📄 হযরত ইবরাহীম আ. মিথ্যা বলেছেন কি না?
ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ইবরাহীম আ. তিনবার অসত্য উক্তি করেছিলেন। দুটি আল্লাহ সংক্রান্ত।
(১) তিনি বলেছিলেন, اِنِّى سَقِيمٌ আমি পীড়িত।
(২) আরেকবার বলেছিলেন, بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَذَا এর বড় মূর্তিটিই এ কর্মটি করেছে।
(৩) উক্তিটি করেছিলেন নিজের ব্যাপারে।
ঘটনা হল, হযরত ইবরাহমীম আ. স্ত্রী সারাহসহ এক জালেম বাদশার এলাকা অতিক্রম করছিলেন। বাদশার নিকট সংবাদ গেল, এই এলাকায় একজন লোক আছে যার সাথে রয়েছে এক পরমা সুন্দরী নারী। জালিম বাদশা হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট লোক পাঠাল। আগন্তুক এসে হযরত ইবরাহীম আ.-কে সারাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, ওনি কে? উত্তরে তিনি বললেন: আমার বোন। এরপর হযরত ইবরাহীম আ. সারাহর কাছে এসে বললেন, দেখ সারাহ! এই ধরাপৃষ্ঠে আমি এবং তুমি ব্যতীত আর কোনো মুমিন নেই। এই আগন্তুক তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কথা জানতে চেয়েছে। আমি তাকে বলে দিয়েছি, তুমি আমার বোন। এখন আমাকে তুমি মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করো না। এরপর ওই জালিম বাদশাহ সারাহকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লোক পাঠাল।
সারাহ বাদশাহর দরবারে নীত হলে, বাদশাহ তাঁর প্রতি হাত বাড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে সে খোদার গযবে পতিত হয়। বাদশা বলল, সারাহ আমার জন্যে দুআ কর! আমি তোমার কোনো ক্ষতি সাধন করব না। সারাহ দুআ করলেন। ফলে বাদশাহ ছাড়া পায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার সে সারাহর প্রতি হাত বাড়ায়। এবারও সে পূর্বের মতো কিংবা তদপেক্ষা কঠিনভাবে তার ওপর শাস্তি নেমে আসে। পুনর্বার বাদশা বলল, আমার জন্যে দুআ কর! আমি তোমার কোনো অনিষ্ট করব না। সারাহ দুআ করলে সে পুনরায় রক্ষা পায়। তখন বাদশা তার উজিরকে ডেকে বলে, তুমি তো আমার কাছে কোনো মানবী আন নি, এনেছ এক দানবী। পরে বাদশা সারাহর খেদমতের জন্যে হাজেরাকে দান করল। সারাহ ইবরাহীম আ.-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে সালাত আদায় করতে দেখতে পান। হযরত ইবরাহীম আ. সালাতে থেকেই হাতের ইশারা দ্বারা ঘটনা জানতে চাইলেন। সারাহ বললেন, আল্লাহ অনাচারী কাফিরের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছেন এবং ওই জালিম আমার খেদমতের জন্যে হাজেরাকে দিয়েছে।
আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, হে বেদুঈন আরব সন্তানরা! এই হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা। ইমাম বুখারী রহ. একক সূত্রে হাদিসটি মওকূফরূপে বর্ণনা করেছেন।
হাফিজ আবু বকর আল বাযযার রহ. আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. মাত্র তিনবার ছাড়া কখনও অসত্য উক্তি করেন নি। ওই তিনটি উক্তিই ছিল আল্লাহ সংক্রান্ত।
(১) নিজেকে (ইন্নী সাক্বীম) (আমি পীড়িত) বলা।
(২) (বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম) (এদের বড়টাই এ কাজ করেছে) বলা।
