📄 গ্রিক সভ্যতা
গ্রিক সভ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা বিবেচনা করা হয়। দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পে গ্রিস উৎকর্ষ সাধন করেছিল। সেখানে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সাহিত্যিক, যারা ছিলেন বিশ্বচিন্তার স্তম্ভ। যেমন সক্রেটিস(৩২), প্লেটো(৩৩), অ্যারিস্টটল (৩৪)।
তারা ছাড়াও অনেক মনীষী ছিলেন। তারা কতিপয় সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব পালন এবং তাদের সমাজজীবনে কিছু মূল্যবোধের বীজ রোপণ করেছিলেন। এগুলো ছিল তাদের যৌক্তিক চিন্তারাশি, বাহ্যিক কার্যকারণ ও তাদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনার ফল।
গ্রিক সভ্যতা দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে যে উৎকর্ষ সাধন করেছিল এবং বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানের যে পরিপক্বতা অর্জন করেছিল, তাদের পূর্বে আর কোনো জাতি এ অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। কিন্তু এই সভ্যতা ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে এগিয়েছে। গ্রিক মনীষীরা যে ঐতিহ্য রেখে গিয়েছিলেন তা পরখ করে দেখলে আমাদের সামনে গ্রিক সভ্যতার পতনের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নোবল সিটি বা অভিজাত নগরী-সম্পর্কিত প্লেটোর ধারণা আমরা আলোচনা করতে পারি। তিনি মনে করতেন যে, অভিজাত নগরী তিন শ্রেণির মানুষ দ্বারা গড়ে উঠবে। প্রথম শ্রেণিতে থাকবে দার্শনিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকবে সেনাসদস্যরা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে থাকবে শ্রমিক ও কৃষকেরা। অভিজাত নগরীতে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন কেবল দার্শনিকেরা, তাতে সেনাশ্রেণি বা শ্রমিকশ্রেণির কোনো অধিকার থাকবে না। প্লেটো সেনাশ্রেণির জন্য চরম শৃঙ্খলা বিধিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি সৈনিকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত করেছিলেন। সৈনিকদের মালিকানার অধিকার ছিল না, পরিবার গঠন করার অধিকারও ছিল না। তাদের স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত নারীরা হতো যৌথ বা এজমালি সম্পত্তি। এ সকল নারীর সন্তানদের পিতৃপরিচয় ছিল না, তারা হতো রাষ্ট্রের সন্তান। অভিজাত নগরীতে তৃতীয় শ্রেণি অর্থাৎ মজদুর ও কৃষকদের দায়িত্ব ছিল শাসকশ্রেণি ও সেনাশ্রেণির সেবা ও খেদমত নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ব্যয় করা। এই শ্রেণির কোনো মানবিক অধিকারই ছিল না। প্লেটোর নগরীতে অসুস্থের কোনো ঠাঁই ছিল না। রাষ্ট্র তাদেরকে দূরে ছুড়ে দিত। এই হলো প্লেটোর অভিজাত নগরীর চিত্র। (৩৫)
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ দাস হয়ে ওঠে এবং দাসত্ব দাস-মানবদের জন্য একটি বৈধ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা, এ ব্যাপারে মহাদার্শনিক অ্যারিস্টটল আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন এবং ইতিবাচক মত ব্যক্ত করেছেন। তার এই মত ছিল অপরিহার্য, ফলে সমাজে দুই শ্রেণির মানবের উদ্ভব ঘটেছিল-শাসক ও শাসিত। উঁচু শ্রেণির সদস্যদের দ্বারা নিচু শ্রেণির সদস্যদের শাসিত হওয়া ছিল অবধারিত। অ্যারিস্টটলের মতে, প্রকৃতি দাস-মানবদের দিয়েছে শক্তিশালী দেহ, পক্ষান্তরে স্বাধীন মানবদের দিয়েছে অসাধারণ বুদ্ধি ও পরিপক্ব চিন্তা। ফলে স্বাধীন মানব ক্ষমতাচর্চার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠেছে, এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে, চিন্তা দেহকে পরিচালিত করে। অ্যারিস্টটলের অবস্থান ছিল প্রাকৃতিক অধিকারে সমতানীতির বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতি এক শ্রেণির মানবকে বুদ্ধি ও চিন্তা দ্বারা (অন্যদের থেকে) বিশিষ্ট করেছে। আর অন্যদেরকে দেহের অঙ্গগুলো ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে। এইভাবে প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের দেহকে দাস সদস্যদের দেহ থেকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছে। দাস শ্রেণির সদস্যরা শ্রমসাধ্য কঠিন কর্মগুলো সম্পন্ন করার জন্য আবশ্যক শক্তি পেয়েছে, পক্ষান্তরে স্বাধীন সদস্যদের শরীর প্রকৃতিগতভাবেই ওইসব কঠিন কাজের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ তাদের সুঠাম শিরদাঁড়া ওইসব শ্রমসাধ্য কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে অনুপযুক্ত। বস্তুত প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের প্রস্তুত করেছে কেবল নাগরিক বা শহুরে জীবনের দায়িত্ব পালনের জন্য। (৩৬)
গ্রিক চিন্তাধারা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সবাই এই চিন্তাধারার মূল্যায়ন করেছে এবং একে একপ্রকার প্রজ্ঞা বলে আখ্যায়িত করেছে। উইল ডুরান্ট এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে গ্রিকরা দৃষ্টান্ত হতে পারে না। তিনি এর কারণ দেখিয়েছেন এই যে, তাদের চিন্তা ও বুদ্ধির বিকাশ তাদের অধিকাংশকে চরিত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ ছিল, চরিত্র বলতে কোনো বিষয় তাদের মধ্যে ছিল না। নিজেদের সন্তান ছাড়া আর কাউকে তারা প্রাধান্য দিত না। হৃদয়ের আবেগ ও যাতনা তারা কমই বুঝতে পারত। তারা নিজেদের যতটা ভালোবেসেছে, প্রতিবেশীদের ততটা ভালোবাসার কথা চিন্তাই করতে পারত না। (৩৭)
গ্রিক সভ্যতার ক্রমান্বয় অধঃপতনের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যোগ করে নিন, তারা কামচরিতার্থে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল এবং কেবল ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটছিল। এটাই তাদের সভ্যতার অধঃপতন ত্বরান্বিত করেছিল। কারণ, জৈবিক সম্পর্কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল এবং তা সৎ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমনকি দার্শনিকরা খাদ্যের উৎসগুলোতে অধিবাসীদের চাপ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে শিশুহত্যা বৈধ করেছিল। এর ফলে নগর ও দেশ বিরান হয়ে পড়েছিল।
সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, নৈতিকতার শৃঙ্খল ছিন্নকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মম্ভরিতার আস্ফালন গ্রিক সভ্যতার পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। মেনানদার (৩৮) তার নাটকগুলোতে এথেন্সের জীবনকে চিত্রায়িত করেছেন, এথেন্সের জীবন ছিল চরিত্রহীনতা, ভ্রষ্টতা ও জৈবিক যথেচ্ছাচারে ভরপুর। তাই পতন ছিল স্বাভাবিক পরিণাম। (৩৯)
টিকাঃ
৩২. ভাববাদী দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates 469-399 BC) গ্রিসের অন্যতম প্রধান অ্যাপোলিক গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সাফ্রোনিস্কস ছিলেন একজন ভাস্কর এবং মা ফেনারিটি ছিলেন ধাত্রী। সক্রেটিসের চেহারা ছিল কিম্ভূত; বেঁটে ও মোটা ছিলেন, নাক ছিল ছড়ানো ও চ্যাপটা, চোখ দুটি ছিল কোটরের বাইরে। তার স্ত্রী জানথিপি ছিলেন খুব বদমেজাজি। সক্রেটিস জীবন রক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ চাইতেন না। তার ছিল বিস্ময়কর রকম কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। খুব সাদামাটা পোশাক পরতেন। এমনকি জুতো পর্যন্ত পায়ে দিতেন না। বলতেন, পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান। দেশের তরুণদের বিপথগামী করা হচ্ছে এই অজুহাতে শাসকেরা সক্রেটিসকে বন্দি করে এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়। শিষ্যেরা প্রহরীদের ঘুষ দিয়ে সহজেই তার পালানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু তিনি পালাননি, ক্ষমাও চাননি। দণ্ডাদেশ অনুযায়ী হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বলেছেন, সবাই মনে করে যে তারা সবকিছু জানে এবং কোনো সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তার সমাধানও করে ফেলে। কিন্তু আসলে তাদের দেওয়া সমাধানে অনেক ভুল, অনেক অপূর্ণতা থেকে যায়। তাদের সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, তারা জানে না যে তারা জানে না আর আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।-অনুবাদক
৩৩. ৪২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম এরিস্টকল্স। প্লেটো শব্দের অর্থ হচ্ছে বিশাল কাঁধ। বিশাল কাঁধের অধিকারী ছিলেন বলে তাকে প্লেটো বলে ডাকা হতো। তার গুরু হলেন সক্রেটিস এবং তার শিষ্য হলেন অ্যারিস্টটল। প্লেটোর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: রিপাবলিক, অ্যাপোলজি, ক্রিটো, ফিদো, পার্মিনাইদিস, থিটিটাস ও সিম্পোজিয়াম। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সক্রেটিসকে দর্শনশাস্ত্রের জনক এবং প্লেটোকে তার পূর্ণতাদানকারী বলা হয়।-অনুবাদক
৩৪. অ্যারিস্টটল (Aristotle BC-322 BC) সর্বকালের অন্যতম প্রধান দার্শনিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। জন্ম মেসিডোনিয়ার স্টাগিরা নামক স্থানে। পিতা চিকিৎসক। ১৭ বছর বয়সে প্লেটোর একাডেমিতে যোগ দেন। বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসেবে মেসিডোনিয়ায় যান। মতবিরোধ দেখা দিলে আবার এথেন্সে ফিরে আসেন। জীবন ও জগতের এমন কোনো দিক ছিল না যেদিকে তিনি গবেষকের দৃষ্টিতে তাকাননি। এজন্য তাকে জ্ঞানের সমুদ্র বলা হতো। বিজ্ঞান ও দর্শনে তার চিন্তা দেড় হাজারেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের জ্ঞানপিপাসুদের প্রভাবিত করেছে। তিনি মনে করতেন, মাটি, বায়ু, আগুন ও পানি-এই চারটি মূল পদার্থে এই পৃথিবী বিভক্ত। অ্যারিস্টটলের সব চিন্তা সঠিক ছিল না। তবু তিনি শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এ কারণে যে পৃথিবীর প্রধান প্রধান মৌলিক বিষয়ে তিনিই প্রথমে চিন্তার সূত্রপাত করেন।-অনুবাদক
৩৫. আহমাদ শালবি, মাউসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, ১ম খ., পৃ. ৫৪।
৩৬. গানিম মুহাম্মাদ সালেহ, আল-ফিকরুস সিয়াসিয়াল কাদিমু ওয়াল-ওয়াসিত, পৃ. ১০৯-১১০।
৩৭. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৭, পৃ. ৯৩ ও তার পরবর্তী (কিছুটা পরিমার্জিত)।
৩৮. মেনানদার (Menander 342/41-290 BC): গ্রিক নাট্যকার, তিনি ১০৮টি কমেডি নাটক রচনা করেন।
৩৯. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৮৬।
গ্রিক সভ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা বিবেচনা করা হয়। দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পে গ্রিস উৎকর্ষ সাধন করেছিল। সেখানে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সাহিত্যিক, যারা ছিলেন বিশ্বচিন্তার স্তম্ভ। যেমন সক্রেটিস(৩২), প্লেটো(৩৩), অ্যারিস্টটল (৩৪)।
তারা ছাড়াও অনেক মনীষী ছিলেন। তারা কতিপয় সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব পালন এবং তাদের সমাজজীবনে কিছু মূল্যবোধের বীজ রোপণ করেছিলেন। এগুলো ছিল তাদের যৌক্তিক চিন্তারাশি, বাহ্যিক কার্যকারণ ও তাদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনার ফল।
গ্রিক সভ্যতা দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে যে উৎকর্ষ সাধন করেছিল এবং বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানের যে পরিপক্বতা অর্জন করেছিল, তাদের পূর্বে আর কোনো জাতি এ অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। কিন্তু এই সভ্যতা ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে এগিয়েছে। গ্রিক মনীষীরা যে ঐতিহ্য রেখে গিয়েছিলেন তা পরখ করে দেখলে আমাদের সামনে গ্রিক সভ্যতার পতনের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নোবল সিটি বা অভিজাত নগরী-সম্পর্কিত প্লেটোর ধারণা আমরা আলোচনা করতে পারি। তিনি মনে করতেন যে, অভিজাত নগরী তিন শ্রেণির মানুষ দ্বারা গড়ে উঠবে। প্রথম শ্রেণিতে থাকবে দার্শনিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকবে সেনাসদস্যরা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে থাকবে শ্রমিক ও কৃষকেরা। অভিজাত নগরীতে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন কেবল দার্শনিকেরা, তাতে সেনাশ্রেণি বা শ্রমিকশ্রেণির কোনো অধিকার থাকবে না। প্লেটো সেনাশ্রেণির জন্য চরম শৃঙ্খলা বিধিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি সৈনিকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত করেছিলেন। সৈনিকদের মালিকানার অধিকার ছিল না, পরিবার গঠন করার অধিকারও ছিল না। তাদের স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত নারীরা হতো যৌথ বা এজমালি সম্পত্তি। এ সকল নারীর সন্তানদের পিতৃপরিচয় ছিল না, তারা হতো রাষ্ট্রের সন্তান। অভিজাত নগরীতে তৃতীয় শ্রেণি অর্থাৎ মজদুর ও কৃষকদের দায়িত্ব ছিল শাসকশ্রেণি ও সেনাশ্রেণির সেবা ও খেদমত নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ব্যয় করা। এই শ্রেণির কোনো মানবিক অধিকারই ছিল না। প্লেটোর নগরীতে অসুস্থের কোনো ঠাঁই ছিল না। রাষ্ট্র তাদেরকে দূরে ছুড়ে দিত। এই হলো প্লেটোর অভিজাত নগরীর চিত্র। (৩৫)
