📄 আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা : লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
দেখতে দেখতে আমরা সিরিজের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এলাম। আমাদের এবারের আলোচ্য বিষয় নারীর শিক্ষা ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এ পর্বে আমরা বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস আলোচনা করব। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন আমরা নারীর মৌলিক কোনো আলোচনা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে অন্য একটি বিষয়কে আলোচ্য বিষয় বানালাম? উত্তর হলো, আমরা আসলে মৌলিক বিষয় থেকে স্থানান্তরিত হইনি। আমরা এ পর্বে শুধু দেখার চেষ্টা করব, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কি আসলেই নারীর প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম? এই শিক্ষাব্যবস্থা কি তার অস্তিত্বের লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাকে কোনো সাহায্য করে? এই শিক্ষাব্যবস্থা কি তার জন্য উপকারী? এটা কি তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী ও আত্মতৃপ্ত করতে পারে? তবে আজকের আলোচনাটি ব্যাপক পরিসরে-যা নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
প্রথমেই আমরা ওয়াহি অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব। যাতে আমাদের সামনে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। তারপর বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাদেরকে ধারণা দেবো। কারণ আমাদের আসলে জানা উচিত, কে আমাদেরকে এই সজ্জিত ক্লাস রুমে নিয়ে এল, যেখানে আমরা আমাদের জীবনের বারো থেকে চৌদ্দ বছর অতিবাহিত করি। যেটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, তখন আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আমাদের জানা উচিত, ভুয়া ডাক্তার, ধোঁকাবাজ ইঞ্জিনিয়ার, চোর ব্যবসায়ী, ঘুষখোর চাকরিজীবী, নাস্তিক প্রফেসর, ফেমিনিস্ট ডক্টর ইত্যাদি সমাজের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা কী?
সর্বপ্রথম আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে আয়াত অবতীর্ণ করেন তা হলো:
ٱقْرَأْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ 'পড়ুন সেই প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।'১৯৬
হে মানুষ, পড়ো এবং জানো সৃষ্টি ও জীবন সম্পর্কে। তোমার রবের নামে সেগুলোকে অনুধাবন করো। বিশ্বাস রাখো যে, তোমার একজন রব আছেন। যিনি তোমাকে প্রতিপালন করেন। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন একটি রক্তপিণ্ড হতে। তারপর তোমাকে বিভিন্ন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। কলম দিয়ে লিখতে শিখিয়েছেন। তিনি তোমাকে দান করেছেন সুস্থ মানবীয় স্বভাব ও বিবেক। যার মাধ্যমে তুমি বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করতে পারো। আর এটা সেই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, যিনি সকল পূর্ণতার অধিকারী। এমন কোনো মস্তিষ্কের অধিকারী ব্যক্তির সৃষ্টি নয়, যে ঘটনাক্রমে কিছু একটা তৈরি করে ফেলেছে। তাই তিনি মহানুভব রব। যিনি শিখিয়েছেন কলমের মাধ্যমে। শিখিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না। পড়ো, নিজে উপকৃত হতে এবং মানুষকে উপকৃত করতে। তোমার জ্ঞান দিয়ে তুমি তোমার স্রষ্টার পূর্ণতার প্রমাণ পেশ করো এবং তোমাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করো। ইহকাল ও পরকালের সুখ ও সফলতা অর্জন করো।
এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। যা মানুষকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত করে। ফলে সে তার শক্তিকে মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যয় করে। এই দর্শন মানুষকে তাওহিদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ফলে সে একক রবের দিকে ধাবিত হয় এবং নিজেও স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী হয়। এই দর্শনকে বুকে ধারণ করে মুসলিমরা এগিয়ে গেল এবং জ্ঞানের জগতে বিরল সব কীর্তি গড়ে তুলল। আমরা আমাদের ‘রিহলাতুল ইয়াকিন’ সিরিজে মুসলিমদের এমন বহু কীর্তি ও আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছি। মুসলিমদের প্রণীত জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারার কথাও সেখানে উঠে এসেছে।
ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মাঝে রয়েছে বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা। যার প্রক্রিয়া নিম্নরূপ :
প্রথমত, ইসলাম শিক্ষাকে ইবাদতের দৃষ্টিতে দেখেছে—হোক তা ধর্মীয় শিক্ষা বা সাধারণ শিক্ষা। তাই রবের নামে পড়ার এই সংস্কৃতি গোটা মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সংস্কৃতির প্রসার ছিল পরিবারে, সমাজে, মসজিদের ইলমি হালকায় এবং ইসলামি যুগে গড়ে ওঠা মাদরাসায়। এর ফলে তৈরি হতো দ্বিতীয় বিষয়টি। আর তা হলো, সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। প্রত্যেকেই শিক্ষাকে নিজের দায়িত্ব মনে করত। তাকে রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিত না। এই দায়িত্ববোধের কারণে যদি রাষ্ট্রও কোনো বিশৃঙ্খলার শিকার হতো, তবুও ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা সেই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকত। কারণ সমাজব্যবস্থা তখন গড়ে উঠেছিল এই চিন্তার ভিত্তিতে, فكلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته 'তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের সকলকেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। '১৯৭
তাই প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই চেষ্টা করতেন নিজের দায়িত্বভুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে। তাই মা-বাবারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দিত ইবাদত মনে করেই। যার ফলে মুসলিম প্রজন্মের মূল অংশ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকত, যদিও কোনো কোনো অংশ তার শিকার হয় না কেন। তারপর সেই মূল অংশ থেকে নতুনভাবে সঠিক ধারার নতুন প্রজন্ম তৈরি হতো। তৃতীয়ত, শিক্ষার মূল উৎসের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা। ইসলাম বলে, পড়ো তোমার রবের নামে। অর্থাৎ ওয়াহিই হলো সকল জ্ঞানের মূল উৎস। তাই ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মানদণ্ড ও মাপকাঠি সুদৃঢ়। যা কখনোই পরিবর্তিত হবে না। তাই রাষ্ট্র যেদিকেই যাক, শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক থাকবে। জ্ঞানচর্চার ধারা ক্ষমতালোভী ও স্বার্থান্বেষীদের থেকে সুরক্ষিত থাকবে। রাষ্ট্র হয়তো কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করতে চাইবে। কিন্তু মূল উৎস থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। বিপরীতে মানুষ শাসকের ভাল-মন্দ বিচার করবে ওয়াহির ভিত্তিতে। আর শাসক না তাতে কোনো দিন স্পর্শ করতে পারবে, না বদলাতে পারবে। বরং সে নিজেও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে ওয়াহির নির্দেশনাকে অনুসরণ করে। আর যদি সে ওয়াহির বিরোধিতা করে এবং এমন কিছু শেখানোর চেষ্টা করে যা মানুষের উপকারে আসে না, তাহলে তো ইসলাম বলেই দিয়েছে,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ 'সৃষ্টিকর্তার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টির আনুগত্যের কোনো সুযোগ নেই।'১৯৮
বরং শাসক যদি ওয়াহির আওতার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তার হাত ধরে তাকে আবারও ওয়াহির আওতায় ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ, তার ক্ষমতা শর্তহীন নয়। বরং :
(فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ)
'যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তাহলে তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।'১৯৯
চতুর্থত, সম্পদ সমাজের মাঝে ব্যাপ্ত ছিল। তা কোনো বিশেষ শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত ছিল না। কোনো শাসকের কাছেও জমা ছিল না। ফলে পুঁজিবাদী চিন্তা থেকে কেউ শিক্ষাকে করায়ত্ত করতে পারত না। আর ইসলাম তো পুঁজিবাদের স্পষ্ট বিরোধিতা করে। ইসলাম বলে :
(كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ)
'যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের মাঝে পালাক্রমে ঘূর্ণন না করে।'২০০
তাই ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে বিদ্যমান ছিল। ফলে তারা সকলেই ছিল স্বাবলম্বী ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের থেকে অমুখাপেক্ষী। তাই আহলে ইলম ও জ্ঞানচর্চাকারীরা নিজেদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলেন। তারা নিজেরাই স্বাবলম্বী ছিলেন। ফলে রিযিক নিয়ে তাদের কোনো হুমকি ছিল না। তাদেরকে শাসকশ্রেণির কাছ থেকে বেতনের অপেক্ষা করতে হতো না। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাও ছিল না। এই স্বাধীন পরিবেশ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি আওকাফ তথা ওয়াকফকৃত সম্পদের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। বিত্তশালী মানুষেরা তাদের সম্পদের একটি বিশেষ অংশ ওয়াকফ করে দিতেন। যা থেকে উপার্জিত সম্পদ কিছু ব্যক্তিকে রিযিকের চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে নিশ্চিন্তে ইলম অর্জন করার সুযোগ করে দিত। এটা ছিল শাসকশ্রেণির মোকাবেলায় জনগণের বড় একটি শক্তি। যার মাধ্যমে তারা আলিমসমাজকে শাসকশ্রেণির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতেন। ফলে সকল ক্ষেত্রে আলিমরা নির্বিঘ্নে বিচরণ করতেন। এমনকি রাষ্ট্রব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়লেও জ্ঞানচর্চা বন্ধ হতো না। যেমন: আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ উপনিবেশ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে তা ওয়াকফকৃত সম্পত্তি থেকে পরিচালিত হতো। সকল স্তরের মানুষের মাঝে সম্পদের ব্যাপ্তির ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তির পক্ষে শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। বরং শিক্ষার পেছনে ইবাদতের লক্ষ্যটিই সব সময় উপস্থিত ছিল। আর মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতিগতভাবে ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদতকে বাস্তবায়ন করা। পঞ্চমত, শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো ওয়াহির লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপর ভিত্তি করে। কোনো পুঁজিবাদী কোম্পানির স্বার্থ বা বস্তুবাদী সভ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো না। অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের কল্যাণের ভিত্তিতে শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো। তাদের আত্মা, শিষ্টাচার ও চারিত্রিক উন্নতিকেই মানদণ্ড মানা হতো। তাই একজন ফকিহ তার যথাযথ মূল্যায়ন পেতেন। একজন তারবিয়াতকারী মা তার যথাযথ মূল্যায়ন পেতেন। অথচ পুঁজিবাদীদের চোখে এসব মানুষের কোনো মূল্যই নেই। কারণ, তারা পুঁজিবাদের সেবাদাস নয়। এই স্বাধীন পরিবেশই শাসকের উপর সাধারণ মুসলিমদের প্রভাব বজায় রাখত এবং তাদের মধ্য থেকেই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ নির্ধারণ করা হতো। সব সময় একটি স্বাধীন প্রজন্মের অস্তিত্ব পাওয়া যেত। তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করত সমাজের মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য। ফলে তাদের নিকট কোনো কিছু গ্রহণ করা বা বর্জন করার মানদণ্ড ছিল সত্য ও মিথ্যা। কারণ, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারও দাসত্ব করতেন না এবং তারা অর্থনৈতিকভাবেও ছিলেন স্বাবলম্বী। তাহলে মোটকথা, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল পাঁচটি:
১. শিক্ষাকে ইবাদত মনে করা।
২. শিক্ষাকে নিজের মৌলিক দায়িত্ব মনে করা।
৩. শিক্ষার মূল উৎসের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা।
৪. ফলাফল বিবেচিত হতো ওয়াহির উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে।
৫. সমাজের মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য। যার ফলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা শিক্ষা কখনো প্রভাবিত হতো না।
