📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : দরিদ্রতা (اَلْفَقْرُ)

📄 মানযিল : দরিদ্রতা (اَلْفَقْرُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-দরিদ্রতার মানযিল।
এই মানযিলটি হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, উঁচু ও সর্বোৎকৃষ্ট মানযিল। বরং এটি হলো সমস্ত মানযিলের প্রাণ, তাৎপর্য, সারাংশ ও উদ্দেশ্য।
এই বিষয়টি উপলব্ধি করা যাবে 'দরিদ্রতা' )الْفَقْرُ(-এর প্রকৃত অর্থ জানার দ্বারা (এবং এর দ্বারা সূফিয়ায়ে কেরাম কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন, তা হৃদয়ঙ্গম করার দ্বারা।) তারা এর মূল অর্থের বাইরে বিশেষ একটি অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
দরিদ্রতা দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো: নিজের দাসত্ব প্রমাণিত করা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা।
এই নামকরণের ক্ষেত্রে এই অর্থটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বরং এটিই হলো ইবাদাত ও দাসত্বের মূল। সব ধরনের আশ্রয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেবল এক আল্লাহর নিকট আত্মনিবেদন করা। রব হিসেবে কেবল তাঁকেই সাব্যস্ত করা।
দরিদ্রতা সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনু মুআয -কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'দরিদ্রতার হাকীকত হলো: আল্লাহ ছাড়া আর কারও প্রতি মুখাপেক্ষী না হওয়া। আর এর আলামত হলো: কোনো ধরনের উপকরণ না থাকা।' [৬৬৯]
তিনি আরও বলেন, 'উপকরণের ওপর আস্থা না রাখা এবং উপকরণের মধ্যেই থেমে না থাকা।'
আবূ হাফস্ -কে প্রশ্ন করা হলো, 'ফকীর বা দরিদ্র ব্যক্তি কী নিয়ে তার রবের দিকে অগ্রসর হবে?' তিনি জবাব দেন, 'দরিদ্র ব্যক্তি তার মুখাপেক্ষিতা নিয়েই তার রবের প্রতি অগ্রসর হবে।'[৬৭০]
দরিদ্রতার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ অর্থ উপলব্ধি করা যায় কোনো এক আলিমের উক্তি থেকে; যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'কখন দরিদ্র ব্যক্তি দরিদ্রতার গুণে গুণান্বিত হয়?' জবাবে তিনি বললেন, 'যখন তার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, তখন।' আবার প্রশ্ন করা হলো, 'তা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'যখন তার কিছু থাকবে, তখন তার কিছুই নেই আর যখন তার কিছুই থাকবে না, তখন তার সবকিছুই আছে।'
এই অর্থ হলো ফাক্ বা দরিদ্রতার সর্বোত্তম অর্থ। অর্থাৎ পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যাওয়া, নিজের জন্য কোনো অংশই অবশিষ্ট না থাকা। সুতরাং যখন নিজের জন্য কোনো অংশ থেকে যায়, তখন দরিদ্রতায় ঘাটতি আসে।
এরপর আবার এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'যখন তার কিছু থাকবে, তখন তার কিছুই নেই...'। অর্থাৎ যখন সে নিজের নফসের জন্য হয়, তখন আল্লাহর জন্য হয় না, আর যখন নফসের জন্য হয় না, তখন সে পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। (ফলে সবকিছুই তখন তার অনুকূলে আসে।)
সুতরাং দরিদ্রতার তাৎপর্য হলো—আপনি নিজের নফসের জন্য হবেন না; বরং আপনি পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যাবেন। এটিই প্রকৃত দরিদ্রতা। কিন্তু যখন আপনি নিজের নফসের জন্য হবেন, তখন আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতায় আপনার ত্রুটি দেখা দেয়।
