📄 বাইআত (তথ্য খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার)
বিশ্বমানবতার কল্যাণে কাজ করা সকল সভ্যতার মধ্যে ইসলামি সভ্যতা এক অনন্য আসন তৈরি করেছে। সকল ধর্মের জন্য ইসলামি সভ্যতার চমৎকার ও উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হচ্ছে বাইআত (খলিফার আনুগত্যের অঙ্গীকার) ব্যবস্থা। লক্ষণীয় বিষয়, এর আগে কোনো সভ্যতায় বাইআত ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল না। বাইআতের অর্থ যদি হয় আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার, অপর দিকে এর অর্থ হলো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যদিও ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর পরিমাণ খুব সামান্যই দেখা যায়। তারপরও এটি ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য।
'বাইআত' মানে প্রশাসকের বিধিনিষেধ মানা এবং তার সকল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকারনামা। সেই কার্যক্রমের মূল হলো আল্লাহর শরিয়ত অনুযায়ী দ্বীন ও দুনিয়ার সকল সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা। পাঠক জেনে অবাক হবেন, বাইআতের বেলায় ইসলাম নারী-পুরুষ বা বড়-ছোটর মাঝে কোনো তারতম্য করেনি। এটিই জনগণের মধ্যে সাম্য ও ভারসাম্য তৈরি করার অন্যতম উপাদান। কারণ, দেশ ও সমাজের উন্নয়নে সকল শ্রেণির অবাধ অংশগ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।
ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই আলো ছড়িয়েছে বাইআত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে সাহাবিগণ একাধিকবার বাইআত গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার বাইআত, বাইআতুর রিদওয়ান, বিশ্বনবীর হাতে তায়েফবাসীর বাইআত গ্রহণ ইত্যাদি। এ ছাড়াও ছোট-বড় বহু দল তার কাছে বাইআত গ্রহণ করেছিল। আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করা পুরুষদের সংখ্যা অগণিত। তেমনই মহিলাদের মধ্যেও বিরাট সংখ্যক আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছেন বলে প্রমাণিত। ইমাম ইবনুল জাওযি রহ. রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ৪৫৭ উল্লেখ করেছেন। তবে তারা সবাই মুসাফাহার মাধ্যমে নয়, মৌখিকভাবে বাইআত গ্রহণ করেন। এমনকি আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুদের পর্যন্ত বাইআত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের বাইআত গ্রহণকালে তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। (৩৭)
এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, ইসলামি সভ্যতা এক পরিপূর্ণ ও সফল সভ্যতা। এক জীবন্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যা সমাজের প্রতিটি সদস্যের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করে। আশপাশে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনায় তার সুষ্ঠু অংশগ্রহণে জোর তাগিদ দেয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক আদর্শ থেকেও এর প্রমাণ মেলে। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই তিনি বাইআতের রীতি প্রচলন করেন। কুরআনুল কারিমের একাধিক স্থানেও আমরা বাইআতের উল্লেখ পাই। এখান থেকেই ইসলামি সভ্যতায় বাইআতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। সুরা ফাতহ-এ মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো মূলত আল্লাহর কাছেই আনুগত্যের শপথ করে। তাদের হাতের ওপর রয়েছে আল্লাহর হাত। (৩৮)
একই সুরায় অন্যত্র বলেন, لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। তাদের অন্তরে যা ছিল আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এরপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদের পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়। (৩৯)
ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব বোঝাতে আল- কুরআনে নারীদের প্রতিও বাইআত গ্রহণের নির্দেশ এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন,
فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ
তাদের (নারীদের) বাইআত গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। (৪০)
বিশ্বনবীর পরিপূর্ণ অনুকরণ নিশ্চিত করতে মুসলিমগণ পরবর্তীকালে বাইআতকে রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং নেতা নির্বাচনে জনগণের সুষ্ঠু অংশগ্রহণের অন্যতম উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেন।
সম্মিলিত পরামর্শ ছাড়া একজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেতা নির্বাচনের ঘোর বিরোধী ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। হজের সময় একবার এ বিষয়টি তার কানে গেলে মুসলিমবিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত হাজিদের উদ্দেশে খলিফা নির্বাচনের শর্ত এবং বাইআত ও শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত একটি ভাষণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। তখন কেউ কেউ বললেন, হজের মৌসুমে তো বিভিন্ন ধরনের মানুষের সমাগম হয়। তাদের মধ্যে এমনও আছে যারা আরবি ভাষা ঠিকমতো বোঝে না। ফলে তারা বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝেই তাদের দেশে ফিরে যাবে এবং এতে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তারচেয়ে ভালো হবে আপনি বিষয়টি মুলতবি রেখে মদিনায় ফেরার পর জ্ঞানী-গুনী ও বুদ্ধিমানদের সামনে এ নিয়ে কথা বললে। উমর রা. তাই করলেন। আল্লাহর রাসুলের মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, আমার কাছে সংবাদ এসেছে, আপনাদের মাঝে অনেকে বলেন, আল্লাহর শপথ, উমরের ইনতেকাল হয়ে গেলে আমি অমুকের হাতে বাইআত গ্রহণ করব। ভালো করে শুনে রাখো, আবু বকরের বাইআত গ্রহণটি ছিল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ত্বরিত শপথ গ্রহণ মাত্র-এ কথা বলে কেউ যেন প্রতারিত না হয়। হ্যাঁ, সেটি এরকমই ছিল। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আবু বকরের মতো গুরুজন এমন কেউ নেই এখন, যার দিকে মানুষ ঘাড় উঁচু করে দেখে। মুসলিমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছাড়া যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, বাইআতগ্রহীতা ও বাইআতকারী উভয়েই হত্যার উপযুক্ত সাব্যস্ত হবে। (৪১) এরপর তিনি আবু বকর রা.-এর শপথ গ্রহণের বিষয়টি টেনে তখনকার পরিস্থিতির কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেন। ত্বরিত বাইআত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কার বিষয়টি তিনি মানুষের কাছে পরিষ্কার করেন। আর আবু বকর রা.-এর গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে কোনো মুসলিমের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। পক্ষান্তরে উমর রা.-এর বাইআত গ্রহণের বিষয়টিও ছিল বড় মাপের একদল সাহাবির সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ফসল। পরবর্তীকালে তা ইজমায়ে উম্মত হিসেবে গণ্য হয়। এ থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার যে, বাইআত বা শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হবে। মনোনীত ও বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও আলেমদের পরামর্শের মাধ্যমেই নেতা নির্বাচন সম্পন্ন হবে। (৪২)
উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর মতো অনেক খলিফা বাইআতের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। যদিও তিনি চাচাতো ভাই সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক কর্তৃক পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার নির্ধারিত চুক্তিপত্রের সিদ্ধান্তের ওপর সাধারণ মুসলিমগণ সুলাইমানের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, তারপরও জনগণের পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণের ওপর তিনি জোর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, জনগণ যদি সন্তুষ্টচিত্তে তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়, তবেই তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তাকে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে এমন সংবাদ শোনার পর উমর ইবনে আবদুল আযিযের দেওয়া প্রথম ভাষণেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সেই ভাষণে তিনি বলেন, হে লোকসকল, এ পদের প্রতি সামান্য চাহিদা বা লোভ আমার ছিল না, তারপরও আমার ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মুসলিমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছাড়াই। তাই আমার হাতে বাইআতের যে দায়িত্ব আপনাদের ঘাড়ে ছিল, তা থেকে আপনাদের মুক্ত ঘোষণা করছি। এখন আপনারাই আপনাদের পছন্দ অনুযায়ী খলিফা নির্বাচন করুন। এ কথা শুনে উপস্থিত সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, আমরা আপনাকেই নির্বাচন করেছি হে আমিরুল মুমিনিন। আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। তাই আপনিও সন্তুষ্টচিত্তে কল্যাণের জন্য আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। (৪৩) এ ঘটনাটিতে উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ.-এর দুনিয়াবিমুখতা প্রকাশের পাশাপাশি ইসলামি সভ্যতার ধারকবাহকদের চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং যোগ্য নেতা নির্বাচনে তাদের পরিপক্বতার বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে মুসলিম স্কলারগণ বাইআত গ্রহণের জন্য অপরিহার্য পাঁচটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। সেগুলো হলো:
১। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, তার মধ্যে ইমামতের জন্য প্রযোজ্য সকল শর্তের উপস্থিতি থাকতে হবে। খিলাফত অধ্যায়ে এ বিষয়ে আমরা সবিস্তারে আলোচনা করেছি।
২। বাইআত ব্যবস্থাপক ব্যক্তিকে অবশ্যই বিজ্ঞ ইসলামিক স্কলার বা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের হতে হবে। যার কথা সবাই অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেবে।
৩। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, বাইআতের প্রতি তার ইতিবাচক মনোভাব থাকতে হবে এবং বাইআত পরবর্তী দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে তাকে পুরো প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি সে বাইআত করতে অনীহা প্রকাশ করে তাহলে জোরপূর্বক তাকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।
৪। বাইআত গ্রহণকারী একজন হলে সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। তবে সংঘবদ্ধভাবে হলে সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।
৫। যার হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে, তিনি হবেন একজন। একাধিক ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা যাবে না। (৪৪)
কোনো সন্দেহ নেই, মুসলিম স্কলারদের প্রণীত ও স্বীকৃত এসব শর্ত ইসলামি শাসনব্যবস্থার উন্নত নিদর্শন এবং ইসলামি সভ্যতার অনন্য অবদান। কারণ এসব শর্ত ও বিধি প্রণয়নের একমাত্র লক্ষ্য একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কল্যাণের বিষয় সংযুক্ত করা।
বাইআত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং খিলাফত গ্রহণের অন্যতম মৌলিক শর্ত হওয়ায় ইসলামি সভ্যতার পুরো ইতিহাসেই আমরা বাইআতের প্রতিফলন দেখতে পাই। এমনকি খিলাফতের পর্ব যখন একেবারে দুর্বল ও অন্তিম মুহূর্তে, তখনও ইসলামি খলিফাগণ এ বাইআতকে কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন সে ঘটনাগুলোও আমাদের জানা। সেলজুক শাসনামলেও মুসলিমগণ বাইআত গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এমনকি ৪৮৫ হিজরিতে বাগদাদের প্রধান বিচারপতি আবুল হাসান দামিগানি নবনিযুক্ত খলিফা মুস্তারশিদ বিল্লাহর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। বাইআতের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে শুরুতেই খলিফা মুস্তারশিদ বিল্লাহ রাষ্ট্রের বিজ্ঞ ইসলামিক স্কলারদের বাইআত গ্রহণে এবং তাদের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে মনোযোগ দেন। তৎকালীন বাগদাদের বিজ্ঞ স্কলার এবং হাম্বলি মাযহাবের বিদগ্ধ আলেম আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল রহ. বলেন, মুস্তারশিদ বিল্লাহ খলিফা হওয়ার পর তিনজন সরকারি কর্মচারী আমার সঙ্গে দেখা করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন আপনাকে তলব করেছেন। এরপর রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে দেখি প্রধান বিচারপতি তার সামনে দাঁড়ানো। তিনি আমাকে বললেন, তিনিই আমিরুল মুমিনিন (তিনবার)। তখন আমি বললাম, তাহলে এটি আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমাদের ও জনগণের ওপর আল্লাহর পরম কৃপা। এরপর আমি হাত বাড়িয়ে দিই। তিনিও নিজ হাত প্রসারিত করে সাড়া দেন। আমি সালাম দিয়ে মুসাফাহা করি। এরপর বাইআত গ্রহণ করে বলি, আমি কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতে রাসুল এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শের ওপর আমিরুল মুমিনিন মুস্তারশিদ বিল্লাহর হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম। আশা করছি, তিনি নিজ সাধ্যমতো কুরআন-সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকবেন। এ ব্যাপারে আমি তার আনুগত্য প্রকাশ করলাম। (৪৫)
নববি যুগ থেকে চলে আসা এ অনুপম রীতি ও সুমহান ঐতিহ্যের মাধ্যমে নতুন খলিফা নির্বাচনে প্রজা বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কোনো সন্দেহ নেই, এসব ঘটনা ইসলামি সভ্যতার অনন্য কীর্তি ও অসামান্য অবদান, যা মানুষের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দেয়। এভাবেই একজন খলিফা, বিচারক থেকে শুরু করে ইসলামি স্কলার, আলেম, ফকিহসহ সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে রাষ্ট্রপ্রধানের আসন অলংকৃত করেন।
ইসলামি সভ্যতায় সবসময় বাইআত ছিল একটি সমুজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যের মতো। নবনিযুক্ত প্রার্থী থেকে শুরু করে এমনকি পদত্যাগকারী সকলেই নিজেদের জন্য এবং তাদের যোগ্য পুত্র, ছোট-বড় সকলের জন্য জনগণের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু বাইআত গ্রহণে সমান গুরুত্বারোপ করতেন। এ অনুপম রীতি শুধু একটি ইসলামি রাষ্ট্রেই নয়, তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিটি অংশে, প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে এমনকি স্পেনেও বিরাজমান ছিল। মরক্কোয় প্রতিষ্ঠিত ইদরিসীয় সাম্রাজ্যের আমির ইদরিস ইবনে ইদরিস ইবনে আবদুল্লাহ মাত্র এগারো বছর বয়সে জনগণের পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাস্তবেও তিনি ছিলেন দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য, স্পষ্টভাষী ও দুরন্ত সাহসী। মিম্বারে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, সকল বন্দনা আল্লাহর। তাঁরই প্রশংসা করছি। তাঁর কাছে ক্ষমা চাইছি। তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁরই ওপর ভরসা করছি। নিজের ও সকল অনিষ্টকারীর অনিষ্ট থেকে আমি তাঁরই আশ্রয় চাচ্ছি। সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। জিন ও ইনসানের প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে তিনি আগত। আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহর দিকে তিনি মানুষকে আহ্বান করেন। তিনি সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি, তাঁর সম্মানিত পরিবারবর্গের প্রতি রহম করুন। তাঁর পরিবারকে আল্লাহ সকল অনিষ্ট ও অপবাদ থেকে সুরক্ষা দান করেছেন এবং তাদের পূত-পবিত্র করেছেন। হে লোকসকল, এ পদে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর সকলেই জানেন, এ পদের কেউ ভালো কাজ করলে তার প্রতিদান সে বহুগুণ বেশি পাবে। তেমনই মন্দ কাজ করলে শাস্তিও তার দ্বিগুণ হবে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এর জন্য সঠিক লক্ষ্যেই আছি। তাই অন্য কারও প্রতি আপনারা মনোনিবেশ করবেন না। কারণ ন্যায় প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন আপনারা লালন করেন, তা আমাদের মাঝেই পাবেন। এরপর তিনি মানুষকে বাইআতের আহ্বান জানান। সকল স্তরের মানুষকে আনুগত্যের স্বীকৃতি দিতে উৎসাহ দেন। মানুষ তার স্পষ্টবাদিতা ও কৈশোরের এ অসামান্য দূরদর্শিতা দেখে অভিভূত হয়ে যায়। এরপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে এলে মানুষ তার হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তার হস্তচুম্বন করতে ভিড় করে। এরপর তিনি মরক্কোর যানাতা, আওরাবা, সানহাজা, গামারাসহ সকল বারবারীয় জাতি-গোষ্ঠীর বাইআত গ্রহণ করেন। এভাবেই তাঁর বাইআত প্রক্রিয়াটি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। (৪৬)
এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি, ইসলামি সভ্যতায় বাইআত ছিল মানবতার প্রতি এক অসামান্য অবদান। যার ফলে সমাজের ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবার ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল এই মহান ব্যবস্থা। কোনো সন্দেহ নেই সাম্প্রতিক পশ্চিমা সভ্যতার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে ছিল ইসলামি সভ্যতা। পাশ্চাত্যের অধুনা সভ্যতা শুধু ব্যক্তিবিশেষের শর্তসাপেক্ষে স্বাধীনতা দিয়েছে। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে (১২১৫ খ্রি.) কিং জন ব্রিটেনের সাম্রাজ্যাধিপতি হওয়ার পর 'অ্যারিস্টোক্রেসি' নামে মানবতার প্রতি মূল্যবোধ প্রদর্শনের যে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, (৪৭) তা ছিল শুধুই নির্দিষ্ট কিছু লোক এবং একটি গোষ্ঠীর স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ, গোটা মানবতার নয়। অনেকে এই ঘটনাকে ব্রিটিশ প্রশাসনের দৃষ্টিতে গণস্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জনে একটি মাইলফলক হিসেবে মনে করেন। বরং কেউ কেউ খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে অবশেষে মানবতার মূল্যবোধের স্বীকৃতি প্রদান সম্ভব হয়েছে বলে গর্ববোধ করে এটিকে অভূতপূর্ব সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন। অথচ ইসলামি সভ্যতা কখনো মানুষের মাঝে বৈষম্য তৈরি করেনি। নেতা বা প্রশাসক নির্বাচনেও জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রচলন করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের ধনী-গরিব সকলের সুষ্ঠু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ইসলামি সভ্যতা।
