📄 জিন্দিক ও মুরতাদের মাঝে পার্থক্য
জিন্দিকের মুরতাদ হওয়া জরুরি নয়। বরং একজন ব্যক্তির মাঝে ইরতেদাদ ও জানদাকা দুটি একসাথে জমা হতে পারে। যেমন, একজন মুসলমান (নাউজুবিল্লাহ) কাদিয়ানি হয়ে গেল। এমনও হতে পারে, কেউ মুরতাদ হলো, কিন্তু সে জিন্দিক নয়, যেমন কেউ ইসলামধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান বা ইহুদি হয়ে গেল, অথবা কোনো ধর্মই গ্রহণ করল না। সুতরাং একজন কাদিয়ানি পারিভাষিকভাবে শুধুই মুরতাদ নয়, বরং একজন জিন্দিক।
এই পার্থক্য উভয় শব্দের মর্ম ও প্রয়োগের বিচারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে উভয় সমান। যেমনইভাবে রিদ্দার পরিবেশের কারণে দ্বীনের ব্যাপারে ঘৃণা ও অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে যায়, যা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক বড় ক্ষতির বিষয়। জিন্দিকের বিষয়টিও তেমনই। বিশেষত যখন সে নিজের জানদাকা ইলহাদের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয় ও উৎসাহিত করে, বরং যদি আরও গভীর থেকে বিষয়টি দেখা হয় তাহলে মুরতাদ থেকেও জিন্দিকের বিষয়টি আরও ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা মুরতাদকে তো মানুষ মুরতাদ হিসাবেই চিহ্নিত করে ফেলে, যার ফলে তাকে ও তার চিন্তাকে ইসলাম ও সত্য বলে আর স্বীকৃতি দেয় না। আর এটা নিয়ে বাড়াবাড়িও করে না। অপরদিকে জিন্দিক ও মুলহিদ বলাই হয় ওই ব্যক্তিকে, যে নিজেকে বাহ্যত মুসলমান ও সঠিক বলে দাবি করে, আবার সাথে কুফরি বিশ্বাস ও চিন্তা লালন করে। আর এটা স্পষ্ট যে, মুরতাদের তুলনায় এমন ব্যক্তির জালে মানুষের ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি।
📄 সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধানের মাঝে পার্থক্যের হেকমত
ইসলামি শরিয়তে সাধারণ কাফের ও মুরতাদের বিধান এক নয়। এই বিষয়ে সাধারণত একটি আপত্তি এই তোলা হয়, এই পার্থক্যের ভিত্তি কী? যেখানে উভয়ই কাফের, সেখানে বিধানগত পার্থক্য কেন? মুরতাদের হত্যার বিষয়টির আলোচনা উঠলে এই প্রশ্ন খুব চাউর হয় এবং একে বিশ্বাসের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক মনে করা হয়।
এই প্রশ্নগুলোর মৌলিক উত্তর হলো, একজন মুসলমান হিসাবে কুরআন-হাদিসের সকল শিক্ষাকে শর্তহীনভাবে মেনে নেওয়া আমার জন্য আবশ্যক। আর কুরআন ও হাদিসে কাফের ও মুরতাদের বিধান আলাদাভাবেই উল্লেখ হয়েছে। এইজন্য আমরাও পার্থক্যের কথা বলি। কুরআন-হাদিস আমাদের বিবেক অনুযায়ী হওয়া জরুরি নয়। এটাও জরুরি নয় যে, শরিয়তের প্রতিটি বিধানের কোনো বাহ্যত কারণ থাকবে আবার সেই কারণ আমাদের বিবেকপ্রসূত হবে। বরং ঈমানের দাবিই হলো যখন কোনো বিধান প্রমাণিত হবে, তখন কোনোরূপ আপত্তি ছাড়াই আমরা তা মেনে নেব।
📄 মুরতাদ হওয়ার হেকমত
এটাই হলো সকল আপত্তির মৌলিক জবাব। এ ছাড়া সাধারণ কাফের আর মুরতাদের বিধানের পার্থক্যের অন্যতম একটি হেকমত এটা বুঝে আসে যে, মুরতাদের সম্পর্ক একসময় ইসলামের সাথে ছিল। সে ইসলামধর্ম স্বীকার করত এবং তাকে নিজের ধর্ম জানত। কোনো বিষয়কে ধর্ম মানার অর্থই হলো তাকে জীবনের সবকিছু থেকে বেশি সম্মান করা। যার কারণে মানুষ নিজের জানমাল সবকিছু কুরবান করে দিতে পারে। এখন কোনো বিশ্বাসকে নিজের ধর্ম হিসাবে কবুল করে নেওয়ার পর তা ছেড়ে দিয়ে বিপরীত কোনো বিশ্বাস মেনে নেওয়ার একটি আবশ্যকীয় অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সম্ভবত তার আগের ধর্মে কোনো দুর্বলতা রয়েছে। নাহলে যে ধর্মের জন্য সে জীবন দিতে প্রস্তুত তা কেন ছেড়ে দেবে!
