📄 দর্শনবিজ্ঞান
আরবি 'ফালসাফা' (দর্শন) শব্দটি মূলত গ্রিক শব্দ। দুটি গ্রিক শব্দখণ্ড থেকে এ শব্দটি তৈরি হয়েছে, philien (এর অর্থ ভালোবাসা, প্রেম) এবং sophia (এর অর্থ জ্ঞান, প্রজ্ঞা)। এভাবে 'ফাইলাসুফ' (দার্শনিক) বা philosopher শব্দটি গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ যিনি প্রজ্ঞাকে ভালোবাসেন বা প্রজ্ঞাপ্রেমী।(৬২২)
মুসলিম দার্শনিকরা দর্শনের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে ইউসুফ আল-কিন্দি দর্শনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা নিম্নরূপ, إِنَّهَا عِلْمُ الْأَشْيَاءِ بِحَقَائِقِهَا بِقَدْرِ طَاقَةِ الْإِنْسَانِ؛ لِأَنَّ غَرَضَ الْفَيْلَسُوْفِ فِي عِلْمِهِ إِصَابَةُ الْحَقَّ، وَفِي عَمَلِهِ الْعَمَلُ بِالْحَقِّ»
দর্শন হলো মানবিক সাধ্যের মধ্যে বস্তুরাশির হাকিকত বা মূল বিষয় জানা, কারণ দার্শনিকের উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যে উপনীত হওয়া এবং কর্মের ক্ষেত্রে সত্য অনুযায়ী তা সম্পাদন করা।(৬২৩)
অনুবাদ-আন্দোলন শুরু হওয়ার পরই মুসলিমরা দর্শনবিদ্যা সম্পর্কে জানতে পেরেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক আব্বাসি যুগে। গ্রিক দর্শনের গ্রন্থরাজির জন্য আরবের পথ সুগম হয়ে ওঠে, ভূমধ্যসাগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে-আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আন্তাকিয়া ও হাররান পর্যন্ত এসব গ্রন্থের সয়লাব ঘটে। শুধু তাই নয়, খলিফা আল-মামুন গ্রন্থাবলি ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য রোমান, অর্থাৎ বাইজান্টাইন সম্রাটদের কাছে লোক পাঠাতেন। তিনি বিশেষভাবে দর্শনের গ্রন্থাবলি সংগ্রহ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জ্ঞানের শহর হিসেবে বিখ্যাত ছিল।(৬২৪) রোমানরা তার কাছে দর্শনের ও অন্যান্য বিষয়ের গ্রন্থাবলি পাঠান। একইভাবে দক্ষ অনুবাদকেরাও আল-মামুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন।
তারা গ্রিক গ্রন্থাবলি আরবিতে অনুবাদ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সুরয়ানি ভাষায় রূপান্তরিত গ্রিক গ্রন্থাবলিও তারা হুবহু অনুবাদ করেন। কারণ, মুসলিমদের আবির্ভাবের পূর্বে গ্রিক দর্শনের অসংখ্য গ্রন্থ সুরয়ানি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এ সকল অনুবাদকের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন: সারগিউস, সফরানিউস, সাওয়িরিস।(৬২৫)
অন্যান্য গ্রিক (ইউনানীয়) জ্ঞানের সঙ্গে গ্রিক দর্শনেরও অনুবাদ হলো এবং তা মুসলিম ভূখণ্ডে স্থান করে নিলো বটে, কিন্তু অব্যবহিত পরই গ্রিক দর্শন নিয়ে মুসলিম জ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেল। কেউ কেউ গ্রিক দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন এবং একে ভ্রান্তি, গোমরাহি ও নৈরাজ্যের ফটক বলে আখ্যায়িত করলেন। এই অবস্থান ছিল কট্টরপন্থী ফকিহদের। কেউ কেউ মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করলেন। তারা গ্রিক দর্শনের সমালোচনা ও পরিশুদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিলেন। গ্রিক দর্শনের যা-কিছু সত্য ও ভালো তা গ্রহণ করা হবে এবং যা-কিছু অসত্য ও ভ্রান্তিপূর্ণ তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। মুতাযিলা সম্প্রদায় ও বহু আশআরি মতাবলম্বীর অবস্থান ছিল এটিই। যেমন ইমাম আবু হামিদ আল-গাযালি। তিনি গ্রিক দর্শনকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম ভাগ, যেটাকে কুফরি বলে আখ্যায়িত করা আবশ্যক; দ্বিতীয় ভাগ, যেটাকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করা আবশ্যক; তৃতীয় ভাগ, যেটাকে মৌলিকভাবে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।(৬২৬)
কেউ কেউ গ্রিক দর্শনকে বিস্ময়কর ও অভাবিত জ্ঞান হিসেবে আলিঙ্গন করেছেন, তারা এর পঠনপাঠন ও চর্চায় নিয়োজিত হয়েছেন, সেগুলোর অনুকরণ করার চেষ্টা করেছেন। তারা গ্রিক দর্শনের রীতি ও আদলে লেখালেখি করেছেন। এই অবস্থানে রয়েছেন আল-কিন্দি ও তার অনুসারীরা।(৬২৭)
আরব প্রাচ্যে বা মরক্কো ও আন্দালুসে মুসলিম মনীষীদের মধ্যে একটি শ্রেণি গ্রিক দর্শনের সেবা করতে চেয়েছেন এবং গ্রিক দর্শনের প্রতি বিমুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। যেমন শেষ দৃষ্টান্তে আমরা উল্লেখ করেছি তা সত্ত্বেও তারা যে কেবল গ্রিক জ্ঞান-ঐতিহ্যের সংরক্ষক ছিলেন অথবা মধ্যযুগে ও পরবর্তী সময়ে প্রাচীন গ্রিস (ইউনান) থেকে ইউরোপে এই জ্ঞান আমদানির বাহক ছিলেন তা নয়, যদিও কতিপয় প্রাচ্যবিদ তাদেরকে এভাবেই চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে আল-কিন্দি বা আল-ফারাবি বা ইবনে সিনা বা ইবনে রুশদ প্রমুখ মনীষীর উত্তরাধিকার-ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির কাছে এটা স্পষ্ট যে, তারা দর্শনশাস্ত্রে, এমনকি গ্রিক দর্শনের বিশ্লেষণে ও সংক্ষেপণে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করেছেন, যা থেকে তাদের মৌলিকত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।
কারও পক্ষে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তাদের কারও কারও মধ্যে ঘৃণ্য পক্ষপাত এবং যাবতীয় ইসলামি ও প্রাচ্যীয় দর্শন ও জ্ঞানের প্রতি বিদ্বেষভাব শেকড় বিস্তার করেছিল। তাদের কথা অবশ্য ভিন্ন। এই ঘরানার দার্শনিকদের মৌলিকত্ব ও প্রাতিস্বিকতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ সম্ভবত দর্শন ও ধর্ম অথবা যুক্তি ও ওহির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে তাদের যে প্রয়াস তার ফলাফলেই ঘটেছে। এসব প্রয়াসের আগে তারা এ ধরনের আরও কিছু প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। সেটা হলো সুফিতাত্ত্বিক আদর্শবাদী প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-যেমনটা তারা বুঝেছেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী অ্যারিস্টটলের (৩৮৪-৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন।(৬২৮)
দর্শনবিজ্ঞানে মুসলিমদের সেরা অবদান এই যে, তারা প্রাচীন গ্রিসের (ইউনানের) দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থাবলি ও রচনারাশির তথ্যসমূহকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং সেগুলোতে যেসব ত্রুটি ছিল সেগুলোকে সংশোধন করেছেন। তারা সেসব গ্রন্থের কোনায়-কানায় থাকা জ্ঞানের ছিটেফোঁটা এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তাদানাকে সন্নিবদ্ধ করেছেন এবং সেগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা সংযোজন করেছেন। তা ছাড়া নতুন নতুন বিষয়, তথ্য ও তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। এগুলো কেবল মুসলিম মনীষীদের উদ্ভাবন, তারা ছাড়া পূর্ববর্তীদের কেউ এগুলো জানত না। তাই ইসলামে দর্শন-চিন্তার নানা দিক ও বিভিন্ন শাখার সূচনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব), তাসাউফ (সুফিতত্ত্ব), অবিমিশ্র ইসলামি দর্শন ইত্যাদি।
এসব শাখা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো।
১. ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব)
ইসলামি যুক্তিবাদের অন্যতম সূচনা হলো দর্শনবিজ্ঞানের এই শাখা। ইবনে খালদুন ইলমুল কালামের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, এটা এমন জ্ঞান যা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলাদির দ্বারা ঈমানি আকিদা-বিশ্বাসের সুরক্ষা প্রদান করে এবং বিদআতি ও বিকৃতিকারীদের যুক্তি খণ্ডন করে।(৬২৯)
এই বিজ্ঞানশাখাটি অবিমিশ্রভাবে মুসলিমদের বলে বিবেচিত, সূচনাকালে তো বটেই। ধর্মত্যাগ ও ভ্রষ্টতা যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই দ্বীনি আকিদা-বিশ্বাস এবং এগুলোর বিশ্লেষণ বা যৌক্তিক ব্যাখ্যার সুরক্ষার জন্য ইলমুল কালামের উদ্ভব ঘটে। ইলমুল কালামকে কেন্দ্র করেই বড় বড় দার্শনিক মতবাদের জন্ম হয়েছে। বিশ্বজগতের (বস্তুরাশির) ব্যাখ্যা এবং প্রাকৃতিক নিয়ম উদ্ভাবনে মুসলিমদের উজ্জ্বল কীর্তিরও প্রকাশ ঘটে এ সময়। তারা অস্তিত্ব, জীবন ও কার্যকারণ ইত্যাদির তাৎপর্য নিরূপণ করেন, যা ছিল গ্রিক দার্শনিকদের থেকে ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে মুসলিম দার্শনিকরা ইউরোপের আধুনিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন।(৬৩০)
মুতাকাল্লিমিন বা ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের কার্যক্রমে যুক্তিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপারে বেশ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এর ফলেই সম্ভবত কতিপয় প্রাচ্যবিদ ইলমুল কালামকে ইসলামি দর্শন-চিন্তার উদ্ভবের কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তারা এটিকে মুসলিমদের চিন্তার মৌলিকত্বের দলিল হিসেবেও দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে ফরাসি প্রাচ্যবিদ আর্নেস্ট রেনান (Joseph Ernest Renan) বলেছেন, ইসলামে প্রকৃত দর্শন-আন্দোলন মুতাকাল্লিমদের মতবাদগুলোতেই খুঁজে দেখা উচিত।(৬৩১)
২. তাসাউফ
তাসাউফকে ইসলামি দর্শন-চিন্তার অন্যতম ময়দান বলে বিবেচনা করা হয়। যদিও তাসাউফের মূল উপাদান হলো সুফিদের যাপিত আত্মিক অভিজ্ঞতা, তারপরও এই অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বাস্তবের সঙ্গে সংশ্লেষ ঘটে চিন্তার এবং কর্মের সঙ্গে জ্ঞানের। এ কারণে তাসাউফ কেবল অবিমিশ্র দর্শন নয় যে তা বৈপরীত্যমুক্ত ও পরিপূর্ণ অধিবিদ্যামূলক(৬৩২) তত্ত্বে উপনীত হওয়ার উদ্দেশ্যে বিতর্কমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনায় গুরুত্বারোপ করবে, বরং তা বিশেষ জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন, যেখানে চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ এবং চিত্তের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা, যা সত্যিকার অস্তিত্ব অনুভব করতে সাহায্য করে। এসব কারণে তাসাউফে বিভিন্ন মত, বিভিন্ন ঘরানা ও বিভিন্ন চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোকে তিনটি মানবশক্তি তথা বুদ্ধি, অস্তিত্ব ও আচরণের পরিপূর্ণতার ফল বিবেচনা করা হয়।(৬৩৩)
আমরা এখানে একটি ইঙ্গিত দেওয়া সংগত মনে করি। তাসাউফ হলো যেকোনো ধর্মীয় অভিজ্ঞতার শৃঙ্খলিত অন্তর্বীক্ষণ, যে ব্যক্তি ধর্মীয় অভিজ্ঞতা যাপন করে তার অন্তরে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাসাউফ একটি মানবতাবাদী প্রপঞ্চ, যার প্রকৃতিটি আত্মিক, সময়ের বা স্থানের সীমারেখা দিয়ে একে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তা ছাড়া তাসাউফ কোনো জাতি বা গোষ্ঠী বা মানবশ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট নয়।(৬৩৪)
২৩. অবিমিশ্র বা বিশুদ্ধ দর্শন
যে-সকল মুসলিম দার্শনিক অভিভূত হয়ে গ্রিক দর্শনকে আলিঙ্গন করেছিলেন, গ্রিক দর্শনের পড়াশোনায় এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রচনাবলি লিখেছিলেন তাদের দর্শনই বিশুদ্ধ দর্শন। যেমন আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে বাজাহ(৬০৭), ইবনে তুফাইল(৬০৮) প্রমুখ। মুসলিম দার্শনিকদের এই দলটি ছিল এক বিশাল মিনারের মতো, এর আলোয় আলোকিত হয়েছিল গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতা। নিচে এ সকল দার্শনিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করা হলো।
১. আল-কিন্দি
আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি আল-কুফি (১৮৫-২৫৬ হি./৮০৫-৮৭৩ খ্রি.)। অধিকাংশ বিশ্লেষক তাকে ইসলামি আরব দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলে বিবেচনা করেছেন। তাই তিনিই 'ফাইলাসুফুল আরব' (আরবের দার্শনিক) উপাধির সত্যিকার হকদার ছিলেন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি দুইশরও বেশি রচনা লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দর্শন বিষয়ে তার মূল্যবান গ্রন্থ 'আল-ফালসাফাতুল উলা ফি-মা দুনাত তবিইয়্যাত ওয়াত-তাওহিদ'।
আল-কিন্দি মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতা-বিষয়ক জটিলতার দার্শনিক ব্যাখ্যায় প্রথম ইটটি স্থাপন করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্রকৃত কর্ম ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের ফসল নয়। তা ছাড়া মানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় একপ্রকার মানসিক শক্তি, আবেগ ও চিন্তাই এই শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। আল- কিন্দি ছিলেন কার্যকারণে বিশ্বাসীদের একজন। ঐশী প্রযত্ন (Divine Providence)(৬৩৭)-এর চিন্তাকে তিনি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন, কতিপয় প্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে ঐশী প্রযত্নের দাবির কাছেই সৃষ্টিজগৎ নতি স্বীকার করে।(৬৩৮)
আল-কিন্দি একইভাবে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি চিকিৎসা ও ওষুধ বিষয়েও গ্রন্থ রচনা করেছেন। ভূগোল, রসায়ন, যন্ত্রপ্রকৌশল ও সংগীতবিদ্যায়ও তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। কতিপয় প্রাচ্যবিদ তাকে বারোজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অন্যতম মনে করেন, যাদেরকে মানব-চিন্তার চূড়া বিবেচনা করা হয়।(৬৩৯)
২. আল-ফারাবি
তিনি হলেন আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবনে তারহান আল-ফারাবি (২৫৯- ৩৩৯ হি./৮৭২-৯৫০ খ্রি.)। তাকে সবচেয়ে বড় মাপের মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে বিবেচনা করা হয়। আল-ফারাবি অ্যারিস্টটলের গ্রন্থাবলির পঠনপাঠন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল নিজে। তার হাতেই অ্যারিস্টটলীয় দর্শন চূড়ান্ত মার্গে পৌছে, অ্যারিস্টটলের দর্শন কোথাও এর চেয়ে বেশি উৎকর্ষ লাভ করেনি। ইউরোপীয়দের কাছে তিনি আলফারাবিয়াস (Alpharabius) নামে বিখ্যাত। আল-ফারাবি তার ব্যাখ্যা, চিন্তা ও শৈলীর কল্যাণে গ্রিক দর্শনকে ইসলামি চিন্তার সাথে ঘনিষ্ঠ করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল-কিন্দির হাতে এই কীর্তি সাধন সম্ভব হয়নি।(৬৪০)
আল-ফারাবির সবচেয়ে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো আরাউ আহলিল মাদিনাতিল ফাদিলাহ ওয়া মুদাদ্দাতুহা। এই গ্রন্থে তিনি অভিজাত আদর্শ মানবসমাজের নীতি-ব্যবস্থা বর্ণনা করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন দিক ও ইসলামি আরব সংস্কৃতির কিছু অনুষঙ্গ তার বিশেষ দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ইলমুল কালাম, আকিদা, ফিকহ ও শরিয়তের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক আলোচনা করেছেন। মধ্যযুগেই আল-ফারাবির গ্রন্থাবলি লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং প্যারিস থেকে ১৬৩৮ সালে মুদ্রিত হয়েছে। তাই ইউরোপের ওপর এসব গ্রন্থের বিরাট দার্শনিক প্রভাব রয়েছে।(৬৪১)
৩. ইবনে সিনা
তিনি হলেন আবু আলি হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা (৩৭০-৪২৮ হি./৯৮০-১০৩৭ খ্রি.)। ইবনে সিনা 'আশ-শাইখুর রয়িস' (প্রধান শাইখ) হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। অ্যারিস্টটল ও আল-ফারাবির পর তিনি 'তৃতীয় শিক্ষক' হিসেবে পরিচিত হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে তার যতটা খ্যাতি, দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি তার চেয়ে কম নয়। আমেরিকান ঐতিহাসিক ও রসায়নবিদ জর্জ সার্টন ইবনে সিনাকে শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম এবং পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের একজন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
দর্শন বিষয়ে ইবনে সিনার বহু রচনা রয়েছে। এসব রচনা তার হাতে দর্শন নির্মাণ ও দর্শনের বিকাশে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। তার কিছু দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ হলো 'আশ-শিফা'। এই গ্রন্থে দর্শনবিদ্যার সমাবেশ ঘটেছে। এর পরে রয়েছে 'আন-নাজাত'। যা আশ-শিফার সংক্ষিপ্ত রূপ। আরও রয়েছে 'আল-ইশারাত ওয়াত-তানবিহ' এবং হিকমাহ বিষয়ে সাতটি পুস্তিকা এবং অন্যান্য বই।(৬৪২)
৪. ইবনে রুশদ
আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে রুশদ কুরতুবি আন্দালুসি (৫৯৫ হি./১১৯৮ খ্রি.)। তিনি আন্দালুসে (মুসলিম স্পেনে) শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক ছিলেন। তাকে অ্যারিস্টটলের দর্শনের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারও বিবেচনা করা হয়। এমনকি তিনি 'আশ-শারিহ' (ব্যাখ্যাকার) নামে পরিচিতি পান। ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর শিক্ষারাশির মধ্যে বৈশিষ্ট্যসূচক পার্থক্য নিরূপণ করেন। তা ছাড়া তিনি সেগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা ও সংশোধনও করেন। এমনকি তিনি অ্যারিস্টটলের অধিকাংশ মত ও সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না, যেগুলো ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
পাশ্চাত্য ইবনে রুশদের দর্শনের পুরোটাই গ্রহণ করেছে। তার দর্শন মধ্যযুগের ইউরোপীয় দর্শন-চিন্তার সামনে তর্কবিতর্ক ও গবেষণার ফটক উন্মোচন করে দেয়। গবেষণার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক মত গ্রহণের ব্যপারে তাদের মধ্যে 'রুশদিয়া মতবাদ' (Averroism)-এর উদ্ভব ঘটে। ইবনে রুশদের গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ফাসলুল মাকাল ফি-মা বাইনাল হিকমাতি ওয়াশ-শারিআতি মিনাল ইত্তিসাল(৬৪৩) এবং মানাহিজিল আদিল্লাহ ফি আকায়িদিল মিল্লাহ।(৬৪৪)
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, ইসলামি দর্শন মানব-চিন্তার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা হিসেবে পরিগণিত। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানব-চিন্তার উৎকর্ষ বলতে ইসলামি দর্শনকেই বোঝায়। পূর্ববর্তী দর্শন থেকে যা-কিছু গ্রহণ করা হয়েছে তা তো হয়েছেই, তা সত্ত্বেও দর্শনের বিশুদ্ধতা নিরূপণে এবং নতুন নতুন বিষয় সংযোজনে ইসলামি দর্শন-স্কুলের অবদান অনেক। ইসলামি দর্শন পরবর্তীকালের অন্যান্য দর্শনের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছে। ইসলামি দর্শনই খ্রিষ্টবাদী দর্শনকে প্রচণ্ড ধাক্কায় হটিয়ে দিয়েছে, ইউরোপীয় রেনেসাঁসের উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং আধুনিক যুগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে রসদ জুগিয়েছে।
বাস্তবিক দিক থেকেও ইসলামি দর্শনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব। ইসলামি দর্শন ইউরোপে বেশ কিছু বিষয়কে ও সমস্যাকে জাগিয়ে দিয়েছে। যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ইনস্টিটিউটে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব সমস্যা ও বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রচুর গবেষণা, আলাপ-আলোচনা ও পঠনপাঠন হয়েছে। বহু গ্রন্থ ও রচনায় এগুলোর প্রতিবিধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশেও এসব বিষয়ের ভিন্নতা প্রভাব ফেলেছিল। এসব বিষয় ও সমস্যার মধ্যে রয়েছে আত্মা ও আত্মার রহস্য, জ্ঞান-তত্ত্ব, পৃথিবীর প্রাচীনত্বের সমস্যা, পরিবর্তনপরম্পরা-তত্ত্ব, স্রষ্টার গুণাবলি, ঐশী প্রযত্ন-সমস্যা, মঙ্গল ও অমঙ্গল, অস্তিত্ব ও উপাদান-সমস্যা, সম্ভব ও আবশ্যক সমস্যা এবং অন্যান্য বিষয়।(৬৪৫)
টিকাঃ
৬২২. ইয়াহইয়া হুওয়াইদি, মুকাদ্দামা ফিল-ফালসাফা, পৃ. ২২।
৬২৩. রাসায়িলুল কিন্দি আল-ফালসাফিয়্যাহ, খ. ১, পৃ. ১৭২।
৬২৪. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৭, পৃ. ৮৭।
৬২৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২০-২২১।
৬২৬. আল-গাযালি, আল-মুনকিযু মিনাদ দালাল, পৃ. ১০১।
৬২৭. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২২, ২৩।
৬২৮. হামিদ তাহির, মাদখাল লি-দিরাসাতিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২১।
৬২৯. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৪৫৮।
৬৩০. আলি সামি নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩১ এবং আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৪।
৬৩১. আবুল ওয়াফা তাফতাযানি, দিরাসাত ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮।
৬৩২. অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স (Metaphysics) হলো দর্শনের একটি শাখা। এতে বিশ্বের অস্তিত্ব, আমাদের অস্তিত্ব, সত্যের ধারণা, বস্তুর গুণাবলি, সময়, স্থান, সম্ভাবনা ইত্যাদির দার্শনিক আলোচনা করা হয়। এই চিন্তাধারার জনক অ্যারিস্টটল। মেটাফিজিক্স শব্দটি গ্রিক 'মেটা' (μετά) এবং 'ফিজিকা' (φυσικά) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। অধিবিদ্যায় দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়: ১. সর্বশেষ পরিণাম কী? ২. কীসের মতো? অধিবিদ্যার দুটি মৌলিক শাখা হলো সৃষ্টিতত্ত্ব (cosmology) এবং তত্ত্ববিদ্যা (ontology)।-অনুবাদক
৬৩৩. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৫।
৬৩৪. আবুল আলা আফিফি, আত-তাসাউফ আস-সাওরাতুর রুহিয়্যা ফিল-ইসলাম, পৃ. ৫৬।
৬০৭. ইবনে বাজাহ আন্দালুসি: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে বাজাহ (৪৮৭-৫৩৩ হি./১০৮৫-১১৩৯ খ্রি.)। ল্যাটিনকৃত 'আডেমপেস' বলেও পরিচিত। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের আন্দালুসের একজন পলিমেথ (বহুশাস্ত্রবিদ)। ইবনে বাজাহ জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সংগীত, যুক্তি, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও কাব্য নিয়ে লিখেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইত্তিসালুল আকল'। ইবনে বাজাহ বর্তমান স্পেনের অ্যারাগনের জারাগোজায় ১০৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১৩৯ সালে মরক্কোর ফেজে মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে বাজাজ কবি তুতিলির সঙ্গে কবিতার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন। প্রায় ২০ বছর তিনি মরক্কোর মুরাবিত সুলতান ইউসুফ ইবনে তাশফিনের উজির হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কিতাবুন নাবাত নামক উদ্ভিদবিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থের রচয়িতা। এতে উদ্ভিদের লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন সেভিলের চিকিৎসক আবু জাফর ইবনে হারুন তুরজালি। তার দার্শনিক মতামত ইবনে রুশদ ও আলবার্টাস মেগনাসের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। অল্প বয়সে মৃত্যুর কারণে তার অধিকাংশ লেখা ও বই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। ওষুধ, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। ইসলামি দর্শনে আত্মা বিষয়ে তার অবদান কম নয়। তার সময়ে দর্শন ছাড়াও সংগীত ও কবিতার একজন প্রখ্যাত সমঝদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫১ সালে তার দিওয়ান আবিষ্কৃত হয়। ইবনে বাজাহর অধিকাংশ কর্ম টিকে না থাকলেও জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তার তত্ত্ব মাইমোনিডস ও ইবনে রুশদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। এ সকল তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে ইসলামি সভ্যতা ও গ্যালিলিও গ্যালিলিসহ ইউরোপের রেনেসাঁসকে প্রভাবিত করেছে।-অনুবাদক।
