📄 সুদমুক্ত ব্যাংকিং
সুদমুক্ত ব্যাংকিং একটি নতুন বিষয় ছিল, যেটাকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেওয়াই হয়নি। বাণিজ্যিক ব্যাংকিং জিনিসটাই তো উনবিংশ শতকের উদ্ভাবন। এ বিষয়ক শুরুর দিকের লেখালেখিগুলো ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মনোযোগ কাড়তে শুরু করে সবে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। সিদ্দিকির রচিত Banking without Interest ১৯৬৯ সালে প্রথমে উর্দুতে এবং তারপর ১৯৭৩ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি ব্যাংকিং কার্যক্রমকে একটি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেন। তারও আগে যারা যারা সুদমুক্ত ব্যাংকিং নিয়ে লেখালেখি করেছেন, তাদের অবদান সম্পর্কে পাঠকদের মূল্যবান তথ্য প্রদান করেন তিনি (সিদ্দিকি, ১৯৭৩)। বিষয়টির ওপর উর্দু, ইংরেজি ও আরবিতে কাজ হয়েছে। উর্দুতে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সন্ধান পাই। সাইয়্যিদ আবুল আলা মওদুদির রিবা (১৯৬১) এবং শাইখ আহমাদ ইরশাদের Banking without Interest (১৯৬৪)। ইংরেজিতে আনওয়ার ইকবাল কুরেশির Islam and the Theory of Interest প্রকাশিত হয়েছে সেই ১৯৪৬ সালে, মুহাম্মাদ উযাইরের An Outline of Interestless Banking ১৯৫৫-তে, আফযালুর রাহমানের Banking and Insurance in Islam ১৯৭৯-তে। মাহমুদ আবু সাউদের Is it Possible to Establish Islamic Banks? মুহামাদ আবদুল্লাহ আল-আরাবির Contemporary Banking (উভয়টি ১৯৬৫), এবং ঈসা আবদুহুর Banking without Interest (১৯৭৪) আরবি ভাষায় কিছু অনন্য কাজ। এই সকল কাজের কমন দিকটি হলো, লেখকগণ ভবিষ্যতে আসন্ন জটিলতাগুলো বুঝেও ইসলামি ব্যাংকিংকে সম্ভব বলেছেন। দেশের ব্যাংকিং আইনের অনুমোদন পেলে এগুলো লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগির ভিত্তিতে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হবে। যেসকল জমাকারী তাদের অর্থ বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক, ব্যাংক একটি স্বাধীন পক্ষ হিসেবে তাদের সাথে অংশীদারিত্বের চুক্তিতে প্রবেশ করবে। আর বিনিয়োগে অনিচ্ছুক জমাকারীগণ তাদের অর্থ জমা রাখবেন চাহিবামাত্র পাওয়ার শর্তে। এই সাধারণ মূলনীতিগুলোর আরও বিশ্লেষণ এবং শাস্ত্রীয় আলোচনা ও ব্যাখ্যা নিরীক্ষণ করা হয়েছে সিদ্দিকির Banking without Interest-এ। আসন্ন কর্মযজ্ঞের আকার উপলব্ধি করে সিদ্দিকি ১৯৭৩ সালে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের আহ্বান জানান এ বিষয়ে আলোচনা আরও সামনে এগুনোর জন্য (সিদ্দিকি, ১৯৭৩)। উনিশশ নব্বইয়ের দশকেও পুরোদমে চলমান থেকেছে এসকল আলোচনা।
সেই প্রাথমিক পর্যায়ে লেখালেখির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার আগমন ঘটেছে ব্যাংকিং অ্যাকাডেমিক ও চর্চাকারীদের কাছ থেকে। মিশরে ১৯৬৩ সালে প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোকে এমন একটি কাজ করেছেন আন-নাজ্জার। মিত-গাম্র ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি ইসলামি ব্যাংকিং-এর ধারণা প্রবর্তিত করলেও কাজটা তিনি ঠিক ইসলামি স্লোগানে মুড়িয়ে করেননি। সঞ্চয়ী ব্যাংকগুলো প্রায় এক দশক ধরে সফলভাবে কার্যক্রম চালানোর পর সরকার এগিয়ে এসে ব্যাংকটিকে সরকারি তত্ত্বাবধান ও আইনের অধীনে স্থানান্তরিত করে (আল-নাজ্জার, ১৯৭৩, ১৯৭৬)। মিত-গাম্র ব্যাংককে আত্মীকৃত করা প্রতিষ্ঠান নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এখনো মিশরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর একটি আলাদা সামাজিক ভূমিকা রয়েছে-যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা এবং অভাবীদের সামাজিক ঋণ প্রদান করা।
ইসলামি ব্যাংক নিয়ে লেখালেখি শুরু হওয়া ও সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের প্রায় দুটি দশক ইসলামি ব্যাংকিং-এর বিশেষ বিশেষ দিকের ওপর সুনির্দিষ্ট লেখনীকর্মের সাক্ষী। আরিফ'। এই গবেষণাকর্মগুলোর বেশ কৌতূহল উদ্রেককারী এক জরিপ আমাদের সামনে পেশ করেছেন। ১৯৬০-এর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত এই বিষয়গুলোর ওপর অবদান বেশ চোখে পড়ার মতো (আরিফ, ১৯৮৮)। জোরারোপ ও বিস্তারের দিক দিয়ে বৈচিত্র্য থাকলেও ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ একমত যে, ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের ভিত্তি অবশ্যই সুদের বদলে হতে হবে PLS (profit and loss sharing বা লাভ-ক্ষতির বণ্টন) নীতি। বিংশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকিং-এর ওপর প্রচুর পরিমাণ তাত্ত্বিক কাজ থাকলেও ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের ওপর বাস্তব কর্ম খুবই সীমিত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশ, মিশর, মালয়শিয়া, পাকিস্তান ও সুদানে কিছু কেইস স্টাডি পরিচালনা করা হয়েছে বটে (প্রাগুক্ত), কিন্তু গবেষণার পরিমাণ এখনো খুব কম। মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, এসব দেশের ইসলামি ব্যাংকসমুহের PLS নীতির প্রয়োগে সাদৃশ্য ও পার্থক্য আছে। যেমন, বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক PLS জমা হিসাব, PLS বিশেষ নোটিস জমা হিসাব, ও PLS টার্ম জমা হিসাব প্রদান করে থাকে। পক্ষান্তরে ব্যাংক ইসলাম মালয়শিয়া চালাচ্ছে দুই ধরনের বিনিয়োগ জমা। একটি সাধারণ জনগণের জন্য, আরেকটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য (প্রাগুক্ত)। গবেষণাটি থেকে আরও দেখা গেছে, স্থান ও কালভেদে মুনাফা-ভাগাভাগির অনুপাত ও পরিশোধের পদ্ধতি বিভিন্নরকম। উদাহরণস্বরূপ, মালয়শিয়ায় মাসিক ভিত্তিতে, মিশরে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ষান্মাসিক ভিত্তিতে, আর সুদানে বার্ষিক ভিত্তিতে মুনাফা ঘোষণা করা হয় (প্রাগুক্ত)।
