📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫০ খ্রি.)

📄 মধ্যযুগ (৮০০-১৪৫০ খ্রি.)


ইউরোপের ইতিহাসের দ্বিতীয় যুগ হচ্ছে মধ্যযুগ (Middle Ages)। অন্ধকার যুগের পরিভাষার মতো মধ্যযুগের পরিভাষার ব্যাপারেও অনেক মতানৈক্য রয়েছে। এই পরিভাষাকে ইউরোপের সেক্যুলার ঐতিহাসিকরা ব্যবহার করে। তাদের নিকট এই যুগটি খ্রিষ্টানদের উত্থানের যুগ এবং এই সময়ে বাদশাহ ও গির্জার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। এই যুগেই খ্রিষ্টানরা ক্রুসেড যুদ্ধের মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করে নেয় এবং স্পেনের অনেক অঞ্চল মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নেয়। অপরদিকে গির্জার খারাপ কাজের কারনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার ফলে গ্রিক দর্শনের মতাদর্শগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেতে থাকে, যা ছিল সেক্যুলার ঐতিহাসিকদের নিকট মানুষের অন্ধকার যুগ থেকে আলোকিত যুগের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই যুগে তাদের ধর্মহীন চিন্তার শিকড় খুব কঠিনভাবে গেড়ে বসে এবং এই যুগকে ইউরোপে রেনেসাঁ (Renaissance) ও এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) আন্দোলনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গণ্য করা হয়। কিছু সেক্যুলার ঐতিহাসিক এই পরিভাষাকে বিপরীত অর্থে ব্যবহার করে। আর তা হচ্ছে, এটা ওই হাজার বছরের এক ইতিহাস, যা হিউম্যানিজম (Humanism) আন্দোলনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মোটকথা আধুনিক যুগের চিন্তাগত ভিত্তি বোঝার জন্য ইউরোপের মধ্যযুগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের সবচেয়ে বড় ফিতনা মানবাধিকার (Human Rights) আন্দোলন ও গণতন্ত্রের অভ্যুত্থান সেই যুগেই হয়েছিল। এগুলো ছিল গির্জা ও বাদশাহদের সেই শাসনব্যবস্থার বিরোধী প্রতিক্রিয়া, যা সেন্ট অগাস্টিনের দর্শন অনুযায়ী 'আল্লাহ তাআলার হুকুমত ও মানুষের হুকুমত' এই থিউরির মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিল। তাই আমাদের জন্য এই বিষয়গুলো খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা আবশ্যক।
এই যুগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইউরোপের মধ্যে সেক্যুলারিজম দ্বিতীয়বার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা। যা পরবর্তী সময়ে গির্জা ও বাদশাহদের শাসনব্যবস্থাকে পরাজিত করে।
এই যুগের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ব্ল‍্যাক-ডেথ বা সেই মহামারি, যা পুরো ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ আবাদি খতম করে দেয়। ফলে ইউরোপীয় সমাজগুলো কৃষি শিল্প ত্যাগ করে অন্য কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা ইউরোপের সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে বিশাল পরিবর্তন সৃষ্টি করে, যা আস্তে আস্তে কোম্পানি-ভিত্তিক বাণিজ্য ও নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয় এবং ফরাসি বিপ্লবের পর এটা পুঁজিবাদী সিস্টেমে পরিবর্তন হয়ে আজ আমাদের মাথার ওপর চেপে বসেছে। অপরদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও উন্নতির ধাপ পাড়ি দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের পর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিচালনাকারী সংবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয়ত, এই যুগেই ক্রুসেড যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দুইশ বছর চলমান ছিল।
যেহেতু এই সবগুলোর সাথে বর্তমান জিহাদের চিন্তাগত ভিত্তিগুলো বোঝার সাথে গভীর সম্পর্ক আছে। তাই আমাদের চেষ্টা থাকবে এই যুগে সংঘটিত ঘটনা ও কার্যক্রমগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা।
সেন্ট অগাস্টিনের থিউরি (আল্লাহর শহর ও মানুষের শহর)
যেমনটা আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি, পঞ্চম শতাব্দীতে ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তা টুকরা টুকরা হয়ে যায়। যেহেতু রোমান বাদশাহরা গির্জার সংরক্ষণকারী হিসেবে গণ্য হয়, তাই সেই সাম্রাজ্যের পতনের ফলে পশ্চিমা খ্রিষ্টানরা ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় এবং সেই অবস্থাতেই সেন্ট অগাস্টিন—যে রোমান গির্জার পাদরি ছিল—৪১৫ সালে 'আল্লাহর শহর ও মানুষের শহর' এই প্রসিদ্ধ মতাদর্শ পেশ করে। সেন্ট অগাস্টিনের এই থিউরি গির্জা, বাদশাহ ও জনগণের মাঝে পারস্পরিক দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করে। ইউরোপের অন্ধকার যুগে এই শাসনব্যবস্থার ভিত্তি রাখা হয় এবং মধ্যযুগে এই শাসনব্যবস্থা উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। এটাই ছিল সেই শাসনব্যবস্থা, যাকে আজকের ঐতিহাসিকগণ ইউরোপের ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার বলে থাকে। সামনে আমরা এই শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
সেন্ট অগাস্টিনের পেশকৃত থিউরিতে চারটি অংশ ছিল:
• গির্জা
• বাদশাহ
• জাগিরদার
• জনসাধারণ
অগাস্টিনের থিউরি অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের বিশ্ব বানিয়েছেন। একটি চিরস্থায়ী দুনিয়া, যেখানে মৃত্যুর পর সমস্ত মানুষ চিরকাল থাকবে এবং অপরটি পারিপার্শ্বিক দুনিয়া, যেখানে আজ মানুষরা রয়েছে। চিরস্থায়ী দুনিয়াতে শুধু আল্লাহ তাআলাই হুকুমত চলে এবং সেখানে থাকার মর্যাদা অর্জন করাই মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সেই চিরস্থায়ী দুনিয়ার সম্পর্ক মানুষের রুহের সাথে। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সম্পর্ক মানুষের শরীর ও তার প্রয়োজনাদির সাথে। পৃথিবীতে থাকা গির্জাগুলোর সম্পর্ক মূলত চিরস্থায়ী দুনিয়ার সাথে। মূল গির্জা হচ্ছে আসমানে অবস্থিত আল্লাহ তাআলার ঘর, সেই গির্জার প্রধান হচ্ছেন ঈসা আলাইহিস সালাম। জমিনের গির্জার পাদরি ও রাহিবরা রুহানিভাবে আসমানি গির্জার সাথে সম্পৃক্ত। অগাস্টিনের মতানুযায়ী ঈসা আলাইহিস সালাম সেই চিরস্থায়ী দুনিয়ার গির্জার প্রধান এবং দুনিয়ার বাকি গির্জাগুলো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মতো। মাথা ও শরীরের মধ্যকার যেমন সম্পর্ক, ঈসা আলাইহিস সালাম ও পাদরিদের মধ্যে তেমনই সম্পর্ক।
এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে গির্জাই চিরস্থায়ী দুনিয়ায় আল্লাহ তাআলার হুকুমতের প্রতিনিধি, জমিনের মধ্যে যা রোমে অবস্থিত। গির্জা ও পোপরা এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে শাসন পরিচালনা করে। যেই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়, তারা আল্লাহ তাআলার হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে পাদরি, বিশপ ও রাহিব। তারা আল্লাহর শহরে বসবাস করে। তাই আজও রোমের গির্জার শহরকে ভ্যাটিকান বা আল্লাহর শহর বলা হয়। আল্লাহ তাআলার এই হুকুমতের বাইরে হচ্ছে মানব-হুকুমত। কিন্তু মানুষের হুকুমতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, তারা আল্লাহর হুকুমত থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মনমতো চলবে; বরং মানুষের হুকুমত আল্লাহ তাআলার হুকুমতেরই আনুগত্য করে চলবে। গির্জার পাদরিরাই বাদশাহকে জনগণের ওপর শাসন করার আল্লাহ- প্রদত্ত ক্ষমতা প্রদান করত। এই ক্ষমতা প্রদানের পরেই সে জনগণের বৈধ শাসক হিসেবে গণ্য হতো। তাই বৈধ শাসক সে-ই হতো, যাকে গির্জার পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হতো। আর সমস্ত জনগণকে এই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হতো। বাদশাহদের কাজ হতো, নিজের অধীন জনগণকে এই বিশ্বাস অনুযায়ী পরিচালিত করা।
শুরুতে গির্জা দুভাগে বিভক্ত ছিল। একটি পূর্বাংশ, যার কেন্দ্র ছিল কনস্টান্টিনোপল, যার প্রধানকে বিশপ বলা হয়। অপরদিকে পশ্চিমাংশের কেন্দ্র ছিল ইতালির রোম, যার প্রধান পাদরিকে পোপ বলা হতো। যেহেতু খ্রিষ্টানদের উত্থান পূর্বাংশ থেকে হয়েছিল, তাই মহা বিশপকে বড় ও রোমের পোপকে দ্বিতীয় অবস্থানে গণ্য করা হতো। পশ্চিমে খ্রিষ্টানদের উত্থানের ফলে রোমের পোপের পাল্লাও ভারী হয়ে যায়। আস্তে আস্তে পূর্বাংশের গির্জা ও পশ্চিমের গির্জার মধ্যে মতানৈক্য হয়ে দুটাই একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। কনস্টান্টিনোপলের গির্জা অর্থডক্স খ্রিষ্টানদের কেন্দ্র হয়ে যায় এবং রোমের গির্জা ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এভাবেই খ্রিষ্টানরা দুই দলে ভাগ হয়ে যায়।
পোপ ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ পিতা। এটি খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি উপাধি হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। যা রোমের বড় পাদরির জন্য নির্দিষ্ট। খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, মাসিহের সাথে তার কিছু প্রিয় বান্দার সর্বদা কথা হয়, যাদের কথা ও কাজ আমাদের জন্য হুজ্জত বা দ্বীনের উৎস। যেহেতু তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বুজুর্গ ব্যক্তিকে গির্জার প্রধান হিসেবে নির্বাচন করা হতো, তাই প্রধান পোপের আদেশকে আল্লাহ তাআলার আদেশ হিসেবে মান্য করা হতো। খ্রিষ্টানদের পরিচালনা করার পরিপূর্ণ ক্ষমতা রোমের ক্যাথলিক গির্জার হাতেই ছিল। তাদের সর্বোচ্চ হাকিমিয়্যাহ বা বিধানদাতার বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির স্বাভাবিক চাহিদা এই ছিল যে, বাদশাহ ও জাগিরদারদের সমস্ত শক্তি গির্জার সম্মান ও পোপের আনুগত্যে ব্যয় করবে।
গির্জার শাসনব্যবস্থা ও বাদশাহর অবস্থান
যেহেতু খ্রিষ্টানদের নিকট মানুষের ক্ষমতা স্বাধীন ক্ষমতা নয়; বরং গির্জার অধীনে পরিচালিত; তাই বাদশাহ গির্জার প্রণীত সিদ্ধান্তের অধীনেই শাসন পরিচালনা করতে বাধ্য। ৯ম শতাব্দীতে চার্লিম্যানই প্রথম বাদশাহ, যে সরকারীভাবে রোমের পোপ গ্রেগোরির হাতে মুকুট পরিধান করে এবং সারা জীবন গির্জার বিজয়ের পথে ব্যয় করে। সে রোমের পোপের আদেশে অনেক মুশরিক গোত্রকে খ্রিষ্টান বানায় এবং তার যুগে ইউরোপে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য বা হোলি রোমান এস্প্যায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টানরা সর্বপ্রথম তার যুগেই ইংল্যান্ডে পৌঁছে এবং দশম শতাব্দীতে এই রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা জার্মান জাতির হাতে চলে যায়। যারা তাদের শাসনের যুগে এই সাম্রাজ্যকে অনেক শক্তিশালী করে। এমনকি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের পুরো এলাকাতে এর সীমানা ছড়িয়ে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্য সেন্ট অগাস্টিনের সংবিধানকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হোলি রোমান এস্প্যায়ারের শাসন দুর্বল হতে থাকে এবং কয়েকটি অংশে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। তা সত্ত্বেও ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত এই সমস্ত সাম্রাজ্য গির্জার আনুগত্যশীল ছিল।
সপ্তদশ শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে ৩০ বছরের দীর্ঘ এক যুদ্ধ হয়, যা ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির দ্বারা শেষ হয়। এই চুক্তির ফলে ইউরোপে নতুন নতুন স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। যার মধ্যে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মান, বেলজিয়াম ও ইতালি অন্তর্ভুক্ত। এগুলোই ছিল আজকের নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। পরবর্তী সময়ে যখন ধর্মহীনতার ফিতনা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং হিউম্যানিজম বা মানবাধিকার আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এই রাষ্ট্রগুলোকে বৈধ রাষ্ট্র বানিয়ে দেওয়া হয় অর্থাৎ এই রাষ্ট্রগুলো নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই রাষ্ট্রগুলোতে হোলি রোমান এস্প্যায়ারের ছাপ স্পষ্ট ছিল। সর্বশেষ ১৮০৬ সালে ফ্রান্সের বাদশাহ নেপোলিয়ন এই নিদর্শনকেও নিঃশেষ করে দেয়। যার আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
গির্জার শাসনে দুর্নীতি
ইউরোপে এক হাজার বছর যাবৎ আল্লাহর হুকুমত ও মানুষের হুকুমতের শাসনব্যবস্থা চলমান ছিল। কিন্তু সেখানে দুর্নীতি ছিল অনেক বেশি। গির্জা যেহেতু রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র ছিল, তাই যেমনিভাবে ইউরোপে বাদশাহ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোমান পোপদের বিশেষ ভূমিকা ছিল, তেমনিভাবে ইউরোপের প্রত্যেক বাদশাহও চাইত, যাতে তার ইচ্ছানুযায়ী নতুন পোপ নির্বাচন করা হয়। অপরদিকে প্রত্যেকটা বাদশাহর কাছে গির্জার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি পাঠানো হতো, যাকে রোমের গির্জার প্রতিনিধি বলা হতো। প্রত্যেক বাদশাহর ইচ্ছা ছিল, তার কাছে পাঠানো প্রতিনিধি তার ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারিত হবে। আর এভাবে বাদশাহ ও গির্জার মধ্যকার চাহিদাগুলোই তাদের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার অনেক উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব
ইউরোপের গির্জা ও বাদশাহদের মধ্যে বিজয়ী সে-ই হতো, যে অধিক শক্তিশালী হতো। যখন রোমের পোপ শক্তিশালী হতো, তখন সে বিজয়ী হতো এবং কখনো বাদশাহ শক্তিশালী হলে সে বিজয়ী হয়ে যেত। এই ঝগড়া রোমান সাম্রাজ্য ও নতুন পোপ নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্য যেহেতু মজবুত ছিল, তাই তারা পোপ নির্বাচনে প্রভাব ফেলত। গির্জার কার্যক্রমে বাদশাহদের অনুপ্রবেশের ফলে রোমের পোপরা অনেক অসন্তুষ্ট থাকত। অতঃপর হেনরি প্রথম যখন রোমান সাম্রাজ্যের বাদশাহ হয়, তখন সে ছিল বাচ্চা। তখন এর সুযোগ নিয়ে রোমের গির্জা বাদশাহদের পক্ষ থেকে পোপ নির্বাচনে অনুপ্রবেশকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ হিসেবে বলা হয়, এটি একটি নিছক ধর্মীয় বিষয়; তাই এতে অধর্মীয় ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের কোনো অনুমতি নেই। এর পরিবর্তে পোপ নির্বাচনের জন্য দশজন পাদরির একটি কমিটি গঠন করা হয়। হেনরি বড় হওয়ার পর সে পোপদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বসে। কিন্তু এই বিরোধিতার জবাবে পোপরা তার থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার ফরমান দেয়। ফলে জনগণ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার ছেলেকে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। ১১২২ সালে গির্জা ও বাদশাহদের মাঝে একটি চুক্তির মাধ্যমে দশ জনের কমিটিকে মেনে নেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত এই কমিটিই পোপ নির্বাচন করে।
গির্জা ও বাদশাহদের মধ্যে দ্বন্দ্বের দ্বিতীয় উদাহরণ পোপ বোনিফেস ও ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ দ্যা ফ্যায়ারের লড়াই। রোমের পোপ বোনিফেস ইউরোপের বাদশাহদেরকে এই ফরমান পাঠায় যে, মানুষের হুকুমতের প্রত্যেক সদস্যকে কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর হুকুমতের অধীন করে দেওয়া হোক। ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ এমনটা করতে অস্বীকার করে। ফলে রোমের পোপ ফিলিপ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু ফিলিপ ছিল শক্তিশালী বাদশাহ। সে ১৩০৩ সালে পোপ বোনিফেসকে গ্রেফতার করে; কিন্তু তিন দিন পর ছেড়ে দেয়। এই সমস্যা ছয় মাস পর পোপের মৃত্যুতে শেষ হয়। কিন্তু গির্জা ও বাদশাহর দ্বন্দ্ব চলমান থাকে এবং একসময় ফ্রান্সের বাদশাহ গির্জাকে রোম থেকে সরিয়ে ফ্রান্সের এভিগনন (Avignon) শহরে স্থানান্তরিত করে ফেলে। ফলে প্রায় একশ বছর পর্যন্ত রোমের পোপ ফ্রান্সের বাদশাহদের অধীনে থাকতে বাধ্য হয়। গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্বের প্রমাণ 'মেঘনা কার্টা' (Megna Carta) প্রসিদ্ধ চুক্তি থেকেও দৃষ্টিগোচর হয়, যা জনগণ ও ব্রিটেনের বাদশাহ কিং জনের (King John) মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল। এই চুক্তিতে গির্জা জনগণের সাথে ছিল। এই চুক্তির প্রথম অংশ ছিল বাদশাহ গির্জার কার্যক্রমে অনুপ্রবেশ করবে না। ইংল্যান্ডের বাদশাহ দ্বিতীয় হেনরির হাতে গির্জার প্রতিনিধি (Thomas Becket) থমাস বেকেটের হত্যা এই দ্বন্দ্বের একটি উদাহরণ। প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধে জেরুজালেমের পাদরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব সামনে আসে। ইউরোপের পুরো ইতিহাস এই সমস্ত উদাহরণে ভরপুর। এই সমস্ত দ্বন্দ্বে জনগণ গির্জা ও বাদশাহদের চাপে পিষে মরছিল।
গির্জা ও বাদশাহদের দ্বন্দ্ব ছাড়াও গির্জার অভ্যন্তরীণ অনেক দুর্নীতি ছিল। গির্জার রাহিবদের মধ্যে অনেক চারিত্রিক নোংরামি ছিল। ইতিহাসে পাদরি ও রাহিবদের অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের অনেক ঘটনা আছে। এ ছাড়াও দানের সম্পদ নিজেদের স্বার্থে খরচ করা, এই সম্পদ দ্বারা পাদরিদের আলিশান জীবনযাপন একটি প্রসিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।
সর্বশেষ গির্জার ইতিহাসে 'মাফনামা' বণ্টন অনেক বড় দুর্নীতি হিসেবে সামনে আসে। পোপ ইনোসেন্ট দ্বিতীয় এই নীতি তৈরি করে যে, কেউ যদি গির্জায় বড় ধরনের দান করে বা কোনো গির্জা বানিয়ে দেয়, তাহলে গির্জা থেকে তাকে মাফনামা দেওয়া হবে। যার অর্থ এই ব্যক্তি যত অপরাধ করুক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। তা ছাড়া সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি বদনাম সেই আদালতগুলো নিয়ে হয়েছিল, যা 'ইনকুইজিশন' নামে প্রসিদ্ধ। এই আদালত থেকে ইউরোপ ও স্পেনের মুসলিমরাসহ অনেক খ্রিষ্টানও রক্ষা পেত না। সামান্য থেকে সামান্য কারণে বা গির্জার কোনো কিছুর বিরোধিতা করলেই সাথে সাথে তার ওপর ধর্মত্যাগের মুকাদ্দামা চালানো হতো এবং তাকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। স্পেনের অসংখ্য মুসলিমকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ইহুদি এবং প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানও এই আদালতের বলি হয়।
গির্জার মধ্যে বিভক্তি (১০৫৪ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১০৫৪ সালের রোমান ক্যাথলিক ও কনস্টান্টাইনের মধ্যে বিশাল বিভক্তি (Great Schism)। এই বিভক্তির কারণ ছিল একই সাথে বিশ্বাসগত, বংশীয় ও রাজনৈতিক। বিশ্বাস কেন্দ্রিক মতানৈক্য ছিল বাপ, ছেলে ও রুহুল কুদ্দুসের অবস্থান নিয়ে। বংশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্তি ছিল পূর্ব দিকের গির্জা ইউনানি ও পশ্চিমের গির্জা ইতালিয়ান হওয়াকে কেন্দ্র করে। রোমান সাম্রাজ্য প্রথম থেকেই দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে ইউরোপে দুটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব ইউরোপে অর্থডক্স খ্রিষ্টানদের অধীনে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় এবং পশ্চিম ইউরোপে গৃহযুদ্ধের পর বাদশাহ চার্লিম্যানের হাতে রোমান ক্যাথলিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
পূর্ব দিকের গির্জাগুলো অর্থডক্স নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যাদের কেন্দ্র ছিল কনস্টান্টিনোপল। আজও তুর্কি, শাম, লেবানন, আর্মেনিয়া, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বসবাসকারী খ্রিষ্টানরা অর্থডক্স গির্জার অনুসরণ করে। অন্যদিকে পশ্চিম দিকের গির্জাগুলো রোমান ক্যাথলিক নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যাদের কেন্দ্র ইতালির রোম শহর। এদের সবার প্রধান ছিল পোপ। রোম শহরে ১১০ একর জায়গা আলাদা করা হয়, যার নাম ভ্যাটিকান সিটি। যাকে ১৯২৯ সালে ইতালির প্রশাসন পোপদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য রোমের পোপের অধীনে স্বাধীন পোপীয় রাষ্ট্র ঘোষণা করে দেয়। ভ্যাটিকান সিটি এখনো পশ্চিমা বিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এই ধর্মের অনুসারী ইউরোপ ও আমেরিকাতেও পাওয়া যায়।
খ্রিষ্টানদের বিভক্তির দুইশ বছর পর রোমের পোপ দুই দলের মধ্যে ঐক্য করার চেষ্টা করে এবং তাতে কিছু সফলতাও অর্জন করে। কিন্তু এই চেষ্টায় পানি ঢেলে দেওয়া হয়, যখন চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধে ক্রুসেডার সেনারা জেরুজালেম বিজয়ের জন্য বের হওয়ার পর সম্পদের ঘাটতি শুরু হয়। নিজেদের এই সমস্যা দূর করার জন্য ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলের ওপর হামলা করে এবং সেখানে অনেক লুটপাট করে। উগ্রতার শিকার হয়ে সেখানের অর্থডক্স দলের সবচেয়ে বড় গির্জা আয়া সুফিয়াকে অসম্মানিত করে। তাদের প্রধান পাদরির সামনে বসে নাচ-গান করে। এই ঘটনার ফলে এই দুই দল আর কখনোই একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারেনি।
ইউরোপের শ্রেণি বিভাজনব্যবস্থা (জাগিরদার বনাম জনগণ)
যখনই জাগিরদারি ব্যবস্থার আলোচনা করা হয়, তখনই আমাদের সামনে জালিম জাগিরদারদের ছবি ভেসে ওঠে। যে নিজের খেত-খামারে মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে খাটায়; কিন্তু তাদের অসুস্থ বাচ্চার জন্য টাকা দেয় না বা তাদের যুবতি মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো জাগিরদারি ব্যবস্থার একটি দিক; কিন্তু এর মূল অংশটি মানুষের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য।
জাগিরদার ব্যবস্থা হচ্ছে, আঞ্চলিকভাবে জনগণের শৃঙ্খলা-বিন্যাস পরিচালনার সবচেয়ে পুরাতন সিস্টেম, যা বাদশাহরা জনগণকে পরিচালনা করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই ব্যবস্থা অনেক ইসলামি অঞ্চলেও প্রচলিত ছিল। এই ব্যবস্থা খ্রিষ্টান ইউরোপ, রাশিয়া, পূর্ব চীন ও হিন্দুস্থানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই ব্যবস্থা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি সময় যাবৎ প্রচলিত ও সবচেয়ে সফল ব্যবস্থা। তবে জেনে রাখা উচিত যে, এই ব্যবস্থার ভিত্তি, নীতিমালা ও পদ্ধতি প্রত্যেক এলাকা ও বাদশাহর ভিন্নতায় ভিন্ন হয়ে থাকে। যেখানে এই ব্যবস্থায় বা জাগিরদারের ক্ষমতায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল কিংবা বাদশাহরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তখন জাগিরদাররা নিজেরাই সেই এলাকার বাদশাহ হয়ে যেত এবং তাদের জুলুম ও নির্যাতন চরম আকার ধারণ করত, যা আজও ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে। বাদশাহ ও জাগিরদারদের এই জুলুমের ফলেই জনগণের মধ্যে সেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, যা ইউরোপে মানবাধিকার আন্দোলনের জন্ম দেয় এবং সেটাই পরবর্তী সময়ে বর্তমান গণতন্ত্রের আকৃতি ধারণ করে। তাই আমরা মনে করি, বর্তমান জিহাদের চিন্তাগত ভিত্তি বোঝার জন্য মুসলিমদেরকে জাগিরদার ব্যবস্থাকে বিস্তারিত বোঝা জরুরি।
জাগিরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাদশাহদের তিনটি বড় উদ্দেশ্য ছিল। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল জনগণ থেকে অর্থনৈতিক সেবা গ্রহণ করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল এলাকার শৃঙ্খলা-বিন্যাস পরিচালনা করা এবং তৃতীয় উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা। পূর্বের জমানার জনগণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এই কৃষি কাজ ফসলি জমিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই বাদশাহ যখন কাউকে কোনো এলাকার পরিচালনার জিম্মাদারি দিত, তখন ফসলি জমির বিশাল অংশ তাকে দিয়ে দেওয়া হতো। অতঃপর জাগিরদাররা এই ভূমির ফসল ও আমদানি দ্বারা এলাকার শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করত।
এই ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হতো ভূমির মালিকানা নিয়ে। এই ভূমি বাদশাহ জাগিরদারকে তার ব্যক্তি মালিকানাধীন বানিয়ে দেবে, নাকি এই ভূমির মালিকানা প্রশাসনের হাতে থাকবে এবং জাগিরদার শুধু তার ব্যবস্থাপক হবে? প্রথম অবস্থাতে জাগিরদারকে যখন জমিনের মালিকানা দেওয়া হতো, তখন সেই জাগিরদার অনেক শক্তিশালী হয়ে যেত এবং একসময় তার সন্তানরা সেই এলাকার বাদশায় পরিণত হতো।
ইউরোপের ইতিহাসে বাদশাহদের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ছিল জাগিরদারকে ভূমির ব্যক্তিগত মালিক বানিয়ে দেওয়া। মালিক হয়ে যাওয়ার ফলে ইউরোপের জাগিরদারদের আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি হয়ে যায়। যা আস্তে আস্তে এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে, তারা জনগণকে নিজেদের গোলাম বানিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে মুসলিমরা এই ব্যবস্থাকে ভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালনা করত। ভূমি দেওয়ার সময় বাদশাহ জাগিরদারদের মালিকানা ও সরকারী মালিকানার ভূমি আলাদা করে দিত। জমিনের যেই অধিকাংশ অংশ দ্বারা এলাকার কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেটা সরকারী মালিকানাধীন থাকত। যার ফলে বিশেষ শ্রেণি ও জনগণের মধ্যে অতিরিক্ত পার্থক্য তৈরি হতো না। অপরদিকে ইসলামি এলাকাগুলোতে শরিয়াহ বাস্তবায়িত ছিল এবং জাকাত-উশরের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ভূমির মালিক ও কৃষকের মাঝে স্পষ্ট ন্যায়-ভিত্তিক শরয়ি নীতিমালা ছিল; যার ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিত না।
মুসলিমদের অঞ্চলেও জাগিরদারির অস্তিত্ব ছিল। জাগিরদার ব্যবস্থা বিকৃত হয়ে জুলুমের আকৃতি ধারণ করে, যখন তারা দ্বীনের বিধান বাস্তবায়ন ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের খ্রিষ্টানদের কাছে কোনো শরিয়াহ ছিল না; তাই এই ব্যবস্থা রোমের পোপ ও বাদশাহরা নিজেদের বানানো নীতিমালা দিয়ে পরিচালনা করত। এই নীতিগুলোর ক্ষেত্রে সম্মানিত শ্রেণির জন্য সহজ ব্যবস্থা রাখা হলেও জনগণের ওপর সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতো।
জাগিরদার ব্যবস্থার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল এলাকার শৃঙ্খলা ও বিন্যাস ঠিক রাখার জন্য উৎপাদিত ফসল থেকে এলাকার কাজি, পুলিশ ও প্রশাসনের সমস্ত কর্মচারীর বেতন সরবরাহ করা। এ ছাড়াও এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থ এই ভূমি থেকেই অর্জিত হতো। যার দ্বারা বুঝে আসে, এই ব্যবস্থা এলাকার শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনাদিও পূরণ করত। এই ব্যবস্থার তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাদশাহর জন্য প্রয়োজনের সময় বাহিনীর রসদ সরবরাহ করা এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা সদস্যের বেতন ও ঘোড়ার খোরাকিও এই জাগিরদারদের জিম্মাদারি ছিল। এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, জাগিরদার ব্যবস্থা জাগিরদারকে ক্ষমতা দানের পাশাপাশি অনেক বড় দায়িত্বও চাপিয়ে দিত।
ইউরোপে যা হতো, দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতার ফলে জুলুম ও বাড়াবাড়ি শুরু হতো। জাগিরদারকে জমির মালিক বানিয়ে দেওয়ার কারণে পুরো সমাজের মধ্যে শ্রেণি-বৈষম্য শুরু হয়ে যায়। যেখানে সবার ওপরে থাকত রোমের পোপ ও গির্জা। তাদের পরে যারা শাহি বংশের সাথে সম্পর্ক রাখত, তাদেরকে উঁচু শ্রেণি হিসেবে গণ্য করা হতো। এদের পরেই ছিল সম্মানিত শ্রেণি, যেখানে জাগিরদার, সেনাবাহিনীর বড় অফিসার ও নাইট এবং এলাকার পাদরিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বাইরে বাকি সমস্ত জনগণ ছিল সাধারণ শ্রেণির। ব্রিটেনে তাদেরকে কমন্স (Commons) বলা হতো। সেই সময় বাস্তবিকভাবে সাধারণ জনগণের অবস্থা গোলাম থেকেও নিচে ছিল, যাদের কাজ ছিল শুধু জাগিরদারদের খিদমত করা। এর বিনিময়ে যা-ই পেত, সেটাই তাদের মেনে নিতে হতো। সাধারণ জনগণের এতটুকু ক্ষমতা ছিল না যে, তারা কোনো জাগিরদারদের পক্ষ থেকে জুলুমের শিকার হলে নিজের ইচ্ছা মুতাবিক অন্য জাগিরদারের কাছে কাজ করবে অথবা সমস্ত জাগিরদারদের থেকে দূরে গিয়ে অনাবাদি জমিনকে আবাদ করবে। এটা এমন অপরাধ ছিল, যার শাস্তি বন্দিত্ব বা মৃত্যু।
গির্জা, বাদশাহ ও জাগিরদারদের শয়তানি ত্রিভুজ পোপ, বাদশাহ ও জাগিরদাররা জুলুম ও নির্যাতনের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। একেবারে সাধারণ কারণে জনগণের ওপর জুলুম ও নির্যাতনের পাহাড় চাপিয়ে দিত। তাদের থেকে ফসল ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাদের প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থাটুকু পর্যন্ত করা হতো না। সম্পদ জমা করা তাদের জন্য নিষিদ্ধের পর্যায়ে ছিল। ব্যবসা বা অন্যান্য পেশাদার ব্যক্তিদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানো হতো। যদি আদায় করতে না পারত, তখন তাকে ও তার ব্যবসাকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করত যে, তাকে ব্যবসা থেকে স্থায়ীভাবে হাত গুটিয়ে নিতে হতো। এমনকি তার ঘর এবং ইজ্জত-সম্মানটুকুও রক্ষা পেত না। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই সমস্ত কাজ গির্জার ছত্রছায়ায় আল্লাহ তাআলার নাম ব্যবহার করে করা হতো।
মধ্যযুগে ইউরোপের জনগণের সামনে একদিকে ছিল গির্জা, অপরদিকে বাদশাহ ও তৃতীয় দিকে জাগিরদার। জনগণের অবস্থা এই ত্রিপক্ষীয় চাপে একজন গোলামের থেকেও বেশি খারাপ ছিল। এই অবস্থাটাই ইউরোপের মধ্যে ধর্মহীনতার সয়লাবের সুযোগ তৈরি করে দেয়। আর এই ধর্মহীনতা মানবাধিকার আন্দোলনের রূপ নেয়, যা সময়ের সাথে সাথে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়ে যায়।
মেঘনা কার্টা বা স্বাধীনতার মহান দলিল (১২১৫ খ্রি.)
১১৯৯ সালে এপ্রিল মাসে ইউরোপের খ্রিষ্টান হিরো ও ইংল্যান্ডের বাদশাহ (Richard, the Lion Hearted) রিচার্ড দ্যা লায়ন হার্টের মৃত্যুর পর তার ভাই 'জন' (John I) ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসে। জন তার শাসনের শুরুতেই বিপদে পড়ে যায়, যখন তার ও রোমের পোপের মধ্যে পাদরি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। উভয় গ্রুপ তাদের নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ইংল্যান্ডের পাদরি নির্ধারণ করতে চাচ্ছিল। এই দ্বন্দ্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, একসময় গির্জার পক্ষ থেকে রোমের বাদশাহ জন-এর বাদশাহি ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ফ্রান্সের বাদশাহকে তার দখলকৃত অঞ্চলগুলো ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাদশাহ জন-এর জন্য পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে যায়। বাদশাহর সিংহাসন থেকে অপসারিত হওয়ার সময়কালে ইংল্যান্ডের সমস্ত গির্জায় ইবাদত বন্ধ হয়ে যায়। জনগণের মধ্যে সমস্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে জাগিরদাররাও বাদশাহ জন-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে।
