📄 ইসলামি অর্থনৈতিক তত্ত্ব, নৈতিকতা ও অর্থনীতি
ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষক ও অংশগ্রহণকারীদের মাঝে আগ্রহের বিষয়গুলোতে ছিল অসামান্য বৈচিত্র্য। এর মাঝে প্রথমটিই হলো ইসলামি অর্থনীতির জন্য একটি ধারণাগত ও তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে দেওয়া- এ ধরনের প্রথম সম্মেলনে যা অবশ্যম্ভাবী সূচনা। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি ব্যাপারে ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ স্বভাবতই একমত যে, তাদের সকল ধারণা ও মূলনীতি চয়ন করা হবে শরীয়ত থেকে। ফলে ইসলাম থেকে উৎসারিত নৈতিকতা ইসলামি অর্থনীতির মৌলিকতম ভিত্তি। তাই ইসলামি অর্থনীতির তত্ত্বীয়করণে যাকাত ও সুদবিহীন ব্যাংকিং অনিবার্যভাবে প্রাধান্য লাভকারী বিষয়ে পরিণত হয়।
সাক্র তার গবেষণাকর্মের শুরুতে অর্থনীতিকে একটি বিজ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো পর্যালোচনা করেন, যাতে ইসলামি ও পশ্চিমা অর্থনীতির মাঝে আপাত সাদৃশ্যমূলক বিষয়গুলো তুলে আনা যায়। এখান থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলো হলো: পশ্চিমা অর্থনীতিতে নৈতিক বিষয়াদি নিহিত রয়েছে, যা আদর্শবাদী অর্থনীতিতে দৃশ্যমান ও পরার্থবাদী অর্থনীতিবিদদের দ্বারা প্রচারিত। অপরদিকে ইসলামি অর্থনীতিতেও নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে, যা ইসলামি রীতি ও ধর্মীয় আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই পশ্চিমা অর্থনীতিবিদগণের কাছে অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ইসলামি অর্থনীতি সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে বা হওয়া উচিত (সাক্র, ১৯৮১)। এরপর তিনি অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় ইসলামি রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রদান করেন। এর ভিত্তি হতে হবে: অর্থনৈতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, সরকারি ব্যয়কে জনকল্যাণে ব্যবহার করা, বাজার কার্যক্রমের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রয়োজন-সাপেক্ষে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, একচেটিয়া বাজারের বিরুদ্ধে লড়াই ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, শ্রমিকদের প্রতিরক্ষায় শ্রমবাজারে হস্তক্ষেপ এবং সকলের প্রতি ন্যায় ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা (প্রাগুক্ত)।
যাকাত-সংক্রান্ত লেখালেখি প্রসঙ্গে আমরা আগেও আল-ফানজারির উদ্ধৃতি দিয়েছি। ইসলামি অর্থনীতির তত্ত্বীয়করণেও তার অবদান রয়েছে। তিনি যেসব বিষয়ে নিজের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন, সেগুলো হলো: শরীয়তের বিষয়গুলোতে মুসলিম অর্থনীতিবিদগণের বুঝের অভাব, এবং অর্থনীতির ব্যাপারে শরীয়তের আলিমগণের বুঝের অভাব। এর ফলাফল, "ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি করা অনেকের লেখার বিষয়বস্তু বিশেষ করে যাকাত ও রিবার নিষিদ্ধতার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। যেন ইসলামি অর্থনীতিতে যাকাত ও রিবা ছাড়া আর কিছুই নেই।” (আল-ফানজারি, ১৯৮১)। তিনি মুসলিম অর্থনীতিবিদদের সমসাময়িক অর্থনীতিতে শাস্ত্রীয়ভাবে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি শরীয়তের ওপরও ভালোভাবে শিক্ষিত হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামি অর্থনীতির চৌদ্দ শ বছরের ইতিহাসের সাথে সমকালীন অর্থনীতির মেলবন্ধন ঘটাতে আল-ফানজারি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন:
◆ প্রথমত, ইসলামি অর্থনীতির ধারণা ও মূলনীতিগুলো নিতে হবে ধর্মের প্রধান উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকে। আর এগুলো পরিবর্তনযোগ্য নয়।
➡ দ্বিতীয়ত, এই ধারণা ও নীতির প্রয়োগ সমকালীন পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্নরকম হতে পারে (প্রাগুক্ত)।
তার মতে, ইসলামি অর্থনীতিকে দুটি প্রধান মাত্রায় ভাগ করা যায়: ১. ইসলামি অর্থনৈতিক পন্থা: যা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক হওয়ার কারণে অপরিবর্তনশীল; ২. ইসলামি অর্থনীতির (প্রয়োগ) পদ্ধতি: যা সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে অভিযোজনযোগ্য।
আল-ফানজারির চিন্তায় বিশেষভাবে আগ্রহোদ্দীপক দিকটি হলো তিনি ইজতিহাদের পক্ষপাতী। “ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া”র ধারণাকে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন তিনি (প্রাগুক্ত)। যেসব ফকিহগণ ধর্মের মধ্যে ইজতিহাদকে বিদআত, আর বিদআতকে পথভ্রষ্টতা, ও প্রতিটি পথভ্রষ্টতাকে জাহান্নামের উপযুক্ত বলে মত দেন—আল-ফানজারির অবস্থান তার বিপরীত।[১] ইজতিহাদের আহ্বান যখন আসে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে, যিনি আবার মিশরের রাষ্ট্রীয় আইনসভার একজন সদস্য—নিশ্চই তা খুব ওজন বহন করে থাকবে।
ইসলামি অর্থনীতির ওপর একটি বিশদ বই ছিল খুবই প্রতীক্ষিত এবং সে চাহিদা পূরণ করে মুহাম্মাদ আবদুল মান্নানের Islamic Economics: Theory and Practice (১৯৭০)। বইটি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়, যখন ইসলামি অর্থনীতির ওপর পাঠ্যবই তৈরির কাজ তার শৈশবলগ্ন পার করছিল। বিষয়টি নিয়ে যারা বিস্তারিত ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করতে চায়, এ বইটি তাদের জন্য ব্যাপক নির্দেশনামূলক ও শিক্ষামূলক। এর মাধ্যমে তিনি পাঠকদের সাহায্য করেছেন যেন তারা বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে বিক্ষিপ্তভাবে তথ্য না নেয়। এর বদলে তাদের দিয়েছেন জ্ঞানার্জনের এক বিশদ মাধ্যম। লেখনশিল্পে মূল্যবান সংযোজন এ বইটি পাঠ্যবইয়ের আকারে রচিত। ইসলামের অর্থনীতির প্রায় সকল দিক এতে আলোচিত হয়েছে, যাতে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাথে তুলনাও (খান, ১৯৮৩)।