কার্যক্রমগত খুঁটিনাটির সমস্যা এখানেই শেষ না। মুরাবাহা কার্যক্রমে মুনাফার অনুপাত হিসেব করার জন্য ইসলামি ব্যাংকগুলোর LIBOR ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড নেই। LIBOR যে সুদের হারভিত্তিক, তা তো সর্বজনবিদিত। মুরাবাহা কার্যক্রম যদি এটাকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটা আদতে সুদের হারের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। তা ছাড়া মুরাবাহা ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিং-এর অন্যান্য কার্যক্রমেও তুলনার জন্য এই একই ভিত্তিকে ব্যবহার করা হয়: LIBOR-এর সাথে তুলনায় মুনাফার হার। ইসলামি ব্যাংকগুলোকে এই সমস্যা সমাধানে সাহায্য করার জন্য একটি মুনাফা-সূচক প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যা মুরাবাহা ও অন্যান্য বিনিয়োগ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে। এরকম একটি সূচক স্থাপন করার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করেছেন আল-আশকার (আল-আশকার, ১৯৯৫)। অবশ্য সূচকের প্রস্তাবিত নমুনার আরও নিরীক্ষণ এবং এর কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য আরও কাজ করা দরকার।
বিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্ভাগ পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকিং-এর ওপর মূল্যবান অনেক কাজ হয়েছে। তবুও এসব লেখালেখির রয়েছে দুটি বিশেষ সীমাবদ্ধতা: প্রথমত, লেখকগণ তাদের বিশ্লেষণ করেছেন এটা ধরে নিয়ে যে, অর্থনীতিতে রিবা একেবারে অনুপস্থিত। দ্বিতীয়ত, মুদ্রা ও অর্থ সংক্রান্ত নীতিগুলো তারা অন্তত বিশদভাবে হলেও আলোচনা করেননি। সেগুলো আসতে চলেছে আরও মোটামুটি এক দশক পরে। এভাবেই সুদমুক্ত অর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে শতাব্দীটির শেষ পর্যন্ত লেখালেখি অব্যাহত থাকে।
টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ আরিফ, মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ব্যাংকিং, এশিয়ান-প্যাসিফিক ইকোনমিক লিটরেচার, খন্ড-২, সংখ্যা-২, সেপ্টেম্বর ১৯৮৮। পৃষ্ঠা ৪৮-৬৪। - সম্পাদক
১. Libor সূচককে কন্ট্রাক্টের মুনাফার হার বা যেকোনো অনুপাত নির্ধারণের জন্য পরিমাপক হিসেবে ছেড়ে দিলে তা নিঃসন্দেহে হারাম হবে। কিন্তু এ ধরনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সূচকের সারণী সামনে রেখে যদি নির্দিষ্ট হার বেঁধে দেওয়া হয়, অর্থাৎ সুদী সূচকের হাতে যদি ছেড়ে দেওয়া না হয়, বরং সেই সূচককে কেবলই অনুপাত নির্ধারণে কোনো পক্ষের ওপর অবিচার হয়নি এটি প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয় তাহলে জায়েজ হবে, বলা বাহুল্য সেক্ষেত্রে এটি প্রি-এগ্রিমেন্ট অবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে, মূল এগ্রিমেন্টে এর কোনো ভূমিকা থাকছে না। দ্র: শারীআহ স্ট্যান্ডার্ডস, মুরাবাহা, ধারা নং ৪/৬, AAOIFI, বাহরাইন। - সম্পাদক
📄 মুদ্রাগত ও আর্থিক নীতিমালা এবং ইসলামি সম্পদ বণ্টন
ইসলামি ব্যাংকসমূহ প্রতিষ্ঠার প্রথম তরঙ্গের কিছুকাল পরেই ইসলামি অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুদ্রানীতি। মক্কায় ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামে মুদ্রা ও অর্থ নীতিমালার ওপর। দ্বিতীয়টি আয়োজিত হয় ১৯৮১ সালে ইসলামাবাদে। যৌথভাবে এই সম্মেলনের বিবরণী প্রকাশ করে ইসলামাবাদের Institute of Policy Studies এবং জেদ্দার International Centre for Research in Islamic Economics। এতে রয়েছে উন্নতমানের কিছু গবেষণা নিবন্ধ। এসব নিবন্ধের সাধারণ আলোচ্য হলো কোনো ইসলামি রাষ্ট্রে একক রাজস্বনীতি সম্ভব কি না। আর যদি সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে তা অনৈসলামিক রাজস্বনীতি থেকে কিভাবে তা আলাদা হবে। লেখকগণ প্রথম প্রশ্নটির সাধারণভাবে ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নটির দ্বিতীয় অংশের উত্তর নিয়ে লেখকগণের মতামতের মাঝে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। শুরুতে একটি সাধারণ মতৈক্য রয়েছে যে, ইসলামি রাষ্ট্রের রাজস্ব নীতিমালা হতে হবে ইসলামি আদর্শকেন্দ্রিক। অন্যান্য অনৈসলামিক নীতিমালার মতো এটি মূল্যবোধ-বর্জিত হতে পারবে না (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। ইসলামি রাষ্ট্রের কার্যক্রম কমবেশি ওইসকল সেক্যুলার রাষ্ট্রের মতোই হবে। তবে এর সাথে একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকবে ইসলামি আদর্শের শুধু প্রচারই নয়, বরং তার প্রতিরক্ষাও করা।
ইসলামি আর্থিক নীতি নিয়ে গবেষকদের মাঝে মতপার্থক্যের উদ্ভব ঘটে যখন আলোচ্য বিষয় ছিল কর-আরোপ। কাহফ্ফের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো জীবনযাত্রার যে গ্রহণযোগ্য মানটি সামাজিকভাবে নির্ধারিত, দরিদ্রদের জন্য ওইটুকু নিশ্চিত করার বাইরে সরকারের আর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাই তার মতে প্রতিরক্ষা খাতের জন্য যতটুকু দরকার, তার বাইরে যাকাত ছাড়া ইসলামি রাষ্টের আর কোনো আর্থিক অধিকার নেই (কাহফ, ১৯৮৩)। পূর্বতন ফকিহগণের ইজমা উদ্ধৃত করে কাহফ মত দেন যে, কর আরোপ বা আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য নীতিমালায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সীমিত হওয়া উচিত। ফলে কাহফ করকে উপার্জন পুনর্বণ্টনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করারও বিরুদ্ধে (প্রাগুক্ত)। তার সাথে অবশ্য অপর কিছু লেখক একমত নন। তাদের যুক্তি হলো, ইসলামি সমাজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য যাকাতের বাইরে অন্যান্য কর আরোপ করা-সহ অন্যান্য নীতির ক্ষেত্রে ইসলামি রাষ্ট্রের আরও কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত। এসব লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে আরও সমতাপূর্ণ একটি আর্থ-সামাজিক শৃঙ্খল নির্মাণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, এবং মুদ্রাগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা (আহমদ প্রমুখ, ১৯৮৩)।
