📄 সংস্কৃতি-চিন্তার সংগতি-অসংগতি
* সংস্কৃতি মানুষকে সুন্দর করে, মানুষের অন্তর্জগতে সুষমা ও সুস্থতা এনে দেয়। অর্থাৎ সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে মানবিক মহিমা ও মহত্বের বিকাশ ঘটে। কিন্তু এমনটা যদি ক্রমে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, সংস্কৃতিচর্চার কারণে মানুষ সুন্দর না-হয়ে আরো অসুন্দর হয়ে উঠছে, মানুষ না হয়ে অমানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে, সংস্কৃতিচর্চার উর্বর ও অনুকূল ক্ষেত্রগুলো অবাধ কার্যকলাপের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে, তা হলে ভয়ের কথা বটে。
* সংস্কৃতি মানে মজা করার জন্য লঘু ও চটুল বিনোদন নয়, সংস্কৃতি হলো একটি জাতির জীবনদর্শনের প্রতিবিম্ব। এইজন্যই সংস্কৃতির মধ্যে একটি জাতির বিশ্বাস ও চৈতন্যের প্রকৃত অভিজ্ঞান জেগে ওঠে। মানুষকে যেমন অন্য কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা চেনা যায় না, চিনতে হয় মুখ দেখে; ঠিক একইরকম, সংস্কৃতি হলো একটা জাতির মুখমণ্ডল। কিন্তু এই মুখমণ্ডল যদি ব্যাধির প্রকোপে কদাকার ও বীভৎস হয়ে ওঠে, সেই বিশাল দুর্ভাগ্যের কোনো সান্ত্বনা নেই। বলা আবশ্যক, আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে সংস্কৃতি, তা আজ কঠিন রোগের আক্রমনে বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
সংস্কৃতির নামে আজ সর্বত্র শিরকের জয়জয়াকার; শিরকই আমাদের সংস্কৃতি-অঙ্গের প্রিয়তম ভূষণ! কোনটা তাওহীদ আর কোনটা তাওহীদ-বিনাশী অংশীবাদ, সেই বোধ পর্যন্ত এখন লুপ্তপ্রায়। গান-কবিতা-নাটক যাই হোক, আমরা বুঝতেই পারছি-না যে, প্রকৃতিমুগ্ধতা আর প্রকৃতিপূজা এক নয়; দেশপ্রেম আর দেশকে মাতৃদেবীরূপে বন্দনা করা এক কথা নয়; নারীর মূল্য ও মর্যাদা আর নারীকে ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য করে তোলা এক বস্তু নয়। বরং তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, একেবারেই হারাম।
আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে এমনভাবে আজ সাজিয়ে নিয়েছি, যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূল নন, ইবলিসই আমাদের একমাত্র পথনির্দেশক পরমতম বন্ধু। বড় আফসোস, সারা দেশ জুড়ে দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ছে ভাস্কর্য ও মূর্তি-সংস্কৃতি; অবাধে প্রসার লাভ করছে বাঙ্গালীয়ানার নামে খোল-করতাল শাঁখা-সিঁদুর মঙ্গলদীপ-রাখীবন্ধনের হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি; ক্রমশই প্রবল প্রতাপে বাঙ্গালী মুসলিম মানসকে অধিকার করে নিচ্ছে বাউল-বিশ্বাসপুষ্ট অন্ধকার দেহবাদ, ফকিরিতন্ত্র, মাজারপূজা, পীরপূজার মত গর্হিত জীবনাচার। বড়ই আফসোস, এইসব নিয়েই আমাদের সংস্কৃতি এখন ষোলকলায় বিকশিত।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতিনিষ্ঠায় সর্বাধিক প্রাণবন্ত উপাদান। এবং এতটাই অপরিহার্য ও প্রাণবান যে, আমাদের কোনো কোনো বেপরোয়া সংস্কৃতিজীবী সগৌরবে ঘোষণা করেন, 'ঈশ্বরকে' অস্বীকার করা সম্ভব কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নয়।
পাঠক আপনি/আমি যদি একজন অভিভাবক হই, তবে হয়তো আমরাও এই সকল কাজকে প্রোমোট করার কাজ করে যাচ্ছি অবচেতন মনেই।
📄 সংস্কৃতির জয়-পরাজয়
চৈত্রের দুপুরে বাঙ্গালী-জননীর হাতের তালপাখার মৃদুমন্দ ব্যজন যেমন সংস্কৃতি, বিসমিল্লাহ বলে খাদ্যগ্রহণ অথবা সুসংবাদ পেলে আলহামদুলিল্লাহ বলাও সংস্কৃতি।