বাদশাহ জন-এর সামনে নিজের শাসন-ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য তখন গির্জার সামনে হাতিয়ার ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না; তাই সে এমনটা করে এবং বাদশাহি বাঁচিয়ে নেয়। কিন্তু বাদশাহর বিরুদ্ধে জনগণ ও জাগিরদারদের বিদ্রোহ পুরোদমে চলমান ছিল। বাদশাহ এই বিদ্রোহ দমনের জন্য গির্জার কাছে অনুরোধ জানায়, তখন গির্জা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বাদশাহ ও জনগণের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা ল্যাটিন ভাষায় লিখিত। এই চুক্তিকে মেঘনা কার্টা (Megna Carta) বা স্বাধীনতার মহান দলিল বলা হয়। এই চুক্তির অধীনে বাদশাহ জনগণের কিছু দাবি মেনে নেয়। যার মধ্যে একটি ছিল, কোনো অপরাধ ব্যতীত কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না, যা বর্তমান পরিভাষায় নিরপরাধ গ্রেফতারের নীতি বলা হয়। এই চুক্তিতে আরেকটি বিষয় ছিল জনগণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা। যেই কমিটির কাজ হবে শুধু জনসাধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাদশাহকে পরামর্শ দেওয়া। ইউরোপের ঐতিহাসিকগণ এটাকে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ মনে করে। বাস্তবে এমনটাই হয়েছিল, কারণ এক শতাব্দীর ভেতরেই বাদশাহ জন-এর পৌত্র এডওয়ার্ড প্রথম পার্লামেন্টের ভিত্তি স্থাপন করে। এটা শুধু ইংল্যান্ড নয়; বরং পুরো ইউরোপের প্রথম পার্লামেন্ট ছিল। মেঘনা কার্টা চুক্তি বাদশাহ উইলিয়ামের সেই চুক্তিকেও বাতিল করে দেয়, যেখানে বাদশাহ একটি বিরান ভূমিকে নিজ এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল।
মোটকথা মেঘনা কার্টা চুক্তি ইউরোপীয় বিশ্বে পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মেঘনা কার্টাকে আজকের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকা প্রত্যেকটা আইন এবং মানুষের বানানো নীতিমালার উৎস ও ভিত্তি মনে করা হয়। এই মেঘনা কার্টাই আজকের মানবাধিকার আন্দোলনের শুরু, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পশ্চিমাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আজও হচ্ছে। মেঘনা কার্টাই ছিল পশ্চিমে সেক্যুলারিজম ছড়িয়ে দেওয়ার মূল উৎস।
মধ্যযুগে সেক্যুলারিজমের সূচনা
মধ্যযুগে ধর্মহীনতার বিষাক্ত কীটগুলো ইউরোপে জন্ম নিতে শুরু করে। ঐতিহাসিকরা এর তিনটি কারণ উল্লেখ করে থাকে। প্রথমটি মেঘনা কার্টা চুক্তি, দ্বিতীয়টি অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা, তৃতীয়টি প্যারিস ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রিক দর্শনের শিক্ষকদের বহিষ্কার, যারা পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে এসে শিক্ষকতা শুরু করে। কিছু ঐতিহাসিকের মত হচ্ছে, মেঘনা কার্টা চুক্তির অধীনে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে অনাবাদি জমি সাধারণ মানুষরা ব্যবহার শুরু করে। এই সমস্ত ভূমি আবাদের ফলে নতুন সমাজাচার অস্তিত্বে আসা শুরু হয়। সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা এখানে আসতে থাকে, যারা পোপ ও জাগিরদার ব্যবস্থার অধীনে অনেক নির্যাতিত হচ্ছিল। তেমনিভাবে বিভিন্ন শহর গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যবসা ও কারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। কারিগরি ও ব্যবসায়িক পেশার জন্য তারা সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান ও কারখানা বানাতে শুরু করে। এই আবাদিগুলো ইতিহাসে 'গিল্ড' নামে পরিচিত।
শুরুতে এই আবাদিগুলোর জনগণ বাদশাহ বা গির্জার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার নাগরিক অধিকার প্রাপ্ত হয়নি। যেহেতু সেই সময় শিক্ষা দেওয়ার অধিকার শুধু গির্জার হাতেই ছিল, তাই গিল্ড আবাদিগুলোর শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। সেই সময় জনগণের কাছে প্যারিস ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা সমাপ্তকারী কিছু ব্যক্তি আসে, যাদেরকে গির্জার পক্ষ থেকে ধর্মহীন ঘোষণা করা হয়েছিল। কারণ তারা গ্রিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা শিক্ষার পর খ্রিষ্ট ধর্মের কিছু মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাদের চিন্তাধারাকে গির্জা কর্তৃক ধর্মত্যাগ (heresy) নাম দেওয়া হয়েছিল। এই ধর্মহীন ব্যক্তিরা ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে আসে এবং সেখানের জনগণের মধ্যে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করে, যারা গির্জার চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা থেকে দূরে ছিল। এভাবেই গিল্ড সমাজে ধর্মহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী দুই শতকের মধ্যে ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড শহরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ভার্সিটিগুলো ইউরোপে এমনভাবে প্রসিদ্ধি পায় যে, পুরো ইউরোপ সেখান থেকে জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে বাধ্য হয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজকে ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি নামে পরিচিত।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় দেড়শ বছর যাবৎ মুসলিম ভূখণ্ডে মুনাফিক বাহিনী তৈরি করে পাঠাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইন্টিফিক সোসাইটি গঠন করা হয়, যাদের বাহ্যিক উদ্দেশ্য পুরো দুনিয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও রিসার্চগুলো একত্রিত করে প্রচার করা।
যাতে বিজ্ঞানের উন্নতি ও অগ্রগতিতে সাহায্য করা যায়। কিন্তু মূলত তারা এর আড়ালে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপে বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্বের সূচনা করে।
পরবর্তী সময়ে এই সমাজগুলো থেকেই ইংল্যান্ডে ধর্মহীনতার আন্দোলন শুরু হয়। সরকার ও ধর্মহীন জনগণের মধ্যে মানবাধিকারের নামে অনেক মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামরিক যুদ্ধ হয়। যার ফলশ্রুতিতে মেঘনা কার্টা চুক্তির অধীনে প্রতিষ্ঠিত পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতঃপর ইংল্যান্ড থেকে যখন এই বিষয়গুলো পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন গির্জা ফ্রান্সের ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে। ফ্রান্সের বাদশাহগণ—যারা নিজেরাই কট্টর খ্রিষ্টান ছিল, তারাও গির্জাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে।
ওয়াইক্লিফের সংশোধন আন্দোলন (১৩৮৪ খ্রি.)
মধ্যযুগে গির্জার অনেক দুর্নীতি সামনে আসা শুরু হয়। কিন্তু এই দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষম কোনো শক্তি তখন ছিল না। এমনকি যারাই তাদের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে কথা বলত, তাদেরই মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো। এমনই একটি আন্দোলন ছিল ওয়াইক্লিফের আন্দোলন। (১৩৩০-১৩৮৪ খ্রি.) ওয়াইক্লিফকে রিফরমেশন বা সংশোধন আন্দোলনের জনক বলা হয়। ওয়াইক্লিফ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন শাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করে। পাশাপাশি সে আলাদা স্থানে রোমের গির্জা থেকে স্বাধীন এক চার্চে পাদরির দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকে। যখন ব্রিটেনের বাদশাহ তৃতীয় এডওয়ার্ডের কাছে তাকে রোমের গির্জার প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করা হয়, তখন সে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ওয়াইক্লিফ পোপের বিরুদ্ধে ও পার্লামেন্টের ক্ষমতা নিয়ে কয়েকটি ছোট বই প্রচার করেছিল। যার ফলে এই বিষয়টা সমাধানের জন্য বাদশাহ পোপের প্রতিনিধিদের সাথে হওয়া কনফারেন্সে তাকেও প্রতিনিধি বানায়।
যদিও কনফারেন্স ব্যর্থ হয়েছিল; কিন্তু পার্লামেন্টে ওয়াইক্লিফ অনেক প্রসিদ্ধি অর্জন করে ফেলে। এরপর ওয়াইক্লিফ এমন একটি বই লিখে, যার মধ্যে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ওপর অসততার অভিযোগ তোলা হয়। সেই সাথে সে অক্সফোর্ডে তার সাথিদের নিয়ে ল্যাটিন বাইবেলকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রচার শুরু করে দেয়। যা সেই সময় গির্জার নীতিতে নিষিদ্ধ ছিল। এই কাজের ফলে তাকে খ্রিষ্টান আদালতে পেশ করা হয়। আদালত থেকে তাকে ধর্মহীন ঘোষণা করা হয় এবং অক্সফোর্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে নিজের মিশন চালিয়ে যায় এবং নিজের চার্চে পাদরির দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকে। সে প্রচারকদের একটি দল তৈরি করে, যারা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে শুরু করে।
তার মৌলিক শিক্ষা ছিল—
• আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক করার জন্য কোনো পাদরি বা গির্জার প্রয়োজন নেই।
• যে কেউ খ্রিষ্টানদের পবিত্র কিতাবের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের জীবনকে আলোকিত করে নিতে পারবে।
• খ্রিষ্টান আলিমদের জন্য উচিত ইনজিলে আলোচিত মাসিহ ও হাওয়ারিদের মতো ফকিরি জীবনযাপন করা।
• খ্রিষ্টবাদের মধ্যে যোদ্ধাবাজ ও গোলামের মতো শ্রম দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই।
১৩৮৪ সালে তার মৃত্যুর পর শাগরিদরা তার অনূদিত ইনজিলকে ব্যাপকভাবে প্রচার করে; কিন্তু তাদের কেউই তার আন্দোলনকে ধরে রাখতে পারেনি। তারপর অনেক সংশোধনকারী ব্যক্তি জন্ম নেয়, যার মধ্যে 'বোহেমিয়া'-এর 'জন হাস' অনেক প্রসিদ্ধ। সে যখন ওয়াইক্লিফের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করে, তখন তাকে গির্জার হুকুমে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি স্বয়ং ওয়াইক্লিফের লাশকে কবর থেকে বের করে জ্বালানো হয়। অতঃপর সর্বশেষ ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথারের রিফরমেশন আন্দোলন সফল হয়, যার আলোচনা আমরা সামনে করব। এমনকি মার্টিন লুথার পর্যন্ত স্বীকার করেছিল যে, সে এই ক্ষেত্রে ওয়াইক্লিফের কাছে ঋণী।
ক্রুসেড যুদ্ধ (১০৯৫-১২৭১ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ক্রুসেড যুদ্ধ। মূলত মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মাঝে ক্রুসেড যুদ্ধ আল্লাহর নবির জীবদ্দশা থেকেই শুরু হয়। মুতার যুদ্ধ ছিল প্রথম যুদ্ধ, যা মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ প্রথমবার মুসলিমদের জেনারেল হিসেবে সামনে আসেন। নবি -এর জীবনে তাবুক যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ, যেখানে আল্লাহর নবি নিজেই অংশগ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু সেখানে কোনো লড়াই হয়নি। রোমান খ্রিষ্টানদের সাথে দ্বিতীয় যুদ্ধ হয় উমর -এর যুগে, যেখানে সাহাবায়ে কিরামের বিজয় অর্জিত হয়। বনু উমাইয়্যা ও বনু আব্বাসের সাথে কনস্টান্টিনোপলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ চলমান থাকে। কুসতুনতিনিয়া বিজয়ের প্রতি মুসলিমদের সর্বদাই আগ্রহ ছিল। কারণ কুসতুনতিনিয়া বিজয়কারী বাহিনীর জন্য আল্লাহর নবি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই ফজিলত অর্জনের জন্য সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের বৃদ্ধ বয়সেও কুসতুনতিনিয়ার ওপর হামলাকারী বাহিনীতে অংশগ্রহণ করতেন। এমনই এক যুদ্ধে আবু আইয়ুব আনসারি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেই তাঁর অফাত হওয়ায় তাঁকে কুসতুনতিনিয়া দুর্গের দেয়ালের পাশে কবর দেওয়া হয়।
পরবর্তী যুগে সেলজুক সুলতানরা বাইজেন্টাইনের ওপর আক্রমণ করে। এই সমস্ত যুদ্ধকেও ক্রুসেড যুদ্ধ বলা হয়। তবে ইতিহাসে দশম শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু হয়ে এয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত চলমান যুদ্ধগুলো ক্রুসেড যুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সম্ভবত এর কারণ ছিল ক্রুসেডারদের বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করা। প্রথমবার আকসা মুসলিমদের হাত থেকে ছুটে যাওয়া ছিল ইতিহাসের অনেক বড় একটি ঘটনা। সেই সাথে ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন জিনকি ও সালাহুদ্দিন আইয়ুবী-এর নেতৃত্বের প্রসিদ্ধিও এর একটি কারণ হতে পারে, যারা মুসলিমদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনেন। আবার এই ক্ষেত্রে সুলতান জাহির বাইবার্সের ব্যক্তিত্বও একটি কারণ হতে পারে, কেননা তিনি আইনে জালুতের যুদ্ধে শুধু হালাকু খানকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হননি; বরং খ্রিষ্টানদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বের করে পৌনে দুইশ বছরের চলমান যুদ্ধকে সমাপ্ত করেন।
ক্রুসেড যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি, উসমানি খিলাফতের সময় সংঘটিত পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের যুদ্ধগুলোও ক্রুসেড যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক মুসলিম উম্মাহর ওপর উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করাও ক্রুসেড যুদ্ধ ছিল। কিন্তু সেগুলো ছিল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ভিন্ন অবস্থান ও ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই যুদ্ধগুলোকে ক্রুসেড-জায়োনিস্ট যুদ্ধ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সেই যুদ্ধগুলোর বিস্তারিত আলোচনা আমরা এই কিতাবের দ্বিতীয় অংশে করব। এখানে আমরা মধ্যযুগের পৌনে দুইশ বছরের ক্রুসেড যুদ্ধগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধ (১০৯৫-১০৯৯ খ্রি.)
প্রথম ক্রুসেড শুরু হয় ১০৯৫ সালে রোমের পোপ উরবান ২য়-এর ঘোষণার মাধ্যমে। রোমের পোপ খ্রিষ্টান-বিশ্বে ছোটাছুটি করে সমস্ত বাদশাহকে আকসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করে। অতঃপর ইউরোপের সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনী ধীরে ধীরে হামলা করে ফিলিস্তিন ও শামের বিশাল অংশ দখল করে নিতে সক্ষম হয় এবং ১০৯৯ সালে বাইতুল মুকাদ্দাসকে দখল করে নেয়। এরপর মুসলিমদের সাথে এমন পশুত্বের আচরণ করে, যার উদাহরণ ইতিহাসে অনেক কম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে খ্রিষ্টানদের ঘোড়ার খুর পর্যন্ত মুসলিমদের রক্তে ডুবে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ (১১৪৭-১১৪৯ খ্রি.)
দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হয় হালাবের আমির ইমামুদ্দিন জিনকি খ্রিষ্টানদের শহর এডেসা দখলের মাধ্যমে। সে সময় যখন দুর্ভাগ্যবশত মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়, সেলজুক বাদশাহ-যাদেরকে মুসলিমদের উত্থান ও উন্নতির নিদর্শন মনে করা হতো-তারা তখন পতনের দিকে ধাবিত হয়। বাগদাদের খলিফা ও সেলজুকিদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছড়িয়ে পড়ে। সেলজুকিদের মধ্যে যদিও তখন সুলতান সানজার ও সুলতান মাসুদ জীবিত ছিলেন, যাদেরকে অনেক শক্তিশালী সুলতান মনে করা হতো; কিন্তু তারাও গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ ভুল বোঝাবুঝির ফলে মুসলিমদের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে দৃষ্টি দিতে পারছিলেন না। তখনই আল্লাহ তাআলা আতাবাকি বংশ থেকে ইমাদুদ্দিন জিনকি-কে শামের মসুল অঞ্চলে উত্থান ঘটান।
ইমাদুদ্দিন জিনকির অন্তর খ্রিষ্টানদের ফিলিস্তিন দখলের ফলে সর্বদা অস্থির থাকত। তিনি শাম ও ফিলিস্তিনকে খ্রিষ্টানদের দখল থেকে মুক্ত করার জন্য সুসংগঠিত কার্যক্রম শুরু করেন। তার সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শামের এডেসা শহর বিজয় করা। যা সেই সময় খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। এডেসা বিজয়ে পুরো ইউরোপে আগুন লেগে যায়। ফ্রান্সের বাদশাহ লুই অষ্টম ও রোমের প্রতিনিধি কনরাড তৃতীয় রোমের পোপের আদেশে সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হয়। সেই সময় ইমাদুদ্দিন -এর ছেলে নুরুদ্দিন জিনকি মাসুলের বাদশাহ ছিলেন। খ্রিষ্টানরা এসে দামেস্কে হামলা করে। দামেস্কে তখন একটি স্বাধীন হুকুমত ছিল এবং তারা নিজেদের প্রতিরোধে সক্ষম ছিল না। নুরুদ্দিন জিনকি দামেস্কের প্রতিরক্ষা করার পাশাপাশি এই অঞ্চলকে নিজের হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। আর এভাবেই দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের মুখে লাগাম পরিয়ে দেন।
তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৭-১১৯২ খ্রি.)
তৃতীয় ক্রুসেড সালাহুদ্দিন আইয়ুবি -এর ফিলিস্তিনে হামলা ও বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর থেকে শুরু হয়। নুরুদ্দিন জিনকি শিরকুহকে মিশরের গভর্নর বানান। তার অফাতের পর তার ভাতিজা সালাহুদ্দিন মিশরের গভর্নর হন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়কে নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেন। হিত্তিনের প্রসিদ্ধ যুদ্ধে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করে বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় করে নেন। ফিলিস্তিনে পরাজিত হওয়ার খবর শুনে পুরো ইউরোপে মাতম শুরু হয়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির বাদশাহ নিজেদের বাহিনী নিয়ে বের হয়ে আসে, যা ছিল তৃতীয় ক্রুসেড। ইংল্যান্ডের বাদশাহ রিচার্ড আক্কা ও জাফা বিজয় করে নেয়; কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে পারেনি। পরবর্তীকালে সালাহুদ্দিন -এর সাথে চুক্তি করে ফিরে যায়।
চতুর্থ ক্রুসেড (১১৯৭ খ্রি.)
১১৯৭ সালে রোমের পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের জন্য কাজ শুরু করে। ১২০৬ সালে ফ্রান্সসহ অনেক রাষ্ট্র নিজেদের বাহিনী প্রেরণ করে। ফয়সালা হয় এই বাহিনী ইতালির শহর ভেনিস থেকে সমুদ্রপথে মিশরের দিকে রওয়ানা হবে। এই সফরের জন্য ৮১ হাজার রুপার মুদ্রা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু খ্রিষ্টানদের কাছে ছিল মাত্র ৫১ হাজার রুপার মুদ্রা। ফলে খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ-কার্যক্রম শুরু থেকেই অর্থনৈতিক সমস্যার শিকার হয়ে যায়। এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য তারা হাঙ্গেরির খ্রিষ্টান রাজ্য জারা বিজয় করে নেয়। অতঃপর বাইজেন্টাইনিদের কুসতুনতিনিয়া দখল করে সেখানে এত পরিমাণ হত্যা-লুণ্ঠন করে যে, খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা বলেছে, যদি মুসলিমরা সেই অঞ্চল দখল করত, তাহলে এমন কিছুই করত না, যা খ্রিষ্টানরা করেছিল। এই কাজের ফলে তারা জেরুজালেমের দিকে রওয়ানা হতেই পারেনি; বরং খ্রিষ্টানদের এলাকাতেই মতানৈক্যের শিকার হয়ে দমে যায়।
পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭-১২২১ খ্রি.)
পঞ্চম ক্রুসেডে হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার বাদশাহ অংশগ্রহণ করে। তারা মিশরের সুলতানুল কামেলের ওপর হামলা করে কিছু প্রাথমিক সফলতা অর্জন করে। কিন্তু সবশেষে খ্রিষ্টানরা পরাজিত হয় এবং তারা আট বছরের নিরাপত্তা চুক্তি করে ফিরে আসে।
ষষ্ঠ ক্রুসেড (১২২৮-১২২৯ খ্রি.)
রোমান সাম্রাজ্যের বাদশাহ দ্বিতীয় ফ্রেডরিক বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের শপথ করে। সেই সময় সুলতান কামেলের হুকুমত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। অনেক যুদ্ধের পর বাদশাহ কামেল ফ্রেডরিকের সাথে দশ বছরের চুক্তি করে। এই চুক্তির অধীনে জেরুজালেম, নাসেরা ও বাইতুল লাহম দশ বছরের জন্য খ্রিষ্টানদের দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাসজিদুল আকসা ও কুব্বাতে সাখরা মুসলিমদের হাতেই রয়ে যায়। ১২৪৪ সালের মধ্যে মুসলিমরা এই সমস্ত এলাকা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যার ফলে সপ্তম ক্রুসেড শুরু হয়।
সপ্তম ক্রুসেড (১২৪৮-১২৫৪ খ্রি.)
১২৪৮ সালে তাতারদের হামলা থেকে পিছপা হয়ে মিশর-ফেরত খাওয়ারিজম বাহিনী জেরুজালেমে থাকা খ্রিষ্টান বাহিনীকে পরাজিত করে শহরকে দখল করে নেয়। তার জবাবে ফ্রান্সের বাদশাহ লুই নবম মিশরে হামলা করে। ফ্রান্সের বাদশাহ তোরান শাহের হাতে পরাজিত হয় এবং নিজেও গ্রেফতার হয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে মুক্ত হয়। এই যুদ্ধের বিশেষ বিষয় ছিল, এই যুদ্ধ জহির বাইবার্সের উত্থানের যুদ্ধ ছিল। যিনি পরবর্তী সময়ে হালাকু খানের বাহিনীকে পরাজিত করার সাথে সাথে খ্রিষ্টান বাহিনীকেও চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।
অষ্টম ক্রুসেড (১২৭০ খ্রি.)
ফ্রান্সের বাদশাহ লুই নবম ১২৭০ সালে অষ্টম ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা বাজায়। সেই সময় খ্রিষ্টানরা উত্তর আফ্রিকা থেকে ক্রুসেড হামলা শুরু করে। লুই নবম তার সেনাবাহিনী নিয়ে তিউনিসিয়া পৌঁছে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। ফলে এই হামলা সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
নবম ক্রুসেড (১২৭১-১২৭২ খ্রি.)
লুইয়ের মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডের বাদশাহ নবম ক্রুসেড যুদ্ধ শুরুর চেষ্টা করে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। সেই সময় মিশরের মামলুক সুলতান বাইবার্স আইনে জালুত স্থানে হালাকু খানের বাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করার পর খ্রিষ্টান অধিকৃত অঞ্চলসমূহ-যার মধ্যে আন্তাকিয়া, আক্কা, তারাবুলুস ও জাজায়ির রোড অন্তর্ভুক্ত ছিল-দখল করে পৌনে তিনশ বছরের চলমান ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়।
মহামারি বা ব্ল্যাক ডেথ (১৩৪৭-১৩৫১ খ্রি.)
মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেই ঘটনা ইউরোপের ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা হচ্ছে ভয়ংকর মহামারি, যা ইতিহাসে ব্ল‍্যাক ডেথ নাম প্রসিদ্ধ। ১৩৪৭-১৩৫১ সালে ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে গিয়েছিল; যার ফলে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ আবাদি খতম হয়ে গিয়েছিল। তখনকার সময় এই মহামারিকে বিশাল ধ্বংস (Great Mortality) বলা হতো। ইউরোপের বিভিন্ন অবস্থা থেকে এই ঘটনার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এর একটি ফলাফল ছিল, খ্রিষ্টান অধিবাসীরা নিজেদের রাগ-দুঃখ ইহুদি ও অন্যান্য বহিরাগত দুর্বল শ্রেণির ওপর প্রয়োগ করতে শুরু করে। তারা অপবাদ দেয় যে, তারা পানি ও বাতাস খারাপ করে দিয়েছিল। যার ফলে এই মহামারি ছড়িয়ে গিয়েছে। এর ফলে অনেক স্থানে খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের একত্রিত করে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
এর দ্বিতীয় প্রভাব ছিল, ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। শ্রমিকের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং জাগিরদারদের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে ইউরোপের জাগিরদার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ রোজগারের আশায় কৃষি জমি ফেলে শহরের দিকে আসতে শুরু করে। সেই সাথে জাগিরদার ও শ্রমিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে অধিকারের আন্দোলনে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার আরও কিছু প্রভাব দেখা দিয়েছিল। প্রথমত, ইউরোপের জনশক্তি এতটাই কমে গিয়েছিল যে, সেখানে সব ধরনের ভাড়াটে শ্রমিক দুর্লভ হয়ে গিয়েছিল। যার দরুন যেসব শ্রমিক ছিল তাদের পারিশ্রমিক এতটাই বেশি হতো যে, কোনো জিনিস তৈরির পর তা অনেক দামি হয়ে যেত। কেউ তা খরিদ করতে পারত না। দ্বিতীয়ত, জনশক্তি কমে যাওয়ার ফলে বাজারে ক্রেতা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর এই অবস্থাই ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে বিশ্বের নতুন নতুন বাজারের তালাশে বের হতে বাধ্য করে। সেই সময় হিন্দুস্থান পুরো দুনিয়াতে কাপড় ও বিভিন্ন দ্রব্য রপ্তানি করত; তাই সমস্ত রাষ্ট্রের আগ্রহ হিন্দুস্থানের দিকে ঘুরে যায়। সর্বপ্রথম পর্তুগাল অতঃপর হল্যান্ড-ফ্রান্স সর্বশেষ ব্রিটেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে হিন্দুস্থানে ব্যবসা শুরু করে। জাতীয় পর্যায়ে কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে যখন অধিক অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন ব্যাংক ও নতুন কারেন্সির প্রচলন ঘটে। এখান থেকে নতুন এক ধরনের বাণিজ্য শুরু হয়। আর এর মাধ্যমে একদিকে পেপার কারেন্সি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর উন্নতি হতে থাকে। যা পরবর্তীকালে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। অপরদিকে ব্যবসার আড়ালে ব্রিটেন হিন্দুস্থানের ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করে বসে। হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেনের দখল ছিল পুরো বিশ্বে পশ্চিমাদের উত্থানের উৎস। যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।
কিছু ঐতিহাসিকের মতানুযায়ী মহামারির আরেকটি প্রভাব হলো, এর ফলে ধর্মহীনতা ও সেক্যুলারিজম জনগণের মাঝে গ্রহণীয় হতে শুরু করে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে সেক্যুলার দার্শনিকরা ধর্মের ওপর কঠিন অভিযোগ করতে থাকে। তারা বলতে থাকে যে, গির্জা এই বিপদকে কাবু করার পরিবর্তে শুধু ধৈর্যের পরামর্শ দিয়েছে। যদি মানুষ ধর্মের আনুগত্য না করে এই বিপদ থেকে মুক্তির চেষ্টা করত, তাহলে এই বিপদ থেকে অনেক আগেই মুক্তি মিলে যেত। এই চিন্তা পরবর্তী শতাব্দীতে শক্তিশালী হতে থাকে, যা সর্বশেষ ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে গির্জার পরাজয় ও ধর্মহীনতার বিজয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে।
মধ্যযুগ ও ইহুদিবাদ
ইউরোপের ইহুদিদের সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছিল মধ্যযুগে। তখনকার যুগে ইহুদিরা মুসলিমদের আন্দালুসে বসবাস করত। তারা নিজেরাই সেই সময়কে ইহুদিদের সোনালি যুগ হিসেবে গণ্য করে। এখানে তারা উত্তর আফ্রিকার মুসলিম এলাকাগুলো থেকে এসেছিল। ইহুদিরা ইউরোপে আসার দ্বিতীয় রাস্তা ছিল তুর্কি হয়ে। কিন্তু এই পথে অনেক কম ইহুদি ইউরোপে এসেছিল, কেননা তারা মুসলিম-বিশ্বে জিম্মি হিসেবে নিরাপদে বসবাস করতে পারলেও খ্রিষ্টানদের হাতে গণহত্যার শিকার হতো। এই দুই রাস্তা দিয়ে আসা ইহুদিদের আজ সাফার্ডিক ইহুদি বলা হয়, তারা আজকের সমস্ত ইহুদির বিশ শতাংশ। এরাই বনি ইসরাইলের মূল বংশধর।
ইউরোপের মধ্যে ইহুদিদের সবচেয়ে বেশি আগমন ঘটে মোঙ্গলদের রাশিয়ার ওপর হামলার পর। তখন তারা রাশিয়া থেকে পলায়ন করে পোল্যান্ড এবং ইউরোপের পূর্বাংশে চলে আসে। আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি, কাফকাজের খিসার গোত্রের শাসক অষ্টম শতাব্দীতে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। ইহুদিরা খিসার গোত্রের মধ্যে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জীবনযাপন করছিল। কিন্তু রাশিয়ার ওপর তাতারদের আক্রমণের ফলে সেখান থেকে পলায়ন করে পূর্ব ইউরোপে চলে আসতে বাধ্য হয়। অতঃপর এখান থেকে পুরো ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। রাশিয়া ও পোল্যান্ড থেকে ছড়িয়ে পড়া ইহুদিদেরকে আশকানাজি ইহুদি বলা হয়, যারা আজকের সমস্ত ইহুদির আশি শতাংশ। এই আশি শতাংশ হচ্ছে মূলত ইহুদি দাবিদার, তারা আসল ইহুদি নয়; বরং খিসার গোত্রের ইহুদি।
মধ্যযুগ ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য বিপদের যুগ। ইউরোপের খ্রিষ্টানরা ইসা-কে হত্যার চেষ্টার অপরাধের দরুন তাদের ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিল না। তাই ইহুদিদের জন্য খ্রিষ্টান এলাকায় থাকা বা সরকারী চাকরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময়ের ইহুদিদের খ্রিষ্টান এলাকাগুলো থেকে দূরে নতুন আবাদি করে বসবাসের নির্দেশ ছিল। সেই ইহুদি আবাদিগুলোকে রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের বার (ghetto) বলা হতো। এই শব্দটাকে পশু ও বদ্ধভূমির জন্য ব্যবহার করা হয়।
মধ্যযুগের ইউরোপে ইহুদিদের কয়েকবার গণহত্যা করা হয়। এগুলোর তিনটি বড় কারণ ছিল:
- প্রথম কারণ ছিল ইউরোপের ক্রুসেড যুদ্ধে বের হওয়া। যখন ইউরোপে ক্রুসেডার বাহিনী যুদ্ধের জন্য বের হয়, তখন এই ক্রুসেডাররা ইউরোপের যেই সমস্ত এলাকার ওপর দিয়ে অতিবাহিত হতো, সেখানে ইহুদিদের গণহত্যা করত।
- দ্বিতীয় কারণ ছিল মহামারি। যখন ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, তখন এর জন্য ইহুদিদের দায়ী করে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়। ইউরোপের প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই এই গণহত্যা সংঘটিত হয়।
- তৃতীয় কারণ ছিল চক্রাকারে সুদি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তারা ইউরোপের সমাজকে ঋণের চাপে জর্জরিত করে ফেলত। যখন তাদের জুলুম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাত, তখন সেই সমাজ তাদের গণহত্যা করত এবং তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করত। এই ধরনের একটি প্রসিদ্ধ গণহত্যা ও দেশান্তরের ঘটনা ফ্রান্সের বাদশাহ ফিলিপ দ্যা ফায়ারের শাসনামলে ফ্রান্সে হয়েছিল। আরেকটি গণহত্যা ইংল্যান্ডের বাদশাহ এডওয়ার্ডের সময় হয়েছিল এবং গণহত্যার পর বেঁচে যাওয়া বাকি ইহুদিদেরকে ইংল্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ইহুদিদের গণহত্যাকারী ব্রিটেন ও ফ্রান্সই পরবর্তীকালে ইহুদিদের জন্য উসমানিদের হাত থেকে ফিলিস্তিনকে বিজয় করার পাশাপাশি সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।
আর এটাই সেই গোপন রহস্য, যা বোঝা আমাদের এই কিতাবের মূল উদ্দেশ্য।

