📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হাবিল ও কাবিলের কাহিনী

📄 হাবিল ও কাবিলের কাহিনী


হাবিল ও কাবিলের কাহিনী আল্লাহ তাআলা বলেন: وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (۲۷) لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَাসِطِ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ (২৮) إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْنِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ (২৯) فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ (٣٠) فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يَا وَيْلَتَا أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِيَ سَوْءَةَ أَخي فَأَصْبَحَ مِنَ النَّادِمِينَ (৩১)

"আদমের দু পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও! যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো, অন্যজনের কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করবই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কোরবানি করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত বাড়াব না। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালককে ভয় করি। আমি চাই, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করে জাহান্নামী হও এবং এটা জালিমদের কর্মফল। তারপর তার প্রবৃত্তি তার ভাইকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো। তারপর আল্লাহ তাআলা একটি কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের লাশ কীভাবে গোপন করা যায়, তা দেখানোর জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতোও হতে পারলাম না! যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। (সূরা মায়েদা: ২৭-৩১)

সুদ্দী রহ. ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি. সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন, আদম আ.-এর এক গর্ভের পুত্র সন্তানের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যা সন্তানকে বিয়ে দিতেন। সে মতে কাবীলের যমজ বোনকে বিয়ে করতে মনস্ত করেন হাবীল। কাবীল বয়সে হাবীলের চেয়ে বড় ছিল। আর তার বোন ছিল অত্যন্ত রূপসী। তাই কাবিল ভাইকে না দিয়ে নিজেই আপন বোনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইল এবং আদম আ. হাবীলের সঙ্গে তাকে বিবাহ দেওয়ার আদেশ করলে সে তা অগ্রাহ্য করল। ফলে আদম আ. তাদের দুজনকে কোরবানি করার আদেশ দিয়ে তিনি হজ করার জন্য মক্কায় চলে যান। যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আসমানসমূহকে তাঁর সন্ত নিদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিতে চান; তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। যমিন, পাহাড়-পর্বতকে তা নিতে বললে তারাও অস্বীকৃতি জানায়। শেষে কাবীল এ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

তারপর আদম আ. চলে গেলে তারা তাদের কোরবানি করে। হাবীল একটি মোটা তাজা বকরি কোরবানি করে। তার অনেক বকরি ছিল। আর কাবীল কোরবানি দেয় নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য। তারপর আগুন হাবিলের কোরবানি গ্রাস করে নেয় আর কাবীলের কোরবানি অগ্রাহ্য হয়। এতে কাবীল ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি হত্যা করেই ছাড়ব। যাতে করে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পার। উত্তরে হাবীল বলল, আল্লাহ তাআলা কেবল মুত্তাকীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন。

আবদুল্লাহ ইবনে আমরা রাযি. বলেন, আল্লাহর কসম! তাদের দুজনের মধ্যে নিহত লোকটিই অধিক শক্তিশালী ছিল। কিন্তু নির্দোষ থাকার প্রবণতা তাকে হত্যাকারীর প্রতি হাত বাড়ানো থেকে বিরত রাখে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হাবিল ও কাবিলের কোরবানি

📄 হাবিল ও কাবিলের কোরবানি


হাবিল ও কাবিলের কোরবানি

আবু জাফর আল-বাকির রহ. বলেন, আদম আ. তাঁর দুই পুত্র হাবীল ও কাবীলের কোরবানি করা এবং হাবীলের কোরবানি কবুল হওয়া ও কাবীলের কোরবানি কবুল না হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তখন কাবীল বলল, ওর জন্য আপনি দোয়া করেছিলেন। তাই ওর কোরবানি কবুল হয়েছে; আর আমার জন্য আপনি দোয়া করেন নি।

কিছুদিন পর এক রাতে হাবীল পশুপাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিলম্ব করেন। ফলে আদম আ. তার ভাই কাবীলকে বললেন, দেখ তো ওর আসতে এতো দেরি হচ্ছে কেন? কাবীল গিয়ে হাবীলকে চারণভূমিতে দেখতে পেয়ে তাকে বলল, তোমার কোরবানি কবুল হলো আর আমারটা হলো না!! হাবীল বলল, আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন।