(৩) হযরত ইবরাহীম আ.-কোনো এক জালিম রাজার এলাকা দিয়ে সফর করার সময় কোনো এক মঞ্জিলে অবতরণ করেন। জালিম রাজা তথায় আগমন করে। তাকে জানানো হয় যে, এখানে একজন লোক এসেছেন। যার সাথে এক পরমা সুন্দরী রমণী আছে। রাজা তখনই ইবরাহীম আ.-এর নিকট লোক প্রেরণ করে। সে এসে মহিলাটি সম্পর্কে ইবরাহীম আ.-কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, সে আমার বোন। এরপর ইবরাহীম আ. তাঁর স্ত্রীর কাছে আসেন এবং বলেন, একটি লোক তোমার সম্পর্কে আমার কাছে জিজ্ঞেস করেছে। আমি তোমাকে আমার বোন বলে পরিচয় দিয়েছি। এখন আমি আর তুমি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো মুসলমান নেই। এ হিসেবে তুমি আমার বোনও বটে। সুতরাং রাজার কাছে আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো না যেন। রাজা তাঁর দিকে হাত বাড়াতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আযাব এসে তাকে পাকড়াও করে। রাজা বলল, তুমি আল্লাহর কাছে দুআ কর! আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। তিনি দুআ করেন। ফলে সে মুক্ত হয়। কিন্তু পরক্ষণে আবার তাঁকে ধরার জন্যে হাত বাড়ায়।
এবারও আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বের মতো কিংবা তদপেক্ষা শক্তভাবে পাকড়াও হয়। রাজা পুনরায় বলল, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ কর, তোমার কোনো ক্ষতি আমি করব না। সুতরাং তিনি দুআ করায় সে মুক্তি পেয়ে যায়। এরূপ তিনবার ঘটে। এরপর রাজা তার সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ অনুচরকে ডেকে বলল, তুমি তো কোনো মানবী আন নি; এনেছ দানবী। একে বের করে দাও এবং হাজেরাকেও সাথে দিয়ে দাও।
বিবি সারাহ ফিরে আসলেন। ইবরাহীম আ. তখন সালাতে রত ছিলেন। সারাহর শব্দ পেয়েই তিনি তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনা কি? সারাহ বললেন, 'আল্লাহ জালিমের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আর সে আমার খিদমতের জন্যে হাজেরাকে দান করেছে।'
বাযযার রহ. বলেছেন, মুহাম্মদ রহ.-এর সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে হিশাম ব্যতীত কেউ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। অন্যরা একে 'মওকূফ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদ রহ. আবু হোরায়রা রাযি. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা কথা বলেন নি।
(১) কাফিররা যখন তাদের মেলায় যাওয়ার জন্যে আহ্বান জানায়, তখন তিনি বলেছিলেন, ইন্নী সাক্বীম (আমি পীড়িত)।
(২) তিনি মূর্তি ভেঙ্গে বলেছিলেন, বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম হাজা (এদের মধ্যে এই বড়টিই এ কাজ করেছে।)
(৩) নিজের স্ত্রী সারাহর পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন: ইন্নাহা উখতী (এ আমার বোন)।
বর্ণনাকারী বলেন: হযরত ইবরাহীম আ. একবার কোনো এক জনপদে প্রবেশ করেন। সেখানে ছিল এক জালিম রাজা। তাকে জানানো হল, এ রাত্রে ইবরাহীম এক পরমা সুন্দরী নারীসহ এখানে এসেছে। রাজা তাঁর কাছে দূত পাঠাল। দূত হযরত ইবরাহীম আ.-কে জিজ্ঞেস করল। আপনার সাথী এ রমণীটি কে? ইবরাহীম আ. বললেন, আমার বোন। দূত বলল, একে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিন।
হযরত ইবরাহীম আ. পাঠিয়ে দিলেন এবং বলে দিলেন, আমার উক্তিকে তুমি মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। কারণ, রাজাকে আমি জানিয়েছি, সম্পর্কে তুমি আমার বোন। বাস্তবে এ পৃথিবীর বুকে আমি এবং তুমি ছাড়া আর কোনো মুমিন নেই। সারাহ রাজার দরবারে পৌঁছলে সে সারাহর দিকে অগ্রসর হল। সারাহ তখন অযু করে সালাত আদায় করে এ দোয়াটি পড়লেন-
