📄 চারিত্রিক দৃঢ়তা বয়ে আনে সফলতা
চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদের মান বা মূল্য নির্ধারণের কোনো মূল্যায়নসূচক নেই। মূল্য দিয়ে চরিত্রকে মূল্যায়ন করা যায় না বলেই এটিকে অমূল্য সম্পদ বলা হয়। মানুষের সার্বিক জীবনব্যবস্থায় এই অমূল্য সম্পদের কার্যকারিতা অনেক শক্তিশালী। তাই মানবজীবনে চরিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী বিষয়। ঈমানের পরে চরিত্রতেই ইসলামে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যার চরিত্র দুর্বল, সে খাঁটি ঈমানদার নয়, প্রকৃত বিশ্বাসী নয়। চরিত্র মহামূল্যবান, অতুলনীয় সম্পদ ও এক অমূল্য রত্ন। ব্যক্তির নৈতিকতা ও চরিত্রকে সুন্দর ও মার্জিত করার বিষয়টি ইসলামে কত যে গুরুত্বপূর্ণ মানবতার মহান শিক্ষক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদিস থেকে তা অনুমান করা যায়। রাসূল (সা) ইরশাদ করেন- তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম মানুষ বলে বিবেচিত, যাদের চরিত্র উত্তম। অপর এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, কেয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হবে, যার নৈতিকতা ও চরিত্র সবচেয়ে ভালো। (বোখারি)।
মানুষ যে সমাজ ও পরিবেশে বসবাস করে সে সমাজ ও পরিবেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানুষের চারিত্রিক উৎকর্ষতা নিশ্চিত করে। সমাজ ও পরিবেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি যদি উত্তম হয় তাহলে মানুষের চরিত্রও উত্তম হয়। তবে জীবনকে সফলতার প্রান্তে উপনীত করার জন্য শুধুমাত্র চারিত্রিক উৎকর্ষতাই যথেষ্ট নয় বরং চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রয়োজন। সমাজের বহু মানুষ আছে যারা মাঝে মধ্যে স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য চরিত্রহীন হয়ে পশুত্বে পরিণত হয়। চরিত্রের বৈশিষ্ট্য পশুত্বে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রয়োজন। চরিত্রের ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান কথা তাই সমাজে বহুল প্রচারিত হয়েছে যে, চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। পৃথিবীর বাকি সকল সম্পদ হারিয়ে গেলেও ফিরে পাওয়া সম্ভব কিন্তু চারিত্রিক সম্পদ নষ্ট কিংবা হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সমাজে বহুল প্রচলিত সেই মহামূল্যবান বাণী হলো- If money is lost nothing is lost, if health is lost something is lost, if character is lost everything is lost. অর্থাৎ অর্থ হারালে কিছুই হারায় না, স্বাস্থ্য হারালে কিছু হারায়, কিন্তু একবার চরিত্র হারালে সবকিছুই হারায়।
মানবজীবনে সফলতার জন্য চারিত্রিক দৃঢ়তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চলনে-বলনে, আচার-অনুষ্ঠানে, কথা-কাজে, নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠাই ব্যক্তিজীবনের সফলতা নিশ্চিত করে। যার চারিত্রিক দৃঢ়তা যতো বেশি তার সফলতাও ততো বেশি। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু দারদা (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, "(কিয়ামতের দিন) মুমিনের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চাইতে বেশি ভারী আর কোনো জিনিস হবে না” (আবু দাউদ) আর চারিত্রিক দৃঢ়তা মানুষের কাছ থেকেই কামনা করা হয়। কারণ মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ তাঁর সকল মাখলুকের মধ্যে মানুষকেই দিয়েছেন চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা। আর বাকি সকল সৃষ্টিকে করেছেন মানুষের অধীন। মানুষের সাথে বাকি মাখলুকের পার্থক্য এখানেই। মানুষ আর পশুর পার্থক্য নির্ণিত হয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে। মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তা যদি সকল হীনতা, নীচতা, পশুত্ব ও নোংরামির ঊর্ধ্বে থাকে তবেই সে পশুর চাইতে শ্রেষ্ঠ, তবেই সে সফল। কষ্ট ছাড়া, ঘাম, শ্রম ও ধৈর্যের বিনিময়ে অর্জিত অনেক দিনের মানমর্যাদা সামান্য চরিত্রহীনতায় মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। মানুষকে কর্ম ও চিন্তার স্বাধীনতা যেমনি দেয়া হয়েছে তেমনি তার সীমাও আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে কোন পরিবেশই তৈরি হোক না কেন সেই সীমা অতিক্রম না করাই চারিত্রিক দৃঢ়তা, নিজেকে সেই সীমার মধ্যে আটকে রাখতে পারাই সফলতা। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব এই আত্মপরিচয় সব সময় স্মরণ থাকলে সেটিই চরিত্রহীনতা থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা পালন করবে। আত্মসম্মানবোধ যেমন সম্মানহানি থেকে চরিত্রকে রক্ষা করে তেমনি আত্মসংযম লোভ-লালসায় ডুবে গিয়ে চরিত্রহীনতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া থেকে ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখে। চরিত্র মানবজীবনের সৌন্দর্য আর চারিত্রিক দৃঢ়তা এই সৌন্দর্যকে কলুষমুক্ত রেখে সুষমায় প্রস্ফুটিত করে সাফল্য নিশ্চিত করে। মানবজীবনের প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পদক্ষেপেই এই সুষমা প্রয়োজন, না হলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে অর্জিত সাফল্য।
চরিত্রই পারে মানুষের সকল সাফল্যকে হাতের মুঠোয় এনে দিতে। তাই এই পৃথিবীর আর কোন কিছুর সঙ্গেই চরিত্রের তুলনা হয় না। চরিত্রকে অর্থের বিনিময়ে কেনা যায় না, এমনকি সমগ্র বিশ্বের বিনিময়েও তা কেনা অসম্ভব। অর্থের ক্রয়ক্ষমতা নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা মূল্যমান নির্ধারণ করে অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করা যায় না। অনেক সময় অর্থ বিশেষ বিষয়ে সীমা অতিক্রম করতে পারে না। চরিত্র অর্থের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে তেমনই একটি বিষয়। তবে যদি কেউ অর্থের বিনিময়ে চারিত্রিক সার্টিফিকেট অর্জন করে তাহলে বুঝতে হবে সেই চারিত্রিক সার্টিফিকেটের সাময়িক কোনো গুরুত্ব থাকলেও তা আসলেই অর্থহীন। মানুষ রাতারাতি বিবেককে বিসর্জন দিয়ে সাফল্য লাভ করতে চায় কিন্তু যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন আর শেষ রক্ষা হয় না। তখন কোন আর্থিক মূল্যও এই শেষ রক্ষা থেকে ব্যক্তিকে পরিত্রাণ দিতে পারে না।
