📄 সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য
অনেকে বলেন, এ যুগ হচ্ছে জাতীয়তাবাদের যুগ, জাতিরাষ্ট্রের যুগ। এর মোদ্দা কথা হচ্ছে- একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী লোকজন কিংবা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ধর্ম-নির্বিশেষে একই সংস্কৃতির সাধনা করবে এবং তারই ভিত্তিতে একটি জাতিত্বের ধারণা গড়ে তুলবে। রাষ্ট্র ব্যাপারে কিংবা রাজনীতি ব্যাপারে ধর্মকে জড়িয়ে ফেলা সংগত হবে না। রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচিত হবে রাষ্ট্র পরিচয়ে; ধর্ম পরিচয়ে নয়। রাষ্ট্রের কাজ হবে ধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা-কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রাখা; ধর্মের বিভূতি বর্ধন করা নয়।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে- ধর্মের থেকে রাজনীতিকে পৃথক করা শক্ত, আর সংস্কৃতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেখা গেছে, ধর্ম কখনও কখনও ব্যক্তিমানস ও সমাজের খুব গভীরে পৌঁছে যায়, দেশে দেশে ধর্মই পুরো একটা সংস্কৃতির গতিপথ নির্মাণ করে এবং সেই সংস্কৃতিকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেয়। আমাদের এই উপমহাদেশের ইতিহাস এর বড়ো প্রমাণ। বহু ধর্মমত এ মাটিতে বিকশিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যার দিক দিয়ে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই ভারতের মাটিতে প্রভাব বিস্তার করে এবং ধর্মকে ভিত্তি করে একালে হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঘটে। এই জাতীয়তাবাদের চাপে একসময় ভারতই ভাগ হয়ে যায়। যারা একালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বাড়-বাড়ন্তকে বক্র দৃষ্টিতে দেখেন, তারা ভারতীয় উপমহাদেশের দুই সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের এই ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ তো একদিনের ঘটনা নয়; এমনকি ব্রিটিশ ও জিন্নাহ সাহেবের রাজনীতির ফলাফলও নয়। হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ শুধু রাজনীতিঘটিত নয়; সংস্কৃতিঘটিতও বটে। ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেসের নেতারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে ওপরে ওপরে একধরনের হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যৌথ জাতীয়তাবাদের কথা বলতেন। কিন্তু আদতে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের কাজকর্মে দেখা গেল, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর এক সংস্কৃতিবাদ তথা হিন্দুত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। সেই চেষ্টার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম লীগের তরফ থেকে এলো স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবি।
ভারতের ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ কখনোই ঘটেনি। ন্যাশনালিজম যে তত্ত্বটা, তা কোনোকালেই কোনো সম্প্রদায় গ্রহণ করেনি- না হিন্দু আমলে, না বৌদ্ধ আমলে, আর না মুসলিম আমলে। ন্যাশনালিজম বলতে এখানে বারবরই বুঝিয়েছে- হিন্দু ন্যাশনালিজম বা মুসলিম ন্যাশনালিজম। তার মানে- ধর্ম অনুসারে ন্যাশনালিটির চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে। আমাদের এখানকার কোনো কোনো পণ্ডিত ভারতের ইতিহাস ঘেঁটে একটি যৌগিক সংস্কৃতি ও সমন্বয় পন্থা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু তার বাস্তব কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। আবার অনেকে আছেন ধর্মের বাইরে গিয়ে লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করতে চান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- লোক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে একটা জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে না। তাহলে তো লালন ফকিরের খোল-করতালেই আমাদের জাতীয়তাবাদঘটিত সমস্যার সমাধান ঘটত।
যে ইউরোপ থেকে আমরা সাংস্কৃতিক বহুত্ব (Cultural Pluralism) ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা পেয়েছি, সেখানে কিন্তু বহুত্ববাদী চিন্তা-ভাবনা আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও ধর্ম এক হওয়ার কারণে এক খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতি পুরো ইউরোপকে একধরনের সমজাতীয়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতকাল ইউরোপে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল। এখন সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছে এবং একটি মুসলিম সমাজ গড়ে উঠছে। এই ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজের সাথে সেখানকার খ্রিষ্টানদের এখন ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে। যে সমাজে খ্রিষ্টানরা একচ্ছত্র, সেখানে মুসলমানরা তাদের আত্মপরিচয় বিকশিত করতে চাওয়ার কারণেই এই বিরোধের সূত্রপাত। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্সে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা সেখানকার খ্রিষ্টানদের অসহিষ্ণুতার নমুনা এবং বহুদিনের ইসলাম-বিদ্বেষের ফল বলে মনে হয়।
এতকাল বলা হয়েছে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের ওপর বৈষম্য সৃষ্টি করা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের ধারণার পরিপন্থি। অথচ সেই কাজটিই এখন করা হচ্ছে ফ্রান্সে, যেটি নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। এর থেকে স্পষ্ট হয়, শুধু ঘোষণা দিলেই একটা রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়ে যায় না। অন্যদিকে ধর্মীয় আইডেন্টিটি যে সেক্যুলারিজমকে ছাড়িয়ে যায়, ফ্রান্সের খ্রিষ্টান-মুসলমান বর্তমান সম্পর্ক তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশের মতো দেশে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ কাজ করেনি। এর একটা কারণ হচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সন্দেহ ও তাদের স্বাতন্ত্র্য চেতনা। বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদে হিন্দু-মুসলমানের সমতা ও সমন্বয়ের কথা বলা হলেও ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও ঘটনা পরম্পরায় এই সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ অনেকখানি হিন্দুত্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দিয়েছে হিন্দু সমাজপতি ও বুদ্ধিজীবীরা। ফলে এই সংস্কৃতির যে পাটাতনটি তৈরি হয়েছে, তাতে হিন্দুত্বের প্রবণতাসমূহ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনও বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এখানকার বাঙালিয়ানায় মুগ্ধ বুদ্ধিজীবীরা সেই উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্তীয় প্রেক্ষিতটি আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। বাঙালি সংস্কৃতির এই অসংগত হিন্দুত্বমুখীনতার কারণেই এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং হাল আমলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে তাদের স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। একটা জিনিস বোঝা দরকার, মুসলমানদের জাতীয়তাবাদ কখনোই ইসলামকে অতিক্রম করে নয়। এই কারণেই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ আজতক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ৫০ ও ৬০-এর দশকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরব জাতীয়তাবাদের ঢেউ লেগেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, নেতৃত্বের বাগাড়ম্বর ও দুর্নীতি ছাড়া সেক্যুলারিস্টরা কিছুই দিতে পারেনি। ফলে সেখানে তারা আজ পিছু হটতে শুরু করেছে এবং সেই শূন্যস্থান ভরে ফেলেছে ইসলামপন্থিরা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মনে হয়েছিল তুরস্কের কামালিজম বোধ হয় সেখানে ইসলামের শেষ চিহ্ন