আল্লা-হুম্মা ইন কুনতা তালামু আন্নী আমানতু বিকা বি রসূলিকা ওয়া আহসানতু ফারজী ইল্লা আলা যাওজী ফালা তুসালিলত আলাল কাফির।
'হে আল্লাহ! আপনি অবশ্যই অবগত আছেন, আমি আপনার উপর ও আপনার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। আমার স্বামী ব্যতীত অন্য সবার থেকে আমার লজ্জাস্থানকে হিফাজত করেছি। অতএব কোনো কাফিরকে আমার উপর হস্তক্ষেপ করতে দিবেন না।
জালিম রাজাকে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এমনভাবে টুটি চেপে ধরা হল যে, পায়ের সাথে পা ঘর্ষণ করে ছটফট করতে লাগল। আবুয যিনাদ রহ. হযরত আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে বলেন, সারাহ তখন পুনরায় দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ! লোকটি এভাবে মারা গেলে লোকে বলবে আমিই তাকে হত্যা করেছি। অতএব রাজা শাস্তি থেকে মুক্তি লাভ করল।
কিন্তু পুনরায় রাজা তার দিকে অগ্রসর হল। সারাহও পূর্বের মতো অযু ও সালাত শেষে ওই দোয়াটি পড়লেন। রাজা পুনরায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করতে থাকে। এ দেখে সারাহ বললেন, "হে আল্লাহ! এ যদি মারা যায় তবে লোকে বলবে ওই মহিলাটিই তাকে হত্যা করেছে।" এরপর সে মুক্তি লাভ করে। এভাবে তৃতীয় বা চতুর্থ বারের পর জালিম রাজা তার লোকদেরকে ডেকে বলল, তোমরা আমার কাছে তো একটা দানবী পাঠিয়েছ। একে ইবরাহীমের নিকট ফিরিয়ে দাও আর হাজেরাকেও এর সাথে দিয়ে দাও। বিবি সারাহ ফিরে এসে হযরত ইবরাহীম আ.কে জানালেন, আপনি কি জানতে পেরেছেন, আল্লাহ কাফিরদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং ওই জালিম একজন দাসীকেও দান করেছে?
কেবল ইমাম আহমদ রহ. এ সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহি সনদের শর্ত অনুযায়ী। ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি.-এর সূত্রে মারফুভাবে হাদিসটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবু হাতেম হযরত আবু সাঈদ রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হযরত ইবরাহীম আ. যে তিনটি কথা বলেছিলেন, তার প্রতিটিই আল্লাহর দীনের গ্রন্থি উম্মোচন করে। তাঁর প্রথম কথা: ইন্নী সাক্বীম (আমি পীড়িত), দ্বিতীয় কথা: বাল ফাআলাহূ কাবীরুহুম হাজা (বরং এদের বড়জনই এ কাজ করেছে), তৃতীয় কথা: যখন রাজা তার স্ত্রীকে কামনা করেছিল, তখন বলেছিলেন, হিয়া উখতী (সে আমার বোন) অর্থাৎ আল্লাহর দীনের সম্পর্কে বোন।
📄 কোনো মহিলা নবী ছিলেন কি না?
কোনো কোনো বিজ্ঞ আলেমের মতে তিনজন মহিলা নবী ছিলেন। (১) সারাহ (২) হযরত মূসা আ.-এর মা (৩) মরিয়াম। কিন্তু অধিকাংশের মতে তাঁরা তিনজন সিদ্দীকা (সত্যপরায়ণা) ছিলেন। আমি কোনো কোনো বর্ণনায় দেখেছি। বিবি সারাহ যখন ইবরাহীম আ.-এর নিকট থেকে জালিম বাদশাহর কাছে যান, তখন থেকে তাঁর ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহ ইবরাহীম আ. ও সারাহর মধ্যকার, পর্দা উঠিয়ে নেন। ফলে রাজার কাছে তাঁর থাকাকালীন যা যা ঘটছিল সবই তিনি প্রত্যক্ষ করছিলেন।
আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ইবরাহীম আ.-এর হৃদয় পবিত্র থাকে, চক্ষু শীতল থাকে এবং তিনি অন্তরে প্রশান্তি বোধ করেন। কেননা হযরত ইবরাহীম আ. সারাহকে তার দীনের জন্যে, আত্মীয়তার সম্পর্কের জন্যে ও অনুপম সৌন্দর্যের জন্যে তাকে গভীরভাবে মহব্বত করতেন। কেউ কেউ বলেছেন, বিবি হাওয়ার পর থেকে সারাহর যুগ পর্যন্ত তাঁর চাইতে অধিক সুন্দরী কোনো নারীর জন্ম হয় নি। সকল প্রশংসা আল্লাহরই।
📄 কে সেই রাজা!