আসলে যে কোনো কারণেই হোক, আজ সংস্কৃতি মানে নৃত্য-সঙ্গীত-কবিতা-নাটক ইত্যাদি। আর এই সকল বস্তু ও বিষয়ের যারা সমঝদার তারাই সংস্কৃতিবান।
অসংখ্য অভিভাবকই এখন এই অভিলাষ পোষণ করে যে, তাদের ছেলেমেয়ে সঙ্গীতশিল্পী/নৃত্যশিল্পীরূপে বিখ্যাত হয়ে উঠুক। এতে এ-ধরনের অভিভাবকেরা শুধু উল্লসিত হয় না, কন্যা কি পুত্রের সাফল্যে তারা তাদের জীবনকে ধন্য ও সার্থক জ্ঞান করে। শুধু খ্যাতি নয়, সংস্কৃতিকর্মীদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থাগমও সহজ হয়ে ওঠে। টাকাটা কোন পথে আসছে, কী হারাতে হচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়; অনেক সহজে অনেক টাকা-যে হাতে আসছে, এটাই বড় কথা। সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য শেষ বিজয়টি হলো, তথাকথিত নান্দনিকতার নামে সংস্কৃতি তার ভক্ত ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছে নিজেকে রীতিমত আরাধ্য বা উপাস্য করে তোলে। এবং এই কারণেই একজন শিল্পী তার গান কি নৃত্য কি অভিনয়কে বিনোদন মনে করে না, মনে করে সাধনা ও তপস্যা।
• সংস্কৃতি এখন আধুনিক মানুষের ধর্মে পরিণত হয়েছে। ধর্ম তার অনুসারীদের নিকট যে আনুগত্য দাবি করে, আধুনিক সংস্কৃতি এখন সেই ধরনের শর্তহীন আনুগত্য পাচ্ছে। উদাহরণত, এমন বহু দুর্ভাগা মুসলিম সন্তান এই সমাজে বিদ্যমান, যারা ইসলাম মানে না, রসূল -এর জীবনাদর্শের প্রতি আগ্রহী নয়, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে রবি ঠাকুরের 'ইবাদত' করে, লালনগীতির মধ্যে ইহকাল পরকালের 'মুক্তি' খুঁজে পায়; এমনকি গাজা-সেবনকেও আধ্যাত্মিক মোক্ষলাভের সহায়ক শক্তি বলে বিবেচনা করে।
• হিন্দু সংস্কৃতির বাহক ভারতের সংস্কৃতিবান গোষ্ঠীরা তাদের সংস্কৃতির পরিচায়ক কথক, ধ্রুপদী, ভারতনাট্যম শেখাতে প্রতিবছর সরকারের বিপুল অর্থব্যয় করে শত শত বাংলাদেশীকে ভারতে নিয়ে যায় তার কারণ কী? কারণ প্রধানত একটাই, বাংলাদেশী মুসলিমদের অন্তর থেকে তাওহিদী চেতনাকে মুছে দিয়ে ভারতপ্রেমের আলপনা এঁকে দেয়া। একেই বলা হয় brain washing। এই বিদ্যা শিখতে যদি দলে দলে বাংলাদেশী হিন্দুরা যান তাতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু মুসলিম ছেলেমেয়েরা গেলে তা চিন্তার বিষয়।
অথচ সরকারী খরচে নয় বরং নিজ খরচেও যদি কেউ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে চান তাহলে কী ঘটে? একজন ছাত্রকে ভারতবর্ষের অন্য যে-কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভর্তি ও বেতন বাবদ দশ গুণ বেশী অর্থ ব্যয় করতে হয় এবং ছাত্রভিসা পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টির একটাই কারণ, অনেক হারানোর পরেও যেহেতু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো কিছুটা তাওহিদী শিক্ষা ও মুসলিম ঐতিহ্য অবশিষ্ট আছে; অতএব সেখানে পাঠ গ্রহণের পথকে যথাসম্ভব দুর্গম করে রাখা আবশ্যক।
জাতীয় কি বিজাতীয় সেটা বড় কথা নয়, কথা হলো, সার্বিক বিচারে কোন জিনিস ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক, নাকি উপকারী? ম্যালেরিয়া বহনকারী মশাও বাংলাদেশের একটি আবহমান কালের 'সম্পদ', কিন্তু যে কোন মূল্যে এই সম্পদকে আমরা উৎখাত করতে চাই। কারণ তা স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। ঠিক এই রকমই, যদি কোনো সংস্কৃতি আমাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে, আমাদের দেশপ্রেম ও আদর্শবোধকে বিপন্ন কি বিপথগামী করে, আমাদের তাওহিদী বিশ্বাস ও আখিরাতের ভয়কে মুছে দিতে চায়, শিল্প কি নান্দনিকতার নামে জীবনকে দায়িত্বহীন ভোগের দাসত্ব করতে শেখায়, আমাদের কল্বকে (আত্মাকে) মৃতে পরিণত করে, সেই সংস্কৃতি জাতীয় হোক বিজাতীয় হোক, অবশ্যই তা ক্ষতিকারক।