চারিত্রিক দৃঢ়তা অর্জনে মানুষের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শ থাকা চাই। আদর্শহীন মানুষ ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সাগরে পালহীন তরীর মতো। কারণ ঝঞ্ঝা- বিক্ষুব্ধ উত্তাল সাগর পালহীন তরীর যাত্রীদের সলিল সমাধি নিশ্চিত করে থাকে। এ অবস্থায় আদর্শহীনতার কারণে চরিত্রহীন মানুষকে কেউ প্রকৃত মানুষ হিসেবেই অভিহিত করে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, চারিত্রিক দৃঢ়তা অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট আদর্শ অনুসরণ আবশ্যক বলা হলেও আমরা জাগতিক ব্যক্তি, জৈবিক আদর্শকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও আমরা এটিকে এড়িয়ে চলে খড়কুটা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ অনুকরণীয়, অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন, “তোমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ” (সূরা আহজাব : ২১)। রাসূলের আদর্শকে সর্বোত্তম অভিহিত করার পরও আমরা রাসূল (সা)-কে বাদ দিয়ে তার আদর্শকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং তাদের মতাদর্শকে অনুসরণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করি। মহানবী (সা)-এর আদর্শ অনুসরণে কল্যাণ নিশ্চিত রয়েছে বলেই তাকে মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল কুরআনে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন, "আর আমি রাসূল (সা)-কে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি” (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে রাসূল (সা)-এর জীবন অনুসরণ আমাদের দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত সফলতা ও মানবিক মুক্তি। কিন্তু তার পরিবর্তে আমরা যদি ব্যর্থ মতবাদে জাগতিক ব্যক্তি আদর্শের পেছনেই ছুটে চলি তাহলে তারা যে রকম ব্যর্থতা ও গ্লানিকেই বহন করেছেন তারা যাদের পূর্ণভাবে অনুসরণ করবে তারাও ব্যর্থ হতে বাধ্য। ব্যর্থতার পরিবর্তে সফলতা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের জাগতিক ব্যক্তি ও মতবাদের পরিবর্তে বিশ্বশান্তির অগ্রদূত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবা এবং ইতঃপূর্বে প্রেরিত নবী-রাসূলদের জীবন-চরিত্রেরই অনুসারী হওয়া উচিত।
প্রখ্যাত চিন্তাবিদ নঈম সিদ্দিকী রচিত চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান বইয়ের শুরুতে প্রকাশক বলেছেন- মানুষের তৎপরতা যত বৃদ্ধি পায়, যত অধিক গুরুত্ব অর্জন করে, সেখানে শয়তানের হস্তক্ষেপও ততই ব্যাপকতর হতে থাকে। একদিকে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও স্বার্থপূজারি সভ্যতা আমাদের জাতির নৈতিক পতনকে চরম পর্যায়ে উপনীত করেছে, অন্যদিকে চলছে সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলা। এ হামলা আমাদের জাতির মৌলিক ঈমান- আকিদার মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ইসলামের সাথে জাতির গভীর প্রেম-প্রীতিময় সম্পর্কের ভিত্তি নড়ে উঠেছে। বিপর্যয় ও অনিষ্টকারিতার 'সিপাহসালার' শয়তান যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল হুবহু তারই চিত্র যেন আজ ফুটে উঠেছে। শয়তান বলেছিল, "আমি গোমরাহ করার জন্য মানবজাতির সামনে থেকে আসবো, পেছন থেকে আসবো, ডান দিক থেকে আসবো, বাম দিক থেকে আসবো” (সূরা আরাফ: ১৭)। আজ সামগ্রিক পরিস্থিতিতে যুবসমাজ অশ্লীলতার অতল গহ্বরে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলছে। শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে বিকিয়ে দিচ্ছে চরিত্র নামের অমূল্য সম্পদ। অথচ অশ্লীলতা এমন এক জিনিস যা মানুষকে চরিত্রের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যায়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে কোনো ধরনের অশ্লীল আচরণের ধারে-কাছেও না যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, "আর প্রকাশ্য কিংবা গোপনে হোক তোমরা বেহায়া-অশ্লীল আচরণের নিকটেও যেয়ো না" (সূরা আনআম: ১৫১)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, "সে-ই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে" (সূরা শামস ৯-১০)।
ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের সেরা মেধাবী ছাত্র শহীদ আবদুল মালেক চরিত্র সম্পর্কে একটি অমূল্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা আমাদের হৃদয়কে সহসাই নাড়া দেয়। তিনি বলেছিলেন, "যেদিন আমাদের চরিত্র হবে হযরত ইউসুফ (আ)-এর মত সেদিনই আসবে কাঙ্ক্ষিত বিজয়" সরাসরি কুমন্ত্রণা প্রত্যাখ্যান করে হযরত ইউসুফ (আ) যেভাবে চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন তা সত্যিই আজকের প্রতিটি যুবকের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ঘটনা প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে- সে (ইউসুফ আ) বলল, "হে আমার প্রতিপালক! এই নারীরা আমাকে যার প্রতি আহবান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশি প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা থেকে আমাকে রক্ষা না করেন, তাহলে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো” (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৩৩)। বর্তমান আইয়ামে জাহেলিয়াতকে হার মানানো এই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে হযরত ইউসুফ (আ)-এর মত তেমনি চারিত্রিক দৃঢ়তা ছাড়া যুবসমাজের রক্ষা নেই। আজকে আমরা সমূলেই আমাদের চরিত্রকে বিকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। অথচ চারিত্রিক শক্তি যে কত বিশাল শক্তি তা আজ আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। চারিত্রিক শক্তির কাছে অন্য সকল শক্তি পরাভূত হতে বাধ্য।
📄 মনের কথা মনে থাকে কি?