এবার জানার বিষয় হলো, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত থাকাকালীন ইউরোপে কী হচ্ছিল? এটা জানা এ জন্য জরুরি যে, ঠিক সে সময়ে ইউরোপেও একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। তারপর যখন ওয়াহির সাথে আমাদের সম্পর্ক শিথিল হয়ে গেল এবং ইউরোপিয়ানরা আমাদের দেশগুলো দখল করে নিল, তখন তারা আমাদের উল্লেখিত শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হলো। তারা কৌশলে ও শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সরিয়ে সেখানে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে দিলো এবং আমাদের মস্তিষ্ককে তার অনুগামী করে দিলো।
ইউরোপিয়ানরা প্রথম দিকে সামাজিক বৈষম্যের চর্চা করত। তাদের মাঝে তখন দুটি শ্রেণি ছিল। নেতা ও কর্মী। শিক্ষা ছিল তখন শুধু নেতাশ্রেণির অধিকার। কর্মীশ্রেণিকে যদি কোনো শিক্ষা দেয়াও হতো, তা হতো নেতাশ্রেণির সেবা ও দাসত্ব করার সুবিধার্থে। তারপর এল বিপ্লবের যুগ। ইতালিতে যার সূচনা হয়েছিল ১৪০০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। এ সময়ে প্রাচীন শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বিপ্লব সাধিত হলো এবং এমন কিছু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো যেখানে মানুষ বসবাস করত শুধু নাগরিক পরিচয়ে। নেতা বা কর্মী বলতে সেখানে কোনো পরিচয় ছিল না। যার ফলে কিছুদিন মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারল। কিন্তু ধীরে ধীরে আবার নতুন বৈষম্য চলে এল। আর তা হলো পুঁজিবাদের বৈষম্য। যেহেতু দীর্ঘ একটি সময় যাবৎ শিক্ষা শুধু একটি শ্রেণির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল, তাই তাকে সমাজের সকল শ্রেণির মাঝে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই ইউরোপে তৈরি হলো সরকারি বিদ্যালয়। আর এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের বিশ্বাসকে প্রজন্মের মাঝে বদ্ধমূল করা তথা Indoctrination। তাদের লক্ষ্য ছিল, এসব বিদ্যালয়ের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। ফলে রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হবে। কারাখানাগুলো সচল হবে এবং এসবের মাধ্যমে অন্যসব রাষ্ট্রের উপর প্রভাব সৃষ্টি করা ও দখলদারি চালানো সহজ হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি করা হলো কারিগরি বিদ্যালয় তথা Factory model schools। যে স্কুল থেকে দক্ষ কর্মী তৈরি হতো। যাদের কাজ ছিল কারখানায় কাজ করা। এ ধরনের বিদ্যালয় সর্বপ্রথম ১৭১৭ সালে জার্মানির ব্রুশিয়া রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলো। তারপর আঠারো শতকের শেষভাগে প্রথম শিল্পবিপ্লব সাধিত হলো। নারীকে ঘর থেকে বের করে আনা হলো এবং তাদের মাঝে জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ বিতরণ করা হলো, যাতে তারা দীর্ঘক্ষণ কারাখানায় কাজ করতে পারে। এর আগে ১৮০৭ সালেই ব্রুশিয়ার স্কুলগুলোকে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে সরকার নির্ধারিত পাঠক্রম পড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল। জার্মান দার্শনিক জোহান গোটলিব ফিস্তে বলেন, বিদ্যালয় ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে দেবে। এমনভাবে বদলে দেবে যে, আপনি যা চান তার বাইরে সে যেন অন্য কিছু না চায়। এর কারণ ছিল, জার্মানরা ফ্রান্সের সাথে বিবাদে জড়িয়ে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। রাষ্ট্রের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই নাগরিকদের এভাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল কর্তারা। দার্শনিক ফিস্তের মতে জার্মানির পিছিয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, ছাত্রদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকার। কারণ তারা তখন ভালো ও মন্দের মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই তাদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকার দূর করে দিলেই তার সমাধান হয়ে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নিল, যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ছাত্রদেরকে তৈরি হবে তা হলো রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণ। এ জন্যই ছাত্রদেরকে প্রতিদিন সকালে সেনাবাহিনীর মতো সারিবদ্ধ হয়ে বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের পবিত্রতার বাণী গাইতে হবে।
তারপর জার্মানিতে উদ্ভাবিত হলো নতুন ব্যবস্থা। ১৮৩০ সালে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবলের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হলো কিন্ডার গার্টেন স্কুল। এ ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অনুপ্রেরণা ছিল, শৈশবে তার মা মারা গিয়েছিল এবং বাবা আরেকটি বিয়ে করেছিল। ফলে সে মা-বাবা উভয়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিল। এ ধরনের স্কুলের মাধ্যমে তাই সে স্নেহহারা বাচ্চাদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল। ঠিক এই সময়টিতেই ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করেছিল। যা ইতিপূর্বে মুসলিমদের দখলে ছিল। তখন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক টমাস মিকোলি ভারতবর্ষের ব্রিটিশদের নির্ধারিত শাসকের নিকট পত্র লিখল। যার শিরোনাম ছিল, ভারতবর্ষে শিক্ষাব্যবস্থা। সেই পত্রের মাঝে যা লেখা ছিল তার মাঝে এ কথাটিও ছিল, এ সময়ে আমাদেরকে নিজেদের মাঝে ও আমাদের শাসিত লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে। আমাদেরকে ভারতবর্ষে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যারা রক্ত ও বর্ণে যদিও হিন্দুস্থানি হবে; কিন্তু চিন্তাধারা, চরিত্র ও রুচির দিক থেকে তারা হবে ইংরেজ। এমন একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজনে আমাদেরকে রাষ্ট্র কর্তৃক সহায়তা প্রদান করতে হবে। তারপর ব্যাপকাকারে তার প্রসার ঘটাতে হবে। আর এই প্রজন্মটিকে গোটা ভারতবর্ষের মানুষের কাছে শিক্ষিত ও অনুসরণীয় প্রজন্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এই হলো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
এভাবেই তারা সামরিকভাবে কোনো দেশকে দখল করার পূর্বেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাকে দখল করে নিত। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান সরকারি বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে আলোচনার স্বার্থে টমাস মিকোলির সূক্ষ্ম দর্শনটিকে আপনার মস্তিষ্কে টুকে রাখুন। ইউরোপে যখন এসব কিছু চলছিল তার মাঝেই মুসলিম পক্ষ থেকে বহু জ্ঞান ও বিজ্ঞান ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। 'পড়ো তোমার রবের নামে' এ দর্শন থেকে দূরে সরে গেল। তৈরি হলো নতুন দর্শন—পড়ো রাষ্ট্র ও তার শক্তির নামে। প্রকারান্তরে পড়া শুরু হলো মানুষের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও শক্তির নামে। ১৮৪৩ সালে কারিগরি বিদ্যালয়ের চিন্তাটি ব্রশিয়া থেকে পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় স্থানান্তরিত হলো। তারপর ১৮৪২ থেকে ১৯১৭ মধ্যবর্তী সময়ে গোটা আমেরিকায় সরকারি বিদ্যালয় ছড়িয়ে পড়ল। ১৮৯২ সালে আমেরিকায় দশ ব্যক্তির সমন্বয়ে 'কমিটি অব টেন' গঠিত হলো—যাদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। যখন এই দশ ব্যক্তি এই শিক্ষাব্যবস্থাটি প্রণয়ন করল এবং তা মুসলিম বিশ্বে প্রসারিত হয়ে গেল তখন আমাদের উচিত প্রশ্ন করা, এই দশ ব্যক্তি কারা? কী তাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য? কেন আমরা তাদের উপর ভরসা রাখব? তারা যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছিল তার সাথে কি আমরা একমত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে আসুন আমরা এই দশজন ব্যক্তির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি উইলিয়াম টোরি হ্যারিসের জীবন থেকে ঘুরে আসি। যাকে আমেরিকান প্রশাসন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য নির্ধারণ করেছিল। সে একটি আর্টিকেল লিখেছে যার শিরোনাম, 'ইন্ডিয়ান এডুকেশন' তথা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা। এখানে ভারতীয় বলে রেড ইন্ডিয়ানদের বোঝানো হয়েছে। যারা ছিল আমেরিকার আদিবাসী। আসুন আমরা আর্টিকেলটির মূল অংশে চোখ বুলাই। বলে রাখা ভালো যে, আমেরিকার ভূমিতে মূলত বসবাস করত রেড ইন্ডিয়ানরা। ইউরোপিয়ানরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে তাদের মাতৃভূমি দখল করে নিল। এটা ছিল এক নির্মম ইতিহাস, যার ব্যাপারে আমরা অন্য সিরিজে কথা বলেছি। ইউরোপিয়ানদের দ্বারা আমেরিকা দখল হওয়ার পরও সেখানের আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে ইউরোপিয়ানদের একটি দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকল। উপরে আলোচিত আর্টিকেলটিতে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় এনে আমেরিকার নতুন সভ্যতার অনুসারী বানানো যায় তার পন্থা আলোচনা করা হয়েছে। যাতে তারা আমেরিকার নিয়ন্ত্রক তথা বর্তমানে যারা নিজেদেরকে আমেরিকার আসল নাগরিক বলে দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে হুমকি না হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে সমাধানটি পেশ করা হয়েছে তা হলো, বাধ্যতামূলক একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ঘটানো। যার ফলে রেড ইন্ডিয়ানদের সন্তানদেরকে শৈশবেই তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বারো বছরের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষাগ্রহণের জন্য নিয়ে আসা হবে। এ ক্ষেত্রে সময়টিও দীর্ঘ হতে হবে। কারণ, দুই থেকে পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে তাদের মস্তিষ্কে নিজেদের চিন্তার বীজ ভালোভাবে বপন করা সম্ভব হবে না। ফলে তাদের মাঝে শিক্ষার প্রভাব বেশি দিন অব্যাহত থাকবে না এবং তাদেরকে শিল্পবিপ্লবের অংশ বানানোও সম্ভব হবে না। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও দখল নিশ্চিত করার জন্য সামরিক বাহিনীতে অর্থ ব্যয় না করে রেড ইন্ডিয়ানদের শিক্ষার পেছনে কিছু অর্থ ব্যয় করলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে।
এই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবায়নের জন্য রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে হাসিমুখে কথা বলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এভাবেই হাসিমুখে একপ্রকার জোরপূর্বক তাদের সন্তানদেরকে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে সাদা চামড়ার লোকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো চিন্তাধারা তাদের মস্তিষ্কে স্থাপন করছিল, অথচ তাদের পিতা-মাতারা তা বুঝতেও পারছিল না। শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত দশজনের মাঝে একজন হলো উইলিয়াম হ্যারিস। সে শিশুদেরকে সকাল সকাল বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার পদ্ধতিটি চালু করল এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে কাটানোর ব্যবস্থা করল। এর পেছনে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, শিশুদের উদ্যমকে নষ্ট করে দেয়া এবং এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে তাদের মা-বাবাকেও নিয়ন্ত্রণ করা। সর্বোপরি সকলের উপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়া। যদি এই লক্ষ্যগুলো সমাজে খুব স্বাভাবিকভাবে বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। নতুবা সেই চিত্রই তৈরি হবে যা বর্তমান চীনে উইঘুরের মুসলিমদের সাথে ঘটছে। তাদের সন্তানদেরকে পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পরিবার ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। তারপর তাদেরকে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী এমনভাবে প্রতিপালন করা হয় যে, তারা মানবযন্ত্রে পরিণত হয়। উইলিয়াম হ্যারিস শিক্ষাব্যবস্থার নামে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার এই উদ্দেশ্যের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। সে তার শিক্ষার দর্শন বিষয়ক বইটিতে বলেছে, বর্তমান সময়ে যেকোনো জাতির শতকরা ৯৯ জন মানুষ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সীমাবদ্ধ কিছু কাজের মধ্য দিয়েই তারা তাদের জীবনকে অতিবাহিত করতে আগ্রহী। তারা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া নিয়মকানুনগুলো পালন করতেই বেশি পছন্দ করে। আর এটা হঠাৎ করেই হয়নি। বরং শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্ককে খাঁচাবদ্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যদি আমরা পারিভাষিক শিরোনাম দাঁড় করাই, তাহলে তা হবে, 'ব্যক্তিকে সীমাবদ্ধকরণ ও তার বৈশিষ্ট্যহরণ'। তারপর সে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিভিন্ন পন্থার কথা উল্লেখ করেছে।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, হ্যারিস, ফেস্তো এদের দিয়ে আমাদের কী কাজ? তারা তো অতীতের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বর্তমান সময়টা দেখুন। কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব চিন্তার স্বাধীনতায় এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যে বিবর্তন বা চিন্তার স্বাধীনতা হরণের কথা বলছেন তা এক সময় হয়তো ছিল; কিন্তু এখন নেই। তাকে আমরা বলব, আপনি বলতে চাচ্ছেন, এটা এখন নেই? তাহলে সেই বিবর্তন ও ব্রেইনওয়াশের ব্যাপারে আপনি কী বলবেন, বর্তমান বিশ্বের শিক্ষার্থীরা যার শিকার হচ্ছে? ব্রেইনওয়াশের শিকার হওয়ার পর তাদের কাছে এখন ব্যভিচারকে ব্যক্তিস্বাধীনতা মনে হচ্ছে। আর এভাবেই যদি তাদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকারকে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তারপর তাদের ব্রেইনওয়াশ করে সেখানে রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণের নীতি ও মানদণ্ড স্থাপন করে দেয়া হয় আর তার জন্য কোনো সুসাব্যস্ত ও সুপ্রমাণিত উৎস না থাকে, তাহলে দিনের পর দিন তা পরিবর্তনই হতে থাকবে। কখনোই তা সুস্থির হবে না।