📄 সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত গানের উল্লেখ করতে পারি "ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা, তোমাতে বিশ্বময়ী বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা"। এখানে বিশ্বমা হচ্ছে কালিদেবী। কালিদেবী তার শাড়ীর আঁচল মাটিতে বিছিয়ে দিয়েছে আর আমরা তাতে মাথা ঠেকাচ্ছি। মুসলিমরা একবার গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, এই কাজ কি কোন ঈমানদার ব্যক্তি করতে পারে। জীবনানন্দ দাসের একটি বহুপঠিত কবিতা 'আবার আসিব ফিরে'। পুরো কবিতাটিই আমাদের ইসলামী জীবনদর্শনকে মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত করতে চায়। এই কবিতার দুটি পংক্তি: 'আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে, হয়ত-বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে'। এখানেও হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস সে মানুষ আবার পূর্ণজন্ম হয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে আসবে শঙ্খচিল শালিকের বেশে। গানের ও কবিতার এই বিষয়গুলো ইসলামী আকিদার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কেউ কেই এমন কথাও বলে, লালনগীতি বা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু উপাদেয় সঙ্গীতমাত্র নয়, রীতিমত ইবাদত-বন্দেগীর বস্তু (নাউযুবিল্লাহ)।
এখানে যেন আমরা কেউ ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি না করি, যে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাসকে ছোট করা হয়েছে। না, মোটেও তা নয়, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাস সারা পৃথিবীর নিকট সম্মানিত। তারা তাদের ধর্ম ও বিশ্বাস অনুযায়ী ফিলোসফিগুলো তাদের কবিতার মধ্যে প্রকাশ করেছেন, এতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু একজন ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে তাদের সব ফিলোসফি গ্রহণ করা যাবে না, এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তথাকথিত সংস্কৃতি আমাদেরকে এমন করুণ-ক্রীড়নকে পরিণত করেছে যে, আমরা এখন মাজারে-দরগায়-বেদীতে-মিনারে শুধু পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ নয়, পুরো ঈমানটাকেই কুণ্ঠাহীন অনুরাগে বিসর্জন দিয়ে আসছি। আমাদের অন্ত র্দেশ ও আত্মচৈতন্য এতটাই তছনছ হয়ে গেছে যে, আমরা এখন প্রায় জরথ্রুস্টবাদী অগ্নিউপাসকে পরিণত হয়েছি। অনেকের যুক্তি, 'মোমবাতি প্রজ্জলন'-এর মধ্যে শিরকের এমন কী আছে, যে-কারণে একে দোষণীয় বিবেচনা করতে হবে? কিন্তু এই প্রশ্নও-তো স্বাভাবিক যে, এর মধ্যে দেশপ্রেমেরই বা কী আছে? অগ্নিশিখার সম্মুখে শ্রদ্ধাবনত হয়ে নিরর্থক দাঁড়িয়ে থাকার নাম যদি শিরক না-হয়, তাহলে প্রাচীন পারসিকরা-যে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডকে প্রদক্ষিণ করতো, তাকেই-বা কোন যুক্তিতে অংশীবাদ বলা যায়? এবং কোনো দেবী-প্রতিমার সামনে ভক্তিভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই-বা কেন শিরক বা পৌত্তলিকতা বলে গণ্য হবে?