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ দাস হয়ে ওঠে এবং দাসত্ব দাস-মানবদের জন্য একটি বৈধ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা, এ ব্যাপারে মহাদার্শনিক অ্যারিস্টটল আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন এবং ইতিবাচক মত ব্যক্ত করেছেন। তার এই মত ছিল অপরিহার্য, ফলে সমাজে দুই শ্রেণির মানবের উদ্ভব ঘটেছিল-শাসক ও শাসিত। উঁচু শ্রেণির সদস্যদের দ্বারা নিচু শ্রেণির সদস্যদের শাসিত হওয়া ছিল অবধারিত। অ্যারিস্টটলের মতে, প্রকৃতি দাস-মানবদের দিয়েছে শক্তিশালী দেহ, পক্ষান্তরে স্বাধীন মানবদের দিয়েছে অসাধারণ বুদ্ধি ও পরিপক্ব চিন্তা। ফলে স্বাধীন মানব ক্ষমতাচর্চার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠেছে, এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে, চিন্তা দেহকে পরিচালিত করে। অ্যারিস্টটলের অবস্থান ছিল প্রাকৃতিক অধিকারে সমতানীতির বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতি এক শ্রেণির মানবকে বুদ্ধি ও চিন্তা দ্বারা (অন্যদের থেকে) বিশিষ্ট করেছে। আর অন্যদেরকে দেহের অঙ্গগুলো ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে। এইভাবে প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের দেহকে দাস সদস্যদের দেহ থেকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছে। দাস শ্রেণির সদস্যরা শ্রমসাধ্য কঠিন কর্মগুলো সম্পন্ন করার জন্য আবশ্যক শক্তি পেয়েছে, পক্ষান্তরে স্বাধীন সদস্যদের শরীর প্রকৃতিগতভাবেই ওইসব কঠিন কাজের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ তাদের সুঠাম শিরদাঁড়া ওইসব শ্রমসাধ্য কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে অনুপযুক্ত। বস্তুত প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের প্রস্তুত করেছে কেবল নাগরিক বা শহুরে জীবনের দায়িত্ব পালনের জন্য। (৩৬)
গ্রিক চিন্তাধারা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সবাই এই চিন্তাধারার মূল্যায়ন করেছে এবং একে একপ্রকার প্রজ্ঞা বলে আখ্যায়িত করেছে। উইল ডুরান্ট এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে গ্রিকরা দৃষ্টান্ত হতে পারে না। তিনি এর কারণ দেখিয়েছেন এই যে, তাদের চিন্তা ও বুদ্ধির বিকাশ তাদের অধিকাংশকে চরিত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ ছিল, চরিত্র বলতে কোনো বিষয় তাদের মধ্যে ছিল না। নিজেদের সন্তান ছাড়া আর কাউকে তারা প্রাধান্য দিত না। হৃদয়ের আবেগ ও যাতনা তারা কমই বুঝতে পারত। তারা নিজেদের যতটা ভালোবেসেছে, প্রতিবেশীদের ততটা ভালোবাসার কথা চিন্তাই করতে পারত না। (৩৭)
গ্রিক সভ্যতার ক্রমান্বয় অধঃপতনের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যোগ করে নিন, তারা কামচরিতার্থে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল এবং কেবল ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটছিল। এটাই তাদের সভ্যতার অধঃপতন ত্বরান্বিত করেছিল। কারণ, জৈবিক সম্পর্কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল এবং তা সৎ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমনকি দার্শনিকরা খাদ্যের উৎসগুলোতে অধিবাসীদের চাপ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে শিশুহত্যা বৈধ করেছিল। এর ফলে নগর ও দেশ বিরান হয়ে পড়েছিল।
সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, নৈতিকতার শৃঙ্খল ছিন্নকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মম্ভরিতার আস্ফালন গ্রিক সভ্যতার পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। মেনানদার (৩৮) তার নাটকগুলোতে এথেন্সের জীবনকে চিত্রায়িত করেছেন, এথেন্সের জীবন ছিল চরিত্রহীনতা, ভ্রষ্টতা ও জৈবিক যথেচ্ছাচারে ভরপুর। তাই পতন ছিল স্বাভাবিক পরিণাম। (৩৯)
টিকাঃ
৩২. ভাববাদী দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates 469-399 BC) গ্রিসের অন্যতম প্রধান অ্যাপোলিক গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সাফ্রোনিস্কস ছিলেন একজন ভাস্কর এবং মা ফেনারিটি ছিলেন ধাত্রী। সক্রেটিসের চেহারা ছিল কিম্ভূত; বেঁটে ও মোটা ছিলেন, নাক ছিল ছড়ানো ও চ্যাপটা, চোখ দুটি ছিল কোটরের বাইরে। তার স্ত্রী জানথিপি ছিলেন খুব বদমেজাজি। সক্রেটিস জীবন রক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ চাইতেন না। তার ছিল বিস্ময়কর রকম কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। খুব সাদামাটা পোশাক পরতেন। এমনকি জুতো পর্যন্ত পায়ে দিতেন না। বলতেন, পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান। দেশের তরুণদের বিপথগামী করা হচ্ছে এই অজুহাতে শাসকেরা সক্রেটিসকে বন্দি করে এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়। শিষ্যেরা প্রহরীদের ঘুষ দিয়ে সহজেই তার পালানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু তিনি পালাননি, ক্ষমাও চাননি। দণ্ডাদেশ অনুযায়ী হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বলেছেন, সবাই মনে করে যে তারা সবকিছু জানে এবং কোনো সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তার সমাধানও করে ফেলে। কিন্তু আসলে তাদের দেওয়া সমাধানে অনেক ভুল, অনেক অপূর্ণতা থেকে যায়। তাদের সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, তারা জানে না যে তারা জানে না আর আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।-অনুবাদক
৩৩. ৪২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম এরিস্টকল্স। প্লেটো শব্দের অর্থ হচ্ছে বিশাল কাঁধ। বিশাল কাঁধের অধিকারী ছিলেন বলে তাকে প্লেটো বলে ডাকা হতো। তার গুরু হলেন সক্রেটিস এবং তার শিষ্য হলেন অ্যারিস্টটল। প্লেটোর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: রিপাবলিক, অ্যাপোলজি, ক্রিটো, ফিদো, পার্মিনাইদিস, থিটিটাস ও সিম্পোজিয়াম। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সক্রেটিসকে দর্শনশাস্ত্রের জনক এবং প্লেটোকে তার পূর্ণতাদানকারী বলা হয়।-অনুবাদক
৩৪. অ্যারিস্টটল (Aristotle BC-322 BC) সর্বকালের অন্যতম প্রধান দার্শনিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। জন্ম মেসিডোনিয়ার স্টাগিরা নামক স্থানে। পিতা চিকিৎসক। ১৭ বছর বয়সে প্লেটোর একাডেমিতে যোগ দেন। বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসেবে মেসিডোনিয়ায় যান। মতবিরোধ দেখা দিলে আবার এথেন্সে ফিরে আসেন। জীবন ও জগতের এমন কোনো দিক ছিল না যেদিকে তিনি গবেষকের দৃষ্টিতে তাকাননি। এজন্য তাকে জ্ঞানের সমুদ্র বলা হতো। বিজ্ঞান ও দর্শনে তার চিন্তা দেড় হাজারেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের জ্ঞানপিপাসুদের প্রভাবিত করেছে। তিনি মনে করতেন, মাটি, বায়ু, আগুন ও পানি-এই চারটি মূল পদার্থে এই পৃথিবী বিভক্ত। অ্যারিস্টটলের সব চিন্তা সঠিক ছিল না। তবু তিনি শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এ কারণে যে পৃথিবীর প্রধান প্রধান মৌলিক বিষয়ে তিনিই প্রথমে চিন্তার সূত্রপাত করেন।-অনুবাদক
৩৫. আহমাদ শালবি, মাউসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, ১ম খ., পৃ. ৫৪।
৩৬. গানিম মুহাম্মাদ সালেহ, আল-ফিকরুস সিয়াসিয়াল কাদিমু ওয়াল-ওয়াসিত, পৃ. ১০৯-১১০।
৩৭. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৭, পৃ. ৯৩ ও তার পরবর্তী (কিছুটা পরিমার্জিত)।
৩৮. মেনানদার (Menander 342/41-290 BC): গ্রিক নাট্যকার, তিনি ১০৮টি কমেডি নাটক রচনা করেন।
৩৯. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৮৬।
গ্রিক সভ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা বিবেচনা করা হয়। দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পে গ্রিস উৎকর্ষ সাধন করেছিল। সেখানে জন্ম নিয়েছিলেন অনেক বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সাহিত্যিক, যারা ছিলেন বিশ্বচিন্তার স্তম্ভ। যেমন সক্রেটিস(৩২), প্লেটো(৩৩), অ্যারিস্টটল (৩৪)।
তারা ছাড়াও অনেক মনীষী ছিলেন। তারা কতিপয় সত্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব পালন এবং তাদের সমাজজীবনে কিছু মূল্যবোধের বীজ রোপণ করেছিলেন। এগুলো ছিল তাদের যৌক্তিক চিন্তারাশি, বাহ্যিক কার্যকারণ ও তাদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনার ফল।
গ্রিক সভ্যতা দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে যে উৎকর্ষ সাধন করেছিল এবং বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানের যে পরিপক্বতা অর্জন করেছিল, তাদের পূর্বে আর কোনো জাতি এ অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। কিন্তু এই সভ্যতা ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে এগিয়েছে। গ্রিক মনীষীরা যে ঐতিহ্য রেখে গিয়েছিলেন তা পরখ করে দেখলে আমাদের সামনে গ্রিক সভ্যতার পতনের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নোবল সিটি বা অভিজাত নগরী-সম্পর্কিত প্লেটোর ধারণা আমরা আলোচনা করতে পারি। তিনি মনে করতেন যে, অভিজাত নগরী তিন শ্রেণির মানুষ দ্বারা গড়ে উঠবে। প্রথম শ্রেণিতে থাকবে দার্শনিক ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকবে সেনাসদস্যরা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে থাকবে শ্রমিক ও কৃষকেরা। অভিজাত নগরীতে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন কেবল দার্শনিকেরা, তাতে সেনাশ্রেণি বা শ্রমিকশ্রেণির কোনো অধিকার থাকবে না। প্লেটো সেনাশ্রেণির জন্য চরম শৃঙ্খলা বিধিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি সৈনিকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত করেছিলেন। সৈনিকদের মালিকানার অধিকার ছিল না, পরিবার গঠন করার অধিকারও ছিল না। তাদের স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত নারীরা হতো যৌথ বা এজমালি সম্পত্তি। এ সকল নারীর সন্তানদের পিতৃপরিচয় ছিল না, তারা হতো রাষ্ট্রের সন্তান। অভিজাত নগরীতে তৃতীয় শ্রেণি অর্থাৎ মজদুর ও কৃষকদের দায়িত্ব ছিল শাসকশ্রেণি ও সেনাশ্রেণির সেবা ও খেদমত নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ব্যয় করা। এই শ্রেণির কোনো মানবিক অধিকারই ছিল না। প্লেটোর নগরীতে অসুস্থের কোনো ঠাঁই ছিল না। রাষ্ট্র তাদেরকে দূরে ছুড়ে দিত। এই হলো প্লেটোর অভিজাত নগরীর চিত্র। (৩৫)
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ দাস হয়ে ওঠে এবং দাসত্ব দাস-মানবদের জন্য একটি বৈধ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা, এ ব্যাপারে মহাদার্শনিক অ্যারিস্টটল আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন এবং ইতিবাচক মত ব্যক্ত করেছেন। তার এই মত ছিল অপরিহার্য, ফলে সমাজে দুই শ্রেণির মানবের উদ্ভব ঘটেছিল-শাসক ও শাসিত। উঁচু শ্রেণির সদস্যদের দ্বারা নিচু শ্রেণির সদস্যদের শাসিত হওয়া ছিল অবধারিত। অ্যারিস্টটলের মতে, প্রকৃতি দাস-মানবদের দিয়েছে শক্তিশালী দেহ, পক্ষান্তরে স্বাধীন মানবদের দিয়েছে অসাধারণ বুদ্ধি ও পরিপক্ব চিন্তা। ফলে স্বাধীন মানব ক্ষমতাচর্চার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠেছে, এই মূলনীতির ভিত্তিতে যে, চিন্তা দেহকে পরিচালিত করে। অ্যারিস্টটলের অবস্থান ছিল প্রাকৃতিক অধিকারে সমতানীতির বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতি এক শ্রেণির মানবকে বুদ্ধি ও চিন্তা দ্বারা (অন্যদের থেকে) বিশিষ্ট করেছে। আর অন্যদেরকে দেহের অঙ্গগুলো ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে। এইভাবে প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের দেহকে দাস সদস্যদের দেহ থেকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছে। দাস শ্রেণির সদস্যরা শ্রমসাধ্য কঠিন কর্মগুলো সম্পন্ন করার জন্য আবশ্যক শক্তি পেয়েছে, পক্ষান্তরে স্বাধীন সদস্যদের শরীর প্রকৃতিগতভাবেই ওইসব কঠিন কাজের জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ তাদের সুঠাম শিরদাঁড়া ওইসব শ্রমসাধ্য কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে অনুপযুক্ত। বস্তুত প্রকৃতি মানবমণ্ডলীর স্বাধীন সদস্যদের প্রস্তুত করেছে কেবল নাগরিক বা শহুরে জীবনের দায়িত্ব পালনের জন্য। (৩৬)
গ্রিক চিন্তাধারা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সবাই এই চিন্তাধারার মূল্যায়ন করেছে এবং একে একপ্রকার প্রজ্ঞা বলে আখ্যায়িত করেছে। উইল ডুরান্ট এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, উত্তম চরিত্রের ক্ষেত্রে গ্রিকরা দৃষ্টান্ত হতে পারে না। তিনি এর কারণ দেখিয়েছেন এই যে, তাদের চিন্তা ও বুদ্ধির বিকাশ তাদের অধিকাংশকে চরিত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ ছিল, চরিত্র বলতে কোনো বিষয় তাদের মধ্যে ছিল না। নিজেদের সন্তান ছাড়া আর কাউকে তারা প্রাধান্য দিত না। হৃদয়ের আবেগ ও যাতনা তারা কমই বুঝতে পারত। তারা নিজেদের যতটা ভালোবেসেছে, প্রতিবেশীদের ততটা ভালোবাসার কথা চিন্তাই করতে পারত না। (৩৭)
গ্রিক সভ্যতার ক্রমান্বয় অধঃপতনের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যোগ করে নিন, তারা কামচরিতার্থে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল এবং কেবল ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটছিল। এটাই তাদের সভ্যতার অধঃপতন ত্বরান্বিত করেছিল। কারণ, জৈবিক সম্পর্কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল এবং তা সৎ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমনকি দার্শনিকরা খাদ্যের উৎসগুলোতে অধিবাসীদের চাপ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে শিশুহত্যা বৈধ করেছিল। এর ফলে নগর ও দেশ বিরান হয়ে পড়েছিল।
সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, নৈতিকতার শৃঙ্খল ছিন্নকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মম্ভরিতার আস্ফালন গ্রিক সভ্যতার পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। মেনানদার (৩৮) তার নাটকগুলোতে এথেন্সের জীবনকে চিত্রায়িত করেছেন, এথেন্সের জীবন ছিল চরিত্রহীনতা, ভ্রষ্টতা ও জৈবিক যথেচ্ছাচারে ভরপুর। তাই পতন ছিল স্বাভাবিক পরিণাম। (৩৯)
টিকাঃ