ওপরে যে দরিদ্রতার কথা বলা হলো, তা ক্ষমতার অধিকারী হওয়া ও বস্তুগত সম্পদের মালিক হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আল্লাহর রাসূল ও নবিগণ বাহ্যিক ধনসম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ফাক্র বা দরিদ্রতার গুণে ছিলেন সবার শীর্ষে। যেমন ইবরাহীম মেহমানদারি করানোর ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর অনেক সম্পদ ও গবাদি পশুও ছিল। এমনিভাবে সুলাইমান ও দাউদ-ও অনেক সম্পদশালী ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আমাদের নবি-ও তেমনই ছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَوَجَدَكَ عَابِلًا فَأَغْنَى “তিনি আপনাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর ধনী বানিয়ে দিয়েছেন।”[৬৭১]
আসলে তাঁরা তাঁদের দরিদ্রতার মাঝেও ধনী ছিলেন। আবার তাঁদের ধনাঢ্যতার মাঝেও তাঁরা দরিদ্র ছিলেন।
সুতরাং প্রকৃত দরিদ্রতা হলো: সবসময় সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী হওয়া এবং বান্দা তার প্রকাশ্য-গোপন, ছোটো-বড়ো প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর নিকট নিজের পরিপূর্ণ অভাবগ্রস্ততা স্বীকার করবে এবং তা প্রকাশ করবে।
বান্দার জন্য দরিদ্রতা হলো একান্ত নিজস্ব ও ভেতরগত একটি গুণ। যা তার পারিপার্শ্বিকতা ও অবস্থা অনুসারে প্রকাশ পায়। তবে এর কিছু আলামত, নিদর্শন, কারণ ও উপকরণ রয়েছে। অনেকেই এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, ‘দরিদ্রতা (الْفَقْرُ) -এর চারটি ভিত্তি রয়েছে— ১. এই পরিমাণ ইলম, যা বান্দাকে সঠিক পথে পরিচালনা করে, ২. এই পরিমাণ আল্লাহভীতি, যা তাকে (হারামে লিপ্ত হতে) বাধা প্রদান করে, ৩. এই পরিমাণ ইয়াকীন, যা তাকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ৪. এই পরিমাণ আল্লাহর যিক্র, যা তাকে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ করে তোলে।’
শিবলী বলেছেন, ‘দরিদ্রতার প্রকৃত অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই নিজের জন্য যথেষ্ট মনে না করা।’
একবার সাহল ইবনু আবদিল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কখন ফকীর (দরিদ্র ব্যক্তি) শান্তি লাভ করে?’ তিনি বললেন, ‘যখন সে যে সময়টাতে অবস্থান করছে, তা ছাড়া নিজের বলে আর কিছুই দেখে না।’[৬৭২]
আবূ হাফস্ বলেছেন, ‘বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট পৌঁছার সর্বোত্তম পন্থা হলো-সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে অভাবী থাকা, সব কাজে সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং হালাল পথে খাদ্য অন্বেষণ করা।[৬৭৩]
কেউ কেউ বলেছেন, 'দরিদ্রতার অন্যতম একটি আলামত হলো—কোনোকিছু পাওয়ার আগ্রহ না থাকা। আর যদি থাকেই, তা হলে তার আগ্রহ যেন তার প্রয়োজনকে অতিক্রম না করে।'
দরিদ্রতা বা মুখাপেক্ষিতার শুরু ও শেষ এবং এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিক রয়েছে। দরিদ্রতার শুরু হলো অপমান আর শেষ হলো সম্মান। এর বাহ্যিক অবস্থা হলো অভাবগ্রস্ততা আর অভ্যন্তরীণ দিক হলো (আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার মাধ্যমে দুনিয়ার সবকিছু থেকে) অমুখাপেক্ষী হওয়া।
সূফিয়ায়ে কেরাম সবাই একমত যে, ধূলিমলিন অবস্থায় থেকে সবসময় আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী থাকা, দম্ভ ও আত্মগর্বের সাথে সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকার চেয়ে উত্তম। আর দম্ভ ও আত্মগর্বের সাথে তো পরিচ্ছন্ন থাকাই যায় না!
যখন দরিদ্রতার প্রকৃত অর্থ জানা হয়ে গেল, তখন এটিও পরিষ্কার হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করাই হলো দরিদ্রতা। সুতরাং এই প্রশ্নের কোনো অর্থ নেই যে, কোন অবস্থাটি উত্তম, আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা নাকি আল্লাহকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করা?
কারণ প্রশ্নটি সঠিক নয়। কেননা আল্লাহকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করাই হলো আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা।
সূফিয়ায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, ফক্স বা মুখাপেক্ষিতার পথ ছাড়া আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার আর কোনো পথ নেই। আর আল্লাহর নিকট প্রবেশ করার জন্য মুখাপেক্ষিতার দরজা ব্যতীত অন্য কোনো দরজা নেই। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৬৬৯] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৩০।
[৬৭০] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা, ২/৪৩৩।
[৬৭১] সূরা দোহা, ৯৩:৮।
[৬৭২] আবূ আবদির রহমান সুলামি, আল-ফুতুওয়্যাহ, ৫১।
[৬৭৩] যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ২০/১৪৫।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : প্রজ্ঞা (اَلْحِكْمَةُ)

📄 মানযিল : প্রজ্ঞা (اَلْحِكْمَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেন, يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
“তিনি যাকে চান, প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে আসলে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়েছে। উপদেশ কেবল তারাই গ্রহণ করে, যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী।”[৬৮৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
"আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত (প্রজ্ঞা) অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অনেক বেশি।” [৬৮৯]
কুরআনে বর্ণিত الْحِكْمَةُ বা প্রজ্ঞার আলোচনা দুইভাবে এসেছে: এককভাবে এবং কিতাবের সাথে মিলিয়ে।
যেখানে হিকমত বা প্রজ্ঞা এককভাবে এসেছে, তার ব্যাখ্যা করা হয় 'নুবুওয়াত' দ্বারা আবার কখনো কুরআনের ইলম দ্বারা। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'হিকমত হলো কুরআনের জ্ঞান। অর্থাৎ কুরআনের নাসিখ-মানসূখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ, মুকাদ্দাম-মুআখখার, হালাল-হারামসহ এ রকম আরও অন্যান্য বিষয়াদির জ্ঞান।'
দাহহাক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'হিকমত হলো কুরআন ও কুরআনের বুঝ।' মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এটি হলো কুরআন, ইলম ও ফিক্‌হ।' আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, 'এটি হলো কথা ও কাজে বিশুদ্ধতা।'
হাসান বাসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহর দ্বীনের ক্ষেত্রে ভয় করা।' তিনি যেন হিকমতের ব্যাখ্যা করলেন হিকমতের ফলাফল ও দাবির মাধ্যমে।
আর যেখানে হিকমত কিতাবের সাথে একত্রে এসেছে, তার দ্বার উদ্দেশ্য হলো সুন্নাহ। ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ -সহ অন্যান্য ইমামগণ এই ব্যাখ্যার সাথে একমত পোষণ করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, 'ওহি মোতাবিক ফায়সালা করা।' তবে সুন্নাহ দ্বারা যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেটিই ব্যাপক ও অধিক প্রসিদ্ধ।
প্রজ্ঞা বা হিকমতের ব্যাখ্যায় সেসব কথা বলে হয়েছে তার মধ্যে ইমাম মালিক ও মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ -এর ব্যাখ্যাই সবচেয়ে উত্তম; তা হলো—'সত্য জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। আর কথা ও কাজে বিশুদ্ধতা অবলম্বন করা।'
আর এই অবস্থা কেবল কুরআন, ফিক্‌হ ও ঈমানের মৌলিক বিষয়াবলি বোঝার দ্বারাই অর্জিত হয়।
হিকমত আবার দুই প্রকার: ইলমি ও আমলি।
ইলমি হিকমত হলো : বস্তুসমূহের ভেতরগত বিষয়ে অবগত হওয়া এবং শারঈ ও সৃষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে কারণ ও পরিণতির পরস্পরের সম্পর্ক কী, তা জানা।
আমলি হিকমত হলো: প্রতিটি বস্তুকে তার উপযুক্ত স্থানে রাখা।