টিকাঃ
৩০. এরাই সেই শ্রেণি, যারা মানবাধিকারের যুদ্ধ শুরু করেছিল। অতঃপর মেঘনা কার্টা চুক্তিতে তাদের কিছু অধিকার মেনেও নেওয়া হয়েছিল। তাদের হওয়ার একটি জোট গঠন করা হয়, যাকে 'হাউস অফ কমন্স' বলা হয়। আজও ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষকে এই নামে ডাকা হয়।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 ইউরোপের রেনেসাঁ (১৪৫০-১৭৮৯ খ্রি.)

📄 ইউরোপের রেনেসাঁ (১৪৫০-১৭৮৯ খ্রি.)


ইউরোপের ইতিহাসের তৃতীয় যুগ, যা আজকের আধুনিক পশ্চিমের আকৃতি ধারণ করেছে, তাকে রেনেসাঁর যুগ বলা হয়। প্রথম যুগগুলোর মতোই এই নামের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। এই যুগে ইউরোপের রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের পতন এবং ধর্মহীনতার বিজয় শুরু হয়। তাই খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকগণ এই যুগকে রেনেসাঁর পরিবর্তে ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্টির যুগ বলে থাকে। কিন্তু আধুনিক যুগে যেহেতু ধর্মহীন ও সেক্যুলারদের শক্তি বেশি, তাই এই পরিভাষা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। ইউরোপের ঐতিহাসিকগণ এই যুগকে বোঝানোর জন্য রেনেসাঁ শব্দ ব্যবহার করেছে, যার বাংলা অর্থ নতুন জন্ম। মোটকথা, এই নাম ও পরিভাষা নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। আমাদের শুধু ইউরোপের ইতিহাস থেকে এতটুকুই জানা যথেষ্ট, যা দ্বারা আজ আমাদের দুশমনকে চিনতে ও বুঝতে পারব এবং উম্মতে মুসলিমার বিরুদ্ধে চলমান চক্রান্তগুলো অনুধাবন করতে পারব। তাই আমরা এই যুগের সেই ঘটনাগুলোই বর্ণনা করব, যা আমাদের আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত।
যদি আমরা রেনেসাঁর যুগকে অধ্যয়ন করি, যা ১৪৫৩ সাল থেকে প্রায় ফরাসি বিপ্লব অর্থাৎ ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হবে, যা আজকের নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার প্রতিষ্ঠায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই যুগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল ইউরোপের জনগণের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন। জনগণের মধ্যে এই চিন্তাগত পরিবর্তন দ্বীনের প্রতি অসন্তুষ্টি থেকেই হয়েছিল। যার ফলে তাদের মধ্যে ধর্মহীনতার চিন্তাধারা গ্রহণ করার হিড়িক পড়ে যায়। যা পরবর্তীকালে যুক্তিবাদের আন্দোলনের পথ পাড়ি দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত পৌঁছায়। এই যুগে গির্জার সংশোধন আন্দোলন আরও অধিক শক্তিশালী হয়, যা মধ্যযুগে ব্যর্থ হয়েছিল। সর্বশেষ মার্টিন লুথারের প্রটেস্টান্ট আন্দোলন সফলতা লাভ করে এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে প্রটেস্টান্ট নামে একটি নতুন দল তৈরি হয়। পরবর্তী যুগে এই দলটি ইংল্যান্ড ও আমেরিকাতে শক্তিশালী হয়, যা আজও একই অবস্থায় টিকে রয়েছে। এই দলটিকে খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ক ও ঐক্য স্থাপনকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। এই যুগেই আমেরিকা আবিষ্কৃত হয় এবং এই রাষ্ট্রটি প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের জন্য সর্বোত্তম আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর এই রাষ্ট্রের মধ্যেই প্রথম ধর্মহীনতার বিপ্লব হয়, যাকে আমেরিকান রেভ্যুলেশন বলা হয়।
রেনেসাঁর যুগে ইউরোপের দেশগুলো ব্যবসার উদ্দেশ্যে হিন্দুস্থানে কোম্পানি পাঠায়। পরবর্তীকালে এই কোম্পানিগুলোই হিন্দুস্থানের ওপর ইংল্যান্ডের দখল প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে পরিণত হয়। হিন্দুস্থানের ওপর ব্রিটেনের দখল ছিল আন্তর্জাতিকভাবে পশ্চিমাদের উত্থানের মূল উৎস। এই যুগেই ব্যাপকভাবে ব্যাংক ও কাগুজে নোটের প্রচলন ঘটে, যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। বর্তমানে আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে 'মার্কেট ইকোনমি' বলা হয়, যার ভিত্তি হচ্ছে এই ব্যাংক, কারেন্সি ও কোম্পানি। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে রাশিয়াতে কমিউনিস্ট বিপ্লব শুরু হয়; যার ফলে আমেরিকা ও রাশিয়ার মাঝে ৪০ বছরের কোল্ড ওয়ার সংঘটিত হয়। রেনেসাঁর যুগে হোলি রোমান এস্প্যায়ারের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধ শুরু হয়, যা ৩০ বছর পর্যন্ত চলমান ছিল। এই যুদ্ধ শেষ হয় ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে। আর এই চুক্তিই আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের থিউরি সামনে আনে। এই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের থিউরি থেকেই ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বণ্টন এই চুক্তির ভিত্তিতেই হয়েছে। আজকের জাতিসংঘ এই চুক্তির মূলনীতি অনুযায়ীই যেকোনো রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।
সামনে আমরা এই ঘটনাগুলোই বিস্তারিত আলোচনা করব।
রেনেসাঁর যুগে ইউরোপে চিন্তাগত পরিবর্তন
ইউরোপের রেনেসাঁর যুগ শুরু হয় ১৪৫৩ সালে। এই যুগের শুরু হয়েছে উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের কুসতুনতিনিয়া বিজয় থেকে। এই বিজয়ী বাহিনীর জন্য আল্লাহর রাসুল জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নিঃশেষ হয়ে যায়। এই বিজয় ইসলামি বিশ্বকে যেমন প্রভাবিত করেছিল, তেমনই ইউরোপের মধ্যে এই বিজয় অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
গ্রিক দর্শনের অনেক দক্ষ ব্যক্তিরা এবং মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক শিক্ষা অর্জনকারী খ্রিষ্টানদের অনেক বড় অংশ এই হামলার পর মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে চলে যায়। এই ব্যক্তিরা প্রথমে ইতালিতে একত্রিত হয় এবং আস্তে আস্তে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। তাই রেনেসাঁর যুগের শুরু ইতালি থেকে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হচ্ছে, এই শিক্ষা অর্জনকারী ব্যক্তিরা আধুনিক শিক্ষা মুসলিমদের থেকেই অর্জন করেছিল; কিন্তু তারা ইউরোপে গিয়ে এই শিক্ষাকে ধর্মহীনতার চিন্তাধারার সাথে মিশ্রিত করে পেশ করতে থাকে। এর আলোচনা আমরা সামনে করব ইনশাআল্লাহ।
মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গ এবং মুজাহিদদের জন্য ইউরোপের ইতিহাসের এই যুগকে বোঝা অনেক জরুরি। কেননা মুসলিম-বিশ্বের ধর্মহীন শ্রেণির একটি বিশেষ দলিল হচ্ছে ইউরোপের রেনেসাঁর যুগ। ধর্মহীন শ্রেণি এর দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করে, ইউরোপের উন্নতির মূল কারণ রেঁনেসার যুগে ধর্মহীন মতাদর্শকে গ্রহণ করা ও বিজ্ঞানে উন্নতি করা। কিন্তু বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলিমদের পতনের একটি কারণ ছিল তাদের দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে ত্যাগ করে পশ্চিমাদের সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে গ্রহণ করা, যা পশ্চিমারা রেনেসাঁর যুগে ধর্মবিরোধী চিন্তাধারা মিশ্রিত করে তৈরি করেছিল। আমরা এই ব্যাপারে ইতিহাসের সারসংক্ষেপে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
রেনেসাঁর যুগে যে সমস্ত চিন্তাগত পরিবর্তন হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রিকের সেই পুরাতন দর্শন গ্রহণ করে নেওয়া, যেখানে মানুষের বুদ্ধিকে ইলমে ওহির তুলনায় অগ্রগামী মনে করা হতো। মানুষের বুদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেই থিউরিকে আজকের আধুনিক যুগে হিউম্যানিজম (Humanism) বলা হয়। আরেকটি চিন্তাগত পরিবর্তন, যা তখন পুরো ইউরোপের জনগণ গ্রহণ করে নিয়েছিল, তা ছিল ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মহীন আধুনিক শিক্ষা। আধুনিক শিক্ষার অধিকাংশটাই মুসলিম-বিশ্ব থেকে আমদানি হয়েছিল; কিন্তু পশ্চিমারা সেই শিক্ষাকে ধর্মহীনতার সাথে মিশিয়ে পড়ানো শুরু করে। অথচ তখন মুসলিম-বিশ্বে এই আধুনিক শিক্ষাকেই দ্বীনি মাদরাসাতে আলাদা শাস্ত্র হিসেবে পড়ানো হতো। এই সবকিছু মূলত মধ্যযুগে গির্জা ও বাদশাহদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া ছিল, যারা ইউরোপের জনগণের ওপর জুলুমের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
ইউরোপে সেক্যুলারিজমের উত্থান
রেনেসাঁর যুগের সেক্যুলারিজমের উত্থান বোঝার পূর্বে জরুরি হচ্ছে স্বয়ং সেক্যুলারিজমকে বোঝা; যাতে আমরা এর উত্থানকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি। অভিধানের তথ্য অনুযায়ী সেক্যুলারিজমের অর্থ হচ্ছে ধর্মহীনতা। বাহ্যিকভাবে সাধারণ মনে হওয়া এই শব্দের ভেতরে অনেক প্যাঁচানো দর্শন লুক্কায়িত রয়েছে। যাকে পশ্চিমা ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা আলাদা একটি ধর্মের মর্যাদা দিয়ে থাকে। যেন নিরপেক্ষতার নামে সে নিজেই 'ধর্মহীনতা'র একটি ধর্ম। এই দুর্বোধ্যতাই সেক্যুলারিজম-সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর একটি বড় সমস্যা।
দুর্বোধ্যতার প্রথম কারণ হচ্ছে, এটি মানুষের সেই অসম্পূর্ণ বুদ্ধি থেকে আবিষ্কৃত, যার দাবি সে সৃষ্টিকর্তা থেকেও বেশি জ্ঞানের অধিকারী। (নাউজুবিল্লাহ) অর্থাৎ যেন সে নিজেই নিজের রব। এই দৃষ্টিতে আপনি এটাকে আল্লাহ-প্রদত্ত দ্বীনের বিপরীতে মানবতৈরি ধর্ম বলতে পারেন।
দ্বিতীয় কারণ, সেক্যুলারিজম শুধু একজন ব্যক্তির একটি অসম্পূর্ণ বুদ্ধির ফল নয়; বরং বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অসম্পূর্ণ বুদ্ধির সমষ্টি।
তৃতীয় কারণ, এ ধর্মের দার্শনিকরা অসম্পূর্ণ বুদ্ধির পাশাপাশি চারিত্রিক দিক থেকেও চরম অধঃপতিত ছিল। যার স্বীকৃতি তারা নিজেরাই দিয়েছে এবং যার ব্যাপারে ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়।
চতুর্থ কারণ, সেক্যুলারিজম শুধু এক বা দুই যুগেই পূর্ণ আকৃতি ধারণ করেনি; বরং তা খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালে রোমান ও গ্রিকের মুশরিক সমাজের গুহা থেকে বের হয়ে দুই হাজার খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আড়াই হাজার বছরের লম্বা সময়ে অনেক পরিবর্তনের ধাপ পাড়ি দিয়ে বর্তমান আকৃতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এবং এখনো তা ধারাবাহিক পরিবর্তনের ধাপ পাড়ি দিয়ে চলমান রয়েছে। এই ভিত্তিতে বলা যায় এটি ধারাবাহিক পরিবর্তনশীল একটি ধর্ম।
পঞ্চম কারণ, সেক্যুলারিজমের উন্নতির সবচেয়ে বড় কারণ খ্রিষ্টান ধর্ম ও সমাজের জুলুমের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে 'পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ধর্ম'ও বলা যায়।
এই সমস্ত বাস্তবতাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাদেরকে লম্বা ইতিহাস, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন সভ্যতা, পুরাতন ধর্ম, জটিল দর্শন ও অগণিত ব্যক্তির জীবনী অধ্যয়ন করতে হয়। এখানে আমরা দুর্বোধ্যতা দূর করে সেক্যুলারিজমকে সহজভাবে পেশ করার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন চেষ্টায় সফলতা দান করেন।
সেক্যুলারিজম একটি বুঝ ও চিন্তা-পদ্ধতির নাম, যেটি এমন বিষয়ে আলোচনা করে, যার ব্যাপারে নির্দেশনা কেবল নবিদের শিক্ষা থেকেই পাওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ কী? মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? মানুষ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে? দুনিয়াতে মানুষের কাছে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী চলার অধিকার রয়েছে কি না? যদি অধিকার থাকে, তাহলে সেটা কতটুকু? এই বিশাল জগৎকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা কে? এই বিশ্বজগতের মালিকের ইচ্ছা কী? মানুষ মারা যায় কেন? মারা যাওয়ার পর মানুষ কোথায় যায়? মানুষ মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার জীবিত হয় নাকি নিঃশেষ হয়ে যায়? এই প্রশ্নগুলোর জবাব শুধু নবিগণই ওহীর ভিত্তিতে দিতেন এবং এই ওহি সমস্ত সৃষ্টিজীবের সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আসত।
কিন্তু যখন এই প্রশ্নগুলোর জবাব মানুষ নবিগণের পরিবর্তে নিজেরাই দেওয়া শুরু করে, তখন থেকেই এই ধর্মহীনতার জন্ম হয়। এখানে ইলমে ওহির পরিবর্তে মানুষের বুদ্ধিকে গ্রহণ করা হয় এবং এই প্রশ্নগুলোর জবাবের জন্য নবিগণকে ত্যাগ করে দর্শনকে ব্যবহার করা হয়।
সেক্যুলারিজমের কয়েকটি প্রকার রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রকার, যা বর্তমান যুগে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তা হচ্ছে, হিউম্যানিজম বা মানবধর্ম।১ এই হিউম্যানিজমই আজকের ধর্মহীনতার উৎস। এটিই সেই চিন্তা-চেতনা, যা ইউরোপের জনগণ, বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও ইউনিভার্সিটিগুলোতে জন্ম নিয়েছে এবং এটাই ইউরোপের রেনেসাঁ। আমরা যদি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ইতিহাস অধ্যয়ন করি, তাহলে আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে বুঝে আসবে যে, তাদের গোমরাহির মূল কারণ ছিল নবিদের বর্ণিত নির্দেশনাগুলো ত্যাগ করে উলামায়ে সু'দের কথাকে গ্রহণ করে নেওয়া। উলামায়ে সু'দের কথাগুলো মানুষের অসম্পূর্ণ বুদ্ধি, চিন্তা ও যুক্তি-তর্ক ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। সেক্যুলারিজমও মানুষকে হুবহু এই বিষয়ের দিকেই আহ্বান করে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, সেখানে উলামায়ে সু'রা ছিল আর এখানে বুদ্ধিপূজারি দার্শনিক। এই দুটাই মানুষকে নিজের অসম্পূর্ণ বুদ্ধির গোলামে পরিণত করে এবং দুই দলের কথা একই পথে পরিচালিত করে, আর তা হচ্ছে গোমরাহির পথ।
হিউম্যানিজম মানবতাবাদ বা মানবধর্ম
খ্রি.পৃ. ৪শ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সেক্যুলারিজমের বিভিন্ন আকৃতির প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু পশ্চিমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে হিউম্যানিজম। এমনকি একসময় সেক্যুলারিজম ও হিউম্যানিজমকে একে অপরের সমার্থক মনে করা শুরু হয়। আনুমানিক খ্রি.পৃ. ৩শ সালে গ্রিক দার্শনিকরা বাহ্যিক দুনিয়া নিয়ে যুক্তি ও বুক্তিবৃত্তিক গবেষণা শুরু করে। এই দার্শনিকদের কসমোলজিস্ট (Cosmologist) বলা হতো। কসমোলজিস্টদের গবেষণা শুধু সূর্য, চন্দ্র ও তারকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কয়েক বছর পর দার্শনিকদের আরও একটি দল তৈরি হয়, যাদের থিউরি ছিল, যেভাবে সূর্য, চন্দ্র ও তারকার গতি-প্রকৃতি জানা সম্ভব হয়েছে, তেমনিভাবে মানববুদ্ধির দ্বারাই রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালা নির্ধারণ ও তৈরি করা সম্ভব। দার্শনিকদের এই দলটি সামাজিক বিষয়ে নিজেদের যুক্তিবৃত্তিক দর্শন পেশ করা শুরু করে। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে তাদের হিউম্যানিস্ট বলা শুরু হয়। সেই সময় হিউম্যানিস্ট সেই ব্যক্তিদের বলা হতো, যারা মানুষের বিভিন্ন বিষয়ের সমাধান দ্বীন ও ইলমে ওহি ব্যতীত শুধু বুদ্ধি দ্বারাই বের করার চেষ্টা করত। চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের প্রসিদ্ধ পাদরি সেন্ট অগাস্টিন এই মতাদর্শকে পরাজিত করে; ফলে এক হাজার বছর পর্যন্ত বুদ্ধিপূজার এই কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত মধ্যযুগে তা আবারও মাথা ওঠায় এবং রেনেসাঁর যুগে এই বুদ্ধিপূজা দ্বিতীয়বার পূর্ণ শক্তি নিয়ে সামনে আসে।
শেষ শতাব্দীগুলোতে হিউম্যানিস্ট সেই ব্যক্তিদের বলা হতো, যারা বিশ্বাস করত, এখন দুনিয়াতে জীবন পরিচালনার জন্য মানুষের কোনো রবের প্রয়োজন নেই। (নাউজুবিল্লাহ) যদি ইলাহ থেকেও থাকে, তাহলে এখন আর তার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং মানুষ নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা করে নিজের প্রয়োজন পূরণ করে নিতে সক্ষম হয়ে গেছে। আধুনিক যুগে হিউম্যানিজমের জনক হচ্ছে জন লক (John Locke), ডেভিড হিউম (David Hume), ফ্রিডরিখ নিৎশে (Nietzsche), ভলতেয়ার (Voltaire) ও রুশোর (Rousseau) মতো দার্শনিকরা। এখানে আমরা এই চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো বর্ণনা করে এই চিন্তা ও শিরকের বিচার স্বয়ং পাঠকের ওপর ছেড়ে দেবো।
হিউম্যানিজমের সারসংক্ষেপ
আমরা এখানে পয়েন্ট আকারে হিউম্যানিজমের মূল বিষয়গুলো আলোচনা করব, যেগুলো তাদের দার্শনিকদের বক্তব্য থেকে নোট করা হয়েছে।
• মানুষ সৃষ্টির শুরুর দিকে তারা অনভিজ্ঞ এবং বাইরের দুনিয়ার ব্যাপারে ভীত ছিল। ফলে তারা কোনো আশ্রয়ের জায়গা খুঁজছিল। সেই সময়ে তারা নিজেদের মনের মধ্যে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যের ঊর্ধ্বে এক অদৃশ্য সত্তার আবিষ্কার করে, যার কল্পনা করে তারা নিজেদের সান্ত্বনা দিত। এই ধারণাকৃত সত্তাকে তারা নিজেদের সৃষ্টিকর্তা মনে করতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মানুষ বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টিকর্তা তৈরি করে সেগুলোর পূজা করতে থাকে। এভাবেই বিভিন্ন ধর্ম অস্তিত্বে আসে। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত বিশাল সময়ে তারা এতটাই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হয়ে যায় যে, তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এখন কোনো ধর্ম বা রবের প্রয়োজন নেই।
• মানুষ যদিও স্বাধীন হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে; কিন্তু ধর্মের আবিষ্কারের পর তারা এর গোলামে পরিণত হয় এবং নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টিজীব হিসেবে কল্পনা করতে থাকে। অথচ মানুষের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই এবং তারা মাখলুকও নয়। বরং সে হচ্ছে হিউম্যান, যে অন্য হিউম্যানের সাথে মিলে হিউম্যানিটি অর্থাৎ মানবতাকে গঠন করে। আর এখান থেকেই এই চিন্তাধারাকে হিউম্যানিজম বলা শুরু হয়।
• এখন যেহেতু মানুষ থেকে বড় কোনো সত্তা নেই, তাই তারা কারও অধীন বা আনুগত্যশীল নয়। বরং তারা এখন স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজেই নিজের মালিক ও একজন স্বেচ্ছাচারী সত্তা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের এখন হিউম্যান হিসেবে নিজ জীবনের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত হয়ে গেছে। এখন সে কোনো ধর্মের আনুগত্যশীল নয় বা কোনো বাদশাহর প্রতি নত নয়। স্বাধীনতার এই অধিকারকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না। বরং সব হিউম্যান—চাই সে পুরুষ হোক বা নারী—যেকোনো রং, বর্ণ, জাতি ও রাষ্ট্র; এমনকি হোক যেকোনো ধর্মের; নিজ ইচ্ছাকে পূর্ণ করার ক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকার পাবে।
• সমস্ত মানুষ এখন যেহেতু স্বাধীন, তাই তার সমস্ত কাজের ক্ষেত্রে সে কোনো বহিরাগত শক্তি বা নিজের অভ্যন্তরীণ কোনো শক্তির অনুগত নয়। তবে সামাজিক জীবনযাপনের জন্য এক হিউম্যান অপর হিউম্যানের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে একটি সমাজ গঠন করতে পারে। এই সামাজিক সমঝোতার অধীনে সমস্ত হিউম্যানের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেই রাষ্ট্র বলা হয়, যা সকল হিউম্যানের সার্বিক স্বাধীনতা রক্ষার জিম্মাদারি গ্রহণ করে থাকে। যার ফলে সমস্ত হিউম্যান শুধু প্রশাসনের আকৃতি ধারণকারী এই সামাজিক ঐক্যের সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।
• আজ পর্যন্ত লিখিত মানব ইতিহাস যেহেতু ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রভাবে প্রভাবান্বিত, তাই এখন নতুন আঙ্গিকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে হবে। যেখানে শুধু মানবসমাজের উন্নতি ও অগ্রগতিকে সামনে রেখে ঘটনাগুলো সাজানো হবে। প্রত্যেক সভ্যতার ইতিহাসে লক্ষণীয় বিষয় শুধু এটাই হবে যে, তারা হিউম্যানের উন্নতির জন্য কতটুকু চেষ্টা করেছে। সেই সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানুষের চাহিদাকে কত উঁচু স্তর পর্যন্ত পূর্ণ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি ফিরআওনের বংশধর মানবচাহিদাকে পূর্ণতা দিয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকেই পুরো মানবজাতির মধ্যে হিউম্যানের জন্য মহান হিরো মনে করা হবে এবং তাকে কোনোভাবেই অত্যাচারী শাসক হিসেবে গণ্য করা হবে না।
হিউম্যানিজমের আবিষ্কারকদের চিন্তাধারা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, হিউম্যানের সংজ্ঞা শুধু সেই মানবসত্তার ওপর কোনোভাবেই প্রয়োগ হয় না, যার জন্য আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে 'আবদ' (বান্দা) শব্দ ব্যবহার করেছেন। বরং হিউম্যান হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করা আবশ্যক। হিউম্যান হারাম ও হালালের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত এমন এক সত্তা, যে দুনিয়ার যেকোনো ধরনের ইলাহি ধর্ম বা আসমানি মানদণ্ড ব্যতীত নিজের চাহিদা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে। আরও অগ্রসর হয়ে এই চিন্তা শুধু রব ও দ্বীনের অস্বীকার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বয়ং মানুষ নিজেকেই নিজের রব ও ইলাহ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়।
যেহেতু রেনেসাঁর যুগে ইউরোপের খ্রিষ্টান জনগণ, যারা পূর্বে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর ইবাদতকে নিজেদের জীবনের লক্ষ্য মনে করত, এখন তারা বান্দার সংজ্ঞা থেকে বের হয়ে হিউম্যান হয়ে গেছে। তাই তারা গির্জার পরিবর্তে ইউরোপের দার্শনিকদের ইবাদত করা শুরু করে।
ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা
হিউম্যানিজম বা মানবধর্ম গ্রহণের ফলে ইউরোপের দ্বিতীয় বড় পরিবর্তনটি ছিল গির্জার আধ্যাত্মিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে ধর্মহীন বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা, যা তাদের কিছু পয়সা কামাতে সাহায্য করত। ফলে লোকেরা তাদের বাচ্চাদের গির্জায় পাঠানোর পরিবর্তে আধুনিক স্কুলে পাঠাতে শুরু করে। সেই যুগে স্কুলগুলোতে দর্শন, বিজ্ঞান, গান, বক্তৃতা, অঙ্কন, কলা ইত্যাদি বিষয় পড়ানো শুরু হয়।
ইউরোপে বিজ্ঞানের উন্নতি এবং খ্রিষ্টবাদের সাথে দ্বন্দ্ব
বিজ্ঞান ছিল সেই বিশেষ বিষয়, যা ইসলামি বিশ্ব থেকে অনুবাদ হয়ে ইউরোপে পৌঁছে ছিল। ইউরোপ এই বিষয়ের ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেয়; যার ফলে রেনেসাঁর যুগের বিশেষ ঘটনা ছিল বিজ্ঞানের উন্নতি। মুসলিম বৈজ্ঞানিক জাবির বিন হাইয়‍্যান, আল-বিরুনি, ইবনে হাইসাম, ইবনে সিনাদের কিতাব অনুবাদ হয়ে ইউরোপে পৌছেছিল। প্লেটো, এরিস্টটলের থিউরিকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য নতুন নতুন থিউরি সামনে আসছিল। যারা এই থিউরিগুলো পেশ করেছিল তাদের মধ্যে ছিল গ্যালিলিও (Galileo), নিউটন (Newton), উইলিয়াম হার্বে (William Harbey), ইয়োহানেস ক্যাপলার (Kepler), ডেভিড হিউম (Hume) এর মতো বিজ্ঞানীরা। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, যেই বিষয়গুলোতে বৈজ্ঞানিকরা নিজেদের মত পেশ করছিল, মুসলিম বৈজ্ঞানিকরা এই মতগুলোই অনেক পূর্ব থেকে বলে আসছিল। মুসলিম-দুনিয়ার বৈজ্ঞানিকরা এই থিউরিগুলো বড় বড় আলিমদের সামনে পেশ করত, সেই সাথে অনেক মুসলিম বৈজ্ঞানিক নিজেই ছিল আলিম। ইসলাম ধর্ম ও বিজ্ঞানের কোনো দ্বন্দ্ব সেই সময় পর্যন্ত অস্তিত্বে ছিল না। কারণ তখনকার সময়ে আলিমগণ যদি ইসলামি আকিদার সাথে বৈজ্ঞানিক থিউরির কোনো বিরোধ দেখতেন, তখন তাতে আপত্তি তুলতেন; ফলে মুসলিম বৈজ্ঞানিকরা সেই আপত্তির আলোকে নিজেদের ভুল শুধরে নিতেন।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে কেউই এই জ্ঞানকে ধর্মহীন পদ্ধতিতে উপস্থাপন করেননি; বরং নিজেদের থিউরি ও আবিষ্কারগুলোকে আল্লাহ তাআলার কুদরত ও নিদর্শন মনে করতেন। কিন্তু এই জ্ঞান যখন ইউরোপে পৌঁছায়, তখন ধর্মহীন বৈজ্ঞানিকরা একে পরিপূর্ণ ধর্মহীন পদ্ধতিতে পেশ করে বা ধর্মহীন দর্শন মিশ্রিত করে পেশ করে। তারা বিজ্ঞানকে আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকারের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। তারা এই জ্ঞানকে খ্রিষ্টান ধর্মকে পরাজিত করার জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। খ্রিষ্টবাদ যেহেতু ইলমে ওহির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, তাই তাদের কাছে বৈজ্ঞানিকদের থিউরিকে ভুল প্রমাণিত করা বা তা প্রতিরোধ করার কোনো জ্ঞান-ভিত্তিক দলিল ছিল না। তাই তারা এই থিউরিগুলোকে ধর্মহীনতা ঘোষণা দিয়ে বৈজ্ঞানিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। যাকে ইতিহাসে বিজ্ঞান ও ধর্মের যুদ্ধ বলা হয়।