টিকাঃ
৩৭. কাত্তানি, আত-তারাতিবুল ইদারিয়্যা, খ. ১, পৃ. ২২২।
৩৮. সুরা ফাতহ: ১০।
৩৯. সুরা ফাতহ: ১৮।
৪০. সুরা মুমতাহিনা: ১২।
৪১. ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ৩৩০-৩৩১।
৪২. মুহাম্মাদ রশিদ রেজা, আল-খিলাফা, পৃ. ২০-২১।
৪৩. আজুররি, আখবারু আবি হাফস উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ৫৬; ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৪৫, পৃ. ৩৫৭।
৪৪. আজুররি, আখবারু আবি হাফস উমার ইবনে আবদুল আযিয, পৃ. ৫৬; ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, খ. ৪৫, পৃ. ৩৫৭।
৪৫. কালকাশান্দি, মাআসিরুল ইনাফা, খ. ১, পৃ. ১৭৬।
৪৬. আহমাদ ইবনে খালেদ আন-নাসিরি, আল-ইসতিকসাউ লি-আখবারি দুওয়ালি মাগরিবিল আকসা, খ. ১, পৃ. ২১৮।
৪৭. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৬, পৃ. ২৭৪-২৭৫।
📄 পরবর্তী খলিফা নির্বাচন
পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়া ইসলামি রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত। সূচনালগ্নে ইসলামি বিশ্ব যেরকম দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, একের পর এক দেশ বিজয়, নতুন নতুন সভ্যতার সঙ্গে পরিচয় ঘটছিল, নানা বর্ণের নানা জাতের নানা ভাষার মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন বাস্তবেই যোগ্য নেতৃত্ব গঠনের স্বার্থে এরকম নতুন ও আধুনিক ব্যবস্থা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল।
'অলিয়ে আহদ' হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে বর্তমান খলিফা বা শাসক তার মৃত্যুর পর শাসক হিসেবে নিযুক্ত করবেন। এরকম মনোনীত ব্যক্তি একজনও হতে পারেন, ক্রমান্বয়ে একাধিকও হতে পারেন। খলিফা কর্তৃক তার কোনো পুত্র অথবা পিতাকে পরবর্তী শাসক হিসেবে ঘোষণা করা অনেক ফিকহি মাযহাবেও স্বীকৃত। কারণ বর্তমান খলিফা হলেন আমিরুল মুমিনিন। তার আনুগত্য জনগণের ওপর ফরয। তিনি নিজে কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করলে অন্য কারও এখানে দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। তার রেখে যাওয়া আমানতের ব্যাপারে কোনোপ্রকার অপবাদের সুযোগ থাকবে না। বিরুদ্ধাচরণ করার উপায় থাকবে না। (৪৮)
ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচন প্রক্রিয়ার উদ্ভাবক হলেন খলিফা মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. (মৃ. ৬০ হি.)। এটি ছিল তার 'ইজতিহাদি' উদ্ভাবন। এর পেছনে কারণও ছিল যথেষ্ট। কেননা পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত না করে গেলে রাষ্ট্রে গোলযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ভয় ছিল যে, বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে গোটা রাষ্ট্র, পরবর্তী সময়ে যা পুরো মুসলিমজাতির জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কারণ তখন শামের অধিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীই ছিলেন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড এবং তারা ছিলেন খলিফা মুআবিয়া এবং তার পুত্র ইয়াযিদের সমর্থক। (৪৯)
বাস্তবতা হলো, পুত্র ইয়াযিদের বাইআতের জন্য মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সকল অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। শুধু তিনজন সাহাবি ও সাহাবিপুত্র এতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। (৫০) তবে এ ব্যাপারে তিনি ইজমায়ে উম্মত (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) অর্জনে সক্ষম হন। এর পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল উম্মতকে বিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা। আর এটাই ছিল তার কাছে সবকিছু থেকে অগ্রগণ্য।
যদিও মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর হাতে ولاية العهد বা পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়, তবে সেখানেও নতুন শাসকের জন্য বাইআত ব্যবস্থা বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়া স্বমহিমায় বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই মুআবিয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল উমাইয়া খলিফা শাসনকর্তার জন্য উন্নত চরিত্র ও অপরিহার্য সকল গুণের উপস্থিতিকে তারা জরুরি মনে করতেন। যাদের মাঝে এসব গুণ ও শর্ত অনুপস্থিত থাকত, তাদেরকে এড়িয়ে যেতেন। গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানে তাদের বারণ করতেন। তাদের কাছে বাইআত গ্রহণ করতে মানুষও অনীহা প্রকাশ করত। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই, খলিফা বা শাসকের মাঝে কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক, সেগুলো মুআবিয়া রা. আগেই সবিস্তারে বর্ণনা করে গেছেন। যেমন সত্যবাদিতা, বদান্যতা, সহনশীলতা, নিষ্কলুষতা, বীরত্ব। (৫১) পাশাপাশি সহিষ্ণুতা ও দানশীলতার গুণ থাকাও অপরিহার্য বলে মনে করতেন। কারণ সহিষ্ণুতা বিরোধিতা থেকে রক্ষা করবে। ঐক্যের পথ সুগম করবে। এ কারণেই তিনি ইয়াযিদকে বলতেন; পুত্র আমার! সহিষ্ণুতা অবলম্বন করলে কখনো অনুশোচনায় পড়তে হবে না তোমাকে। (৫২)
বড় পুত্রকেই পরবর্তী শাসক হিসেবে নিয়োগ করতে হবে এমন কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না। তবে খলিফাগণ পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই পরবর্তী খলিফার পদের জন্য মনোনীত করতেন। আবার কখনো রাজপরিবারের বাইরের লোককেও পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দিতেন।
যাই হোক, সকল খলিফাই ইসলামের মৌলিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল ছিলেন। ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়াই প্রথম তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। যে অভিযানের ব্যাপারে স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। সেই অভিযানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের তিনি প্রশংসা করে বলেছেন,
أَوَّلُ جَيْشٍ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُوْنَ مَدِينَةَ قَيْصَرَ مَغْفُوْرٌ لَهُمْ
রোমসম্রাটের শহর অভিযানকারী আমার উম্মতের প্রথম সেনাবহর আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত। (৫৩)
এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত একজন খলিফা হলেন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। তিনি উমাইয়া খিলাফত সাম্রাজ্যে দীর্ঘ ৬৫ হি. থেকে ৮৬ হি. পর্যন্ত শাসন করেন। ইসলামি রাষ্ট্র তার আমলে বিশাল বিস্তৃতি লাভ করে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম। তার আমলে যথাক্রমে মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৫৪) চীন বিজয় করেন। কুতাইবা ইবনে মুসলিম আল-বাহেলি (৫৫) সমরকন্দ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো বিজয় করেন। মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম হিন্দুস্তান বিজয় করেন। মুসা ইবনে নুসাইর (৫৬) প্রথমে উত্তর আফ্রিকা ও পরে আন্দালুস বিজয় করেন। শুনে অবাক হতে হয়, উমাইয়া শাসনামলেই ইসলামের এত সব বিজয় সম্পন্ন হয়। ফলে এসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দ্রুত ইসলামি সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ে। (৫৭)
৯৯ হিজরিতে ইনতেকাল করা খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক পরবর্তী খলিফা হিসেবে উমর ইবনে আবদুল আযিযের (মৃ. ১০১ হি.) নাম ঘোষণা করেন। অথচ তখন পরবর্তী খলিফা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তার ভাই হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের (মৃ. ১২৬ হি.)। (৫৮) এ থেকেই বোঝা যায়, পরবর্তী খলিফা নির্বাচন নিজ পরিবার বা আপনজন থেকেই করতে হবে এরকম কোনো লিখিত নিয়ম ছিল না।
সেরকমই আরেকটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই আবদুর রহমান ইবনে মুআবিয়া আদ-দাখিলের (মৃ. ১৭২ হি.) ঘটনা থেকে। তার দুই পুত্র হিশাম ও সুলাইমান উভয়েই ছিলেন খলিফা হওয়ার যোগ্য আর সুলাইমান ভাইদের মধ্যে বড় ছিল। তৃতীয় পুত্র ও তাদের আরেক ভাই আবদুল্লাহকে তাদের মধ্যে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণে সালিস নির্ধারণ করেন। খলিফা আবদুর রহমান ছিলেন তখন মৃত্যুশয্যায়। পুত্র হিশাম তখন মারদা (৫৯) অঞ্চলের গভর্নর। অপর পুত্র সুলাইমান টলেডো (৬০) অঞ্চলের প্রশাসক। অন্তিম মুহূর্তে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, তোমার দুই ভাইয়ের মধ্যে যে তোমার কাছে আগে এসে পৌঁছবে, তার হাতেই তুমি আংটি (সিল) ও নেতৃত্ব তুলে দেবে। হিশাম যদি আগে আসে তবে সে ধার্মিকতা ও সচ্চরিত্রে অতুলনীয়। সকলেই তাকে একবাক্যে মেনে নেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি সুলাইমান আগে আসে, তবে বয়সের দিক থেকে পরিণত হওয়ায় এবং শামবাসীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় সেও যথেষ্ট উপযুক্ত। এরপর সুলাইমানের আগে ছোট পুত্র হিশাম এসে কর্ডোভার নিকটবর্তী রাসাফায় অবতরণ করেন। ছোট ভাই আবদুল্লাহ কর্ডোভায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তার ব্যাপারে হিশাম যথেষ্ট শঙ্কিত ছিলেন; কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবদুল্লাহ তার ভাই হিশামের কাছে ছুটে যান। পিতার ওসিয়তমতো হিশামের হাতে খিলাফত ও আংটি হস্তান্তর করে তাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসেন। (৬১)