ইসলামি রাজস্ব-নীতির প্রতি উচ্চ গুরুত্ব আরোপের ক্ষেত্রে মুতাওয়াল্লি একটি অভিনব ধারণা প্রদান করেছেন। অর্থবাজারে স্থিতিশীলতা ও সাম্যাবস্থা অর্জনের জন্য রাজস্ব-নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সুদের অনুপস্থিতি এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তাই ইসলামি রাষ্ট্র "আয় ও অলস সম্পদে”র ওপর "economic dues" আরোপ করতে পারে, “যার হার নির্ভর করবে স্থিতিশীলতা আনয়নকারী শর্তসমূহের ওপর। এর ফলে অলস নগদ অর্থকে ব্যয়বহুল করে তোলা যাবে, যা বিনিয়োগের উৎসাহদাতা হিসেবে কাজ করবে (মুতাওয়াল্লি, ১৯৮৩)। ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে উপযোগী মনে হলেও বাস্তবে এর কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন, সঞ্চয়ের বদলে ভোগ বেড়ে যাওয়া। তা ছাড়া এর ফলে নগদ অর্থের ওপর দ্বিগুণ করের চাপ পড়বে। একবার যাকাত হিসেবে, আরেকবার অর্থনৈতিক শুল্ক হিসেবে। এটা শরীয়তে অনুমোদিত নয়।
কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের মুদ্রানীতির প্রধান প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তিনটি জিনিসকে চিহ্নিত করা গেছে (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। এগুলো হলো: মুদ্রার মূল্যমানের স্থিতিশীলতা, পূর্ণ কর্মসংস্থান ও যথাযথ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহকারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, এবং ন্যায়ানুগ বণ্টনের ব্যবস্থা করা। আল-জারহি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইসলামি অর্থনীতিতে টাকার মূল্যমান ঠিক রাখাটা সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য প্রায় ফরজ। তার মতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত টাকার জোগান শুধু এই পরিমাণ বর্ধিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া, যাতে আসল মজুদের প্রবৃদ্ধিতে কোনো অবদান সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (আল-জারহি, ১৯৮১)। ইসলামি মুদ্রানীতিতে টাকার মূল্যমান ঠিক রাখাকে কেন উচ্চমাত্রার গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এ ব্যাপারে উমর চাপরার মত হলো, ইসলামে রিবার ধারণার ওপর এটির প্রভাব রয়েছে। ঋণকৃত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যদি টাকার মান কমে গিয়ে থাকে, তাহলে সুদের অনুপস্থিতির ফলে ঋণের আসল মূল্য আর কিছুতেই ফেরত পাওয়া যাবে না (চাপরা, ১৯৮৫)। এর ফলে বিনাসুদে ঋণদাতার প্রতি অবিচার করা হবে। ইসলামি সমাজে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার ও সার্বিক কল্যাণের ওপর মুদ্রাস্ফীতির যে বিরূপ প্রভাব, তার সাথে আরও একটি সমস্যা হিসেবে যোগ হবে এটি।
ইসলামি মুদ্রানীতির আরেকটি লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জন। চাপরা এই লক্ষ্যের সাথে পুরোপুরি একমত। কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সর্বাধিককরণ-কে ইসলামি আর্থিক নীতির সার্বিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। স্রেফ উৎপাদন সর্বাধিককরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পণ্য উৎপাদন করা অনুমোদিত নয়। কারণ চাপরার মতে, এর ফলে আল্লাহপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার হবে। তা ছাড়া বর্তমান ভোগ ও ভবিষ্যৎ ভোগের জন্য পণ্য উৎপাদনের মাঝে ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে (চাপরা, ১৯৮৫)।
বেশির ভাগ মুসলিম অর্থনীতিবিদের মতে, ইসলামি অর্থনীতিতে ন্যায়ানুগ বণ্টনের লক্ষ্য সক্রিয়ভাবে অর্জনের জন্য অবশ্যই মুদ্রানীতিকে কাজে লাগানো উচিত। (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। কিন্তু আরিফের মত হলো, মুদ্রানীতি তৈরি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়ানুগ বণ্টনের ওপর অতিরিক্ত মাথা ঘামালে এর অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনের দক্ষতা ও কার্যকারিতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে (প্রাগুক্ত)। তবে এর মানে এই না যে, ন্যায়ানুগ বণ্টন গুরুত্বহীন। উপার্জন-বৈষম্য কমিয়ে আনাটা যে ইসলামি রাষ্ট্রের নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, এ ব্যাপারে তিনি অন্যদের সাথে একমত। কিন্তু তার মতে অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। মুদ্রানীতিকে এত এত লক্ষ্যের ভারে ন্যুব্জ করে দেওয়া ঠিক নয় (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)।
অনৈসলামিক মুদ্রাব্যবস্থায় উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত সুদ যেহেতু এখানে অনুপস্থিত, সেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটার বদলে টাকার জোগান নিয়ন্ত্রণে মনোনিবেশ করতে পারে বলে ইসলামি মুদ্রাবিদগণ মত দেন। ইসলামি অর্থনীতিতে টাকার জোগানের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ চর্চা করা সম্ভব হবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাকার নিয়মনীতি ঠিক করে দেওয়ার মাধ্যমে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাকা হলো প্রবহমান মুদ্রা ও ব্যাংকের সংরক্ষিত সম্পদ। তা ছাড়া নগদ অর্থ জমার অনুপাত, তারল্য অনুপাত, ও ক্রেডিটের ঊর্ধ্বসীমার তারতম্য করে টাকার জোগানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনয়ন করা সম্ভব। টাকার জোগান নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সম্পদের বরাদ্দকরণেও মুদ্রানীতিকে ব্যবহার করা যায়। অনৈসলামিক ব্যবস্থার সুদের হারকে সরিয়ে আনা যেতে পারে ইসলামি ব্যবস্থার লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগি অনুপাতে (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। চাপরা তার Towards a Just Monetary System-এ যেসব সুবিন্যস্ত মত তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে এটিও একটি। ইসলামি অর্থনীতিতে আর্থিক ও মুদ্রানীতি কার্যত কেমন হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে তার এই গবেষণাকর্ম এক সুচারু নিরীক্ষণ (চাপরা, ১৯৮৫)। ইসলামি অর্থনৈতিক লেখালেখির ময়দানে এই বিষয়ক বহু অবদানের মধ্যে চাপরার Towards a Just Monetary System এক অনবদ্য সংযোজন। এটি বিশদ, সুবিন্যস্ত, তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণাত্মক, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত।
