📄 বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শবাদ কি সম্ভব?
পূর্ণ সংশয়ের থেকেই সম্ভবত বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সত্য যাত্রাটা হয়ে থাকে। কিন্তু পূর্ণ সংশয়েও একটা বিশ্বাস থাকে, সেটা হলো: কথার সত্যতায় বিশ্বাস।
— নিৎশে
এই বাহ্যিকতার উপর আমল করতে হবে। আর বহু বিষয় উহ্য থাকে, যেগুলো জানার দায়িত্ব আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। কেবল বাহ্যিকতার উপর আমাদেরকে নির্ভর করতে বলা হয়েছে। সেগুলো (উহ্য তথা অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো) হলো: মুহাদ্দিসের কল্পনা, মিথ্যা, ভুল, এক বা একাধিক ব্যক্তি সনদে সংযুক্তি বা অনুরূপ সম্ভাব্য সকল কিছু। এগুলোর কোনো কিছু প্রকাশ পেলে তখন সেটা গ্রহণ করা আমাদের জন্য বৈধ হবে না।
— হাফেয আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর আল-হুমাইদী (২১৯ হি.)
পূর্বের দুই অধ্যায়ের সারকথা হলো ব্যাপকভাবে দেখলে আমাদের কাছে বিদ্যমান ইতিহাসে আর বিশেষভাবে দেখলে আমাদের হাদীসশাস্ত্রে সংকলিত বক্তব্যে পাঁচটা দার্শনিক কালাম-নির্ভর মৌলিক প্রতিবন্ধক বিদ্যমান। সেগুলো হলো:
- সংশয়ই মূল (দেকার্তের জ্ঞানতত্ত্ব)
- কেবল পরীক্ষণ-নির্ভর জ্ঞানই জ্ঞান
- ইতিহাস নিরপেক্ষ নয়
- অকাট্য জ্ঞানই জ্ঞান
- আবশ্যকীয় জ্ঞানই দৃঢ় বিশ্বাস দেয়
এই অধ্যায়ে আমাদের কাজ হলো প্রতিবন্ধকগুলো দূর করা। সেক্ষেত্রে আমরা সাধারণভাবে ইতিহাস নামক জ্ঞানের দার্শনিক বিবরণ দিব, আর বিশেষভাবে ইলমুল হাদীসের উপর আলোকপাত করব। এর মাধ্যমে আমরা তুলে ধরব যে, এই প্রতিবন্ধকগুলো ভুল তত্ত্ব ও দর্শন, যেগুলো অদ্ভুত ফলাফল প্রদান করে। এরপর চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা দর্শন থেকে প্রাপ্ত ফলাফল ও নৃবিজ্ঞান থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের তুলনামূলক আলোচনা করব।
দর্শনের ইতিহাস জুড়ে সংশয়মূলক চিন্তার মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে একটা প্রসিদ্ধ পন্থা আছে। সেটা হলো তত্ত্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংশয়পূর্ণ দলীলগুলোকে বিবেচনার উপযুক্ত হিসেবে গণ্য না করা এবং জ্ঞানকে সুদৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ এমন জ্ঞানতত্ত্ব উপস্থাপন করা, যেটা সংশয় দূর করে দেয়। আর এখানেই আমরা পৌঁছে যাই বুদ্ধিভিত্তিক আদর্শবাদী কল্পনায়। সে কল্পনাটা হলো সাধারণ মানুষ স্বভাবত যে বিশ্বাস লালন করে (যেমন- আল্লাহর অস্তিত্ব) সেটা অবশ্যই বিশ্বাস ব্যতীত ভিন্ন কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। নাহলে বিশ্বাসটা যুক্তিসঙ্গত হবে না। এটাই দেকার্তের সৃষ্ট নতুন জ্ঞানতত্ত্ব। অথবা আরো সূক্ষ্মভাবে বললে দেকার্ত এটাকে বের করে এনেছেন। কেননা 'প্লেটো থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম অংশে নিরবচ্ছিন্নভাবে পশ্চিমাদের চিন্তার একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল, সেটা হলো মানুষের চিন্তা স্বভাবত স্পষ্ট। মানুষ গভীরভাবে ভেবে দেখলে তার চিন্তার ভিত্তিমূলে পৌঁছাতে পারবে। চিন্তার ভিত জানার বিষয়টা নির্ভর করে সে কতটা গভীরভাবে ভেবে চিন্তার মূল আবিষ্কার করতে পারে সেটার উপর। আর এভাবেই জ্ঞানের ভিত্তি সে আবিষ্কার করবে। এই মূলের অনুসন্ধানকে জরুরী মনে করা হতো। কেননা এটা ছাড়া (যেমনটা ধারণা করা হয়) কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক সত্যতা নিরূপনের পন্থা নেই।¹⁵² তবে আমাদের কাছে বিশেষভাবে কার্তেসিয়ান ভিত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেকার্তে বিজ্ঞানবাদী সংস্কৃতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন। অথবা আলোকায়নের যুগে তার পরে যে সকল দার্শনিক এসেছিলেন, তারা তার নীতি অনুসরণ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিভিত্তিক ভিতের উপর জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা করা।
এই ভিত্তি অনুসরণের ফলে যে সকল বিষয় মেনে নিতে হয়েছে-
(১) ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে আধুনিক ঝোঁক এবং এর পাশাপাশি সমাজ ও সামাজিকভাবে প্রাপ্ত জ্ঞানের অবহেলা। 'দেকার্তের এই নতুন ব্যক্তি-নির্ভর চিন্তা অনুযায়ী বর্ণনা তথা সাক্ষ্য দলীল হিসেবে কোনো শক্তি রাখে না, কেবল গৌণ ভূমিকা পালন করে; যদিও এর ভিত্তি থাকে।¹⁵³ তরণ ব্যক্তির আকল-বুদ্ধি কোনো কিছু অনুধাবন করলে সেটা দলীল। অতীত 'স্বাভাবিকভাবে অতীতই। বর্তমান বা ভবিষ্যতে এর কোনো অস্তিত্বগত গুরুত্ব নেই।'¹⁵⁴ খুব সংক্ষেপে বললে এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ইতিহাস হলো: 'মধ্যযুগে দর্শন পুরোপুরি ধর্মের অনুগামী ছিল। তখন দর্শন ছিল ধ্যান-ধারণা, চিন্তাধারা ও প্রচলিত মতামতের বিশ্লেষণ। নিছক একাডেমিক জ্ঞানে সীমিত হয়ে গিয়েছিল যেটার সাথে মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনোভাবে সেটা সত্যকে আলোকিত করতে সমর্থ ছিল না। তারপর দেকার্ত এসে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে থেকে দর্শনকে মুক্ত করেন। তিনি সবকিছুতে সংশয় তোলার মাধ্যমে নিজের যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তিনি এমন সব বিষয়ে সংশয় পোষণ করে বসেন, যেগুলোতে সংশয় পোষণ করা যায় না। কারণ একজন মানুষ এটা সংশয় পোষণ করতে পারে না যে তার নিজের অস্তিত্বই নেই। তার অবশ্যই অস্তিত্ব থাকতে হবে; যাতে সে সবকিছুতে সংশয় পোষণ করতে পারে। আমি যখন সংশয় পোষণ করি, তখন আমাকে মেনে নিতেই হবে যে আমি অস্তিত্বশীল। সুতরাং আমার নিজের অস্তিত্বে সংশয় পোষণ করা সম্ভব না। এভাবে মানুষের চোখে 'আমি' হয়ে পড়ে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই আধুনিককালে আত্মনির্ভর ও আত্মমুখী চিন্তার যাত্রা শুরু হয়।¹⁵⁵
(২) সত্য কেবল সেটাই, যেটা অনুধাবন করা এবং গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। ঐতিহাসিক বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা যেমন: নৈতিকতা, ঐতিহ্য প্রভৃতি বিষয় যদি বাস্তব বা সত্য হয়ে থাকে তবুও সেগুলো দ্বিতীয় স্তরের সত্য। আধুনিক দর্শনে এই জ্ঞানতত্ত্ব প্রভাব বিস্তার করেছে, হোক সেটা দেকার্তের অনুসারীদের মাঝে কিংবা তার সাথে আংশিকভাবে যাদের মতভেদ আছে তাদের মাঝেও। আমরা দেখতে পাই দেকার্তের পর থেকে পরীক্ষণ প্রক্রিয়ার অনুসারীরাও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে 'জ্ঞানের' সংজ্ঞা দিতে চেষ্টা করেছে। তারা অনুসন্ধানের সমস্যাকে বৈধতা প্রদানের জন্য 'আমিত্ব' থেকে যাত্রা। এটা উপরে ভিটগেনস্টাইনের দেওয়া স্মৃতির উদাহরণ থেকে আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়। তখন প্রশ্নটা হয়, কীভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহকে (ব্যথার অনুভূতি কিংবা টেবিলের অনুভূতি) বদলে (ব্যথা কিংবা টেবিলের) সংজ্ঞায় রূপ প্রদান করা যায়? উত্তর হলো, সমাজ প্রদান করে? সমাজ ব্যথার অনুভূতিকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমাজ একটা নির্দিষ্ট আকৃতি বা পারিপার্শ্বিক সব কিছুর সাথে এর সম্পর্ককে একত্র করে টেবিলের সংজ্ঞায় রূপ দেয়। স্বভাবতই সম্মিলিত মাপকাঠি হলো বেদনার অনুভূতির হওয়ার সাথে সাথে কৃত আচরণ। কারণ মানুষজন এটাই প্রত্যক্ষ করে থাকে। মানুষজন যখন ব্যথা অনুভব করে, তখন তার আচরণ এবং পারিপার্শ্বিক মানুষদের আচরণ থেকে 'ব্যথা'র সংজ্ঞা শিখতে পারে। শিক্ষণের মাপকাঠি থাকে আচরণ, অনুভূতি না। আচরণই ব্যথার সংজ্ঞাকে যথাযথ ব্যবহার করার মাপকাঠি। যেমনিভাবে টেবিলের সাথে মানুষের আচরণ টেবিলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার মাপকাঠি।
তাই দেকার্ত যখন বলেন, আমি বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কার্যত সংশয় পোষণ না করলেও তত্ত্বীয়ভাবে করি, তখন তিনি মূলত বলেন, 'আমি সংশয়ের দাবি তুলি, কিন্তু আচরণে তার কোনো প্রতিফলন থাকে না!' অর্থাৎ তিনি সংশয়ের অনুভূতির কথা বলছেন, কিন্তু সংশয়ের সংজ্ঞা বলছেন না যেটা আমরা সবাই জানি। তিনি এক বিশেষ ভাষায় কথা বলছেন যেটা বোধগম্য না, বা অন্ততপক্ষে স্ববিরোধী। তার উদাহরণ এমন মানুষের মতো যিনি বলেন, 'আমি ঈমানদার' কিন্তু ঈমানের প্রতিফলন ঘটে এমন কোনো কাজ সে করে না। সংশয় বলতে আমরা যা জানি সেটা হলো:
> এমন সংশয় যেটা পূর্ব থেকেই দৃঢ় বিশ্বাসকে অনুমিত ধরে নেয়। কারণ একটা শিশু কোনো কিছু জানার আগে অবশ্যই তাকে চারপাশের সবকিছুকে স্বীকার করে নিতে হবে। অর্থাৎ তাকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট বিষয় মেনে নিতে হবে এবং মেনে নেওয়ার নীতির অন্ধ অনুকরণ করতে হবে। তাহলেই বিশ্বজগত সম্পর্কে সে দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। তারপর যদি কখনো তার মনে হয় যে উত্তরাধিকারসূত্রে যা জেনে এসেছে, সেটা অতিক্রম করতে হবে; তাহলে সে সেটা করতে পারে। কিন্তু বিশ্বকে চেনার আগে কিংবা শূন্য থেকে শুরু করে তার জন্য এমনটা করা সম্ভব নয়। আক্কলে শুরু থেকে যে জ্ঞান থাকে, সেটা নিয়ে সে সংশয় পোষণ করতে পারবে না (যেমন- নিজের অস্তিত্ব, বহির্জগতের অস্তিত্ব, অন্যদের আকল থাকা, যুক্তিবিদ্যার প্রারম্ভিক কিছু মূলনীতি)। দেকার্ত যেখানে মনে করেন, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃঢ় বিশ্বাসের আগে মৌলিক সংশয়ের প্রয়োজন, সেখানে ভিটগেনস্টাইন বর্ণনা করেন যে, 'সংশয়ের জন্য পরীক্ষণ চালানোর সম্ভাবনা ও সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। আর পরীক্ষণের দাবি হলো এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকা, যার উপর ইতঃপূর্বে পরীক্ষা চালানো হয়নি যা সংশয় পোষণ করা হয়নি।' কালামবিদদের ভাষায় বললে, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত আবশ্যকীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'আপনি যদি সব বিষয়ে সংশয় পোষণ করতে চান, তাহলে সংশয়ের ফলে আর কিছুই খুঁজে পাবেন না। সংশয়ের জন্য আগে দৃঢ় বিশ্বাসের অস্তিত্ব আপনাকে মেনে নিতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সংশয়গুলো মেনে নেয় যে সংশয়ের ব্যতিক্রম কিছু বিষয় আছে। এগুলো মৌলিক বিস্তৃত বিষয়ের মত যেগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয় পরিচালিত হয়।¹⁸⁰ সুতরাং মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাসই মূল কিংবা অন্যভাবে বললে প্রাথমিক বা মৌলিক অবস্থান হলো দৃঢ় বিশ্বাস, সংশয় নয়। কারণ শুরুতেই আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে কিছু জিনিসের উপর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই বিশ্বাস করতে হবে, দলীল খুঁজতে হবে না। দার্শনিক শার্ল স্যান্ডেজ পিয়ার্স বলেন, 'পূর্ণ সংশয় থেকে আমাদের সূচনা করা সম্ভব নয়। বরং আমরা যখন দর্শন পড়া শুরু করব, তখন বাস্তবের ব্যাপারে যত পূর্ব ধারণা রাখি, সেগুলো থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। ... শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সংশয়বাদ নিছক আত্মপ্রতারণা, এটা প্রকৃত সংশয়বাদ নয়। ব্যক্তি সংশয় পোষণ করে কারণ সেটার পক্ষে তার ইতিবাচক কারণ থাকে। ... আসুন, আমরা মনে মনে যেসব বিষয়ে সংশয় পোষণ করি না, দর্শনে সেগুলোতে সংশয় পোষণ করার ভান না ধরি।¹⁸¹ এর উপর ভিত্তি করে 'ভিটগেনস্টাইন জ্ঞানের জন্য কিছু মূলনীতি থাকা দরকার এ মর্মে দেকার্তের পরবর্তী যুগে সবাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তোলে, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।' তিনি বিপরীতে এই 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে' গ্রহণ করেন।¹⁸²
> এমন সংশয় যেটার অস্তিত্ব পূর্বের কোনো বিশ্বাসকে মেনে নিতে বাধা প্রদান করে না। ভুল ও সংশয়ের সম্ভাবনার তত্ত্বীয় অস্তিত্ব আমাদের প্রাথমিক বিশ্বাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় না। আর ভিটগেনস্টাইনের মতে 'আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনো মাধ্যম বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। এর প্রয়োজনও নেই। সংশয়ের জন্ম কেবল মৌলিক কোনো কারণ থেকেই হতে হবে। দার্শনিকভাবে সৃষ্ট কোনো কিছু থেকে নয়।¹⁸³ আমরা 'অনেক সময়ে যৌক্তিক কারণে অসংখ্য সম্ভাবনাকে গণনার বাহিরে রাখি, যেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে দেখলে বলতে হবে যে, সেগুলো ঘটার মতো নয়; যদি আমরা যা জানার দাবি করি তা বাস্তবে জেনেই থাকি।' দেকার্তের স্বপ্নের যুক্তির উপর এটা প্রয়োগ করলে বলতে হবে, মূল অবস্থা হলো এটা মেনে নেয়া যে আমি স্বপ্নে আছি। বিভিন্ন তত্ত্বীয় সমস্যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকটা সংশয়ের সাথে এমন তত্ত্বীয় আচরণ করার অসম্ভাব্যতা ব্যক্ত করে ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'কেউ যদি বলে, এই জ্ঞান (প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান) বিষয়গুলোর বিপরীতে কূটতর্কের মাধ্যমে যে সকল যুক্তি দাঁড় করানো হয় সেগুলোর জবাব না দিলে এগুলো টিকবে না; তাহলে কারো কাছে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র জ্ঞান টিকে থাকবে না। কারণ মানুষের মনে কূটতর্কের কারণে যে সকল যুক্তি উপস্থিত হয়, সেগুলোর কোনো শেষ নেই।¹⁸⁴
> প্রায়োগিকভাবে বৈধতা পায় কিন্তু দার্শনিকভাবে পায় না এমন সংশয়। যে সকল মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলোতে অসুস্থতার কারণে বা খুব জোরাজুরি না করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না; সেগুলোর ব্যাপারে একজন ইতিহাসবিদের জন্য সংশয় পোষণ করা সম্ভব যদি তার কাছে এমন কিছু প্রকাশ পায় যেটা তাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। একজন মুহাদ্দিস মুখস্থে পারদর্শী কোনো এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারে, যখন সে ঐ বর্ণনাকে অন্য বর্ণনার সাথে তুলনা করে। যেমন, তার চাইতে মুখস্থে আরো দক্ষ কারো বর্ণনা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংশয় আমাদের স্বাভাবিক সংশয়ের মতো। আমরা যখন কোনো মানুষের সাথে কথা বলি তখন তার কথার সত্যতার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারি, যদি প্রাসঙ্গিক কোনো আলামত পাই। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'এটা হলো কল্পনা বা অনুমান, যাকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।' কারণ দেকার্ত কর্তৃক উপস্থাপিত 'ব্যবহারিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'¹⁸⁵ কল্পনা করা সম্ভব নয়。
সারকথা হলো, দেকার্তের পর থেকে জ্ঞানের তত্ত্বগুলো (যেমন: সংশয়বাদ) সমাজ এবং সামাজিক প্রয়োগের দিকগুলোর প্রাধান্য উপেক্ষা করে যায়। সেগুলো মনে করে জ্ঞান হচ্ছে, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিজের ব্যাপারে প্রদত্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রক্রিয়া। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার অধিকারী হব, তখন আমি (জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) জানব যে আমি এটার মালিক।¹⁸⁶ আর আমাদের বিবরণমূলক পদ্ধতি মৌলিক তথা প্রাথমিক জ্ঞানের ব্যাপারে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় না। মানুষজন যা জানে, সেটাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে আমরা সে সকল দার্শনিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিই। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিবরণ দেওয়ার মাধ্যমে। যার মাঝে রয়েছে মানুষদের দ্বারা মৌলিক জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করা। এটা তুলে ধরা বা প্রকাশ করার মাধ্যমে একজন দার্শনিক সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার উপযুক্ত জবাব প্রদান করা হয়। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'দার্শনিক সমস্যার জন্য (মানুষদের) সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। হাইডেগার যে উপসংহারে উপনীত হন সেটা হলো মানবিক বিদ্যা সামাজিক, পরস্পরের অংশগ্রহণে সৃষ্ট এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। এটা আদর্শিক কল্পিত কিছু নয়। বরং মানুষের প্রয়োজনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট। মানুষের সাথে বিশ্বজগত কিংবা মানুষের সাথে সমাজের প্রকৃত বিচ্ছিন্নতা নেই। সুতরাং ব্যক্তিসত্ত্বা ও বস্তুর মাঝে পৃথকীকরণ বলে কিছু নেই। যেহেতু জ্ঞান উত্তরাধিকার বা বংশসূত্রে প্রাপ্ত, সেহেতু এটা ঐতিহাসিক।
দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনও তার সর্বশেষ দর্শনে এসে বিশেষ ভাষার যুক্তি নামক একটি যুক্তিতে এসে এই ফলাফলে পৌঁছান। আমরা যদি কল্পনা করি দেকার্তের 'আমিত্ব' একটা শিশু যে কিনা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করে, যেখানে কেউ নেই; তাহলে এই শিশু কি জ্ঞান অর্জন করতে পারবে? তার জন্য কি এককভাবে ভাষা অর্জন করা সম্ভব হবে? শিশুটা কি 'ঘর'কে 'ঘর' নাম দিতে পারবে? ভিটগেনস্টাইন তার গবেষণার ২৫৮ নম্বর অনুচ্ছেদে এসে এই প্রশ্নের একটা কাল্পনিক উদাহরণ টেনে বলেন, 'আমি একটা ডায়েরী রাখব যেটা আমাকে নির্দিষ্ট একটা অনুভূতি বারবার ঘটার কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। তারপর ঐ অনুভূতির সাথে 'ক' বর্ণের সম্পর্ক স্থাপন করব। যেদিনই ঐ অনুভূতি আমার হবে, সেদিন আমি 'ক' বর্ণ ডায়েরীতে লিখব। প্রথমে আমি লক্ষ্য করব যে বর্ণের সংজ্ঞা প্রদান করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি ইঙ্গিতবহ একটা সংজ্ঞা হিসেবেও এটার কথা নিজেকে বলতে পারছি না। কীভাবে? আমি কি অনুভূতিটার দিকে ইশারা করতে পারব? না, প্রচলিত অর্থে পারব না। তবে আমি বর্ণটা বলব বা লিখব। আবার একই সময়ে অনুভূতির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করব। মনে মনে সেটার দিকে ইশারা করব। কিন্তু এভাবে মনোযোগ দেওয়ার লক্ষ্য কী? লক্ষ্য হলো ঐ বর্ণের অর্থটা মনের ভেতর স্থাপন করা। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার কাছে শুদ্ধতার কোনো মাপকাঠি নেই। মানুষ এখানে বলতে পারে যে, আমার কাছে যা সঠিক মনে হয় তা সঠিক। অর্থাৎ আমরা 'সঠিক/শুদ্ধ' সম্পর্কে কথা বলতে পারি না।' ভিটগেনস্টাইন এই উদাহরণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন যে ভাষা সামাজিক বিষয়। আর 'নামকরণ' এটা ভাষাগত কার্যক্রম যেটা নির্দিষ্ট মাপকাঠির উপর নির্ভর করে, আর সেই মাপকাঠিটা হলো সমাজ। সমাজ একটা শিশুর ইন্দ্রিয়গুলোকে এমনভাবে পরিচালিত করে, যেন সে বিশ্বকে আমাদের মত করে দেখতে পারে। একজন বিচ্ছিন্ন শিশু অসংখ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উদ্দীপকের মোকাবেলা করে (বস্তুবাদী পরীক্ষণ-নির্ভর দর্শনের দৃষ্টিতে যে শিশুর মাথা সাদা পৃষ্ঠার মতো শূন্য)। একজন শিশু এ সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উদ্দীপকের স্পর্শ পাওয়ার সময় অসংখ্য মানসিক অবস্থার সম্মুখীন হয়। সুতরাং নামকরণের কাজটা নির্বাচনমূলক, এর জন্য দরকার আত্মপরিচয়মূলক স্মৃতি। আর একটা সমাজের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভাষা এটাকে নিশ্চিত করে।
বিষয়টা আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা বারট্রান্ড রাসেলের চোখে জ্ঞানের দুই ভাগ উল্লেখ করব: প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও বর্ণনামূলক জ্ঞান। প্রত্যক্ষ জ্ঞান হলো 'আপনার ইন্দ্রিয়ের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে অনুভূতি। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি টেবিলের দিকে তাকান তাহলে প্রথম দেখায় পুরো টেবিল জানা সম্ভব নয়। কারণ আপনি টেবিল দেখছেন, কিন্তু হাতের আঙুল দিয়ে অনুভব করছেন না। আপনি আলোর প্রতিফলনে এর রং দেখতে পাচ্ছেন। পদার্থটা কঠিন বলে আপনি বুঝতে পারছেন। সরাসরি সংযোগে আপনি যা জেনেছেন, সেটা প্রত্যক্ষ অনুভূতি। আপনি যদি আবার প্রচেষ্টা চালিয়ে এই সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি দিয়ে একটা টেবিলের সামগ্রিক রূপ অর্জন করেন, সেটা হবে প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপ। আর এটা প্রত্যক্ষ জ্ঞান নয়, বরং একটা বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দলীল প্রদান। রাসেলের পরিভাষায় এটা হলো বর্ণনামূলক জ্ঞান।'¹⁷⁷ এখানে জ্ঞানের এই ভুল বিভাজনের স্বীকৃতি প্রদান করা উদ্দেশ্য নয়। বরং সমস্যাটা তুলে ধরা উদ্দেশ্য। সেটা হলো, একজন শিশুর জন্য বিক্ষিপ্ত, আকৃতিগত এবং প্রায়োগিক বিভিন্ন অনুভূতি থেকে 'টেবিল' নামক পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন সম্ভব? ভিটগেনস্টাইন মনে করেন 'বিভিন্ন জিনিসের মাঝে সাদৃশ্য বুঝতে পারা মানব জীবনের অন্যতম অংশ। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন বিষয় অনুধাবন করাও আমাদের জীবনের চিত্রের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সক্ষমতাগুলো আমাদেরকে ভাষা ব্যবহারের অভিনব যোগ্যতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কারণ এটা আমাদেরকে সরল বিষয় থেকে সামগ্রিক ও জটিল বিষয় গঠনের বৈধতা দেয়।'¹⁷⁸ নিছক ইন্দ্রিয় থেকে বর্ণনার পর্যায়ে পৌঁছানোর কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং অন্যের সাথে সংযোগ এবং অপরের দিক-নির্দেশনা এখানে প্রাধান্য পায়। ভিটগেনস্টাইন জোর প্রদান করে বলেন যে, নামকরণের বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত কিছু নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত। নাহলে নামকরণ অর্থহীন হতো। নামকরণ হলো, 'আমি আমার জানাশোনার ভেতরে এটাকে এই নাম দিয়েছি'। সুতরাং নামকরণ বুঝতে পারা ভাষার মূলনীতি বুঝতে পারার সমান। যেমনিভাবে দাবা খেলা পুরোপুরি বোঝা ছাড়া দাবার কোর্টে একটা গুটিকে বোঝা সম্ভব নয়। এই বুঝের সূচনা 'দেকার্তের আত্ম' কিংবা 'স্বচ্ছ আক্কল' থেকে হয় না। আমার যখন কোনো নতুন অনুভূতি হয় যেমন- ব্যথার অনুভূতি (ভিগটেনস্টাইনের উদাহরণ) আর আমি মনের গভীর থেকে সেটা বুঝতে পারি, সেটাকে আমি 'ব্যথা' নামক শব্দের সাথে সম্পৃক্ত করি, আর ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে আমার অনুরূপ অনুভূতি হয়; অতীতে আমার দেওয়া এই নামটা স্মরণ হয়, তখন আমি এটাই ব্যবহার করি। স্মৃতি আমাদেরকে বিভিন্ন শব্দ ও তার অর্থের মাঝে সঠিক সংযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা করে না, যতক্ষণ আমাদের কাছে ভুল থেকে সঠিক আলাদা করার মাপকাঠি না থাকে।¹⁷⁹ এই মাপকাঠি হলো সম্মিলিত স্মৃতি, যেটা বর্ণনার মাধ্যমে বংশানুক্রমে প্রাপ্ত সংস্কৃতি। এটা মানুষের জীবনের চিত্রকে তুলে ধরে। অর্থাৎ আপনি মানুষের একটা সমাজে বসবাস করলেই এমন বিষয়গুলোর মুখোমুখি হবেন। আমাদের চারপাশে বিশ্বকেন্দ্রিক আমাদের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের বর্ণনা (দৃষ্টিভঙ্গী) দ্বারা পূর্ণ। এটা উপরে ভিটগেনস্টাইনের দেওয়া স্মৃতির উদাহরণ থেকে আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়। তখন প্রশ্নটা হয়, কীভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহকে (ব্যথার অনুভূতি কিংবা টেবিলের অনুভূতি) বদলে (ব্যথা কিংবা টেবিলের) সংজ্ঞায় রূপ প্রদান করা যায়? উত্তর হলো, সমাজ প্রদান করে? সমাজ ব্যথার অনুভূতিকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমাজ একটা নির্দিষ্ট আকৃতি বা পারিপার্শ্বিক সব কিছুর সাথে এর সম্পর্ককে একত্র করে টেবিলের সংজ্ঞায় রূপ দেয়। স্বভাবতই সম্মিলিত মাপকাঠি হলো বেদনার অনুভূতির হওয়ার সাথে সাথে কৃত আচরণ। কারণ মানুষজন এটাই প্রত্যক্ষ করে থাকে। মানুষজন যখন ব্যথা অনুভব করে, তখন তার আচরণ এবং পারিপার্শ্বিক মানুষদের আচরণ থেকে 'ব্যথা'র সংজ্ঞা শিখতে পারে। শিক্ষণের মাপকাঠি থাকে আচরণ, অনুভূতি না। আচরণই ব্যথার সংজ্ঞাকে যথাযথ ব্যবহার করার মাপকাঠি। যেমনিভাবে টেবিলের সাথে মানুষের আচরণ টেবিলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার মাপকাঠি।
