📄 মানযিল : দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা (اَلْإِعْتِصَامُ)
তাযাকুর বা শিক্ষা গ্রহণের মানযিলের পর অন্তর দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার মানযিলে অবতরণ করে।
দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা দুই প্রকার: ১. আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা (الْاِعْتِصَامُ بِاللهِ) এবং ২. আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা (الْاِعْتِصَامُ بِحَبْلِ اللهِ)।
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا “তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”[১৭৫]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ "আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো; তিনি তোমাদের অভিভাবক, বড়োই ভালো অভিভাবক এবং বড়োই ভালো সাহায্যকারী তিনি।”[১৭৬]
الْاِعْتِصَامُ হলো الْعِصْمَةُ থেকে বাবুল ইফতিআলের সীগাহ। এর অর্থ হলো: এমন বিষয়কে আঁকড়ে ধরা, যা আপনাকে ভীতিকর ও নিষিদ্ধ বস্তু থেকে রক্ষা করবে এবং নিরাপত্তা দেবে। 'ইসমত' অর্থ হলো রক্ষা করা আর 'ই'তিসাম' অর্থ হলো আত্মরক্ষা করা। এই শব্দ থেকেই দুর্গকে 'আওয়াসিম' )الْعَوَاصِمُ( বলা হয়, কেননা তা সুরক্ষা দান করে এবং নিরাপত্তা দেয়।
দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যের ভিত্তি হলো: আল্লাহ তাআলাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা এবং তাঁর রশিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। এ দুটিকে ধারণ করা ব্যতীত কারও মুক্তি মিলবে না।
আল্লাহর রশি আঁকড়ে ধরার দ্বারা সে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে আর আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার কারণে সে ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। কারণ আল্লাহ-অভিমুখী ব্যক্তি সেই লোকের মতো, যে নিজ গন্তব্যের দিকে পথ চলছে; এখন সে সঠিক পথ চেনার মুখাপেক্ষী এবং নিরাপদে পথ পাড়ি দেওয়ারও মুখাপেক্ষী। এ দুটি বিষয় হাসিল না হলে সে কিছুতেই ঠিকমতো তার গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবে না। দলীল-প্রমাণ তাকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করে এবং তাকে সঠিক পথ, পাথেয়, শক্তি ও হাতিয়ারের প্রতি দিকনির্দেশনা দেয়; যার ফলে সে পথদস্যু ও পথের বিপদাপদ থেকে নিরাপত্তা লাভ করে।
আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা হিদায়াত ও দলীলের অনুসরণ করাকে আবশ্যক করে। আর আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা শক্তি-সামর্থ্য, পাথেয়, হাতিয়ার আর বিভিন্ন উপকরণ অবলম্বন করাকে আবশ্যক করে; যা তার পথচলা নির্বিঘ্ন করে। এ কারণেই আল্লাহর রশি আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে সালাফগণ সবাই এই অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন, যদিও তাদের মতামতের ক্ষেত্রে ভিন্নতা পাওয়া যায়।
ইবনু আব্বাস বলেন, 'অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো।'
ইবনু মাসউদ বলেন, 'এটি হলো জামাআত।' তিনি আরও বলেছেন, 'জামাআতবদ্ধভাবে অবস্থান করাকে নিজের ওপর আবশ্যক করে নাও। কারণ এটি হলো আল্লাহ তাআলার রশি, যা আঁকড়ে ধরার আদেশ তিনি দিয়েছেন। তোমরা একাকী যা পছন্দ করো, তার চেয়ে উত্তম হলো জামাআতে ও আনুগত্যে থাকার সময় তোমরা যা অপছন্দ করো। [১]
মুজাহিদ ও আতা বলেন, ‘আল্লাহর রশি হলো আল্লাহর সাথে করা অঙ্গীকার’। কাতাদা, সুদ্দিসহ আরও অনেক মুফাসসির-এর অভিমত হচ্ছে, ‘এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন।’
ইবনু মাসউদ নবি থেকে বর্ণনা করেছেন, إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ هُوَ حَبْلُ اللَّهِ، وَهُوَ النُّورُ الْمُبِينُ، وَالشِّفَاءُ النَّافِعُ، وَعِصْمَةُ مَنْ تَمَسَّكَ بِهِ، وَنَجَاهُ مَنْ تَبِعَهُ ‘নিশ্চয় এই কুরআন হলো আল্লাহ তাআলার রশি, সুস্পষ্ট আলো, উপকারী ওষুধ, যে তা আঁকড়ে ধরবে, তা তাকে রক্ষা করবে এবং যে তা অনুসরণ করবে, তাকে তা নাজাত দান করবে’। [২]