📄 ইসলামি অর্থনৈতিক তত্ত্ব, নৈতিকতা ও অর্থনীতি
ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষক ও অংশগ্রহণকারীদের মাঝে আগ্রহের বিষয়গুলোতে ছিল অসামান্য বৈচিত্র্য। এর মাঝে প্রথমটিই হলো ইসলামি অর্থনীতির জন্য একটি ধারণাগত ও তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে দেওয়া- এ ধরনের প্রথম সম্মেলনে যা অবশ্যম্ভাবী সূচনা। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি ব্যাপারে ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ স্বভাবতই একমত যে, তাদের সকল ধারণা ও মূলনীতি চয়ন করা হবে শরীয়ত থেকে। ফলে ইসলাম থেকে উৎসারিত নৈতিকতা ইসলামি অর্থনীতির মৌলিকতম ভিত্তি। তাই ইসলামি অর্থনীতির তত্ত্বীয়করণে যাকাত ও সুদবিহীন ব্যাংকিং অনিবার্যভাবে প্রাধান্য লাভকারী বিষয়ে পরিণত হয়।
সাক্র তার গবেষণাকর্মের শুরুতে অর্থনীতিকে একটি বিজ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারপর পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো পর্যালোচনা করেন, যাতে ইসলামি ও পশ্চিমা অর্থনীতির মাঝে আপাত সাদৃশ্যমূলক বিষয়গুলো তুলে আনা যায়। এখান থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলো হলো: পশ্চিমা অর্থনীতিতে নৈতিক বিষয়াদি নিহিত রয়েছে, যা আদর্শবাদী অর্থনীতিতে দৃশ্যমান ও পরার্থবাদী অর্থনীতিবিদদের দ্বারা প্রচারিত। অপরদিকে ইসলামি অর্থনীতিতেও নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে, যা ইসলামি রীতি ও ধর্মীয় আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই পশ্চিমা অর্থনীতিবিদগণের কাছে অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ইসলামি অর্থনীতি সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে বা হওয়া উচিত (সাক্র, ১৯৮১)। এরপর তিনি অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় ইসলামি রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রদান করেন। এর ভিত্তি হতে হবে: অর্থনৈতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, সরকারি ব্যয়কে জনকল্যাণে ব্যবহার করা, বাজার কার্যক্রমের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি, প্রয়োজন-সাপেক্ষে মূল্যনিয়ন্ত্রণ, একচেটিয়া বাজারের বিরুদ্ধে লড়াই ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, শ্রমিকদের প্রতিরক্ষায় শ্রমবাজারে হস্তক্ষেপ এবং সকলের প্রতি ন্যায় ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা (প্রাগুক্ত)।
যাকাত-সংক্রান্ত লেখালেখি প্রসঙ্গে আমরা আগেও আল-ফানজারির উদ্ধৃতি দিয়েছি। ইসলামি অর্থনীতির তত্ত্বীয়করণেও তার অবদান রয়েছে। তিনি যেসব বিষয়ে নিজের দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন, সেগুলো হলো: শরীয়তের বিষয়গুলোতে মুসলিম অর্থনীতিবিদগণের বুঝের অভাব, এবং অর্থনীতির ব্যাপারে শরীয়তের আলিমগণের বুঝের অভাব। এর ফলাফল, "ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি করা অনেকের লেখার বিষয়বস্তু বিশেষ করে যাকাত ও রিবার নিষিদ্ধতার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। যেন ইসলামি অর্থনীতিতে যাকাত ও রিবা ছাড়া আর কিছুই নেই।” (আল-ফানজারি, ১৯৮১)। তিনি মুসলিম অর্থনীতিবিদদের সমসাময়িক অর্থনীতিতে শাস্ত্রীয়ভাবে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি শরীয়তের ওপরও ভালোভাবে শিক্ষিত হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামি অর্থনীতির চৌদ্দ শ বছরের ইতিহাসের সাথে সমকালীন অর্থনীতির মেলবন্ধন ঘটাতে আল-ফানজারি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন:
◆ প্রথমত, ইসলামি অর্থনীতির ধারণা ও মূলনীতিগুলো নিতে হবে ধর্মের প্রধান উৎস কুরআন ও সুন্নাহ থেকে। আর এগুলো পরিবর্তনযোগ্য নয়।
➡ দ্বিতীয়ত, এই ধারণা ও নীতির প্রয়োগ সমকালীন পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্নরকম হতে পারে (প্রাগুক্ত)।
তার মতে, ইসলামি অর্থনীতিকে দুটি প্রধান মাত্রায় ভাগ করা যায়: ১. ইসলামি অর্থনৈতিক পন্থা: যা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক হওয়ার কারণে অপরিবর্তনশীল; ২. ইসলামি অর্থনীতির (প্রয়োগ) পদ্ধতি: যা সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে অভিযোজনযোগ্য।
আল-ফানজারির চিন্তায় বিশেষভাবে আগ্রহোদ্দীপক দিকটি হলো তিনি ইজতিহাদের পক্ষপাতী। “ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া”র ধারণাকে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন তিনি (প্রাগুক্ত)। যেসব ফকিহগণ ধর্মের মধ্যে ইজতিহাদকে বিদআত, আর বিদআতকে পথভ্রষ্টতা, ও প্রতিটি পথভ্রষ্টতাকে জাহান্নামের উপযুক্ত বলে মত দেন—আল-ফানজারির অবস্থান তার বিপরীত।[১] ইজতিহাদের আহ্বান যখন আসে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে, যিনি আবার মিশরের রাষ্ট্রীয় আইনসভার একজন সদস্য—নিশ্চই তা খুব ওজন বহন করে থাকবে।
ইসলামি অর্থনীতির ওপর একটি বিশদ বই ছিল খুবই প্রতীক্ষিত এবং সে চাহিদা পূরণ করে মুহাম্মাদ আবদুল মান্নানের Islamic Economics: Theory and Practice (১৯৭০)। বইটি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়, যখন ইসলামি অর্থনীতির ওপর পাঠ্যবই তৈরির কাজ তার শৈশবলগ্ন পার করছিল। বিষয়টি নিয়ে যারা বিস্তারিত ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করতে চায়, এ বইটি তাদের জন্য ব্যাপক নির্দেশনামূলক ও শিক্ষামূলক। এর মাধ্যমে তিনি পাঠকদের সাহায্য করেছেন যেন তারা বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে বিক্ষিপ্তভাবে তথ্য না নেয়। এর বদলে তাদের দিয়েছেন জ্ঞানার্জনের এক বিশদ মাধ্যম। লেখনশিল্পে মূল্যবান সংযোজন এ বইটি পাঠ্যবইয়ের আকারে রচিত। ইসলামের অর্থনীতির প্রায় সকল দিক এতে আলোচিত হয়েছে, যাতে রয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাথে তুলনাও (খান, ১৯৮৩)।
