📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইসলামি অর্থনীতির ওপর হওয়া উল্লেখযোগ্য কাজগুলো অর্থনৈতিক চিন্তার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, বিশেষত মুসলিমদের মাঝে। সিদ্দিকি ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রায় ৭০০টি মৌলিক ও ব্যাখ্যামূলক কাজ উদ্ধৃত করেছেন। এর বেশির ভাগ রচিত হয়েছে ১৯৫০-এর প্রথম দশক থেকে ১৯৭০-এর শেষ দশকের মধ্যে (সিদ্দিকি, ১৯৮০)। শিরোনামগুলো থেকে বিশাল পরিসরের বিষয়বস্তুর পরিচয় মেলে:
➡ ইসলামে অর্থনৈতিক দর্শন (৮০টি উদ্ধৃতি),
➡ ইসলামের অর্থনৈতিক পদ্ধতি (৪১৮টি শিরোনাম),
➡ সমকালীন অর্থনীতির ইসলামি পর্যালোচনা (১ শর বেশি উদ্ধৃতি),
ইসলামি কাঠামোয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (প্রায় ৫০টি উদ্ধৃতি),
➡ ইসলামে অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাস (৪০টি উদ্ধৃতি), এবং গ্রন্থপঞ্জি।
এর আগেও বিভিন্ন জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। যেমন জামালুদ্দিন আতিয়া (ইসলামি ব্যাংকিং-এর একজন পথিকৃৎ, যিনি ইসলামি ব্যাংককে ইউরোপ পর্যন্ত নিয়ে যান) রচিত A Guide to Researcher in Islamic Economics (১৯৭৪), এবং মুহাম্মাদ আকরাম খান রচিত Annotated Bibliography of Contemporary Economics Thought in Islam and a Glossary of Economic Terms in Islam (১৯৭৩) ও Islamic Economics: Annotated Sources in English and Urdu খণ্ড ১ (১৯৮৩), খণ্ড ২ (১৯৯১)।
কাজের পরিমাণ বিপুল। ইসলামি অর্থনীতির ওপর কিছু বিখ্যাত তুর্কি কাজও এর অন্তর্ভুক্ত। Contemporary Turkish Literature on Islamic Economics-এ যাইম তুর্কি লেখকদের দুই শতাধিক কাজের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইসলামি অর্থনীতির ওপর এই কাজগুলোও করা হয়েছে ৫০ থেকে ৭০-এর দশকে। তুর্কি লেখকরা যেন তাদের অবদানকে সামনে এগিয়ে আনার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। যারা ইসলামি অর্থনীতির সমসাময়িক বিকাশ নিয়ে লেখালেখি করতে চান, এ বিষয়ক কাজের বিশাল পরিমাণ তাদের জন্য এক মধুর সমস্যার সৃষ্টি করে। বিগত অধ্যায়গুলোতে আমরা একেক যুগের একেকজন প্রধান লেখককে আলাদাভাবে উল্লেখ করে করে আলোচনা করছিলাম। এই শতাব্দীতে এসে আর কোনো এক বা একাধিক লেখককে স্বতন্ত্রভাবে বেছে নেওয়া বড়ই কঠিন। কিন্তু অভাবের সমস্যার চেয়ে প্রাচুর্যের সমস্যাই শ্রেয়। এই সমস্যাকে আমরা সাদরে বরণ করে নিচ্ছি।
অতএব, বিংশ শতকের বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামি অর্থনীতির ওপর লেখালেখির প্রাচুর্য। অষ্টম শতাব্দীতে ইমাম আবু ইউসুফ একাই ছিলেন এবং আমরা তার ওপরই আলোকপাত করেছি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ অংশে এসে লেখক এত বেশি যে, তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া দুষ্কর। এর বদলে বিকল্প একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। লেখক বেছে নেওয়ার বদলে এই বিষয়ে লেখালেখির মাঝে মূল ধারাগুলোকে চিহ্নিত করা যাক। দেখা যাক এই বিষয়ের লেখকরা কোন কোন ক্ষেত্রের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। বিষয়ের ধারাবাহিকতা এবং বিষয়ক্ষেত্রের প্রাধান্যের ওপর ভিত্তি করে গুরুত্বের মাত্রা বিভিন্ন হবে। এই কঠোর প্রক্রিয়ায় যে কিছু নামকে অগ্রাহ্য করে যেতে হবে, তাতে সন্দেহ নেই। এটি দুর্ভাগ্যজনক হলেও আমরা নিরুপায়। এর মানে এই না যে, অনুল্লিখিত বিষয়গুলোর গুরুত্ব বা প্রাধান্য কিছুমাত্র কম। এটি বরং বইয়ের কলেবরের সীমাবদ্ধতার দায়। অবশ্য যথাস্থানে শূন্যতা পূরণ ও পাঠকের সুবিধার্থে সংযোজিত গ্রন্থপঞ্জির দিকে ইঙ্গিত করা হবে। বাছাইপ্রক্রিয়ায় আরও একটি নিয়ামকের কথা মাথায় রাখা লাগবে। তা হলো দীর্ঘ গবেষণাপত্র, মনোগ্রাফ, বই এবং বড় কোনো ইসলামি অর্থনৈতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত নিবন্ধকে প্রাধান্য দান করা।

টিকাঃ
১. ড. মুহাম্মাদ নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকী ইসলামি অর্থনীতিতে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। তিনি ইসলামি অর্থব্যবস্থা নিয়ে বেশকিছু সাড়াজাগানো গ্রন্থের রচয়িতা। কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। এই ভারতীয় মুসলিম দার্শনিক অনেক আন্তর্জাতিক পদক পেয়েছেন, তার মধ্যে বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইকতিসাদুনা : আমাদের অর্থনীতি

📄 ইকতিসাদুনা : আমাদের অর্থনীতি


বাকির আস-সাদর
এই বইতে আলাদাভাবে বিশ্লেষণের জন্য বাকির আস-সাদরের ইকতিসাদুনাকে বেছে নেওয়ার কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, আস-সাদর একজন শিয়া আলিম। এখন পর্যন্ত আমরা ইসলামি অর্থনীতির ওপর কোনো শিয়া অবদান পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাইনি। দ্বিতীয়ত, ইকতিসাদুনা অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি, যতটা সাদরের সমসাময়িকগণ পেয়েছিলেন (Wilson, 1998)। তৃতীয়ত, কাজটির চিন্তা, পদ্ধতি ও পরিসর প্রশংসা ও বাহবার যোগ্য। চতুর্থত, আস-সাদর এক নিপীড়ক শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকাকালীন এ কর্ম রচনা করেছেন এবং জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন। পঞ্চমত, ইকতিসাদুনা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬০ এর দশকের শেষ এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে, যখন ইসলামি পুনর্জাগরণবাদের মাধ্যমে ইসলামের পুনরুত্থান হচ্ছিল বলা চলে। ষষ্ঠত, আস-সাদরের সমসাময়িকগণ যেভাবে পশ্চিমা অর্থনীতি ও শিক্ষার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি সে সুযোগ পাননি। তাই এই বিষয়ক তার চিন্তা সম্পূর্ণই তার নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন, যা বিশুদ্ধভাবে ইসলামি শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। এতে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব খুবই সামান্য, অন্তত তার সমসাময়িকদের সমপরিমাণ নয়। তা ছাড়া সপ্তমত, আংশিকভাবে কম্যুনিস্ট অর্থনীতির সমালোচনাকারী এ বইটি এমন সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে ইসলামি বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও নীতিনির্ধারকগণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রগতির পথ হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এগুলো-সহ আরও অনেক কারণে আস-সাদরের ইকতিসাদুনা আলোচনার দাবিদার।
আস-সাদর বইটির ভূমিকায় আমাদের বলেন যে, এটি ফালসাফাতুনা (আমাদের দর্শন) বইয়ের পরবর্তী সংযোজন। সম্ভবত এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সমাজবিজ্ঞানের ওপর একটি ধারাবাহিক লেখনী তৈরি করা। যার মধ্যে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত পরিসরের বিষয়াদি আলোচিত হবে। কিন্তু তা আর হলো না। এর আগেই তৎকালীন শিয়াবিরোধী সরকারের হাতে তার জীবনকালের অবসান ঘটে।
আস-সাদরের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী ইকতিসাদুনার লক্ষ্য হলো মার্কসবাদ, পুঁজিবাদ, ও ইসলামি অর্থনীতির একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ। এখানে এই ব্যবস্থাগুলোর ধারণাগত নীতিমালা ও প্রায়োগিক বিস্তারিতকে বিশ্লেষণ করা হবে। তাই আমাদের অর্থনীতির উপশিরোনাম হিসেবে কথাটিকে যুক্ত করা হয়েছে। শুরুতেই অনুমান করা কঠিন নয় যে, তুলনার শেষে অন্যান্য তন্ত্রের ওপর ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করা হবে। এক লেখককে আরেক লেখকের থেকে আলাদা করে যে জায়গাটি, তা হলো বিশ্লেষণের গভীরতা, পর্যালোচনার নৈর্ব্যক্তিকতা, এবং বিষয়টির ব্যাপারে তাদের পাণ্ডিত্য। আর এগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই আস-সাদরের মাঝে কোনো ঘাটতির দেখা মেলে না।
বইয়ের প্রাককথনেই আমরা দেখি তিনি নিজের উদ্দেশ্য খোলাখুলিভাবে বলেছেন। অনুন্নত মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশি প্রয়োগযোগ্য, তার তুলনা ও মূল্যায়ন করা হবে। একদিকে রয়েছে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ-ভিত্তিক ইউরোপীয় অর্থনীতি, অপরদিকে ইসলাম।
তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল আস-সাদরের মূল বিবেচ্য। পুরো ইকতিসাদুনা জুড়ে এর প্রমাণ মেলে। একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখন ও কী মাত্রায় কর্মক্ষম হয়ে ওঠে, এ ব্যাপারে লেখক কোনো অলীক ধারণার অনুসারী নন। তিনি সতর্ক ও নিরপেক্ষভাবে ঘোষণা করেন যে, অর্থনৈতিক সিস্টেমগুলোর মাঝে তুলনা শুধুমাত্র ধারণাগত কাঠামো, কিংবা তত্ত্বীয় দর্শন ও নীতির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এর ভিত্তি হতে হবে আলোচ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সমাজের জন্য নির্মিত, সেই সমাজের বিচারে ব্যবস্থাটির প্রায়োগিকতা নিয়ে। এটা নিরপেক্ষতার এক দৃশ্যমান উদাহরণ।
এমনকি আস-সাদর ইউরোপীয় সমাজগুলোর জন্য পুঁজিবাদ আত্মরক্ষার আবশ্যকীয়তাই তুলে ধরেছেন বলা চলে। তিনি ইউরোপীয় সমাজের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যাবলী ওপরে আলোকপাত করেননি। দার্শনিকভাবে ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করে দেখান যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সমাজ কিভাবে পুঁজিবাদকে বেছে নিয়েছে। এরকম সমাজের প্রধান তাড়না হয়ে গিয়েছিল মুনাফার অন্বেষণ ও বস্তুগত অর্জন। তাই তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, ইউরোপীয় জনসমাজের চিন্তার জায়গা থেকে উপযুক্ত হলেও মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য পুঁজিবাদ উপযুক্ত নয়। কারণ মুসলিম সমাজ আল্লাহর প্রতি, গায়েবের প্রতি এবং আসমানি আচার-আচরনবিধির প্রতি বিশ্বাসী।
লক্ষ্যণীয় যে, আস-সাদর অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। আর ইসলামি অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুসলিমদের ভূমিকা সর্বোচ্চ গুরুত্ব রাখে। মুসলিম ছাড়া কোনো সফল ইসলামী ব্যবস্থা বা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কল্পনাও করা যায় না। সফলভাবে ইসলামী উপাদান সহকারে একটি ইসলামী সমাজ প্রয়োগের পূর্বশর্ত হলো সকল ইসলামী উপাদান সহকারে একটি সুগঠিত ইসলামী সমাজ উপস্থিত থাকা। একটি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও একটি (শুদ্ধ ‘মুসলিম সমাজ’ নয়) পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরেরটি ছাড়া আগেরটি সফল হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তাই একটি সুসংবদ্ধশালী ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্জনের জন্য একটি সুসংবদ্ধ ইসলামী সমাজের গুরুত্ব বোঝা যায় এখান থেকেই।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইকতািসদুন্নার প্রথম পৃষ্ঠাগুলো থেকেই আস-সাদর একটি কথা বলে আসছেন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান শুধু একটা সামাজিক কাঠামোই নয়, যা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নমুনা ভালোভাবে এঁটে যেতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিসর এর চেয়েও বড়ো। এতে এমন এক কাঠামো প্রয়োজন, যাতে পুরো জাতি অন্তর্ভুক্ত। যেই মানুষদের জন্য অর্থনৈতিক কাজকর্মটির নক্শা করা হয়েছে, তারাও অন্তর্ভুক্ত এ কাঠামোতে। উন্নয়নের জন্য বাহ্যহিত মডলের সাথে উদ্দিষ্ট জনগণের একটি মিথষ্ক্রিয়া হওয়া চাই। উন্নয়নের এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে। কেবলমাত্র পুরো জাতির সহযোগিতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হওয়া সম্ভব। মানুষের সহযোগিতা এবং ব্যবস্থাটির প্রতি তাঁদের পূর্ণ আস্থানিবেদন সাফল্যের পূর্বশর্ত। কারণ সহযোগিতার মাধ্যমেই মানুষ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথে তাঁদের মেধা ও দক্ষতা ঢেলে দিতে পারে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল বাস্তবায়ন করতে হলে মানুষকে এমন একটি ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে।