৬০৮. ইবনে তুফাইল: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে তুফাইল কাইসি আন্দালুসি (৪৯৪-৫৮১ হি./১১০০-১১৮৫ খ্রি.) ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, লেখক, ঔপন্যাসিক, দার্শনিক, কবি, ধর্মতাত্ত্বিক, উজির ও দরবারের কর্মকর্তা। মুওয়াহহিদি খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের দরবারে কাজ করেছেন। প্রথম দার্শনিক উপন্যাস 'হাই ইবনে ইয়াকযান' রচনার জন্য তিনি অধিক সমাদৃত। পাশ্চাত্যজগতে এটি ফিলোসফিকাল অটোডিডাকটাস নামে পরিচিত। মরদেহ ব্যবচ্ছেদের সমর্থক প্রথমদিককার চিকিৎসকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৪৯।
৬৩৭. মানুষ ও সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর প্রযত্ন বা দেখভাল।-অনুবাদক।
৬৩৮. ইবরাহিম মাদকুর, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ২, পৃ. ১৪৪।
৬৩৯. কাদরি হাফিজ তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি, পৃ. ২৭ এবং ফাওকিয়া মাহমুদ, মাকালাত ফি আসালাতিল মুফাককিরিল মুসলিম, পৃ. ৪৯।
৬৪০. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উস্তা, পৃ. ২২৪।
৬৪১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৮।
৬৪২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২৫।
৬৪৩. On the Harmony of Religions and Philosophy or The Decisive Treatise, Determining the Nature of the Connection between Religion and Philosophy.-অনুবাদক।
৬৪৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২৭ এবং রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৮।
৬৪৫. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৮।
আরবি 'ফালসাফা' (দর্শন) শব্দটি মূলত গ্রিক শব্দ। দুটি গ্রিক শব্দখণ্ড থেকে এ শব্দটি তৈরি হয়েছে, philien (এর অর্থ ভালোবাসা, প্রেম) এবং sophia (এর অর্থ জ্ঞান, প্রজ্ঞা)। এভাবে 'ফাইলাসুফ' (দার্শনিক) বা philosopher শব্দটি গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ যিনি প্রজ্ঞাকে ভালোবাসেন বা প্রজ্ঞাপ্রেমী।(৬২২)
মুসলিম দার্শনিকরা দর্শনের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে ইউসুফ আল-কিন্দি দর্শনের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা নিম্নরূপ, إِنَّهَا عِلْمُ الْأَشْيَاءِ بِحَقَائِقِهَا بِقَدْرِ طَاقَةِ الْإِنْسَانِ؛ لِأَنَّ غَرَضَ الْفَيْلَسُوْفِ فِي عِلْمِهِ إِصَابَةُ الْحَقَّ، وَفِي عَمَلِهِ الْعَمَلُ بِالْحَقِّ»
দর্শন হলো মানবিক সাধ্যের মধ্যে বস্তুরাশির হাকিকত বা মূল বিষয় জানা, কারণ দার্শনিকের উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে সত্যে উপনীত হওয়া এবং কর্মের ক্ষেত্রে সত্য অনুযায়ী তা সম্পাদন করা।(৬২৩)
অনুবাদ-আন্দোলন শুরু হওয়ার পরই মুসলিমরা দর্শনবিদ্যা সম্পর্কে জানতে পেরেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক আব্বাসি যুগে। গ্রিক দর্শনের গ্রন্থরাজির জন্য আরবের পথ সুগম হয়ে ওঠে, ভূমধ্যসাগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে-আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আন্তাকিয়া ও হাররান পর্যন্ত এসব গ্রন্থের সয়লাব ঘটে। শুধু তাই নয়, খলিফা আল-মামুন গ্রন্থাবলি ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য রোমান, অর্থাৎ বাইজান্টাইন সম্রাটদের কাছে লোক পাঠাতেন। তিনি বিশেষভাবে দর্শনের গ্রন্থাবলি সংগ্রহ করতেন। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জ্ঞানের শহর হিসেবে বিখ্যাত ছিল।(৬২৪) রোমানরা তার কাছে দর্শনের ও অন্যান্য বিষয়ের গ্রন্থাবলি পাঠান। একইভাবে দক্ষ অনুবাদকেরাও আল-মামুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন।
তারা গ্রিক গ্রন্থাবলি আরবিতে অনুবাদ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সুরয়ানি ভাষায় রূপান্তরিত গ্রিক গ্রন্থাবলিও তারা হুবহু অনুবাদ করেন। কারণ, মুসলিমদের আবির্ভাবের পূর্বে গ্রিক দর্শনের অসংখ্য গ্রন্থ সুরয়ানি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এ সকল অনুবাদকের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন: সারগিউস, সফরানিউস, সাওয়িরিস।(৬২৫)
অন্যান্য গ্রিক (ইউনানীয়) জ্ঞানের সঙ্গে গ্রিক দর্শনেরও অনুবাদ হলো এবং তা মুসলিম ভূখণ্ডে স্থান করে নিলো বটে, কিন্তু অব্যবহিত পরই গ্রিক দর্শন নিয়ে মুসলিম জ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেল। কেউ কেউ গ্রিক দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন এবং একে ভ্রান্তি, গোমরাহি ও নৈরাজ্যের ফটক বলে আখ্যায়িত করলেন। এই অবস্থান ছিল কট্টরপন্থী ফকিহদের। কেউ কেউ মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করলেন। তারা গ্রিক দর্শনের সমালোচনা ও পরিশুদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিলেন। গ্রিক দর্শনের যা-কিছু সত্য ও ভালো তা গ্রহণ করা হবে এবং যা-কিছু অসত্য ও ভ্রান্তিপূর্ণ তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। মুতাযিলা সম্প্রদায় ও বহু আশআরি মতাবলম্বীর অবস্থান ছিল এটিই। যেমন ইমাম আবু হামিদ আল-গাযালি। তিনি গ্রিক দর্শনকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম ভাগ, যেটাকে কুফরি বলে আখ্যায়িত করা আবশ্যক; দ্বিতীয় ভাগ, যেটাকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করা আবশ্যক; তৃতীয় ভাগ, যেটাকে মৌলিকভাবে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।(৬২৬)
কেউ কেউ গ্রিক দর্শনকে বিস্ময়কর ও অভাবিত জ্ঞান হিসেবে আলিঙ্গন করেছেন, তারা এর পঠনপাঠন ও চর্চায় নিয়োজিত হয়েছেন, সেগুলোর অনুকরণ করার চেষ্টা করেছেন। তারা গ্রিক দর্শনের রীতি ও আদলে লেখালেখি করেছেন। এই অবস্থানে রয়েছেন আল-কিন্দি ও তার অনুসারীরা।(৬২৭)
আরব প্রাচ্যে বা মরক্কো ও আন্দালুসে মুসলিম মনীষীদের মধ্যে একটি শ্রেণি গ্রিক দর্শনের সেবা করতে চেয়েছেন এবং গ্রিক দর্শনের প্রতি বিমুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। যেমন শেষ দৃষ্টান্তে আমরা উল্লেখ করেছি তা সত্ত্বেও তারা যে কেবল গ্রিক জ্ঞান-ঐতিহ্যের সংরক্ষক ছিলেন অথবা মধ্যযুগে ও পরবর্তী সময়ে প্রাচীন গ্রিস (ইউনান) থেকে ইউরোপে এই জ্ঞান আমদানির বাহক ছিলেন তা নয়, যদিও কতিপয় প্রাচ্যবিদ তাদেরকে এভাবেই চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে আল-কিন্দি বা আল-ফারাবি বা ইবনে সিনা বা ইবনে রুশদ প্রমুখ মনীষীর উত্তরাধিকার-ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির কাছে এটা স্পষ্ট যে, তারা দর্শনশাস্ত্রে, এমনকি গ্রিক দর্শনের বিশ্লেষণে ও সংক্ষেপণে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করেছেন, যা থেকে তাদের মৌলিকত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।
কারও পক্ষে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তাদের কারও কারও মধ্যে ঘৃণ্য পক্ষপাত এবং যাবতীয় ইসলামি ও প্রাচ্যীয় দর্শন ও জ্ঞানের প্রতি বিদ্বেষভাব শেকড় বিস্তার করেছিল। তাদের কথা অবশ্য ভিন্ন। এই ঘরানার দার্শনিকদের মৌলিকত্ব ও প্রাতিস্বিকতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ সম্ভবত দর্শন ও ধর্ম অথবা যুক্তি ও ওহির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে তাদের যে প্রয়াস তার ফলাফলেই ঘটেছে। এসব প্রয়াসের আগে তারা এ ধরনের আরও কিছু প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন। সেটা হলো সুফিতাত্ত্বিক আদর্শবাদী প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-যেমনটা তারা বুঝেছেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী অ্যারিস্টটলের (৩৮৪-৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন।(৬২৮)
দর্শনবিজ্ঞানে মুসলিমদের সেরা অবদান এই যে, তারা প্রাচীন গ্রিসের (ইউনানের) দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থাবলি ও রচনারাশির তথ্যসমূহকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং সেগুলোতে যেসব ত্রুটি ছিল সেগুলোকে সংশোধন করেছেন। তারা সেসব গ্রন্থের কোনায়-কানায় থাকা জ্ঞানের ছিটেফোঁটা এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তাদানাকে সন্নিবদ্ধ করেছেন এবং সেগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা সংযোজন করেছেন। তা ছাড়া নতুন নতুন বিষয়, তথ্য ও তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। এগুলো কেবল মুসলিম মনীষীদের উদ্ভাবন, তারা ছাড়া পূর্ববর্তীদের কেউ এগুলো জানত না। তাই ইসলামে দর্শন-চিন্তার নানা দিক ও বিভিন্ন শাখার সূচনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব), তাসাউফ (সুফিতত্ত্ব), অবিমিশ্র ইসলামি দর্শন ইত্যাদি।
এসব শাখা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো।
১. ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব)
ইসলামি যুক্তিবাদের অন্যতম সূচনা হলো দর্শনবিজ্ঞানের এই শাখা। ইবনে খালদুন ইলমুল কালামের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, এটা এমন জ্ঞান যা বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলাদির দ্বারা ঈমানি আকিদা-বিশ্বাসের সুরক্ষা প্রদান করে এবং বিদআতি ও বিকৃতিকারীদের যুক্তি খণ্ডন করে।(৬২৯)
এই বিজ্ঞানশাখাটি অবিমিশ্রভাবে মুসলিমদের বলে বিবেচিত, সূচনাকালে তো বটেই। ধর্মত্যাগ ও ভ্রষ্টতা যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই দ্বীনি আকিদা-বিশ্বাস এবং এগুলোর বিশ্লেষণ বা যৌক্তিক ব্যাখ্যার সুরক্ষার জন্য ইলমুল কালামের উদ্ভব ঘটে। ইলমুল কালামকে কেন্দ্র করেই বড় বড় দার্শনিক মতবাদের জন্ম হয়েছে। বিশ্বজগতের (বস্তুরাশির) ব্যাখ্যা এবং প্রাকৃতিক নিয়ম উদ্ভাবনে মুসলিমদের উজ্জ্বল কীর্তিরও প্রকাশ ঘটে এ সময়। তারা অস্তিত্ব, জীবন ও কার্যকারণ ইত্যাদির তাৎপর্য নিরূপণ করেন, যা ছিল গ্রিক দার্শনিকদের থেকে ভিন্ন। এই ক্ষেত্রে মুসলিম দার্শনিকরা ইউরোপের আধুনিক চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন।(৬৩০)
মুতাকাল্লিমিন বা ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের কার্যক্রমে যুক্তিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তির ব্যাপারে বেশ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এর ফলেই সম্ভবত কতিপয় প্রাচ্যবিদ ইলমুল কালামকে ইসলামি দর্শন-চিন্তার উদ্ভবের কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তারা এটিকে মুসলিমদের চিন্তার মৌলিকত্বের দলিল হিসেবেও দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে ফরাসি প্রাচ্যবিদ আর্নেস্ট রেনান (Joseph Ernest Renan) বলেছেন, ইসলামে প্রকৃত দর্শন-আন্দোলন মুতাকাল্লিমদের মতবাদগুলোতেই খুঁজে দেখা উচিত।(৬৩১)
২. তাসাউফ
তাসাউফকে ইসলামি দর্শন-চিন্তার অন্যতম ময়দান বলে বিবেচনা করা হয়। যদিও তাসাউফের মূল উপাদান হলো সুফিদের যাপিত আত্মিক অভিজ্ঞতা, তারপরও এই অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বাস্তবের সঙ্গে সংশ্লেষ ঘটে চিন্তার এবং কর্মের সঙ্গে জ্ঞানের। এ কারণে তাসাউফ কেবল অবিমিশ্র দর্শন নয় যে তা বৈপরীত্যমুক্ত ও পরিপূর্ণ অধিবিদ্যামূলক(৬৩২) তত্ত্বে উপনীত হওয়ার উদ্দেশ্যে বিতর্কমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ-আলোচনায় গুরুত্বারোপ করবে, বরং তা বিশেষ জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন, যেখানে চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ এবং চিত্তের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা, যা সত্যিকার অস্তিত্ব অনুভব করতে সাহায্য করে। এসব কারণে তাসাউফে বিভিন্ন মত, বিভিন্ন ঘরানা ও বিভিন্ন চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোকে তিনটি মানবশক্তি তথা বুদ্ধি, অস্তিত্ব ও আচরণের পরিপূর্ণতার ফল বিবেচনা করা হয়।(৬৩৩)
আমরা এখানে একটি ইঙ্গিত দেওয়া সংগত মনে করি। তাসাউফ হলো যেকোনো ধর্মীয় অভিজ্ঞতার শৃঙ্খলিত অন্তর্বীক্ষণ, যে ব্যক্তি ধর্মীয় অভিজ্ঞতা যাপন করে তার অন্তরে এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাসাউফ একটি মানবতাবাদী প্রপঞ্চ, যার প্রকৃতিটি আত্মিক, সময়ের বা স্থানের সীমারেখা দিয়ে একে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তা ছাড়া তাসাউফ কোনো জাতি বা গোষ্ঠী বা মানবশ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট নয়।(৬৩৪)
২৩. অবিমিশ্র বা বিশুদ্ধ দর্শন
যে-সকল মুসলিম দার্শনিক অভিভূত হয়ে গ্রিক দর্শনকে আলিঙ্গন করেছিলেন, গ্রিক দর্শনের পড়াশোনায় এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রচনাবলি লিখেছিলেন তাদের দর্শনই বিশুদ্ধ দর্শন। যেমন আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে বাজাহ(৬০৭), ইবনে তুফাইল(৬০৮) প্রমুখ। মুসলিম দার্শনিকদের এই দলটি ছিল এক বিশাল মিনারের মতো, এর আলোয় আলোকিত হয়েছিল গোটা বিশ্ব। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতা। নিচে এ সকল দার্শনিকের সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করা হলো।
১. আল-কিন্দি
আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি আল-কুফি (১৮৫-২৫৬ হি./৮০৫-৮৭৩ খ্রি.)। অধিকাংশ বিশ্লেষক তাকে ইসলামি আরব দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলে বিবেচনা করেছেন। তাই তিনিই 'ফাইলাসুফুল আরব' (আরবের দার্শনিক) উপাধির সত্যিকার হকদার ছিলেন। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি দুইশরও বেশি রচনা লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দর্শন বিষয়ে তার মূল্যবান গ্রন্থ 'আল-ফালসাফাতুল উলা ফি-মা দুনাত তবিইয়্যাত ওয়াত-তাওহিদ'।
আল-কিন্দি মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতা-বিষয়ক জটিলতার দার্শনিক ব্যাখ্যায় প্রথম ইটটি স্থাপন করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্রকৃত কর্ম ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের ফসল নয়। তা ছাড়া মানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় একপ্রকার মানসিক শক্তি, আবেগ ও চিন্তাই এই শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। আল- কিন্দি ছিলেন কার্যকারণে বিশ্বাসীদের একজন। ঐশী প্রযত্ন (Divine Providence)(৬৩৭)-এর চিন্তাকে তিনি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন, কতিপয় প্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে ঐশী প্রযত্নের দাবির কাছেই সৃষ্টিজগৎ নতি স্বীকার করে।(৬৩৮)
আল-কিন্দি একইভাবে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি চিকিৎসা ও ওষুধ বিষয়েও গ্রন্থ রচনা করেছেন। ভূগোল, রসায়ন, যন্ত্রপ্রকৌশল ও সংগীতবিদ্যায়ও তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। কতিপয় প্রাচ্যবিদ তাকে বারোজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অন্যতম মনে করেন, যাদেরকে মানব-চিন্তার চূড়া বিবেচনা করা হয়।(৬৩৯)
২. আল-ফারাবি
তিনি হলেন আবু নাসর মুহাম্মাদ ইবনে তারহান আল-ফারাবি (২৫৯- ৩৩৯ হি./৮৭২-৯৫০ খ্রি.)। তাকে সবচেয়ে বড় মাপের মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে বিবেচনা করা হয়। আল-ফারাবি অ্যারিস্টটলের গ্রন্থাবলির পঠনপাঠন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল নিজে। তার হাতেই অ্যারিস্টটলীয় দর্শন চূড়ান্ত মার্গে পৌছে, অ্যারিস্টটলের দর্শন কোথাও এর চেয়ে বেশি উৎকর্ষ লাভ করেনি। ইউরোপীয়দের কাছে তিনি আলফারাবিয়াস (Alpharabius) নামে বিখ্যাত। আল-ফারাবি তার ব্যাখ্যা, চিন্তা ও শৈলীর কল্যাণে গ্রিক দর্শনকে ইসলামি চিন্তার সাথে ঘনিষ্ঠ করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল-কিন্দির হাতে এই কীর্তি সাধন সম্ভব হয়নি।(৬৪০)
আল-ফারাবির সবচেয়ে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো আরাউ আহলিল মাদিনাতিল ফাদিলাহ ওয়া মুদাদ্দাতুহা। এই গ্রন্থে তিনি অভিজাত আদর্শ মানবসমাজের নীতি-ব্যবস্থা বর্ণনা করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন দিক ও ইসলামি আরব সংস্কৃতির কিছু অনুষঙ্গ তার বিশেষ দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। ইলমুল কালাম, আকিদা, ফিকহ ও শরিয়তের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক আলোচনা করেছেন। মধ্যযুগেই আল-ফারাবির গ্রন্থাবলি লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং প্যারিস থেকে ১৬৩৮ সালে মুদ্রিত হয়েছে। তাই ইউরোপের ওপর এসব গ্রন্থের বিরাট দার্শনিক প্রভাব রয়েছে।(৬৪১)
৩. ইবনে সিনা
তিনি হলেন আবু আলি হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা (৩৭০-৪২৮ হি./৯৮০-১০৩৭ খ্রি.)। ইবনে সিনা 'আশ-শাইখুর রয়িস' (প্রধান শাইখ) হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। অ্যারিস্টটল ও আল-ফারাবির পর তিনি 'তৃতীয় শিক্ষক' হিসেবে পরিচিত হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে তার যতটা খ্যাতি, দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি তার চেয়ে কম নয়। আমেরিকান ঐতিহাসিক ও রসায়নবিদ জর্জ সার্টন ইবনে সিনাকে শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম এবং পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের একজন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
দর্শন বিষয়ে ইবনে সিনার বহু রচনা রয়েছে। এসব রচনা তার হাতে দর্শন নির্মাণ ও দর্শনের বিকাশে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। তার কিছু দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ হলো 'আশ-শিফা'। এই গ্রন্থে দর্শনবিদ্যার সমাবেশ ঘটেছে। এর পরে রয়েছে 'আন-নাজাত'। যা আশ-শিফার সংক্ষিপ্ত রূপ। আরও রয়েছে 'আল-ইশারাত ওয়াত-তানবিহ' এবং হিকমাহ বিষয়ে সাতটি পুস্তিকা এবং অন্যান্য বই।(৬৪২)
৪. ইবনে রুশদ
আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে রুশদ কুরতুবি আন্দালুসি (৫৯৫ হি./১১৯৮ খ্রি.)। তিনি আন্দালুসে (মুসলিম স্পেনে) শ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক ছিলেন। তাকে অ্যারিস্টটলের দর্শনের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারও বিবেচনা করা হয়। এমনকি তিনি 'আশ-শারিহ' (ব্যাখ্যাকার) নামে পরিচিতি পান। ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর শিক্ষারাশির মধ্যে বৈশিষ্ট্যসূচক পার্থক্য নিরূপণ করেন। তা ছাড়া তিনি সেগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা ও সংশোধনও করেন। এমনকি তিনি অ্যারিস্টটলের অধিকাংশ মত ও সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না, যেগুলো ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
পাশ্চাত্য ইবনে রুশদের দর্শনের পুরোটাই গ্রহণ করেছে। তার দর্শন মধ্যযুগের ইউরোপীয় দর্শন-চিন্তার সামনে তর্কবিতর্ক ও গবেষণার ফটক উন্মোচন করে দেয়। গবেষণার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক মত গ্রহণের ব্যপারে তাদের মধ্যে 'রুশদিয়া মতবাদ' (Averroism)-এর উদ্ভব ঘটে। ইবনে রুশদের গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ফাসলুল মাকাল ফি-মা বাইনাল হিকমাতি ওয়াশ-শারিআতি মিনাল ইত্তিসাল(৬৪৩) এবং মানাহিজিল আদিল্লাহ ফি আকায়িদিল মিল্লাহ।(৬৪৪)
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, ইসলামি দর্শন মানব-চিন্তার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা হিসেবে পরিগণিত। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানব-চিন্তার উৎকর্ষ বলতে ইসলামি দর্শনকেই বোঝায়। পূর্ববর্তী দর্শন থেকে যা-কিছু গ্রহণ করা হয়েছে তা তো হয়েছেই, তা সত্ত্বেও দর্শনের বিশুদ্ধতা নিরূপণে এবং নতুন নতুন বিষয় সংযোজনে ইসলামি দর্শন-স্কুলের অবদান অনেক। ইসলামি দর্শন পরবর্তীকালের অন্যান্য দর্শনের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছে। ইসলামি দর্শনই খ্রিষ্টবাদী দর্শনকে প্রচণ্ড ধাক্কায় হটিয়ে দিয়েছে, ইউরোপীয় রেনেসাঁসের উন্মেষ ঘটিয়েছে এবং আধুনিক যুগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে রসদ জুগিয়েছে।
বাস্তবিক দিক থেকেও ইসলামি দর্শনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব। ইসলামি দর্শন ইউরোপে বেশ কিছু বিষয়কে ও সমস্যাকে জাগিয়ে দিয়েছে। যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ইনস্টিটিউটে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব সমস্যা ও বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রচুর গবেষণা, আলাপ-আলোচনা ও পঠনপাঠন হয়েছে। বহু গ্রন্থ ও রচনায় এগুলোর প্রতিবিধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশেও এসব বিষয়ের ভিন্নতা প্রভাব ফেলেছিল। এসব বিষয় ও সমস্যার মধ্যে রয়েছে আত্মা ও আত্মার রহস্য, জ্ঞান-তত্ত্ব, পৃথিবীর প্রাচীনত্বের সমস্যা, পরিবর্তনপরম্পরা-তত্ত্ব, স্রষ্টার গুণাবলি, ঐশী প্রযত্ন-সমস্যা, মঙ্গল ও অমঙ্গল, অস্তিত্ব ও উপাদান-সমস্যা, সম্ভব ও আবশ্যক সমস্যা এবং অন্যান্য বিষয়।(৬৪৫)
টিকাঃ
৬২২. ইয়াহইয়া হুওয়াইদি, মুকাদ্দামা ফিল-ফালসাফা, পৃ. ২২।
৬২৩. রাসায়িলুল কিন্দি আল-ফালসাফিয়্যাহ, খ. ১, পৃ. ১৭২।