৩২. ভাববাদী দার্শনিক সক্রেটিস (Socrates 469-399 BC) গ্রিসের অন্যতম প্রধান অ্যাপোলিক গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সাফ্রোনিস্কস ছিলেন একজন ভাস্কর এবং মা ফেনারিটি ছিলেন ধাত্রী। সক্রেটিসের চেহারা ছিল কিম্ভূত; বেঁটে ও মোটা ছিলেন, নাক ছিল ছড়ানো ও চ্যাপটা, চোখ দুটি ছিল কোটরের বাইরে। তার স্ত্রী জানথিপি ছিলেন খুব বদমেজাজি। সক্রেটিস জীবন রক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ চাইতেন না। তার ছিল বিস্ময়কর রকম কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। খুব সাদামাটা পোশাক পরতেন। এমনকি জুতো পর্যন্ত পায়ে দিতেন না। বলতেন, পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান। দেশের তরুণদের বিপথগামী করা হচ্ছে এই অজুহাতে শাসকেরা সক্রেটিসকে বন্দি করে এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়। শিষ্যেরা প্রহরীদের ঘুষ দিয়ে সহজেই তার পালানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু তিনি পালাননি, ক্ষমাও চাননি। দণ্ডাদেশ অনুযায়ী হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বলেছেন, সবাই মনে করে যে তারা সবকিছু জানে এবং কোনো সমস্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তার সমাধানও করে ফেলে। কিন্তু আসলে তাদের দেওয়া সমাধানে অনেক ভুল, অনেক অপূর্ণতা থেকে যায়। তাদের সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, তারা জানে না যে তারা জানে না আর আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।-অনুবাদক
৩৩. ৪২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম এরিস্টকল্স। প্লেটো শব্দের অর্থ হচ্ছে বিশাল কাঁধ। বিশাল কাঁধের অধিকারী ছিলেন বলে তাকে প্লেটো বলে ডাকা হতো। তার গুরু হলেন সক্রেটিস এবং তার শিষ্য হলেন অ্যারিস্টটল। প্লেটোর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: রিপাবলিক, অ্যাপোলজি, ক্রিটো, ফিদো, পার্মিনাইদিস, থিটিটাস ও সিম্পোজিয়াম। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সক্রেটিসকে দর্শনশাস্ত্রের জনক এবং প্লেটোকে তার পূর্ণতাদানকারী বলা হয়।-অনুবাদক
৩৪. অ্যারিস্টটল (Aristotle BC-322 BC) সর্বকালের অন্যতম প্রধান দার্শনিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। জন্ম মেসিডোনিয়ার স্টাগিরা নামক স্থানে। পিতা চিকিৎসক। ১৭ বছর বয়সে প্লেটোর একাডেমিতে যোগ দেন। বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসেবে মেসিডোনিয়ায় যান। মতবিরোধ দেখা দিলে আবার এথেন্সে ফিরে আসেন। জীবন ও জগতের এমন কোনো দিক ছিল না যেদিকে তিনি গবেষকের দৃষ্টিতে তাকাননি। এজন্য তাকে জ্ঞানের সমুদ্র বলা হতো। বিজ্ঞান ও দর্শনে তার চিন্তা দেড় হাজারেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের জ্ঞানপিপাসুদের প্রভাবিত করেছে। তিনি মনে করতেন, মাটি, বায়ু, আগুন ও পানি-এই চারটি মূল পদার্থে এই পৃথিবী বিভক্ত। অ্যারিস্টটলের সব চিন্তা সঠিক ছিল না। তবু তিনি শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এ কারণে যে পৃথিবীর প্রধান প্রধান মৌলিক বিষয়ে তিনিই প্রথমে চিন্তার সূত্রপাত করেন।-অনুবাদক
৩৫. আহমাদ শালবি, মাউসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, ১ম খ., পৃ. ৫৪।
৩৬. গানিম মুহাম্মাদ সালেহ, আল-ফিকরুস সিয়াসিয়াল কাদিমু ওয়াল-ওয়াসিত, পৃ. ১০৯-১১০।
৩৭. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৭, পৃ. ৯৩ ও তার পরবর্তী (কিছুটা পরিমার্জিত)।
৩৮. মেনানদার (Menander 342/41-290 BC): গ্রিক নাট্যকার, তিনি ১০৮টি কমেডি নাটক রচনা করেন।
৩৯. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৮৬।
📄 ভারতীয় সভ্যতা
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মানবজাতির অভিযাত্রায় ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত অবদান রয়েছে। অধিকাংশের মতে তারা গাণিতিক সংখ্যা (০-৯) আবিষ্কার করেছিল। ত্রিকোণমিতিতেও তাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। দেড়, আড়াই, সাড়ে তিন (বিজোড় সংখ্যার অর্ধেক) ইত্যাদি সংখ্যাও প্রথম তারাই ব্যবহার করেছিল। জ্যামিতির ত্রিকোণমিতির(৪০) ক্ষেত্রে সাইন (sine) -এর সারণিও তাদের আবিষ্কার। একইভাবে ভারতীয় সভ্যতা চিকিৎসাবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যায় অবদান রেখেছে।(৪১)
ভারতীয় সভ্যতা উন্নতি ও উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবনতি ও অধঃপতনের পথে দ্রুত নেমে যেতে থাকে। এর কিছু কারণ ও হেতু ছিল।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি(৪২) রহ. খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় সভ্যতা কীরূপ ছিল তা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লিখিত চিত্র অঙ্কন করেছেন। তিনি বলেছেন,
اتفقت كلمة المؤلفين في تاريخ الهند على أن أحط أدوارها ديانة وخلقا واجتماعا، ذلك العهد الذي يبتدئ من مستهل القرن السادس الميلادي.
ভারতবর্ষের ইতিহাস যারা রচনা করেছেন তারা এ বিষয়ে একমত যে, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের গোড়া থেকে যে সময়কালের সূচনা হয়েছে সেটাই ছিল ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অধঃপতিত যুগ।
আবুল হাসান আলি নদবি বিশ্বাসগত অরাজকতার চিত্র তুলে ধরার পর বলেছেন, ভারতে বর্ণবৈষম্যের নীতি পাশবিকভাবে চর্চিত হয়েছিল। পৃথিবীর কোনো মানবগোষ্ঠীর ইতিহাসে ভারতবর্ষের চেয়ে চরম বর্ণবিদ্বেষ, বর্ণে বর্ণে বিপুল পার্থক্য এবং মানবমর্যাদার ভয়ানক ভূলুণ্ঠন সম্পর্কে জানা যায়নি।
খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতাব্দী পূর্বে ভারতবর্ষে ব্রাহ্ম-সভ্যতার সূচনা ঘটে। এতে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার জন্য নতুন নির্দেশনা প্রস্তুত করা হয়। এই নির্দেশনায় নাগরিক ও রাজনৈতিক আইন লিপিবদ্ধ করা হয় এবং এ ব্যাপারে গোটা দেশ একমত হয়। ভারতীয়দের জীবনে এটিই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় আইন ও ধর্মীয় সূত্রসম্ভার। এটি বর্তমানে মনুশাস্ত্র (মনুসংহিতা) নামে পরিচিত। এই আইন দেশের অধিবাসীদের চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। সেগুলো হলো:
১. ব্রাহ্মণ: গণক ও ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণি।
২. ক্ষত্রিয়: সৈনিক বা যোদ্ধা শ্রেণি।
৩. বৈশ্য: কৃষক ও বণিক শ্রেণি।
৪. শূদ্র: সেবক ও দাস শ্রেণি।
মনুসংহিতা ব্রাহ্মণ শ্রেণির জন্য এমনসব মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে যা তাদেরকে দেবতাসনে আসীন করেছে। মনু বলেছেন, ব্রাহ্মণরা হলো ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তারাই সৃষ্টিজগতের দেবতা। পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব তাদের অধীন। তারা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রভু। তারা তাদের দাস শূদ্রশ্রেণির সম্পদ থেকে যা খুশি নিতে পারবে। কারণ, দাস কোনোকিছুর মালিক হতে পারে না, তার সমস্ত সম্পত্তিই তার প্রভুর সম্পত্তি।
মনুসংহিতার আইনের ফলে ভারতীয় সমাজে শূদ্রশ্রেণি ছিল পশুর চেয়েও পতিত, কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট। কুকুর, বিড়াল, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক ও পেঁচা হত্যার যে জরিমানা ছিল, শূদ্রশ্রেণির লোকদের হত্যার জরিমানাও ছিল একই। (৪৩)
ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থান (৪৪) ক্রীতদাসীর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। জুয়াখেলায় পুরুষেরা নিজের স্ত্রীকে বাজি রাখত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নারীর একাধিক স্বামী হতো। আবার কারও স্বামী মারা গেলে সে চিরতরে বিধবা হয়ে যেত, কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারত না। তার জীবন হয়ে উঠত লাঞ্ছনা-যন্ত্রণার লক্ষ্যস্থল। সে মৃত স্বামীর বাড়িতে দাসী হিসেবে থাকত এবং স্বামীর ভাইবোনদের সেবা করে জীবন কাটাত। কখনো পার্থিব জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে আত্মাহুতি দিত। (৪৫)
ইসলামের পূর্বে এমনই ছিল ভারতীয় সভ্যতা। এমন লজ্জাজনক অজ্ঞতা, নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে ছিল না। ইতিহাসেও এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আল-বিরুনি (৪৬) তার গ্রন্থে এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং এগুলোর সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তার গ্রন্থটি হলো, تحقيق ما للهند مِنْ مَقولة مقبولة في العقل أو مرذولة । অধিক জানতে আগ্রহী হলে এই গ্রন্থটি পড়ুন।
টিকাঃ
৪০. ত্রিকোণমিতি: সমকোণী ত্রিভুজের কর্ণ ও বিপরীত বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত, সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সূক্ষ্মকোণদ্বয়ের একটির বিপরীত দিকের বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত।- অনুবাদক
৪১. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ২৩৮।
৪২. আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুল হাই ইবনে ফখরুদ্দিন আল-হাসানি জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, সংগ্রামী সাধক, বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক। সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামি চিন্তাবিদ আবুল হাসান আলি নদবি (জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ এবং মৃত্যু ৩১ ডিসেম্বর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনাবলির প্রায় সবই আরবি ভাষায়। লখনৌ নদওয়াতুল উলামার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা, ও মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য শিক্ষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। দুইশতাধিক গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা নদবির ৩ খণ্ডে প্রকাশিত আত্মজীবনী 'কারওয়ানে যিন্দেগি' এখন গোটা মুসলিমবিশ্বে সমাদৃত। গোটা মুসলিমবিশ্বের পাশাপাশি প্রায় গোটা পৃথিবীই তিনি ভ্রমণ করেছেন। একাধারে আধ্যাত্মিক নেতা, উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক মানের সংগঠক হিসাবে তিনি তার সমকালীন বিশ্বের অভূতপূর্ব স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে দুবার তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি ছিলেন শহীদে বালাকোট হযরত সাইয়িদ আহমাদ শহিদ রহ.-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ। উত্তর ভারতে শহিদ বেরেলবির পারিবারিক গোরস্থানেই আল্লামা নদবিও শায়িত আছেন। - অনুবাদক
৪৩. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ১৬৪-১৬৮।
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭-১৮৩।
৪৫. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৮-৭৬।
৪৬. আবু রাইহান আল-বিরুনি বা আবু রাইহান মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল-বিরুনি আল-খাওয়ারিজমি (২৬২-৪৪০ হি./৯৭৩-১০৪৭ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। খাওয়ারিজমের বাইরে বসবাস করতেন বলে সাধারণভাবে তিনি আল-বিরুনি (প্রবাসী) নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। অধিকন্তু ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা ও সঠিক মতামতের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল-বিরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনিই প্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপার মতে, আল-বিরুনি শুধু মুসলিমবিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তিনি একটি অতি সাধারণ ইরানি পরিবারে ৪ সেপ্টেম্বর ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি নিজের জন্মভূমিতে অতিবাহিত করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন। আল-বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজমের আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফারসিতে অথবা আরবি ও ফারসি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল। তিনি ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইবনে মামুন কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি আলি ইবনে মামুনের পর তার ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। মামুন তার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ১০১৬-১৭ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবনে আলি ও চিকিৎসক আবুল খাইর আল-হুসাইন ইবনে বাবা আল-খাম্মার আল-বাগদাদির সঙ্গে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন থেকে তিনি গজনির শাহি দরবারে সম্ভবত রাজ-জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দুধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাতেও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি এই এক যুগের অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবু তারিখিল হিন্দ। আল-বিরুনি ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তারপরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান। আল-বিরুনির সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ১০টি গ্রন্থ অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। -অনুবাদক
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মানবজাতির অভিযাত্রায় ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত অবদান রয়েছে। অধিকাংশের মতে তারা গাণিতিক সংখ্যা (০-৯) আবিষ্কার করেছিল। ত্রিকোণমিতিতেও তাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। দেড়, আড়াই, সাড়ে তিন (বিজোড় সংখ্যার অর্ধেক) ইত্যাদি সংখ্যাও প্রথম তারাই ব্যবহার করেছিল। জ্যামিতির ত্রিকোণমিতির(৪০) ক্ষেত্রে সাইন (sine) -এর সারণিও তাদের আবিষ্কার। একইভাবে ভারতীয় সভ্যতা চিকিৎসাবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যায় অবদান রেখেছে।(৪১)
ভারতীয় সভ্যতা উন্নতি ও উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবনতি ও অধঃপতনের পথে দ্রুত নেমে যেতে থাকে। এর কিছু কারণ ও হেতু ছিল।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি(৪২) রহ. খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় সভ্যতা কীরূপ ছিল তা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লিখিত চিত্র অঙ্কন করেছেন। তিনি বলেছেন,
اتفقت كلمة المؤلفين في تاريخ الهند على أن أحط أدوارها ديانة وخلقا واجتماعا، ذلك العهد الذي يبتدئ من مستهل القرن السادس الميلادي.