হবে, যা তাদের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যশীল। একটি মুসলিম জাতির মাঝে জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটিকেও ইসলামি হতে হবে। আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সেক্যুলারায়ন করা হলে একটি ইসলামি সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সেরা ফলাফলটি কখনোই আসবে না। একই কারণে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।
অর্থনৈতিক ধারণা ও নীতিমালার আলোচনায় আস-সাদরের লেখায় আরও একবার ইসলামি দর্শন, নীতি ও বিশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। যেমন, তিনি পণ্য ও সেবার মূল্যমানের উৎস, সেই মূল্য কিভাবে নির্ধারিত হয়, শ্রম মূল্যের উৎস কি না-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। তার মতে এই উত্তর খোঁজার জন্য জানতে হবে যে, ধর্ম হিসেবে লাভের ধারণা (পুঁজিবাদী অর্থে)-র ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী। সেইসাথে এটি মূল্যমানের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার কতটা দাবিদার। লাভের বৈধতার মাত্রা উদঘাটন করার জন্য জানতে হবে যে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজি, শ্রম ও উৎপাদনের অন্যান্য মাধ্যম কী ভূমিকা পালন করে। ফলাফল বণ্টনের ওপর উৎপাদনের নিয়ামকগুলোর অধিকারের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কী, তার ভিত্তিতে এসব নিয়ামকের ভূমিকাকে অধ্যয়ন করতে হবে।
ইকতিসাদুনা রচিত হয়েছিল আরবিতে। এর দ্বিতীয় সংস্করণের আকার ৭০০ পৃষ্ঠারও বেশি। আমাদের হাতে থাকা সংস্করণের শব্দসংখ্যা ২০০,০০০-এর চেয়ে একটু বেশি। এমনকি আজকের যুগের হিসেবেও এ এক বিশাল কলেবর। ইকতিসাদুনাকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। মার্কসবাদ, ২০০ পৃষ্ঠা, পুঁজিবাদ, ৪০ পৃষ্ঠা, এবং ৪৬০ পৃষ্ঠা ইসলামি অর্থনীতির জন্য। এ থেকে বোঝা যায়, পুঁজিবাদের তুলনায় সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে আস-সাদরের কথার পরিমাণ কতটা বেশি। এবং ইসলামি ব্যবস্থার প্রতি তিনি কতটা আগ্রহী। তিনি মার্কসবাদের দারুণভাবে সমালোচনা করেছেন। এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এর দর্শন স্ব-বিরোধী। তার মতে পুঁজিবাদ অসৎ স্বাধীনতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেছে। এটি মুক্তবাজারের পক্ষে কথা বললেও মোটাদাগে ব্যক্তিমানুষকে ওইটুকু অর্থনৈতিক মাধ্যম বা ক্রয়ক্ষমতা প্রদান করে না, যার ফলে তারা স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তাই বাজারের স্বাধীনতা ওখানেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, সেটা আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় পরিণত হয় না। এমন স্বাধীনতা তাই অলীক। তার ভাষ্যে, ইসলামি অর্থনীতি একটি মূল্যবোধ-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা। ধনী-দরিদ্র উভয়ের চাহিদাকে পূরণ করে এটি। ইসলাম থেকে উৎসারিত নৈতিক মূল্যবোধ বেশ স্পষ্ট। আস-সাদরের যুক্তিপদ্ধতি অন্যান্য মুসলিম অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণভাবে শরীয়াহ আলিমগণের পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয় ভাগ তথা ইসলামি অর্থনীতির ওপর মনোনিবেশ করা যাক। ইসলামি অর্থনীতির প্রধান রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আস-সাদর পুরো বিষয়টিকে ছয়টি প্রধান অংশে বিভক্ত করেছেন, যথা:
➡ ১. ইসলামি অর্থনীতির সার্বিক গঠন;
➡ ২. পুরো ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইসলামি অর্থনীতি;
➡ ৩. ইসলামি অর্থনীতির সাধারণ কাঠামো;
➡ ৪. ইসলামি অর্থনীতি (পশ্চিমা) বিজ্ঞানের কোনো শাখা নয়;
➡ ৫. উৎপাদনের রূপ থেকে বণ্টনের ভিন্নতা;
➡ ৬. ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ এবং তাদের সমাধান।
ইসলামি অর্থনীতির সাধারণ কাঠামোর ব্যাখ্যায় আস-সাদর বলেছেন, এটি তিনটি মৌলিক নীতির ওপর গঠিত—দ্বৈত মালিকানা, শর্তাধীন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
মালিকানার প্রসঙ্গে আস-সাদর তিন ধরনের মালিকানার কথা বলেছেন। ব্যক্তিগত মালিকানা, গণ মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা। তিনি সতর্ক করে দেন যে, মিশ্র মালিকানার অর্থ এই না যে, ইসলামি অর্থব্যবস্থা একটি মিশ্র অর্থনীতি। মিশ্র অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত ও গণমালিকানা উভয় রূপকে অনুমোদন দেওয়া হয়। তার মতে, ইসলামি অর্থনীতিকে এভাবে পরিচয় দেওয়া যাবে না। কারণ ইসলামি অর্থনীতির মতাদর্শ মিশ্র অর্থব্যবস্থা থেকে আলাদা। মিশ্র অর্থব্যবস্থা মানে গণমালিকানার অনুমোদনকারী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানা রহিতকারী মার্কসবাদী ব্যবস্থা। ইসলামি ব্যবস্থা এ দুইয়ের কোনোটিই নয়। কারণ এর নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে, যা পুঁজিবাদীও নয়, সমাজবাদীও নয়। আস-সাদর কি জাতীয়করণের পক্ষে? তার লেখনীর প্রথম অংশে এর উত্তর ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণের ২৫৯ তম পৃষ্ঠায় এসে তিনি জনস্বার্থে ব্যক্তিগত মালিকানার জাতীয়করণে পুঁজিবাদী অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। একটি পুঁজিবাদী সরকার যা করত, সেটাকে তিনি অনুমোদন দিচ্ছেন বলে ধরে নেওয়া যায় (আস-সাদর, ১৯৮২)।
উৎপাদনের মাধ্যমের মালিকানা প্রসঙ্গে আস-সাদর মালিকানার শর্তসমূহ তুলে ধরেছেন। ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদও উৎপাদনের মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এসব উৎসের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে কাজ করাটা মালিকানা অক্ষুণ্ণ রাখার শর্ত। তার মতে, মালিক যদি সম্পদকে অবহেলা করে বা সেটা ব্যবহার করতে অপারগ হন, তাহলে রাষ্ট্র বা ইমাম এটি ব্যবহারে সক্ষম অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। নতুন মালিক কর্তৃক ব্যবহারের ফলে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ফলাফলের যথাযথ অংশ সংবিধিবদ্ধ মালিককে প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু নতুন মালিককে সংবিধিবদ্ধ মালিকানা দেওয়া হবে না। তিনি বিক্রয়, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো মাধ্যমে এই সম্পদ হস্তান্তর করতে পারবেন না। নতুন মালিকের মালিকানা হলো স্রেফ ওই সম্পদটি ব্যবহারের অধিকার। নিজস্ব অধিকার নয়। এ এক সূক্ষ্ম পার্থক্য, যা মালিকানা-হস্তান্তরের নীতিকে আরও প্রয়োগযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। আধুনিক পরিভাষায় বললে এটি উৎপাদনের অবহেলিত মাধ্যমটির আধা-মালিকানা। পূর্ণ মালিকানা নয়। বলাবাহুল্য, নতুন মালিকের কাছে এই মালিকানা থাকবে সেটিকে ব্যবহার করতে সক্ষম থাকা পর্যন্ত। এমনকি সংবিধিবদ্ধ মালিকানা যদি বিক্রয় বা অন্য কোনো মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে, তারপরও।
উপর্যুক্ত প্রসঙ্গের সাথেই সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্ন হলো ইকতা বা জায়গীর প্রদান। আমরা আগে দেখেছি যে, উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে খাস জমি রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে আসার পর খলিফা তার কোনো প্রজাকে সেটি প্রদান করতেন। তা করা হতো প্রজার কোনো অবদান ও একনিষ্ঠতার পুরস্কার হিসেবে। এসব ভূমি বিনামূল্যে প্রদান করা হতো এবং আখ্যায়িত করা হতো কাতাঈ হিসেবে। উসমানীয়দের অধীনেও অব্যাহত থাকা এই চর্চা আকারেও বাড়তে থাকে এবং ধরনেও বৈচিত্র্য আসতে থাকে। এমনকি মিশরের প্রশাসক মুহাম্মাদ আলি মিশরের পুরো ভূখণ্ডকে বাজেয়াপ্ত করে নিজেকে তার একক মালিক দাবি করেছিলেন (সপ্তম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। আস-সাদর ইকতা বা কাতাঈ ভূমির আলোচনা করেছেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে।
➡ প্রথমত, তিনি ইসলামি জায়গির সিস্টেম আদি ধরনের সাথে পশ্চিমা সামন্তবাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমির পার্থক্য দেখান।
➡ দ্বিতীয়ত, এবং যা তার গবেষণায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ইসলামি জায়গির রীতির বৈধতার একটি মৌলিক যৌক্তিকতা দেখিয়েছেন। তা হলো শ্রমের শর্ত।
পূর্ববর্তী ফকিহদের মত তুলে ধরে নিজের মতের পক্ষে সমর্থন জোরালো করেন। বলেন যে, জায়গির সিস্টেম কোনো ব্যক্তিকে ভূমির সংবিধিবদ্ধ মালিকানা প্রদান করে না। এটা স্রেফ ব্যবহার করার অধিকার। উৎপাদনের অবহেলিত মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে একই চিন্তা অনুসরণ করে আস-সাদর জোর দিয়ে বলেছেন যে, জায়গিরদারের অধিকার শুধুই ব্যবহারের অধিকার। এর মাধ্যমে তিনি দাতা তথা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাজ করছেন মাত্র। তাই ইসলামি জায়গির বৈধ এবং রাষ্ট্র উৎপাদনের মাধ্যম (ভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন খনি) মানুষকে ব্যবহারের জন্য প্রদান করতে পারে। কিন্তু তার মতে সংবিধিবদ্ধ মালিকানা থেকে যাবে রাষ্ট্র তথা ইমামের হাতে। তাই স্বভাবতই বর্তমান মালিক হলো আধা-মালিক। আর এই আধা-মালিকানা অব্যাহত থাকার শর্ত হলো
➡ (ক) বর্তমান মালিক এই সম্পত্তি ব্যবহার করে কাজে লাগাবেন,
➡ (খ) রাষ্ট্রের নিয়মনীতি অনুসরণ করা হবে, এবং
➡ (গ) রাষ্ট্রকে এর অর্থনৈতিক ফলাফলের অংশ প্রদান করা হবে।
“তাই ইকতা বা জায়গির কোনো মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়। এটি বরং ইমাম (রাষ্ট্র) কর্তৃক ব্যক্তিকে প্রদত্ত একটি অধিকার। তিনি নিজের সামর্থ ও ক্ষমতা অনুযায়ী একটি সুসংজ্ঞায়িত সম্পত্তিকে কাজে লাগানোর দায়িত্বে নিয়োজিত।” (আস-সাদর, ১৯৮২, পৃ. ৪৫৯)। বলাবাহুল্য, আস-সাদরের যুক্তি থেকে অনুমান করা যায়, এইসব জমির ওপর রাষ্ট্রের প্রাপ্য ভাগ কিন্তু বর্তমান মালিকের ভাগের ওপর আরোপযোগ্য করের বিকল্প নয়। অনান্য প্রজা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্র যে কর আরোপ করতে পারে, এটি তার ব্যতিক্রম।
