📘 ইসলামী সাধারণ জ্ঞান > 📄 আহক্মাতের পরিচিতি

📄 আহক্মাতের পরিচিতি


ফরয: ফরয শব্দটি আরবী। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে- নির্ধারণ করা, বিধিবদ্ধ করা, পরিমাণ ইত্যাদি। পরিভাষায়- মহান আল্লাহর হুকুম-আহকামকে ফরয বলে। যেমন- সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি আদায় করা। ফরয দুই ভাগে বিভক্ত। যথা- ফরযে আইন: যে কাজগুলো সকলের জন্য পালন করা জরুরি, তাকে ফরযে আইন বলে। যেমন- সালাত আদায় করা, পর্দা করা।

ফরযে কিফায়া: যে কাজগুলো কিছুসংখ্যক লোক আদায় করলেই সমাজের সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, তাকে ফরযে কিফায়া বলে। যেমন- জানাযার সালাত ও জিহাদ করা। ফরয কাজ অস্বীকার করা কুফরি। আর পালন না করা ফাসেকি। উল্লেখ্য যে, ফরযে কিফায়া কেউ আদায় করলে সকলেই দায়িত্বমুক্ত হবে কিন্তু কেউ আদায় না করলে সকলেই পাপী হবে।

ওয়াজিব: ওয়াজিব শব্দটি আরবী। অর্থ আবশ্যক, জরুরি। পরিভাষায়- যে কাজ করা জরুরি না করলে পাপী হতে হয়; তবে ফরযের মত নয়, তাকে ওয়াজিব বলে। যেমন- বিতর ও দুই ঈদের সালাত এবং সদকায়ে ফিতর। ওয়াজিব কাজগুলো আদায় করা আবশ্যক এবং আদায় না করলে গুনাহগার হতে হয়। ইহা অস্বীকার করা কুফরি না, তবে গোমরাহী এবং পালন না করা ফাসেকি।

সুন্নাত: সুন্নাত শব্দটি আরবী। অর্থ রীতি-নীতি, পদ্ধতি, আদর্শ, পথ ইত্যাদি। পরিভাষায়- যে সকল কাজ রাসূল (স) অধিকাংশ সময় নিজে করেছেন, তবে মাঝে মধ্যে পরিত্যাগও করেছেন, সেগুলোকে সুন্নাত বলে। যেমন- সালাতুল ফজরের পর দুই রাকআত সুন্নাত, উমরাহ হজ্জ আদায় করা ইত্যাদি। এই কাজ ফরয ও ওয়াজিবের মত আবশ্যক নয়। এ জাতীয় কাজ অস্বীকার করা ফাসেকির অন্তর্ভুক্ত। এর কোন কাযা নেই।

মুস্তাহাব: এ শব্দটি আরবী। অর্থ পছন্দনীয়। ইসলামী শরীআত যে কাজগুলো ভাল বলে পছন্দ করেছে, পরিভাষায় সে কাজগুলোকে মুস্তাহাব বলে। যেমন- যুহর, মাগরিব ও এশার সালাতের পর দুই রাকআত নফল সালাত আদায় করা। এ জাতীয় কাজে সাওয়াব পাওয়া যায়, তবে না করলেও কোন পাপ হয় না।

হালাল: এ শব্দটি আরবী। অর্থ বৈধ বা সিদ্ধ। ইসলামী শরীআত যে কাজগুলোকে বৈধ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তাকে হালাল বলে। যেমন- উট, দুম্বা, গরু, ছাগলের গোস্ত খাওয়া এবং দুধ পান করা। হালাল জিনিসকে হারাম মনে করে পরিত্যাগ করা কুফরির শামিল। তবে, সাধারণভাবে হালাল কাজ না করলেও কোন গুনাহ নেই।

