📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 ইসমাইল (আ) এর কোরবানী : এক বিরাট পরীক্ষা

📄 ইসমাইল (আ) এর কোরবানী : এক বিরাট পরীক্ষা


আল্লাহর প্রিয় নবী ইবরাহীম (আ) ইরাকের বাদশাহ নমরুদের মূর্তিপূজা ও ইসলাম বিরোধী শাসনের বিরুদ্ধাচারণ করেন। তিনি নমরুদসহ গোটা ইরাকবাসীকে শিরক, বেদআত, কুসংস্কার এবং মানবরচিত মতবাদ ও আইনের পরিবর্তে আল্লাহর আইন মানার দাওয়াত দেন। তিনি তাদেরকে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগে একমাত্র ইসলামী আইন কায়েমের তাগিদ দেন এবং মূর্তিপূজার পরিবর্তে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও তওহীদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু জালেম বাদশাহ নমরুদ ইবরাহীম (আ) এর দাওয়াত কবুল করার পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। শেষ পর্যন্ত নমরুদ তাঁকে বিরাট অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সেই কঠিন পরীক্ষা থেকে উদ্ধার করেন। আল্লাহ আগুনকে বলেন,
قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْداً وَ سَلَاماً عَلَى إِبْرَاهِيمَ .
অর্থ: 'আমরা আগুনকে আদেশ করলাম, হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠাণ্ডা ও নিরাপদ হয়ে যাও।'

আল্লাহর আদেশের কারণে, আগুন ইবরাহীমের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারেনি। কেননা, আগুনসহ সকল সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর হুকুমেই চলে। এর ব্যতিক্রম হচ্ছে শুধু আল্লাহর আইনের কিছু সংখ্যক অবাধ্য মানুষ, যারা আল্লাহর আইন মানেনা। যাক, এটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। তাঁর জীবনের ২য় পরীক্ষা ছিল, নিজের প্রাণপ্রিয় ছেলে ইসমাঈল ও স্ত্রী হাজারকে মক্কার জনমানবশূন্য মরুভূমিতে নির্বাসন দেয়া। অপরদিকে, তাঁর জীবনের ৩য় অগ্নিপরীক্ষা ছিল, ইসমাঈল (আ)-কে কোরবান করার স্বপ্নাদেশ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ - فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيْمٍ - فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّى أرى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرَى - قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ - فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ ، وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا أَبْرَاهِيمُ - قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ - إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلاءُ الْمُبِينُ - وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ - (الصافات - ۱۰۷-۱۰۰)
অর্থ: '(ইবরাহীম আঃ দোয়া করলেন) হে আল্লাহ, আমাকে একটি সন্তান দান করুন! সুতরাং আমি তাকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। যখন পুত্র পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে অর্থাৎ কৈশোরে পৌছল, তখন ইবরাহীম বললেন, হে আমার প্রিয় সন্তান! আমি স্বপ্নে দেখি যে তোমাকে জবেহ করছি। এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি? সে বলল: পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যধারণকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য করলেন এবং ইবরাহীম তাকে জবেহ করার জন্য উপুড় করে শোয়ালেন, তখন আমি ডেকে বললাম: হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই, সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই, এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এর পরিবর্তে জবেহ করার জন্য এক মহান পশু দিলাম।'

উপরে বর্ণিত আয়াতে ইবরাহীম (আ) আল্লাহর কাছে একটি নেক সন্তান কামনা করেছিলেন। সন্তান পাওয়ার পর সে সন্তান কতটুকু নেককার তার পরীক্ষা দরকার ছিল। এজন্য তিনি জবেহর ব্যাপারে ইসমাঈলের মতামত চান। এই পরীক্ষায় ইসমাঈল (আ) পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি সহকারে আল্লাহর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ কার্যকর করার আহ্বান জানান।