এবার এই শিক্ষাব্যবস্থাকে আপনি সঠিক ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তুলনা করুন। যেখানে ওয়াহিই হলো সকল কিছুর উৎস ও শেষ কথা। যে ওয়াহি সময়ের পরিবর্তনে কখনো পরিবর্তন হয় না ও বদলে যায় না। যে ওয়াহির মাঝে সব সময়ই বিদ্যমান থাকে:
( اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ )
'পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।' ২০১
সকলের ক্ষেত্রে এই একই স্লোগান। আর এই শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয় এমন এক স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী সমাজে, যেখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তাধারা বাস্তবায়িত হয় না। শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন চলে না। অথচ ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার কোনো বিদ্যালয়ে একই শ্রেণিকক্ষে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ শিশুরা একসাথে বসার নিয়ম ছিল না। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজপথে বহু আন্দোলন হয়। স্লোগান ওঠে, বর্ণবৈষম্য বন্ধ করো। একটি ঘটনার কারণে আন্দোলনটি শুরু হয়। কৃষ্ণাঙ্গ শিশু রবি ব্রেডজেস যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে তখন অন্য শ্বেতাঙ্গ শিশুদের অভিভাবকরা আপত্তি জানায় এবং তাদের সন্তানদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে নিয়ে আসে। শিশু রবি একাই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে। এবার ভেবে দেখুন, কীভাবে আমরা এদের থেকে কোনো বিবেচনা ছাড়াই শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি? যারা খুব নিকট অতীতেই মানুষের বর্ণ নিয়ে বৈষম্য তৈরি করত। অথচ আমরা সেই জাতি, যাদের স্লোগান হলো :
( إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ)
'তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি। '২০২
এ ব্যাপারে আমিরুল মুমিনিন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
ابو بكر سيدنا و اعتق سیدنا
'আবু বকর আমাদের নেতা। আর তিনি আজাদ করেছেন আমাদের আরেক নেতাকে।'২০৩
অর্থাৎ তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ইথিউপিয়ান দাস বিলাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে আজাদ করেছেন।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, আপনি শুধু এই শিক্ষাব্যবস্থার নেতিবাচক দিকগুলো উল্লেখ করছেন। ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরছেন না। এটা তো পক্ষপাত। তার জবাবে আমরা বলব, এখানে আমাদের লক্ষ্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস তুলে ধরা নয়। বরং আমাদের লক্ষ্য হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, তার সাথে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বৈপরীত্যগুলো তুলে ধরা। এই বৈপরীত্যের কারণে মুসলিমদের সন্তানরা কী কী পরিণতি ভোগ করছে তা আলোচনা করা। আমি একা চাইলেই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারব না। তাই আমি চাই সেখান থেকেই আওয়াজ উঠুক, যারা এই শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। ১৯৮৩ সালে আমেরিকার বহুজাতিক শিক্ষাব্যবস্থা সংরক্ষণ কমিটি আমেরিকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি বার্তা দিয়েছে। যার শিরোনাম, একটি জাতি হুমকির সম্মুখীন। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের অনিবার্যতার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বার্তাটির লেখক জেমস হারফির তাতে লিখেছে, আমাদের সমাজে শিশুদের প্রতিপালনের যে রীতি চলে আসছে, তা একটি রাষ্ট্র ও জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে। যেকোনো সময় কোনো শত্রুপক্ষ বা আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোনো গোষ্ঠী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লাগাম টেনে ধরে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে এবং আমাদের বিরুদ্ধে সহজেই বিজয়ী হয়ে যাবে। কিন্তু এই বার্তাটি প্রদান করার পরও কি শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করা হয়েছে? তার উত্তর এই ঘটনার আট বছর পর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত Dumbing Us Down বইটিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। বইটির লেখক জন টেইলর গেটো দীর্ঘ সময় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছে। তারপর সে এই বইটি লিখেছে। যার নামটি ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, বাধ্যতামূলক চাপিয়ে দেয়া শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিকর ও ভীতিকর দিকসমূহ। এই বইয়ে সে আমেরিকায় প্রচলিত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছে এবং বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ২০০২ সালে বইটির আরেকটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। আমি আপনাদের সামনে সেই বই থেকে কিছু কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই, যাতে আপনারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারেন। গেটো লিখেছে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অধিকাংশ বিষয়বস্তুই এই গ্রহে মানুষের কোনো কাজে আসে না। এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সফল মনোবিজ্ঞানী তৈরি হয়নি। কোনো সফল কবিও এখান থেকে ভাষা শিখে কবি হতে পারেননি। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কোনো রকম উপকৃতই হতে পারেননি।
জন গেটো আরও লিখেছে, বাস্তবতা হলো, বিদ্যালয়গুলো সরকারের আদেশ কীভাবে পালন করবে তার নির্দেশনা ছাড়া আর কিছুই শেখাচ্ছে না। অর্থাৎ সেই ব্রেইনওয়াশ যার কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। সে আরও লিখেছে, শিক্ষাব্যবস্থার কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য রূপরেখা নেই। তাদের বিশেষ কোনো লক্ষ্যও নেই। এক ক্লাসের বেল বাজছে আর শিশুরা বই খুলে বসছে। আরেক ক্লাসের বেল বাজার সাথে সাথে তা বন্ধ করে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াই চলছে স্কুলগুলোতে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, মানুষ আর বানর একই উত্তরাধিকারে জন্ম লাভ করেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী এক ক্লাসে জানছে, পশুদের সাথে মানুষের জিনগত কোনো মিল নেই। আরেক ক্লাসে এসে জানছে, সে এই পশুদের ভাই। এখান থেকে সে কোনো কিছুই নিজের জীবনের জন্য গ্রহণ করতে পারছে না। কোনো কিছুর প্রতিই সে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছে না। ফলে সে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে ও নিজেকে প্রতারিত অনুভব করছে। এই দ্বিধাগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থাই এখন ব্যাপকভাবে সারা বিশ্বে চলছে। বিশেষত কিছু কিছু সিলেবাস শিক্ষার্থীকে ধর্ম সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত করে দিচ্ছে এবং পরক্ষণেই রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার বীজ বপন করে যাচ্ছে। যা জীবনের বাস্তবতায় এসে শিক্ষার্থীদের পেরেশান করে তুলছে। অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত তাদের মস্তিষ্কে ঠেসে দেয়া হচ্ছে। জন গেটো আরও বলেছে, অল্পবিস্তর সংস্কার দ্বারা এই শিক্ষাব্যবস্থা সঠিক হবে না। এ জন্য আমাদেরকে আগে বিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং পরিবারের সাথে এর যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। তার মতে, একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে উপযুক্ত হতে হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষার্থীকে দুটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম হতে হবে। আর তা হলো, কীভাবে সে জীবনযাপন করবে এবং কীভাবে সে জীবনের সমাপ্তি টানবে? যার কোনোটা সম্পর্কেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কোনো ধারণা দিতে সক্ষম নয়। বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছুকে বস্তুগত দৃষ্টিতে বিবেচনা করছে। অথচ তার এই দৃষ্টিকোণ পুরোপুরি ধারণ করার সক্ষমতা নিয়েও বস্তুবাদীরা প্রশ্ন তুলে বসে আছে।
২০০৬ সালে রাষ্ট্র বিষয়ক পরামর্শক রবিনসন—যিনি শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের কারণে 'ফারেস (Knight)' উপাধি পেয়েছেন—একটি পর্যালোচনা পেশ করেছেন, যা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তার পর্যালোচনাটির ভিডিও এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬ মিলিয়ন মানুষ দেখেছে। তার পর্যালোচনাটির শিরোনাম হলো, Do schools kill creativity? (বিদ্যালয় কি সৃজনশীলতা নষ্ট করে দিচ্ছে?)। এখানে তিনি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ভুল হওয়ার ভয় তৈরি করে। যা তাদেরকে অগ্রসর হওয়া ও কোনো কিছু উদ্ভাবন করার ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি করে। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনা করে না। ফলে সে বসে থাকতে ও স্থবির থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই নিজের যোগ্যতাকে সে কখনো আবিষ্কার করতে পারে না। বরং তাকে দাফন করে দেয়। রবিনসন বলেন, শিক্ষা হলো পরিশোধন সরঞ্জামের মতো। যা মানুষের বিবেক থেকে ভুল ও অনর্থক বিষয়গুলোকে দূর করে দেয়। এর বাইরে যা কিছু শেখানো হয়, তা শিক্ষার্থীকে অসুস্থ করে তোলে। অথচ সে তার নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে জানতেও পারে না।
ডক্টর জর্জলান একটি ভিডিও তৈরি করেছেন। যার শিরোনাম 'পাশ করার ব্যর্থতা'। সেখানে তিনি বলেছেন, আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক সংস্থা নাসা তাকে ও তার বন্ধু বেস জারম্যানকে নাসায় চাকরিরত ব্যক্তিদের সৃজনশীলতা যাচাই করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করার অনুরোধ করে। তারা সেই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে নাসাকে পেশ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, শিশুদের সৃজনশীলতা নিয়ে তারা একটি গবেষণা- প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে। সেই প্রতিবেদনে তারা লেখেন, বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে প্রতিদিনই শিশুরা তাদের সৃজনশীলতাকে হত্যা করছে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে তাদের মাঝে যে সৃজনশীলতা বিদ্যমান ছিল বিদ্যালয়ে গিয়ে তারা সেটুকুও হারাচ্ছে। ২০১৩ সালে রবিনসন আরও একটি পর্যালোচনামূলক ভিডিও প্রস্তুত করেন। যার শিরোনাম, 'কীভাবে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মৃত্যু-উপত্যকাটুকু অতিক্রম করব?'
