্ষেপ করল। তির তার কানের নিম্নাংশে গিয়ে বিধল। অতঃপর সে তিরবিদ্ধ স্থানে নিজের হাত রাখল এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ ত্যাগ করল। এ দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন বলে উঠল, “আমরা এ বালকের রবের ওপর ঈমান আনলাম।” এ সংবাদ বাদশাহকে জানানো হলো এবং তাকে বলা হলো, “লক্ষ করেছেন কি? আপনি যে পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা করছিলেন, আল্লাহর শপথ! সে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সকল মানুষই বালকের রবের উপর ঈমান এনেছে। এ দেখে বাদশাহ্ সকল রাস্তার মাথায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হলো এবং ওগুলোতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হলো। অতঃপর বাদশাহ আদেশ করল, “যে লোক তার ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে ওগুলোতে নিক্ষেপ করা হবে।” কিংবা সে বলল, "তাকে বলবে, যেন সে অগ্নিতে প্রবেশ করে।” লোকেরা তাই করল। পরিশেষে এক নারী একটি শিশু নিয়ে অগ্নিগহ্বরে পতিত হবার ব্যাপারে ইতস্তত করছিল। এ দেখে দুধের শিশু তাকে (মাকে) বলল, “ওহে আম্মাজান! সবর করুন, আপনি তো সত্য দ্বীনের (ধর্মের) উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন।” [১]
প্রথম পাঠ
দুনিয়া বড় আজব। কল্পনাতীত জায়গায়ও গোমরাহি তির হয়। কুফরির কারণে মহাপ্লাবন নবীপুত্রকে ডুবিয়ে দিয়েছে। কুফরির কারণে নবীর স্ত্রীর ওপর সম্প্রদায়ের অনুরূপ আজাব নেমে এসেছে। নবীর পিতা মূর্তি পুজায় লিপ্ত! তিনি স্বচক্ষে দেখছেন তার ছেলেকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আবার যেখান থেকে হেদায়েতের আশা করা যায়নি সেখান থেকেও হেদায়েতের আলো ফুটে উঠেছে। আযরের ঔরস থেকেই ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বের হয়েছেন! ফিরআউনের প্রাসাদ থেকে মুসা আলাইহিস সালাম বের হয়েছেন! যে ফিরআউন বলেছিল— 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব।' তার ঘর থেকে ইতিহাসের এক বিদূষী নারী আসিয়া বের হয়েছেন! মহান পবিত্র সত্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের কারণে তাকে শূলীতে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যে বালককে বাদশাহ জাদুকর বানাতে চেয়েছিল সে দায়ী হয়ে যায়। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ মানুষকে গোমরাহ করতে চেয়েছিল সে-ই মানুষের হেদায়েতের মাধ্যম হয়ে ওঠে। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ রাজত্ব মজবুত করতে চেয়েছিল সে-ই তার রাজত্ব নড়বড়ে করে দেয়। যে শিশুর মাধ্যমে বাদশাহ নিজের শক্তি জাহির করতে চেয়েছিল সে-ই তার দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। কোনো ঘরই একেবারে নিখুঁত হিসাবে চলে না। ঘরে কেবল মানুষ বসবাস করে কিন্তু তাদের অন্তরগুলো তো আল্লাহর হাতে। যেখানে আমরা ধারণা করি যে, হেদায়াত ছাড়া কিছুই নেই সেখানে তিনি গোমরাহ করতে পারেন আর যেখানে আমরা ধারণা করি যে, গোমরাহি ব্যতীত কিছু নেই সেখান থেকে তিনি হেদায়েত দিতে পারেন।
দ্বিতীয় পাঠ
আপনিও চান আমিও চাই, কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই বাস্তবায়িত হয়।
কে ভেবেছিল-এই বালক বাদশাহর রাজত্বকে নড়বড়ে করে দেবে! কে ভেবেছিল-মদপ্রেমী হামযাহ একসময় আল্লাহর সিংহ হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-যিনি উহুদে মুসলমানদের সাময়িক পরাজযয়ের কারণ ছিলেন অচিরেই সেই তিনিই সাইফুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-মক্কা বিজয়ের দিন যাঁর রক্ত হালাল ঘোষণা করা হয়েছিল সেই ইকরামা অচিরেই ইয়ারমুকের নেতা এবং শহিদ হয়ে যাবেন! কে ভেবেছিল-শত মানুষের হন্তারককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য আল্লাহ তাআলা ভূখণ্ডকে সংকুচিত করে দেবেন! কে ভেবেছিল-যেই উমর খেজুরের মাধ্যমে উপাস্য বানিয়ে তার ইবাদত করতেন এবং তা আবার খেয়ে ফেলতেন তিনিই একসময় ইতিহাসের অন্যতম ন্যায়-পরায়ণ শাসক হয়ে যাবেন! আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তো ইতিহাসের চেয়েও বড় ব্যক্তি ছিলেন, তার সঙ্গে কাউকে তুলনা দেওয়া যায় না। কে ভেবেছিল—যে ব্যক্তি হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যা করেছে অচিরেই সে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবকে হত্যা করবে!