তাই দেকার্ত যখন বলেন, আমি বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কার্যত সংশয় পোষণ না করলেও তত্ত্বীয়ভাবে করি, তখন তিনি মূলত বলেন, 'আমি সংশয়ের দাবি তুলি, কিন্তু আচরণে তার কোনো প্রতিফলন থাকে না!' অর্থাৎ তিনি সংশয়ের অনুভূতির কথা বলছেন, কিন্তু সংশয়ের সংজ্ঞা বলছেন না যেটা আমরা সবাই জানি। তিনি এক বিশেষ ভাষায় কথা বলছেন যেটা বোধগম্য না, বা অন্ততপক্ষে স্ববিরোধী। তার উদাহরণ এমন মানুষের মতো যিনি বলেন, 'আমি ঈমানদার' কিন্তু ঈমানের প্রতিফলন ঘটে এমন কোনো কাজ সে করে না। সংশয় বলতে আমরা যা জানি সেটা হলো:
> এমন সংশয় যেটা পূর্ব থেকেই দৃঢ় বিশ্বাসকে অনুমিত ধরে নেয়। কারণ একটা শিশু কোনো কিছু জানার আগে অবশ্যই তাকে চারপাশের সবকিছুকে স্বীকার করে নিতে হবে। অর্থাৎ তাকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট বিষয় মেনে নিতে হবে এবং মেনে নেওয়ার নীতির অন্ধ অনুকরণ করতে হবে। তাহলেই বিশ্বজগত সম্পর্কে সে দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। তারপর যদি কখনো তার মনে হয় যে উত্তরাধিকারসূত্রে যা জেনে এসেছে, সেটা অতিক্রম করতে হবে; তাহলে সে সেটা করতে পারে। কিন্তু বিশ্বকেয়ের ফলে আর কিছুই খুঁজে পাবেন না। সংশয়ের জন্য আগে দৃঢ় বিশ্বাসের অস্তিত্ব আপনাকে মেনে নিতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সংশয়গুলো মেনে নেয় যে সংশয়ের ব্যতিক্রম কিছু বিষয় আছে। এগুলো মৌলিক বিস্তৃত বিষয়ের মত যেগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয় পরিচালিত হয়।'¹⁸⁰ সুতরাং মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাসই মূল কিংবা অন্যভাবে বললে প্রাথমিক বা মৌলিক অবস্থান হলো দৃঢ় বিশ্বাস, সংশয় নয়। কারণ শুরুতেই আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে কিছু জিনিসের উপর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই বিশ্বাস করতে হবে, দলীল খুঁজতে হবে না। দার্শনিক শার্ল স্যান্ডেজ পিয়ার্স বলেন, 'পূর্ণ সংশয় থেকে আমাদের সূচনা করা সম্ভব নয়। বরং আমরা যখন দর্শন পড়া শুরু করব, তখন বাস্তবের ব্যাপারে যত পূর্ব ধারণা রাখি, সেগুলো থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। ... শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সংশয়বাদ নিছক আত্মপ্রতারণা, এটা প্রকৃত সংশয়বাদ নয়। ব্যক্তি সংশয় পোষণ করে কারণ সেটার পক্ষে তার ইতিবাচক কারণ থাকে। ... আসুন, আমরা মনে মনে যেসব বিষয়ে সংশয় পোষণ করি না, দর্শনে সেগুলোতে সংশয় পোষণ করার ভান না ধরি।'¹⁸¹ এর উপর ভিত্তি করে 'ভিটগেনস্টাইন জ্ঞানের জন্য কিছু মূলনীতি থাকা দরকার এ মর্মে দেকার্তের পরবর্তী যুগে সবাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তোলে, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।' তিনি বিপরীতে এই 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে' গ্রহণ করেন।¹⁸²
> এমন সংশয় যেটার অস্তিত্ব পূর্বের কোনো বিশ্বাসকে মেনে নিতে বাধা প্রদান করে না। ভুল ও সংশয়ের সম্ভাবনার তত্ত্বীয় অস্তিত্ব আমাদের প্রাথমিক বিশ্বাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় না। আর ভিটগেনস্টাইনের মতে 'আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনো মাধ্যম বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। এর প্রয়োজনও নেই। সংশয়ের জন্ম কেবল মৌলিক কোনো কারণ থেকেই হতে হবে। দার্শনিকভাবে সৃষ্ট কোনো কিছু থেকে নয়।'¹⁸³ আমরা 'অনেক সময়ে যৌক্তিক কারণে অসংখ্য সম্ভাবনাকে গণনার বাহিরে রাখি, যেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে দেখলে বলতে হবে যে, সেগুলো ঘটার মতো নয়; যদি আমরা যা জানার দাবি করি তা বাস্তবে জেনেই থাকি।' দেকার্তের স্বপ্নের যুক্তির উপর এটা প্রয়োগ করলে বলতে হবে, মূল অবস্থা হলো এটা মেনে নেয়া যে আমি স্বপ্নে আছি। বিভিন্ন তত্ত্বীয় সমস্যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকটা সংশয়ের সাথে এমন তত্ত্বীয় আচরণ করার অসম্ভাব্যতা ব্যক্ত করে ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'কেউ যদি বলে, এই জ্ঞান (প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান) বিষয়গুলোর বিপরীতে কূটতর্কের মাধ্যমে যে সকল যুক্তি দাঁড় করানো হয় সেগুলোর জবাব না দিলে এগুলো টিকবে না; তাহলে কারো কাছে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র জ্ঞান টিকে থাকবে না। কারণ মানুষের মনে কূটতর্কের কারণে যে সকল যুক্তি উপস্থিত হয়, সেগুলোর কোনো শেষ নেই।'¹⁸⁴
> প্রায়োগিক বৈদ্যতা পায় কিন্তু দার্শনিকভাবে পায় না এমন সংশয়। যে সকল মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলোতে অসুস্থতার কারণে বা খুব জোরাজুরি না করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না; সেগুলোর ব্যাপারে একজন ইতিহাসবিদের জন্য সংশয় পোষণ করা সম্ভব যদি তার কাছে এমন কিছু প্রকাশ পায় যেটা তাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। একজন মুহাদ্দিস মুখস্থে পারদর্শী কোনো এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারে, যখন সে ঐ বর্ণনাকে অন্য বর্ণনার সাথে তুলনা করে। যেমন, তার চাইতে মুখস্থে আরো দক্ষ কারো বর্ণনা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংশয় আমাদের স্বাভাবিক সংশয়ের মতো। আমরা যখন কোনো মানুষের সাথে কথা বলি তখন তার কথার সত্যতার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারি, যদি প্রাসঙ্গিক কোনো আলামত পাই। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'এটা হলো কল্পনা বা অনুমান, যাকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।' কারণ দেকার্ত কর্তৃক উপস্থাপিত 'ব্যবহারিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'¹⁸⁵ কল্পনা করা সম্ভব নয়।
সারকথা হলো, দেকার্তের পর থেকে জ্ঞানের তত্ত্বগুলো (যেমন: সংশয়বাদ) সমাজ এবং সামাজিক প্রয়োগের দিকগুলোর প্রাধান্য উপেক্ষা করে যায়। সেগুলো মনে করে জ্ঞান হচ্ছে, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিজের ব্যাপারে প্রদত্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রক্রিয়া। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার অধিকারী হব, তখন আমি (জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) জানব যে আমি এটার মালিক।'¹⁸⁶ আর আমাদের বিবরণমূলক পদ্ধতি মৌলিক তথা প্রাথমিক জ্ঞানের ব্যাপারে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় না। মানুষজন যা জানে, সেটাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে আমরা সে সকল দার্শনিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিই। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিবরণ দেওয়ার মাধ্যমে। যার মাঝে রয়েছে মানুষদের দ্বারা মৌলিক জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করা। এটা তুলে ধরা বা প্রকাশ করার মাধ্যমে একজন দার্শনিক সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার উপযুক্ত জবাব প্রদান করা হয়। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'দার্শনিক সমস্যার জন্য (মানুষদের) সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। একজন মানুষের জন্য সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিপক্ষে দার্শনিকদের সব আক্রমণের মোকাবেলা করার উপায় হলো এমন কিছু উপস্থাপন করা, যেটা দেখলে তারা এই সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের উপর আক্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে।'¹⁸⁷
উপর্যুক্ত বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সামাজিক ও পরস্পরের অংশগ্রহণমূলক জ্ঞান ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহু মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিকভাবে দেখলে জ্ঞানের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে 'দৃঢ় বিশ্বাস' সংশয়ের পূর্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ যে মৌলিক জ্ঞান সকল মানুষ জানে সেটার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয়কে প্রায়োগিক দৃঢ় বিশ্বাস দুর্বল করে দেয়।
পূর্বের বক্তব্যগুলো প্রয়োগ করে বলব, ইসলামী সমাজে আমরা দেখতে পাই একজন মুসলিম কিছু মৌলিক জ্ঞান ধারণ করে। যেমন- আমাদের বইয়ের বিষয়বস্তু হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ প্রমাণ করা। আমাদের কাছে যে সকল বর্ণনা পৌঁছেছে, সেগুলোর সমষ্টি সুন্নাহকে তুলে ধরে। আর কোন কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত, সেগুলো নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাদীসের আলেমদের বক্তব্য চূড়ান্ত। বর্ণনাগুলো যাচাই করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি আছে। এই জ্ঞান একজন মুসলিম 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক' পদ্ধতিতে অর্জন করে। কেবল একটা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সে এই জ্ঞানের অধিকারী হয়। দলীল-নির্ভর জ্ঞানের চাইতে এই জ্ঞান তার রক্তে-মাংসে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী এই জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান করা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের জ্ঞান মেনে নিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।¹⁸⁸
টিকাঃ
১৫২. Kazmi, Yedullah, Faith and Knowledge in Islam: An Essay in philosophy of religion. Islamic Studies, Vol. 38, No, 4 (1999) pp. 503-534.
১৫৩. Leslie Stevenson, Why Believe What People Say? Sunthese Vol. 94, No. 3 (Mar., 1993), pp. 429-451.
১৫৪. লুসিয়ান গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফা, আল-মাজলিসুল আ'লা লিস-সাক্বাফা, অনুবাদ: ইউসুফ আল-আনত্বাকী, পৃ. ৫২।
১৫৫. প্যাট্রিক হিলি, সুয়ারুল মা'রিফাহ, পৃ. ৪৯।
১৫৬. রিচার্ড শাখত, রুয়াদুল ফালসাফাহ আল-হাসীসাহ, পৃ. ১৭।
১৫৭. Rudd, Anthony, Expressing the World: Skepticism, Wittgenstein, and Heidegger. Chicago: Open Court, 2003, p. 56.
১৫৮. আব্দুর রহমান বাদাওরী, মাউসুরাতুল ফালসাফাহ, হাইডেগার অধ্যায়।
১৫৯. প্রাগুক্ত।
১৬০. সাফা আব্দুস সালাম জাফর, আল-উজুদুল শুরু করেছে (যেটা মূলত বিশ্বজগৎ সম্পর্কে কিছু ব্যক্তির নিছক প্রতীতি, প্রকৃত রূপ নয় যেমনটা দেকার্তের মত)। তবে আমরা যেন বিক্ষিপ্ত না হয়ে যাই, সে জন্য আমরা শুধু বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টির দিকটাতে মনোযোগ নিবদ্ধ করব। আমরা জানি, কান্টের মতে এই বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কোনো বুদ্ধিভিত্তিক প্রমাণ না থাকাটা দর্শনের জন্য লাঞ্ছনার বিষয়।
আমরা আমাদের বইয়ে যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করব, সেটা হলো দর্শনের কাঠামো বা ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসা, যেটা জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটা তত্ত্ব দাঁড় করানোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় (বরং যেকোনো প্রকার দর্শনচর্চারই সমালোচনা করা)। কারণ এই কাঠামোই মূলত সংশয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। 'দেকার্তের মতে, মানুষ যেটাকে 'জানা' বিষয় মনে করে, সেটাকে 'জ্ঞান' হিসেবে অভিহিত করা যাবে না। যতক্ষণ না সেই জ্ঞানটা কিংবা সেটা যে সকল অনুমানের উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোকে সংশয়ের মুখোমুখি করা যায়।¹⁵⁶ আমরা এমন সমালোচনার পদ্ধতি অনুসরণ করার আহ্বান জানাবো যেটা সকল দার্শনিকের প্রস্তাবিত জ্ঞানের তত্ত্বকে সমালোচনা করবে। এক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প হলো বর্ণনামূলক পন্থা, জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপনের পদ্ধতি না। এই সমালোচনা (জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির সমালোচনা) বিংশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ দুই দার্শনিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ছিল। তারা হলেন মার্টিন হাইডেগার এবং লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের দর্শনের দ্বিতীয় পর্যায়। দার্শনিক রিচার্ড রর্টির মতে এরা ছিলেন দর্শনের রোগ উদঘাটনকারী। দেকার্তের পর থেকে দর্শনে জ্ঞানতত্ত্বের যে কেন্দ্রীয় অবস্থান, সেটার কঠোর সমালোচনা করে খ্যাতি কুড়ান হাইডেগার। আর ভিটগেনস্টাইন গ্রীক দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক দর্শন পর্যন্ত দর্শনচর্চার প্রচলিত ধারাকে অতিক্রম করার কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। উভয়ে আমাদের বাস্তব জীবনের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। তাদের প্রস্তাব হলো দর্শনের সমস্যাগুলো স্বাধীন চিন্তা থেকে সৃষ্ট। সমস্যাগুলোর সমাধান প্রদানের জন্য তারা দুজন আমাদের স্বাভাবিক জীবনে কোনো প্রকার চিন্তা-ভাবনা করার আগে বিভিন্ন বিষয়কে আমরা বাহ্যত কীভাবে নিতাম সেটার বিবরণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। হাইডেগার এবং ভিটগেনস্টাইন যাত্রা শুরু করেন ভাষা থেকে, জ্ঞান সৃষ্টিতে ভাষার গুরুত্বের জায়গা থেকে। সুতরাং ভাষার কোনো তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আপেক্ষিক চিন্তার খণ্ডনে তারা সবচেয়ে উপযুক্ত। এই দুজনের বক্তব্যের উপর নির্ভর করে আমরা যা উপস্থাপন করব, সেটা হলো দর্শনের পূর্বের যুগে আমাদের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান। কেউ সেটাকে দর্শন-বিরোধী বলুক কিংবা মানুষের স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিবরণ বলুক অথবা চিকিৎসা বলুক সেটা বিবেচ্য নয়। এটা 'সে সকল অনুমানের মূলোৎপাটন করে দিবে, যেগুলো দেকার্তের পরবর্তী সকল দর্শনে প্রচলিত সমস্যাগুলো তৈরি করেছে।¹⁵⁷ তাহলে আমরা দেখি জ্ঞানতত্ত্বের খণ্ডন এবং সংশয় প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে এই দুজন দার্শনিক কী কী বিষয় উপস্থাপন করেছেন, যাতে করে আমরা জ্ঞানের নানা তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করার বৈধতা দিতে পারি এবং বর্ণনামূলক পদ্ধতির দিকসমূহ উপস্থাপন করতে সক্ষম হই।
হাইডেগার মনে করেন বিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব (যেটাকে তিনি ডাজারেন- Dasein) সংজ্ঞা এবং বাস্তবতা উভয় দিক থেকেই তার সত্তার বহির্ভূত। সুতরাং হাইডেগারের ভাষায়, 'ডাজেইনের সারবস্তু তার সত্তার বাহিরে অস্তিত্ব লাভ করে।' আমরা যখন মানবীয় অস্তিত্বের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন বিশ্বের মাঝে এই অস্তিত্বই সর্বপ্রথম আমাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়। ডাজায়েনকে তার পারিপার্শ্বিক জগত থেকে পৃথক করা সম্ভব না। কারণ এটা পরিবেশের সাথে আবশ্যকীয়ভাবে সম্পৃক্ত। সামাজিক জীবন থেকেও একে আলাদা করা সম্ভব না; কারণ অন্যরা আমার সাথে চলছে এবং সাহচর্য গ্রহণ করছে। আমি তাদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে যাচ্ছি। এই বিশ্বকে তাদের সাথে আমাকে ভাগ করে নিতে হবে। মানুষ যখনই কিছুটা প্রশস্ততার মাঝে বসবাস করে, তখন অন্যের মাঝে ঢুকে যায় এবং তার জন্য নিজেকে আলোকিত করে। তাই একজন মানুষের জন্য অন্যান্য মানুষের অস্তিত্বটা মৌলিক। আমার অস্তিত্বের মাঝে একই সময়ে আমি অন্যদের সাথে আছি। 'কারো সাথে অস্তিত্ব' প্রত্যেক ডাজেইনের মৌলিক ও প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর অন্যদেরকে বুঝতে পারা আপন অস্তিত্বের একটা অস্তিত্বমূলক অবস্থা।
অন্যভাবে বললে, ডাজেইনের জন্য তার বিশেষ অস্তিত্ব অনুধাবন হলো অন্যদেরকে বুঝতে পারে। আবার আপন সত্ত্বাকে তার পূর্ণভাবে অনুভব ও অনুধাবন করা মূলত অন্যদেরকে অনুভব ও অনুধাবন করা থেকেই সে গ্রহণ করেছে।¹⁶⁰ ডাজায়েন যখন অন্যদের সাথে মেলামেশা পরিত্যাগ করে, তখন সে পরিত্যাগের মাধ্যমে যেন তাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়।¹⁶¹ এভাবে হাইডেগার জ্ঞানের ক্ষেত্রে অঙ্গন, সমাজ বা পরিবেশকে চূড়ান্ত একটা প্রভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, যেটাকে আধুনিক দর্শন পুরোপুরি অবহেলা করেছে। দেকার্তের সমালোচনায় এটাই প্রথম পয়েন্ট যার মূলকথা হলো, 'আমার নিজেকে অনুধাবন করা আমার পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো অনুধাবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।¹⁶² সুতরাং 'জ্ঞান এক প্রকার ডাজায়েন যেটা বিশ্বজগতের অভ্যন্তরে অস্তিত্বের ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত,¹⁶³ পৃথক সত্তার উপর নয়। আরো সহজভাবে বললে, জীববিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানের সকল দিক থেকে জীবনের অস্তিত্ব জ্ঞানেরও অস্তিত্বের পূর্বে। 'আল-কাইনূনা ওয়ায-যামান' বইয়ে হাইডেগার অভিযোগ করেন যে, জ্ঞানের ব্যাপারে আমাদের ধারণাটা সমস্যাজনক। আমরাই প্রশ্ন সৃষ্টি করি, 'কীভাবে এই জ্ঞাত সত্তা তার অভ্যন্তরীণ (বৃত্ত) থেকে বেরিয়ে বাহ্যিক বৃত্তের দিকে ধাবিত হয়? সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জ্ঞানের বিষয়বস্তু কীভাবে থাকতে পারে? একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে কীভাবে ভাষা যেতে পারে? এমনকি শেষ পর্যন্ত সত্তাও তাকে চিনতে পারে?¹⁶⁴ কিন্তু বাস্তবে ব্যাখ্যা জরুরী বা প্রয়োজনীয় নয়। কারণ ডাজায়েন সবসময় অস্তিত্বশীল জিনিসগুলোর মাঝে অস্তিত্বশীল, ফলে এই সকল সৃষ্টির মাঝে এটা ব্যাপ্ত।
আত্মগত তথা ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিক এর দ্বৈততা (যেটাকে ইতিহাসের সত্যতার বিপরীতে সর্বপ্রথম আপত্তি হিসেবে পেশ করা হয়) ধারণা করে নেয় যে, 'বাহির'কে বোঝার ক্ষেত্রে 'অভ্যন্তর'-এর অধিকার আছে। অথচ বিশ্বজগতের সাথে মানুষের প্রকৃত সম্পর্ক হলো মাধ্যম বিহীন এক বিশ্বে তার অস্তিত্ব; বরং এটা 'নিছক গ্রহণ'-এর মাঝে সীমিত। মানুষকে এই বিশ্বে শুধু অস্তিত্ব প্রদান করা হয়েছে। সে ভেতর থেকে বাহিরে বের হওয়ার সত্তা নয়। বরং সে একজন ডাজায়েন হওয়া মাত্রই সে কোনো প্রচেষ্টা না চালালেও বিশ্বের ব্যাপারে নির্দিষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারবে। হাইডেগার বলেন, মানুষের অনুধাবনের ক্ষেত্রে 'ডাজায়েন প্রথম বারের মত তার অভ্যন্তরীণ বৃত্তের বাহিরে যায় না। বরং সে তার অস্তিত্বের সূচনালগ্ন থেকে সবসময় (বাহিরে) এমন এক বৃহদাকার সৃষ্টির মাঝে অস্তিত্বশীল, যার কাছে প্রতিবারই এই আবিষ্কৃত বিশ্বজগতের দূরত্ব বিদ্যমান। একটা সৃষ্টির মাঝে নির্দিষ্টভাবে অবস্থান থেকে কখনো এটা বোঝা যায় না যে, সে 'অভ্যন্তরের' বৃত্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। বরং ডাজায়েন এই বহির্জগতে অস্তিত্বের ক্ষেত্রেও অভ্যন্তরে যে অর্থে সঠিকভাবে বোঝা হয় ঠিক সেটাই। অর্থাৎ এই সত্তাই বিশ্বজগতে তার সেই অস্তিত্ব যেটা আপনি জানেন। অনুরূপভাবে সত্য-সঠিককে গ্রহণ করা বাহির থেকে গনীমত অর্জন করে বিজয়ীর মত নিজের বুঝে ফিরে আসা নয়। বরং গ্রহণ ও সংরক্ষণের পরও জ্ঞাত ডাজায়েন তেমনই থাকে, যেমনটা বাহিরের জগতে থাকে।¹⁶⁵ হাইডেগারের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ একমাত্র অস্তিত্ব, যার গহীন ভেতরে অস্তিত্বের আলো বিদ্যমান। বিপরীতে অন্যান্য জড় ও ঘন অস্তিত্বগুলো এমন নয়। মানুষ আপন সত্তায় বন্দী নয়। বরং সে উদার ও প্রশস্ত। হাইডেগারের মতে মানুষ প্রকৃতিতে বা অস্তিত্বের মাঝে অস্তিত্বশীল একটা সত্তা নয়। বরং সে অস্তিত্বশীল সত্তাসমূহের মাঝে অবস্থান করে, তার সাথে অন্যান্য সত্তার সম্পর্ক উদারতা ও প্রশস্ততার। তাই হাইডেগার বলেন, 'প্রত্যেক নৈর্ব্যক্তিক ঝোঁকের মাঝেই রয়েছে অনুরূপ ব্যক্তিগত ঝোঁক। এর অর্থ এটা নয় যে, সৃষ্ট সত্তা পৃথক চিন্তাশীল ব্যক্তির একটা বিন্দুতে পরিণত হবে। অর্থাৎ একটা এলোমেলো বিষয়ে রূপ নিবে। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমরা যত কিছুর সম্মুখীন হই, সেগুলো আমাদের সামনে 'বস্তু' নিয়ে হাজির একজন মানুষের জন্য সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিপক্ষে দার্শনিকদের সব আক্রমণের মোকাবেলা করার উপায় হলো এমন কিছু উপস্থাপন করা, যেটা দেখলে তারা এই সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের উপর আক্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে।¹⁸⁷
উপর্যুক্ত বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সামাজিক ও পরস্পরের অংশগ্রহণমূলক জ্ঞান ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহু মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিকভাবে দেখলে জ্ঞানের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে 'দৃঢ় বিশ্বাস' সংশয়ের পূর্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ যে মৌলিক জ্ঞান সকল মানুষ জানে সেটার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয়কে প্রায়োগিক দৃঢ় বিশ্বাস দুর্বল করে দেয়।
পূর্বের বক্তব্যগুলো প্রয়োগ করে বলব, ইসলামী সমাজে আমরা দেখতে পাই একজন মুসলিম কিছু মৌলিক জ্ঞান ধারণ করে। যেমন- আমাদের বইয়ের বিষয়বস্তু হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ প্রমাণ করা। আমাদের কাছে যে সকল বর্ণনা পৌঁছেছে, সেগুলোর সমষ্টি সুন্নাহকে তুলে ধরে। আর কোন কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত, সেগুলো নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাদীসের আলেমদের বক্তব্য চূড়ান্ত। বর্ণনাগুলো যাচাই করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি আছে। এই জ্ঞান একজন মুসলিম 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক' পদ্ধতিতে অর্জন করে। কেবল একটা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সে এই জ্ঞানের অধিকারী হয়। দলীল-নির্ভর জ্ঞানের চাইতে এই জ্ঞান তার রক্তে-মাংসে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী এই জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান করা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের জ্ঞান মেনে নিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।¹⁸⁸
মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের আলোচনা শেষ করে এবার আমরা ভিন্ন আলোচনায় যাব, সেটা হলো আধুনিক দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ইতিহাসশাস্ত্রের একটা অংশ হিসেবে হাদীসশাস্ত্র কতটুকু জ্ঞানসম্মত বলে বিবেচ্য হবে।
টিকাঃ
১৫২. Kazmi, Yedullah, Faith and Knowledge in Islam: An Essay in philosophy of religion. Islamic Studies, Vol. 38, No, 4 (1999) pp. 503-534.