জীবন চলার পথে মানুষের কত কিছুইতো মনে থাকে না। ছাত্রের পড়া মনে থাকে না, ব্যবসায়ীর হিসাব মনে থাকে না, শ্রমিকের কাজ মনে থাকে না, কারো 'মন'- এর কথাই মনে থাকে না। জীবনের গতিপথে মানুষ নানা বিষয়ের সাথে জড়িত। মানুষের যত বিষয় তত হিসাব। কথার হিসাব, ব্যথার হিসাব, জানার হিসাব, মানার হিসাব। এই সকল হিসাব যে মনে রাখে তার নাম 'মন'। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই মনের কথা আপনার আমার মনে থাকেতো? চলতে চলতে আমরা কত পথেই না চলি, বলতে বলতে আমরা কত কথাই না বলি। কিন্তু সচেতন মন আমাকে কতটুকু চলতে কিংবা বলতে সাহায্য করে সেটার হিসাব কি কখনো আমরা মনের কাছ থেকে নিয়েছি। নাকি অবচেতন মনই আমাকে আপনাকে কত পথে চালিয়েছে কত কথা বলিয়েছে।
বুদ্ধি ও বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ মন। চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে। মন কী এবং কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে অনেক রকম তত্ত্ব প্রচলিত আছে। জড়বাদী দার্শনিকরা মনে করেন, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোনো কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শরীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে ওঠে। আর বিশ্বাসী মানুষেরা মনকে আত্মা হিসেবে অভিহিত করেন। প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকা মন বা আত্মাই হলো মানুষের নিয়ন্ত্রক। ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রক সেই 'মন'-এর খবর যদি ব্যক্তির কাছে না থাকে তাহলে ব্যক্তির প্রকৃত অস্তিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে; হারিয়ে ফেলে তার জন্মের সার্থকতা।
মানুষের মন যতক্ষণ তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, মানুষ যতক্ষণ মনের কথা মনে রাখতে পারে, ততক্ষণ মানুষের অধীনেই তার মন ন্যস্ত থাকে। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সে মন অবচেতন হয়ে যায়। ফলে সে মন আর তার অধীনে থাকে না। সে ভাবনার রাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ যখন অবচেতন মনে পড়ে থাকে তখনো কিন্তু তার মন কাজ করে। অবচেতন মন কোন না কোন দিক থেকে ঘুরে আসে। মানুষের মনের শক্তি এমনই। এটি বসে থাকে না। অবিরাম চলতে থাকা এই মনকে মানুষ যখন কাজ না দেয়, অলস বানিয়ে রাখার চেষ্টা করে তখন সেখানে অকল্যাণ ভর করে। মূল্যবান একটি বিখ্যাত বাণী রয়েছে, "Empty mind is devil's workshop.” অর্থাৎ “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা” মনকে অলস বানিয়ে রাখবেন তো শয়তান তাকে তার অপকর্মের কারখানা বানিয়ে ফেলবে। তাই সর্বদা চেতন মনকে কল্যাণ চিন্তায় নিবেদিত না করতে পারলে সেটাকে অন্যায় ও অকল্যাণ গ্রাস করে নেবে।
'মন'-এর কথা আসলে মনে থাকে কি না? কিংবা মন কোথায় থাকে? এ ব্যাপারে চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম (রহ) তারই লেখা "মনটাকে কাজ দিন" বইয়ের ভূমিকায়। তিনি লিখেছেন, “ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৬ সেল নামক ১২ কামরাবিশিষ্ট দীর্ঘ দালানের এক নম্বর কামরায় আমার ১৬ মাসের জেলজীবন কাটাই। দিনের বেলা আমার কামরার সামনে নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে একজন সিপাই সব সময় ডিউটিরত থাকত। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পালাক্রমে দু'জন সিপাই ৬ ঘণ্টা করে অবস্থান করত। রাতে প্রত্যেকের ৩ ঘণ্টা করে ডিউটি করতে হতো। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা সময় তাদের যেভাবে কাটত তা দেখে আমার মায়াই লাগত। কখনো একটু পায়চারি করে, কোন সময় বারান্দার লোহার সিক ধরে দাঁড়িয়ে, এক সময় দেয়ালে হেলান দিয়ে, মাঝে মাঝে বসে একটু ঝিমিয়ে কোন রকম সময়টা পার করতে হতো। ২৬ সেলের চাবির ছড়া হাতে ডিউটিরত অপর একজন সিপাইর সাথে গেটের সিঁড়িতে বসে আলাপ করা কালে তার সময়টা ভালোই কাটত বলে মনে হয়। আমি আলাপ করলে খুব খুশি হতো। ঐ এলাকার জমাদারকে এ দু'জন সিপাইর সাথে গল্পরত অবস্থায় দেখলে আমি কয়েকজনকে একসাথে পেয়ে জিজ্ঞেস করতাম, আপনারা ডিউটিতে থাকাকালে শরীরটাতো দাঁড়িয়ে, বসে বা হেঁটে সময় কাটান, কিন্তু মনটা এ সময় কোথায় থাকে এবং কী করে? প্রশ্ন শুনে একে অপরের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে আমার দিকে অসহায় চোখে তাকালে আবার ঐ প্রশ্নই করতাম। তখন একটু ভেবে পাল্টা প্রশ্ন করত, মনে হাজারো চিন্তা ভাবনা তোলপাড় করতে থাকে- পারিবারিক বিষয়, চাকরিতে সমস্যা, অভাব অনটন নিয়ে দুশ্চিন্তা, আজেবাজে কত কথা যে মনে জাগে এর কি কোনো হিসাব থাকে?
আবার প্রশ্ন করতাম, আচ্ছা, এসব ভাবনা-চিন্তা কি নিজে নিজেই এসে ভিড় জমায়, না সচেতনভাবে একটা একটা করে বিষয় নিয়ে ভাবেন? একটু হেসে জওয়াব দিত, এর কোন ঠিকানা নেই। কখন যে কোন কথা মনে হাজির হয়ে যায় তা টেরও পাওয়া যায় না।
মনের অবস্থা সম্পর্কে অধ্যাপক সাহেব চমৎকারই একটি উদাহরণ দিয়েছেন। সত্যিকারভাবে মানুষের মনের অবস্থা এমনই। কখন যে মনে কোন কথা হাজির হয়ে যায়, কোন চিন্তা আশ্রয় নেয় তা আসলে টেরই পাওয়া যায় না। 'মন'-এর ব্যাপারে একটা প্রচলিত কথা আছে, 'মানুষের মন আকাশের রঙের ন্যায়'। এ কথাটির একটি তাৎপর্যও আছে। কারণ আকাশের রঙের যেমন কোনো স্থায়িত্ব নেই, কখন কোন অবস্থা ধারণ করে বলা যায় না। তেমনি মানুষের মনও নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে একই বিষয়ের ওপর তার স্থায়িত্ব থাকে না। মন বড়ই বিচিত্র। মনের অবস্থা কখন যে কী রূপ ধারণ করবে তা বলা যায় না। মনের যিনি ধারক তথা ব্যক্তি তিনিও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না মনের ওপর। রক্ত-মাংসের বিশাল দেহের মানুষটি নিয়ন্ত্রিত হয় অদৃশ্য সেই মনের দ্বারা। মন বলছে তো গোটা দেহ সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। মন বলেনি তো কোনোভাবেই নড়ছে না বিশাল দেহটি। অনুভবযোগ্য না হওয়ার পরও অদৃশ্য মনের প্রভাব অনেক বেশি। মনই হলো সব ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক। মনকে মনে না রেখে তাকে উপেক্ষা করে চলার কোনো উপায় নেই। যে কাজে মন সায় দেবে না সেখানে কোনো প্রাণ থাকবে না। মন+যোগ হলেই কাজে প্রাণ আসে, গতি পায়।
