📄 কুরআন এবং ইঞ্জিল
পবিত্র কুরআনের মৌলিক শিক্ষা এই যে, আল্লাহ তাআলা যেমন এক-অদ্বিতীয়, তেমনি তাঁর সত্যতাও এক-অদ্বিতীয়। তিনি কখনো কোনো বিশেষ জাতি, বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ গোত্রের উত্তরাধিকারমূলক স্বত্বরূপে থাকেন নি। প্রতিটি জাতিতে ও প্রতিটি দেশে আল্লাহর সত্য ও হেদায়েতের পয়গام একই অনুভূতি ও ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তাঁর সত্য নবীগণের বা তাঁদের প্রতিনিধিদের সাহায্যে জগতের জন্য সবসময় সরলপথের আহ্বানকারী ও ঘোষণাকারী থেকেছে। সেই পয়গামের নামই 'সিরাতে মুস্তাকিম' ও 'ইসলাম'। কুরআন মাজিদ এই ভুলে-যাওয়া শিক্ষাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এসেছে এবং কুরআন সর্বশেষ পয়গام, যা বিগত যাবতীয় ধর্মের সত্যতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে মানবজগতের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সুতরাং, কুরআনকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহর যাবতীয় সত্যকে অস্বীকার করা। এই মৌলিক শিক্ষার প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআন হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর মাহাত্ম্যকে অনুমোদন করেছে এবং স্বীকার করেছে যে, নিঃসন্দেহে ইলহামি কিতাব ও আল্লাহ-প্রদত্ত কিতাব। কিন্তু তার সঙ্গে জায়গায় জায়গায় এটাও বলে দিয়েছে যে, আহলে কিতাবের (ইহুদি ও নাসারাদের) আলেমগণ ইঞ্জিলের সত্য শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে, পরিবর্তিত করে ফেলেছে এবং সবদিক থেকে বিকৃত করে ফেলেছে এবং এইভাবে ইঞ্জিলের শিক্ষাকে শিরক ও কুফরির শিক্ষা বানিয়ে ছেড়েছে। কুরআন আবার কোনো কোনো জায়গায় আহলে কিতাবকে তাওরাত ও ইঞ্জিলের শিক্ষার বিপরীতে কার্যকলাপ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জিলের বরাত দিচ্ছে। এ থেকে বুঝা যায়, পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় তাওরাত ও ইঞ্জিলের মূলকপি—যদিও বিকৃত অবস্থায় থাকুক না কেনো—বিদ্যমান ছিলো। তখনই এই কিতাব দুটি শাব্দিক ও অর্থগত উভয় প্রকারের বিকৃতিকরণের শিকার হয়ে এতটা বিকৃত হয়ে পড়েছিলো যে, কিতাব দুটি মুসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত ও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিল হিসেবে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত ছিলো না।
পবিত্র কুরআন তাওরাত ও ইঞ্জিলের মাহাত্ম্য এবং আহলে কিতাবদের হাতে তাদের পরিবর্তন ও বিকৃতি-সাধন—উভয়টিকেই স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। তাওরাত ও ইঞ্জিল-সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো নিচে পেশ করা হলো—
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ () مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ
“(হে মুহাম্মদ,) তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের কিতাবের (তাওরাত ও ইঞ্জিলের) সমর্থক। আর তিনি অবতীর্ণ করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল ইতোপূর্বে মানজাতির জন্য হেদায়েতস্বরূপ; আর তিনি ফুরকান (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী) অবতীর্ণ করেছেন।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩-৪]
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ (سورة آل عمران)
"তিনি তাঁকে শিক্ষা দেন কিতাব, হেকমত, তাওরাত ও ইঞ্জিল।" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৮]