১৫৩. Leslie Stevenson, Why Believe What People Say? Sunthese Vol. 94, No. 3 (Mar., 1993), pp. 429-451.
১৫৪. লুসিয়ান গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফা, আল-মাজলিসুল আ'লা লিস-সাক্বাফা, অনুবাদ: ইউসুফ আল-আনত্বাকী, পৃ. ৫২।
১৫৫. প্যাট্রিক হিলি, সুয়ারুল মা'রিফাহ, পৃ. ৪৯।
১৫৬. রিচার্ড শাখত, রুয়াদুল ফালসাফাহ আল-হাসীসাহ, পৃ. ১৭।
১৫৭. Rudd, Anthony, Expressing the World: Skepticism, Wittgenstein, and Heidegger. Chicago: Open Court, 2003, p. 56.
১৫৮. আব্দুর রহমান বাদাওরী, মাউসুরাতুল ফালসাফাহ, হাইডেগার অধ্যায়।
১৫৯. প্রাগুক্ত।
১৬০. সাফা আব্দুস সালাম জাফর, আল-উজুদুল হাকীকী ইন্দা মার্তিন হাইডেগার, মুনশাআতুল মা'আরেফ, পৃ. ১৮৭।
১৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১।
১৬২. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59..
১৬৩. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, দারুল কুতুবিল জাদীদ আল-মুত্তাহিদাহ, অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকা: ফাতহী আল-মিসকীনী, পৃ. ১৪৫।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১।
১৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪।
১৬৬. হায়াত খালফাওয়ী, মাফস্থমুল হাকীকাহ ইন্দা মার্টিন হাইডেগার, মিন্ডাক্টরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স থিসিস, পৃ. ৫৬।
১৬৭. মুহাম্মাদ আশ-শাইখ, নাকদুল হাদাসাহ ফী ফিকরি হাইডেগার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০০৮, পৃ. ৪৭০।
১৬৮. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ১৫৬।
১৬৯. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 57.
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১৭১. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ৩৮৩।
১৭২. Rudd, Anthony, Expressing the world, 2003, p. 65.
১৭৩. কাইস মাদী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ৩৫-৩৬।
১৭৪. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩-৫৪।
১৭৫. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59.
১৭৬. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩।
১৭৭. যাকী নাজীব মাহমুদ, বারট্রান্ড রাসেল, দারুল মা'আরেক, পৃ. ৬৭।
১৭৮. হানী সুজা, ভিটগেনস্টাইন, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, আফাক লিনাশর ওয়াত-তাওযী, অনুবাদ: সালাহ ইসমাইল, পৃ. ১৬১।
১৭৯. মাহমুদ যাইদান, নাযারিয়্যাতুল মারেফা ইন্দা মুফাকিরিল ইসলাম ওয়া-ফালাসিফাতিল গারবিল মুয়াসিরীন, মাকতাবাতুল মুতানাব্বী, পৃ. ১১৫।
১৮০. অ্যান্ডি হ্যামিল্টন, ভিটগেনস্টাইন ওয়াফিল ইয়াক্বীন, ইবনুন নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১৯, অনুবাদ: মুস্তফা সামীর, পৃ. ৩১২।
১৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৭।
১৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল 'আক্বলি ওয়ান-নাক্কল, তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।
📄 আদর্শবাদ ও আপেক্ষিকতার মাঝে জ্ঞান
এই অনুচ্ছেদে আমরা 'জ্ঞান'-এর ধরন নিয়ে আলোচনা করব, অর্থাৎ মানুষের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যে জ্ঞান সৃষ্টি করে সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় হবে। যেমন- বিজ্ঞান। এক্ষেত্রে আমরা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব এবং জ্ঞানের ইতিহাসে সেগুলোর প্রভাবের উপর আলোকপাত করব।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মেটাফিজিক্সের বিরোধিতা করে এমন বিজ্ঞানমনস্ক একটা গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এদেরকে 'যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ' (Logical Positivism)-এর অনুসারী বলে গণ্য করা হয়। তাদের কাজ মূলত উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই বর্ধিত রূপ, যেটার ঐতিহাসিক বিবরণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে দিয়েছি। এছাড়াও তারা ছিল বিজ্ঞানবাদিতার চরমপন্থার বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানবাদী এবং প্রচলিত দৃষ্টবাদী থেকে তারা কীভাবে আলাদা, সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা তাদেরকে উল্লেখ করব দেকার্তের পর থেকে সর্বশেষ বারের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আদর্শবাদী জ্ঞানের আহ্বানের উদাহরণ প্রদানের জন্য। এই জ্ঞান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং ক্রম-উন্নতি সাধন করে। এটার নমুনা হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এর একমাত্র মাধ্যম হলো অনুসন্ধান। তবে এদেরকে পৃথক করে এমন একটা মৌলিক উপাদান আছে, যেটা উল্লেখ করা আবশ্যক। কারণ তারা প্রচলিত বিজ্ঞানবাদী চিন্তার থেকে ভিন্নভাবে বিষয়টা গ্রহণ করেছে। সেই উপাদানটা হলো 'যাচাইয়ের যোগ্যতা থাকা'। এর সারকথা হলো- বাক্যের অর্থ নির্ভর করে সেটা যাচাইয়ের পদ্ধতির উপর। আপনি একটা বাক্যের অর্থ জানেন মানে হলো আপনি জানেন কীভাবে সেটা যাচাই করতে হবে। যদি কোনো বিষয় যাচাই করার উপায় না থাকে, তাহলে সেটা অর্থপূর্ণ নয়। যাচাই (Verification) বলতে দৃষ্টবাদীরা বোঝায় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই। আর পর্যবেক্ষণ ইন্দ্রিয়ের সব ধরনের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দৃষ্টবাদিতাকে আলাদা করে ভাষাগত দিক। ভাষা হচ্ছে বাস্তবতার এমন বিবরণ, যেটা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির উপর নির্ভর করে। দৃষ্টবাদিতাকে আরো আলাদা করে প্রাকৃতিক দিক। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভাষাকে বিশ্বের বিবরণ দেওয়ার উপযুক্ত উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। নিঃসন্দেহে এই কাজ ইতিহাসকে জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিখ্যাত বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পপার যৌক্তিক ইতিবাদের কঠোর ও বারংবার সমালোচনা করায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। আমরা আমাদের প্রসঙ্গের সাথে মিলে এমন সমালোচনাসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ করব। অনুসন্ধানের সমস্যার সমাধান উদঘাটনের ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতির অক্ষমতার কথা কার্ল পপার স্পষ্ট করেছেন। পর্যবেক্ষণ আর নিয়মের মাঝে সবসময় একটা দূরত্ব থাকে। আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গুটিকয়েক জিনিস পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেখান থেকে একটা নিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে সকল পদার্থ যাচাই করে বলা সম্ভব নয় যে, 'পদার্থগুলো গরমে বিস্তৃতি লাভ করে।' কিন্তু সে নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা নিয়ম দাঁড় করিয়ে ফেলে। হিউমের উত্থাপিত সমস্যা এবং সেটার ব্যাপারে হিউমের বুঝের সমালোচনায় পপার লম্বা আলোচনা করেছেন। তার সমালোচনার সারকথা হলো, একজন বিজ্ঞানী স্বচ্ছ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরীক্ষণ শুরু করে না, বরং তার নির্দিষ্ট একদিকে ঝোঁক থাকে। তিনি বলেন, 'পর্যবেক্ষণ সবসময় তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছাইকৃত। নির্দিষ্ট বিষয়ে, নির্ধারিত কাজে বা প্রয়োজনে বাছাইকৃত সমস্যা এটাকে প্রভাবিত করে। পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য থাকে দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই। সমস্যা হলো একজন বিজ্ঞানী কোথা থেকে শুরু করবে? নিছক স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ না- যেমনটা অনুসন্ধানের পক্ষের লোকেরা বলে থাকেন। তার জন্য কী কী পর্যবেক্ষণ বা লিখে রাখা সম্ভব? একজন বিজ্ঞানীকে অবশ্যই একটা তত্ত্ব জানতে হবে, যাব উপর ভিত্তি করে সে পর্যবেক্ষণ করবে।¹⁹⁰ তাই পপার মনে করেন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রকৃত যাচাই হয় সেটাকে অবিশ্বাস করার মধ্য দিয়ে, সেটার উপর দৃঢ় বিশ্বাস আনার মধ্য দিয়ে না। পপারের বৈজ্ঞানিক দর্শন এবং সেটার সমালোচনাকে একপাশে রেখে বলতে হবে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুমানের ভূমিকা এবং জ্ঞানের মানবীয় দিক ইতিহাসকে 'জ্ঞান' বলে বিবেচনা করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটা যুক্তি। কারণ মানুষের জটিল কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসশাস্ত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের বড় ভূমিকা আছে। পাশাপাশি এটা তাকে বিজ্ঞানের নীতিসমূহের কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং পর্যবেক্ষণ ও উদঘাটনের মাঝে সমন্বয় সাধন করে।
কিন্তু ১৯৬২ সালে একটা বই প্রকাশ পায় যেটার বড় প্রভাব পড়ে মানবিক বিদ্যাসমূহে, তন্মধ্যে একটা বিদ্যা ইতিহাসশাস্ত্র। সেটা হলো দার্শনিক টমাস কুনের বই: 'দ্যা স্ট্রাকচার অফ সায়েন্টিফিক রেভলুশন্স'। এই বইয়ের দ্বৈত ভূমিকা ছিল। কারণ এটা মানবিক বিদ্যার অবস্থানকে অনেক উপরে নিয়ে আসে, যেটা কিনা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক পেছনে ছিল। আবার একই সময়ে যেকোনো ধরনের পদ্ধতিগত জ্ঞানকে হুমকির মুখে ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বা মানবিক বিদ্যা। এই বই জ্ঞানকে 'আপেক্ষিক' করে দেয় এমন অভিযোগ তোলা হয়, তাই অল্প কথায় এটার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা জরুরী।
টমাস কুন মনে করেন বিজ্ঞান তিন ধাপে চেনার আগে কিংবা শূন্য থেকে শুরু করে তার জন্য এমনটা করা সম্ভব নয়। আক্কলে শুরু থেকে যে জ্ঞান থাকে, সেটা নিয়ে সে সংশয় পোষণ করতে পারবে না (যেমন- নিজের অস্তিত্ব, বহির্জগতের অস্তিত্ব, অন্যদের আকল থাকা, যুক্তিবিদ্যার প্রারম্ভিক কিছু মূলনীতি)। দেকার্ত যেখানে মনে করেন, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃঢ় বিশ্বাসের আগে মৌলিক সংশয়ের প্রয়োজন, সেখানে ভিটগেনস্টাইন বর্ণনা করেন যে, 'সংশয়ের জন্য পরীক্ষণ চালানোর সম্ভাবনা ও সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। আর পরীক্ষণের দাবি হলো এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকা, যার উপর ইতঃপূর্বে পরীক্ষা চালানো হয়নি যা সংশয় পোষণ করা হয়নি।' কালামবিদদের ভাষায় বললে, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত আবশ্যকীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'আপনি যদি সব বিষয়ে সংশয় পোষণ করতে চান, তাহলে সংশয়ের ফলে আর কিছুই খুঁজে পাবেন না। সংশয়ের জন্য আগে দৃঢ় বিশ্বাসের অস্তিত্ব আপনাকে মেনে নিতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সংশয়গুলো মেনে নেয় যে সংশয়ের ব্যতিক্রম কিছু বিষয় আছে। এগুলো মৌলিক বিস্তৃত বিষয়ের মত যেগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয় পরিচালিত হয়।'¹⁸⁰ সুতরাং মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাসই মূল কিংবা অন্যভাবে বললে প্রাথমিক বা মৌলিক অবস্থান হলো দৃঢ় বিশ্বাস, সংশয় নয়। কারণ শুরুতেই আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে কিছু জিনিসের উপর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই বিশ্বাস করতে হবে, দলীল খুঁজতে হবে না। দার্শনিক শার্ল স্যান্ডেজ পিয়ার্স বলেন, 'পূর্ণ সংশয় থেকে আমাদের সূচনা করা সম্ভব নয়। বরং আমরা যখন দর্শন পড়া শুরু করব, তখন বাস্তবের ব্যাপারে যত পূর্ব ধারণা রাখি, সেগুলো থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। ... শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সংশয়বাদ নিছক আত্মপ্রতারণা, এটা প্রকৃত সংশয়বাদ নয়। ব্যক্তি সংশয় পোষণ করে কারণ সেটার পক্ষে তার ইতিবাচক কারণ থাকে। ... আসুন, আমরা মনে মনে যেসব বিষয়ে সংশয় পোষণ করি না, দর্শনে সেগুলোতে সংশয় পোষণ করার ভান না ধরি।'¹⁸¹ এর উপর ভিত্তি করে 'ভিটগেনস্টাইন জ্ঞানের জন্য কিছু মূলনীতি থাকা দরকার এ মর্মে দেকার্তের পরবর্তী যুগে সবাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তোলে, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।' তিনি বিপরীতে এই 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে' গ্রহণ করেন।¹⁸²
> এমন সংশয় যেটার অস্তিত্ব পূর্বের কোনো বিশ্বাসকে মেনে নিতে বাধা প্রদান করে না। ভুল ও সংশয়ের সম্ভাবনার তত্ত্বীয় অস্তিত্ব আমাদের প্রাথমিক বিশ্বাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় না। আর ভিটগেনস্টাইনের মতে 'আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনো মাধ্যম বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। এর প্রয়োজনও নেই। সংশয়ের জন্ম কেবল মৌলিক কোনো কারণ থেকেই হতে হবে। দার্শনিকভাবে সৃষ্ট কোনো কিছু থেকে নয়।'¹⁸³ আমরা 'অনেক সময়ে যৌক্তিক কারণে অসংখ্য সম্ভাবনাকে গণনার বাহিরে রাখি, যেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে দেখলে বলতে হবে যে, সেগুলো ঘটার মতো নয়; যদি আমরা যা জানার দাবি করি তা বাস্তবে জেনেই থাকি।' দেকার্তের স্বপ্নের যুক্তির উপর এটা প্রয়োগ করলে বলতে হবে, মূল অবস্থা হলো এটা মেনে নেয়া যে আমি স্বপ্নে আছি। বিভিন্ন তত্ত্বীয় সমস্যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকটা সংশয়ের সাথে এমন তত্ত্বীয় আচরণ করার অসম্ভাব্যতা ব্যক্ত করে ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'কেউ যদি বলে, এই জ্ঞান (প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান) বিষয়গুলোর বিপরীতে কূটতর্কের মাধ্যমে যে সকল যুক্তি দাঁড় করানো হয় সেগুলোর জবাব না দিলে এগুলো টিকবে না; তাহলে কারো কাছে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র জ্ঞান টিকে থাকবে না। কারণ মানুষের মনে কূটতর্কের কারণে যে সকল যুক্তি উপস্থিত হয়, সেগুলোর কোনো শেষ নেই।'¹⁸⁴
> প্রায়োগিক வரவே বৈধতা পায় কিন্তু দার্শনিকভাবে পায় না এমন সংশয়। যে সকল মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলোতে অসুস্থতার কারণে বা খুব জোরাজুরি না করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না; সেগুলোর ব্যাপারে একজন ইতিহাসবিদের জন্য সংশয় পোষণ করা সম্ভব যদি তার কাছে এমন কিছু প্রকাশ পায় যেটা তাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। একজন মুহাদ্দিস মুখস্থে পারদর্শী কোনো এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারে, যখন সে ঐ বর্ণনাকে অন্য বর্ণনার সাথে তুলনা করে। যেমন, তার চাইতে মুখস্থে আরো দক্ষ কারো বর্ণনা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংশয় আমাদের স্বাভাবিক সংশয়ের মতো। আমরা যখন কোনো মানুষের সাথে কথা বলি তখন তার কথার সত্যতার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারি, যদি প্রাসঙ্গিক কোনো আলামত পাই। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'এটা হলো কল্পনা বা অনুমান, যাকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।' কারণ দেকার্ত কর্তৃক উপস্থাপিত 'ব্যবহারিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'¹⁸⁵ কল্পনা করা সম্ভব নয়।
সারকথা হলো, দেকার্তের পর থেকে জ্ঞানের তত্ত্বগুলো (যেমন: সংশয়বাদ) সমাজ এবং সামাজিক প্রয়োগের দিকগুলোর প্রাধান্য উপেক্ষা করে যায়। সেগুলো মনে করে জ্ঞান হচ্ছে, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিজের ব্যাপারে প্রদত্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রক্রিয়া। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার অধিকারী হব, তখন আমি (জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) জানব যে আমি এটার মালিক।'¹⁸⁶ আর আমাদের বিবরণমূলক পদ্ধতি মৌলিক তথা প্রাথমিক জ্ঞানের ব্যাপারে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় না। মানুষজন যা জানে, সেটাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে আমরা সে সকল দার্শনিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিই। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিবরণ দেওয়ার মাধ্যমে। যার মাঝে রয়েছে মানুষদের দ্বারা মৌলিক জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করা। এটা তুলে ধরা বা প্রকাশ করার মাধ্যমে একজন দার্শনিক সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার উপযুক্ত জবাব প্রদান করা হয়। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'দার্শনিক সমস্যার জন্য (মানুষদের) সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। একজন মানুষের জন্য সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিপক্ষে দার্শনিকদের সব আক্রমণের মোকাবেলা করার উপায় হলো এমন কিছু উপস্থাপন করা, যেটা দেখলে তারা এই সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের উপর আক্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে।'¹⁸⁷
উপর্যুক্ত বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সামাজিক ও পরস্পরের অংশগ্রহণমূলক জ্ঞান ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহু মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিকভাবে দেখলে জ্ঞানের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে 'দৃঢ় বিশ্বাস' সংশয়ের পূর্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ যে মৌলিক জ্ঞান সকল মানুষ জানে সেটার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয়কে প্রায়োগিক দৃঢ় বিশ্বাস দুর্বল করে দেয়।
পূর্বের বক্তব্যগুলো প্রয়োগ করে বলব, ইসলামী সমাজে আমরা দেখতে পাই একজন মুসলিম কিছু মৌলিক জ্ঞান ধারণ করে। যেমন- আমাদের বইয়ের বিষয়বস্তু হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ প্রমাণ করা। আমাদের কাছে যে সকল বর্ণনা পৌঁছেছে, সেগুলোর সমষ্টি সুন্নাহকে তুলে ধরে। আর কোন কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত, সেগুলো নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাদীসের আলেমদের বক্তব্য চূড়ান্ত। বর্ণনাগুলো যাচাই করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি আছে। এই জ্ঞান একজন মুসলিম 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক' পদ্ধতিতে অর্জন করে। কেবল একটা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সে এই জ্ঞানের অধিকারী হয়। দলীল-নির্ভর জ্ঞানের চাইতে এই জ্ঞান তার রক্তে-মাংসে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী এই জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান করা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের জ্ঞান মেনে নিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।¹⁸⁸
টিকাঃ
১৫২. Kazmi, Yedullah, Faith and Knowledge in Islam: An Essay in philosophy of religion. Islamic Studies, Vol. 38, No, 4 (1999) pp. 503-534.
