📄 তাকলীদ-এর উত্থান
এ যুগের বিশেষজ্ঞগণ সব ধরনের ইজতিহাদ পরিত্যাগপূর্বক এর দরজাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সর্বসম্মতিক্রমে একটি আইন জারি করেন। তাঁরা যুক্তি উপস্থাপন করেছেন যে, ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সকল সমস্যার আলোচনা করে তার সমাধান বের করা হয়ে গিয়েছে। অতএব, নতুন ইজতিহাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই。(১) এই পদক্ষেপের ফলে মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে একটি নতুন ধারণার জন্ম নেয়। আর তা হলো, কোনো ব্যক্তির ইসলাম চর্চা বৈধ হতে হলে তাকে অবশ্যই চারটি মাযহাবের যে কোনো একটির অনুসরণ করতে হবে।
সময় পরিক্রমায় এ ধারণাটি সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞ মহল— উভয় শ্রেণির মধ্যেই বদ্ধমূল হয়ে যায়। এর ফলে, গোটা ইসলামি জীবনব্যবস্থা বিদ্যমান চারটি মাযহাবের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রত্যেকটি মাযহাবকে ঐশীভাবে নির্দেশিত ইসলামেরই এক একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। এসব মাযহাবের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এদের সবগুলোকেই সম্পূর্ণ সঠিক ও সমমানের ধরে নেওয়া হয়। এমনকি এ যুগে কোনো কোনো ‘আলিম নাবি-এর কিছু হাদীসকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যেন তিনি নিজেই ইমাম ও তাঁদের মাযহাবের আবির্ভাবের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ফলে প্রতিষ্ঠিত চারটি মাযহাবের বাইরে যাওয়াকে ধর্মত্যাগের সমতুল্য অপরাধ মনে করা হতো।
কেউ মাযহাব মানতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ধর্মত্যাগী হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। এ পর্যায়ের অতি-সংরক্ষণশীল ‘আলিমগণ আরও একধাপ এগিয়ে রায় দিয়েছিলেন যে, নিজ মাযহাব পরিবর্তন করে অন্য মাযহাবে প্রবেশ করার দায়ে কোনো ব্যক্তি ধরা পড়লে স্থানীয় বিচারকের ফয়সালা অনুযায়ী তিনি তাকে যেকোনো ধরনের শাস্তি দিতে পারেন।
হানাফি 'আলিমগণ হানাফি মাযহাব অনুসারীদের সাথে শাফি'ই মাযহাবের অনুসারীদের বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এমনকি ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাতও মাযহাবি গোঁড়ামি থেকে মুক্তি পায়নি। এক মাযহাবের অনুসারীরা অন্য মাযহাবের ইমামের পেছনে সলাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করে। একাধিক মাযহাবের অনুসারী বসবাস করে এমন এলাকার মাসজিদগুলোতে (৪) সলাতের পৃথক পৃথক মিহরাব (ইমাম দাঁড়ানোর স্থান) তৈরি করা হয়। সিরিয়ার সুন্নি মুসলিমগণ হানাফি অথবা শাফি'ই মাযহাব অনুসরণ করতেন। এখনও সেখানে একাধিক মিহরাব বিশিষ্ট এ ধরনের মাসজিদ দেখা যায়।
এমনকি মুসলিম জাতি ও ইসলামের ঐক্যের প্রতীক আল-মাসজিদ আল-হারাম-এও এর প্রভাব পড়েছিল। কা'বাহ চারপাশে প্রতিটি মাযহাবের জন্য একটি করে পৃথক মিহরাব তৈরি করা হয়। সলাতের সময় হলে এক মাযহাবের ইমাম এসে তাঁর মাযহাবের অনুসারীদের সালাতে ইমামতি করতেন। তারপর আরেকজন ইমাম এসে নিজ মাযহাবের অনুসারীদের সালাতে ইমামতি করতেন, আর এভাবেই চলতে থাকত। উল্লেখ্য যে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত কা'বাহর চারপাশে প্রত্যেক মাযহাবের জন্য পৃথক মিহরাবের ব্যবস্থা ছিল। এরপর ১৩৪২ হিজরিতে (১৯২৪ সালে) 'আব্দুল-আযীয ইবন সা'উদ মাক্কা জয় করে মাযহাব নির্বিশেষে সকল সালাত আদায়কারীকে একজন ইমামের পেছনে সলাত আদায় করতে একতাবদ্ধ করেন।