তৃতীয় পাঠ
আল্লাহ তাআলা কোনো যুদ্ধ সংঘটিত করতে চাইলে তার জন্য এমন অস্ত্র নির্বাচন করেন, আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। একটি ছোট্ট বালক তখন একটি রাজত্ব ধ্বংস করে ফেলে! সাধারণ পানি পুরো জাতিকে ডুবিয়ে দেয়! সমুদ্র ধ্বংস করে ফেলে আস্ত এক বাহিনীকে! সামান্য এক মশা নমরুদকে অপদস্থ করে ফেলে! ভূপৃষ্ঠ কারুনকে গিলে ফেলে! বৃষ্টি পরাক্রমশালী সম্প্রদায়কে পরাভূত করে দেয়! বাতাস জালেমদেরকে টেনে নিয়ে যায়! ছোট্ট এক পাখি আবরাহাকে পিষে মারে! আর এতসব কিছু করতে আল্লাহ তাআলার একটি শব্দের বেশি কিছু খরচ হয় না। তিনি শুধু বলেন, 'হও!', হয়ে যায়।
বিশ্বাস রাখুন, যিনি রাজত্বকে ধ্বংস করে দিলেন, তিনি আপনার দুঃখ দূর করে দিতে সক্ষম। যিনি আস্ত এক বাহিনীকে তছনছ করে দিতে পারেন তিনি আপনার নিরাশা দূর করে দিতে সক্ষম। যিনি অহংকারী সম্প্রদায় এবং হস্তিবাহিনীকে পরাজিত করে দিলেন তিনি আপনার কষ্ট দূর করতে সক্ষম। শুধু তাকে দেখাতে হবে যে, আপনি তার জন্য, তাহলে তিনিও আপনাকে দেখাবেন যে, তিনি আপনার জন্য।
চতুর্থ পাঠ
ঈমানের বিষয়টি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। কেউ গোটা জীবন কুফরি এবং গোমরাহির মধ্যে কাটিয়ে দেয়, আর পরমুহূর্তেই ঈমান তার সবকিছু মুছে ফেলে। তার অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, সে যেন কুফর কী জিনিস জানেই না! মানুষেরা যুগের পর যুগ ধরে বাদশাহর পূজা করত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা বাদশাহ ছাড়া রব বলে আর কাউকে জানত না। কিন্তু শুধুমাত্র একটি বালকের মৃত্যুতে তারা কুফর থেকে ঈমানের পথে চলে আসে। তাদের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়, আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হয়, জ্বলন্ত আগুনে তাদেরকে নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু কোনো জিনিসই তাদেরকে ঈমান থেকে টলাতে পারেনি। যেন তাদের জন্মই হয়েছে ঈমানের ওপর এবং ঈমান নিয়ে তারা জীবনযাপন করেছে।
বাদশাহর এই অন্ধ সভাসদ ছিল তারই এক অনুচর। মানুষকে বাদশাহর ইবাদত করার জন্য এবং তাদের কাছে কুফরকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য সে গোটা জীবন ব্যয় করেছে। তারপর ঈমান আনায় তার মাথায় করাত ধরা হয়েছে, সত্য ধর্ম পরিত্যাগ না করায় তাকে দুটুকরো করে ফেলা হয়েছে। ফিরআউনের জাদুকরদেরকে মিশরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পূর্বপরিচিতির সূত্র ধরে আনা হয়। তাদের অনেকেই ফিরআউনের সেবক ও সভাসদ ছিল। ফিরআউনের আঙুলের ইশারায় তারা যে-কোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু যখন তাদের মধ্যে ঈমানের নুর এল, তারা সকলেই মুসা আলাইহিস সালাম এবং হারুন আলাইহিস সালাম-এর রবের উপর ঈমান আনল। তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। ফিরআউন আড়াআড়িভাবে তাদের হাত-পাঁ কেটে দেওয়ার এবং শূলীতে চড়ানোর হুমকি দেয়। তারা কি তখন মাথা নত করে দিয়েছিল? এক মুহূর্তের ঈমান তাদেরকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
তারা ফিরআউনকে বলেছিল- 'তুমি যা ইচ্ছা করতে পার। যা করবার পার্থিব এই জীবনেই তো তুমি করবে।' [১]
সকালে তারা জাদুকর ছিল আর সন্ধ্যায় তারা খেজুরগাছের উপর ঝুলন্ত অবস্থায় শহিদ হয়ে যায়। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কথাই ধরুন না! মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ তার ব্যাপারে কবুল হয়ে যায়। নবীজি দুআ করেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আবু জেহেল ও উমর ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে যে আপনার কাছে প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।' [১]
ঈমান আনার পর তিনি (হুদায়বিয়ার সন্ধির পর) গর্জে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি হকের ওপর নই আর তারা কি বাতিলের উপর নয়?' [২] রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলেছিলেন, 'অবশ্যই।' তখন তিনি বলেছিলেন, 'তাহলে কেন আমরা আমাদের ধর্মের এই অপমান মেনে নেব?' এভাবেই এক মুহূর্তে তিনি কুফরের শীর্ষ চূড়া থেকে ঈমানের শীর্ষ চূড়ায় উঠে আসেন। এই ঈমান অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। এটা মানুষের মনে কী না করতে পারে!