ইউরোপে যুক্তিবাদের যুগ
ইউরোপে যুক্তিবাদের যুগ (Rationalism) মূলত রিফরমেশন আন্দোলনের পর শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমরা এটাকে চিন্তাগত পরিবর্তনের অধ্যায়ে এই জন্য আলোচনা করছি; যাতে ইউরোপের মধ্যে চিন্তাগত পরিবর্তনকে বোঝার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। খ্রিষ্টান ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাঝে দ্বন্দ্বের বাহ্যিক ফলাফল ছিল ইউরোপে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকরা মানুষের বিবেককে সকল সত্য-মিথ্যা ও শুদ্ধ-অশুদ্ধের মাপকাঠি ঘোষণা করে বসে। এমনকি তারা ধর্মকেও যুক্তির আলোকে পরখ করা শুরু করে দেয়।
এখানে যুক্তিবাদ বা যুক্তিপূজা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যুক্তিকেই সঠিক-বেঠিক নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি বা ভিত্তি বানিয়ে ফেলা। অন্যভাবে বলা যায় যে, ধর্মের ভিত্তি ও উৎস মানুষের যুক্তি। এই মতবাদ প্রচারকারীদের মধ্যে অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিল। তাদের মধ্যে আছে ডেকার্ট, স্পিনোজা, লিবনিজ, জন লক-সহ আরও কিছু দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুক্তিবাদের শুরু মূলত রিফরমেশন আন্দোলন থেকে হয়েছিল। সংশোধন আন্দোলনের ফলে বাইবেল ব্যাখ্যার অধিকার সকলের হাতে দিয়ে দেওয়ার পর খ্রিষ্টানদের মধ্যে এমন কিছু ধর্মবিরোধী ব্যক্তি সামনে আসে, যারা নিজেদের যুক্তিকে মাপকাঠি বানিয়ে বিকৃত ইনজিলের (যাতে অনেক মতানৈক্য, বাস্তবতা-বিরোধী মত ছিল) প্রত্যেকটি কথার ওপর প্রশ্ন তোলা শুরু করে। এমনিভাবে দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকটি বাক্য—চাই সেটা সত্য হোক বা মিথ্যা—সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে।
যুক্তিবাদের এই চিন্তাধারা সাধারণ-বিশেষ সকল মানুষকেই প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করে। ফলে তারা খ্রিষ্টানদের দ্বীনের সকল উৎস ও প্রত্যেকটি দলিলকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। এই চিন্তাগত পরিবর্তনের স্বাভাবিক ফল হিসেবে ইউরোপের সমাজে জীবন পরিচালনার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা গির্জা অনেক শতাব্দী যাবৎ টিকিয়ে রেখেছিল, তা পূর্ণ ধ্বংস হওয়া শুরু হয়। তখন ইউরোপের জনসাধারণ গির্জার পাদরিদের বাদ দিয়ে ধর্মহীন দার্শনিকদের দিকে যাওয়া শুরু করে। আর ধর্মবিরোধী দার্শনিকরা শুধু বিজ্ঞান ও দর্শনের মাধ্যমে তাদের জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করা শুরু করে। মানুষের বুদ্ধি বা কল্পনা ও অভিজ্ঞতাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। যুক্তি বা কল্পনার বিরোধী সকল বিষয়কে অস্বীকার করা শুরু হয়। রেনেসাঁর যুগে ইউরোপের জনগণ নিজেদেরকে সৃষ্টি বা মাখলুক ও মানুষ থেকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা বা হিউম্যান মনে করতে থাকে। মানবীয় বিবেককে সমস্ত ক্ষেত্রে মূল দলিল ও উৎস হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। এর ফলাফল এমন দাঁড়ায় যে, ইউরোপের সমাজ আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, আখিরাতের ওপর ইমান ও গায়েবের বাস্তবতা যেগুলোর উৎস ছিল একমাত্র ইলমে ওহি, সেগুলোকে অস্বীকার করা শুরু করে। আস্তে আস্তে পরবর্তী দুই শতাব্দীতে পুরো ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ ধর্মহীনতাকে গ্রহণ করে নেয়। এটাই ছিল সেই রেনেসাঁর যুগ, যা পূর্ব থেকেই গোমরাহিতে লিপ্ত খ্রিষ্টানদের আরও বেশি গোমরাহিতে ফেলে দেয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই চিন্তাগত পরিবর্তনগুলো জনগণ পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা গির্জার বিরুদ্ধে রিফরমেশন আন্দোলনই পালন করেছিল।
মার্টিন লুথারের (রিফরমেশন) সংশোধন আন্দোলন
আমরা ওপরে বলে এসেছি পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে একদিকে পূর্ব ইউরোপের ইতালি থেকে শুরু হওয়া হিউম্যানিজম আন্দোলন আস্তে আস্তে পুরো ইউরোপে আদর্শগত পরিবর্তন আনতে শুরু করে এবং জনগণ গির্জা ও বাদশাহদের জুলুমের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই পরিবর্তনগুলো গ্রহণ করে নিতে থাকে। অপরদিকে রেনেসাঁর যুগে গির্জার সংশোধন আন্দোলনের নামে একটি বিপ্লব জন্ম নিতে থাকে। হিউম্যানিজম আন্দোলন গির্জা ও বাদশাহদের শাসনব্যবস্থার বাইরের আন্দোলন ছিল। আর রিফরমেশন আন্দোলন গির্জার অভ্যন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। রেনেসাঁর যুগে ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে রিফরমেশন আন্দোলন হিউম্যানিজম থেকেও বেশি প্রভাব ফেলেছিল।৩৪ বরং এটা বলা ভুল হবে না যে, সংশোধন আন্দোলন ইউরোপে ধর্মহীনতার পথ পরিষ্কারের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল।
গির্জার সংস্কার আন্দোলনের শুরু মধ্যযুগেই হয়েছিল; কিন্তু সেই চেষ্টাগুলো গির্জা কঠোর হস্তে দমন করে। এই আন্দোলনগুলো মধ্যযুগে সফল না হলেও অনেক বড় প্রভাব রেখে যায়। রেনেসাঁর যুগে বৃদ্ধি পাওয়া আন্দোলনগুলো মূলত মধ্যযুগের প্রচেষ্টাগুলোরই ধারাবাহিকতা। এই চেষ্টাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলতা পায় মার্টিন লুথারের সংস্কার আন্দোলন, যা পরবর্তী দুই শতাব্দীর ভেতর খ্রিষ্টানদের মধ্যে নতুন একটি দল তৈরি করে। মার্টিন লুথারের আন্দোলনের সফলতার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের পাদরি ক্যালভিন ও সুইডেনের পাদরি জুইংলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ জন্য আমরা মার্টিন লুথানের আন্দোলনের আলোচনা একটু বিস্তারিত করব।
মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রি.) জার্মানির এক শ্রমিক বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতা তার শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয় এবং তার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সে আইনজীবী হবে। পরবর্তী সময়ে লুথার তার বইগুলো বিক্রি করে একটি গির্জার যাজক হয়ে যায়; কিন্তু সেখানে সে তার আত্মিক প্রশান্তি পাচ্ছিল না। তা সত্ত্বেও গির্জায় তার দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকে এবং একসময় তাকে পাদরি হিসেবে মনোনীত করা হয়। একবার তাকে গির্জার পক্ষ থেকে রোমের প্রধান গির্জাতে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়। সেখানে সে পাদরিদের বিলাসী জীবন দেখে প্রচণ্ড ধাক্কা খায় এবং এই ধাক্কা তাকে খ্রিষ্টান ধর্মের মূলনীতি নিয়ে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে বাধ্য করে। তার দাবি অনুযায়ী সেই সময় তার কাছে রবের পক্ষ থেকে ইলহাম হয়েছিল। ১৫১৭ সালে তার প্রসিদ্ধ 'নাইন্টি ফাইভ থিসিস' নামের আর্টিকেলটি প্রচার করে, যা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় বৈঠকগুলোতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই আর্টিকেলে গির্জার পক্ষ থেকে পাপ মোচননামা বিলি করা ও দুনিয়াবি বিলাসিতার নিন্দা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে এই আর্টিকেল প্রচারের কারণে বাদশাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু সে সেখানেও তার মত পাল্টাতে অস্বীকার করে। এই অবস্থায় বাদশাহর দরবারের তার এক বন্ধু তাকে শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে আনতে সক্ষম হয়। অতঃপর তার বাড়িতে সে কিছু দিন পলাতক হিসেবে অবস্থান করে। সেখানে আশ্রয়ে থাকার সময় সে গ্রিক ও হিব্রু ভাষা থেকে বাইবেলকে জার্মানি ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার করা শুরু করে। যা গির্জার নীতিবিরোধী হওয়ায় তার থেকে পাদরিত্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে গৃহবন্দী করে ফেলা হয়।
১৫২৪ সালে জাগিরদার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলন হয়, যেখানে শ্রমিক নেতারা তার কিছু কথাকে নিজেদের জন্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু এখানে মার্টিন তার রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে হওয়া সত্ত্বেও এই সব কার্যক্রমের বিরোধিতা করে এবং নিজের নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখার জন্য জাগিরদারদের সাথে অংশগ্রহণ করে। জীবনের শেষ সময়ে অসুস্থ হয়ে যায় এবং পোপতন্ত্রের চাপে সে মারা যায়।
সে প্রচলিত খ্রিষ্টবাদের মধ্যে যেসব সংস্কারের দাবি পেশ করেছিল, তা ওয়াইক্লিফের প্রস্তাবনার সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। তার গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো ছিল:
• মানুষের সাথে রবের সম্পর্কের জন্য গির্জা বা পাদরির প্রয়োজন নেই; বরং এই ক্ষেত্রে সরাসরি সম্পর্ক সম্ভব।
• কোনো পাদরির এই ক্ষমতা নেই যে, সে কারোর গুনাহ ক্ষমা করে তাকে জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিতে পারে।
• আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাওরাত ও ইনজিল এই দুই কিতাবের মাধ্যমেই বিধান দিয়েছেন।
• তাওরাতের বিধানের ওপর আমলের মাধ্যমেই খ্রিষ্টানরা গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে পারবে।
• কিতাবুল মুকাদ্দাস পড়া ও বোঝার অধিকার সমস্ত খ্রিষ্টানেরই রয়েছে।
খ্রিষ্টানদের মধ্যে ব্যাপ্টিজম, আশিয়ায়ে রব্বানি ও আরও কিছু আচার-অনুষ্ঠান ব্যতীত সমস্ত রুসম বিদআত। যার মধ্যে সেন্ট ও রাহিবদের কবরের কাছে যাওয়া এবং তাদেরকে অসিলা বানানোও অন্তর্ভুক্ত।
এটাই ছিল সেই মোড়, যেখানে ইহুদিদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা পুনরায় নতুন দিকে ঘুরে যায়। এ ছাড়াও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, কয়েকটি বাস্তবতার কারণে প্রটেস্টান্ট আন্দোলনের সাথে ইহুদিদের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়।
প্রথম কারণ ছিল, স্বয়ং মার্টিন লুথারের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিল সে বংশীয় দিক থেকে ইহুদি।
দ্বিতীয়ত, তার বর্ণিত বিশ্বাসের মধ্যে পূর্বের কিতাব ও তাওরাতের শরিয়তের ওপরেও ইমান আনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল। যাতে ইহুদিদের চিন্তাধারা প্রটেস্টান্ট ধর্মের অনুসারীরা সহজেই গ্রহণ করে নিতে পারে।
তৃতীয়ত, এই দলটির আমেরিকাতে ছাপানো বাইবেলের শেষে সংযুক্ত ঐতিহাসিক চিত্রের মধ্যে ইবরাহিম থেকে নিয়ে বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
চতুর্থত, এই দলটি কার্যক্রমের দিক থেকেও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইহুদিদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। এ ব্যাপারে ব্রিটেন ও আমেরিকার ইতিহাস সাক্ষী, যেখানে প্রটেস্টান্টদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। এমনকি এই দলের রাজনৈতিক নেতাদের জায়োনিস্ট-খ্রিষ্টান বলা হয়ে থাকে।
সুতরাং আমরা এটা বলতে পারি যে, মার্টিন লুথারের মূল ভূমিকা সেন্ট পৌলের থেকে ভিন্ন ছিল না; যদিও বাহ্যিকভাবে তার আন্দোলন সেন্ট পৌলের মতাদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়।
খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিভক্তি ও প্রটেস্টান্ট দলের অস্তিত্ব
মার্টিন লুথারের আন্দোলন থেকে যদিও পর্যাপ্ত পরিমাণ মানুষ প্রভাবিত হয়েছিল; কিন্তু ক্যাথলিকদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের ফলে সেই সময় এই চিন্তাধারার বাস্তবায়ন শুরু হতে পারেনি। পরবর্তীকালে জুইংলি ও ক্যালভিন-সহ কিছু লোক এই আন্দোলনকে শক্তিশালী করে। সর্বশেষ এই আন্দোলন প্রটেস্টান্ট দলের নামে রোমের গির্জার বিপরীতে একটি আলাদা ধর্মের আকৃতি ধারণ করে। এই দলের প্রতিষ্ঠা খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিশাল বিভক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। রোমের গির্জা তাদেরকে দমনের জন্য পুরো রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে এবং তাদেরকে ধর্মহীন ঘোষণা দিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। বন্দী ও হত্যা ছাড়াও অগণিত মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু ইউরোপের অবস্থা এতটাই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল যে, এই আন্দোলন নিঃশেষ হওয়ার পরিবর্তে আরও অধিক শক্তিশালী হতে থাকে।
১৫২৯ সালে যখন ক্যাথলিক চার্চ (Lutheran) লুথারিয়ানদের সাথে তিন বছরের সমঝোতা চুক্তির সময় শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন এই আন্দোলনকে প্রটেস্টান্ট নাম দেওয়া হয়। কারণ তখন লুথারিয়ান শাহজাদারা প্রোটেস্ট করে এবং প্রতিবাদী ইশতিহারে স্বাক্ষর করে। প্রোটেস্টান্টের শাব্দিক অর্থ প্রতিবাদকারী। এখন পারিভাষিক অর্থে এই নাম প্রত্যেক সেই সমস্ত দলের জন্য ব্যবহার করা হয়, যারা অর্থডক্স বা ক্যাথলিক গির্জার অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রটেস্টান্টের প্রসিদ্ধ শাখা চারটি, প্রথমটি লুথারিয়ান গ্রুপ - যেটা ইউরোপে ইভাঞ্জেলিকা (Evangelical) নামে প্রসিদ্ধ, দ্বিতীয় ক্যালভিনিস্ট (Calvinist), তৃতীয় আনাব্যপ্টিস্ট (Anabaptist) ও চতুর্থ এঙ্গালিকান (Angalican)। ১৯১০ সালের হিসাব অনুযায়ী সামষ্টিকভাবে সমস্ত প্রটেস্টান্ট দলের সদস্য মিলে হয় খ্রিষ্টানদের পাঁচ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান হিসাব মুতাবিক তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ইংল্যান্ডে ইভাঞ্জেলিকা চার্চ প্রতিষ্ঠা (প্রটেস্টান্ট দলের উত্থান)
প্রটেস্টান্ট দলের উত্থান তখন হয়, যখন ইংল্যান্ড সরকারীভাবে প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। আর এই ঘোষণা হয়েছিল ইংল্যান্ডের বাদশাহ হেনরি অষ্টমের যুগে। হেনরির কোনো ছেলে-সন্তান ছিল না। তাই সে তার প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আরেকটি বিয়ে করতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বাধা ছিল, এই তালাক বাস্তবায়ন হওয়ার জন্য রোমের পোপের অনুমতি আবশ্যক ছিল। কেননা, খ্রিষ্টানদের ধর্মের নীতি অনুযায়ী তালাক প্রায় হারামের পর্যায়ে ছিল। এমনিভাবে দ্বিতীয় বিয়েও হারাম ছিল। এ ছাড়াও আরও বড় সমস্যা হলো, এই রানি ছিল গির্জার অনুগত।
হেনরি ১৫৩২ সালে গির্জার অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করে নেয়। সেই বিয়েকে গির্জা অবৈধ ঘোষণা করে হেনরির ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এবং ইংল্যান্ডের সমস্ত ধর্মীয় ক্ষমতা উঠিয়ে নেয়। হেনরি যেহেতু শক্তিশালী বাদশাহ ছিল; তাই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গির্জা চার্চ অফ ক্যান্টারবারি—যা রোমান ক্যাথলিক চার্চের অধীনে ছিল—আইন করে সেটাকে ইংল্যান্ডের বাদশাহর অধীনে নিয়ে নেয়। নিজেই এর প্রধান হয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চালু করে দেয়। বাদশাহ এই গির্জার বড় পাদরি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করে। এই নতুন গির্জার নাম চার্চ অফ ইংল্যান্ড রাখা হয়। চার্চ অফ ইংল্যান্ড রোমের পোপের অধীনে ছিল না; কিন্তু সেই সময় যে আচার-অনুষ্ঠান সেখানে পালন হতো, তা রোমান ক্যাথলিক ধর্ম অনুযায়ীই ছিল। চার্চ অফ ইংল্যান্ড রোম থেকে আলাদা হওয়া ইউরোপের ইতিহাসে বড় একটি ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আলাদা হওয়ার ফলে প্রটেস্টান্ট ধর্ম ব্রিটেনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। হেনরি ও তার বড় মেয়ে মেরি ইংল্যান্ডের গির্জাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আলাদা করলেও তারা রোমান ক্যাথলিক ধর্ম ছাড়েনি। কিন্তু তার দ্বিতীয় মেয়ে এলিজাবেথ প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করে নেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এলিজাবেথ কেন প্রটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিল? কারণ ছিল রাজনৈতিক। রাজনৈতিক কারণে এলিজাবেথ প্রটেস্টান্ট হতে বাধ্য হয়েছিল। যেমনটা আমরা ওপরে বলেছি, হেনরি দ্বিতীয় বিয়ে গির্জার অনুমতি ব্যতীত করেছিল; তাই তার বিবাহকে গির্জা অস্বীকার করেছিল। এখন যেহেতু বিয়েই বৈধ হয়নি; তাই সেই স্ত্রীর ঘর থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। আর কোনো বাদশাহর সন্তানকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে সেই সন্তান বাদশাহির দাবিদার হতে পারে না। সুতরাং এলিজাবেথের পক্ষে ক্যাথলিক ধর্মানুযায়ী বাদশাহির দাবিদার হওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রটেস্টান্ট ধর্মানুযায়ী কোনো সমস্যা ছিল না। তাই এলিজাবেথ প্রটেস্টান্ট ধর্মের দিকে ধাবিত হয়।
হেনরির পর তার মেয়ে মেরি রানি হয়ে চার্চ অফ ইংল্যান্ডকে পুনরায় রোমান ক্যাথলিক গির্জার সাথে মিলিত করার চেষ্টা করে। রোমান ক্যাথলিকদের সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহের কারণ ছিল যাতে এলিজাবেথ মেরির মোকাবিলায় বাদশাহির দাবিদার হতে না পারে। কিন্তু এলিজাবেথ প্রটেস্টান্ট দলের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে মেরিকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই ইংল্যান্ডের রানি হয়ে যায় এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ডকে আবারও রোম থেকে আলাদা করে ফেলে। এলিজাবেথ একজন শক্তিশালী রানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সে-ই প্রথম রানি, যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ব্যবসার জন্য অনুমতি দেয়। তার রাজত্ব প্রায় পঞ্চাশ বছর পরিব্যাপ্ত ছিল। এই পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডে প্রটেস্টান্টদের শক্তি অনেক বৃদ্ধি পায়। এলিজাবেথের ক্ষমতা রোমান ক্যাথলিক গির্জার শাসনব্যবস্থার জন্য অনেক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।
১৬০৩ সালে এলিজাবেথের পর জেমস প্রথম ইংল্যান্ডের বাদশাহ হয়। জেমস রোমান গির্জার দিকে ধাবিত ছিল; কিন্তু ইংল্যান্ডের জনগণ এলিজাবেথের যুগে স্বাধীন হিসেবে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল; ফলে জেমস তাদেরকে তৎক্ষণাৎ কাবু করতে সক্ষম ছিল না। তাই জেমস ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে একটু কৌশলে কাজ করার চেষ্টা করে।
সেই কৌশল ছিল, প্রটেস্টান্ট ও ক্যাথলিকদের একসাথে নিয়ে চলা। ধর্মীয় পরিচয়ের এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য জেমস সাতচল্লিশজন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। যাদের কাজ ছিল ধর্মীয়ভাবে উভয় দলকে একত্রিত করা। কিন্তু ইংল্যান্ডের রোমান ক্যাথলিকরা জেমসের এই কার্যক্রমকে ধর্মের মধ্যে বিকৃতি মনে করে বসে এবং তারা এই কার্যক্রমের বিরোধী হয়ে যায়। তারা বাদশাহকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রোমান ক্যাথলিকরা চক্রান্ত করে যে, বাদশাহ যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেবে, তখন পার্লামেন্টকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু এই চক্রান্ত প্রকাশিত হয়ে যায়; ফলে বাদশাহ ক্যাথলিকদের বিরোধী হয়ে যায়। যার পর প্রটেস্টান্ট দল ইংল্যান্ডে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়।
জেমসের মৃত্যুর পর চার্লস প্রথম বাদশাহ হয়। সে এই নীতি গ্রহণ করে যে, 'বাদশাহর সিদ্ধান্ত মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আদেশ'-যা ছিল রোমান ক্যাথলিকদের বিশ্বাস। অন্যদিকে প্রটেস্টান্ট দল মনে করত, পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত আল্লাহ তাআলার আদেশের বহিঃপ্রকাশ। চার্লসের যুগে ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রটেস্টান্ট ধর্ম অনেক শক্তিশালী হয়ে গিয়েছিল। তারা চার্লসের চিন্তাধারাকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শের ধারক মনে করে এবং প্রটেস্টান্টদের শাখা 'পিউরিটান' সেনাপতি অলিভার ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে চার্লসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহের ফলে চার্লস প্রথম নিহত হয় এবং ক্রমওয়েল ইংল্যান্ড থেকে বাদশাহি প্রথাকে নিঃশেষ করে দেয়। ক্রমওয়েল ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এর মাধ্যমে একদিকে ইংল্যান্ডে রোমান ক্যাথলিকরা দুর্বল হয়ে প্রটেস্টান্টরা শক্তিশালী হয়ে যায়। অপরদিকে বাদশাহরা দুর্বল হয়ে পার্লামেন্ট শক্তিশালী হয়ে যায়। ক্রমওয়েলের এই বিদ্রোহ দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারেনি। ১৬৬০ সালে তার মৃত্যুর পর বাদশাহি শাসনব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ক্রমওয়েল ইতিহাসে যে প্রভাব ফেলার দরকার ছিল, তা সম্পন্ন করে যায়। সেই প্রভাবের মধ্যে ছিল, প্রটেস্টান্ট দলকে শক্তিশালী করা, পার্লামেন্টকে বাদশাহদের ওপর জয়ী করা। সর্বশেষ পরিপূর্ণভাবে এই বিষয়টি ১৬৮৮ সালে সম্পন্ন হয়, যাকে ব্রিটেনের ইতিহাসে '১৬৮৮ সালের মহান বিপ্লব' বলা হয়ে থাকে।
ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালের 'মহান বিপ্লব' (খ্রিষ্টান-ইহুদি জোটের প্রথম পদক্ষেপ)
১৬৮৫ সালে জেমস দ্বিতীয় সিংহাসনে বসে। সে বাদশাহি বিশ্বাসের দিক থেকে ক্যাথলিক ছিল এবং বাদশাহের ইচ্ছাকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হওয়ার বিশ্বাস রাখত। জেমস দ্বিতীয় ইংল্যান্ডকে আবারও ক্যাথলিকদের দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু ব্রিটেনের পার্লামেন্টসহ তার মেয়ে মেরি ও তার জামাতা উইলিয়াম ক্যাথলিকদের সাথে মিলিত হতে বাধা দেয়। যার ফলে জেমসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে হত্যা করা হয়। তারপর মেয়ে মেরি, যে প্রটেস্টান্ট ধর্মের অনুসারী ছিল এবং তার স্বামী উইলিয়ামকে সম্মিলিতভাবে ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে ১৬৮৮ সালের এই বিপ্লবকে 'মহান বিপ্লব' (Glorious Revolution) বলা হয়। ১৬৮৮ সালের এই বিপ্লব শুধু ব্রিটেন ও ইউরোপে নয়; বরং পরবর্তী দুইশ বছরের মধ্যে পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক অবস্থার ওপর অনেক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। গির্জা ও বাদশাহদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং প্রটেস্টান্ট ও ক্যাথলিক ধর্মের লড়াই, যা মূলত মধ্যযুগ থেকে শুরু হয়েছিল, এখন তা আস্তে আস্তে নিজস্ব রং ধারণ করা শুরু করেছে। অতঃপর এই পরিবর্তন ব্রিটেন থেকে বের হয়ে ইউরোপের মধ্যে ছড়ানো শুরু করে। ১৬৮৮ সালের বিপ্লব থেকে সৃষ্ট পরিবর্তন ও প্রভাব আমরা নিচে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করছি:
ইংল্যান্ডের সেই বিপ্লবের ফলে সরকারীভাবে রোমান ক্যাথলিক গির্জার প্রভাব ব্রিটেন থেকে সর্বদার জন্য নিঃশেষ হয়ে যায় এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ড একটি আলাদা গির্জার আকৃতি ধারণ করে। এই ঘটনাকে ব্রিটেনে ক্যাথলিকদের পরাজয় ও প্রটেস্টান্ট ধর্মের বিজয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ইংল্যান্ডের এই চার্চ পূর্ণভাবে ক্যাথলিকদের বর্জন করেনি, আবার পূর্ণভাবে প্রটেস্টান্টকেও আঁকড়ে ধরেনি। নিজেদের ব্যাপারে তাদের দাবি ছিল, 'এই চার্চ ক্যাথলিক ধর্মানুযায়ী প্রতিষ্ঠিত, যেখানে প্রটেস্টান্ট সংশোধনী বাস্তবায়িত হয়েছে।'
চার্চ প্রটেস্টান্ট নীতিমালা ও পরিভাষা গ্রহণ করে নেওয়ার ফলে ব্রিটেনের মধ্যে বাদশাহদের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায় এবং পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে যায়। কারণ 'মার্টিন লুথার' ও 'ক্যালভিন'-এর থিউরিতে 'বাদশাহর ক্ষমতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ন্যস্ত' এই বিশ্বাসের পরিবর্তে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বাদশাহির ধারণা উপস্থিত ছিল। ফলে শাসনক্ষমতা ক্যাথলিক ধর্মমতে আল্লাহ তাআলার বিধান অনুযায়ী পরিচালনার বাধ্যবাধকতা রহিত হয়ে যায়; বরং তার পরিবর্তে প্রটেস্টান্ট সংশোধনীর ভিত্তিতে সেক্যুলার থিউরি অনুযায়ী হুকুমত পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়, যেখানে খ্রিষ্টানরা সেক্যুলার নীতিমালা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবে। শুধু এতটুকুই শর্ত ছিল যে, সেক্যুলার প্রশাসন কোনো খ্রিষ্টানকে তার ধর্মীয় অপরাধের দিকে ধাবিত করতে পারবে না।