এবারে ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক মূল্যবোধের দিকে মনোনিবেশ করা যাক। এখানে দেখা যায় ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ বিশেষ জোর দিয়ে অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে একটি বৈপরীত্য দেখিয়েছেন। তা হলো ইসলামি অর্থনীতিতে নৈতিক মূল্যবোধ নিগূঢ়ভাবে বিদ্যমান। ইসলামি দর্শনের মূলে প্রোথিত রয়েছে এ সকল মূল্যবোধ, যা ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তি। তাই কোনো মূল্যবোধ-বর্জিত ভিত্তির ওপর একটি ইসলামি অর্থনৈতিক নমুনার চিত্রায়ন অসম্ভব। ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও শরীয়তের আলিমগণ এ ব্যাপারে নির্দ্বিধায় একমত।
সায়্যিদ নাকভি তার Ethics and Economics: an Islamic Synthesis-এ এই বিষয়টিকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি প্রথমে উল্লেখ করেন যে, ইসলামি অর্থনীতির মৌলিকতা নিহিত এর নৈতিক মূল্যবোধ-ব্যবস্থার মধ্যে। তারপর একে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ইসলামি নৈতিক দর্শন চারটি প্রধান নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত-একতা, সাম্যাবস্থা, স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্ব-কর্তব্য (নাকভি, ১৯৮১)। একতার ধারণাটি এর পূর্ণাঙ্গতম পর্যায়ে স্রষ্টার একত্ব বা তাওহিকে নির্দেশ করে।
নিম্নতর পর্যায়ে এর অর্থ হলো পৃথিবীতে মানুষের জীবন পুরোপুরিভাবে বিশ্বজগতের সাথে অঙ্গীভূত। পৃথিবীর জীবজগত ও মানবজাতি এক সত্তায় ঐক্যবদ্ধ। সমতার ব্যাখ্যা হলো ন্যায় বা আল-আদল। এর দাবি হলো, জীবজগতের একক পূর্ণাঙ্গতার মধ্যে থেকেই এর প্রতিটি উপাদানের অবস্থানের জন্য সাম্যবিন্দু নির্ধারিত করতে হবে, যাতে সকলে মিলে সর্বোত্তম সামাজিক শৃঙ্খল তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রচলিত স্ট্যাটাস-কো বলতে যেরকম স্থবির একটা অবস্থাকে বোঝায়, ইসলামি সমতা বা সামাজিক সঙ্গতি সেরকম নয়। এটি অকল্যাণের বিরুদ্ধে এক গতিশীল শক্তি (প্রাগুক্ত)। তা ছাড়া সমতার ভেতরে অন্তর্নিহিত কিছু আদর্শিক বিষয়ও রয়েছে। কারণ সামাজিক অস্তিত্বের ময়দানে এর দ্বারা একটি আবশ্যক নৈতিক প্রতিশ্রুতিকেও বোঝায়। এই প্রতিশ্রুতির ফলে ব্যক্তি যে-কোনো সমাজে তার জীবনের সকল দিকের মাঝে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে দায়বদ্ধ। তা ছাড়া ইসলাম শুধু সাম্যাবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, সাম্যাবস্থার মানের ওপরও জোর দেয়। এটি “প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম সম্মিলন, যার ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান সামঞ্জস্য মানবজীবনেও ফুটে ওঠে” (প্রাগুক্ত)।
স্বাধীন ইচ্ছা মানুষকে দেয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। কিন্তু নাকভি দেখিয়েছেন যে, মানবীয় স্বাধীনতা 'ব্যক্তি-মানুষে'র ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সমাজের সদস্য হিসেবে 'সামষ্টিক মানুষে'র ক্ষেত্রেও তা-ই। তবে দুটির মাঝে থাকতে হবে এক অনুপম ভারসাম্য (প্রাগুক্ত)। কাজেই, স্বাধীনতার ইসলামি ধারণা পশ্চিমাদের ধারণার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পশ্চিমা ধারণায় মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর প্রায় অসীম অধিকারের মালিক। সামাজিক কল্যাণে সর্বাধিক অবদান অর্জনের জন্য এটি পূর্ণমাত্রায় ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। ইসলাম ব্যক্তি-মালিকানার ওপর মানুষকে সীমাহীন অধিকার প্রদান করে না। কারণ সকল সম্পত্তি আল্লাহর মালিকানাধীন এবং মানুষের মালিকানা হলো তত্ত্বাবধায়ক বা আমানতদার হিসেবে মালিকানা। নাকভি বলেন, এটি সকল ইসলামি অর্থনীতিবিদের ঐক্যমত্যপূর্ণ অবস্থান।
এবার আসা যাক ইসলামি অর্থনীতির চতুর্থ নৈতিক ভিত্তিতে, এটি হলো কর্তব্য। নাকভির মতে এটা হলো মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কতটুকু করতে পারবে, তার সীমা। স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্তব্যকে দেখা যায় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে। স্বাধীন ইচ্ছা মানুষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়, আর সেই স্বাধীনতাকে দায়িত্বশীলতার সাথে চর্চা করার সীমারেখা ঠিক করে দেয় কর্তব্য। আরেকভাবে বললে, প্রকৃতির সাম্যাবস্থা রক্ষা করতে হলে স্বাধীন ইচ্ছাকে কর্তব্যের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখতে হবে (প্রাগুক্ত)।
কিন্তু নাকভি ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয়টিকে আরেকটু টেনে নিয়েছেন। গ্রহণ করেছেন গতানুগতিকতার বাইরে একটি অবস্থান। তিনি বলেছেন যে, কোনো সমাজে সম্পদের অসাম্য দেখা দিলে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে 'সামষ্টিক মালিকানা'য় স্থানান্তর করা আবশ্যক। এই পদ্ধতিকে তিনি নামকরণ করেছেন 'সামষ্টিকীকরণ' (collectivization)। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্ব যেহেতু সাম্যকরণের যে-কোনো চেষ্টার পথে একটি বাধাস্বরূপ, তাই একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সামষ্টিকীকরণ ও পুনর্বণ্টন করতে হবে।' (প্রাগুক্ত)। অন্যান্য মাধ্যমকে তিনি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট বলে মনে করেন না। তাই আরও বলেন, 'এ বিষয়ে জোর দেওয়ার আরেকটি কারণ হলো, আর্থিক উপকরণগুলো এককভাবে উপার্জনের বণ্টন সাম্যকরণে সফল হয়নি।' (প্রাগুক্ত)। মনে প্রশ্ন আসতে পারে, 'সামষ্টিকীকরণ' অর্থ 'জাতীয়করণ' কি না। নাকভি এ প্রশ্নের ত্বরিত নেতিবাচক জবাব দিয়েছেন। সম্পত্তি স্থানান্তরিত হয়ে রাষ্ট্রের হাতে যাবে না। তিনি রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থাশীল এবং বলেছেন সরকারি কর্মীগণ 'সমাজের টাকায় নিজেদের আখের গোছাতে' পারেন (প্রাগুক্ত)। তাই তার কাছে আদর্শ অবস্থা হলো 'রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং উম্মত কর্তৃক সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সামষ্টিক নিয়ন্ত্রণ' (প্রাগুক্ত)।