এবারে ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক মূল্যবোধের দিকে মনোনিবেশ করা যাক। এখানে দেখা যায় ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ বিশেষ জোর দিয়ে অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে একটি বৈপরীত্য দেখিয়েছেন। তা হলো ইসলামি অর্থনীতিতে নৈতিক মূল্যবোধ নিগূঢ়ভাবে বিদ্যমান। ইসলামি দর্শনের মূলে প্রোথিত রয়েছে এ সকল মূল্যবোধ, যা ইসলামি অর্থনীতির ভিত্তি। তাই কোনো মূল্যবোধ-বর্জিত ভিত্তির ওপর একটি ইসলামি অর্থনৈতিক নমুনার চিত্রায়ন অসম্ভব। ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও শরীয়তের আলিমগণ এ ব্যাপারে নির্দ্বিধায় একমত।
সায়্যিদ নাকভি তার Ethics and Economics: an Islamic Synthesis-এ এই বিষয়টিকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি প্রথমে উল্লেখ করেন যে, ইসলামি অর্থনীতির মৌলিকতা নিহিত এর নৈতিক মূল্যবোধ-ব্যবস্থার মধ্যে। তারপর একে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ইসলামি নৈতিক দর্শন চারটি প্রধান নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত-একতা, সাম্যাবস্থা, স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্ব-কর্তব্য (নাকভি, ১৯৮১)। একতার ধারণাটি এর পূর্ণাঙ্গতম পর্যায়ে স্রষ্টার একত্ব বা তাওহিকে নির্দেশ করে।
নিম্নতর পর্যায়ে এর অর্থ হলো পৃথিবীতে মানুষের জীবন পুরোপুরিভাবে বিশ্বজগতের সাথে অঙ্গীভূত। পৃথিবীর জীবজগত ও মানবজাতি এক সত্তায় ঐক্যবদ্ধ। সমতার ব্যাখ্যা হলো ন্যায় বা আল-আদল। এর দাবি হলো, জীবজগতের একক পূর্ণাঙ্গতার মধ্যে থেকেই এর প্রতিটি উপাদানের অবস্থানের জন্য সাম্যবিন্দু নির্ধারিত করতে হবে, যাতে সকলে মিলে সর্বোত্তম সামাজিক শৃঙ্খল তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রচলিত স্ট্যাটাস-কো বলতে যেরকম স্থবির একটা অবস্থাকে বোঝায়, ইসলামি সমতা বা সামাজিক সঙ্গতি সেরকম নয়। এটি অকল্যাণের বিরুদ্ধে এক গতিশীল শক্তি (প্রাগুক্ত)। তা ছাড়া সমতার ভেতরে অন্তর্নিহিত কিছু আদর্শিক বিষয়ও রয়েছে। কারণ সামাজিক অস্তিত্বের ময়দানে এর দ্বারা একটি আবশ্যক নৈতিক প্রতিশ্রুতিকেও বোঝায়। এই প্রতিশ্রুতির ফলে ব্যক্তি যে-কোনো সমাজে তার জীবনের সকল দিকের মাঝে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে দায়বদ্ধ। তা ছাড়া ইসলাম শুধু সাম্যাবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, সাম্যাবস্থার মানের ওপরও জোর দেয়। এটি “প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম সম্মিলন, যার ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান সামঞ্জস্য মানবজীবনেও ফুটে ওঠে” (প্রাগুক্ত)।
স্বাধীন ইচ্ছা মানুষকে দেয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। কিন্তু নাকভি দেখিয়েছেন যে, মানবীয় স্বাধীনতা 'ব্যক্তি-মানুষে'র ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সমাজের সদস্য হিসেবে 'সামষ্টিক মানুষে'র ক্ষেত্রেও তা-ই। তবে দুটির মাঝে থাকতে হবে এক অনুপম ভারসাম্য (প্রাগুক্ত)। কাজেই, স্বাধীনতার ইসলামি ধারণা পশ্চিমাদের ধারণার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পশ্চিমা ধারণায় মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর প্রায় অসীম অধিকারের মালিক। সামাজিক কল্যাণে সর্বাধিক অবদান অর্জনের জন্য এটি পূর্ণমাত্রায় ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। ইসলাম ব্যক্তি-মালিকানার ওপর মানুষকে সীমাহীন অধিকার প্রদান করে না। কারণ সকল সম্পত্তি আল্লাহর মালিকানাধীন এবং মানুষের মালিকানা হলো তত্ত্বাবধায়ক বা আমানতদার হিসেবে মালিকানা। নাকভি বলেন, এটি সকল ইসলামি অর্থনীতিবিদের ঐক্যমত্যপূর্ণ অবস্থান।
এবার আসা যাক ইসলামি অর্থনীতির চতুর্থ নৈতিক ভিত্তিতে, এটি হলো কর্তব্য। নাকভির মতে এটা হলো মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কতটুকু করতে পারবে, তার সীমা। স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্তব্যকে দেখা যায় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে। স্বাধীন ইচ্ছা মানুষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়, আর সেই স্বাধীনতাকে দায়িত্বশীলতার সাথে চর্চা করার সীমারেখা ঠিক করে দেয় কর্তব্য। আরেকভাবে বললে, প্রকৃতির সাম্যাবস্থা রক্ষা করতে হলে স্বাধীন ইচ্ছাকে কর্তব্যের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখতে হবে (প্রাগুক্ত)।
কিন্তু নাকভি ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয়টিকে আরেকটু টেনে নিয়েছেন। গ্রহণ করেছেন গতানুগতিকতার বাইরে একটি অবস্থান। তিনি বলেছেন যে, কোনো সমাজে সম্পদের অসাম্য দেখা দিলে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে 'সামষ্টিক মালিকানা'য় স্থানান্তর করা আবশ্যক। এই পদ্ধতিকে তিনি নামকরণ করেছেন 'সামষ্টিকীকরণ' (collectivization)। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্ব যেহেতু সাম্যকরণের যে-কোনো চেষ্টার পথে একটি বাধাস্বরূপ, তাই একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সামষ্টিকীকরণ ও পুনর্বণ্টন করতে হবে।' (প্রাগুক্ত)। অন্যান্য মাধ্যমকে তিনি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট বলে মনে করেন না। তাই আরও বলেন, 'এ বিষয়ে জোর দেওয়ার আরেকটি কারণ হলো, আর্থিক উপকরণগুলো এককভাবে উপার্জনের বণ্টন সাম্যকরণে সফল হয়নি।' (প্রাগুক্ত)। মনে প্রশ্ন আসতে পারে, 'সামষ্টিকীকরণ' অর্থ 'জাতীয়করণ' কি না। নাকভি এ প্রশ্নের ত্বরিত নেতিবাচক জবাব দিয়েছেন। সম্পত্তি স্থানান্তরিত হয়ে রাষ্ট্রের হাতে যাবে না। তিনি রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থাশীল এবং বলেছেন সরকারি কর্মীগণ 'সমাজের টাকায় নিজেদের আখের গোছাতে' পারেন (প্রাগুক্ত)। তাই তার কাছে আদর্শ অবস্থা হলো 'রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং উম্মত কর্তৃক সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সামষ্টিক নিয়ন্ত্রণ' (প্রাগুক্ত)।