৬২৪. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল বুলদান, খ. ৭, পৃ. ৮৭।
৬২৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২০-২২১।
৬২৬. আল-গাযালি, আল-মুনকিযু মিনাদ দালাল, পৃ. ১০১।
৬২৭. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২২, ২৩।
৬২৮. হামিদ তাহির, মাদখাল লি-দিরাসাতিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২১।
৬২৯. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৪৫৮।
৬৩০. আলি সামি নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩১ এবং আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৪।
৬৩১. আবুল ওয়াফা তাফতাযানি, দিরাসাত ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮।
৬৩২. অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স (Metaphysics) হলো দর্শনের একটি শাখা। এতে বিশ্বের অস্তিত্ব, আমাদের অস্তিত্ব, সত্যের ধারণা, বস্তুর গুণাবলি, সময়, স্থান, সম্ভাবনা ইত্যাদির দার্শনিক আলোচনা করা হয়। এই চিন্তাধারার জনক অ্যারিস্টটল। মেটাফিজিক্স শব্দটি গ্রিক 'মেটা' (μετά) এবং 'ফিজিকা' (φυσικά) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। অধিবিদ্যায় দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়: ১. সর্বশেষ পরিণাম কী? ২. কীসের মতো? অধিবিদ্যার দুটি মৌলিক শাখা হলো সৃষ্টিতত্ত্ব (cosmology) এবং তত্ত্ববিদ্যা (ontology)।-অনুবাদক
৬৩৩. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৫।
৬৩৪. আবুল আলা আফিফি, আত-তাসাউফ আস-সাওরাতুর রুহিয়্যা ফিল-ইসলাম, পৃ. ৫৬।
৬০৭. ইবনে বাজাহ আন্দালুসি: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে বাজাহ (৪৮৭-৫৩৩ হি./১০৮৫-১১৩৯ খ্রি.)। ল্যাটিনকৃত 'আডেমপেস' বলেও পরিচিত। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের আন্দালুসের একজন পলিমেথ (বহুশাস্ত্রবিদ)। ইবনে বাজাহ জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সংগীত, যুক্তি, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও কাব্য নিয়ে লিখেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইত্তিসালুল আকল'। ইবনে বাজাহ বর্তমান স্পেনের অ্যারাগনের জারাগোজায় ১০৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১১৩৯ সালে মরক্কোর ফেজে মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে বাজাজ কবি তুতিলির সঙ্গে কবিতার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন। প্রায় ২০ বছর তিনি মরক্কোর মুরাবিত সুলতান ইউসুফ ইবনে তাশফিনের উজির হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কিতাবুন নাবাত নামক উদ্ভিদবিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থের রচয়িতা। এতে উদ্ভিদের লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন সেভিলের চিকিৎসক আবু জাফর ইবনে হারুন তুরজালি। তার দার্শনিক মতামত ইবনে রুশদ ও আলবার্টাস মেগনাসের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। অল্প বয়সে মৃত্যুর কারণে তার অধিকাংশ লেখা ও বই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। ওষুধ, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। ইসলামি দর্শনে আত্মা বিষয়ে তার অবদান কম নয়। তার সময়ে দর্শন ছাড়াও সংগীত ও কবিতার একজন প্রখ্যাত সমঝদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫১ সালে তার দিওয়ান আবিষ্কৃত হয়। ইবনে বাজাহর অধিকাংশ কর্ম টিকে না থাকলেও জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তার তত্ত্ব মাইমোনিডস ও ইবনে রুশদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। এ সকল তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে ইসলামি সভ্যতা ও গ্যালিলিও গ্যালিলিসহ ইউরোপের রেনেসাঁসকে প্রভাবিত করেছে।-অনুবাদক।
৬০৮. ইবনে তুফাইল: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে তুফাইল কাইসি আন্দালুসি (৪৯৪-৫৮১ হি./১১০০-১১৮৫ খ্রি.) ছিলেন একাধারে একজন চিকিৎসক, লেখক, ঔপন্যাসিক, দার্শনিক, কবি, ধর্মতাত্ত্বিক, উজির ও দরবারের কর্মকর্তা। মুওয়াহহিদি খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফের দরবারে কাজ করেছেন। প্রথম দার্শনিক উপন্যাস 'হাই ইবনে ইয়াকযান' রচনার জন্য তিনি অধিক সমাদৃত। পাশ্চাত্যজগতে এটি ফিলোসফিকাল অটোডিডাকটাস নামে পরিচিত। মরদেহ ব্যবচ্ছেদের সমর্থক প্রথমদিককার চিকিৎসকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৪৯।
৬৩৭. মানুষ ও সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর প্রযত্ন বা দেখভাল।-অনুবাদক।
৬৩৮. ইবরাহিম মাদকুর, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ২, পৃ. ১৪৪।
৬৩৯. কাদরি হাফিজ তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি, পৃ. ২৭ এবং ফাওকিয়া মাহমুদ, মাকালাত ফি আসালাতিল মুফাককিরিল মুসলিম, পৃ. ৪৯।
৬৪০. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উস্তা, পৃ. ২২৪।
৬৪১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৮।
৬৪২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২৫।
৬৪৩. On the Harmony of Religions and Philosophy or The Decisive Treatise, Determining the Nature of the Connection between Religion and Philosophy.-অনুবাদক।
৬৪৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২২৭ এবং রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৮।
৬৪৫. আবদুল মাকসুদ আবদুল গনি, ফিল-ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৮।
📄 ইতিহাসবিজ্ঞান
কোনো সন্দেহ নেই যে, স্বয়ং মানবসমাজের অস্তিত্বের সূচনালগ্নের সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসবিদ্যার সূচনা ঘটেছে। যখন থেকে মানুষ চিহ্ন বা প্রতীক বা অন্যকিছুর দ্বারা তার জীবনের অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেছে তখন থেকেই ইতিহাসবিদ্যার ভিত রচিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই মানুষকে জানার একটি নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটেছে। সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, সামাজিক প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তেই এই জ্ঞানপদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে। সূচনাকাল থেকেই মানবগোষ্ঠীগুলোর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই প্রয়োজন আবশ্যক হয়ে উঠেছে, সুতরাং আমাদের পক্ষে এটা স্বীকার করে নেওয়া সংগতই হবে যে, ইতিহাসের সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। মানবসত্তা ও মানবসমাজকে জানার যে প্রয়োজন, ইতিহাসই তা পূরণ করে।(৬৪৬)
ইবনে খালদুন বলছেন, যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সব জাতি-গোষ্ঠী ইতিহাসশাস্ত্রের চর্চা করেছে। ভ্রাম্যমাণ কাফেলা ও যাযাবররাও ইতিহাসের প্রতি ধাবিত হয়েছে। ইতিহাসবিদ্যার কাছে ধরনা দিয়েছে সচেতন গোষ্ঠী যেমন, তেমনই কল্যাণ-অকল্যাণের ব্যাপারে উদাসীন গোষ্ঠীও। জ্ঞানী ও নির্বোধ উভয় শ্রেণিই ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে সমরেখায় অবস্থান করেছে। যেহেতু ইতিহাস বাহ্যিকভাবে রাষ্ট্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পূর্ববর্তী যুগ সম্বন্ধে কেবল সংবাদই পরিবেশন করেছে। এতে বক্তব্যের বাড়াবাড়ি আছে, দৃষ্টান্তের ছড়াছড়ি আছে। বিভিন্ন জনসমষ্টির ভিন্ন ভিন্ন দিক প্রান্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব সংবাদ আমাদের জানায় যে যুগ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পালটে যায় মানবমণ্ডলীর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্র, রাজ্য ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও ছোট-বড় সব দিক উঠে এসেছে এসব সংবাদে। তারা এক সময় পৃথিবী আবাদ করেছিল, পরে তাদের চলে যাওয়ার ডাক আসে এবং পতনের সময় এসে উপস্থিত হয়। তার অভ্যন্তরীণ দিকে (ইতিহাসবিদ্যার অভ্যন্তরে তত্ত্বানুসন্ধানীদের জন্য) রয়েছে চিন্তাভাবনার অনেক বিষয়, মানবমণ্ডলী ও তাদের নীতি-আদর্শের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা, ঘটনাবলির অবস্থা ও কার্যকারণ সম্পর্কে গভীর তত্ত্ব। এ কারণেই জ্ঞানের ময়দানে ইতিহাসশাস্ত্রের রয়েছে মৌলিক ও দৃঢ়মূল অবস্থান এবং এটি জ্ঞানের অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শাখা।(৬৪৭)
ইতিহাসবিদ্যার সংজ্ঞা নিম্নরূপ: ইতিহাস হলো বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী, তাদের দেশ ও অঞ্চল, আচার-অভ্যাস-সংস্কৃতি, ব্যক্তিবর্গের কীর্তিকলাপ, তাদের বংশধারা, জন্ম ও মৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কে জানা। ইতিহাসের বিষয়বস্তু হলো অতীতকালের নবী-রাসুল, বুযুর্গ-আওলিয়া, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ, কবি-সাহিত্যিক, রাজাবাদশা ও অন্যদের অবস্থাবলি। ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্য হলো অতীত কালের অবস্থাবলি ও ঘটনাবলি সম্পর্কে জানা। ইতিহাসবিদ্যার উপকারিতা হলো ওইসব ঘটনা ও অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, নসিহত হাসিল করা এবং যুগের পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের যোগ্যতা লাভ করা, যাতে অনুরূপ ক্ষতিকর ঘটনা থেকে বেঁচে থাকা যায় এবং অনুরূপ কল্যাণকর ঘটনা থেকে উপকৃত হওয়া যায়। এই বিদ্যায় যারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে তাদের জন্য তা অন্য জীবন এবং এই বিদ্যার ভূমিতে যারা ভ্রমণ করবে তারা অনন্য উপকারিতায় সমৃদ্ধ হবে।(৬৪৮)
ইসলামি ইতিহাসবিদ্যা মৌলিকতা ও অনন্যতার ভূষণে ভূষিত। ইসলামি সমাজের অভ্যন্তর থেকেই এই সমাজের প্রয়োজন পূরণ ও উদ্দেশ্য সাধনে সাড়া দিয়ে এই বিদ্যার উদ্ভব ঘটেছে। ইসলামি ইতিহাস অন্যদের কাছে যা ছিল তার কোনো ছায়া নয় অথবা তাদের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড ও চিন্তাবলি থেকে সংগৃহীতও কিছু নয়। ইসলামি ইতিহাস মূলত ঐতিহাসিকদের ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং ধর্মীয় জ্ঞানরাশির পরিপূরক। ইসলামি ইতিহাস হিজরি বর্ষপঞ্জিকেই যুগপরম্পরা নির্ধারণ ও ঘটনার বর্ণনায় ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।(৬৪৯)
আরবরা জাহিলি যুগে এবং ইসলামের শুরুর দিকে ইতিহাসকে তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করত। তারা ইতিহাসের ঘটনাবলি সংকলন বা লিপিবদ্ধকরণে কোনো প্রচেষ্টা ব্যয় করেনি। তা এ কারণে নয় যে তারা লিখতে জানত না, বরং তারা লেখার চেয়ে স্মৃতিতে সংরক্ষণকেই অধিক সমর্থন দিয়েছে। সেই সময়ে লেখার যোগ্যতা মানুষকে ততটা সামাজিক মর্যাদা এনে দিত না, যতটা মর্যাদা এনে দিত স্মৃতিতে সংরক্ষণের যোগ্যতা। তাই আরবদের প্রাথমিক ইতিহাস, অর্থাৎ ঘটনাবলি ও যুদ্ধবিগ্রহের বিবরণ তাদের স্মৃতিতে সুরক্ষিত ছিল, যা তারা মুখে মুখে আওড়াত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরব মুসলিমরা তাদের পরিবেশ থেকে দূরে সরে গেল, যুদ্ধ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ডে ছড়িয়ে গেল, বিভিন্ন জাতির সঙ্গে মিশে গেল যারা তাদের (আরবি) ভাষায় কথা বলত না। তখন তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণের যোগ্যতা হ্রাস পেল এবং সংগ্রহ ও সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো।
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে মুসলিমদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহ, ঘটনাবলি ও অবস্থাবলি বর্ণনা ও সংরক্ষণের তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলো। এটাই ছিল ইসলামি ইতিহাস সংকলনের সূচনা।
তবে ইসলামি ইতিহাসের সংকলন-কর্মের বিস্তৃতি ঘটল তখনই যখন বিজিত অঞ্চলগুলোর মানুষ ইসলামের প্রতি ধাবিত হলো এবং আরবি ভাষা শিখতে উঠেপড়ে লাগল। তাদের পূর্ববর্তী সভ্যতা তাদেরকে ইতিহাসের স্বাদ আস্বাদনে সহায়তা করল। এসব কারণে ইসলামের প্রাথমিক ঐতিহাসিকরা ছিলেন অনারব আরবি ভাষাবিদ।(৬৫০)
এটা বলা যায় যে, ইসলামি ইতিহাসের পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরুর দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত এবং তার যুদ্ধবিগ্রহ ও যে-সকল সাহাবি এগুলোতে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সংবাদ, প্রাথমিক মুসলিমদের হাবশায় হিজরতের তথ্যাবলি, তারপর মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের ঘটনা ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের উদ্যোগের জন্য মক্কা ও মদিনা ছিল প্রধান কেন্দ্র। ঐতিহাসিকগণ মৌখিক বর্ণনার ওপর নির্ভর করতেন, যেমন মুহাদ্দিসগণ করতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি ইতিহাস সূচনালগ্নে সেই পথেই এগিয়েছে যে পথে এগিয়েছে ইলমুল হাদিস (হাদিসশাস্ত্র)। সংবাদ ও তথ্য পরিবেশকদের থেকে এই পদ্ধতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ঐতিহাসিক সংবাদ ও তথ্য লিপিবদ্ধ করা হতো। এটি সনদ বা ইসনাদ নামে পরিচিত ছিল। এসব সংবাদ ও তথ্য ভাষ্য আকারে পরিবেশিত হলো এবং এর নাম হলো মতন। এই কারণে যুদ্ধবিগ্রহের সংবাদ-সংবলিত গ্রন্থাবলিকে (কুতুবুল মাগাযি ওয়াস-সিয়ার) সবচেয়ে প্রাচীন ও সূচনালগ্নের ইতিহাসগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এসব গ্রন্থে হাদিস ও ইতিহাসের সমাবেশ ঘটেছিল। এসব গ্রন্থ সংকলনে গুরুত্ব প্রদানের কারণ ছিল এই যে, মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ও কাজের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন, যেহেতু তারা এগুলোর দ্বারা পথের দিশা পেতেন এবং এগুলোরই ওপর নির্ভর করতেন।
ফলে মুসলিমদের ইতিহাস সংকলনে দুটি পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে। ১. মুহাদ্দিসগণের পদ্ধতি। মদিনা মুনাওয়ারায় যাপিত নববি জীবনচরিতের ইতিহাস রচনায় এই পদ্ধতির স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে, এটি সনদ বা সূত্রের সঙ্গে সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। ২. এটি হলো ইতিহাসবিদদের পদ্ধতি। বিস্তারিত বিবরণের উল্লেখ, কবিতা ও বক্তৃতার উদ্ধৃতি ও ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে পরিপূর্ণ চিত্র প্রদান করা এই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য। এই পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে কুফায়। তারপর উভয় পদ্ধতির মধ্যে মিলনপ্রক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। একইভাবে ইতিহাসবিদ্যার অন্যান্য ঘরানার প্রকাশ ঘটে। এসব ঘরানার বৈশিষ্ট্য ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, ইসলামি বিজয়, বংশপরম্পরার বর্ণনা ইত্যাকার কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করা।
ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন ছিলেন তারা হলেন: আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান(৬৫১), মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরি, ইবনে ইসহাক(৬৫২), আওয়ানা ইবনুল হাকাম কালবি(৬৫৩), সাইফ ইবনে উমর কুফি(৬৫৪), আল-মাদায়িনি(৬৫৫) প্রমুখ। আল-মাদায়িনি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদদের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতেন। কারণ, তিনি সনদ ও সূত্রের ওপর অন্যদের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। তা ছাড়া তিনি তথ্য ও সংবাদ পরীক্ষানিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও শৃঙ্খলাবদ্ধকরণে মুহাদ্দিসগণের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন।
মুসলিমদের নিকট ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ ধরণগুলো নিম্নরূপ:
ক. সিরাতে নববি ও নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবিগ্রহ-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীসমূহ ও কার্যাবলির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করতেন। কারণ, তারা এগুলোর দ্বারা পথের দিশা পেতেন এবং ইসলামি বিধান প্রণয়নে, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ও জীবনযাপনে এগুলোরই ওপর নির্ভর করতেন। এ ব্যাপারটিই লেখকদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত নিয়ে গ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। কালিক অগ্রগামিতার বিবেচনায় জীবনচরিত বর্ণনাকারীদের ও তাদের গ্রন্থাবলিকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যেতে পারে।
প্রথম স্তর : এই স্তরে শ্রেষ্ঠদের মধ্যে রয়েছেন, ১. উরওয়া ইবনে যুবাইর ইবনুল আওয়াম। তিনি তাবিয়ি। ৯২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। ২. আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান। তিনি বহু পুস্তিকা রচনা করেছেন যেগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের মণি-মুক্তা ধারণ করে আছে। ৩. শুরাহবিল ইবনে সাদ।
দ্বিতীয় স্তর : এই স্তরে শ্রেষ্ঠদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব যুহরি। তাকে জীবনচরিত ও যুদ্ধবিগ্রহের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয় স্তর: এ স্তরের বিখ্যাতদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক। আমরা যত সিরাতগ্রন্থ পেয়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন সিরাতগ্রন্থের রচয়িতা তিনি।
খ. তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি
ইসলামি ইতিহাসের সংস্কৃতি সূচনালগ্ন থেকেই তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলির সঙ্গে পরিচিত। হাদিস সংকলন ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তিকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলিই হলো তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি। হাদিসের সনদ যাচাই-বাছাই, রাবিদের অবস্থাবলি নিরীক্ষণ ইত্যাদিও এসব গ্রন্থের বিষয়। এসব বিষয় থেকেই তবাকাত-চিন্তার উন্মেষ ঘটেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের বক্তব্য বিশুদ্ধীকরণ ও গ্রহণযোগ্যতার অনুমোদনে কতিপয় মানদণ্ড নির্ধারণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হাদিস-বিশেষজ্ঞদের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। রাবির চারিত্রিক দিক, তার সত্যবাদিতা ও তাকওয়াই ছিল সেসব মানদণ্ডের মৌলিক বিষয়। হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ রাবিগণের পারিবারিক অবস্থা, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার হাল-হাকিকত ও তাঁর সঙ্গে তাদের সাহচর্যের সময়সীমা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের সঙ্গে বা খুলাফায়ে রাশেদিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখার বিষয়টিও মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাদের থেকে রাবিগণ হাদিস বর্ণনা করেছেন তাদের সঙ্গে বাস্তবিক অর্থেই তাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে, নাকি সাক্ষাৎ সম্ভাব্য বিষয় ছিল, এ ব্যাপারেও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। সনদে বর্ণিত প্রত্যেক মনীষীর জন্মতারিখ ও মৃত্যুতারিখ জানতেও তারা বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ফলে হাদিসের সনদ বা ইসনাদ ছিল জীবনচরিত রচনার অন্যতম কারণ। এসব জীবনচরিতের সনদে বর্ণিত প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকত। জীবনচরিত রচনায় হাদিসের মূল উৎস অর্থাৎ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সনদের ধারাবাহিকতা জানার চেষ্টায় সনদে বর্ণিত ব্যক্তিদের ধারাবাহিক স্তরে বিন্যস্ত করা, সামসময়িকতার দিকটি বিবেচনায় আনা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সেই সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্ব দেওয়াই ছিল সংগত কাজ। এসব বিষয়েই তবাকাত (স্তরবিন্যাস)-চিন্তার উন্মেষ ঘটেছিল। সনদে বর্ণিত ব্যক্তিদের তথ্যাবলি বেশ কিছু রচনায় পরিবেশিত হয়েছিল।(৬৫৬)
তাবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন (মুহাদ্দিসগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল হুফফায (হাফিযে হাদিসগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল ফুকাহা (ফকিহগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ (শাফিয়ি মাযহাবপন্থী আলেমগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল হানাবিলাহ (হাম্বলি মাযহাবপন্থী আলেমগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল কুররা (কুরআনের কারিদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল মুফাসসিরিন (মুফাসসিরগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুস সুফিয়্যাহ (সুফিগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুশ শুআরা (কবিদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুন নাহবিয়্যিন (ব্যাকরণবিদদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল আতিব্বা (চিকিৎসকদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি। তাবাকাত-বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে: ১. আত-তাবাকাতুল কুবরা, মুহাম্মাদ ইবনে সাদ যুহরি(৬৫৭) ২. তাবাকাতুশ শুআরা, মুহাম্মাদ ইবনে সাল্লাম আল-জুমাহি(৬৫৮) ৩. তাবাকাতুল আতিব্বা, আহমাদ ইবনে আবি উসাইবিআ (মৃ. ৬৬৮ হি.) এবং অন্যান্য গ্রন্থ।
গ. জীবনচরিত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পরিবেশিত হয়েছে। জ্ঞানের বিশেষ শাখায় তাদের খ্যাতিই তাদের একত্র করেছে। বিশ্বকোষ আকারে তাদের জীবনচরিত বর্ণিত হয়েছে। আলেম, জ্ঞানী, পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, খলিফা ও অন্যান্য শ্রেণির মানুষ জীবনচরিত-বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে স্থান পেয়েছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি নিম্নরূপ: ১. মুজামুল উদাবা, ইয়াকুত হামাবি (মৃ. ৬২৬ হি) ২. উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবা, ইবনুল আসির ৩. ওয়াফাতুল আ'য়ান, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম ইবনে খাল্লিকান (মৃ. ৬৮১ হি)। জীবনচরিত বিষয়ে এটি অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ, এটির বিন্যাস উৎকৃষ্ট ও যথাযথ। ৪. ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত, ইবনে শাকির কুতুবি(৬৫৯) ৫. আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, সালাহুদ্দিন খলিল সাফাদি(৬৬০)।
