📄 কর্ডোভা : এক আধুনিক শহর
কর্ডোভা সমাজ ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আমাদের অবগতির ওপর ভিত্তি করে প্রতীয়মান হয় যে, হিজরি চতুর্থ শতকের (খ্রিষ্টীয় দশম শতকের) মাঝামাঝি সময়ে কর্ডোভা একটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছিল, যাকে এই তৃতীয় সহস্রাব্দের আন্তর্জাতিক শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
বস্তুত এতে বিস্ময়বোধ করার কিছু নেই। কেননা, জনমানুষের শিক্ষার জন্য সেখানে বিদ্যালয়ের বিস্তার ঘটেছিল। অসংখ্য ব্যক্তিগত ও গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি পৃথিবীর মধ্যে কর্ডোভাতেই তখন সবচেয়ে বেশি গ্রন্থ ছিল! এ ছাড়া শহরটি পরিণত হয়েছিল সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে। সর্বপ্রকার জ্ঞানের সম্মিলন ঘটেছিল এ শহরে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটি ছিল নেতৃস্থানীয় শহর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে পড়াশোনা করতে পারত। শাসকরা নিজেদের অর্থ থেকে তাদের খরচ বহন করত। তাই এ দাবিতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, তথাকার জনগোষ্ঠী সকলেই সাক্ষর ছিল। কর্ডোভায় এমন একটি লোকও পাওয়া যেত না, যে ভালোভাবে পড়ালেখা জানত না। অথচ সেই সময়ে ইউরোপে মুষ্টিমেয় ধর্মীয় পণ্ডিত ছাড়া সম্ভ্রান্ত লোকেরাও অশিক্ষিত ছিল!
উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, কর্ডোভা নগরীতে সে সময় শুধু জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিগত বিপ্লবই সংঘটিত হয়নি, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক অবকাঠামোগত বিপ্লবও। তখন রাষ্ট্রে তৈরি হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নত প্রশাসনব্যবস্থা। যার মধ্যে ছিল আমিরশাসিত প্রদেশব্যবস্থা ও মন্ত্রিপরিষদ। বিচারব্যবস্থা, পুলিশবিভাগ, 'হিসবাহবিভাগ' ও অন্যান্য বিভাগেরও বিকাশ ঘটে।
এ ছাড়া বড় ধরনের শিল্পবিপ্লবও ঘটে। বিভিন্ন ধরনের শিল্পের উন্নতি সাধিত হয়। সেখানকার অনেক শিল্প প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। যেমন : চামড়াশিল্প, জাহাজশিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণশিল্প, ওষুধশিল্প ইত্যাদি। তা ছাড়া খনি থেকে সোনা, রুপা ও পিতল উত্তোলনেও উন্নতি ঘটে।
আমরা যদি কর্ডোভার নাগরিক জীবন ও তার আধুনিকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাই, এই নগরী পাঁচটি ছোট ছোট শহরে বিভক্ত ছিল। যেন তা পাঁচটি বড় বড় পল্লি। মাক্কারি জানাচ্ছেন, এক শহর থেকে অপর শহরের মাঝে বৃহদায়তন দুর্ভেদ্য প্রাচীর ছিল। প্রতিটি শহরই ছিল আলাদা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রত্যেক শহরের শহরবাসীর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ গণগোসলখানা, হাটবাজার ও শিল্প উৎপাদনব্যবস্থা ছিল।
মুজামুল বুলদান গ্রন্থে উল্লেখিত ইয়াকুত হামাবির বর্ণনা অনুযায়ী কর্ডোভার আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল এরূপ, সেখানকার বাজারগুলো সব ধরনের পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যে পরিপূর্ণ থাকত। আর প্রত্যেক শহরের বাজার ছিল আলাদা আলাদা।
এ পর্যায়ে মাক্কারির বরাত দিয়ে কর্ডোভার স্থাপত্যকীর্তি সম্পর্কে কিছু পরিসংখ্যান উল্লেখ করছি :
মসজিদ: আবদুর রহমান দাখিলের যুগে কর্ডোভার মসজিদ-সংখ্যা চারশ নব্বইয়ে উন্নীত হয়েছিল। তারপর এই সংখ্যা পৌঁছে তিন হাজার আটশ সাঁইত্রিশে।
জনসাধারণের গৃহ : দুই লাখ তেরো হাজার সাতাত্তরটি।
অভিজাত গৃহ : ষাট হাজার তিনশটি।
দোকান (স্টোর ও অন্যান্য): আশি হাজার চারশ পঞ্চান্নটি।
গণগোসলখানা: নয়শটি।
উপশহর: আটাশটি।
অবশ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভিন্নতার কারণে বা ঐতিহাসিকদের বর্ণনার বিভিন্নতার কারণে এসব জিনিসের সংখ্যায় তারতম্য দেখা যায়। কিন্তু এতে কিছু যায়-আসে না। কারণ এসব ভিন্নতা আভিজাত্য, গৌরব ও সৌন্দর্যের মাত্রাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে, এসব বিষয়ের অস্তিত্ব ও বাস্তবতা নিয়ে নয়।
ইসলামি শাসনামলে কর্ডোভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। অথচ বর্তমানে কর্ডোভাবাসীর সংখ্যা মাত্র তিন লাখ দশ হাজারের কাছাকাছি!
