📘 লিডারশীপ লেসন্স > 📄 অবতরণিকা

📄 অবতরণিকা


লিডারশিপ বা নেতৃত্ব মানুষের কাছে এমনই এক আগ্রহের বিষয় যে, প্রভাবশালী, অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় মানুষ তো বটেই, সাধারণ মানুষের মনমস্তিস্ক পর্যন্ত এর দ্বারা গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আজকাল থিওরির পর থিওরি উদ্ভাবন হচ্ছে। এক থিওরি আরেক থিওরিকে রিফিউট করছে। শত শত বই প্রকাশিত হচ্ছে, বইয়ের দোকানের তাকগুলো ভরে উঠছে ‘করো’ আর ‘করবে না’ লেখা স্বল্পবুদ্ধির পরামর্শে ঠাসা বই দিয়ে। সমস্যার দ্রুত সমাধানসম্বলিত বই, ভালো নেতা হওয়ার উপায় ইত্যাদি নিয়েও বইয়ের অন্ত নেই। এসব বিষয় স্পষ্টতই সাক্ষ্য দেয় যেই লিডারশিপ বিষয়টি অতীতেও যেমন রহস্যময়; কিন্তু আগ্রহের বিষয় ছিল, বর্তমানেও তেমনটাই আছে। এসব প্রকাশনার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো জীবনের ক্ষুদ্রতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে সত্যিকার নেতৃত্ব কীভাবে গড়ে উঠবে, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো বয়ান এগুলো হাজির করতে পারেনি।

অন্যদিকে মুসলিমদের কাছে রয়েছে আল্লাহর রাসূলের জীবন থেকে নেওয়া নেতৃত্বের জীবন্ত ও অনবদ্য এক বাস্তব নমুনা, যার বহুমুখী ও অনিরুদ্ধ নেতৃত্ব একটা প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠতম প্রজন্মে পরিণত করেছে। তিনি শুধু নেতৃত্ব দেনইনি; বরং একই সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অসংখ্য যোগ্য মানুষ তৈরি করেছেন। তিনি নির্যাতন সইতে সইতে ভেঙে পড়া, হতোদ্যম দাসদের মধ্যেও নেতৃত্বের বীজ অঙ্কুরিত করতে পারতেন। তাদেরকেও গড়ে তুলতে পারতেন ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে। তিনি রাবি বিন আমরকে এমন করে গড়ে তুলেছেন যে, তিনি পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শক্তিশালী বীর পালোয়ান রুস্তমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যা রুস্তমের অন্তরকে ধারালো বল্লমের আঘাতের চেয়েও বেশি ভেদ করেছে। ‘উমার বিন খাত্তাব—যার নিজের বর্ণনামতে—যিনি এক পাল ভেড়াকেও ঠিকমতো সামলাতে পারতেন না, তাকে মাত্র সাড়ে দশ বছর সময়ের মধ্যে আল্লাহর রাসূল এমনভাবে গড়ে তুললেন যে, তিনি বিশাল মুসলিম জাহানের সামরিক ও রাজনৈতিক সর্বাধিনায়ক এ পরিণত হলেন।

মুসলিমরা যদি তাদের হারানো গৌরবময় ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে তাদেরকে এমন এক নেতৃত্বের ছায়াতলে আসতে হবে, যার নেতৃত্ব মানুষকে বিশ্বজাহানের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত করবে এবং বস্তুর সংকীর্ণতা ভেদ করে তাদেরকে আধ্যাত্মিকতার সুবিশাল প্রান্তরে নিয়ে যাবে। আল্লাহর রাসূল ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি অনুপ্রাণিত ছিলেন খোদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং যিনি গত চৌদ্দশত বছর ধরে তাঁর সৃষ্টিকে অনুপ্রাণিত করে আসছেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে, যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল স্ফটিকস্বচ্ছ, যার গন্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। যারা আল্লাহর রাসূলের জীবন থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তাদের জন্য শাইখ ইয়াওয়ার বেইগ এই বইয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব-উপাত্ত তুলে ধরেছেন, অনেক তথ্য উপস্থাপন করেছেন, খুবই নিপুণতার সঙ্গে।

শাইখ যখন আমাকে বইটি দেখান আমি সত্যিই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছি। আমার পরিচিত মানুষদের মধ্যে এই বিষয়ে লেখার জন্য আমার প্রিয় শাইখের চেয়ে যোগ্য মানুষ আমি কাউকে দেখিনি। আমি নিজে শাইখের তত্ত্বাবধানে পাঁচ দিন ব্যাপী লিডারশিপ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছি। এই কোর্সের অভিজ্ঞতা থেকে আমি চমৎকারভাবে উপকৃত হয়েছি। শাইখের ব্যাপারে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে যে, তিনি আল্লাহর অনুগ্রহে বইটির আলোচ্য বিষয়ের প্রতি পূর্ণ ন্যায়বিচার করার সক্ষমতা রাখেন। আমরা মহান আল্লাহর কাছে দু'আ করি, যেন তিনি বইটিকে হিদায়াতের উৎস ও উম্মাহর আগামী পুনর্জাগরণের মাধ্যম বানান। আল্লাহ যেন শাইখের কাজটিকে কবুল করেন, তার ও তার পরিবারের ওপর রহমবারি বর্ষণ করেন।

জহির মাহমুদ
ডিরেক্টর, আস-সুফফাহ ফাউন্ডেশন, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।

📘 লিডারশীপ লেসন্স > 📄 শুরুর কথা

📄 শুরুর কথা


If greatness of purpose, smallness of means and astounding results are the three criteria of human genius then who could dare to compare any great man in history with Muhammad? Lamartine, French historian and educator.

২০০৮ সালে হাজ্জের তিন দিন পরের ঘটনা। সৌদি আরবের হাজ্জ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বার্ষিক হাজ্জ কনফারেন্সে আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কনফারেন্স এবং হাজ্জের শেষে আমি এবং আমার স্ত্রী মাক্কা থেকে মাদীনা ঘুরেছি। মাদীনাতুর্ রাসূল, রাসূলুল্লাহর শহর। যখন তিনি এখানে থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এর নাম দিয়েছিলেন মুনাওয়ারাহ বা আলোকিত। খুবই অন্যরকম একটি স্থান, যা আপনার মন কখনো ছেড়ে যেতে চাইবে না। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, তিনি যখন জীবিত ছিলেন এবং এখানে ছিলেন, তখন কেমন ছিল এখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ। এমনকি এখনো, যখন তিনি কবরে শায়িত, তাঁর মহিমা ও উপস্থিতি যেন মিশে আছে এই শহর জুড়ে, মিশে আছে এর প্রতিটি ধূলিকণায়। প্রতিটি অলিগলিতে যেন তাঁর কদম মুবারকের ছাপ অঙ্কিত। সবকিছু মিলে এই শহর ও তার লোকদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছে। আমি যত শহরে ঘুরেছি, যেসব থেকে এই শহরকে তা স্বতন্ত্র করে তুলেছে। একজন মুসলমানের জন্য মাদীনায় আসা মানে নিজের ঘরে আসা। এমন ঘর যা তার জন্মস্থানের চেয়েও প্রিয়। এ ঘরেই সে মৃত্যুবরণ করতে চায়, এখানকার মাটিতেই শায়িত হতে চায়। কোনো মুসলমানের কাছে মাদীনা নিছক সৌদি আরব নয়। এটা ইসলাম, এটা তার হৃদয় এবং এমন একটি জায়গা, যেখানে যেতে সে ব্যাকুল, যেখানে প্রিয়নবি মুহাম্মাদ -এর বাড়ি। মাদীনার জন্য এই আকুলতা নিয়ে কত কবি যে কবিতা লিখেছে, তার ইয়ত্তা নেই!

ভোর থেকেই তাঁকে ভালোবেসে, তাঁর কবর জিয়ারত করতে লাখ লাখ লোকের উপস্থিতি শুরু হয়। আমি তার অনেক আগেই তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি সালাম পৌঁছালাম। কেমন ছিল সেসময়, যখন লোকেরা তাঁর কাছে আসত, তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে তাদের সালামের জবাব দিতেন এবং স্নিগ্ধ হাসি উপহার দিতেন, যে হাসিটুকু ছিল তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি দামি। যারা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েছে, যার ওপর কুরআন নাযিল হয়েছে, তাঁর মুখ থেকেই কুরআন শুনেছে তারা কতই না ভাগ্যবান!

১৪৩৫ বছর পরে, বর্তমান সময়ে আমরাও—যারা তাঁকে দেখিনি এবং তাঁর সুমধুর কণ্ঠস্বরও শুনতে পাইনি—তাঁকে অন্য যে কেউ বা যে কোনোকিছুর তুলনায় অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি যখন আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রাহমাত বর্ষণের জন্য এবং আমাদের ইসলামের দিকে পথ দেখানোর জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ পুরস্কার দেওয়ার দু'আ করছিলাম, আমার দুচোখ ভেসে যাচ্ছিল। আমাদের কাছে মাদীনা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ। আরবরা একে বলে মাদীনাতুর রাসূল বা রাসূলের শহর। এখানে যারা বসবাস করে, তারা অনেক গর্বিত। অন্য অনেক জায়গার চেয়ে অনেক কম আয় করার পরও বহু লোক এই শহরকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে; শুধু এ কারণে যে তারা মাদীনা ছেড়ে যেতে চান না। তিনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, বহু বছর, প্রজন্ম, শতাব্দী ধরে তা আজও জ্বলছে, পৃথিবীর আনাচেকানাচে সে আলো ছড়িয়ে পড়েছে।

আমি রাসূলুল্লাহর পাঁচটি অসাধারণ গুণ উল্লেখ করব, যা তিনি তাঁর জীবনে ধারণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সেগুলো সফলভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন। আর এর মধ্য দিয়ে তা তাদেরকে এমন একটি সুসমন্বিত দলে পরিণত করেছিল, যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। অথচ তারা ছিলেন সম্পূর্ণ বিসদৃশ কিছু উপজাতি, যারা খুব তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং তারা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ এবং পথপ্রদর্শকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ গুণগুলো হলো:
১। বিশ্বাস
২। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
৩। কোয়ালিটি
৪। টিমওয়ার্ক
৫। অঙ্গীকার

এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যই তাদেরকে এক্সট্রা অর্ডিনারি বা অসাধারণ করে তোলে।

📘 লিডারশীপ লেসন্স > 📄 অসাধারণ হওয়ার উপায়

📄 অসাধারণ হওয়ার উপায়


কেন অসাধারণ হতে হবে? কারণ 'যথেষ্ট ভালো' হওয়া কখনোই যথেষ্ট নয়। শুরুতেই ব্যাখ্যা করি, এক্সট্রা অর্ডিনারি বা অসাধারণ বলতে কী বোঝাচ্ছি! এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা বাকি আলোচনা বুঝব। বিখ্যাত ফরাসি শিক্ষাবিদ আলফনস ডি ল্যামারটিন-এর একটি উক্তি আছে;

যদি উদ্দেশ্যের শ্রেষ্ঠত্ব, উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ফলাফল মানবিক অসাধারণত্বের তিনটি শর্ত হয়, তাহলে ইতিহাসে মুহাম্মাদের সঙ্গে তুলনা করার মতো আর কে আছে? দার্শনিক, ধর্মপ্রচারক, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, চিন্তক, যৌক্তিক বিশ্বাসের পুনঃস্থাপনকারী, বিশটি স্থলজ এবং একটি আধ্যাত্মিক রাজ্যের স্থপতি-তিনিই মুহাম্মাদ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপক যেকোনো সূচকের বিবেচনায় আমরা জিজ্ঞেস করি, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কে আছে? [Historie de le Turquie, Paris 1854, Vol:11, Pages 276-77]

অন্যরা যা চিন্তা করে, তার চেয়ে বেশি কিছু করা জ্ঞানের পরিচায়ক, যুক্তিসংগত ও যৌক্তিক; কিন্তু অসাধারণ হতে হলে যেকোনো উপায়ে অস্বাভাবিক রকম সেরা হতে হবে। মনের গহিনে এমন ডাক শুনতে পারা, যা অন্যরা বড়জোর চিন্তা করতে পারে; সেই তালে পথ চলা, যা অন্যরা শুনতে না পেলেও পিছু পিছু কদম বাড়ানোর উৎসাহ পায়। এ ধরনের লোক তারাই, যারা অসাধারণ, যারা অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তারা শুধু নিশ্বাস নেওয়ার জন্য বেঁচে থাকে না।

তাই কেউ যদি নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই টিকে থাকার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে, যা অন্য কেউ করেনি। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়; বরং অন্যরা যেন বুঝতে পারে তাদের পক্ষেও এমন কাজ করা সম্ভব। নিজেকে বাস্তবতার চেয়ে ছোট করে দেখানোর চেয়ে মহৎ কিছু নেই। নেতা হতে হলে প্রথাগত ধ্যানধারণা এবং নিজের তৈরি সীমারেখা নিজেকেই বারবার পেরিয়ে যেতে হয়। কারণ, কেউ শীর্ষে পৌঁছার ক্ষেত্রে শত্রু নয়, সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের মন।

নেতা হতে চাইলে মানুষের মন এবং আধ্যাত্মিক দুনিয়ার এমন গহিনে যাওয়ার সাহস অবশ্যই থাকতে হবে, যেখানে কেউ অভিযান চালানোর সাহস করে না। সব সময় সঠিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে-এমন বিষয়কেও প্রশ্ন করতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ধারণাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যত মূল্যই দিতে হোক না কেন, তাকে অবশ্যই সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। অতি অবশ্যই নির্যাতিত, দুর্বল এবং বঞ্চিতদের পক্ষে এবং প্রবল বিক্রমশালী অত্যাচারীর বিপক্ষেও দাঁড়িয়ে লড়তে হবে। এ সকল বিষয় একজন নেতাকে সর্বসাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে সহযোগিতা করে। বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একজন নেতাকে কেবল ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত হলেই চলে না, জনগণের মনে এই বিশ্বাস থিতু হয়ে যেতে হবে যে, তাকে অনুসরণ করার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে।

সংজ্ঞানুযায়ী, নেতৃত্ব সামনে থেকেই দিতে হয়। তাই নেতৃত্ব দেওয়া বিশাল সাহসের ব্যাপার। প্রত্যাশা সামান্য হলে মানুষ জেগে ওঠে না, তারা তখনই জাগে, যখন প্রত্যাশা অনেক বেশি হয়। তাদের এমন নেতা প্রয়োজন, যে এগিয়ে নিতে পারে, পিছিয়ে দিতে নয়।

নেতাকে একই সঙ্গে অবশ্যই লক্ষ্য এবং কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। কেবল বড় বড় স্বপ্ন দেখা ও দেখানোই যথেষ্ট নয়, যদি সেগুলো কীভাবে অর্জন করা হবে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা না থাকে। একজন নেতাকে স্বপ্ন দেখার মতো যোগ্য হতে হবে এবং তার অনুসারীদেরকে এমন এক পথ ধরে নিয়ে যেতে হবে, যে পথ শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে তার সুফল ছড়িয়ে দিতে পারবে। অসাধারণ হতে হলে একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখার মতো ক্ষণস্থায়ী কাজ এবং সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মতো দীর্ঘস্থায়ী কাজও করার যোগ্য হতে হবে। এজন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রকমের লোক প্রয়োজন হয়। এ ধরনের লোক খুঁজে বের করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ, একজন নেতার পক্ষে একাই সবকিছু সামলানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য খুবই যোগ্য এবং অনুগত একদল লোক তৈরি করা না হলে সবচেয়ে উত্তম স্বপ্নটিও আকাঙ্ক্ষার রাজ্যে নির্বাসিত হয়ে যায়। যোগ্য অনুসারী জোগাড় করা, তাদেরকে সর্বোচ্চ ত্যাগে অনুপ্রাণিত করা, কার্যকরী প্রশিক্ষণ ও দক্ষ হাতে পরিচালনা করা একজন নেতার মৌলিক কাজ। সব সময় তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন। কাজগুলো ঠিকমতো করছে কিনা, করতে পারছে কি না-তা তদারকি করা প্রয়োজন। এসব কর্তব্য আঞ্জাম দেওয়ার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ সাধারণ থেকে অসাধারণ নেতা হয়ে ওঠেন।

একজন অসাধারণ নেতাকে অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থা-পদ্ধতি তৈরি করে যেতে হবে, যা তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কোনো অসাধারণ প্রতিভাকে যদি দারুণ একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে রূপান্তর করা না যায়, তাহলে নেতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুও কার্যকর হয়ে যায়। নস্টালজিয়া হিসেবে হয়তো মাঝে মাঝে স্মরণ করা হবে; কিন্তু নেতার পরবর্তী প্রজন্ম তার প্রতিভা থেকে কোনোভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ আর থাকবে না। কোনো মহৎ সংগঠনকে সফল হতে হলে নেতাকে ব্যক্তি-পরিচালনাধীন (person driven) থেকে নিয়মতান্ত্রিকতার অধীন (process driven) রূপান্তর করতেই হবে। তা না হলে নেতার কাজ প্রজন্ম পরিবতর্ন করার মতো উন্নত লক্ষ্য সাধন হবে না। রাসুলল্লাহ্ অসাধারণ লিডারশিপের মানদণ্ড এত প্রাণবন্ত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, সবচেয়ে খারাপ শত্রুও তাঁর পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হয়। এর অনেক প্রামাণ্য ঘটনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ-এর চিঠি পাওয়ার পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সঙ্গে আবু সুফিয়ানের কথোপকথনের ঘটনাটা আমরা উদাহরণ হিসেবে মনে করতে পারি।

অসাধারণ হওয়া নেতার ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটা অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। এমন সব দিকে অসাধারণ হতে হবে, যা লোকদের অনুপ্রেরণা দেবে, শক্তিমান করবে, তাদের মধ্যে সামর্থ্য সঞ্চার করবে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করবে। সাহসীরাই অন্যদের সাহস দিতে পারে। মানবজাতির ইতিহাসে এমন কেউ নেই, যিনি মুহাম্মাদ-এর মতো জীবনের সবক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহরণ দেখিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর সাথিরা তাঁর প্রতি আনুগত্যের এক উদাহরণীয় ভিন্ন মাত্রা প্রদর্শন করেছিলেন। তারা তাঁকে ভালোবেসেছিলেন এবং তিনিও তাদেরকে।

📘 লিডারশীপ লেসন্স > 📄 অসাধারণ বিশ্বাস কী?

📄 অসাধারণ বিশ্বাস কী?