কেউ হয়তো বলতে পারেন, কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থার উপর যোগ্যতা হত্যার অভিযোগ তোলা হয়? অথচ আমরা দেখছি, এর মাধ্যমেই দিনদিন দ্রুতগতিতে বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে। তার উদ্দেশে আমরা বলব, আল্লাহ মানুষকে যেসব যোগ্যতা দান করেছেন তা আরও ক্ষুরধার। আজ আমরা যত আবিষ্কার দেখছি তা হলো কয়েক শতাব্দী যাবৎ ধারাবাহিক গবেষণার ফল, যার মাঝে মুসলিমদেরও বিরাট অবদান রয়ে গেছে। তাই আবিষ্কারের অগ্রগতি এ কথা বোঝায় না যে, বিদ্যালয়ে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সফল। বরং Cradles of Eminence নামক একটি বই-যা ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে-তাতে ৭০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির শৈশব নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, তাদের প্রতি পাঁচজনের তিনজন অর্থাৎ প্রতি এক শ জনের ষাটজনই বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের শিক্ষার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। টমাস এডিসনকে তার শিক্ষক বলে দিয়েছিল, তুমি বিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণের উপযুক্ত নও। তাই তার আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। শিক্ষকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়াই তাকে বড় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আইনস্টাইনকে তার গ্রিক ভাষার শিক্ষক বলে দিয়েছিল, সে জীবনে কোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবে না। সে সবার সময় নষ্ট করছে। তার উচিত দ্রুত বিদ্যালয় ত্যাগ করা। আল্লাহ ভালো জানেন, পূর্ব ও পশ্চিমে আরও কত প্রতিভাবান মানুষের প্রতিভা ও যোগ্যতা এই শিক্ষাব্যবস্থার অযোগ্যতার ফলে দাফন হয়ে গেছে!
আজকের পৃথিবীতে তাই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে আরেকটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যাকে Waldorf education বলা হয়। যেখানে শিশুদের প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে কোনো ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির অধিবাসী বহু মানুষ তাদের সন্তানকে এ ধরনের বিদ্যালয়ে পড়ান। এ ধরনের বিদ্যালয়ের উদ্ভাবক হলেন রোডেল্ফ স্টাইনার। ইবনু তাইমিয়ার প্রতি আল্লাহ দয়া করুন। তিনি তার গ্রন্থ 'ইকতিদাউস সিরাতিল মুসতাকিম' গ্রন্থে বলেছেন, 'যখন মূল নষ্ট হয়ে যায় তখন শাখার মাঝে তার প্রভাব অবশ্যই পড়বে। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে, সে আল্লাহর অবতীর্ণ বিশেষ কিছু প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে পারবে। কারণ, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে কখনো কখনো সে বিবাদের বিষয়টি নিয়েও সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়বে। কারণ, সে তার উপকারিতা সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। বাস্তবতা হলো, কাফিরের সকল কর্ম ও বিষয়ে অবশ্যই কোনো না কোনো সমস্যা রয়েই যায়। যার ফলে তার পূর্ণ উপকারিতা কখনোই পাওয়া যাবে না। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, তার কোনো বিষয় পূর্ণতা লাভ করেছে, তবুও তার বিনিময়ে সে আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে না। তাই তার সকল বিষয় হয়তো বাতিল, নয়তো অপূর্ণাঙ্গ।' তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মুশরিকদের বিরোধিতা করা ও তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন। বিশেষত তাদের সংস্কৃতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। তাদের আবিষ্কৃত জিনিস ব্যবহারের বিধান সম্পর্কে আমরা এখানে কথা বলছি না। কিন্তু যেসকল বিষয়ের সাথে জীবনদর্শনের সম্পর্ক রয়েছে সেসব বিষয়ে তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, এসব ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করলেই আপনি বিপত্তির শিকার হবেন। যা কখনো আপনি বুঝতে পারবেন; আর কখনো নিজের অজান্তেই তা হয়ে যাবে। কারণ তাদের সকল কর্ম হয়তো বাতিল, নয়তো অপূর্ণাঙ্গ। তাই মুসলিমদের উচিত ওয়াহির মানদণ্ডকে সামনে রেখে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা নিজেরাই প্রণয়ন করা।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে যারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন তাদের মাঝে একজন হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক সালমান খান। তিনি পাঠদানের ক্ষেত্রে খুবই দক্ষ ও সরল ভাষার অধিকারী। তিনি নিজ থেকে একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন। যার ব্যাপারে তিনি TED এর সাথে আলাপ করেছেন। The History of Education শিরোনামে তার এই আলোচনা আপনি TED এর ইউটিউব চ্যানেলে পেয়ে যাবেন। আমাদের আজকের আলোচনার অনেক অংশ সেখানেও আপনি পেয়ে যেতে পারেন। এই সালমান খান একটি আন্তর্জাতিক বিনামূল্যের শিক্ষাসংস্থা খুলেছেন। যার নাম খান একাডেমি। সেখানে অনেকগুলো শাস্ত্রের পাঠদান করা হয়। এ সংস্থা থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস শিখতে পারে এবং যা বুঝতে কষ্ট হয় তার ব্যাপারে খুব সহজেই কোনো শিক্ষক থেকে সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এই সংস্থাটি প্রসিদ্ধি লাভ করার সাথে সাথেই পুঁজিবাদীরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান ও বিল গেটসের মতো ব্যক্তিরা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়ে এই সংস্থাকে সহায়তা করেছে। আর স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক সহায়তার সাথে সাথে চিন্তাগত প্রভাব কিছুটা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাবও দেখা গিয়েছে খুব দ্রুত। গুগল ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে খান একাডেমির ইন্সটাগ্রামে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের পোস্ট দেখা গিয়েছে। এ ছাড়াও তারা সমকামিতার প্রচারেও অংশগ্রহণ করেছে। এ ছাড়া যত রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করেছে তার পেছনে সেই ব্রেনওয়াশ ও আগামী প্রজন্মকে নিজেদের চিন্তাধারা অনুযায়ী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কাজ করেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আর হয়নি। এ ক্ষেত্রে আপনি শিক্ষাসংস্কার নিয়ে কাজ করা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে পাবেন। যেমন: IG, SAT, IB ইত্যাদি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মাঝেও উল্লেখিত যেকোনো প্রক্রিয়া বা তার অংশ বিদ্যমান রয়েছে। মোটকথা, প্রচলিত সকল শিক্ষাব্যবস্থার মাঝেই আপনি নিম্নোক্ত অসংগতিগুলো পেয়ে যাবেন:
১. ওয়াহির বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্নতা।
২. আল্লাহ সাথে ও ঈমানের সাথে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা।
৩. জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে ইবাদতের মানসিকতার অনুপস্থিতি।
৪. ব্রেইনওয়াশ ও চিন্তাগত দাসত্ব। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র বা বিশেষ গোষ্ঠীর সেবাদাসে পরিণত করা হচ্ছে।
৫. যোগ্যতার মানদণ্ডে ক্রমাগত পরিবর্তন।
৬. শিক্ষার ফলাফলকে বস্তুগত উন্নতি ও কর্মের বাজার হিসেবে মূল্যায়ন।
৭. একটি তথ্যের সাথে অন্যটির অসামঞ্জস্যতা ও বিপরীতমুখিতা। দেখা যায়, ছাত্রদের বিজ্ঞানের ক্লাসে এমন কিছু পড়ানো হচ্ছে যা ধর্মের ক্লাসের অনেক কিছুর সাথে সাংঘর্ষিক।
তা হলে এখন কী উপায়? কেমন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন? আর সেই শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর অবস্থানই বা কী? এ ব্যাপারে আমরা সামনে কখনো কথা বলব ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ যে, এই পর্বে উল্লেখিত বহু তথ্য আমি বিভিন্ন উৎস থেকে গ্রহণ করেছি। তথ্যগুলো আমাকে একত্র করে দিয়েছেন প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকির। যিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষক। এ ছাড়াও পর্বটি তৈরি করতে গিয়ে আমি বারবার প্রিয় ভাই উস্তায আনাস শাইখ ইকরিমের শরণাপন্ন হয়েছি। যিনি একজন শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়াও অনেক ভাই ও বোন তথ্য সংগ্রহ ও উৎস অনুসন্ধানে আমাকে সহায়তা করেছেন। আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
টিকাঃ
১৯৬. সূরা আলাক, ৯৬: ১
১৯৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯
১৯৮. সহিহুল জামে, হাদিস নং: ৭৫২০; সহিহ।
১৯৯. সূরা নিসা, ৪:৫৯
২০০. সূরা হাশর, ৫৯ : ৭
২০১. সূরা আলাক, ৯৬: ১
২০২. সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩
২০৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৩৭৫৪
দেখতে দেখতে আমরা সিরিজের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এলাম। আমাদের এবারের আলোচ্য বিষয় নারীর শিক্ষা ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এ পর্বে আমরা বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস আলোচনা করব। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন আমরা নারীর মৌলিক কোনো আলোচনা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে অন্য একটি বিষয়কে আলোচ্য বিষয় বানালাম? উত্তর হলো, আমরা আসলে মৌলিক বিষয় থেকে স্থানান্তরিত হইনি। আমরা এ পর্বে শুধু দেখার চেষ্টা করব, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কি আসলেই নারীর প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম? এই শিক্ষাব্যবস্থা কি তার অস্তিত্বের লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাকে কোনো সাহায্য করে? এই শিক্ষাব্যবস্থা কি তার জন্য উপকারী? এটা কি তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সুখী ও আত্মতৃপ্ত করতে পারে? তবে আজকের আলোচনাটি ব্যাপক পরিসরে-যা নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
প্রথমেই আমরা ওয়াহি অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব। যাতে আমাদের সামনে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। তারপর বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনাদেরকে ধারণা দেবো। কারণ আমাদের আসলে জানা উচিত, কে আমাদেরকে এই সজ্জিত ক্লাস রুমে নিয়ে এল, যেখানে আমরা আমাদের জীবনের বারো থেকে চৌদ্দ বছর অতিবাহিত করি। যেটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, তখন আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আমাদের জানা উচিত, ভুয়া ডাক্তার, ধোঁকাবাজ ইঞ্জিনিয়ার, চোর ব্যবসায়ী, ঘুষখোর চাকরিজীবী, নাস্তিক প্রফেসর, ফেমিনিস্ট ডক্টর ইত্যাদি সমাজের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা কী?