আপনার আমার ফেলে আসা কিছু মুহূর্তের কথা চিন্তা করুন তো। সামান্য এই জীবনের পথচলায় মন কত শত বার কত দিকে চলে গেছে, কত শত বার আবার মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছে তার কি কোন হিসাব আছে? মন এই আমার নিয়ন্ত্রণে আছে আবার মুহূর্তেই আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কত চিন্তা, দুশ্চিন্তাকে আশ্রয় দিয়েছে। আসলে মনের শক্তি এমনই। এ জন্য মনকে বলা হয় একটি শক্তিশালী যন্ত্র! এর যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা এবং ব্যাপ্তি অনেক বেশি। এ জন্য কাজ ছাড়া সে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।
মানুষের মন দুই অবস্থায় থাকে- এক. সচেতন, দুই. অবচেতন। সচেতন মনের যে রকম কার্জ ক্ষমতা আছে অবচেতন মনেরও তেমন কর্মক্ষমতা আছে। পার্থক্য হলো সচেতন মন গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে পারে। আর অন্য দিকে অবচেতন মন কেবলমাত্র গ্রহণ করতে পারে বর্জন করতে সক্ষম নয়। অবচেতন মন যা গ্রহণ করে তার ভালো-মন্দ বাছবিচার করে না। মন যেহেতু সচেতন কিংবা অবচেতন দুই অবস্থায়ই কাজ করে সেহেতু আমাদের মন নিষ্কর্মা হয়ে থাকতে পারে না। তাই মনকে সব সময় কল্যাণমূলক কাজে ব্যস্ত রাখা উচিত। না হলে নেতিবাচক কাজ মনের ভেতর প্রবেশ করে জীবনটাকেই সর্বনাশ করে দিতে পারে।
"আল্লাহ মানুষকে যে চিন্তাশক্তি দিয়েছেন সে আলোকে যা করে তাই মন" মনের বৈশিষ্ট্য হলো সে কাজ ছাড়া থাকতে পারে না, সে থাকে সদাব্যস্ত। মানুষ কাজ করতে করতে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়, শ্রান্ত হয়, বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, কিন্তু মন ক্লান্ত হয় না, শ্রান্ত হয় না, কিংবা বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না। এমনকি মানুষের দেহ যখন ঘুমায় মন তখনও ঘুমায় না। মন তখনও থাকে সদা জাগ্রত। ঘুমের সময়ও কিন্তু মন স্বপ্ন দেখে। মানুষ যখন বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মন তখনও কাজ করতে থাকে। বরং মনের কাজ তখন বেড়ে যায়। শরীর বা দেহ কাজ না করলেও তার ইন্দ্রিয়শক্তি চিন্তাশক্তি কাজ করে।
'মন'-এর কথা মনে রাখার প্রশ্ন কেন আসে? সত্যিকার অর্থে মনের কথা মনে রাখার প্রশ্ন এ জন্যই আসে যে, মন কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। এখন আমি যদি মনের খবর না রাখি। মন কি কাজ করছে তার হিসাব না নেই। সচেতনভাবে মনটাকে কাজ না দিই তখন আর কেউ তাকে কাজ দেবে, তখন সে জায়গায় শয়তান আশ্রয় নেবে। শয়তান বা ইবলিসের কাজই হলো মনটাকে কাজ দিয়ে আটকিয়ে রাখা। শয়তান হলো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। মানুষ সৃষ্টির পর প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-কে সেজদা করতে বলার পর শয়তান অহঙ্কার প্রদর্শন করে সিজদা থেকে বিরত থাকে। তখন আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেন। পাশাপাশি মানুষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতাও দেয়া হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে এসেছে, সে বলল- "আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হবো, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না” (সূরা আরাফ: ১৬-১৭) শয়তানের এ অপতৎপরতা সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, "মানুষ এমন এক ঘোড়া যার পিঠ কখনো খালি থাকে না। যদি সে সবসময় আল্লাহকে তার পিঠে সওয়ার করিয়ে রাখে তাহলে সে নিরাপদ। যখনই তার পিঠ খালি হয় তখনই ইবলিস চেপে বসে" সুতরাং মনের খবর যদি আমরা না রাখি তাহলে শয়তানের দখলে চলে যাবে মন। কাজও হবে তার ইচ্ছায়।
কাজের সূচনা হয় মন থেকে। কাজ হলো মানুষের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আর এই সূচনা তথা ইচ্ছাটা আসে মন থেকেই। এখন এই ইচ্ছাটা যদি ভালো হয় কাজও হয় ভালো, আর ইচ্ছা তথা ভাবনা যদি খারাপ হয় কাজও হয় খারাপ। মানুষ যদি তার মনকে মন্দ চিন্তা দেয়, তথা মন থেকে যদি মন্দ চিন্তার উদ্রেক হয় আর সে যদি তাকে প্রশ্রয় দেয়, তবে তার কাজগুলোও হবে সেই রকমই অর্থাৎ মন্দ কাজ। আমরা যদি মন্দ কাজ থেকে বাঁচতে চাই তাহলে আমাদের মনকে ভালো কাজ বা চিন্তা দিতে হবে। আর কর্মজীবনে গিয়ে ভালো কাজের চর্চা করতে হলে এখন থেকেই মনকে ভালো কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখতে অভ্যস্ত হতে হবে।
ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন শয়তান তাকে ধোকা দেবেই। হোক সে বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক বা সফল কোন ব্যক্তি। কোন না কোন ফাঁকে শয়তান তাকে বা তার মনটাকে মন্দ কাজ দিতে চেষ্টা করবেই। যিনি কুরআন পড়েন, হাদিস পড়েন এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন তিনিও যদি মনের খবর না রাখেন তাহলে শয়তান যেকোনো সময় তার ওপরও ভর করতে পারে। এজন্য আমরা দেখি মাঝে মধ্যে ভালো কিছু মানুষও গোমরাহির পথে পা বাড়ান। এটি শয়তানেরই কারসাজি। মনের ওপর শয়তান তার প্রাধান্য বিস্তার করার সুযোগ পায় বলেই এমনটি সম্ভব হয়।
মনটাকে কিভাবে ভালোভাবে রাখা যায় সে চেষ্টায় আমাদের নিবেদিত হতে হবে। মনের খোঁজ রাখতে হবে। মনকে রাখতে হবে নিজের নিয়ন্ত্রণে। কারণ সকল মন্দ কাজ থেকে মনকে বিরত রাখা আমাদের জীবনের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের উত্তরণ করতে না পারলে জীবনের উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যাবে।
