📄 বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।
টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহ এ-কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বনি ইসরাইল হযরত মুসা আ.-কে সবসময় কথায় ও কাজে সব দিক দিয়েই নানা ধরনের কষ্ট দিয়ে আসছে। এমনকি তাঁর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ ও মিথ্যা অপবাদ প্রদান করতেও ত্রুটি করে নি।
প্রতিমা-পূজার আবদার, গো-বৎসের পূজায় লিপ্ত হওয়া, তাওরাতের বিধি-বিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি, পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি, মান্না ও সালওয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা-মোটকথা, প্রতিটি কর্তব্য সম্পন্ন করার ব্যাপারে একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা এবং প্রত্যেকটি ব্যাপারে হযরত মুসা আ.-এর সঙ্গে মূর্খতাসুলভ বাদানুবাদ ইত্যাদির এক সক্রিয় ধারা অব্যাহত ছিলো। এসব বিষয় বনি ইসরাইলের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দৃষ্ট হয়। আর অন্যদিকে দেখা যায় যে, হযরত মুসা আ. দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে একজন 'উলুল আযম' (দৃঢ়প্রতিজ্ঞ) রাসুলের মতো সবকিছু সহ্য করে হেদায়েত ও নসিহতের কাছে মশগুল ছিলেন।
কুরআন মাজিদের বিস্তারিত বিবরণ ছাড়াও যদি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বনি ইসরাইলের ওইসব বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলি জানতে আগ্রহ হয়, তবে তাওরাতের নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করা যেতে পারে: নিষ্ক্রমণ অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১২, আয়াত ১১-১২; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ২-৩।
গণনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ১৪, আয়াত ১-৩; অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৩-১৪; অনুচ্ছেদ ৭, আয়াত ১২-১৩। ইস্তিসনা অধ্যায়: অনুচ্ছেদ ৯; আয়াত ২৩-২৪।
এই গ্রন্থের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে যে-ঘটনাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে তা ছাড়াও কুরআন মাজিদ সুরা আহযাব ও সুরা সাফ-এ হযরত মুসা আ.-কে বনি ইসরাইল যেসব দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করে তার নিন্দা করেছে এবং বলেছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ آذَوْا مُوسَى فَبَرَّأَهُ اللَّهُ مِمَّا قَالُوا وَكَانَ عِنْدَ الله وَجِيها (سورة الأحزاب)
'হে মুমিনগণ, মুসাকে যারা কষ্ট দিয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। তারা যা রটনা করেছিলো, আল্লাহ তা থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন; এবং আল্লাহর কাছে সে মর্যাদাবান।' [সুরা আহযাব: আয়াত ৬৯]
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ لِمَ تُؤْذُونَنِي وَقَدْ تَعْلَمُونَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (سورة الصف)
'আর স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমাকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো যখন তোমরা জানো যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল।" এরপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করলো তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।' [সুরা সাফ: আয়াত ৫]
মুফাস্সির আলেমগণ উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন যে, এখানে যে-কষ্ট প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে তাতে কি ওইসব অবস্থাই উদ্দেশ্য যা বনি ইসরাইলের ধারাবাহিক নাফরমানি ও অবাধ্যতার প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসবকিছু নিশ্চিতভাবে হযরত মুসা আ.-এর মনঃকষ্টের কারণ ছিলো না-কি ওগুলো ব্যতীত অন্যকোনো বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য। যেমন: কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, উল্লিখিত আয়াত দুটিতে বনি ইসরাইল অবাধ্যতা ও হঠকারিতার মাধ্যমে হযরত মুসা আ.কে যে-যন্ত্রণা ও ক্লেশ দিতো তা-ই উদ্দেশ্য। আর কোনো কোনো মুফাস্সির উল্লিখিত আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থল হিসেবে পূর্ববর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে পৃথক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, কোনো কোনো সহিহ হাদিসে হযরত মুসা আ. ও বনি ইসরাইলের মধ্যে এমন এমন ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় যার বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন মাজিদে নেই। সুতরাং, তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলি থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা অথবা এ-জাতীয় সব ঘটনাই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল এবং এ-ঘটনাগুলোই আয়াত দুটির শানে-নুযুল তুল্য।
তাঁদের বর্ণিত ঘটনাসমূহ থেকে একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে উল্লেখ করা হয়েছে।
قَالَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى سَوْأَةِ بَعْضٍ وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا يَمْنَعُ مُوسَى أَنْ يَغْتَسِلَ مَعَنَا إِلَّا أَنَّهُ آدَرُ. قَالَ فَذَهَبَ مَرَّةً يَغْتَسِلُ فَوَضَعَ ثَوْبَهُ عَلَى حَجَرٍ فَفَرَّ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ - قَالَ - فَجَمَحَ مُوسَى بِأَثَرِهِ يَقُولُ ثَوْبِي حَجَرُ ثَوْبِي حَجَرُ حَتَّى نَظَرَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ إِلَى سَوْأَةِ مُوسَى فَقَالُوا وَاللَّهِ مَا بِمُوسَى مِنْ بَأْسِ فَقَامَ الْحَجَرُ بَعْدُ حَتَّى نُظِرَ إِلَيْهِ - قَالَ - فَأَخَذَ ثَوْبَهُ فَطَفِقَ بِالْحَجَرِ ضَرْبًا ». قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاللَّهِ إِنَّهُ بِالْحَجَرِ نَدَبٌ سِتَّةٌ أَوْ سَبْعَةٌ ضَرْبُ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالْحَجَرِ.
