📄 স্বপ্নদোষ হলে পবিত্রতার বিধান
ইহতিলাম বা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্য শরীর থেকে বের হয়ে আসা মানবদেহের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এটি গুনাহর কিছু নয়, তবে স্বপ্নদোষ হলে ব্যক্তি অপবিত্র হয় এবং তার ওপর গোসল ফরয হয়। [৪৫]
যদি কেউ স্বপ্ন দেখে এবং এর ফলে অন্তরে খায়েশও জাগে কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো পানি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে গোসল ফরয হবে না। তবে পানি বা কাপড়ে দাগ দেখলে গোসল ফরয হবে, স্বপ্নের কথা মনে থাকুক বা না থাকুক।
আম্মাজান আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঘুম থেকে ওঠার পর ভেজা অনুভব করে, কিন্তু তার স্বপ্নের কথা স্মরণ নেই, তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, তাকে গোসল করতে হবে।” আর ওই ব্যক্তি, যার স্বপ্নের কথা স্মরণ আছে কিন্তু সে কাপড়ে বা শরীরে কোনো ভেজা পায়নি, তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “না, তার জন্য গোসল করা জরুরি নয়। [৪৬]
অর্থাৎ, স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রে বীর্য দৃশ্যমান হওয়াটাই ধর্তব্য। স্বপ্ন দেখা, না দেখা অথবা দেখেছে কি না মনে না থাকা ধর্তব্য নয়। [৪৭]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, مَاءَ الرَّجُلِ غَلِيظٌ أَبْيَضُ وَمَاءَ الْمَرْأَةِ رَقِيقُ أَصْفَرُ
"সাধারণত পুরুষের বীর্য হয় গাঢ় ও সাদা এবং স্ত্রীলোকের বীর্য হয় পাতলা ও হলদে।” [৪৮]
অর্থাৎ, ছেলেদের বীর্য গাঢ় ও সাদা হয়। যদি ঘুম থেকে উঠে এ রকম পানি দৃশ্যমান হয়, তাহলে গোসল ফরয হবে।
টিকাঃ
[৪৫] সহীহ বুখারী- ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩
[৪৬] জামে তিরমিযী- ১১৩; সুনানে আবু দাউদ- ২৪০
[৪৭] সহীহ বুখারী- ১৩০, ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩; আল বিনায়াহ শারহুল হিদায়াহ- ১/৩৩১; বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৭; মাওয়াহিবুল জালীল- ১/৪৪৫; আয যাখীরাহ- ১/২৯৫; আল ক্বাবাস ফী শারহি মুয়াত্তা মালেক ইবনু আনাস, ইবনুল আরাবী- ১/১৭২; আল মাজমূ'- ২/১৪৩; আল হাউই আল কাবীর, মাওয়ারদি আশ শাফেঈ- ১/২১৪; কাশশাফুল কিনা- ১/১৪০; আল মুগনী- ১/১৪৮
[৪৮] সহীহ মুসলিম- ৩১১
📄 রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ
সিয়ামরত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে স্বাভাবিকভাবে রোজা ভাঙে না। [৪৯] তবে এ ক্ষেত্রে সাথে সাথে পানি দিয়ে ধুয়ে তা ফেলতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব গোসল করে ফেলতে হবে। গোসলে দেরি করা অনুচিত।
তবে কেউ যদি জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটায় অর্থাৎ হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বা কোনো কিছুর সাথে ঘষা দিয়ে বীর্য স্খলন করে, তাহলে তার রোজা ভেঙে যাবে [৫০] এবং তাকে এর কাযাও আদায় করতে হবে। তবে যদি বীর্যপাত না হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। উল্লেখ্য যে, রোজা রাখা বা রোজা না-রাখা উভয় অবস্থাতেই হস্তমৈথুন ইসলামী শরী'আতের দৃষ্টিতে একটি নাজায়েয ও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই এ বদভ্যাস থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। এই গর্হিত কাজের কারণে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। [৫১]
উল্লেখ্য যে, যদি কেউ গোপনাঙ্গ স্পর্শ বা কোনো বস্তুর সাথে ঘষা ছাড়া অনিচ্ছাকৃতভাবে কেবল কামভাবের সাথে স্ত্রীর কথা চিন্তা করে বা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বীর্যপাত ঘটায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু রোজাদার রোজার ফজিলত ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে।
