📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 রুকু এবং সিজদা

📄 রুকু এবং সিজদা


আমরা রুকু এবং সিজদায় যা যা বলি সেটা নিয়ে কখনো চিন্তা করেছেন?

আমরা রুকুতে বলি,
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম।'

অর্থ: 'আমার সুমহান রব অতি পবিত্র (অর্থাৎ আল্লাহ আপনি কতই না পবিত্র এবং আপনি সবচেয়ে শক্তিধর)।'

আমরা সিজদায় বলি,
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
“সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা।”

অর্থ: 'আমার সমুচ্চ রব অতি পবিত্র (অর্থাৎ, আল্লাহ আপনি কতই না পবিত্র এবং আপনার মাকাম সবচেয়ে উঁচু)।'

নামাজের মধ্যে শারীরিক দিক থেকে সবচেয়ে নড়বড়ে এবং দুর্বল অবস্থানটা হচ্ছে 'রুকু।' রুকুতে থাকা অবস্থায় কেউ যদি নামাজরত বান্দাকে হালকা করেও একটা ধাক্কা দেয়, তার কিন্তু ধপাস করে মাটিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। চমৎকার ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা যখন নামাজে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকি, তখন বলি, 'আল্লাহ আপনি সবচেয়ে মহান (শক্তিশালী)'। আবার, আমরা যখন নামাজের মধ্যে সবচেয়ে নিচু অবস্থানে থাকি, তখন আল্লাহকে বলি যে, 'আল্লাহ আপনার মাকাম সবচেয়ে উঁচু।'

সুবহানআল্লাহ! নিজেদের ক্ষুদ্রতা ও বিনয়ের এই প্রকাশ আমাদের নামাজকে অন্য এক অবস্থানে নিয়ে যায়। নামাজ পড়তে পড়তে যেখানেই মন চলে যাক না কেন, রুকু আর সিজদা দেয়ার সময় মনে পড়ে যায় যে, 'আল্লাহ সবচেয়ে মহান (শক্তিধর) এবং আল্লাহই সর্বোচ্চ।' মনে রাখতে হবে, নামাজে রুকু ও সিজদায় আল্লাহর মহত্ত্ব ও সর্বোচ্চ মর্যাদার কথা স্মরণ করতে না পারি, তাহলে দৃশ্যত আমরা রুকু-সিজদা করলেও তাতে প্রাণ থাকবে না।

তারপর রুকু থেকে উঠতে উঠতে আমরা বলি,
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَه
'সামি আল্লাহু লিমান হামিদা।'

অর্থ: 'আল্লাহ সেই ব্যক্তির কথা শোনেন, যে তাঁর প্রশংসা করে।'

এর পরপরই দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং বলি,
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
'রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ।'

অর্থ: 'হে আল্লাহ, যাবতীয় প্রশংসা কেবল তোমারই।'

এই বাক্যদুটি পাঠ অনেকটা এমন, যেন আমাদের কথাগুলি যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা শুনবেন, সেটা নিশ্চিত করে রাখলাম। বলুন তো, ঠিক সিজদায় যাবার আগে কেন এটা নিশ্চিন্ত করে নিলাম যে, আল্লাহ আমার সব কথা শুনবেন? কারণ, সিজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে চলে যায় এবং সিজদা হচ্ছে দুআ করার মোক্ষম সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'সিজদারত বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী। সুতরাং সে সময় তোমরা বেশি বেশি দুআ করো।'[৬৩]

তাই আল্লাহর সাথে বান্দার ঘনিষ্ঠ নৈকট্যের ঠিক আগ মুহূর্তে 'সামি আল্লাহু লিমান হামিদা' স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আল্লাহর কাছে যা চাওয়ার সিজদায় গিয়ে উজাড় করে চেয়ে নাও। তিনি তোমার সব আকুতি-মিনতি শুনছেন। একটাও মাটিতে পড়বে না। প্রতিটা দুআ রব্বুল আলামিনের দরবারে মেহমান হয়ে পৌঁছাবে, ইনশাআল্লাহ。

টিকাঃ
[৬৩] সহীহ মুসলিম ৪৮২

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 রুকু থেকে উঠার দুআ—একটি বিস্ময়কর ঘটনা

📄 রুকু থেকে উঠার দুআ—একটি বিস্ময়কর ঘটনা


রিফাআহ আয-যুরাকি রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার নবীজির পিছনে সালাত পড়ছিলেন। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকু থেকে মাথা তুলে বললেন, 'সামিয়াল্লাহ হুলিমান হামিদাহ (আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা তাঁর প্রশংসা করেছে)।' তখন আমার পিছন থেকে এক সাহাবী বলে উঠলেন,

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ، حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ
উচ্চারণঃ রব্বানা ওয়া লাকাল হামদু, হামদান কাছীরান ত্বায়্যিবান মুবা-রাকান ফীহি
অর্থঃ হে আমাদের রব্ব! আর আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা; অঢেল, পবিত্র ও বরকত-রয়েছে-এমন প্রশংসা।

সালাত শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ঐ কথাটি কে বলেছে? সেই সাহাবী বললেন-আমি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি ত্রিশজনেরও অধিক ফিরিশতাকে এর সওয়াব লেখার জন্য হুড়োহুড়ি করতে দেখেছি!

অন্য বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, রিফাআহ আয-যুরাকি রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেই ছিলেন ঐ ব্যক্তি।

পুণ্য লেখার জন্য এই যে হুড়োহুড়ি, এর বিশেষত্ব কী? এর বিশেষত্ব হলো-সেই সাহাবী প্রতিটি বর্ণই সত্যিকার অর্থেই মন থেকে বলেছেন।

ইবনু হাজার আসকালানী রহ. এই দুআর ব্যাখ্যা করেন, “ফিরিশতাদের সংখ্যার পিছনের রহস্য হলো এই যে, সেই যিকিরের বর্ণসংখ্যা আর ফিরিশতার সংখ্যা সমান।” মূল আরবীতে কথাটির বর্ণসংখ্যা তেত্রিশ, আর তাই তেত্রিশজন ফিরিশতা এই যিকিরের বদৌলতে নেকি লিখছিলেন সেই সাহাবীর আমলনামায়। ভাবা যায়!

কাজেই, আমরা যখন সালাতে দাঁড়াচ্ছি, দুআ পড়ছি, তা শুধুমাত্র 'অভ্যাসের-বশে-সালাত' হয়ে যাচ্ছে না তো? সালাতের সময় বলা দুআগুলো—কথাগুলো বুঝে পড়ছি তো? বুঝে বলছি তো?

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 সিজদায় অন্যান্য দুআ

📄 সিজদায় অন্যান্য দুআ


দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকের দুআ #১
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: রব্বিগফির লী, রব্বিগফির লী

অর্থ: হে আমার রব্ব! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার রব্ব! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।[৬৪]

দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকের দুআ #২
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়া'আফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা'নী

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। [৬৫]

রুকু / সিজদার দুআ #১
নবীজি রুকু এবং সিজদা, উভয় জায়গায় এই দুআ করতেন;
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ: সুবহা-নাকাল্লা-হুম্মা রব্বানা ওয়াবিহামদিকা, আল্লা-হুম্মাগফির লী
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের রব! আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি আপনার প্রশংসাসহ। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে মাফ করে দিন।[৬৬]

রুকু / সিজদার দুআ #২
سُبُّوحٌ قُدُّوسُ، رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوْحِ
উচ্চারণ: সুব্বূহুন কুদ্দুসুন রব্বুল মালা-'ইকাতি ওয়াররূহ
অর্থ: (তিনি/আপনি) সম্পূর্ণরূপে দোষ-ত্রুটিমুক্ত, অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত; ফিরিশতাগণ ও রূহ এর রব।[৬৭]

রুকু / সিজদার দুআ #৩
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিষ্পাপ। তবুও আল্লাহর কাছে ছোট-বড় সকল ধরনের পাপ থেকে বেঁচে থাকার জন্য রুকু এবং সিজদায় ক্ষমা চাইতেন এভাবে;
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ ، دِقَّهُ وَجِلَّهُ، وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ، وَعَلَانِيَتَهُ وَسِرَّهُ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লী যাম্বী কুল্লাহু; দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আউয়ালাহু ওয়া 'আখিরাহু, ওয়া 'আলানিয়্যাতাহু ওয়া সিররাহু
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন- তার ক্ষুদ্র অংশ, তার বড় অংশ, আগের গুনাহ, পরের গুনাহ, প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ।[৬৮]

টিকাঃ
[৬৪] আবু দাউদ ১/২৩১, নং ৮৭৪; ইবনু মাজাহ নং ৮৯৭। আরো দেখুন, সহীহ ইবনু মাজাহ, ১/১৪৮।
[৬৫] আবু দাউদ, ১/২৩১, নং ৮৫০; তিরমিযী, নং ২৮৪, ২৮৫; ইবনু মাজাহ, নং ৮৯৮। আরো দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ১/৯০; সহীহ ইবনু মাজাহ ১/১৪৮।
[৬৬] মুসলিম ১/৩৫৩, নং ৪৮৭; আবু দাউদ, নং ৮৭২
[৬৭] মুসলিম ১/৩৫৩, নং ৪৮৪; আবু দাউদ ১/২৩০, নং ৮৭২
[৬৮] মুসলিম ১/৩৫০, নং ৪৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00