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "হযরত মুসা আ. অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর দেহের কোনো অংশের ওপরই কারো দৃষ্টি পড়তে দিতেন না। পক্ষান্তরে বনি ইসরাইলিরা সর্বসাধারণের সামনে নগ্ন হয়ে গোসল করতে অভ্যস্ত ছিলো। তারা একে অন্যের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতো। এ-কারণে তারা হযরত মুসা আ.-কে উত্যক্ত করতো এবং তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতো। কখনো তারা বলতো, 'হযরত মুসা আ.-এর বিশেষ অঙ্গে শ্বেতরোগের দাগ রয়েছে।' কখনো তারা বলতো, 'তাঁর কুরুণ্ডিয়া রোগ (অণ্ডকোষ বৃদ্ধির ব্যাধি) আছে। বা এ-জাতীয় অন্যকোনো খারাপ রোগ আছে। এ-জন্যই তিনি পৃথক স্থানে গোপনে গোসল করে থাকেন।' হযরত মুসা বনি ইসরাইলের এসব অপবাদ শুনে নীরব থাকতেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা হলো মুসা আ.-কে এসব অপবাদ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করবেন। মুসা আ. একটি পৃথকভাবে আড়ালে গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি তার পরনের কাপড় খুলে একখণ্ড পাথরের ওপর রাখলেন। তখনই পাথরটি আল্লাহ তাআলার আদেশে তার স্থান থেকে নড়ে উঠলো এবং যেখানে সর্বসাধারণের সামনে বনি ইসরাইলিরা নগ্ন অবস্থায় গোসল করছিলো, পাথরটি মুসা আ.-এর কাপড় নিয়ে ঠিক ওখানে গিয়ে পৌছলো। হযরত মুসা আ. ঘাবড়ে গিয়ে ও ক্রোধান্বিত হয়ে পাথরের পেছনে পেছনে এই বলে ছুটলেন, হে পাথর, আমার কাপড়! হে পাথর, আমার কাপড়! পাথরের সঙ্গে সঙ্গে মুসা আ.-ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং সবাই দেখতে পেলো যে, হযরত মুসা আ. তাদের দোষারোপ করা সমস্ত রোগ ও ব্যাধি থেকে পবিত্র। হযরত মুসা আ.-এর ওপর এই ঘটনার প্রভাব এত অধিক হলো যে, ক্রোধে অধীর হয়ে পাথরটির ওপর তাঁর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন। ওই পাথরের ওপর তাঁর প্রত্যেকটি আঘাতেরই দাগ বসে গেলো।"¹³⁶
ইমাম বুখারি ও মুসলিম এই ঘটনাটিকে বিভিন্ন সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে একটি সনদে এই ঘটনাকে সুরা আহযাবের ওই আয়াতের শানে-নুযুল বলা হয়েছে যাতে বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে যন্ত্রণা প্রদান এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত মুসা আ.-এর পবিত্রতা ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে। আর এ-আয়াতটিরই শানে-নুযুল হিসেবে ইবনে আবি হাতেম হযরত আলি রা. থেকে অন্য একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলি (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) বলেন, হযরত মুসা ও হারুন আ. পাহাড়ের ওপর গমন করলেন। পাহাড়ে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেন। ফলে মুসা. একাকী ফিরে আসেন। বনি ইসরাইল তা দেখে হযরত মুসা আ.-এর বিরুদ্ধে এই অপবাদ রটনা করলো যে, তিনি হারুন আ.-কে হত্যা করেছেন। এই অপবাদে হযরত মুসা আ. অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। তখন আল্লাহপাক ফেরেশতাদেরকে হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ বনি ইসরাইলের সামনে এনে উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন। তৎক্ষণাৎ ফেরেশতাগণ হযরত হারুন আ.-এর মৃতদেহ খোলা প্রান্তরে বনি ইসরাইলের ভরা মজলিসে সবার সামনে এনে উপস্থিত করলেন। তারা তা দেখে নিশ্চিত হলো যে, সত্য সত্যই হযরত হারুন আ.-এর দেহে কোথাও কোনো আঘাত বা হত্যার চিহ্ন নেই।