রাসূলুল্লাহ-এর মধ্যে যে অসাধারণ গুণাবলির সন্নিবেশ ঘটেছিল, সেগুলোর প্রথমটি হলো বিশ্বাস। বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বারবারা উইন্টার্সের ভাষায় বলি, কোনো বিষয়ে ঝুঁকি নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ভরসা করার যোগ্যতা থাকা।

"When you come to the end of the light of all that you know and are about to step off into the darkness of the unknown, faith is knowing that one of two things will happen. There will be something firm to stand on or you will be taught how to fly." ~Barbara Winters

'যখন তুমি আলোর একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবে এবং অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে, তখনও তুমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে, সামনে নিশ্চয় এমন শক্ত কিছু পাবে যেখানে পা রাখা যাবে, অথবা তুমি উড়তে শিখে যাবে। এ দুটি জিনিসের যেকোনো একটি অবশ্যই ঘটবে, এমন শক্তপোক্ত ধারণা করাটাই বিশ্বাস।'

শব্দগুলোর ব্যবহার খেয়াল করুন। তিনি কিন্তু বলেননি, Faith is believing. তবে বলেছেন, Faith is knowing এবং এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। To know বা জানা হলো সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত বিশ্বাস করা। বিশ্বাসের এ গুণটাই যে কাউকে ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। শেষ প্রান্তে পৌঁছে পা বাড়ানোর সময় বিশ্বাস করা যে, আপনি ধ্বংস হবেন না; বরং আপনার জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে এবং আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের এমন স্তরে পা রাখবেন-যা কখনো ভাবতেও পারেননি।

বিশ্বাস খুবই জরুরি। কারণ, এটা ছাড়া মানুষের হৃদয় ও ভাবাবেগ পরিবর্তন করার মতো কঠিনতম কাজ অসম্ভবই থেকে যায়। বিশ্বাস শব্দটি ক্ষুদ্র; কিন্তু এর অর্থ বিশাল। একেক মানুষের কাছে এর অর্থ একেক রকম। তাই আমি 'ফেইথ' বলতে কী বোঝাচ্ছি, তা বরং ব্যাখ্যা করি।

আমার মতে ফেইথ একটি ডায়নামিক প্রসেস, যেখানে তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটে। এগুলো হলো:
১. কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা।
২. আল্লাহর নিয়ামাতের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া।
৩. আমাদের পাপ ও ভুলগুলোর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা। একই সঙ্গে বিনীত আর্জির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা। কারণ একটাই, আমরা তাঁকে ভালোবাসি।

বারবারা উইন্টার্স যেভাবে বলেছেন, ঈমান হলো এমনভাবে জানা, যখন বস্তুগতভাবে সঠিক হওয়ার তোয়াক্কা না করেও বিশ্বাসকে অটল রাখা যায়। ঈমান নিছক বাস্তববাদী দুনিয়ার বক্তব্যের মতো অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়। ঈমান হলো বস্তুকে অতিক্রম করে এমন কিছু দেখতে পারা, যা সাদা চোখে দেখা যায় না বা বর্ণনা করা যায় না; কিন্তু হৃদয়ের চোখ দিয়ে পুরোপুরি অনুভব করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

জার্মানদের সঙ্গে তীব্র যুদ্ধের পর একজন সৈনিক তার অফিসারের কাছে নো ম্যান'স ল্যান্ড এলাকায় গিয়ে সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে আসার অনুমতি চাইল। অফিসার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, দেখো সে মরে গেছে। এখন তোমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার দেহ নিয়ে আসার দরকার কী? কিন্তু সৈনিক তার অবস্থানে অনড়, ফলে একপর্যায়ে অফিসার তাকে অনুমতি দিলেন এবং কোম্পানিকে নির্দেশ দিলেন সৈন্যটি সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে ফেরত আসা পর্যন্ত তাকে কাভার দিতে। কয়েক মিনিট পর সৈন্যটি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এল, তার কাঁধে সেই সহযোদ্ধার লাশ। অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়ায় কী লাভ হলো? বাঁচাতে তো আর পারলে না!
সৈন্যটি বলল, স্যার, আমি যখন তার কাছে পৌঁছলাম, দেখি সে তখনো বেঁচে আছে। আমাকে দেখে বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং আমার কাঁধেই মারা গিয়েছে। লাভ এটুকুই।

বিশ্বাস অন্ধ নয়; এটি এমন কিছু দেখতে পায়-যা অবিশ্বাসীর সৌভাগ্যে জোটে না। ভালোবাসা, নিষ্ঠা, বিনাস্বার্থে করা সহযোগিতার লেন্স দিয়ে এটি দেখতে পায়। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই বিশ্বাস। বিশ্বাস তীব্র প্রচেষ্টায় হতাশার অন্ধকার রাস্তাকে আলোয় বিকরিত করে। কারণ, এটি জানে এই পথে সফলতা ও ব্যর্থতা মাইলের হিসাবে মাপা হয় না; বরং যিনি অন্তরের খোঁজ রাখেন, তাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে উঠে দাঁড়ানো ও প্রচেষ্টা চালানোর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে এর আদ্যোপান্ত। যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখনও যে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তার মুখের হাসিই পরম বিশ্বাস। কারণ, সে এমন কিছু শুনতে পেয়েছে যা অন্যরা পায়নি।

সে যখন হাঁটে, অন্যরা থেমে গিয়ে তাকে দেখে এবং বিস্মিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে তারাও ঘুরে দাঁড়ায়, দলে দলে তার সঙ্গে যোগ দিতে থাকে এবং এটি একটি কাফেলায় রূপ নেয়। তারা তাকে অনুসরণ করে। কারণ, এর মধ্যেই তারা জীবনের অর্থ এবং নিজেদের পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়। ইসলামের ভাষায় বিশ্বাস হলো 'তাওয়াক্কুল' বা নির্ভরতা। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,
যেই আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। তাকে তার ধারণাতীত উপায়ে রিস্ক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। [সূরা তালাক ৬৫: ২-৩]

তাওয়াক্কুল-বিশ্বাস ওপরে বর্ণিত তিনটি কাজের ফলাফল।

তাওবা (ক্ষমা প্রার্থনা)
আল্লাহ তা'আলা আমাদের অপরাধের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ করেছেন। তাওবা হলো পথনির্দেশনা পাওয়ার প্রথম শর্ত; কারণ তাওবা কোনোকিছু পরিবর্তনের আগ্রহ নির্দেশ করে। মানুষ যদি কোনো পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন না হয় বা প্রয়োজন অনুভব না করে, তাহলে সহজে পরিবর্তন বা সংশোধন সম্ভব নয়। তাই আমরা যখন তাওবা করি, তার মানে হলো আমরা আমাদের মনোভাব এবং পথ পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন হয়েছি।

আল্লাহ তা'আলা হজরত আদম ও হাওয়াকে দুনিয়ায় প্রেরণের পর প্রথমে তাওবা শিক্ষা দিয়েছিলেন। ইবলিস, আদম, হাওয়া-প্রত্যেকেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধে ভুল করেছিল; কিন্তু পার্থক্য তৈরি হলো তাদের মনোভাবে-যখন তারা তাদের ভুল সম্পর্কে সচেতন হলো। আদম ও হাওয়া সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হলেন এবং বললেন,
হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অতি অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। [সূরা আ'রাফ ৭: ২৩]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাদের ক্ষমা করে দেন, সঠিক পথের দিশা দেন এবং পরবর্তীদের পথ নির্দেশনার উৎস বানিয়ে দেন। অন্যদিকে ইবলিস অনুতপ্ত ছিল না; বরং সে আল্লাহর কাছে সময় চেয়ে বলল, আমাকে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। [সূরা আ'রাফ ৭: ১৪]

আজ আমাদের যদি খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে বলা হয়, আমরা সময় চেয়ে নিই। আমাদের ভেবে দেখা উচিত, আমরা কার মনোভাবের পুনরাবৃত্তি করছি? আদম-হাওয়ার নাকি ইবলিসের? অন্যায়ের ওপর অটল থাকা খারাপ পরিণতির কারণ। আরবিতে বলা হয়, 'লা কাবিরা মা'আল ইসতিগফার ওয়া লা সগীরা মা'আল ইসরার' অর্থাৎ পাপ যত বড়ই হোক না কেন, তাওবা করলে তা বড় থাকে না; আর পাপ যত ছোটই হোক, অবিরাম করতে থাকলে তা আর ছোট থাকে না। পাপের ওপর অটল থাকার ফলে হিদায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং আমাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। যারা নিজেদের সংশোধন প্রত্যাখ্যান করে পাপের ওপর গোঁ ধরে থাকে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
তারা যখন তাদের দেওয়া উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি যখন তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল। [সূরা আন'আম ৬: ৪৪]

আল্লাহ তা'আলা হলেন 'গায়ূর' (গর্বিত, সম্মানিত) এবং আমাদের নিজেদেরকে সংশোধনের একাধিক সুযোগ দেওয়ার পরও যখন আমরা তাঁর বিরোধিতা করে থাকি, তখন তিনি হিদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন। পরিবর্তে তার জন্য বিরুদ্ধাচরণের সব দরজা খুলে দেন, যেন সে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়। তারপর যখন হঠাৎ মৃত্যু তার সামনে উপস্থিত হয়, তখন তার কাছে তাওবা করার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহ আমাদের এমন করুণ পরিণতি থেকে হিফাজাত করুন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব রকমের অবাধ্যতা ও পাপ থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন। কোনো পাপকেই ছোট বা ক্ষুদ্র জ্ঞান করা উচিত নয়; কারণ যেকোনো পাপই আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন এবং এ ধরনের মনোভাব খুবই ভয়ানক। তাই কেবল নির্দিষ্ট কোনো কাজ নয়; বরং আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। কারণ, পাপ-প্রবণ মানসিকতাই মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। সকল পাপের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো শিরক করা এবং কেউ যদি এর ওপর মৃত্যুবরণ করে, তাহলে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করলেও এটা ক্ষমা করবেন না।

দীনের যে সকল বিষয় আমাদের ভালো লাগে, সেগুলো পালন করা এবং যেগুলো ভালো লাগে না, সেগুলো ত্যাগ করার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। এটা অহংকারের চূড়ান্ত রূপ এবং আল্লাহর ক্রোধের কারণ। বর্তমান সময়ে এমন অনেক মুসলমান আছে, যারা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এমন অনেক কিছুকে বৈধ করে নিয়েছে, আবার তারা নামাজও পড়ে। আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ যারা ত্যাগ করে না, তারা কীভাবে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, 'ইয়‍্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়‍্যাকা নাসতাঈন' (আমরা কেবল আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই)। এ ধরনের ঔদ্ধত্য, নিজেদের ইচ্ছামতো বিধান বেছে নেওয়া, স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপন দুনিয়া এবং আখিরাত দুদিকেই শাস্তি অবধারিত করে তোলে।

তাই আল্লাহর অবাধ্যতা এবং রাসূল -এর সুন্নাহের বিপরীত সবকিছু আমাদের অবিলম্বে পরিত্যাগ করতে হবে; যথাসম্ভব দ্রুত তাওবা ও ইসতিগফার করে দীন পালনে মনোযোগী হবে। কতদিন ধরে এই কাজ করা উচিত? যতদিন আমরা বেঁচে থাকি, ততদিন। তাওবা মানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দিকে ফিরে আসা এবং ইসতিগফার হলো আল্লাহর কাছে অতীত পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমে ফিরে আসার উপায়। তাওবা এবং ইসতিগফার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটি আরেকটিকে অনুসরণ করে। ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযি এ বিষয়ে খুব সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: তাওবা ও ইসতিগফারের অর্থ

