📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : ইচ্ছা (اَلْإِرَادَةُ)

📄 মানযিল : ইচ্ছা (اَلْإِرَادَةُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো—ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ “আর তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন না, যারা সকাল-বিকাল তাদের রবের ইবাদাত করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা করে।” [৬০০]
সুফিয়ায়ে কেরামের নিকট ইচ্ছার মানযিলের মূলকথা হলো—ইচ্ছাশূন্য হওয়া।[৬০২]
এই বিষয়ে অনেকের অনেক বক্তব্য রয়েছে। অধিকাংশের অভিমত হলো—ইরাদা হচ্ছে: অভ্যাস পরিত্যাগ করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের কাজগুলো অভ্যাসের বশে অন্যমনস্কতার সাথে এবং প্রবৃত্তির আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহর-পথের-পথিক বা মুরীদ এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার থেকে (তার নিজস্ব) ইচ্ছাকে দূর করা হয়। আল্লাহর পথের পথিকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে বের হয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে, তার শুদ্ধ ইচ্ছার আলামত ও প্রমাণ।
কেউ কেউ বলেছেন, 'সত্যের সন্ধানে অন্তরকে জাগ্রত করা।'
দাক্কাক বলেছেন, 'ইরাদা হলো : অন্তরে জ্বলন, অস্থিরতা ও আসক্তি সৃষ্টি হওয়া এবং নিজের ভেতরে এমন তোলপাড় ও আগুন অনুভব করা, যা হৃদয়কে দগ্ধ করে দেয়।' [৬০২]
কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদের অন্যতম গুণাবলি হলো—বেশি বেশি নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা, উম্মাতের কল্যাণকামিতায় একনিষ্ঠ হওয়া, একাকিত্ব ভালো লাগা, আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালনে কষ্ট সহ্য করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে প্রাধান্য দেওয়া, 'আল্লাহ দেখছেন' এই ভেবে লজ্জা অনুভব করা, তাঁর প্রিয় ক্ষেত্রগুলোতে সাধ্যমতো পরিশ্রম করা, যে সমস্ত মাধ্যম আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তা আঁকড়ে ধরা, অল্পে পরিতুষ্ট হওয়া এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্তর স্থির না হওয়া।'
আবার কেউ কেউ বলেছেন, 'মুরীদ বা আল্লাহকে-চিনতে-ইচ্ছুক ব্যক্তির গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—সে কেবল তখনই ঘুমাবে, যখন চোখ খোলা রাখতে অপারগ হবে; সে কেবল তখনই আহার করবে, যখন প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করবে আর সে কেবল তখনই কথা বলবে, যখন তার কথা বলা জরুরি হবে।'
আবূ উসমান হারীরি বলেছেন, 'পথচলার শুরুতেই যার ইচ্ছা শুদ্ধ হবে না, তার পথচলা তাকে কেবল উলটো দিকেই নিয়ে যাবে।' [৬০৩]
তিনি আরও বলেছেন, 'মুরীদ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে আর সে অনুযায়ী আমল করে, তখন তা একটি হিকমত হিসেবে আজীবন তার অন্তরে থেকে যায়, যা তার উপকার করে এবং যখন কথা বলে, তখন শ্রোতারা এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। অপরদিকে কেউ যখন কোনো জ্ঞানের কথা শোনে; কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করে না, তখন তা একটি ঘটনা হিসেবে সে কয়েক দিন স্মরণ রাখতে পারে, অতঃপর ভুলে যায়।' [৬০৪]
ওয়াসিতি বলেছেন, 'মুরীদের সর্বপ্রথম স্তর হলো—আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার মাঝে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়া'।[৬০৫]

টিকাঃ
[৬০০] সূরা আনআম, ৬:৫২।
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি তার ‘আর-রিসালাহ (২/৩৫১)’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘ইচ্ছা বা ইরাদা হলো আল্লাহ-অভিমুখীদের পথের শুরু। এটি হলো এই পথের প্রথম মানযিল। একে ‘ইরাদা’ করে নামকরণের কারণ হলো: সবকিছুর শুরুতেই ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে। কেউ যদি কোনোকিছুর ইচ্ছাই না করে, তা হলে তার আর সেই কাজ করা হয়ে ওঠে না। ইচ্ছা বা ইরাদা আল্লাহর-পথের-পথিকদের পথচলার শুরু হওয়ার কারণে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের প্রথম মানযিলের নাম রাখা হয়েছে ইচ্ছা বা ইরাদার মানযিল। সুতরাং শব্দের দিকে লক্ষ করলে ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হবে, যার ইরাদা রয়েছে; যেমন আলিম তাকেই বলা হয়, যার ইলম রয়েছে। কিন্তু সুফিয়ায়ে কেরামের পরিভাষায় ‘মুরীদ’ তাকেই বলা হয়, যার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা বা ইরাদা থাকে না। সুতরাং তাদের পরিভাষায় যে ব্যক্তি ইচ্ছাশূন্য হতে পারে না, তাকে মুরীদ বলা হয় না; যেমন শব্দের দিকে লক্ষ করলে যার ইচ্ছা থাকবে না, তাকে মুরীদ বলা হবে না।’
[৬০২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৩৫২।
[৬০৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৩।
[৬০৪] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।
[৬০৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাহ, ২/৩৫৪।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা (اَلْأُنْسُ بِاللَّهِ)