হারাম: এ শব্দটি আরবী। অবৈধ, নিষিদ্ধ, ইসলামী শরীআত যে সকল কাজ করতে বা সে জাতীয় বস্তু পানাহার করতে নিষেধ করেছেন, সেগুলোকে হারাম বলে। যেমন- যিনা করা, চুরি করা, সুদ খাওয়া ইত্যাদি। যে সকল বস্তু নাপাক তা পানাহার করাও হারাম। এ জাতীয় কাজ করা কবিরা গুনাহ ও ফাসেকি। তবে হারামকে হালাল বলে বিশ্বাস করা কুফরি। আর জীবন বাঁচানোর জন্য হারাম বস্তুরও পানাহার করা জায়িয। কেননা ফিক্হ শাস্ত্রে একটি নিয়ম আছে যে, 'প্রয়োজন পরিত্যাজ্য বিষয়কেও জায়িয করে দেয়'।

মাকরূহ: এ শব্দটি আরবী। অর্থ অপছন্দনীয়। ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে যে কাজগুলো অপছন্দনীয়, সেগুলোকে মাকরূহ বলে। যেমন- অন্ধ, ফাসিক ও বিদআতি লোকের ইমামতি করা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানাহার করা। আর মাকরূহ দুই প্রকার। যথা-

১. মাকরূহে তাহরিমি: যে কাজগুলো হারাম না হলেও হারামের কাছাকাছি, সে কাজগুলোকে মাকরূহে তাহরিমি বলে। যেমন- ঈদগাহ ও কবর স্থানে পেশাব- পায়খানা করা, মসজিদে বসে অপ্রয়োজনীয় আলাপ আলোচনা করা। এ কাজগুলো গুনাহের কাজ, তবে এ কাজগুলোকে বৈধ মনে করা ফাসেকি।
২. মাকরূহে তানযিহ: যে কাজগুলো হালালের কাছাকাছি; তবে হালালও নয়, তাকে মাকরূহে তানযিহ বলে। যেমন- পশুর গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেয়া। এ জাতীয় কাজে যদিও কম গুণাহ হয় তবুও এমন কাজ থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

মুবাহ: এ শব্দটি আরবী। অর্থ বৈধ কাজ। ইসলামী শরীআত যে সমস্ত কাজকে বৈধ হিসেবে অভিহিত করেছে, তাকে মুবাহ বলে। যেমন- কৃষিকাজ করা, ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদি।

মুবাহ কাজ হালাল কাজের মতই। তবে হালালকে মুবাহ করা কুফরি। কিন্তু মুবাহকে হারাম জানা কুফরি নয়। এ জাতীয় কাজ করলে কোন সওয়াব নেই এবং না করলেও কোন গুনাহ নেই।

সুন্নাত: সুন্নাত শব্দটি আরবী। অর্থ- নিয়ম, পদ্ধতি, পথ, নমুনা, চরিত ইত্যাদি। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় রাসূল (স) এর কথা, কাজ ও মৌন সমর্থনকে সুন্নাত বলে।

অথবা, যে কাজটি রাসূল (স) স্বয়ং নিজে করেছেন এবং উম্মাতদেরও তা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে সুন্নাত বলে।

সুন্নাত দুই প্রকার। যথা- ১. সুন্নাতে মুআক্কাদাহ; ২. সুন্নাতে যায়েদাহ।

১. সুন্নাতে মুআক্কাদাহ যে সমস্ত কাজ রাসূল (স) সর্বদা পালন করতেন এবং অন্যদেরকেও তা পালন করার জন্য আদেশ দিতেন, তাকে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ বলে। যেমন- ফজরের সালাতের পূর্বে দুই রাকআত, যুহরের সালাতের পূর্বে চার রাকআত ও পরে দুই রাকআত সুন্নাত, মাগরিবের ফরয সালাতের পর দুই রাকআত এবং এশার সালাতের পর দুই রাকআত সুন্নাত সমূহ আদায় করা।
২. সুন্নাতে যায়েদাহ যে সমস্ত কাজ রাসূল (স) কখনও করতেন, আবার কখনও পরিত্যাগ করতেন, তাকে সুন্নাতে যায়েদাহ বলে। যেমন- আসর ও এশার সালাতের পূর্বে চার রাকআত সুন্নাত সালাত আদায় করা।