অতএব, একটি ইসলামি সমাজে স্পষ্ট আইনের প্রয়োগ করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে:
(ক) সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানাকে সীমাবদ্ধ রাখা, এবং
(খ) মোট সম্পদের মালিকানা সুপরিসর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা।
সামষ্টিকীকরণ বা জাতীয়করণ—যে পরিভাষাই ব্যবহার করা হোক, শেষকথা একই। রাষ্ট্রের বিবেচনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত মালিকানাকে সীমিত করা হবে এবং সুনির্দিষ্ট অংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে। এই প্রক্রিয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন। ইসলামি লেখনীতে এ প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফকিহগণ সামগ্রিকভাবে বাজারের কাম্যতার ব্যাপারে একমত, এবং এখান থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার বৈধতা বের করা যায়। এর পক্ষের যুক্তিগুলো হাদীস ও সুন্নাহভিত্তিক (দ্বিতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। এমনকি যেসকল ফকিহ বাজারের ওপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইসলামি বৈধতার পক্ষে রায় দিয়েছেন, তারাও তাদের মতের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন,
(ক) বাজার-পরিস্থিতিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ চলতে থাকা,
(খ) ব্যবসায়ীরা শরীয়ত থেকে বিচ্যুত হয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হওয়া। যেমন দরের ওপর প্রভাব ফেলার জন্য একচেটিয়াপনা চর্চা করা এবং পণ্য গুদামজাত করা, এবং
(গ) এর ফলে বাজারের কার্যক্রমে অস্বাভাবিক পরিণতি দৃশ্যমান হওয়া—এই সবকিছুই বাজারের পরিবেশকে বাইরে থেকে প্রভাবশালী নিয়ামক।
শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই কেবল রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে। আর এই হস্তক্ষেপ চলবে ততক্ষণ, যতক্ষণ অসাধু চক্রের কার্যক্রম চলমান থাকবে। সেটা কেটে গেলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সাথে সাথে হস্তক্ষেপ থেমে যাবে, (উদাহরণস্বরূপ গ্রন্থপঞ্জিতে দ্রষ্টব্য ইবনু তাইমিয়্যা, আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম)। আধুনিক মুসলিম অর্থনীতিবিদগণের কপালেও এ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ আছে। যেমন নাকভির নিবন্ধের ভূমিকায় খুরশিদ আহমাদ লেখকের প্রশংসা করা এবং কাজটিকে স্বাগত জানানোর পর বলেছেন, ""সামষ্টিক মালিকানা' কোনোকালে ইসলামি রীতি ছিল, এমনটা দাবি করার যুক্তিগত বা পুঁথিগত কোনো প্রকার প্রমাণ দুর্লভ। এ ব্যাপারে আরও সতর্ক ও বলিষ্ঠভাবে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। একদিকে রয়েছে আমানতের ধারণার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা। অপরদিকে যেমন রয়েছে পুঁজিবাদের বিধিনিষেধহীন ব্যক্তিগত মালিকানা ও উদ্যোগ, তেমনি রয়েছে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় সম্পত্তির সামষ্টিকীকরণ। একইভাবে মুসলিম অর্থনীতিবিদগণকে সাম্য ও সমতার মাঝেও স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে” (আহমাদ, নাকভি ১৯৮১)। নাকভির আলোচনা ইসলামি অর্থনীতির ধারণাগত ভিত্তির ব্যাপারে মূল্যবান পর্যবেক্ষণ প্রদান করে। তার অভিনব ধারণা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিতর্কিত মতগুলো আরও ব্যাখ্যা ও ব্যাপকতর আলোচনার দাবিদার।
টিকাঃ
১. প্রাচ্যবিদের মতো গ্রন্থকারও ধারণা করেছেন ইসলামের ক্লাসিক্যাল ফকিহ ও আলিমগণ ধর্মের দোহাই দিয়ে সব ধরনের নতুন বিষয়কে অস্বীকার করেন। অথচ নবউদ্ভূত মাসআলার সমাধানে ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায় সকলেরি স্বীকার করেন। নতুন নতুন মাসালার সমাধানে ইজতিহাদ করতে কোনো সমস্যা নেই। ফুকাহায়ে কেরাম যে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন তার অর্থ ছিল স্বীকৃত মাযহাবসমূহের বাইরে গিয়ে পুনরায় নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা। ইজতিহাদের আলোকে নিত্যনতুন মাসায়িলের সমাধান দেওয়াকে তারা কেউ বিদআত বলেননি। বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন, নবি সাহাবা ও তাবিয়িনের যুগে দ্বীনের যে কাঠামো ছিল সেগুলোর বাইরে কোনো রীতিনীতিকে দ্বীনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সালাফদের মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ করা বিদআত নয়। বিস্তারিত দেখুন, আল-ইতিসাম, ইমাম শাতিবি, সপ্তম অধ্যায়, ২/৪১৬। সম্পাদক
📄 ভোক্তার আচরণ
শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভোক্তাদের আচরণ প্রাচীন ফকিহগণকেও ভাবিয়েছে। তারা যদিও অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তাদের ওই অর্থে অর্থনীতিবিদ বলা যায় না, কারণ দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলাদা করে এই শাস্ত্রের অস্তিত্বই ছিল না। পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা ফকিহ ইমাম আশ-শাইবানির (৭৫০-৮০৪) কিতাবুল কাসব এবং আবু হামিদ গাযালির (১০৫৮-১১১১ খ্রি.) ইহইয়া উলূমিদ্দীন-এর উদ্ধৃতি দিয়েছি। আর তাদের পরে আশ-শাতিবি (মৃ. ১৩৯৬) ভোগতত্ত্ব ও ভোক্তার আচরণ আলোচনা করেছেন খুবই দক্ষ অর্থনীতিবিদ-সুলভ ভঙ্গিতে, (আশ-শাইবানি, গাযালি, ১৯৩৭, আশ-শাতিবি, এবং আর-রাইসুনি, ১৯৯৫)। কোনো উপাদানকে যদি তাদের আলোচনা থেকে অনুপস্থিত বলে বিবেচনা করতেই হয়, সেটা হলো আধুনিক প্রান্তিক বিশ্লেষণের অনুপস্থিতি।
ফকিহগণ ভোক্তার আচরণ আলাপ করেছেন তিনটি লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখে:
➡ (ক) ভোক্তা যেন তার ভোগের মানচিত্র এঁকে নিতে এবং নিজের ভোগ্যপণ্যের তালিকা সাজিয়ে নিতে পারে। আর তা অবশ্যই আল্লাহর আদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে,
➡ (খ) ভোগের বিন্যাসকে আল্লাহর আদেশের অনুগামী করা এবং কতটুকু ভোগ করতে হবে, তা দেখানো।