লক্ষ্যণীয় যে, কাতাঈ ভূমির মালিকানার ব্যাপারে আস-সাদরের দৃষ্টিভঙ্গি ইমাম আবু ইউসুফের একেবারে বিপরীত। কিতাবুল খারাজ গ্রন্থে আমরা আবু ইউসুফকে বলতে দেখেছি যে, মালিকানার হস্তান্তরকে পূর্ণ মালিকানা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খলিফা বা শাসকের আশ্রয় ছাড়াই চূড়ান্ত আখ্যায়িত হবে এটি। পূর্ণ মালিকানা পাওয়ার ফলে বিক্রয় বা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের অধিকারও পাওয়া যাবে একইসাথে। ইমাম আবু ইউসুফ এখানেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বলেছেন, খলিফা বা তার পরবর্তী শাসক কর্তৃক সেই মালিকানা ফিরিয়ে নেওয়াটা হবে ডাকাতির সমতুল্য। এক্ষেত্রে হয়তো আবু ইউসুফ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও লেনদেনের ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখেছেন। মালিকানার ধারণাগত ভিত্তির চেয়ে এদিকেই সম্ভবত মনোযোগ বেশি ছিল তার। তিনি তার মতের পক্ষে নবি -এর কর্মপদ্ধতি থেকে দলিলও পেশ করেছেন।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আসা যাক। আস-সাদর এক্ষেত্রে মূলধারার ইসলামি ফকিহদের মতোই রায় দিয়েছেন যে, ইসলামে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৈধ হলেও নিঃশর্ত নয়। শর্তগুলো আসে দুটি বিশিষ্ট সূত্র থেকে-ব্যক্তি ও রাষ্ট্র। ব্যক্তিগত শর্ত উদ্ভূত হয় শরীয়ার নৈতিক বিধানের প্রতি ব্যক্তির বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তির ধর্মীয় চেতনা ও ইসলামি বিশ্বাসের বিকাশের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় এটি। অর্থনীতির ব্যাপারে আস-সাদরের যে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি, সেটার ফলে শর্তের এই উৎসের প্রতি তিনি বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। রাষ্ট্র থেকে উদ্ভূত শর্ত হলো, শরীয়াহ আইন থেকে ব্যক্তির যে-কোনো বিচ্যুতির ফলে সামাজিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রাষ্ট্র তাকে শাস্তি প্রদানের অধিকার রাখে। আস-সাদরের কাছে রাষ্ট্রের সংশোধনী ক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তির ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে শরীয়ত প্রয়োগকারী সরকার অনুপস্থিত থাকলে, ব্যক্তির ধর্মীয় সচেতনতাই হয়ে ওঠে সেটার বিকল্প।
উপার্জন বণ্টনের আলোচনায় আস-সাদর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শ্রমের প্রতিদান দেওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলেছেন তিনি। পুঁজির জোগানদাতার চেয়ে শ্রমের জোগানদাতার ওপর বেশি জোর দেওয়ার কারণে মনে হতে পারে তিনি মার্কসবাদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। কিন্তু তার যুক্তির ভিত্তি আসলে ইসলামের নৈতিক ধারণাসমূহ। তার দৃষ্টিতে সমাজ শুধু সক্ষম ও সমর্থদের ভরণপোষণ দিতেই বাধ্য না, বরং দরিদ্র ও অভাবীদেরও দিতে বাধ্য। শর্ত হলো, দারিদ্র্যের কারণ হতে হবে দুর্বলতা ও অক্ষমতা। অলসতা ও অবহেলা নয়। ইসলামি বিশ্বাসের মূলে যাকাতকে সংযোজিত করার মাধ্যমে ইসলামি অর্থব্যবস্থা মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়টি থেকেই আলাদা হয়ে গেছে।
ইকতিসাদুনা গ্রন্থে আস-সাদর অর্থনীতি ও শরীয়ত উভয় বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা ও চিন্তার বিশালতা প্রদর্শন করেছেন। মনে স্বভাবতই কৌতূহল জাগে যে, তৎকালীন ইরাকি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতে ১৯৮০ সালে মৃত্যুদণ্ড না পেলে, না-জানি আরও কতদূর তার চিন্তার বিকাশ ঘটত (Wilson, 1998)।

বাকির আস-সাদর
এই বইতে আলাদাভাবে বিশ্লেষণের জন্য বাকির আস-সাদরের ইকতিসাদুনাকে বেছে নেওয়ার কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, আস-সাদর একজন শিয়া আলিম। এখন পর্যন্ত আমরা ইসলামি অর্থনীতির ওপর কোনো শিয়া অবদান পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাইনি। দ্বিতীয়ত, ইকতিসাদুনা অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি, যতটা সাদরের সমসাময়িকগণ পেয়েছিলেন (Wilson, 1998)। তৃতীয়ত, কাজটির চিন্তা, পদ্ধতি ও পরিসর প্রশংসা ও বাহবার যোগ্য। চতুর্থত, আস-সাদর এক নিপীড়ক শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকাকালীন এ কর্ম রচনা করেছেন এবং জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন। পঞ্চমত, ইকতিসাদুনা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬০ এর দশকের শেষ এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে, যখন ইসলামি পুনর্জাগরণবাদের মাধ্যমে ইসলামের পুনরুত্থান হচ্ছিল বলা চলে। ষষ্ঠত, আস-সাদরের সমসাময়িকগণ যেভাবে পশ্চিমা অর্থনীতি ও শিক্ষার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন, তিনি সে সুযোগ পাননি। তাই এই বিষয়ক তার চিন্তা সম্পূর্ণই তার নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন, যা বিশুদ্ধভাবে ইসলামি শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। এতে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব খুবই সামান্য, অন্তত তার সমসাময়িকদের সমপরিমাণ নয়। তা ছাড়া সপ্তমত, আংশিকভাবে কম্যুনিস্ট অর্থনীতির সমালোচনাকারী এ বইটি এমন সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে ইসলামি বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও নীতিনির্ধারকগণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রগতির পথ হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এগুলো-সহ আরও অনেক কারণে আস-সাদরের ইকতিসাদুনা আলোচনার দাবিদার।
আস-সাদর বইটির ভূমিকায় আমাদের বলেন যে, এটি ফালসাফাতুনা (আমাদের দর্শন) বইয়ের পরবর্তী সংযোজন। সম্ভবত এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সমাজবিজ্ঞানের ওপর একটি ধারাবাহিক লেখনী তৈরি করা। যার মধ্যে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত পরিসরের বিষয়াদি আলোচিত হবে। কিন্তু তা আর হলো না। এর আগেই তৎকালীন শিয়াবিরোধী সরকারের হাতে তার জীবনকালের অবসান ঘটে।
আস-সাদরের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী ইকতিসাদুনার লক্ষ্য হলো মার্কসবাদ, পুঁজিবাদ, ও ইসলামি অর্থনীতির একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ। এখানে এই ব্যবস্থাগুলোর ধারণাগত নীতিমালা ও প্রায়োগিক বিস্তারিতকে বিশ্লেষণ করা হবে। তাই আমাদের অর্থনীতির উপশিরোনাম হিসেবে কথাটিকে যুক্ত করা হয়েছে। শুরুতেই অনুমান করা কঠিন নয় যে, তুলনার শেষে অন্যান্য তন্ত্রের ওপর ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করা হবে। এক লেখককে আরেক লেখকের থেকে আলাদা করে যে জায়গাটি, তা হলো বিশ্লেষণের গভীরতা, পর্যালোচনার নৈর্ব্যক্তিকতা, এবং বিষয়টির ব্যাপারে তাদের পাণ্ডিত্য। আর এগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই আস-সাদরের মাঝে কোনো ঘাটতির দেখা মেলে না।
বইয়ের প্রাককথনেই আমরা দেখি তিনি নিজের উদ্দেশ্য খোলাখুলিভাবে বলেছেন। অনুন্নত মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেশি প্রয়োগযোগ্য, তার তুলনা ও মূল্যায়ন করা হবে। একদিকে রয়েছে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ-ভিত্তিক ইউরোপীয় অর্থনীতি, অপরদিকে ইসলাম।
তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল আস-সাদরের মূল বিবেচ্য। পুরো ইকতিসাদুনা জুড়ে এর প্রমাণ মেলে। একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখন ও কী মাত্রায় কর্মক্ষম হয়ে ওঠে, এ ব্যাপারে লেখক কোনো অলীক ধারণার অনুসারী নন। তিনি সতর্ক ও নিরপেক্ষভাবে ঘোষণা করেন যে, অর্থনৈতিক সিস্টেমগুলোর মাঝে তুলনা শুধুমাত্র ধারণাগত কাঠামো, কিংবা তত্ত্বীয় দর্শন ও নীতির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এর ভিত্তি হতে হবে আলোচ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সমাজের জন্য নির্মিত, সেই সমাজের বিচারে ব্যবস্থাটির প্রায়োগিকতা নিয়ে। এটা নিরপেক্ষতার এক দৃশ্যমান উদাহরণ।
এমনকি আস-সাদর ইউরোপীয় সমাজগুলোর জন্য পুঁজিবাদ আত্মরক্ষার আবশ্যকীয়তাই তুলে ধরেছেন বলা চলে। তিনি ইউরোপীয় সমাজের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যাবলী ওপরে আলোকপাত করেননি। দার্শনিকভাবে ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করে দেখান যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সমাজ কিভাবে পুঁজিবাদকে বেছে নিয়েছে। এরকম সমাজের প্রধান তাড়না হয়ে গিয়েছিল মুনাফার অন্বেষণ ও বস্তুগত অর্জন। তাই তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, ইউরোপীয় জনসমাজের চিন্তার জায়গা থেকে উপযুক্ত হলেও মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য পুঁজিবাদ উপযুক্ত নয়। কারণ মুসলিম সমাজ আল্লাহর প্রতি, গায়েবের প্রতি এবং আসমানি আচার-আচরনবিধির প্রতি বিশ্বাসী।
লক্ষ্যণীয় যে, আস-সাদর অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। আর ইসলামি অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুসলিমদের ভূমিকা সর্বোচ্চ গুরুত্ব রাখে। মুসলিম ছাড়া কোনো সফল ইসলামী ব্যবস্থা বা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কল্পনাও করা যায় না। সফলভাবে ইসলামী উপাদান সহকারে একটি ইসলামী সমাজ প্রয়োগের পূর্বশর্ত হলো সকল ইসলামী উপাদান সহকারে একটি সুগঠিত ইসলামী সমাজ উপস্থিত থাকা। একটি ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও একটি (শুদ্ধ ‘মুসলিম সমাজ’ নয়) পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরেরটি ছাড়া আগেরটি সফল হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তাই একটি সুসংবদ্ধশালী ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্জনের জন্য একটি সুসংবদ্ধ ইসলামী সমাজের গুরুত্ব বোঝা যায় এখান থেকেই।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইকতািসদুন্নার প্রথম পৃষ্ঠাগুলো থেকেই আস-সাদর একটি কথা বলে আসছেন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান শুধু একটা সামাজিক কাঠামোই নয়, যা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নমুনা ভালোভাবে এঁটে যেতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিসর এর চেয়েও বড়ো। এতে এমন এক কাঠামো প্রয়োজন, যাতে পুরো জাতি অন্তর্ভুক্ত। যেই মানুষদের জন্য অর্থনৈতিক কাজকর্মটির নক্শা করা হয়েছে, তারাও অন্তর্ভুক্ত এ কাঠামোতে। উন্নয়নের জন্য বাহ্যহিত মডলের সাথে উদ্দিষ্ট জনগণের একটি মিথষ্ক্রিয়া হওয়া চাই। উন্নয়নের এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে। কেবলমাত্র পুরো জাতির সহযোগিতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হওয়া সম্ভব। মানুষের সহযোগিতা এবং ব্যবস্থাটির প্রতি তাঁদের পূর্ণ আস্থানিবেদন সাফল্যের পূর্বশর্ত। কারণ সহযোগিতার মাধ্যমেই মানুষ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথে তাঁদের মেধা ও দক্ষতা ঢেলে দিতে পারে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল বাস্তবায়ন করতে হলে মানুষকে এমন একটি ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে।
হবে, যা তাদের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যশীল। একটি মুসলিম জাতির মাঝে জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটিকেও ইসলামি হতে হবে। আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সেক্যুলারায়ন করা হলে একটি ইসলামি সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সেরা ফলাফলটি কখনোই আসবে না। একই কারণে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।
অর্থনৈতিক ধারণা ও নীতিমালার আলোচনায় আস-সাদরের লেখায় আরও একবার ইসলামি দর্শন, নীতি ও বিশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। যেমন, তিনি পণ্য ও সেবার মূল্যমানের উৎস, সেই মূল্য কিভাবে নির্ধারিত হয়, শ্রম মূল্যের উৎস কি না-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। তার মতে এই উত্তর খোঁজার জন্য জানতে হবে যে, ধর্ম হিসেবে লাভের ধারণা (পুঁজিবাদী অর্থে)-র ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী। সেইসাথে এটি মূল্যমানের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হওয়ার কতটা দাবিদার। লাভের বৈধতার মাত্রা উদঘাটন করার জন্য জানতে হবে যে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজি, শ্রম ও উৎপাদনের অন্যান্য মাধ্যম কী ভূমিকা পালন করে। ফলাফল বণ্টনের ওপর উৎপাদনের নিয়ামকগুলোর অধিকারের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কী, তার ভিত্তিতে এসব নিয়ামকের ভূমিকাকে অধ্যয়ন করতে হবে।