বিদ্বানরা তাওবা (ক্ষমাপ্রার্থনা) বলতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বুঝিয়েছেন: ১) পাপ পরিত্যাগ করা ২) পাপের পথে পুনরায় ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা করা ৩) কৃত পাপের জন্য অনুশোচনা করা ৪) যদি পাপটি অন্য কোনো মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তবে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
এগুলো তাওবার শর্ত হিসেবে বিবেচিত; তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বর্ণিত তাওবার অর্থ আরও ব্যাপক। উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও ধৈর্য সহকারে আল্লাহর সকল নির্দেশ মেনে চলাও এর অন্তর্ভুক্ত। যারা তাওবা করতে অনাগ্রহী, তাদের অপছন্দ করা, তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করা, সুযোগ বুঝে তাদের তাওবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসকে উপেক্ষা না করার ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়াও তাওবার অন্তর্ভুক্ত। সোজা কথায় তাওবা হলো পাপ সংগঠনের বিপরীত কাজ। শুধু পাপ ত্যাগ করা এবং এর জন্য অনুশোচনা করাই তাওবার সবটুকু নয়। তাওবার সামগ্রিক সারমর্ম হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তিনি যা পছন্দ করেন তা পালন করা এবং যা অপছন্দ করেন তা পরিত্যাগ করা। তাওবা হলো আল্লাহর অপছন্দনীয় থেকে পছন্দনীয় কাজের দিকে, অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার দিকে, ক্রোধ থেকে দয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন করা।

ইসতিগফার এবং তাওবা
ইসতিগফার মানে ক্ষমা চাওয়া এবং তাওবা মানে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। যখন কেউ তার ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহর বাধ্যগত হয়ে যায় এবং তার কাজের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন সেটা হয় তার ভেতর ইসতিগফার ও তাওবার পারস্পরিক সক্রিয়তার যোগফল। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী যে কারোর জন্য দুটোই করণীয়। তাকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে তার ভুল, পাপ এবং খারাপ কাজ স্বীকার করতে হবে এবং তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। একই সঙ্গে তাকে অবশ্যই শর্তহীনভাবে খারাপ কাজগুলো ত্যাগ করতে হবে এবং আল্লাহর অনুগত হতে হবে।

যেমন: কেউ যদি নামাজ না পড়ে, তাহলে সে সবচেয়ে খারাপ কাজগুলোর একটি করার দোষে দুষ্ট। যখন সে তার কৃতকর্মের লোকসান সম্পর্কে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, দেরি না করে সে আল্লাহর দরবারে ইসতিগফারের মাধ্যমে ক্ষমা চাইবে এবং তাওবা করে পাপ থেকে ফিরে আসবে। পেছনের না পড়া নামাজ কাযা করে নেবে এবং এখন থেকে নিয়মিত প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পাবন্দি করবে। নিয়মিত নামাজ পড়াই হলো তার তাওবা বা প্রত্যাবর্তন; যা ছাড়া ইসতিগফারের কোনো মূল্য নেই। কুরআনে ইসতিগফার—যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা—শব্দটি দুভাবে বর্ণিত হয়েছে। হয় শুধু ইসতিগফার, অথবা তাওবার সঙ্গে মিলে। শুধু একক ইসতিগফারের ব্যবহার পাওয়া যাবে নিচের আয়াতে, যেখানে হজরত সালেহ তাঁর জাতির উদ্দেশে বলছেন,
হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছ না কেন? হয়তো তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে। [সূরা নাম্ল ২৭: ৪৬]
আল্লাহ আরও বলেন, আর আল্লাহর কাছেই মাগফিরাত কামনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়। [সূরা মুয্যাম্মিল ৭৩: ২০]
তিনি আরও বলেন, ক্ষমাপ্রার্থনা মানুষকে ক্রোধ থেকে রক্ষা করে:
অথচ আল্লাহ কখনোই তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তা ছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমাপ্রার্থনা করতে থাকবে, আল্লাহ কখনও তাদের ওপর আযাব দেবেন না। [সূরা আনফাল ৮: ৩৩]

তাওবার সঙ্গে মিলে ইসতিগফারের ব্যবহার নিচের আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়:
আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তারপর তাঁরই দিকে ফিরে এসো। তাহলে তিনি তোমাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশি দেবেন। আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের ওপর এক মহাদিবসে আযাবের আশঙ্কা করছি। [সূরা হুদ ১১: ০৩]
আর হে আমার কওম, তোমাদের রবের কাছে তোমরা মাফ চাও, তারপর তাঁরই দিকে ফিরে এসো। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর বারিধারা বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির ওপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মতো বিমুখ হয়ো না। [সূরা হুদ ১১: ৫২]
আর সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে প্রেরণ করি, তিনি বললেন-হে আমার জাতি, আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। তিনিই মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাতেই তোমাদের বসতি দান করেছেন। অতএব, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চলো; আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, নিশ্চয় তিনি ডাকে সাড়া দেন। [সূরা হুদ ১১: ৬১]

কেউ যদি পাপ করতেই থাকে, আর তাওবার শর্ত পূরণ না করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়; তবে এটি সত্যিকারের ইসতিগফার নয় এবং এটা তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে না। ইসতিগফারের মধ্যে তাওবা অন্তর্ভুক্ত এবং তাওবার মধ্যে ইসতিগফার: প্রত্যেকটি অন্যটির মধ্যে উহ্য আছে।
ইসতিগফার শব্দের তাৎপর্য ব্যাপক। এর মধ্যে বর্ম বা আড়ালের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অর্থও অন্তর্ভুক্ত-আমাদের মানবিক ত্রুটিবিচ্যুতি এবং যাবতীয় ধ্বংসাত্মক ভুল থেকে আড়াল বা রক্ষা করা। মানুষের সবচেয়ে ক্ষতিকর বিচ্যুতি হলো অজ্ঞতা এবং পাপ। এ দুটি ত্রুটির কারণে মানুষ এমন পর্যায়ে নেমে যায়, যা তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই দুই ধরনের ত্রুটি থেকে রক্ষা করার বর্ম হলো নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজের মধ্যে স্রষ্টাপ্রদত্ত জ্ঞান, সুবিচার, ধার্মিকতা স্পষ্ট করা। আল্লাহ মানুষের মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমে যে মর্যাদা দান করেছেন, মানুষ যতই তা ভুলে যাবে, ততই তার পাপ ও অজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে এবং সে নিজেকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনবে।

যখন তাওবা ও ইসতিগফার শব্দ দুটো একত্রে ব্যবহৃত হয় (ইসতিগফার এর পরে তাওবা), তখন একটির (ইসতিগফার) অর্থ হলো যা ঘটে গেছে তার মন্দ ও ক্ষতি থেকে প্রতিরক্ষা চাওয়া। দ্বিতীয়টির (তাওবা) অর্থ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতের মন্দ থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা করা। এখানে দুটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, একটি হলো সেই পাপ, যা ইতোমধ্যেই সংগঠিত হয়ে গেছে, ইসতিগফারের মাধ্যমে তার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা করা হচ্ছে। আবার অন্যটি হলো, আগামীতে একই পাপের পুনরাবৃত্তি; যার ভয় আমরা করছি, তা আর না করার দৃঢ় সংকল্পের নাম তাওবা। আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসতিগফার ও তাওবা দুটোই সমানভাবে আবশ্যক। যখন একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন দুটোই আলাদাভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব প্রকাশ করে। আবার যখন একাকী ব্যবহৃত হয়, তখন প্রত্যেকটি অন্যটিকেও বুঝিয়ে থাকে।

তাওবার সবচেয়ে বড় উপকার হলো এটি নিজেই আমাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে, নিজেই আমাদের জীবনের প্রতি আমাদের মনযোগ নির্দিষ্ট করে। কারণ, তাওবা করার সময় আমরা আমাদের জীবনে কৃতকর্মের হিসাব করে নিই। তাওবা আমাদের মধ্যে নম্রতা প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেই সত্যের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে যে, একদিন আমরা মৃত্যুবরণ করব এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাব। তবে কোনোভাবেই আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। তিনি বলেছেন,
বলুন, (আল্লাহ বলেছেন) হে আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রাহমাত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩]

আমাদের বিশ্বাস-যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ নিষ্ঠার সঙ্গে ক্ষমা চায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তাই আমরা কখনোই আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হই না। যখন আমরা অনুশোচনা করতে অস্বীকার করি এবং মাত্রাতিরিক্ত পাপে জড়িয়ে পড়ি, তখন হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং এ ধরনের কাজ আমাদের কুফরের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন,
যারা কাফের হয়েছে, আপনি তাদের ভয় প্রদর্শন করুন বা না করুন-উভয়টাই তাদের জন্য সমান। তারা ঈমান আনবে না, আল্লাহ তাদের অন্তঃকরণ এবং কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। [সূরা বাকারা ২: ৬-৭]