ভারতবর্ষের ইতিহাস যারা রচনা করেছেন তারা এ বিষয়ে একমত যে, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের গোড়া থেকে যে সময়কালের সূচনা হয়েছে সেটাই ছিল ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অধঃপতিত যুগ।
আবুল হাসান আলি নদবি বিশ্বাসগত অরাজকতার চিত্র তুলে ধরার পর বলেছেন, ভারতে বর্ণবৈষম্যের নীতি পাশবিকভাবে চর্চিত হয়েছিল। পৃথিবীর কোনো মানবগোষ্ঠীর ইতিহাসে ভারতবর্ষের চেয়ে চরম বর্ণবিদ্বেষ, বর্ণে বর্ণে বিপুল পার্থক্য এবং মানবমর্যাদার ভয়ানক ভূলুণ্ঠন সম্পর্কে জানা যায়নি।
খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতাব্দী পূর্বে ভারতবর্ষে ব্রাহ্ম-সভ্যতার সূচনা ঘটে। এতে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার জন্য নতুন নির্দেশনা প্রস্তুত করা হয়। এই নির্দেশনায় নাগরিক ও রাজনৈতিক আইন লিপিবদ্ধ করা হয় এবং এ ব্যাপারে গোটা দেশ একমত হয়। ভারতীয়দের জীবনে এটিই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় আইন ও ধর্মীয় সূত্রসম্ভার। এটি বর্তমানে মনুশাস্ত্র (মনুসংহিতা) নামে পরিচিত। এই আইন দেশের অধিবাসীদের চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। সেগুলো হলো:
১. ব্রাহ্মণ: গণক ও ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণি।
২. ক্ষত্রিয়: সৈনিক বা যোদ্ধা শ্রেণি।
৩. বৈশ্য: কৃষক ও বণিক শ্রেণি।
৪. শূদ্র: সেবক ও দাস শ্রেণি।
মনুসংহিতা ব্রাহ্মণ শ্রেণির জন্য এমনসব মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে যা তাদেরকে দেবতাসনে আসীন করেছে। মনু বলেছেন, ব্রাহ্মণরা হলো ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তারাই সৃষ্টিজগতের দেবতা। পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব তাদের অধীন। তারা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রভু। তারা তাদের দাস শূদ্রশ্রেণির সম্পদ থেকে যা খুশি নিতে পারবে। কারণ, দাস কোনোকিছুর মালিক হতে পারে না, তার সমস্ত সম্পত্তিই তার প্রভুর সম্পত্তি।
মনুসংহিতার আইনের ফলে ভারতীয় সমাজে শূদ্রশ্রেণি ছিল পশুর চেয়েও পতিত, কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট। কুকুর, বিড়াল, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক ও পেঁচা হত্যার যে জরিমানা ছিল, শূদ্রশ্রেণির লোকদের হত্যার জরিমানাও ছিল একই। (৪৩)
ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থান (৪৪) ক্রীতদাসীর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। জুয়াখেলায় পুরুষেরা নিজের স্ত্রীকে বাজি রাখত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নারীর একাধিক স্বামী হতো। আবার কারও স্বামী মারা গেলে সে চিরতরে বিধবা হয়ে যেত, কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারত না। তার জীবন হয়ে উঠত লাঞ্ছনা-যন্ত্রণার লক্ষ্যস্থল। সে মৃত স্বামীর বাড়িতে দাসী হিসেবে থাকত এবং স্বামীর ভাইবোনদের সেবা করে জীবন কাটাত। কখনো পার্থিব জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে আত্মাহুতি দিত। (৪৫)
ইসলামের পূর্বে এমনই ছিল ভারতীয় সভ্যতা। এমন লজ্জাজনক অজ্ঞতা, নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে ছিল না। ইতিহাসেও এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আল-বিরুনি (৪৬) তার গ্রন্থে এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং এগুলোর সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তার গ্রন্থটি হলো, تحقيق ما للهند مِنْ مَقولة مقبولة في العقل أو مرذولة । অধিক জানতে আগ্রহী হলে এই গ্রন্থটি পড়ুন।
টিকাঃ
৪০. ত্রিকোণমিতি: সমকোণী ত্রিভুজের কর্ণ ও বিপরীত বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত, সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সূক্ষ্মকোণদ্বয়ের একটির বিপরীত দিকের বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত।- অনুবাদক
৪১. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ২৩৮।
৪২. আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুল হাই ইবনে ফখরুদ্দিন আল-হাসানি জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, সংগ্রামী সাধক, বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক। সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামি চিন্তাবিদ আবুল হাসান আলি নদবি (জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ এবং মৃত্যু ৩১ ডিসেম্বর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনাবলির প্রায় সবই আরবি ভাষায়। লখনৌ নদওয়াতুল উলামার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা, ও মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য শিক্ষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। দুইশতাধিক গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা নদবির ৩ খণ্ডে প্রকাশিত আত্মজীবনী 'কারওয়ানে যিন্দেগি' এখন গোটা মুসলিমবিশ্বে সমাদৃত। গোটা মুসলিমবিশ্বের পাশাপাশি প্রায় গোটা পৃথিবীই তিনি ভ্রমণ করেছেন। একাধারে আধ্যাত্মিক নেতা, উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক মানের সংগঠক হিসাবে তিনি তার সমকালীন বিশ্বের অভূতপূর্ব স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে দুবার তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি ছিলেন শহীদে বালাকোট হযরত সাইয়িদ আহমাদ শহিদ রহ.-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ। উত্তর ভারতে শহিদ বেরেলবির পারিবারিক গোরস্থানেই আল্লামা নদবিও শায়িত আছেন। - অনুবাদক
৪৩. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ১৬৪-১৬৮।
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭-১৮৩।
৪৫. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৮-৭৬।
৪৬. আবু রাইহান আল-বিরুনি বা আবু রাইহান মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল-বিরুনি আল-খাওয়ারিজমি (২৬২-৪৪০ হি./৯৭৩-১০৪৭ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। খাওয়ারিজমের বাইরে বসবাস করতেন বলে সাধারণভাবে তিনি আল-বিরুনি (প্রবাসী) নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। অধিকন্তু ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা ও সঠিক মতামতের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল-বিরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনিই প্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপার মতে, আল-বিরুনি শুধু মুসলিমবিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তিনি একটি অতি সাধারণ ইরানি পরিবারে ৪ সেপ্টেম্বর ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি নিজের জন্মভূমিতে অতিবাহিত করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন। আল-বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজমের আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফারসিতে অথবা আরবি ও ফারসি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল। তিনি ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইবনে মামুন কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি আলি ইবনে মামুনের পর তার ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। মামুন তার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ১০১৬-১৭ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবনে আলি ও চিকিৎসক আবুল খাইর আল-হুসাইন ইবনে বাবা আল-খাম্মার আল-বাগদাদির সঙ্গে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন থেকে তিনি গজনির শাহি দরবারে সম্ভবত রাজ-জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দুধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাতেও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি এই এক যুগের অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবু তারিখিল হিন্দ। আল-বিরুনি ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তারপরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান। আল-বিরুনির সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ১০টি গ্রন্থ অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। -অনুবাদক
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মানবজাতির অভিযাত্রায় ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত অবদান রয়েছে। অধিকাংশের মতে তারা গাণিতিক সংখ্যা (০-৯) আবিষ্কার করেছিল। ত্রিকোণমিতিতেও তাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। দেড়, আড়াই, সাড়ে তিন (বিজোড় সংখ্যার অর্ধেক) ইত্যাদি সংখ্যাও প্রথম তারাই ব্যবহার করেছিল। জ্যামিতির ত্রিকোণমিতির(৪০) ক্ষেত্রে সাইন (sine) -এর সারণিও তাদের আবিষ্কার। একইভাবে ভারতীয় সভ্যতা চিকিৎসাবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যায় অবদান রেখেছে।(৪১)
ভারতীয় সভ্যতা উন্নতি ও উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছা সত্ত্বেও খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবনতি ও অধঃপতনের পথে দ্রুত নেমে যেতে থাকে। এর কিছু কারণ ও হেতু ছিল।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি(৪২) রহ. খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে ভারতীয় সভ্যতা কীরূপ ছিল তা আলোচনা করতে গিয়ে উল্লিখিত চিত্র অঙ্কন করেছেন। তিনি বলেছেন,
اتفقت كلمة المؤلفين في تاريخ الهند على أن أحط أدوارها ديانة وخلقا واجتماعا، ذلك العهد الذي يبتدئ من مستهل القرن السادس الميلادي.
