📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 আরবদের চোখে সুন্নাহ ব্যক্তিগত, সামাজিক নয়

📄 আরবদের চোখে সুন্নাহ ব্যক্তিগত, সামাজিক নয়


কুরআনের বহু স্থানে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত না মানার পক্ষে আরবের মুশরিকদের যুক্তি ছিল: পূর্বপুরুষদের অনুসরণ। সূরা বাকারায় আছে,
﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ مَابَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ ءَابَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ﴾ [البقرة: ١٧٠]
"যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমাদের উপর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ করো; তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষকে যার উপর পেয়েছি তার অনুসরণ করব। যদি তাদের পিতৃপুরুষরা কিছু না বুঝে এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তাহলেও কি?” [সূরা আল-বাকারা: ১৭০]

সূরা আ'রাফে আছে,
﴿وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا ءَابَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ﴾ [الاعراف: ٢٨]
"তারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে বলে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষকে এর উপর পেয়েছি আর আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বলুন, আল্লাহ অশ্লীল কোনো কিছুর নির্দেশ দেন না। নাকি আল্লাহর উপর এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না?” [সূরা আল-আ'রাফ: ২৮]

অধিকাংশ প্রসিদ্ধ পৌত্তলিক গোষ্ঠীর যুক্তি এটাই ছিল। ইব্রাহীম 'আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ও একই যুক্তি দিয়েছিল। ফেরাউন আর তার সতীর্থরা মুসা 'আলাইহিস সালামকে বলেছিল,
﴿قَالُوا أَجِئْتَنَا لِتَلْفِتَنَا عَمَّا وَجَدْنَا عَلَيْهِ ءَابَاءَنَا وَتَكُونَ لَكُمَا الْكِبْرِيَاءُ فِي الْأَرْضِ وَمَا نَحْنُ لَكُمَا بِمُؤْمِنِينَ﴾ [يونس: ۷۸]
"তুমি কি এসেছ আমরা আমাদের পিতৃপুরুষকে যাতে পেয়েছি তা থেকে আমাদেরকে ফেরাতে এবং যেন যমীনে তোমাদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়? আর আমরা তো তোমাদের প্রতি বিশ্বাসী নই।” [সূরা ইউসুফ: ৭৮]

যুক্তিটা হলো, পূর্বপুরুষের যেহেতু কর্তৃত্ব আছে, সুতরাং তাদের কাজ মাত্রই প্রমাণ। সুতরাং যখন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পূর্ববর্তী নবীরা তাওহীদের দাওয়াত দেন, তখন মুশরিকরা এই দাওয়াতকে পিতৃপুরুষের কর্তৃত্বের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাদের কাছে এই কর্তৃত্বই মাপকাঠি। এর আলোকেই তারা সঠিক চালচলন নির্ধারণ করবে। অথবা এক কথায় বললে এটাই 'সুন্নাহ'। আর এই সুন্নাহ স্বভাবতই অনুসরণীয়, সম্মানিত ও সমাজের সামষ্টিক কাজ। কবি লাবীদ সংক্ষেপে এর ব্যাপারে বলেন, '(আমরা) এমন সম্প্রদায়ের, যাদের জন্য তাদের পূর্বপুরুষ রীতি-নীতি প্রণয়ন করেছিল। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই আছে নির্দিষ্ট রীতি-নীতি ও নেতা।'

সুতরাং একক ব্যক্তির কর্ম (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ) দিয়ে কখনো পূর্ববর্তী বহু মানুষের সামষ্টিক কর্মকে (তাদের সুন্নাহকে) যাচাই করা যাবে না। গোল্ডযিহার বলেন, 'শুরু থেকে সুন্নাহর অর্থ ছিল ঐ সকল আরবের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন শুধরানোর মাপকাঠি, যারা ইসলামের মাধ্যমে এমন জীবনাচার ও সমাজব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল যা দীন-ইসলামের বিশ্বাসের সাথে খাপ খায়। মুসলিমদের জন্য নতুন ধারণা উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কারণ তারা জাহেলী যুগের পৌত্তলিকদের মাঝে বসবাস করত। তাদের কাছে সুন্নাহ অর্থ ছিল আরবদের ঐতিহ্য, রীতিনীতি, প্রথা ও অভ্যাসের সাথে মিলে যায় এমন সকল কিছু। এ অর্থে সুন্নাহ ইসলামী যুগগুলোতে অন্যান্য আরব সমাজেও ব্যবহৃত হত, যে সমাজগুলো দীন ইসলাম দ্বারা খুব কমই প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু ইসলামের আগমনে 'সুন্নাহ' কথাটার পুরাতন অর্থে পরিবর্তন দেখা দেয়। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তার অনুসারীদের প্রথম প্রজন্মের কাছে সুন্নাহ ছিল নবী এবং প্রথম যুগের সাহাবীদের কাজকর্ম। মুসলিমদের দায়িত্ব ছিল নতুন সুন্নাহর আনুগত্য করা, যেমনিভাবে পৌত্তলিক আরবেরা তাদের পূর্বপুরুষদের সুন্নাহর অনুকরণ করত। ইসলামে সুন্নাহর এই সংজ্ঞা প্রাচীন আরবের লোকজনের নানান মত থেকে ঈষৎ পরিবর্তন করে সৃষ্ট।'

তার কথা মৌলিকভাবে একদিক দিয়ে সঠিক। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, জাহেলী পৌত্তলিকতা আর ইসলামের মাঝে ধর্মীয় ও জ্ঞানগত দিক থেকে পার্থক্য বিদ্যমান। কেননা ইসলামের মৌলিক অবস্থা হলো জীবনপদ্ধতি হিসেবে তাওহীদকে আঁকড়ে ধরা এবং শির্ক প্রত্যাখ্যান করা। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদের সাথে সম্পৃক্ত কোনো কিছুর ব্যাপারে কোনো ধরনের শিথিলতা করেননি। অন্যভাবে বললে 'আরব সমাজে ইসলামের প্রবেশ শুধু বর্বর অমানবিক কিছু প্রথার সমাপ্তি ঘটায়নি, বরং পূর্বের জীবনপদ্ধতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে নতুন জীবনপদ্ধতি হাজির করেছে।' আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই নতুন জীবনপদ্ধতির 'প্রতীক' হয়েছিলেন। তিনি পুরাতন কোনো জীবনপদ্ধতিকে কিছুটা কাঁটছাট করেছিলেন এমনটা নয়। বরং দীন ইসলাম পূর্বপুরুষদের সুন্নাহকে তাওহীদের প্রকৃত পিতা ইব্রাহীম 'আলাইহিস সালামের সুন্নাহ থেকে বিচ্যুতি মনে করে। এই বিচ্ছিন্নতা ও পার্থক্যের বিবেচনায় ইসলাম খ্রিষ্টধর্ম থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। খ্রিষ্টধর্ম 'ছিল খুবই শিথিল ও নমনীয়। বিভিন্ন ধর্মীয় ঝোঁক ও প্রচলিত প্রথাকে খ্রিষ্টধর্ম সাদরে গ্রহণ করে নেয়। গ্রীক-রোমান জগতের বহু রীতি-নীতি নিজের অজান্তেই সে নিজের বিশ্বাসে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।'

সংক্ষেপে বললে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ছিল আরবদের সুন্নাহকে সমূলে উৎপাটনকারী এবং সমালোচনামূলক। আরবের মুশরিকদের মাঝে এই ধ্যান-ধারণা উপস্থিত ছিল, যেমনিভাবে অন্যদের মাঝেও ছিল। কুরআন কারীম (প্রাচ্যবিদদের কাছে যেটা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বক্তব্য) যেমনটা বলেছে। কিন্তু কেন এই ধ্যান-ধারণা বা চিন্তা? কেন পিতৃপুরুষের সুন্নাহর ধারণা আরব-অনারব সব সমাজ প্রচলিত ছিল? এই মানবীয় ধারণা মূলত প্রাচীন জাতিসমূহের মাঝে ইতিহাস সম্পর্কে মূল্যবোধ-সম্বলিত চিন্তা থাকার সাথে সম্পৃক্ত। নিছক অনুকরণের প্রাচীনত্বই আদর্শিক নমুনার মাপকাঠি হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু শাক্ত ও অন্যান্য প্রাচ্যবিদদের চোখে সুন্নাহর যে সামাজিক ধারণা, সেটার সমালোচনায় মূল পয়েন্ট হলো: সুন্নাহ সামষ্টিক নয়, এর উৎস ব্যক্তি। প্রাচীন সভ্যতাসমূহের বিভিন্ন নমুনায় (যেমন- ইলিয়াড বা ওডিসা যেটার কথা আমরা এই বইয়ের শুরুতে বলেছি) কিছু বীর বা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ভক্তির সাথে স্মরণ করা হয়। আরবীতে বলতে গেলে এদেরকে 'ইমাম' বলে গণ্য করা হয়। 'বিভিন্ন জাতির মহান বীরদেরকে প্রায়শ স্রষ্টার বংশোদ্ভূত বলে মর্যাদা প্রদান করা হত। এর থেকে বোঝা যায় ইতিহাসের উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের গুরুত্ব।' এ সকল বীরদের জীবনী পরবর্তীদের জন্য আদর্শ, নিছক ইতিহাস নয়। ভাষাবিদ মিল ব্রাভম্যান (M.M. Bravmann) খুব শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, আরবদের কাছে সুন্নাহ 'ব্যক্তিগত'। তিনি মনে করেন 'সুন্নাহ হলো সেই চলার পথ যেটাকে অঙ্কন করে সাজিয়ে চর্চার পরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন নির্দিষ্ট ব্যক্তি (যিনি কালের পরিক্রমায় বিস্মৃত হয়ে গিয়েছেন) অথবা মাঝে মাঝে এটা করেছে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি। আর সামাজিক প্রথা হিসেবে এর অর্থটা গৌণ।' এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় 'নবীজীর চর্চা বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত চর্চা যেটা তিনি করেছেন, সমাজের চর্চা নয়।' সুন্নাহ 'স্বাভাবিকভাবে নবীজীর সুন্নাহকে বোঝায়, যদিও তার নাম না বলা হয়।'

আর সুন্নাহর অর্থ হিসেবে যে 'পন্থা'র কথা বলা হয়, সেটা অর্থগত দিক থেকে নেতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত (আর নেতৃত্ব নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়)। আল্লাহর বাণী "আমরা তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম, আর তারা উভয়ে স্পষ্ট পথের উপর ছিল” এর ব্যাখ্যায় ক্বাতাদাহ ও মুজাহিদ বলেন, 'অর্থাৎ পথের উপর'। ইমাম ত্বাবারী বলেন, ইমাম 'এমন পথ যেটা তারা সফরে অনুসরণ করে' আর মুবিন 'যিনি সুপথে চলেন, তার সঠিক চলনের কারণে সেটা তার জন্য স্পষ্ট হয়ে যায়'। আর পথকে 'ইমাম' বলা হয়েছে, কেননা সেটা অনুসরণীয়। ইতিহাসের ব্যাপারে মূল্যবোধ-সম্বলিত চিন্তা আরো স্পষ্ট প্রকাশ পায় আরবের লোকেরা যখন 'সীরাহ' এবং 'সুন্নাহ' শব্দ দুটি একটি অন্যটির জায়গায় ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, আলী ইবন আবী ত্বালিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা যাওয়ার পর আবু বকর খলীফা হলেন। তিনি তার মতো কাজ করলেন। তার সীরাহ অনুসরণ করলেন। অবশেষে আল্লাহ তাকে নিয়ে গেলেন। তারপর উমর খলীফা হলেন। তিনি তাদের দুজনের মতো কাজ করলেন। তাদের সীরাহ অনুসরণ করলেন। অবশেষে আল্লাহ তাকে নিয়ে গেলেন।' এখানে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সীরাহ অর্থ আমরা সীরাতের বইয়ে যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনাবলি পড়ি সেগুলো উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য নবীজীর যে কর্মপন্থা অনুসরণ করা আবশ্যক। মুখতারুস সিহাহ প্রণেতা 'সুন্নাহ' মূলধাতুর অধীনে বলেন, 'সুন্নাহ হলো সীরাহ। হুযাইল গোত্রের কবি খালিদ ইবন যুহাইর বলেন,
فلا تجزعن من سنة أنت سرتها *** فأول راض سنة من يسيرها
আপনি যে সুন্নাহর উপর চলেছেন, সেটার ব্যাপারে দুর্ভাবনায় ভুগবেন না। কেউ যখন কোনো পথে চলে, তখন সেই সুন্নাহর উপর সর্বপ্রথম সন্তুষ্ট ব্যক্তি সে-ই থাকে।'