সর্বপ্রথম আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে আয়াত অবতীর্ণ করেন তা হলো:
ٱقْرَأْ بِٱسْمِ رَبِّكَ ٱلَّذِى خَلَقَ 'পড়ুন সেই প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।'১৯৬
হে মানুষ, পড়ো এবং জানো সৃষ্টি ও জীবন সম্পর্কে। তোমার রবের নামে সেগুলোকে অনুধাবন করো। বিশ্বাস রাখো যে, তোমার একজন রব আছেন। যিনি তোমাকে প্রতিপালন করেন। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন একটি রক্তপিণ্ড হতে। তারপর তোমাকে বিভিন্ন জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। কলম দিয়ে লিখতে শিখিয়েছেন। তিনি তোমাকে দান করেছেন সুস্থ মানবীয় স্বভাব ও বিবেক। যার মাধ্যমে তুমি বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করতে পারো। আর এটা সেই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, যিনি সকল পূর্ণতার অধিকারী। এমন কোনো মস্তিষ্কের অধিকারী ব্যক্তির সৃষ্টি নয়, যে ঘটনাক্রমে কিছু একটা তৈরি করে ফেলেছে। তাই তিনি মহানুভব রব। যিনি শিখিয়েছেন কলমের মাধ্যমে। শিখিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না। পড়ো, নিজে উপকৃত হতে এবং মানুষকে উপকৃত করতে। তোমার জ্ঞান দিয়ে তুমি তোমার স্রষ্টার পূর্ণতার প্রমাণ পেশ করো এবং তোমাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করো। ইহকাল ও পরকালের সুখ ও সফলতা অর্জন করো।
এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। যা মানুষকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত করে। ফলে সে তার শক্তিকে মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যয় করে। এই দর্শন মানুষকে তাওহিদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। ফলে সে একক রবের দিকে ধাবিত হয় এবং নিজেও স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী হয়। এই দর্শনকে বুকে ধারণ করে মুসলিমরা এগিয়ে গেল এবং জ্ঞানের জগতে বিরল সব কীর্তি গড়ে তুলল। আমরা আমাদের ‘রিহলাতুল ইয়াকিন’ সিরিজে মুসলিমদের এমন বহু কীর্তি ও আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছি। মুসলিমদের প্রণীত জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারার কথাও সেখানে উঠে এসেছে।
ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মাঝে রয়েছে বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা। যার প্রক্রিয়া নিম্নরূপ :
প্রথমত, ইসলাম শিক্ষাকে ইবাদতের দৃষ্টিতে দেখেছে—হোক তা ধর্মীয় শিক্ষা বা সাধারণ শিক্ষা। তাই রবের নামে পড়ার এই সংস্কৃতি গোটা মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সংস্কৃতির প্রসার ছিল পরিবারে, সমাজে, মসজিদের ইলমি হালকায় এবং ইসলামি যুগে গড়ে ওঠা মাদরাসায়। এর ফলে তৈরি হতো দ্বিতীয় বিষয়টি। আর তা হলো, সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। প্রত্যেকেই শিক্ষাকে নিজের দায়িত্ব মনে করত। তাকে রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিত না। এই দায়িত্ববোধের কারণে যদি রাষ্ট্রও কোনো বিশৃঙ্খলার শিকার হতো, তবুও ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা সেই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকত। কারণ সমাজব্যবস্থা তখন গড়ে উঠেছিল এই চিন্তার ভিত্তিতে, فكلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته 'তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের সকলকেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। '১৯৭
তাই প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই চেষ্টা করতেন নিজের দায়িত্বভুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে। তাই মা-বাবারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্ব দিত ইবাদত মনে করেই। যার ফলে মুসলিম প্রজন্মের মূল অংশ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত থাকত, যদিও কোনো কোনো অংশ তার শিকার হয় না কেন। তারপর সেই মূল অংশ থেকে নতুনভাবে সঠিক ধারার নতুন প্রজন্ম তৈরি হতো। তৃতীয়ত, শিক্ষার মূল উৎসের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা। ইসলাম বলে, পড়ো তোমার রবের নামে। অর্থাৎ ওয়াহিই হলো সকল জ্ঞানের মূল উৎস। তাই ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার মানদণ্ড ও মাপকাঠি সুদৃঢ়। যা কখনোই পরিবর্তিত হবে না। তাই রাষ্ট্র যেদিকেই যাক, শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক থাকবে। জ্ঞানচর্চার ধারা ক্ষমতালোভী ও স্বার্থান্বেষীদের থেকে সুরক্ষিত থাকবে। রাষ্ট্র হয়তো কখনো কখনো তাকে প্রভাবিত করতে চাইবে। কিন্তু মূল উৎস থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। বিপরীতে মানুষ শাসকের ভাল-মন্দ বিচার করবে ওয়াহির ভিত্তিতে। আর শাসক না তাতে কোনো দিন স্পর্শ করতে পারবে, না বদলাতে পারবে। বরং সে নিজেও মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে ওয়াহির নির্দেশনাকে অনুসরণ করে। আর যদি সে ওয়াহির বিরোধিতা করে এবং এমন কিছু শেখানোর চেষ্টা করে যা মানুষের উপকারে আসে না, তাহলে তো ইসলাম বলেই দিয়েছে,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ 'সৃষ্টিকর্তার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টির আনুগত্যের কোনো সুযোগ নেই।'১৯৮
বরং শাসক যদি ওয়াহির আওতার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তার হাত ধরে তাকে আবারও ওয়াহির আওতায় ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ, তার ক্ষমতা শর্তহীন নয়। বরং :
(فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ)
'যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তাহলে তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।'১৯৯
চতুর্থত, সম্পদ সমাজের মাঝে ব্যাপ্ত ছিল। তা কোনো বিশেষ শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত ছিল না। কোনো শাসকের কাছেও জমা ছিল না। ফলে পুঁজিবাদী চিন্তা থেকে কেউ শিক্ষাকে করায়ত্ত করতে পারত না। আর ইসলাম তো পুঁজিবাদের স্পষ্ট বিরোধিতা করে। ইসলাম বলে :
(كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ)
'যাতে সম্পদ তোমাদের ধনীদের মাঝে পালাক্রমে ঘূর্ণন না করে।'২০০
তাই ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে বিদ্যমান ছিল। ফলে তারা সকলেই ছিল স্বাবলম্বী ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের থেকে অমুখাপেক্ষী। তাই আহলে ইলম ও জ্ঞানচর্চাকারীরা নিজেদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলেন। তারা নিজেরাই স্বাবলম্বী ছিলেন। ফলে রিযিক নিয়ে তাদের কোনো হুমকি ছিল না। তাদেরকে শাসকশ্রেণির কাছ থেকে বেতনের অপেক্ষা করতে হতো না। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাও ছিল না। এই স্বাধীন পরিবেশ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি আওকাফ তথা ওয়াকফকৃত সম্পদের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। বিত্তশালী মানুষেরা তাদের সম্পদের একটি বিশেষ অংশ ওয়াকফ করে দিতেন। যা থেকে উপার্জিত সম্পদ কিছু ব্যক্তিকে রিযিকের চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে নিশ্চিন্তে ইলম অর্জন করার সুযোগ করে দিত। এটা ছিল শাসকশ্রেণির মোকাবেলায় জনগণের বড় একটি শক্তি। যার মাধ্যমে তারা আলিমসমাজকে শাসকশ্রেণির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতেন। ফলে সকল ক্ষেত্রে আলিমরা নির্বিঘ্নে বিচরণ করতেন। এমনকি রাষ্ট্রব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়লেও জ্ঞানচর্চা বন্ধ হতো না। যেমন: আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ উপনিবেশ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে তা ওয়াকফকৃত সম্পত্তি থেকে পরিচালিত হতো। সকল স্তরের মানুষের মাঝে সম্পদের ব্যাপ্তির ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তির পক্ষে শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। বরং শিক্ষার পেছনে ইবাদতের লক্ষ্যটিই সব সময় উপস্থিত ছিল। আর মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতিগতভাবে ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদতকে বাস্তবায়ন করা। পঞ্চমত, শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো ওয়াহির লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপর ভিত্তি করে। কোনো পুঁজিবাদী কোম্পানির স্বার্থ বা বস্তুবাদী সভ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো না। অর্থাৎ দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের কল্যাণের ভিত্তিতে শিক্ষার ফলাফল বিবেচিত হতো। তাদের আত্মা, শিষ্টাচার ও চারিত্রিক উন্নতিকেই মানদণ্ড মানা হতো। তাই একজন ফকিহ তার যথাযথ মূল্যায়ন পেতেন। একজন তারবিয়াতকারী মা তার যথাযথ মূল্যায়ন পেতেন। অথচ পুঁজিবাদীদের চোখে এসব মানুষের কোনো মূল্যই নেই। কারণ, তারা পুঁজিবাদের সেবাদাস নয়। এই স্বাধীন পরিবেশই শাসকের উপর সাধারণ মুসলিমদের প্রভাব বজায় রাখত এবং তাদের মধ্য থেকেই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ নির্ধারণ করা হতো। সব সময় একটি স্বাধীন প্রজন্মের অস্তিত্ব পাওয়া যেত। তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করত সমাজের মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য। ফলে তাদের নিকট কোনো কিছু গ্রহণ করা বা বর্জন করার মানদণ্ড ছিল সত্য ও মিথ্যা। কারণ, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারও দাসত্ব করতেন না এবং তারা অর্থনৈতিকভাবেও ছিলেন স্বাবলম্বী। তাহলে মোটকথা, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল পাঁচটি:
১. শিক্ষাকে ইবাদত মনে করা।
২. শিক্ষাকে নিজের মৌলিক দায়িত্ব মনে করা।
৩. শিক্ষার মূল উৎসের বিশুদ্ধতা ও প্রামাণিকতা।
৪. ফলাফল বিবেচিত হতো ওয়াহির উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে।
৫. সমাজের মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য। যার ফলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা শিক্ষা কখনো প্রভাবিত হতো না।
এবার জানার বিষয় হলো, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত থাকাকালীন ইউরোপে কী হচ্ছিল? এটা জানা এ জন্য জরুরি যে, ঠিক সে সময়ে ইউরোপেও একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। তারপর যখন ওয়াহির সাথে আমাদের সম্পর্ক শিথিল হয়ে গেল এবং ইউরোপিয়ানরা আমাদের দেশগুলো দখল করে নিল, তখন তারা আমাদের উল্লেখিত শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হলো। তারা কৌশলে ও শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সরিয়ে সেখানে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে দিলো এবং আমাদের মস্তিষ্ককে তার অনুগামী করে দিলো।