রাখবে না। যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও রক্তপাতের ভেতর দিয়ে কামালও চেষ্টা করেছিলেন ইসলামপন্থিদের উত্থান চিরতরে ঠেকিয়ে রাখতে। কিন্তু শতাব্দী শেষে দেখা গেল, কামালের হিসাব-কিতাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রচণ্ড বৈরিতার মধ্যেও তুরস্কে আজ ইসলাম মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস খুব মধুর নয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এটি মুসলিম জনসাধারণের মতামতের বিরুদ্ধে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সর্বত্রই একধরনের সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা সকলের সহাবস্থানের কথা বললেও এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এর পৃষ্ঠপোষকরা সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ধারণা ছুড়ে ফেলেছেন এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বের স্থলে একরৈখিক, মনোলিথিক (Monolithic) চিন্তার প্রশ্রয় দিয়েছেন। এটি সহাবস্থানের বদলে সংঘাতের অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরেও এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল এবং সকল ধরনের ইসলামভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার- একদিকে আমরা বলছি গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় সকলের কথা বলার অধিকার থাকবে, অন্যদিকে আমরা অন্যের রাজনীতিচর্চার ওপর খড়গহস্ত হব! মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার জাতীয়তবাদের গোড়া শক্ত না হওয়ার কারণ এর অযৌক্তিক ও নিষ্ঠুর ধর্মবিরোধিতা। এ কারণেই মুসলমানরা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে ধর্মহীনতার সাথে একার্থক হিসেবে দেখেছে এবং শেষমেষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানের আরেকটা কারণ হচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বত্রই মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে খর্ব করার চেষ্টা করেছে। ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলোকে বাদ দিয়ে ইসলামপূর্ব স্থানিক সংস্কৃতির মধ্যে সেক্যুলারিস্টরা আত্মপরিচয় খোঁজায় বেশি আগ্রহী।
ইসলাম স্থানিক সংস্কৃতির সাথে একধরনের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। প্রয়োজনে ইসলামের মৌলিক প্রবণতার বিপরীতার্থক না হলে এর সদর্থক উপাদানগুলো গ্রহণ করতে রাজি। কিন্তু ঢালাওভাবে ইসলামের সাথে সমন্বয়ের নামে জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি চর্চার পক্ষপাতী নয়। এ ধরনের সমন্বয়বাদিতার কারণে ইসলামের মৌলিক প্রবণতাগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনাকে তাই ইসলাম তার গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। আগেই বলেছি হিন্দুত্বনির্ভর বাঙালি সংস্কৃতি এখানকার বাংলাভাষী মুসলমানকে এক সংস্কৃতিহীনতার দিকে টানছে। এর সাথে তাই ইসলামের সমন্বয় সম্ভব নয়। বাঙালি সংস্কৃতি যদি হয় সকল বাংলাভাষাভাষীর সংস্কৃতি, তাহলে সেখানে বাঙালি মুসলমানের জীবন-ভাবনার প্রতিফলন অবশ্যই থাকতে হবে। কেননা, সংখ্যার দিক দিয়ে তারাই অগ্রগণ্য। বাঙালি সংস্কৃতিতে উনিবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রেক্ষিত ভেঙে ফেলে বাঙালি মুসলমানকে বাঙালিত্বের নতুন একটা প্রেক্ষিত তৈরি করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে বাঙালিত্বের নতুন একটা সংজ্ঞা নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি, ইসলাম হবে যার মেনস্ট্রিম ফিলসফি। ইতিহাস বাঙালি মুসলমানের ওপর বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আশা করা যায়, এই প্রস্তাবিত নতুন সংস্কৃতির পটভূমি ইসলামের বৈশ্বিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্প্রসারিত হবে এবং উনিশ শতকীয় প্রেক্ষাপট ছুড়ে ফেলে নতুন যুগের মুখোমুখি হওয়ার সাধনা করবে।
📄 সংস্কৃতির সীমানা
সংস্কৃতির জগতে নান্দনিকতা ও অশ্লীলতার সীমানা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। কাকে বলব নান্দনিকতা, আর কাকে বলব অশ্লীলতা এই বিতর্কের ফয়সালা আজও সাহিত্যরসিকরা পুরোপুরি করতে পারেননি। এর কারণ হচ্ছে- রসিকজনেরা এই মামলার মীমাংসা করতে চান তাদের নিজের নিজের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে। যার ফলে কোনো ফয়সালাই শেষ পর্যন্ত মূল্যবোধ নিরপেক্ষ হতে পারেনি।
ব্রিটেনে একটা সময় ডি.এইচ. লরেন্সের 'লেডি চ্যাটারলিজ লাভার' বইটিকে অশ্লীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে বইটিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখন আর বইটি বেআইনি নয়। বইটি পেয়েছে প্রথম শ্রেণির উপন্যাসের স্বীকৃতি। নান্দনিকতা ও শ্লীলতা, সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি- এর যে মানদণ্ড, এটি কিন্তু নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধ ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
সেভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। কমিউনিস্টরা যুক্তি দিয়েছিল তার উপন্যাস সমাজ-প্রগতির জন্য বড়ো রকমের বাধা। তেমনি করে বরিস পাস্তারনাক ও আলেক্সান্ডার সোলঝেনিৎসিনের উপন্যাসের ওপরও তারা অনেক কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। কমিউনিস্টরা গোর্কি, মায়াকোভস্কি ও শলোকভের লেখালিখি যেমন করে বিশ্বব্যাপী প্রচার করেছে, টলস্টয় কিংবা তুর্গেনিভের লেখা নিয়ে তেমন কোনো উৎসাহ দেখায়নি। এই কমিউনিজমের যখন পতন ঘটল, তখন কিন্তু একই রাশিয়ায় শোনা গেল ভিন্ন কথা। রাশিয়ার লোকজন অন্য রকম এক মতামত প্রচার করতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, কমিউনিস্টরা রুশ শিল্প-সাহিত্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছে, তার তুলনা একেবারে নেই। তাদের সংস্কৃতি চেতনা ছিল অপসংস্কৃতির প্রকৃষ্ট নিদর্শন। কমিউনিস্টরা মানবমুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করার নামে যত অপকর্ম করেছে, তা আর কেউ করতে পারেনি। তারা শ্রেণি-সংগ্রামের কথা বলে একধরনের বিদ্বেষ প্রচার করেছে এবং একদেশদর্শী মতান্ধ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে।
কমিউনিস্টরা যে মতান্ধ, তার কারণ হচ্ছে- তাদের গুরু মার্কসের ইতিহাসভাষ্য। ইতিহাসে কী ঘটেছে তার সত্যিকার যাচাই-বাছাই না করে শ্রেণি স্বার্থ ও অর্থনীতির ভাষ্য দিয়ে একটা পূর্ব নির্ধারিত ছকে তারা ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সেভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ে আমাদের দেশে এবং এখানকার কিছু বুদ্ধিমান তরুণ মার্কসবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন। এই মতান্ধ মার্কসবাদীরা শ্রেণি-সংগ্রাম দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রচার করেন, ইসলাম হচ্ছে শোষক শ্রেণির ধর্ম এবং এই ধর্ম যাবতীয় সমাজ প্রগতির অন্তরায়।
কমিউনিস্টরা এ অঞ্চলের মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যমুখী আন্দোলন ও কার্যকলাপকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে চিহ্নিত করে; অথচ এরা কখনও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলনকে একইভাবে আক্রমণ করে না। কমিউনিস্টদের এই দ্বিমুখী আচরণ কার্যত একধরনের ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক চেতনার ফল। কমিউনিজমের পতনের পরও বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্র সমাজবাদী গোষ্ঠী চিন্তা-চেতনা লেখালিখিতে নিস্তেজ হয়ে যায়নি। এখনও তারা ইসলামবিদ্বেষ সমানে ছড়িয়ে চলেছে। ইসলামবিরোধী এইসব কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীদের সাথে এখন যুক্ত হয়েছেন একদল সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। এসব সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা প্রায় একচ্ছত্রভাবে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী ও মিডিয়ার জগৎ দখল করে বসে আছেন এবং অনবরত প্রচার করে চলেছেন ইসলাম আর সংস্কৃতি একসাথে চলতে পারে না। এদের আমূল ইসলামবিরোধিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এরা প্রয়োজনে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করতে রাজি, কিন্তু ইসলামকে ঘায়েল করা চাই। তাদের এই অসংগত ইসলামবিরোধিতার মূলে আছে ইসলাম সম্পর্কে তাদের বিপুল অজ্ঞতা ও পাশ্চাত্যের বৈরী প্রচারণা।