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ লিখেছেন, এই সময়ে মিসরের ফেরাউন ছিল বিখ্যাত জালিম বাদশাহ জাহহাকের ভাই। সে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে মিসরের শাসনকর্তা ছিল। তার নাম কেউ বলেন, সিনান ইবনে আলওয়ান ইবনে উবায়দ ইবনে উওয়ায়জ ইবনে আমলাক ইবনে লাওদ ইবনে সাম ইবনে নূহ। ইবনে হিশাম 'তীজান' নামক গ্রন্থে বলেছেন, যে রাজা সারাহর উপর লোভ করেছিল, তার নাম আমর ইবনে ইমরুল কায়স ইবনে মাইলুন ইবনে সাবা। সে মিসরের শাসনকর্তা ছিল। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।
এরপর হযরত ইবরাহীম আ. মিসর থেকে তাঁর পূর্ববর্তী বাসস্থান বরকতের দেশ তথা বায়তুল মুকাদ্দাস যান। তাঁর সাথে বহু পশু সম্পদ, গোলাম, বাঁদী ও ধন-সম্পদ ছিল। মিসরের কিবতী বংশোদ্ভুত হাজেরাও সাথে ছিলেন। এই সময় হযরত লুত আ. তাঁর ধন-সম্পদসহ হযরত ইবরাহীম আ.-এর আদেশক্রমে পাশের দেশে চলে যান। 'গাওরে-যাগার' নামে এ স্থানটি প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি সে অঞ্চলে ওই যুগের প্রসিদ্ধ শহর সদূমে অবতরণ করেন। শহরের বাসিন্দারা ছিল কাফির, পাপাসক্ত ও দুষ্কৃতকারী। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ.-কে দৃষ্টি প্রসারিত করে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব ও পশ্চিমে তাকাতে বলেন এবং সু-সংবাদ দেন, এই সমুদয় স্থান তোমাকে ও তোমার উত্তরসূরিদের চিরদিনের জন্য দান করব। তোমার সন্তানদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি করে দেব, তাদের সংখ্যা পৃথিবীর বালুকণার সমান হয়ে যাবে। এই সুসংবাদ পূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলিত হয়, বিশেষ করে এই উম্মতে মুহাম্মদিয়ার ক্ষেত্রে একটি হাদিস থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ আমার সম্মুখে পৃথিবীর এক অংশকে ঝুঁকিয়ে দেন। আমি তার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখে নিলাম। অচিরেই উম্মতের রাজত্ব এই দেখান সীমানা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, কিছুদিন পর ঐ দুরাচার লোকেরা হযরত লূত আ.-এর উপর চড়াও হয় এবং তাঁর পশু ও ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাঁকে বন্দী করে রাখে। এ সংবাদ হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট পৌঁছলে তিনি তিন শ আঠারজন সৈন্য নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করেন এবং লূত আ.-কে উদ্ধার করেন, তাঁর সম্পদ ফিরিয়ে আনেন।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিপুল সংখ্যক শত্রুকে হত্যা করেন। শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন ও তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তিনি দামেশকের পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেন। শহরের উপকণ্ঠে বারযাহ নামক স্থানে সেনাছাউনি স্থাপন করেন। আমার ধারণা এ স্থানকে "মাকামে ইবরাহীম" বলার কারণ এটাই, এখানে ইবরাহীম খলীলুল্লাহর সৈন্য বাহিনীর শিবির ছিল।
তারপর ইবরাহীম আ. আল্লাহর সাহায্যপুষ্ট অবস্থায় বিজয়ীর বেশে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের শহরসমূহের শাসকবর্গ শ্রদ্ধাভরে ও বিনীতভাবে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তিনি সেখানেই বসবাস করতে থাকেন।
📄 হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ.-এর জন্ম