ইকতিসাদুনা রচিত হয়েছিল আরবিতে। এর দ্বিতীয় সংস্করণের আকার ৭০০ পৃষ্ঠারও বেশি। আমাদের হাতে থাকা সংস্করণের শব্দসংখ্যা ২০০,০০০-এর চেয়ে একটু বেশি। এমনকি আজকের যুগের হিসেবেও এ এক বিশাল কলেবর। ইকতিসাদুনাকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। মার্কসবাদ, ২০০ পৃষ্ঠা, পুঁজিবাদ, ৪০ পৃষ্ঠা, এবং ৪৬০ পৃষ্ঠা ইসলামি অর্থনীতির জন্য। এ থেকে বোঝা যায়, পুঁজিবাদের তুলনায় সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে আস-সাদরের কথার পরিমাণ কতটা বেশি। এবং ইসলামি ব্যবস্থার প্রতি তিনি কতটা আগ্রহী। তিনি মার্কসবাদের দারুণভাবে সমালোচনা করেছেন। এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এর দর্শন স্ব-বিরোধী। তার মতে পুঁজিবাদ অসৎ স্বাধীনতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেছে। এটি মুক্তবাজারের পক্ষে কথা বললেও মোটাদাগে ব্যক্তিমানুষকে ওইটুকু অর্থনৈতিক মাধ্যম বা ক্রয়ক্ষমতা প্রদান করে না, যার ফলে তারা স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তাই বাজারের স্বাধীনতা ওখানেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, সেটা আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় পরিণত হয় না। এমন স্বাধীনতা তাই অলীক। তার ভাষ্যে, ইসলামি অর্থনীতি একটি মূল্যবোধ-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা। ধনী-দরিদ্র উভয়ের চাহিদাকে পূরণ করে এটি। ইসলাম থেকে উৎসারিত নৈতিক মূল্যবোধ বেশ স্পষ্ট। আস-সাদরের যুক্তিপদ্ধতি অন্যান্য মুসলিম অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণভাবে শরীয়াহ আলিমগণের পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তৃতীয় ভাগ তথা ইসলামি অর্থনীতির ওপর মনোনিবেশ করা যাক। ইসলামি অর্থনীতির প্রধান রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আস-সাদর পুরো বিষয়টিকে ছয়টি প্রধান অংশে বিভক্ত করেছেন, যথা:
➡ ১. ইসলামি অর্থনীতির সার্বিক গঠন;
➡ ২. পুরো ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইসলামি অর্থনীতি;
➡ ৩. ইসলামি অর্থনীতির সাধারণ কাঠামো;
➡ ৪. ইসলামি অর্থনীতি (পশ্চিমা) বিজ্ঞানের কোনো শাখা নয়;
➡ ৫. উৎপাদনের রূপ থেকে বণ্টনের ভিন্নতা;
➡ ৬. ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ এবং তাদের সমাধান।
ইসলামি অর্থনীতির সাধারণ কাঠামোর ব্যাখ্যায় আস-সাদর বলেছেন, এটি তিনটি মৌলিক নীতির ওপর গঠিত—দ্বৈত মালিকানা, শর্তাধীন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
মালিকানার প্রসঙ্গে আস-সাদর তিন ধরনের মালিকানার কথা বলেছেন। ব্যক্তিগত মালিকানা, গণ মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা। তিনি সতর্ক করে দেন যে, মিশ্র মালিকানার অর্থ এই না যে, ইসলামি অর্থব্যবস্থা একটি মিশ্র অর্থনীতি। মিশ্র অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত ও গণমালিকানা উভয় রূপকে অনুমোদন দেওয়া হয়। তার মতে, ইসলামি অর্থনীতিকে এভাবে পরিচয় দেওয়া যাবে না। কারণ ইসলামি অর্থনীতির মতাদর্শ মিশ্র অর্থব্যবস্থা থেকে আলাদা। মিশ্র অর্থব্যবস্থা মানে গণমালিকানার অনুমোদনকারী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানা রহিতকারী মার্কসবাদী ব্যবস্থা। ইসলামি ব্যবস্থা এ দুইয়ের কোনোটিই নয়। কারণ এর নিজস্ব মূল্যবোধ রয়েছে, যা পুঁজিবাদীও নয়, সমাজবাদীও নয়। আস-সাদর কি জাতীয়করণের পক্ষে? তার লেখনীর প্রথম অংশে এর উত্তর ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংস্করণের ২৫৯ তম পৃষ্ঠায় এসে তিনি জনস্বার্থে ব্যক্তিগত মালিকানার জাতীয়করণে পুঁজিবাদী অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনেছেন। একটি পুঁজিবাদী সরকার যা করত, সেটাকে তিনি অনুমোদন দিচ্ছেন বলে ধরে নেওয়া যায় (আস-সাদর, ১৯৮২)।
উৎপাদনের মাধ্যমের মালিকানা প্রসঙ্গে আস-সাদর মালিকানার শর্তসমূহ তুলে ধরেছেন। ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদও উৎপাদনের মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এসব উৎসের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে কাজ করাটা মালিকানা অক্ষুণ্ণ রাখার শর্ত। তার মতে, মালিক যদি সম্পদকে অবহেলা করে বা সেটা ব্যবহার করতে অপারগ হন, তাহলে রাষ্ট্র বা ইমাম এটি ব্যবহারে সক্ষম অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। নতুন মালিক কর্তৃক ব্যবহারের ফলে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ফলাফলের যথাযথ অংশ সংবিধিবদ্ধ মালিককে প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু নতুন মালিককে সংবিধিবদ্ধ মালিকানা দেওয়া হবে না। তিনি বিক্রয়, উত্তরাধিকার বা অন্য কোনো মাধ্যমে এই সম্পদ হস্তান্তর করতে পারবেন না। নতুন মালিকের মালিকানা হলো স্রেফ ওই সম্পদটি ব্যবহারের অধিকার। নিজস্ব অধিকার নয়। এ এক সূক্ষ্ম পার্থক্য, যা মালিকানা-হস্তান্তরের নীতিকে আরও প্রয়োগযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। আধুনিক পরিভাষায় বললে এটি উৎপাদনের অবহেলিত মাধ্যমটির আধা-মালিকানা। পূর্ণ মালিকানা নয়। বলাবাহুল্য, নতুন মালিকের কাছে এই মালিকানা থাকবে সেটিকে ব্যবহার করতে সক্ষম থাকা পর্যন্ত। এমনকি সংবিধিবদ্ধ মালিকানা যদি বিক্রয় বা অন্য কোনো মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে, তারপরও।
উপর্যুক্ত প্রসঙ্গের সাথেই সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্ন হলো ইকতা বা জায়গীর প্রদান। আমরা আগে দেখেছি যে, উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে খাস জমি রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে আসার পর খলিফা তার কোনো প্রজাকে সেটি প্রদান করতেন। তা করা হতো প্রজার কোনো অবদান ও একনিষ্ঠতার পুরস্কার হিসেবে। এসব ভূমি বিনামূল্যে প্রদান করা হতো এবং আখ্যায়িত করা হতো কাতাঈ হিসেবে। উসমানীয়দের অধীনেও অব্যাহত থাকা এই চর্চা আকারেও বাড়তে থাকে এবং ধরনেও বৈচিত্র্য আসতে থাকে। এমনকি মিশরের প্রশাসক মুহাম্মাদ আলি মিশরের পুরো ভূখণ্ডকে বাজেয়াপ্ত করে নিজেকে তার একক মালিক দাবি করেছিলেন (সপ্তম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। আস-সাদর ইকতা বা কাতাঈ ভূমির আলোচনা করেছেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে।
➡ প্রথমত, তিনি ইসলামি জায়গির সিস্টেম আদি ধরনের সাথে পশ্চিমা সামন্তবাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমির পার্থক্য দেখান।
➡ দ্বিতীয়ত, এবং যা তার গবেষণায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ইসলামি জায়গির রীতির বৈধতার একটি মৌলিক যৌক্তিকতা দেখিয়েছেন। তা হলো শ্রমের শর্ত।
পূর্ববর্তী ফকিহদের মত তুলে ধরে নিজের মতের পক্ষে সমর্থন জোরালো করেন। বলেন যে, জায়গির সিস্টেম কোনো ব্যক্তিকে ভূমির সংবিধিবদ্ধ মালিকানা প্রদান করে না। এটা স্রেফ ব্যবহার করার অধিকার। উৎপাদনের অবহেলিত মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে একই চিন্তা অনুসরণ করে আস-সাদর জোর দিয়ে বলেছেন যে, জায়গিরদারের অধিকার শুধুই ব্যবহারের অধিকার। এর মাধ্যমে তিনি দাতা তথা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাজ করছেন মাত্র। তাই ইসলামি জায়গির বৈধ এবং রাষ্ট্র উৎপাদনের মাধ্যম (ভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন খনি) মানুষকে ব্যবহারের জন্য প্রদান করতে পারে। কিন্তু তার মতে সংবিধিবদ্ধ মালিকানা থেকে যাবে রাষ্ট্র তথা ইমামের হাতে। তাই স্বভাবতই বর্তমান মালিক হলো আধা-মালিক। আর এই আধা-মালিকানা অব্যাহত থাকার শর্ত হলো
➡ (ক) বর্তমান মালিক এই সম্পত্তি ব্যবহার করে কাজে লাগাবেন,
➡ (খ) রাষ্ট্রের নিয়মনীতি অনুসরণ করা হবে, এবং
➡ (গ) রাষ্ট্রকে এর অর্থনৈতিক ফলাফলের অংশ প্রদান করা হবে।
“তাই ইকতা বা জায়গির কোনো মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়। এটি বরং ইমাম (রাষ্ট্র) কর্তৃক ব্যক্তিকে প্রদত্ত একটি অধিকার। তিনি নিজের সামর্থ ও ক্ষমতা অনুযায়ী একটি সুসংজ্ঞায়িত সম্পত্তিকে কাজে লাগানোর দায়িত্বে নিয়োজিত।” (আস-সাদর, ১৯৮২, পৃ. ৪৫৯)। বলাবাহুল্য, আস-সাদরের যুক্তি থেকে অনুমান করা যায়, এইসব জমির ওপর রাষ্ট্রের প্রাপ্য ভাগ কিন্তু বর্তমান মালিকের ভাগের ওপর আরোপযোগ্য করের বিকল্প নয়। অনান্য প্রজা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্র যে কর আরোপ করতে পারে, এটি তার ব্যতিক্রম।
লক্ষ্যণীয় যে, কাতাঈ ভূমির মালিকানার ব্যাপারে আস-সাদরের দৃষ্টিভঙ্গি ইমাম আবু ইউসুফের একেবারে বিপরীত। কিতাবুল খারাজ গ্রন্থে আমরা আবু ইউসুফকে বলতে দেখেছি যে, মালিকানার হস্তান্তরকে পূর্ণ মালিকানা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খলিফা বা শাসকের আশ্রয় ছাড়াই চূড়ান্ত আখ্যায়িত হবে এটি। পূর্ণ মালিকানা পাওয়ার ফলে বিক্রয় বা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের অধিকারও পাওয়া যাবে একইসাথে। ইমাম আবু ইউসুফ এখানেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বলেছেন, খলিফা বা তার পরবর্তী শাসক কর্তৃক সেই মালিকানা ফিরিয়ে নেওয়াটা হবে ডাকাতির সমতুল্য। এক্ষেত্রে হয়তো আবু ইউসুফ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও লেনদেনের ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখেছেন। মালিকানার ধারণাগত ভিত্তির চেয়ে এদিকেই সম্ভবত মনোযোগ বেশি ছিল তার। তিনি তার মতের পক্ষে নবি -এর কর্মপদ্ধতি থেকে দলিলও পেশ করেছেন।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আসা যাক। আস-সাদর এক্ষেত্রে মূলধারার ইসলামি ফকিহদের মতোই রায় দিয়েছেন যে, ইসলামে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৈধ হলেও নিঃশর্ত নয়। শর্তগুলো আসে দুটি বিশিষ্ট সূত্র থেকে-ব্যক্তি ও রাষ্ট্র। ব্যক্তিগত শর্ত উদ্ভূত হয় শরীয়ার নৈতিক বিধানের প্রতি ব্যক্তির বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তির ধর্মীয় চেতনা ও ইসলামি বিশ্বাসের বিকাশের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় এটি। অর্থনীতির ব্যাপারে আস-সাদরের যে অগ্রসর হওয়ার পদ্ধতি, সেটার ফলে শর্তের এই উৎসের প্রতি তিনি বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। রাষ্ট্র থেকে উদ্ভূত শর্ত হলো, শরীয়াহ আইন থেকে ব্যক্তির যে-কোনো বিচ্যুতির ফলে সামাজিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রাষ্ট্র তাকে শাস্তি প্রদানের অধিকার রাখে। আস-সাদরের কাছে রাষ্ট্রের সংশোধনী ক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তির ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে শরীয়ত প্রয়োগকারী সরকার অনুপস্থিত থাকলে, ব্যক্তির ধর্মীয় সচেতনতাই হয়ে ওঠে সেটার বিকল্প।
উপার্জন বণ্টনের আলোচনায় আস-সাদর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শ্রমের প্রতিদান দেওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলেছেন তিনি। পুঁজির জোগানদাতার চেয়ে শ্রমের জোগানদাতার ওপর বেশি জোর দেওয়ার কারণে মনে হতে পারে তিনি মার্কসবাদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। কিন্তু তার যুক্তির ভিত্তি আসলে ইসলামের নৈতিক ধারণাসমূহ। তার দৃষ্টিতে সমাজ শুধু সক্ষম ও সমর্থদের ভরণপোষণ দিতেই বাধ্য না, বরং দরিদ্র ও অভাবীদেরও দিতে বাধ্য। শর্ত হলো, দারিদ্র্যের কারণ হতে হবে দুর্বলতা ও অক্ষমতা। অলসতা ও অবহেলা নয়। ইসলামি বিশ্বাসের মূলে যাকাতকে সংযোজিত করার মাধ্যমে ইসলামি অর্থব্যবস্থা মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়টি থেকেই আলাদা হয়ে গেছে।