ভারতবর্ষের ইতিহাস যারা রচনা করেছেন তারা এ বিষয়ে একমত যে, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের গোড়া থেকে যে সময়কালের সূচনা হয়েছে সেটাই ছিল ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অধঃপতিত যুগ।
আবুল হাসান আলি নদবি বিশ্বাসগত অরাজকতার চিত্র তুলে ধরার পর বলেছেন, ভারতে বর্ণবৈষম্যের নীতি পাশবিকভাবে চর্চিত হয়েছিল। পৃথিবীর কোনো মানবগোষ্ঠীর ইতিহাসে ভারতবর্ষের চেয়ে চরম বর্ণবিদ্বেষ, বর্ণে বর্ণে বিপুল পার্থক্য এবং মানবমর্যাদার ভয়ানক ভূলুণ্ঠন সম্পর্কে জানা যায়নি।
খ্রিষ্টপূর্ব তিন শতাব্দী পূর্বে ভারতবর্ষে ব্রাহ্ম-সভ্যতার সূচনা ঘটে। এতে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার জন্য নতুন নির্দেশনা প্রস্তুত করা হয়। এই নির্দেশনায় নাগরিক ও রাজনৈতিক আইন লিপিবদ্ধ করা হয় এবং এ ব্যাপারে গোটা দেশ একমত হয়। ভারতীয়দের জীবনে এটিই হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় আইন ও ধর্মীয় সূত্রসম্ভার। এটি বর্তমানে মনুশাস্ত্র (মনুসংহিতা) নামে পরিচিত। এই আইন দেশের অধিবাসীদের চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। সেগুলো হলো:
১. ব্রাহ্মণ: গণক ও ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণি।
২. ক্ষত্রিয়: সৈনিক বা যোদ্ধা শ্রেণি।
৩. বৈশ্য: কৃষক ও বণিক শ্রেণি।
৪. শূদ্র: সেবক ও দাস শ্রেণি।
মনুসংহিতা ব্রাহ্মণ শ্রেণির জন্য এমনসব মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে যা তাদেরকে দেবতাসনে আসীন করেছে। মনু বলেছেন, ব্রাহ্মণরা হলো ঈশ্বরের অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং তারাই সৃষ্টিজগতের দেবতা। পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব তাদের অধীন। তারা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রভু। তারা তাদের দাস শূদ্রশ্রেণির সম্পদ থেকে যা খুশি নিতে পারবে। কারণ, দাস কোনোকিছুর মালিক হতে পারে না, তার সমস্ত সম্পত্তিই তার প্রভুর সম্পত্তি।
মনুসংহিতার আইনের ফলে ভারতীয় সমাজে শূদ্রশ্রেণি ছিল পশুর চেয়েও পতিত, কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট। কুকুর, বিড়াল, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক ও পেঁচা হত্যার যে জরিমানা ছিল, শূদ্রশ্রেণির লোকদের হত্যার জরিমানাও ছিল একই। (৪৩)
ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থান (৪৪) ক্রীতদাসীর চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। জুয়াখেলায় পুরুষেরা নিজের স্ত্রীকে বাজি রাখত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নারীর একাধিক স্বামী হতো। আবার কারও স্বামী মারা গেলে সে চিরতরে বিধবা হয়ে যেত, কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারত না। তার জীবন হয়ে উঠত লাঞ্ছনা-যন্ত্রণার লক্ষ্যস্থল। সে মৃত স্বামীর বাড়িতে দাসী হিসেবে থাকত এবং স্বামীর ভাইবোনদের সেবা করে জীবন কাটাত। কখনো পার্থিব জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে আত্মাহুতি দিত। (৪৫)
ইসলামের পূর্বে এমনই ছিল ভারতীয় সভ্যতা। এমন লজ্জাজনক অজ্ঞতা, নিকৃষ্ট পৌত্তলিকতা এবং সামাজিক অন্যায়-অবিচারের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো জাতির মধ্যে ছিল না। ইতিহাসেও এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। আল-বিরুনি (৪৬) তার গ্রন্থে এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং এগুলোর সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তার গ্রন্থটি হলো, تحقيق ما للهند مِنْ مَقولة مقبولة في العقل أو مرذولة । অধিক জানতে আগ্রহী হলে এই গ্রন্থটি পড়ুন।
টিকাঃ
৪০. ত্রিকোণমিতি: সমকোণী ত্রিভুজের কর্ণ ও বিপরীত বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত, সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সূক্ষ্মকোণদ্বয়ের একটির বিপরীত দিকের বাহুর দৈর্ঘ্যের অনুপাত।- অনুবাদক
৪১. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ২৩৮।
৪২. আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুল হাই ইবনে ফখরুদ্দিন আল-হাসানি জগদ্বিখ্যাত আলেমে দ্বীন, সংগ্রামী সাধক, বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক। সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামি চিন্তাবিদ আবুল হাসান আলি নদবি (জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ এবং মৃত্যু ৩১ ডিসেম্বর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন। উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও তার রচনাবলির প্রায় সবই আরবি ভাষায়। লখনৌ নদওয়াতুল উলামার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা, ও মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য শিক্ষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। দুইশতাধিক গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা নদবির ৩ খণ্ডে প্রকাশিত আত্মজীবনী 'কারওয়ানে যিন্দেগি' এখন গোটা মুসলিমবিশ্বে সমাদৃত। গোটা মুসলিমবিশ্বের পাশাপাশি প্রায় গোটা পৃথিবীই তিনি ভ্রমণ করেছেন। একাধারে আধ্যাত্মিক নেতা, উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক ও আন্তর্জাতিক মানের সংগঠক হিসাবে তিনি তার সমকালীন বিশ্বের অভূতপূর্ব স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৯৪ সালে দুবার তিনি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি ছিলেন শহীদে বালাকোট হযরত সাইয়িদ আহমাদ শহিদ রহ.-এর অধস্তন ৫ম পুরুষ। উত্তর ভারতে শহিদ বেরেলবির পারিবারিক গোরস্থানেই আল্লামা নদবিও শায়িত আছেন। - অনুবাদক
৪৩. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ৩, পৃ. ১৬৪-১৬৮।
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭-১৮৩।
৪৫. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৮-৭৬।
৪৬. আবু রাইহান আল-বিরুনি বা আবু রাইহান মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল-বিরুনি আল-খাওয়ারিজমি (২৬২-৪৪০ হি./৯৭৩-১০৪৭ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। খাওয়ারিজমের বাইরে বসবাস করতেন বলে সাধারণভাবে তিনি আল-বিরুনি (প্রবাসী) নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন গণিতবিদ, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। অধিকন্তু ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা ও সঠিক মতামতের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল-বিরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনিই প্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপার মতে, আল-বিরুনি শুধু মুসলিমবিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তিনি একটি অতি সাধারণ ইরানি পরিবারে ৪ সেপ্টেম্বর ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি নিজের জন্মভূমিতে অতিবাহিত করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবনে সিনার সঙ্গে পত্রবিনিময় করেন। আল-বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজমের আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফারসিতে অথবা আরবি ও ফারসি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল। তিনি ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইবনে মামুন কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি আলি ইবনে মামুনের পর তার ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন। মামুন তার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ১০১৬-১৭ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবনে আলি ও চিকিৎসক আবুল খাইর আল-হুসাইন ইবনে বাবা আল-খাম্মার আল-বাগদাদির সঙ্গে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন থেকে তিনি গজনির শাহি দরবারে সম্ভবত রাজ-জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দুধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাতেও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি এই এক যুগের অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবু তারিখিল হিন্দ। আল-বিরুনি ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তারপরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যান। আল-বিরুনির সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ১০টি গ্রন্থ অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। -অনুবাদক
📄 পারস্য সভ্যতা
পারসিকরা বিপুল বিস্তৃত সাম্রাজ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সভ্য বিশ্বের কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে তারা ছিল রোমানদের সমান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাসানীয় শাসনামলে (Sassanid dynasty) পারস্যসভ্যতার বিকাশ ঘটে। রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধজয়, বিলাসব্যসন ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যে তারা উৎকর্ষ সাধন করে। তাদের একটি জাতিগত ধর্ম ছিল, তা হলো জরথুস্ত্রের ধর্ম। সাহিত্যরসমণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ একটি ভাষাও তাদের ছিল, তা হলো পাহলভি ভাষা। (৪৭)
আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা ছিল এরূপ, প্রাচীন যুগে তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা দিত। এরপর তারা পূর্বসূরিদের মতো সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি ও জ্যোতিষ্কমণ্ডলীকে মর্যাদা দিতে শুরু করে। এরপর সমাজসংস্কারকরূপে জরথুস্ত্রের (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৬৬০-৫৮৩) আবির্ভাব ঘটে। তিনি দেশবাসীর ধর্মীয় চেতনা ও আদর্শের সংস্কার-চিন্তায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজগতের যা-কিছু আলোকিত ও উদ্ভাসিত তার সবকিছুতে আল্লাহর নুর বিচ্ছুরিত হয়। তিনি নামায বা উপাসনার সময় সূর্য ও আগুনের প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হতে নির্দেশ দেন (কারণ এতে আল্লাহরই উপাসনা করা হবে) এবং চারটি উপাদানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেন। উপাদান চারটি এই : আগুন, বায়ু, মাটি ও পানি। জরথুস্ত্রের মৃত্যুর পর যে-সকল মনীষীর আবির্ভাব ঘটে তারা জরথুস্ত্রপন্থীদের জন্য বিভিন্ন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। তারা তাদের জন্য এমনসব বিষয়ে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যেগুলোর জন্য আগুন অনিবার্য। (কারণ, এতে আগুনের অমর্যাদা হতে পারে।) ফলে তাদের কর্মকাণ্ড কৃষিকাজ ও ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আগুনকে এভাবে মর্যাদা দান ও উপাসনার সময় তাকে কেবলা হিসেবে গ্রহণের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে আগুনেরই উপাসনা করতে শুরু করে। অবশেষে তারা আগুনকে উপাস্য বানিয়ে নেয় এবং আগুনের জন্য তারা বেদি ও উপাসনালয় নির্মাণ করে। আগুনের উপাসনা বাদে সমস্ত আকিদা ও ধর্মীয় সংস্কারের বিলুপ্তি ঘটে। (৪৮)
আগুন যখন তার উপাসনাকারীদের কাছে শরিয়ত পাঠাল না, রাসুল প্রেরণ করল না, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করল না, অপরাধী ও পাপাচারীদের শাস্তি দিলো না তখন অগ্নি-উপাসকদের কাছে ধর্ম হয়ে দাঁড়াল কেবল কতিপয় আচার ও প্রথা যা তারা নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত জায়গায় চর্চা করত। উপাসনালয়ের বাইরে ঘর-বাড়িতে, প্রশাসন ও বিচারালয়ে, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে, রাজনীতি ও সমাজে তারা ছিল স্বাধীন। তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা ও মনোবাসনা অনুযায়ী চলত, তাদের চিন্তা তাদের যেভাবে পরিচালিত করত অথবা তাদের হিতাহিত জ্ঞান যা নির্দেশ দিত তারা তা-ই করত। প্রতিটি যুগে প্রতিটি দেশে এটাই ছিল মুশরিকদের অবস্থা। (৪৯)
অতি প্রাচীন কাল থেকেই তাদের নৈতিকতা ও চরিত্রের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে ও ভঙ্গুর। এমনকি আত্মীয়তার পবিত্র (মাহরাম) সম্পর্কগুলোও- বিশ্বের সমস্ত মানুষই স্বভাবগতভাবে এ সম্পর্কগুলোকে পবিত্র এবং যাদের সঙ্গে বৈবাহকমার সম্পর্ককে ঘৃণ্য মনে করত-বিরোধ ও বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (৫০), যিনি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে সাসানীয় সম্রাট ছিলেন, নিজের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, তারপর তাকে খুনও করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সাসানীয় সম্রাট বাহরাম চুবিন (৫১) নিজের বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক ও ইরানের ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেন (৫২) বলেন, সাসানীয় যুগের সামসময়িক ইতিহাসবিদগণ—যেমন জাতহিয়াস ও অন্যরা—স্বীকার করেছেন যে, পারসিকদের মধ্যে রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়দের (যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) বিয়ে করার প্রথা ছিল। সাসানীয় যুগের ইতিহাসে এ ধরনের বিয়ের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। পারসিকদের কাছে এ ধরনের বিবাহ অপরাধ বা পাপ বলে পরিগণিত হতো না। বরং এটা ছিল একটি পুণ্যময় কাজ, যার দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাইত। চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাং 'ইরানিরা বাছবিচারহীনভাবে বিয়ে করত' বলে সম্ভবত এমন বিবাহপ্রথার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। (৫৩)
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে মানির(৫৪) আবির্ভাব ঘটে। তার আন্দোলন ছিল মূলত দেশে বিরাজমান যৌন অনাচার ও উচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে এক স্বভাববিরুদ্ধ কঠিন প্রতিক্রিয়া। মানি এই লাগামহীন যৌনতাচর্চার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি অযৌন জীবনযাপন ও কুমারব্রত পালন করতে আহ্বান জানালেন এবং বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তার অভিপ্রায় ছিল মানুষের বংশবিস্তার রোধ করা এবং তিনি মানবজাতির আসন্ন বিনাশ চেয়েছিলেন। সম্রাট বাহরাম ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মানিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ তো পৃথিবীকে বিরানভূমিতে পরিণত করার আহ্বান নিয়ে বেরিয়েছে। সুতরাং তার কোনো অভিপ্রায় সফল হওয়ার পূর্বেই তাকে ধ্বংস করে ফেলা উচিত। মানির মৃত্যু ঘটেছিল বটে, কিন্তু পারসিক সমাজে তার শিক্ষার প্রভাব ইসলামের বিজয়ধারার পরও টিকে ছিল। (৫৫)
এরপর পারসিকদের স্বভাবাত্মা মানির ধ্বংসাত্মক শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং মাযদাকের(৫৬) আহ্বানে প্রবেশ করে। মাযদাকের জন্ম ৪৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষ সমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং তাদের উচিত সমতার সঙ্গে বসবাস করা, যাতে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে। যেহেতু মানুষের মন নারী ও সম্পদ অধিকারে আনতে ও কুক্ষিগত করতে সবচেয়ে বেশি লালায়িত তাই মাযদাকের কাছে নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা ও যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল। আল্লামা শাহরাস্তানি(৫৭) বলেছেন,
وكان مزدك ينهى الناس عن المخالفة والمباغضة والقتال، ولما كان أكثر ذلك إنما يقع بسبب النساء والأموال أحل النساء وأباح الأموال، وجعل الناس شركة فيهما كاشتراكهم في الماء والنار والكلأ.