তাওবা কবুল হওয়ার তিনটি শর্ত রয়েছে:
১. যিনি তাওবা করছেন, তাকে প্রকৃতভাবেই অনুশোচনাকারী ও অনুতপ্ত হতে হবে এবং যে কাজের জন্য তাওবা করছেন, সেটা ঘৃণা করতে হবে। আদম এবং হাওয়া সেই পরিস্থিতিতে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হন এবং তৎক্ষণাৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারা তাদের কাজকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করার কোনো চেষ্টা করেননি। বুঝতে পারার পর দেরি করেননি কিংবা সময় চাননি। তারা আল্লাহকে অমান্য করার ভয়াবহতা অনুভব করেছিলেন। কারণ, তারা আল্লাহর মহিমা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো পাপই 'ক্ষুদ্র' নয়। কারণ, সকল পাপই আল্লাহর অবাধ্যতা এবং তিনি কোনো 'ক্ষুদ্র' সত্তা নন।
২. যিনি তাওবা করছেন, তাকে একই কাজের পুনরাবৃত্তি না হওয়া নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আদম এবং হাওয়া কতবার আল্লাহকে অমান্য করেছিলেন? একবার। তারা তাদের দীর্ঘ জীবনে সেই একবারের পর আর কখনো পাপ করেননি। পাপের পুনরাবৃত্তি না করাই ক্ষমা চাওয়ায় আন্তরিকতার চিহ্ন।
৩. যিনি তাওবা করছেন, তার কৃত পাপের কারণে কারও ক্ষতি হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। যেমন: তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণ করা ইত্যাদি। কখনো কখনো পাপের প্রকৃতি এমন হয় যে, তা অন্যের বস্তুগত, ব্যক্তিগত অথবা অন্য যেকোনোভাবে ক্ষতি সাধন করে। এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে এবং তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কাজ ছাড়া আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। কারণ, সে যার প্রতি অন্যায় করেছে, সে আল্লাহ নয়, অন্য কেউ।

সকল আধ্যাত্মিক উন্নতি শুরু হয় আল্লাহর দিকে ফেরার মাধ্যমে এবং এ কারণে আমি এই প্রসঙ্গটা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলাম।

সবর এবং শোকর (ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা)
দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মানুষ কেবল তখনই সন্তুষ্টি এবং অন্তরে প্রশান্তি লাভ করে, যখন সে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামাতের জন্য কৃতজ্ঞ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবো এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয় আমার শাস্তি হবে কঠোর। [সূরা ইবরাহীম ১৪: ৭]

তাওবা করার তাওফিক এবং সুযোগ দেওয়ার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাওবার পথ খোলা না রাখতেন, তাহলে আমাদের কী হতো? একজন মানুষ আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামাতের জন্য যত বেশি শোকরগুজার হবে, তত বেশি সে এই নিয়ামাত সম্পর্কে জানবে এবং আল্লাহকে ভালোবাসবে। কৃতজ্ঞতা আল্লাহর বিশালতা ও গরিমা বিষয়ে বান্দাকে আরও সুচারু করে। এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও মালিক যে মানুষের প্রতি দয়াবান, সেই সম্বন্ধে সমৃদ্ধ করে। কৃতজ্ঞতার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো মানুষ যে কারণে কৃতজ্ঞ, তা আরও উপভোগ্য হয়। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞতার প্রথম শাস্তি হিসেবে তার আনন্দ কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে মানুষ তার যা আছে, তা নিয়ে সুখী হতে পারে না এবং স্ব-নির্যাতনের যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে।

শোকর বা কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, এটা তাঁর অধিকার। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলে নিয়ামাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি আমাদের পুরস্কৃত করবেন। পবিত্র কুরআনে বিসমিল্লাহর পর একদম প্রথম আয়াতটিই শোকরের আয়াত: 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল 'আলামীন' (সকল প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর প্রতি)। আল্লাহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তাঁর উপকার ও পুরস্কারের কথা যেমন বলেছেন, কৃতঘ্ন ব্যক্তিকে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্কও করে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি 'কুফর' (অস্বীকার করা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তারপর শাস্তির কথা বলে 'শাদীদ' বিশেষণ এনে আল্লাহর সাজা অনেক কঠিন বলে ধমকে দিয়েছেন।

যারা সবর (ধৈর্য) করবে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সাহায্য করার এবং পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে শোকর। বান্দা সর্বাবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করবে। এ কারণে সবর ও শোকর পারস্পরিক সম্বন্ধযুক্ত।
হে মুমিনরা, তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সূরা বাকারা ২: ১৫৩]
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। যদি তা কর, তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে, এবং তোমাদের ক্ষমতা-সক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। [সূরা আনফাল ৮: ৪৬]

সবর আর শোকর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ইসলামে সবর বা ধৈর্যের ধারণাটি অদ্বিতীয়। সাধারণভাবে ধৈর্য বলতে বোঝায় কঠিন সময়কে নীরবে সহ্য করা, সবর তা বোঝায় না। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে ধৈর্য বা সবর অর্থ হলো, যা ঘটছে তাকে আল্লাহর নির্ধারণকৃত তাকদীর হিসেবে মেনে নেওয়া। এর মানে হলো, নিজের সর্বশক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রচেষ্টা চালানো এবং ফলাফলের জন্য তার ওপর নির্ভর করে থাকা। আল্লাহ তা'আলা অনেক জায়গায় 'মুজাহিদূন' বোঝানোর জন্য 'সাবিরুন' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। একজন মুজাহিদ শুধু আল্লাহর সাহায্যের জন্য বসে থাকে না। সে তার কাছে যা আছে, তাই নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় প্রচেষ্টা চালায় এবং আল্লাহর সাহায্যের জন্য দু'আ করতে থাকে। যে যুদ্ধ করছে, সে কখনো বসে থেকে কষ্ট সহ্য করে না। সর্বদা জাগ্রত থাকে, বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে, চিন্তা ও পরিকল্পনা করে। যুদ্ধে জয়ের জন্য তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়। সমস্ত কাজের নাযরানায়, প্রচেষ্টার শেষে সে তার রবের দরবারে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে। সে জানে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে কোনোকিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

সবর মানে কাজ করা; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং তারপর আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। সবরের এই ধারণাটি রাসূলুল্লাহ-এর জীবনে বদরযুদ্ধের সময় দেখা যায়। যখন তিনি সামান্য উপকরণ নিয়ে যথাসম্ভব প্রস্তুতি গ্রহণ করে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যান এবং তাঁর বিখ্যাত দু'আটি করেন। সাহায্যের আবেদন নিয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে বিনীত হয়ে বলেন-হে আল্লাহ, আত্মাভিমানী এবং উদ্ধত কুরাইশরা তোমার প্রতি অহংকার দেখিয়ে এবং তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এখানে উপস্থিত হয়েছে। হে আল্লাহ, তুমি যে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, আমি তার প্রতীক্ষায় আছি। আমি তোমার কাছে মিনতি করছি, আল্লাহ তুমি তাদের পরাজিত করো। হে আল্লাহ, আজ যদি মুসলমানদের এই দল পরাজিত হয়, তা হলে দুনিয়ায় আপনার ইবাদাত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

তিনি কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত ছড়িয়ে অনবরত তাঁর রবকে ডাকতে লাগলেন। কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যাওয়া পর্যন্ত তাঁর সে আহাজারি থামেনি। আবু বাক্স এসে চাদরটি তুলে রাসূলুল্লাহ-এর কাঁধে চড়িয়ে দিয়ে বললেন-হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আপনার রবের নিকট যথেষ্ট কান্নাকাটি করেছেন। তিনি অবশ্যই তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।

অবিলম্বে আল্লাহর সহায়তা নেমে এল। তিনি তাঁর রাসূল এবং তাঁর সাথিদের সহায়তা করার জন্য আসমান থেকে ফেরেশতাদের পাঠিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলেন,
স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের কাছে ওয়াহি পাঠিয়েছিলেন- আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি-সুতরাং মুমিনদের অবিচল রেখো। অচিরেই আমি কাফিরদের অন্তরসমূহে ভয় ঢুকিয়ে দেবো তাই তাদের ঘাড়সমূহে আঘাত করো এবং আঘাত করো তাদের জোড়ায় জোড়ায়। [সূরা আনফাল ৮: ১২]
স্মরণ করো, যখন তোমরা নিজ রবের কাছে সাহায্য চেয়েছিলে, তিনি তখন তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জরি দান করলেন যে, আমি তোমাদের সাহায্য করব ধারাবহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে। [সূরা আনফাল ৮: ০৯]

আয়াত নাযিলের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ হেলান দিয়ে কিছুটা তন্দ্রাবস্থায় ছিলেন। তারপর তিনি মাথা তুললেন। তাঁর চোখে আনন্দের অশ্রু, বললেন: হে আবু বাক্স, তোমাকে অভিনন্দন। আল্লাহর বিজয় সন্নিকটে। বালুঝড়ের মধ্যে আমি ঘোড়ায় বসা জিবরাইলকে দেখতে পাচ্ছি। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, এ দল তো সত্বরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। [সূরা কামার ৫৪: ৪৫]

জিবরাইল-এর নির্দেশনা অনুযায়ী রাসূল ﷺ একমুঠো নুড়ি বালি তুলে নিলেন, শত্রুদের দিকে ছুড়ে মেরে বললেন, বিভ্রান্তি তাদেরকে পাকড়াও করুক। তার ধূলি নিক্ষেপ করা মাত্র এক ভয়ানক বালুঝড় বিস্ফোরিত অগ্নিকণার ন্যায় শত্রুদের চোখে ছিটয়ে পড়তে লাগল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, আর তুমি নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে; বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং। [সূরা আনফাল ৮: ১৭]

হাদীসের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায়, সেদিন আক্ষরিক অর্থেই ফেরেশতারা এসেছিলেন এবং মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন: সেদিন যখন মুসলমানরা একেকজন কাফিরকে তাড়া করছিল, তখন তার ওপর চাবুকের আওয়াজ শুনতে পাওয়া হচ্ছিল এবং একজন ঘোড়সওয়ার বলছিল, আঘাত হানো হাইজুম। তিনি দেখলেন, শত্রুসৈন্য মস্তকছিন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একজন আনসার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। রাসূল ﷺ বললেন, তুমি সত্য বলেছ। এটা ছিল তৃতীয় আসমান থেকে আসা সাহায্য। বদরে রাসূলুল্লাহ বিপদাপদের মুখোমুখি হলে সালাত এবং সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার কুরআনিক নির্দেশনার একটি বাস্তব নমুনা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তারপরই তিনি তাঁর রবকে ডেকে ছিলেন।