এ কথা শুনে কাবীল চটে গেল। সঙ্গে থাকা লোহার একটা টুকরা দিয়ে হাবীলকে আঘাত করে হত্যা করে ফেলল। কেউ কেউ বলেন, কাবীল ঘুমন্ত অবস্থায় হাবীলকে একটি পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করে তাঁর মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। কেউ কেউ বলেন, কাবীল সজোরে হাবীলের গলা টিপে ধরে এবং হিংস্র পশুর মতো তাঁকে কামড় দেয়, ফলে তিনি মারা যান। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ (২৮)

"আমাকে খুন করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে খুন করার জন্য আমি হাত বাড়াবার নই। (সূরা মায়েদা: ২৮)

কাবীলের হত্যার হুমকির জবাবে হাবীলের এ বক্তব্য তাঁর উত্তম চরিত্র, খোদাভীতি এবং ভাই তাঁর ক্ষতিসাধন করার যে সংকল্প ব্যক্ত করেছিল, তার প্রতিশোধ নেওয়া থেকে তাঁর বিরত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বোখারি ও মুসলিমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: তরবারি উঁচিয়ে দুজন মুসলমান মুখোমুখি হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি দুজনই জাহান্নামে যাবে। এ কথা শুনে সাহাবাগণ বললেন- আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারী জাহান্নামে যাওয়ার কারণটা তো বুঝলাম, নিহত ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে কেন? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: কারণ, সেও তার সঙ্গীকে হত্যার জন্য লালায়িত ছিল।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে: إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْنِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنَ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ (২৯)

আমি তোমার সাথে লড়াই করা পরিহার করতে চাই। যদিও আমি তোমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কারণ, আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করবে। আমি এটাই চাই।

অর্থাৎ, পূর্ববর্তী পাপসমূহের সঙ্গে আমাকে হত্যা করার পাপের বোঝাও তুমি বহন করবে, আমি এটাই চাই।

মুজাহিদ, সুদ্দী ও ইবনে জারির রহ. প্রমুখ আলোচ্য আয়াতের এ অর্থ করেছেন। এ আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয়, নিছক হত্যার কারণে নিহত ব্যক্তির যাবতীয় পাপ হত্যাকারীর ঘাড়ে গিয়ে চাপে; যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন। কেননা ইবনে জারির এ মতের বিপরীত মতকে সর্বসম্মত মত বলে বর্ণনা করেছেন।

কেউ কেউ এ মর্মে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির যিম্মায় কোনো পাপ অবশিষ্ট রাখে না। কিন্তু এর কোনো ভিত্তি নেই এবং হাদিসের কোনো কিতাবে সহি হাসান বা যয়িফ-দুর্বল কোনো সনদে এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কারো কারো বেলায় কেয়ামতের দিন দেখা যাবে, নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। কিন্তু হত্যাকারীর নেকআমলসমূহ তা পূরণ করতে পারবে না। ফলে নিহত ব্যক্তির পাপকর্ম হত্যাকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। যেমনটি সর্বপ্রকার অত্যাচার-অবিচারের ব্যাপারে সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর হত্যা হলো, সব যুলুমের বড় যুলুম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি রহ. হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি উসমান ইবনে আফফান রাযি.-এর গোলযোগের সময় বলেছিলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "অদূর ভবিষ্যতে এমন একটি গোলযোগ হবে, সে সময়ে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চেয়ে এবং চলন্ত ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে।” এ কথা শুনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. বললেন, আচ্ছা! কেউ যদি আমার ঘরে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়ায়, তখন আমি কী করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "তখন তুমি আদমের পুত্রের মতো হয়ো।"

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাযি. থেকে ইবনে মারদুহ মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তখন তুমি আদমের দুই পুত্রের উত্তমজনের মতো হয়ো।"

আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তিই নিহত হয়, তার খুনের একটি দায় আদমের প্রথম পুত্রের ওপর বর্তায়। কারণ, সে-ই সর্বপ্রথম হত্যাকর্মের প্রচলন করে।"