ঘ. বিজয়-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে ভূখণ্ড, দেশ ও শহর বিজয়ের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: ১. ফুতুহু মিস্ত্র ওয়াল-মাগরিব ওয়াল-আন্দালুস, আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল হাকাম (মৃ. ২৫৭ হি.) ২. ফুতুহুল বুলদান, আল-বালাযুরি(৬৬১) ৩. ফুতুহুশ শাম, আল-ওয়াকিদি(৬৬২)।
ঙ. বংশধারা-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে আরবদের বংশধারা ও তাদের উৎপত্তি-সম্পর্কিত আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। বংশবিদ্যায় আরবদের বিশেষ পারঙ্গমতা ছিল, যা অন্যকোনো জাতির মধ্যে ছিল না। কারণ ইসলামের পূর্বে গোত্রগত উপজাতীয়তা (tribalism) তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ছিল। যারা বংশবিদ্যায় বিশেষ পারঙ্গম ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন নিম্নরূপ: ১. মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, তার রচিত গ্রন্থ 'জামহারাতুন নাসাব'। ২. মুসআব যুবাইরি(৬৬৩), তার রচিত গ্রন্থ 'নাসাবু কুরাইশ'। ৩. ইবনে হায্য আল-আন্দালুসি, তার রচিত গ্রন্থ 'জামহারাতু আনসাবিল আরাব'।
চ. অঞ্চল-ভিত্তিক ইতিহাস
এসব ঐতিহাসিক গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা এলাকার ইতিহাস সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। এ শ্রেণির গ্রন্থের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি নিম্নরূপ : ১. উলাতু মিসরা ওয়া কুযাতুহা, আবু উমর আল-কিন্দি(৬৬৪) ২. তারিখে বাগদাদ, খতিব আল-বাগদাদি ৩. তারিখে দিমাশক, আলি ইবনে হাসান ইবনে আসাকির, গ্রন্থটি আশি খণ্ডে রচিত। ৪. আল-বায়ানুল মুগরিব ফি ইখতিসারি আখবারি মুলুকিল আন্দালুস ওয়াকিল মাগরিব, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইযারি(৬৬৫) ৫. আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল-কাহিরাহ, জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনে তাগরি-বারদি আল-আতাবেকি(৬৬৬) (মৃত্যু : ৮৭৪ হি.)।
ছ. সাধারণ ইতিহাসের গ্রন্থাবলি
ঐতিহাসিকদের গুরুত্বের জায়গাগুলো বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং তারা যুদ্ধবিগ্রহ ও জীবনচরিতের পাশাপাশি ব্যাপকতর, সামগ্রিক ও বিপুলায়তনিক ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোকে সাধারণ ইতিহাসগ্রন্থ (তাওয়ারিখে আম্মাহ) বলে। এসব গ্রন্থে ইতিহাসের ঘটনাবলি বর্ষপঞ্জিভিত্তিক বা তারিখভিত্তিক সন্নিবিষ্ট হয়েছে। ঐতিহাসিকরা এসব গ্রন্থে মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। ইসলামপূর্ব আসমানি গ্রন্থসমূহের আলোচনা এতে স্থান পেয়েছে, জাহিলি যুগের ইতিহাস রয়েছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, খুলাফায়ে রাশেদিন থেকে সর্বশেষ ইসলামি ইতিহাসও এগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। সাধারণ ইতিহাস- রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন: ১. মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারি, তার রচিত গ্রন্থ 'তারিখুর রুসুলি ওয়াল-মুলুক', এটি 'তারিখুত তাবারি' নামে প্রসিদ্ধ। ২. আল-মাসউদি, তার রচিত গ্রন্থ 'মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার', এটি বিশ্বকোষ-জাতীয় গ্রন্থ। ৩. ইযযুদ্দিন ইবনুল আসির, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিত-তারিখ', এটি 'তারিখে ইবনে আসির' নামে বিখ্যাত। গ্রন্থটি ইসলামি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎস। ৪. ইবনে কাসির, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া'। ৫. ইবনে খালদুন বা আবু যায়েদ আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে খালদুন, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল- খাবারি ফি আইয়ামিল আরাবি ওয়াল-আজমি ওয়াল-বারবার ওয়ামান 'আসারাহুম মিন যাবিস সুলতানিল আকবার', এটি তারিখে ইবনে খালদুন নামে বিখ্যাত।(৬৬৭)
ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলির আরও বহু বিভাগ ও প্রকার রয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থরচনার হাজারো পদ্ধতির মধ্যে ইতিহাসবিদরা ইচ্ছামতো কোনো একটি বেছে নিয়েছেন এবং সেই পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইমাম যাহাবি ঐতিহাসিক গ্রন্থরচনার চল্লিশটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: সিরাতে নববি বা নবীগণের ঘটনাবলি, সাহাবিদের ইতিহাস, খলিফাদের ইতিহাস, রাজাবাদশাদের ইতিহাস, সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের ইতিহাস, উজির ও মন্ত্রীদের ইতিহাস, আমির ও গভর্নরদের ইতিহাস, ফকিহদের ইতিহাস, কারিদের ইতিহাস, হাফিজদের ইতিহাস, মুহাদ্দিসদের ইতিহাস, ইতিহাসবিদদের ইতিহাস, ব্যাকরণবিদদের ইতিহাস, সাহিত্যিকদের ইতিহাস, ভাষাবিদদের ইতিহাস, কবিদের ইতিহাস, যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখদের ইতিহাস, সুফিদের ইতিহাস, কাজি ও বিচারকদের ইতিহাস, প্রশাসকদের ইতিহাস, শিক্ষকদের ইতিহাস, ওয়ায়েজদের ইতিহাস, অভিজাত ব্যক্তিবর্গের ইতিহাস, চিকিৎসকদের ইতিহাস, দার্শনিকদের ইতিহাস, কৃপণদের ইতিহাস।(৬৬৮)
ফ্রান্জ রোসানথাল বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামি ইতিহাসের গ্রন্থাবলির পরিমাণ বিপুল। বাইজান্টাইন বার্ষিক ঘটনাপঞ্জি ইসলামি বার্ষিক ঘটনাপঞ্জির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তবে ইসলামি ইতিহাস তার নানাবিধ প্রকরণ ও বিপুল পরিমাণের কারণে ওইসব ঘটনাপঞ্জি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবিক ব্যাপার এই যে, প্রথমদিকের ইতিহাসে মনে হয় এমন কোনো স্থান নেই যেখানে অন্যদের ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি পরিমাণে ও আয়তনে মুসলিমদের ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলির সমান হতে পারে। মুসলিমদের ইতিহাসের গ্রন্থাবলি সংখ্যায় গ্রিক ও লাতিন রচনাবলির সমান, কিন্তু তা অবশ্যই মধ্যযুগের ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের রচনাবলি থেকে সংখ্যায় অনেক বেশি। কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামি সাহিত্য-আন্দোলনে এসব গ্রন্থের যে কালজয়ী ভূমিকা তা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো উপায় নেই। যে-সকল পশ্চিমা পণ্ডিত আরবদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন তারা এসব ব্যাপার ভালোভাবেই জানেন। তবে তারা বিজ্ঞান, দর্শন ও খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা তাদের সাধারণ মুসলিম সহযাত্রীদের মতোই, ঐতিহাসিক রচনাবলি সম্পর্কে কিছু জানেন বলে স্বীকার করার মতো নমনীয়তা দেখাননি।(৬৬৯)
টিকাঃ
৬৪৬. কাসিম আবদুহু কাসিম, আর-রুয়াতুল হাযারিয়্যাহ লিত-তারিখ, পৃ. ৯।
৬৪৭. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৩-৪।
৬৪৮. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ১৩৭-১৩৮।
৬৪৯. ফ্রান্জ রোসানথাল (Franz Rosenthal), A History of Muslim Historiography, আরবি অনুবাদ, علم التاريخ عند المسلمين, অনুবাদক, সালেহ আহমাদ আলি, পৃ. ২৬৭; আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ১৫৬-১৬২।
৬৫০. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২১১-২১২।
৬৫১. আবান ইবনে উসমান: আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান আল-উমাবি আল-কুরাশি (মৃ. ১০৫ হি./৭২৩ খ্রি.)। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফাসসির, ইতিহাসবিদ। সিরাতে নববি বা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত বিষয়ে রচনা তিনিই প্রথম লেখেন। তিনি খলিফা উসমান রা.-এর পুত্র। তিনি মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ১, পৃ. ৮৪।
৬৫২. ইবনে ইসহাক: মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার আল-মুত্তালিবি (মৃত্যু: ১৫১ হি./৭৬৮ খ্রি.)। আরবের প্রাথমিক ইতিহাসবিদদের অন্যতম। মদিনার অধিবাসী ছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা'। গ্রন্থটির পরিমার্জন করেছেন ইবনে হিশাম। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ২৭৬-২৭৭।
৬৫৩. আওয়ানা আল-কালবি: আবুল হাকাম আওয়ানা ইবনুল হাকাম ইবনে আওয়ানা ইবনে ইয়ায (মৃ. ১৪৭ হি./৭৬৪ খ্রি.)। বড় মাপের আলেম ও ইতিহাসবিদ, বাগ্মী ও বিশুদ্ধভাষী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আত-তারিখ', 'সিয়ারু মুআবিয়া ওয়া বানি উমাইয়া'। তার অন্যান্য গ্রন্থও রয়েছে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৭, পৃ. ২০১।
৬৫৪. সাইফ ইবনে উমর: সাইফ ইবনে উমর আল-আসাদি আল-কুফি (মৃ. ২০০ হি./৮১৫ খ্রি.)। প্রখ্যাত জীবনচরিতকার। বাগদাদে খ্যাতিমান ছিলেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আল-জামাল', 'আল-ফুতুহুল কাবির'। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ৪, পৃ. ২৫৯।
৬৫৫. আল-মাদায়িনি: আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (১৩৫-২২৫ হি./৭৫২-৮৪০ খ্রি.)। বর্ণনাধর্মী ঐতিহাসিক। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। বসরার অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আখবারু কুরাইশ'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১০, পৃ. ৪০০-৪০২।
৬৫৬. মুহাম্মাদ খায়ের মাহমুদ আল-বুকায়ি, আত-তালিফ ফি তাবাকাতিল মালিকিয়্যা ফিত-তুরাসিল আরাবিয়্যা: দিরাসাতুন তারিখিয়্যাতুন ওয়াসফিয়্যাতুন, পৃ. ২৫৮-২৫৯।
৬৫৭. ইবনে সাদ: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সাদ ইবনে মানি আয-যুহরি (১৬৮-২৩০ হি./৭৮৪-৮৪৫ খ্রি.)। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক, হাফিযে হাদিস। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আত-তাবাকাতুল কুবরা'। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ৯, পৃ. ১৬১।
৬৫৮. আল-জুমাহি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সাল্লাম আল-জুমাহি (১৫০-২৩২ হি./৭৬৭- ৮৪৬ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের ইমাম। বসরার অধিবাসী। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা'। দেখুন, ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল উদাবা, পৃ. ২৫৪১।
৬৫৯. ইবনে শাকির কুতুবি: সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে শাকির আদ-দিমাশকি (মৃ. ৭৬৪ হি./১৩৬৩ খ্রি.)। গবেষক ঐতিহাসিক, সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ। দামেশকেই জন্ম ও মৃত্যু। 'ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত' তার বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২০৩-২০৫।
৬৬০. সাফাদি: সালাহুদ্দিন খলিল ইবনে আইবেক ইবনে আবদুল্লাহ (৬৯৬-৭৬৪ হি./১২৯৬-১৩৬৩ খ্রি.)। সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক। ফিলিস্তিনের সাফাদে জন্মগ্রহণ করেন। (বর্তমানে এটি ইসরাইলের একটি শহর।) তিনি সাফাদে, মিশরে ও আলেপ্পোয় দিওয়ানুল ইনশার প্রধান (খলিফা ও আমিরদের চিঠিপত্র বিভাগের সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর দামেশকে বাইতুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। দামেশকেই মৃত্যুবরণ করেন। 'আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২০০-২০৩।
৬৬১. আল-বালাযুরি: আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে জাবির ইবনে দাউদ (জন্ম: ৮০৬ খ্রি., মৃ. ৮৯২ খ্রি./২৭৯ হি.)। ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ, বংশধারাবিশেষজ্ঞ। বাগদাদের অধিবাসী। 'ফুতুহুল বুলদান' তার বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৬, পৃ. ৩৬।
৬৬২. আল-ওয়াকিদি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে উমর ইবনে ওয়াকিদ আস-সাহমি (১৩০-২০৭ হি./৭৪৭-৮২৩ খ্রি.)। ইসলামি প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিকদের অন্যতম। হাফিযে হাদিস। 'আল-মাগাাযিন নাবাবিয়্যাহ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৩৪৮-৩৫০।
৬৬৩. মুসআব যুবাইরি: আবু আবদুল্লাহ মুসআব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুসআব (১৫৬-২৩৬ হি./৭৭৩-৮৫১ খ্রি.)। বংশবিদ্যায় প্রখ্যাত আলেম। ইতিহাসেও বিশেষজ্ঞ। হাদিসের নির্ভরযোগ্য রাবি। কবি। 'নাসাবু কুরাইশ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ৮৬-৮৭।
৬৬৪. আবু উমর আল-কিন্দি: আবু উমর মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব (২৮৩-৩৫৫ হিজরির পর/৮৯৬-৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের পর)। ঐতিহাসিক। মিশর, মিশরের অধিবাসী ও উপকূলীয় শহরের ইতিহাস সম্পর্কে তিনি সবচেয়ে বেশি জানতেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-উলাত ওয়াল-কুযাত'। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ১৪৮।
৬৬৫. ইবনে ইযারি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ, অথবা আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-মারাকেশি (মৃ. ৬৯৫ হি./১২৯৫ খ্রি.)। ঐতিহাসিক। আন্দালুসীয় বংশোদ্ভূত। মরক্কোর অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৯৫।
৬৬৬. ইবনে তাগরি-বারদি : আবুল মাহাসিন জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনে তাগরি-বারদি (৮১৩-৮৭৪ হি./১৪১০-১৪৭০ খ্রি.)। অনুসন্ধানী ইতিহাসবিদ। কায়রোর অধিবাসী, এখানেই জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ। 'আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ', তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১০০।
৬৬৭. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৯-১৮১; হিকমাত আবদুল কারিম ফারিহাত ও ইবরাহিম ইয়াসিন আল-খতিব, মাদখাল ইলা তারিখিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১১১।
৬৬৮. ফ্রান্জ রোসানথাল (Franz Rosenthal), A History of Muslim Historiography, আরবি অনুবাদ : ইলম আত-তারিখ ইন্দাল মুসলিমিন, পৃ. ৫১৮-৫২২।
৬৬৯. প্রাগুক্ত, ৩৬৯-৩৭০।
কোনো সন্দেহ নেই যে, স্বয়ং মানবসমাজের অস্তিত্বের সূচনালগ্নের সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসবিদ্যার সূচনা ঘটেছে। যখন থেকে মানুষ চিহ্ন বা প্রতীক বা অন্যকিছুর দ্বারা তার জীবনের অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেছে তখন থেকেই ইতিহাসবিদ্যার ভিত রচিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই মানুষকে জানার একটি নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটেছে। সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, সামাজিক প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তেই এই জ্ঞানপদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে। সূচনাকাল থেকেই মানবগোষ্ঠীগুলোর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই প্রয়োজন আবশ্যক হয়ে উঠেছে, সুতরাং আমাদের পক্ষে এটা স্বীকার করে নেওয়া সংগতই হবে যে, ইতিহাসের সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। মানবসত্তা ও মানবসমাজকে জানার যে প্রয়োজন, ইতিহাসই তা পূরণ করে।(৬৪৬)
ইবনে খালদুন বলছেন, যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সব জাতি-গোষ্ঠী ইতিহাসশাস্ত্রের চর্চা করেছে। ভ্রাম্যমাণ কাফেলা ও যাযাবররাও ইতিহাসের প্রতি ধাবিত হয়েছে। ইতিহাসবিদ্যার কাছে ধরনা দিয়েছে সচেতন গোষ্ঠী যেমন, তেমনই কল্যাণ-অকল্যাণের ব্যাপারে উদাসীন গোষ্ঠীও। জ্ঞানী ও নির্বোধ উভয় শ্রেণিই ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে সমরেখায় অবস্থান করেছে। যেহেতু ইতিহাস বাহ্যিকভাবে রাষ্ট্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও পূর্ববর্তী যুগ সম্বন্ধে কেবল সংবাদই পরিবেশন করেছে। এতে বক্তব্যের বাড়াবাড়ি আছে, দৃষ্টান্তের ছড়াছড়ি আছে। বিভিন্ন জনসমষ্টির ভিন্ন ভিন্ন দিক প্রান্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব সংবাদ আমাদের জানায় যে যুগ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে পালটে যায় মানবমণ্ডলীর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্র, রাজ্য ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও ছোট-বড় সব দিক উঠে এসেছে এসব সংবাদে। তারা এক সময় পৃথিবী আবাদ করেছিল, পরে তাদের চলে যাওয়ার ডাক আসে এবং পতনের সময় এসে উপস্থিত হয়। তার অভ্যন্তরীণ দিকে (ইতিহাসবিদ্যার অভ্যন্তরে তত্ত্বানুসন্ধানীদের জন্য) রয়েছে চিন্তাভাবনার অনেক বিষয়, মানবমণ্ডলী ও তাদের নীতি-আদর্শের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা, ঘটনাবলির অবস্থা ও কার্যকারণ সম্পর্কে গভীর তত্ত্ব। এ কারণেই জ্ঞানের ময়দানে ইতিহাসশাস্ত্রের রয়েছে মৌলিক ও দৃঢ়মূল অবস্থান এবং এটি জ্ঞানের অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শাখা।(৬৪৭)
ইতিহাসবিদ্যার সংজ্ঞা নিম্নরূপ: ইতিহাস হলো বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী, তাদের দেশ ও অঞ্চল, আচার-অভ্যাস-সংস্কৃতি, ব্যক্তিবর্গের কীর্তিকলাপ, তাদের বংশধারা, জন্ম ও মৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কে জানা। ইতিহাসের বিষয়বস্তু হলো অতীতকালের নবী-রাসুল, বুযুর্গ-আওলিয়া, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ, কবি-সাহিত্যিক, রাজাবাদশা ও অন্যদের অবস্থাবলি। ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্য হলো অতীত কালের অবস্থাবলি ও ঘটনাবলি সম্পর্কে জানা। ইতিহাসবিদ্যার উপকারিতা হলো ওইসব ঘটনা ও অবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, নসিহত হাসিল করা এবং যুগের পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের যোগ্যতা লাভ করা, যাতে অনুরূপ ক্ষতিকর ঘটনা থেকে বেঁচে থাকা যায় এবং অনুরূপ কল্যাণকর ঘটনা থেকে উপকৃত হওয়া যায়। এই বিদ্যায় যারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে তাদের জন্য তা অন্য জীবন এবং এই বিদ্যার ভূমিতে যারা ভ্রমণ করবে তারা অনন্য উপকারিতায় সমৃদ্ধ হবে।(৬৪৮)
ইসলামি ইতিহাসবিদ্যা মৌলিকতা ও অনন্যতার ভূষণে ভূষিত। ইসলামি সমাজের অভ্যন্তর থেকেই এই সমাজের প্রয়োজন পূরণ ও উদ্দেশ্য সাধনে সাড়া দিয়ে এই বিদ্যার উদ্ভব ঘটেছে। ইসলামি ইতিহাস অন্যদের কাছে যা ছিল তার কোনো ছায়া নয় অথবা তাদের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড ও চিন্তাবলি থেকে সংগৃহীতও কিছু নয়। ইসলামি ইতিহাস মূলত ঐতিহাসিকদের ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং ধর্মীয় জ্ঞানরাশির পরিপূরক। ইসলামি ইতিহাস হিজরি বর্ষপঞ্জিকেই যুগপরম্পরা নির্ধারণ ও ঘটনার বর্ণনায় ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।(৬৪৯)
আরবরা জাহিলি যুগে এবং ইসলামের শুরুর দিকে ইতিহাসকে তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করত। তারা ইতিহাসের ঘটনাবলি সংকলন বা লিপিবদ্ধকরণে কোনো প্রচেষ্টা ব্যয় করেনি। তা এ কারণে নয় যে তারা লিখতে জানত না, বরং তারা লেখার চেয়ে স্মৃতিতে সংরক্ষণকেই অধিক সমর্থন দিয়েছে। সেই সময়ে লেখার যোগ্যতা মানুষকে ততটা সামাজিক মর্যাদা এনে দিত না, যতটা মর্যাদা এনে দিত স্মৃতিতে সংরক্ষণের যোগ্যতা। তাই আরবদের প্রাথমিক ইতিহাস, অর্থাৎ ঘটনাবলি ও যুদ্ধবিগ্রহের বিবরণ তাদের স্মৃতিতে সুরক্ষিত ছিল, যা তারা মুখে মুখে আওড়াত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরব মুসলিমরা তাদের পরিবেশ থেকে দূরে সরে গেল, যুদ্ধ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ডে ছড়িয়ে গেল, বিভিন্ন জাতির সঙ্গে মিশে গেল যারা তাদের (আরবি) ভাষায় কথা বলত না। তখন তাদের স্মৃতিতে সংরক্ষণের যোগ্যতা হ্রাস পেল এবং সংগ্রহ ও সংকলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো।
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে মুসলিমদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহ, ঘটনাবলি ও অবস্থাবলি বর্ণনা ও সংরক্ষণের তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলো। এটাই ছিল ইসলামি ইতিহাস সংকলনের সূচনা।
তবে ইসলামি ইতিহাসের সংকলন-কর্মের বিস্তৃতি ঘটল তখনই যখন বিজিত অঞ্চলগুলোর মানুষ ইসলামের প্রতি ধাবিত হলো এবং আরবি ভাষা শিখতে উঠেপড়ে লাগল। তাদের পূর্ববর্তী সভ্যতা তাদেরকে ইতিহাসের স্বাদ আস্বাদনে সহায়তা করল। এসব কারণে ইসলামের প্রাথমিক ঐতিহাসিকরা ছিলেন অনারব আরবি ভাষাবিদ।(৬৫০)
এটা বলা যায় যে, ইসলামি ইতিহাসের পড়াশোনা ও লেখালেখি শুরুর দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত এবং তার যুদ্ধবিগ্রহ ও যে-সকল সাহাবি এগুলোতে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সংবাদ, প্রাথমিক মুসলিমদের হাবশায় হিজরতের তথ্যাবলি, তারপর মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের ঘটনা ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের উদ্যোগের জন্য মক্কা ও মদিনা ছিল প্রধান কেন্দ্র। ঐতিহাসিকগণ মৌখিক বর্ণনার ওপর নির্ভর করতেন, যেমন মুহাদ্দিসগণ করতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি ইতিহাস সূচনালগ্নে সেই পথেই এগিয়েছে যে পথে এগিয়েছে ইলমুল হাদিস (হাদিসশাস্ত্র)। সংবাদ ও তথ্য পরিবেশকদের থেকে এই পদ্ধতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ঐতিহাসিক সংবাদ ও তথ্য লিপিবদ্ধ করা হতো। এটি সনদ বা ইসনাদ নামে পরিচিত ছিল। এসব সংবাদ ও তথ্য ভাষ্য আকারে পরিবেশিত হলো এবং এর নাম হলো মতন। এই কারণে যুদ্ধবিগ্রহের সংবাদ-সংবলিত গ্রন্থাবলিকে (কুতুবুল মাগাযি ওয়াস-সিয়ার) সবচেয়ে প্রাচীন ও সূচনালগ্নের ইতিহাসগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এসব গ্রন্থে হাদিস ও ইতিহাসের সমাবেশ ঘটেছিল। এসব গ্রন্থ সংকলনে গুরুত্ব প্রদানের কারণ ছিল এই যে, মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ও কাজের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন, যেহেতু তারা এগুলোর দ্বারা পথের দিশা পেতেন এবং এগুলোরই ওপর নির্ভর করতেন।