তৃতীয় হাদিসটি হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. ও সুদ্দি থেকে তাফসিরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত মুসা আ.-এর উপদেশ ও নসিহত কারুনের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় হয়ে পড়লো। ফলে সে একদিন এক বারবণিতাকে কিছু টাকা দিয়ে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলো যে, যখন হযরত মুসা ওয়াজ-নসিহতে মশগুল থাকবে, ঠিক সে- সময়ে তুমি মজলিসে দাঁড়িয়ে মুসার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করবে যে, তোমার সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের বিপুল জনসমাবেশে ওয়াজ করছিলেন। তখন ওই বারবণিতা সমাবেশে দাঁড়িয়ে কারুনের কথামতো হযরত মুসা আ.-এর ওপর দোষারোপ করলো। হযরত মুসা আ. এই রমণীর কথা শোনামাত্র সিজদায় পতিত হলেন। তারপর মাথা তুলের রমণীকে সম্বোধন করে বললেন, তুই কি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলতে পারিস যে তুই যা বলছিস তা সত্য? এ-কথা শুনে রমণীটির দেহে ভীষণ কাঁপুনি শুরু হয়ে গেলো। সে বললো, আল্লাহর কসম, সত্য কথা এই যে, কারুন আমাকে টাকা দিয়ে এ-ধরনের কথা বলতে নির্দেশ দিয়েছিলো। আপনি তো এ-ধরনের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। তখন হযরত মুসা আ. কারুনের জন্য বদদোয়া করলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলার নির্দেশে কারুনকে তার সব ধনসম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেয়া হলো।
টিকাঃ
¹³⁶ সহিহ বুখারি: হাদিস ২98; সহিহ মুসলিম: হাদিস 339।
📄 মীমাংসা
এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।
এই আলোচনায় বিশুদ্ধ পন্থা এই যে, কুরআন মাজিদ যখন হযরত মুসা আ.-কে ক্লেশ ও যন্ত্রণা প্রদানের ব্যাপরটিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে, তখন আমাদের জন্যও এটাই সঙ্গত হবে যে, এর কোনো নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা ব্যতীতই যন্ত্রণা প্রদানের মূল বিষয়টির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না করা। যে-হেকমত ও মুসলেহতের কারণে আল্লাহপাক বিষয়টিকে অস্পষ্ট রাখা সঙ্গত মনে করেছেন, আমরাও তাকেই যথেষ্ট মনে করি। আর যদি বিস্তারিত বিবরণ ও নির্দিষ্টতার প্রতি মনোযোগ দেয়া জরুরি হয়, তাহলে এ-কথা মেনে নিতে হবে যে, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্যস্থল ওইসব ঘটনা যা বনি ইসরাইল কর্তৃক হযরত মুসা আ.-কে কষ্ট প্রদান প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ও সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর এ-কথার প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে যে, আলোচিত কষ্ট প্রদানের বিষয়টি এ-জাতীয় হবে যাতে হযরত মুসা আ.-এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা.-এর পক্ষ থেকে তা খণ্ডন করেন এবং বনি ইসরাইলের অপবাদ থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র সাব্যস্ত করেন। সুতরাং, আলোচ্য আয়াত দুটির প্রত্যেকটির লক্ষ্যস্থলের নির্দিষ্টতায় ওই তিনটি রেওয়ায়েতই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যা হাদিসের কিতাবসমূহ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। ওই রেওয়ায়েতগুলোই উল্লিখিত আয়াত দুটির লক্ষ্যস্থল।
আরেকটি বিষয় এই : শানে নুযুল হওয়ার জন্য একটি বিষয়কে যে নির্দিষ্ট হতে হবে তা হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ.-এর মতে ঠিক নয়। শানে-নুযুলের প্রকৃত অবস্থা এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের সময়ে সংঘটিত ওইসব ঘটনা যা কোনো আয়াতের লক্ষ্যস্থল হতে পারে। ওইসব ঘটনাকেই উল্লিখিত আয়াতের জন্য সমানভাবে শানে নুযুল বলা যেতে পারে।
এখানকার তফাসিরে আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবে একটি দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর ও মিসরের ওলামা মজলিসের মধ্যে এ-বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে সেগুলোকেও উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমরা উভয় ধরনের মতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একমত নই; বরং আমরা প্রাচীন মুফাস্সিরগণের মধ্যে ইমাদুদ্দিন বিন কাসির ও আবু হাইয়ানের প্রবল মতসমূহেরই সমর্থন করে থাকি। তাই আমরা নাজ্জারের দীর্ঘ আলোচনা পরিত্যাগ করলাম।