তদ্রুপ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. ও ইবরাহিম নাখয়ি রহ. থেকে বর্ণিত আছে। দামেশকের উত্তর সীমান্তে কাসিয়ুন পাহাড়ের কাছে একটি বধ্যভূমি আছে বলে জনশ্রুতি আছে। এ স্থানটিকে মাগারাতুদ দাম বলা হয়ে থাকে। কেননা সেখানেই কাবীল তার ভাই হাবীলকে খুন করেছিল বলে কথিত আছে। তথ্যটি আহলে কিতাবদের থেকে সংগৃহীত। তাই এর যথার্থতা সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন।

হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. তাঁর গ্রন্থে আহমদ ইবনে কাসির রহ.-এর জীবনী প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তিনি একজন পুণ্যবান লোক ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু বকর, ওমর রাযি. ও হাবীলকে স্বপ্ন দেখেন। তিনি হাবীলকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, এখানেই তাঁর রক্তপাত করা হয়েছে কি না? তিনি শপথ করে তা স্বীকার করেন এবং বলেন- তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, তিনি যেন এ স্থানটিকে সকল দোয়া কবুল হওয়ার স্থান করে দেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে তাঁকে সমর্থন দান করে বলেন, আবু বকর ও ওমর রাযি. প্রতি বৃহস্পতিবার এ স্থানটি যিয়ারত করতেন।

আমাদের কথা হলো, এটি একটি স্বপ্ন মাত্র। ঘটনাটি সত্যি সত্যি আহমদ ইবনে কাসির-এর হলেও এর ওপর শরয়ি বিধান কার্যকর হবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

فَبَعَثَ اللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِي الْأَرْضِ لِيُرِيَهُ كَيْفَ يُوَارِي سَوْءَةَ أَخِيهِ قَالَ يَا وَيْلَتَا أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِيَ سَوْءَةَ أَخِي فَأَصْبَحَ مِنَ النَّادِمِينَ (৩১) "তারপর আল্লাহ এক কাক পাঠালেন, যে তার ভাইয়ের শবদেহ কীভাবে গোপন করা যায়, তা দেখানোর জন্য মাটি খনন করতে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি। (সূরা মায়েদা : ৩১) তারপর সে অনুতপ্ত হলো।

কেউ কেউ উল্লেখ করেন, কাবীল হাবীলকে হত্যা করে এক বছর পর্যন্ত মতান্তরে একশ বছর পর্যন্ত তাকে নিজের পিঠে করে ঘুরে বেড়ায়। এরপর আল্লাহ তাআলা দুটি কাক প্রেরণ করেন।

সুদ্দী রহ. সনদসহ কয়েকজন সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন: দুই ভাই (ভাই সম্পর্কীয় দুটি কাক) পরস্পর ঝগড়া করে একজন অপরজনকে হত্যা করে ফেলে। তারপর মাটি খুঁড়ে তাকে দাফন করে রাখে। কাবীল এ দৃশ্য দেখে বলে - يَا وَيْلَنَا أَعْجَزْتُ এরপর সে কাকের ন্যায় হাবীলকে দাফন করে।

ইতিহাস ও সীরাত বিশারদগণ বলেন, আদম আ. তাঁর পুত্র হাবীলের জন্য অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন এবং এ বিষয়ে কয়েকটি পঙক্তি আবৃত্তি করেন। ইবনে জারির রহ. ইবনে হুমায়দ থেকে তা উল্লেখ করেন। যথা- تَغَيَّرَتِ الْبِلَادُ وَمَنْ عَلَيْهَا . فَوَجْهُ الْأَرْضِ مُغْبَرٌّ قُبْحٌ تَغَيَّرَ كُلٌّ ذِي لَوْنٍ وَطَعْمٍ ، وَقَلَّ بَشَاشَةُ الْوَجْهِ الْمَلِيحِ

"জনপদ ও জনগণ সব উলট-পালট হয়ে গেছে। পৃথিবীর চেহারা এখন ধূলি-ধূসর ও মলিনরূপ ধারণ করেছে। কোনো কিছুরই রং-রূপ স্বাদ-গন্ধ এখন আর আগের মতো নেই। লাবণ্যময় চেহারার ঔজ্জ্বল্যও আগের চেয়ে কমে গেছে।" এরপর আদম আ.-এর উদ্দেশ্যে বলা হয়-

أَبَا هُبَيْلٍ قَدْ قُتِلَا جَمِيعًا ، وَصَارَ إِلَى كَالْمَيِّتِ الذَّبْحِ وَجَاءَ بِشَرَّة قَدْ كَانَ مِنْهَا . عَلَى خَوْفٍ فَجَمَاء بِهَا يَصِيحُ .