আল্লাহর ভালোবাসা
যখন কেউ তাওবা ও ইসতিগফার করে এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহর অনুগ্রহের শোকর করে, এটা স্বাভাবিক যে সে আল্লাহকে ভালোবাসতে শুরু করবে। তবে আল্লাহর ভালোবাসার সঙ্গে অন্যান্য ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা হলো ইবাদাত এবং এটা কেবল স্রষ্টার নির্ধারিত উপায়েই প্রকাশ করতে হবে। আমরা যে রকম চাই, সে রকমভাবে প্রকাশ বা স্বীকার করার মতো কিছু নয়। যে সকল মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে, তারা সর্বদা তাঁর অনুগত এবং কখনোই তাঁর প্রদত্ত নিয়ামত অবাধ্য পথে ব্যবহার করা অকৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। একারণেই আল্লাহর নৈকট্যের উপায় হলো কাসরাতুস সুজ্জুদ, অর্থাৎ বেশি বেশি সিজদা করা। সিজদা হলো মুসলমানদের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সে কোনো প্রকার সংকোচ এবং শর্ত ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। ঠিক এ কারণেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম। মুসলমানের জন্য তার স্রষ্টা ব্যতীত অন্য কারও নিকট নিজেকে অসহায়ভাবে সমর্পণ করার অনুমতি নেই। এটা মানুষের অস্তিত্বের জন্য অপমান। কেবল আল্লাহ-ই যে এমন আনুগত্যের যোগ্য, সেই সত্যকে এর দ্বারা অস্বীকার করা হয়। সকল ইবাদাত কেবল আল্লাহরই জন্য, তিনি ছাড়া অন্য কেউ বা কিছুই ইবাদাতের যোগ্য নয়।

প্রশ্ন হলো, কীভাবে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব? এর জবাব আল্লাহ তা'আলা নিজেই দিয়েছেন। তিনি তাঁর রাসূলকে বলেন:
বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেবেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান, ৩: ৩১]

স্রষ্টার প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো তাঁর অনুগত হওয়া এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। আমরা যখন তা করব, আল্লাহ আমাদের ভালোবাসবেন। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের এটাই চাবিকাঠি। আবার আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া এবং তাঁর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উপায়ও একই; তাঁর প্রতি অনুগত হওয়া এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। এ ব্যাপারে আমাদের মনে কোনো প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত নয়। যদি কেউ মনে করে যে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কিংবা তাঁর রাসূলের সুন্নাহ উপেক্ষা করে বা সুন্নাতের বিপক্ষে গিয়েও তা'আল্লুক মা'আল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ) বজায় রাখতে সক্ষম হবে, তাহলে সে নিজেকে বোকা বানাল।

আল্লাহ বলেন, সবকিছুকে অতিক্রম করে তাঁকে ভালোবাসাই ঈমানের পরিচায়ক। একজন ঈমানদার যেকোনো সাধারণ ব্যক্তি-বস্তু ও অর্জনের চেয়েও আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে তা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ বলেন,
আর কোনো লোক এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হয়ে থাকে; কিন্তু ঈমানদাররা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। যদি যালিমরা ভাবত যে, তাদের অবস্থা কেমন হবে—যখন তারা আযাব দেখবে আর উপলব্ধি করবে যে যাবতীয় ক্ষমতা শুধু আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। [সূরা বাকারা ২: ১৬৫]

আল্লাহর কোনো নির্দেশ শুনলে ঈমানদারদের অবস্থা কেমন হয়, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলছেন,
তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং আনুগত্য করেছি। আমরা আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। [সূরা বাকারা ২: ২৮৫]

আল্লাহ তাদের সম্বন্ধেও জানিয়ে দিয়েছেন, যারা আল্লাহর নির্দেশের তুলনায় নিজেদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলে,
আপনি কি তাকে দেখেন না যে, তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং আরও পথভ্রান্ত। [সূরা ফুরকান ২৫: ৪৪]

দুই দলের মধ্যবর্তী রেখা স্পষ্ট। আমরা কোন দিকে যেতে চাই, সেটা আমাদেরকেই বেছে নিতে হবে।

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে কাদের নিকটবর্তী, তা বলে দিয়েছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে। [সূরা নাহল ১৬: ১২৮]
যারা আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভালো কাজ করেছে; চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তা-ও। ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান অনেক দূরের হতো! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। [সূরা আলে ইমরান ৩: ৩১]

আল্লাহ এমন একটি সম্পর্কযুক্ত দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন, যেখানে আমাদের সকল কর্মকাণ্ডে দুই ধরনের পরিণতি রয়েছে: দুনিয়াতে উপকার অথবা ক্ষতি এবং আখিরাতে পুরস্কার অথবা শাস্তি। প্রত্যেকটি কাজই দুই ধরনের ফলাফল তৈরি করে। একটি এই দুনিয়ায় জোটে এবং অন্যটি আখিরাতে পাওয়া যাবে। মনে রাখা উচিত, আল্লাহ যখন বান্দাকে ভালোবাসেন, তাঁর ভালোবাসা এই পৃথিবী এবং তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অন্যদিকে যখন আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে অপছন্দ করেন, তার প্রতি ঘৃণা এই দুনিয়া এবং এর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মানুষ আমাদের ভালোবাসবে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে, নাকি ঘৃণা, অপমান ও অসম্মান-তা নির্ধারিত হয় আল্লাহ আমাদের পছন্দ করেন না অপছন্দ-তার ওপর।

যারা মানুষকে নেতৃত্ব দিতে এবং প্রভাবান্বিত করতে আগ্রহী, তাদের অবশ্যই উপলব্ধি করা উচিত যে, আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা এবং তাঁর প্রতি অনুগত হওয়া ব্যতীত মানুষের ভালোবাসা আশা করা উচিত নয়। হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর কোনো বান্দাকে পছন্দ করেন, তিনি জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো। জিবরাইল তখন তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। তারপর জিবরাইল আকাশে ডাক দিয়ে বলেন, আল্লাহ অমুককে ভালোবাসি, তোমরাও তাকে ভালোবাসবে। এভাবে আসমানের অধিবাসীরা তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন এবং পৃথিবীতে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

পক্ষান্তরে আল্লাহ যদি কাউকে ঘৃণা করেন, তিনি জিবরাইলকে ডেকে বলেন— আমি অমুককে ঘৃণা করি, তুমিও তাকে ঘৃণা করবে। অতএব, জিবরাইল তাকে ঘৃণা করা শুরু করেন। তারপর জিবরাইল আসমানে ঘোষণা দিয়ে দেন যে, আল্লাহ অমুককে ঘৃণা করেন; অতএব, তোমরাও তাকে ঘৃণা করবে। এভাবে জমিনের বাসিন্দারা তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে এবং তাঁর প্রতি ঘৃণা জমিনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। [সহীহ মুসলিম, বুখারি, মুয়াত্তা মালিক ও তিরমিযি]

হাদীসের বর্ণনা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়, যেদিন আক্ষরিক অর্থেই ফেরেশতারা এসেছিলেন এবং মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন: সেদিন যখন মুসলমানরা একেকজন কাফিরকে তাড়া করছিল, তখন তার ওপর চাবুকের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল এবং একজন ঘোড়সওয়ার বলছিল, আঘাত হানো হাইজুম। তিনি দেখলেন, শত্রুসৈন্য মস্তকছিন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একজন আনসার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। রাসূল ﷺ বললেন, তুমি সত্য বলেছ। এটা ছিল তৃতীয় আসমান থেকে আসা সাহায্য। বদরে রাসূলুল্লাহ বিপদাপদের মুখোমুখি হলে সালাত এবং সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার কুরআনিক নির্দেশনার একটি বাস্তব নমুনা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তারপরই তিনি তাঁর রবকে ডেকে ছিলেন।

হাদীসে কুদসিতে আছে, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন—আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, যে আমার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব। আমার বান্দা আমার নৈকট্য সবচেয়ে বেশি লাভ করতে পারে ফরজ হুকুম পালনের মধ্য দিয়ে। এরপর সে নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে এবং আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। এভাবে যখন আমি তাকে ভালোবাসি, এক পর্যায়ে তার কান আমার কান হয়ে যায়, তার চোখ আমার চোখ হয়ে যায়, তার হাত আমার হাত হয়ে যায়, তার পা আমার পা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সে আমার কাছে কিছু চাইলে অবশ্যই আমি তাকে তা দিয়ে দিই; সে আমার আশ্রয় চাইলে আমি তাকে আশ্রয় দিই। তার প্রাণ হরণে আমি যতটা ইতস্তত করি তেমনটা আর কিছুতে করি না। সে (ইবাদাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে) মৃত্যুকে অপছন্দ করে, আর আমি তাকে কষ্ট দিতে অপছন্দ করি। [সহীহ বুখারি]

এই তিনটি পদক্ষেপ হলো আমাদের অন্তরে তাওয়াক্কুল প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার উপায়। রাসূলের সীরাতে তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার নবিত্বের শুরুর দিকে যখন তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলেন— 'ওয়া সুবাহা'!