অতএব, একটি ইসলামি সমাজে স্পষ্ট আইনের প্রয়োগ করতে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে:
(ক) সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানাকে সীমাবদ্ধ রাখা, এবং
(খ) মোট সম্পদের মালিকানা সুপরিসর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা।
সামষ্টিকীকরণ বা জাতীয়করণ—যে পরিভাষাই ব্যবহার করা হোক, শেষকথা একই। রাষ্ট্রের বিবেচনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত মালিকানাকে সীমিত করা হবে এবং সুনির্দিষ্ট অংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় স্থানান্তরিত হবে। এই প্রক্রিয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কি না, তা ভিন্ন প্রশ্ন। ইসলামি লেখনীতে এ প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ফকিহগণ সামগ্রিকভাবে বাজারের কাম্যতার ব্যাপারে একমত, এবং এখান থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার বৈধতা বের করা যায়। এর পক্ষের যুক্তিগুলো হাদীস ও সুন্নাহভিত্তিক (দ্বিতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। এমনকি যেসকল ফকিহ বাজারের ওপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইসলামি বৈধতার পক্ষে রায় দিয়েছেন, তারাও তাদের মতের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন,
(ক) বাজার-পরিস্থিতিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ চলতে থাকা,
(খ) ব্যবসায়ীরা শরীয়ত থেকে বিচ্যুত হয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হওয়া। যেমন দরের ওপর প্রভাব ফেলার জন্য একচেটিয়াপনা চর্চা করা এবং পণ্য গুদামজাত করা, এবং
(গ) এর ফলে বাজারের কার্যক্রমে অস্বাভাবিক পরিণতি দৃশ্যমান হওয়া—এই সবকিছুই বাজারের পরিবেশকে বাইরে থেকে প্রভাবশালী নিয়ামক।
শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই কেবল রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে। আর এই হস্তক্ষেপ চলবে ততক্ষণ, যতক্ষণ অসাধু চক্রের কার্যক্রম চলমান থাকবে। সেটা কেটে গেলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সাথে সাথে হস্তক্ষেপ থেমে যাবে, (উদাহরণস্বরূপ গ্রন্থপঞ্জিতে দ্রষ্টব্য ইবনু তাইমিয়্যা, আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম)। আধুনিক মুসলিম অর্থনীতিবিদগণের কপালেও এ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ আছে। যেমন নাকভির নিবন্ধের ভূমিকায় খুরশিদ আহমাদ লেখকের প্রশংসা করা এবং কাজটিকে স্বাগত জানানোর পর বলেছেন, ""সামষ্টিক মালিকানা' কোনোকালে ইসলামি রীতি ছিল, এমনটা দাবি করার যুক্তিগত বা পুঁথিগত কোনো প্রকার প্রমাণ দুর্লভ। এ ব্যাপারে আরও সতর্ক ও বলিষ্ঠভাবে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। একদিকে রয়েছে আমানতের ধারণার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা। অপরদিকে যেমন রয়েছে পুঁজিবাদের বিধিনিষেধহীন ব্যক্তিগত মালিকানা ও উদ্যোগ, তেমনি রয়েছে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় সম্পত্তির সামষ্টিকীকরণ। একইভাবে মুসলিম অর্থনীতিবিদগণকে সাম্য ও সমতার মাঝেও স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে” (আহমাদ, নাকভি ১৯৮১)। নাকভির আলোচনা ইসলামি অর্থনীতির ধারণাগত ভিত্তির ব্যাপারে মূল্যবান পর্যবেক্ষণ প্রদান করে। তার অভিনব ধারণা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিতর্কিত মতগুলো আরও ব্যাখ্যা ও ব্যাপকতর আলোচনার দাবিদার।
টিকাঃ
১. প্রাচ্যবিদের মতো গ্রন্থকারও ধারণা করেছেন ইসলামের ক্লাসিক্যাল ফকিহ ও আলিমগণ ধর্মের দোহাই দিয়ে সব ধরনের নতুন বিষয়কে অস্বীকার করেন। অথচ নবউদ্ভূত মাসআলার সমাধানে ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায় সকলেরি স্বীকার করেন। নতুন নতুন মাসালার সমাধানে ইজতিহাদ করতে কোনো সমস্যা নেই। ফুকাহায়ে কেরাম যে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন তার অর্থ ছিল স্বীকৃত মাযহাবসমূহের বাইরে গিয়ে পুনরায় নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করা। ইজতিহাদের আলোকে নিত্যনতুন মাসায়িলের সমাধান দেওয়াকে তারা কেউ বিদআত বলেননি। বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন, নবি সাহাবা ও তাবিয়িনের যুগে দ্বীনের যে কাঠামো ছিল সেগুলোর বাইরে কোনো রীতিনীতিকে দ্বীনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সালাফদের মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ করা বিদআত নয়। বিস্তারিত দেখুন, আল-ইতিসাম, ইমাম শাতিবি, সপ্তম অধ্যায়, ২/৪১৬। সম্পাদক
📄 ভোক্তার আচরণ
শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভোক্তাদের আচরণ প্রাচীন ফকিহগণকেও ভাবিয়েছে। তারা যদিও অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তাদের ওই অর্থে অর্থনীতিবিদ বলা যায় না, কারণ দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলাদা করে এই শাস্ত্রের অস্তিত্বই ছিল না। পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা ফকিহ ইমাম আশ-শাইবানির (৭৫০-৮০৪) কিতাবুল কাসব এবং আবু হামিদ গাযালির (১০৫৮-১১১১ খ্রি.) ইহইয়া উলূমিদ্দীন-এর উদ্ধৃতি দিয়েছি। আর তাদের পরে আশ-শাতিবি (মৃ. ১৩৯৬) ভোগতত্ত্ব ও ভোক্তার আচরণ আলোচনা করেছেন খুবই দক্ষ অর্থনীতিবিদ-সুলভ ভঙ্গিতে, (আশ-শাইবানি, গাযালি, ১৯৩৭, আশ-শাতিবি, এবং আর-রাইসুনি, ১৯৯৫)। কোনো উপাদানকে যদি তাদের আলোচনা থেকে অনুপস্থিত বলে বিবেচনা করতেই হয়, সেটা হলো আধুনিক প্রান্তিক বিশ্লেষণের অনুপস্থিতি।
ফকিহগণ ভোক্তার আচরণ আলাপ করেছেন তিনটি লক্ষ্যের কথা মাথায় রেখে:
➡ (ক) ভোক্তা যেন তার ভোগের মানচিত্র এঁকে নিতে এবং নিজের ভোগ্যপণ্যের তালিকা সাজিয়ে নিতে পারে। আর তা অবশ্যই আল্লাহর আদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে,