ফলে মুসলিমদের ইতিহাস সংকলনে দুটি পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে। ১. মুহাদ্দিসগণের পদ্ধতি। মদিনা মুনাওয়ারায় যাপিত নববি জীবনচরিতের ইতিহাস রচনায় এই পদ্ধতির স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে, এটি সনদ বা সূত্রের সঙ্গে সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। ২. এটি হলো ইতিহাসবিদদের পদ্ধতি। বিস্তারিত বিবরণের উল্লেখ, কবিতা ও বক্তৃতার উদ্ধৃতি ও ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে পরিপূর্ণ চিত্র প্রদান করা এই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য। এই পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে কুফায়। তারপর উভয় পদ্ধতির মধ্যে মিলনপ্রক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। একইভাবে ইতিহাসবিদ্যার অন্যান্য ঘরানার প্রকাশ ঘটে। এসব ঘরানার বৈশিষ্ট্য ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, ইসলামি বিজয়, বংশপরম্পরার বর্ণনা ইত্যাকার কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করা।
ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন ছিলেন তারা হলেন: আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান(৬৫১), মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরি, ইবনে ইসহাক(৬৫২), আওয়ানা ইবনুল হাকাম কালবি(৬৫৩), সাইফ ইবনে উমর কুফি(৬৫৪), আল-মাদায়িনি(৬৫৫) প্রমুখ। আল-মাদায়িনি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদদের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতেন। কারণ, তিনি সনদ ও সূত্রের ওপর অন্যদের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। তা ছাড়া তিনি তথ্য ও সংবাদ পরীক্ষানিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও শৃঙ্খলাবদ্ধকরণে মুহাদ্দিসগণের পদ্ধতি অবলম্বন করতেন।
মুসলিমদের নিকট ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ ধরণগুলো নিম্নরূপ:
ক. সিরাতে নববি ও নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধবিগ্রহ-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
মুসলিমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীসমূহ ও কার্যাবলির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করতেন। কারণ, তারা এগুলোর দ্বারা পথের দিশা পেতেন এবং ইসলামি বিধান প্রণয়নে, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ও জীবনযাপনে এগুলোরই ওপর নির্ভর করতেন। এ ব্যাপারটিই লেখকদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত নিয়ে গ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। কালিক অগ্রগামিতার বিবেচনায় জীবনচরিত বর্ণনাকারীদের ও তাদের গ্রন্থাবলিকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যেতে পারে।
প্রথম স্তর : এই স্তরে শ্রেষ্ঠদের মধ্যে রয়েছেন, ১. উরওয়া ইবনে যুবাইর ইবনুল আওয়াম। তিনি তাবিয়ি। ৯২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। ২. আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান। তিনি বহু পুস্তিকা রচনা করেছেন যেগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের মণি-মুক্তা ধারণ করে আছে। ৩. শুরাহবিল ইবনে সাদ।
দ্বিতীয় স্তর : এই স্তরে শ্রেষ্ঠদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব যুহরি। তাকে জীবনচরিত ও যুদ্ধবিগ্রহের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয় স্তর: এ স্তরের বিখ্যাতদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক। আমরা যত সিরাতগ্রন্থ পেয়েছি তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন সিরাতগ্রন্থের রচয়িতা তিনি।
খ. তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি
ইসলামি ইতিহাসের সংস্কৃতি সূচনালগ্ন থেকেই তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলির সঙ্গে পরিচিত। হাদিস সংকলন ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তিকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলিই হলো তবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি। হাদিসের সনদ যাচাই-বাছাই, রাবিদের অবস্থাবলি নিরীক্ষণ ইত্যাদিও এসব গ্রন্থের বিষয়। এসব বিষয় থেকেই তবাকাত-চিন্তার উন্মেষ ঘটেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের বক্তব্য বিশুদ্ধীকরণ ও গ্রহণযোগ্যতার অনুমোদনে কতিপয় মানদণ্ড নির্ধারণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হাদিস-বিশেষজ্ঞদের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। রাবির চারিত্রিক দিক, তার সত্যবাদিতা ও তাকওয়াই ছিল সেসব মানদণ্ডের মৌলিক বিষয়। হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ রাবিগণের পারিবারিক অবস্থা, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার হাল-হাকিকত ও তাঁর সঙ্গে তাদের সাহচর্যের সময়সীমা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের সঙ্গে বা খুলাফায়ে রাশেদিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখার বিষয়টিও মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাদের থেকে রাবিগণ হাদিস বর্ণনা করেছেন তাদের সঙ্গে বাস্তবিক অর্থেই তাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে, নাকি সাক্ষাৎ সম্ভাব্য বিষয় ছিল, এ ব্যাপারেও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। সনদে বর্ণিত প্রত্যেক মনীষীর জন্মতারিখ ও মৃত্যুতারিখ জানতেও তারা বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ফলে হাদিসের সনদ বা ইসনাদ ছিল জীবনচরিত রচনার অন্যতম কারণ। এসব জীবনচরিতের সনদে বর্ণিত প্রত্যেক ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকত। জীবনচরিত রচনায় হাদিসের মূল উৎস অর্থাৎ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সনদের ধারাবাহিকতা জানার চেষ্টায় সনদে বর্ণিত ব্যক্তিদের ধারাবাহিক স্তরে বিন্যস্ত করা, সামসময়িকতার দিকটি বিবেচনায় আনা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সেই সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্ব দেওয়াই ছিল সংগত কাজ। এসব বিষয়েই তবাকাত (স্তরবিন্যাস)-চিন্তার উন্মেষ ঘটেছিল। সনদে বর্ণিত ব্যক্তিদের তথ্যাবলি বেশ কিছু রচনায় পরিবেশিত হয়েছিল।(৬৫৬)
তাবাকাত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন (মুহাদ্দিসগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল হুফফায (হাফিযে হাদিসগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল ফুকাহা (ফকিহগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ (শাফিয়ি মাযহাবপন্থী আলেমগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল হানাবিলাহ (হাম্বলি মাযহাবপন্থী আলেমগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল কুররা (কুরআনের কারিদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল মুফাসসিরিন (মুফাসসিরগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুস সুফিয়্যাহ (সুফিগণের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুশ শুআরা (কবিদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুন নাহবিয়্যিন (ব্যাকরণবিদদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি, তাবাকাতুল আতিব্বা (চিকিৎসকদের স্তরবিন্যাস)-সংবলিত গ্রন্থাবলি। তাবাকাত-বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে: ১. আত-তাবাকাতুল কুবরা, মুহাম্মাদ ইবনে সাদ যুহরি(৬৫৭) ২. তাবাকাতুশ শুআরা, মুহাম্মাদ ইবনে সাল্লাম আল-জুমাহি(৬৫৮) ৩. তাবাকাতুল আতিব্বা, আহমাদ ইবনে আবি উসাইবিআ (মৃ. ৬৬৮ হি.) এবং অন্যান্য গ্রন্থ।
গ. জীবনচরিত-বিষয়ক গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পরিবেশিত হয়েছে। জ্ঞানের বিশেষ শাখায় তাদের খ্যাতিই তাদের একত্র করেছে। বিশ্বকোষ আকারে তাদের জীবনচরিত বর্ণিত হয়েছে। আলেম, জ্ঞানী, পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, খলিফা ও অন্যান্য শ্রেণির মানুষ জীবনচরিত-বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে স্থান পেয়েছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি নিম্নরূপ: ১. মুজামুল উদাবা, ইয়াকুত হামাবি (মৃ. ৬২৬ হি) ২. উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবা, ইবনুল আসির ৩. ওয়াফাতুল আ'য়ান, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম ইবনে খাল্লিকান (মৃ. ৬৮১ হি)। জীবনচরিত বিষয়ে এটি অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ, এটির বিন্যাস উৎকৃষ্ট ও যথাযথ। ৪. ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত, ইবনে শাকির কুতুবি(৬৫৯) ৫. আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, সালাহুদ্দিন খলিল সাফাদি(৬৬০)।
ঘ. বিজয়-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে ভূখণ্ড, দেশ ও শহর বিজয়ের বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: ১. ফুতুহু মিস্ত্র ওয়াল-মাগরিব ওয়াল-আন্দালুস, আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল হাকাম (মৃ. ২৫৭ হি.) ২. ফুতুহুল বুলদান, আল-বালাযুরি(৬৬১) ৩. ফুতুহুশ শাম, আল-ওয়াকিদি(৬৬২)।
ঙ. বংশধারা-সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি
এসব গ্রন্থে আরবদের বংশধারা ও তাদের উৎপত্তি-সম্পর্কিত আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। বংশবিদ্যায় আরবদের বিশেষ পারঙ্গমতা ছিল, যা অন্যকোনো জাতির মধ্যে ছিল না। কারণ ইসলামের পূর্বে গোত্রগত উপজাতীয়তা (tribalism) তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ছিল। যারা বংশবিদ্যায় বিশেষ পারঙ্গম ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন নিম্নরূপ: ১. মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, তার রচিত গ্রন্থ 'জামহারাতুন নাসাব'। ২. মুসআব যুবাইরি(৬৬৩), তার রচিত গ্রন্থ 'নাসাবু কুরাইশ'। ৩. ইবনে হায্য আল-আন্দালুসি, তার রচিত গ্রন্থ 'জামহারাতু আনসাবিল আরাব'।
চ. অঞ্চল-ভিত্তিক ইতিহাস
এসব ঐতিহাসিক গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা এলাকার ইতিহাস সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। এ শ্রেণির গ্রন্থের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি নিম্নরূপ : ১. উলাতু মিসরা ওয়া কুযাতুহা, আবু উমর আল-কিন্দি(৬৬৪) ২. তারিখে বাগদাদ, খতিব আল-বাগদাদি ৩. তারিখে দিমাশক, আলি ইবনে হাসান ইবনে আসাকির, গ্রন্থটি আশি খণ্ডে রচিত। ৪. আল-বায়ানুল মুগরিব ফি ইখতিসারি আখবারি মুলুকিল আন্দালুস ওয়াকিল মাগরিব, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইযারি(৬৬৫) ৫. আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল-কাহিরাহ, জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনে তাগরি-বারদি আল-আতাবেকি(৬৬৬) (মৃত্যু : ৮৭৪ হি.)।
ছ. সাধারণ ইতিহাসের গ্রন্থাবলি
ঐতিহাসিকদের গুরুত্বের জায়গাগুলো বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং তারা যুদ্ধবিগ্রহ ও জীবনচরিতের পাশাপাশি ব্যাপকতর, সামগ্রিক ও বিপুলায়তনিক ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোকে সাধারণ ইতিহাসগ্রন্থ (তাওয়ারিখে আম্মাহ) বলে। এসব গ্রন্থে ইতিহাসের ঘটনাবলি বর্ষপঞ্জিভিত্তিক বা তারিখভিত্তিক সন্নিবিষ্ট হয়েছে। ঐতিহাসিকরা এসব গ্রন্থে মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। ইসলামপূর্ব আসমানি গ্রন্থসমূহের আলোচনা এতে স্থান পেয়েছে, জাহিলি যুগের ইতিহাস রয়েছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, খুলাফায়ে রাশেদিন থেকে সর্বশেষ ইসলামি ইতিহাসও এগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। সাধারণ ইতিহাস- রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন: ১. মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারি, তার রচিত গ্রন্থ 'তারিখুর রুসুলি ওয়াল-মুলুক', এটি 'তারিখুত তাবারি' নামে প্রসিদ্ধ। ২. আল-মাসউদি, তার রচিত গ্রন্থ 'মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার', এটি বিশ্বকোষ-জাতীয় গ্রন্থ। ৩. ইযযুদ্দিন ইবনুল আসির, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিত-তারিখ', এটি 'তারিখে ইবনে আসির' নামে বিখ্যাত। গ্রন্থটি ইসলামি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎস। ৪. ইবনে কাসির, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া'। ৫. ইবনে খালদুন বা আবু যায়েদ আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে খালদুন, তার রচিত গ্রন্থ 'আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল- খাবারি ফি আইয়ামিল আরাবি ওয়াল-আজমি ওয়াল-বারবার ওয়ামান 'আসারাহুম মিন যাবিস সুলতানিল আকবার', এটি তারিখে ইবনে খালদুন নামে বিখ্যাত।(৬৬৭)
ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলির আরও বহু বিভাগ ও প্রকার রয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থরচনার হাজারো পদ্ধতির মধ্যে ইতিহাসবিদরা ইচ্ছামতো কোনো একটি বেছে নিয়েছেন এবং সেই পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইমাম যাহাবি ঐতিহাসিক গ্রন্থরচনার চল্লিশটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: সিরাতে নববি বা নবীগণের ঘটনাবলি, সাহাবিদের ইতিহাস, খলিফাদের ইতিহাস, রাজাবাদশাদের ইতিহাস, সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের ইতিহাস, উজির ও মন্ত্রীদের ইতিহাস, আমির ও গভর্নরদের ইতিহাস, ফকিহদের ইতিহাস, কারিদের ইতিহাস, হাফিজদের ইতিহাস, মুহাদ্দিসদের ইতিহাস, ইতিহাসবিদদের ইতিহাস, ব্যাকরণবিদদের ইতিহাস, সাহিত্যিকদের ইতিহাস, ভাষাবিদদের ইতিহাস, কবিদের ইতিহাস, যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখদের ইতিহাস, সুফিদের ইতিহাস, কাজি ও বিচারকদের ইতিহাস, প্রশাসকদের ইতিহাস, শিক্ষকদের ইতিহাস, ওয়ায়েজদের ইতিহাস, অভিজাত ব্যক্তিবর্গের ইতিহাস, চিকিৎসকদের ইতিহাস, দার্শনিকদের ইতিহাস, কৃপণদের ইতিহাস।(৬৬৮)
ফ্রান্জ রোসানথাল বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামি ইতিহাসের গ্রন্থাবলির পরিমাণ বিপুল। বাইজান্টাইন বার্ষিক ঘটনাপঞ্জি ইসলামি বার্ষিক ঘটনাপঞ্জির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, তবে ইসলামি ইতিহাস তার নানাবিধ প্রকরণ ও বিপুল পরিমাণের কারণে ওইসব ঘটনাপঞ্জি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবিক ব্যাপার এই যে, প্রথমদিকের ইতিহাসে মনে হয় এমন কোনো স্থান নেই যেখানে অন্যদের ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলি পরিমাণে ও আয়তনে মুসলিমদের ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলির সমান হতে পারে। মুসলিমদের ইতিহাসের গ্রন্থাবলি সংখ্যায় গ্রিক ও লাতিন রচনাবলির সমান, কিন্তু তা অবশ্যই মধ্যযুগের ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের রচনাবলি থেকে সংখ্যায় অনেক বেশি। কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামি সাহিত্য-আন্দোলনে এসব গ্রন্থের যে কালজয়ী ভূমিকা তা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো উপায় নেই। যে-সকল পশ্চিমা পণ্ডিত আরবদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন তারা এসব ব্যাপার ভালোভাবেই জানেন। তবে তারা বিজ্ঞান, দর্শন ও খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা তাদের সাধারণ মুসলিম সহযাত্রীদের মতোই, ঐতিহাসিক রচনাবলি সম্পর্কে কিছু জানেন বলে স্বীকার করার মতো নমনীয়তা দেখাননি।(৬৬৯)
টিকাঃ
৬৪৬. কাসিম আবদুহু কাসিম, আর-রুয়াতুল হাযারিয়্যাহ লিত-তারিখ, পৃ. ৯।
৬৪৭. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৩-৪।
৬৪৮. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ১৩৭-১৩৮।
৬৪৯. ফ্রান্জ রোসানথাল (Franz Rosenthal), A History of Muslim Historiography, আরবি অনুবাদ, علم التاريخ عند المسلمين, অনুবাদক, সালেহ আহমাদ আলি, পৃ. ২৬৭; আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ১৫৬-১৬২।
৬৫০. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২১১-২১২।
৬৫১. আবান ইবনে উসমান: আবান ইবনে উসমান ইবনে আফফান আল-উমাবি আল-কুরাশি (মৃ. ১০৫ হি./৭২৩ খ্রি.)। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফাসসির, ইতিহাসবিদ। সিরাতে নববি বা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত বিষয়ে রচনা তিনিই প্রথম লেখেন। তিনি খলিফা উসমান রা.-এর পুত্র। তিনি মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ১, পৃ. ৮৪।
৬৫২. ইবনে ইসহাক: মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে ইয়াসার আল-মুত্তালিবি (মৃত্যু: ১৫১ হি./৭৬৮ খ্রি.)। আরবের প্রাথমিক ইতিহাসবিদদের অন্যতম। মদিনার অধিবাসী ছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হলো 'আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা'। গ্রন্থটির পরিমার্জন করেছেন ইবনে হিশাম। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ২৭৬-২৭৭।
৬৫৩. আওয়ানা আল-কালবি: আবুল হাকাম আওয়ানা ইবনুল হাকাম ইবনে আওয়ানা ইবনে ইয়ায (মৃ. ১৪৭ হি./৭৬৪ খ্রি.)। বড় মাপের আলেম ও ইতিহাসবিদ, বাগ্মী ও বিশুদ্ধভাষী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আত-তারিখ', 'সিয়ারু মুআবিয়া ওয়া বানি উমাইয়া'। তার অন্যান্য গ্রন্থও রয়েছে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৭, পৃ. ২০১।
৬৫৪. সাইফ ইবনে উমর: সাইফ ইবনে উমর আল-আসাদি আল-কুফি (মৃ. ২০০ হি./৮১৫ খ্রি.)। প্রখ্যাত জীবনচরিতকার। বাগদাদে খ্যাতিমান ছিলেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আল-জামাল', 'আল-ফুতুহুল কাবির'। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ৪, পৃ. ২৫৯।
৬৫৫. আল-মাদায়িনি: আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (১৩৫-২২৫ হি./৭৫২-৮৪০ খ্রি.)। বর্ণনাধর্মী ঐতিহাসিক। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। বসরার অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: 'আখবারু কুরাইশ'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১০, পৃ. ৪০০-৪০২।
৬৫৬. মুহাম্মাদ খায়ের মাহমুদ আল-বুকায়ি, আত-তালিফ ফি তাবাকাতিল মালিকিয়্যা ফিত-তুরাসিল আরাবিয়্যা: দিরাসাতুন তারিখিয়্যাতুন ওয়াসফিয়্যাতুন, পৃ. ২৫৮-২৫৯।
৬৫৭. ইবনে সাদ: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সাদ ইবনে মানি আয-যুহরি (১৬৮-২৩০ হি./৭৮৪-৮৪৫ খ্রি.)। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক, হাফিযে হাদিস। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আত-তাবাকাতুল কুবরা'। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ৯, পৃ. ১৬১।
৬৫৮. আল-জুমাহি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সাল্লাম আল-জুমাহি (১৫০-২৩২ হি./৭৬৭- ৮৪৬ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের ইমাম। বসরার অধিবাসী। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা'। দেখুন, ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল উদাবা, পৃ. ২৫৪১।
৬৫৯. ইবনে শাকির কুতুবি: সালাহুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে শাকির আদ-দিমাশকি (মৃ. ৭৬৪ হি./১৩৬৩ খ্রি.)। গবেষক ঐতিহাসিক, সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ। দামেশকেই জন্ম ও মৃত্যু। 'ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত' তার বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২০৩-২০৫।
৬৬০. সাফাদি: সালাহুদ্দিন খলিল ইবনে আইবেক ইবনে আবদুল্লাহ (৬৯৬-৭৬৪ হি./১২৯৬-১৩৬৩ খ্রি.)। সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক। ফিলিস্তিনের সাফাদে জন্মগ্রহণ করেন। (বর্তমানে এটি ইসরাইলের একটি শহর।) তিনি সাফাদে, মিশরে ও আলেপ্পোয় দিওয়ানুল ইনশার প্রধান (খলিফা ও আমিরদের চিঠিপত্র বিভাগের সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর দামেশকে বাইতুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। দামেশকেই মৃত্যুবরণ করেন। 'আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২০০-২০৩।
৬৬১. আল-বালাযুরি: আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে জাবির ইবনে দাউদ (জন্ম: ৮০৬ খ্রি., মৃ. ৮৯২ খ্রি./২৭৯ হি.)। ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ, বংশধারাবিশেষজ্ঞ। বাগদাদের অধিবাসী। 'ফুতুহুল বুলদান' তার বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৬, পৃ. ৩৬।
৬৬২. আল-ওয়াকিদি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে উমর ইবনে ওয়াকিদ আস-সাহমি (১৩০-২০৭ হি./৭৪৭-৮২৩ খ্রি.)। ইসলামি প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিকদের অন্যতম। হাফিযে হাদিস। 'আল-মাগাাযিন নাবাবিয়্যাহ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৪, পৃ. ৩৪৮-৩৫০।
৬৬৩. মুসআব যুবাইরি: আবু আবদুল্লাহ মুসআব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুসআব (১৫৬-২৩৬ হি./৭৭৩-৮৫১ খ্রি.)। বংশবিদ্যায় প্রখ্যাত আলেম। ইতিহাসেও বিশেষজ্ঞ। হাদিসের নির্ভরযোগ্য রাবি। কবি। 'নাসাবু কুরাইশ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ৮৬-৮৭।
৬৬৪. আবু উমর আল-কিন্দি: আবু উমর মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব (২৮৩-৩৫৫ হিজরির পর/৮৯৬-৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের পর)। ঐতিহাসিক। মিশর, মিশরের অধিবাসী ও উপকূলীয় শহরের ইতিহাস সম্পর্কে তিনি সবচেয়ে বেশি জানতেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-উলাত ওয়াল-কুযাত'। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ১৪৮।
৬৬৫. ইবনে ইযারি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ, অথবা আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-মারাকেশি (মৃ. ৬৯৫ হি./১২৯৫ খ্রি.)। ঐতিহাসিক। আন্দালুসীয় বংশোদ্ভূত। মরক্কোর অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৯৫।
৬৬৬. ইবনে তাগরি-বারদি : আবুল মাহাসিন জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনে তাগরি-বারদি (৮১৩-৮৭৪ হি./১৪১০-১৪৭০ খ্রি.)। অনুসন্ধানী ইতিহাসবিদ। কায়রোর অধিবাসী, এখানেই জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ। 'আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ', তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১০০।
