📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 ইসলামপূর্ব যুগে খালিদের যুদ্ধজীবন : উহুদযুদ্ধ থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি

📄 ইসলামপূর্ব যুগে খালিদের যুদ্ধজীবন : উহুদযুদ্ধ থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি


ইসলামগ্রহণের আগে খালিদ পিতা ওয়ালিদ ইবনু মুগিরার মতো ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন। রাসুল মদিনায় হিজরতের পর থেকে মক্কাবিজয়ের আগ পর্যন্ত মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে মদিনাবাসীর যুদ্ধ লেগেই ছিল। বদরযুদ্ধ ছিল মক্কাবাসীর সঙ্গে মদিনাবাসীর প্রথম যুদ্ধ। খালিদ এই যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়িক কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ায় ছিলেন। তবে এ যুদ্ধে খালিদের ভাই ওয়ালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মুসলিমদের হাতে বন্দি হন। যুদ্ধ শেষে খালিদ তাঁর বড় ভাই হিশাম ইবনুল ওয়ালিদকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে মদিনায় যান।

১. উহুদযুদ্ধ ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ
ক. উহুদযুদ্ধের প্রেক্ষাপট
উহুদ মদিনা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরের একটা পাহাড়ের নাম। সেখানে হারুন আ.- এর কবর রয়েছে। সবার ঐকমত্যে উহুদযুদ্ধ তৃতীয় হিজরির শাওয়ালে সংঘটিত হয়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। যেমন : ৭, ৯, ১০ ও ১১ শাওয়াল।

বদরযুদ্ধের পরাজয় ও অপমানের গ্লানি এবং সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় লোকদের হত্যার ফলে মক্কার মুশরিকদের দুঃখের বোঝা বইতে হচ্ছিল। এই শোক, ক্ষোভ-দুঃখ নিয়ে যদিও তারা একটা বছর পার করেছে; কিন্তু মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ হচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। এমনকি তাদের নিহতদের জন্য শোকপ্রকাশ করতেও লোকদের নিষেধ করে দিয়েছিল। এ পর্যায়ে তারা যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পন্ন করে ৩ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। তাদের ৭০০ বর্ম, ২০০ ঘোড়া ও ৩ হাজার উট ছিল। এমনকি ১৪ জন মহিলাকে এ জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল যে, এরা তাদের পুরুষদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলবে এবং যারা পালাতে চায়, তাদের তিরস্কার ও লজ্জা দেবে।

এদিকে নবিজির চাচা আব্বাস রা.-যিনি এ সময় ইসলাম কবুল করে নিয়েছেন, তবে তখনো মক্কাতেই ছিলেন-কুরাইশদের এমন আয়োজন ও যুদ্ধপ্রস্তুতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং এতে বেশ বিচলিতবোধ করেন। এ জন্য এর বিস্তারিত সংবাদ জানিয়ে চিঠিসহ দ্রুতগামী এক দূতকে মদিনায় নবিজির কাছে পাঠিয়ে দেন।

নবিজি এ সম্পর্কে অবগত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজন লোককে সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠান। তাঁরা ফিরে এসে তাঁকে সংবাদ দেন, কুরাইশরা মদিনার উপকণ্ঠে এসে গেছে। যেহেতু মদিনা শহরে আক্রমণের আশঙ্কা ছিল, তাই শহরের চারদিকেই পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। সকালে নবিজি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এরপর ১ হাজার সেনার এক বাহিনী নিয়ে মদিনার বাইরে চলে আসেন। এ বাহিনীতে মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার সমমনা ৩০০ মুনাফিকও ছিল। তবে তারা পথিমধ্যেই বাহিনী ছেড়ে ফিরে আসে। ফলে মুসলিমদের সেনাসংখ্যা কমে ৭০০ জনে দাঁড়ায়।

খ. সেনাবিন্যাস ও সাহাবিদের জিহাদি স্পৃহা
এরপর উহুদের ময়দানে পৌঁছে রাসুল মুজাহিদদের কাতারবন্দি করেন। উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে যুদ্ধের কৌশল ঠিক করেন। কেননা, এ দিক দিয়ে শত্রুদের এগিয়ে আসার আশঙ্কা ছিল। ফলে এই কৌশল একদিকে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, আবার অন্যদিকে সুবিধাজনক বটে। উহুদের পেছনে একজায়গা দিয়ে হামলার আশঙ্কা ছিল, এ জন্য নবিজি সেখানে ৫০ জনের এক তিরন্দাজবাহিনীকে পাহারার দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, 'মুসলিমদের জয়-পরাজয় যা-ই হোক না কেন, সর্বাবস্থায় তোমরা এখানে অটল থাকবে।'

এরপর যুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধের পর মুসলিমবাহিনী কুরাইশদের পিছু হটাতে সক্ষম হয়। এ পর্যায়ে মুসলিমবাহিনী বিজয়ী হিসেবে যুদ্ধময়দানে অবস্থান করে; আর কুরাইশরা মনোবল হারিয়ে এদিক-ওদিক পালাতে থাকে। মুজাহিদরা তখন যুদ্ধময়দানে গনিমত সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে পাহাড়ের ওই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নবিজি যে ৫০ জনকে পাহারায় নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ফলে তাঁদের অনেকে মুসলিমদের বিজয় হয়েছে মনে করে নিশ্চিন্ত মনে সেখান থেকে চলে আসেন। তবে তাঁদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়ের রা. বার বার নিষেধ করছিলেন; কিন্তু তাঁরা তাঁর কথা মানেননি। তারপরও কয়েকজন সেখানে থেকে যান।

এ জায়গাটা প্রায় ফাঁকা দেখে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ—যিনি তখনো মুসলমান হননি এবং কুরাইশের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন—পেছন দিক থেকে আচমকা আক্রমণ করে যুদ্ধের দৃশ্য পালটে দেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনু জুবায়েরসহ তাঁর সঙ্গে থাকা অল্প কজন সাহাবি প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যান, তবে শেষপর্যন্ত সবাই শাহাদাতবরণ করেন।

গ. কাফিরদের পক্ষে খালিদের বীরত্ব
এবার মুশরিকবাহিনীর জন্য পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুসলমান ও কাফির উভয় বাহিনী তখন যুদ্ধময়দানে এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যে, মুসলমান মুসলমানের হাতেই শহিদ হতে থাকেন।

এ যুদ্ধে মুসআব ইবনু উমায়ের রা. শহিদ হন। তাঁর চেহারার সঙ্গে নবিজির চেহারার অনেক মিল ছিল। ফলে তাঁর শাহাদাতের পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রাসুল শহিদ হয়েছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, শয়তান বা মুশরিকদের কেউ একজন উচ্চৈঃস্বরে এ ঘোষণা দেয় যে, 'মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন!'

এই মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিদের মনোবল ভেঙে যায়। এমনকি বড় বড় অনেক সাহাবিও হতাশ হয়ে পড়েন। তবে অনেকে তখনো অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বিশৃঙ্খলার কারণে মুসলিমদের হাতে মুসলিমরা শহিদ হতে থাকেন। তবে সবার দৃষ্টি তখন নবিজিকে খুঁজে ফিরছিল। এরপর কাআব ইবনু মালিক রা. প্রথমে তাঁকে দেখতে পান। তিনি আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার দিয়ে ওঠেন, 'মুবারক হো, নবিজি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন!'

কাআবের এ আওয়াজ শুনে সাহাবিরা নবিজির কাছে দৌড়ে আসতে থাকেন। এ সময় কাফিররা অন্যদিক থেকে সরে এসে এদিকে মনোনিবেশ করে। কয়েকবার নবিজির ওপর আক্রমণ করতে উদ্ধত হয়, তবে তিনি নিরাপদই থাকেন। এমনকি একবার কাফিররা কঠোর আক্রমণ করলে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশ করে বলেন, 'কে আছে এমন, যে আমার জন্য প্রাণোৎসর্গ করতে প্রস্তুত?' তখন জিয়াদ ইবনু সাকান রা. নিজের চার সঙ্গীসহ নবিজির কাছে চলে আসেন। তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহিদ হয়ে যান। জিয়াদ রা. আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে রাসুল বলেন, 'তাঁকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' সাহাবিরা তাঁকে পাঁজাকোলা করে নবিজির কাছে নিয়ে আসেন। তখনো তাঁর প্রাণ ছিল। তিনি নবিজির পায়ের উপর নিজের মুখ রাখেন এবং এ অবস্থায়ই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।

ঘ. নবিজির চেহারা মুবারক আহত হওয়া
তখন কুরাইশের প্রখ্যাত বীর আবদুল্লাহ ইবনু কুমাইয়া সেনাসারি ভেদ করে সামনে এগিয়ে যায় এবং নবিজির চেহারা মুবারকে তরবারি দিয়ে সজোরে আঘাত করে। ফলে নবিজির শিরস্ত্রাণের (লোহার টুপি) দুটি কড়া মুখ ভেদ করে মাথায় ঢুকে যায় এবং একটি দাঁত শহিদ হয়। আবু বকর রা. কড়া দুটি ক্ষতস্থান থেকে ওঠাতে এগিয়ে এলে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. বলেন, 'আল্লাহর কসম, এ খিদমতটি আমাকে করার সুযোগ দিন।' তিনি সামনে এগিয়ে এসে হাত না লাগিয়ে নিজের মুখ দিয়ে কড়া দুটিতে টান দেন। তাতে একটা কড়া বেরিয়ে এলেও এর সঙ্গে আবু উবায়দার একটা দাঁতও উপড়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে আবু বকর দ্বিতীয় কড়াটা বের করতে এগিয়ে এলে তিনি আবারও কসম দিয়ে তাঁকে বিরত রাখেন এবং নিজেই তাতে মুখ লাগিয়ে টান দেন। এবারও তাঁর আরেকটা দাঁত উঠে আসে!

এ সময় কাফিরদের খনন করা এক গর্তে রাসুল পড়ে যান। মূলত মুসলিমদের ভূপাতিত করতেই তারা এটা খুঁড়েছিল।

এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুশরিকবাহিনী পাহাড়ের উপর দিক থেকে আক্রমণ করতে এলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তাদের প্রতিহত করেন। তিনি ও তাঁর সাথিরা এ ভয়ানক হামলা প্রতিহত করতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নিশ্চিত বিজয় টের পেলেও মুশরিকরা মুসলিমদের বীরত্বের প্রদর্শনী ও জীবনোৎসর্গকারী আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

২. দ্বিধাবিভক্ত মুসলিমবাহিনীকে সমন্বিত করতে রাসুলের পরিকল্পনা
উহুদযুদ্ধে মুসলিমদের প্রাথমিক বিজয়ের পর মুশরিকবাহিনী যখন মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাদের মৌলিক লক্ষ্য ছিল রাসুলের ওপর আক্রমণ করা; কিন্তু তখনও রাসুল নিজের অবস্থান থেকে পিছপা হননি। জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা একে একে তাঁর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছিলেন। কাফিরবাহিনী যখন রাসুল -কে পুরোপুরি ঘেরাও করে নেয়, তখন তাঁর চারপাশে নয়জন সাহাবি নিজেদের মানবঢালে পরিণত করে নেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন আনসারি। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নবিজিকে এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের করে পাহাড়ের উপরে নিজ বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। আনসার সাহাবিরা তখন কাফিরদের আক্রমণের মুখে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে আত্মোৎসর্গ করতে থাকেন। কায়েস ইবনু আবি হাজিম রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, সেদিন তালহা রা. তাঁর যে হাত দিয়ে নবিজিকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন, আমি তাঁর সে হাত অবশ হয়ে যেতে দেখেছি। রাসুল এক প্রস্তরখণ্ডে উঠতে চাইলে পারেননি। তখন তালহা রা. তাঁর নিচে বসে যান এবং নবিজি তাঁর পিঠে পা দিয়ে পাথরের উপর ওঠেন। জুবায়ের রা. বলেন, রাসুল তখন বলেন, 'তালহা নিজের জন্য জান্নাত আবশ্যক করে নিয়েছে।'

সেদিন সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. রাসুলের সামনে নিজের বীরত্বের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে সক্ষম হন। ফলে নবিজি নিজে তাঁর হাতে তির ধরিয়ে বলেন, 'তোমার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোন, তুমি তির নিক্ষেপ করো।'

এভাবে নবিজির পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেদিন প্রখ্যাত তিরন্দাজ আবু তালহা আনসারিও নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর ভূমিকায় অভিভূত হয়ে নবিজি বলেছিলেন, 'নিশ্চয় আবু তালহার একক আওয়াজ কাফিরবাহিনীর জন্য সম্মিলিত বাহিনীর শব্দের চেয়েও ভয়ংকর।'

সেদিন তিনি নিজেকে ঢাল বানিয়ে রাসুলের সামনে মানববর্মে পরিণত হন। তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ তিরন্দাজ ছিলেন। তির নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অনেক কঠিনভাবে ধনুক টেনে তির চালাতেন। সেদিন তির নিক্ষেপ করতে গিয়ে প্রায় দু-তিনটা ধনুক ভেঙে ফেলেন। নবিজির পাশ দিয়ে কেউ তির নিয়ে গেলে তিনি তাঁকে বলতেন, 'তুমি এগুলো আবু তালহাকে দিয়ে দাও।' একপর্যায়ে নবিজি মাথা উঁচু করে দেখতে চাইলে আবু তালহা বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না। আমি আশঙ্কা করছি—শত্রুর তির যেন আপনার গায়ে লেগে না যায়। আমি তাদের তিরের আঘাত সামলাতে আপনার সামনে বুক পেতে আছি!’

নুসায়বা বিনতু কাআব মাজিনিও সেদিন নবিজির প্রতিরক্ষায় তির ও তরবারি চালাতে নামেন। এমনকি তাঁর শরীরে দৃশ্যমান একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। আবু দুজানাও নিজের শরীরকে নবিজির সামনে মানবঢালে পরিণত করেন। ফলে তিরের আঘাতে তাঁর কোমরে একাধিক ছিদ্র তৈরি হয়।

এরপর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা নবিজির পাশে চলে আসেন। প্রথমেই আবু বকর ও আবু উবায়দা রা. এসে পৌঁছান। আবু উবায়দা নিজের দাঁত দিয়ে নবিজির চেহারা থেকে দুটি তির বের করেন। এরপর আরও প্রায় ৩০ জন সাহাবি নবিজির প্রতিরক্ষায় তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হন, যাঁদের মধ্যে কাতাদা, সাবিত ইবনু দাহদাহ, সাহল ইবনু হুনাইফ, উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুর রাহমান ইবনু আওফ, জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. উল্লেখযোগ্য।

এরপর নবিজি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে উহুদের একটা উপত্যকার দিকে যান। মুশরিকদের প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও সাহাবিরা নিজেদের এবং নবিজির অবস্থা দেখে অত্যন্ত চিন্তাগ্রস্ত ও পেরেশান হয়ে ওঠেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁদের হতাশা ও দিশেহারা পরিস্থিতির গুমোট ভাব দূর করতে আল্লাহ তাঁদের ওপর তন্দ্রার জাল বিস্তার করেন। ফলে তাঁরা কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বস্তির শ্বাস নিতে সক্ষম হন। এ মর্মে আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ آمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّوْنَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُوْلُوْنَ هَلْ لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلهِ يُخْفُوْنَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَّا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُوْلُوْنَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هُهُنَا قُلْ لَّوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوْبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ

তারপর তোমাদের ওপর শোকের পর শান্তি অবতীর্ণ করলেন, যা ছিল তন্দ্রার মতো। সে তন্দ্রায় তোমাদের কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল আল্লাহ সম্পর্কে—তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো। তারা বলছিল, আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বলো, সবকিছুই আল্লাহর হাতে; তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে, তোমার কাছে প্রকাশ করে না। সেসবও তারা বলে, আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। তুমি বলো, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে, তবু তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে, যাদের মৃত্যু লিখে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের মনে যা রয়েছে, তার পরীক্ষা করা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আর তোমাদের মনে যা কিছু রয়েছে, তা পরিষ্কার করা ছিল তাঁর কাম্য। মনের ব্যাপারে গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন। [সুরা আলে ইমরান : ১৫৪]