মাযদাক মানুষকে পারস্পরিক বিরোধ, কলহবিবাদ ও যুদ্ধে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছিলেন। এগুলোর বেশিরভাগ যেহেতু নারী ও সম্পদের কারণেই হয়ে থাকে, তাই তিনি নারীদের হালাল ঘোষণা করেছিলেন এবং সব ধরনের সম্পদ বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। পানি, আগুন ও ঘাসে যেমন মানুষের যৌথ মালিকানা রয়েছে তেমনি নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রেও সবাইকে যৌথ অংশীদার বানিয়ে দিয়েছিলেন। (৫৮)
মাযদাকের এই আহ্বান যুবকশ্রেণি, ধনিকশ্রেণি ও বিলাসভোগীদের জন্য অনুকূল হয়েছিল, তাদের মনোবৃত্তির সহায়ক হয়েছিল এবং রাজদরবারের সুরক্ষা লাভ করে সৌভাগ্যমণ্ডিত হয়েছিল। সাসানীয় সম্রাট প্রথম কুবায (৫৯) মাযদাকের আহ্বান ও তা প্রচারে সহায়তা দিয়েছিলেন, তা সংহতকরণে উদ্যমশীল হয়েছিলেন। ফলে এই আহ্বানের প্রভাবে পারস্য নৈতিক বিপর্যয় ও যৌন স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত হয়েছিল। ইমাম তাবারি রহ. বলেছেন,
ইতর শ্রেণির লোকেরা এটার (মাযদাকের আহ্বান ও নীতি) সুযোগ গ্রহণ করল ও তা কাজে লাগাল। তারা মাযদাক ও তার সহচরদের ঘিরে ধরল এবং তাদের পিছু পিছু ছুটল। ফলে সাধারণ মানুষেরা তাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো। ইতরদের শক্তি বেড়ে গেল, তারা লোকদের বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাস্ত করে ঘর-নারী-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে শুরু করল। কেউ তাদের বাধা দিতে পারল না। তারা সাসানীয় সম্রাট কুবাযকে এই ঘৃণ্য কাজ শোভনীয় করে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করল এবং এর বিপরীত হলে তাকে অপসারণ করা হবে বলে হুমকি দিলো। ফলে সবাই এই ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হলো, এমনকি বাবা তার সন্তানের পরিচয় জানল না এবং সন্তান তার বাবার পরিচয় জানল না। সাধারণ লোকদের সাধ্যের ভেতরে কিছু থাকল না। (৬০)
পারস্যসম্রাটগণ (কায়সারগণ) দাবি করতেন যে, তাদের ধমনিতে ঐশী রক্ত প্রবহমান এবং তাদের স্বভাবচরিত্রে রয়েছে ঊর্ধ্বজাগতিক পবিত্র উপাদান। পারস্যবাসীরাও তাদের এই দাবি মেনে নিয়েছিল। তাদেরকে তারা ঈশ্বর ও উপাস্যের স্থানে বসিয়েছিল। তাদের উদ্দেশে তারা প্রাণী উৎসর্গ করত। (কায়ানি পরিবারের ক্ষেত্রে) তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল সম্রাটই কেবল রাজমুকুট পরিধানের উপযুক্ত এবং তারাই কেবল ভূমিকা আদায় করতে পারেন। রাজ্য ও রাজ্যভান্ডারের ক্ষেত্রে এই নীতিই চলে আসছিল, উত্তরসূরি থেকে পূর্বসূরি, দাদা থেকে পিতা এই অধিকার প্রাপ্ত হতো। জালিম ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে ঝগড়া বাধায়নি। নিকৃষ্ট জারজ সন্তান ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে বিতণ্ডা করেনি। পারস্যবাসীরা রাজ্য ও রাজ-কোষাগারের ক্ষেত্রে রাজত্ব ও উত্তরাধিকারে বিশ্বাস করত। তারা এর কোনো পরিবর্তন চাইত না, এর কোনো বিকল্প তাদের কাম্য ছিল না। (৬১)
ইরানে মানুষের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট বৈষম্য ও ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আর্থার ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, ইরানের সমাজব্যবস্থা বংশমর্যাদা ও পেশার বিবেচনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট খাদ ছিল, যার ওপর কোনো সেতু তৈরি করা যায়নি এবং কোনো বন্ধন তাদের সংযুক্ত করতে পারেনি। (৬২)
এমনই ছিল পারস্যসভ্যতা। জৈবিক বিলাস, যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা সম্রাটদের গোটা জাতি ও সর্বস্তরের মানুষের ঊর্ধ্বে পবিত্র উপাস্যের স্থান দিয়েছিল।
টিকাঃ
৪৭. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭।
৪৮. Shahin Makarios, তারিখে ইরান, পৃ. ২২১-২২৪।
৪৯. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৩-৬৪।
৫০. দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (Yazdegerd II): পারস্যের ষোড়শ সাসানীয় সম্রাট। রাজত্বকাল ৪৩৯ থেকে ৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দ। তার পূর্বসূরি সম্রাট তার পিতা পঞ্চম বাহরাম এবং তার উত্তরসূরি সম্রাট তৃতীয় হরমিযদ। বাইজান্টিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে তিনি বেশ পরিচিতি লাভ করেছিলেন।-অনুবাদক
৫১. বাহরাম চুবিন (Bahram Chobin): তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরু থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং এক বছর (৫৯০-৫৯১ খ্রিষ্টাব্দ) তা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এক বছর পর সম্রাট খসরু ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন।-অনুবাদক
৫২. ড. আর্থার ইমানুয়েল ক্রিস্টেনসেন (Arthur Christensen): জন্ম ৯ জানুয়ারি ১৮৭৫ এবং মৃত্যু ৩১ মার্চ ১৯৪৫ খ্রি.। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরান-বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন। ইরান- বিষয়ক ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ। ইসলামপূর্ব ও ইসলামপরবর্তী ইরানের ইতিহাস যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে আর্থার ক্রিস্টেনসেনকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়।
৫৩. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায় : ইরান والحركات الهدامة فيها ৫৬-৫৭ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত। মূল গ্রন্থটি ফরাসি ভাষায় লিখিত। উর্দু অনুবাদ করেছেন ড. মুহাম্মাদ ইকবাল এবং আরবি অনুবাদ করেছেন ইয়াহইয়া আল-খাশশাব (দারুন-নাহদাতিল আরাবিয়্যাহ, বৈরুত)। অনুবাদক দুজন একই নাম দিয়েছেন: ইরান ফি আহদিস সাসানিন। আবুল হাসান আলি নদবি রহ. উর্দু অনুবাদের সহায়তা নিয়েছেন।
৫৪. মানি: মানিবাদের প্রবক্তা। জন্ম ইরানে, ২১৬ খ্রিষ্টাব্দে। ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার অনুসারীরা তাকে নবী মনে করে।
৫৫. প্রাগুক্ত।
৫৬. মাযদাক (Mazdak) : বিখ্যাত পারসিক দার্শনিক ও জরথুস্ত্রীয় পুরোহিত। সাসানীয় সম্রাট ও প্রথম খসরুর পিতা প্রথম কুবায (Kavadh 1488-513)-এর যুগে তার আবির্ভাব ঘটে। মৃত্যু হয় সম্ভবত ৫২৪ বা ৫২৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি কুবাযকে তার মতাদর্শের প্রতি আহ্বান করলে কুবায সাড়া দেন। পরবর্তীকালে খসরু মাযদাক তার ওপর অপবাদ দিয়েছেন বলে জানতে পারেন। ফলে তাকে ডেকে পাঠান এবং হত্যা করেন। মাযদাক নারী ও সম্পদ-এ দুটির বৈধতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
৫৭. আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল কারিম ইবনে আহমাদ শাহরাস্তানি (৪৭৯-৫৪৮ হিজরি/ ১০৮৬-১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ): দার্শনিক ও আশআরি মতাদর্শের ধর্মতাত্ত্বিক। ধর্মতত্ত্ব, প্রচলিত ধর্ম ও দার্শনিক মতবাদ বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الملل والنحل : نهاية الإقدام في علم الكلام الإرشاد إلى عقائد العبادة تلخيص الأقسام لمذاهب الأنام؛ مصارعات الفلاسفة تاريخ الحكماء المبدأ والمعادة تفسير سورة يوسف مفاتيح الأسرار ومصابيح الأبرار في التفسير. ইরানের শাহরাস্তানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। জীবনচরিত-রচয়িতা ইয়াকুত আল-হামাবি তার জ্ঞান-বিদ্যার উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন।
৫৮. ইমাম শাহরাস্তানি, আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৫৯. পারস্যের সাসানীয় সম্রাট এবং প্রথম খসরুর পিতা। প্রথমবার রাজত্বকাল ৪৮৮-৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয়বার রাজত্বকাল ৪৯৮-৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ।
৬০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ১, পৃ. ৪১৯।
৬১. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৫৯-৫৮।
৬২. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায়: তাফাউত বায়নাত-তাবাকাত, পৃ. ৬০; ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের ইরান ফি আহদিস সাসানিন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
পারসিকরা বিপুল বিস্তৃত সাম্রাজ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সভ্য বিশ্বের কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে তারা ছিল রোমানদের সমান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাসানীয় শাসনামলে (Sassanid dynasty) পারস্যসভ্যতার বিকাশ ঘটে। রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধজয়, বিলাসব্যসন ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যে তারা উৎকর্ষ সাধন করে। তাদের একটি জাতিগত ধর্ম ছিল, তা হলো জরথুস্ত্রের ধর্ম। সাহিত্যরসমণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ একটি ভাষাও তাদের ছিল, তা হলো পাহলভি ভাষা। (৪৭)
আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা ছিল এরূপ, প্রাচীন যুগে তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা দিত। এরপর তারা পূর্বসূরিদের মতো সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি ও জ্যোতিষ্কমণ্ডলীকে মর্যাদা দিতে শুরু করে। এরপর সমাজসংস্কারকরূপে জরথুস্ত্রের (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৬৬০-৫৮৩) আবির্ভাব ঘটে। তিনি দেশবাসীর ধর্মীয় চেতনা ও আদর্শের সংস্কার-চিন্তায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজগতের যা-কিছু আলোকিত ও উদ্ভাসিত তার সবকিছুতে আল্লাহর নুর বিচ্ছুরিত হয়। তিনি নামায বা উপাসনার সময় সূর্য ও আগুনের প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হতে নির্দেশ দেন (কারণ এতে আল্লাহরই উপাসনা করা হবে) এবং চারটি উপাদানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেন। উপাদান চারটি এই : আগুন, বায়ু, মাটি ও পানি। জরথুস্ত্রের মৃত্যুর পর যে-সকল মনীষীর আবির্ভাব ঘটে তারা জরথুস্ত্রপন্থীদের জন্য বিভিন্ন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। তারা তাদের জন্য এমনসব বিষয়ে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যেগুলোর জন্য আগুন অনিবার্য। (কারণ, এতে আগুনের অমর্যাদা হতে পারে।) ফলে তাদের কর্মকাণ্ড কৃষিকাজ ও ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আগুনকে এভাবে মর্যাদা দান ও উপাসনার সময় তাকে কেবলা হিসেবে গ্রহণের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে আগুনেরই উপাসনা করতে শুরু করে। অবশেষে তারা আগুনকে উপাস্য বানিয়ে নেয় এবং আগুনের জন্য তারা বেদি ও উপাসনালয় নির্মাণ করে। আগুনের উপাসনা বাদে সমস্ত আকিদা ও ধর্মীয় সংস্কারের বিলুপ্তি ঘটে। (৪৮)
আগুন যখন তার উপাসনাকারীদের কাছে শরিয়ত পাঠাল না, রাসুল প্রেরণ করল না, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করল না, অপরাধী ও পাপাচারীদের শাস্তি দিলো না তখন অগ্নি-উপাসকদের কাছে ধর্ম হয়ে দাঁড়াল কেবল কতিপয় আচার ও প্রথা যা তারা নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত জায়গায় চর্চা করত। উপাসনালয়ের বাইরে ঘর-বাড়িতে, প্রশাসন ও বিচারালয়ে, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে, রাজনীতি ও সমাজে তারা ছিল স্বাধীন। তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা ও মনোবাসনা অনুযায়ী চলত, তাদের চিন্তা তাদের যেভাবে পরিচালিত করত অথবা তাদের হিতাহিত জ্ঞান যা নির্দেশ দিত তারা তা-ই করত। প্রতিটি যুগে প্রতিটি দেশে এটাই ছিল মুশরিকদের অবস্থা। (৪৯)
অতি প্রাচীন কাল থেকেই তাদের নৈতিকতা ও চরিত্রের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে ও ভঙ্গুর। এমনকি আত্মীয়তার পবিত্র (মাহরাম) সম্পর্কগুলোও- বিশ্বের সমস্ত মানুষই স্বভাবগতভাবে এ সম্পর্কগুলোকে পবিত্র এবং যাদের সঙ্গে বৈবাহকমার সম্পর্ককে ঘৃণ্য মনে করত-বিরোধ ও বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (৫০), যিনি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে সাসানীয় সম্রাট ছিলেন, নিজের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, তারপর তাকে খুনও করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সাসানীয় সম্রাট বাহরাম চুবিন (৫১) নিজের বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক ও ইরানের ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেন (৫২) বলেন, সাসানীয় যুগের সামসময়িক ইতিহাসবিদগণ—যেমন জাতহিয়াস ও অন্যরা—স্বীকার করেছেন যে, পারসিকদের মধ্যে রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়দের (যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) বিয়ে করার প্রথা ছিল। সাসানীয় যুগের ইতিহাসে এ ধরনের বিয়ের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। পারসিকদের কাছে এ ধরনের বিবাহ অপরাধ বা পাপ বলে পরিগণিত হতো না। বরং এটা ছিল একটি পুণ্যময় কাজ, যার দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাইত। চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাং 'ইরানিরা বাছবিচারহীনভাবে বিয়ে করত' বলে সম্ভবত এমন বিবাহপ্রথার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। (৫৩)
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে মানির(৫৪) আবির্ভাব ঘটে। তার আন্দোলন ছিল মূলত দেশে বিরাজমান যৌন অনাচার ও উচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে এক স্বভাববিরুদ্ধ কঠিন প্রতিক্রিয়া। মানি এই লাগামহীন যৌনতাচর্চার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি অযৌন জীবনযাপন ও কুমারব্রত পালন করতে আহ্বান জানালেন এবং বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তার অভিপ্রায় ছিল মানুষের বংশবিস্তার রোধ করা এবং তিনি মানবজাতির আসন্ন বিনাশ চেয়েছিলেন। সম্রাট বাহরাম ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মানিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ তো পৃথিবীকে বিরানভূমিতে পরিণত করার আহ্বান নিয়ে বেরিয়েছে। সুতরাং তার কোনো অভিপ্রায় সফল হওয়ার পূর্বেই তাকে ধ্বংস করে ফেলা উচিত। মানির মৃত্যু ঘটেছিল বটে, কিন্তু পারসিক সমাজে তার শিক্ষার প্রভাব ইসলামের বিজয়ধারার পরও টিকে ছিল। (৫৫)
এরপর পারসিকদের স্বভাবাত্মা মানির ধ্বংসাত্মক শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং মাযদাকের(৫৬) আহ্বানে প্রবেশ করে। মাযদাকের জন্ম ৪৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষ সমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং তাদের উচিত সমতার সঙ্গে বসবাস করা, যাতে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে। যেহেতু মানুষের মন নারী ও সম্পদ অধিকারে আনতে ও কুক্ষিগত করতে সবচেয়ে বেশি লালায়িত তাই মাযদাকের কাছে নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা ও যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল। আল্লামা শাহরাস্তানি(৫৭) বলেছেন,
وكان مزدك ينهى الناس عن المخالفة والمباغضة والقتال، ولما كان أكثر ذلك إنما يقع بسبب النساء والأموال أحل النساء وأباح الأموال، وجعل الناس شركة فيهما كاشتراكهم في الماء والنار والكلأ.