১৫৩. Leslie Stevenson, Why Believe What People Say? Sunthese Vol. 94, No. 3 (Mar., 1993), pp. 429-451.
১৫৪. লুসিয়ান গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফা, আল-মাজলিসুল আ'লা লিস-সাক্বাফা, অনুবাদ: ইউসুফ আল-আনত্বাকী, পৃ. ৫২।
১৫৫. প্যাট্রিক হিলি, সুয়ারুল মা'রিফাহ, পৃ. ৪৯।
১৫৬. রিচার্ড শাখত, রুয়াদুল ফালসাফাহ আল-হাসীসাহ, পৃ. ১৭।
১৫৭. Rudd, Anthony, Expressing the World: Skepticism, Wittgenstein, and Heidegger. Chicago: Open Court, 2003, p. 56.
১৫৮. আব্দুর রহমান বাদাওরী, মাউসুরাতুল ফালসাফাহ, হাইডেগার অধ্যায়।
১৫৯. প্রাগুক্ত।
১৬০. সাফা আব্দুস সালাম জাফর, আল-উজুদুল হাকীকী ইন্দা মার্তিন হাইডেগার, মুনশাআতুল মা'আরেফ, পৃ. ১৮৭।
১৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১।
১৬২. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59..
১৬৩. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, দারুল কুতুবিল জাদীদ আল-মুত্তাহিদাহ, অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকা: ফাতহী আল-মিসকীনী, পৃ. ১৪৫।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১।
১৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪।
১৬৬. হায়াত খালফাওয়ী, মাফস্থমুল হাকীকাহ ইন্দা মার্টিন হাইডেগার, মিন্ডাক্টরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স থিসিস, পৃ. ৫৬।
১৬৭. মুহাম্মাদ আশ-শাইখ, নাকদুল হাদাসাহ ফী ফিকরি হাইডেগার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০০৮, পৃ. ৪৭০।
১৬৮. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ১৫৬।
১৬৯. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 57.
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১৭১. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ৩৮৩।
১৭২. Rudd, Anthony, Expressing the world, 2003, p. 65.
১৭৩. কাইস মাদী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ৩৫-৩৬।
১৭৪. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩-৫৪।
১৭৫. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59.
১৭৬. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩।
১৭৭. যাকী নাজীব মাহমুদ, বারট্রান্ড রাসেল, দারুল মা'আরেক, পৃ. ৬৭।
১৭৮. হানী সুজা, ভিটগেনস্টাইন, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, আফাক লিনাশর ওয়াত-তাওযী, অনুবাদ: সালাহ ইসমাইল, পৃ. ১৬১।
১৭৯. মাহমুদ যাইদান, নাযারিয়্যাতুল মারেফা ইন্দা মুফাকিরিল ইসলাম ওয়া-ফালাসিফাতিল গারবিল মুয়াসিরীন, মাকতাবাতুল মুতানাব্বী, পৃ. ১১৫।
১৮০. অ্যান্ডি হ্যামিল্টন, ভিটগেনস্টাইন ওয়াফিল ইয়াক্বীন, ইবনুন নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১৯, অনুবাদ: মুস্তফা সামীর, পৃ. ৩১২।
১৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৭।
১৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল 'আক্বলি ওয়ান-নাক্কল, হাকীকী ইন্দা মার্তিন হাইডেগার, মুনশাআতুল মা'আরেফ, পৃ. ১৮৭।
১৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১।
১৬২. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59..
১৬৩. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, দারুল কুতুবিল জাদীদ আল-মুত্তাহিদাহ, অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকা: ফাতহী আল-মিসকীনী, পৃ. ১৪৫।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১।
১৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪।
১৬৬. হায়াত খালফাওয়ী, মাফস্থমুল হাকীকাহ ইন্দা মার্টিন হাইডেগার, মিন্ডাক্টরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স থিসিস, পৃ. ৫৬।
১৬৭. মুহাম্মাদ আশ-শাইখ, নাকদুল হাদাসাহ ফী ফিকরি হাইডেগার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০০৮, পৃ. ৪৭০।
১৬৮. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ১৫৬।
১৬৯. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 57.
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১৭১. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ৩৮৩।
১৭২. Rudd, Anthony, Expressing the world, 2003, p. 65.
১৭৩. কাইস মাদী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ৩৫-৩৬।
১৭৪. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩-৫৪।
১৭৫. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59.
১৭৬. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩।
১৭৭. যাকী নাজীব মাহমুদ, বারট্রান্ড রাসেল, দারুল মা'আরেক, পৃ. ৬৭।
১৭৮. হানী সুজা, ভিটগেনস্টাইন, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, আফাক লিনাশর ওয়াত-তাওযী, অনুবাদ: সালাহ ইসমাইল, পৃ. ১৬১।
১৭৯. মাহমুদ যাইদান, নাযারিয়্যাতুল মারেফা ইন্দা মুফাকিরিল ইসলাম ওয়া-ফালাসিফাতিল গারবিল মুয়াসিরীন, মাকতাবাতুল মুতানাব্বী, পৃ. ১১৫।
১৮০. অ্যান্ডি হ্যামিল্টন, ভিটগেনস্টাইন ওয়াফিল ইয়াক্বীন, ইবনুন নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১৯, অনুবাদ: মুস্তফা সামীর, পৃ. ৩১২।
১৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৭।
১৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল 'আক্বলি ওয়ান-নাক্কল, তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।
এই অনুচ্ছেদে আমরা 'জ্ঞান'-এর ধরন নিয়ে আলোচনা করব, অর্থাৎ মানুষের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যে জ্ঞান সৃষ্টি করে সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় হবে। যেমন- বিজ্ঞান। এক্ষেত্রে আমরা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব এবং জ্ঞানের ইতিহাসে সেগুলোর প্রভাবের উপর আলোকপাত করব।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মেটাফিজিক্সের বিরোধিতা করে এমন বিজ্ঞানমনস্ক একটা গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এদেরকে 'যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ' (Logical Positivism)-এর অনুসারী বলে গণ্য করা হয়। তাদের কাজ মূলত উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই বর্ধিত রূপ, যেটার ঐতিহাসিক বিবরণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে দিয়েছি। এছাড়াও তারা ছিল বিজ্ঞানবাদিতার চরমপন্থার বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানবাদী এবং প্রচলিত দৃষ্টবাদী থেকে তারা কীভাবে আলাদা, সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা তাদেরকে উল্লেখ করব দেকার্তের পর থেকে সর্বশেষ বারের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আদর্শবাদী জ্ঞানের আহ্বানের উদাহরণ প্রদানের জন্য। এই জ্ঞান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং ক্রম-উন্নতি সাধন করে। এটার নমুনা হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এর একমাত্র মাধ্যম হলো অনুসন্ধান। তবে এদেরকে পৃথক করে এমন একটা মৌলিক উপাদান আছে, যেটা উল্লেখ করা আবশ্যক। কারণ তারা প্রচলিত বিজ্ঞানবাদী চিন্তার থেকে ভিন্নভাবে বিষয়টা গ্রহণ করেছে। সেই উপাদানটা হলো 'যাচাইয়ের যোগ্যতা থাকা'। এর সারকথা হলো- বাক্যের অর্থ নির্ভর করে সেটা যাচাইয়ের পদ্ধতির উপর। আপনি একটা বাক্যের অর্থ জানেন মানে হলো আপনি জানেন কীভাবে সেটা যাচাই করতে হবে। যদি কোনো বিষয় যাচাই করার উপায় না থাকে, তাহলে সেটা অর্থপূর্ণ নয়। যাচাই (Verification) বলতে দৃষ্টবাদীরা বোঝায় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই। আর পর্যবেক্ষণ ইন্দ্রিয়ের সব ধরনের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দৃষ্টবাদিতাকে আলাদা করে ভাষাগত দিক। ভাষা হচ্ছে বাস্তবতার এমন বিবরণ, যেটা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির উপর নির্ভর করে। দৃষ্টবাদিতাকে আরো আলাদা করে প্রাকৃতিক দিক। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভাষাকে বিশ্বের বিবরণ দেওয়ার উপযুক্ত উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। নিঃসন্দেহে এই কাজ ইতিহাসকে জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিখ্যাত বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পপার যৌক্তিক ইতিবাদের কঠোর ও বারংবার সমালোচনা করায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। আমরা আমাদের প্রসঙ্গের সাথে মিলে এমন সমালোচনাসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ করব। অনুসন্ধানের সমস্যার সমাধান উদঘাটনের ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতির অক্ষমতার কথা কার্ল পপার স্পষ্ট করেছেন। পর্যবেক্ষণ আর নিয়মের মাঝে সবসময় একটা দূরত্ব থাকে। আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গুটিকয়েক জিনিস পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেখান থেকে একটা নিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে সকল পদার্থ যাচাই করে বলা সম্ভব নয় যে, 'পদার্থগুলো গরমে বিস্তৃতি লাভ করে।' কিন্তু সে নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা নিয়ম দাঁড় করিয়ে ফেলে। হিউমের উত্থাপিত সমস্যা এবং সেটার ব্যাপারে হিউমের বুঝের সমালোচনায় পপার লম্বা আলোচনা করেছেন। তার সমালোচনার সারকথা হলো, একজন বিজ্ঞানী স্বচ্ছ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরীক্ষণ শুরু করে না, বরং তার নির্দিষ্ট একদিকে ঝোঁক থাকে। তিনি বলেন, 'পর্যবেক্ষণ সবসময় তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছাইকৃত। নির্দিষ্ট বিষয়ে, নির্ধারিত কাজে বা প্রয়োজনে বাছাইকৃত সমস্যা এটাকে প্রভাবিত করে। পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য থাকে দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই। সমস্যা হলো একজন বিজ্ঞানী কোথা থেকে শুরু করবে? নিছক স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ না- যেমনটা অনুসন্ধানের পক্ষের লোকেরা বলে থাকেন। তার জন্য কী কী পর্যবেক্ষণ বা লিখে রাখা সম্ভব? একজন বিজ্ঞানীকে অবশ্যই একটা তত্ত্ব জানতে হবে, যাব উপর ভিত্তি করে সে পর্যবেক্ষণ করবে।'¹⁹⁰ তাই পপার মনে করেন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রকৃত যাচাই হয় সেটাকে অবিশ্বাস করার মধ্য দিয়ে, সেটার উপর দৃঢ় বিশ্বাস আনার মধ্য দিয়ে না। পপারের বৈজ্ঞানিক দর্শন এবং সেটার সমালোচনাকে একপাশে রেখে বলতে হবে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুমানের ভূমিকা এবং জ্ঞানের মানবীয় দিক ইতিহাসকে 'জ্ঞান' বলে বিবেচনা করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটা যুক্তি। কারণ মানুষের জটিল কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসশাস্ত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের বড় ভূমিকা আছে। পাশাপাশি এটা তাকে বিজ্ঞানের নীতিসমূহের কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং পর্যবেক্ষণ ও উদঘাটনের মাঝে সমন্বয় সাধন করে।
কিন্তু ১৯৬২ সালে একটা বই প্রকাশ পায় যেটার বড় প্রভাব পড়ে মানবিক বিদ্যাসমূহে, তন্মধ্যে একটা বিদ্যা ইতিহাসশাস্ত্র। সেটা হলো দার্শনিক টমাস কুনের বই: 'দ্যা স্ট্রাকচার অফ সায়েন্টিফিক রেভলুশন্স'। এই বইয়ের দ্বৈত ভূমিকা ছিল। কারণ এটা মানবিক বিদ্যার অবস্থানকে অনেক উপরে নিয়ে আসে, যেটা কিনা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক পেছনে ছিল। আবার একই সময়ে যেকোনো ধরনের পদ্ধতিগত জ্ঞানকে হুমকির মুখে ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বা মানবিক বিদ্যা। এই বই জ্ঞানকে 'আপেক্ষিক' করে দেয় এমন অভিযোগ তোলা হয়, তাই অল্প কথায় এটার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা জরুরী।
টমাস কুন মনে করেন বিজ্ঞান তিন ধাপে অগ্রগতি সাধন করে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই তিনটা ধাপ বারবার অতিক্রান্ত হয়:
- বিজ্ঞানপূর্ব পর্যায়: যেখানে একদল বিজ্ঞানী থেকে এলোমেলোভাবে কোনো এক বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম প্রকাশ পায়।
- বিজ্ঞানের স্বাভাবিক পর্যায় (Normal Science)।
- বিজ্ঞানের বিপ্লবের পর্যায়, যে সময়ে পূর্বের জ্ঞানের বদলে স্বতন্ত্র একটা পদ্ধতি স্থাপন করা হয়।
এরপর এই পর্যায়গুলো বারবার ঘটতে থাকে।
তিনি মনে করেন বিজ্ঞান একটা নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্যারাডাইমের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেটা বিজ্ঞানের যাবতীয় তত্ত্ব, অনুমান, প্রয়োগের পদ্ধতি ও দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই নমুনাটা সুশৃঙ্খল জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত ব্যক্তিদের কাছে একটা আদর্শ বিজ্ঞানভিত্তিক নমুনা বলে গণ্য হয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের যুগে গবেষণার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা যায় এবং যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করে। এই সুশৃঙ্খল জ্ঞানের দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে জ্ঞানের অঙ্গনে একটা নীরবতা বজায় থাকে। অবশেষে নমুনায় ফাটল দেখা দেয়, যখন ঐ জ্ঞানীদের গোষ্ঠী থেকে কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়ে। এই ফাটলের ফলে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে। বিজ্ঞানীরা পুরাতন নমুনার বদলে নতুন একটা নমুনাকে গ্রহণ করে। যেমন- টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞানের তত্ত্বের পরিবর্তে কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অথবা নিউটনের তত্ত্বের পরিবর্তে আইনস্টাইনের তত্ত্ব। টমাস কুন বিজ্ঞানের দার্শনিক এবং বিজ্ঞানের ক্রম উন্নতির ইতিহাস রচয়িতাদের মাঝে প্রচলিত একটা বিশ্বাসের সমালোচনা করেন। সেটা হলো, বিজ্ঞান সবসময় কিছু নতুন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পেলে সেটাকে বিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত করে, অথবা ভুল পেলে সেটাতে সংশয় পোষণ করে। বরং পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের যে বিপ্লব দেখেছে, সেটা বিজ্ঞানের উন্নতির পক্ষে প্রমাণ নয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞান আবশ্যকীয়ভাবে নতুন নতুন বাস্তবতা তৈরি করে না। বরং এগুলো কিছু ধাঁধার মতো, যেগুলোর সমাধান বিজ্ঞানীরা করে। তারপর তাদের অনুসরণীয় নমুনার ছায়ায় সেগুলো স্তুপীকৃত করে রেখে দেয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের সময়ে অর্জিত এই স্তুপগুলোর অধিকাংশই বিজ্ঞানের বিপ্লবের সময়ে এসে আর অবশিষ্ট থাকে না। বরং সেগুলোর জায়গায় নতুন আবিষ্কার জায়গা করে নেয়।
বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ পরীক্ষণের মাধ্যমে সেগুলোর সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস আনা সম্ভব, এই প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করে কুন। তিনি মনে করেন বিভিন্ন আলামত যাচাই নির্ভর করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের পর অনুসন্ধানের উপর। এগুলোর মাধ্যমে তত্ত্বের সত্যতা বা ভুল জানা যায়।
পপারের সাথেও কুন দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, যে সকল বিজ্ঞানী জ্ঞানের সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি মেনে চলেন, তাদের দৈনন্দিন প্রায়োগিক কার্যক্রমে কোনো তত্ত্বকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার মতো ব্যাপার ঘটে না। কারণ কোনো তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বিচ্ছিন্ন অবস্থার প্রকাশ এমন তত্ত্বকে বাতিল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট না, যেটার অনুসরণ করে বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী। তার মতে, সুশৃঙ্খল জ্ঞানের পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা তাদের নমুনার খণ্ডনের নানা প হয় যেটাকে 'ব্যক্তি' স্থান করে দেয়; অর্থাৎ ব্যক্তি সত্তা সেটার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করে এবং অস্তিত্বকে জোরদার করে।¹⁶⁷
আমরা বিশ্বকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বস্তু হিসেবে পরীক্ষা করি না। ব্যক্তি প্রথম ধাপে নিজেকে চেনার পর দ্বিতীয় ধাপে বিশ্বকে চিনে—বিষয়টা এমন নয়। বরং বিশ্বের সাথে আমাদের আচরণ একজন কাঠমিস্ত্রীর মতো, যে তার সকল উপকরণ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে আচরণ করে। প্রত্যেকটি উপকরণের অর্থ, গুরুত্ব ও সম্পর্ক আছে। হাইডেগার বলেন, 'একটা উপকরণ সর্বদা অন্য উপকরণের অন্তর্ভুক্তির দিকে ধাবিত করে: লেখার উপকরণ, পালক, কালি, কাগজ, বালিশ, টেবিল, ফানুস, আসবাবপত্র, জানালা, দরজা, রুম। এগুলো একা একা অস্তিত্ব লাভ করে না, যে পরবর্তীতে এগুলোর সমন্বয়ে কক্ষ গঠিত হবে। শুরুতে প্রথম দেখায় একজন ব্যক্তি যে জিনিসটার প্রকৃত রূপ উদঘাটন করতে পারবে না, সেটা হলো কক্ষ। আর এই কক্ষও (চার দেওয়ালের ভেতরে) কোনো স্থানের অর্থে নেই, বরং এটা বসবাসের উপকরণ। এর থেকেই যাত্রা শুরু করে (এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহের) আসবাবপত্রের প্রকাশ ঘটে। প্রত্যেকবার এর ভেতর একক উপকরণ প্রকাশ পায়। এগুলোর আগে প্রত্যেক বার উপকরণবাচক বাক্য আবিষ্কৃত হয়েছে।¹⁶⁸ সংক্ষেপে বললে, 'আমরা জগতকে আমাদের ইচ্ছা-আগ্রহের জায়গা থেকেই দেখে থাকি।¹⁶⁹
তাই হাইডেগারের মত অনুযায়ী 'এই বিশ্বজগতের ব্যাপারে সংশয় পোষণ করা আমাদের জন্য সম্ভব না। কারণ আমাদের জন্য নিজেদের বুঝতে হলে সেটা এই বিশ্বের মাঝে সৃষ্ট প্রাণী হিসেবেই বুঝতে হবে। আর এই বিশ্বকে বুঝতে হলে এমন বিশ্ব হিসেবেই বুঝতে হবে, যেখানে আমাদের অস্তিত্ব আছে।¹⁷⁰ সুতরাং বহির্জগতের অস্তিত্বের পক্ষে এমন কোনো বুদ্ধিভিত্তিক প্রমাণের অস্তিত্ব নেই যা সংশয় দূর করে- কান্টের দাবিকৃত এই দার্শনিক সংকট 'এমন নয় যে এর দলীল পাওয়া দুঃসাধ্য। বরং এমন দলীল সর্বদা কাম্য ও প্রত্যাশিত।¹⁷¹ এই দলীলের অপেক্ষা করাটাই লাঞ্ছনার বিষয়- এমনটা মনে করেন হাইডেগার।