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, 'আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল' এ আয়াতে মুনাফিকদের অবস্থা আলোচনা করা হয়েছে। এদিকে কুরাইশবাহিনী শেষ পর্যায়ে নিজেদের নিশ্চিত বিজয় থেকে নিরাশ হয়ে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিমরা তন্দ্রার পরিস্থিতির ভেতর পরিপূর্ণ স্বস্তিতে নবিজির সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। হতাশ কাফিররা তখন মুসলিমদের পিছু ধাওয়া না করে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরে।

টিকাঃ
১০. শারহুল মাওয়াহিব, জুরকানি: ২/২০।
১১. মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই উহুদযুদ্ধে মুসলিমদের ধোঁকা দিয়েছিল। যুদ্ধে মুসলিমদের ১ হাজার বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুসলমান ও কাফির উভয় বাহিনী তখন যুদ্ধময়দানে এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যে, মুসলমান মুসলমানের হাতেই শহিদ হতে থাকেন। এ যুদ্ধে মুসআব ইবনু উমায়ের রা. শহিদ হন। তাঁর চেহারার সঙ্গে নবিজির চেহারার অনেক মিল ছিল। ফলে তাঁর শাহাদাতের পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রাসুল শহিদ হয়েছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, শয়তান বা মুশরিকদের কেউ একজন উচ্চৈঃস্বরে এ ঘোষণা দেয় যে, 'মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন!' এই মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিদের মনোবল ভেঙে যায়। এমনকি বড় বড় অনেক সাহাবিও হতাশ হয়ে পড়েন। তবে অনেকে তখনো অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বিশৃঙ্খলার কারণে মুসলিমদের হাতে মুসলিমরা শহিদ হতে থাকেন। তবে সবার দৃষ্টি তখন নবিজিকে খুঁজে ফিরছিল। এরপর কাআব ইবনু মালিক রা. প্রথমে তাঁকে দেখতে পান। তিনি আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার দিয়ে ওঠেন, 'মুবারক হো, নবিজি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন!' কাআবের এ আওয়াজ শুনে সাহাবিরা নবিজির কাছে দৌড়ে আসতে থাকেন। এ সময় কাফিররা অন্যদিক থেকে সরে এসে এদিকে মনোনিবেশ করে। কয়েকবার নবিজির ওপর আক্রমণ করতে উদ্ধত হয়, তবে তিনি নিরাপদই থাকেন। এমনকি একবার কাফিররা কঠোর আক্রমণ করলে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশ করে বলেন, 'কে আছে এমন, যে আমার জন্য প্রাণোৎসর্গ করতে প্রস্তুত?' তখন জিয়াদ ইবনু সাকান রা. নিজের চার সঙ্গীসহ নবিজির কাছে চলে আসেন। তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহিদ হয়ে যান। জিয়াদ রা. আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে রাসুল বলেন, 'তাঁকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' সাহাবিরা তাঁকে পাঁজাকোলা করে নবিজির কাছে নিয়ে আসেন। তখনো তাঁর প্রাণ ছিল। তিনি নবিজির পায়ের উপর নিজের মুখ রাখেন এবং এ অবস্থায়ই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। ঘ. নবিজির চেহারা মুবারক আহত হওয়া তখন কুরাইশের প্রখ্যাত বীর আবদুল্লাহ ইবনু কুমাইয়া সেনাসারি ভেদ করে সামনে এগিয়ে যায় এবং নবিজির চেহারা মুবারকে তরবারি দিয়ে সজোরে আঘাত করে। ফলে নবিজির শিরস্ত্রাণের (লোহার টুপি) দুটি কড়া মুখ ভেদ করে মাথায় ঢুকে যায় এবং একটি দাঁত শহিদ হয়। আবু বকর রা. কড়া দুটি ক্ষতস্থান থেকে ওঠাতে এগিয়ে এলে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. বলেন, 'আল্লাহর কসম, এ খিদমতটি আমাকে করার সুযোগ দিন।' তিনি সামনে এগিয়ে এসে হাত না লাগিয়ে নিজের মুখ দিয়ে কড়া দুটিতে টান দেন। তাতে একটা কড়া বেরিয়ে এলেও এর সঙ্গে আবু উবায়দার একটা দাঁতও উপড়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে আবু বকর দ্বিতীয় কড়াটা বের করতে এগিয়ে এলে তিনি আবারও কসম দিয়ে তাঁকে বিরত রাখেন এবং নিজেই তাতে মুখ লাগিয়ে টান দেন। এবারও তাঁর আরেকটা দাঁত উঠে আসে! এ সময় কাফিরদের খনন করা এক গর্তে রাসুল পড়ে যান। মূলত মুসলিমদের ভূপাতিত করতেই তারা এটা খুঁড়েছিল। এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুশরিকবাহিনী পাহাড়ের উপর দিক থেকে আক্রমণ করতে এলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তাদের প্রতিহত করেন। তিনি ও তাঁর সাথিরা এ ভয়ানক হামলা প্রতিহত করতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নিশ্চিত বিজয় টের পেলেও মুশরিকরা মুসলিমদের বীরত্বের প্রদর্শনী ও জীবনোৎসর্গকারী আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২. দ্বিধাবিভক্ত মুসলিমবাহিনীকে সমন্বিত করতে রাসুলের পরিকল্পনা উহুদযুদ্ধে মুসলিমদের প্রাথমিক বিজয়ের পর মুশরিকবাহিনী যখন মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাদের মৌলিক লক্ষ্য ছিল রাসুলের ওপর আক্রমণ করা; কিন্তু তখনও রাসুল নিজের অবস্থান থেকে পিছপা হননি। জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা একে একে তাঁর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছিলেন। কাফিরবাহিনী যখন রাসুল -কে পুরোপুরি ঘেরাও করে নেয়, তখন তাঁর চারপাশে নয়জন সাহাবি নিজেদের মানবঢালে পরিণত করে নেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন আনসারি। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নবিজিকে এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের করে পাহাড়ের উপরে নিজ বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। আনসার সাহাবিরা তখন কাফিরদের আক্রমণের মুখে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে আত্মোৎসর্গ করতে থাকেন। কায়েস ইবনু আবি হাজিম রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, সেদিন তালহা রা. তাঁর যে হাত দিয়ে নবিজিকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন, আমি তাঁর সে হাত অবশ হয়ে যেতে দেখেছি। রাসুল এক প্রস্তরখণ্ডে উঠতে চাইলে পারেননি। তখন তালহা রা. তাঁর নিচে বসে যান এবং নবিজি তাঁর পিঠে পা দিয়ে পাথরের উপর ওঠেন। জুবায়ের রা. বলেন, রাসুল তখন বলেন, 'তালহা নিজের জন্য জান্নাত আবশ্যক করে নিয়েছে।' সেদিন সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. রাসুলের সামনে নিজের বীরত্বের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে সক্ষম হন। ফলে নবিজি নিজে তাঁর হাতে তির ধরিয়ে বলেন, 'তোমার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোন, তুমি তির নিক্ষেপ করো।' এভাবে নবিজির পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেদিন প্রখ্যাত তিরন্দাজ আবু তালহা আনসারিও নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর ভূমিকায় অভিভূত হয়ে নবিজি বলেছিলেন, 'নিশ্চয় আবু তালহার একক আওয়াজ কাফিরবাহিনীর জন্য সম্মিলিত বাহিনীর শব্দের চেয়েও ভয়ংকর।' সেদিন তিনি নিজেকে ঢাল বানিয়ে রাসুলের সামনে মানববর্মে পরিণত হন। তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ তিরন্দাজ ছিলেন। তির নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অনেক কঠিনভাবে ধনুক টেনে তির চালাতেন। সেদিন তির নিক্ষেপ করতে গিয়ে প্রায় দু-তিনটা ধনুক ভেঙে ফেলেন। নবিজির পাশ দিয়ে কেউ তির নিয়ে গেলে তিনি তাঁকে বলতেন, 'তুমি এগুলো আবু তালহাকে দিয়ে দাও।' একপর্যায়ে নবিজি মাথা উঁচু করে দেখতে চাইলে আবু তালহা বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না। আমি আশঙ্কা করছি—শত্রুর তির যেন আপনার গায়ে লেগে না যায়। আমি তাদের তিরের আঘাত সামলাতে আপনার সামনে বুক পেতে আছি!’ নুসায়বা বিনতু কাআব মাজিনিও সেদিন নবিজির প্রতিরক্ষায় তির ও তরবারি চালাতে নামেন। এমনকি তাঁর শরীরে দৃশ্যমান একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। আবু দুজানাও নিজের শরীরকে নবিজির সামনে মানবঢালে পরিণত করেন। ফলে তিরের আঘাতে তাঁর কোমরে একাধিক ছিদ্র তৈরি হয়। এরপর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা নবিজির পাশে চলে আসেন। প্রথমেই আবু বকর ও আবু উবায়দা রা. এসে পৌঁছান। আবু উবায়দা নিজের দাঁত দিয়ে নবিজির চেহারা থেকে দুটি তির বের করেন। এরপর আরও প্রায় ৩০ জন সাহাবি নবিজির প্রতিরক্ষায় তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হন, যাঁদের মধ্যে কাতাদা, সাবিত ইবনু দাহদাহ, সাহল ইবনু হুনাইফ, উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুর রাহমান ইবনু আওফ, জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. উল্লেখযোগ্য। এরপর নবিজি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে উহুদের একটা উপত্যকার দিকে যান। মুশরিকদের প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও সাহাবিরা নিজেদের এবং নবিজির অবস্থা দেখে অত্যন্ত চিন্তাগ্রস্ত ও পেরেশান হয়ে ওঠেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁদের হতাশা ও দিশেহারা পরিস্থিতির গুমোট ভাব দূর করতে আল্লাহ তাঁদের ওপর তন্দ্রার জাল বিস্তার করেন। ফলে তাঁরা কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বস্তির শ্বাস নিতে সক্ষম হন। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ آمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّوْنَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُوْلُوْنَ هَلْ لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلهِ يُخْفُوْنَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَّا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُوْلُوْنَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هُهُنَا قُلْ لَّوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوْبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ তারপর তোমাদের ওপর শোকের পর শান্তি অবতীর্ণ করলেন, যা ছিল তন্দ্রার মতো। সে তন্দ্রায় তোমাদের কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল আল্লাহ সম্পর্কে—তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো। তারা বলছিল, আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বলো, সবকিছুই আল্লাহর হাতে; তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে, তোমার কাছে প্রকাশ করে না। সেসবও তারা বলে, আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। তুমি বলো, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে, তবু তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে, যাদের মৃত্যু লিখে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের মনে যা রয়েছে, তার পরীক্ষা করা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আর তোমাদের মনে যা কিছু রয়েছে, তা পরিষ্কার করা ছিল তাঁর কাম্য। মনের ব্যাপারে গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন। [সুরা আলে ইমরান : ১৫৪] অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, 'আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল' এ আয়াতে মুনাফিকদের অবস্থা আলোচনা করা হয়েছে। এদিকে কুরাইশবাহিনী শেষ পর্যায়ে নিজেদের নিশ্চিত বিজয় থেকে নিরাশ হয়ে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিমরা তন্দ্রার পরিস্থিতির ভেতর পরিপূর্ণ স্বস্তিতে নবিজির সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। হতাশ কাফিররা তখন মুসলিমদের পিছু ধাওয়া না করে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরে। তিন. খায়বারযুদ্ধ ও খালিদ ১. খায়বারের পটভূমি ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ১৯ খায়বার মদিনা থেকে ৬০ অথবা ৮০ মাইল দূরের একটা শহর। এখানে দুর্গ এবং খেতখামারও ছিল। এখানকার আবহাওয়া তেমন ভালো নয়। এলাকাটা ছিল ইয়াহুদিদের ষড়যন্ত্রের আখড়া। এখান থেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। এদিকে হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে খন্দকযুদ্ধের ত্রিমুখী শক্তির মধ্যে কুরাইশদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেও ইয়াহুদি এবং নজদের কয়েকটা গোত্র সম্পর্কে তখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। তাই এদের ব্যাপারে হিসাবনিকাশ মিটিয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন দেখা দেয়। কেননা, এতে সব দিক থেকে নিরাপত্তা লাভ সম্ভব হবে। ফলে সপ্তম হিজরির মুহাররামে নবিজি ﷺ ১ হাজার ৪০০ সাহাবির এক বাহিনী নিয়ে খায়বারের উদ্দেশে রওনা করেন। মুসা ইবনু উকবা বলেন, হুদায়বিয়া থেকে ফিরে আসার পর নবিজি ﷺ প্রায় ২০ দিন মদিনায় অবস্থান করেন। এরপর খায়বারের উদ্দেশে রওনা দেন। রওনার সময় তিনি সিবা ইবনু উরফুজাকে মদিনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যান।২০ নবিজি ﷺ খায়বারে পৌঁছে ফজরের সালাত আদায় করেন। যুদ্ধ শুরুর আগে আলি রা.-এর হাতে পতাকা তুলে দেওয়া হয়। এরপর সেখানের অধিবাসীদের টানা ১৪ দিন কঠোরভাবে অবরোধ করে রাখেন। অবরুদ্ধ খায়বারবাসী একপর্যায়ে মুসলিমবাহিনীর কাছে এই শর্তে সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে আসে যে, দুর্গে যে-সকল সেনা রয়েছে, তাদের প্রাণভিক্ষা দেওয়া হবে এবং তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যারা তাদের কাছেই থাকবে। অর্থাৎ, তারা মুসলিমদের দাস-দাসী হিসেবে বন্দি থাকবে না। তারা নিজেদের অর্থ-সম্পদ সোনা-রুপা, জায়গা-জমি, ঘোড়া, বর্ম ইত্যাদি সবকিছু রাসুল ﷺ-এর কাছে অর্পণ করবে, শুধু পরিধানের পোশাক নিয়ে বেরিয়ে যাবে। ২১ রাসুল ﷺ তাদের প্রস্তাব শুনে বলেন, 'যদি তোমরা কিছু গোপন করে রাখো, তাহলে এর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল দায়ী হবেন না। ইয়াহুদিরা তখন নবিজির এ শর্তও মেনে নেয়। তবে রাসুল ﷺ যখন উপরিউক্ত শর্তে তাদের বহিষ্কারের ইচ্ছা করেন, তখন তারা বলে, এই শর্তে আমাদেকে এখানে থাকতে দিন যে, আমরা এখানের জমি চাষ করব এবং উৎপাদিত ফল ও ফসল থেকে আমরা অর্ধেক নেব আর বাকি অর্ধেক আপনি নেবেন। নবিজি তাদের এ শর্তও মেনে নেন এবং সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত হয়। ২২ ২. খায়বারে কঠিন অবরোধ এবং মুনাফিকদের পিছু হটা খায়বারযুদ্ধে বনু কুরায়জার সমর্থন পেয়ে সম্মিলিত কাফিরবাহিনী অবরোধ তীব্র করে তুললে মুসলিমদের প্রতিকূলতা বাড়তে থাকে। ফলে অবস্থা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের প্রতিকূল অবস্থার আলোচনা করা হয়েছে। তাঁরা যে ধরনের পেরেশানি ও আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তার পরিপূর্ণ দৃশ্য এভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَ مِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَ بَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللهِ الظُّنُوْنَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَ الا شَدِيدًا যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উঁচু ও নিচু ভূমি থেকে এবং তোমাদের চোখ বিস্ফারিত আর প্রাণ কণ্ঠাগত হয়েছিল; আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা করতে শুরু করেছিলে, সে সময় মুমিনরা পরীক্ষিত ও ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। [সুরা আহজাব: ১০-১১] ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর মুসলিমদের অগাধ ভরসা ছিল, যার বিবরণ দিতে গিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে, وَلَمَّا رَا الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هُذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَ رَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيْمَانًا وَتَسْلِيمًا যখন মুমিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখল তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদের এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ইমান ও আত্মসমর্পণই বাড়ল। [সুরা আহজাব : ২২] অন্যদিকে মুনাফিকরা মুসলিমবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ভীতি-শঙ্কায় নিপতিত হয়। একপর্যায়ে আমর ইবনু আওফ গোত্রের মুআত্তাব ইবনু কুশাইর বলে বসে, 'মুহাম্মাদ আমাদের একদিকে কিসরা ও কায়সারের ধনভান্ডার প্রাপ্তির সুসংবাদ শোনান; অথচ আমাদের অবস্থা এমন- নিরাপত্তাহীনতায় প্রাকৃতিক কাজ পর্যন্ত কেউ সারতে পারে না!' তাদের কেউ কেউ নিজের আত্মীয়-পরিজনের নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে ময়দান ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি চায়। মুনাফিকদের এ ধরনের আচরণ তাদের আত্মিক দুর্বলতা ও কাপুরুষতার বহিঃপ্রকাশ ছিল। তারা চেয়েছিল মুসলিমরা যেন শত্রুদের কবলে পড়েন। কিছু কিছু বর্ণনায় মুসলিমদের নিয়ে তাদের বিদ্রুপ করা, মুসলিমদের ভীতসন্ত্রস্ত করা এবং মিত্রহীনভাবে ময়দানে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও পাওয়া যায়; যদিও সেসব সূত্র কিছুটা দুর্বল। ২৩ অবস্থার দৃশ্যকল্পের বিবরণ কুরআনুল কারিম এভাবে তুলে ধরেছে, ২৪ ۞ وَإِذْ قَالَتْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا ۞ وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا ۞ وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ ۚ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا ۞ قُلْ لَنْ يَنْفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَ إِذًا لَا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلًا ۞ قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي يَعْصِمُكُمْ مِنَ اللَّهِ إِنْ أَرَادَ بِكُمْ سُوءًا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ رَحْمَةً ۚ وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا ۞ قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا ۖ وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا ۞ أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ ۖ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ ۖ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ ۚ أُولَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا ۞ يَحْسَبُونَ الْأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا ۖ وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزَابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بَادُونَ فِي الْأَعْرَابِ يَسْأَلُونَ عَنْ أَنْبَائِكُمْ ۖ وَلَوْ كَانُوا فِيكُمْ مَا قَاتَلُوا إِلَّا قَلِيلًا﴾ এবং যখন তাদের একদল বলছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এটা টিকে থাকার মতো জায়গা নয়; তোমরা ফিরে চলো। তাদেরই একদল নবির কাছে অব্যাহতি চেয়ে বলছিল, আমাদের বাড়িঘর খালি; অথচ সেগুলো খালি ছিল না-পালানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গে মিলিত হতো; এরপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই দেরি করত না। অথচ তারা আগে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। বলুন, তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পালালে এই পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। তখন তোমাদের সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে। বলুন, কে আল্লাহ থেকে তোমাদের রক্ষা করবে, যদি তিনি তোমাদের অকল্যাণের বা অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আল্লাহ ভালো করেই জানেন, তোমাদের কারা তোমাদের বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদের বলে, আমাদের কাছে এসো। তারা কমই যুদ্ধ করে; আর তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উলটিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। এরপর যখন বিপদ চলে যায়, তখন ধনসম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সঙ্গে বাক্‌চাতুর্যে নামে। তারা মুমিন নয়, তাই আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্য সহজ। তারা মনে করে শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রুবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা গ্রামবাসী থেকে তোমাদের সংবাদ জেনে নিত, তবেই ভালো হতো। তারা তোমাদের মধ্যে অবস্থান করলেও যুদ্ধ সামান্যই করত। [সুরা আহজাব: ১৩-২০] উপর্যুক্ত আয়াতসমূহে মুনাফিকি ও এর প্রভাবে অন্তরের দুর্বলতা ও কাপুরুষতার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসাহীনতা তৈরি হয়। পরীক্ষার সময় আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের বিপরীতে বাক্‌চাতুর্যে লিপ্ত হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে। তারা রাসুলের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করতে থাকে, যেন যুদ্ধের ময়দান থেকে তাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তুচ্ছ অজুহাত তৈরি করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর সংকল্প করতে থাকে। নিজেদের গৃহ-পরিজনদের নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে চায়; অথচ তাদের এই প্রবণতা শুধু ইমানের দুর্বলতার কারণেই তৈরি হয়। শুধু তা-ই নয়, অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গেও এ ধরনের আচরণ কামনা করে এবং ঘরে ফিরে যেতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। আর এই প্রবণতা বাস্তবায়নে তারা ইমান ও ইসলামের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি। ২০ ৩. খালিদ ও খায়বারের যুদ্ধপরিস্থিতি এদিকে পরিখা পাড়ি দিয়ে মদিনায় ঢুকতে কাফিরদের প্রচেষ্টা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। তাদের অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্যরা বৃহৎ-সংখ্যায় রাতব্যাপী পরিখার আশেপাশে আনাগোনা করতে থাকে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে একটা অশ্বারোহী বাহিনী পরিখার অপেক্ষাকৃত সরু অংশ দিয়ে মুসলিমদের ওপর অতর্কিতে হামলার চেষ্টা করলে উসাইদ ইবনু হুদাইর ২০০ সেনার এক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর কঠোর নজরদারি করতে থাকেন। শত্রুদের সঙ্গে তখন বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে হামজা রা.-এর হত্যাকারী ওয়াহশির বর্শার আঘাতে তুফায়েল ইবনু নুমান শহিদ হন। ২৬ কাফিরবাহিনীর সদস্য হাব্বান ইবনু আরাকার নিক্ষিপ্ত তিরে সাআদ ইবনু মুআজ বাহুতে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাঁর হাতের রগ ছিঁড়ে যায়। তির নিক্ষেপ করতে গিয়ে হাব্বান চিৎকার করে বলছিল, 'ইবনু আরাকার পক্ষ থেকে এটা গ্রহণ করো।' প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সাআদ দুআ করছিলেন, 'আল্লাহ, যদি কুরাইশদের পক্ষ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরও যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আপনি আমাকে জীবিত রাখুন। কেননা, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আগ্রহী, যারা আপনার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, নিজের বাসস্থান থেকে বহিষ্কার করেছে। হে আল্লাহ, যদি আমাদের ও তাদের মধ্যকার যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। ২৭ বনু কুরায়জার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নিজের চক্ষু শীতল করা পর্যন্ত আপনি আমার জীবন দীর্ঘ করুন।' আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় এই বান্দার দুআ কবুল করেছিলেন। অনতিবিলম্বে বনু কুরায়জার বিরুদ্ধে তাঁকেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হয়েছিল। তারপর কাফিরবাহিনী রাসুলের বাসস্থান অভিমুখে তাদের বিশেষ একটা দল পাঠায়। শত্রুর বিরুদ্ধে দিনব্যাপী মুসলিমরা প্রতিরক্ষাযুদ্ধ চালিয়ে যান। কাফিরদের পাঠানো বিশেষ দল রাসুলের বাসস্থানের নিকটবর্তী চলে এলে রাসুল ও তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা আসরের সালাত আদায় করতে পারেননি। রাত ঘনিয়ে এলে শত্রুবাহিনী নিজেদের অবস্থানে ফিরে যায়। তখন রাসুল বলেন, 'আল্লাহ তাদের এবং তাদের ঘর ও কবরসমূহ আগুনে ভরে দিন। কেননা, তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী সালাত তথা আসরের সালাত থেকে বিরত রেখেছে।' একপর্যায়ে সূর্য ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে আসর সালাতের ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়ে যায়। ২৮ চার. হুদায়বিয়ায় রাসুলের অবস্থান এবং খালিদের বাহিনী ১. হুদায়বিয়ায় খালিদের অবস্থান এবং নবিজির পথ পরিবর্তন রাসুল সংবাদ পেয়েছিলেন কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিতে বেরিয়ে পড়েছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে তাদের একটা দল মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করতে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সংবাদ পেয়ে রাসুল সংঘর্ষ এড়াতে পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘোষণা করেন, 'কে আছ, যে কুরাইশদের ওত পেতে থাকা রাস্তার পরিবর্তে অন্য রাস্তার সন্ধান দেবে?' আসলাম গোত্রের একজন বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি এ সেবাদানে প্রস্তুত।' এরপর তিনি পাহাড়ি পথ বেয়ে মুসলিমদের এগিয়ে নিয়ে যান। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রশস্ত উপত্যকার আরামদায়ক রাস্তায় পৌঁছলে রাসুল মুসলিমদের বলেন, 'বলো, আমরা আল্লাহর ক্ষমাপ্রত্যাশী এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি।' এরপর বলেন, 'এটি বনি ইসরাইলকে দেওয়া সেই তাওবার শব্দ 'হিত্তাহ' ।, যা তারা উচ্চারণ করেনি। ২৯ তারপর রাসুল সাহাবিদের নির্দেশ দেন, 'হামাশ অঞ্চলের ডান দিক হয়ে ওই রাস্তা ধরে এগিয়ে যাও, যা সানিয়াতুল মিরারের দিকে এগিয়ে গেছে।' মক্কার নিম্নাঞ্চল হুদায়বিয়ার দিকে এ বাহিনী অত্যন্ত নীরবে এগিয়ে চলে। এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন বাহিনী মুসলিমদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দ্রুত মক্কাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মক্কাবাসী হুদায়বিয়া প্রান্তরে মুসলিমদের পৌঁছার খবর শুনে চিন্তিত হয়ে ওঠে। মক্কার এতটা কাছে মুসলিমবাহিনীর পৌঁছে যাওয়ায় তারা এটাকে মক্কার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করতে থাকে। জেনারেল মাহমুদ শিত এ ব্যাপারে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, মুসলিমবাহিনীর যাত্রাপথ পরিবর্তন মূলত কাফিরদের ভয়ে ভীত হওয়ার কারণে ছিল না। কেননা, শত্রুর ভয়ে ভীত কোনো বাহিনী শত্রুর নিকটবর্তী স্থানে ছাউনি ফেলে না।” ভীতসন্ত্রস্ত হলে শত্রুদের থেকে দূরত্ব অবলম্বন করাই সাধারণ নিয়ম, যাতে আক্রমণ করতে হলে শত্রুবাহিনীর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং তত দিনে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।৩২ ইকতিবাসুন নিজামিল আসকারি ফি আহদিন নাবি গ্রন্থে নবিজির রাস্তা পরিবর্তনের কারণ আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, নতুন রাস্তায় যাত্রা করতে পথপ্রদর্শক নিযুক্ত করা এবং নিরাপদ যাত্রা অব্যাহত রাখার বিষয়টা থেকে অনুধাবন করা যায়, বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান সেনাপতি নিজের বাহিনীর জন্য এ ধরনের রাস্তা অবলম্বন করে থাকেন, যা সাধারণত যেকোনো বিপদের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকে। অভিজ্ঞ সেনাপতিমাত্র এমন রাস্তা এড়িয়ে চলতে চান, যেখানে শত্রুর হামলার আশঙ্কা থাকে।৩৩ ২. খালিদের খালা মায়মুনার সঙ্গে নবিজির বিয়ে মায়মুনা রা. ছিলেন আব্বাস রা.-এর স্ত্রী উম্মুল ফাজলের বোন। ২৬ বছর বয়সে তাঁর স্বামী আবু রুহম ইবনু আবদিল উজ্জা মারা গেলে তিনি আব্বাস রা.-এর স্ত্রীর ওপর নিজের বিয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। উম্মুল ফাজল এ দায়িত্ব আব্বাসের হাতে অর্পণ করলে তিনি তাঁর ভাতিজা মুহাম্মাদের সঙ্গে ৪০০ দিরহাম মোহরের বিনিময়ে তাঁর বিয়ে দেন।৩৪ মায়মুনা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের খালা। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুযায়ী মক্কায় অবস্থানের তিন দিন পেরিয়ে গেলে নবিজি চেয়েছিলেন মায়মুনার সঙ্গে বিয়ের অসিলায় তাঁদের ও কুরাইশদের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য কিছু সময় বাড়াবেন; কিন্তু কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনু আমর ও হুয়াইতিব ইবনু আবদিল উজ্জা প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে জানিয়ে দেয়, তাঁর মক্কায় অবস্থানের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে এসেছে। অতএব, তিনি যেন মক্কা ছেড়ে চলে যান। নবিজি তাদের বলেছিলেন, 'তোমরা আমাকে তোমাদের মধ্যে বিয়ের উৎসব পালনের সুযোগ দাও, আমি তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করি আর তাতে তোমরাও শরিক হও!' তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, 'আপনার খাবারের কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের। আপনি দ্রুত মক্কা ছেড়ে চলে যান।' নবিজি তখন মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং তাঁর আজাদকৃত দাস আবু রাফিকে মায়মুনার খিদমতে রেখে যান। রাসুল যখন সারিফ নামক জায়গায় অবস্থান করেন, তখন মায়মুনাকে নিয়ে আবু রাফি সেখানে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে মায়মুনার দাম্পত্যজীবন শুরু হয়।৩৫ মায়মুনা রা. শেষ সৌভাগ্যবান নারী, যিনি নবিজির স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি সবার শেষে ইনতিকাল করেন। নবিজির সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ যেখানে হয়েছিল, সেই সারিফ প্রান্তরেই তিনি ইনতিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। একদিন সেখানেই তাঁর ওয়ালিমার আয়োজন করা হয়েছিল। মায়মুনার সঙ্গে রাসুলের বিয়ে থেকে অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ ফিকহি একটি মাসআলার উদ্ভব হয়। মাসআলার মূল উপপাদ্য হচ্ছে, রাসুল মায়মুনাকে ইহরাম অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন, নাকি ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার পর? ফিকহশাস্ত্রের গ্রন্থাবলিতে এই মাসআলা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পাঁচ. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ ১. উমরাতুল কাজার প্রভাব উমরাতুল কাজার প্রভাব পুরো আরববিশ্বকে ইসলামের প্রতি অনুভূতিপ্রবণ করে তুলেছিল। মক্কার মুশরিকরাও যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিল তাতে। ড. মাহমুদ শিত খাত্তাব বলেন, উমরাতুল কাজা কুরাইশদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কুরাইশের নেতারা দারুন নাদওয়ায় এবং অন্যরা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রাসুল ও সাহাবিদের মক্কা প্রবেশের দৃশ্য অবলোকন করছিল। রাসুল মসজিদে প্রবেশ করে নিজের চাদরের নিচ থেকে ডান কাঁধ বের করে সাহাবিদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, 'আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর দয়া করুন, যে মক্কার কুরাইশদের সামনে বীরত্ব প্রদর্শন করে।' রাসুল হাজরে আসওয়াদে চুমু খান এবং সাহাবিদের সঙ্গে তাওয়াফের ক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। ২. নববি আখলাকের প্রভাব এবং খালিদের অন্তরে ইসলামের সূর্যোদয় উমরাতুল কাজার সময় রাসুলের আচার-আচরণের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে, তিনি মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মক্কার নেতাদের সামনে একেবারে প্রকাশ্যে বলে বসেন, 'প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তির সামনে এ কথা স্পষ্ট যে, মুহাম্মাদ কোনো জাদুকর বা কবি নন। তাঁর কাছে পাঠানো বাণী নিঃসন্দেহে জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাই বিবেকবানদের তাঁর অনুসরণ করা উচিত!' ফিকহুস সিরাহ, ড. রামাজান বুতি: ৩৫৮। আবু সুফিয়ান নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কি এমন বক্তব্য দিয়েছেন?' খালিদ ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্ধত হন। তখন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল তাকে নিবৃত্ত করে বলেন, 'আবু সুফিয়ান, অপেক্ষা করো। আল্লাহর কসম, খালিদ যে চিন্তা করেন, মুখে তা-ই উচ্চারণ করেন। স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে তুমি তাঁর সঙ্গে লড়াই করবে? অথচ সমগ্র আরবের জনগণ তাঁর হাতে বায়আত হয়ে আছে! আল্লাহর শপথ, আমার মনে হয় এক বছরের মধ্যে সমগ্র আরবের জনগণ মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে যাবে।' খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পর আমর ইবনুল আসও ইসলামগ্রহণ করেন। এদিকে বায়তুল্লাহর তত্ত্বাবধানকারী উসমান ইবনু তালহাও তখন মুসলমান হন। মক্কার প্রতিটা ঘরে প্রকাশ্যে বা গোপনে ইসলামের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, উমরাতুল কাজার মাধ্যমে মক্কাবিজয়ের আগেই মুসলিমরা মক্কাবাসীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন।৩৭ উসতাজ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ বলেন, উমরাতুল কাজার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, ইসলামের আকর্ষণীয় আচরণে প্রভাবিত হয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের ইসলামগ্রহণ। বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতায় এ দুই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে মক্কাবাসীকে তাঁদের অনুসরণে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। ৩৮ ৩. আমর ইবনুল আসের সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য ও ইসলামগ্রহণ ক. আমর ইবনুল আসের সংক্ষিপ্ত জীবনী নাম : আমর ইবনুল আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। উপাধি: আবু মুহাম্মাদ ও আবু আবদিল্লাহ। ইবনু ইসহাক৩৯ ও জুবায়ের ইবনু বাক্কার৪০ এ ব্যাপারে একমত যে, আবিসিনিয়ায় বাদশাহ নাজাশির দরবারেই তিনি ইসলামগ্রহণ করেন। অষ্টম হিজরির সফর মাসে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। ইবনু হাজার বলেন, তিনি মক্কা বিজয়ের আগে অষ্টম হিজরিতে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। হুদায়বিয়া ও খায়বারযুদ্ধের মধ্যবর্তী কোনো একসময় তিনি ইসলামগ্রহণ করেছেন বলেও কথিত আছে। ৪১ খ. আমর ইবনুল আসের জবানিতে তাঁর ইসলামগ্রহণ আমর ইবনুল আস রা. নিজেই তাঁর ইসলামগ্রহণের ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, খন্দকযুদ্ধ থেকে মক্কায় ফিরে আমি আমার কাছের আত্মীয়-বন্ধুদের ডেকে বলি, 'তোমরা জেনে রেখো, মুহাম্মাদের কথা সকল কথার ওপর বিজয়ী হবে, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমার একটা অভিমত রয়েছে, বিষয়টা তোমরা ভেবে দেখতে পারো। চলো, আমরা নাজাশি বাদশাহর কাছে চলে যাই। মুহাম্মাদ যদি আমাদের ওপর বিজয়ী হন, আমরা নাজাশির কাছেই থেকে যাব; আর আমাদের সম্প্রদায় যদি বিজয়ী হয়, তাহলে তো আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি প্রমাণিত হব। সে ক্ষেত্রে নাজাশি আমাদের সঙ্গে উত্তম আচরণই করবেন। আমার এই প্রস্তাব সবাই মেনে নেয়। নাজাশির জন্য কী উপহার নেওয়া যায়, আলোচনা করি। উপহার দেওয়ার মতো সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ছিল আমাদের এখানকার চামড়া। আমরা বেশকিছু চামড়া নিয়ে আবিসিনিয়ায় যাই। আমরা নাজাশির দরবারে যাচ্ছি, এমন সময় আমর ইবনু উমাইয়া আদ দামরিও সেখানে পৌঁছন। রাসুল ﷺ বিশেষ কোনো প্রয়োজনে তাঁকে মদিনা থেকে জাফর ইবনু আবি তালিবের কাছে পাঠিয়েছেন। জাফর তখনো আবিসিনিয়ায় ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আমর নাজাশির দরবার থেকে বেরিয়ে যান। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করতে নাজাশিকে আমরা অনুরোধ করব। অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি যদি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেন, তাহলে আমরা তাকে হত্যা করব। এতে কুরাইশরা বুঝবে, আমরা মুহাম্মাদের দূতকে হত্যা করে বদলা নিয়েছি। এ সিদ্ধান্তের পর আমি নাজাশির কাছে গিয়ে তাঁর সামনে যথারীতি কুর্নিশ করলাম, যেমনটা আমি আগে থেকে করে আসছি। তিনি আমাকে 'হে আমার বন্ধু, তোমায় স্বাগত' বলে বরণ করে নিয়ে বলেন, 'তোমার দেশ থেকে আমার জন্য কোনো উপহার আনোনি?' আমি বলি, 'হ্যাঁ, এনেছি বাদশাহ মহোদয়। আপনার জন্য বিপুল পরিমাণে চামড়া হাদিয়া এনেছি।' এরপর আমাদের উপহারসামগ্রী তাঁর সামনে পেশ করি। উপহারগুলো তাঁর খুবই পছন্দ হয়। তারপর বলি, 'এইমাত্র যে লোকটা আপনার দরবার থেকে বেরিয়ে গেল, সে আমাদের ঘোরতর শত্রুর দূত। আপনি তাকে আমাদের হাতে তুলে দিলে আমরা তাকে হত্যা করব! কারণ, মুহাম্মাদ আমাদের বেশ কজন গোত্রপ্রধান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে।' আমার এ কথায় নাজাশি ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি অমনি হাত বাড়িয়ে নিজের নাকে এমন জোরে ঘুষি মারেন; ভাবলাম নাক হয়তো থেঁতলে গেছে। বাদশাহর এহেন আচরণ দেখে মনে হলো জমিনে আমার জন্য ফাটল ধরুক; আর আমি তাতে ঢুকে যাই। অবস্থা বেগতিক দেখে বিনীতভাবে বলি, 'আমার এ আবেদন আপনাকে এতটা उत्तेজিত করবে, বুঝতে পারলে তা করতাম না।' নাজাশি বললেন, 'তুমি কি চাও, যাঁর কাছে নামুসে আকবর (জিবরিল আ.) আসেন— যিনি মুসা আ.-এর কাছেও এসেছেন—তাঁর দূতকে আমি হত্যার জন্য তোমাদের হাতে তুলে দেবো?' আমি বলি, 'সত্যিই কি তিনি এমন ব্যক্তি?' তিনি বললেন, 'আমর, তোমাদের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। আমার কথা শোনো। তোমরা তাঁর আনুগত্য করো। আল্লাহর শপথ, তিনিই সত্যপন্থি। তিনি তাঁর বিরোধীদের ওপর বিজয়ী হবেন; যেমন হয়েছিলেন মুসা আ. ফিরআউন ও তার লোকদের ওপর।' আমি বলি, 'আপনি তাহলে তাঁর পক্ষে আমার বায়আত বা আনুগত্যের শপথ নিন!' তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর হাতে ইসলামের বায়আত হয়ে আমার সাথিদের কাছে ফিরে যাই; কিন্তু তখন আমার চিন্তাধারায় যে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে, তার কিছুই তাদের কাছে প্রকাশ করিনি। এবার রাসুলের হাতে বায়আত হতে আবিসিনিয়া থেকে রওনা হই। পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হয় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গে। তিনিও মক্কা থেকে মদিনায় যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করি, 'আবু সুলায়মান, কোথায় যাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, মারাত্মক পরীক্ষার সম্মুখীন। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, তিনি নবি। এখন দ্রুত ইসলাম কবুল করা উচিত। এই দ্বিধাসংশয়ে আর কত ডুবে থাকব?' বললাম, 'আমিও তো এই উদ্দেশ্যেই চলছি!' এরপর দুজন একসঙ্গে রাসুলের খিদমতে গেলাম। আমাদের দেখেই নবিজির চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, 'মক্কা তাঁর কলিজার মূল্যবান অংশসমূহ তোমাদের প্রতি ছুড়ে মারছে!' প্রথমে খালিদ নবিজির হাতে বায়আত হন। তারপর আমি একটু কাছে এসে নিবেদন করি, 'আল্লাহর রাসুল, আমিও বায়আত হব। তবে আমার আগের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হবে।' তিনি বললেন, 'আমর, বায়আত হও। ইসলাম আগের সকল পাপ মুছে দেয়, হিজরতও আগের যাবতীয় অপরাধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়।' আমি তখন প্রিয়নবির হাতে বায়আত হয়ে ফিরে যাই। ৪২ আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমর ইবনুল আস বলেন, এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে দেন, তখন আমি রাসুলের দরবারে গিয়ে নিবেদন করি, 'আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বায়আত হতে চাই।' তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে আমি আমার হাত টেনে নিই। রাসুল বললেন, 'আমর, কী ব্যাপার?' বলি, 'আগে আমি শর্ত করে নিতে চাই।' জিজ্ঞেস করেন, 'কী শর্ত করবে?' উত্তরে বলি, 'আল্লাহ যেন আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন।' তিনি বললেন, 'আমর, তুমি কি জানো না, ইসলাম পূর্ববর্তী যাবতীয় অন্যায় মিটিয়ে দেয়; আর হিজরত তার আগের অপরাধ মুছে ফেলে; অনুরূপ হজও আগের সব পাপ নিশ্চিহ্ন করে দেয়!'৪৩ ৪. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ ক. খালিদের ইসলামগ্রহণের জন্য রাসুলের দুআ রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণের জন্য দুআ করতেন। তিনি বলতেন, 'আল্লাহ, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সালামা ইবনু হিশাম এবং দুর্বল মুসলিমদের কাফিরদের হাত থেকে মুক্তি দাও।' এ দুআর বরকতে আল্লাহর রহমতে সপ্তম হিজরিতে খালিদ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসেন। ৪৪ খ. খালিদের জবানিতে তাঁর ইসলামগ্রহণ খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর ইসলামগ্রহণের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, যখন আল্লাহ আমার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, আমার অন্তরে ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার মনোভাব সৃষ্টি করে দেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগত, আমি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে প্রতিটা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। প্রতিটা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় ভাবতাম, হয়তো আমি অনুপযুক্ত স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সবার ওপর বিজয়ী হয়ে আসবেন। রাসুল যখন হুদায়বিয়ার দিকে যাত্রা করেছিলেন, তখন আমি মুশরিকদের অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। উসফান প্রান্তরে আমরা মুসলিমদের মুখোমুখি হই। মুহাম্মাদ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে জুহরের সালাত আদায় করেন। আমরা একবার ভেবেছিলাম, তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা করব; কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হামলা না করা আমাদের জন্য কল্যাণকর ছিল। তিনি যেন আমাদের মনস্থিত ব্যাপারগুলো বুঝতে পারছিলেন, ফলে আসরের সালাতের ক্ষেত্রে 'সালাতুল খাওফ' আদায় করেন। সালাতের অবস্থার পরিবর্তন দেখে আমি প্রভাবিত হয়ে পড়ি। আমার মনে কল্পনার উদয় হয়, এ লোক নিঃসন্দেহে কারও রক্ষণাবেক্ষণে পরিচালিত হচ্ছে! এরপর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং তিনি আমাদের রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরে এগিয়ে যান। যখন কুরাইশরা তাঁর সঙ্গে সন্ধি করে এবং তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেয়, তখন ভাবছিলাম, এখন আর কী-ই-বা করার আছে? কোথায় যাওয়া যায়? একবার ভাবছিলাম আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশির কাছে চলে যাব। আবার ভাবছিলাম, যেহেতু তিনি নিজেই মুহাম্মাদের আনুগত্য গ্রহণ করেছেন এবং মুহাম্মাদের সঙ্গীরা তাঁর কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, সেখানে গিয়ে কী হবে? আবার ভাবছিলাম, কোনোভাবে হিরাক্লিয়াসের কাছে চলে গিয়ে ধর্ম ত্যাগ করে ইয়াহুদি বা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে অনারবদের সঙ্গে তাদের অনুগামী হয়ে বসবাস শুরু করব। কখনো ভাবছিলাম, সবার সঙ্গে নিজ এলাকাতেই স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে থাকি। ইতিমধ্যে রাসুল উমরাতুল কাজা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। আমি মক্কা থেকে বেরিয়ে গেলাম। তিনি যতদিন এখানে ছিলেন, ততদিন মক্কায় আসিনি। আমার ভাই ওয়ালিদ ইবনুল ওয়ালিদও রাসুলের সঙ্গে উমরা করেছিল। সে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমার সাক্ষাৎ পায়নি। তারপর আমার কাছে এই মর্মে চিঠি লিখে যায়, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ইসলামের ব্যাপারে তোমার নেতিবাচক আচরণে আমি বিস্মিত। তুমি যথেষ্ট বিচক্ষণ। বিচক্ষণ কোনো মানুষ কি এখনো ইসলাম সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে? রাসুল আমাকে তোমার ব্যাপারে বার বার জিজ্ঞেস করেছেন এবং বলেছেন, 'খালিদ কোথায়?' আমি বলেছি, 'আল্লাহ তাকে নিয়ে আসবেন।' আমার উত্তর শুনে তিনি বলেছেন, 'খালিদের মতো ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে না। যদি সে মুসলিমদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে নিজের শক্তিপ্রদর্শন করত, তাহলে তা তার জন্য কল্যাণকর হতো। যদি সে আমাদের সঙ্গে মিলিত হতো, তাহলে অবশ্যই তাকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দিতাম।' আমার ভাই, যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে, এবার ফিরে এসো। অনেক সৌভাগ্য তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে, এবার তো ফিরে এসো। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বলেন, আমার কাছে যখন ভাই ওয়ালিদের চিঠি এসে পৌঁছায়, তখন ইসলামের প্রতি আমি আরও আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। রাসুলের কথা শুনে দারুণ আনন্দ অনুভব করি এবং পুলকিত হই। ইতিমধ্যে একদিন স্বপ্নে দেখি, আমি একটা অন্ধকার সংকীর্ণ জায়গায় বসে আছি। খানিক পর আলোকিত প্রশস্ত একটা জায়গায় গিয়ে উপনীত হই। আমি মনে মনে বলছিলাম, এটা একটা অস্বাভাবিক স্বপ্ন। মদিনায় গেলে আবু বকরকে স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'তুমি যে অন্ধকার সংকীর্ণ জায়গা দেখেছিলে, তা ছিল কুফর-শিরকের অন্ধকার। আর যে প্রশস্ত আলোকিত জায়গা দেখেছিলে, তা ছিল ইসলামের আলোকোজ্জ্বল আঙিনা।' এরপর যখন আল্লাহর রাসুলের দরবারে যাওয়ার চিন্তা করি, তখন মনে মনে ভাবছিলাম, কাকে সঙ্গে নেব। অনেক ভেবেচিন্তে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে বলি, 'আবু ওয়াহাব, তুমি কি দেখছ-দিন দিন আমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয় হচ্ছে? ধীরে ধীরে আমরা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছি। এদিকে আরব-অনারব সর্বত্র মুহাম্মাদের বিজয়কেতন উড়ছে। যদি আমরা তাঁর কাছে গিয়ে আনুগত্য গ্রহণ করি; আর ইতিমধ্যে তিনি আরবদের মধ্যে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে গেছেন, তাহলে কতই-না ভালো হতো!' আমার কথা শুনে সাফওয়ান তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলে, 'যদি সমগ্র কুরাইশ ইসলামগ্রহণ করে, তবু আমি করব না।' এমন উত্তর শুনে আমি তার থেকে আলাদা হয়ে যাই। মনে মনে ভাবছিলাম, যেহেতু ইতিপূর্বে বদরযুদ্ধে তার বাপ-ভাই নিহত হয়েছে, এ জন্য হয়তো সে প্রতিশোধের নেশায় দিন গুনছে। এরপর ইকরিমা ইবনু আবি জাহলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাকেও অনুরূপ বলি। সে-ও সাফওয়ানের মতো কথা শোনায়। আমি তাকে বলি, 'ঠিক আছে, এ কথা কাউকে বলো না।' আমি মনে করছিলাম, যেহেতু বদরযুদ্ধে তার আত্মীয়স্বজন নিহত হয়েছে, তাই সে অন্য কিছু ভাবছে। তবে আমি তার সামনে সেসব কথা আলোচনা করা সমীচীন মনে করিনি। এবার ভাবলাম একাই মুহাম্মাদের দরবারে চলে যাই। আমার ভয় কীসের? এরপর একাকী মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ি। পথিমধ্যে উসমান ইবনু তালহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তার সঙ্গে খোলামেলা সব আলোচনা করি। তাকে বলি, 'মুহাম্মাদের সঙ্গে আমাদের বর্তমান অবস্থার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই শেয়ালের মতো, যে গুহায় বসে আছে; কিন্তু সে যখন চাইবে পানি ঢেলে তাকে বের করতে পারে এবং শেয়ালটা তখন বেরোতে বাধ্য হবে।' তাকেও আমি মদিনায় গিয়ে রাসুলের আনুগত্য করার কথা বলি এবং সে তাৎক্ষণিক আমার কথায় ইতিবাচক সায় দেয়। আমাকে বলে, 'আজ সকালেই আমি এ ব্যাপারে ভাবছিলাম। দেখো, আমার বাহন এখনো একদম প্রস্তুত আছে।' এরপর এই বলে যাত্রা শুরু করি যে, আমরা ইয়াজিজ প্রান্তরে একত্রিত হব। যদি সে আমার আগে পৌঁছে যায়, তাহলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে; আর আমি আগে গেলে তার জন্য অপেক্ষা করব। রাতের আঁধারে আমরা যাত্রা করি। ফজরের আগেই ইয়াজিজ প্রান্তরে একত্রিত হই। সকাল হলে একত্রে যাত্রা অব্যাহত রাখি। হাদ্দাহ নামক স্থানে আমর ইবনুল আসের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সে আমাদের স্বাগত জানায়। আমরাও সানন্দে তার সঙ্গে মিলিত হই। আমাদের গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমরা তাকে উলটো তার গন্তব্য জিজ্ঞেস করি। উত্তর না দিয়ে সে আবার আমাদের যাত্রার কারণ জানতে চায়। আমরা জানাই, 'ইসলামগ্রহণ ও মুহাম্মাদের অনুসারী হতে যাচ্ছি।' সে-ও আমাদের মতোই মনোভাব প্রকাশ করে। এরপর একসঙ্গে আমরা মদিনায় পৌঁছাই। হাররাহ নামক স্থানে বাহনগুলো বেঁধে আমরা রাসুলের দরবারে যাই। নবিজিকে আমাদের আগমনের সংবাদ দেওয়া হলে তিনি দারুণ আনন্দিত হন। আমি তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে উত্তম পোশাক পরে রওনা হই। রাস্তায় সহোদর ওয়ালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে আমাকে বলে, 'দ্রুত চলো, নবিজিকে তোমার আগমন-সংবাদ জানানো হয়েছে। তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং তোমাদের অপেক্ষা করছেন।' আমি তখন দ্রুত রাসুলের দরবারে উপস্থিত হই। আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসেন। আমি তাঁকে অভিবাদন জানাই। হাসিমুখে তিনি উত্তর দিলে আমি বলি, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।' উত্তরে তিনি বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন। তোমার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা থেকে আমার প্রত্যাশা ছিল, আল্লাহ তোমাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করবেন।' আমি তখন বলি, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি তো জানেন, আমি প্রতিটা রণাঙ্গনে আপনার বিরুদ্ধে ছিলাম। আমার সেসব পাপের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।' নবিজি বলেন, 'নিঃসন্দেহে ইসলাম আগের যাবতীয় পাপ মিটিয়ে দেয়।' আমি বলি, 'তবু আপনি আলাদা করে প্রার্থনা করুন।' তিনি তখন প্রার্থনা করে বলেন, 'হে আল্লাহ, খালিদ আপনার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরিতে আজ পর্যন্ত যত পাপ করেছে, তাঁর সব ক্ষমা করে দিন!' তারপর আমর ইবনুল আস এবং উসমান ইবনু তালহাও নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে বায়আত হন। খালিদ রা.