তখনকার সময় পরিপূর্ণভাবে পার্লামেন্টের কাছে ক্ষমতা আসেনি; বরং ব্রিটেনের ক্ষমতা এক নতুন দিকে চলা শুরু করে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে দুটি অংশ হয়ে যায়। একটি টোরি পার্টি ও দ্বিতীয়টি হুইগ পার্টি। টোরি পার্টিকে বাদশাহদের পার্টিও বলা হয়। আর হুইগ পার্টিকে পার্লামেন্টের সংবিধানে বিশ্বাসীদের পার্টিও বলা হতো। সময়ের সাথে সাথে হুইগ পার্টির নাম লিবার পার্টি ও টোরি পার্টি আজকের কনজারভেটিভ পার্টি হয়ে যায়। এই দুই পার্টি আজও ব্রিটেনের ক্ষমতার নব্বই শতাংশ দখল করে আছে।
আমেরিকা-আবিষ্কার ও প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানদের আশ্রয়কেন্দ্র
আমেরিকা আবিষ্কার হয় ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হাতে। আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপের দেশগুলো এই নতুন ভূখণ্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমেরিকা মহাদেশের স্বর্ণ ও রূপার ভান্ডার হিংস্র পশুর মতো লুটপাটের ফলে ইউরোপের শিল্প-বিপ্লব সম্ভব হয়। ব্রিটেনের পূর্বেই উত্তর আমেরিকাতে পর্তুগাল, ওলান্দাজ ও স্পেন অনেক ভূমি দখল করে নিয়েছিল; কিন্তু ১৬০৭ সালে ইংরেজরা তাদের আস্তে আস্তে উত্তর আমেরিকা থেকে বের করে দেয়। এই শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ এলাকার ওপর ব্রিটেনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সেই আবাদিগুলোতে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম ব্রিটেন সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হওয়ার আওয়াজ তোলে এবং বিশাল যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। ১৭৭৬ সালে উত্তর আমেরিকার অঞ্চলগুলো ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নেয়। আর এভাবেই আমেরিকাতে নতুন এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভাঞ্জেলিকান চার্চ অফ ইংল্যান্ড নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে নেয়, যা ছিল প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানদের বৈশ্বিক চার্চ। অতঃপর অন্যান্য প্রটেস্টান্ট দলের খ্রিষ্টানরাও ইউরোপের নির্যাতন থেকে পলায়ন করে সময়ে সময়ে আমেরিকাতে আসতে থাকে। এদের মধ্যে প্রটেস্টান্টদের কট্টর শাখা পিউরিটানও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ১৬২০ সালে ধর্মীয় সফরের মাধ্যমে প্লেমাথ ও ম্যাসচুস্টেস এলাকাতে আবাদ হয়।
আমেরিকাতে ইহুদিবাদী খ্রিষ্টানদের ঘাঁটি স্থাপন (ক্রুসেড-ইহুদি জোটের দ্বিতীয় পদক্ষেপ)
ইউরোপে গির্জার নির্যাতনের ফলে প্রটেস্টান্ট দলের সাথে ইহুদিরাও আমেরিকাতে চলে আসে। ১৬৩৫ সালে আমেরিকার রোহাড দ্বীপে তাদের সর্বপ্রথম নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে আমেরিকাতে ইহুদিদের ব্যাপকভাবে আগমন ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে হয়েছিল। বিশেষ করে ১৮৮১ থেকে ১৯২৪ খ্রি. পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপ থেকে ইহুদিরা ধারাবাহিক আমেরিকাতে আসছিল। হলোকাস্ট থেকে বাঁচার জন্য ইহুদিদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। বাস্তবতা হলো, আমেরিকার ক্ষমতা প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের হাতে আজও পর্যন্ত অটল রয়েছে।
যদি সেই যুগের ইতিহাসের বিস্তারিত আলোচনা করে ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনা করা হয়, তাহলে কয়েকটি ফলাফল স্পষ্টভাবে সামনে আসবে:
• ইউরোপে জন্ম নেওয়া মতাদর্শগুলো আমেরিকাতে আরও অধিক শক্তিশালী হতে থাকে। কেননা, সেখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা ছিল না। আমেরিকাতে ইউরোপের সেই সমস্ত ব্যক্তি একত্রিত হয়েছিল, যারা ক্যাথলিক গির্জার সংকীর্ণ চিন্তাধারা ও কঠোরতা থেকে পলায়ন করেছিল।
• আমেরিকাতে প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা পারস্পরিক চিন্তাগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য শূন্য ময়দান পেয়ে যায়। যার ফলে আমেরিকাতে ইহুদিবাদী ক্রুসেড স্কুল অফ থট প্রতিষ্ঠিত হয়, যাকে 'নিও কনসারভেটিভ' (Neo Conservatives) বা 'নিও কন' (Neo Con) বলা হয়।
• আমেরিকাতে ইউরোপের তুলনায় ধর্মহীন সেক্যুলার বিশ্বাস আরও অধিক উজ্জ্বলভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। পক্ষান্তরে ইউরোপে এখনো প্রচলিত ধর্মের ঝলক দেখা যায়।
• আমেরিকাতে শুরু থেকেই বাদশাহি শাসনব্যবস্থা প্রতষ্ঠিত ছিল না।
ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রসমূহের প্রতিষ্ঠা (১৬১৮-১৬৪৮ খ্রি.)
ইউরোপের মধ্যে একদিকে সেক্যুলার চিন্তার বিপ্লব মানুষের মন-মস্তিষ্ক পরিবর্তন করছিল, অপরদিকে সংশোধন আন্দোলন গির্জাকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে দিচ্ছিল। তৃতীয় দিক থেকে প্রটেস্টান্ট নীতিমালা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ বাদশাহদের থেকে বিমুখ হয়ে পার্লামেন্টের দিকে ছুটছিল। অপরদিকে ইউরোপে আরও একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা পরবর্তী যুগে বিশ্বের ইতিহাসে খুব গভীর প্রভাব রেখেছিল। এটা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত ৩০ বছরের যুদ্ধ এবং যার ফলে হয় ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি।
আর এটা ছিল রেনেসাঁর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ৩০ বছরের যুদ্ধের পর নতুন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের থিউরি সামনে আসে। এই থিউরির গর্ভ থেকেই আজকের (দ্বীনের ঊর্ধ্বে) জাহিলি দেশপ্রেমের মতাদর্শ ও আধুনিক জাতীয়তাবাদী বাহিনীর মধ্যে (দ্বীনের পরিবর্তে) দেশের জন্য যুদ্ধের আদর্শ অস্তিত্বে আসে।
যেমনটা মধ্যযুগের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি যে, খ্রিষ্টানদের ইউরোপে উত্থান হয়েছিল রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই সাম্রাজ্য ৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের ভৌগলিক সীমা সময়ের সাথে পরিবর্তন হচ্ছিল। এর মধ্যে আজকের জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, যুগোস্লাভিয়া, সুইডেন, হাঙ্গেরি, বুহেমিয়া ও স্পেনের অনেক এলাকা অন্তর্গত ছিল। এগুলো ছাড়াও অনেক শহর ও রাষ্ট্র আলাদাভাবে যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের সাথে সাথে হোলি রোমান এস্প্যায়ার দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার অধীন রাষ্ট্রগুলো নিজে নিজেই স্বাধীন হয়ে যায়।
১৬১৮ সালে রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। এই যুদ্ধকে ইউরোপের ইতিহাসে ‘থার্টি ইয়ারস ওয়ার' বলা হয়। এই যুদ্ধের কারণগুলো অনেক দুর্বোধ্য। এখানে রোমান সাম্রাজ্যের প্রায় সমস্ত রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যের বাইরের রাষ্ট্রগুলোও অংশগ্রহণ করেছিল। ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধের বড় দুটি কারণ বলেছেন, ধর্মীয় ও ভৌগলিক সম্প্রসারণ। ধর্মীয় এই জন্য ছিল, কারণ, এই যুদ্ধ রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে হয়েছিল। এ ছাড়াও রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের ভৌগলিক সীমা বৃদ্ধি করাও লক্ষ্য ছিল। এই যুদ্ধ শেষ হয় ‘ওয়েস্ট ফেলিয়া' নামক প্রসিদ্ধ চুক্তির মাধ্যমে।
ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তির অধীনে অনেক প্রটেস্টান্ট রাষ্ট্রের নিজেদের ধর্মীয় নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা অর্জিত হয়ে যায়। ফলে এটা ছিল প্রটেস্টান্টদের আরও একটি বিজয়। অপরদিকে এই চুক্তির অধীনের হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, মালান, সুয়াই, গিনি, মানছুয়া, ঠাসকেনি, লোকা, এডমিনা, পারমা রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতা অর্জন করে নেয়। এই চুক্তি শুধু ইউরোপ নয়; বরং আধুনিক পুরো বিশ্বের ভৌগলিক বিভক্তির উৎস ছিল। এই চুক্তি থেকেই নতুন রাষ্ট্র, শহর, ভৌগলিক সীমা নির্ধারণ, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, দেশাত্ববোধ এবং জাতীয়তাবাদী বাহিনীর থিউরি ও মতাদর্শগুলো সামনে আসে। অতঃপর যখন খিলাফতে উসমানির পতন হয়, তখন এই সূত্রই আরব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদের চেতনা মুসলিমদের মধ্যে তৈরি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন উসমানি সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলো স্বাধীন হয়, তখন এই থিউরির ভিত্তিতেই নতুন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অস্তিত্বে আসে। আজ মুসলিম উম্মাহ সাতান্নটি রাষ্ট্রে বিভক্ত। সাতান্নটি বাহিনী ও সাতান্নটি জাতীয়তা। এই সবের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। আজকের নতুন দেশীয় রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, যা জাতিসংঘে গ্রহণযোগ্য, সেখানে চারটি শর্ত রয়েছে। সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব, আবাদি, ভৌগলিক সীমানা এবং প্রশাসন। এই সবগুলোর ভিত্তি এই অভিশপ্ত ওয়েস্ট ফেলিয়া চুক্তি।
ব্রিটেনে পার্লামেন্টের উন্নতি ও উত্থান
ইউরোপের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্রিটেনে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া শুরু হয়। মেঘনা কার্টা চুক্তি ব্রিটেনে পার্লামেন্ট-ব্যবস্থার যেই ভিত্তি রেখেছিল, রেনেসাঁর যুগে এই ব্যবস্থা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়। যার কয়েকটি কারণ আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি। ১২১৫ সালে সম্রাট জন প্রথমের সময় মেঘনা কার্টা চুক্তি হয়েছিল; যার ফলে জনগণের জন্য একটি পরামর্শ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু যখন তার ছেলে হেনরি তৃতীয় সিংহাসনে বসে, তখন তার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের এক জাগিরদার সাইমন ডি মন্টফোর্ট বিদ্রোহ করে বসে। এই বিদ্রোহের পর সাইমন ইংল্যান্ডের একটি এলাকাতে নিজস্ব স্বাধীন হুকুমত প্রতিষ্ঠা করে এবং সেই হুকুমতের প্রশাসন পরিচালনার জন্য সে জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মিলিত একটি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করে। হেনরি তার বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠায়; ফলে সাইমন যুদ্ধে মারা যায়। কিন্তু সে ইংল্যান্ডে এমন একটি নতুন রীতি চালু করে দিয়ে যায়, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। এই প্রথার ফলেই পরবর্তী সময়ে এডওয়ার্ড প্রথম ১২৯৫ সালে পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়। সরকারীভাবে ইংল্যান্ডের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম পার্লামেন্ট।
১৩৪১ সালে এই পার্লামেন্টকে দুটি অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়। নবাব ও জাগিরদারদের জন্য একটি অংশ, যাকে প্রভুদের ঘর বলা হতো। আর যেখানে জনগণের ফয়সালা হতো, তাকে প্রজাদের পরিষদ বলা হতো। ১৫৪৪ সালে প্রভুদের পরিষদের নাম 'হাউজ অফ লর্ডস' রাখা হয়, অন্যদিকে জনগণের পরিষদকে 'হাউজ অফ কমন্স' রাখা হয়। বর্তমানেও ব্রিটেনের পার্লামেন্টে এই দুটি হাউজ উক্ত নামেই রয়েছে।
এডওয়ার্ড তৃতীয় এর সময় পার্লামেন্টের শক্তি তখন বৃদ্ধি হয়, যখন পার্লামেন্ট বাদশাহর অনুমতি ছাড়াই জনগণের ওপর কিছু ট্যাক্স বসিয়ে দেয়। পার্লামেন্ট ও বাদশাহদের এই রেষারেষি কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত চলমান ছিল। যখন বাদশাহ দুর্বল হয়ে যেত, তখন পার্লামেন্ট শক্তিশালী হয়ে যেত। আর যখন বাদশাহ শক্তিশালী হয়ে যেত, তখন পার্লামেন্ট দুর্বল হয়ে যেত। বাদশাহ ও পার্লামেন্টের মাঝে এই দ্বন্দ্বের মধ্যে চূড়ান্ত পরিবর্তন আসে, যখন ক্রমওয়েল বাদশাহিকে খতম করে পার্লামেন্টকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। অতঃপর ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালের মহান বিপ্লবে পার্লামেন্টের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়।
জানা থাকা জরুরি যে, ব্রিটেনের এই পুরাতন পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের আজকের গণতান্ত্রিক পার্লামেন্টের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। পুরাতন পার্লামেন্ট ধর্ম থেকে স্বাধীন ছিল না এবং তা সমাজের নেতাদের কথা ও নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হতো। অর্থাৎ তার সদস্য হওয়ার পদ্ধতি আজকের মতো অধিকাংশের রায় ছিল না; বরং গ্রহণযোগ্যতা ছিল সদস্য হওয়ার মাপকাঠি। তেমনই সদস্য নির্বাচন 'এক মানুষ এক ভোট' এই নীতিতে ছিল না; বরং জাতির বড় বড় ব্যক্তিত্বরা সরকার নির্বাচন করত। ফরাসি বিপ্লবের পর এই পার্লামেন্ট পূর্ণভাবে নতুন সেক্যুলার গণতান্ত্রিক আকৃতি ধারণ করে। এই বিষয়ে সামনে আরও অধিক আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
ইউরোপে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উত্থান ও উন্নতি
ইউরোপের মধ্যে রেনেসাঁর যুগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আসার মৌলিক কারণ ছিল ইউরোপের গির্জা, বাদশাহ ও জাগিরদার ব্যবস্থার জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া। গির্জার মূল শিক্ষা ছিল আত্মীয়তার বন্ধন এবং সমাজের মধ্যে সত্যবাদিতা ও কল্যাণকামিতা। কিন্তু বাস্তবে গির্জার পাদরি, বাদশাহ ও জাগিরদার নিজেরাই জনগণের সম্পদ লুটে নেওয়া ও জমা করার মধ্যে ব্যস্ত ছিল। তাদের জীবনযাপন দেখে এমনটা মনে হতোই না যে, তাদের সাথে আল্লাহ তাআলার দ্বীনের কোনো সম্পর্ক আছে। গির্জা ও তাদের কাজের বৈপরীত্য তাদের ধর্মীয় প্রভাব নষ্ট করে ফেলে। আর এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ রেনেসাঁর যুগে ইউরোপের জনগণ এমন বিষয়গুলোকে গ্রহণ করে নেয়, যা গির্জা ও তার শিক্ষার বিরুদ্ধে ছিল।
দ্বিতীয় কারণ ছিল, ইউরোপের মধ্যে চতুর্দশ শতাব্দীর মহামারি যাকে 'ব্ল‍্যাক ডেথ' বলা হয়। এই মহামারির ফলে ইউরোপে শ্রমিক, ক্রেতা ও উৎপাদনকারী জনগণের পরিমাণ অনেক কমে যায়। যার ফলে জনগণ শহরের দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে এবং শহরের জনগণ নতুন ভূমির তালাশে হিন্দুস্থান ও আমেরিকার দিকে সফর করতে শুরু করে। এই মহামারিতে প্রভাবিত হয়ে সেই সময় ইউরোপের প্রশাসনগুলো হিন্দুস্থানের দিকে নিজ নিজ ব্যবসায়িক কোম্পানি পাঠানো শুরু করে।
ইউরোপের সামাজিক নীতিমালা পরিবর্তনের তৃতীয় কারণ ছিল, প্রটেস্টান্টদের সংশোধন আন্দোলন ইউরোপে সফলতা লাভ করা। যার ফলে খ্রিষ্টানদের মধ্যে বস্তুবাদ ও দুনিয়াপূজার চিন্তা বৈধতা পেয়ে যায়। বাদশাহরা সম্পদ জমা করার অনুমোদন পেয়ে যায়।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল দর্শন
পুঁজিবাদী চিন্তাধারার বিস্তারিত আলোচনা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা এখানে শুধু তার মৌলিক থিউরিগুলো উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল থিউরি হচ্ছে, মানুষ সকল কাজ নিজের বস্তুগত ফায়দা ও ব্যক্তিগত চাহিদার পূর্ণতার জন্য করে। এর জন্যই সে ব্যবসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পেশা ও কাজ গ্রহণ করে নেয়। তাই সবারই অধিক থেকে অধিক ফায়দা অর্জনের জন্য কাজ করার অধিকার লাভ করা উচিত। মানুষ নিজের লাভের জন্য (সেলফ ইন্টারেস্ট) অধিক কাজ করার দ্বারা সমাজ অধিক লাভবান হবে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, পুঁজি বৃদ্ধি করা ও জমা করা। এই পুঁজি তখনই বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব, যখন মানুষ অধিক থেকে অধিক উৎপাদন করা বা ব্যবসা করা এবং পণ্য প্রচারের সুযোগ পাবে।
উৎপাদন ও ব্যবসার কাজ হচ্ছে, কেউ উৎপাদন বা ব্যবসার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করবে। আর অন্য কেউ পণ্য উৎপাদনের জন্য শ্রম দেবে এবং কেউ উৎপাদন ও ব্যবসার জন্য ভূমি দেবে। অতঃপর উৎপাদিত দ্রব্য ও ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রির ফলে লাভ অর্জিত হবে। এই লাভ থেকে শ্রমিক, পুঁজিদাতা, ভূমিদাতা ও ব্যবসায়ী সবাই নিজের অংশ গ্রহণ করবে।
এই সব কাজের জন্য এমন এক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল, যেখানে প্রশাসনের প্রভাব অনেক কম থাকবে। অর্থাৎ প্রশাসনের ট্যাক্স কম হবে এবং সমস্ত প্রতিষ্ঠান প্রাইভেটভাবে কাজ করবে। এই ব্যবস্থার অধীনে মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিক থেকে অধিক সুযোগ লাভ করবে। ফলে তা প্রতিযোগিতার এক বিশাল ময়দান তৈরি হবে। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি অধিক থেকে অধিক লাভ অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং পুঁজি বৃদ্ধি করতে পারবে। এই ব্যবস্থাকেই বর্তমানে স্বাধীন বাণিজ্য বা ফ্রি ইকোনমি বলা হয়ে থাকে।
এই দর্শন ও থিউরির ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপের মধ্যে কোম্পানির ব্যবসা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং কারেন্সি নোট প্রচলিত হয়, যাকে আজ পেপার কারেন্সি বলা হয়ে থাকে। তাই আমরা কোম্পানি, ব্যাংক ও কারেন্সির ইতিহাসে একবার দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক মনে করছি।
আন্তর্জাতিক কোম্পানির ইতিহাস
ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার দরুন সেখানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। যা ইউরোপের জাগিরদার ব্যবস্থার ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। শ্রমিক শ্রেণি কমে যাওয়ার ফলে জাগিরদারদের উৎপাদন কমে আসে এবং শ্রমিকদের পারিশ্রমিক অনেক বেড়ে যায়। জনগণ কমে যাওয়ার ফলে আমদানি ও রপ্তানি কমে আসে। যার ফলে ইউরোপের মধ্যে বাজার কমে যেতে শুরু করে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে ইউরোপের জন্য আবশ্যক হয়ে যায় যে, তারা নিজেদের সম্পদ বিক্রির জন্য নতুন বাজার ও প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের জন্য সস্তা উপনিবেশ খুঁজে বের করবে। যার ফলে ইউরোপের জাগিরদাররা সামুদ্রিক পথে নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকা তালাশে বের হয়, কেননা স্থলভূমির রাস্তাগুলো সব উসমানিদের অধীনে ছিল। ইউরোপের জাগিরদাররা সামুদ্রিক সফরে ব্যবসার থেকে বেশি ঝগড়া-ফাসাদেই লিপ্ত ছিল। যাদের মধ্যে পর্তুগাল, জার্মানি, ফ্রান্স, ওলন্দাজ, স্পেন এবং ইংরেজ সবাই শামিল ছিল। তারা সেসব ক্ষুধার্ত ভেড়ার মতো ছিল, যারা নিজেদের শিকারকে গাফিল দেখে কেবল তাকেই আহার করে না; বরং পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে থাকে।
এখান থেকেই কোম্পানির উত্থান হয়, যা মূলত তখনকার সময় ইউরোপের জাগিরদাররা ব্যবসার উদ্দেশ্যে গঠন করেছিল। তার মধ্যে একটি কোম্পানি উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে প্রসিদ্ধ হয়। এই যুগকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'ইউরোপে সম্পদ পুঞ্জিভূত করার যুগ' নাম দেওয়া যায়। এই যুগে বিশ্বের সমস্ত সম্পদ এসে পশ্চিমাদের কাছে জমা হয়ে যায়। অতঃপর এই কাঁচামাল ও সম্পদ দিয়ে ব্যবসার জন্য নতুন বাজারের খোঁজে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা তিনটি এলাকার দিকে অভিমুখী হয়। একটি আফ্রিকা মহাদেশ, দ্বিতীয়টি পূর্ব ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ ও তৃতীয়টি পাক-ভারত উপমহাদেশ। শুরুতে আফ্রিকার দিকে তাদের দৃষ্টি ছিল না। কেননা, সেই সময় আফ্রিকার বাসিন্দারাও সেখানের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপারে জানত না। কিন্তু তেল, সোনা, হীরা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ আবিষ্কারের পর পশ্চিমারা সেখানে এতটাই শক্তিশালী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে যে, আজও সেখানে সরকার বসানো ও নামানোর ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি হাত থাকে। আফ্রিকার মতো আমেরিকাও তাদের লক্ষ্য ছিল না। আমেরিকা তো হিন্দুস্থানের সংক্ষিপ্ত রাস্তা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার হয়ে যায়; তাই সেখানের আদি বাসিন্দাদের রেড ইন্ডিয়ান বলা হয়। যদিও আফ্রিকা বা আমেরিকাকে ইউরোপীয়রা কম লুটপাট করেনি; কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুস্থান। যেখানের শিল্প, অর্থ ও খনিজ সম্পদের ব্যাপারে তাদের খুব ভালোভাবেই জানা ছিল।
ইউরোপ থেকে হিন্দুস্থানে আসার দুটি রাস্তা ছিল। প্রথমটি সংক্ষিপ্ত রাস্তা রোম উপসাগর পাড়ি দিয়ে মিশর, সেখান থেকে লোহিত সাগর ও আরব সাগর হয়ে হিন্দুস্থান পৌঁছানো। এই রাস্তা পুরোটাই উসমানিদের অধীন ছিল। দ্বিতীয়টি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউন ঘুরে আরবসাগর হয়ে হিন্দুস্থান পৌঁছানো। প্রথমটি দিয়ে দুই মাসে আসা-যাওয়া করা যেত; কিন্তু দ্বিতীয় রাস্তা দিয়ে আট মাসের অধিক সময় লেগে যেত। দ্বিতীয় রাস্তাটিকে 'আশার রাস্তা' বা ক্যাপটাউনকে 'উত্তমাশা অন্তরীপ' বলা হয়। কেননা, এখান থেকে ইউরোপীয়রা নিজেদের কোম্পানি সমুদ্রপথে রওয়ানা করিয়ে দিত। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যে সমস্ত মাঝি সর্বপ্রথম বিলাতিদের হিন্দুস্থান পৌঁছার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল, তারা ছিল আরব মুসলিম। সর্বপ্রথম হিন্দুস্থানে এসেছিল পর্তুগাল, ওলন্দাজ ও ফ্রান্স এবং সর্বশেষ এসেছিল ব্রিটেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইংরেজরা বাকিদের তাড়িয়ে একাই হিন্দুস্থানের ওপর কব্জা করে নেয়। যদি বলা হয়, ব্রিটেনের হিন্দুস্থান দখল পশ্চিমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়, অতঃপর পুরো বিশ্ব দখলের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত শক্তি সঞ্চয় ও সাহায্যের ভূমিকা পালন করেছিল, তাহলে ভুল হবে না।
মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলিমদের থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ দ্বারা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপ ও আমেরিকাতে শিল্প-বিপ্লব হয়। এই সম্পদের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো ইউরোপে নতুন নতুন কারখানা চালু করা শুরু করে। এই কারখানাগুলোতে সস্তা শ্রমিকের জন্য আফ্রিকার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে হামলা করে লক্ষ লক্ষ কালো মানুষকে গোলাম বানিয়ে এনে তাদের দিয়ে ফ্রি কাজ করিয়ে নিত। বাস্তবে পশ্চিমাদের বস্তুগত উন্নতি হিন্দুস্থানের সম্পদ ও আফ্রিকার শ্রম এবং আমেরিকার ওপর অবৈধ দখলের ফলেই হয়েছিল। এই উৎপাদিত পণ্যকে বৈশ্বিক বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে খিলাফতে উসমানিয়ার আকৃতিতে একটি বড় বাধা বাকি রয়ে গিয়েছিল। শুধু স্থল ও জলের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাই নয়; বরং উসমানিদের নিয়ন্ত্রণাধীন পুরো ইসলামি বিশ্বও একটি বড় বাজার ছিল। পশ্চিমারা ষড়যন্ত্র করে ১৯২৪ সালে খিলাফতকে ধ্বংস করার পর এই বাধাও দূর হয়ে যায়। তারপর নতুন শাসনব্যবস্থার অধীনে মুসলিম উম্মাহকে পঞ্চাশের অধিক ছোট ছোট জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দেয় এবং সেই রাষ্ট্রগুলোর বাজার পর্যন্ত পৌছার রাস্তা তৈরি করে নেয়। আর এভাবেই ইউরোপ বৈশ্বিক বাজারের ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে নেয়।
এই সময়ে এসে পশ্চিমাদের সামনে কয়েকটি সমস্যা দেখা দেয়। পশ্চিমাদের পরিভাষা অনুযায়ী তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো নিজেদের বাজারে বহিরাগত পণ্য আমদানির ওপর শক্তিশালী বাধা ও মোটা অংকের ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছিল। যার ফলে ১৯২৯ সালে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে সেই পণ্যগুলো বিক্রি না হওয়াতে পশ্চিমা কারেন্সির মূল্য-স্ফীত হয়ে যায়। তখনও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এই সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি, এর মধ্যেই রাশিয়ার সমাজ-বিপ্লব এবং ইউরোপে জার্মানির ফ্যাসিবাদী নাজি বিপ্লব পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আঘাত করে। অতঃপর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যেখানে জার্মানি পরাজিত হয়। এই সব সমস্যার ফলে ইউরোপ বিশ্বের নেতৃত্বের দৌড়ে পিছিয়ে যায়। এরপর আমেরিকা ও রাশিয়া বিশ্বের দুটি বিশাল পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