ইউরোপিয়ানরা প্রথম দিকে সামাজিক বৈষম্যের চর্চা করত। তাদের মাঝে তখন দুটি শ্রেণি ছিল। নেতা ও কর্মী। শিক্ষা ছিল তখন শুধু নেতাশ্রেণির অধিকার। কর্মীশ্রেণিকে যদি কোনো শিক্ষা দেয়াও হতো, তা হতো নেতাশ্রেণির সেবা ও দাসত্ব করার সুবিধার্থে। তারপর এল বিপ্লবের যুগ। ইতালিতে যার সূচনা হয়েছিল ১৪০০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। এ সময়ে প্রাচীন শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বিপ্লব সাধিত হলো এবং এমন কিছু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো যেখানে মানুষ বসবাস করত শুধু নাগরিক পরিচয়ে। নেতা বা কর্মী বলতে সেখানে কোনো পরিচয় ছিল না। যার ফলে কিছুদিন মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারল। কিন্তু ধীরে ধীরে আবার নতুন বৈষম্য চলে এল। আর তা হলো পুঁজিবাদের বৈষম্য। যেহেতু দীর্ঘ একটি সময় যাবৎ শিক্ষা শুধু একটি শ্রেণির মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল, তাই তাকে সমাজের সকল শ্রেণির মাঝে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই ইউরোপে তৈরি হলো সরকারি বিদ্যালয়। আর এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের বিশ্বাসকে প্রজন্মের মাঝে বদ্ধমূল করা তথা Indoctrination। তাদের লক্ষ্য ছিল, এসব বিদ্যালয়ের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। ফলে রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হবে। কারাখানাগুলো সচল হবে এবং এসবের মাধ্যমে অন্যসব রাষ্ট্রের উপর প্রভাব সৃষ্টি করা ও দখলদারি চালানো সহজ হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি করা হলো কারিগরি বিদ্যালয় তথা Factory model schools। যে স্কুল থেকে দক্ষ কর্মী তৈরি হতো। যাদের কাজ ছিল কারখানায় কাজ করা। এ ধরনের বিদ্যালয় সর্বপ্রথম ১৭১৭ সালে জার্মানির ব্রুশিয়া রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলো। তারপর আঠারো শতকের শেষভাগে প্রথম শিল্পবিপ্লব সাধিত হলো। নারীকে ঘর থেকে বের করে আনা হলো এবং তাদের মাঝে জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ বিতরণ করা হলো, যাতে তারা দীর্ঘক্ষণ কারাখানায় কাজ করতে পারে। এর আগে ১৮০৭ সালেই ব্রুশিয়ার স্কুলগুলোকে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে সরকার নির্ধারিত পাঠক্রম পড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল। জার্মান দার্শনিক জোহান গোটলিব ফিস্তে বলেন, বিদ্যালয় ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে দেবে। এমনভাবে বদলে দেবে যে, আপনি যা চান তার বাইরে সে যেন অন্য কিছু না চায়। এর কারণ ছিল, জার্মানরা ফ্রান্সের সাথে বিবাদে জড়িয়ে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। রাষ্ট্রের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই নাগরিকদের এভাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল কর্তারা। দার্শনিক ফিস্তের মতে জার্মানির পিছিয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, ছাত্রদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকার। কারণ তারা তখন ভালো ও মন্দের মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই তাদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকার দূর করে দিলেই তার সমাধান হয়ে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নিল, যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ছাত্রদেরকে তৈরি হবে তা হলো রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণ। এ জন্যই ছাত্রদেরকে প্রতিদিন সকালে সেনাবাহিনীর মতো সারিবদ্ধ হয়ে বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের পবিত্রতার বাণী গাইতে হবে।
তারপর জার্মানিতে উদ্ভাবিত হলো নতুন ব্যবস্থা। ১৮৩০ সালে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবলের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হলো কিন্ডার গার্টেন স্কুল। এ ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অনুপ্রেরণা ছিল, শৈশবে তার মা মারা গিয়েছিল এবং বাবা আরেকটি বিয়ে করেছিল। ফলে সে মা-বাবা উভয়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিল। এ ধরনের স্কুলের মাধ্যমে তাই সে স্নেহহারা বাচ্চাদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল। ঠিক এই সময়টিতেই ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করেছিল। যা ইতিপূর্বে মুসলিমদের দখলে ছিল। তখন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক টমাস মিকোলি ভারতবর্ষের ব্রিটিশদের নির্ধারিত শাসকের নিকট পত্র লিখল। যার শিরোনাম ছিল, ভারতবর্ষে শিক্ষাব্যবস্থা। সেই পত্রের মাঝে যা লেখা ছিল তার মাঝে এ কথাটিও ছিল, এ সময়ে আমাদেরকে নিজেদের মাঝে ও আমাদের শাসিত লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে। আমাদেরকে ভারতবর্ষে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যারা রক্ত ও বর্ণে যদিও হিন্দুস্থানি হবে; কিন্তু চিন্তাধারা, চরিত্র ও রুচির দিক থেকে তারা হবে ইংরেজ। এমন একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজনে আমাদেরকে রাষ্ট্র কর্তৃক সহায়তা প্রদান করতে হবে। তারপর ব্যাপকাকারে তার প্রসার ঘটাতে হবে। আর এই প্রজন্মটিকে গোটা ভারতবর্ষের মানুষের কাছে শিক্ষিত ও অনুসরণীয় প্রজন্ম হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এই হলো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
এভাবেই তারা সামরিকভাবে কোনো দেশকে দখল করার পূর্বেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাকে দখল করে নিত। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান সরকারি বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে আলোচনার স্বার্থে টমাস মিকোলির সূক্ষ্ম দর্শনটিকে আপনার মস্তিষ্কে টুকে রাখুন। ইউরোপে যখন এসব কিছু চলছিল তার মাঝেই মুসলিম পক্ষ থেকে বহু জ্ঞান ও বিজ্ঞান ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। 'পড়ো তোমার রবের নামে' এ দর্শন থেকে দূরে সরে গেল। তৈরি হলো নতুন দর্শন—পড়ো রাষ্ট্র ও তার শক্তির নামে। প্রকারান্তরে পড়া শুরু হলো মানুষের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও শক্তির নামে। ১৮৪৩ সালে কারিগরি বিদ্যালয়ের চিন্তাটি ব্রশিয়া থেকে পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় স্থানান্তরিত হলো। তারপর ১৮৪২ থেকে ১৯১৭ মধ্যবর্তী সময়ে গোটা আমেরিকায় সরকারি বিদ্যালয় ছড়িয়ে পড়ল। ১৮৯২ সালে আমেরিকায় দশ ব্যক্তির সমন্বয়ে 'কমিটি অব টেন' গঠিত হলো—যাদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। যখন এই দশ ব্যক্তি এই শিক্ষাব্যবস্থাটি প্রণয়ন করল এবং তা মুসলিম বিশ্বে প্রসারিত হয়ে গেল তখন আমাদের উচিত প্রশ্ন করা, এই দশ ব্যক্তি কারা? কী তাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য? কেন আমরা তাদের উপর ভরসা রাখব? তারা যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছিল তার সাথে কি আমরা একমত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে আসুন আমরা এই দশজন ব্যক্তির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি উইলিয়াম টোরি হ্যারিসের জীবন থেকে ঘুরে আসি। যাকে আমেরিকান প্রশাসন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য নির্ধারণ করেছিল। সে একটি আর্টিকেল লিখেছে যার শিরোনাম, 'ইন্ডিয়ান এডুকেশন' তথা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা। এখানে ভারতীয় বলে রেড ইন্ডিয়ানদের বোঝানো হয়েছে। যারা ছিল আমেরিকার আদিবাসী। আসুন আমরা আর্টিকেলটির মূল অংশে চোখ বুলাই। বলে রাখা ভালো যে, আমেরিকার ভূমিতে মূলত বসবাস করত রেড ইন্ডিয়ানরা। ইউরোপিয়ানরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে তাদের মাতৃভূমি দখল করে নিল। এটা ছিল এক নির্মম ইতিহাস, যার ব্যাপারে আমরা অন্য সিরিজে কথা বলেছি। ইউরোপিয়ানদের দ্বারা আমেরিকা দখল হওয়ার পরও সেখানের আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে ইউরোপিয়ানদের একটি দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকল। উপরে আলোচিত আর্টিকেলটিতে রেড ইন্ডিয়ানদেরকে কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় এনে আমেরিকার নতুন সভ্যতার অনুসারী বানানো যায় তার পন্থা আলোচনা করা হয়েছে। যাতে তারা আমেরিকার নিয়ন্ত্রক তথা বর্তমানে যারা নিজেদেরকে আমেরিকার আসল নাগরিক বলে দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে হুমকি না হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে সমাধানটি পেশ করা হয়েছে তা হলো, বাধ্যতামূলক একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ঘটানো। যার ফলে রেড ইন্ডিয়ানদের সন্তানদেরকে শৈশবেই তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বারো বছরের জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষাগ্রহণের জন্য নিয়ে আসা হবে। এ ক্ষেত্রে সময়টিও দীর্ঘ হতে হবে। কারণ, দুই থেকে পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে তাদের মস্তিষ্কে নিজেদের চিন্তার বীজ ভালোভাবে বপন করা সম্ভব হবে না। ফলে তাদের মাঝে শিক্ষার প্রভাব বেশি দিন অব্যাহত থাকবে না এবং তাদেরকে শিল্পবিপ্লবের অংশ বানানোও সম্ভব হবে না। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও দখল নিশ্চিত করার জন্য সামরিক বাহিনীতে অর্থ ব্যয় না করে রেড ইন্ডিয়ানদের শিক্ষার পেছনে কিছু অর্থ ব্যয় করলে তা আরও ফলপ্রসূ হবে।
এই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবায়নের জন্য রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে হাসিমুখে কথা বলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এভাবেই হাসিমুখে একপ্রকার জোরপূর্বক তাদের সন্তানদেরকে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে সাদা চামড়ার লোকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো চিন্তাধারা তাদের মস্তিষ্কে স্থাপন করছিল, অথচ তাদের পিতা-মাতারা তা বুঝতেও পারছিল না। শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত দশজনের মাঝে একজন হলো উইলিয়াম হ্যারিস। সে শিশুদেরকে সকাল সকাল বিদ্যালয়ে উপস্থিত করার পদ্ধতিটি চালু করল এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে কাটানোর ব্যবস্থা করল। এর পেছনে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, শিশুদের উদ্যমকে নষ্ট করে দেয়া এবং এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে তাদের মা-বাবাকেও নিয়ন্ত্রণ করা। সর্বোপরি সকলের উপর রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়া। যদি এই লক্ষ্যগুলো সমাজে খুব স্বাভাবিকভাবে বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। নতুবা সেই চিত্রই তৈরি হবে যা বর্তমান চীনে উইঘুরের মুসলিমদের সাথে ঘটছে। তাদের সন্তানদেরকে পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পরিবার ও ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। তারপর তাদেরকে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী এমনভাবে প্রতিপালন করা হয় যে, তারা মানবযন্ত্রে পরিণত হয়। উইলিয়াম হ্যারিস শিক্ষাব্যবস্থার নামে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার এই উদ্দেশ্যের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। সে তার শিক্ষার দর্শন বিষয়ক বইটিতে বলেছে, বর্তমান সময়ে যেকোনো জাতির শতকরা ৯৯ জন মানুষ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সীমাবদ্ধ কিছু কাজের মধ্য দিয়েই তারা তাদের জীবনকে অতিবাহিত করতে আগ্রহী। তারা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া নিয়মকানুনগুলো পালন করতেই বেশি পছন্দ করে। আর এটা হঠাৎ করেই হয়নি। বরং শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্ককে খাঁচাবদ্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যদি আমরা পারিভাষিক শিরোনাম দাঁড় করাই, তাহলে তা হবে, 'ব্যক্তিকে সীমাবদ্ধকরণ ও তার বৈশিষ্ট্যহরণ'। তারপর সে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিভিন্ন পন্থার কথা উল্লেখ করেছে।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, হ্যারিস, ফেস্তো এদের দিয়ে আমাদের কী কাজ? তারা তো অতীতের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বর্তমান সময়টা দেখুন। কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব চিন্তার স্বাধীনতায় এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যে বিবর্তন বা চিন্তার স্বাধীনতা হরণের কথা বলছেন তা এক সময় হয়তো ছিল; কিন্তু এখন নেই। তাকে আমরা বলব, আপনি বলতে চাচ্ছেন, এটা এখন নেই? তাহলে সেই বিবর্তন ও ব্রেইনওয়াশের ব্যাপারে আপনি কী বলবেন, বর্তমান বিশ্বের শিক্ষার্থীরা যার শিকার হচ্ছে? ব্রেইনওয়াশের শিকার হওয়ার পর তাদের কাছে এখন ব্যভিচারকে ব্যক্তিস্বাধীনতা মনে হচ্ছে। আর এভাবেই যদি তাদের স্বাধীন ইচ্ছাধিকারকে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তারপর তাদের ব্রেইনওয়াশ করে সেখানে রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণের নীতি ও মানদণ্ড স্থাপন করে দেয়া হয় আর তার জন্য কোনো সুসাব্যস্ত ও সুপ্রমাণিত উৎস না থাকে, তাহলে দিনের পর দিন তা পরিবর্তনই হতে থাকবে। কখনোই তা সুস্থির হবে না।