টিকাঃ
(১) কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ।
(২) মুহাম্মাদ হুসাইন আয-যাহাবি, আশ-শারি‘আহ আল-ইসলামিয়্যাহ, মিশর, দাঁর আল-কুতুব আল-হাদীস, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬৮, পৃ. ১২।
(৩) মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানি, সিফাহ সলাত আন-নাবি, (বৈরুত, আল-মাকতাব আল-ইসলামি, নবম সংস্করণ, ১৯৭২), পৃ. ৫১।
(৪) মাসজিদ হলো সলাতের স্থান। আরবিতে বহুবচনে একে মাসাজিদ বলা হয়।
📄 তাকলীদ-এর কারণগুলো
তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ অবশ্যই ইত্তিবা' তথা যুক্তিসংগত অনুসরণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের পূর্বসূরীদের সিদ্ধান্তগুলো মেনে চলার নীতিটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি নীতি। বস্তুত, প্রথম যুগের 'আলিমদের ব্যাখ্যাগুলোকে যথাযথভাবে অনুসরণ করার ফলেই ইসলামের বাণী এখনো পর্যন্ত অবিকৃত রয়েছে। কারণ, প্রথম দিককার সেসব ব্যাখ্যার ভিত্তি ছিল নাবি-এর প্রতি অবতীর্ণ ওয়াহয়ি এবং তাঁর জীবন পদ্ধতি। তিনি নিজেই বলেছেন যে, সর্বোত্তম প্রজন্ম তাঁর প্রজন্ম, তারপর তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম এবং তারপর তার পরের প্রজন্ম। (৫) তবে, রসূলুল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সিদ্ধান্ত ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই যাচাই-বাছাই ব্যতীত কারও সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে অনুসরণ করা উচিত নয়। স্পষ্টত ভুল দেখা সত্ত্বেও যারা অন্ধভাবে বিশেষ কোনো মাযহাবের মতকে অনুসরণ করে তাদের কার্যকলাপকে বোঝানোর জন্য এই বইয়ে তাকলীদ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে।
যেসব সাধারণ মানুষ সংশয়পূর্ণ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না তাদের দায়িত্ব হলো, তাদের যতটুকু জ্ঞান আছে সে অনুযায়ী আ'মাল করা, সত্যকে মেনে নেওয়ার জন্য নিজেদের মন উন্মুক্ত রাখা এবং যতদূর সম্ভব নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ 'আলিমদের উপর নির্ভর করা।
মাযহাবগুলোর অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় ও বাইরের কিছু কারণে মূলত এমন তাল্লীদ-এর সূত্রপাত হয়। এটি ফিকহশাস্ত্রের বিকাশ ও বিশেষজ্ঞদের মানসিকতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। কোনো একক কারণকে এই অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়; সম্ভব নয় সবগুলো কারণও খুঁজে বের করা। যে স্পষ্ট কারণগুলো ফিকহশাস্ত্রকে বন্ধ্যাত্বের এ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে তার কিছু নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. মাযহাবগুলো সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল এবং সব খুঁটিনাটি মাসআলাহ প্রণয়ন করা হয়ে গিয়েছিল। অনুমাননির্ভর সমস্যার সমাধানকল্পে গড়ে ওঠা ফিক্হশাস্ত্রের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে, ঘটেছে এবং ঘটতে পারে—এমন সব কিছুর আইন বের করে ইতোমধ্যেই লিপিবদ্ধ করা হয়ে গিয়েছিল। তাই মৌলিক ইজতিহাদের প্রয়োজন খুব একটা অবশিষ্ট থাকেনি। এ কারণেই মাযহাবগুলোর প্রথম দিকের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও গ্রন্থগুলোর উপর অতিমাত্রায় নির্ভর করার একটি প্রবণতা গড়ে ওঠে।