মাযদাক মানুষকে পারস্পরিক বিরোধ, কলহবিবাদ ও যুদ্ধে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছিলেন। এগুলোর বেশিরভাগ যেহেতু নারী ও সম্পদের কারণেই হয়ে থাকে, তাই তিনি নারীদের হালাল ঘোষণা করেছিলেন এবং সব ধরনের সম্পদ বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। পানি, আগুন ও ঘাসে যেমন মানুষের যৌথ মালিকানা রয়েছে তেমনি নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রেও সবাইকে যৌথ অংশীদার বানিয়ে দিয়েছিলেন। (৫৮)
মাযদাকের এই আহ্বান যুবকশ্রেণি, ধনিকশ্রেণি ও বিলাসভোগীদের জন্য অনুকূল হয়েছিল, তাদের মনোবৃত্তির সহায়ক হয়েছিল এবং রাজদরবারের সুরক্ষা লাভ করে সৌভাগ্যমণ্ডিত হয়েছিল। সাসানীয় সম্রাট প্রথম কুবায (৫৯) মাযদাকের আহ্বান ও তা প্রচারে সহায়তা দিয়েছিলেন, তা সংহতকরণে উদ্যমশীল হয়েছিলেন। ফলে এই আহ্বানের প্রভাবে পারস্য নৈতিক বিপর্যয় ও যৌন স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত হয়েছিল। ইমাম তাবারি রহ. বলেছেন,
ইতর শ্রেণির লোকেরা এটার (মাযদাকের আহ্বান ও নীতি) সুযোগ গ্রহণ করল ও তা কাজে লাগাল। তারা মাযদাক ও তার সহচরদের ঘিরে ধরল এবং তাদের পিছু পিছু ছুটল। ফলে সাধারণ মানুষেরা তাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো। ইতরদের শক্তি বেড়ে গেল, তারা লোকদের বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাস্ত করে ঘর-নারী-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে শুরু করল। কেউ তাদের বাধা দিতে পারল না। তারা সাসানীয় সম্রাট কুবাযকে এই ঘৃণ্য কাজ শোভনীয় করে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করল এবং এর বিপরীত হলে তাকে অপসারণ করা হবে বলে হুমকি দিলো। ফলে সবাই এই ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হলো, এমনকি বাবা তার সন্তানের পরিচয় জানল না এবং সন্তান তার বাবার পরিচয় জানল না। সাধারণ লোকদের সাধ্যের ভেতরে কিছু থাকল না। (৬০)
পারস্যসম্রাটগণ (কায়সারগণ) দাবি করতেন যে, তাদের ধমনিতে ঐশী রক্ত প্রবহমান এবং তাদের স্বভাবচরিত্রে রয়েছে ঊর্ধ্বজাগতিক পবিত্র উপাদান। পারস্যবাসীরাও তাদের এই দাবি মেনে নিয়েছিল। তাদেরকে তারা ঈশ্বর ও উপাস্যের স্থানে বসিয়েছিল। তাদের উদ্দেশে তারা প্রাণী উৎসর্গ করত। (কায়ানি পরিবারের ক্ষেত্রে) তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল সম্রাটই কেবল রাজমুকুট পরিধানের উপযুক্ত এবং তারাই কেবল ভূমিকা আদায় করতে পারেন। রাজ্য ও রাজ্যভান্ডারের ক্ষেত্রে এই নীতিই চলে আসছিল, উত্তরসূরি থেকে পূর্বসূরি, দাদা থেকে পিতা এই অধিকার প্রাপ্ত হতো। জালিম ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে ঝগড়া বাধায়নি। নিকৃষ্ট জারজ সন্তান ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে বিতণ্ডা করেনি। পারস্যবাসীরা রাজ্য ও রাজ-কোষাগারের ক্ষেত্রে রাজত্ব ও উত্তরাধিকারে বিশ্বাস করত। তারা এর কোনো পরিবর্তন চাইত না, এর কোনো বিকল্প তাদের কাম্য ছিল না। (৬১)
ইরানে মানুষের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট বৈষম্য ও ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আর্থার ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, ইরানের সমাজব্যবস্থা বংশমর্যাদা ও পেশার বিবেচনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট খাদ ছিল, যার ওপর কোনো সেতু তৈরি করা যায়নি এবং কোনো বন্ধন তাদের সংযুক্ত করতে পারেনি। (৬২)
এমনই ছিল পারস্যসভ্যতা। জৈবিক বিলাস, যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা সম্রাটদের গোটা জাতি ও সর্বস্তরের মানুষের ঊর্ধ্বে পবিত্র উপাস্যের স্থান দিয়েছিল।
টিকাঃ
৪৭. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭।
৪৮. Shahin Makarios, তারিখে ইরান, পৃ. ২২১-২২৪।
৪৯. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৩-৬৪।
৫০. দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (Yazdegerd II): পারস্যের ষোড়শ সাসানীয় সম্রাট। রাজত্বকাল ৪৩৯ থেকে ৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দ। তার পূর্বসূরি সম্রাট তার পিতা পঞ্চম বাহরাম এবং তার উত্তরসূরি সম্রাট তৃতীয় হরমিযদ। বাইজান্টিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে তিনি বেশ পরিচিতি লাভ করেছিলেন।-অনুবাদক
৫১. বাহরাম চুবিন (Bahram Chobin): তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরু থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং এক বছর (৫৯০-৫৯১ খ্রিষ্টাব্দ) তা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এক বছর পর সম্রাট খসরু ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন।-অনুবাদক
৫২. ড. আর্থার ইমানুয়েল ক্রিস্টেনসেন (Arthur Christensen): জন্ম ৯ জানুয়ারি ১৮৭৫ এবং মৃত্যু ৩১ মার্চ ১৯৪৫ খ্রি.। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরান-বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন। ইরান- বিষয়ক ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ। ইসলামপূর্ব ও ইসলামপরবর্তী ইরানের ইতিহাস যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে আর্থার ক্রিস্টেনসেনকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়।
৫৩. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায় : ইরান والحركات الهدامة فيها ৫৬-৫৭ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত। মূল গ্রন্থটি ফরাসি ভাষায় লিখিত। উর্দু অনুবাদ করেছেন ড. মুহাম্মাদ ইকবাল এবং আরবি অনুবাদ করেছেন ইয়াহইয়া আল-খাশশাব (দারুন-নাহদাতিল আরাবিয়্যাহ, বৈরুত)। অনুবাদক দুজন একই নাম দিয়েছেন: ইরান ফি আহদিস সাসানিন। আবুল হাসান আলি নদবি রহ. উর্দু অনুবাদের সহায়তা নিয়েছেন।
৫৪. মানি: মানিবাদের প্রবক্তা। জন্ম ইরানে, ২১৬ খ্রিষ্টাব্দে। ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার অনুসারীরা তাকে নবী মনে করে।
৫৫. প্রাগুক্ত।
৫৬. মাযদাক (Mazdak) : বিখ্যাত পারসিক দার্শনিক ও জরথুস্ত্রীয় পুরোহিত। সাসানীয় সম্রাট ও প্রথম খসরুর পিতা প্রথম কুবায (Kavadh 1488-513)-এর যুগে তার আবির্ভাব ঘটে। মৃত্যু হয় সম্ভবত ৫২৪ বা ৫২৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি কুবাযকে তার মতাদর্শের প্রতি আহ্বান করলে কুবায সাড়া দেন। পরবর্তীকালে খসরু মাযদাক তার ওপর অপবাদ দিয়েছেন বলে জানতে পারেন। ফলে তাকে ডেকে পাঠান এবং হত্যা করেন। মাযদাক নারী ও সম্পদ-এ দুটির বৈধতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
৫৭. আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল কারিম ইবনে আহমাদ শাহরাস্তানি (৪৭৯-৫৪৮ হিজরি/ ১০৮৬-১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ): দার্শনিক ও আশআরি মতাদর্শের ধর্মতাত্ত্বিক। ধর্মতত্ত্ব, প্রচলিত ধর্ম ও দার্শনিক মতবাদ বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الملل والنحل : نهاية الإقدام في علم الكلام الإرشاد إلى عقائد العبادة تلخيص الأقسام لمذاهب الأنام؛ مصارعات الفلاسفة تاريخ الحكماء المبدأ والمعادة تفسير سورة يوسف مفاتيح الأسرار ومصابيح الأبرار في التفسير. ইরানের শাহরাস্তানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। জীবনচরিত-রচয়িতা ইয়াকুত আল-হামাবি তার জ্ঞান-বিদ্যার উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন।
৫৮. ইমাম শাহরাস্তানি, আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৫৯. পারস্যের সাসানীয় সম্রাট এবং প্রথম খসরুর পিতা। প্রথমবার রাজত্বকাল ৪৮৮-৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয়বার রাজত্বকাল ৪৯৮-৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ।
৬০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ১, পৃ. ৪১৯।
৬১. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৫৯-৫৮।
৬২. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায়: তাফাউত বায়নাত-তাবাকাত, পৃ. ৬০; ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের ইরান ফি আহদিস সাসানিন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
পারসিকরা বিপুল বিস্তৃত সাম্রাজ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সভ্য বিশ্বের কর্তৃত্বে ও নেতৃত্বে তারা ছিল রোমানদের সমান। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাসানীয় শাসনামলে (Sassanid dynasty) পারস্যসভ্যতার বিকাশ ঘটে। রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধজয়, বিলাসব্যসন ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যে তারা উৎকর্ষ সাধন করে। তাদের একটি জাতিগত ধর্ম ছিল, তা হলো জরথুস্ত্রের ধর্ম। সাহিত্যরসমণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ একটি ভাষাও তাদের ছিল, তা হলো পাহলভি ভাষা। (৪৭)
আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা ছিল এরূপ, প্রাচীন যুগে তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা দিত। এরপর তারা পূর্বসূরিদের মতো সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি ও জ্যোতিষ্কমণ্ডলীকে মর্যাদা দিতে শুরু করে। এরপর সমাজসংস্কারকরূপে জরথুস্ত্রের (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৬৬০-৫৮৩) আবির্ভাব ঘটে। তিনি দেশবাসীর ধর্মীয় চেতনা ও আদর্শের সংস্কার-চিন্তায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বজগতের যা-কিছু আলোকিত ও উদ্ভাসিত তার সবকিছুতে আল্লাহর নুর বিচ্ছুরিত হয়। তিনি নামায বা উপাসনার সময় সূর্য ও আগুনের প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হতে নির্দেশ দেন (কারণ এতে আল্লাহরই উপাসনা করা হবে) এবং চারটি উপাদানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেন। উপাদান চারটি এই : আগুন, বায়ু, মাটি ও পানি। জরথুস্ত্রের মৃত্যুর পর যে-সকল মনীষীর আবির্ভাব ঘটে তারা জরথুস্ত্রপন্থীদের জন্য বিভিন্ন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। তারা তাদের জন্য এমনসব বিষয়ে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে যেগুলোর জন্য আগুন অনিবার্য। (কারণ, এতে আগুনের অমর্যাদা হতে পারে।) ফলে তাদের কর্মকাণ্ড কৃষিকাজ ও ব্যবসায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আগুনকে এভাবে মর্যাদা দান ও উপাসনার সময় তাকে কেবলা হিসেবে গ্রহণের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে আগুনেরই উপাসনা করতে শুরু করে। অবশেষে তারা আগুনকে উপাস্য বানিয়ে নেয় এবং আগুনের জন্য তারা বেদি ও উপাসনালয় নির্মাণ করে। আগুনের উপাসনা বাদে সমস্ত আকিদা ও ধর্মীয় সংস্কারের বিলুপ্তি ঘটে। (৪৮)
আগুন যখন তার উপাসনাকারীদের কাছে শরিয়ত পাঠাল না, রাসুল প্রেরণ করল না, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করল না, অপরাধী ও পাপাচারীদের শাস্তি দিলো না তখন অগ্নি-উপাসকদের কাছে ধর্ম হয়ে দাঁড়াল কেবল কতিপয় আচার ও প্রথা যা তারা নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত জায়গায় চর্চা করত। উপাসনালয়ের বাইরে ঘর-বাড়িতে, প্রশাসন ও বিচারালয়ে, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে, রাজনীতি ও সমাজে তারা ছিল স্বাধীন। তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা ও মনোবাসনা অনুযায়ী চলত, তাদের চিন্তা তাদের যেভাবে পরিচালিত করত অথবা তাদের হিতাহিত জ্ঞান যা নির্দেশ দিত তারা তা-ই করত। প্রতিটি যুগে প্রতিটি দেশে এটাই ছিল মুশরিকদের অবস্থা। (৪৯)