এখানেও ঐ একই বিষয়, আগুনের সামনে বা মোমবাতীর সামনে অন্য ধর্মের লোকেরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা দেখালে বা কোন আনুষ্ঠানিকতা করলে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু ইসলাম বলে মুসলিমরা এই কাজ করতে পারে না কারণ তা তার ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। আগুন নিয়ে একজন মুসলিম কোন আনুষ্ঠানিকতা করতে গেলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এখানেই ভয়। তর্কে না জড়িয়ে আমাদেরকে বিষয়টা খুব গভীরভাবে বুঝতে হবে।
📄 বর্ষবরণ ও আদ্যবর্তী সংস্কৃতিপ্রীতি
আনন্দ খারাপ নয়, কিন্তু শিরক ও অশ্লীলতার সঙ্গে যুক্ত হলে তা খারাপ- তো বটেই, আনন্দ তখন একেবারেই গর্হিত ও হারাম হয়ে যায়। কারো অজানা নয়, পহেলা বৈশাখে ভোর না-হতেই নারী-পুরুষের অবাধ ও উদার মেলামেশার মধ্য দিয়ে রমনায় পান্তা খাওয়ার মহোৎসব শুরু হয়ে যায়। চারুকলা চত্বরে অনেক মেয়েরা তাদের বাহু-পিঠে-গালে উল্কি এঁকে নেবার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, নানা দিকে নানা রঙের মিছিল শুরু হয়ে যায়। আর মিছিল শুধু মিছিল নয়, ঢোল-বাদ্যসহকারে জন্তু জানোয়ারের মুখোশ পরিহিত উদ্ভ্রান্ত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিয়ে সে-এক দৃশ্য।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন বা নববর্ষ বরণের যে ক্রিয়া ও প্রক্রিয়া, তার কোনো একটি বিষয়েও আপত্তি নেই, আপত্তি থাকার কোনো কারণও নেই। শঙ্খধবনি হোক, পান্তাভাতের নৈবদ্য সাজিয়ে অতিথিরূপী নারায়ণ- সেবা হোক, উল্কি অঙ্কন, চন্দন বা সিন্দুর টিপ পরিধান হোক, নৃত্য সঙ্গীত মৃদঙ্গ করতাল ঢোলবাদ্য, উলুধবনি মঙ্গলদীপ, রবীন্দ্রপূজা, প্রকৃতিপূজা যাই-ই হোক, কোনো কিছুতেই অনুমাত্র আপত্তি নেই। বরং আশা করবো, হিন্দু সম্প্রদায় তাদের মতো করে নির্বিঘ্নে আলপনা এঁকে ঘট-সাজিয়ে শঙ্খ বাজিয়ে পহেলা বৈশাখকে নানা আচারে উপাচারে মুখরিত করে তুলুক। এমনকি তাদের কাছে প্রকৃতিপূজা যেহেতু সিদ্ধ; তারা মনে করলে, মঙ্গলদাত্রী বৈশাখী দেবীপ্রতিমা নির্মাণ করে পূজা-অর্চনাও করতে পারে।
কিন্তু ইসলামের আপত্তি শুধু একটি ক্ষেত্রে, এবং তা হলো এই হিন্দু উৎসবে মুসলিম নারীপুরুষের অংশগ্রহণ। কেউ যদি নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবী করে তাহলে সে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কারণ এই কাজগুলো ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক। আকীদা হচ্ছে একজন মুসলিমের বিশ্বাসের ভিত্তি।
হ্যাঁ, মুসলিমরা বৈশাখী মেলায় যেতে পারে এক শর্তে। ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় কাবা ঘরের আশে পাশে অমুসলিমদের মেলা বসত। মুহাম্মাদ ﷺ সেই মেলায় যেতেন দ্বীন ইসলাম প্রচার করার উদ্দেশ্যে। তিনি মেলায় আসা শতশত লোকদের নিকট ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতেন এবং দাওয়াত দেয়ার এটি ছিল একটি উত্তম সময়। তাই বৈশাখী মেলা উদযাপন করার উদ্দেশ্যে নয় বৈশাখী মেলায় গিয়ে অমুসলিমদের নিকট দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া যেতে পারে, সেখানে অন্যান্য দোকনীদের সাথে দাওয়াতী স্টল দেয়া যেতে পারে। অমুসলিম এবং নন-প্র্যাকটিসিং মুসলিমদের মাঝে আল-কুরআনের বাংলা অনুবাদের হাজার হাজার কপি ফ্রী গ্রিফ্ট হিসেবে বিতরণ করা যেতে পারে। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম তার উপর কোন ভাল বইও বিতরণ করা যেতে পারে।