এবার এই শিক্ষাব্যবস্থাকে আপনি সঠিক ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তুলনা করুন। যেখানে ওয়াহিই হলো সকল কিছুর উৎস ও শেষ কথা। যে ওয়াহি সময়ের পরিবর্তনে কখনো পরিবর্তন হয় না ও বদলে যায় না। যে ওয়াহির মাঝে সব সময়ই বিদ্যমান থাকে:
( اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ )
'পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।' ২০১
সকলের ক্ষেত্রে এই একই স্লোগান। আর এই শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয় এমন এক স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী সমাজে, যেখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তাধারা বাস্তবায়িত হয় না। শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন চলে না। অথচ ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার কোনো বিদ্যালয়ে একই শ্রেণিকক্ষে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ শিশুরা একসাথে বসার নিয়ম ছিল না। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজপথে বহু আন্দোলন হয়। স্লোগান ওঠে, বর্ণবৈষম্য বন্ধ করো। একটি ঘটনার কারণে আন্দোলনটি শুরু হয়। কৃষ্ণাঙ্গ শিশু রবি ব্রেডজেস যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে তখন অন্য শ্বেতাঙ্গ শিশুদের অভিভাবকরা আপত্তি জানায় এবং তাদের সন্তানদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে নিয়ে আসে। শিশু রবি একাই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকে। এবার ভেবে দেখুন, কীভাবে আমরা এদের থেকে কোনো বিবেচনা ছাড়াই শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি? যারা খুব নিকট অতীতেই মানুষের বর্ণ নিয়ে বৈষম্য তৈরি করত। অথচ আমরা সেই জাতি, যাদের স্লোগান হলো :
( إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ)
'তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি। '২০২
এ ব্যাপারে আমিরুল মুমিনিন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
ابو بكر سيدنا و اعتق سیدنا
'আবু বকর আমাদের নেতা। আর তিনি আজাদ করেছেন আমাদের আরেক নেতাকে।'২০৩
অর্থাৎ তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ইথিউপিয়ান দাস বিলাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে আজাদ করেছেন।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, আপনি শুধু এই শিক্ষাব্যবস্থার নেতিবাচক দিকগুলো উল্লেখ করছেন। ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরছেন না। এটা তো পক্ষপাত। তার জবাবে আমরা বলব, এখানে আমাদের লক্ষ্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস তুলে ধরা নয়। বরং আমাদের লক্ষ্য হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, তার সাথে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বৈপরীত্যগুলো তুলে ধরা। এই বৈপরীত্যের কারণে মুসলিমদের সন্তানরা কী কী পরিণতি ভোগ করছে তা আলোচনা করা। আমি একা চাইলেই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারব না। তাই আমি চাই সেখান থেকেই আওয়াজ উঠুক, যারা এই শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। ১৯৮৩ সালে আমেরিকার বহুজাতিক শিক্ষাব্যবস্থা সংরক্ষণ কমিটি আমেরিকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি বার্তা দিয়েছে। যার শিরোনাম, একটি জাতি হুমকির সম্মুখীন। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের অনিবার্যতার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বার্তাটির লেখক জেমস হারফির তাতে লিখেছে, আমাদের সমাজে শিশুদের প্রতিপালনের যে রীতি চলে আসছে, তা একটি রাষ্ট্র ও জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে। যেকোনো সময় কোনো শত্রুপক্ষ বা আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোনো গোষ্ঠী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লাগাম টেনে ধরে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে এবং আমাদের বিরুদ্ধে সহজেই বিজয়ী হয়ে যাবে। কিন্তু এই বার্তাটি প্রদান করার পরও কি শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করা হয়েছে? তার উত্তর এই ঘটনার আট বছর পর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত Dumbing Us Down বইটিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। বইটির লেখক জন টেইলর গেটো দীর্ঘ সময় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছে। তারপর সে এই বইটি লিখেছে। যার নামটি ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, বাধ্যতামূলক চাপিয়ে দেয়া শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিকর ও ভীতিকর দিকসমূহ। এই বইয়ে সে আমেরিকায় প্রচলিত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছে এবং বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ২০০২ সালে বইটির আরেকটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। আমি আপনাদের সামনে সেই বই থেকে কিছু কিছু অংশ তুলে ধরতে চাই, যাতে আপনারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারেন। গেটো লিখেছে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অধিকাংশ বিষয়বস্তুই এই গ্রহে মানুষের কোনো কাজে আসে না। এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সফল মনোবিজ্ঞানী তৈরি হয়নি। কোনো সফল কবিও এখান থেকে ভাষা শিখে কবি হতে পারেননি। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিরা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কোনো রকম উপকৃতই হতে পারেননি।
জন গেটো আরও লিখেছে, বাস্তবতা হলো, বিদ্যালয়গুলো সরকারের আদেশ কীভাবে পালন করবে তার নির্দেশনা ছাড়া আর কিছুই শেখাচ্ছে না। অর্থাৎ সেই ব্রেইনওয়াশ যার কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। সে আরও লিখেছে, শিক্ষাব্যবস্থার কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য রূপরেখা নেই। তাদের বিশেষ কোনো লক্ষ্যও নেই। এক ক্লাসের বেল বাজছে আর শিশুরা বই খুলে বসছে। আরেক ক্লাসের বেল বাজার সাথে সাথে তা বন্ধ করে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াই চলছে স্কুলগুলোতে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, মানুষ আর বানর একই উত্তরাধিকারে জন্ম লাভ করেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী এক ক্লাসে জানছে, পশুদের সাথে মানুষের জিনগত কোনো মিল নেই। আরেক ক্লাসে এসে জানছে, সে এই পশুদের ভাই। এখান থেকে সে কোনো কিছুই নিজের জীবনের জন্য গ্রহণ করতে পারছে না। কোনো কিছুর প্রতিই সে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছে না। ফলে সে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে ও নিজেকে প্রতারিত অনুভব করছে। এই দ্বিধাগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থাই এখন ব্যাপকভাবে সারা বিশ্বে চলছে। বিশেষত কিছু কিছু সিলেবাস শিক্ষার্থীকে ধর্ম সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত করে দিচ্ছে এবং পরক্ষণেই রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার বীজ বপন করে যাচ্ছে। যা জীবনের বাস্তবতায় এসে শিক্ষার্থীদের পেরেশান করে তুলছে। অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত তাদের মস্তিষ্কে ঠেসে দেয়া হচ্ছে। জন গেটো আরও বলেছে, অল্পবিস্তর সংস্কার দ্বারা এই শিক্ষাব্যবস্থা সঠিক হবে না। এ জন্য আমাদেরকে আগে বিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং পরিবারের সাথে এর যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। তার মতে, একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে উপযুক্ত হতে হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষার্থীকে দুটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম হতে হবে। আর তা হলো, কীভাবে সে জীবনযাপন করবে এবং কীভাবে সে জীবনের সমাপ্তি টানবে? যার কোনোটা সম্পর্কেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কোনো ধারণা দিতে সক্ষম নয়। বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছুকে বস্তুগত দৃষ্টিতে বিবেচনা করছে। অথচ তার এই দৃষ্টিকোণ পুরোপুরি ধারণ করার সক্ষমতা নিয়েও বস্তুবাদীরা প্রশ্ন তুলে বসে আছে।
২০০৬ সালে রাষ্ট্র বিষয়ক পরামর্শক রবিনসন—যিনি শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের কারণে 'ফারেস (Knight)' উপাধি পেয়েছেন—একটি পর্যালোচনা পেশ করেছেন, যা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তার পর্যালোচনাটির ভিডিও এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬ মিলিয়ন মানুষ দেখেছে। তার পর্যালোচনাটির শিরোনাম হলো, Do schools kill creativity? (বিদ্যালয় কি সৃজনশীলতা নষ্ট করে দিচ্ছে?)। এখানে তিনি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ভুল হওয়ার ভয় তৈরি করে। যা তাদেরকে অগ্রসর হওয়া ও কোনো কিছু উদ্ভাবন করার ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি করে। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনা করে না। ফলে সে বসে থাকতে ও স্থবির থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই নিজের যোগ্যতাকে সে কখনো আবিষ্কার করতে পারে না। বরং তাকে দাফন করে দেয়। রবিনসন বলেন, শিক্ষা হলো পরিশোধন সরঞ্জামের মতো। যা মানুষের বিবেক থেকে ভুল ও অনর্থক বিষয়গুলোকে দূর করে দেয়। এর বাইরে যা কিছু শেখানো হয়, তা শিক্ষার্থীকে অসুস্থ করে তোলে। অথচ সে তার নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে জানতেও পারে না।
ডক্টর জর্জলান একটি ভিডিও তৈরি করেছেন। যার শিরোনাম 'পাশ করার ব্যর্থতা'। সেখানে তিনি বলেছেন, আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক সংস্থা নাসা তাকে ও তার বন্ধু বেস জারম্যানকে নাসায় চাকরিরত ব্যক্তিদের সৃজনশীলতা যাচাই করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করার অনুরোধ করে। তারা সেই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে নাসাকে পেশ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, শিশুদের সৃজনশীলতা নিয়ে তারা একটি গবেষণা- প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে। সেই প্রতিবেদনে তারা লেখেন, বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে প্রতিদিনই শিশুরা তাদের সৃজনশীলতাকে হত্যা করছে। বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে তাদের মাঝে যে সৃজনশীলতা বিদ্যমান ছিল বিদ্যালয়ে গিয়ে তারা সেটুকুও হারাচ্ছে। ২০১৩ সালে রবিনসন আরও একটি পর্যালোচনামূলক ভিডিও প্রস্তুত করেন। যার শিরোনাম, 'কীভাবে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মৃত্যু-উপত্যকাটুকু অতিক্রম করব?'