قَالَ جَابِرُ بْنُ زَيْدٍ إِنْ نَظَرَ فَأَمْنَى يُتِمُّ صَوْمَهُ عَنْ عَمْرِو بْنِ هَرِمٍ ، قَالَ : سُبِلَ جَابِرُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ رَجُلٍ نَظَرَ إِلَى امْرَأَتِهِ فِي رَمَضَانَ فَأَمْنَى مِنْ شَهْوَتِهَا، هَلْ يُفْطِرُ؟ قَالَ: لَا ، وَيُتِمَّ صَوْمَهُ)
হজরত জাবের ইবনে যায়েদ -কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর দিকে কামভাবের সঙ্গে তাকিয়েছে, ফলে তার বীর্যপাত ঘটেছে। তার রোজা কি ভেঙে গেছে? তিনি বললেন, না। সে রোজা পূর্ণ করবে। [৫২]
টিকাঃ
[৪৯] সুনানে কুবরা বায়হাকি- ৪/২৬৪
[৫০] আল বাহরুর রায়েক- ১/৪৭৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২০৫
[৫১] আলমুহীতুল বুরহানী- ৩/৩৫০; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ- ২/৩৭৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২০৫; আল বাহরুর রায়েক- ১/৪৭৫; ফতোয়ায়ে শামী- ১/১৪২; ফতোয়ায়ে দারুল উলুম- ৬/৪১৭
[৫২] সহীহ বুখারী- ১/২৫৮, হাদীস- ১৯২৮ এর অধীনে ইমাম বুখারী এএ এই হাদীসটি তা'লীক হিসেবে এনেছেন; ফাতহুল বারী- ৪/১৭৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ৬/২৫৯, হাদীস- ১৪৮০
📄 দৈহিক মিলনের পর ফরয গোসল
দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর যৌনাঙ্গে প্রবেশের দ্বারা উভয়ের ওপর গোসল ফরয হয়ে যায়। এতে বীর্যপাত হোক কিংবা না হোক।[৫৩]
أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا جَلَسَ بَيْنَ شُعَبِهَا الْأَرْبَعِ ثُمَّ جَهَدَهَا، فَقَدْ وَجَبَ عَلَيْهِ الْغُسْلُ وَفِي حَدِيثِ مَطَرٍ وَإِنْ لَّمْ يُنْزِلْ
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন, “যখন কেউ তার স্ত্রীর চার হাত-পায়ের মাঝে উপনীত হবে এবং তার সাথে মিলিত হবে তখন তাঁর ওপর গোসল ফরয হয়ে যাবে।” মাত্বার এর হাদীসে “যদিও বীর্য নির্গত না করে” বাক্যটি অতিরিক্ত রয়েছে। [৫৪]
টিকাঃ
[৫৩] সহীহ বুখারি- ২৯১, সহীহ মুসলিম- ৩৪৩
[৫৪] সহীহ মুসলিম- ৩৪৮
📄 চুমু কিংবা স্পর্শের কারণে কামরস নির্গত হওয়া
সামান্য চুমু খাওয়ার পর বা একে অপরকে স্পর্শ করার পর যদি পুরুষের সজোরে বীর্য নিক্ষেপ হয়ে যায়, তাহলে তার গোসল ফরয হবে; কিন্তু এতে স্ত্রীর গোসল ফরয হবে না। আর যদি উক্ত কারণে মযী (المذي) তথা হালকা পানি বা কামরস বের হয়, তাহলে ওই অংশ ধৌত করার পর ওযু করে নিলেই যথেষ্ট হবে। [৫৫]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : هُوَ الْمَنِيُّ وَالْمَذْيُّ وَالْوَدْيُّ فَأَمَّا الْمَذْيُّ وَالْوَدْيُّ فَإِنَّهُ يَغْسِلُ ذَكَرَهُ وَ يَتَوَضَّأُ وَأَمَّا الْمَنِيُّ، فَفِيهِ الْغُسْلُ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "মনী, মযী, ওদী; এর মাঝে মযী এবং ওদী (মযী : পুরুষদের হালকা পানি, ওদী : নারীদের স্রাব) বের হলে গোপনাঙ্গ ধুয়ে ওযু করে নিতে হবে। আর মনী (পুরুষদের বীর্য) বের হলে গোসল করতে হবে.' [৫৬]
১ মনী, মযী ও ওদী-এর মাঝে পার্থক্য
মনী গাঢ় সাদা পানি। এটি পুরুষাঙ্গ থেকে সবেগে সুখানুভূতির সাথে বের হয়। এটি বের হওয়ার পর মানুষ যৌন নিস্তেজতা অনুভব করে। এটিই পুরুষের বীর্য যা থেকে সন্তান হয়। কেউ বীর্যপাত করলে তার ওপর গোসল ফরয হয়, সেটা সংগমের কারণে হোক কিংবা স্বপ্নদোষ বা অন্যান্য কারণে।
মযী মযী হচ্ছে আঠালো ও পিচ্ছিল ঘন পানি। এটি পুরুষাঙ্গ থেকে উত্তেজনাবশত বের হয়ে আসে। তবে এটি সবেগে বের হয় না এবং এটি বের হওয়ার পর নিস্তেজতা আসে না। এটি যে স্থানে লাগে সেই স্থানটি ধৌত করে নিতে হয়। এটি নির্গত হলে গোসল ফরয হয় না, তবে ওযু ভেঙে যায়।
ওদী পুরুষদের ক্ষেত্রে ওদী হচ্ছে, গাঢ় সাদা রঙের পানি যা দেখতে বীর্যের মতো। এটি প্রস্রাব-পায়খানার চাপ বা উত্তেজনার কারণে প্রস্রাবের সাথে পুরুষাঙ্গ থেকে বের হয়। তবে এতে সুখানুভূতি হয় না। এটি অপবিত্র। এটা বের হলে ওযু করতে হয়। গোসল ফরয হয় না।
টিকাঃ
[৫৫] আল হিদায়াহ- ১/৩২; সহীহ বুখারী- ২৬৯; সহীহ মুসলিম- ৩৪৩; আস সুনানুল কুবরা- ১/২৮২, হাদীস- ৪১১; সুনান নাসায়ী- ১/২৩, হাদীস- ১৯৩; ত্বহাবী শরীফ- ২৫৯
[৫৬] ত্বহাবী শরীফ- ২৫৯