➡ (গ) আল্লাহর আদেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দরিদ্র ও অভাবীদের প্রাপ্য ভোগের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের রূপরেখা ঠিক করে দেওয়া।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে যে, তিনটি প্রধান দিক থেকে ভোগসংক্রান্ত কার্যক্রম ইসলামের একেবারে অন্তর্নিহিত বিষয়। এই তিনটি ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান হলো,
➡ (ক) ভোক্তা হারাম ও অপছন্দনীয় জিনিস থেকে বেঁচে থেকে শুধুমাত্র হালাল উপকরণ ভোগ করবে।
➡ (খ) ভোগ হতে হবে মধ্যমপন্থায়—কৃপণতাও নয়, অপচয়ও নয়।
➡ (গ) যাকাতের সম্পদ ব্যবহার করার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে, দরিদ্র ও অভাবীরা যেন প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে।
ভোগের এসকল পর্যায় এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে প্রাচীন ফকিহগণ কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আর তাদের দিয়ে যাওয়া বিষয়গুলো আধুনিক অর্থনীতিবিদগণ ব্যবহার করেছেন নতুন বিশ্লেষণমূলক উপকরণ ও প্রান্তিক বিশ্লেষণপদ্ধতি প্রয়োগ করার মাধ্যমে।
এ বিষয়ে বিদ্যমান জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়ে আয-যারকা যে কাজ হাতে নিয়েছেন, তিনি সেটাকে আখ্যায়িত করেছেন ভোক্তা আচরণের সামাজিক ভূমিকা হিসেবে (যারকা, ১৯৮০)। ভোগের সামাজিক ভূমিকা যদি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, তাহলে ভোগ্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর প্রদত্ত পুরস্কারের সর্বাধিককরণ ঘটবে। এটা করতে গিয়ে ভোক্তা তিন পর্যায়ের ভোগের নিয়ম মেনে চলবে। সেগুলো হলো: অত্যাবশ্যকীয়, প্রয়োজনীয় ও আরামপ্রদ। পূর্বতন ফকিহগণের বিশ্লেষণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলতে হয়, ইসলামে ভালোভাবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনার জন্য দরকারি পাঁচটি মৌলিক জিনিস প্রয়োজনীয়তার অন্তর্ভুক্ত। যথা: ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পত্তি। সাধারণ প্রয়োজনীয় ভোগের মধ্যে রয়েছে এমন সকল কার্যক্রম ও পণ্য, যা মৌলিক পাঁচটি জিনিস ঠিক রাখার জন্য আবশ্যক নয়। আর আরামপ্রদের অন্তর্ভুক্ত হলো সাধারণ প্রয়োজনের চেয়েও ওপরের কাজকর্ম ও পণ্যদ্রব্য। এগুলো কোনো দুর্দশা বা কঠিনতা দূর করে না, কিন্তু জীবনকে শোভামণ্ডিত ও সুসজ্জিত করে (যারকা, ১৯৮০)। ভোক্তার সামাজিক ভূমিকাকে আকৃতি প্রদানে যাকাতও ধর্মীয় ও সামাজিক ভূমিকা রেখে থাকে।
ভোক্তার আচরণের একটি লক্ষ্য হিসেবে ফালাহ বা সাফল্যের ধারণার ওপর আলোকপাত করেছেন কাহফ (কাহফ, ১৯৮০)। এর অর্থ হলো ইহজীবন ও পরজীবনে সাফল্য অর্জন। ভোক্তার ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের উপযোগকে সর্বাধিককরণ না করলে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কাহফ উপসংহারে বলেন যে:
➡ (ক) যাকাতের গুণে ইসলামি অর্থব্যবস্থা এমন এক ইসলামি ভোক্তা সৃষ্টি করবে, যার সঞ্চয়ের হার অন্যান্য জীবনব্যবস্থার ভোক্তাদের চেয়ে বেশি হবে।
➡ (খ) ইসলামিক সিস্টেমের প্রকৃতিই এমন যে, এটি বিনিয়োগকে সঞ্চয়ের সিদ্ধান্তের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করবে।
➡ (গ) যাকাতের প্রভাবে ইসলামি পদ্ধতিতে সম্পদের মাত্রা ঠিক থাকবে।
➡ (ঘ) যাকাত বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্রদের অবশিষ্ট সম্পদ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ইসলামি ব্যবস্থা সামষ্টিক চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি করবে, ফলে কাজের পরিমাণও বাড়বে।
➡ (ঙ) ইসলামিক সিস্টেম অন্যান্য সিস্টেমের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য অধিকতর পরিমাণ সম্পদ নিশ্চিত করে।
➡ (চ) ইসলামি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় সম্পদগুলো সক্রিয় করে তোলে। এবং
➡ (ছ) যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি কার্যকরী তথ্য উপকরণ প্রদান করে (কাহফ, ১৯৮০)।
আকরাম খান ভোক্তার আচরণ সংক্রান্ত তত্ত্বে মাসলাহাত বা সামাজিক কল্যাণের ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি মুসলিম ভোক্তার আচরণকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে (খান, ১৯৯২)। তিনি “আকাঙ্ক্ষা” ও “প্রয়োজনীয়তা”র মাঝে পার্থক্য করেছেন। বলেছেন যে, ইসলামে ভোক্তার আচরণ আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। সকল আকাঙ্ক্ষাই সমপরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ এবং অসীম পরিমাণ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে—এই ধারণাকে ইসলাম নাকচ করে দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইসলাম বলেছে, সুনির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজন সবার আগে পূরণ করতে হয়। এরপরে মনোনিবেশ করতে হয় আকাঙ্ক্ষার ওপর। এমনকি এই প্রয়োজনীয়তাগুলোরও একটি অগ্রাধিকারের মানদণ্ড রয়েছে। যেখানে কোনোটা কম আবার কোনোটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পণ্য প্রয়োজনীয় না স্রেফ আকাঙ্ক্ষা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাসলাহাতের ধারণাটি ব্যবহার করতে হবে। এতে পরীক্ষা করা হবে যে, সেই পণ্যের উৎপাদন বা সেবা সমাজের কল্যাণ বৃদ্ধি করে কি না। যদি করে, তাহলে তা প্রয়োজনীয়। সেক্ষেত্রে এটির উৎপাদন ও ভোগ করা যেতে পারে। অন্যথায় তা আকাঙ্ক্ষা। সেক্ষেত্রে এটিকে অপেক্ষা করতে হবে আগে অধিক গুরুত্বপূর্ণ সকল চাহিদা পূরণ হওয়া পর্যন্ত। তাই মুসলিম ভোক্তাবৃন্দের ভোগের ধরন যতটা প্রয়োজনীয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে, আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ততটা হবে না। চতুর্দশ শতাব্দীর লেখক আশ-শাতিবির মতো করেই খান প্রয়োজনীয়তাকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন: জীবন, সম্পত্তি, ধর্মবিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি ও বংশধারা। এই পাঁচটি উপাদান নিশ্চিত করার ক্ষমতা যত পণ্যের মধ্যে রয়েছে, সেগুলো মানবজাতির জন্য মাসলাহাত বহনকারী। এ থেকে বোঝা যায় মাসলাহাত ও উপযোগ একই বিষয় নয়। ভোক্তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মাসলাহাত বিবেচনা করা হয় সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের কল্যাণের ওপর। আর উপযোগ দিয়ে নির্ধারিত হয় ভোক্তা তার ব্যক্তিগত ভোগের ক্ষেত্রে কিভাবে অগ্রাধিকারের ক্রম নির্ধারণ করবে। তা ছাড়া দুটোই নির্ধারণ করে যে, ভোক্তা ইহকালে ভোগের জন্য কিভাবে কী ব্যয় করবে। কিন্তু মাসলাহাতে আল্লাহর রাস্তায় ও পরকালের জন্য খরচ করা এবং দুই জগতের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাও প্রত্যাশিত (প্রাগুক্ত)।