📄 মানযিল : আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা (اَلْأُنْسُ بِاللَّهِ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতার মানযিল।
ঘনিষ্ঠতা হলো: আনুগত্য ও মহাব্বতের ফল। সুতরাং প্রত্যেক অনুগত বান্দাই আল্লাহর ঘনিষ্ঠ। আর প্রত্যেক অপরাধীই নিঃসঙ্গ। যেমন কবি বলেছেন:
فَإِنْ كُنْتَ قَدْ أَوْحَشَتْكَ الذُّنُوبُ فَدَعْهَا إِذَا شِئْتَ وَاسْتَأْنِسِ
'পাপাচার যদি তোমাকে ডুবিয়ে দেয় নিঃসঙ্গতায়; তা হলে যখন ইচ্ছা তুমি তা ছেড়ে দাও নির্দ্বিধায়, আর নিমগ্ন হও আপন প্রভুর নিবিড় ঘনিষ্ঠতায়।'
সালিক বা আখিরাতের পথের পথিক আল্লাহর যিক্সের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে। আর কুরআন শ্রবণে তার অন্তর শক্তিশালী হয়, যেমন খাদ্য ও পানীয় দ্বারা শরীর শক্তিশালী হয়।
কেউ যদি সত্যিকারার্থেই আল্লাহকে ভালোবাসে, তাঁর সন্তুষ্টি তালাশ করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, তা হলে তার অন্তরের খাদ্য ও খোরাক হবে কুরআন শ্রবণ; যেমন এটি সেই সমস্ত ব্যক্তিদের আত্মিক খোরাক ছিল, যাঁরা ছিলেন এই উম্মাতের জ্ঞানীদের নেতা, যাঁদের অন্তর ছিল সবচেয়ে পবিত্র এবং যাঁদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে বিশুদ্ধ। তাঁরা হলেন সাহাবায়ে কেরাম।
আর কেউ যদি পথচ্যুত, ধোঁকাগ্রস্ত ও নিকৃষ্ট অবস্থার অধিকারী হয়, তা হলে তার অন্তরের খাবার হবে সংগীত; যেটা শয়তানের কুরআন। যাতে প্রবৃত্তির ও নফসের চাহিদা থাকে বেশ প্রাণবন্ত। আল্লাহ থেকে এদের অবস্থান হয় অনেক দূরে, আল্লাহর মাঝে ও তাদের মাঝে রয়েছে মোটা পর্দা; যদিও তারা নিজেকে আল্লাহওয়ালা বলে দাবি করে থাকে।
কুরআন শ্রবণ হলো আল্লাহর মা'রিফাতপ্রাপ্ত ও সঠিক পথপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শ্রবণ। কুরআন শ্রবণের দ্বারা স্বচ্ছ মস্তিষ্কে অনেক ধরনের সূক্ষ্মজ্ঞান, ইঙ্গিত, মা'রিফাত ও তত্ত্বকথা হাসিল হয়, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্তরের ঘনিষ্ঠতা শক্তিশালী ও মজবুত হয়। ফলে এর দ্বারা তারা আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন এবং তাদের অন্তরে আসে আনন্দ ও উৎফুল্লতা। যা মাঝে মাঝে শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। তখন তারা এতে এমন তৃপ্তি পায়, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সমস্ত তৃপ্তির চেয়ে আলাদা।
শ্রবণের মাধ্যমে আত্মা যে খোরাক পায়, তাতে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। এর সূক্ষ্মতা ও রহস্যময়তার মধ্য থেকে কিছু উল্লেখ করছি :
জেনে রাখুন, আত্মার জন্য আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের খাবার নির্ধারণ করেছেন:
এক ধরনের খাবার হলো বাহ্যিক খাদ্য ও পানীয়; যার মূল ও সারাংশ আত্মার জন্য আর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য থাকে খাদ্য গ্রহণ করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশ।
আরেক ধরনের খাবার হলো আত্মিক খাবার, দৃশ্যমান বাহ্যিক খাবার-পানীয় থেকে আলাদা। যেমন: সুখ, শান্তি, আনন্দ, খুশি, স্বাদ, প্রফুল্লতা, জ্ঞান-বিদ্যা ইত্যাদি। এই খাবার হলো ঊর্ধ্বজগতের আসমানি খাবার।
এই দুই ধরনের খাবার দ্বারাই মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রাখে। মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাথে এগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক-) এগুলোর মাধ্যমেই উভয় ধরনের খাবার মানুষের শরীরে পৌঁছে থাকে।
তবে চোখ ও কানের সাথে আত্মিক খোরাকের যে সম্পর্ক, তা অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় অনেক বেশি। খাবার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই দুটি মাধ্যম অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় অধিক কার্যকর ও শক্তিশালী। এ দুটির প্রভাবও সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই আপনি দেখবেন, কুরআনের বহু জায়গায় চোখ ও কানকে এক সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةً لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আল্লাহ তোমাদের মায়ের পেট থেকে তোমাদেরকে এমন অবস্থায় বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কান দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন আর চিন্তাভাবনা করার মতো হৃদয় দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” [৬৪২]
কুরআনে এ রকম উপস্থাপনা অনেক এসেছে। এর একটি কারণ-ব্যক্তি যা দেখে এবং শোনে তা দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত হয়; যা স্পর্শ করে, স্বাদ নেয় এবং যা শোঁকে তা দ্বারা ততটুকু প্রভাবিত হয় না। এর আরেকটি কারণ-আয়াতে যে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো ইলম অর্জনের পথ: চোখ, কান ও বুদ্ধি-বিবেচনা।