পঞ্চম পাঠ
ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আউলিয়াদের কারামত সত্য। কেবল গোঁড়ামি বশতই তা অস্বীকার করা যেতে পারে। দ্বীন যদিও আমাদেরকে এই কথা বলে যে, গোটা বিশ্বজগত আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু এর বিপরীতে এটি একটি বাস্তবভিত্তিক ধর্ম। যা আমাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী উপকরণ গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তাই কোনো বিষয় হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে আমরা সেই কারামতকে সত্য বলে বিশ্বাস করব। আর তা শুধু জনশ্রুতি হলে মানুষের কাছে বর্ণনা করব না। অন্যথায় মানুষকে বোকামির পথে চালিত করা হবে।
সহিহ হাদিসের মাধ্যমে বহু আউলিয়া কেরামের কারামত সংঘটিত হওয়ার কথা জানা যায়। পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে কারামাত স্বভাববিরুদ্ধ এক বিষয়; আল্লাহ তাআলা যা নেককার বান্দাদের মাধ্যমে সংঘটিত করে থাকেন। কারামত শুধু আউলিয়া কেরামের সঙ্গে ঘটে থাকে আর মুজিযা শুধুমাত্র নবীদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ছোট বালকের হাতে সংঘটিত এ ঘটনাটি কারামাত; ঈসা আলাইহিস সালাম-এর মুজিযার সঙ্গে যার সাদৃশ্য রয়েছে। বালকটি কুষ্ঠ এবং অন্ধ ব্যক্তিকে সুস্থ করে দিত। আল্লাহ তাআলার হুকুমে বহু রোগের চিকিৎসা করত।
মিশরের নীল নদের ব্যাপারে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কারামত রয়েছে। ইতিহাসবিদগণ তা বর্ণনা করেছেন। মিশর বিজয়ের হওয়ার পর সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বলল, 'আমির! আমাদের এই নীল নদের এক রীতি রয়েছে, সেই রীতি পালন ব্যতীত তা প্রবাহিত হয় না।' তিনি বললেন, 'সেটা আবার কী?' তারা বলল, 'এই মাসের তেরো তারিখ হলে আমরা এক কুমারী মেয়ের পিতাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সন্তুষ্ট করে মেয়েকে সবচেয়ে সুন্দর পোশাক এবং অলংকার পরিধান করিয়ে নীল নদে ফেলে দেবো।' আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নাই। ইসলাম জাহেলি যুগের এসব বিষয়কে ধ্বংস করে দেয়।' কিন্তু তারা তিন মাস অপেক্ষা করল। নীলনদ আর প্রবাহিত হলো না। তখন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু নীল নদ এবং মিশরবাসীদের অবস্থা জানিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে চিঠি লিখেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে লিখে পাঠান, 'নিশ্চয়ই তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। ইসলাম পূর্ববর্তী সকল কুসংস্কার বাতিল ঘোষণা করেছে। আমি এই চিঠির মধ্যে তোমার কাছে একটি চিরকুট পাঠালাম, তুমি সেটি নীল নদে রাখবে।'
আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন নীল নদের প্রতি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র চিঠি খুললেন, তিনি দেখতে পেলেন তাতে লেখা রয়েছে-
আল্লাহর বান্দা উমর ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে মিসরের নীল নদের প্রতি পর সমাচার এই যে, যদি তুমি তোমার নির্দেশে প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে তোমার কাছে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি তুমি আল্লাহর হুকুমে প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে আমরা তোমাকে প্রবাহিতকারী সত্তার কাছে নিবেদন করছি, তিনি যেন তোমাকে প্রবাহিত করে দেন।
আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু চিঠিটি নীল নদে নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ তাআলা সঙ্গে সঙ্গে দরিয়ায়ে নীলকে প্রবাহিত করে দেন। এমনকি সে রাতেই পুরো নদী পানিতে ভরে ওঠে। তখন থেকে নিয়ে আজ অবধি মিশরের নীল নদ আর কখনোই শুকায়নি। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র আরেকটি কারামত হলো-মদিনায় একবার ভূমিকম্প দেখা দেয়, উমর তখন ভূপৃষ্ঠকে লাঠি দ্বারা আঘাত করে বলেন-'হে জমিন! থেমে যাও! আমি কি তোমার উপর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করিনি?' সঙ্গে সঙ্গে ভূকম্পন থেমে যায়।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র আরও একটি কারামত হলো- এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বলল, 'আমার হাতে এক জখম হয়েছে, উমর জীবিত থাকাবস্থায় আমি তার কাছে একই জখম নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমার হাতে তার হাত রেখে সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত করেন, এতে আমি সুস্থ হয়ে যাই।' ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন তার হাতে আপন হাত রাখেন এবং সুরা ফাতিহা তেলাওয়াত করেন। কিন্তু সে সুস্থতা লাভ করল না। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এবার বললেন, 'ফাতিহা তো সেই ফাতেহাই রয়েছে কিন্তু উমরের হাত কোথায়!'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু'রও কারামত রয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র সময় একবার অনাবৃষ্টির ফলে শষ্যভূমি অনুর্বর হয়ে যায়। উমর তখন জনগণকে নিয়ে সালাতুল ইসতিসকার জন্য বের হন। সঙ্গে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-ও ছিলেন। তিনি তার বাহু আঁকড়ে ধরেন এবং বলেন, 'হে আল্লাহ আমরা আপনার নবীর চাচার মাধ্যমে আপনার নৈকট্য কামনা করছি। কেননা আপনি বলেছেন আর আপনার কথাই সত্য-