-এর বর্ণনামতে, তিনি অষ্টম হিজরির সফর মাসে ইসলামগ্রহণ করেন। খালিদ বলেন, আমার ইসলামগ্রহণের পর রাসুল সংকটপূর্ণ যেকোনো মুহূর্তে সাহাবিদের মধ্যে আমার ওপরই বেশি ভরসা করতেন। ৪৫ গ. খালিদের ইসলামগ্রহণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ১. কাফির থাকতেই খালিদ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, শেষপর্যন্ত রাসুল-ই বিজয়ী হবেন। তিনি বলেন, 'আমি রাসুলের বিরুদ্ধে প্রতিটা যুদ্ধে উপস্থিত থাকলেও দেখতে পাচ্ছিলাম, প্রতিটা ক্ষেত্রেই তিনি বিজয়ী হচ্ছেন আর আমরা পরাজিত হচ্ছি। মনে হচ্ছিল অচিরেই তিনি পুরো আরবে বিজয়ী ও নেতৃত্ব প্রদানকারী হিসেবে আবির্ভূত হবেন। ৪৬ তাঁর এ স্বীকারোক্তি ইসলামের শত্রুদের জন্য নিঃসন্দেহে চিন্তনীয় বিষয় হতে পারে। ২. কারও যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রদান তার ওপর একধরনের প্রভাব বিস্তার করে। খালিদকে লক্ষ্য করে রাসুলের বক্তব্য— ‘খালিদের মতো বিচক্ষণ ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে অনবগত থাকতে পারে না। কতই-না ভালো হতো, যদি সে তার সামর্থ্য ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণে ব্যবহার করত, আমরাও তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখতাম।’ রাসুলের এমনতর প্রশংসাপূর্ণ কথা তাঁর অন্তরে গভীর রেখাপাত করে ইসলামগ্রহণে উদ্দীপ্ত করে তোলে। নবিজি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারে ছিলেন অত্যন্ত কুশলী। তিনি খালিদের সামনে তাঁর সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলি, বুদ্ধিমত্তা ও সামর্থ্যের প্রশংসা করলে যে নেতৃত্বপ্রীতি এতদিন তাঁর ইসলামগ্রহণে অন্তরায় হয়ে ছিল, তা উধাও হয়ে যায়। যখন তিনি নিশ্চিতভাবে অনুভব করেন, ইসলামগ্রহণের ফলে তাঁকে পিছিয়ে থাকতে হবে না; বরং তাঁর যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে, তখন শয়তানের কুমন্ত্রণা পরাজিত হয় এবং তিনি উদ্বুদ্ধ হন। আমর ইবনুল আস ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ ইসলামের শক্তিবৃদ্ধি আর কাফিরদের লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শৌর্যবীর্যের অধিকারী এই দুই মহানায়কের হাতে অর্জিত ইসলামি বিজয়গাথা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমদের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। ৪৭ টিকাঃ ৩৭. আর-রাসুল আল-কাইদ: ২০৯-২১০। ৩৮. আবকারিয়াতু মুহাম্মাদ: ৬৯। ৩৯. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৯/৩৫। ৪০. আল-ইসাবাহ: ২/৩। ৪১. তাহজিবুত তাহজিব: ৮/৫৬। ৪২. সহিহ আস-সিরাতুন নাবাবিয়া: ৪৯৪; সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/২৭৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৬০। ৪৩. সহিহ মুসলিম: ১২১। ৪৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ১৬৩। ৪৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৩৯-২৪০; আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/৯৫। ৪৬. সুলহু হুদায়বিয়া, আবু ফারিস: ২৬৩। ৪৭. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/৯৫। বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুসলমান ও কাফির উভয় বাহিনী তখন যুদ্ধময়দানে এমনভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যে, মুসলমান মুসলমানের হাতেই শহিদ হতে থাকেন। এ যুদ্ধে মুসআব ইবনু উমায়ের রা. শহিদ হন। তাঁর চেহারার সঙ্গে নবিজির চেহারার অনেক মিল ছিল। ফলে তাঁর শাহাদাতের পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রাসুল শহিদ হয়েছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, শয়তান বা মুশরিকদের কেউ একজন উচ্চৈঃস্বরে এ ঘোষণা দেয় যে, 'মুহাম্মাদ নিহত হয়েছেন!' এই মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিদের মনোবল ভেঙে যায়। এমনকি বড় বড় অনেক সাহাবিও হতাশ হয়ে পড়েন। তবে অনেকে তখনো অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। বিশৃঙ্খলার কারণে মুসলিমদের হাতে মুসলিমরা শহিদ হতে থাকেন। তবে সবার দৃষ্টি তখন নবিজিকে খুঁজে ফিরছিল। এরপর কাআব ইবনু মালিক রা. প্রথমে তাঁকে দেখতে পান। তিনি আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার দিয়ে ওঠেন, 'মুবারক হো, নবিজি নিরাপদ ও সুস্থ আছেন!' কাআবের এ আওয়াজ শুনে সাহাবিরা নবিজির কাছে দৌড়ে আসতে থাকেন। এ সময় কাফিররা অন্যদিক থেকে সরে এসে এদিকে মনোনিবেশ করে। কয়েকবার নবিজির ওপর আক্রমণ করতে উদ্ধত হয়, তবে তিনি নিরাপদই থাকেন। এমনকি একবার কাফিররা কঠোর আক্রমণ করলে তিনি সাহাবিদের উদ্দেশ করে বলেন, 'কে আছে এমন, যে আমার জন্য প্রাণোৎসর্গ করতে প্রস্তুত?' তখন জিয়াদ ইবনু সাকান রা. নিজের চার সঙ্গীসহ নবিজির কাছে চলে আসেন। তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহিদ হয়ে যান। জিয়াদ রা. আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে রাসুল বলেন, 'তাঁকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' সাহাবিরা তাঁকে পাঁজাকোলা করে নবিজির কাছে নিয়ে আসেন। তখনো তাঁর প্রাণ ছিল। তিনি নবিজির পায়ের উপর নিজের মুখ রাখেন এবং এ অবস্থায়ই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। ঘ. নবিজির চেহারা মুবারক আহত হওয়া তখন কুরাইশের প্রখ্যাত বীর আবদুল্লাহ ইবনু কুমাইয়া সেনাসারি ভেদ করে সামনে এগিয়ে যায় এবং নবিজির চেহারা মুবারকে তরবারি দিয়ে সজোরে আঘাত করে। ফলে নবিজির শিরস্ত্রাণের (লোহার টুপি) দুটি কড়া মুখ ভেদ করে মাথায় ঢুকে যায় এবং একটি দাঁত শহিদ হয়। আবু বকর রা. কড়া দুটি ক্ষতস্থান থেকে ওঠাতে এগিয়ে এলে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. বলেন, 'আল্লাহর কসম, এ খিদমতটি আমাকে করার সুযোগ দিন।' তিনি সামনে এগিয়ে এসে হাত না লাগিয়ে নিজের মুখ দিয়ে কড়া দুটিতে টান দেন। তাতে একটা কড়া বেরিয়ে এলেও এর সঙ্গে আবু উবায়দার একটা দাঁতও উপড়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে আবু বকর দ্বিতীয় কড়াটা বের করতে এগিয়ে এলে তিনি আবারও কসম দিয়ে তাঁকে বিরত রাখেন এবং নিজেই তাতে মুখ লাগিয়ে টান দেন। এবারও তাঁর আরেকটা দাঁত উঠে আসে! এ সময় কাফিরদের খনন করা এক গর্তে রাসুল পড়ে যান। মূলত মুসলিমদের ভূপাতিত করতেই তারা এটা খুঁড়েছিল। এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুশরিকবাহিনী পাহাড়ের উপর দিক থেকে আক্রমণ করতে এলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তাদের প্রতিহত করেন। তিনি ও তাঁর সাথিরা এ ভয়ানক হামলা প্রতিহত করতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নিশ্চিত বিজয় টের পেলেও মুশরিকরা মুসলিমদের বীরত্বের প্রদর্শনী ও জীবনোৎসর্গকারী আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২. দ্বিধাবিভক্ত মুসলিমবাহিনীকে সমন্বিত করতে রাসুলের পরিকল্পনা উহুদযুদ্ধে মুসলিমদের প্রাথমিক বিজয়ের পর মুশরিকবাহিনী যখন মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাদের মৌলিক লক্ষ্য ছিল রাসুলের ওপর আক্রমণ করা; কিন্তু তখনও রাসুল নিজের অবস্থান থেকে পিছপা হননি। জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা একে একে তাঁর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছিলেন। কাফিরবাহিনী যখন রাসুল -কে পুরোপুরি ঘেরাও করে নেয়, তখন তাঁর চারপাশে নয়জন সাহাবি নিজেদের মানবঢালে পরিণত করে নেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন আনসারি। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নবিজিকে এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের করে পাহাড়ের উপরে নিজ বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। আনসার সাহাবিরা তখন কাফিরদের আক্রমণের মুখে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে আত্মোৎসর্গ করতে থাকেন। কায়েস ইবনু আবি হাজিম রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, সেদিন তালহা রা. তাঁর যে হাত দিয়ে নবিজিকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন, আমি তাঁর সে হাত অবশ হয়ে যেতে দেখেছি। রাসুল এক প্রস্তরখণ্ডে উঠতে চাইলে পারেননি। তখন তালহা রা. তাঁর নিচে বসে যান এবং নবিজি তাঁর পিঠে পা দিয়ে পাথরের উপর ওঠেন। জুবায়ের রা. বলেন, রাসুল তখন বলেন, 'তালহা নিজের জন্য জান্নাত আবশ্যক করে নিয়েছে।' সেদিন সাআদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. রাসুলের সামনে নিজের বীরত্বের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে সক্ষম হন। ফলে নবিজি নিজে তাঁর হাতে তির ধরিয়ে বলেন, 'তোমার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোন, তুমি তির নিক্ষেপ করো।' এভাবে নবিজির পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেদিন প্রখ্যাত তিরন্দাজ আবু তালহা আনসারিও নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর ভূমিকায় অভিভূত হয়ে নবিজি বলেছিলেন, 'নিশ্চয় আবু তালহার একক আওয়াজ কাফিরবাহিনীর জন্য সম্মিলিত বাহিনীর শব্দের চেয়েও ভয়ংকর।' সেদিন তিনি নিজেকে ঢাল বানিয়ে রাসুলের সামনে মানববর্মে পরিণত হন। তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ তিরন্দাজ ছিলেন। তির নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অনেক কঠিনভাবে ধনুক টেনে তির চালাতেন। সেদিন তির নিক্ষেপ করতে গিয়ে প্রায় দু-তিনটা ধনুক ভেঙে ফেলেন। নবিজির পাশ দিয়ে কেউ তির নিয়ে গেলে তিনি তাঁকে বলতেন, 'তুমি এগুলো আবু তালহাকে দিয়ে দাও।' একপর্যায়ে নবিজি মাথা উঁচু করে দেখতে চাইলে আবু তালহা বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না। আমি আশঙ্কা করছি—শত্রুর তির যেন আপনার গায়ে লেগে না যায়। আমি তাদের তিরের আঘাত সামলাতে আপনার সামনে বুক পেতে আছি!’ নুসায়বা বিনতু কাআব মাজিনিও সেদিন নবিজির প্রতিরক্ষায় তির ও তরবারি চালাতে নামেন। এমনকি তাঁর শরীরে দৃশ্যমান একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। আবু দুজানাও নিজের শরীরকে নবিজির সামনে মানবঢালে পরিণত করেন। ফলে তিরের আঘাতে তাঁর কোমরে একাধিক ছিদ্র তৈরি হয়। এরপর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে জীবনোৎসর্গকারী সাহাবিরা নবিজির পাশে চলে আসেন। প্রথমেই আবু বকর ও আবু উবায়দা রা. এসে পৌঁছান। আবু উবায়দা নিজের দাঁত দিয়ে নবিজির চেহারা থেকে দুটি তির বের করেন। এরপর আরও প্রায় ৩০ জন সাহাবি নবিজির প্রতিরক্ষায় তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হন, যাঁদের মধ্যে কাতাদা, সাবিত ইবনু দাহদাহ, সাহল ইবনু হুনাইফ, উমর ইবনুল খাত্তাব, আবদুর রাহমান ইবনু আওফ, জুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. উল্লেখযোগ্য। এরপর নবিজি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে উহুদের একটা উপত্যকার দিকে যান। মুশরিকদের প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও সাহাবিরা নিজেদের এবং নবিজির অবস্থা দেখে অত্যন্ত চিন্তাগ্রস্ত ও পেরেশান হয়ে ওঠেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁদের হতাশা ও দিশেহারা পরিস্থিতির গুমোট ভাব দূর করতে আল্লাহ তাঁদের ওপর তন্দ্রার জাল বিস্তার করেন। ফলে তাঁরা কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বস্তির শ্বাস নিতে সক্ষম হন। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ آمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّوْنَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُوْلُوْنَ هَلْ لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلهِ يُخْفُوْنَ فِي أَنْفُسِهِمْ مَّا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُوْلُوْنَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هُهُنَا قُلْ لَّوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللَّهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوْبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ তারপর তোমাদের ওপর শোকের পর শান্তি অবতীর্ণ করলেন, যা ছিল তন্দ্রার মতো। সে তন্দ্রায় তোমাদের কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল আল্লাহ সম্পর্কে—তাদের মিথ্যা ধারণা হচ্ছিল মূর্খদের মতো। তারা বলছিল, আমাদের হাতে কি কিছুই করার নেই? তুমি বলো, সবকিছুই আল্লাহর হাতে; তারা যা কিছু মনে লুকিয়ে রাখে, তোমার কাছে প্রকাশ করে না। সেসবও তারা বলে, আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না। তুমি বলো, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে, তবু তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে, যাদের মৃত্যু লিখে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের মনে যা রয়েছে, তার পরীক্ষা করা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আর তোমাদের মনে যা কিছু রয়েছে, তা পরিষ্কার করা ছিল তাঁর কাম্য। মনের ব্যাপারে গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন। [সুরা আলে ইমরান : ১৫৪] অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, 'আর কেউ কেউ প্রাণের ভয়ে ভাবছিল' এ আয়াতে মুনাফিকদের অবস্থা আলোচনা করা হয়েছে। এদিকে কুরাইশবাহিনী শেষ পর্যায়ে নিজেদের নিশ্চিত বিজয় থেকে নিরাশ হয়ে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিমরা তন্দ্রার পরিস্থিতির ভেতর পরিপূর্ণ স্বস্তিতে নবিজির সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। হতাশ কাফিররা তখন মুসলিমদের পিছু ধাওয়া না করে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার পথ ধরে। টিকাঃ ১২. শারহুল মাওয়াহিব, জুরকানি: ২/৩০১। ১৩. ইবনু হিব্বান, দারা কুতনি, তাবরানি ইত্যাদি-কানজুল উম্মাল: ২/২৭৪। ১৪. নাজরাতুন নায়িম: ১/৩০৪। ১৫. সহিহ বুখারি: ৩৭২৪। ১৬. সহিহ আস-সিরাতুন নাবাবিয়া: ২৯৬। ১৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩৫-৩৬। ১৮. নাজরাতুন নায়িম: ১/৩০৫-৩০৬।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খায়বারযুদ্ধ ও খালিদ