ইসলামের মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি আগেও ছিল এবং এখনও আছে। এই শক্তি না থাকলে ইসলামে বিশ্বাসীরা মানুষের ইতিহাসে এত বড়ো সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারত না। মুসলিম সভ্যতার গোড়ায় যে এক নতুন ধর্মবিশ্বাসের প্রেরণা কাজ করেছিল এসব কথা ঐতিহাসিকরা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ইসলামবিরোধিতার সুরটা এসেছে ইউরোপের রেনেসাঁ উদ্ভূত চিন্তা-ভাবনা থেকে। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- ইউরোপের ইতিহাসে খ্রিষ্টান ধর্মের বিবর্তন যেভাবে হয়েছে, মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে ইসলামের বিবর্তন সেরকম হয়নি। ইসলামের ইতিহাসে রেনেসাঁর প্রয়োজন হয়নি। আবার রেনেসাঁর পেছনে যেরকম চার্চ ও পাদরিদের অত্যাচারের ইতিহাস আছে, ইনকুইজিসনের ঘটনা আছে, ডার্ক এজের কথা আছে- ইসলামের ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ইসলামকে বিবেচনা করতে হবে ইসলামের ধারায়। ইসলামকে ইউরোপীয় আয়নায় বিচার করতে গেলে ইসলাম বিশ্বাসীদের প্রতি একধরনের অবিচার করা হবে।
ইউরোপীয় সংস্কৃতির মূলকথা হচ্ছে- ইহজাগতিকতা। মানে এই সংস্কৃতির মূল পরিমণ্ডল হচ্ছে জাগতিক ক্রিয়াকাণ্ডের দ্বারা সীমাবদ্ধ। ইসলাম হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়। মৃত্যুতেই জীবনের শেষ নয়; মৃত্যুর পরেও একটি জীবন আছে এবং সেই জীবনে জবাবদিহি করতে হবে। এই বিশিষ্ট চিন্তা ইসলাম বিশ্বাসীদের একটি নৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে সাহায্য করে। তাই ইসলামি সংস্কৃতি হচ্ছে নৈতিকতাভিত্তিক এবং মানবতামুখী। তাই 'শিল্পের জন্য শিল্প' কথাটা ইউরোপীয় ইহজাগতিকতার ফ্রেমে বন্দি করা গেলেও ইসলামি নীতির আলোকে পুরোপুরি ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। ইসলামের সাথে বরং 'মানুষের জন্য শিল্প' কথাটা বেশি মানানসই। প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী মারমাডিউক পিকথল ইসলামি সংস্কৃতির একটা জুতসই সংজ্ঞা দিয়েছেন: By Islamic culture, I mean not the culture, from whatever source derived, attained at any given moment by people who profess the religion of Islam, but the kind of culture prescribed by a religion of which human progress is the definite and avowed aim.¹
এর মানে হচ্ছে- শিল্প সংস্কৃতি, স্থাপত্য, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যত বড়ো অর্জনই আমরা করি না কেন, তা যদি ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক না হয়, তবে তাকে ইসলামি সংস্কৃতি বলা যাবে না। তাহলে একদিক থেকে বলা যায়- সমাজ থেকে যদি বেইনসাফি, অসহিষ্ণুতা, ভোগবাদী ক্ষয়িষ্ণুতা প্রভৃতি প্রবণতাগুলোকে হটানো না যায়, সমাজের ভেতর যদি তৌহিদের নীতিকে প্রতিষ্ঠা না করা যায়, তবে শুধু কলাচর্চা করে ইসলামের সংস্কৃতির নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে না। এই নীতি কার্যকর করতে হলে চাই কুরআনের মৌলিক নিয়ম-কানুনকে বাস্তব অর্থে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে আভাসিত করে তোলা। এই কার্যকর করার যাত্রাপথে সংস্কৃতি ও কলাচর্চা হচ্ছে একটা মাধ্যম। তাই ইসলামি নীতিতে মাধ্যম কখনও লক্ষ্যের স্থান দখল করে নিতে পারে না।
মারমাডিউক পিকথল তাঁর বিখ্যাত Cultural Side of Islam গ্রন্থে পাশ্চাত্যের ইহজাগতিক সংস্কৃতির সাথে ইসলামি সংস্কৃতির পার্থক্য দেখাতে গিয়ে সেখানকার পত্র-পত্রিকায় বহুল প্রচারিত একটা বিতর্কের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। প্রশ্নটা হলো- একটি ঘরে তুলনাহীন ও অপরিবর্তনযোগ্য একটি প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের সাথে একটি মানবশিশু অবস্থান করছে এবং হঠাৎ করে ঘরটিতে আগুন ধরে গেছে। এ পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র দুটির একটি রক্ষা করা সম্ভব, কোনটি রক্ষা করা উচিত? পিকথল লিখেছেন সেদিন পাশ্চ্যাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞজনেরা ভাস্কর্যটি রক্ষার জন্য জোর দেন। তাদের অদ্ভুত যুক্তি ছিল- এই পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এই ধরনের চিন্তার কথা কোনো মুসলমানের মাথায় আসতেই পারে না। এটি হচ্ছে মূর্তিপূজার আধুনিক সংস্কৃত রূপ। একজন মুসলিম মানুষের সৃষ্ট কোনো কলাশৈলী- তা সে যতই নান্দনিক তাৎপর্যপূর্ণ হোক না কেন- তাতে সে কখনও দেবত্ব আরোপ করতে পারে না। এটি হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা ও মানবজাতির প্রতি তার মহান উদ্দেশ্য অস্বীকৃতির নামান্তর। গ্রিক ভাস্কর্য রক্ষার ইচ্ছা একধরনের নৈরাশ্য লালন করার ফল। কিন্তু ইসলাম নৈরাশ্যের কথা বলে না; বলে প্রত্যয়ের কথা। এ কারণে ইসলামে পার্থিব ও অপার্থিব, সেক্যুলার ও ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে কোনো রকমের ভেদরেখা টানা হয়নি। ইসলাম মানুষকে একটি অবিভাজ্য সামগ্রিক সত্তা হিসেবে দেখে। এ কারণে ইসলামে একই সাথে কুরআন চর্চার কথা বলা হয়েছে। কুরআনে পার্থক্যটা করা হয়েছে ভালো ও মন্দের ধারণা থেকে। এই ভালো ও মন্দের মানদণ্ডটা নির্ধারণ করা হয়েছে মানুষের জন্য কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা অকল্যাণকর সেই হিসেবে।
ইসলামের মধ্যে এসব প্রগতিশীল উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের আধুনিকতাবাদীদের কথা একটাই- ইসলাম এ যুগে অচল। কেননা, এটি মধ্যযুগীয় ধর্মচিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানকালের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সিভিল সোসাইটি, জেন্ডার ইস্যুর মতো ব্যাপারগুলো ঠিক ইসলামের সাথে খাপ খায় না। একালে ইসলামের প্রবক্তারা এসব কথার সাথে একমত হতে পারছেন না। যেমন, ইকবাল ইসলামকে বলেছেন Theocratic Democracy -ধর্মীয় গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র ঠিক দূরবর্তী কোনো ধর্মতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় যে, শুধু প্রার্থনার সময় এর প্রয়োজন পড়বে এবং বাকি সময় এটি বিস্মৃত থাকলেই চলবে। পক্ষান্তরে এটি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত, কার্যক্ষম ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা ও গণতন্ত্র- যা সার্বক্ষণিকভাবে পালন করা চাই। জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে সর্বত্র এর প্রতিফলন থাকতে হবে।
মনে রাখা দরকার, ইসলামকে অন্যান্য অনেক তামাদি হয়ে যাওয়া ধর্মের সাথে তুলনা করলে চলবে না। কারণ, ইসলামে সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতির একটা রূপরেখা আছে- যা অন্য ধর্মে নেই। এর ওপর ভিত্তি করে একালের ইসলামপন্থিরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের একটা বিকল্প পথ আমাদের দেখাচ্ছেন। তারা এটাও বলতে চাইছেন, পশ্চিমি আধুনিকতার বাইরেও ইসলামের নিজের মতো করে আধুনিকতা রূপায়নের একটি বিকল্প শক্তি আছে। সুতরাং ইসলামি সমাজ কোনো বদ্ধজলা নয়। ধর্ম নিয়ে যে আধুনিকতার চর্চা করা যায়, তা একালের ইসলামপন্থিরা দেখিয়ে দিচ্ছেন। ইজতিহাদের প্রক্রিয়াগুলো আবার সচল হয়ে উঠেছে। ইজতিহাদ হলো সময়োপযোগী পরিবর্তনের জন্য যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের নির্দেশ। আমাদের পাশ্চাত্য অনুগত আধুনিকতাবাদীরা ইসলামের ভেতরের এই পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে বুঝে দেখলে তাদের অনেক ভ্রান্তির অবসান ঘটবে।