কানের সাথে অন্তরের সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা, চোখের সাথে সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততার চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণেই মজাদার কিছু দেখার চেয়ে মজাদার কিছু শ্রবণের প্রভাব বেশি হয়। এমনিভাবে অপছন্দনীয় বস্তুর ক্ষেত্রেও দেখা ও শোনার মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে।
যখন এই বিষয়টি জানা হয়ে গেল, তখন মনে রাখবেন-মানুষের এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের জন্য রয়েছে ভালো ও খারাপ গুণ। ভালো গুণগুলো হলো অন্তরের অংশ আর খারাপ গুণগুলো হলো নফসের অংশ।
কিছু কিছু মানুষ আছে, যাদের ইন্দ্রিয় থেকে অন্তর বা কল্বের কোনো অংশ নেই। আছে শুধু চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় অতি সামান্য একটু অংশ। কেবল মনুষ্যত্বের স্তরটি ছাড়া তাদের স্তর আর পশুর স্তর সমান। এই কারণে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে সাদৃশ্য দিয়েছেন; বরং তাদেরকে পশুর চেয়েও পথভ্রষ্ট বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُوْنَ أَوْ يَعْقِلُوْنَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا )
“আপনি কি মনে করেন, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মতো; বরং তারা আরও বেশি পথভ্রষ্ট।”[৬৪৩]
আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কাফিরদের কান, চোখ ও বোধ-বিবেচনা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, তারা এগুলো দ্বারা উপকৃত হয় না। ফলে তা যেন না থাকার মতোই।
সুতরাং প্রকৃত শ্রবণ অর্জিত হওয়ার মাধ্যমে যে পবিত্র জীবনের সূচনা হয়, সেই জীবনই এই পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ জীবন। কারণ এর মাধ্যমেই অন্তর সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। যার ফলে শক্তি, উদ্যম, আনন্দ, খুশি, সজীবতা, প্রফুল্লতা ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। আর অন্তর যখন ভালো ও উপযুক্ত খাবার পায় না, তখন নষ্ট ও খারাপ খাবারের দ্বারাই শক্তিশালী হয়। খাবার যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন শক্তি-সামর্থ্য, আনন্দ, সজীবতা, প্রফুল্লতা সবই কমে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন খারাপ ও নষ্ট খাবার দ্বারা শরীর শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
অন্তরের সাথে বাহ্যিক কানের সম্পর্ক খুব বেশি আর এ দুটির পরস্পরের দূরত্বও চোখ ও অন্তরের দূরত্বের চেয়ে কম। এই কারণে চোখের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলির তুলনায় কানের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি অন্তরে দ্রুত প্রভাব ফেলে। যার ফলে মাঝে মাঝে মানুষ অতি আনন্দদায়ক, বা অতি কষ্টদায়ক বা পছন্দনীয় সুমিষ্ট কোনো সুর শোনার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যায়। অপরদিকে চিত্তাকর্ষক ও মনোরম কোনো দৃশ্য দেখে মানুষ জ্ঞান হারায় না।
কখনো কখনো অন্তরে এই ধরনের শ্রবণের মাধ্যমে প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে; কিন্তু ব্যক্তি অন্যমনস্ক ও ব্যস্ত থাকার দরুন এবং সে সময় বাহ্যিক অবস্থার সাথে ভেতরগত অবস্থার মিল না থাকার কারণে তা টের পায় না। পরে যখন অবসর হয় এবং নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় পায়, তখন ঠিকই সেই প্রভাবে সে আচ্ছন্ন হয়।
রূহ ও অন্তর যখনই ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়, তখনই এই প্রকার শ্রবণ তাতে পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
যা শ্রবণ করা হয়, তা যদি সুন্দর অর্থবিশিষ্ট হয় এবং সুমিষ্ট স্বরে শ্রবণ করা হয়, তা হলে অন্তরে সেই সুন্দর অর্থের একটা অংশ হাসিল হয় এবং অর্থ উপলব্ধি অনুসারে অন্তর এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ আনন্দিত হয়। রূহের জন্যও একটা অংশ অর্জিত হয়; যেমন: সুরের মিষ্টতা, সৌন্দর্য ইত্যাদি। এর মাধ্যমে প্রাণশক্তি, উৎফুল্লতা, আনন্দ ও খুশি বেড়ে যায়। এমনকি মাঝে মাঝে এর প্রভাব শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এবং আশপাশের সাথিসঙ্গীদের ওপরও পড়ে।
এটি পরিপূর্ণরূপে এই দুনিয়ায় অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এটি কেবল আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম আল-কুরআনুল কারীম শ্রবণের মাধ্যমেই সম্ভব। সুতরাং রূহ যখন ঝামেলা মুক্ত হয়, ওহির আলো ধারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার প্রতি আগ্রহী হয় এবং সমস্ত মনোযোগ শ্রুত বিষয়ের ওপর নিবদ্ধ রাখে; ফলে সে অন্তর উপস্থিত রেখে সতর্কতার সাথে কান পেতে রাখে, অতঃপর যখন সে তিলাওয়াতকারীর সুমধুর স্বর শ্রবণ করে, তখন তার অন্তর এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার উপক্রম হয়, সে প্রবেশ করে ভিন্ন একজগতে, যেখানে সে এমন স্বাদ অনুভব করে সৃষ্টিজগতের কোনোকিছুর সাথেই তার কোনো তুলনা হয় না। সেটি জান্নাতে জান্নাতিদের অবস্থার চেয়েও অতি সূক্ষ্ম।
সুতরাং খাবার ও খোরাক হিসেবে এটা কতই-না উত্তম আর কতই-না উপকারী!