"হে হাবীলের পিতা! ওরা দুজনই নিহত হয়েছে। আর বেঁচে থাকা লোকটিও জবাইকৃত মৃতের মতো হয়ে গেছে। সে এমন একটি অপকর্ম করল, ফলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আর্তনাদ করতে করতে ছুটতে লাগল।"

এ পঙক্তিগুলোও সন্দেহমুক্ত নয়। হতে পারে আদম আ. পুত্রশোকে নিজের ভাষায় কোনো কথা বলেছিলেন। পরবর্তীকালে কেউ তা এভাবে ছন্দরূপ দেয়। এ ব্যাপারে বেশ মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।

মুজাহিদ রহ. উল্লেখ করেন, কাবীল যে-দিন তার ভাইকে হত্যা করেছিল সেদিনই নগদ নগদ তাকে এর শাস্তি প্রদান করা হয়। মাতা-পিতার অবাধ্যতা, ভাইয়ের প্রতি হিংসা এবং পাপের শাস্তিস্বরূপ তার পায়ের গোছাকে উরুর সাথে ঝুলিয়ে এবং মুখমণ্ডলকে সূর্যমুখী করে রাখা হয়েছিল। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "পরকালের জন্য শাস্তি সঞ্চিত রাখার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তাকে নগদ শাস্তি প্রদান করেন। শাসকের বিরুদ্ধাচরণ ও আতীীয়তা ছিন্ন করার মতো এমন জঘন্য অপরাধ আর নেই।"

আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত তাওরাতে রয়েছে, আল্লাহ তাআলা কাবীলকে অবকাশ দিয়েছেন। সে এডেনের পূর্ব দিকে অবস্থিত নূদ অঞ্চলের কিন্নীন নামক স্থানে কিছুকাল বসবাস করেছিল। খানুখ নামে তার একটি সন্তানও জন্ম হয়েছিল। তারপর খানুখের ঔরসে উনদুর, উনদুরের ঔরসে মাহওয়াবিল, মাহওয়াবিলের ঔরসে মুতাওয়াশিল এবং মুতাওয়াশিলের ঔরসে লামাকের জন্ম হয়। এই লামাক দুই মহিলাকে বিবাহ করে। একজন হল আদা অপরজন সালা। আদা ইবিল নামের এক সন্তান প্রসব করে। এ ইবিলই প্রথম ব্যক্তি, যে গম্বুজাকৃতির তাবুতে বসবাস করে এবং সম্পদ আহরণ করে। আদার গর্ভে নওবিল নামের আরেকটি সন্তান জন্ম হয়। যে সর্বপ্রথম বাদ্যযন্ত্র ও করতাল ব্যবহার করে।

অপরদিকে 'সালা' তুবলাকিন নামের একটা সন্তান প্রসব করেন। তুবলাকিনই প্রথম তামা ও লোহা ব্যবহার করেন। সালা একটি কন্যা সন্তানও প্রসব করেন। তার নাম ছিল নামা।

কথিত তাওরাতে আরো আছে, আদম আ. একবার স্ত্রী সহবাস করলে তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। স্ত্রী তার নাম 'শীষ' রেখে বললেন, কাবীল কর্তৃক নিহত হাবীলের পরিবর্তে আমাকে এ সন্তান দান করা হয়েছে। তাই তার এ নাম রাখা হলো। শীষের ঔরসে 'আনুশ'-এর জন্ম হয়।