একদিকে আদর্শবাদ ও আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ এবং অন্যদিকে ভোক্তার আচরণের ইসলামি বিশ্লেষণের মাঝে পার্থক্য নিয়ে এই ময়দানের অনেক লেখকই ভেবেছেন। এই দুই তত্ত্বের মাঝে আল-আশকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য দুইই দেখিয়েছেন (আল-আশকার, ১৯৮৩)। শুরুতে বলা যায়, পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিবিদ ও ইসলামি অর্থনীতিবিদ উভয় পক্ষ থেকেই গতানুগতিক অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা করা হয়েছে। সাধারণভাবে গোটা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিশেষভাবে ভোক্তার আচরণের ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করার দায়ে অভিযুক্ত তারা। অবশ্য এ ধরনের সমালোচনা শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কারণ কিছু গতানুগতিক অর্থনীতিবিদও আদর্শবাদকে বিবেচনায় নিয়েছেন। যেমন, কলার্ড (Collard, 1978)।
সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা থেকে বোঝা যায় তারা কতটা জোর দিয়েছেন কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর। তবে সাধারণভাবে গতানুগতিক অর্থনীতির আচরণগত ধারণাগুলো পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের কাছে সমালোচিত। তাদের মতে ভোক্তার সামাজিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। যথাযথ পরিমাণ আমলে নিতে হবে পারিপার্শ্বিক সমাজের স্বার্থকে। তারা বরং একটি সামাজিক চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ভোক্তাকে বিবেচনা করা হয় "হোমো-ইকোনোমিকাস-হিউম্যানাস” হিসেবে (Nitsch, 1982)। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়াদিকে খ্রিষ্টান চিন্তার বা “অনুরূপ কোনো শিক্ষাসমষ্টি যেমন ইসলাম"-এর সামাজিক নৈতিকতার সাথে সংযুক্ত করার পক্ষপাতী (McKee, 1982)। সামাজিক-অর্থনীতিবিদ ও ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ আপাতদৃষ্টে একটি বিষয়ে একমত: ভোক্তার আচরণের বিশ্লেষণে পারিপার্শ্বিক সমাজের প্রতি ভোক্তার সামাজিক দায়িত্বকে বিবেচনায় নেওয়া। এই সাদৃশ্যের স্বীকৃতি সত্ত্বেও বলতে হয় এই দুই দল অর্থনীতিবিদ বিশেষভাবে নিম্নলিখিত বিষয়াদিতে দ্বিমত করেন (আল-আশকার, ১৯৮৩ ও ১৯৮৫):
➡ (১) সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের একগুচ্ছ নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে, যেগুলো ঠিক ধর্মীয় না-ও হতে পারে। ইসলামি অর্থনীতিবিদদের নৈতিকতা উৎসারিত হয় ইসলামি বিশ্বাস থেকে। এই পার্থক্যের গুরুত্ব পরবর্তী পয়েন্টগুলোর সাথে সম্পর্কিত।
◆(২) ভোক্তা কী পদ্ধতি অনুসরণ করবে, সে ব্যাপারে সামাজিক- অর্থনীতিবিদদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নেই (নিজস্ব নৈতিক মূল্যবোধের সাপেক্ষে ব্যক্তি তার ভোগের বিন্যাস নির্ধারণে স্বাধীন)। ইসলামি অর্থনীতিবিদদের রয়েছে ইসলাম-প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।
⇨ (৩) পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিতে ভোক্তার লক্ষ্য দুইরকম—ভোগকৃত পণ্য ও সেবা থেকে প্রাপ্ত উপযোগ এবং নৈতিক সন্তুষ্টি। ইসলামি অর্থনীতিতে তা তিনরকম: ভোগকৃত পণ্য ও সেবা থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, নৈতিক সন্তুষ্টি, এবং ইহকাল ও পরকালে ঐশী পুরস্কার পাওয়ার সন্তুষ্টি।
ভোক্তা আচরণের ইসলামি তত্ত্বের দিকে সমালোচনা ধেয়ে আসতে পারে যে, এটি অতিরিক্ত আদর্শবাদী। ভোক্তা তার ব্যয়-নির্বাহে ইসলামি আদর্শ কতটা পালন করে, সে প্রশ্নে বাস্তব পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা দরকার। কিন্তু এ ধরনের কাজের পরিমাণ নগণ্য। অল্পকিছু গবেষণাকর্মের মধ্যে আল-আশকারের গবেষণা রয়েছে। তিনি একটি অনৈসলামিক দেশ স্কটল্যান্ডে মুসলিম ভোক্তাদের আচরণ এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব তদন্ত করার চেষ্টা করেছেন (আল-আশকার, ১৯৮৫)। গবেষণাটির সার্বিক ফলাফল এই তত্ত্বকে কিছুটা সমর্থন করে, তবে কিছু দাবিকে নাকচও করে দেয়। ফলাফলগুলো নিম্নরূপ:
➡ ক. উত্তরদাতাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর তাদের কাছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায় সমাজকল্যাণমূলক খরচ। এটি উক্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মতকে সমর্থন করে।
➡ খ. পরিবেশের প্রভাব এই গবেষণায় একদম স্পষ্ট। কারণ নিজস্ব পরিবহনের জন্য গাড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা অগ্রাধিকারের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে। নিম্ন আয়বিশিষ্ট অন্যান্য মুসলিম দেশে এমনটি না-ও হতে পারে।
➡ গ. সঞ্চয়ের বেশির ভাগ অবশ্য পশ্চিমাদের পরিচালিত ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়। গবেষণায় এর অনেকরকম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই ইসলামি ব্যাংকের অনুপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। সুদের ইসলামি নিষিদ্ধতা কেউই অস্বীকার করেননি।
এটা অবশ্য একেবারেই প্রাথমিক গবেষণা। চর্চাকে তত্ত্বের সাথে সংযুক্ত করার জন্য বাস্তব পর্যবেক্ষণমূলক আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