আলি ইবনু আবী তালিব কুরআন সম্পর্কে নবি থেকে বর্ণনা করেছেন, هُوَ حَبْلُ اللَّهِ الْمَتِينُ، وَهُوَ الذِّكْرُ الْحَكِيمُ، وَهُوَ الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ، وَهُوَ الَّذِي لَا تَزِيعُ بِهِ الْأَهْوَاءُ، وَلَا يَخْلَقُ عَنْ كَثْرَةِ الرَّدِّ، وَلَا تَلْتَبِسُ بِهِ الْأَلْسُنُ، وَلَا يَشْبَعُ مِنْهُ الْعُلَمَاءُ ‘এটি হলো আল্লাহ তাআলার মজবুত রশি, প্রজ্ঞাময় যিক্, সরল-সোজা পথ, এর দ্বারা চিন্তাভাবনা কখনো বিকৃত হয় না, অনেক ব্যবহার করলেও কোনোদিন তা পুরাতন হয় না, কোনো ভাষা-ই এর (শুদ্ধতার) ব্যাপারে মতবিরোধ করে না এবং বিদ্বানরা এর থেকে কখনো পরিতৃপ্ত হয় না’। [৩]
মুকাতিল বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আদেশ ও আনুগত্যে অবিচল থেকো। ইয়াহুদি-নাসারারা যেমন পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তোমরা সেরকম করে বিচ্ছিন্ন হোয়ো না’। [৪]
আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلَاثًا فَيَرْضَى لَكُمْ أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوْا وَيَكْرَهُ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ وَكَثُرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ
"আল্লাহ তাআলা তিনটি কাজ পছন্দ করেন এবং তিনটি কাজ অপছন্দ করেন। তোমাদের জন্য তিনি যা পছন্দ করেন, তা হলো:
১. তোমরা তাঁরই ইবাদাত করবে, ২. তাঁর সঙ্গে কোনোকিছু শরীক করবে না এবং ৩. তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না।
আর যেসকল বিষয় তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন, তা হলো: ১. অর্থহীন কথাবার্তা বলা, ২. অধিক প্রশ্ন করা এবং ৩. সম্পদ নষ্ট করা।" [১৮১]
আল্লাহ তাআলাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো: তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তা চাওয়া, তাঁর মাধ্যমে নিজের আত্মরক্ষা করা, সাথে এই প্রার্থনা করা যে, তিনি যেন বান্দাকে হেফাজত করেন, সুরক্ষা দান করেন এবং সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে বাঁচান। কারণ আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার ফল হলো বান্দা থেকে ক্ষতি দূর করা। আর আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন। যখন মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চায় এবং তাঁকে আঁকড়ে ধরে, তখন আল্লাহ তার থেকে সব ধরনের ধ্বংসাত্মক ও অনিষ্টকর বস্তু দূর করে দিয়ে তাকে সুরক্ষিত করেন। তার যত সন্দেহ-সংশয়, মন্দ চাহিদা, শত্রুর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ষড়যন্ত্র, কুপ্রবৃত্তির খারাবি, মন্দ ও অসৎ উপকরণের আবশ্যকীয় ক্ষতি-সবকিছু থেকে তাকে হেফাজত করেন। তবে এটি হয় ব্যক্তির আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার ও তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার শক্তি অনুপাতে। আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা ও অগ্রসর হওয়া বান্দার পক্ষ থেকে যেমন হয়, বান্দার থেকে ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ দূর করা এবং তা থেকে তাকে রক্ষা করাও তেমনই হয়।
টিকাঃ
[১৭৫] সূরা আল ইমরান, ৩: ১০৩।
[১৭৬] সূরা হাজ্জ, ২২: ৭৮।
[১] বাগাবি, তাফসীর, ২/৭৮।
[২] ইবনু কাসীর, ফাদাইলুল কুরআন, ১/৪৭; বাগাবি, তাফসীর, ২/৭৮।
[৩] তিরমিযি, ২৯০৬; ইবনু আবী শাইবা, ৩০৬২৯।
[৪] বাগাবি, তাফসীর, ১/৪৮১।
[১৮১] মুসলিম, ১৭১৫।
📄 মানযিল : পলায়ন করা (اَلْفِرَارُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর একটি মানযিল হলো—পলায়ন করার মানযিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ “অতএব, তোমরা আল্লাহর দিকে পালাও।”[১৮২]
'ফিরার' বা পলায়ন করার প্রকৃত অর্থ হলো : এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুর দিকে ছোটা। এটি দুই প্রকার : ১. সৌভাগ্যবানদের পলায়ন এবং ২. দুর্ভাগ্যবানদের পলায়ন।
১. সৌভাগ্যবানদের পলায়ন : আল্লাহর দিকে پলায়ন করা।
২. দুর্ভাগ্যবানদের پলায়ন : আল্লাহর দিকে নয়, বরং আল্লাহ থেকে পলায়ন করা।