জ্ঞানী ও অনুসন্ধানী মানসিকতার মানুষদের কাছে কোনো ব্যক্তির এমন আচরণ তেমন প্রভাব সৃষ্টিকারী হবে না। কিন্তু জনসাধারণের জন্য এটা বড় ধরনের বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয় যে, একজনের দেখাদেখি অন্যরাও কোনো দুনিয়ার লোভে পড়ে ঈমান বিক্রি করে বসবে। ইসলাম ত্যাগকারী ব্যক্তি সমাজে যত গ্রহণযোগ্য হবে, ততই তার অনিষ্টতা সমাজকে গ্রাস করতে থাকবে। আর এটা শুধুই ধারণাপ্রসূত বক্তব্য নয়। বরং সমাজের একটি চরম বাস্তবতা। তা ছাড়া ইসলামের শত্রুপক্ষ অতীত ও বর্তমানে এগুলোকে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি কৌশল হিসাবে ব্যবহার করেছে। ইসলামের নেয়ামত থেকে মানুষদের বিরত রাখতে ইহুদিরা যে-কয়টি অপকৌশল ও চক্রান্ত করেছে তার মধ্যে এটা অন্যতম। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন,
وَقَالَت طَائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ ءَامِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ ءَامَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا ءَاخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ.
কিতাবিদের একদল অন্যদের বলছে, তোমরা দিনের শুরুতে তা মেনে নাও যা মুসলমানদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, অতঃপর দিনের শেষে তা প্রত্যাখ্যান করো, হয়তো এতে মুসলমানরা স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে। (১৭৫)
এ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, ইরতেদাদ মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। যদিও এই বিদ্রোহ বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহ নয়, কিন্তু ক্ষতির প্রভাবের দিক থেকে এটি সশস্ত্র বিদ্রোহের থেকেও বেশি ভয়ংকর। এর মাধ্যমে ইসলামের ব্যাপারে অন্তরে সংশয় তৈরি হয়। এজন্য পুরো দুনিয়ায় বিদ্রোহের শাস্তি যেমন মৃত্যুদণ্ড, বিদ্রোহী ব্যক্তি যদি নিজ থেকে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তো মাফ পায়, অন্যথায় তাকে হত্যা করে রাষ্ট্রকে এর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয়, তেমনই ইসলামধর্মেও ইরতেদাদের এটাই শাস্তি—হয়তো সে পুনরায় ইসলামধর্মে ফিরে আসবে, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। তবে ইসলামের মহানুভবতা হলো তার ওপর অতিরিক্ত এই অনুগ্রহ করা হবে যে, তাকে সাথে সাথে হত্যা করা হবে না, বরং প্রয়োজনানুযায়ী চিন্তা-ফিকির করার সময় দেওয়া হবে এবং ইসলামের ব্যাপারে কোনো সংশয়ের কারণে যদি সে ধর্ম ত্যাগ করে থাকে তাহলে তা দূর করার চেষ্টা করা হবে।
টিকাঃ
১৭৫. সুরা আলে ইমরান: ৭২
📄 মুরতাদের সাথে বিভিন্ন প্রকারের সম্পর্ক ও তার হুকুম
কাফেরদের সাথে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ককে আমরা তিন প্রকারে ভাগ করেছিলাম।
১. ধর্মীয় সম্পর্ক। অর্থাৎ বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা রাখা, বিয়েশাদি করা ইত্যাদি।
২. সামাজিকতা প্রদর্শন। যার মাঝে দাওয়াত, মেহমানদারি, পরস্পরকে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য করা, হাদিয়া-তোহফার আদান-প্রদান করা ইত্যাদি সামাজিক বিভিন্ন বিষয়।