📄 বীমা
ইসলামি অর্থনীতিবিদ এবং শরীয়তের আলিমগণের কাছে বীমার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে দুটি কারণে: (ক) এর নতুনত্ব এবং (খ) আধুনিক ইতিহাসে ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনার (Risk management) উপকরণ হিসেবে এর ভূমিকা。
➡ প্রথমত, যেসব আধুনিক কর্মকাণ্ড ইসলামের প্রাথমিক শতাব্দীগুলোতে ছিল না, সেগুলোর একদম স্পষ্ট এক উদাহরণ হলো বীমা। তাই এর ইসলামি বৈধতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
➡ দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় ক্ষতির অর্থায়নের কৌশল হিসেবে বীমা আধুনিক সমাজে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন, তেমনি ব্যবসায়ী পর্যায়েও।
মতভেদটা যতটা না বীমা নিয়ে, তার চেয়ে বেশি বীমা প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে। যেমন, মুস্তফা আয-যারকা বীমাকে আনুভূমিকভাবে পারস্পরিক, সমবায় ও লাভজনক এই তিনভাগে' এবং উল্লম্বভাবে সম্পত্তি, ঋণদায়, ও জীবন এই তিনভাগে ভাগ করেছেন। তারপর সবগুলোকে অনুমোদন দিয়ে বলেছেন যে, এগুলো বেআইনি হওয়ার কোনো কারণ তিনি শরীয়তে পাননি (যারকা, ১৯৮০)। [১] তার মতে পারস্পরিক বীমা ইসলামের আগে ও এর প্রাথমিক যুগগুলোতে পরিচিত ছিল। তাই আধুনিক মুসলিম সমাজে একে নিষিদ্ধ করা যাবে না। আর সমবায় বীমাও এটার মতো একই প্রকৃতির হওয়ায় শরীয়তে এর বৈধতাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এ ধরনের বীমায় মুনাফা উদ্দেশ্য না। বরং উদ্দেশ্য হলো ক্ষতি সংঘটিত হলে তা তাকাফুল বা বীমা তহবিলের অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া। তহবিলের যদি কোনো ক্ষতি সংঘটিত না হয়, তাহলে তহবিল নাকচ করে দিয়ে যার যার টাকা তার তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। তবে অংশগ্রহণকারীরা তহবিল অব্যাহত রাখার ব্যাপারে একমত হলে ভিন্ন কথা। ক্ষতি যদি প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়, তাহলেও একই কথা। বীমা তহবিলের টাকা এর অংশগ্রহণকারীদের ফেরত দিয়ে দেওয়া যায় (প্রাগুক্ত)। শর্তাবলি পাওয়া গেলে শরীয়তের আলিমগণ এই ধরনের বীমা তহবিল গঠন বৈধ বলেছেন।
তবে যেসব বীমার মাধ্যমে বীমাকারীর মুনাফা করানো উদ্দেশ্য, সেগুলো নিয়ে হয়েছে মতপার্থক্য। আধুনিক সময়ে তা হবে বিশেষায়িত বীমা কোম্পানির মাধ্যমে কৃত বীমা। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বীমার প্রিমিয়াম হিসাব করতে সক্ষম, যাতে বীমাকারী কোম্পানিকে গ্রহণযোগ্য মুনাফা প্রদান করা যায়। এই হিসাব করা হয় ক্ষতিপূরণের সম্ভাব্য মূল্যের অথবা বীমাকৃত ঘটনাটি ঘটে গেলে ক্ষতির মূল্যের বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে।
টিকাঃ
১. কমার্শিয়াল বীমা প্রায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হারাম। এতে সুদ, জুয়া, গারার-সহ 'শরীয়তে নিষিদ্ধ এমন' বিষয়াদি পাওয়া যায়। ইসলামি ফিকহ একাডেমি, মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ-সহ মুসলিম ফকিহ ও স্কলারদের অনেক বোর্ডে এর অবৈধতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শাইখ যারকা-র মতামতকে ফকিহগণের ঐকমত্যের তুলনায় বিচ্ছিন্ন মত ধরা হয়। অবশ্য বীমার বিকল্প হিসেবে তাকাফুল ব্যবস্থা বর্তমানে বেশ প্রচলিত হয়েছে। এতে কোম্পানীর শেয়ারহোল্ডাররা ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়ামের মালিক হয়ে যান না। পলিসিহোল্ডার ও শেয়ারহোল্ডারদের হিসাব আলাদা থাকে। এতে সাধারণত পারস্পরিক অনুদানের ভিত্তিতে ঝুঁকি বহন করা হয়। - সম্পাদক
📄 মুসলিম দেশসমূহের মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতা
মুসলিম দেশসমূহের মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি ইসলামি অর্থনীতিবিদদের বেশ মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। স্বভাবতই সার্বিকভাবে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। জোর দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের জন্য এর গুরুত্বের ওপর। অবশ্য পদ্ধতির বৈচিত্র্য এবং জোরারোপের পরিমাণের বিভিন্নতা রয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে ইউসরি একটি সমন্বিত ইসলামি সমবায় ব্যবস্থার প্রস্তাবনা রেখেছিলেন। এর লক্ষ্য হবে অনৈসলামিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর ওপর থেকে নির্ভরতা বিলোপ করা। এটি হতে পারে নিম্নলিখিত মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে (ইউসরি, ১৯৮৫):
➡ (১) উৎপাদন ও রপ্তানিতে বৈচিত্র্যের প্রবর্তন ঘটানো, যার ফলে মুসলিম দেশগুলো একপণ্য (one-product) অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করবে। এটি এসকল দেশের একটি অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য। শিল্পখাতে অগ্রসর দেশগুলোতে একটি বা দুটি কাঁচামাল রপ্তানি করার ওপরই দেশগুলো নির্ভরশীল হয়ে থাকে।
➡ (২) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে বহুজাতিক ইসলামি বিনিয়োগের প্রচারণা।
➡ (৩) ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা এবং এগুলোর প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান।
➡ (৪) এমন এক ইসলামি শুল্ক ব্যবস্থার প্রয়োগ, যা মুসলিম দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত হবে।
➡ (৫) অনৈসলামিক দর্শন-নির্ভর অর্থনৈতিক সংস্থায় যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
➡ (৬) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে একটি ইসলামি কাস্টমস ইউনিয়ন স্থাপন করা, যেখানে এই দেশগুলো তাদের উৎপাদন কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এর উদ্দেশ্য হবে তুলনামূলক কম খরচ এবং নিজেদের মাঝে যথাযথভাবে সম্পদ বণ্টনের সুবিধা অর্জন করা।