ইবরাহীম (আ) জবেহ করার সময়, ইসমাঈল (আ)-কে চিৎ করে না শুইয়ে উপুড় করে শুইয়েছিলেন, যেন জবেহ করার সময় পুত্রের মুখ দেখে স্নেহ ভালবাসার জোয়ারে নিজ হাত কেঁপে না উঠে। সে জন্য তিনি নীচের দিক থেকে ছুরি চালিয়ে জবেহ করতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ইসমাঈল (আ) পিতাকে বললেন, 'আপনি আমাকে শক্ত করে বেঁধে নিন। যাতে করে আমি ছটফট করতে না পারি। আপনার পরনের কাপড় সামলিয়ে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিঁটা তাতে না পড়ে। কেননা, এতে আমার সওয়াব কমে যেতে পারে। এছাড়াও রক্ত দেখলে আমার মা বেশী পেরেশান হবেন। পক্ষান্তরে, আপনার ছুরিটাও ভাল করে ধার দিয়ে নিন, যেন তা আমার গলায় তাড়াতাড়ি চালাতে পারেন এবং দ্রুত আমার প্রাণ বেরিয়ে যায়। কারণ, মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আমার মায়ের কাছে আমার সালাম বলবেন। যদি তাঁর শান্তনার জন্য আমার জামা-কাপড় নিয়ে যেতে চান, নিয়ে যাবেন।' ছেলের মুখে এসব কথা শুনে বাপের মনে স্নেহের যে তোলপাড় শুরু হওয়ার কথা, তা সহজেই অনুমেয়। তা সত্বেও ইবরাহীম (আ) ঈমানের এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় মজবুত পাহাড়ের মত অটল রইলেন এবং বললেন, হে সন্তান, আল্লাহর আদেশ পালনে তুমি আমার উত্তম সহায়ক হয়েছো। তারপর তিনি ইসমাঈলকে চুমু খান এবং অভ্রমাখা চোখে তাকে বেঁধে নেন।

ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে যা দেখেছিলেন, হুবহু তা বাস্তবায়ন করেন। যে মূহূর্তে তিনি ইসমাঈলের গলায় ছুরি চালাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে, আল্লাহ আওয়াজ দিয়ে বলেন, হে ইবরাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেছ এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। এখন ইসমাঈলকে জবেহ করার আর প্রয়োজন নেই, জবেহ করার উদ্যোগ ও প্রস্তুতিই জরুরী ছিল, কেননা, তুমি এটাতো স্বপ্নে দেখনি যে, ইসমাঈলকে জবেহ করেই ফেলেছ এবং তার প্রাণবায়ু তার দেহ থেকে বের করে দিয়েছ। বরং তুমি স্বপ্নে দেখেছ যে, তুমি ইসমাঈলকে জবেহ করছ। এর অর্থ ছিল তুমি জবেহ করার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছ। আল্লাহ ভাল করেই জানেন যে, তোমাকে যদি বলা হয় যে, তাকে জবেহ করেই ফেল তাহলে, তাও তুমি করবে। কেননা, আল্লাহর প্রেমে সিক্ত খলীলের জন্য এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন কিছু নয়।

ইসমাঈল (আ)-কে জবেহ করার এই পরীক্ষা-পর্বের মাধ্যমে, মিল্লাতে ইবরাহীমের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি মুসলমানের অন্তরে, আল্লাহর আদেশ পালনের আগ্রহ এবং জান-মাল ত্যাগ করার শিক্ষাদানই মুখ্য বিষয়। মোমেন ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের জন্য প্রয়োজন হলে, নিজের জান-মাল সর্বস্ব উৎসর্গ করবে।

যাক, তারপর জিবরীল (আ) একটি দুম্বা বা ভেড়া নিয়ে হাজির হন এবং ইবরাহীম (আ) কে ইসমাঈলের পরিবর্তে তা জবেহ করার কথা বলেন। কোরআন এটাকে 'মহান কোরবানী' বলে উল্লেখ করেছে। কেননা এই উপলক্ষে, আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত এই সুন্নাত চালু করে দিলেন যে, প্রতি বছর এই দিবসে সারা দুনিয়ার ঈমানদার লোকেরা পশু কোরবানী করবে এবং আনুগত্য ও ত্যাগের এই স্মারক মহড়ায় অংশগ্রহণ করবে।