আর আল্লাহর থেকে পালিয়ে আল্লাহর দিকেই যাওয়া—এটি হলো তাঁর নৈকট্যশীল ওলিদের পলায়ন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস ওপরের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'আল্লাহর কাছ থেকে পালিয়ে আল্লাহর দিকেই ছুটে যাও এবং তাঁর আনুগত্য করতে থাকো।' [১৮৩]
সাহল ইবনু আবদিল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহ ছাড়া আর সবার কাছ থেকে পালিয়ে তোমরা আল্লাহর দিকেই যাও।' [১৮৪]
অন্যান্যরা বলেছেন, 'আল্লাহর শাস্তি থেকে পালিয়ে ঈমান ও আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর সাওয়াবের দিকে ধাবিত হও।'
মূর্খতা থেকে জ্ঞানের দিকে ধাবিত হওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। জাহল বা মূর্খতা দুই প্রকার: ১. উপকারী ও সত্য ইলম সম্পর্কে না জানা এবং ২. সেই ইলম অনুযায়ী আমল না করা। শাব্দিক, পারিভাষিক, শারঈ ও প্রকৃত অবস্থার বিচারে উভয়টিই মূর্খতা।
মূসা বলেছেন, أَعُوْذُ بِاللهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الجَاهِلِينَ “মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”[১৮৫]
মূসা এই কথা বলেছিলেন তখন, যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا "তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছো?"[১৮৬]
ইউসুফ বলেছেন, وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِّنَ الجَاهِلِينَ "আপনি যদি তাদের চক্রান্ত আমার থেকে প্রতিহত না করেন, তা হলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।”[১৮৭]
অর্থাৎ তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব, যারা হারাম কাজে লিপ্ত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُوْنَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ
"অবশ্যই আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, যারা মূর্খতাবশত মন্দ কাজ করে।”[১৮৮]
কাতাদা বলেছেন, 'সাহাবায়ে কেরাম একমত পোষণ করেছেন যে, যার দ্বারা আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, তা-ই মূর্খতা।[১৮৯]
অনেকেই বলেছেন, 'সাহাবায়ে কেরামের ইজমা সংঘটিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানি করে, সে-ই মূর্খ বা জাহিল।'
ইলমের মূল্যায়ন না করাকে মূর্খতা বলে নামকরণ করা হয়েছে; ১. ইলম দ্বারা উপকৃত না হওয়ার কারণে অথবা ২. বান্দা তার কৃত পাপকাজের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে।
উল্লেখিত পলায়ন বা ফিরার এই দুই প্রকার মূর্খতা থেকে পলায়নকেও শামিল করে। অর্থাৎ ইলম সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে ইলম হাসিল করার দিকে পলায়ন করা। এমনিভাবে আমল না করার মূর্খতা থেকে স্বেচ্ছায় ও চেষ্টার মাধ্যমে উপকারী পরিশ্রম ও নেক আমল করার দিকে পলায়ন করা।
এমনিভাবে অলসতার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে আমল ও পরিশ্রমের ডাকে সাড়া দেওয়াও পালিয়ে যাওয়া বা ফিরারের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে পরিশ্রম বলতে সংকল্পের সততা এবং ঝিমিয়ে না পড়া এবং কোনো আমলকে ছোটো করে দেখা থেকে ও তা দেরি করে আদায় করা থেকে বেঁচে থাকা। 'শীঘ্রই করব', 'অচিরেই করব', 'দেখা যাক', 'আশা আছে'—এই রকম অজুহাত না দেওয়া। এটি হলো বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এটি এমন একটি গাছ, যার ফল কেবল ক্ষতি ও আফসোস।
এই দুনিয়াতে বিভিন্ন চিন্তা, পেরেশানি ও ভয়ভীতি বান্দাকে যে কষ্ট দেয় এবং ধনসম্পদ, শরীর, পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি ক্ষেত্রে বান্দা যে কষ্ট পায়, সে কারণে তার হৃদয়ে যে সংকীর্ণতা আসে, তা থেকে আল্লাহ তাআলার ওপর নির্ভরতার প্রশস্ত ময়দানের দিকে, তাঁর ওপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল, তাঁর প্রতি উত্তম আশা, তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও করুণা প্রাপ্তির প্রত্যাশা করার দিকে অগ্রসর হওয়াও ফিরার বা پলায়নের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ মানুষের এই কথাটি অনেক উত্তম, 'আল্লাহ সাথে থাকলে কোনো চিন্তা নেই!'