হজরত ইবনু আব্বাস বলেন, যখন 'হে নবি, আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সাবধান করুন' আয়াতটি নাযিল হয়, নবি কারীম তখন সাফা পাহাড়ে উঠলেন। হে বনু ফিহর, হে বনু 'আদি, বলে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে ডাক দিলেন। রাসূলের আহ্বানে তারা দলে দলে সমবেত হলো। উপস্থিতিদের উদ্দেশ্য করে নবিজি বললেন, বলো তো, আমি যদি এখন তোমাদের বলি—এই পাহাড়ের অপর প্রান্তে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের ওপর অতর্কিতে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? সমবেত সকলে বলল, হ্যাঁ বিশ্বাস করব। কারণ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্যবাদীই পেয়েছি। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে সামনে একটি কঠিন আযাব সম্পর্কে সাবধান করছি। এই কথা শুনে আবু লাহাব বলল, তোমার বিনাশ হোক। তুমি কি এজন্যই আমাদের একত্র করেছ? তখন সূরা লাহাব নাযিল হলো। অর্থ, আবু লাহাবের উভয় হাত ধ্বংস হোক এবং তার বিনাশ ঘটক। [বুখারি, মুসলিম]

খেয়াল করুন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন উপায়ে তার সমাজের কাছে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারতেন। নিজের গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মহত্ব দাবি করতে পারতেন। তিনি অভিজাত গোত্রদের মধ্যে অভিজাত কুরাইশ গোত্রের অন্তর্গত বনু হাশিম কবিলার সদস্য ছিলেন। তাই তিনি নিজেকে প্রথমে একজন গোত্রপ্রধান হিসেবে ভূমিকা টানতে পারতেন এবং তারপর ইসলামের দাওয়াত দিতে পারতেন। বিকল্পভাবে তিনি সমাজ সংস্কারকের পথ অবলম্বন করতে পারতেন। তৎকালীন মাক্কাকে সামাজিক অবক্ষয়ের আধিক্য, নিপীড়ন এবং পাপের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মুহাম্মাদ ﷺ প্রথমে এসবের বিরুদ্ধে বলতে পারতেন, নিজের পক্ষে অনেক লোক জমায়েত করে তারপর তার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের মতবাদ হিসেবে ইসলামের পরিচয় দিতে পারতেন। সবশেষে তিনি ইসলামকে একটি বিকল্প ধর্ম, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, ক্ল্যাসিক্যাল থিওরি, সত্যে পৌঁছানোর নতুন উপায়, রোমে যাওয়ার আরেকটি পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন। জান্নাতে পৌঁছানোর একমাত্র পথ, মুক্তির একমাত্র উপায়, একমাত্র সত্য ধর্ম, যা ছাড়া আর কিছুই শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না-এমনভাবে উপস্থাপন না করলেও পারতেন। তিনি ইসলামকে বর্তমান সময়ের আরও অনেক নতুন নতুন বৈপ্লবিক তত্ত্বের ন্যায় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন, যা বহুত্ববাদী যেকোনো সমাজ সহজেই গ্রহণ করে নেওয়ার বেশ নজির আছে। তিনি এ ধরনের কিছুই করেননি। তার কাছে যত রকম বিকল্প উপায় ছিল, তার কোনোটিই তিনি প্রয়োগ করেননি; বরং সবকিছু থেকে সুস্পষ্ট অবস্থানে থেকে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, মূর্তিপূজা ত্যাগ করো। কোনো শরীক না করে কেবল তাঁরই ইবাদাত করো; অথবা আল্লাহর শাস্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।

এভাবে আহ্বানের ফলে তিনি একদিকে মক্কার সবাইকে তার শত্রুভাবাপন্ন করে তুললেন। কারণ, আদর্শের দিক থেকে তিনি তাদের ধর্মকে আঘাত করেছেন এবং তার অলীক রূপটা তুলে ধরেছেন। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ধারণা উপস্থাপন করেছেন-যার কাছে কোনো কিছুই গোপনীয় নয়। যারা নিজেদের ক্ষমতা এবং সম্পদের জোরে তাদের ইচ্ছানুযায়ী যা খুশি করতে অভ্যস্ত ছিল, তাদের জন্য এটা খুব সুখকর ধারণা ছিল না। কোনো যুগের ধনী এবং ক্ষমতাশালীরাই একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ও কৃতকর্মের জবাব দেওয়ার ধারণাকে ভালোভাবে নেয়নি। এ বিষয়গুলো মক্কার সাধারণ লোকদের কাছে, বিশেষত কুরাইশদের কাছে এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল যে, তারা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ করে বসে। আরবে কুরাইশরা ছিল যাজক শ্রেণির, কা'বা ঘরের জিম্মাদার। যেখানে তারা ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল; এদের উপাসনা তাদের কাছে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল; বিশেষ করে হাজ্জের সময় তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এগুলো। মুহাম্মাদ ﷺ-এর বাণী কেবল তাদের বিশ্বাসকেই বিপন্ন করেনি, তাদের চোখে তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের অর্থনীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ ছিল, তারা এটা সহ্য করতে পারেনি। ফলে সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ কেন ইসলাম প্রচারের জন্য ঠিক এ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, বোঝার একমাত্র উপায় কুরআন অধ্যয়ন এবং দেখা যে, আল্লাহর অন্য নবিরা কী করেছিলেন! তারা সকলেই একই কাজ করেছিলেন। তারা কোনো প্রকার ঘুরপথে না গিয়ে বা প্রচ্ছন্নতার আশ্রয় না নিয়ে সুস্পষ্টভাবে এবং সরাসরি তাদের বার্তা উপস্থাপন করেছিলেন।

তারা মানুষের কাছ থেকে কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক পুরস্কার চাননি। তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করেছিলেন কেবল আল্লাহকে ভয় করে এবং শুধু তাঁর কাছ থেকেই পুরস্কারের আশায়। কোনোরকম পার্থিব পুরস্কারের আশা ব্যতিরেকে ইসলামের প্রচার ছিল সকল নবিদের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। যুগ যুগ ধরে নবিরা মানবজাতির পথপ্রদর্শনে যা করে এসেছেন, মুহাম্মাদ কেবল তার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত নবির উত্তরাধিকারীগণ-জ্ঞানী ব্যক্তিরা, যারা আল্লাহর বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন-একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। স্পষ্ট এবং সরাসরি বলেছেন। মানুষের কাছ থেকে কোনোরকম পুরস্কারের আশা ছাড়াই এ কাজ করে গেছেন। যে কেউ এই পদ্ধতির পরিবর্তন আনবে, সে নিজেকে নবিদের মহিমান্বিত ঐতিহ্য এবং এর সঙ্গে যুক্ত আল্লাহর সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।

আমি যখনই রাসূলুল্লাহ -এর শক্তিশালী, গভীর, ধৈর্যসমৃদ্ধ এবং অবিচল ঈমানের কথা চিন্তা করি, তাঁর ইসলাম প্রচারে শুরুর এ ঘটনা আমার ভাবনায় চলে আসে। কারণ, এটি সফলতার জন্য আল্লাহর ওপর তাঁর পূর্ণ নির্ভরতার চিত্র অঙ্কন করে; যেখানে তিনি অন্য কিছু, এমনকি নিজস্ব ফায়সালাকেও হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না দিয়ে তাঁর প্রতি যে আদেশ করা হয়েছে, তা অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁকে মানুষদের সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি তা-ই করেছেন। নিজস্ব বিবেচনাবোধ ব্যবহার করে ভালোমন্দ নির্ধারণ করেননি। যার ওপর ওয়াহি নাযিল হয়, তার জন্য বিনাপ্রশ্নে অনুসরণ করা ব্যতীত আর কোনো উপায় নেই। একই যুক্তি বর্তমানে যে মুসলিমরা সেই বাণীকে বহন করে চলেছেন, আসমানি বাণী এবং এর শাশ্বত সত্যতার ওপর বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা বাণীর মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধন না করে আমাদের যা করতে বলা হয়েছে, তা বিনা প্রশ্নে পালন করি। এটি আমাদের নিজেদের সততাকেই প্রমাণ করবে। এ বৈশিষ্ট্য ইয়াহুদি ও নাসারাদের থেকে মুসলমানদের পার্থক্য করে। কারণ, তারা তাদের ওপর অবর্তীর্ণ কিতাবে এমন পরিবর্তন করেছিলেন যে, সেটার ঐশ্বরিক গুণাবলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং আল্লাহর কথা মানুষের কথায় পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। গত দেড় হাজার বছরে মুসলমানদের কখনোই এই অপবাদের মুখোমুখি হতে হয়নি।

মাক্কায় তের বছর নববি সময়কাল পুরোটাই ছিল ক্রমাগত নির্যাতন, অপবাদ আর আশাহত ঘটনায় বিপর্যস্ত। কেউ যদি বাহ্যিক সফলতার দৃশ্যমান চিহ্ন খোঁজে, তাহলে খুব বেশি কিছু পাবে না। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ কীভাবে এই লম্বা সময়জুড়ে তাঁর মিশন চালিয়ে গেলেন! তাঁর প্রত্যয় এবং উদ্যম অফুরন্ত। রাতে দাঁড়াতেন রবের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য। দিনে মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতেন। তা সে গ্রহণ করুক বা না করুক। তারা যেরকম প্রতিক্রিয়াই দেখাক, অথবা যত বিরূপ আচরণই করুক, তিনি কখনোই ধৈর্য হারাতেন না, রাগতেন না। তাদের বাজে আচরণের প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। ধৈর্য ধরে কাজ চালিয়ে গেছেন। কখনোই তাঁর মিশন থেকে সরে আসেননি কিংবা প্রচারে সামান্য দুর্বলতার আশ্রয়ও নেননি। তাঁর এবং তাঁর মিশনের জন্য কোনো সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক বিরতি ছিল না। তিনি অবিরাম উদ্যমে দিনরাত কাজ করে গেছেন। সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক ঈমান ছাড়া আর কী এমন প্রচেষ্টার কারণ হতে পারে? আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এই উচ্চতার শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে? আমাদের জীবনে শেখার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্যতম হলো দাওয়াহর ময়দানে সাফল্য ধরা দিতে দেরির হতাশা এবং আপাতব্যর্থতার মুখে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করা। যে সবচেয়ে দ্রুতগতির, সে নয়, দৌড়ে সে-ই জিতে, যে সবচেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। আমরা সহসাই হাল ছেড়ে দিই, দ্রুত নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ি এবং দৃশ্যমান ফলাফলের প্রতি অতিরিক্ত ফোকাস দিই। আমরা ভুলে যাই, ইসলাম হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং এই প্রবেশের বেশিরভাগ অংশই অদৃশ্য। 'উমার ইবনুল খাত্তাব-এর জীবনী থেকে আমরা জানতে পারি, ইসলাম কীভাবে অন্তরে প্রবেশ করে; কিন্তু প্রকাশ্যে আসতে কিছু সময় লেগে যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কখন 'উমারের অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দেন, তার একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি মদ পান করতেন এবং তার মদ পানের সঙ্গীসমেত আসর ছিল। এক গভীর রাতে তার মদ পানের ইচ্ছা হলো; কিন্তু তিনি এজন্য কোনো সঙ্গী পেলেন না। যেহেতু তার কিছু করার ছিল না, তিনি ঠিক করলেন কা'বা তাওয়াফ করবেন। গভীর রাত। তিনি যখন কা'বায় উপস্থিত হলেন, দেখলেন রাসূলুল্লাহ কা'বার সামনে সালাতে দাঁড়িয়ে আছেন। 'উমার কা'বার পেছন দিকে চলে গেলেন এবং এর কিসওয়ার (পর্দা) আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। তারপর গোপনে একদম রাসূলুল্লাহ-এর সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে সূরা আল-হাক্কাহ তিলাওয়াত করছিলেন। 'উমার গোপনে ওত পেতে আল্লাহর রাসূলের তিলাওয়াত শুনছিলেন।
'উমার মনে মনে ভাবলেন, এটা নিশ্চয় কোনো কবির বয়ান। রাসূলুল্লাহ তখনই তিলাওয়াত করলেন: এটা কোনো কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর! [আল-হাক্কাহ ৬৯:৪১]
'উমার খুব অবাক হলেন, ভাবলনে, এটা অবশ্যই কোনো কাহিনের (ভবিষ্যতবক্তা) বয়ান।
রাসূলুল্লাহ তখন তিলাওয়াত করলেন: এবং এটা কোনো অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর। [আল-হাক্কাহ ৬৯:৪২]
'উমার বিস্মিত হলেন এবং স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এই ঘটনারও কয়েক বছর পর তিনি সত্যি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের বিখ্যাত ঘটনাটি আমরা সবাই-ই জানি।