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (سورة آل عمران)
"হে কিতাবিগণ, ইবরাহিম সম্পর্কে তোমরা কেনো তর্ক করো, অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল তো তার পরেই নাযিল হয়েছিলো। কেনো তোমরা বোঝো না?" [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৬৫]
وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِمْ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ () وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (سورة المائدة)
"মারইয়াম-তনয় ইসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে তাদের পেছনে প্রেরণ করেছিলাম এবং তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সমর্থকরূপে ও মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশরূপে তাঁকে (ইসা আলাইহিস সালামকে) ইঞ্জিল দিয়েছিলাম; তাতে ছিলো পথের নির্দেশ ও আলো। ইঞ্জিলের অনুসারীরা যেনো তাতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিধান দেয়। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই ফাসিক।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৪৬-৪৭]
وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ مِنْ رَبِّهِمْ لَأَكَلُوا مِنْ فَوْقِهِمْ وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ مِنْهُمْ أُمَّةٌ مُقْتَصِدَةً وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ سَاءَ مَا يَعْمَلُونَ (سورة المائدة)
"তারা যদি তাওরাত, ইঞ্জিল ও তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত করতো (যদি বিকৃতি-সাধনের দ্বারা সেগুলোকে পরিবর্তিত না করতো), তা হলে তারা তাদের পদতল ও উপর থেকে (সচ্ছল ও নিশ্চিন্তভাবে) আহার লাভ করতো। তাদের মধ্যে একদল রয়েছে যারা মধ্যপন্থী; কিন্তু তাদের অধিকাংশ যা করে তা নিকৃষ্ট।" [সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৬]
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ
“(হে মুহাম্মদ,) বলো, হে কিতাবিগণ, তাওরাত, ইঞ্জিল ও যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে তোমরা তা প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তিই নেই।” [সুরা মায়িদা: আয়াত ৬৮]
وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ
“(হে ঈসা,) তোমাকে কিতাব, হিকমত ১৭৩, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম।” [সুরা মায়িদা: আয়াত ১১০]
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ
“যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইঞ্জিল — যা তাদের কাছে আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়।” [সুরা আ'রাফ: আয়াত ১৫৭]
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (سورة التوبة)
“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে-সওদা করেছো সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং ওটাই তো মহাসাফল্য।” [সুরা তাওবা: আয়াত ১১১]
মোটকথা, এসব প্রশংসা ও ফজিলত সেই তাওরাত ও সেই ইঞ্জিলের যেগুলো হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর তাওরাত এবং হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর ইঞ্জিলরূপে অভিহিত হওয়ার যোগ্য এবং যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কিতাব ছিলো। কিন্তু ইহুদি ও নাসারা জাতি এই আসমানি কিতাবগুলোর সঙ্গে কী আচরণ করেছে, তার অবস্থাও কুরআনের ভাষাতেই শুনুন-
أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (سورة البقرة)