রাশিয়া ও আমেরিকার কোল্ড ওয়ার ছিল মূলত এক প্রকারের বাণিজ্যিক যুদ্ধ। এই বাণিজ্যিক যুদ্ধে পুঁজিবাদী পশ্চিমা কোম্পানিগুলো অগ্রগামী হয়ে যায় এবং এক শতাব্দীর মধ্যে তারা নিজেদের এতটাই শক্তিশালী করে ফেলে যে, তারা তখন উৎপাদিত পণ্যকে বৈশ্বিক বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর সব সুবিধা ও মাধ্যমের ওপর পরিপূর্ণ কজা প্রতিষ্ঠা করে নেয়। এই শত বছরে কোম্পানির কাজের পদ্ধতি ও ধরনের মধ্যে কয়েকটি পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও সরকারী কোম্পানি ইত্যাদি কাঠামো এই অস্তিত্ব লাভ করেছে। আজকের নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের যুগে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো দেশীয় কোম্পানিগুলো থেকে অনেক বড় হয়ে গেছে। এর বিস্তারিত আলোচনা বইয়ের দ্বিতীয় অংশ নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মধ্যে করা হবে ইনশাআল্লাহ।
ব্যাংকের ইতিহাস
বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইউরোপের উন্নতির লক্ষ্যে কোম্পানিগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য একটি সুসংহত ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। আর এই প্রয়োজন থেকেই ব্যাংক ও কারেন্সির নতুন পদ্ধতি জন্ম হয়। ইউরোপে ব্যাংকের শুরু মূলত ক্রুসেড যুদ্ধ থেকে হয়েছে, যখন খ্রিষ্টান বাহিনীর সেনাদের বেতন পৌঁছানোর জন্য গির্জার পক্ষ থেকে নাইটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের নাইট টেম্পলার বলা হতো। এই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আধুনিক ইউরোপে ব্যাংক ও কারেন্সির শুরু ইহুদি মুদ্রাব্যবসায়ীদের থেকে হয়েছিল, যাদের ব্যবসা ব্যতীত অন্য কোনো পেশা গ্রহণের অনুমতি ছিল না। ব্যবসায়ীরা তাদের স্বর্ণ, রূপার কয়েন ও দামি বস্তুগুলো এদের কাছে গচ্ছিত রেখে তাদের থেকে রশিদ নিয়ে নিত। যখন ব্যবসায়ীরা কোনো কিছু ক্রয় করত, তখন মুদ্রাব্যবসায়ীরা সেই রশিদ দিয়ে দিত। বিক্রেতা ব্যবসায়ীর এই রশিদ নিয়ে মুদ্রাব্যবসায়ীর কাছে গেলে সে তাকে সেই পরিমাণ স্বর্ণ আদায় করে দিত।
একসময় ইহুদি মুদ্রাব্যবসায়ীরা দেখল, অনেক কম লোকই নিজেদের স্বর্ণ ওঠানোর জন্য তাদের কাছে আসে। কারণ তারা যখন ব্যবসার ক্ষেত্রে এই রশিদ ব্যবহার করে, তখন রশিদ হাসিলকারী স্বর্ণ না উঠিয়ে এই রশিদকেই আরও সামনে বাড়িয়ে দিত, তথা আরেকজনের কাছে হস্তান্তর করে দিত। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে এভাবে একের পর এক হস্তান্তর হতেই থাকত।
যার ফলে আস্তে আস্তে মুদ্রাব্যবসায়ীদের কাছে অনেক বেশি স্বর্ণ জমা হয়ে যায়। কেননা, শুধু ২০% বা তার থেকে কম ব্যক্তিরা স্বর্ণ নিতে আসত। তাই মুদ্রাব্যবসায়ীরা ২০% ব্যক্তিকে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ রেখে বাকিগুলো সুদি লোন বা ঋণের জন্য ব্যবহার শুরু করে। এভাবেই একসময় মুদ্রাব্যবসায়ীরা একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করে এবং সেটাই ছিল বর্তমান ব্যাংকের প্রাথমিক রূপ।
সময়ের সাথে সাথে প্রশাসনও এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করা শুরু করে। প্রশাসন তাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ এই ব্যাংকগুলোতে জমা করত এবং প্রয়োজনের সময় সেখানে তাদের মূল সম্পদের থেকেও বেশি যত ইচ্ছা ঋণ নিত। যার ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনগত বৈধতা অর্জিত হয়ে যায়। দেখতে দেখতে ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্রে ব্যাংকের শাখা খুলে দেওয়া হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানগুলো মুদ্রাব্যবসায়ী থেকে ব্যাংকে পরিবর্তন হয় এবং মুদ্রাব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ছিল ইহুদি, তাই আজ বিশ্বের ৮০% এর বেশি ব্যাংকের মালিক ইহুদি। এই ব্যাংকগুলো বিশ্বের সমস্ত জাতি, বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহকে গোলাম বানানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৬০৯ সালে সর্বপ্রথম ব্যাংক হল্যান্ডে খোলা হয়। ১৬৯৫ সালে ইংল্যান্ডে ব্যাংক খোলা হয়। তারপর ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পেয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়াসহ সব রাষ্ট্রেই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
কারেন্সির ইতিহাস
পরিভাষায় কারেন্সি বলা হয় কোনো জিনিস ক্রয় ও বিক্রয়ের মাধ্যমকে। ইসলামি শরিয়াহতে এটাকে সামান বা মূল্য বলা হয়ে থাকে। পূর্বযুগে স্বর্ণ ও রূপা কারেন্সি বা মূল্য হিসেবে ব্যবহার হতো। ইসলামি ফকিহরাও এই দুটিকে হাকিকি সামান বা মূল্য হিসেবে গণ্য করেছেন। অর্থাৎ যেকোনো জিনিসের মূল্য স্বর্ণ বা রূপার পরিমাণের দ্বারা নির্ধারণ হতো। ইসলামি সমাজে প্রকৃত মূল্য হিসেবে স্বর্ণ ও রূপার কয়েন দিরহাম ও দিনার প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন জাতি স্বর্ণ ও রূপা জমা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করত। বনি ইসরাইল মিশর থেকে বের হওয়ার সময় স্বর্ণ ও রূপা অলংকারের আকৃতিতে জমা করেছিল। এখনো এগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্য অলংকার বা ইটের আকৃতি দেওয়া হয়ে থাকে।
ইউরোপে স্বর্ণের কারবারের সাথে সংশ্লিষ্ট মুদ্রাব্যবসায়ীরা প্রধানত ইহুদিরা ছিল। তারা অধিকাংশই ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নিত; ফলে অন্য জাতির প্রভাবশালীদের মধ্যে সহজেই প্রবেশ করতে পারত। মুদ্রা ও প্রভাবশালীদের মধ্যে সম্পর্ক খুব গভীর ছিল। জনগণ নিজের উপার্জিত সম্পদ সংরক্ষণের জন্য মুদ্রাব্যবসায়ীদের কাছে অতিরিক্ত স্বর্ণ জমা রাখত। যার প্রমাণস্বরূপ মুদ্রাব্যবসায়ীরা তাদেরকে এই স্বর্ণের রশিদ দিত। একসময় ব্যবসায়ীরা মূল্য আদায়ের জন্য স্বর্ণের পরিবর্তে এই রশিদ পেশ করা শুরু করে। রশিদের মালিকের উচিত ছিল মুদ্রাব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে রশিদের বিনিময়ে জমাকৃত স্বর্ণ নিয়ে নেওয়া। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সহজতার জন্য এই রশিদকেই ব্যবসার ক্ষেত্রে পরবর্তী লেনদেনে ব্যবহার করে ফেলত। আর এভাবেই রশিদগুলো স্বর্ণ-রূপার পরিবর্তে প্রচলিত কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার হওয়া শুরু হয়। এই রশিদগুলো বর্তমানের কারেন্সি নোটের প্রাচীন রূপ ছিল। এই রশিদ মুদ্রাব্যবসায়ী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যকার স্মারক হিসেবে ব্যবহার হওয়ার কারণে 'নোট' বলা শুরু হয়। পূর্বে যেহেতু এই কারেন্সির বিপরীতে স্বর্ণের মজুদ থাকা আবশ্যক ছিল, তাই আপনি আজও অধিকাংশ নোটের মধ্যে এই লেখা দেখতে পাবেন, 'রাষ্ট্রীয় ব্যাংক চাহিবামাত্রই ইহার বাহককে ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে।' অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় জামানত থেকে এই কারেন্সি জারি হয়েছে। যাতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দস্তখত আছে। লেখাটিতে 'ইহা' দ্বারা উদ্দেশ্য নোট এবং 'টাকা' দ্বারা উদ্দেশ্য স্বর্ণ বা রূপার কয়েন।
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন (১৬৭৫-১৭৮৯ খ্রি.)
ইউরোপে মধ্যযুগে সংগঠিত হিউম্যান রাইটস এবং বিজ্ঞান বনাম ধর্মের দ্বন্দ্বে যুক্তিকে ইলমে ওহির বিপরীতে দলিল হিসেবে গণ্য করা হতো। এখন ইউরোপের দার্শনিকরা নিজেদের অসম্পূর্ণ বুদ্ধির ভিত্তিতে এই ফয়সালা দেয় যে, মানুষ স্বাধীন হিসেবে জন্ম নিয়েছে; কিন্তু ধর্ম ও বাদশাহরা এদেরকে গোলাম বানিয়ে রেখেছে। ধর্ম একটি অন্ধকার, যা মানুষকে গুনাহ-সাওয়াব, হারাম-হালাল এবং আখিরাতের জবাবদিহির কথা বলে আবদ্ধ করে রাখে। এই অন্ধকারকে অস্বীকার করাই আলোকিত চিন্তা বা বুদ্ধির মুক্তি। American History (by James Henretta and others ১৯৯৩) বইয়ের ১১৩ পৃষ্ঠায় লেখক (Enlightenment) এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের ব্যাপারে লিখেছে:
'এই আন্দোলনের সমস্ত দার্শনিক চারটি মূলনীতির ওপর ঐকমত্য হয়েছিল:
প্রথমত, এই কথার ওপর বিশ্বাস রাখা যে, মানুষের যুক্তিই চূড়ান্ত দলিল।
• দ্বিতীয়ত, এই দুনিয়া প্রাকৃতিক স্বাভাবিক নীতিমালার ওপর চলমান। (এখানে অদৃশ্য কারও হস্তক্ষেপ নেই)
• তৃতীয়ত, রাষ্ট্র শাসনে সব ধরনের ইলাহি বিধানের ক্ষমতাকে প্রত্যাখ্যান করা।
• চতুর্থত, সমাজের ধারাবাহিক উন্নতি।'
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই সমস্ত চিন্তা ও সংস্কৃতির প্রতি ধাবিত হওয়া, যা ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ ও আমেরিকাতে চালু হয়েছিল। এই পরিভাষা সেই সময়ের চিন্তাবিদরা তৈরি করেছিল—যারা মনে করত, তারা মূর্খতা ও অন্ধকারকে দূর করে বুদ্ধি, বিজ্ঞান ও মানবতার সমন্বয়ে গঠিত আলোকিত যুগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের শুরু সপ্তদশ শতাব্দীতে ডেকার্ট ও স্পিনোজার মতো যুক্তিবাদী দার্শনিক, থমাস হবস ও জন লকের মতো রাজনৈতিক দার্শনিক এবং পিয়ার বেইলারের মতো সন্দেহবাদী থিউরি প্রচারকদের হাতে হয়েছিল। এই সমস্ত দার্শনিক সামষ্টিকভাবে মানববুদ্ধির শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখত।
এই যুগের দার্শনিকরা আইজ্যাক নিউটনের গতিসূত্র আবিষ্কারের ফলে অনেক প্রভাবিত হয়েছিল। কারণ তাদের যুক্তি ছিল, 'মানুষ যদি বিশ্বজগৎ নিয়ে চিন্তা করত, তাহলে তারা সমস্ত সৃষ্টিজীব ও মানুষের জীবনযাপনের নীতিমালা আবিষ্কার করতে পারত। সেই সাথে বুদ্ধিকে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, এমনকি নৈতিক মানদণ্ডের ভেদ জানাও সম্ভব।' জন লকের দর্শন যুক্তিবাদের মধ্যে এই কথা বৃদ্ধি করে যে, বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো বাদিহি (প্রকাশ্য সত্য) নয়; বরং তা স্পষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধির মাধ্যমে কল্পনা ও অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত হয়। অতঃপর এর থেকে অর্জিত সঠিক জ্ঞান দ্বারা মানুষ নিজের প্রকৃতিকে উন্নতি করতে সক্ষম। অর্থাৎ ধর্মীয় কিতাবের পরিবর্তে মানবপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করে সার্বিক সত্য অর্জন করা সম্ভব।
এই সমস্ত দার্শনিকদের দৃষ্টিতে গির্জা, বিশেষ করে ক্যাথলিক গির্জা হচ্ছে সেই শক্তি, যারা সমস্ত বুদ্ধিকে গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। এই দার্শনিকদের কয়েক জন ধর্মকেও মেনে নিয়েছিল এবং আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখত। কিন্তু এই ধর্ম গ্রহণ আল্লাহ তাআলার আদেশ কিংবা ধর্মীয় গ্রন্থের নির্দেশনার কারণে ছিল না; বরং যেহেতু এই বিষয়গুলো তাদের যুক্তিতে ধরেছিল, তাই সেগুলো গ্রহণ করে নিয়েছিল। তাদের কয়েক জন এমন প্রভুর ওপর ইমান রাখত, যিনি মাখলুকাতকে সৃষ্টি করার পর কোনো বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ না করে মুক্ত ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের কাছে আখিরাতের ধারণাও এমন যে, আখিরাতের সফলতার সাথে দুনিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আখিরাতের সফলতা দুনিয়ার জীবনের ওপর নির্ভর নয়। এখানে পার্থিব সফলতাই সবকিছুর মূল।
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন মূলত আলাদা কোনো বিশেষ চিন্তার নাম নয়; বরং এটি একটি চিন্তাপদ্ধতি। আর তা হচ্ছে, মানুষের সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তা এবং নৈতিকতাকে বিবেক দিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যেক বিষয়ের ওপর প্রশ্ন ওঠানো হবে; যাতে বিভিন্ন দিক থেকে নতুন নতুন চিন্তা তৈরি হয়। তাই সেই যুগের লিখিত বই-পুস্তকে অসংখ্য বৈপরীত্য পাওয়া যায়। এ ছাড়াও এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দার্শনিকরা বড় কোনো দার্শনিক ছিল না; বরং তারা শুধু জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য বিকৃত চিন্তা প্রচার করত। তারা নিজেরা নিজেকে হিউম্যানিস্ট দলের সদস্য মনে করত। তারা জনমতকে নিজেদের থিউরির দিকে ধাবিত করার জন্য অপরিচিত লেখকদের বই এবং অধিক প্রচারিত মিডিয়া মাধ্যমগুলোকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করেছিল।
এই দার্শনিকদের অধিকাংশের সম্পর্ক ছিল ফ্রান্সের সাথে। সম্ভবত এর কারণ ছিল সেই সময় ফ্রান্স রোমান ক্যাথলিকদের সবচেয়ে মজবুত কেন্দ্র ছিল। এখানে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও আইনবিদ চার্লস ডি মন্টেঙ্কু (Charles de Montesquieu) নিজের লিখিত বই প্রচার শুরু করে, যেখানে তখনকার সময়ের বাদশাহি ও পোপতন্ত্রের দুর্নীতির সমালোচনা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক সংস্থাগুলো এই বিষয়ে বিশাল গবেষণা পেশ করতে থাকে। যা The Spirit of Laws নামক বইয়ে সংকলন করা হয়েছিল। এমনিভাবে প্যারিসে এক দার্শনিক 'ডেনিস দিদেরো' (Denis Didot) অন্যান্য দার্শনিকদের সাথে মিলে সবার লেখাকে একত্রিত করে একটি বিশ্বকোষ প্রচার করা শুরু করে। যেখানে এনলাইটেনমেন্টের ব্যাপারে লিখিত সকল বইয়ের সারসংক্ষেপ একত্রিত করার পাশাপাশি এর বিরোধীদের জবাব দেওয়ার জন্য সকল উত্তর যুক্ত করা হয়েছিল।
এই আন্দোলনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিল ফ্রান্সের নোবেল বিজয়ী কবি ভলতেয়ার (Voltaire)। সে তখন এনলাইটেনমেন্টের দর্শনকে নিজের লিখিত আক্রমণাত্মক সমালোচনা, অরুচিকর বিভিন্ন প্রবন্ধ, ছোট ছোট উপন্যাস, বিভিন্ন লেখক ও বাদশাহদের নামে অসংখ্য কাব্য লেখার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করে। অতঃপর তার থেকেও বেশি লেখালেখি করেছিল আরেক দার্শনিক রুশো (Jean Jacques Roussea)। রুশো ছিল ফ্রান্সের সেই দার্শনিক, যার দর্শনের ভিত্তিতে আজকের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। সে এমন দার্শনিক ছিল, যে তার লেখার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারার সাথে নিজের ব্যক্তিগত চিন্তাধারা ও খোলামেলা অশ্লীল আলোচনা করত। ভলতেয়ারের উপন্যাস 'ক্যান্ডিড' (Candide) এবং 'দর্শনের অভিধান' (Dictionnaire Philosophique), রুশোর বই 'সামাজিক সম্পর্ক' (Social Contract) ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই দার্শনিকদের চিন্তাধারা গিল্ড সমাজ, মার্টিন লুথারের সংস্কার আন্দোলন, পোপতন্ত্র ও বাদশাহির বিরুদ্ধে বিপ্লবের পথকে সহজ করে দিয়েছিল।
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের কার্যক্রম ছিল অনেক বিস্তৃত, যা পুরো পশ্চিমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জার্মানিতে 'কান্ট', ব্রিটেনে 'ডেবিড হিউম', ইতালিতে 'চেসারে বিক্কারিয়া' ও আমেরিকাতে 'থমাস জেফারসন' এই কাজ আঞ্জাম দিয়েছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের নেতাদেরকে বিভিন্ন আদর্শের আক্রমণের বিরুদ্ধে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। তাদের লেখালেখির ফলে অনেক সদস্য বন্দী হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং চার্চের পক্ষ থেকেও এগুলোর সমালোচনা হচ্ছিল। কিন্তু সেই শতাব্দীর শেষার্ধে সফলতার পালা এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে যেতে থাকে। এমনকি ১৭৭০ সালে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্মের দার্শনিকরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাহায্য পেতে শুরু করে এবং তাদের হাতে থিংকট্যাঙ্ক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেওয়া হয়। বই, মিডিয়া, পত্রিকা ও প্রকাশনার মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারা আরও অধিক পরিসরে ছড়িয়ে দেয়। এমনকি শাসকশ্রেণি, ধর্মীয় আলিম এবং রাহিবরাও তাদের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হতে শুরু করে। তাদের সংস্কারগুলোকে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি কিছু অংশ হলেও গ্রহণ করে নিয়েছিল। ভলতেয়ারের আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় ছিল 'বাদশাহির দর্শন'। এই থিউরি বাদশাহদের মধ্যে অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসা শুরু হয়। রুশোর থিউরির ভিত্তিতে মানুষের আবেগ এবং অনুভূতিকেও তার বুদ্ধির মতো গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া শুরু হয়। আরও একটি পরিবর্তন ছিল, দার্শনিকরা সব বিষয়কে বুদ্ধি দিয়ে যাচাই ও সমালোচনা করার এই পদ্ধতিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত করে। আস্তে আস্তে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের প্রভাব আমেরিকাতেও পৌঁছে যায়। সর্বশেষ এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনই ১৭৭২ সালে আমেরিকান বিপ্লবের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর আমেরিকার 'স্বাধীনতার ঘোষণা' ও বিপ্লবের যুদ্ধকে ইউরোপেও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়। কেননা আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, আমেরিকাতে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন শুধু আলোচনা-পর্যালোচনার সীমা পাড়ি দিয়ে বাস্তবায়নের স্তরে চলে এসেছে। অতঃপর ইউরোপেও শাসকদের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়। এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের আমেরিকাতে সফলতা ফরাসি বিপ্লবের উদ্বুদ্ধকারী কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের যুগ যদিও ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে এনলাইটেনমেন্টের দর্শনের আরও অগ্রগতি ঘটে। কারণ এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন গির্জার পতন, আধুনিক সেক্যুলারিজমের উত্থান, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং মানবীয় সংশোধনগুলো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। আর এভাবেই পাশ্চাত্য 'উন্নতি'র বিশ্বাস আরও দৃঢ় হতে থাকে।
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন ও আমেরিকার বিপ্লব
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের প্রভাব বইয়ের মাধ্যমে ইউরোপ থেকে আমেরিকাতে পৌঁছে যায়। আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রায় সমস্ত নেতা এই চিন্তার ধারক-বাহক ছিল। যাদের মধ্যে বেঞ্জামিন ফ্রাংলিন ও জেফারসন অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৬২-১৭৭৪ সালে ব্রিটেন আমেরিকাতে নিজেদের দখলকৃত এলাকাগুলোতে দশটি নতুন ট্যাক্স লাগায়। এগুলোর মধ্যে চা, চিনি ও সম্পদের ওপর ট্যাক্স ছিল অন্যতম। জনগণ এই ট্যাক্সকে জুলুম আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ শুরু করে। এই শান্তিপূর্ণ বিরোধিতা আন্তে আস্তে স্বাধীনতা-যুদ্ধে রূপ নেয়। এবং একটি মহাদেশীয় বাহিনী গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিল আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। এই আন্দোলনে স্বাধীনতারকামী আমেরিকান রাজাকারদেরকে ভর্তি করা হতে থাকে। এই বাহিনী ও অন্যান্য আমেরিকান জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য একটি 'ঘোষণানামা' প্রদান করা হয়, যাকে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণানামা (Declaration of Independence) বলা হয়। স্বাধীনতার এই ঘোষণানামাটি লিখেছে আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট জেফারসন। এই বিষয়ে তার বক্তব্য হলো, সে এই ঘোষণা লেখার জন্য অনেক বইপত্র অধ্যয়ন করেনি; বরং এখানে এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের দার্শনিকদের চিন্তাগুলোই লিখে দিয়েছে। এভাবেই দুনিয়াতে সর্বপ্রথম ধর্মহীন রাষ্ট্র অস্তিত্বে আসে।
এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন ও ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯ খ্রি.) (ইউরোপে ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডারের পতন)
'ইংল্যান্ড বিপ্লব' ও 'আমেরিকার বিপ্লব' এরপর 'ফরাসি বিপ্লব' ছিল রেনেসাঁর যুগের সর্বশেষ ঘটনা। যার পর পশ্চিমা বিশ্বে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে পশ্চিমারা নতুন আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে। ফরাসি বিপ্লব ছিল ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডারের পতন ও নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের শুরু। ১৭৮৯ সালের ৪ জুলাই ফরাসি বিপ্লবকে ধর্মীয় এবং বাদশাহি শাসনের ভাগ্যে সর্বশেষ পেরেক হিসেবে গণ্য করা হয়। যার ফলে পোপতন্ত্র ও বাদশাহির জায়গায় ধর্মহীন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক সংবিধান ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিপ্লবের কারণ ছিল বিশেষ শ্রেণির পক্ষ থেকে জনগণের ওপর জুলুম; কিন্তু মৌলিকভাবে মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর যুগের পুরো ইতিহাসের সাথে এর সম্পর্ক ছিল।
তখন ফ্রান্সের বাদশাহ লুই ১৮তম এর হুকুমত চলছিল। ১৭৮৮ সালে ফ্রান্সে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মানুষরা এই দুর্ভিক্ষের ফলে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তারা ক্ষতিপূরণ ও ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়ার জন্য বাদশাহর কাছে দাবি জানায়; কিন্তু বাদশাহ তাদের দাবিতে কোনো ভ্রুক্ষেপ তো করেইনি, উলটো বাদশাহ ও তার সঙ্গীরা আরও বিলাসী জীবনযাপন করতে থাকে। ফ্রান্স ছিল সেই সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ঘাঁটি। এই আন্দোলনের চিন্তাধারা ও দর্শন এবং রুশো ও ভলতেয়ারের লেখাগুলো তাদের মধ্যে আগে থেকেই অগ্নি প্রজ্বলিত করে রেখেছিল। ফলে জনগণ বাদশাহদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়। বাস্তিল নামক দুর্গ, যা একটি জেল হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তা দখল করে বন্দীদের মুক্ত করে নেয়। এরপর ধারাবাহিক বিদ্রোহ চলতে থাকে। ১৭৮৯ সালের ৪ জুলাই এই আন্দোলনগুলো মানবাধিকারের নামে একটি ঘোষণা জারি করে। এই ঘোষণার মধ্যে মানুষকে স্বাধীন ও আইনকে মানুষের স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়। জনগণের 'সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব'কে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এই বিপ্লবের ফলে শুধু ইউরোপে নয়; বরং পুরো দুনিয়াতে চিন্তাগত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। অতঃপর বিশ্বের অধিকাংশ এলাকাতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সামরিক দখল এই বিপ্লবকে বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে দেয়। এমনিভাবে ইউরোপের পরিবর্তনগুলোর প্রভাব নতুন উপনিবেশ রাষ্ট্রগুলোতেও প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। তবে তার পাশাপাশি ফরাসি বিপ্লবের ফলে ইউরোপের সমাজে তিনটি শূন্যতা তৈরি হয়।
ফরাসি বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা
ফরাসি বিপ্লবের ফলে ইউরোপের সমাজে তিনটি শূন্যতা তৈরি হয়:
• এক. গির্জার নির্দেশনা ও ঐশী বিধান বিলুপ্তের ফলে বিধানদাতার দৃষ্টিভঙ্গিতে শূন্যতা।
• দুই. বাদশাহি বিলুপ্তের ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় শূন্যতা।
• তিন. দ্বীন বিলুপ্ত হওয়ার ফলে নৈতিক মানদণ্ডের ক্ষেত্রে সৃষ্ট শূন্যতা।
এই তিনটি শূন্যতাকে পূরণের জন্য সেক্যুলারিজম সামনে এগিয়ে আসে এবং পূর্বের চারশ বছরের শ্রমের ফল দ্বারা দুনিয়াকে নতুনভাবে শৃঙ্খলিত করে। বিধান প্রদান ও প্রণয়নের জন্য হিউম্যানিজমের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। নৈতিকতা নির্ধারণের জন্য মানুষের বুদ্ধিকেই মূল মাপকাঠি বানায় এবং সমাজ পরিচালনার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে মানুষের সাথে পরিচিত করায়। এই ছিল সেই মাইলস্টোন, যেখানে ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ইতিহাস শেষ হয় এবং যা এই আধুনিক বিশ্বকে বোঝার সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক সময়।