সারকথা হলো, সুন্নাহ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব, জীবনী ও কর্মের সাথে সম্পৃক্ত। প্রথম প্রজন্মের লোকজন যদিও প্রতিষ্ঠিত আমলকে সুন্নাহ বলত, হোক সেটা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ কিংবা তার পরবর্তী খলীফাদের, তবুও প্রথম প্রজন্মের লোকজন মনে করত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংঘটিত বিষয় অন্যদের থেকে পৃথক। অন্য যে কারো উপর তার অগ্রাধিকার আছে। সাহাবীদের সুন্নাহসমূহও তার দিকে ফিরে যায়। গবেষক উইলিয়াম গ্রাহাম (William A. Graham) হাদীসে কুদসীর উপর একটা গবেষণা করেছেন যার শিরোনাম 'Divine Word and Prophetic Word in Early Islam'। গবেষণার মূল বক্তব্য ছিল সাহাবীরা কখনো কুরআন-হাদীসকে প্রমাণ বিবেচনায় ভিন্ন মনে করতেন না; সে ব্যাপারে দলীল হলো উভয়ের মাঝে সংযোগ স্থাপনকারী বিষয় তথা হাদীসে কুদসীর উপস্থিতি। গ্রাহাম বলেন, 'পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমদের জন্য হাদীস বাদ দিয়ে শুধু কুরআন বোঝা এবং সেটা অনুযায়ী জীবন ধারণ করা সম্ভব না, ঠিক যেমনিভাবে সাহাবীদের পক্ষে নবীজীর মাধ্যম ছাড়া কুরআন গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। তিনি তাদের কাছে কুরআন ব্যাখ্যা করে দেন এবং নতুন সমাজকে (মুসলিম সমাজ) পরিচালিত করার কাজে ব্যবহার করেন। ওহী এবং নবীজীর বার্তা উভয়টা একত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উর্ধ্বতন কার্যক্রমের মূল বলে বিবেচিত হয়। এই দুটি বিষয় একত্রিত হয়ে ইসলামের ইতিহাসের সূচনালগ্নে থাকা পবিত্র অংশে পরিণত হয়।' তিনি আরো বলেন, 'বড় বড় সাহাবী-তাবেয়ীদের সমাজে জীবন্ত এই সুন্নাহ নবীজীর সুন্নাহ থেকে ভিন্ন কোনো মাপকাঠির উপর গড়ে তোলা হয়েছে এমন ধারণা করাটা ভুল। নবুওয়াত পরবর্তী সমাজ যেভাবে সুন্নাহকে চর্চা করে এসেছে, সেটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে সুন্নাহর চর্চিত অবস্থারই চলমান রূপ।'

ইয়াসিন ডুটন (Yasin Dutton) ইমাম মালেকের মুয়াত্তা গ্রন্থের উপর একটি গবেষণা করেন। সেখানে তিনি সুন্নাহর চারটি প্রকরণ আলাদা করেন। প্রথমটা হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শিক কর্মকাণ্ড, অথবা বলতে গেলে কুরআনের 'জীবন্ত চিত্রায়ণ'। দ্বিতীয়টা হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের কর্মকাণ্ড। তৃতীয়টা হলো মদীনার লোকজনের মাঝে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান কর্মকাণ্ড। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইয়াসিন ডুটন দ্বিতীয় ও তৃতীয় অর্থে সুন্নাহর ব্যবহার 'নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কার্যক্রমের সাথে মৌলিকভাবে জড়িত থাকার কথা বলেছেন।' তিনি মনে করেন 'মদীনাবাসীদের সুন্নাহ নবীর কর্মকাণ্ড ও চর্চা থেকে উদ্ভূত, যেটাকে সাহাবীরা এবং তার পরে মালেকের সময়কাল পর্যন্ত মদীনাবাসীরা প্রয়োগ করেন।' আর 'সুন্নাহ শুধু মদীনার আলেমরা সংরক্ষণ করত না, বরং মদীনার সমাজ সুন্নাহকে সংরক্ষণ করত।'

এমনকি অনৈসলামিক উৎসসমূহও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মকাণ্ডকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণের বিষয়টা স্বীকার করে। প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধে 'মা-ওয়ারা-আন্নাহর' অঞ্চলে উত্তর-পশ্চিমে বসবাস করতেন এমন একজন সুরইয়ানী লেখক হলেন ইউহান্না ইবনুল ফানকী। তিনি মনে করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আরবদের পথপ্রদর্শক। আরবের লোকজন তার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী চলেছিল। তাকে 'অনুকরণ' করেছিল। রবার্ট হুইলান্ড মনে করেন এখানে 'অনুকরণ' বলতে উদ্দেশ্য হলো তারা 'তাকে আঁকড়ে ধরেছিল এবং তাদের নবীর আদর্শিক নমুনা হিসেবে গ্রহণ করেছিল।'

সুন্নাহর ব্যাপারে উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি যৌক্তিক, আর এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের ব্যাপারে প্রাচীন জাতিসমূহের ধারণার সাথে মিলে যায়। শাস্ত্রের বক্তব্যে যে বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থানের ধারণা পাওয়া যায়, সে রকম কিছু এখানে নেই। আবার এই দৃষ্টিভঙ্গি শাফেয়ীর স্পষ্ট বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তিনি বলেছেন, "নিজেকে আলেম বলেছে অথবা লোকজন আলেম বলে অভিহিত করেছে এমন কাউকে আমি এ ব্যাপারে দ্বিমত করতে দেখিনি যে, আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলের নির্দেশ মান্য করা এবং তার বিধানের সামনে নিজেকে সমর্পণ করা আবশ্যক করেছেন। সেটা এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা নবীর পরবর্তী সবাইকে তার অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য কোনো অবস্থাতেই অনুসরণ করা আবশ্যক হবে না; কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া সব কিছু এই দুটিরই অনুগামী হবে। আমাদের আগের ও পরের মানুষদের উপর যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনা গ্রহণ করে নেওয়া আবশ্যক ছিল, তেমন বর্ণনা গ্রহণ করা আমাদের উপরও আবশ্যক।” শাস্ত্রের সৃষ্ট এই শূন্যস্থান উদঘাটন করে কুলসন বলেন, 'শাস্ত্রের গবেষণা পদ্ধতিগতভাবে এগিয়ে যে ফলাফলে উপনীত হয় সেটা হলো শরয়ী বিধি-বিধান সম্বলিত হাদীসগুলো সর্বোচ্চ একশত হিজরী পর্যন্ত পৌঁছায়। এভাবে সে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধযুক্ত সব বিধানের সত্যতা অস্বীকার করে। তার এমন সিদ্ধান্তের ফলে ইসলামের প্রথম যুগে শরয়ী বিধান প্রণয়নের বিবর্তন কল্পনা করার জায়গাটাতে একটা শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়।' তাই কুলসন এই শূন্যস্থান অস্বীকার করে বলেন, 'বাস্তবতার বিবেচনা করলে এবং তৎকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ভেবে দেখলে এমন শূন্যস্থান সৃষ্ট হওয়ার মতো ধারণা মেনে নেয়া খুব কঠিন। তার মানে এটা প্রস্তাব করছি না যে, এই হাদীসের অমুক বা তমুক সনদ সহীহ। কারণ এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়্টা এমন না। কিন্তু আমার প্রস্তাব হলো বহু হাদীস (বিশেষ করে যেগুলো প্রচলিত সমস্যাবলির ব্যাপারে বারংবার আসে এবং কুরআনের শরয়ী বিধান যেগুলোকে ফুটিয়ে তোলে) অন্ততপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৌখিক বর্ণনার সংরক্ষিত রূপকে তুলে ধরে। আর এই ভূমিকাটা যদি গ্রহণযোগ্য হয়েই থাকে, তাহলে এটা ইতিহাসের ব্যাপারে একটা যৌক্তিক বুদ্ধিভিত্তিক ভিত প্রদান করে, যেটা অনুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধকৃত যেকোনো বক্তব্য গ্রহণ আবশ্যক হয়ে যায়; যদি না এমন কোনো কারণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয় যার মাধ্যমে সেটা বানোয়াট হওয়া আবশ্যক হয়।'

ওয়ায়েল হাল্লাক বলেন, 'দলীল-প্রমাণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, রাসূলের মৃত্যুর পরই তার সুন্নাহর প্রকাশ ঘটে। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়, যেহেতু তার সমকক্ষ নয় এমন বহু আরব ব্যক্তিত্বও সুন্নাহ প্রণয়ন করেছে। সুতরাং ইসলামের প্রথম সমাজে সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনাচরণের আদর্শিক নমুনা হিসেবে থাকবেন না এমনটা মানা কঠিন; যেখানে কুরআন মুমিনদেরকে বহু স্থানে স্পষ্ট তার আনুগত্য করা এবং তার কর্মের অনুসরণ করতে বলেছে। কুরআনের সেই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।'

ফযলুর রহমান মালেক বলেন, 'বিংশ শতাব্দীতে এসে এটা দাবি করা বালখিল্য হবে যে, নবীজীর আশেপাশে থাকা মানুষেরা কুরআন এবং সুন্নাহকে পৃথক চোখে দেখত; যে কারণে একটা বাদ দিয়ে অন্যটা আঁকড়ে ধরত। অর্থাৎ একটাকে অন্যটা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করত। সাহাবীরা কি একবারও প্রশ্ন করেনি যে, আল্লাহ কেন এই মানুষকে তার বার্তাবাহক হিসেবে নির্বাচন করেছেন? পরবর্তী যুগের বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক থেকে উৎসারিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ওহীর একজন রেকর্ডার মাত্র। এটা নবীজীর ব্যাপারে কুরআনী দৃষ্টিভঙ্গির পুরো বিপরীত, যেখানে নবীকে স্বতন্ত্র অবস্থান দেওয়া হয়েছে এবং বৃহৎ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।'

কিন্তু কুলসন স্ববিরোধিতা করে বলেন, 'আমরা যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি সেটা হলো, শাস্ত্রের গবেষণার মূলভিত্তি বর্জনীয় নয়। শরীয়ত হিসেবে নবীজীর দিকে যা কিছু সম্বন্ধযুক্ত করা হয় তার বড় অংশই বানোয়াট, পরবর্তী বিভিন্ন ফিকহী মত প্রতিষ্ঠার জন্য সেগুলোকে জাল করা হয়েছে।' এই স্ববিরোধিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না, যেখানে এই কুলসন স্বয়ং শাখতের বেশ শক্তপোক্ত সমালোচনা করেছেন, আবার যখন পক্ষ নিয়েছেন তখন শাস্ত্রের ভিত্তির পক্ষে কোনো দলীল প্রদান করেননি। এই শূন্যস্থানটাই নিষ্ফল মতভেদের মূল জায়গা যেটা হাদীসের উৎস নির্ণয়ে প্রাচ্যবিদদের গবেষণাকে আক্রান্ত করেছে। অর্থাৎ নিজেদের কল্পনা দিয়ে তারা যে শূন্যস্থান তৈরি করেছে। জন ওয়ালব্রিজ বলেন, 'যাইহোক, পশ্চিমের গবেষকরা যখন ইসলামের প্রথম দুই বা তিন প্রজন্মে ধর্মীয় মতভেদের প্রসঙ্গে হাদীসের উৎপত্তির খোঁজ করতে এবং সেগুলোর মূল খুঁজতে গিয়েছেন, তখন তারা মুসলিম আলেমদের থেকে বেশি সফল হননি। কারণ হাদীসের ইতিহাস তারা কীভাবে নির্ণয় করবে, সেটার ব্যাপারে তাদের মাঝে ঐকমত্য হয়নি। নানা পদ্ধতির উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটলেও সেগুলো হাদীসের অন্তর্নিহিত বিশ্বাসগত দিক অথবা হাদীসের সনদের উপর নির্ভর করেছে, আর এগুলোর কোনোটিই পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।'