"তোমরা (মুসলিমগণ) কি এই আশা করো যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে-যখন তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, এরপর তারা তা বিকৃত করে, অথচ তারা জানে।" (সুরা বাকারা: আয়াত ৭৫]
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (سورة البقرة)
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে।' তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের।" [সুরা বাকারা: আয়াত ৭৯।
يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ
"(ইহুদিদের মধ্যে কতিপয় লোক) কথাগুলোকে স্থানচ্যুত করে বিকৃত করে।" [সুরা নিসা: আয়াত ৪৬)
এগুলো ছাড়াও, তুচ্ছ মূল্যে আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে বিক্রি করা প্রসঙ্গে সুরা বাকারা, সুরা আলে ইমরান, সুরা নিসা ও সুরা তাওবার মধ্যে অনেক আয়াত বিদ্যমান। আয়াতগুলোর সারমর্ম এই যে, ইহুদি ও নাসারারা দুইভাবেই তাওরাত ও ইঞ্জিল বিক্রি করতো : শব্দ পরিবর্তন করে এবং অর্থকে বিকৃত করে। যেনো সোনা ও রুপার জন্য লালায়িত হয়ে সাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের মর্জিমতো আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহের শাব্দিক ও অর্থগত বিকৃতি-সাধন করা সেগুলোকে বিক্রি করারই নামান্তর। এই চেয়ে দুর্ভাগ্যের কাজ দ্বিতীয়টি নেই। এই কাজ সবসময়ই লানত ও অভিশাপের কারণ।
টিকাঃ
১৭৩. যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে।
📄 ইঞ্জিল এবং ইসা আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণ
মুফাস্সিরগণ সাধারণত বলে থাকেন যে, حواري শব্দটি থেকে حور নির্গত হয়েছে। এর অর্থ কাপড়ের শুভ্রতা। কাপড় ধোয়ার পর যখন তা সাদা ও শুভ্র হয়ে যায় তখন আরবি ভাষাভাষীরা বলেন, حار الثوب (কাপড় শুভ্র হয়েছে)। আর ধোপাকে বলা হয় حواري (হাওয়ারি) এবং حواري-এর বহুবচন حواریون। এই অর্থের প্রেক্ষিতে হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর অনুসারী ও শিষ্যদের হাওয়ারি বলা হতো এ-কারণে যে, তাঁদের অধিকাংশই ধোপা বা জেলে সম্প্রদায়ের ছিলেন। অথবা এ-কারণে যে, ধোপা যেভাবে ময়লা কাপড় পরিষ্কার করে, তেমনি হাওয়ারিগণও হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষা দ্বারা মানুষের অন্তরসমূহ আলোকিত করে তুলতেন। হাওয়ারি শব্দের অর্থ সহায়তাকারী, সাহায্যকারী ও উপদেশদাতাও হয়। আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার বলেন, নাসারগণ হযরত ইসا মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণকে তাঁর শিষ্য বলে থাকে। এটা অমূলক নয়। কারণ তার একটা ভিত্তি আছে। তা এই যে, মূলের বিবেচনায় حبور একটি হিব্রু শব্দ। শব্দটির অর্থ শিষ্য বা শাগরেদ। আর حبور-এর বহুবচন حبوريم । এই حبورم-ই আরবি ভাষায় এসে حوارین ও حواري-এর রূপ পরিগ্রহ করেছে।
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর হাওয়ারিগণ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআন মাজিদ কেবল حواریون বলেই সংক্ষিপ্তভাবে তাঁদের উল্লেখ করেছে। তাঁদের কারো নাম উল্লেখ করে নি। ইঞ্জিল অবশ্য তাদের নামও উল্লেখ করেছে এবং সংখ্যা। যেমন, ম্যাথুর ইঞ্জিলে প্রথম অধ্যায়ে বারোজন শিষ্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর বিদ্যমান ইঞ্জিল চতুষ্টয় থেকে খারিজকৃত বারনাবাসের ইঞ্জিলের চতুর্দশ অধ্যায়েও এই সংখ্যাই উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য কয়েকটি নামের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা যায়। নিম্নবর্ণিত নকশা থেকে তা বুঝা যাবে:
| ম্যাথুর ইঞ্জিল | বারনাবাসের ইঞ্জিল |
| :--- | :--- |
| সংখ্যা নাম | সংখ্যা নাম |
| ১. সিমন পিটার (সামআন) বিন ইউনা, আন্দ্রউসের ভাই | ১. পিটার আস-সাইয়্যাদ (সামআন) |
| ২. আন্দ্রউস (আন্দ্রে) বিন ইউনা, সিমনের ভাই | ২. আন্দ্রউস (আন্দ্রে) |
| ৩. ইয়াকুব বিন যাবাদি | ৩. বারনাবাস |
| ৪. ইউহান্না বিন যাবাদি (ইয়াকুবের ভাই) | ৪. ইয়াকুব বিন যাবাদি |
| ৫. ফিলিপ্স | ৫. ইউহান্না বিন যাবাদি |
| ৬. বারসু লামাউস | ৬. ফিলিপ্স |
| ৭. তুমা | ৭. বারসু লামাউস |
| ৮. ম্যাথু আল-ইশার | ৮. তাদাউস |
| ৯. ইয়াকুব বিন হালাফি | ৯. ইয়াকুব বিন হালাফি |
| ১০. লিবাদুস (উপাধি : তাদাউস) | ১০. ইয়াহুদা |
| ১১. সামআন আল-কানুবি | ১১. ম্যাথু আল-ইশার |
| ১২. ইয়াহুদা আসখার ইউতি | ১১. ইয়াহুদা আসখার ইউতি |
[কাসাসুল আম্বিয়া, আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ৪৮২।।
ইঞ্জিল দুটিতে মাত্র দুটি নামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ম্যাথুর ইঞ্জিলে তুমা ও সামআন আল-কানুবি রয়েছে আর বারনাবাসের ইঞ্জিলে তাদের বদলে ভিন্ন দুইজনের নাম রয়েছে: স্বয়ং বারনাবাস ও তাদাউস। কোন্ ইঞ্জিলের কথা সঠিক তা নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু প্রমাণের আলোকে খুব সহজে বলা যায় যে, গির্জার কাউন্সিল প্রমাণ ও সনদ ব্যতিরেকেই বারনাবাস ও তাঁর সঙ্গী তাদাউসের নাম মঞ্জুর করে দিয়েছে শুধু এ-বিষয়ের প্রেক্ষিতে যে, তাঁদের বর্ণনাসমূহের ভিত্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর খোদা হওয়ার ও কাফফারার আকিদার বিরুদ্ধে সত্যিকার খ্রিস্টধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তা ছাড়া তাঁদের বর্ণনাসমূহ গির্জাপতিরা সেন্ট পলের প্রবর্তিত ও বিকৃত খ্রিস্টধর্মের যে-বিশ্বাস লালন করতো এবং এখনো করছে তার বিরোধী ছিলো। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, বারনাবাসের নাম বর্তমান খ্রিস্টধর্মে হওয়ারিদের তালিকা থেকে খারিজ মনে করা হয়েও তাঁর নাম ওই দূতগণের তালিকায় আজো বিদ্যমান আছে, যাঁরা রাজ্যগুলোতে আল্লাহ তাআলার রাজত্ব ঘোষণা করেছিলেন এবং খ্রিস্টধর্মের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
📄 হযরত ইসা আলাইহিস সালাম এবং বর্তমান খ্রিস্টধর্ম
হযরত ইসا আলাইহিস সালাম-এর শিক্ষার সারমর্ম ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। তিনি আল্লাহ তাআলার সত্য নবী, সত্য ও সততার প্রতি আহ্বানকারী, সুস্পষ্ট সত্যধর্মের পথপ্রদর্শক ও প্রচারক ছিলেন। আল্লাহর সকল সত্য নবীর মতো তাঁর শিক্ষাও সৃষ্টির শুরু থেকে প্রচারিত সত্য ও সততার সমর্থক ছিলো, যুগের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক প্রয়োজনীয়তার বৈপ্লবিক পরিবর্তনশীলতার অবস্থা-অনুরূপ ছিলো এবং ইঞ্জিলের আকারে সংশোধন ও বিপ্লবের আহ্বানকারী ছিলো। খাঁটি একত্ববাদ, সৃষ্টিকর্তার পরিচয়লাভে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গেই উপায়হীন নৈকট্য, ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, দয়া, ক্ষমা, নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নতি তাঁর পবিত্র শিক্ষার সারমর্ম ছিলো। কিন্তু মানবজাতির মনোবিপ্লবের ইতিহাসে এর চেয়ে বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ব্যাপার আর কিছুই নেই যে, বর্তমান খ্রিস্টধর্ম হযরত ইসা আলাইহিস সালাম-এর পবিত্র শিক্ষার নামে একত্ববাদের জায়গায় ত্রিত্ববাদ, আল্লাহর পরিচয় লাভের জন্য পুত্রত্বের আকিদা, মুক্তির জন্য ইলম ও আমলের একনিষ্ঠতার স্থলে প্রায়শ্চিত্তে বিশ্বাস ইত্যাদি মূর্খতাপ্রসূত ও মুশরিকসুলভ অভিনব আকিদাসমূহের প্রচার ও প্রসারে তৎপর রয়েছে।