যে অন্তর শয়তানি (সংগীত) শ্রবণ দ্বারা পরিপুষ্ট, সেই অন্তরের জন্য এটা হারাম যে, সে কুরআন শ্রবণে এই স্বাদ পাবে; তবুও যদি সে এর কিছুটা স্বাদ অনুভব করে, তা হলে তা কেবল তিলাওয়াতকারীর সুমিষ্ট সুরের কারণে, এর গভীর অর্থ অনুধাবন করার কারণে নয়।
যখন অন্তর মনোযোগের সাথে কোনোকিছু শ্রবণ করে এবং এর বাহির ও ভেতরের মধ্যে বেশি তারতম্য না থাকে, তখন কান অন্তর পর্যন্ত সেই তথ্য পৌঁছিয়ে দেয়, যা অন্তরের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও (অন্তর এমন কিছু উপলব্ধি করে,) যা সেই শ্রবণকৃত বিষয় বোঝায় না এবং বক্তাও তা উদ্দেশ্য নেয় না। এটি শুধু অর্থবহ বাক্যের সাথেই বিশেষিত নয়; বরং অনেক সময় অর্থহীন কোনো শব্দ শ্রবণ করার মাধ্যমেও এ রকম উপলব্ধি হয়।
কুশাইরি বলেছেন, 'আমি আবূ আবদির রহমান সুলামি -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'আমি একবার আবূ উসমান মাগরিবির নিকট প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে একব্যক্তি চরকি দিয়ে পানি উত্তোলন করছিল। এটি দেখে তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো, এই চরকিটি কী বলছে?' আমি বললাম, 'না।' তখন তিনি বললেন, 'সে বলছে, 'আল্লাহ, আল্লাহ। [৬৪৪]
সুতরাং ইশারা-ইঙ্গিতও দলীল ও আলামতের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি উপলব্ধি করার জন্য অন্তরে একাগ্রতা ও স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। তীক্ষ্ণ অনুভূতির দ্বারা এমন ছোটো ছোটো বস্তুও উপলব্ধি করা যায়, যা অন্যরা বুঝতে পারে না এবং তাদের কল্পনাতেও আসে না।
আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা -কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত সম্পর্কে বলতে শুনেছি-
لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ )
"যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।” [৬৪৫]
এই সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'এই আয়াতটি ইঙ্গিত প্রদান করে যে, পবিত্র ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ ঊর্ধ্বজগতের সেই সহীফা আল্লাহর নিকট অতি সম্মানিত হওয়ার কারণে যখন ফেরেশতারা পবিত্রতা অর্জন করা ব্যতীত তা স্পর্শ করতে পারে না, তখন এই সহীফার ক্ষেত্রেও পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করতে পারবে না-এটাই অধিক সংগত।'
আবার নবি বলেছেন,
لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ
"যে বাড়িতে কুকুর থাকে এবং (কোনো প্রাণীর) ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [৬৪৬]
এই হাদীস সম্পর্কে আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, 'যখন কুকুর ও ছবি আল্লাহর- সৃষ্টি-করা-ফেরেশতাদেরকে বাড়িতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, তখন কীভাবে আল্লাহ তাআলার মা'রিফাত, তাঁর মহাব্বত, তাঁর যিকরের স্বাদ এবং তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা সেই অন্তরে প্রবেশ করবে, যে অন্তর বিভিন্ন ধরনের মন্দচাহিদা আর কুবাসনার কুকুর ও ছবি দ্বারা পরিপূর্ণ রয়েছে?!' এটি উপরিউক্ত হাদীসের শব্দ থেকেই সুস্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম হয়।'
এর আরেকটি উদাহরণ হলো: সালাত সহীহ হওয়া এবং সাওয়াব পাওয়ার জন্য শর্ত হলো কাপড় ও শরীর পবিত্র হওয়া। যদি এতে কোনো কমতি হয়, তা হলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং অন্তর যখন নাপাক হয় আর ব্যক্তি তা পবিত্র না করে, তা হলে তার সালাত কীভাবে বিশুদ্ধ হবে এবং এর দ্বারা সে কী সাওয়াব পাবে? যদিও এর দ্বারা তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। বাহ্যিক পবিত্রতার হুকুম দেওয়া হয়েছে তো কেবল অভ্যন্তরীণ পবিত্রতাকে পরিপূর্ণ করার জন্যই।
এর আরেকটি উদাহরণ হলো: সালাত সহীহ হওয়ার জন্য কিবলামুখী হওয়া একটি আবশ্যকীয় শর্ত। আর তা হলো আল্লাহ তাআলার ঘর। বান্দার শরীরকে সেদিকে ফেরানো জরুরি, তা না হলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং সেই ব্যক্তির সালাত কীভাবে বিশুদ্ধ হবে, যার অন্তর কিবলার অধিপতি ও শরীরের মালিক আল্লাহর অভিমুখী না হয়? বরং তার শরীর থাকে কিবলার দিকে ফেরানো, আর তার অন্তর থাকে আল্লাহ থেকে গাফিল?
