📄 মুজেযা ও سحر (জাদু)-র মধ্যে পার্থক্য
ইসলামের আলেমগণের মধ্যে আবহমান কাল থেকে এ-বিষয়টি একটি মতামতের যুদ্ধক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে চলে আসছে যে, জাদু এবং মুজেযার মধ্যে পার্থক্য কী। একজন লোক কেমন করে স্থির করবে যে, এটা নবী ও রাসুলের মুজেযা না-কি জাদুকরের জাদু। এ-প্রসঙ্গে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইলমি দলিল ও প্রমাণসমূহ উদ্ধৃত করা হয়েছে তা জানার জন্য আকায়িদ শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ পাঠ করা আবশ্যক। বিশেষ করে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ.-এর كتاب النبوات (কিতাবুন নবুওয়াত) এবং শায়খ মুহাম্মদ সাফারিনি রহ.-এর شرح عقيدة سفاريني (শারহু আকিদা সাফারিনি)-এর পাঠ প্রণিধানযোগ্য। অবশ্য এখানে একটি সহজবোধ্য প্রমাণ পেশ করে দেয়া সঙ্গত মনে হচ্ছে।
নবী ও রাসুলগণের প্রকৃত মুজেযা তাঁদের সেই শিক্ষা, যা সত্যপথ থেকে ভ্রষ্ট মানুষ এবং বিপথগামী সম্প্রদায়গুলোর হেদায়েতের জন্য অত্যন্ত হিতকর এবং যা নবী-রাসুলগণ ধর্মীয় ও পার্থিব কল্যাণ ও সফলতা লাভের জন্য অনুপম বিধান আকারে পেশ করে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব। কিন্তু যেভাবে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ আল্লাহর নবীর উপস্থাপিত জ্ঞান ও হেকমত এবং তাঁর বর্ণিত হেদায়েত ও নসিহতের সত্যতা ও পূর্ণতাকে যাচাই করে থাকেন, তেমনি দুনিয়ার সাধারণ মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতিও এ-বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, তারা সত্যতা ও সততা পরখ করার জন্যও এমন কিছু বিষয়ের আকাঙ্ক্ষী হয়, যা সত্য আনয়নকারীর আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং যার মোকাবিলা করতে দুনিয়ার যাবতীয় শক্তি অক্ষম হয়ে যায়। কেননা, সাধারণ মানুষের জ্ঞান সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য একেই মাপকাঠি সাব্যস্ত করে।
অতএব, আল্লাহ তাআলার এই নিয়ম প্রচলিত আছে যে, তিনি নবী ও রাসুলগণকে সত্য ধর্মের শিক্ষা ও পয়গাম প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে একটি বা একাধিক নিদর্শনও দান করে থাকেন। আর নবী-রাসুলগণ যখন নবুওতের দাবির সঙ্গে সঙ্গে কোনো কারণ ও উপকরণ ছাড়াই এমন কোনো নিদর্শন প্রকাশ করেন, দুনিয়ার কোনো শক্তিই যার মোকাবিলা করতে পারে না, তখন তার নাম হয় মুজেযা।
আর এই একই এটাও আল্লাহ তাআলার নিয়ম যে, কোনো নবী ও রাসুলকে যে-মুজেযা প্রদান করা হয়, তা ওই জাতীয়ই হয়ে থাকে, যে-বিষয়ে সেই কওমের যাদেরকে নবী ও রাসুল প্রথম সম্বোধন করে হেদায়েতের বাণী শুনিয়েছেন তাদের পূর্ণ অভিজ্ঞতা থাকে এবং সে-বিষয়ের যাবতীয় সূক্ষ্ম তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত থাকে। তাদের জন্য এটা হৃদয়ঙ্গম করতে সহজ হয় যে, নবী ও রাসুলের এই মুজেযা মানবিক শক্তির চেয়ে অনেক উচ্চতর শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদি একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, তবে তারা তা বিনা দ্বিধায় স্বীকার করে নেয় যে-
این سعادت بزور بازو نیست تا نه بخشه خدا نے بخشنده
"এই সৌভাগ্য বাহুবলে অর্জিত হবে না, যে-পর্যন্ত না মহান দাতা আল্লাহ তাআলা দান করেন।"
এভাবে প্রতিটি মানুষের ওপর আল্লাহ তাআলার প্রমাণ পূর্ণ হয়ে যায়। অতএব, মুজেযা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলারই কর্ম, যা একজন সত্য নবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য কোনো কারণ ও উপকরণ ব্যতীত অস্তিত্ব লাভ করে থাকে। তার ভিত্তি কোনো নিয়ম-কানুনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। একটি বিদ্যা বা কৌশলের মতো তা শিখে নেয়া যেতে পারে না। নবী-রাসুলও তা সবসময় করে দেখাতে সক্ষম হন না, যতক্ষণ না সত্যের বিরোধীদের সামনে চ্যালেঞ্জস্বরূপ তা প্রদর্শন করার প্রয়োজন হয়। সুতরাং, যখন সেই গুরুত্বপূর্ণ সময় এসে পড়ে এবং নবী ও রাসুল আল্লাহপাকের প্রতি রুজু হন, তখন আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে তা করে দেখানোর জন্য শক্তি প্রদান করা হয়। পক্ষান্তরে সেহর (জাদু) তার বিপরীত। তা একটি বিদ্যা ও কলা-কৌশলমাত্র। প্রতিটি দক্ষ জাদুকর নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে জাদুকে সবসময়ই কাজে লাগাতে পারে। এর কারণ ও উপকরণ যদিও সাধারণ দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়, কিন্তু এ-ব্যাপারে সব অভিজ্ঞ লোক তা অবগত থাকে। এ-কারণেই জাদু অন্যান্য বিদ্যা ও শাস্ত্রের মতো একটি সংকলিত ও সুবিন্যস্ত বিষয়। মিসরীয়, চৈনিক ও ভারতীয়রা জাদুকে উৎকর্ষমণ্ডিত ও চালু করেছে এবং এটিকে পূর্ণতার সীমায় পৌঁছে দিয়েছে।
এই হলো বিষয়টি ইলমি ও জ্ঞানগত দিক, যার দ্বারা মুজেযা ও জাদুর সীমারেখা সম্পূর্ণরূপে পৃথক ও আলাদা হয়ে যায়। বাকি থাকলো অনুভূতি ও চাক্ষুষ দর্শনের ব্যাপারটি। এ-ক্ষেত্রে মুজেযা ও জাদুর মধ্যে পার্থক্য এই যে, জাদুকরের সাধারণ জীবন ভয়-ভীতি, কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদান এবং অসৎ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এ-কারণে মানুষ জাদুকরকে ভয় করে। জাদুকরের সামনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে নবী ও রাসুলের গোটা জীবনটাই সত্যতা ও সততা, আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবজাতির প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা, খোদাভীতি ও পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে এবং তাঁদের চরিত্র পবিত্র, নিষ্কলুষ, পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল হয়ে থাকে। তিনি মুজেযাকে পেশা বানিয়ে নেন না; বরং গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সততা ও সত্যের সংরক্ষণে তা প্রদর্শন করে থাকেন।
আর তিনি এমন সময় মুজেযা প্রদর্শন করে থাকেন, যখন তাঁর শত্রুরাও তাঁর পবিত্রতা, সততা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার স্বীকৃতি আগে থেকেই দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা সত্যের দাওয়াত ও তাবলিগকে হয়তো সন্দেহের চোখে দেখে অথবা অবিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। এরপর তারা নবীর মুজেযা দাবি করে। তা ছাড়া কখনো যদি মুজেযা ও জাদুর প্রতিযোগিতা এসে পড়ে, তখন মুজেযাই জয়ী হয় এবং উচ্চ থেকে উচ্চস্তরের জাদুও পরজিত ও অক্ষম হয়ে পড়ে; কিন্তু এর বিপরীত ঘটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। যেমন: জাদুকর ও আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রতিযোগিতার ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে।
মোটকথা, হযরত মুসা আ.-কে লাঠি ও শুভ্রোজ্জ্বল হাতের মুজেযা দান করা হয়েছিলো এইজন্য যে, তাঁর যুগে মিসর ছিলো জাদুর কেন্দ্রস্থল, আর যাদুবিদ্যাও ছিলো তার পূর্ণ যৌবনে। আর মিসরীয়রা একে গোটা পৃথিবীর মোকাবিলায় পূর্ণতার উচ্চস্তরে পৌঁছে দিয়েছিলো।
অতএব, আল্লাহ তাআলার চিরকালীন নিয়মের চাহিদা মোতাবেক হযরত মুসা আ.-কে এমন মুজেযা প্রদান করা হয়েছিলো, যা তারই জাতীয় কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। যেনো তাদের অবিশ্বাসের ওপর হঠকারিতা সীমা অতিক্রম করলে এবং শত্রু ও বিপক্ষ দল তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপকারী জাদু দ্বারা তাঁর সঙ্গে মোকাবিলা করতে অগ্রসর হলে আল্লাহ তাআলার মুজেযা ও নিদর্শন বিপক্ষ ও বিরোধী দলকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, মুসার কাছে যে-শক্তি রয়েছে তা মানুষের কলাকৌশল ও বিস্ময়কর কার্যাবলির চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে এবং মানবিক ক্ষমতার বাইরে।
এভাবে সাধারণ ও বিশিষ্ট সর্বস্তরের মানুষের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, এগুলো সত্য মুজেযা এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সংঘটিত। তাদের মুখ তা স্বীকার করুক বা না করুক, জনসমাবেশে তাদের অক্ষমতা ও অপারগতা তাদের অন্তরসমূহের স্বীকৃতির সাক্ষ বহন করে।
টিকাঃ
⁶⁵ ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, শিহাবুদ্দিন আবুল ফযল আহমদ বিন আলি বিন হাজার আল-আসকালানি রহ., দশম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৩।