টিকাঃ
৩১. এখানে হিউম্যানিজমের অর্থ মানবধর্ম এবং হিউম্যানের অর্থ মানুষ এই জন্য করা হয়েছে যে, এটি ছাড়া বাংলায় পাঠককে বোঝানোর জন্য আর কোনো শব্দ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অন্যথায় হিউম্যানের শাব্দিক অর্থ কোনোভাবেই মানুষ হয় না। এর বিশেষ অর্থ আছে (যা সামনের অধ্যায়ে বিস্তারিত আসবে) এবং এই বিশেষ অর্থটি ব্যাপকভাবে মানুষ শব্দে কখনোই প্রবেশ করে না। এই বিষয়টি মাথায় রাখা আবশ্যক।
৩২. সাইন্স বা বিজ্ঞান দ্বারা আমরা এখানে প্রকৃতির জ্ঞান উদ্দেশ্য নিয়েছি অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা এবং সৃষ্টিজগতের গোপনভেদ ও নিদর্শনগুলো বোঝা। এই জ্ঞানকে যদি এই অর্থে নেওয়া হয় এবং দ্বীনি বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম না করা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞান ইসলামের বিরোধী নয়। পনেরো শতাব্দীর পর পশ্চিমা ধর্মহীন দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানকে আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার ও ধর্মহীন চিন্তাধারা অনুযায়ী প্রণয়ন করে এবং বিজ্ঞানকে ধর্মের বিরুদ্ধে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এই সমস্ত জ্ঞান ও বিদ্যা, যা নিশ্চিত কুফুরি ধর্মবিরোধী দর্শন বা মানুষের চাহিদার সীমাহীন বাস্তবায়নকে নিজ লক্ষ্য বানিয়ে নেয়-সত্যপন্থী আলিমরা সর্বযুগে এতে বাধা দিয়েছেন এবং দলিলের মাধ্যমে এই বিষাক্ত জ্ঞান ও থিউরিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই কথাও স্পষ্ট, লেখকের বক্তব্যের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, মুসলিমরাই বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করেছেন। কেননা, গ্রিক ও হিন্দে এরও পূর্বে এই জ্ঞান প্রচলিত ছিল। মুসলিমরা সেখান থেকে উপকারী ও কার্যকর বিষয়গুলো গ্রহণ করেছেন এবং পরে আরও গবেষণা বৃদ্ধি করেছেন। মুসলিমদের পরে পশ্চিমারা এই জ্ঞানকে গ্রহণ করে এবং যেমনটা ওপরে বলা হয়েছে, তারা এটাকে ধর্মহীন বিশ্বাসের সাথে মিশ্রিত করে পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয়।
৩৩. এখানে এই বিষয়টিও স্পষ্ট, যেভাবে ইসলামে ধর্ম ও বিজ্ঞান (বিজ্ঞান অর্থাৎ প্রকৃতির জ্ঞান) এর কোনো দ্বন্দ্ব নেই, তেমনিভাবে বুদ্ধি ও ওহির মাঝে দ্বন্দ্বের কোনো ধারণা বাস্তবে ইসলামে নেই। বুদ্ধি মানুষের নিজের বানানো নয়; বরং আল্লাহ তাআলার দানকৃত নিয়ামত এবং কুরআনে আকলকে নিয়ামত হিসেবেই পেশ করা হয়েছে এবং তা ব্যবহার করার জন্য বারবার আদেশ দিয়েছে। এখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা শিক্ষার সাথে আল্লাহ তাআলারই দানকৃত বুদ্ধির দ্বন্দ্ব কীভাবে সম্ভব? সুতরাং বোঝার বিষয় হচ্ছে, মানুষের বুদ্ধি অনেক সীমাবদ্ধ এবং তা তখনই সঠিকভাবে ব্যবহার হবে, যখন অকাট্য জ্ঞানের উৎস ওহি অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে। তাহলে এই বুদ্ধিই মানুষকে রবের পরিচয় প্রাপ্তির স্তরে নিয়ে যাবে। এই কথা আরও স্পষ্ট হয় কুরআনে জাহান্নামিদের যে বাক্য উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে, তারা বলতে থাকবে যে, 'যদি আমরা শুনতাম বা বুদ্ধি ব্যবহার করতাম, তাহলে অগ্নিবাসীর মধ্যে হতাম না।' তাই বুদ্ধি ও ওহির দ্বন্দ্ব সেই সমস্ত বোকাদের কাছেই জন্ম নেয়, যারা বুদ্ধি দ্বারা সেই কাজ নিতে চায়, যা বুদ্ধিগতভাবেও আকলের সাধ্যের ভেতর নেই এবং যারা কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির নীতি দ্বারা অদৃশ্যের বিষয়গুলোর ব্যাপারে সঠিক- ভুলের নিশ্চিত ফয়সালা করতে চায়। যার ফলে সে নিজেই নিজের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেয়।
৩৪. এর অন্যতম কারণ হলো, এটি ছিল ধর্মের নামে ধর্মহীনতার আন্দোলন। প্রাচ্যবিদদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম-বিশ্বে যারা ইসলামকে সংস্কার করার দাবি তুলে কিংবা পোপতন্ত্রের জিগির তুলে ইসলামকে মনমতো ব্যাখ্যার দ্বার উন্মোচন করে দিতে চায়, তাদের আন্দোলনও মুসলিমদের জন্য রিফরমেশনের মতো ভয়ংকর। কারণ এর শেষ ফলাফল হলো দ্বীনের মূল আদর্শ থেকে বেরিয়ে যাওয়া।
৩৫. আমেরিকা মূলত মুসলিমদের আবিষ্কার। কলম্বাসের বহু আগেই মুসলিম নাবিকরা সেখানে পৌছেছিল। এমনকি কলম্বাস মুসলিম ভূগোলবিদদের তৈরি মানচিত্র অনুসরণ করেই আমেরিকার সন্ধান পেয়েছিল। এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে 'আমেরিকা মুসলিমদের আবিষ্কার' বইটি পড়া যেতে পারে।
৩৬. উন্নতি দ্বারা এখানে উন্নতির পশ্চিমা ধারণা উদ্দেশ্য। যার মূল কথা হলো, নফসকে খুশি করার যোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়া। সীমাহীন খায়েশ ও চাহিদা পূরণ করতে পারা।