➡ (খ) ভোগের বিন্যাসকে আল্লাহর আদেশের অনুগামী করা এবং কতটুকু ভোগ করতে হবে, তা দেখানো।
➡ (গ) আল্লাহর আদেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দরিদ্র ও অভাবীদের প্রাপ্য ভোগের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের রূপরেখা ঠিক করে দেওয়া।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে যে, তিনটি প্রধান দিক থেকে ভোগসংক্রান্ত কার্যক্রম ইসলামের একেবারে অন্তর্নিহিত বিষয়। এই তিনটি ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান হলো,
➡ (ক) ভোক্তা হারাম ও অপছন্দনীয় জিনিস থেকে বেঁচে থেকে শুধুমাত্র হালাল উপকরণ ভোগ করবে।
➡ (খ) ভোগ হতে হবে মধ্যমপন্থায়—কৃপণতাও নয়, অপচয়ও নয়।
➡ (গ) যাকাতের সম্পদ ব্যবহার করার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে, দরিদ্র ও অভাবীরা যেন প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে।
ভোগের এসকল পর্যায় এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে প্রাচীন ফকিহগণ কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আর তাদের দিয়ে যাওয়া বিষয়গুলো আধুনিক অর্থনীতিবিদগণ ব্যবহার করেছেন নতুন বিশ্লেষণমূলক উপকরণ ও প্রান্তিক বিশ্লেষণপদ্ধতি প্রয়োগ করার মাধ্যমে।
এ বিষয়ে বিদ্যমান জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়ে আয-যারকা যে কাজ হাতে নিয়েছেন, তিনি সেটাকে আখ্যায়িত করেছেন ভোক্তা আচরণের সামাজিক ভূমিকা হিসেবে (যারকা, ১৯৮০)। ভোগের সামাজিক ভূমিকা যদি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, তাহলে ভোগ্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর প্রদত্ত পুরস্কারের সর্বাধিককরণ ঘটবে। এটা করতে গিয়ে ভোক্তা তিন পর্যায়ের ভোগের নিয়ম মেনে চলবে। সেগুলো হলো: অত্যাবশ্যকীয়, প্রয়োজনীয় ও আরামপ্রদ। পূর্বতন ফকিহগণের বিশ্লেষণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলতে হয়, ইসলামে ভালোভাবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনার জন্য দরকারি পাঁচটি মৌলিক জিনিস প্রয়োজনীয়তার অন্তর্ভুক্ত। যথা: ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পত্তি। সাধারণ প্রয়োজনীয় ভোগের মধ্যে রয়েছে এমন সকল কার্যক্রম ও পণ্য, যা মৌলিক পাঁচটি জিনিস ঠিক রাখার জন্য আবশ্যক নয়। আর আরামপ্রদের অন্তর্ভুক্ত হলো সাধারণ প্রয়োজনের চেয়েও ওপরের কাজকর্ম ও পণ্যদ্রব্য। এগুলো কোনো দুর্দশা বা কঠিনতা দূর করে না, কিন্তু জীবনকে শোভামণ্ডিত ও সুসজ্জিত করে (যারকা, ১৯৮০)। ভোক্তার সামাজিক ভূমিকাকে আকৃতি প্রদানে যাকাতও ধর্মীয় ও সামাজিক ভূমিকা রেখে থাকে।
ভোক্তার আচরণের একটি লক্ষ্য হিসেবে ফালাহ বা সাফল্যের ধারণার ওপর আলোকপাত করেছেন কাহফ (কাহফ, ১৯৮০)। এর অর্থ হলো ইহজীবন ও পরজীবনে সাফল্য অর্জন। ভোক্তার ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের উপযোগকে সর্বাধিককরণ না করলে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কাহফ উপসংহারে বলেন যে:
➡ (ক) যাকাতের গুণে ইসলামি অর্থব্যবস্থা এমন এক ইসলামি ভোক্তা সৃষ্টি করবে, যার সঞ্চয়ের হার অন্যান্য জীবনব্যবস্থার ভোক্তাদের চেয়ে বেশি হবে।
➡ (খ) ইসলামিক সিস্টেমের প্রকৃতিই এমন যে, এটি বিনিয়োগকে সঞ্চয়ের সিদ্ধান্তের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করবে।
➡ (গ) যাকাতের প্রভাবে ইসলামি পদ্ধতিতে সম্পদের মাত্রা ঠিক থাকবে।
➡ (ঘ) যাকাত বণ্টনের মাধ্যমে দরিদ্রদের অবশিষ্ট সম্পদ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ইসলামি ব্যবস্থা সামষ্টিক চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি করবে, ফলে কাজের পরিমাণও বাড়বে।
➡ (ঙ) ইসলামিক সিস্টেম অন্যান্য সিস্টেমের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য অধিকতর পরিমাণ সম্পদ নিশ্চিত করে।
➡ (চ) ইসলামি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় সম্পদগুলো সক্রিয় করে তোলে। এবং
➡ (ছ) যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি কার্যকরী তথ্য উপকরণ প্রদান করে (কাহফ, ১৯৮০)।
আকরাম খান ভোক্তার আচরণ সংক্রান্ত তত্ত্বে মাসলাহাত বা সামাজিক কল্যাণের ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি মুসলিম ভোক্তার আচরণকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে (খান, ১৯৯২)। তিনি “আকাঙ্ক্ষা” ও “প্রয়োজনীয়তা”র মাঝে পার্থক্য করেছেন। বলেছেন যে, ইসলামে ভোক্তার আচরণ আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। সকল আকাঙ্ক্ষাই সমপরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ এবং অসীম পরিমাণ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে—এই ধারণাকে ইসলাম নাকচ করে দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইসলাম বলেছে, সুনির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজন সবার আগে পূরণ করতে হয়। এরপরে মনোনিবেশ করতে হয় আকাঙ্ক্ষার ওপর। এমনকি এই প্রয়োজনীয়তাগুলোরও একটি অগ্রাধিকারের মানদণ্ড রয়েছে। যেখানে কোনোটা কম আবার কোনোটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পণ্য প্রয়োজনীয় না স্রেফ আকাঙ্ক্ষা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাসলাহাতের ধারণাটি ব্যবহার করতে হবে। এতে পরীক্ষা করা হবে যে, সেই পণ্যের উৎপাদন বা সেবা সমাজের কল্যাণ বৃদ্ধি করে কি না। যদি করে, তাহলে তা প্রয়োজনীয়। সেক্ষেত্রে এটির উৎপাদন ও ভোগ করা যেতে পারে। অন্যথায় তা আকাঙ্ক্ষা। সেক্ষেত্রে এটিকে অপেক্ষা করতে হবে আগে অধিক গুরুত্বপূর্ণ সকল চাহিদা পূরণ হওয়া পর্যন্ত। তাই মুসলিম ভোক্তাবৃন্দের ভোগের ধরন যতটা প্রয়োজনীয়তা দিয়ে নির্ধারিত হবে, আকাঙ্ক্ষা দিয়ে ততটা হবে না। চতুর্দশ শতাব্দীর লেখক আশ-শাতিবির মতো করেই খান প্রয়োজনীয়তাকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন: জীবন, সম্পত্তি, ধর্মবিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি ও বংশধারা। এই পাঁচটি উপাদান নিশ্চিত করার ক্ষমতা যত পণ্যের মধ্যে রয়েছে, সেগুলো মানবজাতির জন্য মাসলাহাত বহনকারী। এ থেকে বোঝা যায় মাসলাহাত ও উপযোগ একই বিষয় নয়। ভোক্তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মাসলাহাত বিবেচনা করা হয় সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের কল্যাণের ওপর। আর উপযোগ দিয়ে নির্ধারিত হয় ভোক্তা তার ব্যক্তিগত ভোগের ক্ষেত্রে কিভাবে অগ্রাধিকারের ক্রম নির্ধারণ করবে। তা ছাড়া দুটোই নির্ধারণ করে যে, ভোক্তা ইহকালে ভোগের জন্য কিভাবে কী ব্যয় করবে। কিন্তু মাসলাহাতে আল্লাহর রাস্তায় ও পরকালের জন্য খরচ করা এবং দুই জগতের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখাও প্রত্যাশিত (প্রাগুক্ত)।