➡ (৭) একটি ইসলামি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পর্ষদ স্থাপন করা, যা মুসলিম দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক নীতিমালার সমন্বয় সাধনে সাহায্য করবে। সেইসাথে এসব দেশে ইসলামি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করতে চাওয়া বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদেরও সাহায্য করবে এটি।
➡ (৮) ইসলাম যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের আদেশ করে, তার ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সহযোগিতা থাকতে হবে।
বলাবাহুল্য, ইউসরি তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার উপকারিতা নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলাপ করেছেন।
মুসলিম দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতার এই একই বিষয়টি নিয়ে শাইখ যাকিও আলোচনা করেছেন। তিনি মনোনিবেশ করেছেন মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া সমস্যা এবং সেগুলোর টেকসই সমাধান অনুসন্ধানের ওপর (যাকি, ১৯৮০)। এগুলো হলো:
➡ (ক) সম্পদ ও আয়ের ভুল বণ্টন;
➡ (খ) একপণ্য অর্থনীতি;
➡ (গ) পুঁজির সংকট;
➡ (ঘ) দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকের অভাব;
➡ (ঙ) নিম্নমানের প্রযুক্তি;
➡ (চ) শিল্পখাতে উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের অভাব;
➡ (ছ) সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব এবং
➡ (জ) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সমন্বয়ের অভাব।
এই সমস্যাগুলো কিভাবে সামাল দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে যাকি বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। প্রাকৃতিক, মানবীয় ও আর্থিক অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নত ব্যবহার, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং কৃষিখাতের উন্নয়ন এসব পরামর্শের মাঝে কয়েকটি উদাহরণ (প্রাগুক্ত)।
এই লেখকগণের বিশ্লেষণের দুই দশক পর এসব সমস্যার কতটুকু এখনো বিরাজমান, তা আন্দাজ করা তেমন কঠিন কিছু নয়। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য বহুল প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পুঁজি সরবরাহে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। তারপরও অনেক কাজ বাকি। প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে, দক্ষ শ্রমিক আগের চেয়ে অনেক বেশি সুলভ, আর গত প্রায় দুই দশকে দারুণভাবে উন্নত হয়েছে অবকাঠামো। কিন্তু কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মুসলিম দেশসমূহের মাঝে সমন্বয়ে এখনো অনেক অসুবিধা বিদ্যমান।
তা ছাড়া ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মাঝে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো খুবই সীমিত। যেমন, ইউরো জোনের অর্ধেক থেকে চার-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য জোনের সদস্য দেশগুলোর সাথেই সংঘটিত হয়। কিন্তু ২০০১ সালে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ এবং আমদানির ক্ষেত্রে ১৪ শতাংশ। নিচে ছক ৯.১-এ তা দেখানো হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈষম্য এবং হরেক রকম অর্থনৈতিক কাঠামো রয়েছে। তাই মুদ্রাগত ঐক্য স্থাপনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে নিজেদের মুদ্রায় সামঞ্জস্য আনার শর্ত পূরণ করা সম্ভব বলে মনে হয় না (Wilson, 2004)। যথাযথ মুদ্রাগত ঐক্য সফল হওয়ার জন্য মানডেল (১৯৬১) ও ম্যাককিনন (১৯৬৩) তিনটি শর্তের কথা বলেছেন।
➡ প্রথমত, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সম্পদ, বিশেষত শ্রম ও পুঁজি স্থানান্তরযোগ্য হতে হবে;
➡ দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক কাঠামো একইরকম হতে হবে;
➡ তৃতীয়ত, মুদ্রা, অর্থ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিমালার মাঝে সমন্বয় সাধনের সদিচ্ছা থাকতে হবে।
মানডেল ও ম্যাককিনন আরও বলেছেন যে, সফল মুদ্রাগত ঐক্যের জন্য পুঁজির মুক্ত চলাচলের পাশাপাশি কিছু আর্থিক বাজার সমন্বয়ও পূর্বশর্ত। এই শর্তগুলো ওআইসিভুক্ত দেশগুলোতে পূরণ হয় না। সব ওআইসি দেশের মাঝে শ্রম স্থানান্তরে বিধিনিষেধ রয়েছে। তা ছাড়া ওয়ার্ক পারমিটের ওপর ক্রমেই বেড়ে চলেছে বিধিনিষেধ। এর মাধ্যমে বিদেশিদের বদলে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করা হয় (Wilson, 2004)। তা ছাড়া বাস্তবতা হলো, মুসলিম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে পুঁজির প্রবাহ একেবারেই কম। এটি পুঁজিবাজারের সীমিত মাত্রা ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রবাহের বিধিনিষেধের আংশিক প্রতিফলন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র সৌদি আরব ও মালয়শিয়া, যেখানে পুঁজিবাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। তা ছাড়া সেখানে সরকারি বন্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্য হয়ে থাকে, যার মাঝে মালয়শিয়ার সুকুক সার্টিফিকেটও অন্তর্ভুক্ত।
**ছক ৯.১: ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মাঝে অন্তঃবাণিজ্য, ২০০১**
| দেশের নাম | অন্তঃ-রপ্তানি (ইউএস ডলার বিলিয়ন) | অন্তঃ-রপ্তানির ভাগ % | অন্তঃ-আমদানি (ইউএস ডলার বিলিয়ন) | অন্তঃ-আমদানির ভাগ % |
|---|---|---|---|---|
| আলজেরিয়া | ১.৩৩ | ৬.৮ | ০.৯১ | ৭.৯ |
| বাংলাদেশ | ০.২২ | ৩.৮ | ০.৮৮ | ৯.৮ |
| মিশর | ০.৭৬ | ১৮.৪ | ১.৬৮ | ১৩.২ |
| ইন্দোনেশিয়া | ৪.৮১ | ৭.৪ | ৪.৭৪ | ১২.২ |
| ইরান | ৩.৬৮ | ১৪.০ | ২.৪৫ | ১৩.৩ |
| ইরাক | ১.০৪ | ৯.৪ | ১.১০ | ২১.২ |
| জর্দান | ১.১৯ | ৫১.৮ | ১.৪২ | ২৯.১ |
| কুয়েত | ২.১২ | ১১.৩ | ১.৭১ | ২১.৭ |
| মালয়শিয়া | ৪.৯৫ | ৫.৬ | ৪.৭১ | ৬.৪ |
| মরক্কো | ০.৫০ | ৭.০ | ১.৮৮ | ১৭.১ |
| পাকিস্তান | ১.৯৮ | ২১.৫ | ৪.৪৫ | ৪৩.৬ |
| সৌদি আরব | ১০.৩৩ | ১৪.৭ | ৩.৩৯ | ৮.০ |
| সিরিয়া | ১.৩১ | ২৪.০ | ০.৯৪ | ১৪.৮ |
| তিউনিসিয়া | ০.৭৩ | ১১.১ | ০.৯২ | ৯.৭ |
| তুর্কিয়ে | ৩.৯০ | ১২.৫ | ৫.২৭ | ১২.৭ |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ৬.০৬ | ১৫.১ | ৯.০০ | ২০.৮ |