৩. ব্যবসায়িক লেনদেন। প্রথম প্রকারের সম্পর্ক তো কাফেরদের সাথে নাজায়েজ। তবে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে আহলে কিতাব নারীদের বিবাহের অনুমতি রয়েছে। যা বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। সৌজন্যমূলক আচরণেরও বিভিন্ন শর্তের সাথে অনুমতি আছে। বাকি ব্যবসায়ী বিষয়ে মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে মূলগত তেমন পার্থক্য নেই। তবে কখনো বহিরাগত কারণে কিছু শর্ত আরোপ হয়, যার আলোচনাও গত হয়েছে।
এটা তো সাধারণ কাফেরদের সাথে বিধান। আর মুরতাদের সাথে বিধানের কিছু মূলনীতি হলো-
ক. প্রথম প্রকার সম্পর্ক অন্য কাফেরদের মতো তার সাথেও নাজায়েজ।
খ. দ্বিতীয় প্রকারের সম্পর্ক সাধারণ কাফেরদের সাথে শর্তসাপেক্ষে জায়েয হলেও হারবি কাফেরদের সাথে জায়েয নয়। আর মুরতাদ মূলত হারবি কাফেরের হুকুমে। একজন হারবির জানমাল যেমন অনিরাপদ, তেমনই একজন মুরতাদের জানমালও অনিরাপদ। এইজন্য সাধারণ অবস্থায় মুরতাদের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক রাখা, তাদের সাহায্য করা, তাদের দাওয়াত কবুল করা বা মেহমানদারি করা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
ইমাম জাসসাস রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৩৭০ হি.) লেখেন,
وهذا يدل على أن علينا ترك مجالسة الملحدين وسائر الكفار عند إظهارهم الكفر والشرك وما لا يجوز على الله تعالى إذا لم يمكننا إنكاره وكنا في تقية من تغييره باليد أو اللسان. (أحكام القرآن ٦٦١/٤، تحت سورة الأنعام، باب النهي عن مجالسة الظالمين)
মুলহিদ আর সকল কাফের-যখন তারা বিভিন্ন শিরকে লিপ্ত হয়, তাদের সাথে ওঠাবসা করা থেকে বিরত থাকা আমাদের জন্য আবশ্যক। যখন আমাদের পক্ষে হাত ও জবান দিয়ে এই অন্যায়ের প্রতিরোধ সম্ভব নয়। (১৭৬)
'উরানিয়্যিনবাসীর' হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৬৭৬ হি.) লেখেন,
قلت قد ذكر في هذا الحديث الصحيح أنهم قتلوا الرعاة وارتدوا عن الإسلام وحينئذ لا يبقى لهم حرمة في سقي الماء ولا غيره وقد قال أصحابنا لا يجوز لمن معه من الماء ما يحتاج إليه للطهارة أن يسقيه لمرتد يخاف الموت من العطش ويتيمم ولو كان ذميا أو يهيمة وجب سقيه ولم يجز الوضوء به حينئذ والله أعلم. (شرح مسلم للنووي ٣٤١/١١، كتاب القسامة والمحاربين والقصاص والديات)
সহিহ হাদিসে উল্লেখ হয়েছে, যখন উরানিয়্যিনবাসী মেষপালকদের হত্যা করে এবং ইসলামধর্ম ত্যাগ করে, তখন আর তাদেরকে পানি পান করানো বা ইত্যাদি কিছুর বৈধতা বাকি থাকে না। আমাদের শাফেয়ي উলামায়ে কেরাম বলেন, কোনো ব্যক্তির কাছে যদি পবিত্রতা অর্জন পরিমাণ পানি থাকে আর এমতাবস্থায় সে কোনো মুরতাদকে পানির পিপাসায় মৃত্যুবরণ করতে দেখে, তাহলে তার জন্য তায়াম্মুম করে সে পানি মুরতাদকে পান করানো জায়েয নেই। অথচ যদি জিম্মي হয় বা কোনো চতুষ্পদ জানোয়ারের এমন অবস্থা হয়, তাহলে তখন তাদেরকে পানি পান না করিয়ে অজু করা জায়েয হবে না। (১৭৭)
টিকাঃ
১৭৬. আহকামুল কুরআন, ৪/১৬৬
১৭৭. শরহে মুসলিম, ১১/১৪৩