১. প্রতিটি বস্তুরই কিছু স্তর ও হক রয়েছে; যেগুলো তাকদীর ও শারীআতের দাবি। ২. এমনিভাবে প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তার আসা-যাওয়া সে পর্যন্তই; এর বাইরে সে যেতে পারে না। ৩. এমনিভাবে প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে; ঠিক সে সময়েই তা ঘটবে, সামান্য আগেও না, পরেও না। সুতরাং হিকমত হলো বস্তুর এই তিনটি দিকেই পরিপূর্ণ খেয়াল রাখা। আল্লাহ তাআলা শারঈ ও তাকদীরিভাবে যার যা হক ও অধিকার নির্ধারণ করেছেন, তাকে সে অধিকারই প্রদান করা; এতে সীমালঙ্ঘন না করা। কারণ সীমালঙ্ঘন করা হিকমতের খেলাফ। কোনোকিছুকে তার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই কামনা না করা; কারণ তা হিকমতের বিপরীত আবার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিলম্বও না করা। কারণ বিলম্ব করলে তা হাতছাড়া হয়ে যায়।
এটি হলো শারঈ ও তাকদীরি দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে সাধারণ হুকুম। সুতরাং তা বিনষ্ট করলে, হিকমতও নষ্ট হয়ে যায়। যেমন বীজ ও জমি চাষের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে, ফসল উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দেয়।
তবে অধিকারের চেয়ে বেশি প্রদান করা হলো, জমিনের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি সেঁচ দেওয়ার মতো। ফলে অতিরিক্ত পানি বীজ ও ফসল ডুবিয়ে দেয় এবং তা নষ্ট করে ফেলে। আর সময়ের পূর্বেই কিছু পেতে চাওয়া হলো, ফসল পরিপূর্ণভাবে পাকার আগেই তা কেটে ফেলার ন্যায়।
সুতরাং হিকমত হলো যতটুকু প্রয়োজন, যেভাবে প্রয়োজন এবং যে সময়ে প্রয়োজন ঠিক সেভাবেই তা সম্পন্ন করা।
প্রজ্ঞা বা হিকমতের ভিত্তি হলো তিনটি : ১. ইলম, ২. সহিষ্ণুতা ও ৩. ধীর-স্থিরতা।
আর এর বিপদ ও বিপরীত বিষয় হলো: ১. অজ্ঞতা, ২. অস্থিরতা ও ৩. তাড়াহুড়ো করা।
সুতরাং অজ্ঞ, অস্থির ও তাড়াহুড়োকারী ব্যক্তির কোনো প্রজ্ঞা বা হিকমত নেই। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞানুসারেই ওয়াদা ও শাস্তির বিষয়টি নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفُهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا “নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও ওপর এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। যদি কেউ একটি সৎকাজ করে, তা হলে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে দান করেন মহাপুরস্কার।”[৬৯০]
শাস্তিদানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইনসাফের রীতি গ্রহণ করেন। আর ওয়াদা পূরণের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন দয়া ও অনুগ্রহের রীতি। সমস্ত বিষয় তাঁর পরম প্রজ্ঞা বা হিকমত অনুযায়ীই হয়ে থাকে।
এমনিভাবে আল্লাহর ইনসাফের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রণীত শারীআর হুকুম-আহকাম এবং সৃষ্টিকুলের ওপর তাঁর চলমান নিয়মনীতির মধ্যে। এগুলোর মধ্যে কোনো জুলুম, অবিচার কিংবা অত্যাচার নেই। যদিও তিনি অত্যাচারীর হাতে ক্ষমতা দান করে থাকেন। তিনি হলেন সমস্ত ইনসাফকারীর চেয়ে বেশি ইনসাফকারী। আসলে তিনি যাকে ক্ষমতা দেন, যে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে, সে হলো জালিম। (তবে অত্যাচারী শাসক নিযুক্তির পেছনেও থাকে তাঁর অপার প্রজ্ঞা।)
এমনিভাবে কাউকে না দেওয়াও আল্লাহ তাআলার হিকমতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তিনি তো এমন প্রাচুর্যভান্ডারের মালিক, অগণন দান করলেও যা থেকে চুল পরিমাণও কমে না। সুতরাং যাকে তিনি তাঁর অনুগ্রহ দান করেন না, তাকে তাঁর পরিপূর্ণ হিকমতের কারণেই দান করেন না। তিনি হলেন الْجَوَّادُ الْحَكِيمُ অর্থাৎ পরম দাতা ও প্রজ্ঞাময়। আর তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর দানশীলতার সাথে সাংঘর্ষিক ও বিপরীত নয়।
সুতরাং দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা, হিদায়াত দেওয়া, পথভ্রষ্ট করা সবকিছুর পেছনেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার পরম প্রজ্ঞা ও হিকমত।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি যখন দুনিয়ার বিভিন্ন অবস্থা ও এর অপূর্ণতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে, তখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে যে এটিই হলো হিকমাহ। দুনিয়া-আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম সবই আল্লাহর প্রজ্ঞা বা হিকমতের সাথেই আবর্তিত।