এ থেকেই প্রতীয়মান হয়, স্পেনের খলিফা আবদুর রহমান আদ-দাখিল তার পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকেই খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি জানতেন, তার পুত্রদের মধ্যে পরবর্তী খলিফা হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে হিশাম। কারণ খোদাভীতি, দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে তার পারদর্শিতাসহ খলিফা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্তই তার মাঝে বিদ্যমান ছিল; কিন্তু তারপরও নিজ পুত্রদের মাঝে সংঘাত তৈরি হোক, খিলাফত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হোক, এটা তিনি চাননি। কারণ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে সুলাইমানই পরবর্তী পদের অধিকারী হওয়ার কথা; কিন্তু সেই সংঘাত এড়াতে সুকৌশলে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেন। কর্ডোভায় যে আগে পৌঁছবে তার হাতেই খিলাফতের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে বলে পুত্র আবদুল্লাহকে ওসিয়ত করেন। এরপর আবদুর রহমান আদ-দাখিলের অনুমান সত্যি হয়। পুত্র হিশামই কর্ডোভায় আগে পৌঁছে যান। আর তিনিই ছিলেন পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
কোনো সন্দেহ নেই, পরবর্তী খলিফা নির্বাচনব্যবস্থাটি ইসলামি সভ্যতায় একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলামি ভূখণ্ড যতই বিস্তৃত হয়েছে, ততই সেটি আরও জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সুফল ছিল উম্মত বা জাতি হিসেবে মুসলিমদের একতা সুরক্ষা, যা ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয় খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত গোটা মুসলিমবিশ্বে বিদ্যমান ছিল।
টিকাঃ
৪৮. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১৩।
৪৯. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৪৪৫।
৫০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৩, পৃ. ২৪৮। তারা হলেন, হুসাইন ইবনে আলি, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা.।
৫১. নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব, খ. ৬, পৃ. ৪।
৫২. ইবনুত তিকতাকি, আল-ফাখারিয়্যু ফিল-আদাবিস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১০৫।
৫৩. বুখারি: কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: মা কি-লা ফি কিতালির রুম, ২৭৬৬।
৫৪. মাসলামা ইবনে আবদুল মালিক (৬৬ হি.-১২০ হি./৬৮৫ খ্রি.-৭৩৮ খ্রি.)। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা দামেশকে। যুদ্ধবিষয়ক অনেক ঘটনা তার থেকে বর্ণিত রয়েছে। দেখুন, তাহযিবুল কামাল, খ. ২৭, পৃ. ৫২৩।
৫৫. কিংবদন্তি সেনানায়ক, সুমহান বীরপুরুষ তিনি। খাওয়ারিজম ও বুখারার মতো এলাকাগুলো তার হাতেই বিজিত হয়। এরপর ফারগানা ও তুর্কি দেশসমূহও মুসলিমদের করতলগত করেন তিনি। দেখুন, ইমাম যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪১০।
৫৬. ৯৭ হিজরিতে ইনতেকাল করা এ সেনানায়কের বেড়ে ওঠা দামেশকে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ৮৮ হিজরিতে তাকে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে মনোনীত করেন। তারেক ইবনে যিয়াদের সঙ্গে মাত্র এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি স্পেন বিজয় সম্পন্ন করেন। তার ইনতেকাল হয় মদিনায়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৪৯৬; ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ৩১৮।
৫৭. ইউসুফ আল কারযাবি, তারিখুনাল মুফতারা আলাইহি, পৃ. ৮২।
৫৮. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৭৪।
৫৯. ফিলিস্তিনের একটি শহর।
৬০. স্পেনের একটি প্রাচীন শহর।
৬১. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব, খ. ২, পৃ. ৬১।
📄 জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক
ইসলামি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি কারণ হলো তা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মাঝে বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হয়েছে। সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল করতে পেরেছে যে, তাদের ও শাসক শ্রেণির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বরং শাসকবর্গ তাদের সেবক ও হিতৈষী। একজন শাসক সচ্ছলতা ও বিপদের মুহূর্তে জনগণের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক অটুট রাখবেন সেই মহান শিক্ষা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন। মদিনায় হিজরতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে 'মসজিদে নববি' নির্মাণের কাজে তিনি সাহাবিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। সেই ঘটনার জীবন্ত বর্ণনা উরওয়া রা.-এর বিবৃতিতে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, তখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সাহাবিদের সঙ্গে ইট বহনের কাজে অংশ নেন। ইট বহনের সময় তিনি বলছিলেন,
هَذَا الْحِمَالُ لَا حِمَالَ خَيْبَرَ، هَذَا أَبَرُّ رَبَّنَا وَأَطْهَرُ
আজকের এই ইট বহনের কাজটি খাইবার অঞ্চলের সাধারণ ইট বহনের মতো কোনো কাজ নয়। বরং এটি আমাদের মহান প্রতিপালকের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও পবিত্র একটি কাজ। তিনি আরও বলছিলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّ الْأَجْرَ أَجْرُ الْآخِرَةِ، فَارْحَمِ الْأَنْصَارَ وَالْمُهَاجِرَةَ
হে আল্লাহ, আখেরাতের পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ ও বড় পুরস্কার। তাই আনসার ও মুহাজির সম্প্রদায়ের প্রতি আপনার দয়া অব্যাহত রাখুন। (৬২)
কঠিন বিপদের মুহূর্তেও সাথিদের সঙ্গে থেকে তিনি তাদের মনোবল বাড়ানোর কাজ করেন। তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। খন্দক যুদ্ধে তিনি নিজে খননকাজে অংশ নেন। তখন তার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল ইবনে রাওয়াহার রচিত বিখ্যাত কাব্যমালা। তিনি মাটি অপসারণের কাজ করছিলেন। এমনকি কাজের চাপে তার পেটের সাদা অংশ মাটিতে লেপটে যায়। (৬৩) এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও নিরহংকারী চরিত্রের প্রভাব পড়ে সাহাবিদের মাঝে। যা ওই যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে তাদের ভেতর টনিকের মতো কাজ করে। তাদের সাহস ও মনোবল বাড়াতে তা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ফলে শত্রুদের পৌঁছার আগেই তারা সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ সেনাপতি, জনগণের বিপদের সময় যিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তাদের সঙ্গে একই সারিতে কাজ করে তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
বিশ্বনবীর পর তাঁর প্রতিনিধি হওয়া খুলাফায়ে রাশেদিনের মাঝেও আমরা সেই আদর্শ ও চরিত্রের প্রতিবিম্ব লক্ষ করি। বিশ্বনবীর তখন ইনতেকাল হয়ে গেছে। মুসলিমদের শাসক তখন আবু বকর রা.। উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর ভাষায়, মদিনার উপকণ্ঠে বাস করত এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, সেই অন্ধ বৃদ্ধার জন্য আমি পানির ব্যবস্থা করব। তার প্রয়োজন পূরণ করব। সেজন্য যখনই আমি তার কাছে আসতাম, দেখতাম আমার আগে কে যেন তার সকল প্রয়োজন পূরণ করে চলে গেছেন। প্রতিদিন আমার আগে কে এসে এই বৃদ্ধার প্রয়োজন পূরণ করে দেন তা দেখার জন্য একদিন আমি আগেভাগে এসে পাশের এক জায়গায় আত্মগোপন করে রইলাম। দেখি আবু বকর এসে বৃদ্ধার প্রয়োজন পূরণ করছেন। আর আবু বকর তখন আমিরুল মুমিনিন। তা দেখে উমর বলে উঠলেন, খোদার কসম! আপনিই তাহলে সেই লোক। (৬৪)
জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারা ছিলেন সদা তৎপর। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও সাধারণ মানুষের প্রতি যত্ন ও তাদের কল্যাণের জন্য শাসকদের কী পরিমাণ মনোযোগ ছিল, নোমান ইবনে মুকরিন রা.-এর প্রতি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর লেখা চিঠি থেকে এর প্রমাণ মেলে। চিঠির ভাষা ছিল এমন:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এটি আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনিন উমরের পক্ষ থেকে নোমান ইবনে মুকরিনের প্রতি। আসসালামু আলাইকুম। প্রথমে আমি আপনার কাছে আল্লাহর প্রশংসা শোনাচ্ছি। যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। পরকথা এই, নিহাওয়ান্দ শহরে বেশ কিছু অনারব জাতি-গোষ্ঠী আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমবেত হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। আমার চিঠি পাওয়ামাত্রই আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা হয়ে যাবেন। আল্লাহর সাহায্য ও মদদ আপনার এবং আপনার সঙ্গে থাকা মুসলিমদের সাথে আছে। কোনো দুর্গম প্রান্তর বা গহিন অরণ্য দিয়ে যাবেন না। তাহলে সাধারণ মুসলিমদের কষ্ট হবে। তাদের অধিকার নষ্ট করবেন না, নয়তো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাদের নিয়ে ঘন বৃক্ষলতায় ভরা জঙ্গলে প্রবেশ করবেন না। কারণ একজন মুসলিম আমার কাছে এক লক্ষ দিনারের চেয়েও বেশি মূল্যবান। আসসালামু আলাইকুম। (৬৫)
উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর অন্য একটি ঘটনায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ১৭ হিজরির শেষ দিকে মদিনায় খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে বছর বৃষ্টিবাদল কম হওয়ায় মদিনার সকল ফসলি জমি ও চাষাবাদের ভূমি শুকিয়ে ফেটে যায়। তাবাকাতে ইবনে সাদ-এ উল্লেখিত আছে, সে বছর একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কাছে মাখন মেশানো রুটি আনা হলে তিনি একজন বেদুইনকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খেতে বসেন। বেদুইন প্লেটের একপাশ থেকে বড় বড় লুকমায় দ্রুত রুটি খেতে থাকে। তা দেখে উমর রা. বললেন, তুমি দেখছি বড় বড় লুকমায় সব রুটি মুহূর্তেই সাবাড় করে ফেলছ! বেদুইন বলল, বহুদিন হলো তেল আর মাখন-চোখে পড়ে না। অনেক দিন ধরে কাউকে এসব খাবার খেতে দেখি না। এ ঘটনার পর উমর রা. শপথ করেন, যতদিন না মানুষের এই দুর্দশার পরিবর্তন হচ্ছে ততদিন কোনো মাখন বা মাংস তিনি স্পর্শ করবেন না।
উমর রা. ছিলেন একজন খাঁটি আরব। মাখন আর দুধই ছিল তার প্রথম পছন্দ। মানুষ দুর্ভিক্ষে পড়ায় এসব খাবার তিনি নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেন। অনাহারে-অর্ধাহারে সে বছর তার গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। এভাবেই তিনি জনগণের দুঃখ-দুর্দশা নিজের গায়ে সয়ে নিয়ে অন্যসব শাসকের জন্য শ্রেষ্ঠ উদাহরণ স্থাপন করেন। সন্ধ্যায় শুধু তেল মাখানো রুটি দিয়েই খাবার সারতেন। একদিন একটি উট জবাই করে গোশত পাকিয়ে মানুষকে খাওয়ানো হয়। তার সামনে সেই উটের কুঁজ ও কলিজার সামান্য অংশ নিয়ে আসা হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, এগুলো কীসের? সবাই বলল, হে আমিরুল মুমিনিন, আজ যে উট জবাই হয়েছে সেই উটের। তা শুনে তিনি বললেন, উঠিয়ে নাও, সরিয়ে নাও। আমি খাব নরম গোশত ও কলিজা আর মানুষ খাবে হাড্ডি, তা কখনো হবে না। এ খাবার সরিয়ে সাধারণ খাবার নিয়ে এসো আমার জন্য। এরপর রুটি আর তেল আনা হলে তিনি রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে তেলের সঙ্গে মাখিয়ে খেয়ে নেন। এরপর বললেন হে ইয়ারফা, এই খাবার তুমি 'ছামাগ' (৬৬) গ্রামে থাকা আমার পরিবারের লোকদের দিয়ে এসো। তিন দিন হলো তাদের জন্য আমি কোনো খাবার পাঠাতে পারিনি। মনে হয় তারা এবার পেট ভরে খেতে পারবে। এগুলো তাদের দিয়ে এসো। (৬৭)
জনগণের প্রতি মুসলিম শাসকদের দরদ কেমন ছিল তার আরেকটি উদাহরণ আব্বাসি খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর (মৃ. ২২৭ হি.) অভিযান থেকে বোঝা যায়। রোমান সৈন্যবাহিনী একজন মুসলিম নারীকে বন্দি করলে সে চিৎকার করে সাহায্য চায়, হে মুতাসিম!! খলিফা মুতাসিমের কানে সে সংবাদ পৌঁছলে তিনি সিংহাসনে বসেই সেই আবেদনে সাড়া দেন, বলে ওঠেন, আমি প্রস্তুত, আমি প্রস্তুত। আর তৎক্ষণাৎ সিংহাসন ছেড়ে প্রাসাদে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন, আন-নাফির, আন-নাফির। (যুদ্ধের ডাক এসেছে। বেরিয়ে পড়ো সবাই।) এরপর তিনি বাহনে উঠে জিজ্ঞেস করেন, রোমানদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য কেল্লা কোনটি? সবাই বলল, আম্মুরিয়ার দুর্গ। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত কেউ তাতে আক্রমণ করেনি। এটি খ্রিষ্টানদের মূল ভূমি। কনস্টান্টিনোপলের চেয়েও তাদের কাছে এটি বেশি পবিত্র। এরপর মুতাসিম যুদ্ধের জন্য এত বিপুল পরিমাণ সেনা, অস্ত্র, খাদ্য ও পানীয়সামগ্রী, প্রয়োজনীয় আসবাব প্রস্তুত করলেন, যা ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধের জন্য কোনো খলিফা করেননি। এরপর অভিযান শুরু করে ৬ রমযান (২২৩ হিজরি) তিনি সেই স্থানে পৌছেন। ৫৫ দিন সেখানে অবস্থান করে সকল বন্দিকে মুক্ত করেন। এরপর তারাসুস অভিমুখে রওয়ানা হন। (৬৮)
এগুলো মুসলিম শাসকদের থেকে সংঘটিত কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়, বরং যে নীতি আদর্শের সংস্পর্শে এসে তারা এসব ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, সেই আদর্শের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে ইসলামি সভ্যতা। পৃথিবীর ইতিহাসে যার কোনো জুড়ি নেই। খলিফা হিশামের সেনাপতি আল-হাজিব আল-মনসুর মাত্র তিনজন মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অভিযান চালান। এ তিন নারী স্পেনের বেস্কিউ রাজ্যে গির্জায় কারাবন্দি ছিল। একবার মনসুরের পক্ষ থেকে একজন রাজদূত সেই গির্জা পরিদর্শনে গেলে বহুদিনের কারাবন্দি এক নারীকে তার কাছে নিয়ে আসা হয়। এরপর ওই নারী দূতকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, মনসুর কি শুধু নিজেই ভোগবিলাসে মত্ত থাকবে আর আমাদের দুঃখদুর্দশার কথা ভুলে যাবে? নিজে রাজকীয় পোশাক পরবে আর আমরা নোংরা পোশাকে অপবিত্র হয়ে দিনযাপন করব? আর কত বছর পর্যন্ত বিধর্মীদের এ কারাগারে আমাদের থাকতে হবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। আল্লাহর নামের দোহাই দিয়ে তার কাছে আবেদন করেন, যেন সে তার এই গ্লানির জীবনের অবসান ও কষ্ট-যন্ত্রণাকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং এ মর্মে তার থেকে শক্ত শপথ ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে আশ্বস্ত হন। এরপর এই দূত মনসুরের কাছে গিয়ে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বিষয় ও তথ্য তাকে অবহিত করেন। মনসুর তার কথা শেষ পর্যন্ত মন দিয়ে শোনেন। মনসুর আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে অস্বস্তিকর ঠেকেছে এরকম কিছু দেখেছ সেখানে? নাকি তেমন কিছু তুমি সেখানে পাওনি! এরপর দূত মনসুরকে ওই নারীর ঘটনা ও তাকে দেওয়া অঙ্গীকার সম্পর্কে অবহিত করেন। বন্দি নারীর সকল অভিযোগ ও শপথবাক্য হুবহু মনসুরের সামনে উপস্থাপন করেন। তা শুনে মনসুর দূতকে তিরস্কার করে বলেন, এ কথা তুমি প্রথমেই বলোনি কেন?! এরপর মনসুর ওই নারীসহ সকল মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন।(৬৯)
ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে এমনই ছিল শাসকদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক। যে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল সহানুভূতি, দয়া, উপকার সাধন ও আন্তরিকভাবে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হওয়া। ক্ষমতার লোভ বা কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়।
টিকাঃ
৬২. বুখারি, ৪১৮; মুসলিম, ৫২৪।
৬৩. ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৪৯৫। ইবনে কাসির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৩০৬; সুহাইলি, আর-রওযুল উনুফ, খ. ২, পৃ. ৩৩৬।
৬৪. সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, খ. ১, পৃ. ৭৪।
৬৫. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ২, পৃ. ৩৬৫।
৬৬. মদিনার নিকটবর্তী এক জায়গার নাম।
৬৭. ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খ. ৩, পৃ. ৩১২।
৬৮. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ৬, পৃ. ৪৫।
৬৯. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ১, পৃ. ৪০৪।
📄 শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান
ইসলামি সভ্যতা যুগ যুগ ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গমন করলেও মুসলিম স্কলারগণ হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। আর তাই তাদের লেখা অসংখ্য বইপুস্তক আমরা দেখতে পাই যার মাধ্যমে তারা ইসলামি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়কে আরও সুসংহত ও সমৃদ্ধ করতে বিপুল অবদান রেখে গেছেন। এসব রচনাসম্ভার মূলত তাদের প্রশাসনিক অবস্থার বাস্তব বিবরণ আমাদের সামনে তুলে ধরে। চোখে আঙুল দিয়ে শাসকদের নেতিবাচক দিকগুলো দেখিয়ে সংশোধনের পথ বাতলে দেয়।
এ কারণেই ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিম মনীষীগণ বইপুস্তক রচনার গুরুত্ব অনুধাবন করেন। ইসলামি রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গন এবং বাস্তব প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা যাদের লেখনীতে উঠে এসেছে তাদের অন্যতম হলেন বিখ্যাত ফিকহ বিশারদ আবু ইউসুফ রহ.(৭০)। তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর শিষ্য। الخراج আল-খারাজ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি শাসক ও জনগণের মাঝে কীরকম সম্পর্ক থাকবে এ বিষয়ে সাধারণ ইজতিহাদের গণ্ডি পেরিয়ে বেশ কিছু গঠনমূলক নির্দেশনা প্রদান করেন। ইমামের পূর্ণ আনুগত্যের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বেশ কিছু হাদিস উল্লেখ করে তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পেশ করেন। এর মধ্যে একটি হাদিস হলো:
إِنْ أُمَّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدُ حَبْشِيٌّ مُجَدَّعُ فَاسْمَعُوْا لَهُ وَأَطِيعُوا»