২. ইসলামি আইন ব্যবস্থাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা 'আব্বাসি খিলাফাতের মূলক্ষমতা একপর্যায়ে চলে যায় মন্ত্রীদের (ওয়াযীর) কাছে। এদের অনেকেই ছিল শী'আহ মতাবলম্বী। পরিশেষে মুসলিম এ সাম্রাজ্যটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এসব রাষ্ট্রের শাসকদের ইসলামি আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াইয়ে ঝোঁক বেশি ছিল।
৩. 'আব্বাসি সাম্রাজ্য বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রত্যেকটি নতুন রাষ্ট্র নিজের পছন্দ মতো মাযহাব অনুসরণ করতে শুরু করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মিশর শাফি'ঈ মাযহাব, স্পেন মালিকি মাযহাব এবং তুরস্ক ও ভারত হানাফি মাযহাব অনুসরণ করতে থাকে। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই কেবল রাষ্ট্রীয় মাযহাবের অনুসারীদের মধ্য থেকে তাদের শাসক, কার্যনির্বাহক ও বিচারক নিয়োগ দিতো। তাই, যে সকল বিশেষজ্ঞ বিচারক হতে চাইতেন, তাঁদেরকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুসরণ করতে হতো।
৪. কিছু অযোগ্য ব্যক্তি দীনকে নিজের খেয়ালখুশি মতো পরিবর্তনের অসৎ উদ্দেশ্যে ইজতিহাদ করতে শুরু করে। অন্যদিকে বেশ কিছু বিষয়ে কতিপয় অযোগ্য 'আলিমের সিদ্ধান্তে জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এসবের হাত থেকে শারী'আহকে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে সে যুগের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞগণ ইজতিহাদের দ্বার বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। (৬)
টিকাঃ
(৫) ইবন মাস'উদ, আবু হুরায়রা, 'ইমরান ইবন হুসাইন ও 'আ'ইশাহ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ১৩৪৬, হাদীস নং ৬১৫৩-৬১৫৪ এবং পৃ. ১৩৪৭, হাদীস্ নং ৬১৫৬ ও ৬১৫৯।
(৬) আল-মাদখাল, পৃ. ১৩৬-১৩৭।
📄 ফিক্হ সংকলন
উল্লিখিত কারণগুলোর প্রভাবেই বিশেষজ্ঞগণ পূর্ববর্তীদের গ্রন্থগুলোকে পর্যালোচনা ও সম্পাদনা করার মধ্যে নিজেদের সৃজনশীল ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। পূর্ববর্তী বিশেষজ্ঞদের ফিক্হ গ্রন্থগুলো ছিল এমনিতেই সংক্ষিপ্ত; সেগুলোর আরও সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীকালে সেগুলোকে সহজে মুখস্থ করার সুবিধার্থে আবারও সংক্ষেপ করা হয়। এদের অনেকগুলোকে ছন্দাকারে লিপিবদ্ধ করা হয়। একসময় এই সারাংশগুলো সমকালীন শিক্ষার্থীদের জন্য ধাঁধায় পরিণত হয়। এরপর বিশেষজ্ঞদের পরবর্তী প্রজন্ম আবার সেসব সারাংশ ও কাব্যের ব্যাখ্যা লিখতে শুরু করেন। তার পরবর্তী বিশেষজ্ঞগণ উপরোক্ত ব্যাখ্যাগুলোর ভাষ্য রচনা করেছেন। কেউ কেউ আবার সেসব ভাষ্যের উপর টীকা সংযোজন করেছেন।
এ যুগে ফিক্হশাস্ত্রের মূলনীতি তথা উসুল আল-ফিক্হ-এর উপর কিছু গ্রন্থ রচিত হয়। এসব গ্রন্থে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি ও তা প্রয়োগের শর্তাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে, এসব গ্রন্থে যে সকল শর্ত আরোপ করা হয় তা এতটাই কঠোর ছিল যে, কেবল তাঁদের সমসাময়িক বিশেষজ্ঞগণই নয়, পূর্বেকার ইজতিহাদ চর্চাকারী অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যেও এসব শর্ত পূরণের যোগ্যতা ছিল না।