টিকাঃ
[৬৮৮] সূরা বাকারা, ২: ২৬৯।
[৬৮৯] সূরা নিসা, ৪: ১১৩।
[৬৯০] সূরা নিসা, ৪:৪০।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : অন্তর্দৃষ্টি বা বিচক্ষণতা (اَلْبَصِيرَةُ)

📄 মানযিল : অন্তর্দৃষ্টি বা বিচক্ষণতা (اَلْبَصِيرَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেছেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ "নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।”[৬৯১]
এই আয়াতের তাফসীরে মুজাহিদ বলেছেন, 'এটি হলো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য।' আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য।' কাতাদা বলেছেন, 'শিক্ষাগ্রহণকারীদের জন্য।' মুকাতিল বলেছেন, 'চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য।'
এই অভিমতগুলোর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ পর্যবেক্ষণকারীরা যখন অস্বীকারকারীদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি ও তাদের পরিণাম পর্যবেক্ষণ করবে, তখন তাদের মাঝে অন্তর্দৃষ্টি, চিন্তাশক্তি ও শিক্ষাগ্রহণের ক্ষমতা তৈরি হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেছেন, وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ "আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে চাক্ষুষ দেখিয়ে দিতাম, তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে তাদের বাচনভঙ্গি থেকে আপনি তাদেরকে অবশ্যই চিনে ফেলবেন। আল্লাহ তোমাদের সব আমল ভালো করেই জানেন।”[৬৯২]
এখানে প্রথমটি হলো দেখা ও চোখের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা আর দ্বিতীয়টি কান ও শোনার ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, তাদের বাচনভঙ্গি দ্বারাই তাদের চেনা যাবে। কারণ কোনো ব্যক্তির চেহারা ও অন্যান্য আলামত দেখে তাকে যতটা চেনা যায়, তার কথা শুনে তাকে এর চেয়েও বেশি চেনা যায়, তার মনের অবস্থা সম্পর্কে আরও বেশি জানা যায়। কেননা বক্তার উদ্দেশ্য ও তার মনের ইচ্ছা অন্যান্য আলামতের তুলনায় তার কথার দ্বারা বেশি প্রকাশিত হয়। অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাতের সম্পর্ক দুটি বস্তুর সাথে দেখা ও শোনা। আবূ সাঈদ খুদূদ্রি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি বলেছেন,
اتَّقُوْا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللَّهِ
"তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকো। কারণ সে আল্লাহর নূরের সাহায্যে দেখে।"
এরপর নবি তিলাওয়াত করলেন,
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ )
"নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।” (সূরা হিজর, ১৫: ৭৫)[৬৯৩]
অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ) তিন প্রকার: ১. ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ الْإِيْمَانِيَّةُ) ২. সাধনা, ক্ষুধা, রাত্রিজাগরণ ও নির্জনতা যাপনের মাধ্যমে অর্জিত অন্তর্দৃষ্টি (فِرَاسَةُ الرِّيَاضَةِ وَالْجُوعِ وَالسَّهَرِ وَالتَّخَلِّيَّةِ) ৩. সৃষ্টিগত অন্তর্দৃষ্টি (الْفِرَاسَةُ الْخَلْقِيَّةُ)
১. ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি: এই মানযিলে এ প্রকারের অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করাই উদ্দেশ্য।
ঈমানি অন্তর্দৃষ্টি এমন নূর, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে দান করেন। এর সাহায্যে বান্দা হক-নাহক ও সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করতে পারে।
এর তাৎপর্য হলো: এটি অন্তরে এমন চিন্তাভাবনার উদয় করে, যা ঈমানের বিপরীত বিষয়াদিকে আক্রমণ করে দূর করে দেয়। (ঈমানের বিপরীত বিষয়গুলো দূর করতে) তা অন্তরে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন সিংহ তার শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এই প্রকারের অন্তর্দৃষ্টি ঈমানি শক্তি অনুসারে হয়ে থাকে। যার ঈমানি শক্তি যত বেশি, তার দূরদর্শিতাও তত তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী।