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" [১৯০]
রবী' ইবনু খুসাইম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'মানুষের ওপর যত ধরনের সংকীর্ণতা আসতে পারে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় তিনি সৃষ্টি করে দেবেন।[১৯১]
আবুল আলিয়া বলেছেন, 'প্রতিটি বিপদাপদ থেকে তিনি নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন।'[১৯২]
'যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন'- এই প্রতিশ্রুতিটি দুনিয়া ও আখিরাতের সব ধরনের বিপদাপদ ও সংকীর্ণতা থেকে নিষ্কৃতি দেওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ আল্লাহ তাআলা মুত্তাকী খোদাভীরুদের জন্য দুনিয়া কিংবা আখিরাত কোনোটিকে নির্দিষ্ট করে এই প্রতিশ্রুতি দেননি। (বরং ব্যাপকভাবেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।)
বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার প্রতি উত্তম ধারণা রাখবে, তাঁর নিকট উত্তম আশা পোষণ করবে এবং সততার সাথে তাঁর ওপর ভরসা করবে, তখন নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ তাআলা তার আশা-ভরসাকে বিফল হতে দেবেন না। কারণ আল্লাহ কোনো আশাপোষণকারীর আশাকে নিরাশায় পরিণত করেন না এবং কোনো আমলকারীর আমলকে নষ্ট করেন না। তাঁর ওপর নির্ভরতা ও তাঁর প্রতি উত্তম ধারণাকে তিনি প্রশস্ততা বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা ঈমান আনার পর তাঁর ওপর নির্ভর করা, তাঁর নিকট ভালো আশা করা এবং তাঁর প্রতি উত্তম ধারণা রাখার চেয়ে হৃদয়ের জন্য অধিক প্রশস্ত আর কোনোকিছু নেই।
টিকাঃ
[১৮২] সূরা যারিয়াত, ৫১:৫০।
[১৮৩] সা'লাবি, তাফসীর, ২৪/৫৬২।
[১৮৪] কুরতুবি, তাফসীর, ১৭/৫৪।
[১৮৫] সূরা বাকারা, ২: ৬৭।
[১৮৬] সূরা বাকারা, ২: ৬৭।
[১৮৭] সূরা ইউসুফ, ১২: ৩৩।
[১৮৮] সূরা নিসা, ৪: ১৭।
[১৮৯] বাগাবি, তাফসীর, ১/৫৮৬।
[১৯০] সূরা তালাক, ৬৫: ২-৩।
[১৯১] তাবারি, তাফসীর, ২৩/৪৬।
[১৯২] সা'লাবি, তাফসীর, ২৬/৫৬১।
📄 মানযিল : সাধনা করা (اَلرِّيَاضَةُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-সাধনা করার মানযিল। এটি হলো নফসকে সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার ওপরে উঠানোর অনুশীলন করা।
সাধনা করার দ্বারা দুটি বিষয় উদ্দেশ্য নেওয়া হয় : এক. কোনো কথা, কাজ ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে যখন সত্য পেশ করা হয়, তখন অন্তরকে সত্য গ্রহণে অভ্যস্ত করে তোলা। যখন তার কাছে সত্য উপস্থিত হয়, তখন সে যেন তা কবুল করে নেয়, তা মানে এবং তার প্রতি বিনয়ী হয়।
দুই. হক ও ন্যায় যে-ই বলুক, তা গ্রহণ করে নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ "যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে; তারাই প্রকৃত খোদাভীরু।”[১৯৩]
অর্থাৎ আপনার শুধু সত্যবাদী হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সত্যবাদিতার সাথে সাথে সত্যবাদীদের সত্যায়ন করা এবং স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি। এমন অনেক মানুষ আছে, যারা সত্য কথা বলে; কিন্তু অহংকার, হিংসা বা অন্য কোনো কারণে অপরের বলা-সত্যকে স্বীকার করতে চান না, তা সত্যায়ন করেন না।
১. সাধনার অন্যতম একটি দিক হলো: ইলমের মাধ্যমে নিজের স্বভাব-চরিত্রকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করে তোলা। যাতে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যে কাজই করুক না কেন, তা ইলম অনুযায়ী হয়। প্রকাশ্য-গোপন প্রতিটি নড়াচড়া যেন শারঈ মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়।
২. এর আরেকটি দিক হলো: নিজের সমস্ত আমলকে ইখলাসের মাধ্যমে বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করা। আল্লাহ তাআলার জন্য এমনভাবে তা নিবেদন করা যে, গাইরুল্লাহর কোনো মিশ্রণ যেন না থাকে।