প্রাচীরের ব্যাপার—সেটি ছিল নগরের দুজন পিতহীন বালকের। এর নিচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। [১]
'তাদের পিতা সৎ হওয়ার কারণে তাদেরকে রক্ষা করা হয়েছিল। অতএব, হে আল্লাহ, আপনি নবীর মাধ্যমে তার চাচাকে রক্ষা করুন। তিনি আমাদেরকে আপনার কাছে সুপারিশকারী এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারী হিসেবে নিয়ে এসেছেন।'
এরপর তিনি লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন- 'আর হে আমার কওম! তোমাদের রবের কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তারই দিকে মনোনিবেশ করো; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা প্রেরণ করবেন।' [১]
এরপর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দুআ করতে থাকেন আর তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। একসময় মেঘ তৈরি হয়। তা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। এমনকি বৃষ্টির পানি হাঁটু পর্যন্ত উঠে যায়। মানুষ তখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে তার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে বলতে লাগল, 'হে হারামাইনের পানি সিঞ্চনকারী! আপনার জন্য মুবারকবাদি।' তখন বৃষ্টি থামে। এ ধরনের আরও বহু ঘটনা রয়েছে।
ষষ্ঠ পাঠ
জাহান্নামকে কামনা বাসনা দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে আর জান্নাতকে কষ্টদায়ক জিনিস দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে। [২]
জান্নাতের রাস্তা অত্যন্ত কঠিন তবে আল্লাহ তাআলা যাকে চান তার জন্য তা সহজ করে দেন। বিশ্বজগতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো, এই ধর্মের অনুসারীরা কিছুটা কষ্ট এবং শাস্তি ভোগ করবে। এর কারণ তাদেরকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার অক্ষমতা নয়; বরং আল্লাহ তাআলা জালেমকে একটু ছাড় দিতে চান এবং মুমিনকে উঁচু করতে চান।
নবুওয়াত লাভের পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম-কে ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের কাছে নিয়ে যান তখন ওয়ারাকা নবীজি বলেন, 'হায়! যখন তোমার সম্প্রদায় তোমাকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম, অবশ্যই আমি তোমাকে সবরকমের সহযোগিতা করতাম।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে!' তিনি বলেন, 'তুমি যে জিনিস নিয়ে এসেছ তা নিয়ে যারাই এসেছে তাদের সঙ্গে শত্রুতা করা হয়েছে।'
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম-কে করাত দ্বারা বিদীর্ণ করে ফেলা হয়েছে। এক নবীকে তার সম্প্রদায় পাথর দ্বারা আঘাত করতে করতে রক্ত ঝরিয়ে ফেলেছে। তিনি রক্ত মুছতে মুছতে বলছেন, 'হে আমার রব, আপনি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। তারা তো জানে না।' উপরোল্লিখিত ঘটনায় মুমিনরা যে শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে এ যেন লম্বা এক শেকলের ছোট্ট আংটা। অর্থাৎ শুরু থেকে চলে আসা ধারাবাহিকতা।
এই দ্বীন তো কেবল রক্ত এবং কুরবানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিলাল ইবনে রাবাহের সঙ্গে উমাইয়া ইবনে খালাফ যে আচরণ করেছে উদাহরণ হিসেবে সেটিই যথেষ্ট। বিলাল বলেন, 'আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হাজির হলাম। তখন তিনি নিজ চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবাঘরের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা মুশরিকদের পক্ষ থেকে কঠিন নির্যাতন ভোগ করছিলাম। তাই আমি বললাম, “আপনি কি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন না?” তখন তিনি উঠে বসলেন এবং তার চেহারা লাল হয়ে গেল। বললেন, “তোমাদের পূর্বের ঈমানদারদের মধ্যে কারও কারও শরীরের হাড় পর্যন্ত তামাম গোশত ও শিরা উপশিরাগুলো লোহার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে বের করে ফেলা হতো। কিন্তু এসব নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন থেকে বিমুখ করতে পারত না। তাদের মধ্যে কারও মাথার মাঝখানে করাত রেখে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা হতো। কিন্তু এ নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন। তখন একজন উস্ট্রারোহী সানআ থেকে হাযারামাউত পর্যন্ত একাই সফর করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ভয় করবে না এবং তার মেষপালের উপর নেকড়ের আক্রমণ ছাড়া সে অন্য কিছুর ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা তড়িগড়ি করছ।”