নবীদের স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়। সেটাও ওহী। তাই ইবরাহীম (আ) ঐ স্বপ্ন দেখার পর তা বাস্তবায়ন করার প্রস্তুতি নেন। শুধু তাই নয়, ইসমাঈলও (আ) ঐ স্বপ্নকে শুধু স্বপ্ন মনে না করে তাকে আল্লাহর নির্দেশ মনে করে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন এবং জবেহ হওয়ার জন্য পুরো মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ইসমাঈলকে জবেহ করার হুকুমটি কোন ফেরেশতার মাধ্যমেও নাযিল করা যেত। কিন্তু, স্বপ্নের মাধ্যমে উক্ত আদেশের দ্বারা ইবরাহীম (আ) এর আনুগত্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশের সুযোগ দেয়া হল, কেননা, স্বপ্নের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা করার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও ইবরাহীম (আ) নির্দ্বিধায় আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করে দিলেন।

আল্লাহ ইসমাঈল (আ) এর কোরবানীর এই ঘটনা বর্ণনা করে এই দুটো বংশের লোকসহ অন্যান্য লোকদের মধ্যে এই অনুভূতি জাগাতে চান যে, দুনিয়ায় তোমাদের ভাগ্যে যতটুকু মর্যাদা অর্জিত হয়েছে তা সম্ভব হয়েছে আল্লাহর আনুগত্য ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসমূহের কারণে, যা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ) স্থাপন করে গেছেন। আল্লাহ তাদেরকে জানিয়ে দিতে চান যে, আল্লাহ তাদের আদি পিতাদের উপর অন্ধের ন্যায় কোন অনুগ্রহ ও দয়া বর্ষণ করেননি। বরং তাঁরা আল্লাহর সাথে পরিপূর্ণ ঈমান ও আনুগত্যের বাস্তব প্রমাণ পেশ করেছেন। আর এ কারণেই তাঁরা আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার অধিকারী হয়েছিলেন। এখন যে কেউ শুধু তাদের বংশধর হওয়ার কারণেই আল্লাহর রহমত পেতে পারে না। সেজন্য দরকার হচ্ছে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করা।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেছেন,
لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَادِمَاءُهَا وَلكِنْ يَنَالُهُ التَّقوى - (الحج - ٣٤)
অর্থ: 'আল্লাহর কাছে কোরবানীর রক্ত ও গোশত কোনটাই পৌঁছেনা। তাঁর কাছে যা পৌঁছে তা হচ্ছে তাকওয়া।'

ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হলো, তাকওয়া হচ্ছে: 'আল্লাহর সকল আদেশ মানা ও নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত থাকা।' এর সহজ সরল অর্থ হল, ফরজ-ওয়াজিবগুলো মানা এবং হারাম কাজগুলো থেকে বিরত থাকা। তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমেই ইসমাঈল (আঃ) এর কোরবানীর ঘটনা থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 বিশ্বের ইসলামী নেতৃত্বে ইবরাহীম (আ) এর নিযুক্তি

📄 বিশ্বের ইসলামী নেতৃত্বে ইবরাহীম (আ) এর নিযুক্তি


এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে সমগ্র দুনিয়ার ইমাম বা নেতা বানিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলেন,
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَهُنَّ طَ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا .
অর্থ: 'এবং যখন ইবরাহীম (আ) কে তাঁর রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং তিনি সে সকল পরীক্ষা সম্পন্ন করলেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে সকল মানুষের ইমাম বা নেতা নিযুক্ত করছি।' (সূরা বাকারা: ১২৪)

এইভাবে হযরত ইবরাহীমকে (আ) সারা দুনিয়ার নেতৃত্বদান করা হল এবং তাঁকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের নেতা নিযুক্ত করা হল। এখন এই দাওয়াতী আন্দোলনের প্রচার-প্রসারের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ও দেশে তাঁর কিছু সংখ্যক সহযোগী আবশ্যক। এই ব্যাপারে তিন ব্যক্তি হযরত ইবরাহীম (আ) এর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছেন। একজন তাঁর ভাতিজা হযরত লূত (আ), দ্বিতীয় তাঁর বড় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) এবং তৃতীয় হচ্ছেন তাঁর ছোট পুত্র হযরত ইসহাক (আ)। তাঁরা তিনজনই নবী ছিলেন। ভাতিজা হযরত লূত (আ) কে 'সাদুম' (ট্রান্স-জর্দান) এলাকায় বসালেন। এখানে সেকালের সর্বাপেক্ষা লম্পট জাতি বাস করত। তাদের নৈতিকতাহীনতা সর্বনিম্নে পৌঁছে গিয়েছিল। নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের পরিবর্তে পুরুষে পুরুষে সমকামিতার সয়লাব শুরু হয়েছিল। ইরান-ইরাক এবং মিসরের ব্যবসায়ীরা এই পথ দিয়ে যেত। তাদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয়। ছোট পুত্র হযরত ইসহাক (আ) কে তিনি কেনয়ান বা ফিলিস্তিনে বসান। এটি সিরিয়া এবং মিসরের মধ্যবর্তী স্থান। এই স্থান থেকেই হযরত ইসহাক (আ) এর পুত্র ইয়াকুব যার অপর নাম ইসরাইল এবং পৌত্র হযরত ইউসুফ (আ) এর মাধ্যমে মিসরে ইসলামের আহবান পৌছে।