📄 অহংবোধ : ঘুণে ধরা জীবনের প্রতিচ্ছবি
মানবমনের ক্ষুদ্র কোণে লুকিয়ে থেকে যে আচরণ সুন্দর জীবনে ধ্বংসের অভিযাত্রা শুরু করে তার নাম অহংবোধ বা অহংকার প্রদর্শন। অহংকার মানবজীবনের এক মারাত্মক ব্যাধি। মারাত্মক এই ব্যাধিটি উইপোকার মতো। এটি ধীরে ধীরে মানবজীবনের সৎগুণাবলি এবং এর বিকাশের সকল রাস্তাকে বন্ধ করে দেয়। তখন ব্যক্তির সৎগুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। আর তখনই পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ নিজেকে ভুলে যায়, ভুলে যায় তার আত্মপরিচয়। তাছাড়া কোনো ভালো অর্জন কিংবা ভালো কাজ করার পর যদি এই আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় যে লোকে দেখুক, প্রশংসা করুক- তখন এ ধরনের আত্মপ্রদর্শনীয় ইচ্ছাই মানুষকে অহংবোধের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আর অহংবোধের পর্যায় থেকে মানুষ ধীরে ধীরে অমানুষের পর্যায়ে চলে গিয়ে পতনের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। তাইতো অহংকারকে বলা হয় পতনের মূল।
অহংকার মানে হলো বড়ত্ব বা আত্মম্ভরিতার আতাপ্রদর্শন। অন্যের চাইতে নিজেকে বড় মনে করাই এর অন্তর্নিহিত অর্থ। এর পারিভাষিক অর্থ হলো সত্যকে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। রাসুলুল্লাহ (সা)-কে বলা হলো, আমরা সুন্দর জুতা পরি, সুন্দর পোশাক পরিধান করি, এগুলো কি অহংকার হবে? তিনি বললেন, না বরং অহংকার হলো সত্যকে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে হেয় জ্ঞান করা। অহংকার মানবস্বভাবের একটি নিকৃষ্ট অংশ। এর উপকারিতার চেয়ে অনিষ্টকারিতা বেশি। একে দমন করে সৎকর্মে লাগানোর মধ্যেই মানুষের কৃতিত্ব বা সাফল্য নির্ভর করে। এই রোগে যে আক্রান্ত হয়, সে নিজেকে নিজে ধ্বংস করে। তার দ্বারা সমাজ, সংগঠন, রাষ্ট্র এমনকি নিজ পরিবারও আক্রান্ত হয়, সে নিজেকে নিজেই ধ্বংস করে। মানুষের মধ্যে ক্রোধ, লোভ, মোহ, দম্ভ, গর্ব, অহংকার, ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতার মতো কিছু আচরণ বিদ্যমান থাকে যেগুলোর দক্ষ ব্যবস্থাপনাই কাম্য। অহংবোধ বা যেকোনো ধরনের পাপ কাজেরই উৎস হলো তিনটি। হাফেজ ইবনুল কাইয়িম (রহ:) বলেন, সমস্ত পাপের উৎস হলো তিনটি- ১) অহংকার, যা ইবলিসের পতন ঘটিয়েছিল। ২) লোভ, যা জান্নাত থেকে আদম (আ)-কে বের করে দিয়েছিল। ৩) হিংসা, যা আদম (আ)-এর এক সন্তানের বিরুদ্ধে অপর সন্তানকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছিল। যে ব্যক্তি উক্ত তিনটি বস্তুর অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকতে পারবে সে সকল পাপ কাজ থেকেই বিরত থাকবে।
অহংকার একবার অন্তরে প্রবেশ করলে তা থেকে রেহাই পাওয়া দুষ্কর। ইবলিস নিজেকে আগুনের তৈরি বলে মাটির তৈরি আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করে যে অহংবোধের জন্ম দিয়েছিল তা তাকে শয়তানে পরিণত করেছিল। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেন, "আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম আদমকে সেজদা কর। সকলেই সেজদা করল, শুধু ইবলিস ছাড়া। সে অস্বীকার ও অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল, অহংকারবশত আল্লাহর আদেশ অমান্য করে ইবলিস কাফের বলে গণ্য হয়ে গেল" (সূরা বাকারা: ৩৪)। অহংকার ইবলিসকে তারই সৃষ্টিকর্তার আদেশ পালন থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে সে কাফের হিসেবে গণ্য হয়ে জান্নাত থেকেই বিতাড়িত হলো। অহংকারের পরিণতি এমনই ভয়াবহ। অহংকার যারা পোষণ করে তারা জান্নাতে যেতে পারবে না।
মানবজীবনেও যার মধ্যে অহংকার ঢুকে যায় সে তার আত্মপরিচয় ভুলে যায়। সে ভুলে যায় তার সৃষ্টিকর্তাকে। নিজে সামান্য জমাটবাঁধা পানি থেকে সৃষ্টি, মাটির সৃষ্টি এই আত্মপরিচয় ভুলে গেলেই মানুষ অহংকারী হয়। আল্লাহ এজন্য অহংকারীদের ভালোবাসেন না এবং পরকালে তাদের জন্য মন্দস্থান তথা জাহান্নাম নির্ধারণ করে রেখেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না, আর জমিনের ওপর অহংকার করে চলাফেরা করো না। আল্লাহ কোনো আত্ম-অহংকারী দাম্ভিক মানুষকে পছন্দ করেন না” (সূরা লোকমান: ১৮)।
আল্লাহ তায়ালা অহংকারীকে ভালোবাসেন না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "কতই না মন্দ অহংকারকারীদের বাসস্থান" (সূরা নাহল: ২৯)। হজরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি বলল, মানুষ চায় যে, তার পরিধেয় বস্ত্র সুন্দর হোক, তার জুতা জোড়া সুন্দর হোক। তিনি বলেন, আল্লাহ সৌন্দর্যময় এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। অহংকার হলো সত্যকে দম্ভের সাথে পরিত্যাগ করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা। (মুসলিম)। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ) বলেন, "অহংকার শিরকের চেয়েও নিক" কেননা অহংকারী ব্যক্তি আল্লাহর দাসত্বের বিরুদ্ধে অহংকার করে। আর মুশরিক আল্লাহর ইবাদত করে এবং অন্যেরও করে" হাদিসে কদসিতে এসেছে- আল্লাহ তায়ালা বলেন, "অহংকার আমার পোশাক, এই পোশাক যে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেষ্টা করে তাকে আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো" (সহীহ মুসলিম)। আর এক হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, "অহংকারী স্বৈরাচারীদেরকে কিয়ামতের দিন ক্ষুদ্র কণার আকৃতিতে ওঠানো হবে। লোকেরা তাদের পায়ের তলায় পিষ্ট করবে এবং চারদিক থেকে তাদের ওপর কেবল লানত ও অপমানই আসতে থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামের বোলাস নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের মাথার ওপর আগুন জ্বলতে থাকবে এবং তাদেরকে জাহান্নামবাসীর মলমূত্র, ঘাম, কাশি ইত্যাদি খেতে দেয়া হবে" (সুনানে নাসায়ী জামে আত তিরমিজি)।