টিকাঃ
১. Muhammad Marmaduke Pickthall, The Cultural side of Islam. New Delhi: Kitav Bhavan, 1990.
📄 সংস্কৃতির অবক্ষয়
আমাদের সংস্কৃতিতে রুচির যত প্রসার ঘটছে, সেই রুচির স্থূলীকরণ ও কদর্যকরণও যেন ঘটছে একই তালে। এক হিসেবে বলা যায়- এই রুচির স্থূলীকরণ আমাদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের নমুনা। গত পঞ্চাশ কী ষাট বছরে আমাদের সমাজে বিপুল পরিবর্তন এসেছে- যা নজর এড়ানোর নয়। সামাজিক মানুষের মধ্যে নানা রকম সমৃদ্ধির সম্প্রসারণ ঘটেছে, নগরায়ণ হয়েছে, শিল্পায়ন হয়েছে। সুউচ্চ সৌধশ্রেণি, সুসজ্জিত বিপনী নগরীর চেহারাই পালটে দিয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সরব উপস্থিতিও দেখার মতো, বিশেষ করে নারী শিক্ষার অগ্রগতি একালের একটা উল্লেখযোগ্য দিক। দৈনিক ও সাময়িকপত্রের সংখ্যা যেমন ক্রমবর্ধমান, তেমনি পুস্তক প্রকাশনা ও পাঠকের সংখ্যাও একইভাবে বেড়ে চলেছে। চিত্র প্রদর্শনী, সাহিত্য সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, সিনেমা, নাটক,নৃত্যানুষ্ঠানও পরিমাণগতভাবে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি দৃষ্টিগোচর।
আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক চলমানতার এ হচ্ছে বাইরের ছবি। কিন্তু এই চলমানতা যতখানি পরিমাণগত, ঠিক ততখানি গুণগত নয়। এই শ্রীবৃদ্ধি উৎকর্ষতার দিক দিয়ে, মননগত বিচারে কতটুকু জনকল্যাণমুখী- তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। আমাদের সংস্কৃতি জগতের এখনকার একটা দুর্লক্ষণ হচ্ছে- সেসব গ্রন্থ, সাময়িকী, নাটক কিংবা সিনেমা প্রচুর পারিমাণে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে- যা কিনা তুলনামূলকভাবে তরল রসের পরিবেশন করছে। রুচির স্থুলীকরণ সম্ভব হয়েছে বলেই দর্শকসমাজে ও পাঠকসমাজে এই তরল রসের পরিবেশকেরই গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কয়েক দশক আগেও প্রকাশিত পুস্তক-পুস্তিকার সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়, এখনকার প্রকাশনাগুলোতে মননশীলতা ও গভীর জীবনবোধের অভাব কতখানি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, সিনেমা ব্যবসায়ী ও পুস্তক প্রকাশকরা আমাদের জনমানসের এই প্রবণতাগুলো সম্বন্ধে সচেতন এবং এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করতে তারা এতটুকু কার্পণ্য করেন না। সচেতনভাবেই যেন তারা রুচির স্থুলীকরণের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অবস্থার জন্য দায়ী শিল্প-সাহিত্যের ব্যবসায়ীকরণ এবং পুস্তক প্রকাশক ও সিনেমা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য শিল্প সংস্কৃতির সেবা নয়; বরং মুনাফা ও দ্রুত অর্থোপার্জন। দ্রুত মুনাফা অর্জনের নেশায় তারা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে, শিল্প-সংস্কৃতির কোনো মূল্যবোধ তারা মানতে রাজি নন। মননশীল ও গভীর জীবনবোধ আশ্রয়ী পুস্তক-সাময়িকী প্রকাশে তাদের অনীহা সুস্পষ্ট। অথচ সেসব প্রকাশনায় তারা বিনিয়োগ করতে উৎসুক- যা সমাজের জন্য আশু ক্ষতিকর ও উত্তেজক, অথচ বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত উঠে আসার সম্ভাবনায় নিশ্চিন্ত।
সংস্কৃতির জগতের আরেকটা সংকট একই সাথে ঘনীভূত হয়ে উঠেছে তা হলো- সত্যিকার সৃষ্টিশীল প্রতিভার সংখ্যা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সংস্কৃতির জগৎ এখন ভারী করে রেখেছে সৃষ্টিহীন, প্রতিভাহীন কতকগুলো বর্ণচোরা লোক, যারা রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের মতো এই জগৎকেও দলাদলি ও কাদা ছুড়াছুড়ির একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছে। প্রতিভার কাজ হচ্ছে- সৃষ্টিশীল মতবাদ, গভীর জীবনজিজ্ঞাসা ও সূক্ষ্ম মননশীলতার পরিচয় দেওয়া- যা কিনা জাতির ভাবাদর্শের নেতৃত্ব দেবে এবং সংকটে জাতিকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। আমাদের দুর্ভাগ্য- এই রকম প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো নতুন প্রতিভার আবির্ভাব তেমন একটা হচ্ছে না। তাই আমাদের সংস্কৃতি-রুচির স্থুলীকরণও আজ একপক্ষীয় ব্যাপার নয়। প্রতিভার সংকট হেতু মেধাহীন লোকেরা সংস্কৃতির জগৎ দখল করে যেমন একদিকে তরল ও উত্তেজক প্রমোদরসের জোগান দিচ্ছে, তেমনি পুস্তক ও সিনেমা ব্যবসায়ীরাও পূর্ণ উদ্যমের সাথে সেই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে একটি আরেকটি উজ্জীবিত করছে এবং এ দুইটি এখন আমাদের সমাজের বাস্তব ছবি হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতির জগতের এই গভীর সংকটের কারণ হয়তো বহুবিধ, তবে সাম্প্রতিক দুয়েকটি সামাজিক লক্ষণ এর সাথে গভীরভাবে জড়িত বলে মনে হয়। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নানা রকম টানাহ্যাঁচড়ার মধ্যে চলা সত্ত্বেও সমাজের ভেতর একধরনের পরার্থপরতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ সচল ছিল বলা যায়। এই মূল্যবোধ আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকে এবং এটিকেই যুগ যুগ ধরে আমরা লালন করে এসেছি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের পরাজয়, পুঁজিবাদের জয়জয়কার এবং বিশ্বায়নের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উত্থানের ফলে একটি নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং পুঁজিবাদের আবশ্যিক সঙ্গী শোষণ, পীড়ন, বৈষম্য, দুর্নীতি এখন আমাদের দুয়ারে অব্যাহতভাবে হানা দিতে শুরু করেছে। একই সাথে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে সমানতালে। অতীতের তুলনায় আমাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা সমৃদ্ধি এসেছে ঠিক, কিন্তু সেই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য আমরা এখন সব রকমের নৈতিকতা, শোভনতা ও মূল্যবোধকেও পদদলিত করতে রাজি। যেকোনো মূল্যে বিত্তশালী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও মনোবৃত্তি যেকোনো ধরনের নৈতিকতাবিরোধী কাজকর্ম করতেও আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। চোরাচালানী, কালোবাজারী, উৎকোচের মতো পদ্ধতিগুলো এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে এসব আগে সমাজে ঘৃণিত হতো। ঘুষখোর কিংবা মদখোরকে গ্রামের লোক মিলে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করে রাখতেও দেখা গেছে। তার মানে এগুলোর পেছনে সমাজের কোনো অনুমোদন ছিল না এবং এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে সমাজই একটি প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করত। নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সমাজের এই প্রাকৃত বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো আর অবাঞ্ছিত ঠেকছে না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গে পরিণত হয়েছে; বরং এই ঘৃণিত পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করে কেউ যদি বৈষয়িকভাবে সফল হয়, তবে তাকে আর এখন ঘৃণা করা হচ্ছে না। তাকে বলা হচ্ছে বুদ্ধিমান। অন্যদিকে নৈতিক অনুশাসন মেনে চলে কেউ যদি যথেষ্ট লেখাপড়া করেও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়, তবে তাকে বলা হচ্ছে বোকা। নৈতিকভাবে সবল হলেও সামাজিকভাবে সে হয়ে যায় উপেক্ষণীয়, অনাদর ও অবহেলার শিকার। বৈবাহিক সম্বন্ধের বেলায় আগে যেখানে পাত্রের উঁচু নৈতিক চরিত্রকে একটা বড়ো গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেখানে গুণ হিসেবে দেখা হচ্ছে পাত্রের বৈষয়িক সফলতা কতটুকু। পয়সাওয়ালা না হলে শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের খাতির নেই। তার মানে- আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা আকারে-ইঙ্গিতে যেন এটাই বলে দিতে চাইছে- যদি সমাজে মর্যাদাবান হতে চাও, তাহলে পয়সাওয়ালা হও। পয়সা অর্জনের পদ্ধতি এখন দেখার বিষয় নয়; বিষয় হচ্ছে তুমি পয়সার মালিক কিনা।
এই যে নীতিহীন বিত্তপূজা এখন আমাদের সমাজে কায়েম হয়েছে, এর ফলে গুণীর কদর কমে যাচ্ছে। গুণী ব্যক্তির অভাবে সমাজের চিরকালীন মূল্যবোধগুলো একপ্রকার ভেঙেচুরে নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। কারণ, তারাই এসব মূল্যবোধগুলো টিকিয়ে রাখতে ও যুগপৎ চর্চা করতে প্রধান ভূমিকা রাখেন। কিন্তু আজকাল যেহেতু বিত্তের মানদণ্ডে সমাজের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদিত হয়, তাই নৈতিক মানদণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং চতুর্দিকে এক নীতিহীনতার মচ্ছব শুরু হয়েছে। এই নীতিহীনতার সংক্রমণ প্রথম সমাজের উঁচুতলায় ধাক্কা দিয়েছে। সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই প্রথম নৈতিকতাকে ছুড়ে ফেলেছেন এবং যেকোনো প্রকারেই হোক সমাজের কর্তৃত্বকে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছেন। এর প্রভাব সমাজের সব শ্রেণিতে আছড়ে পড়েছে। সমাজের যারা নীচু স্তরে পড়ে আছে, তারা ভাবছে- সমাজের কর্তাব্যক্তিদেরই যখন নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, তখন আমরা খামাখা নৈতিকতার পিছনে দৌড়াতে গিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যর্থতা বরণ করব কোন দুঃখে। এখন নির্মম হলেও সত্য, সামর্থ্য থাকুক আর না থাকুক- জীবনযাত্রার একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছানোর জন্য আমরা একটা ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছি। যেকোনো মূল্যে হোক, তা সে যত ঘৃণিত পদ্ধতি হোক, বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জনই হচ্ছে এখন আমাদের মোক্ষ। বৈষয়িক সমৃদ্ধি অর্জন কোনো অন্যায় ব্যাপার নয়। কিন্তু সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নৈতিক অর্থে আগে যে ধর্ম ও অধর্মের বিভাজনটা ছিল- এখন তা প্রায় অবলুপ্ত হতে চলেছে। তাই কালোবাজারী, ফটকাবাজি, ঘুষ গ্রহণের মতো পদ্ধতি অবলম্বন করেও একালে আমাদের 'ভদ্র' ও 'কালচার্ড' হতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