আমরা সুন্নাহর যে নৃতাত্ত্বিক ভিত প্রতিষ্ঠা করলাম, এটা শাস্ত্রের প্রকল্পের মূলোৎপাটন করে দেয়। কারণ এটা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাবে-তাবেয়ীদের সংযোগকে অন্ততপক্ষে সম্ভাব্যতার স্তরে রেখে দেয়। আর বাস্তবে এটা বিচ্ছিন্নতার দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ঐতিহাসিকভাবে এমন বিচ্ছিন্নতার অসম্ভাব্যতা স্পষ্ট করে। (নবীজীর সাথে তাবে তাবেয়ীদের) যেকোনো প্রকার সংযোগের ধারণা শুনলেই শান্ত অস্বস্তি অনুভব করতেন। কারণ তিনি জানতেন এটা তার প্রকল্পের জন্য কতটা ভয়াবহ। তাই কুলসনের 'তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী' বইটা যখন কল্পিত শূন্যস্থানকে নাকচ করে দিল, তখন তার বিপক্ষে বিশাল খণ্ডন লিখে তিনি বলেন, 'কুলসন সাহেব প্রাচীন ইমামদের দিকে সম্বন্ধকৃত মাযহাব সাব্যস্ত করে পেছনে যেতে যেতে নবীজী পর্যন্ত সব সাব্যস্ত করে ফেলেছেন। বানোয়াট সনদগুলোকে তিনি নিঃসংকোচে মেনে নিয়েছেন। এর উপর ভিত্তি করে তিনি বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোর সনদসমূহ বাহ্যত দ্বিতীয় হিজরী শতকের মাঝামাঝিতে গিয়ে উদ্ভুত মনে হলেও এগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত মাযহাবসমূহ নবীজী থেকে প্রমাণিত বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলা যেতে পারে; যদি সেই বর্ণনাগুলো নবীজীর মাদানী সমাজের চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু তখনকার অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ ও এ মর্মে বানানো সনদগুলো কোনোটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ সেগুলো বানোয়াট। তার এই কথা মূলত মাযহাবগুলোকে বিপরীত দিক থেকে নির্ভরযোগ্য বলার চেষ্টা, সাথে সাথে নিজের মতেরও সমর্থন। কুলসন সাহেব নিজেকে তৃতীয় শতকের মুহাদ্দিসদের চাইতেও হাস্যকর করে তুলেছেন, যারা কিনা অন্তত কিছু হাদীস বর্জন করেছিল যেগুলো তাদের মাপকাঠিতে জাল বলে বিবেচিত হয়েছিল।'

উপর্যুক্ত খণ্ডন পড়লে বোঝা যায়, নবীজীর সুন্নাহর সাথে তাবে-তাবেয়ীদের কোনো ধরনের সংযোগের ইঙ্গিত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে শাস্ত্র কতটা দৃঢ় অবস্থানে। এমনকি এমন একজন পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ 'যিনি ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জায়গা থেকে শাস্তকে এত বেশি জানতেন যে, শাস্ত্রও তার সমালোচনামূলক লিখনীকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন' এবং যিনি সনদের ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতেন, তবুও তিনি কেবল সুন্নাহর ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হওয়ার কারণে তার কথা শাস্ত কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

আর বর্ণনার দিক (মুক্বলের) থেকে যদি আমরা প্রমাণের খোঁজ করি, তাহলে এমন বহু টেক্সট আছে যেগুলোতে ‘সুন্নাহ’ শব্দটা ব্যবহার করে উদ্দেশ্য করা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ। যেমন- সহীহ মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার বাণী, “আবত্বাহে অবতরণ করা সুন্নাহ না। এই জায়গায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করার কারণ বের হওয়ার সময় এটা তার জন্য সহজ ছিল।”

আবুত-তুফাইল বলেন, আমি ইবন আব্বাসকে বললাম, আপনার সম্প্রদায় দাবি করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবাঘরকে কেন্দ্র করে রমল (দ্রুতবেগে হাঁটছিলেন) করেছিলেন, আর সেটা সুন্নাহ। তিনি বললেন, ‘তারা সত্য বলেছে, মিথ্যাও বলেছে।’ আমি বললাম, ‘তারা কী সত্য বলল আর কী মিথ্যা বলল?’ তিনি বললেন, ‘সত্য বলেছে; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমল করেছেন। আর মিথ্যা বলেছে; এটা সুন্নাহ নয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধি চলাকালীন কুরাইশ সম্প্রদায় বলেছিল, ‘মুহাম্মাদ ও তার সাহাবীদের ছেড়ে দাও। তাদের নাক দিয়ে পোকা পড়তে পড়তে তারা মারা যাক।’ পরবর্তী বছর এসে মক্কায় তিন দিন থাকার শর্তে তাদের সাথে সন্ধি হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আসলেন। মুশরিকরা তখন কু‘আইক্কা‘আনের দিকে ছিল। তিনি সাহাবীদের বললেন, “তোমরা কাবাঘরকে কেন্দ্র করে তিন বার রমল করো।” আর এটা সুন্নাহ নয়। আমি বললাম, ‘আপনার সম্প্রদায় দাবি করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে চড়ে সাফা-মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করেছিলেন, আর এটা সুন্নাহ।’ তিনি বললেন, ‘তারা সত্য বলেছে, মিথ্যাও বলেছে।’ আমি বললাম, ‘তারা কী সত্য বলেছে আর কী মিথ্যা বলেছে?’ তিনি বললেন, ‘সত্য বলেছে; আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা-মারওয়ার মাঝে উটের পিঠে চড়ে তাওয়াফ করেছিলেন। আর মিথ্যা বলেছে; এটা সুন্নাহ নয়। মানুষজন তার থেকে দূরে সরত না, তাদেরকে দূরে সরানো যেত না। তাই তিনি উটের পিঠে চড়েছিলেন, যেন তারা তার কথা শুনতে পায়, তার জায়গা দেখতে পায় এবং তাদের হাত তার শরীর স্পর্শ না করে।'

আরো কিছু শরয়ী টেক্সট আছে যেগুলো প্রমাণ করে শাফেয়ীর আগে সাহাবীদের সুন্নাহ (যার কেন্দ্রবিন্দু নবীজীর সুন্নাহ) থেকে স্বতন্ত্র নববী সুন্নাহর ধারণা ছিল। সেই টেক্সটগুলো শাস্ত্রের চিন্তাধারা অনুযায়ী বোঝা সম্ভব নয়। শামের এক লোক ইবন উমারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, উমরাহ থেকে হজ্জ পর্যন্ত তামাতু' (ইহরাম থেকে মুক্ত থাকা) করা যাবে কিনা। তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার বলেছিলেন, 'এটা হালাল।' শামের লোকটা উত্তর দিয়েছিল, 'আপনার বাবা তো নিষেধ করেছেন।' আব্দুল্লাহ ইবন উমার বলেছিলেন, 'যদি আমার বাবা কোনো কিছু করতে নিষেধ করে যেটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছিলেন, তাহলে কি আমার বাবার নির্দেশ অনুসরণ করব? নাকি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ?' লোকটা বলল, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ।' ইবন উমার বললেন, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটা করেছেন।' সালেহ ইবন কাইসান (১৩০ হি.) বলেন, আমি আর ইবন শিহাব ইলম অর্জনের জন্য একত্র হলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা সুন্নাহ লিখব। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সূত্রে আমরা যা যা শুনলাম তার সবই লিখলাম। তারপর তার সাহাবীদের থেকে শ্রুত বিষয়গুলো লিখলাম। আমি বললাম, 'না, এটা সুন্নাহ নয়।' তিনি বললেন, 'বরং এটা সুন্নাহ।' তিনি লিখলেন, আমি লিখলাম না। সে সফল হলো, আমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে ফেললাম। শেষ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, শাফেয়ী যে সুন্নাহ বলতে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মনে করতেন সেটা তার আবিষ্কার নয়, বরং তার আগেও ছিল। আবার সুন্নাহ বলতে তিন প্রজন্ম একটা ব্যাপক বিষয়কে বুঝত, যেটা সাহাবীদের মতো প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বকে অন্তর্ভুক্ত করত। এই বিষয়টা শান্ত বুঝতে পারেন নি, তাই তিনি এই টেক্সট পড়ে ধারণা করেছেন যে, 'মদীনাবাসীরা নবীজীর বর্ণনার উপর সাহাবীদের বর্ণনাকে প্রাধান্য দিত'!

(নবীজীর) সুন্নাহ ছিল জাহেলী পূর্বপুরুষের সুন্নাহর সমালোচনার একটা উপকরণ, পাশাপাশি এর ছিল এক বৃহৎ সামাজিক কর্তৃত্ব, যার বাহক সাহাবী, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীরা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় 'সংরক্ষিত দীর্ঘতম সামাজিক বিবরণী, যেটাকে আজ পর্যন্ত সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা জেনেছে।

প্রথম যুগ থেকেই সমালোচনার বিশেষত্ব থাকায় দীন ইসলাম হয়ে পড়ে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জড়িত সকল কিছুর নির্ভরযোগ্য ইতিহাস। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর উচ্চতর অবস্থানের দিক থেকে, যেটা হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ। যখন 'ইসলাম এল, আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল এবং রাসূলে আরাবীর জীবনী বিস্তারিত জানার প্রয়োজন দেখা দিল যার থেকে তার সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে, তখনই কিছু মানুষ সুন্নাহ সংকলন ও লিখনীতে মনোযোগ দিলেন। এভাবে ইসলামে আরবদের ইতিহাসচর্চার সূচনা ঘটল।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামের ইতিহাসে সমালোচনা আর ইউরোপের রেনেসাঁর যুগে ইতিহাসে সমালোচনার সূচনার ক্ষেত্রে পার্থক্য। 'আমরা যদি ইউরোপীয়দের সমালোচনাকে আরব মুসলিমদের প্রথম যুগের সমালোচনার সাথে তুলনা করি, তাহলে দেখতে পাব দ্বিতীয়টা তার উপাদান, গবেষণার বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিক থেকে রেনেসাঁর যুগে সূচিত ইউরোপীয় ইতিহাসভিত্তিক সমালোচনার চাইতে ভিন্ন ছিল। কারণ আরবদের কাছে ইতিহাস গড়ে ওঠে হাদীসশাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে। আর হাদীসশাস্ত্র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় জ্ঞান। অর্থাৎ ইতিহাস ঐ সকল (ধর্মীয়) শাস্ত্রের সাথে মিশে গিয়ে নিজের উদ্দেশ্যকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে; যাতে সেগুলোর লক্ষ্যের সাথে মিলে যায়। আর এটা ইসলামের ইতিহাসশাস্ত্র গড়ে ওঠার সূচনালগ্নের কথা। এছাড়া ইতিহাস হাদীসশাস্ত্র থেকে ধর্মীয় লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপকরণ গ্রহণ করেছে, যেটা হলো জারহ-তা'দীল তথা মুহাদ্দিসদের দ্বারা চর্চিত হাদীসের সনদের সমালোচনা। ইতিহাসের সমালোচনাও একইভাবে ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহ যাচাইয়ের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে। সময়ের পরিক্রমায় আধুনিক ইতিহাসের সংহতি দুর্বল হওয়া এবং ইতিহাসের সমালোচনার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যাওয়ার পরও আরব মুসলিমরা যে ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক সমালোচনা সে সময়ে জেনেছিল সেটা খুব দুর্বলভাবে হলেও ধর্মীয় দিক এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত রয়ে গিয়েছে। আমরা দেখতে পাই রেনেসাঁর যুগে ইউরোপীয় ইতিহাসের সমালোচনা এমন পরিবেশে গড়ে ওঠে যার সাথে ধর্মের বিরোধ থাকুক কিংবা না থাকুক, কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় বিবেক-বুদ্ধিকে গীর্জার প্রভাব ও চিন্তার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে আনা। ফলে ইউরোপীয়রা (বিশেষ করে ইতালির লোকজন) তাদের ঐতিহাসিক গবেষণায় রেনেসাঁর যুগের আগ পর্যন্ত সকল ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক ঐতিহ্যকে সমালোচনার চোখে দেখে, তন্মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং গীর্জার ধর্মীয় ও সময়-নির্ভর কর্তৃত্বের স্থিত ভিতসমূহ। উদাহরণস্বরূপ আপনি তুলনা করে দেখতে পারেন পৌত্তলিক নানান টেক্সটের উপর রেনেসাঁর যুগের 'তত্ত্বীয় গবেষণা', যা কিনা খ্রিষ্টধর্মের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল; আর প্রাচীন ব্যক্তিদের বর্ণনার ক্ষেত্রে মুসলিম আলেমদের জ্ঞানগত মূল্যবোধ-নির্ভর গবেষণা 'যার মাধ্যমে তারা কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত প্রাচীন জাতিসমূহের দিকে কৃত ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা করেছিল।'