ইসলাম একটি স্বতন্ত্র জীবনদর্শন, একটি সর্বতোমুখী হিদায়াত। এখানে সংস্কৃতি আছে কিন্তু সংস্কৃতিপূজার কোনো অস্তিত্ব নেই; অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকারের কথা আছে কিন্তু মানবপূজা এখানে হারাম। এবং এখানে এমনসব আনন্দকর্ম পুরোপুরি নিষিদ্ধ, যা যৌনতা, বেহায়াপনা, শিরক ও অশ্লীলতার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। অতএব পহেলা বৈশাখ হোক, বর্ষবরণ, বর্ষবিদায় কি প্রকৃতিবন্দনা যা-কিছুই হোক, একজন মুসলিম সর্বদা ও সর্বতোভাবে এই শর্তের অধীন যে, তার তাওহিদী-অভিজ্ঞান যেন এতোটুকু নিষ্প্রভ না হয়, সে যেন কোনোভাবেই শিরকের ফাঁদে জড়িয়ে না পড়ে, তার কর্মকান্ডে যেন বিন্দু পরিমান শিরকের ছোয়া না লাগে।
তথাকথিত সংস্কৃতিপ্রেমীরা বলতে পারে এবং আমরাও তর্কের খাতিরে ধরে নিতে পারি, বর্ষশুরুর প্রাক্কালে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। কারণ, এটা-তো সবারই মনস্কামনা যে, নতুন বছর সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক, সবার জীবন শান্তি ও সুখের সৌরভে আমোদিত করে তুলুক। আসলে এখানেই প্রশ্ন এবং প্রশ্নটি জীবনদর্শনের। কোনো মুসলিম কি একথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে, নববর্ষ বা বৈশাখের আবাহনের মধ্যে কোন মঙ্গল বা কল্যাণ নিহিত আছে! অসম্ভব! সকল শক্তি, ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ; আমাদের সকল চাওয়া, সকল প্রার্থনা একমাত্র তাঁরই কাছে আমরা পেশ করি। এক্ষেত্রে কোনোরকম ব্যতিক্রম ঘটলে অর্থাৎ অন্য কোথাও অন্য কারো কাছে আমরা আমাদের কোনো আরজু যদি নিবেদন করি, সেটা সুস্পষ্ট শিরক, যে শিরকের অপরাধ আল্লাহপাক কখনোই ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। অতএব নববর্ষ উদযাপনের বাহানায় আমাদের পক্ষে মুশরিকী চেতনা উদ্ভুত আনন্দযজ্ঞে শামিল হওয়ার কোনো উপায় নেই।
কেবল মাত্র আল্লাহ যে সকল সময়, দিনক্ষণ, রাত ও মাসকে বরকতময় বলে জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা মুসলিমরা কেবলমাত্র সেই সকল নির্দিষ্ট সময়ে, দিনক্ষণে ও মাসে রসূল ﷺ-এর নির্দেশিত উপায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে বিশেষ বরকত অর্জন করতে পারি।
নববর্ষকে যদি আমাদের জীবনে ফলবান, গ্লানিমুক্ত ও শান্তিময়রূপে দেখতে চাই, তাহলে সেই প্রার্থনা ইসলাম-সম্মতভাবে আল্লাহপাকের কাছেই পেশ করতে হবে। আসলে শয়তান বড় চতুর। আগে আসতো নানা ধরনের অংশীবাদপুষ্ট ধর্মের আলখাল্লা পরিধান করে; এখন আসে, কখনো ধর্মনিরপেক্ষতা, কখনো উদার আবহমান সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে। উদ্দেশ্য একটাই, তাওহিদী উম্মাহকে সত্যভ্রষ্ট করা, পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের সমূহ সর্বনাশ সাধনের পথ প্রশস্ত করা।