কথিত আছে, শীষের যেদিন জন্ম হয় সেদিন আদম আ.-এর বয়স ছিল একশ ত্রিশ বছর। এরপর তিনি আরো আট শ' বছর বেঁচেছিলেন। আনুশের জন্মের দিন 'শীষ'-এর বয়স ছিল একশ পঁয়ষট্টি বছর। 'আনুশ' ছাড়া তাঁর আরো কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। আনুশের বয়স যখন নব্বই বছর, তখন তার পুত্র 'কীনান'-এর জন্ম হয়। তারপর যখন কীনানের বয়স সত্তর বছরে উপনীত হয়, তখন তাঁর ঔরসে 'মাহলাইল'-এর জন্ম হয়। তারপর মাহলাইল পঁয়ষট্টি বছর বয়সে উপনীত হলে তার পুত্র 'ইয়ারদ'-এর জন্ম হয়। তারপর 'ইয়ারদ' একশ বাষট্টি বছর বয়সে পৌঁছলে তাঁর পুত্র 'খানুখে'র জন্ম হয়। তারপর খানুখের বয়স পঁয়ষট্টি বছর হলে তার পুত্র মুতাওয়াশালিহ এর জন্ম হয়। তারপর যখন মুতাওয়াশালিহ একশ সাতাশি বছর বয়সে উপনীত হন, তখন তাঁর পুত্র 'লামাক' এর জন্ম হয়। লামাক এর বয়স একশ' বিরাশি বছর হলে তার ঔরসে নূহ আ.-এর জন্ম হয়।

এরপর আদম আ. আরো পাঁচ শ' পঁচানব্বই বছর বেঁচে থাকেন। এ সময়ে তাঁর আরো কয়েকজন ছেলে-মেয়ে জন্ম হয়। তারপর নূহ আ.-এর বয়স পাঁচশ বছর হলে তাঁর ঔরসে সাম, হাম ও ইয়াফিছ'-এর জন্ম হয়। এ হলো আহলে কিতাবদের গ্রন্থের বর্ণনা। উক্ত ঘটনাপঞ্জি আসমানি কিতাবের বর্ণনা কি-না, এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে। বহু আলেম এ ব্যাপারে আহলে কিতাবদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

উল্লেখ্য, এ বর্ণনায় অবিবেচনাপ্রসূত অতিকথন রয়েছে। অনেকে এ বর্ণনাটির ব্যাখ্যাস্বরূপ অনেক সংযোজন করেছেন এবং তাতে যথেষ্ট ভুলও রয়েছে। যথাস্থানে বিষয়টি আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

ইমাম আবু জাফর তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে কতিপয় আহলে কিতাবের বরাতে উল্লেখ করেছেন, আদম আ.-এর ঔরসে হাওয়া আ.-এর বিশ গর্ভে চল্লিশজন সন্তান প্রসব করেন। ইবনে ইসহাক এ বক্তব্য দিয়ে তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। কেউ কেউ বলেন, হাওয়া আ. প্রতি গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান করে একশ' বিশ জোড়া সন্তান জন্ম দেন। এদের সর্বপ্রথম হলো, কাবীল ও তার বোন কালিমা আর সর্বশেষ হল আবদুল মুগিছ ও তাঁর বোন উম্মুল মুগিছ। এরপর মানুষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সংখ্যায় তারা অনেক হয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিস্তার লাভ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

"হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। আর যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকেও সৃষ্টি করেছেন। এবং যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।" (সূরা নিসা: ১)

ঐতিহাসিকগণ বলেন, আদম আ. তাঁর ঔরসজাত সন্তান এবং তাদের সন্তানদের সংখ্যা চার লাখে উপনীত হওয়ার পর ইনতেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتْ بِهِ فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللَّهَ رَبَّهُمَا لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ (۱۸۹) فَلَمَّا آتَاهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهُ شُرَكَاءَ فِيمَا آتَاهُمَا فَتَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

"তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সে এক লঘু গর্ভধারণ করে এবং তা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে; গর্ভ যখন গুরুভার হয় তখন তারা উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে দোয়া করেন- যদি তুমি আমাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দাও, তবে তো আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। তারপর যখন তিনি তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দান করা হয়, সে সম্বন্ধে আল্লাহর শরিক করে; কিন্তু তারা যাকে শরিক করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে।"