টিকাঃ
২৯৬. মুহাম্মাদ মাহির হাম্মাদাহ, আল-মাকতাবাত ফিল-ইসলাম, পৃ. ৯৯।
২৯৭. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ৫, পৃ. ২১৮।
২৯৮. মাক্কারি, নাফহুত তিব মিন গুসনি আন্দালুসির রাতিব, খ. ১, পৃ. ৫৫৮।
২৯৯. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০০. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৫৪০।
৩০১. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, আল-আসার সিয়্যাতুল বাকিক ফি আসবানিয়া ওয়াল- বুরতুগাল, পৃ. ১৯।
৩০২. http://ar.w ia.org. (২০ লাখ পঁচিশ হা অনুবাদক) না জনসংখ্যা তিন
📄 আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-সাহিত্যিকদের চোখে কর্ডোভা
মসুলের ব্যবসায়ী আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে হাওকাল (মৃ. ৩৬৭ হি.) ৩৫০ হিজরি/৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কর্ডোভা ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি এভাবে তার বর্ণনা দেন, আন্দালুসের অন্যতম বড় শহর কর্ডোভা। জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে কর্ডোভার মতো শহর মাগরিব অঞ্চলে একটিও নেই। বলা হয়ে থাকে, এটি দুই পার্শ্ববিশিষ্ট বাগদাদের একটি পার্শ্বের সাথে তুলনীয়। তবে কর্ডোভা যদি সেরকম নাও হয়ে থাকে, তবু তার কাছাকাছি তো অবশ্যই! গোটা নগরীটি পাথরের দ্বারা নির্মিত মজবুত প্রাচীরে বেষ্টিত। সেই প্রাচীরের গায়ে দুটি উন্মুক্ত ফটক রয়েছে। ফটকের দরজাগুলোর পথ রুসাফা এলাকার তীরবর্তী গোয়াদেল কুইভার নদীর দিকে চলে গেছে। আর রুসাফা হলো শহরের উঁচু অংশে নির্মিত বাসস্থানময় এলাকা, যার নিচে আছে ঘন বৃক্ষমালা। রুসাফার ভবনগুলো চতুর্দিক থেকে পরস্পর সংলগ্ন। তো (প্রাচীরের সেই পথটি) চলে গেছে গোয়াদেল কুইভার নদী পর্যন্ত। পথের আশপাশে আছে বাজার ও বেচাকেনার বিখ্যাত স্থান। সাধারণ মানুষের বাসস্থান (রুসাফার নিম্নবর্তী) ঘন গাছবিশিষ্ট স্থানে। সেখানকার মানুষেরা সম্পদশালী ও বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক।
কর্ডোভার নাগরিকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, মানুষের মাঝে তারা অভিজাত শ্রেণি, মর্যাদাশালী এবং আলেম-উলামা ও জ্ঞানীগুণী সম্প্রদায়। এ প্রসঙ্গে শরিফ ইদরিসি বলেন, কর্ডোভায় সবসময়ই বড় বড় আলেম-উলামা ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের বসবাস ছিল। এখানকার ব্যবসায়ীরা ছিল অত্যন্ত ধনবান। তারা খুবই অবস্থাসম্পন্ন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ছিল। তাদের উন্নতমানের জাহাজ ছিল। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য।
হিময়ারি বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের মূল ঘাঁটি এবং প্রধান শহর। উমাইয়া খেলাফতের কেন্দ্রস্থল ছিল এই শহর। তাদের নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন এখানে সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। কর্ডোভার শ্রেষ্ঠত্ব ও তার খলিফাদের কৃতিত্ব এত প্রসিদ্ধ যে তা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজনীয় বিষয়। তারা ছিলেন দেশের অভিজাত শ্রেণি ও শ্রেষ্ঠ মানুষ। বিশুদ্ধ মতাদর্শ, হালাল উপার্জন, সুন্দর বেশভূষা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আখলাক ও শিষ্টাচারের জন্য তারা ছিলেন বিখ্যাত। কর্ডোভায় বসবাস করতেন বড় বড় আলেম ও নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি।
কর্ডোভা সম্পর্কে ইয়াকুত হামাবিও বলেন, কর্ডোভা ছিল আন্দালুসের শ্রেষ্ঠ শহর, দেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সম্রাটের (খলিফার) আবাসস্থল ও শাসনকেন্দ্র। বনি উমাইয়ার সম্রাটগণ (খলিফাগণ) কর্ডোভাতেই বসবাস করতেন। এই শহর ছিল জ্ঞানীগুণীদের খনি ও প্রস্রবণের সাথে তুলনীয়।