৬৬৭. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৯-১৮১; হিকমাত আবদুল কারিম ফারিহাত ও ইবরাহিম ইয়াসিন আল-খতিব, মাদখাল ইলা তারিখিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১১১।
৬৬৮. ফ্রান্জ রোসানথাল (Franz Rosenthal), A History of Muslim Historiography, আরবি অনুবাদ : ইলম আত-তারিখ ইন্দাল মুসলিমিন, পৃ. ৫১৮-৫২২।
৬৬৯. প্রাগুক্ত, ৩৬৯-৩৭০।
📄 সাহিত্য
আরবরা ইসলামপূর্ব কাল থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত। কিছু কিছু সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলেও-যেমন লাতিন সাহিত্য, ফারসি সাহিত্য-আরবি সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
আমাদের কাছে আরবদের যা-কিছু পৌঁছেছে তার মধ্যে সাহিত্য সবচেয়ে প্রাচীন। মুসলিমরা যদিও ইউনান (গ্রিস) থেকে নানা ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণ করেছে, কিন্তু তারা গ্রিক সাহিত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রহণ করেননি। অথচ ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য ছিল সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল। তা ছাড়া আরবি সাহিত্য ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য-চরিত্রের দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি।
যদিও মুসলিমরা গ্রিক সাহিত্যের কিছু গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, যেমন অ্যারিস্টটলের কবিতা, দুই বিখ্যাত গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড(৬৭০) ও ওডিসি(৬৭১)। বরং উলটো ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। যথাস্থানে আমরা তা দেখব। ইউরোপীয় সাহিত্য মূলত গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যেই একটি জাত। কোনো সন্দেহ নেই যে সাহিত্য জাতির আত্মা থেকে উৎসারিত হয়, তেমনই আরবি সাহিত্যও আরবি ও ইসলামি আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে।(৬৭২)
বিশেষজ্ঞগণ সাহিত্য বা সাহিত্যবিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, আরবি ভাষার মৌখিক ও লেখ্য রূপে যাবতীয় ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা যায় যে বিদ্যার দ্বারা তাই সাহিত্যবিদ্যা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য হলো পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষসাধন, একইসঙ্গে বুদ্ধিকে শাণিত করা এবং চিত্তকে বিশুদ্ধ করা।(৬৭৩) ইবনে খালদুন বলেন, ভাষাভাষীদের কাছে সাহিত্যবিদ্যার উদ্দেশ্য তার ফল বা পরিণতি। তা হলো আরবদের শৈলী ও রীতি-পদ্ধতি অনুসারে পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধন।(৬৭৪)
আরবি 'আদব' (সাহিত্য) শব্দটির মূল অজ্ঞাত, ইসলামি যুগে শব্দটির বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল তাও জানা যায় না। তার কারণ এই যে, আরবরা বিজিত দেশগুলোর সঙ্গে-যাদের পূর্ববর্তী সাহিত্য বিদ্যমান ছিল- নিজেদের মিশ্রণ এবং এসব দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ইসলামের শুরুর যুগে 'আদব' শব্দটি ধর্মীয় অর্থ বহন করত এবং সুন্নাহ বোঝাত। তারপর এটি যেকোনো কাজের রীতি ও পদ্ধতি বোঝাতে শুরু করল। তারপর সাধারণ সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকল। প্রত্যেক জ্ঞানশাখার একটি অংশকে গ্রহণ করাও বোঝাত 'আদব' শব্দটি। অবশেষে 'আদব' শব্দটি সাধারণ অর্থেই গদ্যে ও পদ্যে উৎকর্ষ সাধনের ওপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।(৬৭৫)
পদ্য সাহিত্য: পদ্য মানে কবিতা। মানে ছন্দবদ্ধ ও প্রত্যেক পঙ্ক্তিতে অন্ত্যমিলযুক্ত কথা। আরবদের কাব্য সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি তাদের পরিচয়ের অন্যতম বড় দিক। জাহিলি যুগের ছন্দবদ্ধ ও অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও আমরা পেয়েছি। আরবরা পদ্য বা কবিতাকে বিভিন্ন রীতি ও প্রকারে শৃঙ্খলিত করেছে। পরবর্তীকালে চারটি নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে: ১. রাজায (এই রীতিতে রচিত কাব্যকে আরজুযাহ বলা হয়। আরজুযাহ শব্দের বহুবচন আরাজিয) ২. কারিয (এটি রাজাযের বিপরীত) ৩. মাকবুয এবং ৪. মাবসুত। জাহিলি যুগে আরবরা তাদের কবিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মেলা বা বাজার বসাত। এতে বড় বড় কবি অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদের কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। যে কবি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতেন তার কবিতা কাবাঘরের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং কবিতাটির নাম দেওয়া হতো মুআল্লাকাহ (ঝুলন্ত কবিতা)।
আরবি কবিতার বিষয়বস্তু অজস্র। এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে গৌরব, প্রশংসা, নিন্দা, শোক, গুণগান, প্রেম ও প্রণয়। এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক গৌরবগাথা রচনা, অর্থাৎ উপজাতীয় ও গোত্রগত কৌলীন্য ও বংশমর্যাদা প্রকাশ করে কবিতা রচনা। জাহিলি যুগে বিভিন্ন গোত্রের কবিদের মধ্যে গৌরবগাথা রচনার প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান হতো। আরবি সাহিত্যের উৎসগুলোতে এ ধরনের গৌরবগাথার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এসব গৌরবগাথা মাঝে মাঝেই যুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটাত। ইসলাম আসার পর এ ধরনের বিদ্বেষমূলক গৌরবগাথা রচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাহিলি যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের কয়েকজন হলেন : মুহালহিল(৬৭৬), ইমরুল কাইস(৬৭৭), নাবিগা যুবয়ানি(৬৭৮), যুহাইর ইবনে আবি সুলমা(৬৭৯), আনতারা ইবনে শাদ্দাদ(৬৮০), তারাফা ইবনুল আবদ(৬৮১), আলকামা আল-ফাহল(৬৮২), আ'শা(৬৮৩) ও লাবিদ ইবনে রবিআহ। জাহিলি যুগে কয়েকজন বিখ্যাত মহিলা কবিও ছিলেন, যেমন হিন্দ বিনতে আসাদ আদ-দাবাবিয়্যাহ ও খানসা।(৬৮৪)
ইসলাম আসার পর উপজাতীয়তা ও কৌলীন্য নিয়ে বড়াই ও গৌরবের প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, যা ছিল আরবি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু। এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ গৌরবগাথা রচনার ফলে আরবদের মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। ইসলাম কবিতার নতুন চরিত্র ও প্রকৃতি নির্দেশ করে এবং একটি ভারসাম্য পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিতার বিচার করে। মিথ্যাবাদী মুনাফিক কবিদের নিন্দা প্রকাশ করে এবং সত্যবাদীদের প্রশংসা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ ( أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
এবং কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখো না তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং তারা এমন কথা বলে যা তারা করে না। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোন স্থলে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।(৬৮৫)
উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ مِنَ الشَّعْرِ حِكْمَةً» নিশ্চয় কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ।(৬৮৬)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
إِذَا خَفِيَ عَلَيْكُمْ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ فَابْتَغُوْهُ فِي الشَّعْرِ؛ فَإِنَّهُ دِيْوَانُ الْعَرَبِ
তোমাদের কাছে কুরআনের কোনো শব্দ অস্পষ্ট মনে হলে কবিতায় তা খুঁজে দেখো। কারণ, তা আরবদের তথ্য-বিবরণী।(৬৮৭)
কবিরা ইসলামি দাওয়াতকে জোরালো রূপ দিয়েছেন। তারা মুক্তি ও বিজয়ের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণের উদ্দেশ্যে স্তবগীতি রচনা করেছেন। জিহাদে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহর পথে শহিদ হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। মুজাহিদ শহিদগণের জন্য শোকগাথা রচনা করেছেন। ইসলামের শুরুর যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: কাব ইবনে যুহাইর রা. (মৃ. ২৬ হি./৬৪৫ খ্রি.), আবু যুআইব আল-হুযালি রা. (মৃ. ২৭ হি./৬৪৮ খ্রি.-এর দিকে) এবং হাসসান ইবনে সাবিত রা. (মৃ. ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রি.)। কাব ইবনে যুহাইর কাসিদায়ে বুরদা রচনা করেন।
উমাইয়া যুগে কবিতার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের বিস্তৃতি ঘটে। নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয় কবিতায়, যেগুলো ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। কারণ খলিফারা, প্রশাসক ও গভর্নররা একদিক থেকে কবিতাকে গুরুত্ব দিতেন, সামাজিক জীবনের রূপান্তর ও বিবর্তন ঘটত অন্যদিকে থেকে, আরেকদিকে ছিল নতুন নতুন রাজনৈতিক দল-উপদলের আত্মপ্রকাশ। এই যুগে কাব্য-সাহিত্য উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। কারণ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই কবিতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত। তা ছাড়া সাধারণ জনমণ্ডলীর মধ্যে কবিতার প্রভাব ছিল ব্যাপক। উমাইয়া খলিফা ও আমিররা কবিতাকে তাদের প্রশংসার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিলেন। কবিতার দ্বারা তারা তাদের কর্তৃত্বকে অটুট রাখতে এবং প্রতিপক্ষ নেতৃবৃন্দকে ঘায়েল করারও চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে শিয়া, খারেজি ও যুবাইরি আমিররা(৬৮৮) এই দিকে এগিয়ে ছিলেন। উমাইয়া যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আশা রবিআহ আবদুল্লাহ ইবনে খারিজা (মৃ. ১০০ হি./৭১৮ খ্রি.), আদি ইবনুল রিকা আল-আমিলি (মৃ. ৯৫ হি./৭১৪ খ্রি.), তিনি খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সভাকবি ছিলেন। উমাইয়া যুগে ইরাকের শক্তিমান কবিদের মধ্যে যারা খলিফা ও আমিরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আদরযত্ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, জারির ইবনে আতিয়্যাহ (৩৩-১১০ হি./৬৫৩-৭২৮ খ্রি.), ফারাযদাক (৩৮-১১৪ হি./৬৪১-৭৩২ খ্রি.) ও আল-আখতাল আত-তাগলিবি (১৯-৯০ হি./৬৪০-৭০৮ খ্রি.)। উমাইয়াদের বিরোধী দলীয় কবিদের মধ্যে শিয়া কবিরা বিখ্যাত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি (মৃ. ৬৯ হি./৬৮৮ খ্রি.), আল-কুমাইত ইবনে যায়েদ (মৃ. ১২৬ হি./৭৪৩ খ্রি.)। খারিজি কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তিরিম্মাহ ইবনুল হাকিম (মৃ. ১০০ হি.)। আবদুল্লাহ ইবনুল যুবাইর-দলীয় (যুবাইরি) কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে কাইস আর-রুকাইয়াত (মৃ. ৮৫ হি.)। উমাইয়া যুগে গযল-রচয়িতা কবিদেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। গযল দুই ধরনের : ১. উযরি এবং ২. সারিহ। কবিরা এই দুই ধরনের গযলই রচনা করতেন। উযরি গযলের বৈশিষ্ট্য হলো বক্তব্যের সারল্য ও সততা এবং গাম্ভীর্য। এই শ্রেনীর গযল-রচয়িতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জামিল বাসিনা(৬৮৯) (মৃত্যু : ৮২ হি./৭০১ খ্রি.) এবং লাইলা আল-আখিলিয়্যাহ(৬৯০) (মৃ. ৭৫ হি./৭০৪ খ্রি.)। সারিহ গযল-রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন উমর ইবনে আবি রবিআহ (২৩-৯৩ হি./৬৪৪-৭১১ খ্রি.)।(৬৯১)
আব্বাসি যুগ কবিতায় এক গভীর বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে-পরিমাণেও, প্রকরণেও। কবিতার বিষয়বস্তু, অর্থ, শৈলী, শব্দের প্রয়োগে ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে। নতুন নতুন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হতে থাকে, যা পূর্বে দেখা যায়নি। অন্যান্য বিষয়ও কবিতায় যুক্ত হয়। রাজনৈতিক কবিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে বীরত্বপূর্ণ কবিতাগাথাও, উযরি গযলের গায়েও লাগে রুণতার বাতাস। অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে স্তবগীতি ও শোক-কবিতা, প্রজ্ঞামণ্ডিত কবিতার সয়লাব বয়ে যায়, তপস্যামূলক ও দুনিয়াবিমুখতায় চিহ্নিত কবিতার জোয়ার ওঠে। সুফিতাত্ত্বিক, দার্শনিক, শিক্ষামূলক, কাহিনিমূলক এমন নানা প্রকারের কবিতা পাখা মেলে ছড়িয়ে পড়ে। নবাগত কবিরা অলংকারশাস্ত্রের বিভিন্ন অলংকার, যেমন শ্লেষালংকার ও বিরোধালংকার ইত্যাদি অপরিমিত ব্যবহার করেন। তারা শব্দের কারুকাজ ও অলংকরণে অধিক মনোযোগ দেন। ফলে কাব্য-আন্দোলন ও সাহিত্য-আন্দোলন উজ্জ্বলরূপ ধারণ করে। এই আন্দোলনে সামাজিক উপাদানগুলোর সঙ্গে কার্যকরী অর্থেই অন্যান্য উপাদানের সংশ্লেষ ঘটে। অনুবাদের পথ ধরে আরবে আগমন করে অনারব সাহিত্য-সংস্কৃতি। একদিকে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও ধর্মাদর্শিক বিরোধ, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরোধ সাহিত্য-আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে। তা ছাড়া বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে খলিফা ও শাসকরা কবিদের বেশ উৎসাহ দিতেন, উজ্জীবিত করতেন। আব্বাসি সাহিত্যের আকাশে বড় বড় কবি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে: বাশশার ইবনে বাব্দ (৯৬-১৬৮ হি./৭১৪-৭৮৪ খ্রি.), আবু নাওয়াস (১২৯-১৯৮ হি./৭৪৭-৮১৪ খ্রি.), আবু তাম্মাম হাবিব ইবনে আওস আত-তায়ি (মৃ. ২১৮ হি.), আল-বুহতুরি (২০৪-২৮৪ হি./৮১৯-৮৯৭ খ্রি.), ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি./৮৩৫-৮৯৬ খ্রি.), আবুত তাইয়িব আল-মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি./৯১৫-৯৬৫ খ্রি.), আবু ফিরাস হামদানি (৩২০-৩৫৭ হি./৯৩২-৯৬৮ খ্রি.), আবুল আলা মাআররি (৩৬৩-৪৪৯ হি./৯৭৩-১০৫৭ খ্রি.)।(৬৯২)
আন্দালুসীয় কবিরা আন্দালুসে কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের উদ্ভাবন করেন এবং এটিকে বিকশিত করেন। কবিতার এই প্রকরণের বিভিন্ন শৈলীতে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। আরবি কবিতার গঠন-উৎকর্ষে 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এটি কবিকে কবিতার অন্ত্যমিল নিয়ে কারিকুরি করার স্বাধীনতা এনে দেয়। ছন্দ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার স্বাধীনতাও কবিরা পান। কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের প্রচার-প্রসারের ফলে উপজাতীয় জাযাল(৬৯৩) সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। ইবনে খালদুন বলেন, আন্দালুসের ভূখণ্ডে কবিতাচর্চা বেড়ে গেল। কবিতার প্রকরণ, বিষয় ও প্রবণতা মার্জিত রূপ নিলো। শৈলীবদ্ধকরণ (স্টাইলাইজেশন) তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। ফলে আন্দালুসের পরবর্তী কবিরা কবিতার একটি প্রকরণ উদ্ভাবন করেন এবং এটির নাম দেন 'মুওয়াশশাহ'।(৬৯৪) আন্দালুসীয় বিখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে যাইদুন (৩৯৪-৪৬৩ হি.) এবং সেভিলের শাসক মুতামিদ ইবনে আব্বাদ (৪৩১-৪৮৮ হি./১০৪০-১০৯৫ খ্রি.)।
গদ্য সাহিত্য: গদ্য মানে অন্ত্যমিলহীন কথা। সমৃদ্ধি ও উর্বরতার দিক থেকে এটি পদ্যের চেয়ে কম নয়। ইসলামের শুরুর যুগেই গদ্য সাহিত্যের সাবলীল ও সহজ সূচনা দেখা যায়। বাক্যগুলো ছোট ছোট এবং কাঠামোও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: পত্র, ভাষণ-বক্তৃতা, হাদিস, উপমা, কাহিনি ইত্যাদি। সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গদ্য সাহিত্যেরও অগ্রগতি ঘটে। গদ্যের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য আসে এবং প্রকরণেও দেখা যায় ভিন্নতা। তাই লিখন-শিল্পের প্রকাশ ঘটে এবং উমাইয়া যুগে তা উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে। প্রথম যুগের বড় লিখন-শিল্পীদের অন্যতম হলেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব (মৃ. ১৩২ হি.)। তিনি লিখনের শর্তাবলি তার বিখ্যাত পুস্তিকাগুলোতে সন্নিবিষ্ট করেছেন এবং লিখন-শিল্পীদের সামনে তা তুলে ধরেছেন। এমনকি এ কথা প্রচলিত আছে যে, লিখন-শিল্প শুরু হয়েছে আবদুল হামিদের হাতে এবং এর সমাপ্তি ঘটেছে ইবনুল আমিরের হাতে।
আব্বাসি যুগে গদ্য-শিল্প বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে যারা গদ্য-শিল্পে খ্যাতি লাভ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিয (১৫০-২৫৫ হি./৭৬৭-৮৬৮ খ্রি.)। তিনি গদ্যের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং গদ্যের দিগন্ত বিস্তৃত করেন। গদ্যের ইমামে পরিণত হন তিনি। ইবনুল মুকাফফাও (১০৬-১৪২ হি./৭২৪-৭৫৯ খ্রি.) গদ্য সাহিত্যে জাহিযের মতো অবদান রাখেন। হিজরি চতুর্থ শতকে গদ্য সাহিত্য তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। এই সময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন আবু হাইয়ান আত-তাওহিদি (মৃ. ৪০০ হি.-এর দিকে) এবং ইবনুল আমিদ (মৃ. ৩৬৬ হি.) ও অন্যরা। এরপর গদ্যের উপর দিয়ে শাব্দিক কারুকাজ ও অলংকারের প্রবল তরঙ্গ বয়ে যায়। অর্থগত সূক্ষ্মতার চেয়ে শব্দের কারিকুরিতেই অপচয় ঘটে বেশি। পরবর্তী কয়েকজন লেখকের মাকামা-সাহিত্যে(৬৯৫) ও চিঠিপত্রে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিঠিপত্র হলো শৈল্পিক গদ্যের একটি প্রকার। চিঠিপত্র দুই ধরনের: ১. সরকারি বা সাধারণ চিঠি এবং ২. ব্যক্তিগত বা বিশেষ চিঠি। ইসলামের শুরুর যুগে ও উমাইয়া খিলাফতকালে প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র ছিল সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট, এগুলোতে লৌকিকতার কোনো স্পর্শ ছিল না। আব্বাসি যুগ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে কাতেব বা মুন্সি নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা চিঠিপত্রে ভাষার কারুকাজ ও শব্দের কারিকুরি দেখাতে শুরু করেন। চিঠিপত্রের বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব, ইবনুল আমিদ, সাহিব ইবনে আব্বাদ প্রমুখ। বিশেষ বা ব্যক্তিগত অথবা ভ্রাতৃত্বসুলভ চিঠি হলো, যা এক বন্ধু অপর বন্ধুকে লিখে থাকে। এ ধরনের চিঠির বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন আল-জাহিয ও ইবনে যাইদুন।
আরবি গদ্যের আরেকটি প্রকার হলো খুতবা বা বক্তৃতা। মুসলিমরা কবিতার পর বক্তৃতার ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ বক্তৃতা মূলত বাগ্মিতাপূর্ণ কথা, যা সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধিতে ভাস্বর। জাহিলি যুগে ও ইসলামের শুরুর যুগে বক্তৃতার বড় ভূমিকা রয়েছে। আরবরা তাদের কিশোর-যুবাদেরকে তাদের শিশুকাল থেকেই বক্তৃতার প্রশিক্ষণ দিত। সাহিত্যের গ্রন্থগুলোতে বেশ কিছু অলংকারপূর্ণ বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে। রাশেদি যুগের বিখ্যাত খতিব বা বক্তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব। 'নাহজুল বালাগাহ' গ্রন্থে তার অলংকারসমৃদ্ধ বক্তৃতাসমূহ ও চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ বক্তৃতাই আলি রা.-এর নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও বাস্তবে তিনি সেগুলোর বক্তা নন।
উমাইয়া যুগে বক্তৃতার জোয়ার বয়ে যায়। কয়েকজন আমির ও খলিফা, যেমন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ, যিয়াদ ইবনে আবিহি ছিলেন বিখ্যাত বক্তা। তারা জনমণ্ডলীর কাছে তাদের উদ্দেশ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মেনে নিতে জনমণ্ডলীকে প্রভাবিত করার জন্য বক্তৃতার ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগ আমাদের জন্য বিপুল সংখ্যক উৎকৃষ্ট বক্তৃতার উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছে, এসব বক্তৃতা বাক্যে যেমন অলংকারপূর্ণ তেমনই চিন্তায়ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
আব্বাসি যুগে বক্তৃতা-শিল্পে পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বড় ধরনের অধঃপতন ঘটে। আব্বাসি খলিফাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে কেউই খ্যাতি বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেননি।
মুসলিমরা উপমা-সাহিত্যেও গুরুত্ব প্রদান করেন। তারা উপমা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোকে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন। উপমা-সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি নিম্নরূপ : ১. মাজমাউল আমসাল, আবুল ফজল আল-মাইদানি(৬৯৬) ২. আল-মুসতাকসা ফি আমসালিল আরাব, আল-যামাখশারি(৬৯৭), এটি আরবি উপমাসমগ্র, যেখানে উপমাগুলোকে আরবি বর্ণমালাভিত্তিক সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।
কাহিনি ও গল্প সাহিত্যে মুসলিমদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অনেক বিশাল। মানুষ এখনো এগুলো পড়ে এবং এসব কাহিনির দিগন্তবিস্তৃত প্রেক্ষাপট, ভাবনার মাধুর্য ও ঘটনার অভিনবত্বে বিমুগ্ধ হতেন। সম্ভবত এসব কাহিনির মধ্যে আক্স গোত্রের কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়সওয়ার আনতার বা আনতারার কাহিনি(৬৯৮), ইয়ামেনের বিখ্যাত বীর সাইফ ইবনে যি-ইয়াযানের কাহিনি(৬৯৯), মাগরিবের (মরক্কোর) বীরপুরুষ আবু যায়দ আল-হিলালির কাহিনি এবং মিশরের সুলতান জাহির বাইবার্সের কাহিনি, এ ছাড়াও মোগল-বিরোধী যুদ্ধ ও ক্রুসেড যুদ্ধের বীর সেনানীদের বীরত্বগাথা সবচেয়ে বিখ্যাত।
হিজরি চতুর্থ শতকে আরবি সাহিত্যে ছোট গল্পের ভিত প্রস্তুত করা হয়, এগুলোকে বলা হয় মাকামাত। বিখ্যাত মাকামাত-রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বদিউযযামান আল-হামাদানি (৩৫৮-৩৯৮ হি./৯৬৯-১০০৭ খ্রি.)। তিনি চারশ মাকামাত রচনা করেছেন। এই চারশ মাকামাত রচনা করা হয়েছে দুজন বীরপুরুষকে নিয়ে, তাদের একজন হলেন ঈসা ইবনে হিশাম এবং দ্বিতীয়জন হলেন আবুল ফাত্হ আল-ইস্কান্দারি। আরও আছেন ইবনে নাকিয়া আল-বাগদাদি (৪১০-৪৮৫ হি./১০২০-১০৯২ খ্রি.)। তিনি আল-হামদানির পদ্ধতি অনুসরণ করে গদ্য রচনা করেন। আরও আছেন আল-হারিরি(৭০০) (৪৪৬-৫১৬ হি./১০৫৪-১১২২ খ্রি.)। তিনি তার মাকামাতে আবু যায়দ আস-সারুজি এবং হারিস ইবনে হাম্মام নামের দুজন ব্যক্তির সাহসিকতার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এ দুজন ব্যক্তিই অত্যন্ত মেধাবী।(৭০১)
সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে ইবনে খালদুন বলেছেন, আরবি (ভাষা ও) সাহিত্যের ভিত্তি হলো চারটি দিওয়ান (সংকলনগ্রন্থ): ১. আদাবুল কাতিব, ইবনে কুতাইবা দিনাওরি(৭০২) ২. আল-কামিল (ফিল-লুগাহ ওয়াল-আদাব), আল-মুবাররাদ(৭০৩) ৩. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন, আল-জাহিয(৭০৪) ৪. আন-নাওয়াদির, আবু আলি আল-কালি(৭০৫)।(৭০৬) আরবি সাহিত্যের আরও কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে, এখানে সেগুলোর নাম না নিলেই নয়: আল-ইদুল ফারিদ, ইবনে আব্দ রাব্বিহি (মৃ. ৩২৮ হি.); আল-আগানি, আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানি (মৃ. ৩৫৬ হি.); বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মুজালিস, ইবনে আবদুল বার ইত্যাদি।
এই গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে আমরা আল্লাহ চাহে তো বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের ওপর ইসলামি আরবি সাহিত্যের প্রভাব সম্পর্কে জানব।
টিকাঃ
৬৭০. ইলিয়াড গ্রিক মহাকাব্য। প্রাচীন গ্রিসের ইলিওন শহরের নামানুসারে এই মহাকাব্যের নামকরণ করা হয়। মহাকবি হোমার এই মহাকাব্যের রচয়িতা। এটি গ্রিক ভাষায় রচিত ও ২৪টি সর্গে বিভক্ত। এর বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। এতে ১৬,০০০ পঙ্ক্তি কবিতা আছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় হেলেন নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে গ্রিকদের সেরা বীর ছিলেন অ্যাকিলিস আর ট্রয়ের পক্ষে ছিলেন হেক্টর। যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে তখন হেক্টর অ্যাকিলিস কর্তৃক নিহত হন এবং এর মধ্য দিয়ে মূলত ট্রয়বাসীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। যুদ্ধ শেষে গ্রিক সেনারা সুরক্ষিত ও সাজানো নগরী ট্রয় জ্বালিয়ে দেয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭১. ওডিসিও কবি হোমারের রচিত মহাকাব্য। এই কবিতায় ট্রয় নগরীর ধ্বংসের পরে ইথাকার রাজা ওডিসিউসের আপন ভূমিতে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে তাকে পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়ঝাপটা, সংগ্রাম করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। নিজের সহযোগযোদ্ধাদের হারিয়ে তাকে একাই ফিরতে হয়েছে ইথাকায়। হোমার সেই কাহিনিই তার ওডিসি মহাকাব্যে তুলে ধরেছেন। আধুনিক গ্রহণযোগ্য সংস্করণে ইলিয়াডের ১৫,৬৯৩টি ছত্র রয়েছে। এটি আইওনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৭।
৬৭৩. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৪৪।
৬৭৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।
৬৭৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮।
৬৭৬. নাজদের অধিবাসী এবং কবি ইমরুল কাইসের মামা। আসল নাম আদি ইবনে রবিআহ ইবনুল হারিস আত-তাগলিবি। ৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৭. ইমরুল কাইস হলেন ৬ষ্ঠ শতকের আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তার পুরো নাম হল ইমরুল কাইস জুনদুহ ইবনে হুজর আল-কিন্দি। তার পিতার নাম হুজর ইবনুল হারিছ এবং মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে রাবিয়াহ আল-তাগলিবি। তিনি আরবের নাজদ এলাকায় ৬ষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং রাজকীয়ভাবে প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি বাল্যকালে কবিতা রচনা শুরু করলে তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তারপর তিনি বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়ে মদ্যপায়ী জীবন শুরু করেন। তার প্রেমিকার নাম ছিল উনাইযা। ইমরুল কাইস আরবি ভাষায় লেখা বিখ্যাত কাব্য সংকলন মুআল্লাকার অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ লেখক। এই মহান কবি ৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৮. ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার একটি কবিতাকে ঝুলন্ত গীতিকার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। তার আসল নাম যিয়াদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে দাব্বাব। তার কবিতা শিল্পকুশলতা ও ছন্দমাধুর্যে উৎকৃষ্ট এবং সর্বাপেক্ষা সাবলীল। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৯. শ্রেষ্ঠ কবিত্রয়ের অন্যতম। অন্য দুজন হলেন ইমরুল কাইস ও নাবিগা। জীবৎকাল : ৫২০- ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দ। কবিদের মধ্যে প্রজ্ঞাবান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তলাভের এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮০. আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কাররাদ আল-আবসি (৫২৫-৬০৮ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত ইসলাম-পূর্ব আরব কবি। ঘোড়সওয়ার হিসেবেও খ্যাতি ছিল তার। কবিতার জন্য যেমন, তেমনই দুঃসাহসিক জীবনের জন্য বিখ্যাত। তিনি কাবাঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার অন্যতম কবি। আনতারার কবিতাগুলো ভিলহেল্ম অলওয়ার্ড-এর লেখা 'দা ডিভান্স অব দা সিক্স এনশিয়েন্ট এরাবিক পোয়েটস (লন্ডন, ১৮৭০) প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে বৈরুত থেকে (১৮৮৮) আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। ৬০৮ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮১. তারাফা ইবন আবদ জাহিলি প্রথম সারির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বিখ্যাত ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার কবিদের একজন। বাহরাইনের এক অভিজাত পরিবারে ৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। হিরার অধিপতি আমর ইবনে হিন্দ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গকবিতা রচনার অভিযোগে তারাফাকে হত্যার নির্দেশ দেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তারাফার জীবনাবসান ঘটে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮২. আলকামা ইবনে আবাদাহ ইবনে নাশিরাহ ইবনে কাইস। আলকামা আল-ফাহল নামে পরিচিত। ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি।
৬৮৩. মাইমুন ইবনে কাইস ইবনে জানদাল। আ'শা শব্দের অর্থ রাতকানা। তিনি রাতে কম দেখতেন বলে এই নামকরণ হয়েছে। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি। জন্ম ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যু ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮-২০০।
৬৮৫. সুরা শুআরা: আয়াত ২२৪-২২৭।
৬৮৬. বুখারি, কিতাব: আল-আদব, বাব: মা ইয়াজুযু মিনাশ-শি'রি ওয়ার-রাজযি ওয়া মা ইয়ুকরাহু মিনহু, হাদিস নং ৫৭৯৩; আবু দাউদ, হাদিস নং ৫০১০; তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৪৪; ইবনে মাজাহ, ৩৭৫৫।
৬৮৭. মুসতাদরাকে হাকেম, কিতাবুত তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতি নুন, হাদিস নং ৩৮৪৫।
৬৮৮. আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর খিলাফতকালে (৬৪-৭৩ হি.) যারা আমির ও গভর্নর ছিলেন।
৬৮৯. জামিল ইবনে মা'মার, বা জামিল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'মার আল-উযরি আল- কুযায়ি।-অনুবাদক
৬৯০. লাইলা বিনতে আবদুল্লাহ আর-রিহাল ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কা'ব আল-আখিলিয়্যাহ।
৬৯১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৬৯২. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৪।
৬৯৩. জাযাল )زجل( : কথ্য উপভাষায় রচিত মৌখিক স্ট্রফিক কাব্যের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ। জাযালের সঠিক উৎস সম্পর্কে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে জাযালের প্রথম কবি হিসেবে আন্দালুসের আবু বকর ইবনে কুযমান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তার জীবৎকাল ১০৭৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৯৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৮৩।
৬৯৫. আরবি গদ্য-সাহিত্যের একটি আঙ্গিক।
৬৯৬. আল-মাইদানি : আবুল ফজল আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে ইবরাহিম (মৃ. ৫১৮ হি./১১২৪ খ্রি.)। সাহিত্যিক, গবেষক। নিসাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। খাইরুদ্দিন আয-যিরিকলি তার 'মাজমাউল আমসাল' গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এ ধরনের গ্রন্থ ইতিপূর্বে লেখা হয়নি। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১৪৮; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২১৪।
৬৯৭. আয-যামাখশারি: জারুল্লাহ আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-খাওয়ারিজমি (৪৬৭-৫৩৮ হি./১০৭৫-১১৪৪ খ্রি.)। ধর্মীয় জ্ঞান, তাফসির, ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। তার রচিত গ্রন্থ অনেক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুরআনুল কারিমের তাফসির 'আল-কাশশাফ'। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৮-১৭১।
৬৯৮. কবি আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ও তার প্রেমাস্পদ আবলার কাহিনি।-অনুবাদক।
৬৯৯. ইয়ামেনের প্রাচীন হিময়ারি বাদশাহ সাইফ ইবনে যি-ইয়াযান বা মাদিকারিব ইবনে আবু মুররাহ (৫১৬-৫৭৬ খ্রি.)-এর কাহিনি। তিনি ইয়ামেন থেকে হাবশিদের বিতাড়িত করেছিলেন।- অনুবাদক।
৭০০. আবু মুহাম্মাদ আল-কাসিম ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান আল-হারিরি আল-বসরি আল-হারামি।-অনুবাদক
৭০১. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২০৬-২১০; রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৫-১৭৭।
৭০২. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি : আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি (২১৩-২৭৬ হি./৮২৮-৮৮৯ খ্রি.)। মুফাসসির, ফকিহ, সাহিত্যবিশারদ, ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ২৯৬।
৭০৩. আল-মুবাররাদ: মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে আবদুল আকবার ইবনে উমাইর ইবনে হাসসান (২১০-২৮৬ হি./৮২৬-৮৯৯ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণের ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিল- লুগাহ ওয়াল-আদাব', 'আল-ফাদিল', 'আল-মুকতাদাব', 'শারহু লামিয়াতিল আরাব'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ৫৭৬।
৭০৪. আল-জাহিয: আবু উসমান আমর ইবনে বাহর আল-কিনানি (১৬৩-২৫৫ হি./৭৮০-৮৬৯ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের বড় ইমাম এবং মুতাযিলা সম্প্রদায়ের জাহিযিয়্যাহ গোত্রের প্রধান। বসরায় জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: 'আল- বায়ান ওয়াত-তাবয়িন', 'কিতাবুল হায়াওয়ান', 'আল-বুখালা', 'আল-মাহাসিন ওয়াল-আযদাদ'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১২১-১২২।
৭০৫. আবু আলি আল-কালি: ইসমাইল ইবনুল কাসিম ইবনে ইযুন (২৮৮-৩৫৬ হি./৯০১-৯২৭ খ্রি.)। ভাষা, কবিতা ও সাহিত্যের বিষয়াবলি তিনি সবচেয়ে বেশি মুখস্থ রেখেছিলেন। ফুরাত নদীর পূর্ব তীরে মানযিকাবৃন্দ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্ডোভায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'কিতাবুল আমালি', 'আল-বারিউ ফিল-লুগাহ', 'আল-আমসাল' ইত্যাদি। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১৪২।
৭০৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।
আরবরা ইসলামপূর্ব কাল থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত। কিছু কিছু সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলেও-যেমন লাতিন সাহিত্য, ফারসি সাহিত্য-আরবি সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
আমাদের কাছে আরবদের যা-কিছু পৌঁছেছে তার মধ্যে সাহিত্য সবচেয়ে প্রাচীন। মুসলিমরা যদিও ইউনান (গ্রিস) থেকে নানা ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণ করেছে, কিন্তু তারা গ্রিক সাহিত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রহণ করেননি। অথচ ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য ছিল সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল। তা ছাড়া আরবি সাহিত্য ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য-চরিত্রের দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি।
যদিও মুসলিমরা গ্রিক সাহিত্যের কিছু গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, যেমন অ্যারিস্টটলের কবিতা, দুই বিখ্যাত গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড(৬৭০) ও ওডিসি(৬৭১)। বরং উলটো ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। যথাস্থানে আমরা তা দেখব। ইউরোপীয় সাহিত্য মূলত গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যেই একটি জাত। কোনো সন্দেহ নেই যে সাহিত্য জাতির আত্মা থেকে উৎসারিত হয়, তেমনই আরবি সাহিত্যও আরবি ও ইসলামি আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে।(৬৭২)
বিশেষজ্ঞগণ সাহিত্য বা সাহিত্যবিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, আরবি ভাষার মৌখিক ও লেখ্য রূপে যাবতীয় ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা যায় যে বিদ্যার দ্বারা তাই সাহিত্যবিদ্যা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য হলো পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষসাধন, একইসঙ্গে বুদ্ধিকে শাণিত করা এবং চিত্তকে বিশুদ্ধ করা।(৬৭৩) ইবনে খালদুন বলেন, ভাষাভাষীদের কাছে সাহিত্যবিদ্যার উদ্দেশ্য তার ফল বা পরিণতি। তা হলো আরবদের শৈলী ও রীতি-পদ্ধতি অনুসারে পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধন।(৬৭৪)
আরবি 'আদব' (সাহিত্য) শব্দটির মূল অজ্ঞাত, ইসলামি যুগে শব্দটির বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল তাও জানা যায় না। তার কারণ এই যে, আরবরা বিজিত দেশগুলোর সঙ্গে-যাদের পূর্ববর্তী সাহিত্য বিদ্যমান ছিল- নিজেদের মিশ্রণ এবং এসব দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ইসলামের শুরুর যুগে 'আদব' শব্দটি ধর্মীয় অর্থ বহন করত এবং সুন্নাহ বোঝাত। তারপর এটি যেকোনো কাজের রীতি ও পদ্ধতি বোঝাতে শুরু করল। তারপর সাধারণ সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকল। প্রত্যেক জ্ঞানশাখার একটি অংশকে গ্রহণ করাও বোঝাত 'আদব' শব্দটি। অবশেষে 'আদব' শব্দটি সাধারণ অর্থেই গদ্যে ও পদ্যে উৎকর্ষ সাধনের ওপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।(৬৭৫)
পদ্য সাহিত্য: পদ্য মানে কবিতা। মানে ছন্দবদ্ধ ও প্রত্যেক পঙ্ক্তিতে অন্ত্যমিলযুক্ত কথা। আরবদের কাব্য সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি তাদের পরিচয়ের অন্যতম বড় দিক। জাহিলি যুগের ছন্দবদ্ধ ও অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও আমরা পেয়েছি। আরবরা পদ্য বা কবিতাকে বিভিন্ন রীতি ও প্রকারে শৃঙ্খলিত করেছে। পরবর্তীকালে চারটি নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে: ১. রাজায (এই রীতিতে রচিত কাব্যকে আরজুযাহ বলা হয়। আরজুযাহ শব্দের বহুবচন আরাজিয) ২. কারিয (এটি রাজাযের বিপরীত) ৩. মাকবুয এবং ৪. মাবসুত। জাহিলি যুগে আরবরা তাদের কবিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মেলা বা বাজার বসাত। এতে বড় বড় কবি অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদের কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। যে কবি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতেন তার কবিতা কাবাঘরের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং কবিতাটির নাম দেওয়া হতো মুআল্লাকাহ (ঝুলন্ত কবিতা)।
আরবি কবিতার বিষয়বস্তু অজস্র। এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে গৌরব, প্রশংসা, নিন্দা, শোক, গুণগান, প্রেম ও প্রণয়। এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক গৌরবগাথা রচনা, অর্থাৎ উপজাতীয় ও গোত্রগত কৌলীন্য ও বংশমর্যাদা প্রকাশ করে কবিতা রচনা। জাহিলি যুগে বিভিন্ন গোত্রের কবিদের মধ্যে গৌরবগাথা রচনার প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান হতো। আরবি সাহিত্যের উৎসগুলোতে এ ধরনের গৌরবগাথার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এসব গৌরবগাথা মাঝে মাঝেই যুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটাত। ইসলাম আসার পর এ ধরনের বিদ্বেষমূলক গৌরবগাথা রচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাহিলি যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের কয়েকজন হলেন : মুহালহিল(৬৭৬), ইমরুল কাইস(৬৭৭), নাবিগা যুবয়ানি(৬৭৮), যুহাইর ইবনে আবি সুলমা(৬৭৯), আনতারা ইবনে শাদ্দাদ(৬৮০), তারাফা ইবনুল আবদ(৬৮১), আলকামা আল-ফাহল(৬৮২), আ'শা(৬৮৩) ও লাবিদ ইবনে রবিআহ। জাহিলি যুগে কয়েকজন বিখ্যাত মহিলা কবিও ছিলেন, যেমন হিন্দ বিনতে আসাদ আদ-দাবাবিয়্যাহ ও খানসা।(৬৮৪)
ইসলাম আসার পর উপজাতীয়তা ও কৌলীন্য নিয়ে বড়াই ও গৌরবের প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, যা ছিল আরবি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু। এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ গৌরবগাথা রচনার ফলে আরবদের মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। ইসলাম কবিতার নতুন চরিত্র ও প্রকৃতি নির্দেশ করে এবং একটি ভারসাম্য পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিতার বিচার করে। মিথ্যাবাদী মুনাফিক কবিদের নিন্দা প্রকাশ করে এবং সত্যবাদীদের প্রশংসা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ ( أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
এবং কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখো না তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং তারা এমন কথা বলে যা তারা করে না। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোন স্থলে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।(৬৮৫)
উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ مِنَ الشَّعْرِ حِكْمَةً» নিশ্চয় কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ।(৬৮৬)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
إِذَا خَفِيَ عَلَيْكُمْ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ فَابْتَغُوْهُ فِي الشَّعْرِ؛ فَإِنَّهُ دِيْوَانُ الْعَرَبِ
তোমাদের কাছে কুরআনের কোনো শব্দ অস্পষ্ট মনে হলে কবিতায় তা খুঁজে দেখো। কারণ, তা আরবদের তথ্য-বিবরণী।(৬৮৭)
কবিরা ইসলামি দাওয়াতকে জোরালো রূপ দিয়েছেন। তারা মুক্তি ও বিজয়ের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণের উদ্দেশ্যে স্তবগীতি রচনা করেছেন। জিহাদে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহর পথে শহিদ হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। মুজাহিদ শহিদগণের জন্য শোকগাথা রচনা করেছেন। ইসলামের শুরুর যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: কাব ইবনে যুহাইর রা. (মৃ. ২৬ হি./৬৪৫ খ্রি.), আবু যুআইব আল-হুযালি রা. (মৃ. ২৭ হি./৬৪৮ খ্রি.-এর দিকে) এবং হাসসান ইবনে সাবিত রা. (মৃ. ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রি.)। কাব ইবনে যুহাইর কাসিদায়ে বুরদা রচনা করেন।
উমাইয়া যুগে কবিতার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের বিস্তৃতি ঘটে। নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয় কবিতায়, যেগুলো ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। কারণ খলিফারা, প্রশাসক ও গভর্নররা একদিক থেকে কবিতাকে গুরুত্ব দিতেন, সামাজিক জীবনের রূপান্তর ও বিবর্তন ঘটত অন্যদিকে থেকে, আরেকদিকে ছিল নতুন নতুন রাজনৈতিক দল-উপদলের আত্মপ্রকাশ। এই যুগে কাব্য-সাহিত্য উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। কারণ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই কবিতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত। তা ছাড়া সাধারণ জনমণ্ডলীর মধ্যে কবিতার প্রভাব ছিল ব্যাপক। উমাইয়া খলিফা ও আমিররা কবিতাকে তাদের প্রশংসার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিলেন। কবিতার দ্বারা তারা তাদের কর্তৃত্বকে অটুট রাখতে এবং প্রতিপক্ষ নেতৃবৃন্দকে ঘায়েল করারও চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে শিয়া, খারেজি ও যুবাইরি আমিররা(৬৮৮) এই দিকে এগিয়ে ছিলেন। উমাইয়া যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আশা রবিআহ আবদুল্লাহ ইবনে খারিজা (মৃ. ১০০ হি./৭১৮ খ্রি.), আদি ইবনুল রিকা আল-আমিলি (মৃ. ৯৫ হি./৭১৪ খ্রি.), তিনি খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সভাকবি ছিলেন। উমাইয়া যুগে ইরাকের শক্তিমান কবিদের মধ্যে যারা খলিফা ও আমিরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আদরযত্ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, জারির ইবনে আতিয়্যাহ (৩৩-১১০ হি./৬৫৩-৭২৮ খ্রি.), ফারাযদাক (৩৮-১১৪ হি./৬৪১-৭৩২ খ্রি.) ও আল-আখতাল আত-তাগলিবি (১৯-৯০ হি./৬৪০-৭০৮ খ্রি.)। উমাইয়াদের বিরোধী দলীয় কবিদের মধ্যে শিয়া কবিরা বিখ্যাত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি (মৃ. ৬৯ হি./৬৮৮ খ্রি.), আল-কুমাইত ইবনে যায়েদ (মৃ. ১২৬ হি./৭৪৩ খ্রি.)। খারিজি কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তিরিম্মাহ ইবনুল হাকিম (মৃ. ১০০ হি.)। আবদুল্লাহ ইবনুল যুবাইর-দলীয় (যুবাইরি) কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে কাইস আর-রুকাইয়াত (মৃ. ৮৫ হি.)। উমাইয়া যুগে গযল-রচয়িতা কবিদেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। গযল দুই ধরনের : ১. উযরি এবং ২. সারিহ। কবিরা এই দুই ধরনের গযলই রচনা করতেন। উযরি গযলের বৈশিষ্ট্য হলো বক্তব্যের সারল্য ও সততা এবং গাম্ভীর্য। এই শ্রেনীর গযল-রচয়িতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জামিল বাসিনা(৬৮৯) (মৃত্যু : ৮২ হি./৭০১ খ্রি.) এবং লাইলা আল-আখিলিয়্যাহ(৬৯০) (মৃ. ৭৫ হি./৭০৪ খ্রি.)। সারিহ গযল-রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন উমর ইবনে আবি রবিআহ (২৩-৯৩ হি./৬৪৪-৭১১ খ্রি.)।(৬৯১)