সাহাবীদের সমালোচনার পদ্ধতি ছিল প্রয়োজনের অনুসরণে, সংশয় থেকে উদ্ভূত নয়। একজন মানুষের ভুল-ত্রুটি হবে কিংবা সংশয়-কল্পনা আসবে এটা স্বাভাবিক। সে কারণে আমরা দেখি বেশ কিছু সাহাবী নির্দিষ্ট কিছু হাদীস যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। আবার আমরা দেখতে পাই কিছু সাহাবী একজন সাহাবীর একটা বর্ণনার সমালোচনা করেছেন, যখন সেটা সমালোচক সাহাবীর কাছে থাকা মূলনীতি বা প্রমাণিত জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে। যেমনটা আমরা কিছু সাহাবীর ব্যাপারে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতিবিধানমূলক মন্তব্যও দেখতে পাই। তবে এ ধরনের সমালোচনার প্রয়োজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। শীঘ্রই ভুলের সাথে যুক্ত হয় মিথ্যাচারের মতো উপাদানও, আর এটা দেখা দেয় যখন ফিতনা শুরু হয়। ইবন সীরীন (১১০ হি.) বলেন, ‘তারা সনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত না। তারপর যখন ফিতনা দেখা দিল তখন বলল, আমাদেরকে তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম দাও। আহলুস সুন্নাহর হাদীস গ্রহণ করা হবে আর বিদআতীদের হাদীস গ্রহণ করা হবে না।’ এখানে ফিতনা বলতে উদ্দেশ্য হলো তৃতীয় খলীফা উসমান ইবন আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হওয়ার কারণে সাহাবীদের মাঝে সংঘটিত ফিতনা এবং খারেজীদের উত্থানের ফিতনা। এটা দ্বারা ১২৬ হিজরীতে ওয়ালীদ ইবন ইয়াযীদের মৃত্যু উদ্দেশ্য না, যেমনটা দাবী করেছে শাখত। ইবন সীরীন যেহেতু এর আগে মারা গিয়েছেন, সেহেতু শাখতের দাবী হলো এই আছর তার নামে বানানো হয়েছে। এই আছরের সাথে এমন অদ্ভুত আচরণের কারণ শাখত মনে করেন ‘প্রথম প্রজন্মে সনদের উপস্থিতি যৌক্তিক নয়’, এক্ষেত্রে তিনি সূ্যাখর ব্যাপারে তার নিজস্ব তত্ত্বের উপর নির্ভর করেছেন। ‘এমনকি যুক্তিসঙ্গত একটা সম্ভাবনার দিকে তিনি ফিরেও তাকাননি যেটা হলো, ইবন সীরীন হয়তো আসলে এমন কথা বলেছেন; আর ফিতনা বলতে হয়তো ওয়ালীদদের নিহত হওয়ার ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু বোঝাতে পারে (যেমন প্রথম শতকে সংঘটিত অন্য যেকোনো বড় ফিতনা), তাহলে তার ব্যাখ্যাটা আরো স্বাভাবিক হতো। কারণ বর্ণনার উৎস (সাহাবীতে) না পৌঁছালে এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, একজন তাবেয়ী (প্রয়োজন মনে করলে কিংবা মাঝে মাঝে হলেও) যে তাবেয়ীর সূত্রে বর্ণনা করছে তার সনদের খোঁজ করবে। এই ফলাফলে পরবর্তী বেশ কিছু প্রাচ্যবিদ পৌঁছে যান, তন্মধ্যে ছিলেন জে. ইয়াহ্যুল; যিনি মনে করেন সনদ (সমালোচনার স্থায়ী পদ্ধতি হিসেবে রিজাল শাস্ত্র নয়) প্রথম হিজরী শতকের সত্তরের দশকে দেখা দেয়। এমনকি জোসেফ ভান এস মনে করেন, এই ফিতনা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর ফিতনা।

সাধারণভাবে বোঝা যায়, প্রথম দিকের বর্ণনাগুলোতে তীব্র প্রয়োজনের কারণে সবসময় ধারাবাহিক সমালোচনামূলক কাজ অব্যাহত ছিল। মুসলিম উম্মাহর প্রথম প্রজন্মসমূহের মাঝে হাদীসের সমালোচনার এই ধারাবাহিকতার বিবরণ একজন ইমামের বক্তব্যে বিদ্যমান। তিনি হলেন ইমাম ইবন হিব্বান। তার ভাষায়, 'সাহাবীরা বর্ণনা গ্রহণ করার ব্যাপারে যেমন সতর্কতা অবলম্বন করতেন, তেমনটা গ্রহণ করেন মদীনার কিছু তাবেয়ী, তন্মধ্যে ছিলেন: সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (৯৩ হি.), কাসেম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবু বকর (১০৬ হি.), সালেম ইবন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (১০৬ হি.), আলী ইবনুল হোসাইন ইবন আলী (৯৩ হি.), আবু সালামাহ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আউফ (৯৪ হি.), উবাইদুল্লাহ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন উতবাহ ইবন মাসউদ (৯৮ হি.), খারেজা ইবন যাইদ ইবন সাবেত (৯৯ হি.), উরওয়া ইবনুয যুবাইর ইবনুল আওয়াম (৯৪ হি.), আবু বকর ইবন আব্দুর রহমান ইবনুল হারেস ইবন হিশাম (৯৪ হি.), সুলাইমান ইবন ইয়াসার (১০০ হিজরীর পরে মারা যান)। তারা সুন্নাহ সংরক্ষণ করেন, সুন্নাহর অন্বেষণে সফর করেন, সুন্নাহর অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করেন, দীনকে আঁকড়ে ধরেন এবং মুসলিমদেরকে দীনের দাওয়াত দেন। এরপর তাদের থেকে ইলম গ্রহণ করে হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনার অনুসন্ধান এবং বর্ণনাকারী বাছাইয়ের কাজ করার পাশাপাশি সুন্নাহ সংকলনে আরো একদল লোক সচেষ্ট হন। তন্মধ্যে ছিলেন: যুহরী (১২৪ হি.), ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-আনসারী (১৪৪ হি.), হিশাম ইবন উরওয়া ইবনুয যুবাইর (১৪৫ হি.), সাদ ইবন ইব্রাহীম (১২৫ হি.) এরা সহ মদীনার একটা দল। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে সচেতন, মুখস্থে অগ্রগামী, বেশি ভ্রমণকারী এবং উঁচু হিম্মতের অধিকারী ছিলেন যুহরী রাহমাতুল্লাহ 'আলাইহি। এরপর তাদের থেকে হাদীস সংকলন, বর্ণনাকারীদের সমালোচনা, সুন্নাহ সংরক্ষণ এবং দুর্বল বর্ণনাকারীদের অভিযুক্ত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন একদল ইমাম ও ফকীহ, তারা হলেন: সুফইয়ান ইবন সাঈদ আস-সাওরী (১৬১ হি.), মালেক ইবন আনাস (১৭৯ হি.), শু'বাহ ইবনুল হাজ্জাজ (১৬০ হি.), আব্দুর রহমান ইবন আমর আল-আওযা'ঈ (১৫৬ হি.), হাম্মাদ ইবন সালামাহ (১৬৭ হি.), লাইস ইবন সা'দ (১৭৫ হি.), হাম্মাদ ইবন যাইদ (১৭৯ হি.)-সহ আরো বেশ কয়েকজন।

তবে এদের মাঝে সুন্নাহ নির্বাচনে সবচেয়ে সতর্ক ও অধ্যবসায়ী এমন তিনজন ছিলেন, যারা তাদের এই কাজে কোনো ভুলের সংমিশ্রণ ঘটাননি। তারা হলেন: মালেক, সাওরী ও শু'বাহ। এরপর এদের থেকে হাদীস অন্বেষণ, বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে অনুসন্ধান, দুর্বল বর্ণনাকারী নির্ণয় এবং বর্ণনার কারণ খোঁজ করার বিষয়টা একদল লোক গ্রহণ করেন। তারা হলেন: আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১৮১ হি.), ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান (১৯৮ হি.), ওয়াকী' ইবনুর জারাহ (১৯৭ হি.), আব্দুর রহমান ইবন মাহদী (১৯৮ হি.), মুহাম্মাদ ইবন ইদরীস আশ-শাফেয়ী (২০৪ হি.) প্রমুখ।

তবে এদের মাঝে মুহাদ্দিসদের কাজে সবচেয়ে বিজ্ঞ এবং দুর্বল বর্ণনাকারীদের পরিত্যাগে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন দুজন, যারা এটাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজেদের দীনদারিতা, পরহেজগারিতা ও সুন্নাহর ব্যাপারে গভীর জ্ঞান ধরে রেখেছিলেন। তারা দুজন হলেন: ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-কাত্তান ও আব্দুর রহমান ইবন মাহদী। এরপর একদল লোক এদের থেকে শেখেন হাদীস নির্বাচন এবং বর্ণনার বর্ণনাকারী বাছাই। তারা বিভিন্ন শহরে গিয়ে সুন্নাহ সংকলন করেন, নগরীতে-নগরীতে অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্বল বর্ণনাকারীদের অভিযুক্ত করেন এবং নির্ভরযোগ্য-অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের অবস্থা বর্ণনা করেন। সবশেষে তারা আছার ও বর্ণনার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ইমামে পরিণত হন। তাদের মাঝে রয়েছেন: ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (২৪১ হি.), ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন (২৩৩ হি.), আলী ইবনুল মাদীনী (২৩৪ হি.), আবু বকর ইবন আবী শাইবাহ (২৩৫ হি.), ইসহাক ইবন ইব্রাহীম আল-হানযালী (২৩৮ হি.), উবাইদুল্লাহ ইবন উমার আল-ক্বাওয়ারীরী (২৩৫ হি.), যুহাইর ইবন হারব আবু খাইসামা (২৩৪ হি.)।