একদিকে আদর্শবাদ ও আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ এবং অন্যদিকে ভোক্তার আচরণের ইসলামি বিশ্লেষণের মাঝে পার্থক্য নিয়ে এই ময়দানের অনেক লেখকই ভেবেছেন। এই দুই তত্ত্বের মাঝে আল-আশকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য দুইই দেখিয়েছেন (আল-আশকার, ১৯৮৩)। শুরুতে বলা যায়, পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিবিদ ও ইসলামি অর্থনীতিবিদ উভয় পক্ষ থেকেই গতানুগতিক অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা করা হয়েছে। সাধারণভাবে গোটা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিশেষভাবে ভোক্তার আচরণের ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করার দায়ে অভিযুক্ত তারা। অবশ্য এ ধরনের সমালোচনা শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কারণ কিছু গতানুগতিক অর্থনীতিবিদও আদর্শবাদকে বিবেচনায় নিয়েছেন। যেমন, কলার্ড (Collard, 1978)।
সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা থেকে বোঝা যায় তারা কতটা জোর দিয়েছেন কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর। তবে সাধারণভাবে গতানুগতিক অর্থনীতির আচরণগত ধারণাগুলো পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের কাছে সমালোচিত। তাদের মতে ভোক্তার সামাজিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। যথাযথ পরিমাণ আমলে নিতে হবে পারিপার্শ্বিক সমাজের স্বার্থকে। তারা বরং একটি সামাজিক চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ভোক্তাকে বিবেচনা করা হয় "হোমো-ইকোনোমিকাস-হিউম্যানাস” হিসেবে (Nitsch, 1982)। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়াদিকে খ্রিষ্টান চিন্তার বা “অনুরূপ কোনো শিক্ষাসমষ্টি যেমন ইসলাম"-এর সামাজিক নৈতিকতার সাথে সংযুক্ত করার পক্ষপাতী (McKee, 1982)। সামাজিক-অর্থনীতিবিদ ও ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ আপাতদৃষ্টে একটি বিষয়ে একমত: ভোক্তার আচরণের বিশ্লেষণে পারিপার্শ্বিক সমাজের প্রতি ভোক্তার সামাজিক দায়িত্বকে বিবেচনায় নেওয়া। এই সাদৃশ্যের স্বীকৃতি সত্ত্বেও বলতে হয় এই দুই দল অর্থনীতিবিদ বিশেষভাবে নিম্নলিখিত বিষয়াদিতে দ্বিমত করেন (আল-আশকার, ১৯৮৩ ও ১৯৮৫):
➡ (১) সামাজিক-অর্থনীতিবিদদের একগুচ্ছ নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে, যেগুলো ঠিক ধর্মীয় না-ও হতে পারে। ইসলামি অর্থনীতিবিদদের নৈতিকতা উৎসারিত হয় ইসলামি বিশ্বাস থেকে। এই পার্থক্যের গুরুত্ব পরবর্তী পয়েন্টগুলোর সাথে সম্পর্কিত।
◆(২) ভোক্তা কী পদ্ধতি অনুসরণ করবে, সে ব্যাপারে সামাজিক- অর্থনীতিবিদদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নেই (নিজস্ব নৈতিক মূল্যবোধের সাপেক্ষে ব্যক্তি তার ভোগের বিন্যাস নির্ধারণে স্বাধীন)। ইসলামি অর্থনীতিবিদদের রয়েছে ইসলাম-প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।
⇨ (৩) পশ্চিমা সামাজিক-অর্থনীতিতে ভোক্তার লক্ষ্য দুইরকম—ভোগকৃত পণ্য ও সেবা থেকে প্রাপ্ত উপযোগ এবং নৈতিক সন্তুষ্টি। ইসলামি অর্থনীতিতে তা তিনরকম: ভোগকৃত পণ্য ও সেবা থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, নৈতিক সন্তুষ্টি, এবং ইহকাল ও পরকালে ঐশী পুরস্কার পাওয়ার সন্তুষ্টি।
ভোক্তা আচরণের ইসলামি তত্ত্বের দিকে সমালোচনা ধেয়ে আসতে পারে যে, এটি অতিরিক্ত আদর্শবাদী। ভোক্তা তার ব্যয়-নির্বাহে ইসলামি আদর্শ কতটা পালন করে, সে প্রশ্নে বাস্তব পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা দরকার। কিন্তু এ ধরনের কাজের পরিমাণ নগণ্য। অল্পকিছু গবেষণাকর্মের মধ্যে আল-আশকারের গবেষণা রয়েছে। তিনি একটি অনৈসলামিক দেশ স্কটল্যান্ডে মুসলিম ভোক্তাদের আচরণ এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব তদন্ত করার চেষ্টা করেছেন (আল-আশকার, ১৯৮৫)। গবেষণাটির সার্বিক ফলাফল এই তত্ত্বকে কিছুটা সমর্থন করে, তবে কিছু দাবিকে নাকচও করে দেয়। ফলাফলগুলো নিম্নরূপ:
➡ ক. উত্তরদাতাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর তাদের কাছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায় সমাজকল্যাণমূলক খরচ। এটি উক্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মতকে সমর্থন করে।
➡ খ. পরিবেশের প্রভাব এই গবেষণায় একদম স্পষ্ট। কারণ নিজস্ব পরিবহনের জন্য গাড়ি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা অগ্রাধিকারের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে। নিম্ন আয়বিশিষ্ট অন্যান্য মুসলিম দেশে এমনটি না-ও হতে পারে।
➡ গ. সঞ্চয়ের বেশির ভাগ অবশ্য পশ্চিমাদের পরিচালিত ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়। গবেষণায় এর অনেকরকম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই ইসলামি ব্যাংকের অনুপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। সুদের ইসলামি নিষিদ্ধতা কেউই অস্বীকার করেননি।
এটা অবশ্য একেবারেই প্রাথমিক গবেষণা। চর্চাকে তত্ত্বের সাথে সংযুক্ত করার জন্য বাস্তব পর্যবেক্ষণমূলক আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।