নাক/কান কাটা একজন হাবশিকেও যদি তোমাদের নেতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, তবুও তোমরা তার কথা শোনো। তার আদেশ মেনে চলো। (৭১)
এরপর হাসান বসরি রহ.-এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে এ বিষয়টি আরও জোরালো করে তোলেন, তোমরা শাসকদের নিন্দা করো না। ভালো কাজ করলে তারা পুরস্কার পাবে, আর তোমরা তাদের কৃতজ্ঞতা জানাবে। মন্দ কাজ করলে এর বোঝা তাকেই বহন করতে হবে, আর তোমরা শুধু ধৈর্য ধারণ করবে। (৭২)
আবু ইউসুফ রহ. আরও বলেন, একজন শাসকের উচিত জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। তাদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। তিনি তার বক্তব্যের সমর্থনে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে উপদেশ দিতে এসে এক ব্যক্তি বলল, اتق الله-আল্লাহকে ভয় করুন। মজলিসে উপস্থিত একজন ব্যক্তিটির স্পর্ধা দেখে তাকে ধমক দিলে উমর রা. তাকে বললেন, জনগণ যদি আমাদের কিছু না বলতে আসে তাহলে এ ধরনের জনগণের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। আর আমরা যদি তাদের মতামত না শুনি, তাহলে আমাদের মাঝেও কোনো কল্যাণ নেই। (৭৩)
এর দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামি রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান সূত্র হলো হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তবে যাই হোক, এটি হলো মতামত গ্রহণ ও উপদেশ প্রদানের আদলে রাজনৈতিক বিষয়ের একেবারে প্রাথমিক পদক্ষেপ। (৭৪)
এ কারণেই আমরা লক্ষ করি, হিজরি ৩য় শতকের গোড়া থেকেই লেখালেখি ও রচনা তৈরি রাজনীতিকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী করার একমাত্র উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় ইবনে কুতাইবা আদ- দিনাওয়ারি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু রচনা করেন। বইয়ের এই শিরোনামটিই সেই শতাব্দীতে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক ইস্যুতে মুসলিম মনীষীদের গভীর জ্ঞানের পরিচয় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে আমরা মনে করি। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই রাজনীতিকে মুসলিমগণ কেমন গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন এবং তারা কীরকম দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক উপহার দিয়েছিলেন এই বইয়ে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় এবং পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে ইসলাম শুধু ভ্রাতৃত্ব ও উদারতার ধর্ম নয়, রাজনীতি ও নেতৃত্বেরও ধর্ম।
ইবনে কুতাইবা গ্রন্থের সূচনা করেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা.-এর খিলাফত ইস্যু দিয়ে। আর ইতি টানেন খলিফা মামুনের বিবরণ দিয়ে। প্রত্যেক খলিফার বৃত্তান্ত ও খলিফাকেন্দ্রিক বর্ণনাগুলো পৃথকভাবে উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে বইয়ের বিন্যাস ঘটান। যেসব ইতিহাসগ্রন্থে লেখকের কোনো সংযোজন ছাড়া শুধু রেওয়ায়েত বা বর্ণনাকারীদের বিবৃতি সংকলন করা হয় এটি সেরকমই একটি বই। অনেকটা তারিখে তবারি এবং সিরাতে ইবনে হিশাম-এর মতো।
এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী দুই শতকে লেখা রাজনীতিকেন্দ্রিক বই বিশেষত খিলাফত ও খলিফাদের নিয়ে লেখা রচনাসমূহ আরও উন্নত ও পরিপক্ব চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটিয়েছে। খিলাফত ও শাসনব্যবস্থা বিষয়ক স্বনামধন্য লেখক ইমাম মাওয়ারদি রহ.-এর লেখা আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা ওয়াল-বিলায়াতু দ্বীনিয়া (الأحكام السلطانية والولايات الدينية ) বইটি সে কালের খুবই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বলে বিবেচিত হতো। বইটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবিক উভয় ক্ষেত্রেই সমান তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত হয়। এ ছাড়াও ইমাম মাওয়ারদির সমকালীন আরও অনেকের লেখা এ বিষয়ে আলো ছড়িয়েছে। যেমন হেলাল ইবনে মুহসিন আস-সাবির (৭৫) লেখা রুসুমুল খিলাফা। তবে এ বইটি এত গভীরভাবে বিশ্লেষণে যেতে পারেনি। আরও পরিষ্কার করে বললে একটি ইসলামি সমাজকে সুনিপুণভাবে নেতৃত্ব দেওয়া এবং উন্নতি ও অগ্রগতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যেসব উপায়-উপকরণের বর্ণনা ইমাম মাওয়ারদির লেখায় পাওয়া যায়, সেরকমটি রুসুমুল খিলাফাতে পাওয়া যায়নি।
মোটকথা, স্বসময়ে প্রধান বিচারপতির পদে দায়িত্বরত মাওয়ারদি নামের এই মহান পুরুষ তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা আল-কায়েম বি- আমরিল্লাহর একান্ত কাছের লোক ছিলেন। খলিফা ও বুওয়াই সাম্রাজ্যের (Buyid Dynasty) মাঝে দূত হিসেবে কাজ করতেন। ফলে রাজনৈতিক পটভূমিতে বহু দিনের কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি তার অনবদ্য আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা ওয়াল-বিলায়াতুদ দ্বীনিয়্যা গ্রন্থটি রচনার ইচ্ছা করেন।
চিত্র নং-১ মাওয়ারদি রচিত 'আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা'
এ গ্রন্থে খিলাফত ও রাজনীতি সংক্রান্ত সকল কিছুর বিস্তারিত বিবরণ ও বিধি উল্লেখ করেন। নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে অপরাধ ও ফৌজদারি বিধির সকল আইনকানুন সুস্পষ্টরূপে বিবৃত করেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়োগ পাওয়া প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য তাতে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উল্লেখ করেন। কারণ রাজনৈতিক এসব পদে কর্মরত মানুষগুলোই পুরো মুসলিমজাতির জন্য মেরুদণ্ডের মতো।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইমাম মারওয়ারদি বলেন, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা মূলত নেতা, শাসক ও গভর্নরদের উদ্দেশ্যে লেখা। এ বইটি অধ্যয়ন করলে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণকারী এ শ্রেণি অনেক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বিশেষভাবে সেখানে উল্লেখ করেছি। যেন ইসলামি আইনবিদগণ এ বই থেকে উপকৃত হতে পারেন এবং যে বিষয়গুলো আমি এতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি, সেগুলো রচনার কাজে হাত দিতে পারেন। এ বই লেখার পেছনে আমার উদ্দেশ্য ছিল শাসকশ্রেণি যেন বইটি পড়ে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেন। ইনসাফ কায়েম বা সুচারুরূপে বিচারকার্য সম্পাদনে আত্মনিয়োগ করেন। (৭৬)
তবে যাইহোক, মাওয়ারদি রহ. খিলাফত ও ইমামতকে একই অর্থে নিয়ে এর সংজ্ঞা করেছেন এভাবে,
«الإمامة موضوعة لخلافة النبوة في حراسة الدين وسياسة الدنيا، وعقدها لمن يقوم بها في الأمة واجب بالإجماع»
ইমামত (ইসলামি শাসক নির্ধারণ প্রক্রিয়া) প্রতিষ্ঠা হয়েছে নবুয়তের প্রতিনিধি হিসেবে দ্বীনের সুরক্ষা এবং ভূপৃষ্ঠের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে। আর এ মহান দায়িত্ব যে ব্যক্তি ভালোভাবে পালন করতে পারে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার লক্ষ্যে ইমাম বা খলিফা নির্ধারণ করা ওয়াজিব। (৭৭)
উম্মতের মহান আইনবিদগণ খিলাফতের যেসব সংজ্ঞা ও শর্ত উল্লেখ করেছেন, তাদের সুরে সুর মিলিয়ে একজন নির্ভেজাল আইনজ্ঞের মতো তিনিও খিলাফত প্রতিষ্ঠার বিষয়কে ইজমায়ে উম্মতের (সকল মুসলিম স্কলারদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের) ভিত্তিতে ওয়াজিব হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এখানে তিনি পরিষ্কারভাবে খিলাফত শব্দের উল্লেখ করেননি। কারণ ওই সময় প্রকৃত অর্থে খিলাফতের পটভূমি অবশিষ্ট ছিল না। শুরা পদ্ধতির বদলে তখন প্রচলিত ছিল বাইআত ও বংশানুক্রমিক ইমাম নির্বাচন প্রক্রিয়া।
এখানে মাওয়ারদির বিশ্লেষণ কয়েকটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবির্ভূত। সবগুলোকে সমন্বয় করলে সারকথা এই দাঁড়ায় যে, ইমামত বা শাসক নির্বাচন শুধু যুক্তির নিরিখে নয়, বরং শরিয়তের ভিত্তিতে ওয়াজিব। আর সেটি হবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। শাসক নির্বাচনে প্রস্তাবিত ব্যক্তিবর্গ অবশ্যই কুরাইশ বংশের হবেন। সামসময়িক সকল ধর্মীয় নেতা এবং ইজতিহাদের স্তরে উপনীত সকল আইনজ্ঞ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবেন। মাওয়ারদির বক্তব্য থেকে আরও স্পষ্ট, তুলনামূলক কম মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকেও ইমাম হিসেবে নির্বাচন করা যাবে। তাই বলে একসঙ্গে দুজনকে শাসক বানানো যাবে না। পরবর্তী শাসনকর্তা হিসেবে মনোনীত ব্যক্তি বা যুবরাজ ইচ্ছা করলে যুবরাজ হিসেবে নির্ধারিত অন্য ব্যক্তিদেরকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। তবে এটি ছিল নিছক মাওয়ারদির ইজতেহাদপ্রসূত মত। ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর মতও এরূপ বলে তিনি দাবি করেন। (৭৮)