৩. রিয়াযত বা সাধনার আরেকটি দিক হলো: মুআমালা-লেনদেনের ক্ষেত্রে সব ধরনের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করা। তা এভাবে যে, আপনাকে আল্লাহর হকের ব্যাপারে ও বান্দার হকের ব্যাপারে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করবেন। যার সাথে লেনদেন করছেন, তার কল্যাণ কামনা করা, তাকে ধোঁকা না দেওয়া এবং তাকে সাধ্যমতো খুশি রাখার চেষ্টা করা। এর ফলে আপনিও তার প্রশংসায় ও কৃতজ্ঞতায় ধন্য হবেন।
যখন এই তিনটি বিষয় পালন করতে নফসের জন্য কঠিন হয়ে যায়, তখন এগুলো অর্জন করতে কঠোর সাধনা করতে হয়। ফলে যখন তা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা স্বভাব-চরিত্রের উত্তম গুণে রূপান্তরিত হয়।
টিকাঃ
[১৯৩] সূরা যুমার, ৩৯ : ৩৩।
📄 মানযিল : আল্লাহভীতি (اَلْخَوْفُ)
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এর আরেকটি মানযিল হলো-আল্লাহভীতি।
এটি হলো সবচেয়ে সম্মানিত মানযিল এবং অন্তরের জন্য সবচেয়ে উপকারী। এটি প্রত্যেকের ওপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا تَخَافُوْهُمْ وَخَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ
"সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো।” [২৩১]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন,
فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ
"সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো।” [২৩২] আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কালামে ভয়কারীদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের গুণগান বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ هُمْ مِّنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُّشْفِقُوْنَ * وَالَّذِينَ هُمْ بِآيَاتِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُوْنَ وَالَّذِينَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا يُشْرِكُوْنَ وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةً أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُوْنَ أُولَبِكَ يُسَارِعُونَ فِي الخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُوْنَ
“নিশ্চয় যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের পালনকর্তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে, যারা তাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করে না এবং তারা যা কিছুই দান করে, তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, তারাই কল্যাণের কাজ দ্রুত শেষ করে এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।”[২০০]
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ -কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, وَالَّذِيْنَ يُؤْتُوْنَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ “যারা যা কিছুই দান করে তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে দান করে থাকে”[২০৪] এ ব্যাপারে আয়িশা বললেন, 'এরা কি মদখোর ও চোর?' তিনি বললেন,
لَا يَا بِنْتَ الصِّدِّيْقِ وَلَكِنَّهُمُ الَّذِيْنَ يَصُوْمُوْنَ وَيُصَلُّوْنَ وَيَتَصَدَّقُوْنَ وَهُمْ يَخَافُوْنَ أَنْ لَّا يُقْبَلَ مِنْهُمْ أُولَبِكَ الَّذِيْنَ يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُوْنَ
“হে সিদ্দীকের মেয়ে, না এরা তা নয়; বরং তারা সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে, দান-সদাকা করে এবং এই ভয়ে ভীত থাকে যে, তাদের পক্ষ হতে এগুলো কবুল করা হবে কি না, তারাই কল্যাণের কাজে বেশ তৎপর থাকে এবং তাতে তারা অগ্রগামী হয়।”[২০৫]
হাসান বাসরী বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! তারা নেক আমল করে এবং তাতে কঠোর পরিশ্রম করে আবার এই ভয়ও করে যে, সেগুলো তাদের (মুখের) ওপর নিক্ষেপ করা হবে। আসলে মুমিন বান্দারা ভালো কাজ করে আবার ভয়ে ভয়ে থাকে। অপরদিকে মুনাফিকরা খারাপ কাজ করেও নির্ভাবনায় থাকে।'[২০৬]