ইকতিসাদুনা গ্রন্থে আস-সাদর অর্থনীতি ও শরীয়ত উভয় বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা ও চিন্তার বিশালতা প্রদর্শন করেছেন। মনে স্বভাবতই কৌতূহল জাগে যে, তৎকালীন ইরাকি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতে ১৯৮০ সালে মৃত্যুদণ্ড না পেলে, না-জানি আরও কতদূর তার চিন্তার বিকাশ ঘটত (Wilson, 1998)।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

📄 ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ


বিগত দিনের ইসলামি বিশ্ব ছিল বহু অর্জনে পরিপূর্ণ। তখন মুসলিম সরকারগুলো ছিল শক্তিশালী, বাধাবিপত্তি ছিল কম মারাত্মক। এর সাথে আজকের ইসলামি বিশ্বের দুঃখজনক বাস্তবতার তুলনা করলে আমরা পেছন ফিরে দেখার সুযোগ পাই। লাভ করি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব প্রমাণ ও শিক্ষা। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণকে সাবধানতার সঙ্গে ব্যবহার করা চাই। কেননা, ইতিহাসের মাঝে অন্তর্নিহিত বিকৃতি সেই প্রমাণ চয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অতীতের পরিস্থিতি বর্তমানের থেকে আলাদা ছিল। সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বিশেষ কোনোদিকে ঝোঁক তৈরি করে। একটু কম মাত্রায় হলেও সাংস্কৃতিক কাঠামোও একই ভূমিকা রাখে, যদি সেই সংস্কৃতি একই উৎস থেকে পরিপুষ্ট হয়ে থাকে। ইসলাম-ভিত্তিক সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসে শিক্ষণীয় উপাদান রয়েছে বটে। কিন্তু সেটাকে গ্রহণ করতে হলে নিরীক্ষণ-প্রবণ মন এবং অনুসন্ধানী স্বভাব প্রয়োজন। ইসলামি অর্থনীতির ঐতিহাসিক নিরীক্ষা আমাদের বলে যে, একটি কার্যকর কাঠামো ও কর্মক্ষম নমুনা প্রদানের স্বতন্ত্র ক্ষমতা ইসলামি ব্যবস্থার রয়েছে, যদি অন্যান্য জিনিস অপরিবর্তিত থাকে। এই "অন্য জিনিস” গুলো হলো:
➡ (ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা,
➡ (খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র,
➡ (গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বহিঃশক্তি যেন ইসলামের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ না করে,
➡ (ঘ) প্রযুক্তিগত এবং সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন-ক্ষমতা।
বর্তমান যেমন অতীতের একটি অবিচ্ছিন্ন শেকলের অংশ, একই প্রক্রিয়ায় এটি ভবিষ্যতের সাথেও নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ তাদের পছন্দের অর্থনীতির জন্য এক উত্তম ভবিষ্যৎ কামনা করেন। তারা সকলেই উপলব্ধি করেছেন যে, সমাধান ও সংকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে আজকের সমস্যাগুলো অধ্যয়ন করলে আগামীর জন্য এক শক্তিশালীতর ইসলামি অর্থনীতির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানকে ভবিষ্যতের সাথে সংযুক্ত করার পথে তিনটি বড় বড় ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলোতে এখন বিশেষভাবে মনোযোগ প্রদান করা উচিত:
➡ প্রথমত, শরীয়তের বিশুদ্ধ উৎস থেকে অর্থনৈতিক ধারণা ও প্রয়োজনবোধে নতুন পরিভাষা চয়নের গুরুত্ব;
➡ দ্বিতীয়ত, ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম, রাষ্ট্রের অর্থায়ন, ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে ইসলামি অর্থনীতির প্রয়োগের ব্যাপারে সাহসী আলোচনা;
➡ তৃতীয়ত, বাস্তবসম্মত প্রমাণ ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণা, যেহেতু এই ময়দানে কাজ হয়েছে খুবই কম।
মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ তাদের ভিত্তিকে সুগঠিত করার এক প্রখর চেষ্টায় নিয়জিত। যাতে ভবিষ্যতে আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এগোনো যায়। প্রচেষ্টা করা হয়েছে এটা দেখাতে যে, (ক) ইসলামি অর্থনীতি পশ্চিমা অর্থনৈতিক ধারণাগুলোর সমতুল্য ইসলামিক সংস্করণকে সংস্থান করতে সক্ষম; অর্থনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” থেকে লেখালেখি দুর্লভ নয়, এবং (খ) কোনো রাষ্ট্র তার অর্থব্যবস্থার ইসলামিকরণ করতে চাইলে ম্যাক্রো লেভেলে তা জনকল্যাণের এক বাস্তবসম্মত বিকল্প।
তবে যত যা-ই হোক, স্বয়ং ইসলাম থেকে উৎসারিত অর্থনৈতিক ধারণা পুনরাবিষ্কারে আরও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আরেকভাবে বললে, ইসলামি উৎসসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, খুলাফায়ে রাশিদীন ও ফকিহগণের মত) থেকে ইসলামি অর্থনীতির পরিচয়কে আরও বেশি আলোকপাত করা প্রয়োজন। যেমন, দর-নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক সমকালীন লেখনীতে কেন আল-হিসবাহ'র কোনো উল্লেখ নেই, সে ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন উইলসন (Wilson, 1998)। সরদার তার Islamic Futures: the Shape of Ideas to Come গ্রন্থে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। সেখানে তার আলোচ্য বিষয়ের মাঝে রয়েছে: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের পুনরুদঘাটন, সমস্যা সমাধানে শরীয়তের মূল্যায়ন, ইসলামি অর্থনীতির আংশিক ও স্বতঃসিদ্ধ রূপ, উন্নয়নের ইসলামি ধারণা ইত্যাদি (সরদার, ১৯৮৫)। ইসলামি গবেষণার ব্যাপারে সরদার একটি স্বাধীন যাচাই পদ্ধতির সমর্থক। এটি হবে অনুকরণ থেকে মুক্ত এবং কুরআন-সুন্নাহ দিয়ে পরিচালিত (প্রাগুক্ত)। স্বচ্ছ ও নতুন ইসলামি চোখ দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করার ক্ষেত্রে তার সাথে একমত হতেই হয়। তার অর্থ এই না যে, পশ্চিমা সাহিত্যে অর্থনীতি বিষয়ে যা রচিত হয়েছে, মুসলিমরা তার সবই ছুঁড়ে ফেলে দিবে। এমনটি করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্ঞান হারিয়ে যাবে। কিন্তু অনুসন্ধিৎস্যু মুসলিম অর্থনীতিবিদদের হয়তো ইসলামি অর্থনীতিকে দেখতে হবে এক "সদ্যোজাত” স্বাধীন জ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে। যেটা পশ্চিমা অর্থনৈতিক লেখালেখির সাথে একেবারে সেঁটে থাকতে বাধ্য নয়। যেমন, ইসলামি অর্থনীতি যদি স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব মৌলিক ধ্যানধারণা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে গতানুগতিকভাবে "ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে” অর্থনীতিকে দেখার আর প্রয়োজন নেই। এই "ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে” শব্দগুচ্ছটি বিংশ শতাব্দীর ইসলামি অর্থনৈতিক লেখকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। এই অপরিহার্য তুলনাপ্রবণতা এবং "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” সিনড্রোম থেকে সরে আসা যে কতটা কঠিন, তা এখান থেকেই বোঝা যায়। হাজার হোক, এখন পর্যন্ত এই ময়দানে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া মুসলিম অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ হয় পশ্চিমা-শিক্ষিত অথবা শিক্ষার দিক থেকে পশ্চিম-প্রভাবিত। তাই হয়তো এই তুলনা অপরিহার্যভাবে চলে আসে এবং "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” শব্দ দ্বারা আলোচনা করাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এই বিষয়টির গুরুত্ব দুইদিক থেকে:
(ক) কোনো জনসমাজের জন্য আমদানিকৃত বস্তু ভালো জিনিস বটে, কিন্তু আমদানিকৃত ধ্যানধারণা ওই জনসমাজে প্রয়োগযোগ্য না-ও হতে পারে।
➡ (খ) এ ব্যাপারটা নতুন না, আমরা সবাই জানি। কিন্তু ইসলাম যে অর্থনীতি সহ অন্যান্য ব্যাপারে নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে সক্ষম, তার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
ইসলামি অর্থনীতি যদি কেবল পশ্চিমা অর্থনীতির প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়, তাদের ছাড়া নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে না পারে, তাহলে ইসলামি অর্থনীতিকে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে দেখার আর কোনো যৌক্তকতা থাকে না। এটি অর্থনীতি বিষয়ের অধীনে স্রেফ একটি উপবিষয় হতে পারে। এমনকি “আদর্শবাদী” অর্থনীতির শিরোনামেও তা হারিয়ে যেতে পারে। মধ্যযুগের মুসলিম লেখকগণ যখন ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন, তারা "আল-কাসব”, “আল-আমওয়াল”, “আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা”, “আয যারীআহ”, ও “রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশে”র পাশাপাশি "খারাজ” ও "হিসবাহ”র মতো বিষয় নিয়েও এসেছেন। তারা এখানে কোনো ইসলামি “দৃষ্টিকোণ” টেনে আনার প্রয়োজন বোধ করেননি।[১] এটা সত্যি যে, এখনকার লেখালেখির ক্ষেত্র অতীতের চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের জন্য এই ইসলামি লেখাগুলো একটিই কেন্দ্রীয় শিরোনামের অধীনে চলে আসতে পারে-ইসলামি অর্থনীতি।
ইসলামি অর্থনৈতিক আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার দিকটিতে আসা যাক। বেশ কিছুকাল ধরে এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে ইসলামি ব্যাংক। মিশরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ও পাকিস্তানে ছোট্ট সঞ্চয়ী ব্যাংকের রূপ ধরে এর সূচনা ঘটেছিল ১৯৬০ এর শুরুর দিকে। বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইসলামি ব্যাংক হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাতের এক বড় অংশীদার। আজ এর অধীনে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২০০ ব্যাংক, যার মোট সম্পদ ৩০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। মোট পুঁজি ৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ও মোট জমা ১৭০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। যে-কোনো মানদণ্ডেই এ এক বিশাল অর্জন। কিন্তু সমস্যা রয়েই গেছে। ইসলামি অর্থায়নের আরও অনেক সুসংলগ্ন ভিত্তি অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে এই সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ তোলা লাগবে। এগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়নি অবশ্য। ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ এ সমস্যাগুলোর পর্যালোচনায় মগ্ন আছেন। এর উদ্দেশ্য হলো সমালোচনাগুলোর উত্তর প্রদান করা অথবা সেগুলো সমাধানের সত্যিকারের উপায় অন্বেষণ করা। কিছু সমস্যা নিম্নে তুলে ধরা হলো (এ সমস্যাগুলোর বিস্তারিত আলোচনার জন্য উদাহরণস্বরূপ দেখুন Future of Economics, Chapra 2000)।
➡ ১. ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক প্রদত্ত সেবার গুণগতমান প্রমিতকরণের (standardisation) অভাব। এটি মূলত কোনো কেন্দ্রীয় শরীয়াহ ব্যাংক না থাকার ফল—যা থেকে সকল ইসলামি ব্যাংকগুলো পরামর্শ ও ধর্মীয় নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারত (চাপরা, ২০০০)।
এ থেকে অনুরূপ আরেকটি পরিস্থিতির কথা মাথায় চলে আসে। যদি কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে, কোনো স্ট্যান্ডার্ড হিসাবপদ্ধতি নেই, তখন হিসাববিজ্ঞানের বিষয়গুলো সমাধান করা হয় সাধারণ রীতি অনুযায়ী। সাধারণভাবে গৃহীত হিসাব নীতিমালার (Generally Acceptable Accounting Principles-GAAP) আলোকে। উভয় পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাগুলো সহজেই তুলনা করে দেখা যায়। যেমন চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ফ্রান্সে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড হিসাবব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্যের নন-স্ট্যান্ডার্ড হিসাবব্যবস্থা। যুক্তরাজ্যে কেবলমাত্র হিসাব-নিরীক্ষণ বোর্ড প্রতিষ্ঠার পরেই সামঞ্জস্য তৈরি করা গেছে।