অতি প্রাচীন কাল থেকেই তাদের নৈতিকতা ও চরিত্রের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে ও ভঙ্গুর। এমনকি আত্মীয়তার পবিত্র (মাহরাম) সম্পর্কগুলোও- বিশ্বের সমস্ত মানুষই স্বভাবগতভাবে এ সম্পর্কগুলোকে পবিত্র এবং যাদের সঙ্গে বৈবাহকমার সম্পর্ককে ঘৃণ্য মনে করত-বিরোধ ও বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (৫০), যিনি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে সাসানীয় সম্রাট ছিলেন, নিজের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, তারপর তাকে খুনও করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সাসানীয় সম্রাট বাহরাম চুবিন (৫১) নিজের বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক ও ইরানের ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেন (৫২) বলেন, সাসানীয় যুগের সামসময়িক ইতিহাসবিদগণ—যেমন জাতহিয়াস ও অন্যরা—স্বীকার করেছেন যে, পারসিকদের মধ্যে রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়দের (যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) বিয়ে করার প্রথা ছিল। সাসানীয় যুগের ইতিহাসে এ ধরনের বিয়ের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। পারসিকদের কাছে এ ধরনের বিবাহ অপরাধ বা পাপ বলে পরিগণিত হতো না। বরং এটা ছিল একটি পুণ্যময় কাজ, যার দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাইত। চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাং 'ইরানিরা বাছবিচারহীনভাবে বিয়ে করত' বলে সম্ভবত এমন বিবাহপ্রথার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। (৫৩)
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে মানির(৫৪) আবির্ভাব ঘটে। তার আন্দোলন ছিল মূলত দেশে বিরাজমান যৌন অনাচার ও উচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে এক স্বভাববিরুদ্ধ কঠিন প্রতিক্রিয়া। মানি এই লাগামহীন যৌনতাচর্চার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি অযৌন জীবনযাপন ও কুমারব্রত পালন করতে আহ্বান জানালেন এবং বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। তার অভিপ্রায় ছিল মানুষের বংশবিস্তার রোধ করা এবং তিনি মানবজাতির আসন্ন বিনাশ চেয়েছিলেন। সম্রাট বাহরাম ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মানিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ তো পৃথিবীকে বিরানভূমিতে পরিণত করার আহ্বান নিয়ে বেরিয়েছে। সুতরাং তার কোনো অভিপ্রায় সফল হওয়ার পূর্বেই তাকে ধ্বংস করে ফেলা উচিত। মানির মৃত্যু ঘটেছিল বটে, কিন্তু পারসিক সমাজে তার শিক্ষার প্রভাব ইসলামের বিজয়ধারার পরও টিকে ছিল। (৫৫)
এরপর পারসিকদের স্বভাবাত্মা মানির ধ্বংসাত্মক শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং মাযদাকের(৫৬) আহ্বানে প্রবেশ করে। মাযদাকের জন্ম ৪৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষ সমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সুতরাং তাদের উচিত সমতার সঙ্গে বসবাস করা, যাতে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে। যেহেতু মানুষের মন নারী ও সম্পদ অধিকারে আনতে ও কুক্ষিগত করতে সবচেয়ে বেশি লালায়িত তাই মাযদাকের কাছে নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা ও যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল। আল্লামা শাহরাস্তানি(৫৭) বলেছেন,
وكان مزدك ينهى الناس عن المخالفة والمباغضة والقتال، ولما كان أكثر ذلك إنما يقع بسبب النساء والأموال أحل النساء وأباح الأموال، وجعل الناس شركة فيهما كاشتراكهم في الماء والنار والكلأ.
মাযদাক মানুষকে পারস্পরিক বিরোধ, কলহবিবাদ ও যুদ্ধে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছিলেন। এগুলোর বেশিরভাগ যেহেতু নারী ও সম্পদের কারণেই হয়ে থাকে, তাই তিনি নারীদের হালাল ঘোষণা করেছিলেন এবং সব ধরনের সম্পদ বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। পানি, আগুন ও ঘাসে যেমন মানুষের যৌথ মালিকানা রয়েছে তেমনি নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রেও সবাইকে যৌথ অংশীদার বানিয়ে দিয়েছিলেন। (৫৮)
মাযদাকের এই আহ্বান যুবকশ্রেণি, ধনিকশ্রেণি ও বিলাসভোগীদের জন্য অনুকূল হয়েছিল, তাদের মনোবৃত্তির সহায়ক হয়েছিল এবং রাজদরবারের সুরক্ষা লাভ করে সৌভাগ্যমণ্ডিত হয়েছিল। সাসানীয় সম্রাট প্রথম কুবায (৫৯) মাযদাকের আহ্বান ও তা প্রচারে সহায়তা দিয়েছিলেন, তা সংহতকরণে উদ্যমশীল হয়েছিলেন। ফলে এই আহ্বানের প্রভাবে পারস্য নৈতিক বিপর্যয় ও যৌন স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত হয়েছিল। ইমাম তাবারি রহ. বলেছেন,
ইতর শ্রেণির লোকেরা এটার (মাযদাকের আহ্বান ও নীতি) সুযোগ গ্রহণ করল ও তা কাজে লাগাল। তারা মাযদাক ও তার সহচরদের ঘিরে ধরল এবং তাদের পিছু পিছু ছুটল। ফলে সাধারণ মানুষেরা তাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো। ইতরদের শক্তি বেড়ে গেল, তারা লোকদের বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে তাদের পরাস্ত করে ঘর-নারী-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে শুরু করল। কেউ তাদের বাধা দিতে পারল না। তারা সাসানীয় সম্রাট কুবাযকে এই ঘৃণ্য কাজ শোভনীয় করে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করল এবং এর বিপরীত হলে তাকে অপসারণ করা হবে বলে হুমকি দিলো। ফলে সবাই এই ঘৃণ্য কর্মে লিপ্ত হলো, এমনকি বাবা তার সন্তানের পরিচয় জানল না এবং সন্তান তার বাবার পরিচয় জানল না। সাধারণ লোকদের সাধ্যের ভেতরে কিছু থাকল না। (৬০)
পারস্যসম্রাটগণ (কায়সারগণ) দাবি করতেন যে, তাদের ধমনিতে ঐশী রক্ত প্রবহমান এবং তাদের স্বভাবচরিত্রে রয়েছে ঊর্ধ্বজাগতিক পবিত্র উপাদান। পারস্যবাসীরাও তাদের এই দাবি মেনে নিয়েছিল। তাদেরকে তারা ঈশ্বর ও উপাস্যের স্থানে বসিয়েছিল। তাদের উদ্দেশে তারা প্রাণী উৎসর্গ করত। (কায়ানি পরিবারের ক্ষেত্রে) তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল সম্রাটই কেবল রাজমুকুট পরিধানের উপযুক্ত এবং তারাই কেবল ভূমিকা আদায় করতে পারেন। রাজ্য ও রাজ্যভান্ডারের ক্ষেত্রে এই নীতিই চলে আসছিল, উত্তরসূরি থেকে পূর্বসূরি, দাদা থেকে পিতা এই অধিকার প্রাপ্ত হতো। জালিম ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে ঝগড়া বাধায়নি। নিকৃষ্ট জারজ সন্তান ছাড়া কেউ তাদের সঙ্গে বিতণ্ডা করেনি। পারস্যবাসীরা রাজ্য ও রাজ-কোষাগারের ক্ষেত্রে রাজত্ব ও উত্তরাধিকারে বিশ্বাস করত। তারা এর কোনো পরিবর্তন চাইত না, এর কোনো বিকল্প তাদের কাম্য ছিল না। (৬১)
ইরানে মানুষের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট বৈষম্য ও ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আর্থার ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, ইরানের সমাজব্যবস্থা বংশমর্যাদা ও পেশার বিবেচনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের সামাজিক স্তরগুলোর মধ্যে বিরাট খাদ ছিল, যার ওপর কোনো সেতু তৈরি করা যায়নি এবং কোনো বন্ধন তাদের সংযুক্ত করতে পারেনি। (৬২)
এমনই ছিল পারস্যসভ্যতা। জৈবিক বিলাস, যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা সম্রাটদের গোটা জাতি ও সর্বস্তরের মানুষের ঊর্ধ্বে পবিত্র উপাস্যের স্থান দিয়েছিল।
টিকাঃ
৪৭. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭।
৪৮. Shahin Makarios, তারিখে ইরান, পৃ. ২২১-২২৪।
৪৯. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৩-৬৪।
৫০. দ্বিতীয় ইয়াযদিগারদ (Yazdegerd II): পারস্যের ষোড়শ সাসানীয় সম্রাট। রাজত্বকাল ৪৩৯ থেকে ৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দ। তার পূর্বসূরি সম্রাট তার পিতা পঞ্চম বাহরাম এবং তার উত্তরসূরি সম্রাট তৃতীয় হরমিযদ। বাইজান্টিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে তিনি বেশ পরিচিতি লাভ করেছিলেন।-অনুবাদক
৫১. বাহরাম চুবিন (Bahram Chobin): তিনি সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরু থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং এক বছর (৫৯০-৫৯১ খ্রিষ্টাব্দ) তা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এক বছর পর সম্রাট খসরু ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন।-অনুবাদক
৫২. ড. আর্থার ইমানুয়েল ক্রিস্টেনসেন (Arthur Christensen): জন্ম ৯ জানুয়ারি ১৮৭৫ এবং মৃত্যু ৩১ মার্চ ১৯৪৫ খ্রি.। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরান-বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন। ইরান- বিষয়ক ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ। ইসলামপূর্ব ও ইসলামপরবর্তী ইরানের ইতিহাস যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে আর্থার ক্রিস্টেনসেনকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়।
৫৩. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায় : ইরান والحركات الهدامة فيها ৫৬-৫৭ ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত। মূল গ্রন্থটি ফরাসি ভাষায় লিখিত। উর্দু অনুবাদ করেছেন ড. মুহাম্মাদ ইকবাল এবং আরবি অনুবাদ করেছেন ইয়াহইয়া আল-খাশশাব (দারুন-নাহদাতিল আরাবিয়্যাহ, বৈরুত)। অনুবাদক দুজন একই নাম দিয়েছেন: ইরান ফি আহদিস সাসানিন। আবুল হাসান আলি নদবি রহ. উর্দু অনুবাদের সহায়তা নিয়েছেন।
৫৪. মানি: মানিবাদের প্রবক্তা। জন্ম ইরানে, ২১৬ খ্রিষ্টাব্দে। ২৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার অনুসারীরা তাকে নবী মনে করে।
৫৫. প্রাগুক্ত।
৫৬. মাযদাক (Mazdak) : বিখ্যাত পারসিক দার্শনিক ও জরথুস্ত্রীয় পুরোহিত। সাসানীয় সম্রাট ও প্রথম খসরুর পিতা প্রথম কুবায (Kavadh 1488-513)-এর যুগে তার আবির্ভাব ঘটে। মৃত্যু হয় সম্ভবত ৫২৪ বা ৫২৮ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি কুবাযকে তার মতাদর্শের প্রতি আহ্বান করলে কুবায সাড়া দেন। পরবর্তীকালে খসরু মাযদাক তার ওপর অপবাদ দিয়েছেন বলে জানতে পারেন। ফলে তাকে ডেকে পাঠান এবং হত্যা করেন। মাযদাক নারী ও সম্পদ-এ দুটির বৈধতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
৫৭. আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল কারিম ইবনে আহমাদ শাহরাস্তানি (৪৭৯-৫৪৮ হিজরি/ ১০৮৬-১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ): দার্শনিক ও আশআরি মতাদর্শের ধর্মতাত্ত্বিক। ধর্মতত্ত্ব, প্রচলিত ধর্ম ও দার্শনিক মতবাদ বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিত। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الملل والنحل : نهاية الإقدام في علم الكلام الإرشاد إلى عقائد العبادة تلخيص الأقسام لمذاهب الأنام؛ مصارعات الفلاسفة تاريخ الحكماء المبدأ والمعادة تفسير سورة يوسف مفاتيح الأسرار ومصابيح الأبرار في التفسير. ইরানের শাহরাস্তানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। জীবনচরিত-রচয়িতা ইয়াকুত আল-হামাবি তার জ্ঞান-বিদ্যার উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন।
৫৮. ইমাম শাহরাস্তানি, আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খ. ১, পৃ. ২৪৮।
৫৯. পারস্যের সাসানীয় সম্রাট এবং প্রথম খসরুর পিতা। প্রথমবার রাজত্বকাল ৪৮৮-৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয়বার রাজত্বকাল ৪৯৮-৫৩১ খ্রিষ্টাব্দ।
৬০. তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, খ. ১, পৃ. ৪১৯।
৬১. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৫৯-৫৮।
৬২. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, অধ্যায়: তাফাউত বায়নাত-তাবাকাত, পৃ. ৬০; ড. আর্থার ক্রিস্টেনসেনের ইরান ফি আহদিস সাসানিন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
📄 রোমান সভ্যতা
গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)
টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।
গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)
টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।
গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)
টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।