📄 হযরত হারুন আ.-এর ইন্তেকাল
পূর্বে বর্ণিত ঘটনাসমূহে বলা হয়েছে যে, বনি ইসরাইল পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে অস্বীকার করলে আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর মাধ্যমে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এখন তোমাদেরকে চল্লিশ বছরকাল যাবৎ এই প্রান্তরেই ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে হবে। এখন যারা প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছে তাদের মধ্য থেকে কেউই আর পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ করতে পারবে না।
তার সঙ্গে বনি ইসরাইলকে এ-কথাও বলা হয়েছিলো যে, মুসা ও হারুনও তাদের কাছেই থাকবেন। কেননা, তাদের এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদের হেদায়েত ও নসিহতের জন্য মুসা ও হারুন আ.-এর ওখানে থাকা একান্ত আবশ্যক। বনি ইসরাইল তীহ ময়দানে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে পর্বতের এক চূড়ার কাছে গিয়ে পৌঁছলো। পাহাড়ের এই চূড়া 'হুর' নামে বিখ্যাত ছিলো। এ-সময় হযরত হারুন আ.-এর কাছে পরলোকের ডাক এলো। তিনি ও হযরত মুসা আ. পাহাড়ের হুর চূড়ার ওপর আরোহণ করলেন। ওখানে কিছুদিন আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মশগুল থাকলেন। একসময় হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করলেন। হযরত মুসা আ. তাঁর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য নিচে নেমে এলেন এবং বনি ইসরাইলকে হারুন আ.-এর ইন্তেকাল সম্পর্কে সংবাদ প্রদান করলেন।
তাওরাত এই ঘটনাকে নিম্নবর্ণিত ভাষায় বর্ণনা করেছে:
"এরপর বনি ইসরাইলের গোটা দল কাবেস থেকে যাত্রা করে হুর নামক পাহাড়ের কাছে পৌঁছলো। আল্লাহ তাআলা হুর পাহাড়ের ওপর—যা 'আদওয়াম' সীমান্তের সঙ্গে মিলিত ছিলো—হযরত মুসা ও হারুন আ.-কে বললেন, হারুন তার নিজের লোকদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে। কেননা, আমি বনি ইসরাইলকে যে-রাজ্য দিলাম হারুন সেই রাজ্যে যেতে পারবে না। কারণ তোমরা 'মুরিবাহ'র ঝরনার কাছে আমার কথার বিপরীত কাজ করেছো। সুতরাং তুমি হারুন ও তার পুত্র আল-ইয়ারাযকে সঙ্গে নিয়ে হুর পাহাড়ের ওপর আসো এবং হারুনের পোশাক খুলে তার পুত্র আল-ইয়ারাযকে পরিয়ে দাও। কেননা, হারুন ওখানে মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়ে তার নিজেদের লোকদের সঙ্গে মিলিত হবে। মুসা আ. আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুসারে কাজ করলেন। তিনি বনি ইসরাইলের গোটা দলের চোখের সামনে হুর পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন। মুসা আ. হারুন আ.-এর পরিধেয় বস্ত্র খুলে তাঁর পুত্র আল-ইয়ারাযকে পরিয়ে দিলেন। হারুন আ. ওখানেই পাহাড়ের চূড়ার ওপর ইন্তেকাল করলেন। এরপর মুসা আ. ও আল-ইয়ারায পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নেমে এলেন। বনি ইসরাইল শুনতে পেলো যে হযরত হারুন আ. ইন্তেকাল করেছেন। তাদের সব গোত্রের লোকেরা তিরিশ দিনব্যাপী শোক পালন করলো। "
টিকাঃ
১৩৭ গণনা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৬, আয়াত ২২-২৯।
📄 হযরত মুসা ও খিযির আলাইহিমুস সালাম