তবে এদের মাঝে দীনদারিতায় সবচেয়ে পরহেজগার, দুর্বল বর্ণনাকারী অন্বেষণে সবচেয়ে অগ্রসর এবং সর্বদা এই শাস্ত্রের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখা ব্যক্তি হলেন: আহমদ ইবন হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন, আলী ইবনুল মাদীনী রাহমাতুল্লাহি 'আলাইহিম আজমাঈন। এরপর এদের থেকে বর্ণনার সমালোচনা এবং বর্ণনাকারী নির্বাচনের কর্মপন্থা গ্রহণ করেন একদল লোক। তাদের মাঝে ছিলেন: মুহাম্মাদ ইবন ইয়াহইয়া আয-যুহালী (২৫৮ হি.), আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুর রহমান আদ-দারেমী (২৫৫ হি.), আবু যুর'আ উবাইদুল্লাহ ইবন আব্দুল কারীম আর-রাযী (২৬৪ হি.), মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল আল-বুখারী (২৫৬ হি.), মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হি.), আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশ'আস (২৭৫ হি.) প্রমুখ। তারা মুখস্থে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বেশি বেশি লিখেছিলেন, অনেক ভ্রমণ করেছিলেন এবং সুন্নাহ সংরক্ষণে পরস্পর আলোচনা, বই রচনা ও পড়ালেখা করেছিলেন।'

এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, 'হাদীসের হাফেযরা পূর্ববর্তী স্তরের হাফেযদের ছাত্র। কোনো স্তরের ছাত্রের জন্য বড় আলেম হওয়া সম্ভব না যদি সে পূর্ববর্তী হাফেযদের কারো থেকে ইলম অর্জন না করে। বর্ণনার প্রতিটি জাল, হোক সেটা ইলমী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা নয়, আনুভূমিক নয়, ধারাবাহিক। হাফেযরা এই ধর্মীয়-সামাজিক কর্তৃত্ব তথা বর্ণনার ধারাবাহিকতা গ্রহণ করেন সাহাবীদের যুগ শেষ হওয়ার পর। তারা বর্ণনাকারীদের সরাসরি যাচাই এবং পারস্পরিক তুলনার মাধ্যমে তাদের মূল্যায়ন করেন। যেমন আমরা দেখতে পাই ইমাম শু'বাহ ইবনুল হাজ্জাজ (১৬০ হি.) একজন দুর্বল বর্ণনাকারী থেকে সতর্ক করেন। বর্ণনাকারীদের জীবনী সংকলনের বইয়ে আমরা দেখি, শু'বাহ একদিন মসজিদে বর্ণনার দুটি মজলিস দেখে বলেন, 'মানুষদের দেখে অবাক হতে হয়! তারা সবচেয়ে বড় মিথাবাদীকে (জাফর ইবনুষ যুবাইর) কেন্দ্র করে একত্র হয়েছে আর সবচেয়ে বড় সত্যবাদীকে (ইমরান ইবন হুদাইর) ছেড়ে দিয়েছে।' ঘটনার বর্ণনাকারী ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম যার নাম ইয়াযীদ ইবন হারুন। তিনি বলেন, 'স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম ভীড়ে থাকা লোকজন জাফরকে ছেড়ে ইমরানের কাছে সবাই চলে গিয়েছে। জাফরের কাছে আর কেউ নেই।' শু'বাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যাচারকারীদের মুখোশ উন্মোচনে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি তার সঙ্গীদের বলতেন, 'চলো, আমরা আল্লাহর জন্য গীবত করি।' এমনকি চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে তিনি 'মানুষের কাছে গিয়ে বলতেন, তুমি হাদীস বর্ণনা করবে না; করলে তোমার বিরুদ্ধে শাসককে লেলিয়ে দিব।' প্রকাশ্যে গীবত করার মাধ্যমে সমাজে হক-বাতিলের মিশ্রণ তিনি রোধ করেছিলেন।

ইমাম মুসলিম তার সহীহ বইয়ের ভূমিকায় বর্ণনাকারীদের সমালোচনার প্রসঙ্গে বলেন, 'তারা নিজেদের উপর হাদীসের বর্ণনাকারীদের দোষ-ত্রুটি উদঘাটন আবশ্যক করে নেয় এবং এই বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা ফতোয়া দেয়। কারণ দীনী বিবিধ বিষয়ের বর্ণনাগুলো কোনো কিছু হালাল-হারাম বলে, আদেশ-নিষেধ বলে গণ্য করে এবং উৎসাহিত- নিরুৎসাহিত করে থাকে। এমন অবস্থায় বর্ণনাকারী যদি সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত না হয়, তারপর তার থেকে এমন কেউ বর্ণনা করতে শুরু করে যে তাকে চিনে, কিন্তু তার মাঝে বিদ্যমান সমস্যা জানে না এমন কারো কাছে যদি সে বিষয়টা না জানায়, তাহলে উক্ত কাজের জন্য সে পাপী হবে এবং আম মুসলিমদের সাথে প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত হবে। কারণ যারা এই বর্ণনাগুলো শুনেছে, তাদের কেউ কেউ এগুলো বা এগুলোর কিছু অংশ ব্যবহার করে বসবে।' এভাবেই ইসলামের প্রথম যুগ থেকে লিখনীর যুগ পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রে পণ্ডিত লোকজন বর্ণনাকারীদের অবস্থা বর্ণনা করে গিয়েছেন, শক্তিশালী ও দুর্বলদের অবস্থা জানিয়েছেন। জারহ-তা'দীল শাস্ত্রের পূর্ণতা এভাবে এসেছে। বর্ণনাকারী এবং তাদের ব্যাপারে সমালোচকদের মন্তব্য নিয়ে বিরাট বই রচিত হয়েছে। এমনকি মিথ্যুকরা কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সাথে মিশে যেতে পারত না। আবার দুর্বল বর্ণনাকারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র অভিধান রচিত হয়েছে। ফলে হাদীসশাস্ত্রবিদদের জন্য প্রতি যুগে দুর্বল থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনা আলাদা করা খুব সহজ হয়ে গিয়েছে।

প্রাচীন সমাজগুলোতে বর্ণনাকারীদের উঁচু সামাজিক মর্যাদা ছিল। ফলে তারা সবসময় জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। 'মৌখিক বিবরণের ধারাবাহিক জালে তারাই ছিল শক্তি'। কারণ 'পরবর্তী সময়ে একটা ঘটনাকে তৈরি করা এমন বহু বর্ণনার উপর নির্ভর করে যেগুলো প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা প্রদান করবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ছাড়া সে রকম কর্তৃত্ব অর্জন সম্ভব না।

এখানে লক্ষ্য রাখা জরুরী যে, বর্ণনাকারীর ব্যাপারে 'ন্যায়পরায়ণতা'র যে শর্ত দেওয়া হয় সেটা নিছক ধর্মীয় ধারণা নয়। অর্থাৎ এটা এমন ধারণা নয় যেটা কেবল একজন মুসলিম স্বীকার করে। বরং এটা নৃতাত্ত্বিক ধারণাও বটে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম মন্টেগোমারি ওয়াট এই প্রাচ্যবিদদের প্রাচীন অভিযোগ উপস্থাপন করেন যার মূল বক্তব্য হলো—'নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিরের কোনো উৎস থেকে ওহী গ্রহণ করেননি। বরং নিজ থেকে আয়াত রচনা করে মানুষের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, তারা প্রতারিত হয়েছে এবং তার অনুসরণ করেছে।' তারপর তিনি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তার প্রত্যাখ্যানের অর্থ এটা নয় যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তে বিশ্বাস রাখতেন। বরং এই ঠুনকো অভিযোগ বহু প্রাচ্যবিদ প্রত্যাখ্যান করেছে, কেননা এটা অযৌক্তিক। এটা আমাদের কাছে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা দেয় না কেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কী জীবনে সব ধরনের বঞ্চনা সয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন? কেন তিনি সচ্চরিত্রের বুদ্ধিমান মানুষগুলোর সম্মান অর্জন করেছিলেন? এছাড়া আমরা বুঝতে পারি না কীভাবে তিনি এক বৈশ্বিক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন যেটা স্পষ্টভাবে বহু পবিত্র মানুষের জন্ম দিয়েছে। এ সব কিছু যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন আমরা মুহাম্মাদের সত্যতা অনুমিত ধরে নিই। অর্থাৎ আমরা যদি বিশ্বাস করি যে, তিনি আসলেই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতেন এই কুরআন তার কল্পনার ফলাফল না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর অবতীর্ণ সবকিছু হক।'

এই ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক খণ্ডন দিয়েই আমরা 'ন্যায়পরায়ণতা'র (আদালত) 'পার্থিব' দিকটা বুঝতে পারি। মুহাদ্দিসদের কষ্টকর ভ্রমণের কথা পশ্চিমারাও স্বীকার করে। আর এ সকল ভ্রমণের পক্ষে একটাই ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব, সেটা হলো তারা ধর্মীয় তাড়নার জায়গা থেকে তারা এই যাত্রা করেছিলেন। সুতরাং এর উপর নির্ভর করাটা জ্ঞানগত দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নির্ভরতা, যেহেতু এটা (নির্ভরতা) নির্দিষ্ট একটা কাজের সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ বোঝার লক্ষ্যে।

চূড়ান্ত সূক্ষ্মতা নিয়ে হাদীসশাস্ত্রের এমন উত্থান অভূতপূর্ব এবং ব্যতিক্রমী ঘটনা। আমরা যদি বিভিন্ন জাতির ইতিহাসে গিয়ে ইতিহাসের সমালোচনার দিকে তাকাই, তাহলে ইসলামের আগে আমরা জাহেলী যুগে অনেক খুঁজলেও ইতিহাস লিখে রাখার কোনো নমুনা পাব না। এমনকি যে সকল জাতিকে আমরা উন্নত ও সভ্য মনে করতাম এবং ধারণা করতাম তারা তাদের উন্নতির ইতিহাস লিখে রেখেছিল, যেমন: ইয়েমেন, হীরা, গাস্সান, এদের কারো ইতিহাসের কোনো বিবরণী আমাদের কাছে পৌঁছেনি।

পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি সাধারণত মানুষজন ভুলে যায়। সময়ের পরিক্রমায় সমাজের প্রভাবশালী লোকদের প্রয়োগে গিয়ে বিকৃতির শিকার হয়। আমরা যদি মধ্যযুগে মুসলিম এবং ইউরোপীয়দের ইতিহাস রচনার তুলনা করি, তাহলে দেখতে পাব ইউরোপে যে সময়টাতে ইতিহাস রচনার উপর ধর্মীয় বা ঐশ্বরিক প্রভাব বিস্তার করেছিল, ঠিক সে সময় ইসলামী ও আরব সভ্যতায় জ্ঞানের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। মুসলিম চিন্তাবিদরা চিন্তার পদ্ধতি ও উপকরণে ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। মানবীয় বিদ্যাসমূহেরও অগ্রগতি সাধিত হয়। যদিও সেগুলো পবিত্র ধর্মীয় টেক্সটের উপর ভিত্তি করে বেড়ে ওঠা সভ্যতা। ইসলামী বিশ্বে সর্বপ্রথম ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয় কুরআন কারীম এবং পবিত্র সুন্নাহ এই দুই উৎস লেখার মাধ্যমে। সুন্নাহ সংকলনের ক্ষেত্রে সংকলন ও ইতিহাস রচয়িতারা জারহ-তা'দীল নামক শুদ্ধাশুদ্ধি নিরূপণের পদ্ধতির উপর নির্ভর করেন। আর এই পদ্ধতি চূড়ান্ত সূক্ষ্মতার বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

