📄 মুয়াহিদুনদের আগমনের পূর্বে স্পেনের অবস্থা
যে সমস্ত বিবাদমান শক্তিসমূহের কারণে স্পেনে মুসলিম রাজ্যের ধ্বংস সাধিত হয়, মুরাবিতুনগণ সেই সমস্ত শক্তিকে স্বল্পদিনের জন্য ঐক্যবদ্ধ করেন। মুয়াহিদুনগণ ইফ্রিকিয়ায় মুরাবিতুনদের আরো সম্প্রসারণে উত্তর স্পেনের অগ্রাভিযানে বাধা প্রদান করেন। মুরাবিতুন শাসনের শুরুতে বিনা বাধায় কৃষি উন্নয়ন, কারখানা ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে কিন্তু কাব্য চর্চা ও দর্শনে জ্ঞান লাভকে উৎসাহিত করা হয় না। মুরাবিতুনগণ ধর্ম প্রচার ও দেশ বিজয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। স্পেনে মুসলিম বিজয়ের পরে মুসা বিন নুসায়েরের সহিত সম্পাদিত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করিয়া যে সমস্ত গীর্জা নির্মিত হইয়াছিল আলেমদের প্রভাবে সেগুলির ধ্বংস সাধন করা হয়।
আফ্রিকায় মুরাবিতুনের সহিত মুয়াহিদিনদের বিরোধ খ্রীস্টানদিগকে স্পেনের মুসলিম অধ্যুসিত এলাকা ধ্বংস সাধন ও মুসলমানদের উপর চরম অত্যাচার করার সুযোগ করিয়া দেয়। হোলের মতে, উত্তরাঞ্চলের খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের রক্ষার্থে ইউসুফের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত স্পেনে দুই পুরুষের মুসলিম শাসন ছিল সর্বাপেক্ষা দুর্বল। ৬ স্পেনের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত হইয়া খ্রীস্টানদের নৌ-শক্তি একত্রিত হইয়া আলমেরিয়া আক্রমণ ও অধিকার করে। ৭ ১১৩৩ খ্রীঃ ক্যাস্টিলের সপ্তম আলফন্সো কর্ডোভা, সেভিল, কারমোনা ও কাডিজের ধ্বংস সাধন করেন। ১১৪৪ খ্রীঃ কালাতারাভা হইতে আলমেরিয়া পর্যন্ত সারা আন্দালুসিয়া খ্রীস্টানদের করায়ত্ত হয়। ১১৪৫ খ্রীঃ মুরাবিতুন শাসনের পতনের পর হইতে শুরু করিয়া মুয়াহিদিনদের ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত স্পেনে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা বাড়িতেছিল।
টিকাঃ
৬। আন্দালুস, পৃঃ ২৬।
৭। ডজি, রিচারচেস, ২য় খণ্ড, ১৮১৮, পৃঃ ৩১২; স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৭২৬।
📄 আবু আমর মুসার স্পেন অভিযান
আবদুল মুমিন ১১৪৭ খ্রীঃ যখন আবু আমর মুসাকে ত্রিশ হাজার সৈন্য ও নৌবহরসহ স্পেন অধিকারের জন্য প্রেরণ করেন তখন স্পেনের শহরের পর শহর মুসার আগমনে অভিনন্দন জানায় এবং স্পেনের মুসলমানগণ তাহার সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। বাদাজোজের সেনাবাহিনী ও তাহার সহিত যোগদান করে। সেভিলের মুরাবিতুনগণ ও আত্মসমর্পণ করে। মালগা বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করে। আবু সাঈদ গ্রানাডা অধিকার করেন এবং ভ্যালেন্সিয়ায় শহর রক্ষীদলকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। আবদুল মুমিন জিব্রাল্টার পর্যন্ত অগ্রসর হন, ইহাকে সুরক্ষিত করেন এবং তাহার নতুন বিজিত এলাকায় সেনাধ্যক্ষ নিয়োগ করেন। ১১৬০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে আব্দুল মুমিন আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, ত্রিপলী ও মাহদীয়া পর্যন্ত তাহার রাজ্যের সীমা সম্প্রসারণ করেন। ১১৬৩ খ্রীস্টাব্দে তেত্রিশ বৎসরের সফল ও সুযোগ্য শাসনের পর তিনি দেহত্যাগ করেন।
📄 আবদুল মুমিনের কৃতিত্ব
আবদুল মুমিন শুধু একজন বিখ্যাত যুদ্ধবিশারদ বিজয়ী বীরই ছিলেন না তিনি ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসকও। তিনি প্রতিনিধি পরিষদ ও সাধারণ পরিষদকে একত্রিত করেন। পুরাতন বন্দরসমূহ পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করেন এবং নতুন নতুন বন্দর নির্মাণ করেন। মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিতগণ তাহার প্রাসাদে সমবেত হন। তাহার সাম্রাজ্যের সর্বত্র শিল্প ও সাহিত্যের চরম উৎকর্ষ ও উন্নতি সাধিত হয়। প্রতিটি শহর ও নগরে স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কেবল কিতাবী বিদ্যায় শিক্ষা দেওয়া হইত না বরঞ্চ শিল্প, হস্তশিল্প ও সামরিক বিদ্যাও শিক্ষা দেওয়া হইত। গৃহযুদ্ধ ও খ্রীস্টানদের আক্রমণ স্পেনের বৈষয়িক উন্নতির পথে বাঁধার সৃষ্টি করে।
📄 আবু ইয়াকুব ইউসুফ
মুমিনের মৃত্যুর পর তাহার পুত্র আবু ইয়াকুব ইউসুফ ১১৬৩ খ্রীঃ সিংহাসনে আরোহণ করেন। নতুন রাজা ছিলেন একজন বিখ্যাত সৈনিক ও খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ। তিনি বিশ হাজার সুদক্ষ সৈনিককে স্পেনে প্রেরণ করেন এবং নিজেও সেভিলে অবস্থান করেন। তিনি টলেডো পর্যন্ত বিস্তৃত তাগুস উপত্যকা ও আলকানতারার সীমান্ত ঘাঁটি অধিকার করেন। সেভিলে এক বৎসর অবস্থান কালে তিনি সুরম্য প্রাসাদ, মিনারযুক্ত মসজিদ ও অসংখ্য সেতু নির্মাণ করিয়া ইহাকে সুশোভিত করিতে চেষ্টা করেন। ৯ ১১৮৪ খ্রীস্টাব্দে তাহারা সামতারেন অবরোধ করেন। ইউসুফ সেখানে গুরুতর রূপে আহত হন এবং মুসলমানগণ খ্রীস্টানদের হস্তে চরমভাবে পরাজিত হন।
টিকাঃ
৯। এই মসজিদটি চার্চের পার্শ্বে নির্মিত হয়। মসজিদ নির্মাণের বহু পূর্বে চার্চটি নর্ম্যান কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। খ্রীস্টানদের সেভিল বিজয়ের পর মসজিদটি ক্যাথেড্রালে পরিবর্তিত হয়।