📘 ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার > 📄 পশ্চিমাদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা

📄 পশ্চিমাদের ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা


যেভাবে আমরা পূর্বের অধ্যায়ের শেষে ইহুদিদের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ পেশ করেছিলাম, এখানেও আমরা পশ্চিমাদের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরব। পশ্চিমাদের ইতিহাস পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হবে, পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা বা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার কীভাবে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা বা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে পরিবর্তন হয়।

**খ্রিষ্টবাদের স্বরূপ**
খ্রিষ্টবাদ মূলত আপসপূর্ণ দরবারি এক ধর্ম ছিল। প্রথমে তারা ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করে নেয়। যার ফলে তারা বিশ্বাস করতে থাকে যে, ঈসা প্রভুর সন্তান, যিনি মানুষের গুনাহের কাফফারা আদায়ের জন্য নিজেই নিজেকে ক্রুশে চড়িয়েছিলেন। এখন মানুষের মুক্তির মাধ্যম হলো, তারা এই ঘটনার ওপর ইমান আনবে এবং নিজেকে আল্লাহ তাআলার জান্নাতের উপযুক্ত মনে করবে। মানুষকে গুনাহ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তারা মিশনারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দুনিয়াতে খ্রিষ্টবাদের দাওয়াত শুরু করে। আফ্রিকা ও আমেরিকাসহ কয়েকটি মহাদেশে তারা এই বিশ্বাস সেখানের বাসিন্দাদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়। তাদের দাবি অনুযায়ী যখন পরিবেশ প্রস্তুত হয়ে যাবে, তখন ঈসা পুনরায় দুনিয়াতে এসে সমস্ত বেইমানকে খতম করবেন। আর তখন দুনিয়াতে রবের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে।

**খ্রিষ্টবাদ প্রটেস্টান্টিজমে রূপান্তর**
ইহুদিদের চক্রান্তে খ্রিষ্টবাদ আরও একবার নিজের বিশ্বাস পরিবর্তন করে। নতুন খ্রিষ্টানদের প্রটেস্টান্ট বলা হয়। এদের সদস্যরা পশ্চিমে পরিবর্তনের নতুন রাস্তা করে দেয়। তারা একদিকে খ্রিষ্টান ইউরোপে সেক্যুলার ধর্মহীনতার দরজা খুলে দেয় এবং অপরদিকে ইহুদিদের বিশ্বাসকে গ্রহণ করে তাদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে সাহায্য করতে থাকে। তারা খ্রিষ্টানদের মধ্যে এই বিশ্বাস ব্যাপক করে দেয় যে, ইহুদিদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পরেই ঈসা আগমন করবেন। কেমন যেন এই আধুনিক খ্রিষ্টানরা ইহুদি ও খ্রিষ্টান দুই ধর্মের বিশ্বাসকে একীভূত করে ফেলে।

**পশ্চিমাদের মধ্যে সেক্যুলারিজমের উত্থান ও তার কারণসমূহ**
পশ্চিমে সেক্যুলারিজমের উত্থানের কিছু কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো :

১. মানবাধিকার আন্দোলন
মানবাধিকার আজকের সমাজে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং মুখরোচক স্লোগান। মানবাধিকার আন্দোলনের শুরু মেঘনা কার্টা থেকে হয়েছে। কিন্তু পাঁচশ বছরের ইতিহাসে এই আন্দোলন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। কখনো এই যুদ্ধ ছিল শুধু গির্জার বিরুদ্ধে, আবার কখনো ছিল বাদশাহর বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধ কখনো ইউরোপের জনগণের পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত হতো, আবার কখনো হতো ইহুদিদের স্বাধীনতার জন্য। এই আন্দোলনের ফলে পুরো বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আন্দোলনকেই মুসলিম ও উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে খুব কঠিনভাবে ব্যবহার করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাধিকার আন্দোলন আধুনিক পশ্চিমাদের খুব প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়।

২. ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জন্ম নেওয়া, গিল্ড সমাজে শুরু হওয়া ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের চিন্তাগুলো সেক্যুলারিজমের পক্ষে অনেক উপকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ফরাসি বিপ্লবে বিজ্ঞান খ্রিষ্টান ধর্মকে পরাজিত করে ফেলে। অতঃপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপনিবেশ বিজ্ঞানকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গাদ্দার তৈরিতে ব্যবহার করতে থাকে। স্পষ্ট বিষয় হচ্ছে, যে যুদ্ধ খ্রিষ্টান ও বিজ্ঞানের মধ্যে হয়েছিল, তার সাথে ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

৩. খ্রিষ্টান ধর্মের শরয়ি উৎসে পরিবর্তন
ঠিক এই সময়টাতেই রিফরমেশন আন্দোলনের উত্থান হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য বাহ্যিকভাবে গির্জার সংশোধন হলেও তার ফলে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎস পরিবর্তন হয়ে যায়। কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যার অধিকার পাদরিদের সাথে সাথে এখন জনগণের বিবেকের কাছেও অর্পণ করা হয়। এই আন্দোলনই খ্রিষ্টানদের মাঝে নতুন বিভাজন তৈরি করে এবং এনলাইটেনমেন্ট যুগের একটি মাইলফলক হিসেবে প্রমাণিত হয়।

৪. আধুনিক অর্থব্যবস্থার উত্থান
এমনিভাবে মহামারি থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতির ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৈশ্বিক কোম্পানি, কারেন্সি ও ব্যাংকের উত্থান হয়। যা পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অতঃপর যখন ধর্মহীনতা ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে খ্রিষ্টানদের পরাজিত করে, তখন এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে মানুষ জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এবং এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই পরিচালনার জন্য গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক সংবিধান বানিয়ে পেশ করা হয়।

**খ্রিষ্টান-ইহুদি জোট**
ইহুদিরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য খ্রিষ্টান-দুনিয়াতে এমন কিছু আন্দোলন ঘটায়, যার দ্বারা খ্রিষ্টান ধর্মে নতুন গ্রুপ তৈরির পাশাপাশি পুরাতন গ্রুপগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। পুরাতন ও নতুন গ্রুপগুলো বিভিন্নভাবে ইহুদিদের রক্ষা করতে থাকে। এখানে আমরা সেই গ্রুপগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরছি, যার ইতিহাস আমরা পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।

*প্রটেস্টান্ট 'জায়োনবাদী' খ্রিষ্টান*
ইহুদিরা প্রথমে এই পদক্ষেপ নিয়েছিল যে, তাদের দুশমনদেরই কিছু লোককে নিজেদের লক্ষ্যের পথে সাহায্যকারী বানিয়ে নেবে। এই লক্ষ্যে গির্জার পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ উত্তোলনকারী মার্টিন লুথারের প্রটেস্টান্ট আন্দোলনের সাথে ইহুদিদের খুব গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, যা আজও টিকে রয়েছে। এই আন্দোলনের ফলে ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা দুই অংশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একটি ছিল মৌলবাদী পুরাতন খ্রিষ্টান ও আরেকটি ছিল সংস্কারপন্থী মডারেট খ্রিষ্টান। দ্বিতীয় দলের একটি বিশেষ বিশ্বাস ছিল, পুরাতন আসমানি কিতাব এবং শরিয়াহগুলোও গ্রহণ করে নিতে হবে। এই চিন্তা প্রটেস্টান্ট দলকে ব্যাপকভাবে ইহুদিদের নিকটবর্তী করে দেয়। এমনকি প্রটেস্টান্ট গ্রুপের অনেকেই বিশ্বাস করে, ফিলিস্তিন ভূমিকে জবরদস্তির মাধ্যমে দখল করার পূর্ণ অধিকার ইহুদিদের রয়েছে। যখন ক্যাথলিক চার্চ এই দলের বিরোধিতা করে, তখন এই দলের অনেক গ্রুপ গির্জার জুলুমের শিকার হয়ে আমেরিকা চলে যেতে থাকে। যা তাদের স্থায়ী বাসস্থানে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে ইহুদিদের সাথে এই দলটির নৈকট্য এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তাদের বিরোধীরা তাদেরকে 'ইহুদিবাদী খ্রিষ্টান' বলা শুরু করে।

*ধর্মহীন খ্রিষ্টান*
মর্ডানিস্ট খ্রিষ্টানরা কিতাবুল মুকাদ্দাসের ব্যাখ্যার অধিকার সাধারণ-বিশেষ নির্বিশেষে সকল জনগণকে প্রদান করে খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মহীন শ্রেণি সৃষ্টি করে। যারা দ্বীনের বিধানগুলোর সমালোচনা করত এবং সেগুলোকে নিয়ে বিদ্রূপ করত। যার ফলে পুরাতন ধারার খ্রিষ্টানদের বিশেষ অংশ আলাদা হয়ে যায় এবং অন্যদের বিদ্রুপ ও হাস্যরসের পাত্র হয়ে যায়। কারণ তারা ধর্মহীনতার স্রোতের মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর অনেক মানুষ এমন ছিল, যাদের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এ সত্ত্বেও তারা নিজেদের খ্রিষ্টান মনে করত। এই শ্রেণি পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরোপের পার্লামেন্টে ইহুদিদের জন্য মানবাধিকারের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তোলে এবং তাদেরকে সমান নাগরিক অধিকার দিয়ে দেয়। এভাবেই দীর্ঘ শতাব্দী যাবৎ রোমান গির্জার কাছে আবদ্ধ ইহুদিরা মুক্ত হয়ে যায় এবং নিজেদের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়ার পথে আর বড় কোনো বাধা তাদের জন্য ছিল না।

*রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান*
যদিও এদেরকে ইহুদিদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করা হতো; কিন্তু এদের ও সাধারণ খ্রিষ্টানদের মধ্যে দূরত্ব এবং ইউরোপের রাজনৈতিক ক্ষমতায় ইহুদিদের শক্তি অর্জিত হওয়ার পর তারাও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অবস্থা শুধু পরিবর্তনই হয়নি; বরং সম্পূর্ণভাবে উলটে যায়। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রোমের পোপ জন দ্বিতীয় রেখেছিল। সে ইহুদি-বংশের প্রতি ঘৃণাকে প্রভুর সাথে ঘৃণার সমপর্যায়ের সাব্যস্ত করে এবং ইহুদিদের ধর্মীয় বড় ভাই হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৩ সালে সে রোমের গির্জাকে ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করে। পরবর্তী সময়ে সে নিজেই ইসরাইল গিয়ে পবিত্র দেয়ালের নিচে ইহুদিদের জন্য দুআ করে এবং লিখিত একটি মাগফিরাতনামা দেয়ালের চিড়ের মধ্যে রেখে আসে। এই দেয়াল মাসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকে রয়েছে। যেখানে ইহুদিরা এসে ইবাদত ও তাওরাত তিলাওয়াত করে। তাদের ধারণামতে এই দেয়াল হাইকালে সুলাইমানির ধ্বংসাবশেষ, যেখানে আবার তা তৈরি করা হবে। এভাবেই ইহুদিরা খ্রিষ্টানদের মধ্যে নিজেদের সমর্থক পেয়ে যায় এবং কম-বেশি সকল খ্রিষ্টানকে এই কথা বোঝাতে সফল হয় যে, এখন ফিলিস্তিনের ওপর ক্ষমতার অধিকার শুধু ইহুদিদের। এমনকি খ্রিষ্টানরাও ইহুদিদের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধে শামিল হয়ে যায়। এখানে এই কথা জেনে রাখা উচিত যে, ইহুদিরা যেভাবে খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে নিজেদের এজেন্ট বানিয়ে নিয়েছিল, তেমন চক্রান্ত তারা আজ নতুনভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে করছে।

**ফরাসি বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট তিনটি শূন্যতা এবং হিউম্যানের জেনারেল উইল (আধুনিক শিরক)**
পশ্চিমাদের ইতিহাস অধ্যয়নের ফলে এই কথা বুঝে আসে যে, এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন পুরো ইউরোপে এই বিষয়টি প্রচার করে যে, 'মানুষ আল্লাহ তাআলার বান্দা নয়; বরং নিজের ইচ্ছা ও চাহিদা অনুযায়ী জীবনযাপনকারী হিউম্যান। তাকে ধর্মের অন্ধকার চিন্তাধারা থেকে বের করে নতুন আলোকিত চিন্তা গ্রহণ করে নেওয়া উচিত।' এনলাইটেনমেন্টের দর্শন মানুষকে এই কথা বোঝায় যে, তাকে নিরাপদ ও সুখী থাকা চাই। এই নিরাপত্তা ও সুখের জন্য তাকে বস্তুগত উন্নতি অর্জন করতে হবে। বস্তুগত এই উন্নতির পথে ধর্মের হালাল-হারামের বাধা বিলুপ্ত করা জরুরি। এ ছাড়া বাদশাহরাও এই পথে বড় একটি বাধা; তাই তাদের থেকেও স্বাধীনতা চাই। এই স্বাধীনতা পুরুষ ও নারীর মধ্যে সাম্যের ভিত্তিতে হবে। এই এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাধারার প্রভাবে পশ্চিমাদের মধ্যে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়।
ফরাসি বিপ্লবের অধীনে আমরা আলোচনা করেছি যে, এটি সমাজের মধ্যে তিনটি শূন্যতা তৈরি করে। প্রথমত, গির্জার দাবি ছিল, তারা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি। তারা ইউরোপের বাদশাহদের খ্রিষ্টবাদ গ্রহণের পর তাদেরকে আল্লাহ তাআলার ছায়া হিসেবে ঘোষণা দিত। এখন গির্জার হুকুমত বিলুপ্তির পর হঠাৎ সার্বভৌমত্বের স্থান খালি হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, অতীতকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত বাদশাহি ব্যবস্থা বিলুপ্তির ফলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সমাজে দ্বীনহীনতার ফলে মানুষের সামাজিক আচার-ব্যবহারের মধ্যে শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতাগুলো পূরণের জন্য ধর্মহীনতার ধর্ম, গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বিস্তারিত আলোচনা দ্বিতীয় অধ্যায়ে আসবে ইনশাআল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00