টিকাঃ
২৪২. আস-সিদ্দীক বাশীর নসর, আত-তা'লীকাতুন নাকদিয়্যা 'আলা কিতাবি দিরাসাত মুহাম্মাদিয়্যা, মারকাযুল আলাম আল-ইসলামী লি-দিরাসাতিল ইস্তেশরাক, ২০০৮, পৃ. ২৮-২৯। এ হচ্ছে গোল্ডযিহার এর অপবাদ। অচিরেই এর জবাব আসছে।
২৪৩. অর্থাৎ সুন্নাহ শব্দের অর্থ রীতিনীতি হওয়ার দিক দিয়ে। কিন্তু ইসলামে সুন্নাহর বাস্তবতা হিসেবে নয়। [সম্পাদক]
২৪৪. থমাস আরনল্ড, আদ-দাওয়াহ ইলাল ইসলাম: বাহসুন ফী তারীখি নাশরিল আক্বীদাতিল ইসলামিয়্যা, মাকতাবাতুন নাহদ্বাহ আল-মিসরিয়াহ, ১৯৭১, অনুবাদ: হাসান ইব্রাহীম ও আব্দুল মজীদ আবেদীন, পৃ. ৬১।
২৪৫. শার্ল জেনিবার, আল-মাসীহিয়্যা নাশআতুহা ওয়া-তাতাউরুহা, মানশুরাতুল মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরূত, অনুবাদ: আব্দুল হালীম মাহমুদ, পৃ. ১২১।
২৪৬. হাসান হানাফী, মুকাদ্দিমাতুন ফী ইলমিল ইস্তিগরাব, পৃ. ১১৭।
২৪৭. অ্যালবান জে. উইদজে, আত-তারীখ ওয়া-কাইফা ইউফাস্সিরুনাহ, প্রাগুক্ত, ১/১১০।
২৪৮. M.M. Bravmann, 1972, p. 155.
২৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৯।
২৫০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩১।
২৫১. তাফসীরুত ত্বাবারী (১৭/১২৫)।
২৫২. মুসনাদ আহমদ, রিসালাহ ছাপা, পৃ. ১০৫৫। শাইখ শুয়াইব আরনাউত্ব বলেন, এর সনদ হাসান।
২৫৩. William A. Graham, Divine Word and Prophetic Word in Early Islam, The Hague and Paris: Mouton, 1977, p. 10.
২৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।
২৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২।
২৫৬. Adis Duderija (ed.), 2015, p.17.
২৫৭. Robert G. Hoyland, Seeing Islam as Others Saw it: A Survey and Evaluation of Christian, Jewish and Zoroastrian Writings on Early Islam, Studies in Late Antiquity and Early Islam, 13 (Princeton, N.J: Darwin Press, 1997). P. 196-197.
২৫৮. জিমাউল ইলম (পৃ. ৫)।
২৫৯. কুলসন, ফী তারীখিত তাশরী'ঈল ইসলামী, পৃ. ১৪।
২৬০. হাল্লাক, নাশআতুল ফিকহিল ইসলামী ওয়া-তাতাউরুহু (পৃ. ৮২-৮৩)।
২৬১. Fazlur Rahman, Islamic Methodology in History, Pakistan: Islamic Research Institute, P.9.
২৬২. কুলসন, ফী তারীখিত তাশরী'ঈল ইসলামী, পৃ. ১৪।
২৬৩. ওয়ালব্রিজ, আল্লাহ ওয়াল-মানত্বেক ফিল-ইসলাম, পৃ. ৭৪।
২৬৪. ফাহাদ আল-হামুদী, নাক্কদু নাযারিয়াতিল মাদার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০১৪, অনুবাদ: হাইফা আল-জাবরী, পৃ. ৬৮।
২৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮।
২৬৬. হাদীস নং ১৩১১; অনুরূপ বুখারী, হাদীস নং ১৭৬৫।
২৬৭. অর্থাৎ বর্ণনাকারী বলছেন, এটি সুন্নাহ নয়। কিন্তু তারা এটিকে সুন্নাহ মনে করেছে। [সম্পাদক]
উল্লেখ্য যে, যে কারণেই হোক না কেন, রমল করা সুন্নাহ। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জে রমল করেছেন। সুতরাং বুঝা গেল, সুন্নাহ না বলার বিষয়টি সাহাবীর ইজতিহাদ ছিল।
২৬৮. অর্থাৎ বর্ণনাকারী বলছেন, এটি সুন্নাহ নয়। কিন্তু তারা এটিকে সুন্নাহ মনে করেছে। -সম্পাদক।
২৬৯. সুনান আবু দাউদ, হা. ১৮৮৫, হাদীসটির সনদ সহীহ।
২৭০. সুনান আবু দাউদ, হা. ৮২৪, হাদীসটির সনদ সহীহ।
২৭১. মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক (১১/২৫৮), মা'মার ইবন রাশেদের সূত্রে।
২৭২. Joseph Schacht, 1950, p.24.
২৭৩. লেখকবৃন্দ, আত-তারীখুশ শাফাওয়ী, পৃ. ১২৫।
২৭৪. এফসি হার্নশো, ইলমুত ভারীখ, লাজনাভূত তালীক ওয়াত-তর্জমা ওয়াল্-নাশর, ১৯৩৭, অনুবাদ: আব্দুল হামীদ আল-আবব্বানী, পৃ.৫০।
২৭৫. জামীল আন-নাজ্জার, দিরাসাত ফী ফালসাফাতিত তারীখ আন-নাকদিয়্যাহ, পৃ. ১২৫-১২৬।
২৭৬. হার্নশো, ইলমুত তারীখ, পৃ. ৫৫।
২৭৭. সহীহ মুসলিমের মুকাদ্দিমাহ।
২৭৮. H. Motzki, The Origins of Islamic Jurisprudence, Meccan Fiqh before the Classical Schools, Transl. by M. Katz, Leiden 2002, p.23.
২१९. 'ফিতনা' পরিভাষার ব্যাপারে প্রাচ্যবিদদের মতামত জানতে পড়ুন Shaukat, Jamila, "Isnad in Hadith Literature", Islamic Studies 24/4 (1985), p. 445-454.
ইবন সীরীন অন্যান্য যে সকল জায়গায় 'ফিতনা' শব্দ ব্যবহার করেছেন সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে শাস্তে র মতের খণ্ডন জানতে দেখুন- খালেদ আদ-দুরাইসের 'আল-উয়ুবুল মানহাজিয়্যাহ ফী-কিতাবাতিল মুস্তাশরিক শাস্ত্র আল-মুতায়াল্লিকাহ বিস-সুন্নাহ আন-নাবাউইয়্যাহ', মুজাম্মাউল মালিক ফাহাদ, পৃ. ৫৫-৫৬।
২৮০. ইবন হিব্বান, আল-মাজরূহীন (১/৩৮-৫৮)।
২৮১. জাল বলতে বোঝানো হয়েছে যে বর্ণনাগুলো জালের মত বিস্তৃত, শৃঙ্খলের মত নয়। এক ছাত্র বহু শিক্ষকের সাথে সংযুক্ত, একজন শিক্ষকের সাথে নয়। এভাবে পূর্ববর্তী স্তরের হাদীসের হাফেযদের সাথে পরবর্তী স্তরের হাদীসের হাফেযদের সম্পর্ক একটা জালের মত বিস্তার লাভ করেছে। [অনুবাদক]
২৮২. লেখকবৃন্দ, আত-তারীখুশ শাফাওয়ী, (১/১৩৮-১৩৯)।
২৮৩. ইবন আবী হাতেম, আল-জারহ ওয়াত-তা'দীল (২/৪৭৯)।
২৮৪. আল-কিফায়াহ ফী-ইলমির রিওয়ায়াহ (পৃ. ৪৫)।
২৮৫. আল-জামে' লি-আখলাকির-রাওয়ী ওয়া-আদাবিস সামি' (২/১৭০)।
২৮৬. মুহাম্মাদ আজ্জাজ আল-খত্বীব, আস-সুন্নাহ ক্বাবলাত তাদওয়ীন, দারুল-ফিকর লিত-ত্বিবায়াহ, বৈরূত, পৃ. ২৩৭-২৩৮।
২৮৭. লেখকবৃন্দ, আত-তারীখ আশ-শাফাওয়ী, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৪০।
২৮৮. মন্টেগোমারি ওয়াট, মুহাম্মাদ ফিল-মাদীনাহ, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরূত, অনুবাদ: শা'বান বারাকাত, পৃ. ৪৯৫।
২৮৯. হুসাইন নাস্সার, নাশআতুত তাদওয়ীনিত তারীখি ইন্দাল আরাব, মানশূরাত ইক্করা, ১৯৮০, পৃ. ১১।
২৯০. আব্দুল হালীম মাহুরবাশা, ফালসাফাতুত তারীখ, পৃ. ২৬।

📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 মালেক ও পূর্ববর্তীদের অনুকরণে অগ্রাধিকার, অতঃপর শাফেয়ী ও মৌখিক ইতিহাসের অগ্রাধিকার

📄 মালেক ও পূর্ববর্তীদের অনুকরণে অগ্রাধিকার, অতঃপর শাফেয়ী ও মৌখিক ইতিহাসের অগ্রাধিকার


আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সুন্নাহ যে ওহী তা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় ছিল। কারণ সেটা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান শরীয়ত প্রণয়নের দিকটির প্রতিনিধিত্ব করত। এই সুন্নাহ সাহাবী-তাবেয়ী প্রজন্ম পেরিয়ে ইমাম মালেকসহ বড় লেখকদের প্রজন্ম অতিক্রম করে ইমাম শাফেয়ীতে এসে পৌঁছায়। যাহাবী বলেন, '১৪৩ হিজরী সনে এ যুগের আলেমরা হাদীস, ফিকহ ও তাফসীর লিখনীর কাজ শুরু করেন। ইবন জুরাইজ মক্কায়, মালেক মদীনায় মুয়াত্তা, আওযা'ঈ শামে, ইবন আবী 'আরূবা ও হাম্মাদ ইবন সালামাহ প্রমুখ বসরায়, মা'মার ইয়েমেনে, সুফিয়ান সাওরী কুফায় গ্রন্থ রচনা করেন। ইবন ইসহাক মাগাযী তথা যুদ্ধের বিবরণ আর আবু হানীফা ফিকহ ও রায়ের উপর লেখেন। এর কিছু সময় পরে হুশাইম, লাইস, ইবন লাহী'আ, ইবনুল মুবারক, আবু ইউসুফ, ইবন ওয়াত্ব বই লেখেন। এরপর জ্ঞান লিপিবদ্ধ ও অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হতে থাকে। আরবী, ভাষা, ইতিহাস ও যুদ্ধের বিবরণের উপর বই রচিত হয়।'

কিন্তু তার অর্থ কি ইমাম মালেক আর ইমাম শাফেয়ীর কর্মপদ্ধতিতে কোনো পার্থক্য নেই? মৌলিকভাবে তাদের মাঝে পার্থক্য আছে। কিন্তু সেটা সুন্নাহকে ওহী বা প্রমাণ হিসেবে মেনে নেওয়ার সাথে সম্পৃক্ত না যেমনটা শান্ত দাবি করেছেন, অথবা কুলসন যেমনটা বলেছেন, 'প্রথম বারের মত শাফেয়ী একটা চিন্তার উপর জোর দেন। চিন্তাটা আগে অনেকের কাছে কিছুটা অস্পষ্ট ছিল। সেটা হলো নবীজীর শরয়ী বিধি-বিধান আল্লাহ প্রদত্ত ওহী।' এছাড়াও কুলসন বলেন, 'তবে শাফেয়ীর মাহাত্ম্য নতুন ধারণা প্রদানের মাঝে সীমিত না। বরং তিনি প্রতিষ্ঠিত চিন্তার সাথে নিজের চিন্তাকে মিলিয়ে উভয়ের মাঝে ভারসাম্য করে উসূলুল ফিকহের এক পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি উপস্থাপন করেন, যেমনটা আগে কখনো ঘটেনি।' পরের বক্তব্যটা সঠিক, আর প্রথম বক্তব্যটা শাস্ত্রের এঁকে দেওয়া গণ্ডির প্রতি আনুগত্য টিকিয়ে রাখা ছাড়া ভিন্ন কিছু বোঝায় না। মালেক আর শাফেয়ীর পদ্ধতিগত পার্থক্য আগে থেকেই ছিল। কিন্তু একটা পরিবর্তনমূলক স্তরের কারণে এটার নবায়ন হয়। সেটা হলো জীবন্ত মৌখিক বক্তব্যের অনুসরণের যুগের সমাপ্তি টেনে নির্ভরযোগ্য মৌখিক বর্ণনার সূচনা। আমরা নিচে এটাই ব্যাখ্যা করব।