দেকার্ত যেমন অনুধাবনকে উপস্থিত একটা মুহূর্ত বলে মনে করে, অর্থাৎ নিজেকে পূর্বে বিদ্যমান যেকোনো জ্ঞান থেকে আলাদা করে ফেলে; তার বিপরীতে গিয়ে হাইডেগার মনে করেন আমরা সময়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রবহমান, অর্থাৎ আমাদের ইতিহাস আছে, সেটা অতীত বা ভবিষ্যত উভয় সময়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। 'কারণ অতীতকে আমরা যাচাই করব এই হিসেবে যে, অতীত হলো আমরা যা কিছু করে বর্তমান পর্যন্ত এসেছি। আর ভবিষ্যতকে যাচাই করব কিছু প্রশস্ত সম্ভাবনা হিসেবে, তার মধ্যে কিছু সম্ভাবনায় আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করব, আর কিছু এড়িয়ে যাব।¹⁷² আমাদের নিজেদের বুঝ, আগ্রহ, বিশ্বাস ও অনুভূতি সম্পর্কে আমাদের সকল বক্তব্য আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমরা যে সকল অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করতে পারি, সেটার দিকেও নির্দেশ করে। আমাদের ইতিহাসকে বর্তমান মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের সামনে এই মুহূর্তে (ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কিংবা হৃদয়ে ধারণ) যা প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলো পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত নয়, আবার ভবিষ্যতের সাথেও এর সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়। স্মৃতি আমাদেরকে 'বাস্তবতার সাথে কেমন আচরণ করতে হবে সে ব্যাপারে যাবতীয় উপকরণ প্রদান করে। স্মৃতি ছাড়া আমাদের দিন-রাত লক্ষ্যহীন হয়ে পড়বে। স্মৃতি আমাদের প্রত্যেককে আপন ইতিহাস রচনা করতে সাহায্য করে। আমরা যেটাকে বর্তমান বলি, সেটা একটা সময়ের স্পষ্ট সীমারেখায় বেঁধে ফেলা যায় না; কারণ এটাকে বর্তমান বলে অভিহিত করার আগেই এটা শেষ হয়ে অতীতে পরিণত হয়। আমাদের এমন বর্তমান প্রয়োজন পড়ে যেটার আলোকে আমরা পরিমাপ করব। সেজন্য নিকট অতীত থেকে একটা অংশ চুরি করে আমরা সেটাকে নিজেদের তৎক্ষণাৎ অনুভূতি হিসেবে গণ্য করে 'বাহ্যিক বর্তমান' হিসেবে চালিয়ে দিই। এই বর্তমানটা এক প্রকার চিন্তা যেটা আমাদের তৎক্ষণাৎ অর্জনের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া এবং লক্ষ্য অনুযায়ী বদলে যায়। প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের প্রত্যেকে (ইতিহাস লেখকেরাও) অনুভবযোগ্য পরিবর্তনশীল বর্তমানের বুকে সর্বদা নতুন সুতা বুনে চলি, সেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবন এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দাবিকে অন্তর্ভুক্ত করে। স্মৃতিশক্তিকে নবায়ন করার ভিত্তির উপর দাঁড়ানো চিন্তা অনুভবযোগ্য বর্তমানের পরিধিকে বিস্তৃত করতে ভূমিকা রাখে। যেমন আমরা বলি: 'এই বছর' বা 'বর্তমান প্রজন্ম'। অথচ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ঘটনাগুলো এমন অনুভূত বর্তমানের অংশ না যেটা অতীতের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে এগুলো কিছু অনুমান হিসেবে সমবেত হয়েছে যেগুলো ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে।' আমাদের স্মৃতি শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সীমিত না। 'বরং ব্যক্তির গণ্ডি অতিক্রম করে আমাদের সমাজ ও অন্যান্য সমাজের সাধারণ বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করে, যেগুলো আমরা আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন উৎসের জ্ঞান থেকে অর্জন করেছি। এই ক্রম নবায়নকৃত স্মৃতি দিয়ে আমরা আমাদের জন্য এবং আমাদের মাধ্যমে একটা সরল ইতিহাস তৈরি করি, যেটার উৎস হলো অনুভূত বর্তমানে চিন্তাকৃত অতীত।¹⁷³ দেকার্তের 'আমি'কে কেবল 'কোনো জাতিগোষ্ঠীর পটভূমিতেই পাওয়া যায়। আমরা অতীতে যেটার খোঁজ করি, বর্তমানে মানুষকে জানতেও সেটাই খুঁজি। প্রথমে ব্যক্তিদের মৌলিক অবস্থান এবং তারপর মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে মানুষের সমবেত হওয়া, তারপর পরস্পরের মিলেমিশে অবস্থান করা আর বিশ্বজগত। ইতিহাস জানাটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, আমরা এর মাধ্যমে এমন কিছু মানুষের সাথে পরিচিত হই যারা অনুরূপ মূল্যবোধের পক্ষে লড়াই করেছিল। আমরা আজ যা কিছু পাচ্ছি, সেগুলোর সাথে মিলে অথবা সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদেরকে অতিক্রম করে এমন সকল কিছুর একটা অংশ আমরা। ইতিহাসের জ্ঞান শুধু ঐ ব্যক্তির মাঝে থাকে, যে আত্মকেন্দ্রিকতাকে অতিক্রম করে এবং সেই অতিক্রম করার বিষয়টা বাস্তবায়নের জন্য অন্যতম মৌলিক মাধ্যম নির্ধারণ করে নেয়।'¹⁷⁴ সুতরাং জ্ঞানতত্ত্ববিদদের সমস্যা হলো তারা 'নিজেদেরকে পৃথক আকল মনে করে সেখান থেকে চিন্তার যাত্রা শুরু করে, যে আক্কলগুলো স্বতন্ত্র কোনো কিছুর মোকাবেলা করে যেমনটা তারা দাবি করে। ধরে নেয়া হয় যে আমরা সেগুলোকে না জানলেও সেগুলো অস্তিত্বশীল। কিন্তু যদি সবকিছুর এমন পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য থাকে, তাহলে অবশ্যই সংশয়মূলক তর্ক উত্থাপিত হবে। জ্ঞানতত্ত্ববিদদের বক্তব্যগুলো মেনে নিলে সেগুলো মোকাবেলা করা কঠিন হবে। আমরা যদি মেনেও নিই যে, আমাদের বাহিরে জগতের অস্তিত্ব আছে, তবুও সেটা অর্থবহ বহু জিনিসে ভরপুর বিশ্বে আমাদের দৈনন্দিন অনুধাবনকে পুনরায় দাঁড় করানোর জন্য যথেষ্ট হবে না।'¹⁷⁵ এই 'আত্ম' সকল সমস্যার মূল, কারণ 'ইতিহাস তত্ত্বের ভিত্তিই হলো অন্যদের সাথে সম্পর্ক।¹⁷⁶
এভাবে হাইডেগার যে উপসংহারে উপনীত হন সেটা হলো মানবিক বিদ্যা সামাজিক, পরস্পরের অংশগ্রহণে সৃষ্ট এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। এটা আদর্শিক কল্পিত কিছু নয়। বরং মানুষের প্রয়োজনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট। মানুষের সাথে বিশ্বজগত কিংবা মানুষের সাথে সমাজের প্রকৃত বিচ্ছিন্নতা নেই। সুতরাং ব্যক্তিসত্ত্বা ও বস্তুর মাঝে পৃথকীকরণ বলে কিছু নেই। যেহেতু জ্ঞান উত্তরাধিকার বা বংশসূত্রে প্রাপ্ত, সেহেতু এটা ঐতিহাসিক।
দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনও তার সর্বশেষ দর্শনে এসে বিশেষ ভাষার যুক্তি নামক একটি যুক্তিতে এসে এই ফলাফলে পৌঁছান। আমরা যদি কল্পনা করি দেকার্তের 'আমিত্ব' একটা শিশু যে কিনা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস করে, যেখানে কেউ নেই; তাহলে এই শিশু কি জ্ঞান অর্জন করতে পারবে? তার জন্য কি এককভাবে ভাষা অর্জন করা সম্ভব হবে? শিশুটা কি 'ঘর'কে 'ঘর' নাম দিতে পারবে? ভিটগেনস্টাইন তার গবেষণার ২৫৮ নম্বর অনুচ্ছেদে এসে এই প্রশ্নের একটা কাল্পনিক উদাহরণ টেনে বলেন, 'আমি একটা ডায়েরী রাখব যেটা আমাকে নির্দিষ্ট একটা অনুভূতি বারবার ঘটার কথা স্মরণ করিয়ে দিবে। তারপর ঐ অনুভূতির সাথে 'ক' বর্ণের সম্পর্ক স্থাপন করব। যেদিনই ঐ অনুভূতি আমার হবে, সেদিন আমি 'ক' বর্ণ ডায়েরীতে লিখব। প্রথমে আমি লক্ষ্য করব যে বর্ণের সংজ্ঞা প্রদান করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি ইঙ্গিতবহ একটা সংজ্ঞা হিসেবেও এটার কথা নিজেকে বলতে পারছি না। কীভাবে? আমি কি অনুভূতিটার দিকে ইশারা করতে পারব? না, প্রচলিত অর্থে পারব না। তবে আমি বর্ণটা বলব বা লিখব। আবার একই সময়ে অনুভূতির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করব। মনে মনে সেটার দিকে ইশারা করব। কিন্তু এভাবে মনোযোগ দেওয়ার লক্ষ্য কী? লক্ষ্য হলো ঐ বর্ণের অর্থটা মনের ভেতর স্থাপন করা। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার কাছে শুদ্ধতার কোনো মাপকাঠি নেই। মানুষ এখানে বলতে পারে যে, আমার কাছে যা সঠিক মনে হয় তা সঠিক। অর্থাৎ আমরা 'সঠিক/শুদ্ধ' সম্পর্কে কথা বলতে পারি না।' ভিটগেনস্টাইন এই উদাহরণ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন যে ভাষা সামাজিক বিষয়। আর 'নামকরণ' এটা ভাষাগত কার্যক্রম যেটা নির্দিষ্ট মাপকাঠির উপর নির্ভর করে, আর সেই মাপকাঠিটা হলো সমাজ। সমাজ একটা শিশুর ইন্দ্রিয়গুলোকে এমনভাবে পরিচালিত করে, যেন সে বিশ্বকে আমাদের মত করে দেখতে পারে। একজন বিচ্ছিন্ন শিশু অসংখ্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উদ্দীপকের মোকাবেলা করে (বস্তুবাদী পরীক্ষণ-নির্ভর দর্শনের দৃষ্টিতে যে শিশুর মাথা সাদা পৃষ্ঠার মতো শূন্য)। একজন শিশু এ সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উদ্দীপকের স্পর্শ পাওয়ার সময় অসংখ্য মানসিক অবস্থার সম্মুখীন হয়। সুতরাং নামকরণের কাজটা নির্বাচনমূলক, এর জন্য দরকার আত্মপরিচয়মূলক স্মৃতি। আর একটা সমাজের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভাষা এটাকে নিশ্চিত করে।
বিষয়টা আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা বারট্রান্ড রাসেলের চোখে জ্ঞানের দুই ভাগ উল্লেখ করব: প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও বর্ণনামূলক জ্ঞান। প্রত্যক্ষ জ্ঞান হলো 'আপনার ইন্দ্রিয়ের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে অনুভূতি। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি টেবিলের দিকে তাকান তাহলে প্রথম দেখায় পুরো টেবিল জানা সম্ভব নয়। কারণ আপনি টেবিল দেখছেন, কিন্তু হাতের আঙুল দিয়ে অনুভব করছেন না। আপনি আলোর প্রতিফলনে এর রং দেখতে পাচ্ছেন। পদার্থটা কঠিন বলে আপনি বুঝতে পারছেন। সরাসরি সংযোগে আপনি যা জেনেছেন, সেটা প্রত্যক্ষ অনুভূতি। আপনি যদি আবার প্রচেষ্টা চালিয়ে এই সকল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি দিয়ে একটা টেবিলের সামগ্রিক রূপ অর্জন করেন, সেটা হবে প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপ। আর এটা প্রত্যক্ষ জ্ঞান নয়, বরং একটা বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দলীল প্রদান। রাসেলের পরিভাষায় এটা হলো বর্ণনামূলক জ্ঞান।¹⁷⁷ এখানে জ্ঞানের এই ভুল বিভাজনের স্বীকৃতি প্রদান করা উদ্দেশ্য নয়। বরং সমস্যাটা তুলে ধরা উদ্দেশ্য। সেটা হলো, একজন শিশুর জন্য বিক্ষিপ্ত, আকৃতিগত এবং প্রায়োগিক বিভিন্ন অনুভূতি থেকে 'টেবিল' নামক পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন সম্ভব? ভিটগেনস্টাইন মনে করেন 'বিভিন্ন জিনিসের মাঝে সাদৃশ্য বুঝতে পারা মানব জীবনের অন্যতম অংশ। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন বিষয় অনুধাবন করাও আমাদের জীবনের চিত্রের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সক্ষমতাগুলো আমাদেরকে ভাষা ব্যবহারের অভিনব যোগ্যতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কারণ এটা আমাদেরকে সরল বিষয় থেকে সামগ্রিক ও জটিল বিষয় গঠনের বৈধতা দেয়।¹⁷⁸ নিছক ইন্দ্রিয় থেকে বর্ণনার পর্যায়ে পৌঁছানোর কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং অন্যের সাথে সংযোগ এবং অপরের দিক-নির্দেশনা এখানে প্রাধান্য পায়। ভিটগেনস্টাইন জোর প্রদান করে বলেন যে, নামকরণের বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত কিছু নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত। নাহলে নামকরণ অর্থহীন হতো। নামকরণ হলো, 'আমি আমার জানাশোনার ভেতরে এটাকে এই নাম দিয়েছি'। সুতরাং নামকরণ বুঝতে পারা ভাষার মূলনীতি বুঝতে পারার সমান। যেমনিভাবে দাবা খেলা পুরোপুরি বোঝা ছাড়া দাবার কোর্টে একটা গুটিকে বোঝা সম্ভব নয়। এই বুঝের সূচনা 'দেকার্তের আত্ম' কিংবা 'স্বচ্ছ আক্কল' থেকে হয় না। আমার যখন কোনো নতুন অনুভূতি হয় যেমন- ব্যথার অনুভূতি (ভিগটেনস্টাইনের উদাহরণ) আর আমি মনের গভীর থেকে সেটা বুঝতে পারি, সেটাকে আমি 'ব্যথা' নামক শব্দের সাথে সম্পৃক্ত করি, আর ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে আমার অনুরূপ অনুভূতি হয়; অতীতে আমার দেওয়া এই নামটা স্মরণ হয়, তখন আমি এটাই ব্যবহার করি। স্মৃতি আমাদেরকে বিভিন্ন শব্দ ও তার অর্থের মাঝে সঠিক সংযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা করে না, যতক্ষণ আমাদের কাছে ভুল থেকে সঠিক আলাদা করার মাপকাঠি না থাকে।¹⁷⁹ এই মাপকাঠি হলো সম্মিলিত স্মৃতি, যেটা বর্ণনার মাধ্যমে বংশানুক্রমে প্রাপ্ত সংস্কৃতি। এটা মানুষের জীবনের চিত্রকে তুলে ধরে। অর্থাৎ আপনি মানুষের একটা সমাজে বসবাস করলেই এমন বিষয়গুলোর মুখোমুখি হবেন। আমাদের চারপাশে বিশ্বকেন্দ্রিক আমাদের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের বর্ণনা (দৃষ্টিভঙ্গী) দ্বারা পূর্ণ। এটা উপরে ভিটগেনস্টাইনের দেওয়া স্মৃতির উদাহরণ থেকে আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়। তখন প্রশ্নটা হয়, কীভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুসমূহকে (ব্যথার অনুভূতি কিংবা টেবিলের অনুভূতি) বদলে (ব্যথা কিংবা টেবিলের) সংজ্ঞায় রূপ প্রদান করা যায়? উত্তর হলো, সমাজ প্রদান করে? সমাজ ব্যথার অনুভূতিকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক অগ্রগতি সাধন করে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই তিনটা ধাপ বারবার অতিক্রান্ত হয়:
- বিজ্ঞানপূর্ব পর্যায়: যেখানে একদল বিজ্ঞানী থেকে এলোমেলোভাবে কোনো এক বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম প্রকাশ পায়।
- বিজ্ঞানের স্বাভাবিক পর্যায় (Normal Science)।
- বিজ্ঞানের বিপ্লবের পর্যায়, যে সময়ে পূর্বের জ্ঞানের বদলে স্বতন্ত্র একটা পদ্ধতি স্থাপন করা হয়।
এরপর এই পর্যায়গুলো বারবার ঘটতে থাকে।
তিনি মনে করেন বিজ্ঞান একটা নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্যারাডাইমের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেটা বিজ্ঞানের যাবতীয় তত্ত্ব, অনুমান, প্রয়োগের পদ্ধতি ও দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই নমুনাটা সুশৃঙ্খল জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত ব্যক্তিদের কাছে একটা আদর্শ বিজ্ঞানভিত্তিক নমুনা বলে গণ্য হয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের যুগে গবেষণার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা যায় এবং যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করে। এই সুশৃঙ্খল জ্ঞানের দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে জ্ঞানের অঙ্গনে একটা নীরবতা বজায় থাকে। অবশেষে নমুনায় ফাটল দেখা দেয়, যখন ঐ জ্ঞানীদের গোষ্ঠী থেকে কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়ে। এই ফাটলের ফলে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে। বিজ্ঞানীরা পুরাতন নমুনার বদলে নতুন একটা নমুনাকে গ্রহণ করে। যেমন- টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞানের তত্ত্বের পরিবর্তে কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অথবা নিউটনের তত্ত্বের পরিবর্তে আইনস্টাইনের তত্ত্ব। টমাস কুন বিজ্ঞানের দার্শনিক এবং বিজ্ঞানের ক্রম উন্নতির ইতিহাস রচয়িতাদের মাঝে প্রচলিত একটা বিশ্বাসের সমালোচনা করেন। সেটা হলো, বিজ্ঞান সবসময় কিছু নতুন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পেলে সেটাকে বিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত করে, অথবা ভুল পেলে সেটাতে সংশয় পোষণ করে। বরং পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের যে বিপ্লব দেখেছে, সেটা বিজ্ঞানের উন্নতির পক্ষে প্রমাণ নয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞান আবশ্যকীয়ভাবে নতুন নতুন বাস্তবতা তৈরি করে না। বরং এগুলো কিছু ধাঁধার মতো, যেগুলোর সমাধান বিজ্ঞানীরা করে। তারপর তাদের অনুসরণীয় নমুনার ছায়ায় সেগুলো স্তুপীকৃত করে রেখে দেয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের সময়ে অর্জিত এই স্তুপগুলোর অধিকাংশই বিজ্ঞানের বিপ্লবের সময়ে এসে আর অবশিষ্ট থাকে না। বরং সেগুলোর জায়গায় নতুন আবিষ্কার জায়গা করে নেয়।
বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ পরীক্ষণের মাধ্যমে সেগুলোর সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস আনা সম্ভব, এই প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করে কুন। তিনি মনে করেন বিভিন্ন আলামত যাচাই নির্ভর করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের পর অনুসন্ধানের উপর। এগুলোর মাধ্যমে তত্ত্বের সত্যতা বা ভুল জানা যায়।
পপারের সাথেও কুন দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, যে সকল বিজ্ঞানী জ্ঞানের সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি মেনে চলেন, তাদের দৈনন্দিন প্রায়োগিক কার্যক্রমে কোনো তত্ত্বকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার মতো ব্যাপার ঘটে না। কারণ কোনো তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বিচ্ছিন্ন অবস্থার প্রকাশ এমন তত্ত্বকে বাতিল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট না, যেটার অনুসরণ করে বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী। তার মতে, সুশৃঙ্খল জ্ঞানের পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা তাদের নমুনার খণ্ডনের নানা পন্থার খোঁজ বা যাচাই করে না। তারা বিচ্ছিন্ন নানা অবস্থার উপর নির্ভর করে একটা আদর্শ নমুনাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে দেয় না। অর্থাৎ তারা কিছু নির্দিষ্ট তত্ত্বের নমুনার অভ্যন্তরকে শুধু মিথ্যা সাব্যস্ত করে, সরাসরি নমুনাকে তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অবস্থা বারবার আসার ফলে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বের সংহতি হুমকির মুখে পড়ে এবং ফাটল দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের মাঝে তখন বিভক্তি দেখা দেয় যে এই নমুনা কি টিকে থাকার উপযুক্ত কিনা। বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী নির্ধারণ করে দেয় কখন পুরাতন নমুনাকে বাতিল করে নতুন নমুনাকে গ্রহণ করা হবে। কুন যে বিষয়টাতে বেশ জোর প্রদান করেন সেটা হলো এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক পন্থায় গৃহীত হয় না- যেমনটা বিজ্ঞানকে যারা আদর্শ জ্ঞান করে তারা মনে করে থাকে।
অ্যালেক্স রুজেনবার্গ বলেন, 'বিপ্লবীরা যখন একটা নতুন নমুনা দাঁড় করায়, তখন তারা কোনো নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে না যেটার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে এটা বেশি যৌক্তিক পন্থা। অনুরূপভাবে তাদের বিপরীতে তাদের চাইতে বয়স্ক এবং গভীরতার অধিকারী ব্যক্তিরা যখন পুরাতন নমুনাকে আঁকড়ে ধরে সেটার পক্ষে লড়াই করে, তখন তারাও অধিকতর যৌক্তিক পন্থার অনুসরণ করে না।¹⁹² সুতরাং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অর্থ বিজ্ঞানীদের মাঝে নমুনায় বিদ্যমান অধিকাংশ ধাঁধাঁ সমাধান করার যোগ্যতা থাকা। কোনো তত্ত্বকে যাচাই করার মাপকাঠি স্থিত কিছু নয়, এটা বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র নয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অধিকাংশ সময়ে পূর্বের মতামত ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং বিজ্ঞান অগ্রগতিমূলক কিংবা নিরপেক্ষ নয়। তারপর কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে এর পক্ষে অনেকগুলো উদাহরণ পেশ করেন।¹⁹³
তাই বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে 'নিরপেক্ষতা'কে উপস্থাপন করার বিষয়টা কুন সংশয়ের চোখে দেখেছেন। তার বক্তব্যের কারণে সে সময়ে এসে মানবিক বিদ্যাও 'জ্ঞান' হিসেবে কতটুকু উপযুক্ত সেটা নিয়ে বিদ্যমান তর্কে মানবিক বিদ্যা এগিয়ে যায়। কেননা কুন বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেন যে প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে পর্যবেক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রভাব আছে। তত্ত্বকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেই, যেমনটা দৃষ্টবাদীরা বা কার্ল পপার কিংবা অন্যরা বলে থাকে। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে যে আপত্তি তোলা যায়, বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও সেই আপত্তি তোলা যায়। কারণ 'ইতিহাসের দর্শনে নিরপেক্ষতা মোটাদাগে দর্শনে বিদ্যমান নিরপেক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত।¹⁹⁴ কিন্তু অন্যদিকে থেকে দেখলে যেকোনো বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের সত্যতার উপর কুনের এই বইটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিজ্ঞানের চর্চা। কুনের পর থেকে কোনো বিজ্ঞানীর জন্য 'বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার' যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইতিহাসের দর্শনে যারাই নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তারা কুনের যুক্তিগুলোর পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছেন।
উল্লেখ্য করা জরুরী যে, কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে (পরীক্ষণের উপযুক্ততা, মিথ্যার সম্ভাবনা) জ্ঞান এবং 'অ-জ্ঞান' পৃথক করা তথা এই দুইয়ের মাঝে সীমারেখা টেনে দিয়ে কোনটা 'জ্ঞান' আর কোনটা 'জ্ঞান' নয় সেটা নির্ণয় করার চিন্তা কুনের পর থেকে প্রায় পরিত্যক্ত। কারণ কুন এমন পার্থক্য করার লক্ষ্যে অগ্রসর হননি। তিনি 'বিজ্ঞানের যৌক্তিকতা'-কেই সন্দেহ করেছেন। ফলে 'বিজ্ঞান' অন্য কোনো মানবীয় কার্যক্রম থেকে আলাদা হওয়া সম্ভব না। তাই যদি হয় তাহলে আপেক্ষিকতার উপর্যুপরি আক্রমণের পরও ঐতিহাসিক জ্ঞান কীভাবে 'সম্ভাব্য' থাকে?