এ যুগে তুলনামূলক ফিক্হ শাস্ত্রের উপরও কিছু গ্রন্থ রচিত হয়। আগের যুগের গ্রন্থগুলোর মতো এসব গ্রন্থেও বিভিন্ন মাযহাবের মতামত প্রমাণসহ পর্যালোচনা করে গ্রন্থকারগণ তাঁদের নিজ মাযহাবে মতকেই সর্বাধিক বিশুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এ যুগের শেষের দিকে 'উসমানি খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামি আইনকে বিধিবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সাতজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেলকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কাজটি ১২৯৩ হিজরিতে (১৮৭৬ সাল) সম্পন্ন হয়। তারপর সুলতানের নির্দেশে গোটা 'উসমানি সাম্রাজ্য জুড়ে তা মাজাল্লাহ আল-আহকাম আল-'আদিলাহ বা ন্যায়সঙ্গত সংবিধান নামে জারি করা হয়। তবে, আপাত দৃশ্যমান এ মহৎ উদ্যোগটিও মাযহাবি গোঁড়ামি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। কমিটির সব কজন বিশেষজ্ঞকেই হানাফি মাযহাব থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে এ সংবিধানটিতে ফিকহশাস্ত্রে অন্যান্য মাযহাবের অবদান সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছে।
কলম্বাস ও ভাস্কো দা গামার অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও উৎসগুলোর দখল প্রক্রিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব এশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের শিকারে পরিণত হয়। জাভা দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয় এবং হিজরি ১০৯৫ (১৬৮৪ ইং) সালে ডাচদের হাতে জাভার পতন ঘটে। হিজরি ১১১০ (১৬৯৯ ইং) সালে ট্রান্সিলভ্যানিয়া ও হাঙ্গেরি 'উসমানিদের হাত থেকে অস্ট্রিয়ার হাতে চলে যায়।
হিজরি ১১৮২-৮৮ (১৭৬৮-৭৪ ইং) সালের রুশ-তুর্কী যুদ্ধে রাশিয়ার কাছে 'উসমানিদের পরাজয়ের ফলে অতি দ্রুত 'উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ইউরোপীয় অঞ্চলগুলো একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যায়। (৮) এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ লাভ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন 'উসমানি সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন উপনিবেশ ও আশ্রিত রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ইউরোপীয় আইন-বিধানগুলো ইসলামি আইনের জায়গা দখল করে নেয়।
কয়েক দশক পূর্বে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও সাউদি আরব, পাকিস্তান ও ইরান ব্যতীত সবকটি মুসলিম দেশে ইসলামি আইন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সাউদি আরবে হানবালি মাযহাব, পাকিস্তানে মূলত হানাফি মাযহাব ও সম্প্রতি ইরানে জা'ফারি মাযহাব (৯) অনুযায়ী ইসলামি আইনকে বিধিবদ্ধ করেছে।
টিকাঃ
(৭) আনওয়ার আহমাদ কাদরি, ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স ইন দ্যা মডার্ন ওয়ার্ল্ড, (লাহোর, পাকিস্তান: আশরাফ, প্রথম সংস্করণ ১৯৬৩), পৃ. ৬৫।
(৮) ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স ইন দ্যা মডার্ন ওয়ার্ল্ড, পৃ. ৮৫।
(৯) ইসনা 'আশারীয়্যাহ (দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী) শী'আহ সম্প্রদায়ের ফিহি মাযহাবকে ভ্রান্তভাবে ইমাম জা'ফার সাদিকের (মৃত্যু ৭৬৫ সাল) প্রতি আরোপ করা হয়েছে।
📄 সংস্কারক
উল্লিখিত অবক্ষয় সত্ত্বেও এ যুগের বিভিন্ন সময়ে অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁরা তাকলীদ-এর বিরোধিতা করে ইজতিহাদের ধারাকে পুনরায় চালুর চেষ্টা করেছেন। তাঁরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দীনের আদি বিশুদ্ধতা ও ইসলামি আইনের সঠিক উৎসগুলোর উপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন। এরূপ কয়েকজন মহান সংস্কারক ও তাঁদের অবদান নিম্নে আলোচনা করা হলো:
ইমাম আহমাদ ইবন তাইমিয়াহ এ যুগের সংস্কারকগণের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছেন ইমাম আহমাদ ইবন তাইমিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হিজরি; ১২৬৩-১৩২৮ সাল)। তৎকালীন প্রচলিত বিভিন্ন ভ্রান্ত আকীদাহ-বিশ্বাস ও আচার-প্রথার বিরুদ্ধে তিনি প্রবলভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সমসাময়িক স্বার্থান্বেষী মহলের অনেকেই তাঁকে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) আখ্যায়িত করে শাসকশ্রেণির মাধ্যমে বারবার কারারুদ্ধ করিয়েছে। এরপরেও ইমাম ইবন তাইমিয়াহ ছিলেন তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠতম বিদ্বান। প্রথম দিকে তিনি হানবালি মাযহাব অনুযায়ী ফিক্হ অধ্যয়ন করলেও নিজেকে এ মাযহাবের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেননি। তিনি ইসলামি আইনের উৎসগুলোকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানের সব কয়টি শাখায় ব্যাপক ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।
ইসলাম থেকে বিচ্যুত বিভিন্ন উপদলের লেখনীগুলো এবং ইহুদি, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করে তিনি এগুলোর উপর বিশাল সমালোচনা গ্রন্থ রচনা করেছেন। সে সময় মঙ্গোলরা সাবেক 'আব্বাসি সাম্রাজ্যের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো দখল করে নেয় এবং মিশর ও উত্তর আফ্রিকাকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। ইমাম ইবন তাইমিয়াহ তাদের বিরুদ্ধে জিহাদেও অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর ছাত্রবৃন্দও ছিলেন তাঁদের সময়ের সেরা ইসলামি বিশেষজ্ঞ।
ইবন তাইমিয়াহ ইজতিহাদ ও ইসলামের বিশুদ্ধ উৎসগুলোর দিকে ফিরে আসার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁর ছাত্রবৃন্দই তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সফলভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফিকহ ও হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ইমাম ইবন আল-কায়্যিম, হাদীসশাস্ত্রের অসাধারণ বিশেষজ্ঞ ইমাম আয-যাহাবি এবং তাফসীর, ইতিহাস ও হাদীসশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ইমাম ইবন কাসীর।
মুহাম্মাদ ইবন 'আলি আশ-শাওকানি
ইয়েমেনের শাওকান শহরে জন্মগ্রহণকারী মুহাম্মাদ ইবন 'আলি আশ-শাওকানিও (১১৭৩-১২৫০ হিজরি; ১৭৫৭-১৮৩৫ সাল) এ যুগের সংস্কারকদের অন্যতম। ইমাম আশ-শাওকানি যাইদি মাযহাব (১০) অনুযায়ী ফি অধ্যয়ন করে এ মাযহাবের একজন অসাধারণ বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। তারপর তিনি হাদীসশাস্ত্রের গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সময়ের সর্বাধিক খ্যাতিমান হাদীস বিশারদে পরিণত হন। এ পর্যায়ে তিনি নিজেকে নির্দিষ্ট মাযহাব থেকে মুক্ত করে নিয়ে স্বাধীনভাবে ইজতিহাদের চর্চা শুরু করেন। তিনি ফিক্হ ও উসুল আল-ফিক্হ-এর উপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। এসব গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ে সকল মাযহাবের মতকে পর্যালোচনা করে বিশুদ্ধতম প্রমাণ ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য যুক্তির ভিত্তিতে সমাধান দেওয়া হয়েছে।