ইমাম মালেক একজন বড় মাপের তাবে-তাবেয়ী। নবুওয়তের যুগের কাছাকাছি সময়ে থাকার কারণে তিনি মদীনাবাসী তাবেয়ীদের কথা ও কাজ থেকে জীবন্ত সুন্নাহর সংস্পর্শ লাভ করতে সক্ষম হন। 'মদীনার ফকীহদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন, যে বিষয়ের উপর আমল চলে আসছে, সেটা নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ ও অভিজ্ঞতার যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব নির্দেশ করে। এখান থেকেই তারা বিষয়টার বৈধতা সাব্যস্ত করে। মদীনাবাসীর এমন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী প্রচলিত হাদীসগুলো যদি চলে আসা আমলকে জোরদার করে, তাহলে সেটাকে সবচেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি বলে গণ্য করতে হবে। আর যদি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় তাহলে নবীজীর অভিজ্ঞতার সাথে না মেলা পর্যন্ত মিথ্যা বলে গণ্য হবে, যে অভিজ্ঞতাকে মদীনাবাসী তাদের আমলের মাধ্যমে জীবিত রেখেছে।' এমন দৃষ্টিভঙ্গি যৌক্তিক; কেননা 'যে লক্ষ্যে হাদীস সংকলন করা হয়েছে, বা যে লক্ষ্যে ইসলামী জ্ঞান অগ্রসর হয়, সেটা হলো একজন ব্যক্তি তার বিবিধ অবস্থায় কী কী করবে সেটা জানা। অন্যভাবে বললে, এর উদ্দেশ্য থাকে নির্দিষ্ট ও বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং নব-উদ্ভূত অবস্থায় ওহী হিসেবে প্রাপ্ত শরীয়ত বাস্তবায়নের পদ্ধতি জানা। শরীয়ত কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে সেটার জন্য হাদীসকে একমাত্র উপকরণ হিসেবে ধরে নিতে হবে এমন কোনো আবশ্যকতা নেই। মুসলিম সমাজে প্রচলিত উরফ বা প্রথাও দলীলে পরিণত হতে পারে যেটার শক্তিমত্তা স্বল্প সংখ্যক সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীসের চাইতে শক্তিশালী হবে।' নৃতাত্ত্বিকদের ভাষায় এই স্তরের নাম 'মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ'। এগুলো মূলত এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুখে মুখে স্থানান্তরিত হওয়া চিন্তাসমূহ (সাময়িকভাবে পাঠককে অনুরোধ করব তিনি যেন মেনে নেন যে, প্রথম শতাব্দীতে কেবল মৌখিকভাবে হয়েছে, আমরা লিখনীর সংজ্ঞায়নে গিয়ে এটার খণ্ডন করব)। এই মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ মূলত জীবন্ত বিষয় অনুসরণের উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে শাফেয়ী যেহেতু কালের বিবেচনায় জীবন্ত নমুনা অনুসরণের দিক থেকে মালেকের পরে ছিলেন, অধিকন্তু তার সময়ে হাদীস গ্রন্থগুলো দেখা গিয়েছিল আর হাদীসের সমালোচনার ধারাও পূর্ণতা লাভ করেছিল, সেহেতু শাফেয়ী মৌখিক বর্ণনাকে এমন আমলের উপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন যেটা তার দৃষ্টিতে যথাযথ ও নিয়মতান্ত্রিক ছিল না। মৌখিক বর্ণনার ইতিহাসের চাইতে মৌখিক জীবন্ত অনুকরণের ভিন্নতার জায়গা হলো মৌখিক বর্ণনার ইতিহাস ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছে। যে বর্ণনাকারী থেকে শাফেয়ী বা অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ শুনছেন, তিনি তার উপরের বর্ণনাকারীর থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি শুনছেন। এভাবে বর্ণনা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আর মৌখিক বর্ণনার অনুকরণ হলো জীবন্ত সুন্নাহর সাথে জীবনযাপন, যেখানে সুন্নাহ হিসেবে সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে ফকীহদের কর্মেরও ভূমিকা থাকবে। কারণ তাদের কাজগুলো পূর্ববর্তীদের থেকে প্রাপ্ত। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাদের মাত্র দুই প্রজন্মের ব্যবধান। ইমাম মালেক এবং তার পূর্ববর্তী মদীনার ইমামরা মাদানী আমল ও সহীহ বর্ণনার মাঝে তুলনা করেন। 'শাফেয়ী নিছক সুন্নাহর দলীলকে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে মালেক গবেষণা চালিয়ে যাচাই-বাছাই করে তুলনার মাধ্যমে কোনো দলীল গ্রহণ করেন; এমনকি যদি তিনি ঐ দলীল নিজে বর্ণনা করে থাকেন এবং মুয়াত্তা বইয়ে লিখে থাকেন।' অন্যভাবে বললে, শাফেয়ী প্রথমেই নির্ভর করেছেন জীবন্ত স্মৃতির সংরক্ষিত আর্কাইভের উপর, অন্যদিকে মালেক প্রথমেই নির্ভর করেছেন যাপিত জীবন্ত স্মৃতির উপর। এখানে দুটি কর্মপদ্ধতির মাঝে তুলনা করা উদ্দেশ্য নয়। কারণ তুলনার জন্য বিশেষজ্ঞরা আছেন। আমরা যেটা বলতে চাই সেটা হলো:

(১) মালেক ও শাফেয়ীর যে মতভেদ, সেটা সুন্নাহর সংজ্ঞায়নে নয়, বরং সুন্নাহ কীসের দিকে নির্দেশ করে সেটার ব্যাপারে। শাফেয়ীসহ অন্যান্য মুহাদ্দিস-ফকীহদের কাছে সুন্নাহ প্রথমেই সহীহ হাদীসকে বুঝায়। তাই তারা সহীহ হাদীস দিয়েই সুন্নাহকে বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে মালেকের কাছে সুন্নাহ প্রথমেই আমলকে বুঝায়। তাই সুন্নাহ এখানে সহীহ হাদীস থেকে ব্যাপক। এই বিষয়ের আলোকেই আমরা সুন্নাহ ও হাদীসকে পৃথকভাবে দেখা প্রাচীন বক্তব্যগুলো বুঝব।

(২) মালেক ও শাফেয়ীর মাঝে মতভেদ নতুন নয়। মালেকের জন্মের আগেও এটা ছিল। ইমাম আহমদ সহীহ সনদে ইবন আবী মুলাইকা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উরওয়া একবার ইবন আব্বাসকে বললেন, 'ইবন আব্বাস, আর কত আপনি মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন?' ইবন আব্বাস বললেন, 'কী হলো উরওয়াহ?' উরওয়া বললেন, 'আপনি আমাদেরকে হজ্জের মাসে উমরাহ করতে নির্দেশ দেন, অথচ আবু বকর-উমার এটা করতে নিষেধ করেছেন।' ইবন আব্বাস বললেন, 'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং করেছেন।' উরওয়াহ বললেন, 'তারা দুজন আপনার চাইতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশি অনুসরণ করতেন, তার ব্যাপারে তারা আপনার চাইতে বেশি জানতেন।'

তাই 'জোসেফ শাখ বা অন্যরা যখন দাবি করেছে যে, শাফেয়ী ইসলামী ফিকহকে পরিপক্কতার স্তরে নিয়ে এসেছে, তখন তারা স্পষ্ট ভুল বলেছে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় যত ফকীহ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি তাদের একজন ছিলেন মাত্র। ফকীহরা সকলে কুরআন-সুন্নাহকে গ্রহণ করতেন। তারা দলীলের বিবেচনায় দুইটাকে ভিন্নভাবে দেখতেন না। 'শাফেয়ীর আগে বা পরে কোনো মুসলিম কল্পনাও করেনি যে, সাহাবী বা তৎপরবর্তীদের আমল অথবা জামা'আতের আমল তথা উরফ (প্রথা) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্বন্ধকৃত সুন্নাহর সমকক্ষ। আর নবীজীর সুন্নাহকে সাহাবীদের সম্মিলিত আমলের বা একক আমলের চাইতে নিচের স্তরে ভাবা তো বহু দূরের বিষয়। সর্বোচ্চ যেটা ঘটেছে সেটা হলো কিছু ফকীহ সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু মাপকাঠি নির্ধারণ করেছিলেন, যেগুলোর কারণে ইমাম শাফেয়ী তাদেরকে সুন্নাহ পরিত্যাগ করা এবং সনদের বিবেচনায় সহীহ না বলার দায়ে অভিযুক্ত করেন। শাফেয়ী এর মাধ্যমে নতুন কিছু বলেননি। বরং তার আগে-পরে অনেক মুহাদ্দিস ছিলেন যারা এই মাপকাঠিগুলো পরিত্যাগ করে কেবল সনদের বিশুদ্ধতার মাঝে সীমিত থাকতে বলতেন, বিপরীত মতাদর্শীদেরকে সুন্নাহ পরিত্যাগ ও এর থেকে দূরে সরে যাওয়ার দোষে দুষ্ট বলতেন। এই অভিযোগ শুনে প্রতিপক্ষ হতচকিত হয়ে যেত। তারা এর থেকে নিজেদের মুক্ত দাবি করতে জোর প্রচেষ্টা চালাত। শাখ বা তার অনুসারীরা যেমনটা দাবি করছে, তেমনটা যদি হয়ে থাকত, তাহলে তারা তো এসব অভিযোগের কোনো পরোয়াই করত না। তাদের এবং সমাজের চোখে অভিযোগগুলো নিন্দনীয়ও হতো না; যদি নবীজীর সুন্নাহ গ্রহণ করাটা 'বিচ্ছিন্ন' (শায) মত-ই হয়ে থাকত।'

এতদসত্ত্বেও হাদীসের বর্ণনাসমূহ কতটুকু সুন্নাহর প্রতিনিধিত্ব করে সেটা নিয়ে ইমাম মালেক ও শাফেয়ীর পদ্ধতির মাঝে আপেক্ষিক অবিচ্ছিন্নতা ছিল, বিচ্ছিন্নতা ছিল না। মুরসাল বর্ণনার ক্ষেত্রে এসে এটা স্পষ্ট দেখা যায়। মুরসাল হাদীসের বিষয়টাই 'জীবন্ত ঐতিহ্যের অনুকরণ' (যেখানে মুরসাল এবং সনদ ছাড়াই কারো থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা দিয়ে অনেক সময় দলীল পেশ করা হয়)-এর ধারা এবং মৌখিক নিয়মতান্ত্রিক বর্ণনার ধারাকে পৃথক করে। কিছু ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী মুরসাল হাদীসের সাথে আচরণের পদ্ধতিতে ইমাম শাফেয়ীর সাথে তার পূর্ববর্তীদের পদ্ধতির পূর্ণ বৈপরিত্য বা বিচ্ছিন্নতা ছিল: যেমনটা আবু দাউদ তার 'রিসালাহ লি-আহলি মাক্কাহ'-তে বলেন— 'মুরসাল হাদীস দিয়ে পূর্ববর্তী আলেমরা দলীল দিতেন, যেমন: সুফিয়ান সাওরী, মালেক ইবন আনাস, আওযাঈ; অবশেষে শাফেয়ী এসে মুরসাল বর্ণনার ব্যাপারে কথা বললেন'। তবে সে সকল ইমামের বক্তব্যে উত্থাপিত বিচ্ছিন্নতার এই দাবি সূক্ষ্ম নয়। শাফেয়ী সহীহ সনদে বর্ণিত মুরসালকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং কিছু নির্দিষ্ট শর্ত তাতে জুড়ে দিয়েছেন। যেমন-অন্য কোনো সূত্র থেকে মুসনাদ হিসেবে বর্ণিত হবে, মুরসালের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল এমন সাহাবীর কথা বা কাজ থাকতে হবে, মুরসাল অনুযায়ী অধিকাংশ আলেম ফতোয়া দিবে প্রভৃতি। অবিচ্ছিন্নতা বুঝায় এমন আরো একটা বিষয় হলো ইমাম শাফেয়ী ইজমাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইজমাকে দলীল হিসেবে মানার ক্ষেত্রে তার যুক্তি আর মালেকের মদীনাবাসীর আমলকে দলীল হিসেবে মানার যুক্তি একই। যুক্তিটা হলো বিভিন্ন শহরে একটা ফিকহী ঐতিহ্য প্রচলিত থাকলে সেটা 'সুন্নাহ' হওয়ার পক্ষে জোর প্রমাণ। এমনকি শাফেয়ী যখন বললেন: আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহগুলো আম মুসলিমদের জীবন থেকে উঠে যেতে পারে না, তখন তার বক্তব্যের উপর মন্তব্য করে নসর হামেদ আবু যাইদ দাবি করল, 'তার এই বক্তব্যে সে তার উস্তায ইমাম মালেকের যুক্তির পুনরাবৃত্তি করেছে, যে যুক্তি ইমাম মালেক মদীনাবাসীর আমলকে ফিকহের উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পেশ করেছিলেন।' ইজমা এবং মুসনাদ হাদীসের মাঝে পার্থক্য হলো 'ইজমা সরাসরি শ্রুত নয় এমন বিবরণ, এটা শ্রুত বিবরণের চাইতে দালীলিক বিবেচনায় কোনো অংশে কম না।' শাফেয়ী যদি মুসলিমদের মাঝে সুন্নাহর নতুন ভিত স্থাপনকারী ফকীহ হতেন কিংবা অস্পষ্টতার পর নতুনভাবে স্পষ্টতা প্রদানকারী হতেন (যেমনটা প্রাচ্যবিদরা বলে) তাহলে আমরা এই আপেক্ষিক অবিচ্ছিন্নতা পেতাম না, বরং পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাই পেতাম।