তাই ইসলামি ব্যাংকগুলোর উচিত ছিল নিজস্ব শরীয়াহ-নিরীক্ষণ বোর্ড রাখা। কিংবা বোর্ড গঠনের তুলনায় আকারে ছোট হলে অন্তত শরীয়াহ উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া। এতে শরীয়তের নিয়মনীতি মেনে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইসলামি ব্যাংকগুলো সহায়তা পাবে। সেইসাথে শেয়ারহোল্ডার-সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আশ্বস্ত করা যেত যে, ব্যাংকের কার্যক্রমে শরীয়তের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।
সমস্যা হলো এতে পশ্চিমাভিত্তিক ব্যাংকগুলোর যতটা খরচ হবে, ইসলামি ব্যাংকের খরচ তার চেয়ে বেড়ে যায়। যেহেতু তারা একই আর্থিক পরিবেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর অনুরূপ ক্ষতি না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইসলামি ব্যাংকগুলো অসুবিধাজনক অবস্থানে পড়ে যাবে। ইসলামি ব্যাংকের এই খরচ নিরোধ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ড প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও জামানত প্রদান করা হবে। এই কেন্দ্রীয় বোর্ডের খরচ সাধারণভাবে সব ইসলামি ব্যাংককে ভাগ করে দেওয়া হবে। এর ফলে প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা আলাদা বোর্ড রাখার খরচ কমে যাবে। OIC-কে দেখা গেছে ফিক্হ অ্যাকাডেমি এবং International Association of Islamic Banks (IAIB)-এর উদ্যোগ নিতে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত শরীয়াহ কমিশন প্রতিষ্ঠিত করে কেন্দ্রীয়ভাবে পরামর্শ প্রদান করা হয়। তারপরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে হয়তো বেশ কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে (প্রাগুক্ত)।
২. ইসলামি ব্যাংকগুলো এমন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে ইসলামি ও পশ্চিমা উভয় ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে ইসলামি ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যেগুলো মূলত পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংকগুলোর সাথে মানানসই করে তৈরি করা হয়েছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ব্যাংক ডিপোজিটের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবিকৃত রিজার্ভ অনুপাত। ইসলামি ব্যাংকে টাকা জমাকারীগণ লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে কার্যক্রম চলছে বলে জানেন। তাই টাকা জমা করেন পুরোটাই বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ইসলামি ব্যাংককে এই জমার একটা অংশ রাখতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের জন্য। ফলে জমার এই অংশের লভ্যাংশ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফার হার যদি সুদের হারের চেয়ে উচ্চ হয়ে থাকে, তাহলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার খরচ পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেড়ে যেতে পারে। ইসলামি ব্যাংকের উচ্চতর ঝুঁকির কারণে বাস্তবে এমনটাই হয়ে থাকে। বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফার হার আসলেই সুদের হারের চেয়ে বেশি। খরচ আরও বেড়ে যাবে, যদি ঝুঁকি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের অনুপাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
৩. ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রম তৃতীয় যে বড় সমস্যাটির মুখোমুখি হয়ে থাকে, তা হলো তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় আকারে খুবই ছোট। যেমন, একটি পশ্চিমা বহুজাতিক ব্যাংকের সম্পদ সকল ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সমষ্টির চেয়ে অনেক বেশি (চাপরা, ২০০০)। এতে প্রতিযোগিতা বেশ কঠিন হয়ে যায়। বিশেষত যখন উভয় ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দেশে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়। যে-কোনো আর্থিক বিপদের ক্ষেত্রে ছোট ব্যাংকটি আগে বাজার থেকে ছিটকে পড়বে।[১]
তবে খুব সম্ভবত ইসলামি ব্যাংকগুলোকে এ নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই, তা তারা যত ছোটই হোক না কেন। তারা গ্রাহকদের সাথে ভালো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হতে পারে। ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির ব্যবসার জন্য এটা খুবই উপকারী। ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি তাদের কর্মীদের জন্য ইন-হাউজ দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য আর্থিক ও শিল্পগত তথ্য, ও ভালো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে বিশেষায়িত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তারা বৃহত্তর ব্যাংকগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে না পারলেও তাদের সাথে অন্তত প্রতিযোগিতা করতে পারবে। আরেকভাবে বললে, ইসলামি ব্যাংকগুলো বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বিশেষ বিশেষ পণ্য সরবরাহ এবং বিশেষ বিশেষ বাজারে মনোনিবেশ করতে পারে। ইসলামি ব্যাংকিং তত্ত্বে এটি ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রমের ব্যাপারে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা। কিন্তু এই পর্যায়ে এই ধরনের সেবা প্রদানে সমর্থ হতে হলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন সুপ্রশিক্ষিত কর্মী ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য। একবিংশ শতাব্দীতে হয়তো ইসলামি ব্যাংকিং-এ এই বিশেষ বিষয়টির দেখা মিলবে।
৪. মুরাবাহা ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে অন্তত আংশিকভাবে হলেও হয়তো সরে আসা প্রয়োজন। অধিকতর মনোনিবেশ করতে হবে অন্য ধরনের বিনিয়োগ অর্থায়নে-মুদারাবা ও মুশারাকা। তা ছাড়া বাণিজ্যিক অর্থায়নে LIBOR মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীলতা হয়তো ইসলামি ব্যাংকের অর্থায়নের প্রকৃতির ব্যাপারে এক ধরনের সন্দেহের অনুভূতিও জাগাচ্ছে। LIBOR ও এর অনুরূপ হারের ওপর নির্ভর করাটা হয়তো ব্যাংকগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত। কিন্তু এ এক জটিলতর সমস্যার সমাধান হিসেবে কাজ করলেও ব্যাংকের সেবাগ্রহাকদের মনে ইসলামিকরণের ধারণা তৈরিতে সহায়ক নয়। হোক তারা জমাকারী কিংবা অর্থায়নের ব্যবহারকারী।
একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামি ব্যাংকগুলোকে হয়তো এমন হার থেকে সরে আসতে শুরু করা প্রয়োজন, যেগুলো পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে বেশি সাজুয্যপূর্ণ, লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগি নীতিধারণকারী ইসলামি উদ্যোগের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। সূচকের ব্যবহার উদঘাটন করার জন্য হয়তো আরও গবেষণা প্রয়োজন। যেমন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থায়নের প্রকৃতি পরিবর্তনের সাথে সহজে ও গতিশীলভাবে প্রয়োগযোগ্য একটি মুনাফা সূচক।
আসন্ন বছরগুলোতে ইসলামি অর্থনীতি কি টিকে থাকবে? আলোচকদের মাঝে কে আছেন, তার ভিত্তিতে হয়তো এই প্রশ্নের বৈচিত্র্যময় উত্তর উঠে আসতে পারে। কোনো ঐক্যমত্যপূর্ণ উত্তর হয়তো আসবে না। তা প্রত্যাশিতও না। কারণ এই বিষয়ের ওপর মতভিন্নতা একেবারেই দৃশ্যমান। মতভেদের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। উত্তরটি হয়তো কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
➡ (ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা,
➡ (খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র,
➡ গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মতো রাজনৈতিক কলকব্জার পক্ষ থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতার অনুপস্থিতি,
➡ (ঘ) প্রযুক্তিগত-সহ সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন ক্ষমতা-ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রচনায় বেশ প্রভাব ফেলবে।
(ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা: অন্য যে-কোনো দর্শনের মতো অর্থনৈতিক দর্শনও সমৃদ্ধ হয় সেগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের জোরে। বিশেষত সে ব্যবস্থা যদি নৈতিক মূল্যবোধ হয়ে থাকে এবং ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর গড়ে উঠে থাকে, তাহলে এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। এসব মূল্যবোধ থেকে যত সরে যাওয়া হবে, ততই সেগুলোর ওপর ব্যবস্থাটির নির্ভরতা কমে যাবে। ততই ধ্যানধারণাগুলোর প্রয়োগ দুর্বলতর হয়ে পড়বে। ইসলামি অর্থব্যবস্থার সমৃদ্ধি তো বটেই, টিকে থাকার জন্যই এর মুসলিমদের সমর্থন দরকার হবে। আর তা আসবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামি রীতিনীতির প্রতি তাদের আনুগত্য থেকে। যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ইসলামি ও পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ইসলামি ব্যাংকগুলো টিকে থাকতে পারবে যদি গ্রাহকদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বাড়ে। সেটা বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই। গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভর করবে। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্য। সংক্ষেপে বললে, সমাজে আর্থিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি চর্চা না থাকলে বিশেষভাবে ইসলামি ব্যাংকিং ও সাধারণভাবে ইসলামি অর্থনীতি কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আর ইসলামি অর্থনৈতিক চর্চা যত বিস্তৃত ও গভীর হবে, ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং-এর বৃদ্ধি ও টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পাবে। তার মানে এই না যে, ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ না দিয়ে শুধুই গ্রাহকদের ধার্মিকতার ওপর নির্ভর করবে। ক্রমাগত বাজে কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করতে থাকলে গ্রাহকরা ফিরে যাবেন। ইসলাম, ধর্মের নামে কোনো আলস্যের অনুমোদন দেয় না। তাই ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উপযুক্ত সমস্যা ও সমালোচনার ব্যাপারটিকে এর চেয়ে আর জোর দিয়ে বোঝানো সম্ভব না।
(খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র: একটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আর্থিক ও উপকরণগত সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সূচনা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এটি খুব দরকারি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এরকম এক রাষ্ট্রের শক্তি থাকার মানে হলো প্রতিবেশী অর্থনীতির প্রতি কম নির্ভরশীলতা, যেগুলো ইসলামি আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য অনৈসলামিক সমাজের প্রতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, এরকম কোনো ইসলামি অর্থনীতি কল্পনা করাটাও দুষ্কর। বাইরের সাহায্যের ওপর এরকম নির্ভরশীলতা সেই ব্যবস্থাকে বাহ্যিক শক্তির অধীন করে দেয়। ফলে অনৈসলামিক প্রভাবের সামনেও অরক্ষিত হয়ে পড়ে এটি।
(গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মতো রাজনৈতিক কলকব্জার পক্ষ থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতার অনুপস্থিতি: ইসলামি অর্থনীতির প্রতি রাষ্ট্রের ভেতর থেকে শত্রুতার উত্থান হওয়ার কারণ হলো এই দুশ্চিন্তা যে, ইসলামি শক্তিগুলো রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণ বা ক্ষমতা দখল করে ফেলতে চায়। কোনো মুসলিম সংস্থা তাদের এই লক্ষ্য গোপন রাখে না। তাই নিজস্ব ব্যবস্থায় ইসলামি নীতিমালা প্রয়োগ না-করা সরকারগুলো পশ্চিমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইবাদতের বাইরে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ইসলামি ধ্যানধারণার প্রয়োগের বিরোধিতা করে তারা। আন্তর্জাতিক চাপও একই দিক অভিমুখী। তারা মনে করে, প্রতিবেশী কোনো ইসলামি সরকার তাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। সেক্ষেত্রে ইসলামি শাসনের বিরোধিতা করাটাই তাদের মূলধারার আচরণে পরিণত হয়।
(ঘ) সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন ক্ষমতা: প্রশ্নের জটিলতার একটা নতুন মাত্রা এই যে, পৃথিবীতে বিশ্বায়ন ঘটে গেছে এবং এই বিশ্বায়নের ব্যাপকতা দিন দিন বেড়েই চলছে। উল্টোদিকে যাওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। মুসলিমরা অনুভব করেছেন যে, এখন অনিবার্যভাবে সেসকল অর্থব্যবস্থার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করতে হয়, যেগুলোর তারা নিজেরাই বিরোধী। আর এসব অর্থনৈতিক শক্তি যখন বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন ইসলামি অর্থনীতির আদর্শ প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক মুসলিম দেশগুলো একঘরে হয়ে পড়ে। তাই বাহ্যিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শরীয়তের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার যে গুরুত্ব, তার কথা বলাই বাহুল্য।
এরকম আরও নানা সমস্যা দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি অর্থনীতির অগ্রগতি যে-কোনো মানদণ্ডেই বিপুল। মুসলিম বিশেষজ্ঞদের সাথে অমুসলিম বিশেষজ্ঞরাও হাত মিলিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই ময়দানে গবেষণা অব্যাহত রাখার জন্য। ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় অনেক মুসলিম অর্থনীতিবিদ অবদান রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি। পর্যালোচনার ক্ষমতাধারী। কিন্তু কারো একনিষ্ঠতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ নেই যে, নীতিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নতি করার আরও অনেক জায়গা বাকি, যেমনটা চাপরা তার The Futures of Economics-এ দেখিয়েছেন (চাপরা, ২০০০)। কিন্তু মুসলিম অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও চর্চাকারীদের মাঝে একটি সাধারণ ঐক্যমত্য দেখা যায় যে, তারা বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন এবং তারা পরাজিত হওয়ার নন। চাপরার সাথে সুর মেলাতে অনেকেই উদগ্রীব হতে পারেন। তার মতে ইসলামি আর্থিক আন্দোলন বেশ সফল সূচনা করেছে। এটাকে কেউ এখন আর উল্টোদিকে গুটিয়ে দিতে পারবে না (প্রাগুক্ত)। কিন্তু মহান সুফি আল-মুহাসিবি আমাদের যেমনটা বলেছেন, আমাদের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত করে দেওয়া বিষয়গুলো অর্জনে শুধু আশাই যথেষ্ট নয়। হারাকা বা কঠোর পরিশ্রম ও একনিষ্ঠ চেষ্টারও প্রয়োজন। আর ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর সাথে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তাহলে তাদের এখন প্রচুর হারাকাহ করা প্রয়োজন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
“হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের শাস্তিপ্রদান করবেন না।”

টিকাঃ
১. তাদের আলোচনার সাথে সমসাময়িক আলোচনার পার্থক্য এটা নয় যে পূর্ববর্তীগণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা না করে স্বাধীনভাবে জ্ঞানগত সমাধানের দিকে গিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, বর্তমানের আলোচনাগুলো অনেকাংশে অনৈসলামিক চর্চার কোনো বিকল্প উদঘাটন করতে গিয়ে উত্থাপিত হচ্ছে, পূর্ববর্তীদেরগুলো ছিল সরাসরি ও মৌলিকভাবে ইসলামি আইনপ্রণয়ণের প্রচেষ্টা, কোনো বিকল্প উদঘাটনের প্রেরণা থেকে উৎসারিত নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। -সম্পাদক
১. একবিংশ শতাব্দীতে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ইসলামি অর্থনীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন সুদভিত্তিক অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইসলামি ব্যাংকব্যবস্থা গত কয়েক দশকে প্রতি বছরে গড়ে ১০% হারে উন্নতি করেছে এবং সামগ্রিকভাবে এটি এখন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল এক অর্থনীতি। তবে শরীয়তের কাঙ্ক্ষিত প্রয়োগ ও বাস্তব সুদমুক্ত ব্যাংকিং-এর চর্চার পথে এখনো অনেক বাধাবিপত্তি বিদ্যমান। ইসলামি ব্যাংকব্যবস্থা তাই এখনো বাস্তব অর্থে ইসলামি হয়ে উঠতে পারেনি। - সম্পাদক

বিগত দিনের ইসলামি বিশ্ব ছিল বহু অর্জনে পরিপূর্ণ। তখন মুসলিম সরকারগুলো ছিল শক্তিশালী, বাধাবিপত্তি ছিল কম মারাত্মক। এর সাথে আজকের ইসলামি বিশ্বের দুঃখজনক বাস্তবতার তুলনা করলে আমরা পেছন ফিরে দেখার সুযোগ পাই। লাভ করি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব প্রমাণ ও শিক্ষা। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণকে সাবধানতার সঙ্গে ব্যবহার করা চাই। কেননা, ইতিহাসের মাঝে অন্তর্নিহিত বিকৃতি সেই প্রমাণ চয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অতীতের পরিস্থিতি বর্তমানের থেকে আলাদা ছিল। সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বিশেষ কোনোদিকে ঝোঁক তৈরি করে। একটু কম মাত্রায় হলেও সাংস্কৃতিক কাঠামোও একই ভূমিকা রাখে, যদি সেই সংস্কৃতি একই উৎস থেকে পরিপুষ্ট হয়ে থাকে। ইসলাম-ভিত্তিক সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসে শিক্ষণীয় উপাদান রয়েছে বটে। কিন্তু সেটাকে গ্রহণ করতে হলে নিরীক্ষণ-প্রবণ মন এবং অনুসন্ধানী স্বভাব প্রয়োজন। ইসলামি অর্থনীতির ঐতিহাসিক নিরীক্ষা আমাদের বলে যে, একটি কার্যকর কাঠামো ও কর্মক্ষম নমুনা প্রদানের স্বতন্ত্র ক্ষমতা ইসলামি ব্যবস্থার রয়েছে, যদি অন্যান্য জিনিস অপরিবর্তিত থাকে। এই "অন্য জিনিস” গুলো হলো:
➡ (ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা,
➡ (খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র,
➡ (গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বহিঃশক্তি যেন ইসলামের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ আচরণ না করে,
➡ (ঘ) প্রযুক্তিগত এবং সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন-ক্ষমতা।
বর্তমান যেমন অতীতের একটি অবিচ্ছিন্ন শেকলের অংশ, একই প্রক্রিয়ায় এটি ভবিষ্যতের সাথেও নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ তাদের পছন্দের অর্থনীতির জন্য এক উত্তম ভবিষ্যৎ কামনা করেন। তারা সকলেই উপলব্ধি করেছেন যে, সমাধান ও সংকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে আজকের সমস্যাগুলো অধ্যয়ন করলে আগামীর জন্য এক শক্তিশালীতর ইসলামি অর্থনীতির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানকে ভবিষ্যতের সাথে সংযুক্ত করার পথে তিনটি বড় বড় ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলোতে এখন বিশেষভাবে মনোযোগ প্রদান করা উচিত:
➡ প্রথমত, শরীয়তের বিশুদ্ধ উৎস থেকে অর্থনৈতিক ধারণা ও প্রয়োজনবোধে নতুন পরিভাষা চয়নের গুরুত্ব;
➡ দ্বিতীয়ত, ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম, রাষ্ট্রের অর্থায়ন, ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে ইসলামি অর্থনীতির প্রয়োগের ব্যাপারে সাহসী আলোচনা;
➡ তৃতীয়ত, বাস্তবসম্মত প্রমাণ ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণা, যেহেতু এই ময়দানে কাজ হয়েছে খুবই কম।
মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ তাদের ভিত্তিকে সুগঠিত করার এক প্রখর চেষ্টায় নিয়জিত। যাতে ভবিষ্যতে আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এগোনো যায়। প্রচেষ্টা করা হয়েছে এটা দেখাতে যে, (ক) ইসলামি অর্থনীতি পশ্চিমা অর্থনৈতিক ধারণাগুলোর সমতুল্য ইসলামিক সংস্করণকে সংস্থান করতে সক্ষম; অর্থনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” থেকে লেখালেখি দুর্লভ নয়, এবং (খ) কোনো রাষ্ট্র তার অর্থব্যবস্থার ইসলামিকরণ করতে চাইলে ম্যাক্রো লেভেলে তা জনকল্যাণের এক বাস্তবসম্মত বিকল্প।
তবে যত যা-ই হোক, স্বয়ং ইসলাম থেকে উৎসারিত অর্থনৈতিক ধারণা পুনরাবিষ্কারে আরও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আরেকভাবে বললে, ইসলামি উৎসসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, খুলাফায়ে রাশিদীন ও ফকিহগণের মত) থেকে ইসলামি অর্থনীতির পরিচয়কে আরও বেশি আলোকপাত করা প্রয়োজন। যেমন, দর-নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক সমকালীন লেখনীতে কেন আল-হিসবাহ'র কোনো উল্লেখ নেই, সে ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন উইলসন (Wilson, 1998)। সরদার তার Islamic Futures: the Shape of Ideas to Come গ্রন্থে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। সেখানে তার আলোচ্য বিষয়ের মাঝে রয়েছে: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের পুনরুদঘাটন, সমস্যা সমাধানে শরীয়তের মূল্যায়ন, ইসলামি অর্থনীতির আংশিক ও স্বতঃসিদ্ধ রূপ, উন্নয়নের ইসলামি ধারণা ইত্যাদি (সরদার, ১৯৮৫)। ইসলামি গবেষণার ব্যাপারে সরদার একটি স্বাধীন যাচাই পদ্ধতির সমর্থক। এটি হবে অনুকরণ থেকে মুক্ত এবং কুরআন-সুন্নাহ দিয়ে পরিচালিত (প্রাগুক্ত)। স্বচ্ছ ও নতুন ইসলামি চোখ দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করার ক্ষেত্রে তার সাথে একমত হতেই হয়। তার অর্থ এই না যে, পশ্চিমা সাহিত্যে অর্থনীতি বিষয়ে যা রচিত হয়েছে, মুসলিমরা তার সবই ছুঁড়ে ফেলে দিবে। এমনটি করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্ঞান হারিয়ে যাবে। কিন্তু অনুসন্ধিৎস্যু মুসলিম অর্থনীতিবিদদের হয়তো ইসলামি অর্থনীতিকে দেখতে হবে এক "সদ্যোজাত” স্বাধীন জ্ঞানশাস্ত্র হিসেবে। যেটা পশ্চিমা অর্থনৈতিক লেখালেখির সাথে একেবারে সেঁটে থাকতে বাধ্য নয়। যেমন, ইসলামি অর্থনীতি যদি স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব মৌলিক ধ্যানধারণা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে গতানুগতিকভাবে "ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে” অর্থনীতিকে দেখার আর প্রয়োজন নেই। এই "ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে” শব্দগুচ্ছটি বিংশ শতাব্দীর ইসলামি অর্থনৈতিক লেখকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। এই অপরিহার্য তুলনাপ্রবণতা এবং "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” সিনড্রোম থেকে সরে আসা যে কতটা কঠিন, তা এখান থেকেই বোঝা যায়। হাজার হোক, এখন পর্যন্ত এই ময়দানে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া মুসলিম অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ হয় পশ্চিমা-শিক্ষিত অথবা শিক্ষার দিক থেকে পশ্চিম-প্রভাবিত। তাই হয়তো এই তুলনা অপরিহার্যভাবে চলে আসে এবং "ইসলামি দৃষ্টিকোণ” শব্দ দ্বারা আলোচনা করাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এই বিষয়টির গুরুত্ব দুইদিক থেকে:
(ক) কোনো জনসমাজের জন্য আমদানিকৃত বস্তু ভালো জিনিস বটে, কিন্তু আমদানিকৃত ধ্যানধারণা ওই জনসমাজে প্রয়োগযোগ্য না-ও হতে পারে।
➡ (খ) এ ব্যাপারটা নতুন না, আমরা সবাই জানি। কিন্তু ইসলাম যে অর্থনীতি সহ অন্যান্য ব্যাপারে নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে সক্ষম, তার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