আহলে কিতাবদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর নিকট সুসন্তানের জন্য দুআ করেন। আল্লাহ তাঁকে এ বিষয়ে সুসংবাদ দানও করেন। কিন্তু এরপর বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁর বিশটি বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। এ সময় একদিন সারাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে বললেন, আমাকে তো আল্লাহ সন্তান থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। সুতরাং আপনি আমার বাঁদীর সাথে মিলিত হন। তার গর্ভে আল্লাহ আমাকে একটা সন্তান দিতেও পারেন। সারাহ হাজেরাকে ইবরাহীমের জন্যে হেবা করে দিলে ইবরাহীম আ. তাঁর সাথে মিলিত হন। তাতে হাজেরা সন্তান-সম্ভবা হন।
এতে আহলে কিতাবগণ বর্ণনা করে থাকেন, হাজেরা অনেকটা গৌরববোধ করেন এবং আপন মনিব সারাহর তুলনায় নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে করতে থাকেন। সারাহর মধ্যে আত্মমর্যাদা বোধ জাগ্রত হয়। তিনি এ সম্পর্কে ইবরাহীম আ.-এর নিকট অভিযোগ করেন। জবাবে ইবরাহীম আ. বললেন, "তার ব্যাপারে তুমি যে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাও নিতে পার।” এতে হাজেরা শঙ্কিত হয়ে পলায়ন করেন এবং অদূরেই এক কূপের নিকটে অবতরণ করেন। সেখানে জনৈক ফেরেশতা তাঁকে বলে দেন, তুমি ভয় পেয় না; যে সন্তান তুমি ধারণ করেছ, আল্লাহ তাকে গৌরবময় করবেন।
ফেরেশতা তাঁকে বাড়িতে ফিরে যেতে বলেন এবং সুসংবাদ দেন, তুমি পুত্র-সন্তান প্রসব করবে। তাঁর নাম রাখবে ইসমাঈল। সে হবে এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। সকল লোকের উপর তাঁর প্রভাব থাকবে এবং অন্য সবাই তাঁর দ্বারা শক্তির প্রেরণা পাবে। সে তার ভাইদের কর্তৃত্বাধীন সমস্ত এলাকার অধিকারী হবে। এসব শুনে হাজেরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এই সুসংবাদ হযরত ইবরাহীম আ.-এর অধঃস্তন সন্তান মুহাম্মদ এর ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রায় প্রযোজ্য। কেননা গোটা আরব জাতি তার দ্বারা গৌরবের অধিকারী হয়। পূর্ব-পশ্চিমের সমস্ত এলাকায় তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁকে আল্লাহ এমন উন্নত ও কল্যাণকর শিক্ষা এবং সৎকর্ম-কুশলতা দান করেন, যা পূর্বে কোনো উম্মতকেই দেওয়া হয়নি। আরব জাতির এ মর্যদা পাওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের রাসূলের মর্যাদা যিনি হচ্ছেন নবীকুল শিরোমণি। তাঁর রিসালাত হচ্ছে বরকতময়। তিনি হচ্ছেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যে রাসূল। তাঁর আনীত আদর্শ হচ্ছে পুণ্যতম আদর্শ।
হাজেরা ঘরে ফেরার পর হযরত ইসমাঈল আ. ভূমিষ্ঠ হন। এ সময় ইবরাহীম আ.-এর বয়স হয়েছিল ছিয়াশি বছর। এটা হচ্ছে ইসহাক আ.-এর জন্মের তের বছর পূর্বের ঘটনা। ইসমাঈল আ.-এর জন্মের পর আল্লাহ হযরত ইবরাহীম আ.-কে সারাহর গর্ভে ইসহাক নামের সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেন।
ইবরাহীম আ. তখন আল্লাহর উদ্দেশে শোকরানা সিজদা আদায় করেন। আল্লাহ তাঁকে জানান, আমি তোমার দুআ ইসমাঈলের পক্ষে কবুল করেছি। তাকে বরকত দান করেছি। তাঁর বংশের বিস্তৃতি দান করেছি। তার সন্তানদের মধ্য থেকে বারো জন প্রধানের জন্ম হবে। তাঁকে আমি বিরাট সম্প্রদায়ের প্রধান করব। এটাও এই উম্মতের জন্যে একটা সুসংবাদ। বারো জন প্রধান হলেন সেই বারজন খলিফায়ে রাশেদা যাঁদের কথা জাবির ইবনে সামুরা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বারো জন আমীর হবে।'