আবুল হাসান আলি ইবনে বাসসাম শান্তারিনি (৪৫০-৫৪২ হি.) কর্ডোভা সম্পর্কে বলেন, (আন্দালুসে) কর্ডোভা ছিল চূড়ান্ত গন্তব্য, পতাকার কেন্দ্র, প্রধান নগরী, মর্যাদাবান ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের আবাসস্থল, জ্ঞানীগুণীদের ভূমি, রাজ্যের হৃৎপিণ্ড, জ্ঞানবিজ্ঞানের অবিরাম প্রস্রবণ, ইসলামের গম্বুজস্বরূপ, মহামান্য ইমামতুল্য, সুস্থ বিবেকবুদ্ধির গন্তব্যস্থল, অন্তরের জন্য ফলবাগানতুল্য, মেধা নিঃসৃত মণিমুক্তার সাগর। কর্ডোভার দিগন্ত থেকে উদিত হয়েছে পৃথিবীর তারকারা, উড্ডীন হয়েছে জগতের নিশানতুল্য ব্যক্তিবর্গ, বিকশিত হয়েছে গদ্য ও পদ্যের যোদ্ধারা। এখানে রচিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ রচনাবলি, লিখিত হয়েছে অমূল্য গ্রন্থরাজি। এসবের-এবং প্রাচীন কালে ও বর্তমান কালে এখানকার বাসিন্দাদের অন্য মানুষদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের-কারণ এই যে, তাদের নগরী তথা কর্ডোভার দিগন্তজুড়ে সবসময়ই বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষক ও জ্ঞান-অন্বেষকদের আবাসস্থল ছিল। মোটকথা, এই দিগন্তের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষভাবে কর্ডোভার মানুষ এবং ব্যাপকভাবে গোটা আন্দালুসের মানুষ ছিল আন্দালুসবিজয়ী প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ আরবগণ এবং এ অঞ্চলে আবাস নির্মাণকারী শাম ও ইরাকের মহান সেনাপতিবৃন্দ, এরপর তাদের অভিজাত বংশধররাই এতদঞ্চলের অধিবাসীরূপে অবস্থান গ্রহণ করে। তাই আন্দালুসে এমন কোনো শহর ছিল না, যেখানে দক্ষ লেখক বা স্বনামধন্য কোনো কবি ছিল না।
ইবনুল ওয়ারদি তার খারিদাতুল আজায়িব গ্রন্থে কর্ডোভা ও তার অধিবাসী সম্পর্কে বলেন, কর্ডোভাবাসীরা ছিল গোটা দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষ। খাদ্য-পানীয়, বাহন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা-সব দিক থেকে তারা ছিল অভিজাত ও সেরা। কর্ডোভাতেই ছিলেন সেরা আলেমগণ, নেতৃস্থানীয় জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ, বীর সেনাপতিগণ এবং দুঃসাহসী যোদ্ধারা। এরপর তিনি কর্ডোভার জামে মসজিদ ও সেতুর বর্ণনা দিয়ে বলেন, এই শহরের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা এত বেশি যে তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
মোটকথা, ইসলামি সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরের নাম হলো কর্ডোভা, যা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এবং তার চাকাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে বাস্তবিকতা এই যে, সেই যুগে এরূপ শহর একমাত্র কর্ডোভাই ছিল না; বরং আমরা চাইলে বাগদাদ, দামেশক, কায়রো, বসরা বা অন্যান্য শহর সম্পর্কেও এমন আলোচনা করতে পারি। সেসব শহরও কর্ডোভার মতো বিস্ময়কর ছিল অথবা বলা যায় তার চেয়েও বেশি। না, এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই! কেননা এটা হলো মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন, যা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সভ্যতা এবং দীর্ঘ মানবেতিহাসের ললাটে এক গৌরবপূর্ণ শুভ্রচিহ্ন।
টিকাঃ
৩০৩. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৪. ইদরিসি, নুজহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক, খ. ২, পৃ. ৫৭৫।
৩০৫. হিময়ারি, আর-রওযুল মিতার ফি খবারিল আকতার, পৃ. ৪৫৬।
৩০৬. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৪, পৃ. ৩২৪।
৩০৭. আবুল হাসান ইবনে বাসসাম, আয-যাখিরা ফি মাহাসিনি আহলিল জাযিরা, খ. ১, পৃ. ৩৩।
৩০৮. ইবনুল ওয়ারদি, খারিদাতুল আজায়িব ওয়া ফারিদাতুল গারায়িব, পৃ. ১২।