ইমাম আশ-শাওকানির মতে, তাল্লীদ বা অন্ধ অনুসরণ হারাম। তিনি এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থও রচনা করেছেন, যেমন আল-কাওল আল-মুফীদ ফী হুকমি আত-তাকলীদ। এই কারণে তিনিও সমকালীন অনেক তাকলীদপন্থী লোকদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন。(১১)
আহমাদ ইবন 'আব্দুর-রহীম
আরেকজন উল্লেখযোগ্য সংস্কারক ছিলেন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আহমাদ ইবন 'আব্দুর রহীম। তিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহ দিহলাউই (১১১৪-১১৭৬ হিজরি; ১৭০৩-১৭৬২ সাল) নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর জন্ম ভারতীয় উপমহাদেশে; আর সেখানেই তাকলীদ-এর চর্চা ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানার্জনের পর তিনি ইজতিহাদের দ্বার পুনরায় উন্মুক্ত করে মাযহাবগুলোকে একীভূত হওয়ার আহ্বান জানান।
ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূলনীতিগুলো পুনঃনিরীক্ষণ ও বিভিন্ন মাযহাবের সিদ্ধান্তগুলোর প্রমাণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ হাদীস গবেষণায় নতুনভাবে প্রাণ সঞ্চার করেন। তিনি প্রচলিত মাযহাবগুলোকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেননি। তবে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে মাযহাবের সিদ্ধান্তের বিপরীত কিন্তু অধিকতর বিশুদ্ধ প্রমাণ পাওয়া গেলে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই নিজ মাযহাবের পরিপন্থী মত গ্রহণের স্বাধীনতা আছে。(১২)
অন্যান্য
জামাল আদ-দীন আফগানি (১২৫৪-১৩১৫ হিজরি; ১৮৩৯-১৮৯৭ সাল) সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি ভারত, মাক্কা ও ইস্তাম্বুল ভ্রমণ করে পরিশেষে মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ে তিনি মুক্ত চিন্তার আহ্বান জানান এবং তাকলীদ ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। মূলত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় (১৩) থেকে তিনি এই ধ্যান-ধারণা লাভ করেছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদের অনেককে প্রভাবিতও করেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে জামাল আদ-দীনের কিছু কিছু চিন্তাধারা ছিল চরমপন্থী। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি মানব মন ও তার যৌক্তিক উৎসারণকে ওয়াহয়ির সমপর্যায়ে মনে করতেন। মধ্যপ্রাচ্যে জেগে ওঠা ম্যাসনবাদী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাঁর উদ্দেশ্য অনেকটা সন্দেহজনক হয়ে পড়ে。(১৪)
মুহাম্মাদ 'আব্দুহু (১২৬৫-১৩২৩ হিজরি; ১৮৪৯-১৯০৫ সাল) ছিলেন আফগানির সর্বাধিক খ্যাতিমান ছাত্র। আফগানি ও ইমাম ইবন তাইমিয়্যার চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে মুহাম্মাদ আব্দুহ ইজতিহাদের ঝাণ্ডাকে পুনরায় উত্তোলন করেন। তিনি তাকলীদ ও তার সমর্থকদের বিরোধিতা করেন। তবে, আধুনিকতার প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ার কারণে পরবর্তীকালে কিছু ব্যাখ্যা ও আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ, তাঁর রচিত তাফসীরে নবীদের প্রতি আরোপিত সকল অলৌকিক ঘটনাকে তিনি প্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে সংঘটিত আল্লাহ্-র কর্ম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কা'বাহ আক্রমণের সময় আবরাহার