জাবির রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর একটা শব্দ বলেছেন, কিন্তু আমি তা বুঝতে পারি নি। তাই সে সম্পর্কে আমার পিতার কাছে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বললেন, রাসূলের সে শব্দটি হল কুল্লুহুম মিন ক্বুরাইশ অর্থাৎ 'তারা সবাই হবেন কুরায়শ গোত্রের লোক।' বুখারী ও মুসলিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অপর এক বর্ণনায় আছে:
লা ইয়াযালু হাজাল আমরু কাইমান হাত্তা ইয়াকুনানা ইছনা আশারা খলীফাতান কুল্লুহুম মিন ক্বুরাইশ
অর্থাৎ এই খিলাফত বারো জন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত বা শক্তিশালী থাকবে; এরা সবাই হবে কুরাইশ গোত্রের লোক। উক্ত বারজনের মধ্যে চারজন হলেন প্রথম চার খলিফা আবু বকর রাযি. উমর রাযি. উসমান ও আলী রাযি.। একজন উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. কতিপয় বনি আব্বসীয় খলীফা। বারজন খলিফা ধারাবাহিকভাবে হতে হবে এমন কোনো কথা নাই। বরং যে কোনোভাবে বারো জনের বিদ্যমান হওয়াটাই জরুরি। উল্লিখিত বারো জন ইমাম রাফিজী সম্প্রদায়ের কথিত 'বারো ইমাম' নয়। যাদের প্রথম জন আলী ইবনে তালিব রাযি. আর শেষ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারী। এই শেষোক্ত ইমামের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস হচ্ছে, তিনি সামেরার একটি ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ থেকে বের হয়ে আসবেন। এরা তার প্রতীক্ষায় আছে।
কেননা, এ ইমামগণ হযরত আলী রাযি. ও তাঁর পুত্র হাসান ইবনে আলী অপেক্ষা অধিকতর কল্যাণকামী হতে পারেন না। বিশেষ করে যখন স্বয়ং হাসান ইবনে আলী রাযি. যুদ্ধ পরিত্যাগ করে হযরত মুআবিয়া রাযি. এর অনুকুলে খেলাফত ত্যাগ করেন। যার ফলে ফিৎনার আগুন নির্বাপিত হয়। মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়। অবশিষ্ট ইমামগণ তো অন্যদের শাসনাধীন ছিলেন। উম্মতের উপরে কোনো বিষয়েই তাঁদের কোনো আধিপত্য ছিল না। সামিরার ভূগর্ভস্থিত প্রকোষ্ঠ সম্পর্কে রাফিজীদের যে বিশ্বাস তা নিতান্ত অবাস্তব কল্পনা ও হেঁয়ালী ছাড়া আর কিছুই নয়। এর কোনো ভিত্তি নেই।
হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল আ.-এর জন্ম হলে সারাহর ঈর্ষা পায়। তিনি হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট আবেদন জানান, যাতে হাজেরাকে তার চোখের আড়াল করে দেন। সুতরাং ইবরাহীম আ. হাজেরা ও তাঁর পুত্রকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং মক্কায় নিয়ে রাখেন। বলা হয়ে থাকে যে, ইসমাঈল আ. তখন দুধের শিশু ছিলেন।
ইবরাহীম আ. যখন তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে আসার জন্যে উদ্যত হলেন, তখন হাজেরা উঠে তার কাপড় জড়িয়ে ধরে বললেন, আমাদেরকে এখানে খাদ্য-রসদহীন অবস্থায় রেখে কোথায় যাচ্ছেন? ইবরাহীম আ.-কোনো উত্তর দিলেন না। বারবার পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি যখন জওয়াব দিলেন না, তখন হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন : 'আল্লাহ কি এরূপ করতে আপনাকে আদেশ করেছেন?' ইবরাহীম আ. বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা বললেন : 'তা হলে আর কোনো ভয় নেই। তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না।'
শায়খ আবু মুহাম্মদ ইবনে আবি যায়েদ রহ, 'নাওয়াদির' কিতাবে লিখেছেন: সারাহ হাজেরার ওপর ক্রদ্ধ হয়ে কসম করলেন, তিনি তাঁর তিনটি অঙ্গ ছেদন করবেন। ইবরাহীম আ. বললেন, দুটি কান ছিদ্র করে দাও ও খাৎনা করিয়ে দাও এবং কসম থেকে মুক্ত হয়ে যাও। সুহায়লী বলেছেন: 'হাজেরাই সর্বপ্রথম নারী, যার খাৎনা করা হয়েছিল, সর্বপ্রথম যার উভয় কান ছিদ্র করা হয়। এবং তিনিই সর্বপ্রথম দীর্ঘ আঁচল ব্যবহার করেন।"