হযরত মুসা আ. এবং একজন বাতেনি ইলমে অভিজ্ঞ মহামানবের মধ্যে যে-সাক্ষাৎ ঘটেছিলো তা হযরত মুসা আ.-এর গোটা জীবনের ঘটনাবলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হযরত মুসা আ. তাঁর কাছ থেকে সৃষ্টিজগতের কতিপয় রহস্য ও গোপনীয় তথ্য অবগত হয়েছিলেন। সুরা কাহফে বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে এই সাক্ষাতের উল্লেখ রয়েছে। আর সহিহ বুখারিতে এই ঘটনা সম্পর্কে আরো কিছু অতিরিক্ত বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারিতে হযরত সাঈদ বিন জুবাযের রা. থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে : তিনি একবার আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর কাছে আরজ করলেন, নুফ আল-বাক্কালি ( نوف البكالي ) বলেন, হযরত খিযির আ.-এর সঙ্গী মুসা এবং বনি ইসরাইলের সঙ্গী মুসা এক ব্যক্তি নন। খিযিরের সঙ্গী মুসা হলেন অন্য মুসা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বললেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা কথা বলছে।
উবাই বিন কা'ব রা. আমার কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, একদিন হযরত মুসা আ. বনি ইসরাইলের উদ্দেশে ওয়াজ করছিলেন। এ-সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'এই যুগের সবচেয়ে বড় আলেম কে?'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকেই সবচেয়ে বেশি ইলম দান করেছেন।' আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-এর এ-কথা পছন্দ করলেন না। তৎক্ষণাৎ তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, 'তোমার কর্তব্য تو এই ছিলো যে, তুমি উক্ত প্রশ্নের জবাব আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের ওপর সোপদ করে দিয়ে বলতে, والله اعلم আল্লাহ তাআলাই সে-সম্পর্কে ভালো অবগত আছেন।' এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আ.-এর প্রতি ওহি নাযিল করলেন: 'দুই সাগরের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা রয়েছেন। তিনি কোনো কোনো বিষয়ে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।'
হযরত মুসা আ. আরজ করলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনার ওই বান্দার কাছে কোন্ পথ দিয়ে যেতে হবে?' আল্লাহ তাআলা বললেন, 'ভাজা মাছ থলের মধ্যে রেখে দাও। এরপর যে-স্থানে মাছটি হারিয়ে যাবে ওখানেই আমার ওই বান্দাকে দেখতে পাবে।'
হযরত মুসা আ. ভাজা মাছ থলের মধ্যে রেখে তাঁর খলিফা ইউশা বিন নুনকে সঙ্গে নিয়ে ওই নেককার বান্দার সন্ধানে বের হলেন। চলতে চলতে এক জায়গায় পৌঁছে তাঁরা উভয়েই একটি পাথরের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। থলের মধ্যে যে-ভাজা মাছটি ছিলো তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হলো এবং তা থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেলো। মাছটি পানির যে-অংশের ওপর দিয়ে চলে গেলো এবং যে-পর্যন্ত গেলো, ওখানকার পানি বরফের মতো জমে গিয়ে একটি ক্ষুদ্র ও সরু রাস্তার মতো হয়ে গেলো। মনে হছিলো যেনো সমুদ্রের মধ্যে একটি রেখা অঙ্কিত হয়েছে।
এই ঘটনা হযরত ইউশ আ. দেখলেন। কেননা, তিনি হযরত মুসা আ.-এর আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন। কিন্তু হযরত মুসা আ. ঘুম থেকে জাগলে ইউশা আ. তাঁকে ঘটনাটি জানাতে ভুলে গেলেন। এরপর তাঁরা পুনরায় চলতে শুরু করলেন। সারাদিন ও সারারাত চলতেই থাকলেন। দ্বিতীয় দিন ভোরে হযরত মুসা আ. বললেন, 'এখন অত্যন্ত ক্লান্তি অনুভব করছি। ওই মাছটি বের করো, তার দ্বারা ক্ষুধা নিবারণ করি।' হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হযরত মুসা আ. আল্লাহর বর্ণিত উদ্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত কোনো ক্লান্তি অনুভব করেন নি। কিন্তু পথ ভুলে যখন ওই স্থান পেরিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলেন, তখনই তিনি ক্ষুধা অনুভব করলেন।
হযরত ইউশা আ. বললেন, আপনি নিশ্চয় জেনে থাকবেন, যেখানে আমরা পাথরের ওপর শায়িত ছিলাম, ওখানে এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো যে, অকস্মাৎ মাছটি থলের মধ্যে নড়ে উঠলো এবং থলে থেকে বের হয়ে সাগরের দিকে চলে গেলো। আর মাছটির গতিপথে সাগরের মধ্যে রাস্তা তৈরি হয়ে গেলো। আমি এই ঘটনা আপনার কাছে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। নিশ্চয় আমার ভুলে যাওয়া শয়তানের একটা চক্রান্ত ছিলো।
হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাগরের ওই রেখাটি মাছটির জন্য (সাঁতার কাটার) পথ ছিলো আর হযরত মুসা আ. ও ইউশা আ.-এর জন্য ছিলো বিস্ময়কর ব্যাপার।
হযরত মুসা আ. বলেন, আমরা যে-স্থানটি সন্ধান করছিলা, ওটাই ছিলো সেই স্থান। এই বলে তাঁরা উভয়ে পরস্পর কথা বলতে আবার সে-পথেই ফিরে চললেন এবং ওই পাথরখণ্ডগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁরা ওখানে পৌছে দেখলেন উত্তম পোশাক-পরিহিত একজন লোক ওখানে বসে রয়েছেন। হযরত মুসা আ. তাঁকে সালাম দিলে ওই ব্যক্তি বললেন, 'এই দেশে সালাম কোথায়? এই দেশে তো মুসলমান বাস করে না।' ইনি ছিলেন হযরত খিযির আ.।
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আমার নাম মুসা।' খিযির আ. বললেন, 'বনি ইসরাইল বংশের মুসা?' মুসা আ. বললেন, হ্যাঁ। আমি আপনার কাছ থেকে ওই ইলম শিক্ষা করতে এসেছি যা আল্লাহ তাআলা একমাত্র আপনাকেই দান করেছেন।'
হযরত খিযির আ. বললেন, 'আপনি আমার সঙ্গে থেকে সেসব ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। হে মুসা, আল্লাহ তাআলা আমাকে সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা আপনাকে দান করা হয় নি।'
হযরত মুসা আ. বললেন, 'ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আপনার নির্দেশ আমি কখনো লঙ্ঘন করবো না।'
হযরত খিযির আ. বললেন, 'তবে এই শর্ত থাকলো যে, যতক্ষণ আপনি আমার সঙ্গে থাকবে ততক্ষণ কোনো ব্যাপারেই-যা আপনার দৃষ্টিতে গোচরীভূত হবে-আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না। পরে আমি নিজেই আপনাকে ওসব বিষয়ের গূঢ়তত্ত্ব বলে দেবো।'
হযরত মুসা আ. এই শর্ত মেনে নিলেন এবং উভয়ই কোনো এক সাগরের দিকে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে সামনেই একটি নৌকা দেখতে পেলেন। হযরত খিযির আ. নৌকার মাঝিদেরকে ভাড়া কত জিজ্ঞেস করলেন। তারা খিযির আ.-কে চিনতো। কাজেই তারা ভাড়া গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালো এবং তাঁদের উভয়কে অত্যন্ত সমাদর করে নৌকায় তুলে নিলো। নৌকাটি তখনো বেশিদূর অগ্রসর হয় নি, হঠাৎ খিযির আ. নৌকার সামনের অংশের একটি তক্তা খুলে ফেলে নৌকাটিকে ছিদ্র করে দিলেন। হযরত মুসা আ. ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না। তিনি খিযির আ.-কে বললেন, 'নৌকার মাঝিরা তো আমাদের সঙ্গে খুবই সদ্ব্যবহার করলো, আমাকে ও আপনাকে বিনা ভাড়ায় আরোহণ করালো। আর আপনি তার এই বিনিময় প্রদান করলেন যে, নৌকাটির মধ্যে ছিদ্র করে দিলেন। এর ফল তো এই হবে যে, নৌকার আরোহীরা সবাই নৌকাসহ ডুবে যাবে। এটা তো বড় অসঙ্গত কাজ হলো।' হযরত খিযির আ. বললেন, 'আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনি আমার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। অবশেষে তা-ই ঘটলো।' হযরত মুসা আ. বললেন, 'আমি তা ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং আমি আমার ভুল ত্রুটির জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না এবং আমার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন না।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এই প্রথম প্রশ্নটি বাস্ত বিকই হযরত মুসা আ.-এর ভুলে যাওয়ার কারণেই হয়েছিলো। ঠিক সে-সময় একটি পাখির উড়ে এসে নৌকাটির এক পাশে বসলো এবং সমুদ্রের মধ্যে চঞ্চু ডুবিয়ে দিয়ে এক বিন্দু পানি পান করলো।
হযরত খিযির আ. বললেন, 'তুলনাহীনভাবে আল্লাহ তাআলার সীমাহীন জ্ঞানের মোকাবিলায় আমার ও আপনার জ্ঞান এমনই তুচ্ছ, যেমন সমুদ্রের অথৈ জলরাশির সামনে এই বিন্দুটি, যা পাখিটি পান করলো।'
নৌকা তীরে পৌছলো। তাঁরা উভয়ে নৌকা থেকে অবতরণ করে একদিকে যাত্রা করলেন। তাঁর সমুদ্রের তীর ধরে চলছিলেন। এক জায়গায় কিছু শিশু খেলা করছিলো। হযরত খিযির আ. এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্য থেকে একটি শিশুকে হত্যা করে ফেললেন। হযরত মুসা আ. আবার ধৈর্যহীন হয়ে পড়লেন। খিযির আ.-কে বললেন, 'আপনি অন্যায়ভাবে একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে ফেললেন? এটা তো অত্যন্ত অন্যায় কাজ হলো।' হযরত খিযির আ. বললেন, 'আমি তো প্রথমেই আপনাকে বলেছিলাম, আপনি আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্য ও সহনশীলতা রক্ষা করতে পারবেন না।'
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যেহেতু এ-বিষয়টি প্রথম ঘটনার চেয়ে কঠিন ছিলো, তাই হযরত মুসা আ. ধৈর্য ধারণ করতে অপারগ ছিলেন।
হযরত মুসা আ. বললেন, 'আচ্ছা, এবারও আমাকে ক্ষমা করুন। এরপর যদি আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম না হই, তবে আমার আর কোনো আপত্তি করার সুযোগ থাকবে না। এরপর আমি আমার থেকে পৃথক হয়ে যাবেন।'
তাঁরা উভয়ে আবার চলতে শুরু করলেন এবং চলতে চলতে একটি জনপদে এসে পৌছলেন। জনপদের অধিবাসীরা ছিলো সচ্ছল অবস্থাসম্পন্ন এব সব দিক থেকেই আতিথেয়তা করার উপযুক্ত। কিন্তু হযরত মুসা আ. ও খিযির আ.-এর মুসাফিরসুলভ আবেদন সত্ত্বেও জনপদবাসীরা তাঁদেরকে অতিথি হিসেবে বরণ করতে অস্বীকৃতি জানালো। তাঁরা তখনো জনপদের মধ্য দিয়ে চলছিলেন। হঠাৎ হযরত খিযির আ. এমন একটি ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন যার দেয়াল সামান্য হেলে পড়েছিলো এবং মাটিতে পতিত হওয়ার উপক্রম করছিলো। হযরত খিযির আ. হাতে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালটিকে সোজা করে দিলেন। হযরত মুসা আ. পুনরায় খিযির আ.-কে প্রশ্ন করে বসলেন। তিনি বললেন, 'আমরা মুসাফিররূপে এই জনপদে আগমন করেছি। কিন্তু তার অধিবাসীরা আমাদের আতিথেয়তাও করলো এবং রাতযাপনের জন্য একটু জায়গাও দিলো না। আপনি এটা কী করলেন—এই জনপদেরই একজন বাসিন্দার পতনোন্মুখ দেয়ালটিকে সোজা করে দিলেন, অথচ কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেন না? যদি দেয়ালটি সোজা করে দিতেই হতো, তবে আমাদের ক্ষুধা ও পিপাসা নিবারণের জন্য কিছু পারিশ্রমিকই ধার্য করে নিতে পারতেন।' হযরত খিযির আ. বললেন, هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ 'এখন আপনার ও আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদের সময় এসে গেছে।'
এরপর তিনি হযরত মুসা আ.-কে এই তিনটি বিষয়ের গূঢ়রহস্য বুঝিয়ে দেয়ার জন্য বললেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এগুলো এমন বিষয় ছিলো, যা দেখে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন নি।'
এই ঘটনা বর্ণনা করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমার মন চাচ্ছিলো যে, যদি হযরত মুসা আ. আরো কিছু সময় ধৈর্য ধারণ করতেন, তাহলে আমরা আল্লাহর সৃষ্টিরহস্যের আরো কিছু গূঢ়রহস্য জানতে পারতাম।'
হযরত মুসা আ. ও হযরত খিযির আ.-এর মধ্যে বিচ্ছেদের অবস্থা ঘটে গেলে হযরত খিযির আ. ওই ঘটনাগুলোর গূঢ়তত্ত্ব বর্ণনা করলেন। কুরআন মাজিদ এই ঘটনাকে বর্ণনা করে গূঢ়তত্ত্বগুলো প্রকাশ করেছে এভাবে-
قَالَ هَذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ سَأُنَبِّئُكَ بِتَأْوِيلِ مَا لَمْ تَسْتَطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا () أَمَّا السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُمْ مَلِكَ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا )) وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَنْ يُرْهَقَهُمَا طُغْيَانًا وَكُفْرًا )) فَأَرَدْنَا أَنْ يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِنْهُ زَكَاةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا ) وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَيْرٌ لَهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا فَأَرَادَ رَبُّكَ أَنْ يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنْزَهُمَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا (سورة الكهف)
'সে (মুসা আ.-এর সঙ্গী খিযির) বললো, "এখানেই আপনার এবং আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হলো; যে-বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন নি আমি তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছি। নৌকাটির ব্যাপার-তা ছিলো কয়েকজন দরিদ্র লোকের, তারা সাগরে জীবিকা অন্বেষণ করতো; আমি ইচ্ছা করলাম নৌকাটি ত্রুটিযুক্ত করতে; কারণ তাদের সামনে ছিলো এক রাজা, যে বল প্রয়োগ করে সব (ভালো) নৌকা ছিনিয়ে নিতো। (খুঁতযুক্ত মনে করে বাদশাহ নৌকাটিকে ছেড়ে দেবে।) আর কিশোরটি, তার পিতা-মাতা ছিলো মুমিন। আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বিদ্রোহাচরণ ও কুফরির মাধ্যমে তাদেরকে বিব্রত করবে (কষ্ট ও যন্ত্রণা দেবে)। তারপর আমি চাইলাম যে, (আমি এই শিশুটিকে হত্যা করে ফেলি এবং) তাদের প্রতিপালক যেনো তাদেরকে তার পরিবর্তে এক সন্তান দান করেন, যে হবে পবিত্রতায় মহত্তর ও ভক্তি-ভালোবাসায় ঘনিষ্ঠতর। আর ওই প্রাচীরটি, তা ছিলো নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, এর নিচে আছে তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিলো সৎকর্ম পরায়ণ। সুতরাং আপনার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন যে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হোক এবং তারা তাদের ধনভাণ্ডার উদ্ধার করুক। আমি নিজ থেকে কিছু করি নি। (বরং আল্লাহ তাআলার নির্দেশে করেছি।) আপনি যে-বিষয়ে ধৈর্য ধারণে অপারগ হয়েছিলেন, এই হলো তার ব্যাখ্যা।" [সুরা কাহফ: আয়াত ৭৮-৮২)
কুরআন মাজিদ এই ঘটনার শুরুতে হযরত খিযির আ.-এর ইলম সম্পর্কে বলেছে, وَعَلَمْنَاهُ مِنْ لَدُنَا عِلْمًا 'আর আমি নিজের পক্ষ থেকে তাকে এক ইলম শিখিয়েছি।' আর ঘটনাগুলোর শেষে হযরত খিযির আ.-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে : وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي 'আমি এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো আমার নিজের পক্ষ থেকে করি নি।'
এই দুটি বাক্য থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা খিযির আ.-কে কোনো কোনো বস্তুর গূঢ়তত্ত্বের জ্ঞান দান করেছিলেন। এই জ্ঞান ছিলো সৃষ্টিরহস্য এবং তার অভ্যন্তরীণ (বাতেনি) গূঢ়তত্ত্ব-সংক্রান্ত। আর এগুলো ছিলো এমন বিষয়ের প্রকাশ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা সত্যপন্থীদের জন্য এ-কথাটি পরিষ্কার করে দিলেন যে, যদি বিশ্বজগতের যাবতীয় গূঢ়তত্ত্ব থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়ে উন্মোচিত করে দেয়া হয়- যেমন হযরত খিযির আ.-এর জন্য কোনো কোনো বিষয়ের গূঢ়তত্ত্ব উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিলো-তাহলে দুনিয়ার সমস্ত বিধানই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আর আমল ও দায়দায়িত্বের পরীক্ষার সমস্ত জগতই উল্টে-পাল্টে যাবে। কিন্তু দুনিয়া আমলের পরীক্ষাকেন্দ্র। সুতরাং, সৃষ্টিতত্ত্বের গূঢ় রহস্যসমূহ পর্দাবৃত থাকাই আবশ্যক। যেনো হক ও বাতিলের পরিচয়ের জন্য আল্লাহ তাআলা যে-পাল্লা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা অনবরত নিজের কাজ সমাধা করতে পারে।
টিকাঃ
১৩৮ অর্থাৎ, আমি আল্লাহর কাছ থেকে জানতে পারলাম।