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম আদম আ.-এর কথা উল্লেখ করে পরে ভ্রূণ তথা মানবজাতির আলোচনা করেছেন। এর দ্বারা হযরত আদম ও হাওয়া আ.কে বুঝানো হয় নি। বরং ব্যক্তি উল্লেখের দ্বারা মানব জাতিকে বুঝানো উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (১২) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (১৩) "আমি মানুষকে মৃত্তিকার উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্র বিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। (সূরা ত্বহা: ১২-১৩)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِلشَّيَاطِينِ "আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং তাদেরকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ।" (সূরা মুল্ক: ৫)

এটা জানা কথা, এখানে শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ সত্যি সত্যি আকাশের নক্ষত্ররাজি নয়। বরং আয়াতে নক্ষত্র শব্দ উল্লেখ করে নক্ষত্র শ্রেণী বুঝানো হয়েছে।

• ইমাম আহমদ রহ. বলেন, এক হাদিসে আছে- হাওয়া আ.-এর সন্তান জন্মগ্রহণ করে বাঁচতো না। একবার তাঁর একটি সন্তান জন্ম হলে ইবলিস তাঁর কাছে গমন করে বলল, তুমি এর নাম আবদুল হারিস রেখে দাও, তবে সে বাঁচবে। হাওয়া তার নাম আবদুল হারিস রেখে দিলে সে বেঁচে যায়।

আমাদের কথা হলো, আল্লাহ তাআলা আদম ও হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছেন, তারা মানবজাতির উৎসমূল হবেন। তাঁদের থেকে তিনি বহু নর-নারী বিস্তার করবেন। সুতরাং উপরিউক্ত হাদিসে যা উল্লেখ করা হয়েছে, যদি তা যথার্থ হয়ে থাকে, তা হলে হাওয়া আ.-এর সন্তান না বাঁচার কী যুক্তি থাকতে পারে? তাই হাদিসটি মারফু আখ্যা দেওয়া ভুল। মওকুফ হওয়াই যথার্থ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 হযরত শীষ আ.-কে অসিয়ত

📄 হযরত শীষ আ.-কে অসিয়ত


শীষ অর্থ আল্লাহর দান। হাবীল নিহত হওয়ার পর হযরত আদম আ. এ পুত্র সন্তান লাভ করেছিলেন। তাই হযরত আদম ও হাওয়া আ. তাঁর এ নাম রেখেছিলেন।

• হযরত আবু যর রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তাআলা একশ চারখানা সহিফা (পুস্তিকা) নাযিল করেছেন। তন্মধ্যে পঞ্চাশটি নাযিল করেন শীষ আ.-এর ওপর।

• মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন: হযরত আদম আ.-এর ওফাতের সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন তিনি তাঁর পুত্র শীষ আ. কে কাছে ডেকে অসিয়ত ও নসিহত করেন। তিনি পুত্র শীষ আ. কে দিন ও রাতের সময়গুলোর পরিচয় করিয়ে দেন এবং এ সময়ের ইবাদতসমূহের শিক্ষা দেন। পরবর্তীকালে যে মহা তুফান সংঘটিত হবে, তিনি সে খবরও তাঁকে জানিয়ে দেন।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি নবী ছিলেন। ইবনে হিব্বান তাঁর সহি কিতাবে আবু যর রাযি. থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হযরত শীষ আ.-এর ওপর পঞ্চাশটি সহিফা নাযিল হয়। এরপর তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে তাঁর অসিয়ত অনুসারে তাঁর পুত্র আনুশ, তারপর তাঁর পুত্র কিনান দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তারপর তিনিও মৃত্যুবরণ করলে তাঁর ছেলে মাহলাইল দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

পারসিকদের মতে মাহলাইল সপ্ত রাজ্যের তথা গোটা পৃথিবীর রাজা ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম গাছপালা কেটে শহর, নগর ও বড় বড় দুর্গ নির্মাণ করেন। বাবেল ও আল-আকসা' নগরী তিনিই নির্মাণ করেন। তিনিই ইবলিস ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের পরাজিত করে তাদেরকে পৃথিবীর সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে এবং বিভিন্ন পাহাড় উপত্যকায় তাড়িয়ে দেন। তিনি একদল অবাধ্য জিন-ভূতকেও হত্যা করেন। তাঁর একটি বড় মুকুট ছিল। তিনি লোকজনদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা প্রদান করতেন। তাঁর রাজত্ব চল্লিশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়ারদ তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর তাঁরও মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আপন পুত্র খানুখকে অসিয়ত করে যান। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী এ খানুখই হলেন হযরত ইদরিস আ.