আবূ সাঈদ খাররায বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্তর্দৃষ্টির আলোয় দেখে, সে আসলে আল্লাহর দেওয়া নূর দিয়েই দেখে। কোনো প্রকার ভুলভ্রান্তি ও গাফলত ছাড়াই তার জ্ঞানের উৎস হয় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। বরং তখন আল্লাহ তাআলার ফায়সালা তাঁর বান্দার জবান দিয়ে প্রকাশ পায়।' [৬৯৪]
ওয়াসিতি বলেছেন, 'ফিরাসাত হলো আলোর কিছু টুকরো, যা অন্তরকে আলোকিত করে তোলে, অদৃশ্য জগতের গোপন রহস্যাবলি অন্তরে উদ্ভাসিত করে। এমনকি বান্দা সবকিছু چাক্ষুষ দেখতে পায়; যেন আল্লাহ তাআলাই তাকে দেখাচ্ছেন। ফলে সে সৃষ্টিজগতের রহস্য সম্পর্কে কথা বলতে থাকে।' [৬৯৫]
দারানি বলেছেন, 'অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাত হলো অন্তর উদ্ভাসিত হওয়া এবং গোপন বিষয়াবলি দেখতে পাওয়া। এটি হলো ঈমানের স্তরসমূহের মধ্যে একটি স্তর।'[৬৯৬]
আবূ বকর ছিলেন এই উম্মাতের সবচেয়ে বড়ো বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। তারপরে উমর ইবনুল খাত্তাব। উমর -এর অন্তর্দৃষ্টির কথা তো খুবই প্রসিদ্ধ। তিনি কোনোকিছু সম্পর্কে বলতেন, 'এ ব্যাপারে আমি এই ধারণা করি।' পরে দেখা যেত তিনি যেরকম বলেছেন, ঠিক সেরকমই ঘটেছে। তার ফিরাসাতের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, অনেক জায়গায় আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্তের সাথে তার সিদ্ধান্ত মিলে গিয়েছে।
একবার উমর -এর পাশ দিয়ে সাওয়াদ ইবনু কারিব যাচ্ছিলেন। তখন উমর তাকে চিনতেন না। উমর বললেন, 'আমার ধারণা ভুলও হতে পারে, তবে আমার মনে হয়, এই লোকটি গণক ছিল অথবা জাহিলি যুগে গণকবিদ্যায় পারদর্শী ছিল।' সাওয়াদ ইবনু কারিব যখন তার সামনে বসলেন, তখন তিনি তাকে সে কথাগুলো জানালেন। প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাকে যেভাবে সম্বোধন করলেন এর আগে আপনার সাথিসঙ্গীদের কেউই আমাকে এভাবে সম্বোধন করেনি।' উমর বললেন, 'আমরা তো জাহিলি যুগে এর চেয়েও বেশি ছিলাম। বরং আপনাকে যা জিজ্ঞেস করলাম, সে সম্পর্কে বলুন।' তিনি বলেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আপনি সত্য বলেছেন। জাহিলি যুগে আমি গণক ছিলাম।' এরপর তিনি তার পুরা কাহিনি বর্ণনা করতে শুরু করেন।[৬৯৭]
২. সাধনা, ক্ষুধা, রাত্রিজাগরণ ও নির্জনতা যাপনের মাধ্যমে অর্জিত অন্তর্দৃষ্টি : মানুষের অন্তর যখন সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হয়, তখন তাতে সে অনুপাতে অন্তর্দৃষ্টি ও বিচক্ষণতা আসে। এটি মুমিন-কাফির সবার জন্যই উন্মুক্ত। এটি ঈমানের ও আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে না। অনেক জাহিল ও অজ্ঞ ব্যক্তি এর মাধ্যমে ধোঁকায় পড়ে যায়।
৩. সৃষ্টিগত অন্তর্দৃষ্টি: এ বিষয়ে অনেক চিকিৎসকসহ আরও অনেকেই গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারা সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যাবলির মাধ্যমে চারিত্রিক গুণাবলির ওপর প্রমাণ পেশ করেছেন; এ দুটির মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে। যে সম্পর্কগুলো আসলে আল্লাহ তাআলার হিকমতেরই দাবি।
অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি তিনটি অঙ্গের সাথে সম্পর্কিত: চোখ, কান ও অন্তর। চোখের কাজ হলো নিদর্শন, চিহ্ন ও আলামতসমূহ পর্যবেক্ষণ করা। কানের কাজ হলো কথাবার্তা শ্রবণ করা, এর সুস্পষ্ট, অস্পষ্ট, ইশারা-ইঙ্গিত, ভাবভঙ্গি, সারমর্ম, কথা বলার স্বর ও সুর ইত্যাদি আয়ত্ত করতে তৎপর থাকা। আর অন্তরের কাজ হলো দেখা ও শোনা বিষয়গুলোতে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে, দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা এবং এর গোপন রহস্যাবলি উদঘাটনে চেষ্টা করা। বাহ্যিক দিক দেখে এর ভেতরে প্রবেশ করা। যেমন সাইরাফি বা স্বর্ণ পরীক্ষক বাইরের নকশা ও ধাতব মুদ্রা দেখেই এর ভেতরে কী পরিমাণ ভেজাল বা খাদ রয়েছে, তা বলে দিতে পারে। এমনিভাবে বিচক্ষণ বা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও অবস্থা দেখে রূহ ও অন্তরের ভেতরগত গোপন অবস্থা বলে দিতে পারে। সুতরাং রূহ ও অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি স্বর্ণ পরীক্ষকের মতো; যে বাইরের নকশা ও চেহারা দেখেই বলে দিতে পারে যে, কতটুকু খাঁটি আর কতটুকু ভেজাল।
অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাত অর্জনের দুইটি কারণ রয়েছে:
প্রথম কারণ : অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তির মস্তিষ্কের উৎকৃষ্টতা, অন্তরের তীক্ষ্ণতা এবং মেধার প্রখরতা।
দ্বিতীয় কারণ : সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দলীল-প্রমাণ ও আলামতসমূহ ভালোভাবে প্রকাশিত হওয়া।
সুতরাং কারও মধ্যে যখন দুটি কারণই একত্রিত হয়, তখন তার অন্তর্দৃষ্টি ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে খুব কম। আর দুটি কারণই যখন কারও নিকট অনুপস্থিত থাকে, তখন তার অন্তর্দৃষ্টি সঠিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। যদি কারও একটি কারণ শক্তিশালী থাকে এবং আরেকটি থাকে দুর্বল, তা হলে সেই ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি হবে মাঝামাঝি পর্যায়ের।
ইয়াস ইবনু মুআবিয়া তার যুগের অনেক বড়ো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এ ব্যাপারে তার প্রসিদ্ধ অনেক ঘটনা রয়েছে। এমনিভাবে ইমাম শাফিয়ি -ও সুতীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। বলা হয় এ বিষয়ে তার অনেক রচনা রয়েছে।

টিকাঃ
[৬৯১] সূরা হিজর, ১৫: ৭৫।
[৬৯২] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ৩০।
[৬৯৩] তিরমিযি, ৩১২৭।
[৬৯৪] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৮৬।
[৬৯৫] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৮৬।
[৬৯৬] ইবনু আবিল ইযয, শারহুল আকীদাতিত তহাবিয়্যা, ৪৯৯।
[৬৯৭] বিস্তারিত দেখুন, বুখারি, ৩৮৬৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : প্রশান্তি (اَلسَّكِينَةُ)

📄 মানযিল : প্রশান্তি (اَلسَّكِينَةُ)


এই মানযিলটি হলো আল্লাহর দেওয়া মানযিলসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি মানযিল। এটি মানুষের অর্জন ক্ষমতার বাইরে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদের ছয়টি স্থানে السَّكِينَةُ শব্দটি উল্লেখ করেছেন।[৬৯৮] তার মধ্যে একটি হলো:
ثُمَّ أَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُوْلِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ
"তারপর আল্লাহ তাঁর প্রশান্তি অবতীর্ণ করেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মুমিনদের ওপর।”[৬৯৯]
প্রশান্তি বা সাকীনার মূল হলো নিশ্চিন্ততা, গাম্ভীর্য ও স্থিরতা, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে নাযিল করেন; যখন বান্দা ভয়ভীতি কিংবা পেরেশানিতে অস্থির হয়। ফলে এসব পরিস্থিতিতে সে উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও অস্থির না হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে। এতে তার ঈমান আরও বেড়ে যায় এবং ইয়াকীনের দৃঢ়তা আসে।
এই কারণে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুমিনদের ওপর পেরেশানি ও অস্থিরতার সময় প্রশান্তি বা সাকীনা অবতীর্ণ করার কথা জানিয়েছেন। যেমন, নবি ﷺ-এর হিজরতের সময়; যখন তিনি ও তাঁর সাথি আবূ বকর ؓ গুহার ভেতরে ছিলেন আর শত্রুপক্ষ ছিল গুহার ওপরে। তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকাত, তা হলেই তাঁদের দেখতে পেত। এমনিভাবে হুনাইনের যুদ্ধের দিন; যখন কাফিরদের প্রচণ্ড আক্রমণে মুসলিমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, কেউ কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ করছিল না। এমনিভাবে হুদাইবিয়ার দিন; যখন কাফিরদের ফায়সালা শুনে, তাদের শর্তগুলো মেনে নিয়ে মুমিনদের অন্তর দুঃখভারাক্রান্ত হয়েছিল। এমন এমন শর্ত ছিল যা কেউ মানতে পারছিল না, উমর -এর মতো সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিও সেদিন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে আবূ বকর তাকে শান্ত করেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন,