সপ্তম পাঠ
কখনো উস্তাদের তুলনায় ছাত্রের যোগ্যতা বেশি হয়। আমরা যেসব আলেমের কথা জানি তারা অধিকাংশিই এমন উস্তাদের ছাত্র যাঁদেরকে আমরা চিনি না। আপনার ছাত্র আপনার চেয়ে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হলে একে সমস্যা মনে করবেন না। সে যদি আপনার চেয়েও অধিক খ্যাতি লাভ করে তবে এটা আপনার জন্য একটি সাদাকায়ে জারিয়া। উপরোল্লিখিত ঘটনায় ছাত্র তার উস্তাদকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পাহাড়ে ওই ধর্মযাজকের মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বালকটি প্রতিবারই নিজ পায়ে হেঁটে বাদশাহর কাছে ফিরে এসেছে। ধর্মযাজক মৃত্যুভয়ে বালককে তার সন্ধান দিতে নিষেধ করেছিলেন, আর বালকটি নিজেকে হত্যা করার পদ্ধতি নিজেই বাদশাহকে বলে দিয়েছিল! ধর্মযাজক যেহেতু বালককে এই পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছিলেন তাই তিনি অবশ্যই এর সওয়াব পাবেন। মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের চেয়ে বড় না হতে পারব, যতক্ষণ আমরা অন্যের মাধ্যমে হলেও হকের বিজয়ের আশা না করতে পারব কিংবা অন্যের মাধ্যমে হলেও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না চাইব ততক্ষণ পূর্ণতায় পৌঁছুতে পারব না। নিজের সাওয়াবের অংশের ব্যাপারে ভীত হবেন না। এটা এমন এক দ্বীন যে দ্বীনের অনুসারী কাউকে ভালো কাজের সন্ধান দিলে সে ওই কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সওয়াব লাভ করে থাকে।
অষ্টম পাঠ
অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করুন, যদিও তা সামান্য হয়। অন্যের ক্ষুধা নিবারণ করুন, যদিও তা একটুকরো রুটির মাধ্যমে হয়। অন্যের ব্যথা হালকা করুন, যদিও তা সামান্য ঔষধের মূল্যের মাধ্যমে হয়। বিবাদ মিটিয়ে দিন, যদিও তা একটি মিষ্টি-কথার মাধ্যমে হয়। সরল, সহজ, সাধারণ এবং প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি একটু দৃষ্টিপাত আপনাকে দাওয়াত থেকে বিমুখ করে দেবে না; বরং এটাই হলো দাওয়াত। ঘটনায় উল্লিখিত বালকের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বড় কাজ নিতে চেয়েছেন। মানুষকে বাদশাহর ইবাদত-উপাসনা থেকে বের করে আল্লাহ তাআলার উপাসনার দিকে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। এই বিষয়টি তাকে মানুষ থেকে বিমুখ করে রাখেনি; বরং সম্পূর্ণ উল্টো হয়েছে। সে সবসময় অসুস্থ, প্রয়োজনগ্রস্ত ও দুর্বলদের সঙ্গেই ছিল। মানুষ যখন আমাদেরকে ভালোবাসবে তখন তারা আমাদের দাওয়াতকেও ভালোবাসবে। আমরা যদি নিকৃষ্ট নমুনা হই, তাহলে কোন জিনিস তাদেরকে তাদের বর্তমান অবস্থা পরিত্যাগ করে আমাদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করতে উদ্বুদ্ধ করে তুলবে? আচার-আচরণে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হোন। লেনদেনে নরম হোন। কথাবার্তায় সুমিষ্ট হোন। জনৈক ব্যক্তি অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন, আপনার পকেটে কুরআনুল কারিম থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার চরিত্রে যেন একটি হলেও আয়াত ফুটে ওঠে।
টিকাঃ
[১] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ৩০০৫
[১] সুরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম : ৭২
[১] সুনানে তিরমিযি, হাদিস-ক্রম: ৩৬৮১
[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস-ক্রম: ১৭৮৫
[১] সুরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৮২
[১] সুরা হুদ, আয়াত-ক্রম : ৫২
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম : ৬৪৮৭
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩৯৪৩
📄 আলেমকে উপদেশদানকারী নারী
মুয়াত্তা মালেকে এসেছে কাসেম ইবনে মুহাম্মদের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাযি আমাকে সান্ত্বনা জানানোর জন্য আসেন। তিনি বলেন, বনি ইসরাইলে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আলেম, ফকিহ, আবেদ ও মুজতাহিদ ছিলেন। তার এক স্ত্রী ছিল, যার সৌন্দর্যে তিনি আকৃষ্ট ছিলেন। তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একদিন ওই স্ত্রী মারা যায়। এতে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। তিনি তার জন্য আফসোস করতে থাকেন। ঘর বন্ধ করে নির্জনে অবস্থান করতে থাকেন। মানুষজন থেকে আড়ালে চলে যান। কেউ তার কাছে যেতে পারত না। এক নারী তার এ অবস্থার কথা শুনে তার কাছে এল। সে বলল, তার কাছে আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে। আমি সে ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। আর বিষয়টি সরাসরি সাক্ষাৎ ব্যতীত সম্ভব হবে না। লোকের সমাগম কমে গেলে সে ওই আলেমের দরজায় পড়ে রইল। সে বলল, আমার অবশ্যই তাকে প্রয়োজন। এক ব্যক্তি ওই আলেমকে গিয়ে বলল, 'এখানে একজন নারী এসেছে, সে আপনাকে একটি বিষয় জিজ্ঞেস করতে চায়, সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়া নাকি তা