এই রকম বিশুদ্ধ ইশারা-ইঙ্গিতের অনেক উদাহরণ রয়েছে; যেগুলো অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, সঠিক অন্তর্দৃষ্টি এবং উত্তম চিন্তাভাবনা ছাড়া অর্জিত হয় না। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
শ্রবণের ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: যে ব্যক্তি তার অন্তরকে কেবল নফসের বৈশিষ্ট্য দ্বারা পূর্ণ করে। ফলে তার অন্তর তার নফসে পরিণত হয়ে যায়। যার কারণে শাহওয়াত ও কুপ্রবৃত্তি তার ওপর প্রবল হয়। শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ জন্তু-জানোয়ারের অংশের মতো, যারা হাঁকডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না।
দ্বিতীয় প্রকার: যে ব্যক্তি তার নফসকে তার অন্তরের গুণাবলি দ্বারা সুসজ্জিত করে তোলে। ফলে তার নফস তার অন্তরে রূপান্তরিত হয়। এ কারণে তার ওপর মা'রিফাত, মহাব্বত, আকল-বুদ্ধি ও পরিপূর্ণতার সব গুণসমূহ প্রবল হয়। এর ফলে তার নফস তার অন্তরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত হয়, আল্লাহর দাসত্বে তার চক্ষু শীতল হয়, আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসায় সে প্রফুল্ল ও সতেজ হয়। শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ হলো ফেরেশতাদের অংশের সমান বা তার নিকটবর্তী। তার শ্রবণ করা হলো তার কল্ব ও রূহের খোরাক, দুনিয়াতে তার চোখের শীতলতা ও প্রশান্তি, একটি মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন বাগান, যেখানে সে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে বেড়ায় এবং এতে তার জীবন হয় স্বাচ্ছন্দ্যময়।
কবিতা ও ছন্দমালা যারা শ্রবণ করে, তারা এ অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করে থাকে। কিন্তু তারা পথ ভুল করে ফেলেছে আর দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছে।
তৃতীয় প্রকার: এর প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হলো সেই ব্যক্তি, যার মানযিল উপরিউক্ত দুই মানযিলের মাঝে অবস্থিত। তার অন্তর মূল ফিতরাত বা স্বভাবের ওপর অবশিষ্ট থাকে।
শ্রবণ থেকে এই ব্যক্তির অংশ হলো আগের দুই অংশের মাঝামাঝি অংশ। যদি সে তার কল্বের আহ্বানে সাড়া দেয়, তা হলে তার শ্রবণের অংশ হয় শক্তিশালী আর যদি সে তার নফস ও কুপ্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দেয়, তা হলে তার শ্রবণের অংশ হয় দুর্বল।
আর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার এই পার্থক্যের কারণেই আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে দ্বীনের বুঝশক্তি, উৎফুল্লতা এবং তাঁর কালাম শ্রবণে প্রশান্তি লাভ করার ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকমের পার্থক্য হয়ে থাকে।

টিকাঃ
[৬৪২] সূরা নাহল, ১৬: ৭৮।
[৬৪৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ৪৪।
[৬৪৪] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৫১৭।
[৬৪৫] সুরা ওয়াকিআ, ৫৬: ৭৯।
[৬৪৬] বুখারি, ৩২২৫; মুসলিম, ২১০৬।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : দরিদ্রতা (اَلْفَقْرُ)

📄 মানযিল : দরিদ্রতা (اَلْفَقْرُ)


إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-দরিদ্রতার মানযিল।
এই মানযিলটি হলো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, উঁচু ও সর্বোৎকৃষ্ট মানযিল। বরং এটি হলো সমস্ত মানযিলের প্রাণ, তাৎপর্য, সারাংশ ও উদ্দেশ্য।
এই বিষয়টি উপলব্ধি করা যাবে 'দরিদ্রতা' )الْفَقْرُ(-এর প্রকৃত অর্থ জানার দ্বারা (এবং এর দ্বারা সূফিয়ায়ে কেরাম কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন, তা হৃদয়ঙ্গম করার দ্বারা।) তারা এর মূল অর্থের বাইরে বিশেষ একটি অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
দরিদ্রতা দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো: নিজের দাসত্ব প্রমাণিত করা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা।
এই নামকরণের ক্ষেত্রে এই অর্থটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বরং এটিই হলো ইবাদাত ও দাসত্বের মূল। সব ধরনের আশ্রয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেবল এক আল্লাহর নিকট আত্মনিবেদন করা। রব হিসেবে কেবল তাঁকেই সাব্যস্ত করা।
দরিদ্রতা সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনু মুআয -কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'দরিদ্রতার হাকীকত হলো: আল্লাহ ছাড়া আর কারও প্রতি মুখাপেক্ষী না হওয়া। আর এর আলামত হলো: কোনো ধরনের উপকরণ না থাকা।' [৬৬৯]
তিনি আরও বলেন, 'উপকরণের ওপর আস্থা না রাখা এবং উপকরণের মধ্যেই থেমে না থাকা।'
আবূ হাফস্ -কে প্রশ্ন করা হলো, 'ফকীর বা দরিদ্র ব্যক্তি কী নিয়ে তার রবের দিকে অগ্রসর হবে?' তিনি জবাব দেন, 'দরিদ্র ব্যক্তি তার মুখাপেক্ষিতা নিয়েই তার রবের প্রতি অগ্রসর হবে।'[৬৭০]