অহংবোধ বা অহংকার প্রদর্শন ব্যক্তির এক ঘুণে ধরা জীবনের প্রতিচ্ছবি। ঘুণে ধরা অবস্থা নিয়ে বসবাস করলে একসময় মড়মড় করে পতনের ধ্বনি শোনায় কিন্তু অহংবোধ জীবনের এমন এক ঘুণ যা জীবনকে এমন নিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে তখন আর পতনের ধ্বনি শোনা যায় না। মড়মড় শব্দ ছাড়াই সুন্দর একটি জীবনের পতন হয়ে যায়, যা আশপাশের সবাই দেখলেও অহংকারী ব্যক্তি দেখতে পায় না, উপলব্ধিও করে না। "অহংকার পতনের মূল, কলিজায় ধরে ঘুণ”- এই শ্লোগান একজন ব্যক্তির জীবনে ঠিক তখনই প্রতিফলিত হয় যখন অহংকার নামক এই ঘুণে ধরা অবস্থা নিয়ে ব্যক্তি তার আত্মার সমানতালে বসবাস করে। যেসব মানুষের অহংবোধ বেশি তাদের পৃথিবীটা ঠিক তেমনি অতি সঙ্কীর্ণ যেমনি তারা নিজেদেরকে বড় করে দেখে অন্যকে সঙ্কীর্ণ করে দেখে। অহংবোধের কারণে তাদের চালিকাশক্তি এতো কমে যায় যে তারা নিজেদের মধ্যেই আবর্তিত হয়, এরা বেশি দূর যেতেও পারে না, এগোতেও পারে না। একদিকে যেমন তারা নিজেদের বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারে না, অপরদিকে অন্যদেরকেও এগিয়ে যেতে দেয় না। ফলে অহংকারীর পৃথিবীতে গতিশীলতার পরিবর্তে নেমে আসে স্থবিরতা।
অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে বড় মনে করার মাধ্যমে নিজের মাঝে এক ধরনের মিথ্যা অনুভূতি জাগ্রত করে। এই মিথ্যা অনুভূতিই ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে অন্যায়, অনাচার সৃষ্টির। পবিত্র কুরআনে গর্ব, অহংকার ও দম্ভ না করার বিষয়ে স্পষ্ট সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, "তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই দম্ভভরে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনোই পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না” (সূরা বনি ইসরাইল: ৩৭)। নিজের আত্মপ্রশংসা করে নিজেকে যতই বড় ভাবা হোক না কেন নিজেকে পর্বত উচ্চতায় কখনোই উপনীত করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে নিজের ঢোল নিজে না পেটানোই কল্যাণকর। কারণ নিজে কত বড় তার জবাব অন্য কেউ দেবেন। আর আপনাকে যে বড় বলে সে বড় নয়। বরং লোকে যাকে বড় বলে সেই বড় হয়। কার কত বড়ত্ব তা মহান আল্লাহই ভালো জানেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "অতএব তোমরা আত্ম-প্রশংসা করবে না, কে মুত্তাকি এ সম্পর্কে তিনিই সম্যক জ্ঞাত" (সূরা নজম: ৩২)।
মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা, অবজ্ঞা করা, তাদের ঘৃণা করা, নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ মনোভাব পোষণ করা আর অন্যদের ছোট বা নিচু মনে করা, অন্যকে ছোট প্রমাণিত করার উদ্দেশ্যে নিজেকে জাহির করা, বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করা ইত্যাদি মনোভাব অহংকারের সূচনা করে। যখন মানুষ নিজেকে অনেক বড় মনে করে, নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করে, নিজেকে অন্য সবার চাইতে উত্তম মনে করে; আর এটাই তাকে উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহর সৃষ্টিকে ঘৃণা, অবজ্ঞা আর হাসিঠাট্টা করতে, যা প্রতীয়মান হয় তার কথা এবং কাজে। এই অহংকারের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “(অহংকারবশে) তুমি মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না; কারণ আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না" (সূরা লোকমান ১৮)। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, "একজন মুসলিমের জন্য এটা অনেক বড় একটি গুনাহের কাজ যদি সে তার অপর ভাইকে অশ্রদ্ধা বা অবজ্ঞার চোখে দেখে" (সহীহ্ মুসলিম)।
অধিক ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, জ্ঞান-গরিমা, মান-সম্মান, বংশমর্যাদা এবং উচ্চ পদমর্যাদা মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তোলে। অধিক ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। অথচ মানুষ তা ভুলে যায়। অহংকারের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রকার হলো ইলম তথা জ্ঞান-গরিমার অহংকার। মান-সম্মান, বংশমর্যাদা এবং উচ্চ পদমর্যাদা মানুষের মধ্যে অনেক সময় অহংকার সৃষ্টি করে। অথচ এগুলো মানবকল্যাণে অবদান রাখার বিষয়। পদমর্যাদা একটি কঠিন জবাবদিহিতার বিষয়। যিনি যত বড় দায়িত্বের অধিকারী, তাকে তত শক্ত জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, "মনে রেখ, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে" যে ব্যক্তি পদমর্যাদা বা দায়িত্ব পেয়ে অহংকারী হয় এবং পদের অপব্যবহার করে তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) এরশাদ করেন, " আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে লোকদের ওপর দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন, অতঃপর সে তার লোকদের সাথে খেয়ানতকারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার ওপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন। বংশমর্যাদা মানুষের উচ্চ সম্মানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মানদন্ড। এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, যতক্ষণ বংশের লোকেরা বিনয়ী ও চরিত্রবান থাকে। উক্ত দু'টি গুণ যত বৃদ্ধি পায়, তাদের সম্মান তত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যদি সেখানে কথায় ও আচরণে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়, তাহলে কচুপাতার পানির মতো উক্ত সম্মান ভূলুণ্ঠিত হয়।