)الرَّهْبَةُ) (الْخَشْيَةُ) (الْخَوْفُ) (الْوَجَلُ) (এই শব্দগুলো প্রায় কাছাকাছি অর্থ প্রদান করে, তবে সমার্থক নয়; (কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।)
)اَلْخَوْفُ বা আল্লাহভীতি(:আবুল কাসিম জুনাইদ বলেছেন, 'খাওফ বা আল্লাহভীতি হলো শাস্তির আশঙ্কা শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে ঢুকে যাওয়া।।২০৯।
কেউ কেউ বলেছেন, 'আল্লাহভীতি হলো ভয়ের বিষয় (শাস্তির কথা) স্মরণ করে অন্তর অস্থির ও পেরেশান হওয়া।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'আল্লাহভীতি হলো হুকুম-আহকামের প্রয়োগ সম্পর্কে মজবুত ইলম। তবে এটি আল্লাহভীতির কারণ, হুবহু এটিই আল্লাহভীতি নয়।'
কেউ কেউ বলেছেন, 'খাওফ হলো মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কিছুতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা টের পাওয়ার সাথে সাথেই অন্তর সেখান থেকে পলায়ন করা।'
আর আল্লা হলো খাওফ থেকেও খাছ বা বিশিষ্ট। কারণ খাশইয়াত হলো আল্লাহ সম্পর্কে যারা গভীর জ্ঞান রাখে, তাদের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ "আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।” [২৩৮]
এটি এমন ভয়, যার সাথে মা'রিফাত বা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান সংযুক্ত থাকে।
নবি বলেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ "আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তাঁর নাফরমানي করা থেকে তোমাদের চেয়ে বেশি বেঁচে থাকি।” [২৩৯]
সুতরাং খাওফ হলো নড়াচড়া করা, ভয়ে অস্থির হওয়া আর খাশইয়াত হলো স্থিরতা, গুটিয়ে থাকা ও ভয়ে জমে থাকা। যে ব্যক্তি শত্রু বাহিনীর আগমন দেখে বা এ রকম কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তখন তার দু রকম অবস্থা হয় :
এক. তাদের থেকে ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তার তৎপরতা। এটি হলো খাওফের অবস্থা।
দুই. এমন স্থানে অবস্থান নেওয়া ও স্থির হয়ে থাকা, যেখানে তার নিকট শত্রুপক্ষ পৌঁছাতে পারে না। এটি হলো খাশইয়াত।
الوَجْلُ হলো অপছন্দনীয় বস্তু থেকে ভয়ে পালানোর সময় গভীর মনোযোগী হওয়া। এটি হলো الْرَّغْبَةُ -এর বিপরীত; রগবত-এর অর্থ হলো: আগ্রহের বস্তুর সন্ধানে অন্তর ধাবিত হওয়া।
الْوَجَلُ হলো যার ক্ষমতা ও শাস্তির ভয় করা হয়, তার আলোচনায় বা তাকে দেখে ভয়ে অন্তর প্রকম্পিত ও বিদীর্ণ হওয়া।
الهيبة হলো সম্মান ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা'রিফাত ও মহাব্বতের পাশাপাশি এই ভয়ের সৃষ্টি হয়। আর إِجْلَالُ হলো ভালোবাসা মিশ্রিত শ্রদ্ধা।
সুতরাং খাওফ হলো সাধারণ মুমিনদের জন্য, খাশইয়াত হলো উলামায়ে কেরামের জন্য, হাইবাত হলো মহাব্বতকারীদের জন্য, আর ইজলাল হলো নৈকট্যশীলদের জন্য। ইলম ও মা'রিফাতের পরিমাণ অনুসারে খাওফ ও খাশইয়াত সৃষ্টি হয়। যেমন নবি বলেছেন,
فَوَاللَّهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهُمْ بِاللَّهِ وَأَشَدُّهُمْ لَهُ خَشْيَةً
"আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে তাঁকে অনেক বেশি ভয় করি।” [২৪০]
ওপরের হাদীসের বর্ণনায় আরেকটি রিওয়ায়াতে خَوْنً শব্দটি এসেছে। (শব্দ দুটি প্রায় সমার্থক।)
আবূ যার থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا وَمَا تَلَذَّذْتُمْ بِالنِّسَاءِ عَلَى الْفُرْشِ وَلَخَرَجْتُمْ إِلَى الصُّعُدَاتِ تَجْأَرُوْنَ إِلَى اللَّهِ
"আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তা হলে তোমরা খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে এবং স্ত্রীদের সাথে বিছানায় সুখভোগ না করে ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে-প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে আর আল্লাহ তাআলার নিকট কাকুতি-মিনতি করতে থাকতে।”[২৪১]