দরিদ্রতার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ অর্থ উপলব্ধি করা যায় কোনো এক আলিমের উক্তি থেকে; যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'কখন দরিদ্র ব্যক্তি দরিদ্রতার গুণে গুণান্বিত হয়?' জবাবে তিনি বললেন, 'যখন তার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, তখন।' আবার প্রশ্ন করা হলো, 'তা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'যখন তার কিছু থাকবে, তখন তার কিছুই নেই আর যখন তার কিছুই থাকবে না, তখন তার সবকিছুই আছে।'
এই অর্থ হলো ফাক্ বা দরিদ্রতার সর্বোত্তম অর্থ। অর্থাৎ পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যাওয়া, নিজের জন্য কোনো অংশই অবশিষ্ট না থাকা। সুতরাং যখন নিজের জন্য কোনো অংশ থেকে যায়, তখন দরিদ্রতায় ঘাটতি আসে।
এরপর আবার এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'যখন তার কিছু থাকবে, তখন তার কিছুই নেই...'। অর্থাৎ যখন সে নিজের নফসের জন্য হয়, তখন আল্লাহর জন্য হয় না, আর যখন নফসের জন্য হয় না, তখন সে পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। (ফলে সবকিছুই তখন তার অনুকূলে আসে।)
সুতরাং দরিদ্রতার তাৎপর্য হলো—আপনি নিজের নফসের জন্য হবেন না; বরং আপনি পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যাবেন। এটিই প্রকৃত দরিদ্রতা। কিন্তু যখন আপনি নিজের নফসের জন্য হবেন, তখন আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতায় আপনার ত্রুটি দেখা দেয়।
ওপরে যে দরিদ্রতার কথা বলা হলো, তা ক্ষমতার অধিকারী হওয়া ও বস্তুগত সম্পদের মালিক হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আল্লাহর রাসূল ও নবিগণ বাহ্যিক ধনসম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ফাক্র বা দরিদ্রতার গুণে ছিলেন সবার শীর্ষে। যেমন ইবরাহীম মেহমানদারি করানোর ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর অনেক সম্পদ ও গবাদি পশুও ছিল। এমনিভাবে সুলাইমান ও দাউদ-ও অনেক সম্পদশালী ও ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আমাদের নবি-ও তেমনই ছিলেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَوَجَدَكَ عَابِلًا فَأَغْنَى “তিনি আপনাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর ধনী বানিয়ে দিয়েছেন।”[৬৭১]
আসলে তাঁরা তাঁদের দরিদ্রতার মাঝেও ধনী ছিলেন। আবার তাঁদের ধনাঢ্যতার মাঝেও তাঁরা দরিদ্র ছিলেন।
সুতরাং প্রকৃত দরিদ্রতা হলো: সবসময় সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী হওয়া এবং বান্দা তার প্রকাশ্য-গোপন, ছোটো-বড়ো প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর নিকট নিজের পরিপূর্ণ অভাবগ্রস্ততা স্বীকার করবে এবং তা প্রকাশ করবে।
বান্দার জন্য দরিদ্রতা হলো একান্ত নিজস্ব ও ভেতরগত একটি গুণ। যা তার পারিপার্শ্বিকতা ও অবস্থা অনুসারে প্রকাশ পায়। তবে এর কিছু আলামত, নিদর্শন, কারণ ও উপকরণ রয়েছে। অনেকেই এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, ‘দরিদ্রতা (الْفَقْرُ) -এর চারটি ভিত্তি রয়েছে— ১. এই পরিমাণ ইলম, যা বান্দাকে সঠিক পথে পরিচালনা করে, ২. এই পরিমাণ আল্লাহভীতি, যা তাকে (হারামে লিপ্ত হতে) বাধা প্রদান করে, ৩. এই পরিমাণ ইয়াকীন, যা তাকে সৎকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ৪. এই পরিমাণ আল্লাহর যিক্র, যা তাকে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠ করে তোলে।’
শিবলী বলেছেন, ‘দরিদ্রতার প্রকৃত অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই নিজের জন্য যথেষ্ট মনে না করা।’
একবার সাহল ইবনু আবদিল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কখন ফকীর (দরিদ্র ব্যক্তি) শান্তি লাভ করে?’ তিনি বললেন, ‘যখন সে যে সময়টাতে অবস্থান করছে, তা ছাড়া নিজের বলে আর কিছুই দেখে না।’[৬৭২]
আবূ হাফস্ বলেছেন, ‘বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট পৌঁছার সর্বোত্তম পন্থা হলো-সর্বাবস্থায় আল্লাহর দিকে অভাবী থাকা, সব কাজে সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং হালাল পথে খাদ্য অন্বেষণ করা।[৬৭৩]
কেউ কেউ বলেছেন, 'দরিদ্রতার অন্যতম একটি আলামত হলো—কোনোকিছু পাওয়ার আগ্রহ না থাকা। আর যদি থাকেই, তা হলে তার আগ্রহ যেন তার প্রয়োজনকে অতিক্রম না করে।'
দরিদ্রতা বা মুখাপেক্ষিতার শুরু ও শেষ এবং এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিক রয়েছে। দরিদ্রতার শুরু হলো অপমান আর শেষ হলো সম্মান। এর বাহ্যিক অবস্থা হলো অভাবগ্রস্ততা আর অভ্যন্তরীণ দিক হলো (আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার মাধ্যমে দুনিয়ার সবকিছু থেকে) অমুখাপেক্ষী হওয়া।
সূফিয়ায়ে কেরাম সবাই একমত যে, ধূলিমলিন অবস্থায় থেকে সবসময় আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী থাকা, দম্ভ ও আত্মগর্বের সাথে সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকার চেয়ে উত্তম। আর দম্ভ ও আত্মগর্বের সাথে তো পরিচ্ছন্ন থাকাই যায় না!