বড়পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) কে মক্কায় বসান এবং পিতা-পুত্র দু'জনে মিলেই মক্কায় মুসলমানদের বিশ্ব ইসলামী কেন্দ্র, কা'বা নির্মাণ করেন। এই খানেই বিশ্বের মুসলমানদের হজ্জের ব্যবস্থা করা হয়। আল্লাহ নিজেই এই কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেছিলেন এবং নিজেই তা নির্মাণের স্থানও নির্ধারিত করেছিলেন। কা'বা শরীফের চারপার্শ্বে মসজিদে হারাম গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এই মসজিদটি সাধারণ মসজিদের মত শুধু নির্দিষ্ট এবাদতের স্থান নয়, প্রথম দিন থেকেই এটি, দ্বীন ইসলামের বিশ্ব আন্দোলনের প্রচার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কা'বা নির্মাণের উদ্দেশ্য হল, পৃথিবীর নিকট ও দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ হতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী সকল মানুষ এখানে এসে মিলিত হবে এবং সংঘবদ্ধভাবে এক আল্লাহর এবাদত করবে। আবার এখান থেকেই ইসলামের বিপ্লবী পয়গাম নিয়ে তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবে। বিশ্ব মুসলিমের এই সম্মেলনের নাম হল হজ্জ। হজ্জ ইসলামের ৫ খুঁটির অন্যতম খুঁটি।

দুনিয়াব্যাপী ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ, প্রচার প্রসার, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের প্রতিরোধ, একামতে দীন তথা ইসলামী আন্দোলন, তাওহীদ এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে নবীকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হল, তাঁর প্রধান কার্যালয় ঠিক করে দেয়া হল মক্কায়। যে যতদূরেই বাস করুক না কেন, মক্কায় এসে উপরোক্ত বিষয়সমূহের উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেয়া হল।

মোটকথা, হযরত ইবরাহীম (আ) ইরাকসহ সর্বত্র যে শিরক, বিদআত, কুসংস্কার, মূর্তিপূজা, মানুষের উপর মানুষের শাসন, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যান্য ক্ষতিকর নিয়ম পদ্ধতি দেখলেন, তার আমূল পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই মক্কায় তাওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্বও আইন-কানুন চালুর জন্য তাঁরই নির্দেশে এই বিশ্ব মুসলিম কেন্দ্র নির্মাণ করেন।

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় জোরহোম গোত্রের শাসন

📄 মক্কায় জোরহোম গোত্রের শাসন


মক্কায় জোরহোম গোত্রের আবাদীর সাথে তাদের শাসন শুরু হয়। তাদের বংশে হযরত ইসমাঈল (আ) বিয়ে করেন এবং তাদের ভাষা আরবী শিখেন। তাঁর বংশধরদেরকে ঐতিহাসিকরা العرب المستعربة বা 'নতুন আরব' বলে অভিহিত করেন। কেননা, জোরহোম গোত্র ও তদানীন্তন ইয়েমেনের আরবরা ছিল মূল আরবী লোক।