ইসলামি রাজনৈতিক ইস্যুতে লেখা আরও একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো আবু বকর আত-তারতুশি(৭৯) রচিত 'সিরাজুল মুলুক'। এই স্থূলকায় গ্রন্থে তিনি একাধারে আরব, পারস্য, রোম, হিন্দুস্তান, সিন্ধু এলাকা এবং হিন্দ- সিন্ধের সমন্বিত নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সৌন্দর্যের দিকগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। মূলত এ গ্রন্থটি তিনি লেখেন মিশরের নবনিযুক্ত উযির মামুন বাতাইহির(৮০) উদ্দেশ্যে। এর পেছনে তার লক্ষ্য ছিল, হক প্রতিষ্ঠায় মামুনকে উদ্বুদ্ধ করা। শরিয়তের প্রতি তাকে অনুগতরূপে গড়ে তোলা। আহলে সুন্নাতের মাযহাবগুলোর প্রতি তাকে শ্রদ্ধাশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ এর আগে মামুন ছিলেন মিশরের শিয়া ফাতেমি সাম্রাজ্যের অন্যতম উযির।
সিরাজুল মুলুক গ্রন্থটি চৌষট্টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। এতে বিবৃত হয়েছে রাজনীতি, শাসনবিধি, মানবাধিকার রক্ষা নীতি, একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্য অপরিহার্য গুণাবলি, সুলতানের বৈশিষ্ট্য, রাজ্য সুরক্ষার কৌশল, রাষ্ট্রকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার সব নীতিমালা। স্থান পেয়েছে রাষ্ট্রনায়ক অবিচার ও স্বেচ্ছাচারে লিপ্ত হলে জনগণের করণীয়, সৈনিক ও যোদ্ধাদের সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কের সম্পর্ক ও তাদের সঙ্গে আচরণ, রাজস্ব উত্তোলন ও অর্থ ব্যয়সহ রাজনৈতিক নানা বিষয়। তা ছাড়াও এই গ্রন্থে তিনি মন্ত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন। উযিরদের বৈশিষ্ট্য ও নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে পরামর্শ ও উপদেশদানের মতো উন্নত গুণাবলি ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে একজন সুলতান কীভাবে এবং কতটুকু হস্তক্ষেপ করতে পারবেন তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। শহরে-নগরে নিয়োগকৃত সরকারি কার্যনির্বাহী ও কর্মচারীদের প্রতি সুলতান কীরূপ নীতি অবলম্বন করবেন সেই বিষয়গুলোও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তা ছাড়া জিম্মির (ভিসা বা অনুমোদন নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিম) প্রতি সরকারের আচরণ এবং এ সংক্রান্ত নীতিমালা তিনি সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধবিষয়ক নিয়মনীতি ও কলাকৌশলের কথাও বিখ্যাত এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
অপরদিকে ৫৮৯ হিজরিতে ইনতেকাল করা স্বনামধন্য আইনবিশারদ আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ শাইযারি রহ. আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক রচনা করেন। এ গ্রন্থ লেখার পেছনে তার লক্ষ্য ছিল, গল্প ও নানা ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ছলে সুলতান সালাহুদ্দিন ইবনে আইয়ুবকে রাজনৈতিক উপদেশ ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করা।
পূর্ববর্তী শাসকদের অবস্থা বর্ণনা করে সেখান থেকে সারনির্যাস বের করে তাকে শিক্ষা গ্রহণের পথ বলে দেওয়া। এ কারনেই গ্রন্থের শুরুতে কিতাব লেখার নেপথ্য কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সালাহুদ্দিনের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে আমি এ গ্রন্থ রচনা করেছি। এতে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের কথা, সাহিত্যের মণিমুক্তা, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার রক্ষার মূলনীতি লিপিবদ্ধ আছে। রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করা এবং জনগণের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশলও এতে বিবৃত হয়েছে। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন এবং সৈনিকদের মাঝে এর সুষম বণ্টন পদ্ধতি, সেনাবাহিনীর ওপর জিহাদ সংক্রান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা সংযোজন করেছি। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো ও মন্দ চরিত্রের দিকগুলো উল্লেখ করেছি। রাষ্ট্র পরিচালনায় মাশওয়ারা বা পরামর্শের গুরুত্ব, মাশওয়ারায় উৎসাহ প্রদান, শত্রুদের মোকাবেলা, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয়গুলো সবিস্তারে উল্লেখ করেছি। এর জন্য প্রয়োজনীয় উদাহরণ, ঘটনা, যুক্তি, প্রমাণ সবকিছু বর্ণনা করেছি। (৮১) কোনো সন্দেহ নেই, সালাহুদ্দিনের মতো একজন দূরদর্শী ও বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক সবসময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। এ কারনেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দীক্ষা নিয়ে এবং পূর্ববর্তী খলিফা ও শাসকদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি রচনা করেন একের পর এক বিজয়ের উপাখ্যান। রাষ্ট্রকে উন্নীত করেন সমকালীন সকল সাম্রাজ্যের ঊর্ধ্বে।
উক্ত গ্রন্থে স্বরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ইস্যুকে ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এজন্য সুলতানমাত্রই জনগণের সঙ্গে বসার ও তাদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার ওপর জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। গ্রন্থে লেখক বলেন, জেনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রনায়ককে সময় বের করে বসতে হবে। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাদী-বিবাদীর মাঝে নিষ্পত্তি বিধান করতে হবে। এগুলো ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। তা না করলে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে না। সুষম বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। (৮২) রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ স্পষ্ট করতে গিয়ে সালাহুদ্দিনের উদ্দেশ্যে বইতে তিনি লেখেন, তিন কারণে রাষ্ট্র ধ্বংস ও অধঃপতনের দিকে যায়: প্রথম কারণটি রাষ্ট্রনায়ককেন্দ্রিক। আর সেটি হলো, শাসকের মনোবৃত্তি যদি তার বুদ্ধি বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়। তাহলে ভোগের সুযোগ আসামাত্রই সে তা লুফে নেবে। খুঁজবে শুধু আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতার সকল উপায়-উপকরণ। দ্বিতীয় কারণটি হলো মন্ত্রিপরিষদ-কেন্দ্রিক। আর তা হলো নিজের মতের বিরুদ্ধে হলেই প্রতিহিংসা-প্রবণতা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের মাঝে সবসময় মনোমালিন্য ঘটবে। ফলে তৈরি হবে বিভেদ। তৃতীয় কারণটি হলো, সেনাবাহিনী ও শাসকের একান্ত সহযোগীকেন্দ্রিক। আর তা হলো, জিহাদের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বরফের মতো জমে বসে থাকা। জিহাদের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ না করে অস্ত্রের প্রয়োগ ছাড়া শান্তির পথ তালাশ করা। (৮৩)
তকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া(৮৪) রহ. রচিত আস-সিয়াসাতুশ শারয়িয়্যা ফি ইসলাহির রায়ি ওয়ার-রায়িয়্যাহ গ্রন্থটিও ইসলামি রাজনীতির বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া রহ. তার এ গ্রন্থে পরিষ্কার করে বলেছেন, বর্তমান সময়ে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়া, তাদের রাষ্ট্রগুলো হাতছাড়া হওয়া এবং শত্রুদের হামলার কেন্দ্রস্থল হওয়ার একমাত্র কারণ শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতা, নৈরাজ্য এবং আল্লাহর বিধান থেকে তাদের দূরে সরে যাওয়া। যার ব্যাপ্তি মুসলিম জনসাধারণকেও গ্রাস করে ছেড়েছে। শাসনযন্ত্র ও শাসকশ্রেণির বিনষ্টতাকে কেন্দ্র করে মূলত প্রধান দুটি নির্দেশনা নিয়ে তার এ বইটি রচিত। এর মধ্যে একটি হলো, যথাযথভাবে অর্থব্যয় নিশ্চিত করা এবং আমানত ও দায়িত্ব সুষ্ঠুরূপে আদায় করা। দ্বিতীয়টি হলো, সবকিছুতে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং মানুষের সকল অধিকার রক্ষা করা। দ্বিতীয় ইস্যুর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি একজন শাসকের চরিত্রের উত্তম দিকগুলো টেনে এনেছেন। শাসক ও শাসিত সকলকেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যার ফলে নবীন ও প্রবীণ গবেষক মহলে বইটি বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। (৮৫)
ইসলামি রাজনীতির বিষয়ে উন্নত লেখনী বেরিয়ে এসেছে ইবনে খালদুনের হাত থেকেও। বিখ্যাত আল-মুকাদ্দিমায় তিনি রাজনীতির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এবং সমাজের সকল শ্রেণি ও দলকে একটি সংঘে পরিণত করার পদ্ধতি ও কৌশলগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ গ্রন্থে তিনি সমাজের শুধু একটি শ্রেণির বিবরণ ও তাদের সমস্যার কথা বর্ণনা করেননি, বরং সমাজের শহুরে ও গ্রাম্য উভয় শ্রেণির স্বাতন্ত্র্য বর্ণনা করে উভয় শ্রেণির সমস্যার সমাধানের পথ বর্ণনা করেন। ইবনে খালদুনের মতো জগদ্বিখ্যাত লেখকের শুধু এ গ্রন্থেই নয়, বরং তার লেখা সব পুস্তকেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর চমৎকার একটি উদাহরণ হলো, খিলাফত ও ইমামতকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তিনি বলেন, খিলাফত হলো দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণার্থে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী সকল কিছু বিধান করা। অর্থাৎ আখেরাতের ভালোমন্দ পরিণামের কথা বিবেচনা করে জাগতিক সকল সমস্যার সমাধান শরিয়তের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে, এক কথায় শরিয়তের বিধিবিধানের ওপর ভিত্তি করে ধর্মের সুরক্ষা এবং ভূ-রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার নাম হচ্ছে খিলাফত। (৮৬)