কারণ, হৃদয়কে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য কুরআনের আয়াতের যে ক্ষমতা, তা এখানেও প্রকাশ পায়। আমি বহুবার বলেছি, কুরআন কথ্যভাষা হিসেবে নাযিল হয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ শক্তি প্রকাশ পায় যখন এটি শোনা হয়। এর ছন্দ, ঢং, নির্দেশনার মহিমা এবং যোগাযোগের স্পষ্টতার মধ্যে এমন কিছু আছে, যা প্রকৃত সত্যসন্ধানীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আমি এজন্যও ঘটনাটি উল্লেখ করতে চাই, কারণ এটি রাসূল-এর সীরাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, যার মাধ্যমে তাঁর ঈমান কীভাবে চরম শত্রুকেও প্রভাবান্বিত করেছিল, সেই পরিচয় পাওয়া যায়।

একদিন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিবৃত করার উপায় নিয়ে আলোচনা চলছিল কুরাইশ এবং তার মিত্রদের মাঝে। তারা জানতে চাইল, কে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে আগ্রহী? 'উমার এগিয়ে এলেন, আমি করব। তিনি তার তলোয়ার নিয়ে দারুল আরকামের দিকে রওয়ানা হলেন। পথে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসের সঙ্গে দেখা। সা'দ জানতে চাইলেন, কোথায় যাচ্ছ 'উমার? 'উমার বললেন, যে লোকটা আমাদের বিভক্ত করেছে এবং আমাদের দেবতাদের অভিশাপ দিয়েছে তাকে হত্যা করতে যাচ্ছি। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস ﷺ তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি মনে কর বনু 'আবদ মানাফ গোত্রের লোককে হত্যা করলে তারা তোমাকে এই পৃথিবীর বুকে হাঁটতে দেবে? এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল এবং 'উমার তাকে বললেন, আমার ধারণা তুমিও মুসলিম হয়ে গিয়েছ। যদি তা-ই হয়, তা হলে মুহাম্মাদকে হত্যার আগে আমি তোমাকে হত্যা করব। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস বললেন, মুহাম্মাদকে হত্যা করার আগে নিজের ঘর সামলাও না কেন?
কী বলতে চাও?, 'উমার জানতে চাইলেন।
সাহাবি বললেন, তোমার বোন এবং তার স্বামী মুসলিম হয়ে গেছে।
'উমার -এর বোন ফাতিমা বিনতু আল খাত্তাব এবং তার স্বামী সাঈদ বিন যাইদ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। সাঈদ বিন যাইদ ছিলেন 'উমারের চাচাতো ভাই এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান দশজনের একজন। তাদেরকে খাব্বাব বিন আল-আরাত কুরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন। 'উমার যখন রেগে আগুন অবস্থায় তাদের বাসায় উপস্থিত হলেন, তিনি শুনতে পেলেন তারা কুরআন তিলাওয়াত করছে। তিনি দরজায় করাঘাত করলেন। যখন তারা দেখলেন, দরজায় 'উমার দাঁড়িয়ে আছে, খাব্বাব লুকিয়ে পড়লেন। কীসের শব্দ পেলাম?, জানতে চাইলেন 'উমার। ফাতেমা বললেন-কিছু না, আমরা কথা বলছিলাম। 'উমার ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, মিথ্যা বলো না। তোমরা কি মুসলিম হয়ে গিয়েছ? সাঈদ বললেন, যদি ইসলাম তোমার ধর্ম থেকে ভালো হয়, তা হলে? 'উমার তাকে আক্রমণ করলেন, মাটিতে ফেলে দিয়ে তার ওপর বসে পড়লেন। ফাতিমা স্বামীকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন; কিন্তু 'উমার তার মুখে আঘাত করলেন এবং তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। যদিও 'উমার ক্রুদ্ধ; কিন্তু ফাতিমা ভয় পেলেন না। দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি। বলে আমাকে মেরেছ? তাহলে শুনে নাও, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল। এখন তুমি যা খুশি করতে পার।

তার দৃঢ়তায় 'উমার হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং তার রক্তাক্ত মুখ দেখে তিনি নিজ কৃতকর্মের জন্য হঠাৎ লজ্জায় পড়ে গেলেন। সাঈদকে ছেড়ে দিয়ে বসলেন, বললেন, তোমাদের ফলকগুলো দাও। ফাতিমা দিতে অস্বীকার করলে 'উমার বললেন, তোমার কথা আমাকে প্রভাবিত করেছে। কথা দিচ্ছি, তোমার কাগজগুলো অক্ষত ফেরত দেবো। ফাতেমা বললেন, তুমি মুশরিক এবং অপবিত্র। আগে গোসল করে এসো। 'উমার গোসল করে এলে তিনি কাগজগুলো দিলেন। 'উমার কাগজে লেখা আয়াত তিলাওয়াত শুরু করলেন।
১. তো-হা। ২. আপনাকে ক্লেশ দেওয়ার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি। ৩. কেবল তাদেরই উপদেশের জন্য, যারা ভয় করে। ৪. এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি যমিন ও সমুচ্চ আসমান সৃষ্টি করেছেন। ৫. তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। ৬. আসমান ও যমিনে এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। ৭. যদি তুমি উচ্চকণ্ঠেও কথা বল, তিনি তো গুপ্ত ও সে উপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। ৮. আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমণ্ডিত নাম তাঁরই। [সূরা তো-হা ২০:১-৮]

'উমার আয়াতগুলো পড়ে বললেন, কুরাইশরা কি এরই বিরোধিতা করে? সত্যিই এসব যিনি বলেছেন, তিনিই উপাসনার যোগ্য। মুহাম্মাদ কোথায় আছে, আমাকে বলো। 'উমার যখন আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে আপ্লুত হয়ে রাসূলুল্লাহ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন, খাব্বাব বিন আল আরাত আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, হে 'উমার, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহ -এর দু'আ কবুল করেছেন। তিনি দু'আ করেছিলেন, হে আল্লাহ, আমর বিন হিশাম অথবা 'উমার ইবনুল খাত্তাব, এ দুজনের যেকোনো একজনকে-যাকে তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ-তার মাধ্যমে ইসলামকে সম্মানিত (শক্তিশালী) করো।

তারা 'উমারকে রাসূলুল্লাহ -এর অবস্থান বললেন এবং তিনি সরাসরি সেখানে হাজির হয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। সাহাবিরা তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন এবং সবাই বসে রইলেন। হামজা তাদের দেখে বললেন, কী ব্যাপার? তারা বললেন, দরজায় 'উমার। তো কী হয়েছে? যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে ভালো; কিন্ত যদি খারাপ উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে আমি তার তলোয়ার দিয়েই তাকে হত্যা করব। দরজা খুলে দাও। 'উমার ঘরে ঢুকলে হামজা এবং অন্যরা তাকে ধরে ফেলে রাসূলুল্লাহ -এর কাছে নিয়ে গেলেন।
রাসূল বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। তারা ছেড়ে দিলেন। রাসূল 'উমারের ঘাড়ে ধরে বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব, কেন এসেছ এখানে? আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত কি তুমি ইসলামের সঙ্গে লড়াই করতে থাকবে? 'উমার বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিতে এসেছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং আপনি তাঁর রাসূল। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকবীর দিলেন, তাঁর সঙ্গে উপস্থিত সকলের তাকবীরে জায়গাটি মুখরিত হয়ে গেল। তারা এত উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর দিয়েছিলেন যে, তার পরপরই সবার নজর এড়াতে তারা দ্রুত আলাদা হয়ে গেলেন।

টিকাঃ
১. হক দুই প্রকার। ১. হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক ২. হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক। আল্লাহর হক নষ্ট করা, যেমন: ইবাদাত ছেড়ে দেওয়া, শিরকে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। হক্কুল ইবাদ মানে বান্দার হক। যেমন: কারও অর্থ-সম্পদ মেরে দেওয়া, জমি দখল করা ইত্যাদি। হক্কুল্লাহ নষ্টকারী তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। শিরক ছাড়া আর সব পাপই তিনি ক্ষমা করে দেবেন; কিন্তু বান্দার হক কখনোই আল্লাহ নিজ উদ্যোগে ক্ষমা করবেন না। এর ক্ষমা চাইতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে দাবি তুলিয়ে নিতে হবে। তারপর তাওবা কবুল হবে। বান্দার হক সরাসরি আল্লাহ ক্ষমা করেন না। - সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00