সম্ভব না। সবাই চলে গেছে, কিন্তু সে দরজা ছাড়ছে না।' তিনি বললেন, 'তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও।' নারীটি তার কাছে প্রবেশ করে বলল, 'আমি আপনাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে এসেছি।' তিনি বললেন, 'কী?' সে বলল, 'আমি আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি অলংকার ধার নিয়েছিলাম। আমি তা পরিধান করতাম। এরপর তারা আমার কাছে তা ফেরত দেওয়ার সংবাদ পাঠায়। আমি কি তাদেরকে তা ফেরত দিয়ে দেব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই।' নারীটি বলল, 'এই অলংকার তো আমার কাছে কিছু কাল ছিল!' তিনি বললেন, 'তারা যেহেতু কিছু সময়ের জন্য তোমাকে ধার দিয়েছিল তাই তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক।' নারী বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে জিনিস কিছুদিন ব্যবহারের জন্য ধার দিয়েছেন এরপর তা নিয়ে নিয়েছেন, আপনি সে কারণে আফসোস করছেন! অথচ তিনি সে ব্যাপারে আপনার চেয়ে অধিক হকদার!' আল্লাহ তাআলা নারীটির কথার মাধ্যমে ওই আলেমের দৃষ্টি খুলে দেন এবং তাকে উপকৃত করেন। [১]
প্রথম পাঠ
প্রাচীনকালের আরবগণ বলতেন-বিচক্ষণ ব্যক্তিরও ভুল হয়ে থাকে। দানশীল ব্যক্তিরও আবদার থাকে। ভালো মানের ঘোড়াও হোঁচট খায়! এটি আরবদের এক বুদ্ধিদীপ্ত উক্তি। আমরা তো মানুষ। আর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কর্মকাণ্ডের রেলগাড়ি লাইনচ্যুত হতে পারে। যে হাকিম মানুষের সমস্যা সমাধান করেন তিনি নিজেও সমস্যায় নিপতিত হয়ে থাকেন। মুত্তাকি ব্যক্তিরও কখনো গুনাহ হয়ে যায়। দানশীলও কখনো কৃপণতার নিকটবর্তী হয়ে। নম্র ব্যক্তিও কখনো রাগান্বিত হয়। তাই সাময়িক ও সামান্য কোনো ঘটনার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব ও মানবতায় পরিপূর্ণ ইতিহাসকে মুছে ফেলবেন না। ফিকহের একটি মূলনীতি রয়েছে, পানি অনেক বেশি হলে তখন নাপাকি পড়লেও তা বিবেচ্য হয় না। বহু মানুষ এমন রয়েছে যারা দান-দক্ষিণার দিক থেকে সমুদ্রের মতো। কখনো তাদের দ্বারা কলংকজনক কোনো কাজ প্রকাশ পেলে তাদের সুউজ্জ্বল অতীতকে স্মরণ করুন।
বদরি সাহাবি হাতেব ইবনে আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশদের চিঠি লিখেন। এতে তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কা বিজয়ের অভিযানের সংবাদ প্রদান কেরন। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টিকে গোপন রাখতে বলেছিলেন। এরপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ বিষয়ে সংবাদ প্রদান করেন। হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু যে নারী দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে খুঁজে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়ে দেন। হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু চিঠি লেখার কারণ সম্পর্কে বলেন যে, মক্কায় তার পরিবার-পরিজন রয়েছে। তার প্রবল ধারণা হয়েছিল, যদি চিঠি লেখার মাধ্যমে তিনি মক্কার কুরাইশদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন তাহলে তারা তার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মারাত্মক বিশ্বাঘাতকতা! এ কারণেই উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু দয়ালু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি ভুল কাজের কারণে তার অতীতের উজ্জ্বল ইতিহাস ভুলে যেতে পারেন না। তাই তিনি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সম্ভবত বদরবাসীদের প্রতি উঁকি দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা যা খুশি করতে পারো। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।' [১]
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে কিতাবুল্লাহর হাফেজ ছিলেন। কুরআনের উপর তিনি আমল করতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের দিন তিনি মসজিদে রাগান্বিত হয়ে যান। যারা ধারণা করে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার সংকল্প করেন। তিনি মনে করেছিলেন, মুসা আলাইহিস সালাম-এর মতোই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাত করতে সাময়িকের জন্য গেছেন। কিন্তু যখন আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, মৃত্যুই আল্লাহ তাআলার ফায়সালা। কোনো জিনিস একে প্রতিহত করতে পারবে না।
'আর মুহাম্মদ তো একজন রাসুলই! তার পূর্বেও বহু রাসুল অতিবাহিত হয়েছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে?' [১]
পরবর্তী সময়ে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমার মনে হচ্ছিল যেন ইতিপূর্বে আমি এ আয়াত শোনিইনি।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসা বশতঃ সামান্য সময়ের এ ঘটনার মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র খেলাফত-পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী উজ্জ্বল ইতিহাস মুছে ফেলাটা কি ইনসাফ হবে?
