📄 মুসা আ.-এর শ্বশুর কে?
কুরআন মাজিদ হযরত মুসা আ. এবং মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধ ব্যক্তি সম্পর্কে যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছে, তার মধ্যে কোনো এক স্থানের বৃদ্ধের নাম উল্লেখ করা হয় নি। এ-কারণে ঐতিহাসিক বিবেচনায় মাদয়ানের বৃদ্ধের নাম সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তা ও মুফাস্স্সিরগণের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বক্তব্য পাওয়া যায়। নিম্নে সেগুলো আলোচিত হলো:
১। মুফাস্সিরগণ, জীবনচরিত লেখকগণ, আরবের সাহিত্যিকগণের বিরাট একটি অংশ ধারণা করেন যে, ইনি হযরত শুআইব আ.। এই মতটি খুবই প্রসিদ্ধ এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বিখ্যাত মুফাস্সির ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি রহ. হাসান বসরি রহ. থেকে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, "লোকে বলে, মুসা আ.-এর শ্বশুর হযরত শুআইব আ."²³
হাফেয ইমাদুদ্দিন বিন কাসির রহ. বলেন, হাসান বসরি রহ.-এর ঝোঁক এ-দিকেই যে, মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধ ছিলেন হযরত শুআইব আ.। ইবনে কাসির আরও বলেন, ইবনে আবি হাতিম পূর্ণ সনদ উল্লেখ করার সঙ্গে মালিক বিন আনাস রহ. থেকে রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, তাঁর কাছে এ-বিষয়টি পৌছেছে, "হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুর ছিলেন হযরত শুআইব আ.। "²⁴
২। উলামাগণের এক অংশ বলেন, কুরআনে উল্লিখিত বৃদ্ধের নাম 'ইয়াসরুন' এবং ইনি ছিলেন হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা। ইমাম আবু জাফর আত-তাবারি সনদের সঙ্গে একটি রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ রা. বলতেন, যে-বৃদ্ধ হযরত মুসা আ.-কে শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা 'ইয়াসরুন'। ²⁵
৩। আবার কেউ কেউ বলেন, হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুরের নাম ছিলো ইয়াসরি। ইমাম তাবারি রহ. হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে সনদসহ রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, মুসা আ.-কে শ্রমিক নিযুক্তকারী মাদয়ানের বুযুর্গ বৃদ্ধের নাম ছিলো ইয়াসরি। আর এই রেওয়াতেরই অন্য শব্দগুলো এই, "স্ত্রীলোকটির পিতার নাম ছিলো ইয়াসরি।" কিন্তু 'ইয়াসরি'-যুক্ত রেওয়ায়েতটিতে এ-কথা বলা হয় নি যে তিনি হযরত শুআইব আ.-এর ভাতিজা ছিলেন। ²⁶ আর তাওরাতে এ-রেওয়ায়েতে বর্ণিত নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম, 'ইয়াসরু' বলা হয়েছে।'
৪। কেউ কেউ বলেন, এই বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-এরই কওমের একজন মুমিন ব্যক্তি ছিলেন। ²⁷
৫। উলামাগণের আর একটি জামাত ধারণা করেন যে, এই বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-ও হতে পারেন না এবং তাঁর ভাতিজাও হতে পারেন না। কেননা, কুরআন মাজিদ থেকে জানা যায় যে, হযরত শুআইব আ.-এর যুগ হযরত মুসা আ.-এর বহু পূর্বের যুগ। উভয় যুগের মধ্যে কয়েকশো বছর ব্যবধান। কুরআন মাজিদ বলে, হযরত শুআইব আ. তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বলেছিলেন—
وَمَا قَوْمُ لُوطٍ مِنْكُمْ بَعِيدٍ (سورة هود) 'আর লুতের সম্প্রদায় (-এর ঘটনা) তোমাদের থেকে দূরে নয়।' (সুরা হুদ : আয়াত ৮৯]
এটা স্পষ্ট বিষয় যে, হযরত লুত আ.-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংস হযরত ইবরাহিম আ.-এর যুগে হয়েছিলো। আর হযরত ইবরাহিম আ. ও হযরত মুসা আ.-এর মধ্যবর্তী সময়সীমা ছিলো চারশো বছরেরও বেশি। আর যাঁরা এই সময়সীমাকে নিকটতম করে দেয়ার জন্য বলেছেন যে, হযরত শুআইব আ.-এর বয়স অসাধারণ রকম দীর্ঘ হয়েছিলো, তাঁদের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। ²⁸
এই বক্তব্যের সমর্থনের জন্য এটিও একটি শক্তিশালী দলিল যে, হযরত মুসা আ.-এর শ্বশুর যদি হযরত শুআইব আ.-ই হতেন তাহলে অবশ্যই কুরআন তাঁর না উল্লেখ করতো। এভাবে অস্পষ্ট রেখে দিতো না। ²⁹
এই বিভিন্ন ধরনের পাঁচটি বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর আমাদের মতে প্রবল ও বিশুদ্ধ অভিমত এটাই মনে হয় যা ইবনে জারির আত-তাবারি ও ইবনে কাসির রহ.-এর মতো উচ্চ মর্যাদাশীল মুহাদ্দিসগণ ও মুফাস্সিরগণ অবলম্বন করেছেন। তাঁরা বলেন, নাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার ব্যাপারে কোনো সহিহ রেওয়ায়েত পাওয়া যায় নি। আর যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করা হয়েছে সেগুলো দলিররূপে পেশ করার যোগ্য নয়। সুতরাং নাম স্পষ্ট না করে যেভাবে কুরআন মাজিদ সেই বৃদ্ধের কথা আলোচনা করেছে, তদ্রূপ আমরাও তার নাম স্পষ্ট উল্লেখ করাকে আল্লাহ তাআলার ইলমের ওপর সোপর্দ করে দিলাম।
তাফসিরে ইবনে কাসির-এর ইবারত নিম্নরূপ—
قال ابو جعفر الطبرى و هذا مما لا يدرك علمه إلا بخير، ولا خبر بذلك تجب حجته، فلا قول في ذلك أولى بالصواب مما قاله الله جل ثناؤه
'আবু জাফর আত-তাবারি বলেছেন, নাম স্পষ্টরূপে উল্লেখ করার বিষয়টি খবর ও সংবাদ পাওয়া ব্যতীত মীমাংসিত হতে পারে না। এ- ব্যাপারে এমন কোনো খবর বা রেওয়ায়েত পাওয়া যায় নি যা তা দলিল হতে পারে। সুতরাং সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো তা-ই যা কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন।¹³⁰ (অর্থাৎ নাম সম্পর্কে নীরব থেকেছেন।) ইবনে জারির আত-তাবারি ইঙ্গিত করেছেন কুরআনের এই বাক্যটির প্রতি-
وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ 'আর আমাদের পিতা একজন অতিশয় বৃদ্ধ।' [সুরা কাসাস: আয়াত ২৩]
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, 'আমার সঙ্গে একজন মর্যাদাবান আলেম এ-বিষয়ে আলোচনা করেছেন যে, হযরত মুসা আ. অতি উচ্চ শ্রেণির নবী ছিলেন। সুতরাং কোনো সাধারণ লোক তাঁকে শ্রমিক নিযুক্ত করার সাহস করতে পারে না। আর মুসা আ. তা মঞ্জুরও করতেন না। তাঁকে শ্রমিক নিযুক্তকারী কেবল নবী ও পয়গাম্বরই হতে পারেন। সুতরাং মাদয়ানের বুযুর্গ দুর্বল বৃদ্ধ হযরত শুআইব আ.-ই হতে পারেন।' আমি তাঁকে আরজ করলাম, 'আপনার এই বক্তব্য যৌক্তিক প্রমাণের মর্যাদা রাখে না এবং কিতাবি প্রমাণের মর্যাদারও অধিকারী নয়। খুব বেশি হলে কেয়াস বা অনুমানের স্তরে স্থান দেয়া যেতে পারে। ত ছাড়া, মুসা আ. তখন নবী ছিলেন না। নবুওতের মর্যাদা তিনি পরে লাভ করেছিলেন। ¹³¹
যাইহোক। এটা একটা মীমাংসিত বিষয় যে, বুযুর্গ বৃদ্ধের নাম স্পষ্ট করে উল্লেখ করার ব্যাপারে প্রমাণের উপযুক্ত কোনে রেওয়ায়েত নেই। ইবনে জারির আত-তাবারি এবং ইবনে কাসির রহ. 'শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করা' প্রসঙ্গে যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন, তার মধ্যে বায্যার ও ইবনে আবি হাতিম রহ.-এর দীর্ঘ রেওয়ায়েতগুলো ব্যতীত কোনো রেওয়ায়েতেই নাম উল্লেখ করা হয় নি। আর এ-দুটি রেওয়ায়েতের অতিরিক্ত শব্দগুলো সম্পর্কে ইবনে কাসির বলেন-
مدار هذا الحديث على عبد الله بن لهيعة المصري وفي حفظه سوء وأخشى أن يكون رفعه خطأ، والله أعلم.
'এই (নামের স্পষ্ট বর্ণনা-সম্পর্কিত) হাদিসটির সত্যতা আবদুল্লাহ বিন লুহাইয়া আল-মিসরির ওপর নির্ভরশীল। তাঁর স্মরণশক্তি ছিলো দুর্বল। আমি তো আশঙ্কা করি যে, এই হাদিসটিকে 'মারফু' বলা ভুল।'³²
আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি বলেন-
ثم قد روي أيضاً نحوه من حديث عتبة بن النذر بزيادة غريبة جداً
'তা ছাড়া উতবা বিন নযরের হাদিস থেকেও অত্যন্ত অপরিচিত (ও নিশ্চিত দুর্বল) অতিরিক্ত শব্দাবলির সঙ্গে অনুরূপ বর্ণনা করা হয়েছে।' (সেই অতিরিক্ত কথাটি হলো নামের স্পষ্টরূপে উল্লেখ-সম্পর্কি।)
টিকাঃ
²³ প্রাগুক্ত, সুরা কাসাস।
²⁴ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁵ جامع البيان عن تأويل أي القرآن, আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি, সুরা কাসাস।
²⁶ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁷ উদ্ধৃত বক্তব্যগুলো থেকে এটাও জানা গেলো যে, সাইয়িদ সুলাইমান সাহেবের এই কথা বলা সঠিক নয় যে, মুসলমান মুফাস্সিরগণ সাধারণভাবে ইয়াসরু, হুবাব এবং শুআইব আ.-কে একই ব্যক্তি মনে করেন।
²⁸ তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮, সুরা কাসাস।
²⁹ প্রাগুক্ত।
¹³⁰ جامع البيان عن تأويل أي القرآن, আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি, সুরা কাসাস।
¹³¹ 'কাসাসুল আম্বিয়া, সাইয়িদ আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার মিসরি, পৃষ্ঠা ২০৪।
³² তাফসিরুল কুরআনির আযিম, ইমাদুদ্দিন বিন কাসির, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭, সুরা কাসাস।
📄 প্রতিশ্রুত মেয়াদ পূর্ণ করা
মোটকথা, হযরত মুসা আ. তাঁর শ্বশুরালয়ে শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করার অর্থাৎ বকরি-ভেড়া চরানোর জন্য অবস্থান করলেন। মুফাস্স্সিরগণ নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোর প্রতি লক্ষ করে বলেন, মুসা আ. পূর্ণ মেয়াদ দশ বছরেই সম্পন্ন করেছিলেন।
কুরআন মাজিদে এ-কথার উল্লেখ নেই যে, মেয়াদ শেষ করার পর কতদিন মুসা আ. শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেছিলেন। অবশ্য মুফাস্সিরগণ এটা বলেন যে, মেয়াদ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই মুসা আ. মিসরের দিকে রওয়ানা করেছিলেন। আর তিনি মিসরে চলে যাওয়ার বছর বকরি ও ভেড়াগুলো যে-পরিমাণ বাচ্চা প্রসব করেছিলো, তাঁর শ্বশুর বাচ্চাই মুসা আ.-এর হাতে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও বকরির পাল নিয়ে মিসরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। ³³ মুফাস্সিরগণ সম্ভবত নিম্নলিখিত আয়াতের প্রতি লক্ষ করেই মেয়াদ শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই যাত্রা করার কথা বলেছেন।
فَلَمَّا قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا 'মুসা যখন তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলো, তখন সে তুর পর্বতের দিকে আগুন দেখতে পেলো।' (সুরা কাসাস: আয়াত ৩০]
এই মনীষীগণ কুরআনে মেয়াদ পূর্ণ করা এবং যাত্রা করার বর্ণনার নৈকট্যের প্রতি লক্ষ করেই অনুমান করে নিয়েছেন যে, মেয়াদ শেষ করার পরেই মুসা আ. মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন। অথত কোনো ইঙ্গিত বা সংকেত পাওয়ার আগ পর্যন্ত واو সংযোজক অব্যয়টি 'পরের' অর্থও বোঝায় না এবং 'পর্যায়ক্রম'-এর অর্থও বোঝায় না।
معالم التريل কিতাবে রয়েছে, হযরত মুসা আ. শ্রমের মেয়াদ পূর্ণ করার পর আরো দশ বছর তাঁর শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেছিলেন। ³⁴ তাওরাতও এ-কথারই সমর্থন করছে যে, মুসা আ. মেয়াদ পূর্ণ করার পরপরই মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যান নি। বরং একবার তিনি গবাদিপশু চরাতে চরাতে পথ ভুলে গিয়ে পবিত্র ওয়াদিতে (উপত্যকায়) পৌঁছলেন এবং আল্লাহ তাআলার আদেশপ্রাপ্ত হলেন যে, বনি ইসরাইলকে ফেরআউনের দাসত্ব থেকে স্বাধীন করো এবং মিসরে গিয়ে তাদেরকে ফেরআউনের উৎপীড়ন থেকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করো, তখন তিনি মিসরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তাওরাতের বাক্যগুলো নিম্নরূপ:
"আর মুসা আ. তাঁর শ্বশুর মাদয়ানের জ্যোতিষী ইয়াসরুর বকরির পাল চরাতেন। তিনি বকরির পালকে চারণভূমির দিকে তাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর পাহাড় হুরাবের কাছে এলেন। তখন আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা একটি ঝোপ থেকে আগুনের শিখার ভেতর থেকে তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, বৃক্ষের একটি ঝাড় বা ঝোপ আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে; কিন্তু পুড়ে যাচ্ছে না।... এখন দেখো, বনি ইসরাইলের আর্তনাদ তোমার কাছে এসে পৌঁছেছে। আর বনি ইসরাইলের ওপর মিসরীয়রা যে-নিপীড়ন চালাচ্ছে তা আমি দেখেছি। সুতরাং তুমি যাও, আমি তোমাকে ফেরআউনের কাছে পাঠাচ্ছি। আমার মানুষ বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে আনো।"³⁶ তখন মুসা আ. ওখান থেকে ফিরে এসে তাঁর শ্বশুরের কাছে গেলেন। শ্বশুরকে বললেন, আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, আমাকে বিদায় দিন, মিসরে আমার ভাইদের কাছে চলে যাই।"³⁷
উত্তম এই যে, প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ তাআলা ইলমের প্রতিই সোপর্দ করা হোক। একমাত্র আল্লাহই প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে অবগত আছেন। তারপরও কুরআন মাজিদে বর্ণনাশৈলী এদিকে ইঙ্গিত করছে যে, সাধারণ তাফসিরের কিতাবসমূহে সুরা তোয়া-হা ও সুরা কাসাসে উল্লেখ করা হয়েছে-
فَلَمَّا قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ 'মুসা যখন তার (শ্বশুরের সঙ্গে প্রতিশ্রুত) মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে যাত্রা করলো।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৩০।
আয়াতটির তাফসিরে বলা হয়েছে যে, মুসা আ.-এর এই যাত্রা করা মিসরের উদ্দেশে ছিলো। খুব সম্ভব এই বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা, মুসা আ. মিসরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছায় রওয়ানা হয়ে থাকতেন তাহলে ওয়াদিয়ে মুকাদ্দাসে (পবিত্র উপত্যকায়) পৌছার পর যখন তাঁকে বলা হলো, "জালিম ফেরআউনের কাছে এবং তাকে বোঝাও" তখন মুসা আ. জবাবে এ-কথা বলতেন না-
قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ (سورة القصص) 'মুসা বললো, "হে আমার প্রতিপালক, আমি তো তাদের (ফেরআউনের সম্প্রদায়ের) একজনকে হত্যা করেছি। ফলে আমি আশঙ্কা করছি (আমি মিসরে গেলে) তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে।"" [সুরা কাসাস: আয়াত ৩৩]
وَلَهُمْ عَلَيَّ ذَنْبٌ فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونَ (سورة الشعراء)
"আমার বিরুদ্ধে তো তাদের (মিসরীয়দের) এক অভিযোগ আছে (যে, আমি তাদের একজনকে হত্যা করেছি), আমি আশঙ্কা তারা আমাকে হত্যা করবে।" [সুরা শুআরা: আয়াত ১৪]
হযরত মুসা আ.-এর এই জবাবটি নিজেই বলছে যে, এই কথোপকথনের সময় হত্যার ঘটনাটির কারণে মুসা আ.-এর মিসরে যাওয়ার সাহস ছিলো না। অবশ্য যখন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দান তাঁকে নবুওত ও রিসালাতের সম্মানে ভূষিত করলো, তখনে মিসরে ফিরে যাওয়ার আদেশপ্রাপ্ত হয়ে মুসা আ. আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরকে নিশ্চিত করে নিয়ে ওখান থেকেই মিসরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আল্লাহপাকের আদেশের সামনে শ্বশুরের কাছে গিয়ে অনুমতি গ্রহণেরও পরোয়া করলেন না।
যাইহোক। হযরত মুসা আ. মাদয়ানে এক দীর্ঘকাল অবস্থান করলেন। এই পুরো সময়ে তিনি তাঁর শ্বশুরের পশুপাল চরালেন। তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, শ্বশুরালয়ে অবস্থানের সময় হযরত মুসা আ.-এর একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলো। তিনি এর নাম রেখেছিলেন 'জিরাসুন'। মাদয়ানি ইবরানি ভাষায় এই শব্দের অর্থ 'ভ্রমণ ও সফর'। মুসা আ. যেনো পুত্রের নামের মধ্যে তাঁর সফরকে স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন। যাতে তাঁর বংশধরদের এ-কথা মনে থাকে যে, ছেলেটির জন্ম হয়েছিলো ভিনদেশে ও সফরের অবস্থায়। তাওরাতের ইবারত নিম্নরূপ:
"আর মুসাকে নিজ কন্যা সাফুরাকে দান করলেন। সাফুরা এক পুত্রসন্তান প্রসব করলেন। তিনি তার নাম রাখলেন জিরাসুন। কারণ, তিনি বললেন, আমি বিদেশে মুসাফির অবস্থায় রয়েছি।"³⁷
টিকাঃ
³³ معالم التريل, আবু মুহাম্মদ হুসাইন বিন মাসউদ আল-বাগাবি রহ., পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৩।
³⁴ প্রাগুক্ত।
³⁶ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩, আয়াত ১-১০।
³⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪, আয়াত ১৮।
📄 ওয়াাদিয়ে মুকাদ্দাস বা পবিত্র উপত্যকা
একদিন হযরত মুসা আ. তাঁর পরিবারবর্গসহ বকরি-ভেড়া চরাতে চরাতে মাদয়ান থেকে অনেক দূরে চলে গেলেন। বকরিচারক গ্রোত্রসমূহের জন্য এটা কোনো বিচিত্র ব্যাপার নয়। তখন ছিলো শীতের রাত। শীতের আধিক্য তাঁকে আগুন অন্বেষণে বাধ্য করলো। সামনে তুরে-সাইনা পর্বতশ্রেণি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। এটা ছিলো সাইনা পর্বতের পূর্ব কোণ। মাদয়ান থেকে একদিনের দূরত্বে লোহিত সাগরের দুটি শাখার মধ্যস্থলে মিসরে যাওয়ার পথের ওপর অবস্থিত। হযরত মুসা আ. চকমক পাথর দিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু অত্যধিক শীতের কারণে তাতে আগুন ধরলো না। সামনে ওয়াদির (ওয়াদিয়ে আইমান) দিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন, একটি আগুনের শিখা আলো ছড়াচ্ছে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তোমরা এখানেই অপেক্ষা করো। আমি আগুন নিয়ে আসছি। আগুন পোহানোর কাজও চলবে আর ওখানে কোনো পথপ্রদর্শকের সাক্ষাৎ পেলে ভুলা-পথের সন্ধানও পাওয়া যাবে।
ঘটনার এই অংশ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
إِذْ رَأَى نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي أَنَسْتُ نَارًا لَعَلِّي آتِيكُمْ مِنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ على النار هدى (سورة طه)
'সে যখন আগুন দেখলো, তখন তার পরিবারবর্গকে বললো, "তোমরা এখানে থাকো, আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবত আমি তোমাদের জন্য তা থেকে কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারবো অথবা আমি আগুনের কাছে কোনো পথনির্দেশ পাবো।"' [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ১০]
টিকাঃ
³⁷ তাওরাত: আত্মপ্রকাশ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২. আয়াত ২১-২২।
³⁸ মুসা আ. স্ত্রীসহ মাদয়ান থেকে মিসর যাচ্ছিলেন। পথে রাত হয়। শীতে তাদের কষ্ট হচ্ছিলো। তখন তিনি আগুন দেখলেন। প্রকৃতপক্ষে তা ছিলো আল্লাহর তাজাল্লি।
📄 নবুওয়ত লাভ
خدا کے فضل کا موسی سے پوچھ نے احوال کہ اگ لینے کو جائیں پیمبری مل جائیں
'আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের অবস্থা মুসাকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি আগুন আনার জন্য গিয়ে নবুওত লাভ করেন।'
হযরত মুসা আ. দেখলেন এ তো এক বিচিত্র রকমের আগুন; গাছের গায়ে আলো দেখা যায়; কিন্তু তা গাছকে পোড়ায় না আবার নিভেও যায় না। এসব ভাবতে ভাবতে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি যতই এগিয়ে যান, আগুন আরও দূরে সরে যায়। এই অবস্থা দেখে মুসা আ.-এর অন্তরে আতঙ্কের ভাব সৃষ্টি হলো। তিনি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। যখনই তিনি পেছনে ফিরে যেতে উদ্যত হলেন তখনই আগুন কাছে এসে পড়লো। আগুন কাছে এলে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন-
يَا مُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ (سورة القصص)
"হে মুসা, আমি আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক।"
فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ يَا مُوسَى إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى () وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى (سورة طه)
'এরপর যখন সে আগুনের কাছে এলো, তখন আহ্বান করে বলা হলো, “হে মুসা আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তোমার পাদুকা খুলে ফেলো, কারণ তুমি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় রয়েছো। এবং আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। সুতরাং যা ওহি প্রেরণ করা হচ্ছে তুমি তা মনোযোগের সঙ্গে শোনো।"” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ১১-১৩]
কুরআন মাজিদের পূর্ববর্তী আয়াত এবং এই আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ করে তাফসিরের কিতাবসমূহে দুটি বিষয় আলোচনাধীন এসেছে: এক.
হযরত মুসা আ. যে-বস্তুটিকে আগুন মনে করেছিলেন তা আগুন ছিলো না। বরং তা ছিলো আল্লাহ তাআলার তাজাল্লির নুর। কিন্তু এই নুরের পর্দার অন্তরাল থেকে যে-আওয়াজ শুনা গিয়েছিলো তা ছিলো ফেরেশতার আওয়াজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসা আ.-কে (সরাসরি) কথোপকথনের মর্যাদা দান করেছিলেন। অথবা তা আল্লাহ তাআলারই সম্বোধন ছিলো। কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন, এটা ফেরেশতার আওয়াজ ছিলো। এর মাধ্যমে মুসা আ. আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। এটা আল্লাহ তাআলার আওয়াজ ছিলো না। কেননা, তাঁর কথার সুরও নেই, স্বরও নেই।
আর তত্ত্বজ্ঞানীদের মতে, এটা সরাসরি আল্লাহ তাআলারই সম্বোধন ছিলো। মুসা আ. এই আওয়াজকে অন্যকিছুর মাধ্যমে শোনেন নি; বরং তিনি তেমনই শুনেছেন যেমন আল্লাহর নবীগণ আল্লাহর ওহি শুনে। থাকেন এবং مِنْ وَرَاءِ حِجَاب 'পর্দার অন্তরাল থেকে' আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করে থাকেন।
দুই. ওয়াদিয়ে মুকাদ্দাসে মুসা আ.-কে জুতা খুলে ফেলার আদেশ করা হয়েছিলো। অথচ সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁরা সাহাবিগণ রা. পায়ে জুতাসহ মসজিদে নামায আদায় করতেন। আজ তাঁর উম্মতের জন্যও এটাই ইসলামি বিধান যে, জুতা পবিত্র হলে তা পায়ে রেখেই বিনা দ্বিধায় মসজিদে নামায পড়া যেতে পারে। তবে এখানে মুসা আ.-কে কেনো নির্দেশ দেয়া হলো যে, এটা পবিত্র উপত্যকা, সুতরাং তোমারা জুতা খুলে ফেলো। এই জিজ্ঞাসার জবাব সহিহ হাদিসে রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কারণ বিশ্লেষণ করে বলেছেন-
قَالَ : يَوْمَ كَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى كَانَتْ عَلَيْهِ جُبَّةٌ صُوفَ ، وَكِسَاءُ صُوفَ ، وَسَرَاوِيلُ صُوف، وَكُمَّةٌ صُوفَ ، وَنَعَالٌ مِنْ جَلْدِ حِمَارِ غَيْرِ ذَكِيَّ.
'হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, "আল্লাহ তাআলা যেদিন মুসা আ.-এর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেদিন তাঁর পরনে ছিলো পশমি জুব্বা, পশমি চাদর, পশমি পায়জামা এবং পশমি টুপি। তাঁর জুতাজোড়া ছিলো মৃত গাধার দাবাগতহীন চামড়ার তৈরি।"'³⁹
যাইহোক। এখন হযরত মুসা আ. আল্লাহ তাআলার নবী এবং সম্মানিত রাসুল। আল্লাহপাক তাঁকে নবীগণের সত্য দীনের দীক্ষা এবং ফেরআউনের দাসত্ব বনি ইসরাইলকে মুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ খেদমতের জন্য মনোনীত করেছেন। এখন তিনি পবিত্র উপত্যকায় আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করছেন। যে-মুসা আ. মাদয়ানের রাস্তা থেকে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন সেই মুসা আ.-কে মিসরের মতো সভ্যতা ও সংস্কৃতির দেশে ফেরআউনের মতো অহঙ্কারী বাদশাহকে দীনের পথপ্রদর্শনের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আর যিনি গতকাল পর্যন্তও উট ও বকরির পালের রাখালগিরি করছিলেন, আজ তাঁকে মানুষের নেতৃত্ব প্রদানের দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। আর যে-জীবনের মূলধন গতকাল বকরি-ভেড়ার রাখালগিরি থেকে শুরু হয়েছিলো, তা আজ পবিত্র উপত্যকায় আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক মানবজাতির রাখালগিরিতে উন্নীত পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। আর গতকালের বকরিপালের রাখাল আজ পৃথিবীর পরিচালক হচ্ছেন। এটাই আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরতের অপার মহিমা যা মুখে অস্বীকারকারীদের অন্তরেও স্বীকৃতির কাঁটা বিঁধিয়ে দেয়। কোথায় যাযাবর রাখাল আর কোথায় সভ্য ও শহুরে রাজত্বের জন্য আল্লাহ তাআলার সত্যের পয়গামবাহী।
হযরত মুসা আ. যখন আল্লাহ তাআলার এই আওয়াজ শুনলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, আর তাঁর ভাগ্যে এমন এক মহামূল্যবান সম্পদ জুটে গেছে যা মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং আল্লাহপাকের দানের চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন, তখন তিনি যারপরনেই আনন্দিত ও পুলকিত হয়ে উঠলেন। আশেকের মতো আত্মবিমোহিত হয়ে অস্থির অবস্থায় মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুনরায় কথোপকথন শুরু হলো এবং মুসা আ.-কে জিজ্ঞেস করা হলো-
مَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَى (سورة طه)
"হে মুসা, তোমার ডান হাতে ওটা কী?" [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ১৭]
ব্যস্, আর কী! প্রকৃত মাহবুব ও প্রেমাস্পদের প্রশ্ন সত্যিকারের আশেক ও প্রেমিককে! আল্লাহু আকবার! এত বড় সৌভাগ্য! লুটিয়ে পড়ার ক্ষেত্র। ইশকের মোহে আত্মবিমোহিত, এটাও মনে থাকলো না যে, প্রশ্নের পাল্লা দিয়েই উত্তরকে ওজন করে নিতে হয় এবং যা-কিছু জিজ্ঞেস করা হয় কেবল তারই জবাব দিতে হয়। তিনি জবাব দিলেন-
قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَى غَنَمِي (سورة طه)
"এটা আমার লাঠি; আমি এতে ভর দিই এবং এর দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষপালের জন্য বৃক্ষপত্র ফেলে থাকি।" (সুরা তোয়া-হা: আয়াত ১৮]
জবাবে শুধু 'লাঠি' শব্দটুকুই বলা উচিত ছিলো। কিন্তু ভালোবাসার আবেগ ও মুহাব্বতের ইশককে কেমন করে থামিয়ে রাখতে পারেন, যিনি মাহবুব ও প্রেমাস্পদের সঙ্গে কথোপকথনের সৌভাগ্যকে দীর্ঘতর করে দক্ষ প্রাণ শীতল করার উপকরণ সংগ্রহ করতে আকাঙ্ক্ষী? বললেন, এটা আমার লাঠি। তারপর আবার লাঠির উপকারিতা বর্ণনা করতে শুরু করলেন। কিন্তু হঠাৎ ভালোবাসার আবেগের স্থলে প্রকৃত মাহবুবের আদব রক্ষার চিন্তা মনের ভেতর চিঁটি কেটে ওঠে। নিজেকে নিজেই বলেন, মূসা, খবরদার, কোন্ দরবারে দাঁড়িয়ে আছো, পাছে তোমার বর্ণনার দীর্ঘসূত্রতা ধৃষ্টতা ও বেয়াদবির মধ্যে গণ্য না হয়।' মূসা আ. এসব ভেবে তৎক্ষণাৎ কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে আরজ করলেন—
وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ
“এবং তা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।” [সুরা তোয়া-হা: আয়াত ১৮]
হে প্রতিপালক, হৃদয়ের আবেগ ও প্রাণের অস্থিরতা তো এটাই চায় যে, আরো অনেক কিছু বলতে থাকি এবং এই অসীম আনন্দ ও স্বাদ অনুভব করতে থাকি; কিন্তু আদব রক্ষার চিন্তা আমাকে বিরত রাখছে। সূক্ষ্মদর্শী চোখে নির্দেশ দিচ্ছে যেনো আমি নীরবতা অবলম্বন করি। সুতরাং কথা সংক্ষেপ করছি। অন্যথায় ইশকের কাহিনি তো অফুরন্ত।
কবি বললেন—
عشق کہتاہے جنوں کوش رہناچاہئے ضبط کید ہے خاموش رہناچاہئے قصہ موسیٰ ! سبق ہے ہوش والوں کیل کس طرح عشاق کو خاموش رہناچاہئے
‘ইশক বলে, উন্মাদনার আবেগ থাকা উচিত। সংযমের তাকিদ হলো নীরব থাকা বাঞ্ছনীয়। মূসার কাহিনি একটি শিক্ষণীয় পাঠ জ্ঞানীদের জন্য; অর্থাৎ কীভাবে আশেকদের পক্ষে নীরবতা অবলম্বন করা উচিত।'
টিকাঃ
³⁹ সুনানুত তিরমিযি: হাদিস ১৭৩৪; মুসনাদে আবি ইয়ালা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭: কানযুল উম্মাল: হাদিস ৩২৩৮০। উদ্ধৃত ভাষ্য মুসনাদে আবি ইয়ালা থেকে।