হযরত ইসমাঈল (আ) এর ইন্তেকালের পর জোরহোম গোত্রে তাঁর নাতী মোদাদ বিন আমর আলজোরহোমী পর্যন্ত মক্কার শাসন অবশিষ্ট ছিল। জোরহোমীরা পরে দুই শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটি হচ্ছে জোরহোম শাখা আর ২য়টি হচ্ছে কাতুরা শাখা। মোদাদ তাঁর শাখার লোকদেরকে নিয়ে মক্কার উঁচু দিকে এবং কুআইকাআন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস শুরু করেন। অপরদিকে কাতুরা সম্প্রদায়ের প্রধান সুমাইজা' তাঁর শাখার লোকদেরকে নিয়ে জিয়াদ ও মক্কার নীচু দিকে বাস করা শুরু করেন। তবে এক শাখার লোকেরা অন্য শাখার লোকদের বসবাসের এলাকায় আসা-যাওয়া করত না। জোরহোম গোত্র কুআইকাআন, যা আজকে 'জাবালে হিন্দ' নামে পরিচিত, সেই এলাকাসহ উত্তর-পূর্ব দিকে কাসাসিয়া বরাবর মক্কা উপত্যকার উপরিভাগে বাস করত। অপরদিকে, কাতুরা সম্প্রদায়ের লোকেরা জিয়াদের সাদ এলাকা থেকে শুরু করে মেসফালার মুখ পর্যন্ত এলাকায় বাস করা শুরু করে। পরে জোরহোম ও কাতুরা শাখার মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। মোদাদ বিন আমর সুমাইজা'র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খোলা তলোয়ার ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়। শাণিত অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে বের হওয়াকে আরবীতে تقعقع 'তাকা'কা' বলে। এই জন্য তাদের বসবাসের এলাকাকে قُعَيقَعَانُ 'কুআইকাআন' বলা হয়। অপরদিকে, 'সুমাইজা' তার দলবল ও ঘোড়া নিয়ে মোকাবিলার জন্য বের হয়। আরবীতে ঘোড়াকে جیاد 'জিয়াদ' বলা হয়। এজন্য তাদের বসবাসের এলাকাকে জিয়াদ বলা হয়। হযরত ইসমাঈল (আ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর ছেলে সাবেত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মক্কা শহরের শাসক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোদাদ বিন আমর আলজোরহোমী মক্কা শহরের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁরই বংশ থেকে হযরত ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে। পরে যখন জোরহোম বংশের লোক বেড়ে যায় এবং মক্কার পার্বত্য শহরে তাদের সংকুলান কষ্টকর হয়ে উঠে, তখন তাঁদের কিছু লোক বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা যখনই যে শহরে গিয়েছেন, সেখানেই হযরত ইসমাঈল (আ) এর দীনের সঠিক অনুসরণ করার কারণে আল্লাহ তাদেরকে সম্মান দিয়েছেন। ফলে তাঁরা বিভিন্ন জায়গার নেতৃত্ব লাভ করেন এবাং আমালিকা সম্প্রদায়ের লোকদের সেখান থেকে বিতাড়িত করেন। মানুষ চারদিক থেকে কা'বা শরীফের তওয়াফ ও যিয়ারত করতে আসা শুরু করে। ফলে, মক্কা শহরের শাসক হিসাবে জোরহোম গোত্রের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বেড়ে যায়। কেউ তাদের সাথে ঝগড়া-সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয় না। কেননা, এমনিতেই মক্কায় সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বিগ্রহ-নিষিদ্ধ।

পরবর্তীতে ২য় মোদাদ বিন আমরের শাসনামলে, জোরহোম গোত্র আল্লাহর ঘরের মর্যাদা খাটো করে দেখা শুরু করে। তারা বড় ধরনের গুনাহ ও অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ২য় মোদাদ বিন আমর, নিজের সম্প্রদায়ের লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে এক বক্তৃতায় বলেন, “হে আমার জাতি, তোমরা বিদ্রোহকে ভয় কর। কেননা, জালেম বিদ্রোহীরা ধ্বংস হতে বাধ্য। তোমরা দেখেছ তোমাদের আগে আমালিক সম্প্রদায়ের লোকেরাও হারাম এলাকার মর্যাদাকে খাটো করে দেখার কারণে তাদের মর্যাদা কমে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে পারস্পরিক লড়াই-ঝগড়া শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল। আল্লাহ তাদের উপর তোমাদেরকে বিজয়ী করেছেন, তোমরা তাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দিয়েছ। তারা বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কোন সম্মান নেই। এই শহরে ও হারাম শরীফের প্রতি সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে কিংবা কেউ যদি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে তাদের উপর জুলুম করো না। যদি তা কর, তাহলে আমি তোমাদেরকে এখান থেকে বেইজ্জত হয়ে, বিতাড়িত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছি। ফলে তোমাদের কেউ এই হারাম কিংবা বাইতুল্লাহর কাছেও আসতে পারবে না। অথচ এটা তোমাদেরসহ সকলের জন্য, এমনকি পশুপাখীর জন্য নিরাপদ এলাকা।" এই বক্তৃতার জবাবে তাঁর সম্প্রদায়ের 'ইয়াজদা' নামক এক ব্যক্তি বলেন, "কে আমাদেরকে এই শহর থেকে বিতাড়িত করতে পারে? আমরা কি সমস্ত আরবদের মধ্যে বেশী অস্ত্র ও অর্থের অধিকারী নই?" এর জবাবে ২য় মোদাদ বলেন, "যখন ঐ রকম অবস্থা সৃষ্টি হবে তখন তোমার এ সকল ধ্যান-ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে।"