দ্বিতীয় পাঠ
নারীদেরকে তুচ্ছ ভাবা থেকে বিরত থাকুন। এমনও ক্ষেত্র রয়েছে যে ক্ষেত্রে একজন নারী এক-হাজার পুরুষের সমান। বহু সমস্যা ও সংকটে একজন নারীর মত হাজার পুরুষের মতের চেয়েও অগ্রগণ্য হয়ে থাকে। নারী তো মানুষ। তার আছে অতি সংবেদনশীল মানসিকতা এবং সুবিশাল হৃদয়। এটা কখনো এই কথার প্রমাণ বহন করে না যে, সে কম বুদ্ধিসম্পন্ন। সংবেদনশীলতা মূলত নারীর প্রশংসা। এটি তার কোনো দোষ নয়। কে বলেছে যে, সংবেদনশীলতা জ্ঞান-বুদ্ধির পরিপন্থী? যদি আমরা এমনটি বলি তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে তার বিপরীত বিষয় বলতে হবে যে, মানুষের কোনো হৃদয় নেই। এই বিষয়টি যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জুলুম তেমনিভাবে নারী ক্ষেত্রেও। আল্লাহ তাআলা অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় নারীকে অধিক সংবেদনশীলতা দান করেছেন। তিনি তাকে শাসনকার্য ও বিচার-আচারের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেছেন। সেটা হলো বিচারক এবং শাসকদের প্রতিপালন। তিনি পুরুষদেরকে অধিক জ্ঞান-বুদ্ধি দেওয়ার কারণ হলো-তাদের জীবনযাপন অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বহু স্থানে তাদেরকে কঠোর ও দয়ামায়াহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সুখময় পরিবার তো সেটি, যে পরিবারের নারীরা পুরুষের বিবেক-বুদ্ধিকে সংবেদনশীলতার মাধ্যমে নরম করে তোলে। আর পুরুষেরা আপন বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে নারীর সংবেদনশীল হৃদয়কে শক্ত করে তোলে।
তৃতীয় পাঠ
নবী-রাসুলগণ ব্যতীত কোনো মানুষ নিষ্পাপ নয়। নিজ নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি ও অন্তর অনুপাতে মানুষের গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পার্থক্য ঘটে থাকে। আমরা তো সাধারণ মানুষ, আমরা ফেরেশতা বা নবী নই। মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসার ক্ষেত্রে আমাদেরকে এ বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মতপথ ও চিন্তা-চেতনা রয়েছে। আমি এমন বিষয় দেখে থাকি যা অন্য কেউ দেখে না। আবার সে যা দেখে আমি তা দেখি না। তাই আমার দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অন্যকে অপারগ ভাবা উচিত। তেমনিভাবে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও আমাকে অপারগ ভাবা উচিত। কারও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে এমনভাবে নেওয়া যাবে না যে, যেন আমরা মানুষের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।
সুফিয়ান ইবনে হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি ইয়াস মুয়াবিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি'র কাছে এক ব্যক্তির দোষের কথা উল্লেখ করলাম। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি কি রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তাহলে কি সিন্ধু হিন্দুস্তান এবং তুর্কে যুদ্ধ করেছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'হিন্দ, সিন্ধু, তুর্ক রোমানরা তোমার থেকে নিরাপদ থাকতে পারে কিন্তু তোমার মুসলিম ভাই তোমার থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে না!'