তবে খিলাফত ও রাজত্বের মাঝে পার্থক্য করেছেন ইবনে খালদুন। তিনি বলেন, রাজত্বের মূল হলো কিছু রাজনৈতিক বিধিনিষেধ, যেগুলো জনসাধারণ একবাক্যে মেনে নেয় এবং পালন করতে বাধ্য থাকে। এবার এই বিধানগুলো যদি রাষ্ট্রের বিজ্ঞ আইনবিদ ও দূরদর্শী শ্রেণির দ্বারা স্বীকৃত হয়, তবে তা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি। আর যদি আল্লাহর নাযিল করা কুরআন এবং রাসুলের রেখে যাওয়া সুন্নাহ কর্তৃক স্বীকৃত হয়, তবে সেটি হবে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণবাহী ধর্মীয় রাজনীতি বা খিলাফত। (৮৭)
রাজনৈতিক বিষয়ে মুসলিম লেখকদের অবদান সংক্রান্ত আলোচনা শেষ করার আগে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সেটি হলো, এ সংক্রান্ত সকল গ্রন্থে লেখকগণ কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলের দেখানো পথ অবলম্বন করেছেন। কুরআন-সুন্নাহ থেকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নিছক শাসকশ্রেণির তোষামোদ পেতে এবং তাদের প্রিয়পাত্র হতে তাদের সঙ্গে দুর্নীতি ও অবিচারের পাল্লা ভারী না করে, বরং সবসময় কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলের দিকে ফিরে আসার প্রতি তাদের আহ্বান জানিয়েছেন। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল যুগেই প্রায় সকল মুসলিম লেখক একই পথ অনুসরণ করেছেন। তবে তাদের বর্ণনা ও উপস্থাপনভঙ্গিতে বৈচিত্র্য ছিল। পরবর্তীকালের লেখকদের লেখনীতে অনেক নতুন নতুন বিষয়ের আলোচনা ও প্রস্তাবনা ছিল।
কারণ এ সংক্রান্ত অধিকাংশ গ্রন্থ লেখার পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং খ্যাতিমান এ আইন বিশারদদের যুগে ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণের পথ সুগম করা। রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে লেখা মুসলিম লেখকদের গ্রন্থগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা লেখকদের বইগুলোর তুলনা করলেই তাদের ও মুসলিম লেখকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের নবজাগরণের যুগে রাজনীতি বিষয়ে লেখা নিকোলা ম্যাকিয়াভেলির (৮৮) বিখ্যাত গ্রন্থ দা প্রিন্স সংকলনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইতালির একটি শহরের জনৈক শাসকের কৃপাদৃষ্টি লাভ করা। একজন শাসক কীভাবে তার সমকক্ষদের সামলাবেন তার বিবরণ তিনি এ গ্রন্থে দিয়েছেন। তার প্রধান রাজনৈতিক দর্শন ছিল 'লক্ষ্য ভালো হলে যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে দোষ নেই'। অর্থাৎ কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে বৈধ-অবৈধ যেকোনো পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। লক্ষ্যটা যদি ভালো হয় তবে এতে দোষের কিছু নেই। সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে ধোঁকা, প্রতারণা, মিথ্যা, ষড়যন্ত্র ও অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলেছেন ম্যাকিয়াভেলি। জনসাধারণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে জোরপূর্বক স্বার্থ হাসিলের কথাও বলেছেন তিনি। তিনি আরও বলতেন, রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা ও সাধুতা বলতে কিছু নেই। (৮৯)
কোনো সন্দেহ নেই, এই গ্রন্থকার এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (৯০) ও অ্যাডলফ হিটলারসহ (৯১) তার অনুসারী সকল শাসকবর্গের যে পরিমাণ মানুষের মালামাল লুণ্ঠন করা ও শাসক শ্রেণির ভোগবিলাসের উপকরণ নিশ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল সে পরিমাণ জনগণের মাঝে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের জন্য সকল সামাজিক উপকরণ নিশ্চিত করা উদ্দেশ্য ছিল না। সেই তুলনায় মুসলিম লেখকদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল শাসকদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। নানাভাবে, বিচিত্র পন্থায় আল্লাহর জমিনে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করা।
টিকাঃ
৭০. তিনি হলেন ইয়াকুব ইবনে ইবরাহিম ইবনে হাবিব আল-আনসারি আল-বাগদাদি। (১১৩-১৮২ হি./৭৩১-৭৯৮ খ্রি.) ইমাম আবু হানিফার ছাত্র ও সহচর। হানাফি মাযহাবের প্রথম প্রচারক হিসেবে বিখ্যাত এই মহাপুরুষ ছিলেন বিজ্ঞ ফকিহ, হাফিযুল হাদিস। কুফায় তার জন্ম। হাদিস ও রেওয়ায়েত বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। কাযিযুল কুযাত বা প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাকেই প্রথম সম্বোধন করা হয়। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহের অন্যতম হলো আল-খারাজ। দেখুন, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১, পৃ. ২৯২-২৯৩; আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ১৯৩। মুজামুল মাতবুআত, খ. ১, পৃ. ৪৮৮।
৭১. ইবনে মাজাহ, ২৮৬১; তিরমিযি, ১৭০৬; আহমাদ, ২৭৩০১।
৭২. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ১০।
৭৩. আবু ইউসুফ, আল-খারাজ, পৃ. ১২।
৭৪. আবদুল আযিয আদ-দুরি, আন-নুযুমুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৬৮।
৭৫. হিলাল আস-সাবি। তার পুরো নাম আবুল হুসাইন হেলাল ইবনে মুহসিন আস সাবি (৩৫৯-৪৪৮ হি./৯৭০-১০৫৬ খ্রি.)। তিনি একাধারে লেখক, চিন্তাবিদ, ইতিহাসবিদ। বাগদাদ নিবাসী এ লেখক বহুদিন পর্যন্ত বাগদাদের রাজদরবারের রচনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে : আখবারু বাগদাদ, রুসুমু দারিল খিলাফা, গুরারুল বালাগা, তুহফাতুল উমারায়ি ফি তারিখিল ওযারায়ি উল্লেখযোগ্য। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ৯২।
৭৬. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ১।
৭৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩।
৭৮. মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ. ২০।
৭৯. পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে খালাফ আল-কুরাশি আত-তারতুশি (৪৫১-৫২০ হি./১০৫৯-১১২৬ খ্রি.)। মালেকি মাযহাবের ফকিহ হিসেবে খ্যাত এ মনীষী ছিলেন পশ্চিম আন্দালুসের তারতুশ এলাকার অন্যতম সুসাহিত্যিক। তার ইনতেকাল হয় আলেকজান্দ্রিয়ায়। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ২৬২-২৬৪।
৮০. মামুন বাতাইহি (মৃ. ৫১৯ হি./১১২৫ খ্রি.) দরিদ্র অবস্থায় বেড়ে ওঠা এ মন্ত্রী শুরুতে কুলির কাজ করতেন। ফাতেমি সরকারের উঁচু স্তরের কর্মকর্তা আফজাল আল-উবাইদির কাছে তিনি মজদুরি করতেন। এরপর ধীরে ধীরে উন্নতি করতে করতে মিশরের মন্ত্রণালয়ে চাকরি পেয়ে যান। তিনি ছিলেন দুঃসাহসী, মহৎ ও দানবীর। তবে রক্তপাতের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রনায়ককে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করে তাকে শূলে চড়ানো হয়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৯, পৃ. ৫৫৩।
৮১. শাইযারি, আল-মানহাজুল মাসলুক ফি সিয়াসাতিল মুলুক, পৃ. ১৫৮-১৫৯।
৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬২-৫৬৩।
৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫৭।
৮৪. তার পুরো নাম আহমাদ ইবনে আবদুল হালিম আল-হাররানি (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)। তিনি একাধারে ইমাম, বড় আলেম, বিখ্যাত ফকিহ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, শাইখুল ইসলাম উপাধিতে ভূষিত। হাররানে জন্মেছেন। দামেশকে ইনতেকাল করেছেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত খ. ৭, পৃ. ১১।
৮৫. ইবনে তাইমিয়া, আস-সিয়াসাতুশ শারয়িয়্যা, পৃ. ৪-৫।
৮৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ১৯১।
৮৭. প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ১৯০। দেখুন, যাফির কাসেমি, নিযামুল হুকমি ফিশ-শারিআতি ওয়াত- তারিখিল ইসলামি, খ. ১, পৃ. ১৯১।
৮৮. নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রি.)। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে বাস্তববাদী রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা বলা হয়ে থাকে। তার লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ দা প্রিন্স।
৮৯. আলি ইবনে নায়েফ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা বাইনা আসালাতিল মাযি ওয়া আমালিল মুসতাকবিল, পৃ. ২৯৪।
৯০. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (১৭৬৯-১৮২১ খ্রি.)। বিখ্যাত ইউরোপীয় সেনানায়ক। মিশরের বিরুদ্ধে ফরাসি আক্রমণের নেতৃত্ব দেন তিনি। ইউরোপেও বহু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সবগুলোতেই তিনি ছিলেন অপরাজেয়। তবে বেলজিয়ামের ওয়াটারলুতে সংঘটিত যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। এরপর তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
৯১. অ্যাডল্ফ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫ খ্রি.)। জার্মানির বিখ্যাত রাষ্ট্রপ্রধান। তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত জার্মানির পতন ঘটে এবং তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।