| ইয়েমেন | ০.৪৯ | ১৪.০ | ১.১৭ | ৩৮.৫ |
উৎস: ইসলামি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বার্ষিক প্রতিবেদন, ১৪২৩ হি., জেদ্দা, ২০০৩, পৃ. ৬৩
প্রায় পঁচিশ বছর আগে দেওয়া ইউসরির পরামর্শের বিপরীতে মুসলিম দেশ থেকে পুঁজি প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো পশ্চিমা বিশ্বে। ছক ৯.২-এ উল্লেখিত বেশির ভাগ পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রবাহে অন্তঃপ্রবাহের বদলে দেখা যাচ্ছে মুসলিম বিশ্ব থেকে উন্নত দেশ থেকে বহিপ্রবাহ। ইসলামি বিশ্বে প্রধান কার্যালয়বিশিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানির অভাব মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সীমিত করে দিচ্ছে। এমনকি মুসলিম অর্থনীতিসমূহ এবং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির মাঝে এফডিআই চলাচল একেবারেই সামান্য, যা ছক ৯.২ থেকে দেখা যায়।
মুসলিম বিশ্বে অর্থবাজারের সমন্বয় আরেকটি কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা হলো পুঁজি রপ্তানির ওপর সর্বজনীনভাবে প্রযুক্ত বিদেশি লেনদেন নিয়ন্ত্রণ। GCC রাষ্ট্রগুলো প্রধানতম ব্যতিক্রম। যদিও এসব দেশে উদ্ভূত তহবিল ইসলামি বিশ্বের পরিবর্তে বহুলাংশে পশ্চিমে বিনিয়োগ হয় (Wilson, 2004)।
মুসলিম মুদ্রাগত ঐক্য সফল হতে হলে অভিন্নতার মানদণ্ড নির্ধারণ ও পূরণ করতে হবে। মাস্ট্রিক্টে যেসব মানদণ্ডের ব্যাপারে ঐক্যমত্য হয়েছে এবং পরে ঋণ মানদণ্ড বাদে বহুলাংশে ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলোতে প্রযুক্ত হয়েছে, মুসলিম দেশগুলোকেও সেগুলোর অনুরূপ হতে হবে।
**ছক ৯.২: নির্বাচিত মুসলিম অর্থনীতিসমূহে পুঁজির অন্তঃপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহ**
| দেশের নাম | ব্যক্তিগত K/GDP % ১৯৯০* | ব্যক্তিগত K/GDP % ২০০২* | FDI/GDP % ১৯৯০** | FDI/GDP % ২০০২** |
|---|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ০.৯ | ২.৬ | 0.0 | ০.১ |
| মিশর | ৬.৮ | ৬.৬ | ১.৭ | ০.৮ |
| ইন্দোনেশিয়া | ৪.১ | ৫.৪ | ১.০ | ২.১ |
| ইরান | ২.৬ | ২.৪ | 0.0 | 0.0 |
| জর্দান | ৬.৩ | ৭.৮ | ১.৭ | ০.৯ |
| কুয়েত | ১৯.৩ | ১৮.৯ | ১.৩ | ০.৫ |
| মালয়শিয়া | ১০.৩ | ১৯.৯ | ৫.৩ | ৫.৮ |
| মরক্কো | ৫.৫ | ৩.৩ | ০.৬ | ১.৪ |
| পাকিস্তান | ৪.২ | ৫.৩ | ০.৬ | ১.৪ |
| সৌদি আরব | ৮.৮ | ১৩.৯ | ১.৬ | ০.৫ |
| সিরিয়া | ১৮.০ | ১৬.৮ | 0.0 | ১.৫ |
| তিউনিসিয়া | ৯.৫ | ১০.৬ | ০.৬ | ৩.৮ |
| তুর্কিয়ে | ৪.৩ | ৭.৭ | ০.৫ | ০.৭ |
| ইয়েমেন | ১৬.২ | ৩.৬ | ২.৭ | ১.১ |
টীকা: * FDI ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অন্তপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহের সমষ্টি ** FDI অন্তপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহের সমষ্টি
উৎস: ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস, বিশ্বব্যাংক, ওয়াশিংটন, ২০০৪।
মুদ্রাস্ফীতির হারের তারতম্য তুর্কিতে ৪০% আর GCC রাষ্ট্রগুলোতে প্রায় শূন্য (বিশ্বব্যাংক, ২০০২)। সুদের হারের পার্থক্য ও লেনদেন হারের চলাচলেও এই বৈষম্য ফুটে ওঠে। তাই অভিন্নতার সম্ভাবনা খুবই কম (প্রাগুক্ত)।
তারপরও মুসলিম দেশগুলোর মাঝে কাস্টমস ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইউসরির ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা সুপারিশ আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। GCC তে মুক্তবাণিজ্য অর্জন করা সহজ ছিল। তেল রপ্তানির কারণে এই দেশগুলো অনুকূল বাণিজ্যিক অবস্থানে রয়েছে। আর আমদানি পরিশোধেও কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। গভীর সমন্বয় আসে ২০০২ সালে, যখন মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলকে স্থগিত করে দেয় একটি কাস্টমস ইউনিয়ন। প্রতিটি GCC রাষ্ট্র পাঁচ শতাংশের একটি সাধারণ ট্যারিফ গ্রহণ করে। আর পণ্য চলাচলের ওপর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ (Looney, 2003)। সাধারণ বাজারের অনেক পূর্বশর্ত GCC দেশগুলোতে আগে থেকেই রয়েছে। বিশেষত পুঁজি বা স্থানীয় নাগরিকদের চলাচলে কোনো বাহ্যিক বিধিনিষেধ নেই। তাই আরও নিবিড় অর্থনৈতিক সমন্বয়ের দিকে এগোনোর ব্যাপারে একমত হওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। যেহেতু একক মুদ্রাকে কার্যকর কাস্টমস ইউনিয়নের আবশ্যক পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়, তাই এই পদক্ষেপটুকু নেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক (আয-যোবাইদি, ২০০২)। GCC'র লক্ষ্য হলো ২০০৫ সালের মাঝে মুদ্রাগত ঐক্য অর্জন করা। আর একক মুদ্রা হিসেবে হয়তো দিনারকে নির্ধারণ করা হতে পারে, যা বিদ্যমান ছয়টি মুদ্রাকে প্রতিস্থাপিত করবে ২০১০ সালের মধ্যে।
এই সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর কোনো সরল স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই। দেখা যাক, উৎপাদিত পণ্যের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি এবং সেবা থেকে প্রাপ্ত উপার্জনবিশিষ্ট আরও মুসলিম দেশ দীর্ঘমেয়াদে নতুন এই মুদ্রা গ্রহণ করে নেয় কি না। সেইসাথে উপসাগরীয় দিনারকেও পরিণত হতে হবে সত্যিকার অর্থে ইসলামি দিনারে। তাহলে লেনদেনের হার ও জ্বালানির দামের মাঝে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়বে। ইসলামি দিনার ব্লকের বৈদেশিক লেনদেনের আয় তখন হবে আরও বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। এটি সহায়তা করবে মুদ্রার স্থিতিশীলতা তৈরিতে। বৈচিত্র্যের জন্য সত্যিকারের প্রণোদনা তৈরি হবে। সেটা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ব্লককে প্রশস্ত করার মাধ্যমে যেমন, তেমনি ব্লকের বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলোর রপ্তানি ও সেবাখাতের উপার্জন-ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেও (Wilson, 2004)।