كُلُّ سَكِينَةٍ فِي الْقُرْآنِ فَهِيَ طُمَأْنِينَةٌ إِلَّا الَّتِي فِي سُوْرَةِ الْبَقَرَةِ
'সূরা বাকারাতে ব্যতীত কুরআনে উল্লেখিত প্রত্যেকটি সাকীনার অর্থই হলো নিশ্চিন্ততা। [৭০০]
যখন অন্তরে সাকীনা অবতীর্ণ হয়, তখন অন্তর প্রশান্ত হয়, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্থিরতা আসে। সাকীনা গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে, জবানকে সঠিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলায় এবং অশ্লীল, নোংরা, অহেতুক ও বাতিল কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে। ইবনু আব্বাস রা. বলেছেন, 'আমরা পরস্পর বলাবলি করতাম যে, উমর রা.-এর জবানে ও অন্তরে যেন সাকীনাই কথা বলে।' [৭০১]
শাইখুল ইসলাম আবূ ইসমাঈল হারাবি রহ. বলেছেন, 'সাকীনা হলো যা নবি ও মুমিনদের অন্তরে নাযিল করা হয়েছিল। এটি এমন এক বস্তু যা অন্তরে আলো, শক্তি ও সজীবতা আনে; ভীত ব্যক্তি এখানে এসে স্বস্তি পায়, এর মাধ্যমে বিষণ্ণ ও ব্যথিত ব্যক্তি সান্ত্বনা লাভ করে এবং এর মাঝে অবাধ্য, পাপাচারী ও গুনাহগার ব্যক্তিও খুঁজে পায় নিরাপদ আশ্রয়। [৭০২]
এটি হলো তার বাণীসমূহের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণী। যার ব্যাপারে তার সমবয়সিরাও প্রশংসা করেছেন। যা অন্তরে গেঁথে যায়। এটি তার সুস্থ রুচির পরিচয় বহন করে, শুধু ইলম থেকে কারও এমন উপলব্ধি আসে না।
তিনি উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তাআলা যে সাকীনা তাঁর রাসূল ﷺ ও তাঁর মুমিন বান্দাদের অন্তরে অবতীর্ণ করেন, তা তিনটি বিষয়কে শামিল করে: আলো, শক্তি ও সজীবতা।
এরপর এর তিনটি ফলাফল উল্লেখ করেছেন: ভীত ব্যক্তির আশ্বস্ত ও নিরাপদ হওয়া, বিষণ্ণ ও ব্যথিত ব্যক্তির সান্ত্বনা লাভ করা এবং অবাধ্য, পাপাচারী ও গুনাহগার ব্যক্তির নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া।
সজীবতার মধ্যে রয়েছে অন্তরের প্রাণ, সাকীনার মাধ্যমে প্রাপ্ত আলোর দ্বারা অন্তর আলোকিত ও উজ্জ্বল হয় আর শক্তির মাধ্যমে আসে দৃঢ়তা, উদ্যম ও উৎফুল্লতা।
সুতরাং নূর বা আলো ব্যক্তির জন্য ঈমান ও ইয়াকীনের তাৎপর্য ও প্রমাণসমূহকে প্রকাশিত করে। হক ও নাহক, সত্য ও মিথ্যা এবং হিদায়াত ও গোমরাহির মধ্যে পার্থক্য করে দেয়।
প্রাণশক্তি বা সজীবতা মানুষকে পরিপূর্ণরূপে জাগ্রত ও মনোযোগী করে তোলে এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সাহায্য করে।
আর শক্তি ও সক্ষমতা সত্য কথা বলতে, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে, কুপ্রবৃত্তির আহ্বানকে দমিয়ে রাখতে এবং নিজেকে দোষত্রুটি ও নোংরামি থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই সাকীনার দ্বারা ঈমান কেবল বৃদ্ধিই পায়।
ঈমানের ফল হলো নূর, সজীবতা ও শক্তি-সামর্থ্য। আবার এই তিনটি বিষয় ঈমান আনতে সাহায্য করে এবং ঈমানকে বৃদ্ধি করে। সুতরাং বলা যায় ঈমান এগুলোর দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে।
সাকীনা বা প্রশান্তির দ্বারা যে নূর অর্জিত হয়, তার মাধ্যমে ঈমানের নিদর্শনাদি পরিস্ফুট হয় এবং যে সজীবতা অর্জিত হয়, তার মাধ্যমে গাফলত থেকে সতর্ক হয়ে সজাগ থাকা যায় আর এর দ্বারা যে শক্তি পাওয়া যায়, তার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তি, নফস ও শয়তানকে দমিয়ে রাখা যায়।

টিকাঃ
[৬৯৮] উল্লেখিত স্থানগুলো হলো-সূরা বাকারা, ২: ২৪৮; সূরা তাওবা, ৯: ২৬, ৪০; সূরা ফাতহ, ৪৮ : ৪, ১৮, ২৬।
[৬৯৯] সূরা তাওবা, ৯: ২৬।
[৭০০] বাগাবি, তাফসীর, ৭/২৯৮।
[৭০১] সুয়ূতি, জামিউল আহাদীস, ৩৪৪৫৫; আলি মুত্তাকী, কানযুল উম্মাল, ৩৫৮৭৫।
[৭০২] মানাযিলুস সায়িরীন, ৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00