📘 কাসাসুল আম্বিয়া > 📄 ওফাত লাভ

📄 ওফাত লাভ


ওফাত লাভ • মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আদম আ. তাঁর পুত্র শীষ আ. কে অসিয়ত করেন। তাতে রাত ও দিবসের ক্ষণসমূহ এবং সেসব ক্ষণের ইবাদতসমূহ শিখিয়ে যান ও ভবিষ্যতে আসন্ন তুফান সম্পর্কে অবহিত করে যান।

• মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, আজকের সকল আদম সন্তানের বংশধারা শীষ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায় এবং শীষ ছাড়া আদম আ.-এর অপর সব কটি বংশধারাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আল্লাহ পাকই সর্বজ্ঞ।

জুমার দিন দিন আদম আ. শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের কিছু সুগন্ধি ও কাফন নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করেন এবং তাঁর পুত্র ও স্থলাভিষিক্ত শীষ আ.-কে সান্ত্বনা দান করেন। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. বলেন, সেই সঙ্গে সাত দিন সাত রাত পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ লেগে থাকে।

• ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে যামরা সাদী বলেন, মদিনায় আমি এক প্রবীণ ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে লোকেরা বলল, তিনি উবাই ইবনে কাব রাযি.। তখন তিনি কথা প্রসঙ্গে বললেন, "আদম আ.-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর পুত্রদের বললেন, আমার জান্নাতের ফল খেতে ইচ্ছা হয়। তাঁরা ফলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

পথে তাঁদের সঙ্গে কতিপয় ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ ঘটে। তাদের সাথে আদম আ.-এর কাফন, সুগন্ধি, কয়েকটি কুঠার, কোদাল ও থলে ছিল। ফেরেশতাগণ তাদের বললেন, হে আদম-পুত্রগণ। তোমরা কী চাও এবং কী খুঁজছ? কিংবা বললেন, তোমরা কী উদ্দেশ্যে এবং কোথায় যাচ্ছ? উত্তরে তারা বললেন, আমাদের পিতা অসুস্থ। তিনি জান্নাতের ফল খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা শুনে ফেরেশতাগণ বললেন, তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের পিতার ইনতেকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর কাছে এলে হাওয়া আ. তাদের চিনে ফেলেন এবং আদম আ. কে জড়িয়ে ধরেন। তখন আদম আ. বললেন, আমাকে ছেড়ে দিয়ে তুমি সরে যাও। কারণ, তোমার আগেই আমার ডাক পড়েছে। অতএব আমার ও আমার মহান রব-এর ফেরেশতাগণের মধ্য থেকে তুমি সরে দাঁড়াও।

ফেরেশতাগণ তাঁর জান কবয করে নিয়ে তাঁকে গোসল দেন। কাফন পরান। সুগন্ধি মাখিয়ে দেন। এবং তাঁর জন্য বগলী কবর খুঁড়ে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর তাঁকে কবরে রেখে দাফন করেন। এরপর তাঁরা বললেন, হে আদমের সন্ত নিগণ! এ হলো তোমাদের দাফনের নিয়ম। এ বর্ণনাটির সনদ সহি।

* ইবনে আসাকির রহ. ইবনে আব্বাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ফেরেশতাগণ আদম আ.-এর জানাযায় চারবার, আবু বকর রাযি. ফাতেমা রাযি.-এর জানাযায় চারবার, হযরত ওমর রাযি. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর জানাযায় চারবার এবং সুহাইব রাযি. হযরত ওমর রাযি.-এর জানাযায় চারবার তাকবির পাঠ করেন। ইবনে আসাকির বলেন, শায়বান ছাড়া অন্যান্য রাবি মাইমুন সূত্রে ইবনে ওমর রাযি. থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00