এই অধপতিত ও কলুষিত মূল্যবোধ থেকে এখন আমাদের সাহিত্য ও শিল্পের জগতের মানুষগুলোও আত্মরক্ষা করতে পারছেন না। যে জগতের মানুষগুলোকে আমরা সাধারণত মননশীল ও সৃজনশীল বলে মনে করে থাকি, যাদের সম্বন্ধে মনে করা হয় বৈষয়িক ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন বা নিরপেক্ষ এবং যাদেরকে নিয়ে সমাজের মননচর্চার কথা ভাবা হয়, তারাই আজ যেন বিকৃত চিন্তা-ভাবনার উপাসক হয়ে উঠেছেন। যেকোনো উপায়ে পয়সাওয়ালা হওয়া ও আখের গোছানোর চেষ্টা করা এবং সেই আকাঙ্ক্ষায় নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন, আদর্শ পরিবর্তন, পরস্পরের স্বার্থে পরস্পরকে পৃষ্ঠপোষণ, অন্ধ দলবাজি এখন কোনো দুর্লভ ব্যাপার নয়। এই কারণেই শিল্প-সাহিত্যের জগতে মৌলিক ও শিল্প মানসমৃদ্ধ কোনো লেখার বা সৃষ্টির দর্শন মিলছে না। উত্তম ও মৌলিক কিছু নির্মাণ বা সৃষ্টি করতে হলে যে সাধনা ও একাগ্রতা দরকার, যে ব্যাপক পঠন-পাঠনের প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে মননধর্মী লেখার জন্য যে ধরনের পরিশ্রম দরকার, সেই পরিশ্রমের যথাযথ ফল ও স্বীকৃতি লেখক যদি না পান, তাহলে তিনি নিরুৎসাহিত হবেন। তিনি যদি দেখেন, মাত্র কয়েকদিনের হালকা পরিশ্রম করে যে অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে আর বহুদিন অধ্যবসায়ের ফলে লিখিত কোনো মননধর্মী ও জীবনধর্মী লেখার ক্ষেত্রে একই রকম অর্থাগম হয় বা স্বীকৃতি মেলে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটুকুও প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকে না, তাহলে কে আর মননধর্মী লেখা লিখতে উৎসাহী হবে! আগেই বলেছি, প্রকাশকরাও মননধর্মী লেখা প্রকাশে আদৌ উৎসাহিত নন। যে সমাজে শ্রম ও সাধনার মূল্য নেই, সেখানে সাধকরাও দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যান কিংবা ধীরে ধীরে তাদের প্রতিভাকেও ব্যবহার করেন স্থূল জৈবিক চাহিদা মেটানোর সহায়ক শক্তি হিসেবে।
আমাদের সমাজে এখন যে নীতি-নৈতিকতাহীন ও রুচিহীন বিত্ত পদ্ধতির প্রসার ঘটেছে, তার ফল হয়তো কেউ কেউ ভোগ করছেন। কিন্তু একটা জিনিস বোঝা দরকার- এই ফল তারা ভোগ করছেন অন্য কাউকে ফল বঞ্চিত করে। সমাজে যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ওপরে উঠার জন্য বা বিত্তশালী হওয়ার জন্য যেকোনো পদ্ধতি সিদ্ধ- তাতে একজনকে বঞ্চিত করেই অন্যজনের পথ সুগম হবে। মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে পায়ে দলে যে সমৃদ্ধি আসে, তাতে যে জটিল চক্রের সৃষ্টি হয় সেই চক্রে পড়ে মানুষের নিগ্রহ ও নিষ্পেষণই বাড়ে। এক নীতিহীনতা আরেক নীতিহীনতার পথ উসকে দেয়। যিনি আজ নীতিহীনতার পথে সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন, তিনি যদি নিজেকে মনে করেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী তবে এর চেয়ে বড়ো বিভ্রম আর নেই। কারণ, কোনো সমাজই প্রতিদ্বন্দ্বী বিরহিত নয়। অন্য একটা নীতিহীনতার ঝড়ে তার অবলীলায় ভেসে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। 'খুনি খুনির হাতেই শেষ হয়ে যায়'- এ ধরনের প্রবচন আমাদের সমাজের দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফল থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের সমাজের বর্তমান অর্থনৈতিক নীতিহীনতা, রাজনৈতিক গোলযোগ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, যৌনবিলাস, সাংস্কৃতিক অধোগতি ও অন্যান্য দুর্লক্ষণগুলো দীর্ঘদিনের ব্যক্তিক ও সামাজিক নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি। ফলস্বরূপ যুগ-যুগান্তরের সামাজিক কাঠামোটিই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সমাজ থেকে ইনসাফ প্রায় উঠে গেছে। এরই ফলে তৈরি হয়েছে সমাজের শ্রেণিতে-শ্রেণিতে বৈষম্য। একজনের হাতে সমৃদ্ধি উপচে পড়ছে, আরেকজন সেই সমৃদ্ধির ছিটেফোটা পাওয়ার জন্য রক্ত পানি করে ফেলছে। আজকে দেশজোড়া যে উগ্রবাদী সন্ত্রাস চলছে, তার উৎস এই বৈষম্যের জমিনেই খুঁজতে হবে। কারণ, বৈষম্যের জমিনই সন্ত্রাসের উর্বরা ক্ষেত্র।
নীতিহীনতা আজ সমৃদ্ধশালী ও সমৃদ্ধিহীন উভয়ের ধর্মে পরিণত হয়েছে। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার হাত থেকে ধনী-দরিদ্র, শোষক-শোষিত কেউ-ই রেহাই পায় না। আমাদের নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সময় থাকতে হুঁশ হওয়া দরকার। সমাজে এখন জরুরি ভিত্তিতে ইনসাফ ফিরিয়ে আনা দরকার। বৈষম্যহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন। নিজেদের আত্মস্বার্থপর চিন্তা-ভাবনা ও সংকীর্ণ দলাদলি ত্যাগ করে যদি তারা এদিকে মনোযোগ না দেন, তাহলে কেউ-ই এই বিশৃংখলার আগুন থেকে রেহাই পাবে না।
📄 সংস্কৃতির সংকট
এক.
বহুকাল ধরে মুসলমান সমাজকে এক হীনম্মন্যতার রাহু কুরে কুরে খাচ্ছে। মুসলমান সমাজের মধ্যে এই যে এভাবে একটা সংকীর্ণতার ভাব আর নানামুখী দারিদ্রের লক্ষণ উঁকি দিচ্ছে তা যেমন একদিকে করুণ, অন্যদিকে আমাদের পরাজয়ী মনোভাবের ইঙ্গিতবহ। বেশ কিছু সময় ধরে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান আর টেকনোলজির জগৎ থেকে পিছিয়ে পড়েছে, তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা ও কর্মশীলতার উত্তাপ নিভে গেছে বললেই চলে। এ কালে মুসলমানরা জগৎসভায় খুব বড়ো কিছু Contribute করতে পারছে বলে মনে হয় না। এ বাস্তবতা আমাদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হলেও সেটি অত্যন্ত তীব্রভাবে সত্য।
অথচ বহুদিন পর্যন্ত মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিকে অগ্রসর ছিলেন এবং আমাদের এই উপমহাদেশেই ইংরেজ, ফরাসি, পর্তুগীজ যেসব পরিব্রাজক সে সময় এসেছে, তারা মুসলমানদের অর্জন দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছে। এটা তো স্বতঃসিদ্ধ কথা- যে সমাজ নতুন কোনো চিন্তাধারা উপস্থিত করতে পারে না, সময়ের হিসাবে সেটা Backward হয়ে যায়। এই Backwardness বা পশ্চাৎবর্তিতা ঠেকাতে তাই প্রয়োজন নতুন নতুন চিন্তাধারা নিয়ে আসা, নতুন নতুন কর্মপদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করে সময়ের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করা। গত প্রায় ৩-৪শ বছর ধরে মুসলমান সমাজে এই সৃষ্টিশীলতার প্রবাহ আটকে গেছে। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের ওপর প্রকৃত দুর্যোগ নেমে আসে ১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে। এই বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যেমন এখানে কলোনির শাসন শুরু হয় এবং কলোনির সুবাদেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার এ দেশীয় বরকন্দাজরা বাঙালি মুসলমান সমাজকে পুরোপুরি ভেঙে-চুরে ওলট-পালট করে দেয়। এর ফলে বাঙালি মুসলমানের ভেতর শিক্ষিত শ্রেণি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আবার এর পাশাপাশি রাষ্ট্রিক বিরূপতার কারণে বাঙালি মুসলমান ব্যবসায়ী, জমিদার ও ধনিকশ্রেণির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে ওঠে। ফল হয় পরবর্তী প্রায় দু'শ বছর ধরে বাঙালি মুসলমানের সামনে আদর্শ সমাজ বলে কিছুই থাকে না। এরকম একটা পরিস্থিতি হীনম্মন্যতার জন্ম দেবে এটাই স্বাভাবিক। বাঙালি মুসলমান চোখ মেলে দেখতে পেল এমন কিছু নেই, যা দিয়ে তারা নিজেরা গর্ব করতে পারে। কারণ তার চারিদিকে তাকিয়ে সে দেখতে পায়, অন্য সমাজের লোক- তারাই শিক্ষিত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর, ধনে ও প্রাচুর্যে প্রতাপশীল। আর এভাবেই তাদের মধ্য শুরু হয় অনুকরণশীলতা। উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিবেশী হিন্দু সমাজ ইংরেজের পৃষ্ঠপোষণায় জেগে উঠল। বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ইংরেজের আমলাতন্ত্রে চাকরি নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তারা প্রতিষ্ঠা পেল। তখনকার বাঙালি মুসলমান সমাজ তাই দেখে মনে করল- এই ভাবে এই পথ ধরে অগ্রসর হতে পারলে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে। ওরা যে আদর্শ মেনে নিয়েছে, সেইটা মেনে নেওয়াই এখন আমাদের বড়ো কর্তব্য। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- এই হীনম্মন্যতা ও অনুকারিতার পথ ধরে সেদিন বাঙালি মুসলমান সমাজে, উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় যে বাবু সংস্কৃতির চর্চা চলত, যা তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত পেয়েছিল, তা অবলীলায় ঢুকে পড়ল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই বাঙালি সংস্কৃতির ভূত আজও আমাদের ছাড়েনি। শুধু বাঙালি মুসলমান নয়; লক্ষ করলে বোঝা যায়- এই হীনম্মন্যতা আজ পুরো মুসলিম দুনিয়াকেই ছেয়ে ফেলেছে। মুসলমানদের একাংশের মধ্যে এরকম একটা চৈতন্য কাজ করছে একালে পাশ্চাত্য দুনিয়া যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও টেকনোলজিতে বহু দূর এগিয়ে গেছে, সুতরাং তাদের আদর্শ ও চিন্তা-ভাবনা অনুকরণ করাই শ্রেয়। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো- কেন মুসলমানের মধ্যে এ ধরনের বিচ্যুতি ও বিকৃতি এলো?