বিদআত: বিদআত অর্থ নতুন ভাবে বা পূর্বের নমুনা ছাড়া কিছু হওয়া। এ জন্যেই আল্লাহকে বাদীউন বলা হয়। কেননা তিনি এ পৃথিবীর সব কিছু পূর্বের কোনরূপ নমুনা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায়, যে কাজ রাসূল (স) ও তাঁর সাহাবীগণ করেননি এবং তাঁদের যুগে ছিলও না বরং তাঁদের ইনতিকালের পর সৃষ্টি হয়েছে, তাকে বিদআত বলে।

কেউ কেউ বলেছেন- যে জিনিস নতুন আবিষ্কৃত হয়েছে এবং পূর্ববর্তী যুগেও উহার কোন উদাহরণ ছিল না, তাকে বিদআত বলে।

বিদআত দুইভাগে বিভক্ত। যথা-

১. বিদআতে হাসানাহ ও ২. বিদআতে সাইয়্যিয়াহ।

বিদআতে হাসানাহ: যে বিদআত রাসূল (স) এর সুন্নাত বিরোধী নয় বরং এর দ্বারা ইসলামের অনেক উপকার সাধিত হয়; তাকে বিদআতে হাসানাহ বলে। যেমন- ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য ধর্মীয় বই পুস্তক প্রণয়ন করা, সভা-সমিতি করা, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা।
বিদআতে সাইয়্যিয়াহ যে বিদআতে রাসূল (স) এর সুন্নাত বিরোধী, ইসলামের জন্য ক্ষতিকর ও মানুষের চরিত্র বিনষ্টকারী, তাকে বিদআতে সায়্যিয়াহ বলে। যেমন- অশ্লীল ছবি, গান-বাজনা, খারাপ নাটক ইত্যাদি।

শিক: শির্ক শব্দটি আরবী। অর্থ অংশীবাদ, বহু ঈশ্বরবাদ, অনেক দেবোপাসনা। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায়- আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর সিফাত বা গুণাবলির সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করাকে শিক্ বলে। শিক্ দুই প্রকার। যাথা- ১. শিকে জলি ও ২. শিরকে খফি।

শিরকে জলি: যদি কেউ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদত করে, তাকে শিকে জলি বলে।
শিরকে খফি: যদি কেউ অসাবধানতা বশত কাউকে আল্লাহ পাকের কোন গুণ বা শক্তির সাথে তুলনা করে, তাকে শিরকে খফি বলে।

কুফর: কুফর শব্দটি আরবী। অর্থ আবৃত করা, গোপন করা, ঢেকে রাখা, আচ্ছাদন করা, অকৃতজ্ঞ হওয়া। এজন্য যারা আল্লাহর বাণী কুরআনকে অস্বীকার করে সত্যকে গোপন করে রাখে তাদেরকে কাফির বলে। শরীআতের পরিভাষায়- মহান আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করাকে কুফর বলে।

অথবা, রাসূল (স) যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, তার কোন একটিকে অস্বীকার করাকে কুফর বলে।

নিফাক: নিফাক শব্দটি আরবী। অর্থ দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা। কুফরি গোপন করে নিজেকে মুমিন বলে প্রকাশ করা, কপটতা ইত্যাদি। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায়- সামাজিক সুযোগ সুবিধা আদায় করার লক্ষ্যে ইসলাম ও রাসূল (স) এর প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য প্রদর্শন করা এবং মনে কুফরি ভাব গোপন রাখাকে নিফাক বলে।

আখিরাত: আখিরাত শব্দটি আরবী। অর্থ পরবর্তী বা পরকাল। অর্থাৎ এর দ্বারা দুনিয়ার পরবর্তীকাল তথা পরকালীন জীবনকে বুঝানো হয়।

হাশর: হাশর শব্দটি আরবী। অর্থ একত্রিকরণ, জামায়েত করা। আল্লাহ তাআলার এ সৃষ্টিজগত ক্ষণস্থায়ী। এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর সমস্ত মানুষকে জীবিত করা হবে এবং সকলকে কৃতকর্মের হিসাব দেওয়ার জন্য এক জায়গায় একত্রিত করা হবে। এই একত্রকরণকে হাশর বলে।