টিকাঃ
১৮৯. ইউমনা ত্বারীফ আল-খুলীর 'ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম' বইটি পড়ুন।
১৯০. ইউমনা আল-খুলী, ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম, পৃ. ১৩৯।
১৯১. দেখুন আমার (লেখকের) বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম', মারকাযু বারাহীন, ২০১৯।
১৯২. অ্যালেক্স রুজেনবার্গ, ফালসাফাতুল ইলম: মুকাদ্দিমাতুন মুরাসিরা, আল-মারকাযুল কাওমি লিত-তার্জামা, অনুবাদ: আহমদ আস-সামাহী, ফাতহুল্লাহ আশ-শাইখ, পৃ. ২৭৮।
১৯৩. আল-মা'রেফাতুত তারীখিয়্যাহ ফিল-গার্ব, পৃ. ১২৫-১৩১।
১৯৪. Aviezer Tucker, ed., 2009, p. 172.
এই অনুচ্ছেদে আমরা 'জ্ঞান'-এর ধরন নিয়ে আলোচনা করব, অর্থাৎ মানুষের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যে জ্ঞান সৃষ্টি করে সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় হবে। যেমন- বিজ্ঞান। এক্ষেত্রে আমরা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব এবং জ্ঞানের ইতিহাসে সেগুলোর প্রভাবের উপর আলোকপাত করব।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মেটাফিজিক্সের বিরোধিতা করে এমন বিজ্ঞানমনস্ক একটা গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এদেরকে 'যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ' (Logical Positivism)-এর অনুসারী বলে গণ্য করা হয়। তাদের কাজ মূলত উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই বর্ধিত রূপ, যেটার ঐতিহাসিক বিবরণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে দিয়েছি। এছাড়াও তারা ছিল বিজ্ঞানবাদিতার চরমপন্থার বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানবাদী এবং প্রচলিত দৃষ্টবাদী থেকে তারা কীভাবে আলাদা, সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা তাদেরকে উল্লেখ করব দেকার্তের পর থেকে সর্বশেষ বারের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আদর্শবাদী জ্ঞানের আহ্বানের উদাহরণ প্রদানের জন্য। এই জ্ঞান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং ক্রম-উন্নতি সাধন করে। এটার নমুনা হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এর একমাত্র মাধ্যম হলো অনুসন্ধান। তবে এদেরকে পৃথক করে এমন একটা মৌলিক উপাদান আছে, যেটা উল্লেখ করা আবশ্যক। কারণ তারা প্রচলিত বিজ্ঞানবাদী চিন্তার থেকে ভিন্নভাবে বিষয়টা গ্রহণ করেছে। সেই উপাদানটা হলো 'যাচাইয়ের যোগ্যতা থাকা'। এর সারকথা হলো- বাক্যের অর্থ নির্ভর করে সেটা যাচাইয়ের পদ্ধতির উপর। আপনি একটা বাক্যের অর্থ জানেন মানে হলো আপনি জানেন কীভাবে সেটা যাচাই করতে হবে। যদি কোনো বিষয় যাচাই করার উপায় না থাকে, তাহলে সেটা অর্থপূর্ণ নয়। যাচাই (Verification) বলতে দৃষ্টবাদীরা বোঝায় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই। আর পর্যবেক্ষণ ইন্দ্রিয়ের সব ধরনের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দৃষ্টবাদিতাকে আলাদা করে ভাষাগত দিক। ভাষা হচ্ছে বাস্তবতার এমন বিবরণ, যেটা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির উপর নির্ভর করে। দৃষ্টবাদিতাকে আরো আলাদা করে প্রাকৃতিক দিক। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভাষাকে বিশ্বের বিবরণ দেওয়ার উপযুক্ত উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। নিঃসন্দেহে এই কাজ ইতিহাসকে জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিখ্যাত বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পপার যৌক্তিক ইতিবাদের কঠোর ও বারংবার সমালোচনা করায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। আমরা আমাদের প্রসঙ্গের সাথে মিলে এমন সমালোচনাসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ করব। অনুসন্ধানের সমস্যার সমাধান উদঘাটনের ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতির অক্ষমতার কথা কার্ল পপার স্পষ্ট করেছেন। পর্যবেক্ষণ আর নিয়মের মাঝে সবসময় একটা দূরত্ব থাকে। আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গুটিকয়েক জিনিস পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেখান থেকে একটা নিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে সকল পদার্থ যাচাই করে বলা সম্ভব নয় যে, 'পদার্থগুলো গরমে বিস্তৃতি লাভ করে।' কিন্তু সে নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা নিয়ম দাঁড় করিয়ে ফেলে। হিউমের উত্থাপিত সমস্যা এবং সেটার ব্যাপারে হিউমের বুঝের সমালোচনায় পপার লম্বা আলোচনা করেছেন। তার সমালোচনার সারকথা হলো, একজন বিজ্ঞানী স্বচ্ছ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরীক্ষণ শুরু করে না, বরং তার নির্দিষ্ট একদিকে ঝোঁক থাকে। তিনি বলেন, 'পর্যবেক্ষণ সবসময় তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছাইকৃত। নির্দিষ্ট বিষয়ে, নির্ধারিত কাজে বা প্রয়োজনে বাছাইকৃত সমস্যা এটাকে প্রভাবিত করে। পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য থাকে দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই। সমস্যা হলো একজন বিজ্ঞানী কোথা থেকে শুরু করবে? নিছক স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ না- যেমনটা অনুসন্ধানের পক্ষের লোকেরা বলে থাকেন। তার জন্য কী কী পর্যবেক্ষণ বা লিখে রাখা সম্ভব? একজন বিজ্ঞানীকে অবশ্যই একটা তত্ত্ব জানতে হবে, যাব উপর ভিত্তি করে সে পর্যবেক্ষণ করবে।'¹⁹⁰ তাই পপার মনে করেন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রকৃত যাচাই হয় সেটাকে অবিশ্বাস করার মধ্য দিয়ে, সেটার উপর দৃঢ় বিশ্বাস আনার মধ্য দিয়ে না। পপারের বৈজ্ঞানিক দর্শন এবং সেটার সমালোচনাকে একপাশে রেখে বলতে হবে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুমানের ভূমিকা এবং জ্ঞানের মানবীয় দিক ইতিহাসকে 'জ্ঞান' বলে বিবেচনা করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটা যুক্তি। কারণ মানুষের জটিল কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসশাস্ত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের বড় ভূমিকা আছে। পাশাপাশি এটা তাকে বিজ্ঞানের নীতিসমূহের কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং পর্যবেক্ষণ ও উদঘাটনের মাঝে সমন্বয় সাধন করে।
কিন্তু ১৯৬২ সালে একটা বই প্রকাশ পায় যেটার বড় প্রভাব পড়ে মানবিক বিদ্যাসমূহে, তন্মধ্যে একটা বিদ্যা ইতিহাসশাস্ত্র। সেটা হলো দার্শনিক টমাস কুনের বই: 'দ্যা স্ট্রাকচার অফ সায়েন্টিফিক রেভলুশন্স'। এই বইয়ের দ্বৈত ভূমিকা ছিল। কারণ এটা মানবিক বিদ্যার অবস্থানকে অনেক উপরে নিয়ে আসে, যেটা কিনা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক পেছনে ছিল। আবার একই সময়ে যেকোনো ধরনের পদ্ধতিগত জ্ঞানকে হুমকির মুখে ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বা মানবিক বিদ্যা। এই বই জ্ঞানকে 'আপেক্ষিক' করে দেয় এমন অভিযোগ তোলা হয়, তাই অল্প কথায় এটার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা জরুরী।
টমাস কুন মনে করেন বিজ্ঞান তিন ধাপে অগ্রগতি সাধন করে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই তিনটা ধাপ বারবার অতিক্রান্ত হয়:
- বিজ্ঞানপূর্ব পর্যায়: যেখানে একদল বিজ্ঞানী থেকে এলোমেলোভাবে কোনো এক বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম প্রকাশ পায়।
- বিজ্ঞানের স্বাভাবিক পর্যায় (Normal Science)।
- বিজ্ঞানের বিপ্লবের পর্যায়, যে সময়ে পূর্বের জ্ঞানের বদলে স্বতন্ত্র একটা পদ্ধতি স্থাপন করা হয়।
এরপর এই পর্যায়গুলো বারবার ঘটতে থাকে।
তিনি মনে করেন বিজ্ঞান একটা নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্যারাডাইমের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেটা বিজ্ঞানের যাবতীয় তত্ত্ব, অনুমান, প্রয়োগের পদ্ধতি ও দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই নমুনাটা সুশৃঙ্খল জ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত ব্যক্তিদের কাছে একটা আদর্শ বিজ্ঞানভিত্তিক নমুনা বলে গণ্য হয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের যুগে গবেষণার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা যায় এবং যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করে। এই সুশৃঙ্খল জ্ঞানের দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে জ্ঞানের অঙ্গনে একটা নীরবতা বজায় থাকে। অবশেষে নমুনায় ফাটল দেখা দেয়, যখন ঐ জ্ঞানীদের গোষ্ঠী থেকে কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়ে। এই ফাটলের ফলে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে। বিজ্ঞানীরা পুরাতন নমুনার বদলে নতুন একটা নমুনাকে গ্রহণ করে। যেমন- টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞানের তত্ত্বের পরিবর্তে কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অথবা নিউটনের তত্ত্বের পরিবর্তে আইনস্টাইনের তত্ত্ব। টমাস কুন বিজ্ঞানের দার্শনিক এবং বিজ্ঞানের ক্রম উন্নতির ইতিহাস রচয়িতাদের মাঝে প্রচলিত একটা বিশ্বাসের সমালোচনা করেন। সেটা হলো, বিজ্ঞান সবসময় কিছু নতুন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পেলে সেটাকে বিজ্ঞানে অন্তর্ভুক্ত করে, অথবা ভুল পেলে সেটাতে সংশয় পোষণ করে। বরং পশ্চিমা বিশ্ব বিজ্ঞানের যে বিপ্লব দেখেছে, সেটা বিজ্ঞানের উন্নতির পক্ষে প্রমাণ নয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞান আবশ্যকীয়ভাবে নতুন নতুন বাস্তবতা তৈরি করে না। বরং এগুলো কিছু ধাঁধার মতো, যেগুলোর সমাধান বিজ্ঞানীরা করে। তারপর তাদের অনুসরণীয় নমুনার ছায়ায় সেগুলো স্তুপীকৃত করে রেখে দেয়। সুশৃঙ্খল জ্ঞানের সময়ে অর্জিত এই স্তুপগুলোর অধিকাংশই বিজ্ঞানের বিপ্লবের সময়ে এসে আর অবশিষ্ট থাকে না। বরং সেগুলোর জায়গায় নতুন আবিষ্কার জায়গা করে নেয়।
বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ পরীক্ষণের মাধ্যমে সেগুলোর সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস আনা সম্ভব, এই প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করে কুন। তিনি মনে করেন বিভিন্ন আলামত যাচাই নির্ভর করে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের পর অনুসন্ধানের উপর। এগুলোর মাধ্যমে তত্ত্বের সত্যতা বা ভুল জানা যায়।
পপারের সাথেও কুন দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, যে সকল বিজ্ঞানী জ্ঞানের সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি মেনে চলেন, তাদের দৈনন্দিন প্রায়োগিক কার্যক্রমে কোনো তত্ত্বকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার মতো ব্যাপার ঘটে না। কারণ কোনো তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বিচ্ছিন্ন অবস্থার প্রকাশ এমন তত্ত্বকে বাতিল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট না, যেটার অনুসরণ করে বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী। তার মতে, সুশৃঙ্খল জ্ঞানের পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা তাদের নমুনার খণ্ডনের নানা পন্থার খোঁজ বা যাচাই করে না। তারা বিচ্ছিন্ন নানা অবস্থার উপর নির্ভর করে একটা আদর্শ নমুনাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে দেয় না। অর্থাৎ তারা কিছু নির্দিষ্ট তত্ত্বের নমুনার অভ্যন্তরকে শুধু মিথ্যা সাব্যস্ত করে, সরাসরি নমুনাকে তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অবস্থা বারবার আসার ফলে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বের সংহতি হুমকির মুখে পড়ে এবং ফাটল দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের মাঝে তখন বিভক্তি দেখা দেয় যে এই নমুনা কি টিকে থাকার উপযুক্ত কিনা। বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী নির্ধারণ করে দেয় কখন পুরাতন নমুনাকে বাতিল করে নতুন নমুনাকে গ্রহণ করা হবে। কুন যে বিষয়টাতে বেশ জোর প্রদান করেন সেটা হলো এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক পন্থায় গৃহীত হয় না- যেমনটা বিজ্ঞানকে যারা আদর্শ জ্ঞান করে তারা মনে করে থাকে।
অ্যালেক্স রুজেনবার্গ বলেন, 'বিপ্লবীরা যখন একটা নতুন নমুনা দাঁড় করায়, তখন তারা কোনো নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে না যেটার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে এটা বেশি যৌক্তিক পন্থা। অনুরূপভাবে তাদের বিপরীতে তাদের চাইতে বয়স্ক এবং গভীরতার অধিকারী ব্যক্তিরা যখন পুরাতন নমুনাকে আঁকড়ে ধরে সেটার পক্ষে লড়াই করে, তখন তারাও অধিকতর যৌক্তিক পন্থার অনুসরণ করে না।'¹⁹² সুতরাং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অর্থ বিজ্ঞানীদের মাঝে নমুনায় বিদ্যমান অধিকাংশ ধাঁধাঁ সমাধান করার যোগ্যতা থাকা। কোনো তত্ত্বকে যাচাই করার মাপকাঠি স্থিত কিছু নয়, এটা বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র নয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অধিকাংশ সময়ে পূর্বের মতামত ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং বিজ্ঞান অগ্রগতিমূলক কিংবা নিরপেক্ষ নয়। তারপর কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে এর পক্ষে অনেকগুলো উদাহরণ পেশ করেন।¹⁹³
তাই বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে 'নিরপেক্ষতা'কে উপস্থাপন করার বিষয়টা কুন সংশয়ের চোখে দেখেছেন। তার বক্তব্যের কারণে সে সময়ে এসে মানবিক বিদ্যাও 'জ্ঞান' হিসেবে কতটুকু উপযুক্ত সেটা নিয়ে বিদ্যমান তর্কে মানবিক বিদ্যা এগিয়ে যায়। কেননা কুন বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেন যে প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে পর্যবেক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রভাব আছে। তত্ত্বকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেই, যেমনটা দৃষ্টবাদীরা বা কার্ল পপার কিংবা অন্যরা বলে থাকে। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে যে আপত্তি তোলা যায়, বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও সেই আপত্তি তোলা যায়। কারণ 'ইতিহাসের দর্শনে নিরপেক্ষতা মোটাদাগে দর্শনে বিদ্যমান নিরপেক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত।'¹⁹⁴ কিন্তু অন্যদিকে থেকে দেখলে যেকোনো বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের সত্যতার উপর কুনের এই বইটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিজ্ঞানের চর্চা। কুনের পর থেকে কোনো বিজ্ঞানীর জন্য 'বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার' যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইতিহাসের দর্শনে যারাই নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তারা কুনের যুক্তিগুলোর পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছেন।
উল্লেখ করা জরুরী যে, কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে (পরীক্ষণের উপযুক্ততা, মিথ্যার সম্ভাবনা) জ্ঞান এবং 'অ-জ্ঞান' পৃথক করা তথা এই দুইয়ের মাঝে সীমারেখা টেনে দিয়ে কোনটা 'জ্ঞান' আর কোনটা 'জ্ঞান' নয় সেটা নির্ণয় করার চিন্তা কুনের পর থেকে প্রায় পরিত্যক্ত। কারণ কুন এমন পার্থক্য করার লক্ষ্যে অগ্রসর হননি। তিনি 'বিজ্ঞানের যৌক্তিকতা'-কেই সন্দেহ করেছেন। ফলে 'বিজ্ঞান' অন্য কোনো মানবীয় কার্যক্রম থেকে আলাদা হওয়া সম্ভব না। তাই যদি হয় তাহলে আপেক্ষিকতার উপর্যুপরি আক্রমণের পরও ঐতিহাসিক জ্ঞান কীভাবে 'সম্ভাব্য' থাকে?
টিকাঃ
১৮৯. ইউমনা ত্বারীফ আল-খুলীর 'ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম' বইটি পড়ুন।
১৯০. ইউমনা আল-খুলী, ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম, পৃ. ১৩৯।
১৯১. দেখুন আমার (লেখকের) বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম', মারকাযু বারাহীন, ২০১৯।
১৯২. অ্যালেক্স রুজেনবার্গ, ফালসাফাতুল ইলম: মুকাদ্দিমাতুন মুরাসিরা, আল-মারকাযুল কাওমি লিত-তার্জামা, অনুবাদ: আহমদ আস-সামাহী, ফাতহুল্লাহ আশ-শাইখ, পৃ. ২৭৮।
১৯৩. আল-মা'রেফাতুত তারীখিয়্যাহ ফিল-গার্ব, পৃ. ১২৫-১৩১।
১৯৪. Aviezer Tucker, ed., 2009, p. 172.
এই অনুচ্ছেদে আমরা 'জ্ঞান'-এর ধরন নিয়ে আলোচনা করব, অর্থাৎ মানুষের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যে জ্ঞান সৃষ্টি করে সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় হবে। যেমন- বিজ্ঞান। এক্ষেত্রে আমরা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব এবং জ্ঞানের ইতিহাসে সেগুলোর প্রভাবের উপর আলোকপাত করব।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মেটাফিজিক্সের বিরোধিতা করে এমন বিজ্ঞানমনস্ক একটা গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এদেরকে 'যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ' (Logical Positivism)-এর অনুসারী বলে গণ্য করা হয়। তাদের কাজ মূলত উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই বর্ধিত রূপ, যেটার ঐতিহাসিক বিবরণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে দিয়েছি। এছাড়াও তারা ছিল বিজ্ঞানবাদিতার চরমপন্থার বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানবাদী এবং প্রচলিত দৃষ্টবাদী থেকে তারা কীভাবে আলাদা, সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা তাদেরকে উল্লেখ করব দেকার্তের পর থেকে সর্বশেষ বারের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আদর্শবাদী জ্ঞানের আহ্বানের উদাহরণ প্রদানের জন্য। এই জ্ঞান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং ক্রম-উন্নতি সাধন করে। এটার নমুনা হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এর একমাত্র মাধ্যম হলো অনুসন্ধান। তবে এদেরকে পৃথক করে এমন একটা মৌলিক উপাদান আছে, যেটা উল্লেখ করা আবশ্যক। কারণ তারা প্রচলিত বিজ্ঞানবাদী চিন্তার থেকে ভিন্নভাবে বিষয়টা গ্রহণ করেছে। সেই উপাদানটা হলো 'যাচাইয়ের যোগ্যতা থাকা'। এর সারকথা হলো- বাক্যের অর্থ নির্ভর করে সেটা যাচাইয়ের পদ্ধতির উপর। আপনি একটা বাক্যের অর্থ জানেন মানে হলো আপনি জানেন কীভাবে সেটা যাচাই করতে হবে। যদি কোনো বিষয় যাচাই করার উপায় না থাকে, তাহলে সেটা অর্থপূর্ণ নয়। যাচাই (Verification) বলতে দৃষ্টবাদীরা বোঝায় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই। আর পর্যবেক্ষণ ইন্দ্রিয়ের সব ধরনের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। এখানে দৃষ্টবাদিতাকে আলাদা করে ভাষাগত দিক। ভাষা হচ্ছে বাস্তবতার এমন বিবরণ, যেটা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির উপর নির্ভর করে। দৃষ্টবাদিতাকে আরো আলাদা করে প্রাকৃতিক দিক। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ভাষাকে বিশ্বের বিবরণ দেওয়ার উপযুক্ত উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। নিঃসন্দেহে এই কাজ ইতিহাসকে জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিখ্যাত বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পপার যৌক্তিক ইতিবাদের কঠোর ও বারংবার সমালোচনা করায় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। আমরা আমাদের প্রসঙ্গের সাথে মিলে এমন সমালোচনাসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ করব। অনুসন্ধানের সমস্যার সমাধান উদঘাটনের ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতির অক্ষমতার কথা কার্ল পপার স্পষ্ট করেছেন। পর্যবেক্ষণ আর নিয়মের মাঝে সবসময় একটা দূরত্ব থাকে। আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গুটিকয়েক জিনিস পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেখান থেকে একটা নিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে সকল পদার্থ যাচাই করে বলা সম্ভব নয় যে, 'পদার্থগুলো গরমে বিস্তৃতি লাভ করে।' কিন্তু সে নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা নিয়ম দাঁড় করিয়ে ফেলে। হিউমের উত্থাপিত সমস্যা এবং সেটার ব্যাপারে হিউমের বুঝের সমালোচনায় পপার লম্বা আলোচনা করেছেন। তার সমালোচনার সারকথা হলো, একজন বিজ্ঞানী স্বচ্ছ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরীক্ষণ শুরু করে না, বরং তার নির্দিষ্ট একদিকে ঝোঁক থাকে। তিনি বলেন, 'পর্যবেক্ষণ সবসময় তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছাইকৃত। নির্দিষ্ট বিষয়ে, নির্ধারিত কাজে বা প্রয়োজনে বাছাইকৃত সমস্যা এটাকে প্রভাবিত করে। পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য থাকে দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই। সমস্যা হলো একজন বিজ্ঞানী কোথা থেকে শুরু করবে? নিছক স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ না- যেমনটা অনুসন্ধানের পক্ষের লোকেরা বলে থাকেন। তার জন্য কী কী পর্যবেক্ষণ বা লিখে রাখা সম্ভব? একজন বিজ্ঞানীকে অবশ্যই একটা তত্ত্বিয়্যা লিত-তারীখ, পৃ. ১২২।
২০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।
২০১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩১।
২০২. কাইস মাদ্বী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ১১০।
২০৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৯।
২০৪. Aviezer Tucker ed. 2009 p.20.
২০৫. কাইস মাঘী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ১০৪।
২০৬. জন ওয়ালব্রিজ, আল্লাহ ওয়াল-মানত্বিক ফিল-ইসলাম: খিলাফাতুল আরুল, মারকায নামা, ২০১৮, পৃ. ৭৯-৮০।
২০৭. অর্থাৎ মানুষের চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে হাদীস শাস্ত্রের বিভিন্ন পরিভাষা নির্ধারিত হয়েছে। এখানে হাদীসকে বুঝানো হচ্ছে না।
২০৮. অন্যদের বর্ণনার জ্ঞানতাত্ত্বিক বৈধতা ও তা গ্রহণ করার যথার্থতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন নিম্নের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা:
Coady, C.A.J, 1992, Testimony: A Philosophical Study, Oxford, Oxford University Press.