মুসলমানের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, আছে নিজস্ব ইতিহাস ও ট্রাডিশন, আছে নিজস্ব ধর্মবোধ। এসব কিছুই একদিন শুরু হয়েছিল মদিনা থেকে। তারপর এ সংস্কৃতি ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক ঘুরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিকশিত হয়েছে। তা দামেশক, বাগদাদ হোক অথবা স্পেন, তুরস্ক, মিশর, সুদান, মধ্য এশিয়া, উপমহাদেশ বা সুদূর ইন্দোনেশিয়া হোক- সেটা মুসলমানের নিজস্ব কালচার। মুসলিম ঐক্য বা সংহতির মূলে আছে এই বৈশ্বিক মুসলিম কালচার সম্বন্ধে একটা গর্ববোধ। এই বোধটা এ কালের মুসলমানের মধ্যে একেবারে অনুপস্থিত বলা যায়। নিজের তাহজিব-তমুদ্দুন নিয়ে এই গর্ববোধ নেই বলে, নিজের Tradition থেকে একটা বড়ো রকমের ছেদ তৈরি হয়ে যাওয়ার ফলে মুসলমানের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার সেই তুফান বন্ধ হয়ে গেছে বলা চলে। মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলে কোনো সমাজের পক্ষেই নতুনতর কোনো কিছু দেওয়া সম্ভব হয় না।
সেই মূলধারাটা কী? আমাদের যে ক্লাসিকাল ঐতিহ্য, আমাদের যে ক্লাসিকাল ভাষা-সাহিত্য, তার সাথে আমরা একেবারেই যোগ হারিয়ে ফেলেছি। বিশেষ করে এ কথাটা বাঙালি মুসলমানদের জন্য সর্বতোভাবে সত্য। আমাদের আদর্শের ভিত প্রস্তুত হয়েছে সেই মদিনায়। কুরআন- হাদিস হচ্ছে আমাদের আকরগ্রন্থ। এ হচ্ছে আমাদের বিশ্বাস, কনস্টিটিউশন আর ম্যাগনাকার্টা। এগুলোকে বাদ দিয়ে মুসলমান সমাজের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। মুসলমানের এসব বাণী ও আদর্শের বার্তা এসেছে আরবি ভাষার মাধ্যমে, কতকটা ফারসি ও উর্দুর পথ ধরে। বলা চলে- এসবের সাথে আমরা এখন সম্পূর্ণরূপে বিচ্যুত হয়ে গেছি। এসব ভাষার সাথে আমাদের যোগও ছিন্ন হয়ে গেছে। এভাবে এ কালের জেনারেশন বড়ো হয়ে উঠছে নিজের ঐতিহ্যকে না জেনেই। অনেক শিক্ষিত ছেলে আছে, যারা আধুনিক নানা বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেছে কিংবা কারিগরী জ্ঞান লাভ করেছে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- ইসলামের মৌলিক অনেক বিষয় সম্বন্ধেই তারা অনবহিত রয়ে গেছে। কুরআন-হাদিসের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও তাদের নেই। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, পুরো একটা জেনারেশন একটা Tradition gap-এর মধ্যে পড়ে গেছে এবং এই Tradition-টাকে এখানে এখন অনেকে বলছে- একটা বিদেশি জিনিস। সেই কারণেই এখানে এখন অনেকেই সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেছে, তাহলে আমরা কে ও আমাদের Tradition বলে কি কিছুই নেই? এরকম একটা দিক-বিদেশহীন অবস্থায় আমাদের হাত পাততে হচ্ছে, সেই উনিশ শতকের মতো কখনও কলকাতার বাবু সংস্কৃতির কাছে, কখনও পশ্চিমের ধ্যানধারণার দিকে। আমাদের ফিরে যেতে হচ্ছে বঙ্কিমের আদর্শে, শুনতে হচ্ছে রবি ঠাকুর আমাদের আদর্শ। রবি বাবুই আমাদের সবেধন নীলমণি, এর বাইরে আমাদের আর কিছু নেই। মুসলমানের মধ্যে এরকম একটা Tradition gap তৈরি হোক, সেরকম চেষ্টা ঔপনিবেশিক শক্তি সেকালেই করেছিল, একালেও তার ধারাবাহিকতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
রকরম ট্রাডিশন-বিচ্যুত একটা সমাজকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করা যায় এবং এখানকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্যলুপ্তি তাতে সহজসাধ্য হয়ে উঠবে। সে কারণেই এখানকার Education policy-কে বিভিন্ন সময় এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যাতে সেখানে ইসলামি আদর্শের কোনো ছাপ একেবারেই না থাকতে পারে। ভাবটা এমন- মুসলমান শিক্ষিত হোক অসুবিধা নেই, কিন্তু ইসলাম যেন তার বোধে ও মননে আদৌ কাজ করতে না পারে। ঔপনিবেশিক আমলে তো বটেই; উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ে এসেও এখানকার Education policy-কে সর্বতোভাবে ইসলামমুক্ত করার জন্য হাতিয়ার উচিয়ে রাখা হয়েছে। ইসলামি শিক্ষা ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা তো আছেই। এদেশে স্কুল পর্যায়ে আরবি ভাষা বাধ্যতামূলক করার সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নানা রকম যুক্তি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ করুন যুক্তিগুলো কত অদ্ভূত ও অবৈজ্ঞানিক- আরবি একটি বিদেশি ভাষা, এটা শিশুর ওপর চাপিয়ে দিলে শিশুর মনোবিকাশকে ব্যাহত করবে। অথবা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি শিক্ষার চেষ্টাকে বলা হয়েছে এতগুলো ভাষা যদি শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে নাকি শিশুর মনোবৈকল্য ঘটবে।
দুনিয়ার সব ভাষাতাত্ত্বিকরা স্বীকার করেছেন অনেকগুলো ভাষা একযোগে শিখতে কোনোই অসুবিধা নেই এবং ভাষা আয়ত্ত করবার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শৈশবকাল। একই কথার প্রধিতধ্বনি করেছেন একালের আমেরিকার রেডিক্যাল বুদ্ধিজীবী ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রথিতযশা নোয়াম চমস্কিও। অবাক করার বিষয় হচ্ছে- যেসব যুক্তি আরবি ভাষার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে, সেসব কথা কিন্তু ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কখনও শুনিনি। প্রকৃতপক্ষে বাঙালি মুসলমানের ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে সেই ফোর্ট উইলিয়ামের কাল থেকে। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে ফোর্ট উইলিয়ামের পণ্ডিত ও পাদরিরা ছিনতাই করে নিতে চেয়েছিল। উত্তর ঔপনিবেশিককালে এসে বাঙালি মুসলমান জড়িয়ে পড়েছে ভাষার রাজনীতির এক চক্রে। রাজনীতির এই চক্র বাঙালি মুসলমানকে তার ঐতিহ্যের বিরাট বিশ্ব থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। ভাষার রাজনীতি যেমন একদিকে বাঙালি মুসলমানকে তার ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, তেমনি বাকি বিশ্বের সাথে জানাজানির পথকেও করে তুলেছে ক্রমহ্রাসমান। ফলে বাঙালি মুসলমান হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিকভাবে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। এই বিচ্ছিন্নতা তার জন্য নিয়ে এসেছে এক নিরালম্ব হতাশার কাল; যে হতাশা তার কর্মশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা উভয়ই কেড়ে নিয়েছে।