📄 খায়বারযুদ্ধ ও খালিদ


১. খায়বারের পটভূমি ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ
খায়বার মদিনা থেকে ৬০ অথবা ৮০ মাইল দূরের একটা শহর। এখানে দুর্গ এবং খেতখামারও ছিল। এখানকার আবহাওয়া তেমন ভালো নয়। এলাকাটা ছিল ইয়াহুদিদের ষড়যন্ত্রের আখড়া। এখান থেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।

এদিকে হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে খন্দকযুদ্ধের ত্রিমুখী শক্তির মধ্যে কুরাইশদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেও ইয়াহুদি এবং নজদের কয়েকটা গোত্র সম্পর্কে তখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। তাই এদের ব্যাপারে হিসাবনিকাশ মিটিয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন দেখা দেয়। কেননা, এতে সব দিক থেকে নিরাপত্তা লাভ সম্ভব হবে।

ফলে সপ্তম হিজরির মুহাররামে নবিজি ﷺ ১ হাজার ৪০০ সাহাবির এক বাহিনী নিয়ে খায়বারের উদ্দেশে রওনা করেন। মুসা ইবনু উকবা বলেন, হুদায়বিয়া থেকে ফিরে আসার পর নবিজি ﷺ প্রায় ২০ দিন মদিনায় অবস্থান করেন। এরপর খায়বারের উদ্দেশে রওনা দেন। রওনার সময় তিনি সিবা ইবনু উরফুজাকে মদিনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যান।

নবিজি ﷺ খায়বারে পৌঁছে ফজরের সালাত আদায় করেন। যুদ্ধ শুরুর আগে আলি রা.-এর হাতে পতাকা তুলে দেওয়া হয়। এরপর সেখানের অধিবাসীদের টানা ১৪ দিন কঠোরভাবে অবরোধ করে রাখেন। অবরুদ্ধ খায়বারবাসী একপর্যায়ে মুসলিমবাহিনীর কাছে এই শর্তে সন্ধিপ্রস্তাব নিয়ে আসে যে, দুর্গে যে-সকল সেনা রয়েছে, তাদের প্রাণভিক্ষা দেওয়া হবে এবং তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যারা তাদের কাছেই থাকবে। অর্থাৎ, তারা মুসলিমদের দাস-দাসী হিসেবে বন্দি থাকবে না। তারা নিজেদের অর্থ-সম্পদ সোনা-রুপা, জায়গা-জমি, ঘোড়া, বর্ম ইত্যাদি সবকিছু রাসুল ﷺ-এর কাছে অর্পণ করবে, শুধু পরিধানের পোশাক নিয়ে বেরিয়ে যাবে। রাসুল ﷺ তাদের প্রস্তাব শুনে বলেন, 'যদি তোমরা কিছু গোপন করে রাখো, তাহলে এর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল দায়ী হবেন না। ইয়াহুদিরা তখন নবিজির এ শর্তও মেনে নেয়।

তবে রাসুল ﷺ যখন উপরিউক্ত শর্তে তাদের বহিষ্কারের ইচ্ছা করেন, তখন তারা বলে, এই শর্তে আমাদেকে এখানে থাকতে দিন যে, আমরা এখানের জমি চাষ করব এবং উৎপাদিত ফল ও ফসল থেকে আমরা অর্ধেক নেব আর বাকি অর্ধেক আপনি নেবেন। নবিজি তাদের এ শর্তও মেনে নেন এবং সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত হয়।

২. খায়বারে কঠিন অবরোধ এবং মুনাফিকদের পিছু হটা
খায়বারযুদ্ধে বনু কুরায়জার সমর্থন পেয়ে সম্মিলিত কাফিরবাহিনী অবরোধ তীব্র করে তুললে মুসলিমদের প্রতিকূলতা বাড়তে থাকে। ফলে অবস্থা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের প্রতিকূল অবস্থার আলোচনা করা হয়েছে। তাঁরা যে ধরনের পেরেশানি ও আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তার পরিপূর্ণ দৃশ্য এভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে,
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَ مِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَ بَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللهِ الظُّنُوْنَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَ الا شَدِيدًا

যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উঁচু ও নিচু ভূমি থেকে এবং তোমাদের চোখ বিস্ফারিত আর প্রাণ কণ্ঠাগত হয়েছিল; আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা করতে শুরু করেছিলে, সে সময় মুমিনরা পরীক্ষিত ও ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। [সুরা আহজাব: ১০-১১]

ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর মুসলিমদের অগাধ ভরসা ছিল, যার বিবরণ দিতে গিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে,
وَلَمَّا رَا الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هُذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَ رَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيْمَانًا وَتَسْلِيمًا

যখন মুমিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখল তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদের এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ইমান ও আত্মসমর্পণই বাড়ল। [সুরা আহজাব : ২২]

অন্যদিকে মুনাফিকরা মুসলিমবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ভীতি-শঙ্কায় নিপতিত হয়। একপর্যায়ে আমর ইবনু আওফ গোত্রের মুআত্তাব ইবনু কুশাইর বলে বসে, 'মুহাম্মাদ আমাদের একদিকে কিসরা ও কায়সারের ধনভান্ডার প্রাপ্তির সুসংবাদ শোনান; অথচ আমাদের অবস্থা এমন- নিরাপত্তাহীনতায় প্রাকৃতিক কাজ পর্যন্ত কেউ সারতে পারে না!' তাদের কেউ কেউ নিজের আত্মীয়-পরিজনের নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে ময়দান ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি চায়।

মুনাফিকদের এ ধরনের আচরণ তাদের আত্মিক দুর্বলতা ও কাপুরুষতার বহিঃপ্রকাশ ছিল। তারা চেয়েছিল মুসলিমরা যেন শত্রুদের কবলে পড়েন। কিছু কিছু বর্ণনায় মুসলিমদের নিয়ে তাদের বিদ্রুপ করা, মুসলিমদের ভীতসন্ত্রস্ত করা এবং মিত্রহীনভাবে ময়দানে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও পাওয়া যায়; যদিও সেসব সূত্র কিছুটা দুর্বল। অবস্থার দৃশ্যকল্পের বিবরণ কুরআনুল কারিম এভাবে তুলে ধরেছে,
۞ وَإِذْ قَالَتْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا ۞ وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا ۞ وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ ۚ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا ۞ قُلْ لَنْ يَنْفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَ إِذًا لَا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلًا ۞ قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي يَعْصِمُكُمْ مِنَ اللَّهِ إِنْ أَرَادَ بِكُمْ سُوءًا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ رَحْمَةً ۚ وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا ۞ قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا ۖ وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا ۞ أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ ۖ فَإِذَا جَاءَ الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ ۖ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ ۚ أُولَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا ۞ يَحْسَبُونَ الْأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا ۖ وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزَابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بَادُونَ فِي الْأَعْرَابِ يَسْأَلُونَ عَنْ أَنْبَائِكُمْ ۖ وَلَوْ كَانُوا فِيكُمْ مَا قَاتَلُوا إِلَّا قَلِيلًا﴾

এবং যখন তাদের একদল বলছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এটা টিকে থাকার মতো জায়গা নয়; তোমরা ফিরে চলো। তাদেরই একদল নবির কাছে অব্যাহতি চেয়ে বলছিল, আমাদের বাড়িঘর খালি; অথচ সেগুলো খালি ছিল না-পালানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গে মিলিত হতো; এরপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই দেরি করত না। অথচ তারা আগে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

বলুন, তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পালালে এই পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। তখন তোমাদের সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে।

বলুন, কে আল্লাহ থেকে তোমাদের রক্ষা করবে, যদি তিনি তোমাদের অকল্যাণের বা অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ছাড়া নিজেদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আল্লাহ ভালো করেই জানেন, তোমাদের কারা তোমাদের বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদের বলে, আমাদের কাছে এসো। তারা কমই যুদ্ধ করে; আর তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উলটিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। এরপর যখন বিপদ চলে যায়, তখন ধনসম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সঙ্গে বাক্‌চাতুর্যে নামে। তারা মুমিন নয়, তাই আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্য সহজ। তারা মনে করে শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। যদি শত্রুবাহিনী আবার এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে যে, যদি তারা গ্রামবাসী থেকে তোমাদের সংবাদ জেনে নিত, তবেই ভালো হতো। তারা তোমাদের মধ্যে অবস্থান করলেও যুদ্ধ সামান্যই করত। [সুরা আহজাব: ১৩-২০]

উপর্যুক্ত আয়াতসমূহে মুনাফিকি ও এর প্রভাবে অন্তরের দুর্বলতা ও কাপুরুষতার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসাহীনতা তৈরি হয়। পরীক্ষার সময় আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের বিপরীতে বাক্‌চাতুর্যে লিপ্ত হওয়ার নিন্দা করা হয়েছে। তারা রাসুলের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করতে থাকে, যেন যুদ্ধের ময়দান থেকে তাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তুচ্ছ অজুহাত তৈরি করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর সংকল্প করতে থাকে। নিজেদের গৃহ-পরিজনদের নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে চায়; অথচ তাদের এই প্রবণতা শুধু ইমানের দুর্বলতার কারণেই তৈরি হয়। শুধু তা-ই নয়, অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গেও এ ধরনের আচরণ কামনা করে এবং ঘরে ফিরে যেতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। আর এই প্রবণতা বাস্তবায়নে তারা ইমান ও ইসলামের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতির প্রতি ভ্রুক্ষেপও করেননি।

৩. খালিদ ও খায়বারের যুদ্ধপরিস্থিতি
এদিকে পরিখা পাড়ি দিয়ে মদিনায় ঢুকতে কাফিরদের প্রচেষ্টা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। তাদের অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্যরা বৃহৎ-সংখ্যায় রাতব্যাপী পরিখার আশেপাশে আনাগোনা করতে থাকে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে একটা অশ্বারোহী বাহিনী পরিখার অপেক্ষাকৃত সরু অংশ দিয়ে মুসলিমদের ওপর অতর্কিতে হামলার চেষ্টা করলে উসাইদ ইবনু হুদাইর ২০০ সেনার এক বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর কঠোর নজরদারি করতে থাকেন। শত্রুদের সঙ্গে তখন বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে হামজা রা.-এর হত্যাকারী ওয়াহশির বর্শার আঘাতে তুফায়েল ইবনু নুমান শহিদ হন।

কাফিরবাহিনীর সদস্য হাব্বান ইবনু আরাকার নিক্ষিপ্ত তিরে সাআদ ইবনু মুআজ বাহুতে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাঁর হাতের রগ ছিঁড়ে যায়। তির নিক্ষেপ করতে গিয়ে হাব্বান চিৎকার করে বলছিল, 'ইবনু আরাকার পক্ষ থেকে এটা গ্রহণ করো।' প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সাআদ দুআ করছিলেন, 'আল্লাহ, যদি কুরাইশদের পক্ষ থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরও যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আপনি আমাকে জীবিত রাখুন। কেননা, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আগ্রহী, যারা আপনার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, নিজের বাসস্থান থেকে বহিষ্কার করেছে। হে আল্লাহ, যদি আমাদের ও তাদের মধ্যকার যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। বনু কুরায়জার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নিজের চক্ষু শীতল করা পর্যন্ত আপনি আমার জীবন দীর্ঘ করুন।'

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় এই বান্দার দুআ কবুল করেছিলেন। অনতিবিলম্বে বনু কুরায়জার বিরুদ্ধে তাঁকেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হয়েছিল। তারপর কাফিরবাহিনী রাসুলের বাসস্থান অভিমুখে তাদের বিশেষ একটা দল পাঠায়। শত্রুর বিরুদ্ধে দিনব্যাপী মুসলিমরা প্রতিরক্ষাযুদ্ধ চালিয়ে যান। কাফিরদের পাঠানো বিশেষ দল রাসুলের বাসস্থানের নিকটবর্তী চলে এলে রাসুল ও তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিরা আসরের সালাত আদায় করতে পারেননি। রাত ঘনিয়ে এলে শত্রুবাহিনী নিজেদের অবস্থানে ফিরে যায়। তখন রাসুল বলেন, 'আল্লাহ তাদের এবং তাদের ঘর ও কবরসমূহ আগুনে ভরে দিন। কেননা, তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী সালাত তথা আসরের সালাত থেকে বিরত রেখেছে।' একপর্যায়ে সূর্য ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে আসর সালাতের ওয়াক্ত অতিবাহিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
১৯. মুখতাসার জাদুল মাআদ, ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহ.।
২০. মাগাজি, আল ওয়াকিদি: ১১২; সহিহ বুখারি: ২/৬০৩-৬০৪।
২১. সুনানু আবি দাউদে রয়েছে, রাসুল ﷺ এ শর্তে রাজি হয়েছিলেন যে, ইয়াহুদিরা তাদের বাহনে করে যতটা সম্ভব অর্থ-সম্পদ নিয়ে যেতে পারবে: ২/৭৬।
২২. আর-রাহিকুল মাখতুম, মাওলানা সাফিউর রাহমান মুবারকপুরি।
২৩. মু'জামুল কাবির লিত-তাবরানি: ১১/৩৭৬১।
২৪. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া আস-সাহিহা: ২/৪২৪১।
২৫. প্রাগুক্ত: ২/৪২৫।
২৬. হাদিসুল কুরআনিল কারিম আন গাজাওয়াতির রাসুল: ২/৪২৪।
২৭. সহিহ মুসলিম: ১৭৬৯।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 হুদায়বিয়ায় রাসূলের অবস্থান এবং খালিদের বাহিনী