আব্বাসি যুগ কবিতায় এক গভীর বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে-পরিমাণেও, প্রকরণেও। কবিতার বিষয়বস্তু, অর্থ, শৈলী, শব্দের প্রয়োগে ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে। নতুন নতুন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হতে থাকে, যা পূর্বে দেখা যায়নি। অন্যান্য বিষয়ও কবিতায় যুক্ত হয়। রাজনৈতিক কবিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে বীরত্বপূর্ণ কবিতাগাথাও, উযরি গযলের গায়েও লাগে রুণতার বাতাস। অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে স্তবগীতি ও শোক-কবিতা, প্রজ্ঞামণ্ডিত কবিতার সয়লাব বয়ে যায়, তপস্যামূলক ও দুনিয়াবিমুখতায় চিহ্নিত কবিতার জোয়ার ওঠে। সুফিতাত্ত্বিক, দার্শনিক, শিক্ষামূলক, কাহিনিমূলক এমন নানা প্রকারের কবিতা পাখা মেলে ছড়িয়ে পড়ে। নবাগত কবিরা অলংকারশাস্ত্রের বিভিন্ন অলংকার, যেমন শ্লেষালংকার ও বিরোধালংকার ইত্যাদি অপরিমিত ব্যবহার করেন। তারা শব্দের কারুকাজ ও অলংকরণে অধিক মনোযোগ দেন। ফলে কাব্য-আন্দোলন ও সাহিত্য-আন্দোলন উজ্জ্বলরূপ ধারণ করে। এই আন্দোলনে সামাজিক উপাদানগুলোর সঙ্গে কার্যকরী অর্থেই অন্যান্য উপাদানের সংশ্লেষ ঘটে। অনুবাদের পথ ধরে আরবে আগমন করে অনারব সাহিত্য-সংস্কৃতি। একদিকে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও ধর্মাদর্শিক বিরোধ, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরোধ সাহিত্য-আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে। তা ছাড়া বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে খলিফা ও শাসকরা কবিদের বেশ উৎসাহ দিতেন, উজ্জীবিত করতেন। আব্বাসি সাহিত্যের আকাশে বড় বড় কবি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে: বাশশার ইবনে বাব্দ (৯৬-১৬৮ হি./৭১৪-৭৮৪ খ্রি.), আবু নাওয়াস (১২৯-১৯৮ হি./৭৪৭-৮১৪ খ্রি.), আবু তাম্মাম হাবিব ইবনে আওস আত-তায়ি (মৃ. ২১৮ হি.), আল-বুহতুরি (২০৪-২৮৪ হি./৮১৯-৮৯৭ খ্রি.), ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি./৮৩৫-৮৯৬ খ্রি.), আবুত তাইয়িব আল-মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি./৯১৫-৯৬৫ খ্রি.), আবু ফিরাস হামদানি (৩২০-৩৫৭ হি./৯৩২-৯৬৮ খ্রি.), আবুল আলা মাআররি (৩৬৩-৪৪৯ হি./৯৭৩-১০৫৭ খ্রি.)।(৬৯২)
আন্দালুসীয় কবিরা আন্দালুসে কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের উদ্ভাবন করেন এবং এটিকে বিকশিত করেন। কবিতার এই প্রকরণের বিভিন্ন শৈলীতে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। আরবি কবিতার গঠন-উৎকর্ষে 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এটি কবিকে কবিতার অন্ত্যমিল নিয়ে কারিকুরি করার স্বাধীনতা এনে দেয়। ছন্দ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার স্বাধীনতাও কবিরা পান। কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের প্রচার-প্রসারের ফলে উপজাতীয় জাযাল(৬৯৩) সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। ইবনে খালদুন বলেন, আন্দালুসের ভূখণ্ডে কবিতাচর্চা বেড়ে গেল। কবিতার প্রকরণ, বিষয় ও প্রবণতা মার্জিত রূপ নিলো। শৈলীবদ্ধকরণ (স্টাইলাইজেশন) তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। ফলে আন্দালুসের পরবর্তী কবিরা কবিতার একটি প্রকরণ উদ্ভাবন করেন এবং এটির নাম দেন 'মুওয়াশশাহ'।(৬৯৪) আন্দালুসীয় বিখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে যাইদুন (৩৯৪-৪৬৩ হি.) এবং সেভিলের শাসক মুতামিদ ইবনে আব্বাদ (৪৩১-৪৮৮ হি./১০৪০-১০৯৫ খ্রি.)।
গদ্য সাহিত্য: গদ্য মানে অন্ত্যমিলহীন কথা। সমৃদ্ধি ও উর্বরতার দিক থেকে এটি পদ্যের চেয়ে কম নয়। ইসলামের শুরুর যুগেই গদ্য সাহিত্যের সাবলীল ও সহজ সূচনা দেখা যায়। বাক্যগুলো ছোট ছোট এবং কাঠামোও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: পত্র, ভাষণ-বক্তৃতা, হাদিস, উপমা, কাহিনি ইত্যাদি। সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গদ্য সাহিত্যেরও অগ্রগতি ঘটে। গদ্যের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য আসে এবং প্রকরণেও দেখা যায় ভিন্নতা। তাই লিখন-শিল্পের প্রকাশ ঘটে এবং উমাইয়া যুগে তা উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে। প্রথম যুগের বড় লিখন-শিল্পীদের অন্যতম হলেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব (মৃ. ১৩২ হি.)। তিনি লিখনের শর্তাবলি তার বিখ্যাত পুস্তিকাগুলোতে সন্নিবিষ্ট করেছেন এবং লিখন-শিল্পীদের সামনে তা তুলে ধরেছেন। এমনকি এ কথা প্রচলিত আছে যে, লিখন-শিল্প শুরু হয়েছে আবদুল হামিদের হাতে এবং এর সমাপ্তি ঘটেছে ইবনুল আমিরের হাতে।
আব্বাসি যুগে গদ্য-শিল্প বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে যারা গদ্য-শিল্পে খ্যাতি লাভ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিয (১৫০-২৫৫ হি./৭৬৭-৮৬৮ খ্রি.)। তিনি গদ্যের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং গদ্যের দিগন্ত বিস্তৃত করেন। গদ্যের ইমামে পরিণত হন তিনি। ইবনুল মুকাফফাও (১০৬-১৪২ হি./৭২৪-৭৫৯ খ্রি.) গদ্য সাহিত্যে জাহিযের মতো অবদান রাখেন। হিজরি চতুর্থ শতকে গদ্য সাহিত্য তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। এই সময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন আবু হাইয়ান আত-তাওহিদি (মৃ. ৪০০ হি.-এর দিকে) এবং ইবনুল আমিদ (মৃ. ৩৬৬ হি.) ও অন্যরা। এরপর গদ্যের উপর দিয়ে শাব্দিক কারুকাজ ও অলংকারের প্রবল তরঙ্গ বয়ে যায়। অর্থগত সূক্ষ্মতার চেয়ে শব্দের কারিকুরিতেই অপচয় ঘটে বেশি। পরবর্তী কয়েকজন লেখকের মাকামা-সাহিত্যে(৬৯৫) ও চিঠিপত্রে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিঠিপত্র হলো শৈল্পিক গদ্যের একটি প্রকার। চিঠিপত্র দুই ধরনের: ১. সরকারি বা সাধারণ চিঠি এবং ২. ব্যক্তিগত বা বিশেষ চিঠি। ইসলামের শুরুর যুগে ও উমাইয়া খিলাফতকালে প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র ছিল সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট, এগুলোতে লৌকিকতার কোনো স্পর্শ ছিল না। আব্বাসি যুগ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে কাতেব বা মুন্সি নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা চিঠিপত্রে ভাষার কারুকাজ ও শব্দের কারিকুরি দেখাতে শুরু করেন। চিঠিপত্রের বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব, ইবনুল আমিদ, সাহিব ইবনে আব্বাদ প্রমুখ। বিশেষ বা ব্যক্তিগত অথবা ভ্রাতৃত্বসুলভ চিঠি হলো, যা এক বন্ধু অপর বন্ধুকে লিখে থাকে। এ ধরনের চিঠির বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন আল-জাহিয ও ইবনে যাইদুন।
আরবি গদ্যের আরেকটি প্রকার হলো খুতবা বা বক্তৃতা। মুসলিমরা কবিতার পর বক্তৃতার ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ বক্তৃতা মূলত বাগ্মিতাপূর্ণ কথা, যা সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধিতে ভাস্বর। জাহিলি যুগে ও ইসলামের শুরুর যুগে বক্তৃতার বড় ভূমিকা রয়েছে। আরবরা তাদের কিশোর-যুবাদেরকে তাদের শিশুকাল থেকেই বক্তৃতার প্রশিক্ষণ দিত। সাহিত্যের গ্রন্থগুলোতে বেশ কিছু অলংকারপূর্ণ বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে। রাশেদি যুগের বিখ্যাত খতিব বা বক্তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব। 'নাহজুল বালাগাহ' গ্রন্থে তার অলংকারসমৃদ্ধ বক্তৃতাসমূহ ও চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ বক্তৃতাই আলি রা.-এর নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও বাস্তবে তিনি সেগুলোর বক্তা নন।
উমাইয়া যুগে বক্তৃতার জোয়ার বয়ে যায়। কয়েকজন আমির ও খলিফা, যেমন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ, যিয়াদ ইবনে আবিহি ছিলেন বিখ্যাত বক্তা। তারা জনমণ্ডলীর কাছে তাদের উদ্দেশ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মেনে নিতে জনমণ্ডলীকে প্রভাবিত করার জন্য বক্তৃতার ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগ আমাদের জন্য বিপুল সংখ্যক উৎকৃষ্ট বক্তৃতার উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছে, এসব বক্তৃতা বাক্যে যেমন অলংকারপূর্ণ তেমনই চিন্তায়ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
আব্বাসি যুগে বক্তৃতা-শিল্পে পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বড় ধরনের অধঃপতন ঘটে। আব্বাসি খলিফাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে কেউই খ্যাতি বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেননি।
মুসলিমরা উপমা-সাহিত্যেও গুরুত্ব প্রদান করেন। তারা উপমা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোকে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন। উপমা-সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি নিম্নরূপ : ১. মাজমাউল আমসাল, আবুল ফজল আল-মাইদানি(৬৯৬) ২. আল-মুসতাকসা ফি আমসালিল আরাব, আল-যামাখশারি(৬৯৭), এটি আরবি উপমাসমগ্র, যেখানে উপমাগুলোকে আরবি বর্ণমালাভিত্তিক সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।
কাহিনি ও গল্প সাহিত্যে মুসলিমদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অনেক বিশাল। মানুষ এখনো এগুলো পড়ে এবং এসব কাহিনির দিগন্তবিস্তৃত প্রেক্ষাপট, ভাবনার মাধুর্য ও ঘটনার অভিনবত্বে বিমুগ্ধ হতেন। সম্ভবত এসব কাহিনির মধ্যে আক্স গোত্রের কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়সওয়ার আনতার বা আনতারার কাহিনি(৬৯৮), ইয়ামেনের বিখ্যাত বীর সাইফ ইবনে যি-ইয়াযানের কাহিনি(৬৯৯), মাগরিবের (মরক্কোর) বীরপুরুষ আবু যায়দ আল-হিলালির কাহিনি এবং মিশরের সুলতান জাহির বাইবার্সের কাহিনি, এ ছাড়াও মোগল-বিরোধী যুদ্ধ ও ক্রুসেড যুদ্ধের বীর সেনানীদের বীরত্বগাথা সবচেয়ে বিখ্যাত।
হিজরি চতুর্থ শতকে আরবি সাহিত্যে ছোট গল্পের ভিত প্রস্তুত করা হয়, এগুলোকে বলা হয় মাকামাত। বিখ্যাত মাকামাত-রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বদিউযযামান আল-হামাদানি (৩৫৮-৩৯৮ হি./৯৬৯-১০০৭ খ্রি.)। তিনি চারশ মাকামাত রচনা করেছেন। এই চারশ মাকামাত রচনা করা হয়েছে দুজন বীরপুরুষকে নিয়ে, তাদের একজন হলেন ঈসা ইবনে হিশাম এবং দ্বিতীয়জন হলেন আবুল ফাত্হ আল-ইস্কান্দারি। আরও আছেন ইবনে নাকিয়া আল-বাগদাদি (৪১০-৪৮৫ হি./১০২০-১০৯২ খ্রি.)। তিনি আল-হামদানির পদ্ধতি অনুসরণ করে গদ্য রচনা করেন। আরও আছেন আল-হারিরি(৭০০) (৪৪৬-৫১৬ হি./১০৫৪-১১২২ খ্রি.)। তিনি তার মাকামাতে আবু যায়দ আস-সারুজি এবং হারিস ইবনে হাম্মام নামের দুজন ব্যক্তির সাহসিকতার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এ দুজন ব্যক্তিই অত্যন্ত মেধাবী।(৭০১)
সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে ইবনে খালদুন বলেছেন, আরবি (ভাষা ও) সাহিত্যের ভিত্তি হলো চারটি দিওয়ান (সংকলনগ্রন্থ): ১. আদাবুল কাতিব, ইবনে কুতাইবা দিনাওরি(৭০২) ২. আল-কামিল (ফিল-লুগাহ ওয়াল-আদাব), আল-মুবাররাদ(৭০৩) ৩. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন, আল-জাহিয(৭০৪) ৪. আন-নাওয়াদির, আবু আলি আল-কালি(৭০৫)।(৭০৬) আরবি সাহিত্যের আরও কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে, এখানে সেগুলোর নাম না নিলেই নয়: আল-ইদুল ফারিদ, ইবনে আব্দ রাব্বিহি (মৃ. ৩২৮ হি.); আল-আগানি, আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানি (মৃ. ৩৫৬ হি.); বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মুজালিস, ইবনে আবদুল বার ইত্যাদি।
এই গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে আমরা আল্লাহ চাহে তো বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের ওপর ইসলামি আরবি সাহিত্যের প্রভাব সম্পর্কে জানব।
টিকাঃ
৬৭০. ইলিয়াড গ্রিক মহাকাব্য। প্রাচীন গ্রিসের ইলিওন শহরের নামানুসারে এই মহাকাব্যের নামকরণ করা হয়। মহাকবি হোমার এই মহাকাব্যের রচয়িতা। এটি গ্রিক ভাষায় রচিত ও ২৪টি সর্গে বিভক্ত। এর বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। এতে ১৬,০০০ পঙ্ক্তি কবিতা আছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় হেলেন নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে গ্রিকদের সেরা বীর ছিলেন অ্যাকিলিস আর ট্রয়ের পক্ষে ছিলেন হেক্টর। যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে তখন হেক্টর অ্যাকিলিস কর্তৃক নিহত হন এবং এর মধ্য দিয়ে মূলত ট্রয়বাসীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। যুদ্ধ শেষে গ্রিক সেনারা সুরক্ষিত ও সাজানো নগরী ট্রয় জ্বালিয়ে দেয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭১. ওডিসিও কবি হোমারের রচিত মহাকাব্য। এই কবিতায় ট্রয় নগরীর ধ্বংসের পরে ইথাকার রাজা ওডিসিউসের আপন ভূমিতে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে তাকে পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়ঝাপটা, সংগ্রাম করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। নিজের সহযোগযোদ্ধাদের হারিয়ে তাকে একাই ফিরতে হয়েছে ইথাকায়। হোমার সেই কাহিনিই তার ওডিসি মহাকাব্যে তুলে ধরেছেন। আধুনিক গ্রহণযোগ্য সংস্করণে ইলিয়াডের ১৫,৬৯৩টি ছত্র রয়েছে। এটি আইওনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৭।
৬৭৩. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৪৪।
৬৭৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।
৬৭৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮।
৬৭৬. নাজদের অধিবাসী এবং কবি ইমরুল কাইসের মামা। আসল নাম আদি ইবনে রবিআহ ইবনুল হারিস আত-তাগলিবি। ৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৭. ইমরুল কাইস হলেন ৬ষ্ঠ শতকের আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তার পুরো নাম হল ইমরুল কাইস জুনদুহ ইবনে হুজর আল-কিন্দি। তার পিতার নাম হুজর ইবনুল হারিছ এবং মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে রাবিয়াহ আল-তাগলিবি। তিনি আরবের নাজদ এলাকায় ৬ষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং রাজকীয়ভাবে প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি বাল্যকালে কবিতা রচনা শুরু করলে তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তারপর তিনি বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়ে মদ্যপায়ী জীবন শুরু করেন। তার প্রেমিকার নাম ছিল উনাইযা। ইমরুল কাইস আরবি ভাষায় লেখা বিখ্যাত কাব্য সংকলন মুআল্লাকার অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ লেখক। এই মহান কবি ৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৮. ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার একটি কবিতাকে ঝুলন্ত গীতিকার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। তার আসল নাম যিয়াদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে দাব্বাব। তার কবিতা শিল্পকুশলতা ও ছন্দমাধুর্যে উৎকৃষ্ট এবং সর্বাপেক্ষা সাবলীল। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৯. শ্রেষ্ঠ কবিত্রয়ের অন্যতম। অন্য দুজন হলেন ইমরুল কাইস ও নাবিগা। জীবৎকাল : ৫২০- ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দ। কবিদের মধ্যে প্রজ্ঞাবান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তলাভের এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮০. আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কাররাদ আল-আবসি (৫২৫-৬০৮ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত ইসলাম-পূর্ব আরব কবি। ঘোড়সওয়ার হিসেবেও খ্যাতি ছিল তার। কবিতার জন্য যেমন, তেমনই দুঃসাহসিক জীবনের জন্য বিখ্যাত। তিনি কাবাঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার অন্যতম কবি। আনতারার কবিতাগুলো ভিলহেল্ম অলওয়ার্ড-এর লেখা 'দা ডিভান্স অব দা সিক্স এনশিয়েন্ট এরাবিক পোয়েটস (লন্ডন, ১৮৭০) প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে বৈরুত থেকে (১৮৮৮) আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। ৬০৮ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮১. তারাফা ইবন আবদ জাহিলি প্রথম সারির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বিখ্যাত ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার কবিদের একজন। বাহরাইনের এক অভিজাত পরিবারে ৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। হিরার অধিপতি আমর ইবনে হিন্দ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গকবিতা রচনার অভিযোগে তারাফাকে হত্যার নির্দেশ দেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তারাফার জীবনাবসান ঘটে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮২. আলকামা ইবনে আবাদাহ ইবনে নাশিরাহ ইবনে কাইস। আলকামা আল-ফাহল নামে পরিচিত। ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি।
৬৮৩. মাইমুন ইবনে কাইস ইবনে জানদাল। আ'শা শব্দের অর্থ রাতকানা। তিনি রাতে কম দেখতেন বলে এই নামকরণ হয়েছে। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি। জন্ম ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যু ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮-২০০।
৬৮৫. সুরা শুআরা: আয়াত ২२৪-২২৭।
৬৮৬. বুখারি, কিতাব: আল-আদব, বাব: মা ইয়াজুযু মিনাশ-শি'রি ওয়ার-রাজযি ওয়া মা ইয়ুকরাহু মিনহু, হাদিস নং ৫৭৯৩; আবু দাউদ, হাদিস নং ৫০১০; তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৪৪; ইবনে মাজাহ, ৩৭৫৫।
৬৮৭. মুসতাদরাকে হাকেম, কিতাবুত তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতি নুন, হাদিস নং ৩৮৪৫।
৬৮৮. আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর খিলাফতকালে (৬৪-৭৩ হি.) যারা আমির ও গভর্নর ছিলেন।
৬৮৯. জামিল ইবনে মা'মার, বা জামিল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'মার আল-উযরি আল- কুযায়ি।-অনুবাদক
৬৯০. লাইলা বিনতে আবদুল্লাহ আর-রিহাল ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কা'ব আল-আখিলিয়্যাহ।
৬৯১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৬৯২. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৪।
৬৯৩. জাযাল )زجل( : কথ্য উপভাষায় রচিত মৌখিক স্ট্রফিক কাব্যের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ। জাযালের সঠিক উৎস সম্পর্কে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে জাযালের প্রথম কবি হিসেবে আন্দালুসের আবু বকর ইবনে কুযমান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তার জীবৎকাল ১০৭৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৯৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৮৩।
৬৯৫. আরবি গদ্য-সাহিত্যের একটি আঙ্গিক।
৬৯৬. আল-মাইদানি : আবুল ফজল আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে ইবরাহিম (মৃ. ৫১৮ হি./১১২৪ খ্রি.)। সাহিত্যিক, গবেষক। নিসাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। খাইরুদ্দিন আয-যিরিকলি তার 'মাজমাউল আমসাল' গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এ ধরনের গ্রন্থ ইতিপূর্বে লেখা হয়নি। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১৪৮; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২১৪।
৬৯৭. আয-যামাখশারি: জারুল্লাহ আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-খাওয়ারিজমি (৪৬৭-৫৩৮ হি./১০৭৫-১১৪৪ খ্রি.)। ধর্মীয় জ্ঞান, তাফসির, ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। তার রচিত গ্রন্থ অনেক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুরআনুল কারিমের তাফসির 'আল-কাশশাফ'। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৮-১৭১।
৬৯৮. কবি আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ও তার প্রেমাস্পদ আবলার কাহিনি।-অনুবাদক।
৬৯৯. ইয়ামেনের প্রাচীন হিময়ারি বাদশাহ সাইফ ইবনে যি-ইয়াযান বা মাদিকারিব ইবনে আবু মুররাহ (৫১৬-৫৭৬ খ্রি.)-এর কাহিনি। তিনি ইয়ামেন থেকে হাবশিদের বিতাড়িত করেছিলেন।- অনুবাদক।
৭০০. আবু মুহাম্মাদ আল-কাসিম ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান আল-হারিরি আল-বসরি আল-হারামি।-অনুবাদক
৭০১. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২০৬-২১০; রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৫-১৭৭।
৭০২. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি : আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি (২১৩-২৭৬ হি./৮২৮-৮৮৯ খ্রি.)। মুফাসসির, ফকিহ, সাহিত্যবিশারদ, ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ২৯৬।
৭০৩. আল-মুবাররাদ: মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে আবদুল আকবার ইবনে উমাইর ইবনে হাসসান (২১০-২৮৬ হি./৮২৬-৮৯৯ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণের ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিল- লুগাহ ওয়াল-আদাব', 'আল-ফাদিল', 'আল-মুকতাদাব', 'শারহু লামিয়াতিল আরাব'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ৫৭৬।
৭০৪. আল-জাহিয: আবু উসমান আমর ইবনে বাহর আল-কিনানি (১৬৩-২৫৫ হি./৭৮০-৮৬৯ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের বড় ইমাম এবং মুতাযিলা সম্প্রদায়ের জাহিযিয়্যাহ গোত্রের প্রধান। বসরায় জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: 'আল- বায়ান ওয়াত-তাবয়িন', 'কিতাবুল হায়াওয়ান', 'আল-বুখালা', 'আল-মাহাসিন ওয়াল-আযদাদ'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১২১-১২২।
৭০৫. আবু আলি আল-কালি: ইসমাইল ইবনুল কাসিম ইবনে ইযুন (২৮৮-৩৫৬ হি./৯০১-৯২৭ খ্রি.)। ভাষা, কবিতা ও সাহিত্যের বিষয়াবলি তিনি সবচেয়ে বেশি মুখস্থ রেখেছিলেন। ফুরাত নদীর পূর্ব তীরে মানযিকাবৃন্দ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্ডোভায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'কিতাবুল আমালি', 'আল-বারিউ ফিল-লুগাহ', 'আল-আমসাল' ইত্যাদি। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১৪২।
৭০৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।