পুলসিরাত: পুলসিরাতকে আরবীতে সিরাত বলে। এর অর্থ রাস্তা বা সেতু। কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সমস্ত মানুষ একত্রিত হবে। আর দোযখের উপর দিয়ে একটি দীর্ঘ পুল থাকবে। যে পুল অতিক্রম করে জান্নাতে যেতে হবে, তাকে পুলসিরাত বলে।

মিযান: মিযান শব্দটি আরবী। অর্থ পরিমাপ বা মাপার যন্ত্র। আল্লাহ তাআলা হাশরের মাঠে সমস্ত জ্বিন ইনসানকে হাজির করে সকলের আমল পরিমাপ করবেন। যার নেকীর পাল্লা ভারী হবে, তাকে মহাসুখের স্থান জান্নাত দান করবেন। আর যার নেকীর পাল্লা হালকা হবে, তাকে চির কষ্টের স্থান জাহান্নামে ফেলা হবে।

জান্নাত: জান্নাত শব্দটি আরবী। অর্থ আবৃত করা, আচ্ছাদন করা। সুতরাং জান্নাতের অর্থ হলো- বৃক্ষপত্র দ্বারা আবৃত স্থান। যাকে আমরা বাগান বলে থাকি। বাংলা ভাষায় একে স্বর্গ আর উর্দুতে বেহিস্ত বলে। জান্নাতের সংখ্যা আটটি। যথা
১. জান্নাতুল আদন; ২. জান্নাতুল খুল্দ; ৩. জান্নাতুন নাঈম; ৪. জান্নাতুল মাওয়া; ৫. দারুস্ সালাম; ৬. দারুল কারার; ৭. দারুল মাকাম ও ৮. জান্নাতুল ফিরদাউস।

জাহান্নাম : জাহান্নাম শব্দটি আরবী। বাংলায় একে নরক বলে। ইহা দোযখের সর্বোচ্চ স্তরের নাম। জাহান্নামের ৭টি স্তর রয়েছে। যথা- ১. জাহান্নাম; ২. লাজা; ৩. হুতামাহ্; ৪. সাঈর; ৫. সাকার; ৬. জাহিম ও ৭. হাবিয়া।

উল্লেখ্য যে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টি সত্য। উভয়টি এখনও মওজুদ আছে। এ সম্পর্কে কুরআনের অনেক আয়াত ও রাসূল (স)-এর বহু হাদীস বিদ্যমান। তাই আল্লাহ যে জান্নাত ও জাহান্নাম তৈরি করে রেখেছেন, এর উপর প্রতিটি মুসলমানের ঈমান রাখতে হবে। অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই।

তাকদীর
তাকদির শব্দটি আরবী। অর্থ- নির্ধারণ, ক্ষমতা বা শক্তি। শরীআতের পরিভাষায় তাকদির হলো- ভাগ্য বা মহান আল্লাহর নির্ধারণ।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির আগেই তার তাকদিরকে নির্ধারণ করে রেখেছেন।

তাই মানুষের জীবন ভাল-মন্দ যা কিছু হয়, তা পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তাআলা যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা হবেই। কেননা এ মর্মে রাসূল (স) ইরশাদ করেছেন- 'আল্লাহ তাআলা যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা হবেই'।

তাকদিরে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি অন্যতম বিষয়। ইহা ঈমানের অঙ্গ। কোন ব্যক্তি তাকদিরকে অস্বীকার করে ঈমানদার হওয়ার দাবি করতে পারে না।

তাকদির দুই প্রকার। যথা- ১. মুবাররম বা অকাট্য; ২. মুয়াল্লাকা বা ঝুলন্ত।

প্রথম প্রকার তাকদির কখনও পরিবর্তন হয় না। তবে দ্বিতীয় প্রকার তাকদির মানুষের কর্ম দ্বারা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে- 'তাকদির পরিবর্তন হয় না, তবে দোয়া দ্বারা পরিবর্তন হয়। অতএব, এ কথা বুঝতে হবে যে, তাকদিরের উপর মানুষের কোন হাত নেই। যার তকদিরে যা আছে তা হবেই এর কোন পরিবর্তন হয়না। এ কথায় প্রতিটি মুসলমানের পূর্ণ ঈমান রাখতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00