📄 হুদায়বিয়ায় রাসূলের অবস্থান এবং খালিদের বাহিনী


১. হুদায়বিয়ায় খালিদের অবস্থান এবং নবিজির পথ পরিবর্তন
রাসুল সংবাদ পেয়েছিলেন কুরাইশরা তাঁকে বাধা দিতে বেরিয়ে পড়েছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে তাদের একটা দল মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করতে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সংবাদ পেয়ে রাসুল সংঘর্ষ এড়াতে পথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘোষণা করেন, 'কে আছ, যে কুরাইশদের ওত পেতে থাকা রাস্তার পরিবর্তে অন্য রাস্তার সন্ধান দেবে?' আসলাম গোত্রের একজন বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমি এ সেবাদানে প্রস্তুত।' এরপর তিনি পাহাড়ি পথ বেয়ে মুসলিমদের এগিয়ে নিয়ে যান। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রশস্ত উপত্যকার আরামদায়ক রাস্তায় পৌঁছলে রাসুল মুসলিমদের বলেন, 'বলো, আমরা আল্লাহর ক্ষমাপ্রত্যাশী এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি।' এরপর বলেন, 'এটি বনি ইসরাইলকে দেওয়া সেই তাওবার শব্দ 'হিত্তাহ' ।, যা তারা উচ্চারণ করেনি।

তারপর রাসুল সাহাবিদের নির্দেশ দেন, 'হামাশ অঞ্চলের ডান দিক হয়ে ওই রাস্তা ধরে এগিয়ে যাও, যা সানিয়াতুল মিরারের দিকে এগিয়ে গেছে।' মক্কার নিম্নাঞ্চল হুদায়বিয়ার দিকে এ বাহিনী অত্যন্ত নীরবে এগিয়ে চলে। এদিকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন বাহিনী মুসলিমদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দ্রুত মক্কাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মক্কাবাসী হুদায়বিয়া প্রান্তরে মুসলিমদের পৌঁছার খবর শুনে চিন্তিত হয়ে ওঠে। মক্কার এতটা কাছে মুসলিমবাহিনীর পৌঁছে যাওয়ায় তারা এটাকে মক্কার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করতে থাকে।

জেনারেল মাহমুদ শিত এ ব্যাপারে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, মুসলিমবাহিনীর যাত্রাপথ পরিবর্তন মূলত কাফিরদের ভয়ে ভীত হওয়ার কারণে ছিল না। কেননা, শত্রুর ভয়ে ভীত কোনো বাহিনী শত্রুর নিকটবর্তী স্থানে ছাউনি ফেলে না। ভীতসন্ত্রস্ত হলে শত্রুদের থেকে দূরত্ব অবলম্বন করাই সাধারণ নিয়ম, যাতে আক্রমণ করতে হলে শত্রুবাহিনীর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং তত দিনে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

ইকতিবাসুন নিজামিল আসকারি ফি আহদিন নাবি গ্রন্থে নবিজির রাস্তা পরিবর্তনের কারণ আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, নতুন রাস্তায় যাত্রা করতে পথপ্রদর্শক নিযুক্ত করা এবং নিরাপদ যাত্রা অব্যাহত রাখার বিষয়টা থেকে অনুধাবন করা যায়, বিচক্ষণ-বুদ্ধিমান সেনাপতি নিজের বাহিনীর জন্য এ ধরনের রাস্তা অবলম্বন করে থাকেন, যা সাধারণত যেকোনো বিপদের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকে। অভিজ্ঞ সেনাপতিমাত্র এমন রাস্তা এড়িয়ে চলতে চান, যেখানে শত্রুর হামলার আশঙ্কা থাকে।

২. খালিদের খালা মায়মুনার সঙ্গে নবিজির বিয়ে
মায়মুনা রা. ছিলেন আব্বাস রা.-এর স্ত্রী উম্মুল ফাজলের বোন। ২৬ বছর বয়সে তাঁর স্বামী আবু রুহম ইবনু আবদিল উজ্জা মারা গেলে তিনি আব্বাস রা.-এর স্ত্রীর ওপর নিজের বিয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। উম্মুল ফাজল এ দায়িত্ব আব্বাসের হাতে অর্পণ করলে তিনি তাঁর ভাতিজা মুহাম্মাদের সঙ্গে ৪০০ দিরহাম মোহরের বিনিময়ে তাঁর বিয়ে দেন।

মায়মুনা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের খালা। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুযায়ী মক্কায় অবস্থানের তিন দিন পেরিয়ে গেলে নবিজি চেয়েছিলেন মায়মুনার সঙ্গে বিয়ের অসিলায় তাঁদের ও কুরাইশদের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য কিছু সময় বাড়াবেন; কিন্তু কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনু আমর ও হুয়াইতিব ইবনু আবদিল উজ্জা প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে জানিয়ে দেয়, তাঁর মক্কায় অবস্থানের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে এসেছে। অতএব, তিনি যেন মক্কা ছেড়ে চলে যান। নবিজি তাদের বলেছিলেন, 'তোমরা আমাকে তোমাদের মধ্যে বিয়ের উৎসব পালনের সুযোগ দাও, আমি তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করি আর তাতে তোমরাও শরিক হও!' তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, 'আপনার খাবারের কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের। আপনি দ্রুত মক্কা ছেড়ে চলে যান।'

নবিজি তখন মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং তাঁর আজাদকৃত দাস আবু রাফিকে মায়মুনার খিদমতে রেখে যান। রাসুল যখন সারিফ নামক জায়গায় অবস্থান করেন, তখন মায়মুনাকে নিয়ে আবু রাফি সেখানে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে মায়মুনার দাম্পত্যজীবন শুরু হয়।

টিকাঃ
২৮. সহিহ বুখারি: ৪১১১।
২৯. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৩/৩৩৮।
৩০. গাজওয়াতুল হুদায়বিয়া, আবু ফারিস: ২৯।
৩১. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবু ফারিস: ৩৭৪।
৩২. আর-রাসুলুল কায়িদ: ১৮৬-১৮৭।
৩৩. আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, আবু ফারিস: ৩৭৪; ইকতিবাসুন নিজামিল আসকারিয়া ফি আহদিন নাবি: ২৫৮ থেকে।
৩৪. সুয়ার ওয়া ইবার মিনাল জিহাদিন নাবাবি ফিল মাদিনা: ৩৬২।
৩৫. সিরাতু ইবনি হিশাম: ৪/১৯।

📘 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা: > 📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ

📄 খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ


১. উমরাতুল কাজার প্রভাব
উমরাতুল কাজার প্রভাব পুরো আরববিশ্বকে ইসলামের প্রতি অনুভূতিপ্রবণ করে তুলেছিল। মক্কার মুশরিকরাও যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিল তাতে।

ড. মাহমুদ শিত খাত্তাব বলেন, উমরাতুল কাজা কুরাইশদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কুরাইশের নেতারা দারুন নাদওয়ায় এবং অন্যরা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রাসুল ও সাহাবিদের মক্কা প্রবেশের দৃশ্য অবলোকন করছিল। রাসুল মসজিদে প্রবেশ করে নিজের চাদরের নিচ থেকে ডান কাঁধ বের করে সাহাবিদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, 'আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর দয়া করুন, যে মক্কার কুরাইশদের সামনে বীরত্ব প্রদর্শন করে।' রাসুল হাজরে আসওয়াদে চুমু খান এবং সাহাবিদের সঙ্গে তাওয়াফের ক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন।

২. নববি আখলাকের প্রভাব এবং খালিদের অন্তরে ইসলামের সূর্যোদয়
উমরাতুল কাজার সময় রাসুলের আচার-আচরণের প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে, তিনি মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মক্কার নেতাদের সামনে একেবারে প্রকাশ্যে বলে বসেন, 'প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তির সামনে এ কথা স্পষ্ট যে, মুহাম্মাদ কোনো জাদুকর বা কবি নন। তাঁর কাছে পাঠানো বাণী নিঃসন্দেহে জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তাই বিবেকবানদের তাঁর অনুসরণ করা উচিত!'
আবু সুফিয়ান নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কি এমন বক্তব্য দিয়েছেন?' খালিদ ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি তাঁকে আক্রমণ করতে উদ্ধত হন। তখন ইকরিমা ইবনু আবি জাহল তাকে নিবৃত্ত করে বলেন, 'আবু সুফিয়ান, অপেক্ষা করো। আল্লাহর কসম, খালিদ যে চিন্তা করেন, মুখে তা-ই উচ্চারণ করেন। স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে তুমি তাঁর সঙ্গে লড়াই করবে? অথচ সমগ্র আরবের জনগণ তাঁর হাতে বায়আত হয়ে আছে! আল্লাহর শপথ, আমার মনে হয় এক বছরের মধ্যে সমগ্র আরবের জনগণ মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে যাবে।'

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পর আমর ইবনুল আসও ইসলামগ্রহণ করেন। এদিকে বায়তুল্লাহর তত্ত্বাবধানকারী উসমান ইবনু তালহাও তখন মুসলমান হন। মক্কার প্রতিটা ঘরে প্রকাশ্যে বা গোপনে ইসলামের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, উমরাতুল কাজার মাধ্যমে মক্কাবিজয়ের আগেই মুসলিমরা মক্কাবাসীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন।

উসতাজ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ বলেন, উমরাতুল কাজার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, ইসলামের আকর্ষণীয় আচরণে প্রভাবিত হয়ে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসের ইসলামগ্রহণ। বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতায় এ দুই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে মক্কাবাসীকে তাঁদের অনুসরণে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

৩. আমর ইবনুল আসের সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য ও ইসলামগ্রহণ
ক. আমর ইবনুল আসের সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম : আমর ইবনুল আস ইবনু ওয়াইল সাহমি। উপাধি: আবু মুহাম্মাদ ও আবু আবদিল্লাহ। ইবনু ইসহাক ও জুবায়ের ইবনু বাক্কার এ ব্যাপারে একমত যে, আবিসিনিয়ায় বাদশাহ নাজাশির দরবারেই তিনি ইসলামগ্রহণ করেন। অষ্টম হিজরির সফর মাসে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। ইবনু হাজার বলেন, তিনি মক্কা বিজয়ের আগে অষ্টম হিজরিতে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন। হুদায়বিয়া ও খায়বারযুদ্ধের মধ্যবর্তী কোনো একসময় তিনি ইসলামগ্রহণ করেছেন বলেও কথিত আছে।

খ. আমর ইবনুল আসের জবানিতে তাঁর ইসলামগ্রহণ
আমর ইবনুল আস রা. নিজেই তাঁর ইসলামগ্রহণের ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, খন্দকযুদ্ধ থেকে মক্কায় ফিরে আমি আমার কাছের আত্মীয়-বন্ধুদের ডেকে বলি, 'তোমরা জেনে রেখো, মুহাম্মাদের কথা সকল কথার ওপর বিজয়ী হবে, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমার একটা অভিমত রয়েছে, বিষয়টা তোমরা ভেবে দেখতে পারো। চলো, আমরা নাজাশি বাদশাহর কাছে চলে যাই। মুহাম্মাদ যদি আমাদের ওপর বিজয়ী হন, আমরা নাজাশির কাছেই থেকে যাব; আর আমাদের সম্প্রদায় যদি বিজয়ী হয়, তাহলে তো আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি প্রমাণিত হব। সে ক্ষেত্রে নাজাশি আমাদের সঙ্গে উত্তম আচরণই করবেন। আমার এই প্রস্তাব সবাই মেনে নেয়। নাজাশির জন্য কী উপহার নেওয়া যায়, আলোচনা করি। উপহার দেওয়ার মতো সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ছিল আমাদের এখানকার চামড়া। আমরা বেশকিছু চামড়া নিয়ে আবিসিনিয়ায় যাই।

আমরা নাজাশির দরবারে যাচ্ছি, এমন সময় আমর ইবনু উমাইয়া আদ দামরিও সেখানে পৌঁছন। রাসুল ﷺ বিশেষ কোনো প্রয়োজনে তাঁকে মদিনা থেকে জাফর ইবনু আবি তালিবের কাছে পাঠিয়েছেন। জাফর তখনো আবিসিনিয়ায় ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আমর নাজাশির দরবার থেকে বেরিয়ে যান। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করতে নাজাশিকে আমরা অনুরোধ করব। অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি যদি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেন, তাহলে আমরা তাকে হত্যা করব। এতে কুরাইশরা বুঝবে, আমরা মুহাম্মাদের দূতকে হত্যা করে বদলা নিয়েছি।

এ সিদ্ধান্তের পর আমি নাজাশির কাছে গিয়ে তাঁর সামনে যথারীতি কুর্নিশ করলাম, যেমনটা আমি আগে থেকে করে আসছি। তিনি আমাকে 'হে আমার বন্ধু, তোমায় স্বাগত' বলে বরণ করে নিয়ে বলেন, 'তোমার দেশ থেকে আমার জন্য কোনো উপহার আনোনি?' আমি বলি, 'হ্যাঁ, এনেছি বাদশাহ মহোদয়। আপনার জন্য বিপুল পরিমাণে চামড়া হাদিয়া এনেছি।' এরপর আমাদের উপহারসামগ্রী তাঁর সামনে পেশ করি। উপহারগুলো তাঁর খুবই পছন্দ হয়। তারপর বলি, 'এইমাত্র যে লোকটা আপনার দরবার থেকে বেরিয়ে গেল, সে আমাদের ঘোরতর শত্রুর দূত। আপনি তাকে আমাদের হাতে তুলে দিলে আমরা তাকে হত্যা করব! কারণ, মুহাম্মাদ আমাদের বেশ কজন গোত্রপ্রধান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে।'

আমার এ কথায় নাজাশি ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি অমনি হাত বাড়িয়ে নিজের নাকে এমন জোরে ঘুষি মারেন; ভাবলাম নাক হয়তো থেঁতলে গেছে। বাদশাহর এহেন আচরণ দেখে মনে হলো জমিনে আমার জন্য ফাটল ধরুক; আর আমি তাতে ঢুকে যাই। অবস্থা বেগতিক দেখে বিনীতভাবে বলি, 'আমার এ আবেদন আপনাকে এতটা उत्तेজিত করবে, বুঝতে পারলে তা করতাম না।'

নাজাশি বললেন, 'তুমি কি চাও, যাঁর কাছে নামুসে আকবর (জিবরিল আ.) আসেন— যিনি মুসা আ.-এর কাছেও এসেছেন—তাঁর দূতকে আমি হত্যার জন্য তোমাদের হাতে তুলে দেবো?' আমি বলি, 'সত্যিই কি তিনি এমন ব্যক্তি?' তিনি বললেন, 'আমর, তোমাদের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। আমার কথা শোনো। তোমরা তাঁর আনুগত্য করো। আল্লাহর শপথ, তিনিই সত্যপন্থি। তিনি তাঁর বিরোধীদের ওপর বিজয়ী হবেন; যেমন হয়েছিলেন মুসা আ. ফিরআউন ও তার লোকদের ওপর।' আমি বলি, 'আপনি তাহলে তাঁর পক্ষে আমার বায়আত বা আনুগত্যের শপথ নিন!' তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর হাতে ইসলামের বায়আত হয়ে আমার সাথিদের কাছে ফিরে যাই; কিন্তু তখন আমার চিন্তাধারায় যে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে, তার কিছুই তাদের কাছে প্রকাশ করিনি।

এবার রাসুলের হাতে বায়আত হতে আবিসিনিয়া থেকে রওনা হই। পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হয় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সঙ্গে। তিনিও মক্কা থেকে মদিনায় যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করি, 'আবু সুলায়মান, কোথায় যাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, মারাত্মক পরীক্ষার সম্মুখীন। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, তিনি নবি। এখন দ্রুত ইসলাম কবুল করা উচিত। এই দ্বিধাসংশয়ে আর কত ডুবে থাকব?' বললাম, 'আমিও তো এই উদ্দেশ্যেই চলছি!' এরপর দুজন একসঙ্গে রাসুলের খিদমতে গেলাম। আমাদের দেখেই নবিজির চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, 'মক্কা তাঁর কলিজার মূল্যবান অংশসমূহ তোমাদের প্রতি ছুড়ে মারছে!'

প্রথমে খালিদ নবিজির হাতে বায়আত হন। তারপর আমি একটু কাছে এসে নিবেদন করি, 'আল্লাহর রাসুল, আমিও বায়আত হব। তবে আমার আগের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হবে।' তিনি বললেন, 'আমর, বায়আত হও। ইসলাম আগের সকল পাপ মুছে দেয়, হিজরতও আগের যাবতীয় অপরাধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়।' আমি তখন প্রিয়নবির হাতে বায়আত হয়ে ফিরে যাই।

আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমর ইবনুল আস বলেন, এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে দেন, তখন আমি রাসুলের দরবারে গিয়ে নিবেদন করি, 'আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বায়আত হতে চাই।' তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে আমি আমার হাত টেনে নিই। রাসুল বললেন, 'আমর, কী ব্যাপার?' বলি, 'আগে আমি শর্ত করে নিতে চাই।' জিজ্ঞেস করেন, 'কী শর্ত করবে?' উত্তরে বলি, 'আল্লাহ যেন আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন।' তিনি বললেন, 'আমর, তুমি কি জানো না, ইসলাম পূর্ববর্তী যাবতীয় অন্যায় মিটিয়ে দেয়; আর হিজরত তার আগের অপরাধ মুছে ফেলে; অনুরূপ হজও আগের সব পাপ নিশ্চিহ্ন করে দেয়!'

৪. খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ
ক. খালিদের ইসলামগ্রহণের জন্য রাসুলের দুআ
রাসুল খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণের জন্য দুআ করতেন। তিনি বলতেন, 'আল্লাহ, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সালামা ইবনু হিশাম এবং দুর্বল মুসলিমদের কাফিরদের হাত থেকে মুক্তি দাও।' এ দুআর বরকতে আল্লাহর রহমতে সপ্তম হিজরিতে খালিদ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসেন।

খ. খালিদের জবানিতে তাঁর ইসলামগ্রহণ
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তাঁর ইসলামগ্রহণের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, যখন আল্লাহ আমার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, আমার অন্তরে ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার মনোভাব সৃষ্টি করে দেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগত, আমি মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে প্রতিটা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। প্রতিটা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় ভাবতাম, হয়তো আমি অনুপযুক্ত স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সবার ওপর বিজয়ী হয়ে আসবেন।
রাসুল যখন হুদায়বিয়ার দিকে যাত্রা করেছিলেন, তখন আমি মুশরিকদের অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। উসফান প্রান্তরে আমরা মুসলিমদের মুখোমুখি হই। মুহাম্মাদ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে জুহরের সালাত আদায় করেন। আমরা একবার ভেবেছিলাম, তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা করব; কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হামলা না করা আমাদের জন্য কল্যাণকর ছিল। তিনি যেন আমাদের মনস্থিত ব্যাপারগুলো বুঝতে পারছিলেন, ফলে আসরের সালাতের ক্ষেত্রে 'সালাতুল খাওফ' আদায় করেন। সালাতের অবস্থার পরিবর্তন দেখে আমি প্রভাবিত হয়ে পড়ি। আমার মনে কল্পনার উদয় হয়, এ লোক নিঃসন্দেহে কারও রক্ষণাবেক্ষণে পরিচালিত হচ্ছে! এরপর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং তিনি আমাদের রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরে এগিয়ে যান। যখন কুরাইশরা তাঁর সঙ্গে সন্ধি করে এবং তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেয়, তখন ভাবছিলাম, এখন আর কী-ই-বা করার আছে? কোথায় যাওয়া যায়?

একবার ভাবছিলাম আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশির কাছে চলে যাব। আবার ভাবছিলাম, যেহেতু তিনি নিজেই মুহাম্মাদের আনুগত্য গ্রহণ করেছেন এবং মুহাম্মাদের সঙ্গীরা তাঁর কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, সেখানে গিয়ে কী হবে? আবার ভাবছিলাম, কোনোভাবে হিরাক্লিয়াসের কাছে চলে গিয়ে ধর্ম ত্যাগ করে ইয়াহুদি বা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে অনারবদের সঙ্গে তাদের অনুগামী হয়ে বসবাস শুরু করব। কখনো ভাবছিলাম, সবার সঙ্গে নিজ এলাকাতেই স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে থাকি। ইতিমধ্যে রাসুল উমরাতুল কাজা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। আমি মক্কা থেকে বেরিয়ে গেলাম। তিনি যতদিন এখানে ছিলেন, ততদিন মক্কায় আসিনি। আমার ভাই ওয়ালিদ ইবনুল ওয়ালিদও রাসুলের সঙ্গে উমরা করেছিল। সে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমার সাক্ষাৎ পায়নি। তারপর আমার কাছে এই মর্মে চিঠি লিখে যায়,

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ইসলামের ব্যাপারে তোমার নেতিবাচক আচরণে আমি বিস্মিত। তুমি যথেষ্ট বিচক্ষণ। বিচক্ষণ কোনো মানুষ কি এখনো ইসলাম সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে? রাসুল আমাকে তোমার ব্যাপারে বার বার জিজ্ঞেস করেছেন এবং বলেছেন, 'খালিদ কোথায়?' আমি বলেছি, 'আল্লাহ তাকে নিয়ে আসবেন।' আমার উত্তর শুনে তিনি বলেছেন, 'খালিদের মতো ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে না। যদি সে মুসলিমদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে নিজের শক্তিপ্রদর্শন করত, তাহলে তা তার জন্য কল্যাণকর হতো। যদি সে আমাদের সঙ্গে মিলিত হতো, তাহলে অবশ্যই তাকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দিতাম।'

আমার ভাই, যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে, এবার ফিরে এসো। অনেক সৌভাগ্য তোমার হাতছাড়া হয়ে গেছে, এবার তো ফিরে এসো।

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. বলেন, আমার কাছে যখন ভাই ওয়ালিদের চিঠি এসে পৌঁছায়, তখন ইসলামের প্রতি আমি আরও আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। রাসুলের কথা শুনে দারুণ আনন্দ অনুভব করি এবং পুলকিত হই। ইতিমধ্যে একদিন স্বপ্নে দেখি, আমি একটা অন্ধকার সংকীর্ণ জায়গায় বসে আছি। খানিক পর আলোকিত প্রশস্ত একটা জায়গায় গিয়ে উপনীত হই। আমি মনে মনে বলছিলাম, এটা একটা অস্বাভাবিক স্বপ্ন। মদিনায় গেলে আবু বকরকে স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'তুমি যে অন্ধকার সংকীর্ণ জায়গা দেখেছিলে, তা ছিল কুফর-শিরকের অন্ধকার। আর যে প্রশস্ত আলোকিত জায়গা দেখেছিলে, তা ছিল ইসলামের আলোকোজ্জ্বল আঙিনা।'

এরপর যখন আল্লাহর রাসুলের দরবারে যাওয়ার চিন্তা করি, তখন মনে মনে ভাবছিলাম, কাকে সঙ্গে নেব। অনেক ভেবেচিন্তে সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে বলি, 'আবু ওয়াহাব, তুমি কি দেখছ-দিন দিন আমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয় হচ্ছে? ধীরে ধীরে আমরা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছি। এদিকে আরব-অনারব সর্বত্র মুহাম্মাদের বিজয়কেতন উড়ছে। যদি আমরা তাঁর কাছে গিয়ে আনুগত্য গ্রহণ করি; আর ইতিমধ্যে তিনি আরবদের মধ্যে সম্মানিত অবস্থানে পৌঁছে গেছেন, তাহলে কতই-না ভালো হতো!'

আমার কথা শুনে সাফওয়ান তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলে, 'যদি সমগ্র কুরাইশ ইসলামগ্রহণ করে, তবু আমি করব না।' এমন উত্তর শুনে আমি তার থেকে আলাদা হয়ে যাই। মনে মনে ভাবছিলাম, যেহেতু ইতিপূর্বে বদরযুদ্ধে তার বাপ-ভাই নিহত হয়েছে, এ জন্য হয়তো সে প্রতিশোধের নেশায় দিন গুনছে। এরপর ইকরিমা ইবনু আবি জাহলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাকেও অনুরূপ বলি। সে-ও সাফওয়ানের মতো কথা শোনায়। আমি তাকে বলি, 'ঠিক আছে, এ কথা কাউকে বলো না।' আমি মনে করছিলাম, যেহেতু বদরযুদ্ধে তার আত্মীয়স্বজন নিহত হয়েছে, তাই সে অন্য কিছু ভাবছে। তবে আমি তার সামনে সেসব কথা আলোচনা করা সমীচীন মনে করিনি।

এবার ভাবলাম একাই মুহাম্মাদের দরবারে চলে যাই। আমার ভয় কীসের? এরপর একাকী মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ি। পথিমধ্যে উসমান ইবনু তালহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তার সঙ্গে খোলামেলা সব আলোচনা করি। তাকে বলি, 'মুহাম্মাদের সঙ্গে আমাদের বর্তমান অবস্থার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই শেয়ালের মতো, যে গুহায় বসে আছে; কিন্তু সে যখন চাইবে পানি ঢেলে তাকে বের করতে পারে এবং শেয়ালটা তখন বেরোতে বাধ্য হবে।' তাকেও আমি মদিনায় গিয়ে রাসুলের আনুগত্য করার কথা বলি এবং সে তাৎক্ষণিক আমার কথায় ইতিবাচক সায় দেয়। আমাকে বলে, 'আজ সকালেই আমি এ ব্যাপারে ভাবছিলাম। দেখো, আমার বাহন এখনো একদম প্রস্তুত আছে।'

এরপর এই বলে যাত্রা শুরু করি যে, আমরা ইয়াজিজ প্রান্তরে একত্রিত হব। যদি সে আমার আগে পৌঁছে যায়, তাহলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে; আর আমি আগে গেলে তার জন্য অপেক্ষা করব। রাতের আঁধারে আমরা যাত্রা করি। ফজরের আগেই ইয়াজিজ প্রান্তরে একত্রিত হই। সকাল হলে একত্রে যাত্রা অব্যাহত রাখি। হাদ্দাহ নামক স্থানে আমর ইবনুল আসের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সে আমাদের স্বাগত জানায়। আমরাও সানন্দে তার সঙ্গে মিলিত হই। আমাদের গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমরা তাকে উলটো তার গন্তব্য জিজ্ঞেস করি। উত্তর না দিয়ে সে আবার আমাদের যাত্রার কারণ জানতে চায়। আমরা জানাই, 'ইসলামগ্রহণ ও মুহাম্মাদের অনুসারী হতে যাচ্ছি।' সে-ও আমাদের মতোই মনোভাব প্রকাশ করে।

এরপর একসঙ্গে আমরা মদিনায় পৌঁছাই। হাররাহ নামক স্থানে বাহনগুলো বেঁধে আমরা রাসুলের দরবারে যাই। নবিজিকে আমাদের আগমনের সংবাদ দেওয়া হলে তিনি দারুণ আনন্দিত হন। আমি তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে উত্তম পোশাক পরে রওনা হই। রাস্তায় সহোদর ওয়ালিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে আমাকে বলে, 'দ্রুত চলো, নবিজিকে তোমার আগমন-সংবাদ জানানো হয়েছে। তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং তোমাদের অপেক্ষা করছেন।' আমি তখন দ্রুত রাসুলের দরবারে উপস্থিত হই। আমাকে দেখে তিনি মুচকি হাসেন। আমি তাঁকে অভিবাদন জানাই। হাসিমুখে তিনি উত্তর দিলে আমি বলি, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।'

উত্তরে তিনি বলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তোমাকে হিদায়াত দান করেছেন। তোমার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা থেকে আমার প্রত্যাশা ছিল, আল্লাহ তোমাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করবেন।' আমি তখন বলি, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি তো জানেন, আমি প্রতিটা রণাঙ্গনে আপনার বিরুদ্ধে ছিলাম। আমার সেসব পাপের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।' নবিজি বলেন, 'নিঃসন্দেহে ইসলাম আগের যাবতীয় পাপ মিটিয়ে দেয়।' আমি বলি, 'তবু আপনি আলাদা করে প্রার্থনা করুন।' তিনি তখন প্রার্থনা করে বলেন, 'হে আল্লাহ, খালিদ আপনার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরিতে আজ পর্যন্ত যত পাপ করেছে, তাঁর সব ক্ষমা করে দিন!'

তারপর আমর ইবনুল আস এবং উসমান ইবনু তালহাও নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে বায়আত হন। খালিদ রা.-এর বর্ণনামতে, তিনি অষ্টম হিজরির সফর মাসে ইসলামগ্রহণ করেন। খালিদ বলেন, আমার ইসলামগ্রহণের পর রাসুল সংকটপূর্ণ যেকোনো মুহূর্তে সাহাবিদের মধ্যে আমার ওপরই বেশি ভরসা করতেন।

গ. খালিদের ইসলামগ্রহণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা
১. কাফির থাকতেই খালিদ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, শেষপর্যন্ত রাসুল-ই বিজয়ী হবেন। তিনি বলেন, 'আমি রাসুলের বিরুদ্ধে প্রতিটা যুদ্ধে উপস্থিত থাকলেও দেখতে পাচ্ছিলাম, প্রতিটা ক্ষেত্রেই তিনি বিজয়ী হচ্ছেন আর আমরা পরাজিত হচ্ছি। মনে হচ্ছিল অচিরেই তিনি পুরো আরবে বিজয়ী ও নেতৃত্ব প্রদানকারী হিসেবে আবির্ভূত হবেন। তাঁর এ স্বীকারোক্তি ইসলামের শত্রুদের জন্য নিঃসন্দেহে চিন্তনীয় বিষয় হতে পারে।

২. কারও যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রদান তার ওপর একধরনের প্রভাব বিস্তার করে। খালিদকে লক্ষ্য করে রাসুলের বক্তব্য— ‘খালিদের মতো বিচক্ষণ ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে অনবগত থাকতে পারে না। কতই-না ভালো হতো, যদি সে তার সামর্থ্য ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণে ব্যবহার করত, আমরাও তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখতাম।’ রাসুলের এমনতর প্রশংসাপূর্ণ কথা তাঁর অন্তরে গভীর রেখাপাত করে ইসলামগ্রহণে উদ্দীপ্ত করে তোলে। নবিজি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারে ছিলেন অত্যন্ত কুশলী। তিনি খালিদের সামনে তাঁর সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলি, বুদ্ধিমত্তা ও সামর্থ্যের প্রশংসা করলে যে নেতৃত্বপ্রীতি এতদিন তাঁর ইসলামগ্রহণে অন্তরায় হয়ে ছিল, তা উধাও হয়ে যায়। যখন তিনি নিশ্চিতভাবে অনুভব করেন, ইসলামগ্রহণের ফলে তাঁকে পিছিয়ে থাকতে হবে না; বরং তাঁর যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে, তখন শয়তানের কুমন্ত্রণা পরাজিত হয় এবং তিনি উদ্বুদ্ধ হন। আমর ইবনুল আস ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ইসলামগ্রহণ ইসলামের শক্তিবৃদ্ধি আর কাফিরদের লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শৌর্যবীর্যের অধিকারী এই দুই মহানায়কের হাতে অর্জিত ইসলামি বিজয়গাথা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমদের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

টিকাঃ
৩৬. ফিকহুস সিরাহ, ড. রামাজান বুতি: ৩৫৮।
৩৭. আর-রাসুল আল-কাইদ: ২০৯-২১০।
৩৮. আবকারিয়াতু মুহাম্মাদ: ৬৯।
৩৯. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৯/৩৫।
৪০. আল-ইসাবাহ: ২/৩।
৪১. তাহজিবুত তাহজিব: ৮/৫৬।
৪২. সহিহ আস-সিরাতুন নাবাবিয়া: ৪৯৪; সিরাতু ইবনি হিশাম: ২/২৭৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৩/৬০।
৪৩. সহিহ মুসলিম: ১২১।
৪৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ১৬৩।
৪৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/২৩৯-২৪০; আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/৯৫।
৪৬. সুলহু হুদায়বিয়া, আবু ফারিস: ২৬৩।
৪৭. আত-তারিখুল ইসলামি, হুমায়দি: ৭/৯৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00