যখন দরিদ্রতার প্রকৃত অর্থ জানা হয়ে গেল, তখন এটিও পরিষ্কার হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলাকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করাই হলো দরিদ্রতা। সুতরাং এই প্রশ্নের কোনো অর্থ নেই যে, কোন অবস্থাটি উত্তম, আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা নাকি আল্লাহকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করা?
কারণ প্রশ্নটি সঠিক নয়। কেননা আল্লাহকে নিজের জন্য যথেষ্ট মনে করাই হলো আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী থাকা।
সূফিয়ায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, ফক্স বা মুখাপেক্ষিতার পথ ছাড়া আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার আর কোনো পথ নেই। আর আল্লাহর নিকট প্রবেশ করার জন্য মুখাপেক্ষিতার দরজা ব্যতীত অন্য কোনো দরজা নেই। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।

টিকাঃ
[৬৬৯] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ২/৪৩০।
[৬৭০] আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়‍্যা, ২/৪৩৩।
[৬৭১] সূরা দোহা, ৯৩:৮।
[৬৭২] আবূ আবদির রহমান সুলামি, আল-ফুতুওয়্যাহ, ৫১।
[৬৭৩] যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ২০/১৪৫।

📘 মাদারিজুস সালিকীন > 📄 মানযিল : প্রজ্ঞা (اَلْحِكْمَةُ)

📄 মানযিল : প্রজ্ঞা (اَلْحِكْمَةُ)


আল্লাহ তাআলা বলেন, يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
“তিনি যাকে চান, প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে আসলে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়েছে। উপদেশ কেবল তারাই গ্রহণ করে, যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী।”[৬৮৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
"আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত (প্রজ্ঞা) অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অনেক বেশি।” [৬৮৯]
কুরআনে বর্ণিত الْحِكْمَةُ বা প্রজ্ঞার আলোচনা দুইভাবে এসেছে: এককভাবে এবং কিতাবের সাথে মিলিয়ে।
যেখানে হিকমত বা প্রজ্ঞা এককভাবে এসেছে, তার ব্যাখ্যা করা হয় 'নুবুওয়াত' দ্বারা আবার কখনো কুরআনের ইলম দ্বারা। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'হিকমত হলো কুরআনের জ্ঞান। অর্থাৎ কুরআনের নাসিখ-মানসূখ, মুহকাম-মুতাশাবিহ, মুকাদ্দাম-মুআখখার, হালাল-হারামসহ এ রকম আরও অন্যান্য বিষয়াদির জ্ঞান।'
দাহহাক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'হিকমত হলো কুরআন ও কুরআনের বুঝ।' মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'এটি হলো কুরআন, ইলম ও ফিক্‌হ।' আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, 'এটি হলো কথা ও কাজে বিশুদ্ধতা।'
হাসান বাসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহর দ্বীনের ক্ষেত্রে ভয় করা।' তিনি যেন হিকমতের ব্যাখ্যা করলেন হিকমতের ফলাফল ও দাবির মাধ্যমে।
আর যেখানে হিকমত কিতাবের সাথে একত্রে এসেছে, তার দ্বার উদ্দেশ্য হলো সুন্নাহ। ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ -সহ অন্যান্য ইমামগণ এই ব্যাখ্যার সাথে একমত পোষণ করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, 'ওহি মোতাবিক ফায়সালা করা।' তবে সুন্নাহ দ্বারা যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেটিই ব্যাপক ও অধিক প্রসিদ্ধ।
প্রজ্ঞা বা হিকমতের ব্যাখ্যায় সেসব কথা বলে হয়েছে তার মধ্যে ইমাম মালিক ও মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ -এর ব্যাখ্যাই সবচেয়ে উত্তম; তা হলো—'সত্য জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। আর কথা ও কাজে বিশুদ্ধতা অবলম্বন করা।'
আর এই অবস্থা কেবল কুরআন, ফিক্‌হ ও ঈমানের মৌলিক বিষয়াবলি বোঝার দ্বারাই অর্জিত হয়।
হিকমত আবার দুই প্রকার: ইলমি ও আমলি।
ইলমি হিকমত হলো : বস্তুসমূহের ভেতরগত বিষয়ে অবগত হওয়া এবং শারঈ ও সৃষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে কারণ ও পরিণতির পরস্পরের সম্পর্ক কী, তা জানা।
আমলি হিকমত হলো: প্রতিটি বস্তুকে তার উপযুক্ত স্থানে রাখা।