সুতরাং খাওফের গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি (আল্লাহর ভয়ে খারাপ কাজ থেকে) বিরত থাকে ও পালিয়ে বেড়ায়।
আর খাশইয়াতের অধিকারী ব্যক্তি ইলমকে আঁকড়ে ধরার দিকে ধাবিত হয়।
এই দুই ব্যক্তির উদাহরণ হলো সেই দুই ব্যক্তির মতো, যাদের একজন চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে কিছুই জানে না আর অপরজন সে সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞ। ফলে প্রথম ব্যক্তি আশ্রয় নেয় রোগ প্রতিরোধ করার দিকে এবং যাতে রোগাক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার দিকে। আর অভিজ্ঞ ব্যক্তি আশ্রয় নেয় ওষুধ ও দাওয়া গ্রহণের দিকে।
আবূ হাফস বলেছেন, 'খাওফ বা ভয় হলো আল্লাহর চাবুক, এর দ্বারা তাঁর দুয়ার থেকে পলায়নকারীদের তিনি সঠিক পথে রাখেন।[২৪২]
তিনি আরও বলেছেন, 'খাওফ বা আল্লাহভীতি হলো অন্তরের প্রদীপ, এর দ্বারা অন্তরের ভালো-মন্দ সবকিছু দেখা যায়। তুমি যাদেরকে ভয় করো তাদের প্রত্যেকের নিকট থেকে পালিয়ে বেড়াও, কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল আল্লাহ তাআলা। কারণ আল্লাহকে ভয় করার পরেও তাঁর কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'
আসলে আল্লাহকে ভয়কারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট থেকে পালিয়ে আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়।
আবূ সুলাইমান বলেছেন, 'কোনো অন্তর আল্লাহর ভয় থেকে শূন্য হলে, তা ধ্বংস হয়ে যায়।' [২৪৩]
ইবরাহীম ইবনু সুফইয়ান বলেছেন, 'অন্তরে যখন খাওফ বা আল্লাহর ভয় স্থান পায়, তখন সেই ভয় তার নফস ও কুপ্রবৃত্তির চাহিদাগুলোকে জ্বালিয়ে দেয় এবং তার নিকট থেকে দুনিয়াকে দূরে রাখে। [২৪৪]
যুন-নূন মিসরি বলেন, 'মানুষ ততক্ষণ সোজা পথে চলতে থাকে, যতক্ষণ তাদের সাথে আল্লাহভীতি অবস্থান করে। আর যখন আল্লাহভীতি উধাও হয়ে যায়, তখন তারা পথ হারিয়ে ফেলে।' [২৪৫]
হাতিম আল-আসাম্মা বলেন, 'কোনো উত্তম স্থান পেয়ে ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ জান্নাতের চেয়ে উত্তম কোনো স্থান নেই, অথচ আদম সেখানে যার মুখোমুখি হবার তার মুখোমুখিই হয়েছেন! অধিক ইবাদাত দ্বারাও ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ ইবলীস দীর্ঘদিন যাবৎ ইবাদাত করার পরও যার সম্মুখীন হবার তার সম্মুখীনই হয়েছেন! অধিক ইলমের কারণেও ধোঁকাগ্রস্ত হোয়ো না। কারণ বালআম ইবনু বাউরা যা পাবার তা-ই পেয়েছে, অথচ সে ইসমে আ'যম জানত! আবার নেককার ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ লাভের কারণেও প্রতারিত হোয়ো না। কারণ নবি -এর চেয়ে অধিক নেককার ও উত্তম মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই, অথচ তাঁর শত্রু ও মুনাফিকরা তাঁর সাক্ষাৎ ও দর্শন লাভ করার দ্বারা কোনো উপকৃত হতে পারেনি।' [২৪৬]
খাওফ বা আল্লাহভীতি বান্দার জন্য সত্তাগতভাবে উদ্দেশ্য নয়, বরং (দুনিয়াতে) বিভিন্ন ইবাদাত ও আমলই উদ্দেশ্য। এ কারণেই যখন ভয়ের বস্তু (আখিরাতে) থাকবে না, তখন ভয়ও থাকবে না। কেননা জান্নাতের অধিবাসীদের কোনো ভয় নেই এবং তারা কখনো চিন্তিতও হবে না।
খাওফের সম্পর্ক হলো কাজকর্মের সাথে আর মহাব্বতের সম্পর্ক হলো সত্তা ও গুণাবলির সাথে। এ কারণেই জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহর প্রতি ঈমানদারদের মহাব্বত বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। সেখানে তাদের কোনো ভয় থাকবে না। আর এই কারণে মহাব্বতের মানযিল খাওফের মানযিলের চেয়েও উঁচু ও মর্যাদাপূর্ণ।
ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রশংসিত আল্লাহভীতি (al) হলো: যা ব্যক্তির মাঝে ও আল্লাহ তাআলার হারামকৃত বস্তুসমূহের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দেয়, (তাকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখে)। আর (ভয়ের এই ভারসাম্যপূর্ণ) সীমা যদি কেউ অতিক্রম করে, তা হলে সেই ব্যক্তির মাঝে হতাশা ও নিরাশা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অনুভূতি ও ইলম অর্জনের পরেই খাওফের সৃষ্টি হয়। সুতরাং যে বিষয়ে ইলম ও অনুভূতি নেই, সে বিষয়ে মানুষের ভয় সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব।