মানুষ বহু পরিশ্রম করে সাফল্য অর্জন করে। এই সাফল্য অর্জনে সাধারণত শিক্ষক পিতা-মাতা, বন্ধু, সহকর্মীসহ অনেকের অবদান থাকে। কিন্তু অনেক সময় মানুষের অর্জিত সাফল্য ধ্বংস হয় অহংকারে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে অহংকারীরা সফল হবে না উল্লেখ করে বলা হয়েছে, "যারা নিজেদের নিকট কোনো দলিল না থাকলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাদের আছে শুধু অহংকার, যা সফল হওয়ার নয়। অতএব, আল্লাহর শরণাপন্ন হও; তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” (সূরা আল-মু'মিন: ৫৬)। প্রখ্যাত সাহাবী হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, "মানুষের ধ্বংসের প্রধান দু'টি লক্ষণ হচ্ছে অহংকার ও নৈরাশ্য” মানুষ যখন নিজের অর্জনটাকে বড় করে দেখে গর্ব প্রকাশ করে, নিজের মাঝেই অহংকারের পরিবেশ সৃষ্টি করে তখন তার সেই অর্জন ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষ তখনই অহংকারী হয় যখন তার মাঝে আত্মগরিমা জেগে ওঠে। শিক্ষকের চাইতে ছাত্র অনেক বেশি মেধাসম্পন্ন হতে পারে, তাই বলে শিক্ষককে ছোট ভাবলে আত্ম-অহংকার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ছাত্রের স্মরণ রাখা উচিত তার মেধা-যোগ্যতায় তার শিক্ষকেরই অবদান রয়েছে। পিতা-মাতার চেয়ে মান-মর্যাদায় বড়ত্বের অংশ ধরে অহমিকা প্রকাশের আগে সন্তানকে চিন্তা করা উচিত তার পিতা-মাতা তাকে জন্ম দিয়েছেন, লালন পালন করে বড় করেছেন। সন্তান যতই বড় হোক না কেন পিতা-মাতার ওপরে নিজেকে বড় মনে করা মানায় না। পতনের আগেই অহংকারী শাসকের মনে রাখা উচিত যেকোনো সময় তার পতন হতে পারে। যে জনগণ তাকে সমর্থন দিয়েছে, অপকর্মের কারণে সেই জনগণই তার ওপর যেকোনো সময় বিক্ষুব্ধ হতে পারে। সুপরিচিত ব্যক্তির অহংকার প্রকাশের আগে ভাবা উচিত কাদের কল্যাণে এই পরিচিতি। দায়িত্বশীল, কর্তৃত্বশীল ও ব্যক্তিত্বশীলকে অহংকারী হওয়ার আগে চিন্তা করা উচিত এ পর্যায়ে আসার পেছনে কার বা কাদের অবদান রয়েছে। যে সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে ব্যক্তির এত বড় অবস্থান, যে জনশক্তি কিংবা জনগণের কল্যাণে ব্যক্তির এত বড় সম্মান ও মর্যাদা সে কোনোভাবেই অহংকারী হতে পারে না। আর পূর্বাপর উপেক্ষা করে নিজের বড় হয়ে ওঠার সিঁড়িকে যদি কেউ অস্বীকার করে অহমিকা প্রদর্শন করে তারতো পতনই একমাত্র সমাধান।
📄 বিনয় নম্রতা ও সততা ধারণ করুন
উন্নত, সুন্দর এবং সাফল্যমণ্ডিত জীবন একজন ব্যক্তির কাছে অনেক আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। প্রতিটি ব্যক্তিই তার জীবনটাকে সুন্দর, উন্নত এবং সাফল্যমণ্ডিত দেখতে চায়। কেউ এমন প্রত্যাশিত জীবন গঠন করে, কেউ গঠন করতে পারে না। এমন জীবন গঠনের জন্য ব্যক্তির জীবনে বিনয়, নম্রতা ও সততার উপস্থিতি প্রয়োজন। কারণ ব্যক্তি যত বিনয়ী ও নম্র হয় জীবন তার তত উন্নত হয়। আর সততা জীবনটাকে অনেক সুন্দর করে সাফল্যমণ্ডিত করে। বিনয়, নম্রতা ও সততার উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির মর্যাদাও বাড়ে। এ প্রসঙ্গে অনুপম আদর্শের অধিকারী রাসূল (সা) বলেছেন, "যে আল্লাহর জন্য বিনয় দেখাল, তাকে তিনি অনেক উঁচুতে স্থান করে দেন" (মুসলিম)। মুসনাদে আহমদের এক হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, "আল্লাহপাকের জন্য যে যত বেশি নিচু হবে অর্থাৎ বিনয়ী হবে (এই বলে রাসূল সা: নিজের হাতকে মাটির দিকে নামিয়ে দেখালেন), আল্লাহপাক তাকে তত বেশি উঁচু করবেন (রাসূল সা: তার হাতের তালু ওপরের দিকে উঠিয়ে দেখালেন) অর্থাৎ মানুষের কাছে সম্মানিত করবেন"
বিনয়ের আসল অর্থ হচ্ছে সত্যকে দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে নেয়া। এর আরেকটি অর্থ নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা। প্রখ্যাত মনীষী হজরত হাসান বসবি (রহ:) বলেছেন, নিজের ঘর থেকে বের হওয়ার পর যেকারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তাকে নিজের চেয়ে ভালো এবং নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করার নামই বিনয়। মানুষের জীবনে যত উত্তম গুণাবলি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম উত্তম গুণ হলো বিনয় ও নম্রতা। বিনয় ও নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ। এই বিনয় ও নম্রতা দ্বারা মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। পারে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে। পরম শত্রুকেও বিনয় ও নম্রতা দ্বারা বশে আনা যায়। একদিন খোতবা পাঠের সময় মিম্বরে দাঁড়িয়ে হজরত ওমর (রা) বলেন, "হে মানুষ তোমরা নম্র হও, কেননা আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি যে, যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী ও নম্র হয় আল্লাহ তাকে সাফল্যমণ্ডিত করেন”
অন্যকে জয় করার সহজ পথ হলো বিনয়, নম্রতা ও সততা। বিনয়, নম্রতা ও সততা দিয়ে সহজেই অন্যের হৃদয় জয় করা যায়, অন্যকে কাছে টানা যায়- যার মূর্ত প্রতীক হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবারা। বিনয় ও নম্রতা দ্বারাই তারা মানুষকে আপন করে নিয়েছেন। বিনয়ী ব্যক্তিকে আল্লাহ যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও তাকে ভালোবাসেন। এ সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে- তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আল্লাহ স্বয়ং নম্র, তাই তিনি নম্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি কঠোরতার জন্য যা দান করেন না; তা নম্রতার জন্য দান করেন। নম্রতা ছাড়া অন্য কিছুতেই তা দান করেন না” (মুসলিম)। যে আল্লাহর উদ্দেশে বিনয়ী হয় আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, "যারা তোমার অনুসরণ করে সেসব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও” (সূরা আশ্-শুআরা: ২১৫)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল এবং তার সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফিরদের প্রতি বজ্রকঠোর। আর নিজেরা নিজেদের প্রতি বড়ই করুণাশীল বা বিনয়ী” (সূরা আল ফাতহ ২৯)। আল্লাহ তায়ালা সূরা আল মায়েদার ৫৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের দীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ আরও অনেক লোক তৈরি করবেন; যারা হবে আল্লাহর প্রিয় এবং আল্লাহ হবেন তাদের প্রিয়। যারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর” মহান আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, “তারাই তো আল্লাহর প্রকৃত বান্দা যারা জমিনে নম্রতার সঙ্গে চলাফেরা করে। আর যখন মূর্খ লোকেরা তাদের সঙ্গে আল্লাহর বিষয়ে তর্ক করে তখন তারা বলে দেয় তোমাদের প্রতি সালাম” (সূরা আল ফুরকান: ৬৩)।