হস্তীবাহিনীর উপর পাখির যে-ঝাঁকটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিল সেগুলো ছিল নিছক বায়ুবাহিত জীবাণু এবং তাদের মধ্যে এই জীবাণু রোগব্যাধি ছড়িয়ে দিয়েছিল। একইভাবে, মুসলিমদের সুদি কারবারে জড়িত হওয়ার অনুমতি দিয়ে তিনি একটি ফাতওয়া প্রদান করেছিলেন। "অতীব প্রয়োজনীয়তায় নিষিদ্ধ কাজ বৈধ হয়ে যায়"-শারী'আহ্ এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি ফাতওয়াটি প্রদান করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি মারাত্মক ভুল। কারণ, ফিক্হ শাস্ত্রের এই মূলনীতিতে 'অতীব প্রয়োজনীয়তা' বলতে মূলত জীবন-মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানী এ ধরনের বিষয়কে বোঝায়। অথচ ব্যবসা-বাণিজ্যের চুক্তিতে এরূপ মারাত্মক আশঙ্কাজনক কোনো বিষয় নেই।
মুহাম্মাদ আব্দুহুর প্রধান ছাত্র মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা (মৃত্যু ১৩৫৪ হিজরি; ১৯৩৫ সাল) তাকলীদ-এর উপর নিজ শিক্ষকের আক্রমণকে অব্যাহত রাখেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষকের অধিকাংশ বাড়াবাড়িকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে মুহাম্মাদ 'আব্দুহুর অন্যান্য ছাত্রবৃন্দ চরম আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সত্য থেকে নিজেদের শিক্ষকের চেয়েও বেশি বিচ্যুত হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ছাত্র কাসিম আমীনই (মৃত্যু ১৩২৬ হিজরি; ১৯০৮ সাল) ছিল প্রথম ব্যক্তি যে নিজেকে মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও বহু বিবাহ, ইসলামে তলাকের সহজ ব্যবস্থা ও পর্দা ইত্যাদি বিধানের উপর চরম আঘাত হানে।
ইখওয়ান আল-মুসলিমূন-এর প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্না (মৃত্যু ১৩৬৮ হিজরি; ১৯৪৯ সাল), সায়্যিদ কুত্ব, জামা'আত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল-আ'লা মাওদুদি (১৩২১-১৩৯৯ হিজরি; ১৯০৩-১৯৭৯ সাল) এবং অতি সম্প্রতি আমাদের যুগের বিখ্যাত হাদীস বিশারদ নাসির আদ-দীন আল-আলবানি প্রমুখ 'আলিমদের মতো বিংশ শতাব্দীর আরও অনেক 'আঁলিমগণই ইসলামি পুনর্জাগরণের পতাকা উত্তোলন করে মাযহাবগুলোকে পুনরায় একীভূত করার আহ্বান জানিয়েছেন。(১৫)
তথাপিও বর্তমান যুগে বেশিরভাগ 'আলিমই নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ইচ্ছাকৃত কিংবা উদ্দেশ্য প্রণোদিত না হলেও তাদের এই কর্মপন্থার কারণে মুসলিম জাতির মধ্যকার বিভাজন একরকম স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। নিকট ভবিষ্যতে এই অবস্থার উন্নতির খুব একটা আশা দেখা যায় না। কারণ, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও সক্রিয়ভাবে কোনো না কোনো মাযহাবের প্রচারণা চালাচ্ছে।
এ কথা সত্য যে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে ফিক্হ মুকারান বা তুলনামূলক ফিশাস্ত্রকে এখন একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে হাদীসের অধ্যয়নও আগের তুলনায় আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইসলামি শিক্ষার মাযহাবি দৃষ্টিভঙ্গি হাদীস ও ফিশাস্ত্রের গতিশীলতাকে অনেকটা সীমিত করে দিয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুসরণ করছে; আর এর ফলে ইসলামি আইনের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ফিকহের সবগুলো মৌলিক কোর্সই রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুযায়ী শেখানো হচ্ছে。