কেউ হয়তো বলতে পারেন, কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থার উপর যোগ্যতা হত্যার অভিযোগ তোলা হয়? অথচ আমরা দেখছি, এর মাধ্যমেই দিনদিন দ্রুতগতিতে বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে। তার উদ্দেশে আমরা বলব, আল্লাহ মানুষকে যেসব যোগ্যতা দান করেছেন তা আরও ক্ষুরধার। আজ আমরা যত আবিষ্কার দেখছি তা হলো কয়েক শতাব্দী যাবৎ ধারাবাহিক গবেষণার ফল, যার মাঝে মুসলিমদেরও বিরাট অবদান রয়ে গেছে। তাই আবিষ্কারের অগ্রগতি এ কথা বোঝায় না যে, বিদ্যালয়ে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সফল। বরং Cradles of Eminence নামক একটি বই-যা ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে-তাতে ৭০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির শৈশব নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, তাদের প্রতি পাঁচজনের তিনজন অর্থাৎ প্রতি এক শ জনের ষাটজনই বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের শিক্ষার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। টমাস এডিসনকে তার শিক্ষক বলে দিয়েছিল, তুমি বিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণের উপযুক্ত নও। তাই তার আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। শিক্ষকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়াই তাকে বড় হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আইনস্টাইনকে তার গ্রিক ভাষার শিক্ষক বলে দিয়েছিল, সে জীবনে কোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবে না। সে সবার সময় নষ্ট করছে। তার উচিত দ্রুত বিদ্যালয় ত্যাগ করা। আল্লাহ ভালো জানেন, পূর্ব ও পশ্চিমে আরও কত প্রতিভাবান মানুষের প্রতিভা ও যোগ্যতা এই শিক্ষাব্যবস্থার অযোগ্যতার ফলে দাফন হয়ে গেছে!
আজকের পৃথিবীতে তাই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে আরেকটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যাকে Waldorf education বলা হয়। যেখানে শিশুদের প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে কোনো ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির অধিবাসী বহু মানুষ তাদের সন্তানকে এ ধরনের বিদ্যালয়ে পড়ান। এ ধরনের বিদ্যালয়ের উদ্ভাবক হলেন রোডেল্ফ স্টাইনার। ইবনু তাইমিয়ার প্রতি আল্লাহ দয়া করুন। তিনি তার গ্রন্থ 'ইকতিদাউস সিরাতিল মুসতাকিম' গ্রন্থে বলেছেন, 'যখন মূল নষ্ট হয়ে যায় তখন শাখার মাঝে তার প্রভাব অবশ্যই পড়বে। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে, সে আল্লাহর অবতীর্ণ বিশেষ কিছু প্রজ্ঞাকে উপলব্ধি করতে পারবে। কারণ, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে কখনো কখনো সে বিবাদের বিষয়টি নিয়েও সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়বে। কারণ, সে তার উপকারিতা সম্পর্কে জ্ঞাত নয়। বাস্তবতা হলো, কাফিরের সকল কর্ম ও বিষয়ে অবশ্যই কোনো না কোনো সমস্যা রয়েই যায়। যার ফলে তার পূর্ণ উপকারিতা কখনোই পাওয়া যাবে না। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, তার কোনো বিষয় পূর্ণতা লাভ করেছে, তবুও তার বিনিময়ে সে আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে না। তাই তার সকল বিষয় হয়তো বাতিল, নয়তো অপূর্ণাঙ্গ।' তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মুশরিকদের বিরোধিতা করা ও তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকার আদেশ করেছেন। বিশেষত তাদের সংস্কৃতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। তাদের আবিষ্কৃত জিনিস ব্যবহারের বিধান সম্পর্কে আমরা এখানে কথা বলছি না। কিন্তু যেসকল বিষয়ের সাথে জীবনদর্শনের সম্পর্ক রয়েছে সেসব বিষয়ে তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, এসব ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করলেই আপনি বিপত্তির শিকার হবেন। যা কখনো আপনি বুঝতে পারবেন; আর কখনো নিজের অজান্তেই তা হয়ে যাবে। কারণ তাদের সকল কর্ম হয়তো বাতিল, নয়তো অপূর্ণাঙ্গ। তাই মুসলিমদের উচিত ওয়াহির মানদণ্ডকে সামনে রেখে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা নিজেরাই প্রণয়ন করা।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে যারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন তাদের মাঝে একজন হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক সালমান খান। তিনি পাঠদানের ক্ষেত্রে খুবই দক্ষ ও সরল ভাষার অধিকারী। তিনি নিজ থেকে একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করেছেন। যার ব্যাপারে তিনি TED এর সাথে আলাপ করেছেন। The History of Education শিরোনামে তার এই আলোচনা আপনি TED এর ইউটিউব চ্যানেলে পেয়ে যাবেন। আমাদের আজকের আলোচনার অনেক অংশ সেখানেও আপনি পেয়ে যেতে পারেন। এই সালমান খান একটি আন্তর্জাতিক বিনামূল্যের শিক্ষাসংস্থা খুলেছেন। যার নাম খান একাডেমি। সেখানে অনেকগুলো শাস্ত্রের পাঠদান করা হয়। এ সংস্থা থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস শিখতে পারে এবং যা বুঝতে কষ্ট হয় তার ব্যাপারে খুব সহজেই কোনো শিক্ষক থেকে সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এই সংস্থাটি প্রসিদ্ধি লাভ করার সাথে সাথেই পুঁজিবাদীরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান ও বিল গেটসের মতো ব্যক্তিরা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়ে এই সংস্থাকে সহায়তা করেছে। আর স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক সহায়তার সাথে সাথে চিন্তাগত প্রভাব কিছুটা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাবও দেখা গিয়েছে খুব দ্রুত। গুগল ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে খান একাডেমির ইন্সটাগ্রামে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের পোস্ট দেখা গিয়েছে। এ ছাড়াও তারা সমকামিতার প্রচারেও অংশগ্রহণ করেছে। এ ছাড়া যত রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করেছে তার পেছনে সেই ব্রেনওয়াশ ও আগামী প্রজন্মকে নিজেদের চিন্তাধারা অনুযায়ী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কাজ করেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আর হয়নি। এ ক্ষেত্রে আপনি শিক্ষাসংস্কার নিয়ে কাজ করা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে পাবেন। যেমন: IG, SAT, IB ইত্যাদি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মাঝেও উল্লেখিত যেকোনো প্রক্রিয়া বা তার অংশ বিদ্যমান রয়েছে। মোটকথা, প্রচলিত সকল শিক্ষাব্যবস্থার মাঝেই আপনি নিম্নোক্ত অসংগতিগুলো পেয়ে যাবেন:
১. ওয়াহির বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্নতা।
২. আল্লাহ সাথে ও ঈমানের সাথে জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতা।
৩. জ্ঞান অন্বেষণের ক্ষেত্রে ইবাদতের মানসিকতার অনুপস্থিতি।
৪. ব্রেইনওয়াশ ও চিন্তাগত দাসত্ব। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র বা বিশেষ গোষ্ঠীর সেবাদাসে পরিণত করা হচ্ছে।
৫. যোগ্যতার মানদণ্ডে ক্রমাগত পরিবর্তন।
৬. শিক্ষার ফলাফলকে বস্তুগত উন্নতি ও কর্মের বাজার হিসেবে মূল্যায়ন।
৭. একটি তথ্যের সাথে অন্যটির অসামঞ্জস্যতা ও বিপরীতমুখিতা। দেখা যায়, ছাত্রদের বিজ্ঞানের ক্লাসে এমন কিছু পড়ানো হচ্ছে যা ধর্মের ক্লাসের অনেক কিছুর সাথে সাংঘর্ষিক।
তা হলে এখন কী উপায়? কেমন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন? আর সেই শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর অবস্থানই বা কী? এ ব্যাপারে আমরা সামনে কখনো কথা বলব ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ যে, এই পর্বে উল্লেখিত বহু তথ্য আমি বিভিন্ন উৎস থেকে গ্রহণ করেছি। তথ্যগুলো আমাকে একত্র করে দিয়েছেন প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকির। যিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষক। এ ছাড়াও পর্বটি তৈরি করতে গিয়ে আমি বারবার প্রিয় ভাই উস্তায আনাস শাইখ ইকরিমের শরণাপন্ন হয়েছি। যিনি একজন শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়াও অনেক ভাই ও বোন তথ্য সংগ্রহ ও উৎস অনুসন্ধানে আমাকে সহায়তা করেছেন। আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
টিকাঃ
১৯৬. সূরা আলাক, ৯৬: ১
১৯৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯
১৯৮. সহিহুল জামে, হাদিস নং: ৭৫২০; সহিহ।
১৯৯. সূরা নিসা, ৪:৫৯
২০০. সূরা হাশর, ৫৯ : ৭
২০১. সূরা আলাক, ৯৬: ১
২০২. সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩
২০৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৩৭৫৪