বিনয় ও নম্রতার পাশাপাশি সততাকে ধারণ করা আবশ্যক। কারণ যে সততাকে ধারণ করে সে বিনয়ী ও নম্র হয় এবং সে জীবনে বড় হয়, সাফল্যের অধিকারী হয়। বিনয়, নম্রতা ও সততা- এগুলো মহৎ গুণ। এ গুণে গুণান্বিতরা মহৎ হয় বলেই সমাজে তাদের আসন সুউচ্চে। বিনয় নম্রতাকে সাথে নিয়ে সত্যের লালন মানবজীবনের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ীরাই সাফল্যের সন্ধান পায়। এই চ্যালেঞ্জে উপনীত হওয়ার জন্যই জীবনের প্রতিটি দিনে প্রতিটি ক্ষণে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে সত্যকে লালন করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা। যিনি যত বেশি এই সার্থকতাকে অর্জন করতে পেরেছেন তিনি তত বেশি সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেকে রাঙিয়েছেন, জগৎ রাঙিয়েছেন। সততার ওপর জীবন পরিচালনা করা শুধুমাত্র সুসময়ের অনুসরণীয় কাজ নয় বরং প্রতিকূল অবস্থায়ও একে ধারণ করার মধ্যেই রয়েছে বিরাট সার্থকতা। প্রতিকূল মুহূর্তে সততাকে ধারণ করে দুঃসময়কেও প্রতিহত করা যায়।
বিনয়, নম্রতা এবং সততার লালন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের মানুষের জন্য নির্ধারিত নয়, বরং এগুলো প্রত্যেক ধর্মের, প্রত্যেক জাতির মানুষের নৈতিকতার সাথে জড়িত। সাফল্য অর্জনকারী মানুষ এই গুণগুলোকে যদি ধারণ করতে না পারেন তাহলে তিনি সাময়িক সফল হতে পারেন কিন্তু নৈতিকতাবোধসম্পন্ন সফল মানুষ হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। অসৎ পথে, অসৎ পদ্ধতিতে সাফল্য অর্জনের চেয়ে হেরে যাওয়া অনেক ভালো, সম্মানের সঙ্গে হেরে গেলে নিজের অভাব বা দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পরীক্ষায় নকল করে পাস করার চেয়ে ফেল করাই অনেক ভালো নয় কি? কারণ ফেল করার কারণ খুঁজে বের করে নিয়ে পরবর্তী প্রস্তুতি দিয়ে দুর্বল বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ হওয়াটাই মূল সফলতা। নকল করে সাময়িক সাফল্য অর্জিত হতে পারে, কিন্তু যখন কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগ শুরু হবে তখন ব্যর্থতার গ্লানি সেই পাস করা সাফল্যকে ধুয়ে মুছে মলিন করে দেবে। তখন আফসোস করা ছাড়া কোনো উপায়ই থাকবে না।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন বিনয়, নম্রতা, সততা ও নৈতিকতা- এগুলো পুরাতন কাসুন্দি। আধুনিক সমাজে এসব অচল। প্রকৃত পক্ষে ইতিহাসের সময় ও সভ্যতার এমন ঘটনা জানা নেই যখন এই মূল্যবোধগুলোকে অস্বীকার করে কেউ সফল হয়েছে। একজন সফল ব্যক্তি তাকেই বলা যায় যার মাঝে দয়া, সাহস, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতার পাশাপাশি বিনয়, নম্রতা, সততা ও নৈতিকতার গুণ থাকে। আমরা অনেক সময় সততাকে পদদলিত করে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করি। একটি মিথ্যাকে ঢাকার জন্য আরেকটি মিথ্যা বলি। কারো কারো ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক অভ্যাসেও পরিণত হয়। তখন তার কাছে সততার পরিবর্তে মিথ্যাই মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মিথ্যার এই হাতিয়ার শুধুমাত্র ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না বরং সমাজ জীবনে বিপর্যয়ও ডেকে আনে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তোমরা মিথ্যার সঙ্গে সত্যের মিশ্রণ করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না" (সূরা বাকারা : ৪২)। সততা ব্যক্তিকে উন্নত করে, মর্যাদাবান করে তোলে, শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করে, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কেউ হয়তো সাময়িক উন্নতি করে কিন্তু সত্যের আলো উদ্ভাসিত হলে সাফল্যের চূড়া থেকে তার মুহূর্তেই পতন ঘটে। তাই ছোটখাটো মিথ্যাও পরিত্যাগ করা উচিত, কেননা মিথ্যা আরো মিথ্যার জন্ম দেয়। সাফল্য অর্জনে সততা অবলম্বন করাই উত্তম ব্যবস্থা। নকল করে পরীক্ষায় হয়তো কতকার্য হওয়া যায়, ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়। কিন্তু জীবনের যে সাফল্য সেই সাফল্য অর্জন করা যায় না। তাইতো বলা হয়ে থাকে Honesty is the best policy |
আমাদের আচরণ ও ব্যবহার আমাদের চিন্তা, চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। আমি যে সাফল্য অর্জনের পেছনে ছুটে চলতে গিয়ে আমার ঘাম, শ্রম, পরিশ্রম ঢেলে দিচ্ছি, সেই পথ চলায় যদি আমি বিনয়, নম্রতা ও সততাকে ধারণ না করি তাহলে আমার অর্জিত সাফল্য হবে ঐ বৃক্ষের ন্যায় যেই বৃক্ষে তার ডাল-পালার চেয়ে আগাছাই শক্তিশালী। কার্যত আমার অর্জিত সাফল্য হবে তখন মিথ্যাশ্রিত, বিনয় নম্রতাহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ইমাম শাফেয়ি (রহ) বলেছেন, বিনয়, নম্রতা সত্যিকার মানুষের লক্ষণ আর অহঙ্কার, ধৃষ্টতা মন্দ লোকের আচরণ। হজরত আবু বকর (রা) বলেন, "বিনয়, নম্রতা গরিবের জন্য একটা উত্তম অভ্যাস, কিন্তু ধনীর বিনয় উচ্চস্তরের চরিত্রবিশেষ"