টিকাঃ
২৯১. আস-সুয়ূত্বী, তারীখুল খুলাফা (৪১৬-৪১৭)।
২৯২. কুলসন, ফী তারীখিত তাশরী'ইল ইসলামী, পৃ. ৮৩।
২৯৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৮।
২৯৪. হাল্লাক, নাশআতুল ফিকহিল ইসলামী ওয়া-তাতাউরুহু, পৃ. ১৫৫।
২৯৫. ওয়ালব্রিজ, আল্লাহ ওয়াল-মানত্বেক ফিল-ইসলাম, পৃ. ৮০।
২৯৬. মুহাম্মাদ আবু যাহরা, মালেক: হায়াতুহু ওয়া-আসরুহু ওয়া-আরাউহুল ফিকহিয়্যাহ, পৃ. ৩৪২।
২৯৭. মুসনাদ আহমদ (২২৭৭)।
২৯৮. হাল্লাক, নাশআতুল ফিকহিল ইসলামী ওয়া-তাতাউরুহু, পৃ. ১৬৯। বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত আমাদের মতের সাথে সামঞ্জস্যশীল মত জানতে পড়ুন, N. Calder, Studies in Early Muslim Jurisprudence (Oxford: Clarendon Press, ১৯৯৩).
২৯৯. রিফ'আত ফাওযী আব্দুল মুত্তালিব, তাওসিকুস-সুন্নাহ ফিল-কারনিস সানী আল-হিজরী: উসুসুহু ওয়া-ইত্তিজাহাতুহু, মাকতাবাতুল খানান্‌জী, মিশর, পৃ. ১৬।
৩০০. আর-রিসালাহ (পৃ. ৪৬১-৪৬৫)।
৩০১. নসর হামেদ আবু যাইদ, আল-ইমাম আশ-শাফেয়ী ওয়া তাসীসুল আইদিউলুজিয়্যা আল-ওয়াসাত্বিয়্যাহ, মাকতাবাতু মাদবুলী, ১৯৯৬, পৃ. ১২২।

📘 যুক্তির নিরিখে সুন্নাহর প্রামাণ্যতা > 📄 শাফেয়ীর সাথে তার প্রতিপক্ষের মতবিরোধের বিষয় কি সুন্নাহর প্রামাণ্যতা ছিল?

📄 শাফেয়ীর সাথে তার প্রতিপক্ষের মতবিরোধের বিষয় কি সুন্নাহর প্রামাণ্যতা ছিল?


আমরা প্রমাণ করেছি যে, জীবনাচরণের মাপকাঠি হিসেবে নববী সুন্নাহর ধারণা সাহাবী-তাবেয়ীদের মাঝে ছিল। এখানে আমরা প্রমাণ করব যে, এই ধারণা শাফেয়ীর সময়কাল পর্যন্ত চলমান ছিল। অর্থাৎ সুন্নাহর ব্যাপারে শাস্ত্রের ধারণার বাকি অংশ এখানে খণ্ডন করব। শাস্ত্রের দাবি অনুযায়ী শাফেয়ীর যুগে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। প্রাচ্যবিদদের গবেষণার সারকথা হলো শাফেয়ী সুন্নাহ অস্বীকারকারী মুতাযিলাদের সমালোচনা করতেন। আমি আমাদের ইমামদের কোনো বইয়ে সুন্নাহকে ঐশী উৎস হিসেবে মেনে নেওয়ার বিষয়টা অস্বীকার করার মতো কিছু দেখিনি। শাফেয়ীর বই পড়ে 'মুতাযিলা সম্প্রদায় সুন্নাহ অস্বীকার করত' এমন ধারণা দিতে সর্বপ্রথম দেখেছি শাইখ মুহাম্মাদ আল-খুদ্বারী (১৯২৭ খ্রি.)-কে। তিনি তার বই 'তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী'তে বলেন, 'শাফেয়ী আমাদের কাছে স্পষ্ট করেননি কারা এই মত অনুসরণ করত। ইতিহাস থেকেও আমরা সেটা জানতে পারি না। তবে শাফেয়ী পরবর্তী মতের (বিশেষ ব্যক্তিদের থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীদের সাথে তর্ক করতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন যে, এই মতের (সকল বর্ণনা প্রত্যাখ্যানের মতো) অনুসারীরা বসরার অধিবাসী। আর বসরা সে সময় কালামী মতাদর্শের কেন্দ্র ছিল। এখান থেকে মুতাযিলাদের উত্থান ঘটে। এখানে মুতাযিলাদের বড় ব্যক্তিবর্গ এবং বই রচিত হয়। তারা আহলুল হাদীসের বিরোধিতা করার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। সম্ভবত এই মতের অনুসারী তাদের কেউ হবে। আমার কাছে বিষয়টা আরো শক্তিশালী হলো যখন আমি আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুসলিম ইবন কুতাইবাহর 'তাওয়ীলু মুখতালাফিল হাদীস' বইটি পড়লাম। তিনি সেখানে সুন্নাহর ব্যাপারে মুতাযিলা শাইখ ও তাদের বড় মুফতীদের অবস্থান আর সাহাবীদের ব্যাপারে তাদের নিন্দাবাদ উপস্থাপন করেছেন।'

খুদ্বারী এখান থেকে উদঘাটন করেন যে, শাফেয়ীর যুগে বা তার কিছু সময় আগে আহলুস সুন্নাহর উপর কালামবিদরা আক্রমণ করত। অধিকাংশ কালামবিদ বসরায় ছিলেন। সুতরাং শাফেয়ীর সাথে যারা তর্ক-বিতর্ক করেছিলেন, তারা নিশ্চয় কালামবিদ। কিন্তু শাফেয়ীর বই বা তিনি যাদের খণ্ডন করেছেন তাদের কারো বক্তব্য থেকে এমনটা জানা যায় না যে, তারা সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানার বিষয়টা অস্বীকার করত। অর্থাৎ এটাকে ঐশী মাপকাঠি হিসেবে মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল। বরং তাদের আপত্তি ছিল যে, 'কুরআনের মতো করে সমগ্র সুন্নাহকে প্রমাণ করা সম্ভব না।' যিনি সুন্নাহ অস্বীকার করেন তিনি 'খবরে ওয়াহেদ এবং (খবরে) মুতাওয়াতির প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ এই দুটির কোনোটিই তার দৃষ্টিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত না।' সুতরাং প্রত্যাখ্যানের কারণ 'ভুল-ত্রুটি ও বর্ণনাকারীদের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা; যদিও তাদের সংখ্যা তাওয়াতুরের পর্যায়ে যায়। ... সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে না; তাই এই প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি যদি নবীজীর যুগে থাকতেন, তার কথা শুনতেন এবং তার কাজকর্ম দেখতেন, তাহলে প্রত্যাখ্যান করতেন না, বরং এই সুন্নাহ দিয়ে দলীল দিতেন।' অন্যভাবে বললে, 'মতভেদের জায়গা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত বর্ণনাসমূহের উপর আমল করার আবশ্যকতা; আর সেটা বর্ণনাগত বিশুদ্ধতার বিবেচনায়, সুন্নাহ হিসেবে নয়।'

খুদ্বারী (এবং শান্ত) শাফেয়ীর বক্তব্যকে যেভাবে পাঠ করেছেন, উপর্যুক্ত আলোচনা হলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেক কর্তৃক সেই পাঠের সূক্ষ্ম সমালোচনার মূল বক্তব্য। শাফেয়ী সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কুরআনের যে সকল আয়াত ব্যবহার করেছেন, সেগুলো আব্দুল গনী আব্দুল খালেকের মতে গবেষণার ভূমিকা ছিল, প্রতিপক্ষকে বোঝানোর লক্ষ্যে সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আয়াতগুলো ব্যবহৃত হয়নি। তিনি শাফেয়ীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রমাণ করেন যে, শাফেয়ীর বিরোধী ব্যক্তি রাসূলের সুন্নাহকে ওহী হিসেবে মানতেন এবং সেটাকে প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করতেন। নাহলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শাফেয়ীর উপস্থাপিত প্রমাণ যথাযথ হবে না।

এটা মুতাযিলাদের রক্ষা করার জন্য বলা হচ্ছে না। বরং সাহাবীদের ব্যাপারে মুতাযিলাদের আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল। তবে তার মানে এই না যে, মুতাযিলারা সুন্নাহ অস্বীকার করত, যেমনটা প্রাচ্যবিদরা তুলে ধরার চেষ্টা করে। বরং তারা বর্ণনাসমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে মতবিরোধ করেছিল, মুহাদ্দিসদের কর্মপদ্ধতি থেকে সরে গিয়েছিল। প্রাসঙ্গিক আলামত থাকলে খবরে ওয়াহেদ গ্রহণ করার ব্যাপারে তাদের বড় ব্যক্তিত্বদের যে বক্তব্যসমূহ আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, সেগুলো মুতাযিলাদের বাইরে অন্যান্য কালামবিদদের মতের চাইতে সত্যের বেশি কাছাকাছি। মুতাযিলারা যে সুন্নাহকে স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করত, সেটার পক্ষে ঐ বক্তব্যগুলো প্রমাণ। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো 'সুন্নাহকে প্রমাণ হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানানো এবং ইসলাম শুধু কুরআনে সীমিত করে দেওয়ার বিষয়টা এমন কোনো মুসলিম বলতে পারে না, যিনি আল্লাহর দীন ও শরয়ী বিধান ঠিকভাবে জানেন। তার বক্তব্য বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। শরয়ী বিধি-বিধানের অধিকাংশ বিষয় সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআনে যত বিধি-বিধান আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো সংক্ষিপ্ত এবং সামগ্রিক মূলনীতি।'

টিকাঃ
৩০২. আল-খুদ্বারী, তারীখুত তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৯৭)। মূল সূত্র: মুস্তফা সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী (পৃ. ১৭১)।
৩০৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১।
৩০৪. আব্দুল গনী আব্দুল খালিক, হুজিয়াতুস সুন্নাহ, দারুল ওয়াফা- আস-মা'হাদুল 'আলামী লিল-ফিকরিল ইসলামী, পৃ. ২৬০-২৬১।
৩০৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩-২৬৪।
৩০৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৫-২৭৭।
৩০৭. সিবা'ঈ, আস-সুন্নাহ ওয়া-মাকানাতুহা ফিত-তাশরী'ইল ইসলামী, পৃ. ১৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00