এটা তো ইতিহাসের সত্য, মুসলমানরা বাংলাদেশে আসার পর এখানে তারা একটা উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শ তৈরি করতে পেরেছিল। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তারা যে একটা বড়ো রকমের অবদান রাখতে পেরেছিল তা বলাই বাহুল্য। এটা কী করে সম্ভব হয়েছিল? লক্ষ করলে দেখা যায়- সেকালেও মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ সুলতান বা আলাওলের মতো বড়ো মাপের প্রতিভাবান কবির জন্ম হয়েছিল। এরা বাংলা চর্চা করেছেন, বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছেন। কিন্তু মুসলমান সংস্কৃতি বলতে যা বুঝি- তার থেকে তারা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি কিংবা যে আরবি-ফারসির মাধ্যমে এ দেশে মুসলিম সংস্কৃতির মূল ধারাটা প্রবাহিত হয়ে এসেছে তার সাথে এরা খুব ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন। এরা বাংলার সাথে সাথে আরবি-ফারসির চর্চাও করেছেন, ফলে এরা আমাদের যা দিতে পেরেছেন, তার মূল্য যথেষ্ট। এ ধারার শেষ উজ্জ্বল প্রতিনিধি হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর পক্ষে বড়ো মাপের মৌলিক কাজকর্ম করা সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে, তিনি বাঙালি মুসলমানের এই Cultural Base-টা সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন। সংস্কৃতির জগতের পাশাপাশি সেকালের রাজনীতিবিদরাও মুসলমানের এই ঐতিহ্যের ধরনটা সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলেন না। সেকারণেই আমরা এক সময় নওয়াব সলিমুল্লাহ, ফজলুল হক প্রমুখের মতো রাজনীতিবিদ পেয়েছি- যারা একসময় বাংলার গণজীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই ঐতিহ্যের যোগটা ছিন্ন হয়ে গেছে বলেই কী সংস্কৃতির জগতে, কী রাজনীতির জগতে- সবর্ত্রই একটা বন্ধ্যাত্ব ও ঊষরতার কাল শুরু হয়েছে।
ঐতিহ্যের এই ফলবতী চেহারাটা বুঝতে আমরা একটু ইউরোপের দিকে নজর দিতে পারি। আজকে যারা ইংল্যান্ডে-ফ্রান্সে-জার্মানিতে-ইতালিতে সাহিত্য চর্চা করেন বা এসব ভাষায় বড়ো বড়ো সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন, তাদের সবারই কমবেশি ইউরোপের ক্লাসিকাল সাহিত্য গ্রিক ও ল্যাটিনের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। শেলি, কিটস, ব্রাউনিং থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের তাবত কবিরা তো বরাবরই গ্রিস আর ইতালিকে তাদের মনোরাজ্যে স্বপ্নের আর কিংবদন্তির দেশ বানিয়ে রেখেছেন। এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কালচার, ফ্রান্সের কালচার, ইতালির কালচার বুঝতে হলে গ্রিক-ল্যাটিন ভাষা ও সংস্কৃতির কাছে গিয়ে বুঝতে হবে। এই গ্রিক-ল্যাটিন কালচারের ধারাটা বুঝতে পারলেই একালের ইংল্যান্ড বা ইউরোপের অন্যান্য কালচারের স্বরূপ আমরা বুঝতে পারব। এখন হয়তো অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ইউরোপের সবাই তো আর এই ভাষা জানেন না বা সরাসরি এসব ভাষা চর্চা করেন না। সেটা হয়তো এক অর্থে ঠিক, কিন্তু এই ঐতিহ্যের সাথে তারা সম্পর্কচ্যুত হয়ে যাননি। তরজমার মাধ্যমে এই গ্রিক বা হেলেনীয় কৃষ্টি, কালচার ও দর্শনকে তারা ঠিকই বুঝে নিচ্ছেন। এখনও হোমারের ইলিয়ড-ওডেসি, দান্তের ডিভাইন কমেডি, ভার্জিলের কবিতা কিংবা সফোক্লিসের নাটক যেভাবে ইউরোপের মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি শেক্সপিয়র বা গ্যাটের সাহিত্যও আজ ইংল্যান্ড বা জার্মানির ঐতিহ্য নয়; এটি পুরোপুরি ইউরোপের কমন কালচারের অংশ হয়ে উঠেছে। এই যে কমন ঐতিহ্যের ব্যাপারটা, তার থেকে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে গেছি। কালচারের যে প্রবাহটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের মধ্যে চলে আসছিল, তার যেন হঠাৎ করেই ছেদ পড়ে গেছে। আগেই বলেছি, এখানে ভাষা আন্দোলন-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি বা রাজনীতি এই মুসলিম সংস্কৃতির প্রবাহকে বেশখানি ক্ষুণ্ণ করেছে। এ ছাড়া মুসলিম দেশগুলোতে সেক্যুলার ন্যাশনালিজমের প্রাদুর্ভাবও এই কালচার দুর্বল হয়ে যাওয়ার পেছনে কতকটা দায়ী। আগে আমাদের এখানে বাংলার পাশাপাশি আরবি-ফার্সির চর্চা চলেছে। ধর্মের ভাষা হিসেবে আমরা আরবি পড়েছি। কুরআনের ভাষা হিসেবে এটির মর্ম আমরা বিশেষভাবে বুঝবার চেষ্টা করেছি। সাদি-জামি-রুমির সাহিত্য এ দেশের ঘরে ঘরে পঠিত হয়েছে এবং এর রস আস্বাদন করে বাঙালি মুসলমান আপ্লুত হয়েছে। ইকবাল, গালিবকে আমাদের কখনও পর মনে হয়নি। এইভাবে একই ব্যক্তির মধ্যে বহুভাষার সৃষ্টিশীলতার এক জঙ্গম তৈরি হয়েছে। বাঙালি মুসলমানও এর মধ্যে পেয়েছে আন্তর্জাতিকতার বোধ, এক বিশ্ব মুসলিম মনন ও চৈতন্য এর মধ্যে গড়ে উঠেছে।
এখন এমন অবস্থা এসে দাঁড়িয়েছে আরবি-ফারসির চর্চাটা যেন পুরোপুরি মাদরাসার দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। আরও বিশেষভাবে বললে বলতে হয়, এসব মাদরাসায় যারা ছাত্র হিসেবে আসছে, তারা অনেকটা অর্থনৈতিকভাবে সমাজের নীচুতলার অংশ থেকেই আসছে। ফলে এসব ভাষা বা ঐতিহ্যের সাথে এদের কিছুটা পরিচয় হলেও পুরো সমাজটার ওপর তাদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি হতে পারছে না। ফলে বর্তমান যুগের একটা ছেলে, যে কিনা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এসেছে, তাদের মনে একটা দ্বন্দ্ব বা সংশয় জেগে ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ, একদিকে তাদের আরবি-ফারসির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, ঐতিহ্য সম্বন্ধে তারা একবারেই অজ্ঞ। অন্যদিকে সে যখন নিজস্ব সামাজিক, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দিকে তাকায়, তখন তার জীবনের অনেক ব্যাপারই তার নজরে আসে- যার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা সে এই তথাকথিত বাঙালি কালচারের মধ্যে খুঁজে পায় না। এইভাবে সে নিজের মধ্যে ক্রমাগত এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ টয়েনবি কালচার সম্বন্ধে একটা সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কালচারের একটা সার্কেল (Circle) বা চক্র থাকে। সেটা কী রকম? যেমন আজকের ইউরোপীয় কালচার হচ্ছে একটা পশ্চিম ইউরোপীয় কালচার। তার পেছনে রয়ে গেছে একটা খ্রিষ্টান কালচার, আর তার পেছনে রয়েছে গ্রিক ও রোমান কালচার বা হেলেনীয় কালচার। লক্ষ করুন, একটা হলো হেলেনীয় কালচার, তার মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টান কালচার, তার মধ্যে আবার আছে পশ্চিম ইউরোপীয় কালচার এবং সবশেষে যে কালচারটি রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে ব্রিটিশ কালচার বা ইউরোপের অন্যান্য কালচার। ইউরোপীয় কালচার আমরা কোনোদিনই বুঝতে পারব না; যদি না আমরা এই চক্রটার সামগ্রিক পরিচয় পাই। বাঙালি মুসলমানের কালচারটা বুঝতে গেলেও এরকম একটা চক্রের আশ্রয় আমাদের নিতে হবে। বাঙালি মুসলমানের কালচারের মধ্যে আছে বাংলাদেশের কালচার, তার মধ্যে আছে একটা মুসলমান কালচার, আবার তার মধ্যে আছে আরব-ইরানের কালচার, আরো বিশেষ করে বললে মদিনার কালচার। বাঙালি মুসলমানের কালচারের এই চক্রটা টুটে-ফেটে গিয়েছে কলোনির কালে। ফলে এখন তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে এক ক্রান্তি ও সংকটের মুহূর্ত।
দুই.
বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির মূল প্রবাহটা বিচ্যুত হয়ে পড়েছে- এ কথা আগে বলেছি। এই বিচ্যুতি থেকে উদ্ধার না পেলে আমরা মুসলমান হিসেবে টিকতে পারব না। সেজন্য চাই আমাদের আদর্শের পুনরাবিষ্কার। আমাদের আদর্শ কেমন, আমাদের মূল্যবোধের স্বরূপ, আমাদের জীবনের ধারণা, আমাদের Social structure এগুলো পুরোপুরি জানা চাই। সেটা করতে হলে আমাদের ইতিহাস জানতে হবে, ঐতিহ্য সম্বন্ধেও পুরোপুরি অবহিত হওয়া জরুরি। যিনি লেখাপড়া জানেন, যার মধ্যে জ্ঞান আছে, তিনি মোকাবিলা করতে পারবেন বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বিরুদ্ধে যে ঝড় ধেয়ে আসছে তার। কিন্তু যিনি জানেন না, তিনি কী করে মোকাবিলা করবেন? প্রতিবাদই-বা করবেন কী করে? আসলে এটিই হচ্ছে আমাদের সমস্যা। এই না জানার সমস্যা এখন বাঙালি মুসলমানের কালান্তক রোগে পরিণত হয়েছে। এই অজ্ঞানতার সুযোগে আমাদের যা গিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাই আমরা অবলীলাক্রমে গলধকরণ করে ফেলছি। আমাদের স্কুল-কলেজের বইপত্র, টেক্সট বুক বলে যা চালানো হচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কতখানি তুলে ধরতে পেরেছে? এগুলো দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মগজ ধোলাই শুরু হয়। তারপর আমাদের মিডিয়া- যার পুরোটাই এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে বাঙালি সংস্কৃতির বলয়ের লোকজন, তার প্রভাব তো আছেই। এর কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না এবং এভাবেই একটা জেনারেশন বেড়ে উঠছে যারা তাদের অতীত সম্বন্ধে কিছুই জানে না। অসংখ্য বই দিয়ে দেশটাকে ছেয়ে ফেলা হয়েছে। এর কিছু আসছে কলকাতা থেকে, কিছু এখানেই ছাপা হচ্ছে। এসব বইয়ের একটাই উদ্দেশ্য- কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে সর্বস্তরে পূজনীয় ও আদর্শ স্থানীয় করে তোলা। যেহেতু এর কোনো সবল প্রতিবাদ নেই, তাই এখনকার জেনারেশন ভাবছে- এটাই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং একে সাথে নিয়ে চলায় সুবিধা বেশি। অথচ এরা জানেই না, এর সাথে আমাদের সত্যিকার কালচারের কোনো মিল নেই। আর এভাবেই আমাদের ছেলেরা রবীন্দ্রনাথকে অবধারিত করে নিচ্ছে, কুরআন বাদ দিয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল আরবি নামগুলো বর্জন করে বাঙালিত্বের নামে হিন্দু নাম ধারণ করছে। এভাবে হিন্দুর সভ্যতা ও সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে চলে আসছে।
আজকাল একটা অদ্ভুত জিনিস নজরে পড়ছে। এতকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে নওশা সাধারণত আচকান-পায়জামা ও শেরওয়ানি পরে আসতেন। এখন একটা পরিবর্তন দেখছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নওশা সুট-প্যান্ট পরতে শুরু করেছেন; অন্যদিকে শেরওয়ানি তারা বর্জন করছেন। এ পরিবর্তনটা অনেকের চোখে পড়তেও পারে, নাও পারে, কিন্তু এ পরিবর্তন এক সুদূর প্রসারী ইংগিত দেয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে শেরওয়ানি পরা ছিল আমাদের এখানকার কালচার। সেই কালচারের ভিত নাড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে এখানকার বাঙালিবাদীরা। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয় আমাদের শুনতে হবে বিয়ের অনুষ্ঠানে শেরওয়ানি না পরাটাই আদর্শ, ওটাই বাঙালি কালচার। এই একটা জিনিস স্পষ্ট- আমরা এখন একটা উন্নত মতাদর্শ ও কালচার বাদ দিয়ে একটা নিকৃষ্ট জিনিসকে গ্রহণ করতে যাচ্ছি বাঙালি কালচার নামে। এর প্রতিবাদ জরুরি।
মুসলমানরা যখন এ দেশে আসে তখন তারা এক উন্নত সভ্যতা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। এ কোনো আবেগাচ্ছন্ন উক্তি নয়; এটি সর্ববাদী সম্মত ঐতিহাসিক সত্য। আল-বেরুনির 'কিতাবুল হিন্দ' পড়লে দেখা যায়, মুসলমানরা আসার আগে এখানকার সংস্কৃতি কতদূর অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। নরবলি, সতীদাহ, বর্ণপ্রথা- এগুলো আর যা-ই হোক সভ্যতার অংশ বলা চলে না। বাদশাহ বাবর তাঁর স্মৃতিকথায় একই রকম কথা বলেছেন। বাবরনামা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি: এদেশের কৃষক ও নিম্নশ্রেণির লোকেরা প্রায় উলঙ্গ অবস্থাতেই চলাফেরা করে। অল্প এক টুকরা কাপড় কোনো রকমে মালকোছার মতো পরে তারা তাদের নগ্নতা ঢাকে। এটাকে তারা বলে লেঙ্গুটি। মেয়েদের কাপড়েরও একই অবস্থা। তবে তাদের কাপড় একটু বড়ো। তারা এ কাপড় কোমরেও বাঁধে, আবার একটা দিক মুড়িয়ে ঘোমটাও দেয়।¹
এরকম একটা সংকীর্ণতার জালে আবদ্ধ সমাজে ইসলাম এক পরিচ্ছন্ন ও উদার মানবতাবাদী সংস্কৃতির অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, যার প্রভাব ভারতে বিশেষ করে বাংলার গণজীবনে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। এসব কথা শুধু মুসলমান নয়; হিন্দু ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদেরাও সংকীর্ণতা সত্ত্বেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। একটা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও আমরা বেমালুম আত্মবিস্মৃত হয়ে গেছি, বাছবিচারের ক্ষমতা আমাদের অনেকখানি লুপ্ত হয়েছে এবং অন্যের নিকৃষ্ট মালকে আমরা সংস্কৃতির নামে রীতিমতো আত্মস্থ করে ফেলছি। আমরা যখন বলি, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ, সূর্যসেন-ক্ষুদিরাম আমাদের জাতীয় বীর, তখন আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের দারিদ্র্য ধরা পড়ে। আমাদের আদর্শবোধ ও ধর্মবোধের বেহাল অবস্থার কথা চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করিয়ে দেয় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্কিম-অরবিন্দ-রবীন্দ্রনাথ-সূর্যসেন প্রমুখ সবাই নানা রকম প্রতিভা ও বিদ্যাবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তারা সবাই স্ব-সমাজের জন্য বড়ো রকমের অবদান রেখেছিলেন সন্দেহ নেই। একটা জিনিস লক্ষ করার মতো, ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজের সহযোগিতায় বাঙালি হিন্দুর মধ্যে যে জাগরণ এসেছিল এরা সবাই তাতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে এরা ইউরোপের সংস্পর্শে এলেও সকলেই সেই পুরাতন হিন্দু কালচারকে নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণ হিন্দু সমাজের কাছে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি, যিনি 'মানুষের ধর্ম' নামে এক বই লিখেছিলেন এবং সেখানে উদারমানবতাবাদ চর্চার পক্ষে ওকালতি করেছিলেন, সেই তিনিও শান্তি নিকেতনে প্রাচীন ভারতের আদর্শে প্রাণিত হয়ে তপোবন ও ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তি নিকেতন বা বিশ্বভারতীতে যেসব প্রথা ও পদ্ধতি চালু করা হয়, তা পুরোপুরি প্রাচীন ঔপনিষদিক রীতি অনুসারে করা হয়েছিল। এ জিনিসটাই লক্ষ করার মতো, এই যে এভাবে একজন নিজের কালচারের মধ্যে ফিরে আসছে। কিন্তু আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজের কারও কারও মধ্যে একটা মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়। কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন, হুমায়ুন কবীরের মতো সাহিত্যিকরা বললেন অন্য কথা। তাদের ধারণা ছিল- আমরা বাঙালি। আমরা যে ইসলাম অনুসারী, এই ধর্মটা আমরা গ্রহণ করেছি বাইরের প্রয়োজনে। এটা ছেড়ে দিলেই আমাদের মুক্তির লক্ষ্য অর্জিত হবে। ওদুদ সাহেব তার ‘শাশ্বত বঙ্গ’ বইতে এসব কথাই বলতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তার প্রবন্ধের বাণীগুলো যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে মুসলমান হিসেবে গৌরব করার কিছু থাকে না। এই গৌরবহীনতা ও আত্মহীনতার পথে আজও কেউ কেউ এগুচ্ছেন- এ নিছক আত্মহনন ছাড়া কিছু নয়। আত্মহননের পথে কেউ কি কোনো বড়ো কিছু অর্জন করতে পারে? এরকম নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। এর থেকে ফিরে আসা দরকার। এর জন্য চাই ইতিহাসের চর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা। নতুন করে ইসলাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন। সেই পথেই আসতে পারে আমাদের জাতীয় মুক্তি; অন্য কোনোভাবে নয়।
টিকাঃ
১. জহীর-উদ্দীন মুহম্মদ বাবুর, বাবুরনামা (তরজমা: ইবরাহীম খাঁ)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩।