📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 আসহাবে কাহাফ

📄 আসহাবে কাহাফ


وَكَذٰلِكَ اَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوْٓا اَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّاَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيْهَا اِذْ يَتَنَازَعُوْنَ بَيْنَهُمْ اَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوْا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا رَبُّهُمْ اَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوْا عَلٰٓى اَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَّسْجِدًا (২১) سَيَقُوْلُوْنَ ثَلٰثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُوْلُوْنَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُوْلُوْنَ سَبْعَةٌ وَّثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ قُلْ رَّبِّيْ اَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ مَّا يَعْلَمُهُمْ اِلَّا قَلِيْلٌ فَلَا تُمَارِ فِيْهِمْ اِلَّا مِرَآءً ظَاهِرًا وَّلَا تَسْتَفْتِ فِيْهِمْ مِّنْهُمْ اَحَدًا (২২) وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَيْءٍ اِنِّيْ فَاعِلٌ ذٰلِكَ غَدًا (২৩) اِلَّآ اَنْ يَّشَآءَ اللّٰهُ وَاذْكُرْ رَّبَّكَ اِذَا نَسِيْتَ وَقُلْ عَسٰٓى اَنْ يَّهْدِيَنِ رَبِّيْ لِاَقْرَبَ مِنْ هٰذَا رَشَدًا (২৪) وَلَبِثُوْا فِيْ كَهْفِهِمْ ثَلٰثَ مِائَةٍ سِنِيْنَ وَازْدَادُوْا تِسْعًا (২৫) قُلِ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوْا لَهٗ غَيْبُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ اَبْصِرْ بِهٖ وَاَسْمِعْ مَا لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ مِنْ وَّلِيٍّ وَّلَا يُشْرِكُ فِيْ حُكْمِهٖ اَحَدًا

তুমি কি মনে কর, গুহা ও রাকীম (পর্বত বা ফলক)-এর অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলেছিল: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন। এরপর আমি তাঁদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। পরে আমি ওদেরকে জাগ্রত করলাম জানার জন্যে, দু দলের মধ্যে কোনটি ওদের অবস্থান কাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে? আমি তোমার নিকট ওদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। ওরা ছিল কয়েকজন যুবক। ওরা ওদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি ওদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম আমি ওদের চিত্ত দৃঢ় করে দিলাম। ওরা যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বলল, আমাদের প্রতিপালক আকাশরাজি ও পৃথিবীর প্রতিপালক। আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনো ইলাহকে আহ্বান করব না। যদি করে বসি, তবে তা হবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। আমাদেরই এ স্বজাতিরা তাঁর পরিবর্তে অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে। তারা এ সকল ইলাহ সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক জালেম আর কে?

তোমরা যখন বিচ্ছিন্ন হলে ওদের থেকে এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করে তাঁদের থেকে তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন। তুমি দেখতে পেতে— ওরা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত, সূর্য উদয়কাল ওদের গুহার দক্ষিণ পার্শ্বে হেলে যায় এবং অস্তকালে ওদেরকে অতিক্রম করে বামপার্শ্ব দিয়ে। এ সমস্ত আল্লাহর নিদর্শন আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনই তার কোনো পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না। তুমি মনে করতে ওরা জাগ্রত, কিন্তু ওরা ছিল নিদ্রিত। আমি তাঁদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বামে এবং ওদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটো গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। তাকিয়ে ওদেরকে দেখলে তুমি পিছনে ফিরে পলায়ন করতে ও ওদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে। এবং এভাবেই আমি ওদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে ওরা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওদের একজন বলল, তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? কেউ কেউ বলল, একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ। কেউ কেউ বলল, তোমরা কতদিন অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন।

এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এ মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর! সে যেন দেখে কোন খাদ্য উত্তম এবং তা হতে যেন কিছু তোমাদের জন্যে নিয়ে আসে। সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে এবং কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকেই কিছু জানতে না দেয়। ওরা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে, তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে ওদের ধর্মে ফিরিয়ে নিবে এবং সে ক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না। এবং এভাবে আমি মানুষকে তাঁদের বিষয় জানিয়ে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয়, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতের কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা তাঁদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিল, তখন অনেকে বলল, ওদের ওপর সৌধ নির্মাণ কর। ওদের প্রতিপালক ওদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাঁদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল— আমরা তো নিশ্চয়ই ওদের পার্শ্বে মসজিদ নির্মাণ করব। কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল তিনজন, ওদের চতুর্থটি ছিল ওদের কুকুর। কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল পাঁচজন, ওদের ষষ্ঠটি ছিল ওদের কুকুর। অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল সাত জন, ওদের অষ্টমটি ছিল ওদের কুকুর। বল, আমার প্রতিপালকই ওদের সংখ্যা ভালো জানেন; ওদের সংখ্যা অল্প কজনই জানে। সাধারণ আলোচনা ব্যতীত আপনি ওদের বিষয়ে বিতর্ক করবে না এবং ওদের কাউকে ওদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। কখনই তুমি কোনো বিষয়ে বলবে না, 'আমি এটি আগামীকাল করব। আল্লাহ ইচ্ছা করলে' কথাটি না বলে। যদি ভুলে যাও, তবে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করবে এবং বলবে, সম্ভবত আমার প্রতিপালক আমাকে ওটি অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথনির্দেশ করবেন। ওরা ওদের গুহায় ছিল তিন শ' বছর আরো নয় বছর। তুমি বল, তারা কতকাল ছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন, আকাশরাজি ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা! তিনি ব্যতীত ওদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে তাঁর কর্তৃত্বে শরিক করেন না। (সূরা কাহাফ: ৯-২৬)

আসহাবে কাহাফ ও যুলকারনাইন সম্পর্কে আয়াত নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকসহ অন্যান্য সীরাত রচয়িতাগণ তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কুরায়েশরা মদিনার ইহুদিদের নিকট একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ইহুদিরা যেন তাঁদেরকে কিছু প্রশ্ন শিখিয়ে দেয়। এরপর কুরাইশরা সেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করবে এবং এর দ্বারা তারা তাঁকে পরীক্ষা করবে। ইহুদিরা বলেছিল, তোমরা তাঁকে এমন এক সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, যারা অতীতেই বিলীন হয়ে গেছে। যার ফলে তাঁদের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে জানা যায় না। আর প্রশ্ন করবে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী একজন লোক সম্পর্কে এবং রূহ সম্পর্কে। এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন : (অয়া ইয়াস আলু নাকা আনির রূহ) তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে! অন্যত্র আছে (অয়া ইয়াসআলুনাকা আন যিল ক্বরনাইন) তারা আপনাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে! আর এখানে বললেন: "তুমি কি মনে কর, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?" অর্থাৎ, আমি আপনাকে যেসব অভূতপূর্ব আশ্চর্যজনক বিষয়াদি, উজ্জ্বল নিদর্শনাদি ও বিস্ময়কর ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করেছি, সে সবের তুলনায় গুহা ও রাকীমের অধিবাসীদের সংবাদ ও ঘটনা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়।

'কাহফ' অর্থ, পর্বত গুহা। শুআইব যুবাঈ বলেন, গুহাটির নাম হায়যুম। রাকীম শব্দ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাকীম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, তা আমার জানা নেই। কেউ কেউ বলেন: রাকীম অর্থ লিখিত ফলক, যাতে সেখানে আশ্রয় গ্রহণকারীদের নাম এবং তাঁদের ঘটনাবলী লিখিত রয়েছে। পরবর্তী যুগের লোকজন এটি লিখে রেখেছিল। ইবনে জারীর ও অন্যান্যগণ এ অভিমত করেন। কেউ কেউ বলেন: রাকীম হল সেই পর্বতের নাম, যে পর্বতের গুহায় তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস রাযি. ও শুআইব যুবাঈ বলেন, ওই পর্বতের নাম বিনাজলুস। কারো কারো মতে রাকীম হচ্ছে ওই গুহার পাশে অবস্থিত একটি উপত্যকার নাম। অপর কারো কারো মতে এটি সে এলাকার একটি জনপদের নাম।

শুআইব যুবাঈ বলেন, তাঁদের কুকুরের নাম হামরান। কোনো কোনো তাফসিরকারক বলেছেন, তাঁরা ছিলেন হযরত ঈসা আ.-এর পরবর্তী যুগের লোক এবং তারা খৃস্টান ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে ইহুদিদের গুরুত্ব আরোপ এবং তাঁদের সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের আগ্রহ দ্বারা প্রমাণিত হয়, তারা হযরত ঈসা আ.-এর পূর্ববর্তী যুগের লোক। আয়াতের বাচনভঙ্গি থেকে প্রতীয়মান হয়, তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকজন ছিল মুশরিক। তারা মূর্তিপূজা করত। বহু তাফসিরকারক ও ইতিহাসবিদ অভিমত প্রকাশ করেছেন, তারা বাদশা দাকরানূমের সময়ের অভিজাত বংশীয় লোক ছিলেন। আবার কারো কারো মতে তারা ছিলেন রাজপুত্র।

ঘটনাক্রমে তারা সম্প্রদায়ের উৎসবের দিনে একত্র হয়। তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানে যে মূর্তিদেরকে সিজদা করছে এবং প্রতিমাগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করছে, তা তারা প্রত্যক্ষ করে। তখন তারা গভীর মনোযোগের সাথে তা পর্যালোচনা করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের অন্তরের উদাসীনতার পর্দা ছিন্ন করে দেন এবং তাঁদের মনে সত্য ও হেদায়েতের উন্মেষ ঘটান। ফলে তারা উপলব্ধি করেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের এসব কাজকর্ম সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যুবকরা তাঁদের ওই ধর্ম পরিত্যাগ করেন এবং এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেন। কেউ কেউ বলেন, যুবকদের প্রত্যেকের মনে আল্লাহ তাআলা তাওহিদ ও হেদায়েতের অনুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। তারপর তারা সকলেই লোকজনের সংসর্গ ত্যাগ করে এক নির্জন এলাকায় এসে উপস্থিত হন। বুখারীতে এ বিষয়ে একটি বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। "রূহগুলো সুবিন্যস্ত বাহিনী স্বরূপ। তাঁদের মধ্যে যেগুলো পূর্ব-পরিচিত, সেগুলো বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আর যারা পরস্পর অপরিচিত তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।" তখন তারা একে অপরের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান বর্ণনা করে। তখন জানা যায়, তারা সবাই নিজ নিজ গোত্র ছেড়ে এসেছে এবং ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আপন দীন রক্ষার্থে পালিয়ে এসেছে। ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও পাপাচারের বিস্তৃতিকালে এভাবে সমাজ ত্যাগ করা শরিয়তসম্মত।

আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে? তোমরা যখন তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাঁদের থেকে" অর্থাৎ দীনের প্রশ্নে তোমরা যখন তাঁদের থেকে পৃথক হয়ে গেলে এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত যেগুলোর উপাসনা করে, সেগুলোকে ত্যাগ করল। কেন না, তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করত। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ বলেছিলেন: "তোমরা যেগুলোর পূজা কর, তাঁদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে শুধু তাঁরই সাথে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আমাকে সৎপথ দেখাবেন।" (সূরা যুখরুফ: ২৬-২৭)

এ যুবকরাও অনুরূপ বলেছিলেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, দীনের প্রশ্নে তোমরা যেমন তোমাদের সম্প্রদায় থেকে পৃথক হয়ে গেছ, দৈহিকভাবেও তোমরা তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, যাতে ওদের অনিষ্ট থেকে তোমরা নিরাপদ থাকতে পার। "তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ কর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন" অর্থাৎ তাঁর রহমতের পর্দা দ্বারা তোমাদেরকে ঢেকে দিবেন। তোমরা তার নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে থাকবে এবং তিনি তোমাদের পরিণাম কল্যাণময় করে দিবেন। যেমন হাদিস শরীফে এসেছে: "হে আল্লাহ। সকল কর্মে আমাদেরকে কল্যাণময় পরিণতি দান করুন এবং দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন।"

এরপর তারা যে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, গুহাটি উত্তরমুখী ছিল। তার পশ্চিম দিকে ঢালু ছিল। কিবলার দিকে ঢালু উত্তরমুখী স্থান অধিক কল্যাণকর স্থানরূপে বিবেচিত হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি দেখতে পেতে, ওরা গুহার চত্বরে অবস্থিত। সূর্য উদয়কালে ওদের গুহার ডান দিকে হেলে যায় এবং অস্তকালে ওদেরকে অতিক্রম করে বাম পার্শ্ব দিয়ে" অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে সূর্য উদিত হওয়ার সময় তাঁদের গুহার পশ্চিম দিকে আলো ছড়ায়, তারপর সূর্য যতই উপরে উঠতে থাকে, ক্রমান্বয়ে ততই ওই আলো গুহা থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এটি হল সূর্যের ডান দিক দিয়ে অতিক্রম। এরপর সূর্য মধ্য আকাশে উত্থিত হয় এবং গুহা থেকে ওই আলো বেরিয়ে যায়। তারপর যখন অস্ত যেতে শুরু করে, তখন পূর্ব পাশ দিয়ে অল্প অল্প করে আলো প্রবেশ করতে থাকে। অবশেষে সূর্য অস্ত যায়। এ ধরনের স্থানে এরূপই দেখা যায়। তাঁদের গুহায় মাঝে মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশের এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে ওই গুহার আবহাওয়া দূষিত না হয়। "ওরা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত"। এ সব আল্লাহর নিদর্শন। তাঁদের পানাহার না করে, খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ না করে শত শত বছর এ অবস্থায় বিদ্যমান থাকাটা আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিদর্শন এবং তাঁর মহাশক্তির প্রমাণ স্বরূপ।

"আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনই তার কোনো পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না। তুমি মনে করতে তারা ঘুমন্ত অথচ তারা জাগ্রত।" এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন: তাঁদের চোখ খোলা ছিল। যাতে সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত বন্ধ থাকার ফলে চক্ষু নষ্ট হয়ে না যায়। "আমি ওদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে, বামে"—এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, বছরে একবার করে তাঁদের পার্শ্ব পরিবর্তন করানো হত। এ পাশ থেকে ও পাশে ফেরানো হত। হতে পারে বছরে একাধিকবারও তা ঘটত। আল্লাহই সম্যক অবগত। "তাঁদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটো গুহার মুখের দিকে প্রসারিত করে।" শুআইব জুবাঈ বলেন, তাঁদের কুকুরের নাম ছিল হামরান। অন্য এক মুফাসসির বলেন: যুবকগণ যখন নিজ নিজ গোত্র থেকে একাকী বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন যে কুকুরটি তাঁদের সাথে এসেছিল সেটি শেষ পর্যন্ত, তাঁদের সাথে থেকে যায়। এটি গুহার মধ্যে প্রবেশ করে নি বরং দুহাত গুহামুখে রেখে গুহার প্রবেশ পথে বসেছিল। এটি ওই কুকুরের অনুপম শিষ্টাচার এবং যুবকদের প্রতি সম্ভ্রমবোধের নিদর্শন। কেন না, সাধারণত যে ঘরে কুকুর থাকে সে ঘরে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। সাহচর্য ও আনুগত্যের স্বভাবতই একটা প্রভাব থাকে। তাই যুবকদের অনুসরণ করতে গিয়ে কুকুরটিও তাঁদের সাথে অমর হয়ে রয়। কেন না, যে যাকে ভালবাসে, সে তার সৌভাগ্যের অংশীদার হয়। একটি কুকুরের ব্যাপারে যখন এমন হল, তখন সম্মানের পাত্র কোনো পুণ্যবানের অনুসরণকারীর ক্ষেত্রে কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বহু ধর্মীয় বক্তা ও তাফসিরকারক উক্ত কুকুর সম্পর্কে অনেক লম্বা-চওড়া কাহিনীর উল্লেখ করেছেন। কুকুরটির নাম ও রং সম্পর্কে তারা বিভিন্ন কথা বলেছেন। এগুলোর অধিকাংশই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে সংগৃহিত এবং এর অধিকাংশ নির্জলা মিথ্যা। এতে কোনো ফায়দাও নেই। গুহাটি কোথায় অবস্থিত, এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের অনেকে বলেন, এটি আয়লা অঞ্চলে অবস্থিত। কেউ বলেন, এটির অবস্থান নিনোভা এলাকায়। কারো মতে কলকা অঞ্চলে আবার কারো মতে রোমকদের এলাকায়। শেষ অভিমতটিই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

আল্লাহ তাআলা তাঁদের ঘটনার অধিক কল্যাণকর অংশটি এমন সাবলীল প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করলেন, যেন শ্রবণকারী তা প্রত্যক্ষ করছে এবং নিজের চোখে তাঁদের গুহার অবস্থা, গুহার মধ্যে তাঁদের অবস্থান, ওদের পার্শ্ব পরিবর্তন এবং তাঁদের গুহা মুখে প্রসারিত করে উপবিষ্ট কুকুর স্বচক্ষে দেখছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি যদি ওদেরকে তাকিয়ে দেখতে, তবে পিছনে ফিরে পালাতে এবং ওদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে"। অর্থাৎ তারা যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে এবং যে গুরুগম্ভীর ও ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য। সম্ভবত এ সম্বোধনটি সকল মানুষের জন্যে, শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে নয়। কারণ, মানুষ সাধারণত ভীতিকর দৃশ্য দেখলে পালিয়ে যায়। এতে বুঝা যায়, শোনা আর দেখা এক কথা নয়। যেমনটি হাদীসেও এর সমর্থন রয়েছে। কারণ, আলোচ্য ঘটনায় গুহাবাসীর ভীতিকর সংবাদ শুনে কেউ পালায় নি বা ভীতও হয় নি। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি তাঁদেরকে জাগ্রত করলেন তাঁদের ৩০৯ বছর নিদ্রামগ্ন থাকার পর। জাগ্রত হওয়ার পর তাঁদের একে অন্যকে বলল: তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? কেউ কেউ বলল, একদিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ। অপর কেউ বলল তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন। যা হোক, তোমাদের একজনকে তোমাদের এ মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর অর্থাৎ তাঁদের সাথে থাকা রৌপ্য মুদ্রার দিকে ইঙ্গিত করে, তা নিয়ে নগরে যেতে বলেছিল।

কথিত আছে, ওই নগরীর নাম ছিল দাফমূম। "সে গিয়ে দেখুক কোন খাদ্য উত্তম" অর্থাৎ কোনটি উৎকৃষ্ট মানের। "এরপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্যে"। অর্থাৎ যা তোমরা খেতে পারবে। এটি ছিল তাঁদের সংযম ও নির্লোভ মনোভাবের পরিচায়ক। সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে নগরে প্রবেশ করার সময়। "কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকে কিছু টের পেতে না দেয়। ওরা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে ওদের ধর্মে ফিরিয়ে নিবে। সেক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।" অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে ওদের বাতিল ধর্ম থেকে উদ্ধার করার পর তোমরা যদি পুনরায় ওদের মধ্যে ফিরে যাও, তবে আর তোমাদের সাফল্য নেই। তারা এ জাতীয় কথাবার্তা এ জন্য বলেছিল, তারা মনে করেছিল তারা একদিন, একদিনের কতকাংশ কিংবা তার চাইতে কিঞ্চিতাধিক সময় নিদ্রামগ্ন ছিল। তারা যে ৩০০ বছরের অধিককাল ধরে নিদ্রামগ্ন ছিল এবং ইতোমধ্যে যে রাষ্ট্রক্ষমতার বহুবার হাত বদল হয়েছে, নগর ও নগরবাসীর পরিবর্তন হয়েছে, তাঁদের প্রজন্মের লোকদেরও মৃত্যু হয়েছে, অন্য প্রজন্ম এসেছে এবং তারাও চলে গিয়েছে, এরপর অন্য আরেক প্রজন্মের আবির্ভাব হয়েছে; তার কিছুই তারা তখনও আঁচ করে উঠতে পারে নি। এ জন্যে তাঁদের একজন অর্থাৎ তীযূসীস যখন নিজের পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে গুহা থেকে বের হন এবং নগরে প্রবেশ করেন, তখন তা তাঁর নিকট অপরিচিত মনে হয়। নগরবাসীরাও তাঁকে দেখে অপরিচিত বোধ করে। তাঁর আকার-আকৃতি কথাবার্তা এবং তাঁর মুদ্রা সবই নগরবাসীর নিকট অপরিচিত ও আশ্চর্যজনক মনে হয়।

কথিত আছে, তারা তাঁকে তাঁদের রাজার নিকট নিয়ে যায় এবং তারা তাঁকে গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে। কেউ কেউ তাঁকে শক্তিশালী শত্রু মনে করে তার ক্ষতিকর আক্রমণেরও আশঙ্কা করেছে। কতক ঐতিহাসিকের মতে তিনি তখন তাঁদের নিকট থেকে পালিয়ে যান। আর কতক ঐতিহাসিকের মতে তিনি নগরবাসীকে তাঁর নিজের ও সাথীদের অবস্থার বিবরণ দেন। এরপর তারা তাঁর সাথে তার অবস্থান ক্ষেত্রের দিকে রওনা হয়, যাতে তিনি তাঁদেরকে নিজেদের অবস্থানস্থল দেখিয়ে দেন। নগরবাসী গুহার নিকট এসে পৌঁছার পর তীযূসীস সর্বাগ্রে তার সাথীদের নিকট প্রবেশ করেন। তিনি নিজেদের প্রকৃত অবস্থা এবং নিদ্রার মেয়াদ সম্পর্কে তাঁদেরকে অবহিত করেন। তখন তারা উপলব্ধি করে, মূলত এটি মহান আল্লাহর নির্ধারিত একটি বিষয়। কথিত আছে, এরপর তাঁরা আবার নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েন। মতান্তরে এরপর তাঁদের ইনতেকাল হয়ে যায়। ওই নগরবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা ওই গুহাটি খুঁজে পায়নি। গুহাবাসীদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে অনবহিত রেখে দেন। কেউ কেউ বলেন, গুহাবাসীদের ব্যাপারে তাঁদের মনে ভীতির সৃষ্টি হওয়ার দরুণ গুহায় প্রবেশ করতে পারে নি। গুহাবাসীদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে নগরবাসীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। তাঁদের একদল বলল, "তাঁদের ওপর সৌধ নির্মাণ করে দাও!" অর্থাৎ গুহামুখ বন্ধ করে দাও! যাতে তারা সেখান থেকে বের হতে না পারে কিংবা কেউ তাঁদেরকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের নিকট যেতে না পারে। অপর দল বলল, "আমরা অবশ্যই ওদের ওপর মসজিদ নির্মাণ করব" অর্থাৎ ইবাদতখানা তৈরি করব। আর এদের মতই প্রবল ছিল। এ সকল পূণ্যবান লোকদের পাশাপাশি থাকার কারণে তা বরকতময় হয়ে থাকবে। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে এরূপ মসজিদ নির্মাণের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।

আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি মানুষকে এভাবে তাঁদের বিষয় জানিয়ে দিলাম। যাতে তারা জ্ঞাত হয়, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই।" বহু তাফসিরকারক বলেছেন, এর অর্থ হল যাতে লোকজন জানতে পারে, পুনরুত্থান সত্য এবং কিয়ামত অনুষ্ঠানে কোনো সন্দেহ নেই। কেন না মানুষ যখন অবগত হবে, গুহাবাসীগণ তিনশ বছরেরও অধিককাল ধরে নিদ্রামগ্ন ছিল, তারপর কোনো প্রকারের বিকৃতি ছাড়া যে অবস্থায় ছিলেন ঠিক সে অবস্থায়ই জাগ্রত হয়ে উঠেছেন, তখন তারা উপলব্ধি করতে পারবে, মহান সত্তা তাঁদেরকে কোনো পরিবর্তন ছাড়া অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষমতা রাখেন। তিনি নিশ্চয়ই চূর্ণ-বিচূর্ণ অস্থি বিশিষ্ট মানবদেহকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করার ক্ষমতা রাখেন। এটি এমন একটি বিষয়, যাতে ঈমানদারগণ কোনোই সন্দেহ পোষণ করে না।

অবশ্য আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যাও হতে পারে। অর্থাৎ 'যাতে তারা জানতে পারে' বলতে গুহাবাসীগণকে বুঝানো হয়েছে। কেন না তাঁদের নিজেদের সম্পর্কে তাঁদের অবগত হওয়াটা তাঁদের সম্পর্কে অন্যের অবগত হওয়া অপেক্ষা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী। আবার হতে পারে আয়াতে 'তারা জানতে পারে' বলতে সকলকেই বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন: "কেউ বলবে, ওরা ছিল তিনজন; ওদের চতুর্থটি ছিল ওদের কুকুর এবং কেউ বলবে, ওরা ছিল পাঁচজন; ওদের ষষ্ঠটি ছিল ওদের কুকুর। অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে, ওরা ছিল সাতজন; ওদের অষ্টমটি ছিল ওদের কুকুর।" তাঁদের সংখ্যা সম্পর্কে মানুষের তিনটি অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দুটো অভিমত দুর্বল সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বুঝা যায়, তৃতীয় অভিমতটিই যথার্থ। এ ছাড়া অন্য কোনো মত থাকলে তা-ও উল্লিখিত হত। এ তৃতীয় মতটি যথার্থ না হলে তাও দুর্বল বলে চিহ্নিত করা হত। তাই তৃতীয় মতটিই সঠিক। তবে এ জাতীয় বিষয়ে বিতর্কে যেহেতু কোনো উপকারিতা নেই, সেহেতু আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে করণীয় শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ যখন এ জাতীয় বিষয়ে মতভেদ করবে, তখন তিনি যেন বলেন, 'আল্লাহই ভালো জানেন।' এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেন, "বল আমার প্রতিপালকই ওদের সংখ্যা ভালো জানেন। ওদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে।" "সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি ওদের বিষয়ে বিতর্ক করবে না।" অর্থাৎ সহজ ও স্বাভাবিক আলোচনা করুন। এ জাতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হবেন না। আর তাঁদের সম্বন্ধে কোনো মানুষকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। এ কারণে শুরুতে আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংখ্যা অস্পষ্ট রেখেছেন।

সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, "কখনও তুমি কোনো বিষয়ে বলবে না, আমি এটি আগামীকাল করব 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে' কথাটি না বলে।" এটি একটি উচ্চস্তরের শিষ্টাচার। এটা আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ কোনো কাজ করতে চাইলে তার জন্যে শরিয়তের বিধান, সে 'ইনশাআল্লাহ' বলবে। যাতে এতে তার সুদৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পায়। কেন না আগামীকাল কি হবে তা তো বান্দা জানে না। সে এটাও জানে না, সে যে কাজটি করার সংকল্প করেছে তা তার তাকদিরে আছে কি-না? এই 'ইনশাআল্লাহ' শব্দটি শর্ত বলে গণ্য হবে না। বরং এটি তার দৃঢ় সংকল্প বলেই গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলার বাণী: "যদি ভুলে যাও তবে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ কর!" কেন না, ভুলে যাওয়াটা কোনো কোনো সময় শয়তানের প্রভাবে হয়ে থাকে। তখন আল্লাহর স্মরণ অন্তর থেকে প্রভাব বিদূরিত করে দেয়। ফলে যা ভুলে গিয়েছিল, তা স্মরণে আসে। আল্লাহর বাণী: “এবং বল সম্ভবত আমার প্রতিপালক আমাকে এটি অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথ নির্দেশ করবেন।" অর্থাৎ যখন কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা এসে যায় এবং লোকজনের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়, তবে আপনি আল্লাহ অভিমুখী হন, তিনি বিষয়টিকে আপনার জন্যে সহজ ও স্বাভাবিক করে দিবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, "তারা তাঁদের গুহায় ছিল তিনশ বছর, আরও নয় বছর।" তাঁদের সুদীর্ঘ কাল গুহায় অবস্থানের কথা উল্লেখ তাৎপর্যবহ। তাই আল্লাহ তাআলা এর উল্লেখ করেছেন। এখানে অতিরিক্ত নয় বছর হল চান্দ্র মাসের হিসাবে। সৌর বছরের ৩০০ বছর পূর্ণ করতে চান্দ্র মাসের হিসেবে অতিরিক্ত নয় বছরের প্রয়োজন হয়। কেন না, প্রতি ১০০ সৌর বছর থেকে ১০০ চান্দ্র বছরের সময়কাল তিন বছর কম হয়ে থাকে।

আল্লাহর বাণী: "বল, তারা কতকাল ছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন।" অর্থাৎ এ জাতীয় কোনো বিষয়ে যদি আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করে আর আপনার নিকট সে বিষয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ না থাকে, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করে দিন। "আকাশরাজি ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই।" অর্থাৎ অদৃশ্য বিষয়ে অবগত তিনিই, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাঁকে তা অবগত করান; অন্য কাউকে নয়। "তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টাও শ্রোতা।" অর্থাৎ তিনি সবকিছুকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। কেন না, তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে এবং সেগুলোর চাহিদা ও প্রয়োজন সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, "তিনি ব্যতীত ওদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।” অর্থাৎ রাজত্বে, ক্ষমতায় ও কর্তৃত্বে আপনার প্রতিপালক একক, অনন্য। তাঁর কোনো শরীক ও অংশীদার নেই। (সূরা কাহাফ: ৯-২৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00