📄 অন্ধকার যুগ এবং গির্জাসমূহের সংশোধনের আওয়াজ
খ্রিস্টান ধর্মবেত্তাগণ বলেন, প্রকৃতপক্ষে ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম পূর্বাঞ্চলীয় দার্শনিক পেত্রার্ক ফুতিউস এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তার কারণ এই যে, তাঁর ও তাঁর দলের অভিপ্রায় ছিলো কোনো-না-কোনোভাবে পূবাঞ্চলের (গ্রিক) গির্জাগুলোকে পশ্চিমাঞ্চলের (রোমান) গির্জাগুলোর প্রভাবমুক্ত ও পৃথক করা এবং উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলোর মধ্যকার ঐক্যকে বিনষ্ট করা। এই অভিপ্রায়কে সমর্থন ও শক্তি প্রদানের জন্য ১০৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাধান আর্চ বিশপ পেত্রাক মিখাইল খুব দ্রুত এই আকিদার প্রচার-প্রসার শুরু করেন। এভাবে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এসব মতানৈক্য পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় গির্জাগুলোর মধ্যকার কলহকে স্থায়ী করলো। উভয় অঞ্চলের গির্জাগুলো একে অন্যের ওপর এই দোষারোপ করতে থাকলো যে, বিরোধী গির্জাগুলো খ্রিস্টধর্মে খোদাদ্রোহিতা ও অভিনব বিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সত্য খ্রিস্টধর্মকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। সাধারণভাবে রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টানদের মধ্যে এবং বিশেষভাবে গির্জাসমূহের উপদলগুলোর মধ্যে কলহ-বিবাদের এই ধারা ওই যুগে চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলো এবং তারা পরস্পরকে ভয়ঙ্কর রক্তপাত ও পাশবিক অত্যাচারের নরকে পরিণত করেছিলো। আর সে-যুগে ইসলাম তার আকিদাসমূহের সরলতা ও নেক আমলের পবিত্রতা এবং ইলম ও আমলে আধ্যাত্মিকতার উদ্ভাসের ফলে 'ব্যাপক নিরাপত্তা' ও 'রহমতে'র উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলো।
তখন ছিলো সেই যুগ যখন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গির্জাগুলো সাধারণ ও অতি সাধারণ মতভেদকে কেন্দ্র করে পোপের শাসন ও পোপের অনুসারীদের শাসনের মাধ্যমে এক দল আরেক দলের শিরশ্ছেদ ও মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দিতো। তারা হাজার হাজার ও লাখ লাখ মানুষকে ভয়ঙ্কর নির্যাতনে পীড়িত করে হত্যা করে ফেলতো। এ-কারণে ইতিহাসবিদগণ ইতিহাসের এই অধ্যায়কে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কুরআন হযরত ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে-তত্ত্ব ও সত্য প্রকাশ করেছে, পোপ ও গির্জার প্রতাপ খ্রিস্টানদেরকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেদিকে মনোযোগ প্রদান করতে না দিলেও কুরআনের সত্যের আওয়াজ প্রভাব সৃষ্টি না করে থাকে নি। এর বিস্তারিত বিবরণ খাতিমুল আম্বিয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনচরিতে উল্লেখ করা হবে।
এখানে শুধু এতটুকু ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য যে, রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও প্রোটেস্টান খ্রিস্টান এবং অন্য উপদলগুলো কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়াই সেন্ট পল কর্তৃক প্রবর্তিত বিকৃতিকে (ত্রিত্ববাদকে) খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদারূপে মেনে নিয়েছিলো। কতিপয় ক্ষুদ্র দল বা কতিপয় ব্যক্তি ত্রিত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করলেও সেই আওয়াজ ধীরে ধীরে দমিত হয়ে পড়েছে। যেমন, ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে ও ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে যথাক্রমে নিকায়ের কাউন্সিল ও কনস্টান্টিনোপলের কাউন্সিল যখন ত্রিত্ববাদকে খ্রিস্টধর্মের মৌলিক আকিদা বলে সাব্যস্ত করলো তখন 'আবওয়ারিয়্যুন' সম্প্রদায় পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করলো যে, হযরত ইসা মাসিহ আলাইহিস সালাম একজন মানুষমাত্র; তাঁর খোদাত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। আর 'সাবলিইয়্যুন' উপদল বলেছে যে, তিনটি সত্তা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূল নয়; বরং তা ওয়াহদাতে লাহুতের বা লাহুতের একত্বের বিভিন্ন আকৃতি বা প্রকাশ, যাকে আল্লাহ তাআলা কেবল নিজের একক সত্তার জন্য প্রয়োগ করে থাকেন। তারপরও ওই সময় পর্যন্ত পোপ ও গির্জার সিদ্ধান্তকে আল্লাহর সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হতো এবং বিশপ ও পাদরিদের أَرْبَابًا مِنْ دُون الله 'আল্লাহ ব্যতীত বিভিন্ন খোদা' বলে বিশ্বাস করা হতো। এ-কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদল ও ব্যক্তিবিশেষের সংশোধনবাদকে খোদাদ্রোহিতা আখ্যায়িত করে দমিত করে দেয়া হয়েছিলো।
কিন্তু যখন ক্রুসেডের লড়াইসমূহ খ্রিস্টানদেরকে মুসলমানদের অতি কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ করে দিলো এবং খ্রিস্টানরা ইসলামের বিশ্বাসগত ও কর্মগত শৃঙ্খলার অনেক চিত্র প্রত্যক্ষ করলো এবং তাদের কাছে ইসলাম সম্পর্কে বিশপ ও পাদরিদের বিষোদ্গার, মিথ্যাচার ও ভ্রান্ত বক্তব্য প্রকাশ পেতে শুরু করলো, তখন তাদের মধ্যেও স্বাধীন চিন্তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এবং তাদের মধ্যে অন্ধ-বিশ্বাসের শৃঙ্খলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলার প্রেরণা জাগ্রত হলো। এ-ব্যাপারে কিং লুথারের আহ্বান প্রথম সত্য-উচ্চারণ ছিলো, যিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهএক আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য বাতিল ও মিথ্যা উপাস্যকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু আপনারা এ-কথা শুনে বিস্ময়বোধ করবেন যে, কিং লুথারের সত্য-উচ্চারণের বিরুদ্ধে পোপের পক্ষ থেকে খোদাদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতাসহ যেসব দোষ চাপানো হয়েছিলো তার মধ্যে প্রধান দোষারোপ ছিলো এটা যে, এই ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে 'মুসলমান' হয়ে পড়েছে এবং পোপের বিরুদ্ধে তা সত্য- উচ্চারণ কুরআনেরই প্রতিধ্বনি।
এটাই ছিলো সংশোধনের আওয়াজ, যা নিঃসন্দেহে ইসলামের 'চিন্তা ও অনুধাবনে'র আহ্বানে প্রভাবিত হয়ে ধীরে ধীরে গির্জার সংশোধনের নামে খ্রিস্টানজগতে গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছিলো এবং চারদিকে অগ্নিশিখার মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। এসব সংশোধনের মধ্যে একটি সংশোধন- চিন্তা এটাও ছিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা পবিত্র গ্রন্থ (নিউ টেস্টামেন্ট)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ফলে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচীন লাহুতি উপদলের সবাই, নাসতুরি উপদলের দলীয় সিদ্ধান্ত এবং নতুন উপদলগুলোর মধ্যে সুসিনিয়ানিয়্যুন, জার্মানিয়্যুন, মুওয়াহিদুন, উমুমিয়্যুন এবং অন্যান্য উপদল গির্জার শিক্ষার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিপ্লব ঘোষণা করে পরিষ্কাভাবে বলে দিলো যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা কিতাব ও যুক্তি উভয়েরই বিরোধী এবং মেনে নেয়ার অযোগ্য। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদেরকে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়া থেকে নিবৃত্ত রাখলেও তারা ত্রিত্ববাদের আকিদার বিভিন্ন চেহারা ও আকৃতির বিশ্লেষণ প্রদান করতে শুরু করলো এবং এসব বিশ্লেষণ ত্রিত্ববাদের আকিদাকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করে আল্লাহ তাআলার একত্বের পবিত্র অঙ্কুরোদ্গম করতে লাগলো। যেমন, সুইডেনবার্গ বললেন, তিনটি মূল-'পিতা', 'পুত্র' ও 'রুহুল কুদ্স্স'-এর সম্পর্ক হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা ব্যতীত (আল্লাহ তাআলার) একত্বের সত্তার সঙ্গে নয় (শুধু মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তার সঙ্গেই জড়িত)। অর্থাৎ, হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সত্তা তার লাহুতি স্বভাবের প্রেক্ষিতে 'পিতা' এবং আলমে নাসুতে বা মানবজগতে মানবাকৃতিবিশিষ্ট হওয়ার কারণে 'পুত্র' ও 'দ্বিতীয় মূল'। আর তা থেকেই রুহুল কুদসের আবির্ভাব ঘটেছে, এ-কারণে তৃতীয় মূল 'রুহ' বা 'আত্মা'। মোটকথা, ত্রিমূলের সম্পর্ক কেবল মাসিহ আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গেই (অন্যকারো সঙ্গে নয়)।
জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট বলেন, ত্রিত্ববাদের আকিদার অর্থ এই নয় যে, ‘পিতা’, ‘পুত্র’ ও ‘রুহুল কুদ্স’—এই তিন সত্তা; বরং তা আলমে লাহুতে বা অদৃশ্য জগতে মহান আল্লাহর তিনটি মৌলিক গুণের প্রতি ইঙ্গিত, যা তাঁর অন্য যাবতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের উৎস ও উৎপত্তিস্থল হওয়ার মর্যাদা রাখে। মৌলিক গুণ তিনটি এই : কুদরত (পিতা), হেকমত (পুত্র) এবং মুহাব্বাত (রুহ)। অথবা ত্রিত্ববাদের দ্বারা আল্লাহ তাআলার তিনটি মৌলিক কর্মের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলোকে সৃষ্টি, সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ নামে আখ্যায়িত করা যায়।
আর হ্যাকান ও শিলং এই চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছেন যে, ত্রিত্ববাদের আকিদা অন্যান্য সত্য বিষয়ের মতো কোনো সত্য বিষয়ই নয়। এটি নিছক একটি কাল্পনিক মতাদর্শ। তাঁদের কথার উদ্দেশ্য এই যে, সত্য বলতে যা বোঝায় তা হলো মহান আল্লাহর সত্তা একক ও সমকক্ষহীন। আর হযরত মাসিহ আলাইহিস সালাম তাঁর সৃষ্ট বান্দা। কিন্তু সাধারণ কল্পনা ও অনুমানে যখন আমরা অদৃশ্য জগতের দিকে উড়তে থাকি তখন আমাদের কল্পনা এই মানবজগতে খোদা, মাসিহ ও রুহুল কুদ্স্সকে ‘পিতা, ‘পুত্র’ ও ‘রুহ’ শব্দে বিশ্লেষিত করে থাকে এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ত্রিমূলের মর্যাদায় কেন্দ্রীভূত দেখতে পায়। যুক্তিবাদী, লুথারপন্থী, একত্ববাদী, জার্মান দলগুলো ছাড়াও অনেক মানুষ আছে যারা সাবলিয়্যুন উপদলের আকিদা অবলম্বন করে একটি বিশাল দলে রূপ নিচ্ছে।
এসব ব্যাপার সত্ত্বেও এ-কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ইউরোপে পুনর্জাগরণের যুগেও সাধারণভাবে সমস্ত গির্জাই ত্রিত্ববাদের আকিদায় বিশ্বাসী থেকেছে। তাদের কাছে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা তা-ই যা খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে কতিপয় ধর্মীয় কাউন্সিল কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে এবং যা নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য শির্ক, এবং একত্ববাদের সম্পূর্ণ বিরোধী।