📄 ইতিহাসের নিরপেক্ষতা
মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।
ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।
(২) ঐকমত্য হবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইতিহাসবিদদের মাঝে। অর্থাৎ তারা রাজনৈতিক মতামত বা দার্শনিক মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন হবে। এভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে যে, একই আদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা ঐকমত্য পোষণ করেনি।
(৩) ইতিহাসবিদদের একটা বড় সংখ্যা এই ঐকমত্যে অংশ নিবে।²⁰³
কিন্তু ইতিহাসের সত্যতার প্রশ্নে কী হবে? এটা কি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের থেকে ভিন্ন হবে? আমরা এখানে মেনে নিব যে, একজন বিজ্ঞানী যত বৈচিত্র্য সহকারে বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে, তার জন্য নিরপেক্ষতা ও সত্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে। পদার্থবিজ্ঞান বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুমিত তথ্যে পূর্ণ। পাশাপাশি থাকা প্যারাডাইমের সংখ্যা অনেক। অধিকন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সম্ভাব্য অনেক তত্ত্ব বিদ্যমান। সুতরাং নিরপেক্ষতা থেকে দূরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু ইতিহাসে অনুধাবন করার জাল ততটা সুবিস্তৃত নয়, ফলে একজন আধুনিক ইতিহাসবিদ সরাসরি টেক্সটে প্রবেশ করে এবং সেটার লেখকের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের খোঁজ করে। এর মাধ্যমে সে কথকের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মাঝে পার্থক্য জানা যায় ইতিহাসের ব্যাপারে খুব প্রসিদ্ধ একটা সমস্যার জবাবে, যেটা হলো ইতিহাসের পাতায় থাকা অতীত ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি হওয়ার অসম্ভাব্যতা। পুনরাবৃত্তি ঘটার সক্ষমতা সাধারণত বিজ্ঞানের থাকে। কারণ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বেশ কিছু পরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে একটা নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল বিষয়ের প্রভাবক নির্ণয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল উপাদানের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। (আমরা 'সাধারণত' বললাম কেননা বিজ্ঞানের কিছু বিষয় পুনরায় ঘটে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে সকল বিষয়ে গবেষণা চালায়, সেগুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করে না। অনুরূপ অবস্থা ভূতত্ত্ববিদদেরও। তারা যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, সেগুলোর মাঝে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণের সম্ভাবনা রাখে না)²⁰⁴ অন্যদিকে ইতিহাসে পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু 'একজন দক্ষ ইতিহাসবিদ তার পরীক্ষণের যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতীতের ঘটনাবলি বারংবার স্মরণ করতে পারে না, যেমনটা একজন বিজ্ঞানী পুনরায় যাচাই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরীক্ষণে এমনটা করে থাকে। তবে সেটা দুর্বলতার কোনো উপাদান নয়, বরং শক্তিমত্তার উপাদান; যা ইতিহাসকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে আলাদা করে। কারণ দক্ষ ইতিহাসবিদ মৃত অতীতের বাস্তবতাকে স্বতন্ত্রভাবে খুঁজে। অন্যদিকে বিজ্ঞানী যেকোনো ঘটনার প্রকৃতির ব্যাপারে এমন কিছু প্রশ্ন দাঁড় করায়, যেগুলো সবসময় সে যা কিছু প্রমাণ করতে ইচ্ছুক তার সাথে মিলে যায়। তার এ সকল পরীক্ষণের লক্ষ্য থাকে ঈপ্সিত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন অথবা দৃঢ়ভাবে নাকচ। ... সুতরাং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান একটা কৃত্রিম কাঠামো, কেননা সেটা প্রকৃতির বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম উপস্থিত বিষয় এবং গৌণ উপাদান দিয়ে যাচাই করে থাকে।²⁰⁵
উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী আমরা বলব, ইতিহাস যতটা কাঠামোগত শাস্ত্র, তার চাইতে উদঘাটনমূলক শাস্ত্র।
তবে বলা হতে পারে 'মানবিক বিদ্যা' হিসেবে ইতিহাসে পক্ষপাতিত্ব বিজ্ঞানের যেকোনো শাস্ত্রে বিদ্যমান পক্ষপাতিত্ব থেকে বৃহৎ। আমরা সেটা মেনেও নিব। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, ইতিহাসের সাথে জড়িত সকল ব্যবহারিক শাস্ত্রে পক্ষপাতিত্বের মাত্রা সমান। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ইতিহাসকে এক প্রকার অনুধাবন আর ইতিহাসকে এক প্রকার নথিপত্র হিসেবে দেখা—এ দুটি বিষয় আমাদের আলাদা করতে হবে। কারণ ইতিহাসচর্চার সত্যতা নিয়ে সামগ্রিকভাবে বলা বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মৌখিক বর্ণনার আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ঘটনা যে প্রজন্ম শুনেছে সে প্রজন্ম অথবা তৎপরবর্তী প্রজন্মের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের (যারা সরাসরি শোনেনি কিন্তু পূর্বের প্রজন্ম থেকে শুনেছে) ব্যাপারে সঠিক ঐতিহাসিক জ্ঞানে পৌঁছানোর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো তাদের বক্তব্যগুলোর অডিও রেকর্ড সংগ্রহ। দ্বিতীয় ধাপ হলো সেই বক্তব্যগুলো অনুধাবন ও সেগুলোর মাঝে সমন্বয়। নিঃসন্দেহে প্রথম ধাপে (সমন্বয়) কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে (অনুধাবন) পক্ষপাতিত্ব আছে। যে বইগুলো ইতিহাসকে জ্ঞান হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি পেশ করে, সেগুলো অনুধাবনের এই ধাপের ক্ষেত্রেই ইতিহাসের পক্ষ নেয়। কারণ প্রথম ধাপে মানবীয় অনুধাবনের জাল পাতার কোনো সুযোগ নেই।
ইলমুল হাদীস তথা হাদীসশাস্ত্র পদ্ধতিগতভাবে নথিপত্রের মাধ্যমে সংকলিত ইতিহাসের অধীন, আর এটা দুটি বিষয়ের অধীন:
(১) সকল বর্ণনাকে সংরক্ষণ (আমল করা নয়) করা। আর যে সকল বর্ণনাকে দুর্বল বলার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে বা মুহাদ্দিসরা দুর্বলতার বিষয়টা প্রাধান্য দিয়েছে সেগুলোকে মুছে না ফেলা। কেননা 'বাস্তবতার ব্যাপারে আমরা যে ঐতিহাসিক জ্ঞানই লাভ করি না কেন সেটা এই বর্ণনাসমূহের থেকে পেতে হবে। হাদীসগুলো নিয়ে খেল-তামাশা করা বা সেগুলো থেকে পছন্দমত বাছাই করার অর্থ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে বসা, যার কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ... মানবীয় ইতিহাসে জীবনীশাস্ত্রের সাথে জড়িত মুখস্থের মাধ্যমে সংকলিত সর্ববৃহৎ কাজ ছিল এটা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ যেখানে মুসলিমদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ, সেখানে তার জীবনীর প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: হোক সেটা তার কথা বা কাজ। এমনকি তিনি অন্যদের যে কাজ করতে দেখে আপত্তি করেননি, সেটাও এর অন্তর্ভুক্ত।'²⁰⁶
(২) বিপুল সংখ্যক বর্ণনার মাঝে তুলনা। হাদীসের সমালোচক বর্ণনা কারীদেরকে তাদের সমকালীন বর্ণনাকারীদের সাথে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করে থাকেন। তাদের বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ বর্ণনাকারীদের সাথে তুলনা করেন। এছাড়া তাদের ধার্মিকতা ও মুখস্থশক্তি যাচাই করেন। অধিকন্তু বর্ণনাকারীদের সমকালীন হাদীস তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।
মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।
ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।ন্থার খোঁজ বা যাচাই করে না। তারা বিচ্ছিন্ন নানা অবস্থার উপর নির্ভর করে একটা আদর্শ নমুনাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে দেয় না। অর্থাৎ তারা কিছু নির্দিষ্ট তত্ত্বের নমুনার অভ্যন্তরকে শুধু মিথ্যা সাব্যস্ত করে, সরাসরি নমুনাকে তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করে না। কিন্তু বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অবস্থা বারবার আসার ফলে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বের সংহতি হুমকির মুখে পড়ে এবং ফাটল দেখা দেয়। বিজ্ঞানীদের মাঝে তখন বিভক্তি দেখা দেয় যে এই নমুনা কি টিকে থাকার উপযুক্ত কিনা। বিজ্ঞানীদের গোষ্ঠী নির্ধারণ করে দেয় কখন পুরাতন নমুনাকে বাতিল করে নতুন নমুনাকে গ্রহণ করা হবে। কুন যে বিষয়টাতে বেশ জোর প্রদান করেন সেটা হলো এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক পন্থায় গৃহীত হয় না- যেমনটা বিজ্ঞানকে যারা আদর্শ জ্ঞান করে তারা মনে করে থাকে।
অ্যালেক্স রুজেনবার্গ বলেন, 'বিপ্লবীরা যখন একটা নতুন নমুনা দাঁড় করায়, তখন তারা কোনো নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করে না যেটার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে এটা বেশি যৌক্তিক পন্থা। অনুরূপভাবে তাদের বিপরীতে তাদের চাইতে বয়স্ক এবং গভীরতার অধিকারী ব্যক্তিরা যখন পুরাতন নমুনাকে আঁকড়ে ধরে সেটার পক্ষে লড়াই করে, তখন তারাও অধিকতর যৌক্তিক পন্থার অনুসরণ করে না।'¹⁹² সুতরাং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির অর্থ বিজ্ঞানীদের মাঝে নমুনায় বিদ্যমান অধিকাংশ ধাঁধাঁ সমাধান করার যোগ্যতা থাকা। কোনো তত্ত্বকে যাচাই করার মাপকাঠি স্থিত কিছু নয়, এটা বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিত্ব থেকে স্বতন্ত্র নয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অধিকাংশ সময়ে পূর্বের মতামত ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং বিজ্ঞান অগ্রগতিমূলক কিংবা নিরপেক্ষ নয়। তারপর কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে এর পক্ষে অনেকগুলো উদাহরণ পেশ করেন।¹⁹³
তাই বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হিসেবে 'নিরপেক্ষতা'কে উপস্থাপন করার বিষয়টা কুন সংশয়ের চোখে দেখেছেন। তার বক্তব্যের কারণে সে সময়ে এসে মানবিক বিদ্যাও 'জ্ঞান' হিসেবে কতটুকু উপযুক্ত সেটা নিয়ে বিদ্যমান তর্কে মানবিক বিদ্যা এগিয়ে যায়। কেননা কুন বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দেন যে প্রত্যেকটা বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে পর্যবেক্ষকদের ব্যক্তিগত প্রভাব আছে। তত্ত্বকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেই, যেমনটা দৃষ্টবাদীরা বা কার্ল পপার কিংবা অন্যরা বলে থাকে। তাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে যে আপত্তি তোলা যায়, বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার ব্যাপারেও সেই আপত্তি তোলা যায়। কারণ 'ইতিহাসের দর্শনে নিরপেক্ষতা মোটাদাগে দর্শনে বিদ্যমান নিরপেক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত।'¹⁹⁴ কিন্তু অন্যদিকে থেকে দেখলে যেকোনো বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের সত্যতার উপর কুনের এই বইটা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, হোক সেটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিজ্ঞানের চর্চা। কুনের পর থেকে কোনো বিজ্ঞানীর জন্য 'বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতার' যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইতিহাসের দর্শনে যারাই নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তারা কুনের যুক্তিগুলোর পর্যালোচনা করে অগ্রসর হয়েছেন।
উল্লেখ করা জরুরী যে, কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে (পরীক্ষণের উপযুক্ততা, মিথ্যার সম্ভাবনা) জ্ঞান এবং 'অ-জ্ঞান' পৃথক করা তথা এই দুইয়ের মাঝে সীমারেখা টেনে দিয়ে কোনটা 'জ্ঞান' আর কোনটা 'জ্ঞান' নয় সেটা নির্ণয় করার চিন্তা কুনের পর থেকে প্রায় পরিত্যক্ত। কারণ কুন এমন পার্থক্য করার লক্ষ্যে অগ্রসর হননি। তিনি 'বিজ্ঞানের যৌক্তিকতা'-কেই সন্দেহ করেছেন। ফলে 'বিজ্ঞান' অন্য কোনো মানবীয় কার্যক্রম থেকে আলাদা হওয়া সম্ভব না। তাই যদি হয় তাহলে আপেক্ষিকতার উপর্যুপরি আক্রমণের পরও ঐতিহাসিক জ্ঞান কীভাবে 'সম্ভাব্য' থাকে?
টিকাঃ
১৮৯. ইউমনা ত্বারীফ আল-খুলীর 'ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম' বইটি পড়ুন।
১৯০. ইউমনা আল-খুলী, ফালসাফাতু কার্ল পপার: মানহাজুল ইলম, মানত্বিকুল ইলম, পৃ. ১৩৯।
১৯১. দেখুন আমার (লেখকের) বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম', মারকাযু বারাহীন, ২০১৯।
১৯২. অ্যালেক্স রুজেনবার্গ, ফালসাফাতুল ইলম: মুকাদ্দিমাতুন মুরাসিরা, আল-মারকাযুল কাওমি লিত-তার্জামা, অনুবাদ: আহমদ আস-সামাহী, ফাতহুল্লাহ আশ-শাইখ, পৃ. ২৭৮।
১৯৩. আল-মা'রেফাতুত তারীখিয়্যাহ ফিল-গার্ব, পৃ. ১২৫-১৩১।
১৯৪. Aviezer Tucker, ed., 2009, p. 172.
মৌলিক জ্ঞানের ব্যাপারে সংশয় থেকে বের হওয়ার সমাধান যেমন দেকার্তের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির পরিবর্তে 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান, তেমনিভাবে বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সমাধান বিজ্ঞানের 'বর্ণনামূলক পদ্ধতিতে' বিদ্যমান। টমাস কুন প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের যে নমুনা পেশ করেছেন, সেটা বিজ্ঞানের প্রকৃত বিবরণ না। বরং এটা তত্ত্বীয় একটা নমুনা মাত্র। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের প্রদত্ত নমুনা বা কল্পনা পপারের প্রদত্ত নমুনার মতো এটা একটা নমুনা। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে বাছাই করে তার নমুনার সাথে যেগুলো মিলে যায়, সেগুলো নিয়েছেন। বিজ্ঞানের দার্শনিক 'ল্যারি লোডান'সহ আরো কয়েকজন কুনের উদাহরণের সাথে সাংঘর্ষিক উদাহরণ দেখিয়েছেন। 'বিজ্ঞানের বিপ্লব' এবং 'যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানের' মাঝে সৃষ্ট শক্ত সীমারেখা অবাস্তব। কুন যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তার চাইতে বিজ্ঞানের যাত্রা আরো জটিল। কিন্তু এই টেকনিক্যাল সমালোচনা আমাদের কাছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'লোডান' কি বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিকদের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেটা মেনে চলেছেন কিনা। কুন বা তার পরবর্তীতে আপেক্ষিকতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিরা বিজ্ঞানে বিদ্যমান 'অযৌক্তিক' প্রভাবকের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আমরা মানুষ। এছাড়াও কুন জ্ঞানের ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ 'যৌক্তিকতা' কী সেটা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কুনও যাত্রা শুরু করেছেন দৃষ্টবাদিতার ভূমি থেকে। যেমন: 'এই তত্ত্ব কি পূর্বের তত্ত্বসমূহের চাইতে বেশি ঘটনার ব্যাখ্যা করে? এটার পক্ষে কি পূর্ববর্তী তত্ত্বে বিদ্যমান পরীক্ষণ-নির্ভর কিছু বিচ্ছিন্নতার সমাধান করা সম্ভব?'¹⁹⁶ ল্যারি লোডান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন- এই 'যৌক্তিকতা' মূলত 'যৌক্তিকতার একটা রূপ'। এটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক, যেটা অনুসারে বিজ্ঞানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সমস্যার সমাধান করা, বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য স্থাপন করা নয় (যেমনটা দৃষ্টবাদীরা দাবি করে)। সুতরাং আমাদের উচিত বিজ্ঞান বাস্তবতার বিবরণ কতটা সত্যভাবে করে সেটার মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা। বিজ্ঞানকে আমাদের সমস্যাসমূহ সমাধানের একটা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করা। লোডান বলেন, 'আমার গবেষণা দাবি করে, কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে একটা কাঠামো হিসেবে দেখা মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যেটা অনেক উচ্চাশা রাখে। সেই উচ্চাশা হলো অন্য যেকোনো কাঠামোর তুলনায় বিজ্ঞান যে বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা সেটাকে অনুধাবন করতে পারা।' আমরা এমনটা করলে স্পষ্ট হবে যে 'বিজ্ঞানের দর্শনে অধিকাংশ প্রথাগত সমস্যা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মাপকাঠির পর্যায়ে থাকা বেশ কিছু বিষয় এখন খুবই মতভেদপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে; বিশেষত যখন আমরা বিজ্ঞানকে কোনো সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রম বলে গণ্য করছি। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রমাণ করব যে বিজ্ঞানের একটা সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এমন অনেক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিবে, যেগুলো বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতা ও বিজ্ঞান-দার্শনিকদের প্রচলিত অনেক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হবে।'¹⁹⁷ লোডান বেশ নিশ্চয়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, তত্ত্বসমূহ মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে 'এটা লক্ষ্য রাখা খুব দরকারী যে, তত্ত্বগুলো কতটুকু 'সত্য' বা 'সমর্থনপ্রাপ্ত' অথবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সেগুলোর কতটুকু বৈধতা দেওয়া সম্ভব সেটা যাচাইয়ের চাইতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কতটুকু উপযুক্ত ও যথাযথ সমাধান দেয় সেটা দেখা।'¹⁹⁸ লোডানের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু দার্শনিক পদার্থ বা রসায়নের কিছু মূলনীতি ছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহের সত্যতাকে অস্বীকার করেন। কেউ কেউ সত্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান, কাজের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন।
ইতিহাসশাস্ত্রে এটা প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই, দৃষ্টবাদীরা যে ভুল করে তা হলো, সামাজিক প্রয়োজন, সামাজিক চর্চা, সামাজিক ধ্যান-ধারণা, ইতিহাসবিদের উদঘাটনমূলক অনুমান, ইতিহাসবিদের পক্ষপাতিত্ব বা (কোনো এক ইতিহাস দার্শনিকের ভাষায়) 'গোপন আবেগ'- এর কোনোটি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো জ্ঞান নেই। কিন্তু সেটার কারণে ইতিহাসের যেমন 'যৌক্তিকতা' হ্রাস পায় না, তেমনিভাবে অন্য কোনো শাস্ত্রের 'যৌক্তিকতা'ও কমে যায় না। কারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদর্শবাদী যৌক্তিকতা নিছক কল্পনাই। আর অবিনির্মাণবাদীদের ভুল হলো 'তারা বর্তমানে ইতিহাস চর্চায় বিদ্যমান মৌলিক জটিলতার ব্যাপারে উদাসীন।'¹⁹⁹ বরং ব্যাপকভাবে বললে ইতিহাস চর্চার ব্যাপারেই তারা উদাসীন। তারা জানে না যে, ইতিহাসবিদের উদঘাটন ও অনুমান স্বাধীন না। বরং সেগুলো 'বিভিন্ন উৎস থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে অর্জিত, আর সেগুলো অবিনির্মাণবাদী চিন্তাধারার বিপরীতে প্রথম ঢাল।'²⁰⁰ এমন শর্ত প্রদান বিজ্ঞানে সাধ্যমত নিরপেক্ষতার সুযোগ প্রদান করে। আর মানবীয় এই নিরপেক্ষতা গ্রহণ না করা মূলত অন্য কথায় 'আদর্শবাদী বীরোচিত' জ্ঞান কামনা করার মতো, যেটা খোঁজ করে বেড়ায় দৃষ্টবাদীরা। এটা 'বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য ধ্বংস করে দেয়। একজন লেখক টেক্সট থেকে সত্য বের করে আনার জন্য যে ক্লান্তিকর প্রচেষ্টা চালায়, সেটাকে অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য করে।'²⁰¹ এটা সত্য যে, 'ইতিহাসবিদদের হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যেটা দিয়ে তারা অতীতে প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা নিশ্চিত হতে পারে যে, তাদের ঐতিহাসিক বিবরণ বিদ্যমান বিভিন্ন আলামতের অভিনব ব্যাখ্যা প্রদানেরই অংশ; ফলে তারা এ সকল বিবরণের সত্যতার উপর নির্ভর করে।'²⁰² অনেক বড় বড় ইতিহাসবিদ চূড়ান্ত মাত্রার নিরপেক্ষতা অর্জনের জন্য বড় ধরনের শর্ত দিয়েছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এভিয়েযার টাকার (Aviezer Tucker) সঠিক ইতিহাস জানার জন্য কিছু শর্ত প্রদান করেছেন। সেগুলো হলো:
(১) জ্ঞানের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মাঝে ঐকমত্য।
(২) ঐকমত্য হবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ইতিহাসবিদদের মাঝে। অর্থাৎ তারা রাজনৈতিক মতামত বা দার্শনিক মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন হবে। এভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে যে, একই আদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা ঐকমত্য পোষণ করেনি।
(৩) ইতিহাসবিদদের একটা বড় সংখ্যা এই ঐকমত্যে অংশ নিবে।²⁰³
কিন্তু ইতিহাসের সত্যতার প্রশ্নে কী হবে? এটা কি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের থেকে ভিন্ন হবে? আমরা এখানে মেনে নিব যে, একজন বিজ্ঞানী যত বৈচিত্র্য সহকারে বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবে, তার জন্য নিরপেক্ষতা ও সত্যতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে। পদার্থবিজ্ঞান বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুমিত তথ্যে পূর্ণ। পাশাপাশি থাকা প্যারাডাইমের সংখ্যা অনেক। অধিকন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সম্ভাব্য অনেক তত্ত্ব বিদ্যমান। সুতরাং নিরপেক্ষতা থেকে দূরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু ইতিহাসে অনুধাবন করার জাল ততটা সুবিস্তৃত নয়, ফলে একজন আধুনিক ইতিহাসবিদ সরাসরি টেক্সটে প্রবেশ করে এবং সেটার লেখকের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের খোঁজ করে। এর মাধ্যমে সে কথকের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মাঝে পার্থক্য জানা যায় ইতিহাসের ব্যাপারে খুব প্রসিদ্ধ একটা সমস্যার জবাবে, যেটা হলো ইতিহাসের পাতায় থাকা অতীত ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি হওয়ার অসম্ভাব্যতা। পুনরাবৃত্তি ঘটার সক্ষমতা সাধারণত বিজ্ঞানের থাকে। কারণ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বেশ কিছু পরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে একটা নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল বিষয়ের প্রভাবক নির্ণয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল উপাদানের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। (আমরা 'সাধারণত' বললাম কেননা বিজ্ঞানের কিছু বিষয় পুনরায় ঘটে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে সকল বিষয়ে গবেষণা চালায়, সেগুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করে না। অনুরূপ অবস্থা ভূতত্ত্ববিদদেরও। তারা যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, সেগুলোর মাঝে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণের সম্ভাবনা রাখে না)²⁰⁴ অন্যদিকে ইতিহাসে পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু 'একজন দক্ষ ইতিহাসবিদ তার পরীক্ষণের যথার্থতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অতীতের ঘটনাবলি বারংবার স্মরণ করতে পারে না, যেমনটা একজন বিজ্ঞানী পুনরায় যাচাই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরীক্ষণে এমনটা করে থাকে। তবে সেটা দুর্বলতার কোনো উপাদান নয়, বরং শক্তিমত্তার উপাদান; যা ইতিহাসকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে আলাদা করে। কারণ দক্ষ ইতিহাসবিদ মৃত অতীতের বাস্তবতাকে স্বতন্ত্রভাবে খুঁজে। অন্যদিকে বিজ্ঞানী যেকোনো ঘটনার প্রকৃতির ব্যাপারে এমন কিছু প্রশ্ন দাঁড় করায়, যেগুলো সবসময় সে যা কিছু প্রমাণ করতে ইচ্ছুক তার সাথে মিলে যায়। তার এ সকল পরীক্ষণের লক্ষ্য থাকে ঈপ্সিত বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন অথবা দৃঢ়ভাবে নাকচ। ... সুতরাং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান একটা কৃত্রিম কাঠামো, কেননা সেটা প্রকৃতির বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম উপস্থিত বিষয় এবং গৌণ উপাদান দিয়ে যাচাই করে থাকে।'²⁰⁵
উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী আমরা বলব, ইতিহাস যতটা কাঠামোগত শাস্ত্র, তার চাইতে উদঘাটনমূলক শাস্ত্র।
তবে বলা হতে পারে 'মানবিক বিদ্যা' হিসেবে ইতিহাসে পক্ষপাতিত্ব বিজ্ঞানের যেকোনো শাস্ত্রে বিদ্যমান পক্ষপাতিত্ব থেকে বৃহৎ। আমরা সেটা মেনেও নিব। কিন্তু তার অর্থ এটা নয় যে, ইতিহাসের সাথে জড়িত সকল ব্যবহারিক শাস্ত্রে পক্ষপাতিত্বের মাত্রা সমান। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ইতিহাসকে এক প্রকার অনুধাবন আর ইতিহাসকে এক প্রকার নথিপত্র হিসেবে দেখা—এ দুটি বিষয় আমাদের আলাদা করতে হবে। কারণ ইতিহাসচর্চার সত্যতা নিয়ে সামগ্রিকভাবে বলা বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মৌখিক বর্ণনার আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ঘটনা যে প্রজন্ম শুনেছে সে প্রজন্ম অথবা তৎপরবর্তী প্রজন্মের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের (যারা সরাসরি শোনেনি কিন্তু পূর্বের প্রজন্ম থেকে শুনেছে) ব্যাপারে সঠিক ঐতিহাসিক জ্ঞানে পৌঁছানোর দুটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো তাদের বক্তব্যগুলোর অডিও রেকর্ড সংগ্রহ। দ্বিতীয় ধাপ হলো সেই বক্তব্যগুলো অনুধাবন ও সেগুলোর মাঝে সমন্বয়। নিঃসন্দেহে প্রথম ধাপে (সমন্বয়) কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে (অনুধাবন) পক্ষপাতিত্ব আছে। যে বইগুলো ইতিহাসকে জ্ঞান হিসেবে মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি পেশ করে, সেগুলো অনুধাবনের এই ধাপের ক্ষেত্রেই ইতিহাসের পক্ষ নেয়। কারণ প্রথম ধাপে মানবীয় অনুধাবনের জাল পাতার কোনো সুযোগ নেই।
ইলমুল হাদীস তথা হাদীসশাস্ত্র পদ্ধতিগতভাবে নথিপত্রের মাধ্যমে সংকলিত ইতিহাসের অধীন, আর এটা দুটি বিষয়ের অধীন:
(১) সকল বর্ণনাকে সংরক্ষণ (আমল করা নয়) করা। আর যে সকল বর্ণনাকে দুর্বল বলার ব্যাপারে ঐকমত্য আছে বা মুহাদ্দিসরা দুর্বলতার বিষয়টা প্রাধান্য দিয়েছে সেগুলোকে মুছে না ফেলা। কেননা 'বাস্তবতার ব্যাপারে আমরা যে ঐতিহাসিক জ্ঞানই লাভ করি না কেন সেটা এই বর্ণনাসমূহের থেকে পেতে হবে। হাদীসগুলো নিয়ে খেল-তামাশা করা বা সেগুলো থেকে পছন্দমত বাছাই করার অর্থ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারিয়ে বসা, যার কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ... মানবীয় ইতিহাসে জীবনীশাস্ত্রের সাথে জড়িত মুখস্থের মাধ্যমে সংকলিত সর্ববৃহৎ কাজ ছিল এটা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ যেখানে মুসলিমদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ, সেখানে তার জীবনীর প্রতিটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: হোক সেটা তার কথা বা কাজ। এমনকি তিনি অন্যদের যে কাজ করতে দেখে আপত্তি করেননি, সেটাও এর অন্তর্ভুক্ত।'²⁰⁶
(২) বিপুল সংখ্যক বর্ণনার মাঝে তুলনা। হাদীসের সমালোচক বর্ণনা কারীদেরকে তাদের সমকালীন বর্ণনাকারীদের সাথে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করে থাকেন। তাদের বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ বর্ণনাকারীদের সাথে তুলনা করেন। এছাড়া তাদের ধার্মিকতা ও মুখস্থশক্তি যাচাই করেন। অধিকন্তু বর্ণনাকারীদের সমকালীন হাদীস সমালোচকদের মূল্যায়নের উপরও নির্ভর করে থাকেন। তুলনা করাটা ইলমুল হাদীসে একটা মৌলিক উপাদান, হোক সেটা বর্ণনাসমূহের মাঝে কিংবা বর্ণনাকারীদের মাঝে। আর বর্ণনা ও বর্ণনাকারী একটি অন্যটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির দিকে একটা টেক্সট সম্বন্ধযুক্ত করা হলে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গের আলোকে সেই টেক্সটের উপর সিদ্ধান্ত প্রদান এবং টাকারের উল্লিখিত সমন্বয়ের খোঁজ করার মতো কাজের তুলনায় বর্ণনাকারীদের সমালোচনা আর বর্ণনাসমূহের মাঝে তুলনা করার কাজটা সহজ। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত এই শাস্ত্র ইতিহাসের উপর গবেষণার ক্ষেত্রে মূল্যবান সুযোগ প্রদান করেছে, যেটাকে মৌখিক ইতিহাসের পক্ষাবলম্বী যেকোনো ইতিহাসবিদ কাজে লাগাতে চাইবে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এমন কিছু উল্লেখ করব যা নৃতাত্ত্বিকভাবে এই সমালোচনার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, সেটা সাহাবীদের যুগ থেকে শুরু করে সুন্নাহ সংকলনের সময় পর্যন্ত। আর প্রাচ্যবিদরা শরয়ী টেক্সটগুলোর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে কোনো গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি উপস্থাপন করেনি। তবে আমাদের জন্য এখানে নিম্নের বিষয়গুলো জানা যথেষ্ট:
- হাদীসশাস্ত্র একটা বানানো শাস্ত্র।²⁰⁷ এটা ঐতিহাসিক গবেষণার একটা রূপ। কিন্তু এর বাস্তবায়নের রূপটা ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে; কেননা এটা একটা সংকলনমূলক কাজ, যেটা ব্যাখ্যা প্রদানের পূর্বে ঘটে থাকে; যেমনটা আধুনিক মৌখিক ইতিহাসে উপকরণ সংকলনের ক্ষেত্রে ঘটে। এখানে অনুধাবনের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভবের বাহিরে স্বতন্ত্র কোনো অনুধাবনের জাল নেই। বরং এটার জন্য কিছু প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়, যেগুলো বর্ণনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাভাবিক কার্যকলাপের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়; তবে নিয়ম মাফিক।
- নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছানো বর্ণনা গ্রহণ ও তার উপর নির্ভর করা। যে বর্ণনা নির্ভরযোগ্য ও মুখস্থশক্তির অধিকারী কারো হয়ে থাকবে, আর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞানের বিরোধী হবে না। আবার দক্ষ বর্ণনাকারীদের বর্ণনা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে বৈধ এমন কোনো ঘটনার সাথে সাংঘর্ষিক হবে না। এটাই মূল অবস্থা, আর মূলের বাহিরে কোনো প্রমাণ ছাড়া যাওয়া যাবে না।²⁰⁸
টিকাঃ
১৯৫. আমার বই 'নাহুয়া মানহাজিন ওয়াসফিয়্যিন লিল-ইলম' এর তৃতীয় অধ্যায় দেখুন।
১৯৬. ল্যারি লোডান, আত-তাকাদ্দুম ওয়া-মুশকিলাতুহু: নাহুয়া নাযারিয়্যাতিন 'আনিন-নুমুয়্যিল ইলমী, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, অনুবাদ: ফাতিমা ইসমাঈল, পৃ. ৯১।
১৯৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২।
১৯৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
১৯৯. মুন্সলো, দিরাসা তাফকিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। সমাজ একটা নির্দিষ্ট আকৃতি বা পারিপার্শ্বিক সব কিছুর সাথে এর সম্পর্ককে একত্র করে টেবিলের সংজ্ঞায় রূপ দেয়। স্বভাবতই সম্মিলিত মাপকাঠি হলো বেদনার অনুভূতির হওয়ার সাথে সাথে কৃত আচরণ। কারণ মানুষজন এটাই প্রত্যক্ষ করে থাকে। মানুষজন যখন ব্যথা অনুভব করে, তখন তার আচরণ এবং পারিপার্শ্বিক মানুষদের আচরণ থেকে 'ব্যথা'র সংজ্ঞা শিখতে পারে। শিক্ষণের মাপকাঠি থাকে আচরণ, অনুভূতি না। আচরণই ব্যথার সংজ্ঞাকে যথাযথ ব্যবহার করার মাপকাঠি। যেমনিভাবে টেবিলের সাথে মানুষের আচরণ টেবিলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার মাপকাঠি।
তাই দেকার্ত যখন বলেন, আমি বহির্জগতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কার্যত সংশয় পোষণ না করলেও তত্ত্বীয়ভাবে করি, তখন তিনি মূলত বলেন, 'আমি সংশয়ের দাবি তুলি, কিন্তু আচরণে তার কোনো প্রতিফলন থাকে না!' অর্থাৎ তিনি সংশয়ের অনুভূতির কথা বলছেন, কিন্তু সংশয়ের সংজ্ঞা বলছেন না যেটা আমরা সবাই জানি। তিনি এক বিশেষ ভাষায় কথা বলছেন যেটা বোধগম্য না, বা অন্ততপক্ষে স্ববিরোধী। তার উদাহরণ এমন মানুষের মতো যিনি বলেন, 'আমি ঈমানদার' কিন্তু ঈমানের প্রতিফলন ঘটে এমন কোনো কাজ সে করে না। সংশয় বলতে আমরা যা জানি সেটা হলো:
> এমন সংশয় যেটা পূর্ব থেকেই দৃঢ় বিশ্বাসকে অনুমিত ধরে নেয়। কারণ একটা শিশু কোনো কিছু জানার আগে অবশ্যই তাকে চারপাশের সবকিছুকে স্বীকার করে নিতে হবে। অর্থাৎ তাকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট বিষয় মেনে নিতে হবে এবং মেনে নেওয়ার নীতির অন্ধ অনুকরণ করতে হবে। তাহলেই বিশ্বজগত সম্পর্কে সে দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। তারপর যদি কখনো তার মনে হয় যে উত্তরাধিকারসূত্রে যা জেনে এসেছে, সেটা অতিক্রম করতে হবে; তাহলে সে সেটা করতে পারে। কিন্তু বিশ্বকে চেনার আগে কিংবা শূন্য থেকে শুরু করে তার জন্য এমনটা করা সম্ভব নয়। আক্কলে শুরু থেকে যে জ্ঞান থাকে, সেটা নিয়ে সে সংশয় পোষণ করতে পারবে না (যেমন- নিজের অস্তিত্ব, বহির্জগতের অস্তিত্ব, অন্যদের আকল থাকা, যুক্তিবিদ্যার প্রারম্ভিক কিছু মূলনীতি)। দেকার্ত যেখানে মনে করেন, সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হলে জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃঢ় বিশ্বাসের আগে মৌলিক সংশয়ের প্রয়োজন, সেখানে ভিটগেনস্টাইন বর্ণনা করেন যে, 'সংশয়ের জন্য পরীক্ষণ চালানোর সম্ভাবনা ও সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। আর পরীক্ষণের দাবি হলো এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকা, যার উপর ইতঃপূর্বে পরীক্ষা চালানো হয়নি যা সংশয় পোষণ করা হয়নি।'¹⁸⁰ কালামবিদদের ভাষায় বললে, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে শেষ পর্যন্ত আবশ্যকীয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'আপনি যদি সব বিষয়ে সংশয় পোষণ করতে চান, তাহলে সংশয়ের ফলে আর কিছুই খুঁজে পাবেন না। সংশয়ের জন্য আগে দৃঢ় বিশ্বাসের অস্তিত্ব আপনাকে মেনে নিতে হবে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সংশয়গুলো মেনে নেয় যে সংশয়ের ব্যতিক্রম কিছু বিষয় আছে। এগুলো মৌলিক বিস্তৃত বিষয়ের মত যেগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য বিষয় পরিচালিত হয়।¹⁸⁰ সুতরাং মৌলিক বা প্রাথমিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাসই মূল কিংবা অন্যভাবে বললে প্রাথমিক বা মৌলিক অবস্থান হলো দৃঢ় বিশ্বাস, সংশয় নয়। কারণ শুরুতেই আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে কিছু জিনিসের উপর সহজাত প্রবৃত্তির মাধ্যমেই বিশ্বাস করতে হবে, দলীল খুঁজতে হবে না। দার্শনিক শার্ল স্যান্ডেজ পিয়ার্স বলেন, 'পূর্ণ সংশয় থেকে আমাদের সূচনা করা সম্ভব নয়। বরং আমরা যখন দর্শন পড়া শুরু করব, তখন বাস্তবের ব্যাপারে যত পূর্ব ধারণা রাখি, সেগুলো থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। ... শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সংশয়বাদ নিছক আত্মপ্রতারণা, এটা প্রকৃত সংশয়বাদ নয়। ব্যক্তি সংশয় পোষণ করে কারণ সেটার পক্ষে তার ইতিবাচক কারণ থাকে। ... আসুন, আমরা মনে মনে যেসব বিষয়ে সংশয় পোষণ করি না, দর্শনে সেগুলোতে সংশয় পোষণ করার ভান না ধরি।¹⁸¹ এর উপর ভিত্তি করে 'ভিটগেনস্টাইন জ্ঞানের জন্য কিছু মূলনীতি থাকা দরকার এ মর্মে দেকার্তের পরবর্তী যুগে সবাই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে দাবি তোলে, সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।' তিনি বিপরীতে এই 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে' গ্রহণ করেন।¹⁸²
> এমন সংশয় যেটার অস্তিত্ব পূর্বের কোনো বিশ্বাসকে মেনে নিতে বাধা প্রদান করে না। ভুল ও সংশয়ের সম্ভাবনার তত্ত্বীয় অস্তিত্ব আমাদের প্রাথমিক বিশ্বাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় না। আর ভিটগেনস্টাইনের মতে 'আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কোনো মাধ্যম বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করে না। এর প্রয়োজনও নেই। সংশয়ের জন্ম কেবল মৌলিক কোনো কারণ থেকেই হতে হবে। দার্শনিকভাবে সৃষ্ট কোনো কিছু থেকে নয়।¹⁸³ আমরা 'অনেক সময়ে যৌক্তিক কারণে অসংখ্য সম্ভাবনাকে গণনার বাহিরে রাখি, যেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে দেখলে বলতে হবে যে, সেগুলো ঘটার মতো নয়; যদি আমরা যা জানার দাবি করি তা বাস্তবে জেনেই থাকি।' দেকার্তের স্বপ্নের যুক্তির উপর এটা প্রয়োগ করলে বলতে হবে, মূল অবস্থা হলো এটা মেনে নেয়া যে আমি স্বপ্নে আছি। বিভিন্ন তত্ত্বীয় সমস্যার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেকটা সংশয়ের সাথে এমন তত্ত্বীয় আচরণ করার অসম্ভাব্যতা ব্যক্ত করে ইবন তাইমিয়াহ বলেন, 'কেউ যদি বলে, এই জ্ঞান (প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞান) বিষয়গুলোর বিপরীতে কূটতর্কের মাধ্যমে যে সকল যুক্তি দাঁড় করানো হয় সেগুলোর জবাব না দিলে এগুলো টিকবে না; তাহলে কারো কাছে কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র জ্ঞান টিকে থাকবে না। কারণ মানুষের মনে কূটতর্কের কারণে যে সকল যুক্তি উপস্থিত হয়, সেগুলোর কোনো শেষ নেই।¹⁸⁴
> প্রায়োগিক वैधता পায় কিন্তু দার্শনিকভাবে পায় না এমন সংশয়। যে সকল মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়গুলোতে অসুস্থতার কারণে বা খুব জোরাজুরি না করলে সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না; সেগুলোর ব্যাপারে একজন ইতিহাসবিদের জন্য সংশয় পোষণ করা সম্ভব যদি তার কাছে এমন কিছু প্রকাশ পায় যেটা তাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। একজন মুহাদ্দিস মুখস্থে পারদর্শী কোনো এক বর্ণনাকারীর বর্ণনার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারে, যখন সে ঐ বর্ণনাকে অন্য বর্ণনার সাথে তুলনা করে। যেমন, তার চাইতে মুখস্থে আরো দক্ষ কারো বর্ণনা। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংশয় আমাদের স্বাভাবিক সংশয়ের মতো। আমরা যখন কোনো মানুষের সাথে কথা বলি তখন তার কথার সত্যতার ব্যাপারে সংশয় পোষণ করতে পারি, যদি প্রাসঙ্গিক কোনো আলামত পাই। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'এটা হলো কল্পনা বা অনুমান, যাকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে হবে।' কারণ দেকার্ত কর্তৃক উপস্থাপিত 'ব্যবহারিক দিক থেকে বিচ্ছিন্ন ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'¹⁸⁵ কল্পনা করা সম্ভব নয়।
সারকথা হলো, দেকার্তের পর থেকে জ্ঞানের তত্ত্বগুলো (যেমন: সংশয়বাদ) সমাজ এবং সামাজিক প্রয়োগের দিকগুলোর প্রাধান্য উপেক্ষা করে যায়। সেগুলো মনে করে জ্ঞান হচ্ছে, 'একজন জ্ঞানী ব্যক্তির নিজের ব্যাপারে প্রদত্ত নির্ভরযোগ্যতার প্রক্রিয়া। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার অধিকারী হব, তখন আমি (জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) জানব যে আমি এটার মালিক।¹⁸⁶ আর আমাদের বিবরণমূলক পদ্ধতি মৌলিক তথা প্রাথমিক জ্ঞানের ব্যাপারে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় না। মানুষজন যা জানে, সেটাকে প্রকাশ করার মাধ্যমে আমরা সে সকল দার্শনিক প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিই। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিবরণ দেওয়ার মাধ্যমে। যার মাঝে রয়েছে মানুষদের দ্বারা মৌলিক জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করা। এটা তুলে ধরা বা প্রকাশ করার মাধ্যমে একজন দার্শনিক সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করে, তার উপযুক্ত জবাব প্রদান করা হয়। ভিটগেনস্টাইন বলেন, 'দার্শনিক সমস্যার জন্য (মানুষদের) সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। একজন মানুষের জন্য সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের বিপক্ষে দার্শনিকদের সব আক্রমণের মোকাবেলা করার উপায় হলো এমন কিছু উপস্থাপন করা, যেটা দেখলে তারা এই সম্মিলিত ইন্দ্রিয়ের উপর আক্রমণে উদ্বুদ্ধ হবে।¹⁸⁷
উপর্যুক্ত বিবরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সামাজিক ও পরস্পরের অংশগ্রহণমূলক জ্ঞান ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহু মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিকভাবে দেখলে জ্ঞানের মূলনীতিসমূহের ব্যাপারে 'দৃঢ় বিশ্বাস' সংশয়ের পূর্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ যে মৌলিক জ্ঞান সকল মানুষ জানে সেটার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশয়কে প্রায়োগিক দৃঢ় বিশ্বাস দুর্বল করে দেয়।
পূর্বের বক্তব্যগুলো প্রয়োগ করে বলব, ইসলামী সমাজে আমরা দেখতে পাই একজন মুসলিম কিছু মৌলিক জ্ঞান ধারণ করে। যেমন- আমাদের বইয়ের বিষয়বস্তু হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ প্রমাণ করা। আমাদের কাছে যে সকল বর্ণনা পৌঁছেছে, সেগুলোর সমষ্টি সুন্নাহকে তুলে ধরে। আর কোন কোন বর্ণনা গ্রহণযোগ্য বা প্রত্যাখ্যাত, সেগুলো নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাদীসের আলেমদের বক্তব্য চূড়ান্ত। বর্ণনাগুলো যাচাই করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি আছে। এই জ্ঞান একজন মুসলিম 'অ-জ্ঞানতাত্ত্বিক' পদ্ধতিতে অর্জন করে। কেবল একটা মুসলিম সমাজে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠার মাধ্যমে সে এই জ্ঞানের অধিকারী হয়। দলীল-নির্ভর জ্ঞানের চাইতে এই জ্ঞান তার রক্তে-মাংসে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী এই জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান করা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের জ্ঞান মেনে নিতে জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।¹⁸⁸
টিকাঃ
১৫২. Kazmi, Yedullah, Faith and Knowledge in Islam: An Essay in philosophy of religion. Islamic Studies, Vol. 38, No, 4 (1999) pp. 503-534.
১৫৩. Leslie Stevenson, Why Believe What People Say? Sunthese Vol. 94, No. 3 (Mar., 1993), pp. 429-451.
১৫৪. লুসিয়ান গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইন্সানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফা, আল-মাজলিসুল আ'লা লিস-সাক্বাফা, অনুবাদ: ইউসুফ আল-আনত্বাকী, পৃ. ৫২।
১৫৫. প্যাট্রিক হিলি, সুয়ারুল মা'রিফাহ, পৃ. ৪৯।
১৫৬. রিচার্ড শাখত, রুয়াদুল ফালসাফাহ আল-হাসীসাহ, পৃ. ১৭।
১৫৭. Rudd, Anthony, Expressing the World: Skepticism, Wittgenstein, and Heidegger. Chicago: Open Court, 2003, p. 56.
১৫৮. আব্দুর রহমান বাদাওরী, মাউসুরাতুল ফালসাফাহ, হাইডেগার অধ্যায়।
১৫৯. প্রাগুক্ত।
১৬০. সাফা আব্দুস সালাম জাফর, আল-উজুদুল হাকীকী ইন্দা মার্তিন হাইডেগার, মুনশাআতুল মা'আরেফ, পৃ. ১৮৭।
১৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১।
১৬২. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59..
১৬৩. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, দারুল কুতুবিল জাদীদ আল-মুত্তাহিদাহ, অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকা: ফাতহী আল-মিসকীনী, পৃ. ১৪৫।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১।
১৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৪।
১৬৬. হায়াত খালফাওয়ী, মাফস্থমুল হাকীকাহ ইন্দা মার্টিন হাইডেগার, মিন্ডাক্টরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স থিসিস, পৃ. ৫৬।
১৬৭. মুহাম্মাদ আশ-শাইখ, নাকদুল হাদাসাহ ফী ফিকরি হাইডেগার, আশ-শাবাকাতুল আরাবিয়্যা লিল-আবহাসি ওয়ান-নাশর, ২০০৮, পৃ. ৪৭০।
১৬৮. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ১৫৬।
১৬৯. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 57.
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
১৭১. হাইডেগার, আল-কাইনুনা ওয়ায-যামান, পৃ. ৩৮৩।
১৭২. Rudd, Anthony, Expressing the world, 2003, p. 65.
১৭৩. কাইস মাদী, আল-মা'রিফাতুত তারীখিয়্যা ফিল-গার্ব, পৃ. ৩৫-৩৬।
১৭৪. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩-৫৪।
১৭৫. Rudd, Anthony, Expressing the World, 2003, p. 59.
১৭৬. গোল্ডম্যান, আল-উলুম আল-ইনসানিয়্যা ওয়াল-ফালসাফাহ, পৃ. ৫৩।
১৭৭. যাকী নাজীব মাহমুদ, বারট্রান্ড রাসেল, দারুল মা'আরেক, পৃ. ৬৭।
১৭৮. হানী সুজা, ভিটগেনস্টাইন, আল-মারকাযুল কওমী লিত-তর্জমা, আফাক লিনাশর ওয়াত-তাওযী, অনুবাদ: সালাহ ইসমাইল, পৃ. ১৬১।
১৭৯. মাহমুদ যাইদান, নাযারিয়্যাতুল মারেফা ইন্দা মুফাকিরিল ইসলাম ওয়া-ফালাসিফাতিল গারবিল মুয়াসিরীন, মাকতাবাতুল মুতানাব্বী, পৃ. ১১৫।
১৮০. অ্যান্ডি হ্যামিল্টন, ভিটগেনস্টাইন ওয়াফিল ইয়াক্বীন, ইবনুন নাদীম ওয়া-দারুর রাওয়াফেদ, ২০১৯, অনুবাদ: মুস্তফা সামীর, পৃ. ৩১২।
১৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৭।
১৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।
১৮৪. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল 'আক্বলি ওয়ান-নাক্কল, তাহকীক: মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম (৫/২৫৪)।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩।
১৮৮. তবে কিছু অমুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই মৌলিক জ্ঞান তাদের কাছে স্বীকৃত বিষয় হবে না। বরং এগুলো শুধুই তত্ত্ব। তাই আমরা চতুর্থ অধ্যায় রেখেছি যেন সেখানে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত মৌলিক অভিযোগগুলোর খণ্ডন করা যায়। আমরা আবারও বলছি, যে মুসলিম ঐ সকল সংশয় পড়ে না বা খণ্ডনও পড়ে না, স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক জ্ঞানের স্বীকৃতি প্রদান (অ-জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে) করে, মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান বৈধ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কিছু নেই।