মানুষ কবে আবার প্রত্যেক বিষয়ে একমত হবে? যদি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এক ধরনের হতো তাহলে আর ফিকহের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ এবং বহুমত তৈরি হতো না! এইসব ইজতিহাদ এবং মতবিরোধে অবশ্যই রহমত রয়েছে। ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি যদি তার উস্তাদ শাফেয়ি রহমতুল্লাহি আলাইহি'র সঙ্গে সকল বিষয়ে সহমত পোষণ করতেন তাহলে তিনি কোনো মাজহাবের ইমাম হয়ে যেতেন না। কিন্তু তিনি নিজে উস্তাদকে সম্মান করার পাশাপাশি তার সঙ্গে মতবিরোধ করতেন। আর সর্বক্ষেত্রেই উস্তাদ-ছাত্রের বিষয়টি বিদ্যমান থাকে না। সমসাময়িকদেরকে বিশেষ ক্ষেত্রে অপারগ মনে করাটা আলিমগণের বৈশিষ্ট্য।
চতুর্থ পাঠ
একটি ঘটনা হাজার ক্লাস থেকে উত্তম। জেনে রাখুন, কুরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশই ঘটনা। এগুলো আনন্দ, ফূর্তি ও উপভোগের জন্য নয়; বরং তা আগ্রহোদ্দীপক পাঠ। আল্লাহ তাআলা যখন আমাদেরকে চারিত্রিক পবিত্রতা শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যখন দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার আদর্শ শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ফিরআউনের জাদুকরদের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন দুআ কবুল হওয়ার বিষয়টি শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, নুহ ও জাকারিয়া আলাইহিমাস সালাম-এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন অপরাধীদের ছলচাতুরির বিবরণ পেশ করতে চেয়েছেন, বনি ইসরাইলের গাভীর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যখন তাঁর নেয়ামত অস্বীকার করার পরিণাম সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, বাগানবাসী দুই ব্যক্তির আলোচনা করেছেন। যখন সৎকাজ শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর কথা আলোচনা করেছেন। যখন আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদেরকে সাহায্য করার বিষয়টি আলোচনা করতে চেয়েছেন, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-কে আগুনে নিক্ষেপ করার বিষয়টি এবং মুসা আলাইহিস সালাম-এর সমুদ্রের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যখন কৃপণতার পরিণাম শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, বাগানবাসীদের কথা আলোচনা করেছেন। যখন তাঁর প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়টি অবগত করাতে চেয়েছেন, সামুদ, আদ ও লুত সম্প্রদায়ের কথা আলোচনা করেছেন। যখন হেকমত শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, লুকমান আলাইহিস সালামের কথা আলোচনা করেছেন। যখন কৃপণতা এবং অহংকারের পরিণাম জানাতে চেয়েছেন, কারুনের কথা আলোচনা করেছেন। যখন ভাই ভাইকে ভালোবাসার শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম-এর কথা আলোচনা করেছেন। যখন এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, নিকটাত্মীয়রাও বিদ্বেষী হয়ে যেতে পারে, তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কথা আলোচনা করেছেন। যখন হারাম মনোবাসনার কুফল জানাতে চেয়েছেন, জুলাইখার কথা আলোচনা করেছেন। যখন মৃতকে জীবিত করার ব্যাপারে তার কুদরত সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, উযাইরের গাধা এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পাখি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যখন দুশমনের মোকাবেলায় তার সেনাবাহিনী নির্বাচনের বিষয়টি জানাতে চেয়েছেন, নুহ আলাইহিস সালাম-এর প্লাবন এবং আবরাহার হস্তিবাহিনী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যখন দ্বীনের ব্যাপারে সন্তানের অবাধ্যতা সম্পর্কে জানাতে চেয়েছেন, নুহ আলাইহিস সালাম-এর পুত্রের আলোচনা করেছেন। যখন হিংসা সম্পর্কে অবগত করতে চেয়েছেন, হাবিল-কাবিলের কথা আলোচনা করেছেন। আর যখন তিনি আমাদেরকে অবাধ্য ও বোকাদের সম্পর্কে অবগত করতে চেয়েছেন, ফিরআউন ও নমরুদের কথা আলোচনা করেছেন। মানব-মনে ঘটনা অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এটি ছোটদের পূর্বে বড়দের জন্য শিক্ষা, উপদেশ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। তাই ঘটনার ব্যাপারে বিমুখ হবেন না। একটি ঘটনা হাজারটা উপদেশের সমান হতে পারে।
পঞ্চম পাঠ
পূর্ববর্তীদের ঘটনায় অবশ্যই সান্ত্বনার উপাদান রয়েছে। যার সন্তান তার অবাধ্যতা করে থাকে সে যেন নুহ আলাইহিস সালাম-এর ঘটনার মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করে। হে বালক! পিতার পাপাচারের কারণে তুমি পরীক্ষায় নিপতিত? তুমি ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারো। হে স্বামী আপনি কি পাপাচারী স্ত্রীর মাধ্যমে পরীক্ষার নিপতিত? আপনি লুত আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। হে স্ত্রী! আপনি কি পাপাচারী স্বামীর মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত? আপনি ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনি কি রোগব্যাধির মাধ্যমে পরীক্ষায় নিপতিত? তাহলে আপনি আইয়ুব আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনার কি সন্তান হারিয়ে গেছে? তাহলে আপনি ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনি কি ভাইদের মাধ্যমে জুলুমের শিকার হচ্ছেন? তাহলে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন। আপনার চাচা কি আপনাকে কষ্ট দেয়? তাহলে আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করতে পারেন।
আপনার দৃষ্টিতে যদি এই সকল ব্যক্তি সান্ত্বনা লাভের মাধ্যম না হয়, তাহলে জেনে রাখুন, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো পৃথিবীতে আর কোনো জিনিস নেই। আল্লাহ তাআলার তাকদিরের ওপর রাগ-অভিমান কখনো আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। বরং তা গুনাহ এবং আজাব নিয়ে আসবে। আবার তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্টি কখনো আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার নাও করতে পারে। কিন্তু এতে আপনার দ্বিগুণ সওয়াব অর্জনের পাশাপাশি আপনার মর্যাদার বৃদ্ধি ঘটবে।
টিকাঃ
[১] মুয়াত্তা মালেক, হাদিস-ক্রম: ৮১১
[১] সহিহ বুখারি, হাদিস-ক্রম: ৩০০৭
[১] সুরা আলে ইমরান, ৩: ১৪৪