১. প্রতিটি বস্তুরই কিছু স্তর ও হক রয়েছে; যেগুলো তাকদীর ও শারীআতের দাবি। ২. এমনিভাবে প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তার আসা-যাওয়া সে পর্যন্তই; এর বাইরে সে যেতে পারে না। ৩. এমনিভাবে প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে; ঠিক সে সময়েই তা ঘটবে, সামান্য আগেও না, পরেও না। সুতরাং হিকমত হলো বস্তুর এই তিনটি দিকেই পরিপূর্ণ খেয়াল রাখা। আল্লাহ তাআলা শারঈ ও তাকদীরিভাবে যার যা হক ও অধিকার নির্ধারণ করেছেন, তাকে সে অধিকারই প্রদান করা; এতে সীমালঙ্ঘন না করা। কারণ সীমালঙ্ঘন করা হিকমতের খেলাফ। কোনোকিছুকে তার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই কামনা না করা; কারণ তা হিকমতের বিপরীত আবার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিলম্বও না করা। কারণ বিলম্ব করলে তা হাতছাড়া হয়ে যায়।
এটি হলো শারঈ ও তাকদীরি দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে সাধারণ হুকুম। সুতরাং তা বিনষ্ট করলে, হিকমতও নষ্ট হয়ে যায়। যেমন বীজ ও জমি চাষের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে, ফসল উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দেয়।
তবে অধিকারের চেয়ে বেশি প্রদান করা হলো, জমিনের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি সেঁচ দেওয়ার মতো। ফলে অতিরিক্ত পানি বীজ ও ফসল ডুবিয়ে দেয় এবং তা নষ্ট করে ফেলে। আর সময়ের পূর্বেই কিছু পেতে চাওয়া হলো, ফসল পরিপূর্ণভাবে পাকার আগেই তা কেটে ফেলার ন্যায়।
সুতরাং হিকমত হলো যতটুকু প্রয়োজন, যেভাবে প্রয়োজন এবং যে সময়ে প্রয়োজন ঠিক সেভাবেই তা সম্পন্ন করা।
প্রজ্ঞা বা হিকমতের ভিত্তি হলো তিনটি : ১. ইলম, ২. সহিষ্ণুতা ও ৩. ধীর-স্থিরতা।
আর এর বিপদ ও বিপরীত বিষয় হলো: ১. অজ্ঞতা, ২. অস্থিরতা ও ৩. তাড়াহুড়ো করা।
সুতরাং অজ্ঞ, অস্থির ও তাড়াহুড়োকারী ব্যক্তির কোনো প্রজ্ঞা বা হিকমত নেই। আল্লাহ তাআলাই অধিক জানেন।
আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞানুসারেই ওয়াদা ও শাস্তির বিষয়টি নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفُهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا “নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও ওপর এক অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। যদি কেউ একটি সৎকাজ করে, তা হলে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে তাকে দান করেন মহাপুরস্কার।”[৬৯০]
শাস্তিদানের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা ইনসাফের রীতি গ্রহণ করেন। আর ওয়াদা পূরণের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন দয়া ও অনুগ্রহের রীতি। সমস্ত বিষয় তাঁর পরম প্রজ্ঞা বা হিকমত অনুযায়ীই হয়ে থাকে।
এমনিভাবে আল্লাহর ইনসাফের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রণীত শারীআর হুকুম-আহকাম এবং সৃষ্টিকুলের ওপর তাঁর চলমান নিয়মনীতির মধ্যে। এগুলোর মধ্যে কোনো জুলুম, অবিচার কিংবা অত্যাচার নেই। যদিও তিনি অত্যাচারীর হাতে ক্ষমতা দান করে থাকেন। তিনি হলেন সমস্ত ইনসাফকারীর চেয়ে বেশি ইনসাফকারী। আসলে তিনি যাকে ক্ষমতা দেন, যে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে, সে হলো জালিম। (তবে অত্যাচারী শাসক নিযুক্তির পেছনেও থাকে তাঁর অপার প্রজ্ঞা।)
এমনিভাবে কাউকে না দেওয়াও আল্লাহ তাআলার হিকমতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তিনি তো এমন প্রাচুর্যভান্ডারের মালিক, অগণন দান করলেও যা থেকে চুল পরিমাণও কমে না। সুতরাং যাকে তিনি তাঁর অনুগ্রহ দান করেন না, তাকে তাঁর পরিপূর্ণ হিকমতের কারণেই দান করেন না। তিনি হলেন الْجَوَّادُ الْحَكِيمُ অর্থাৎ পরম দাতা ও প্রজ্ঞাময়। আর তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর দানশীলতার সাথে সাংঘর্ষিক ও বিপরীত নয়।
সুতরাং দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা, হিদায়াত দেওয়া, পথভ্রষ্ট করা সবকিছুর পেছনেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার পরম প্রজ্ঞা ও হিকমত।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি যখন দুনিয়ার বিভিন্ন অবস্থা ও এর অপূর্ণতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে, তখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে যে এটিই হলো হিকমাহ। দুনিয়া-আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম সবই আল্লাহর প্রজ্ঞা বা হিকমতের সাথেই আবর্তিত।

টিকাঃ
[৬৮৮] সূরা বাকারা, ২: ২৬৯।
[৬৮৯] সূরা নিসা, ৪: ১১৩।
[৬৯০] সূরা নিসা, ৪:৪০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00