📘 মক্কা শরিফের ইতিকথা > 📄 মক্কায় খোজাআ’ গোত্রের শাসন

📄 মক্কায় খোজাআ’ গোত্রের শাসন


জোরহোম গোত্র মক্কায় পাপাচার শুরু করে, বহিরাগত লোকদের উপর জুলুম-নির্যাতন আরম্ভ করে, কা'বা শরীফের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত উপহার সামগ্রী ভোগ করা শুরু করে এবং কাবা শরীফের ভেতরে জেনা-ব্যভিচারের সূচনা করে। তখন আল্লাহ তাদের উপর ইয়েমেনের কাহতান সম্প্রদায়ের 'খোজাআ' বংশকে বিজয়ী করেন এবং জোরহোম গোত্রকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। এই ঘটনা ৩ শত খৃষ্টাব্দের শেষ কিংবা ৪শ' খৃস্টাব্দের প্রথমে সংঘটিত হয়।

আমর বিন মাউসামা প্রখ্যাত কবি ইমরাউল কায়েসের বংশধর এবং কাহতানী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তিনি দক্ষিণ আরবের অধিবাসী ছিলেন। প্রখ্যাত আরম বন্যার কারণে তিনি ও তাঁর বংশের লোকেরা নিজ এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। যেখানেই তাঁরা গিয়েছেন সেখানেই তারা স্থানীয় লোকদের উপর বিজয়ী হয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁরা উত্তম-জায়গার তালাশে মক্কা আসেন। তাঁরা মক্কার শাসক ২য় মোদাদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহবান জানান। কিন্তু মোদাদ তা অস্বীকার করেন। ফলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে জোরহোম গোত্র পরাজিত হয় এবং দেশত্যাগী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ জীবিত নেই। তখন থেকেই মক্কায় 'খোজাআ' গোত্রের শাসন শুরু হয়। নতুন শাসকদের কাছে বনী ইসমাঈলরা আসে এবং মক্কায় থাকার অনুমতি চায়। ২য় মোদাদের ছেলে হারেসের পক্ষে মক্কা ত্যাগ করা খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনি পুনরায় মক্কায় বাস করার আগ্রহ নিয়ে 'খোজাআ' গোত্রের কাছে অনুমতি চান। খোজাআ গোত্র অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। 'খোজাআ' গোত্রের আমর বিন লুহাই মক্কার শাসক নিযুক্ত হন। তিনিই প্রথম মক্কায় মোটা-তাজা উট জবাই করে এর সুরুয়ার সাথে রুটি মিশ্রিত করে প্রখ্যাত আরব খাবার 'সারীদ' তৈরি করে হাজীদেরকে খাওয়ান এবং প্রত্যেক হাজীকে ইয়েমেনের তৈরি ৩টি চাদর উপহার দেন। তিনিই পরবর্তীতে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে বিভিন্ন কুসংস্কার চালু করেন, কা'বাঘরের চতুষ্পার্শ্বে মূর্তি বসান এবং সুদূর ইয়েমেন থেকে অভিশপ্ত হোবল দেবতাকে এখানে নিয়ে আসেন। এখানেই কোরাইশ ও আরবরা তীর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করত। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর দীনের বিকৃতি সাধন করেন।

আমর বিন লুহাই ও তাঁর বংশধররা ৫শ' খৃস্টাব্দ পর্যন্ত কা'বা শরীফের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তারা কা'বা শরীফের কোনকিছু নষ্ট করেনি এবং এতে কোন সংস্কার বা নতুন নির্মাণও করেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00