(১৬) মূলত রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করতে সক্ষম 'আলিম গড়ে তোলার জন্যই এই শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়। এটিই হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে সবকটি প্রধান মাযহাবের মতকে শেখানো হয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় নিজ মাযহাব উল্লেখ করতে হয় এবং প্রতিটি মাযহাবের ছাত্রদের ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে স্থান দেওয়া হয়। অধ্যয়নের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের তাদের নিজ মাযহাবের অধ্যাপকগণই পাঠদান করেন। এর ফলে অন্যান্য মাযহাবের মতামত কেবল দায়সারা ভাবেই পড়ানো হয়। সত্য জানার উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজেদের মাযহাবের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই হাদীসের পাঠদান করা হয়। অধ্যয়ন চলাকালে নিজ মাযহাবের পরিপন্থী কোনো মত এসে পড়লে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ তা একান্ত ভাসাভাসাভাবে আলোচনা করেন। এরপর তিনি নিজ মাযহাবের মতের স্বপক্ষে অনেক যুক্তি দিয়ে অন্য মাযহাবের মতটিকে খন্ডন করেন।
এভাবে, অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হলেও এসব শিক্ষক অন্যদের সেসব মতের প্রতি কোনো সম্মানও প্রদর্শন করেন না। একইভাবে, হাদীস অধ্যয়নকালে কোনো শক্তিশালী হাদীসকে নিজ মাযহাবের মতের পরিপন্থী মনে হলে শিক্ষক তাঁর মাযহাবকে সমর্থন দেওয়ার জন্য হয় হাদীসটিকে ঘুরিয়ে ব্যাখ্যা করেন নতুবা এড়িয়ে যান।
দুটির একটিও করা সম্ভব না হলে শিক্ষক নিজ মাযহাবের সমর্থনে অনেকগুলো দুর্বল হাদীস বর্ণনা করেন, অথচ এগুলোর দুর্বলতার কথা একটুও উল্লেখ করেন না। তখন মনে হয় যেন ঐ মাযহাবের মতটির সমর্থনে অধিক সংখ্যক হাদীস রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরাও নিজেদের মাযহাবের মতের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নবপ্রত্যয় লাভ করে।
টিকাঃ
(১০) পরবর্তীকালের ফিক্হ শাস্ত্রের প্রধান শী'আহ মাযহাবগুলোর অন্যতম।
(১১) মুহাম্মাদ ইবন 'আলি আশ-শাওকানি, নাইল আল-আওতার, খন্ড ১, পৃ. ৩-৬।
(১২) এ জে আরবেরি, রিলিজিয়ন ইন দ্যা মিডল ইস্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬৯-পুনঃমুদ্রণ ১৯৮১, খন্ড ২, পৃ. ১২৮-১২৯।
(১৩) মুসলিম বিশ্বের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ৩৬১ হিজরি/৯৭২ সালে ফাঁতিমি শী'আহ রাষ্ট্র কর্তৃক মিশরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
(১৪) মুহাম্মাদ হুসাইন, আল-ইত্তিজাঁহাঁত আল-ওয়াতানিয়্যাহ ফী আল-আদাব আল-'আরাবি আল-মু'আসির, খন্ড ১, পৃ. ১৫৩ এবং রিলিজন ইন দ্যা মিডল ইস্ট, খন্ড ২, পৃ. ৩৭।
(১৫) আল-বান্না'র অন্যতম অনুসারী আস-সাইয়্যিদ সাবিকের লেখা ফিক্ আস-সুন্নাহ গ্রন্থটি এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
(১৬) বর্তমান সময়ে এ নিয়মের হাতেগোনা কয়েকটি ব্যতিক্রমের একটি হলো সাউদি আরবের মাদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। এর ৮০ শতাংশেরও বেশি ছাত্র এসেছে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে এবং সেখানে কলেজ স্তরে ফিকহশাস্ত্র অধ্যয়নের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ মাযহাবকে অন্য মাযহাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয় না।