খাওফ বা ভয় সৃষ্টি হওয়ার জন্য দুটি বিষয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন, এক. অপছন্দনীয় ও হারাম বস্তু সম্পর্কে জানা এবং দুই. সেই বস্তু পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পথ ও কারণ সম্পর্কে জানা। হারাম বস্তু এবং সে পর্যন্ত পৌঁছার কারণ সম্পর্কে ব্যক্তির অনুভূতি ও ইলম অনুসারে তার মাঝে ভয় সৃষ্টি হবে। এই দুটির মধ্যে যেকোনো একটি সম্পর্কে উপলব্ধি ও জ্ঞানের কমতি হলে, সে অনুপাতে খাওফ বা আল্লাহভীতিতেও কমতি আসবে।
যে ব্যক্তির এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকবে না যে, অমুক কারণ ও উপকরণ অমুক গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তা হলে সেই ব্যক্তি ওই কারণ ও উপকরণকে ভয় করবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো কারণ সম্পর্কে জানে যে, তা গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়, কিন্তু এটা জানে না যে, তা কোন গুনাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়, তার ভয়াবহতা কেমন, তাহলেও সে একে ভয় করার মতো ভয় করবে না। আর যদি সে কারণ এবং গুনাহ উভয়টি সম্পর্কেই জ্ঞান রাখে, তা হলে তার প্রকৃত খাওফ বা ভয় হাসিল হবে।
আল্লাহর দিকে সফর করার ক্ষেত্রে অন্তর একটি পাখির মতো। মহাব্বত হলো তার মাথা, ভয় ও আশা হলো তার দুটি ডানা। সুতরাং যখন মাথা ও দুই ডানা সুস্থ থাকবে, তখন পাখি ভালোভাবে উড়তে পারবে। আর যখন মাথা কেটে ফেলা হবে, তখন পাখি মারা যাবে। আর যখন দুই ডানা নষ্ট হয়ে যাবে, তখন সে শিকারী ও হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হবে।
সালাফগণ এটা পছন্দ করেছেন যে, সুস্থ থাকাবস্থায় আশার ডানার চেয়ে ভয়ের ডানা শক্তিশালী রাখবে। আর দুনিয়া থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় (অর্থাৎ মৃত্যুর সময়) ভয়ের ডানার চেয়ে আশার ডানা শক্তিশালী রাখবে। এটি হলো আবূ সুফইয়ান ও অন্যান্যদের তরীকা। তিনি বলেছেন, 'অন্তরের জন্য উচিত হলো (সুস্থ থাকাবস্থায়) তার ওপর ভয়েরই প্রাধান্য থাকবে আর যদি তার ওপর (সে সময়) আশা প্রাধান্য পায়, তা হলে অন্তর নষ্ট হয়ে যায়।[২৪৭]
অন্যান্যরা বলেছেন, 'অন্তরের পরিপূর্ণ অবস্থা হলো: আশা ও ভয় সমান সমান থাকা এবং মহব্বতের প্রাধান্য থাকা। আসলে মহব্বত হলো বাহন, আশা তাকে সামনে থেকে টানে এবং ভয় তাকে পেছন থেকে হাঁকিয়ে নিতে থাকে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার দয়া ও করুণায় বান্দা মানযিল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
টিকাঃ
[২৩১] সুরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭৫।
[২৩২] সূরা মায়িদা, ৫:৪৪।
[২০৩] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৫৭-৬১।
[২০৪] সূরা মুমিনূন ২৩:৬০।
[২০৫] তিরমিযি, ৩১৭৫; ইবনু মাজাহ, ৪১৯৮।
[২০৬] বাগাবি, তাফসীর, ৩/৩৬৮।
[২০৭] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৩৮] সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮।
[২৩৯] বুখারি, ৫০৬৩।
[২৪০] বুখারি, ৬১০১।
[২৪১] তিরমিযি, ২৩১২; ইবনু মাজাহ, ৪১৯০।
[২৪২] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫২।
[২৪৩] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৪৪] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৫/২৩৮।
[২৪৫] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৪।
[২৪৬] আবূ হামিদ গাযালি, ইহইয়াউ উলূমিদ দ্বীন, ৪/১৮৫।
[২৪৭] আবদুল কারীম কুশাইরি, আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যা, ১/২৫৫।