ইসলামি অর্থনীতি যদি কেবল পশ্চিমা অর্থনীতির প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়, তাদের ছাড়া নিজস্ব ধারণা তৈরি করতে না পারে, তাহলে ইসলামি অর্থনীতিকে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে দেখার আর কোনো যৌক্তকতা থাকে না। এটি অর্থনীতি বিষয়ের অধীনে স্রেফ একটি উপবিষয় হতে পারে। এমনকি “আদর্শবাদী” অর্থনীতির শিরোনামেও তা হারিয়ে যেতে পারে। মধ্যযুগের মুসলিম লেখকগণ যখন ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লিখেছেন, তারা "আল-কাসব”, “আল-আমওয়াল”, “আল-মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা”, “আয যারীআহ”, ও “রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশে”র পাশাপাশি "খারাজ” ও "হিসবাহ”র মতো বিষয় নিয়েও এসেছেন। তারা এখানে কোনো ইসলামি “দৃষ্টিকোণ” টেনে আনার প্রয়োজন বোধ করেননি।[১] এটা সত্যি যে, এখনকার লেখালেখির ক্ষেত্র অতীতের চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের জন্য এই ইসলামি লেখাগুলো একটিই কেন্দ্রীয় শিরোনামের অধীনে চলে আসতে পারে-ইসলামি অর্থনীতি।
ইসলামি অর্থনৈতিক আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার দিকটিতে আসা যাক। বেশ কিছুকাল ধরে এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে ইসলামি ব্যাংক। মিশরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ও পাকিস্তানে ছোট্ট সঞ্চয়ী ব্যাংকের রূপ ধরে এর সূচনা ঘটেছিল ১৯৬০ এর শুরুর দিকে। বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইসলামি ব্যাংক হয়ে উঠেছে ব্যাংকিং খাতের এক বড় অংশীদার। আজ এর অধীনে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ২০০ ব্যাংক, যার মোট সম্পদ ৩০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। মোট পুঁজি ৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ও মোট জমা ১৭০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। যে-কোনো মানদণ্ডেই এ এক বিশাল অর্জন। কিন্তু সমস্যা রয়েই গেছে। ইসলামি অর্থায়নের আরও অনেক সুসংলগ্ন ভিত্তি অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে এই সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ তোলা লাগবে। এগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়নি অবশ্য। ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ এ সমস্যাগুলোর পর্যালোচনায় মগ্ন আছেন। এর উদ্দেশ্য হলো সমালোচনাগুলোর উত্তর প্রদান করা অথবা সেগুলো সমাধানের সত্যিকারের উপায় অন্বেষণ করা। কিছু সমস্যা নিম্নে তুলে ধরা হলো (এ সমস্যাগুলোর বিস্তারিত আলোচনার জন্য উদাহরণস্বরূপ দেখুন Future of Economics, Chapra 2000)।
➡ ১. ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক প্রদত্ত সেবার গুণগতমান প্রমিতকরণের (standardisation) অভাব। এটি মূলত কোনো কেন্দ্রীয় শরীয়াহ ব্যাংক না থাকার ফল—যা থেকে সকল ইসলামি ব্যাংকগুলো পরামর্শ ও ধর্মীয় নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারত (চাপরা, ২০০০)।
এ থেকে অনুরূপ আরেকটি পরিস্থিতির কথা মাথায় চলে আসে। যদি কখনো পরিস্থিতি এমন হয় যে, কোনো স্ট্যান্ডার্ড হিসাবপদ্ধতি নেই, তখন হিসাববিজ্ঞানের বিষয়গুলো সমাধান করা হয় সাধারণ রীতি অনুযায়ী। সাধারণভাবে গৃহীত হিসাব নীতিমালার (Generally Acceptable Accounting Principles-GAAP) আলোকে। উভয় পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাগুলো সহজেই তুলনা করে দেখা যায়। যেমন চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ফ্রান্সে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড হিসাবব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্যের নন-স্ট্যান্ডার্ড হিসাবব্যবস্থা। যুক্তরাজ্যে কেবলমাত্র হিসাব-নিরীক্ষণ বোর্ড প্রতিষ্ঠার পরেই সামঞ্জস্য তৈরি করা গেছে।
তাই ইসলামি ব্যাংকগুলোর উচিত ছিল নিজস্ব শরীয়াহ-নিরীক্ষণ বোর্ড রাখা। কিংবা বোর্ড গঠনের তুলনায় আকারে ছোট হলে অন্তত শরীয়াহ উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া। এতে শরীয়তের নিয়মনীতি মেনে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ইসলামি ব্যাংকগুলো সহায়তা পাবে। সেইসাথে শেয়ারহোল্ডার-সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আশ্বস্ত করা যেত যে, ব্যাংকের কার্যক্রমে শরীয়তের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।
সমস্যা হলো এতে পশ্চিমাভিত্তিক ব্যাংকগুলোর যতটা খরচ হবে, ইসলামি ব্যাংকের খরচ তার চেয়ে বেড়ে যায়। যেহেতু তারা একই আর্থিক পরিবেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর অনুরূপ ক্ষতি না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইসলামি ব্যাংকগুলো অসুবিধাজনক অবস্থানে পড়ে যাবে। ইসলামি ব্যাংকের এই খরচ নিরোধ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ড প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও জামানত প্রদান করা হবে। এই কেন্দ্রীয় বোর্ডের খরচ সাধারণভাবে সব ইসলামি ব্যাংককে ভাগ করে দেওয়া হবে। এর ফলে প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা আলাদা বোর্ড রাখার খরচ কমে যাবে। OIC-কে দেখা গেছে ফিক্হ অ্যাকাডেমি এবং International Association of Islamic Banks (IAIB)-এর উদ্যোগ নিতে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত শরীয়াহ কমিশন প্রতিষ্ঠিত করে কেন্দ্রীয়ভাবে পরামর্শ প্রদান করা হয়। তারপরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে হয়তো বেশ কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে (প্রাগুক্ত)।
২. ইসলামি ব্যাংকগুলো এমন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে ইসলামি ও পশ্চিমা উভয় ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে ইসলামি ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যেগুলো মূলত পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংকগুলোর সাথে মানানসই করে তৈরি করা হয়েছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ব্যাংক ডিপোজিটের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবিকৃত রিজার্ভ অনুপাত। ইসলামি ব্যাংকে টাকা জমাকারীগণ লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে কার্যক্রম চলছে বলে জানেন। তাই টাকা জমা করেন পুরোটাই বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ইসলামি ব্যাংককে এই জমার একটা অংশ রাখতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের জন্য। ফলে জমার এই অংশের লভ্যাংশ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফার হার যদি সুদের হারের চেয়ে উচ্চ হয়ে থাকে, তাহলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার খরচ পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেড়ে যেতে পারে। ইসলামি ব্যাংকের উচ্চতর ঝুঁকির কারণে বাস্তবে এমনটাই হয়ে থাকে। বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফার হার আসলেই সুদের হারের চেয়ে বেশি। খরচ আরও বেড়ে যাবে, যদি ঝুঁকি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের অনুপাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
৩. ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রম তৃতীয় যে বড় সমস্যাটির মুখোমুখি হয়ে থাকে, তা হলো তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় আকারে খুবই ছোট। যেমন, একটি পশ্চিমা বহুজাতিক ব্যাংকের সম্পদ সকল ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সমষ্টির চেয়ে অনেক বেশি (চাপরা, ২০০০)। এতে প্রতিযোগিতা বেশ কঠিন হয়ে যায়। বিশেষত যখন উভয় ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দেশে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়। যে-কোনো আর্থিক বিপদের ক্ষেত্রে ছোট ব্যাংকটি আগে বাজার থেকে ছিটকে পড়বে।[১]
তবে খুব সম্ভবত ইসলামি ব্যাংকগুলোকে এ নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই, তা তারা যত ছোটই হোক না কেন। তারা গ্রাহকদের সাথে ভালো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হতে পারে। ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির ব্যবসার জন্য এটা খুবই উপকারী। ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি তাদের কর্মীদের জন্য ইন-হাউজ দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য আর্থিক ও শিল্পগত তথ্য, ও ভালো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে বিশেষায়িত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তারা বৃহত্তর ব্যাংকগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে না পারলেও তাদের সাথে অন্তত প্রতিযোগিতা করতে পারবে। আরেকভাবে বললে, ইসলামি ব্যাংকগুলো বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বিশেষ বিশেষ পণ্য সরবরাহ এবং বিশেষ বিশেষ বাজারে মনোনিবেশ করতে পারে। ইসলামি ব্যাংকিং তত্ত্বে এটি ইসলামি ব্যাংকের কার্যক্রমের ব্যাপারে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা। কিন্তু এই পর্যায়ে এই ধরনের সেবা প্রদানে সমর্থ হতে হলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন সুপ্রশিক্ষিত কর্মী ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য। একবিংশ শতাব্দীতে হয়তো ইসলামি ব্যাংকিং-এ এই বিশেষ বিষয়টির দেখা মিলবে।
৪. মুরাবাহা ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে অন্তত আংশিকভাবে হলেও হয়তো সরে আসা প্রয়োজন। অধিকতর মনোনিবেশ করতে হবে অন্য ধরনের বিনিয়োগ অর্থায়নে-মুদারাবা ও মুশারাকা। তা ছাড়া বাণিজ্যিক অর্থায়নে LIBOR মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীলতা হয়তো ইসলামি ব্যাংকের অর্থায়নের প্রকৃতির ব্যাপারে এক ধরনের সন্দেহের অনুভূতিও জাগাচ্ছে। LIBOR ও এর অনুরূপ হারের ওপর নির্ভর করাটা হয়তো ব্যাংকগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত। কিন্তু এ এক জটিলতর সমস্যার সমাধান হিসেবে কাজ করলেও ব্যাংকের সেবাগ্রহাকদের মনে ইসলামিকরণের ধারণা তৈরিতে সহায়ক নয়। হোক তারা জমাকারী কিংবা অর্থায়নের ব্যবহারকারী।
একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামি ব্যাংকগুলোকে হয়তো এমন হার থেকে সরে আসতে শুরু করা প্রয়োজন, যেগুলো পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে বেশি সাজুয্যপূর্ণ, লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগি নীতিধারণকারী ইসলামি উদ্যোগের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। সূচকের ব্যবহার উদঘাটন করার জন্য হয়তো আরও গবেষণা প্রয়োজন। যেমন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থায়নের প্রকৃতি পরিবর্তনের সাথে সহজে ও গতিশীলভাবে প্রয়োগযোগ্য একটি মুনাফা সূচক।
আসন্ন বছরগুলোতে ইসলামি অর্থনীতি কি টিকে থাকবে? আলোচকদের মাঝে কে আছেন, তার ভিত্তিতে হয়তো এই প্রশ্নের বৈচিত্র্যময় উত্তর উঠে আসতে পারে। কোনো ঐক্যমত্যপূর্ণ উত্তর হয়তো আসবে না। তা প্রত্যাশিতও না। কারণ এই বিষয়ের ওপর মতভিন্নতা একেবারেই দৃশ্যমান। মতভেদের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। উত্তরটি হয়তো কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
➡ (ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা,
➡ (খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র,
➡ গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মতো রাজনৈতিক কলকব্জার পক্ষ থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতার অনুপস্থিতি,
➡ (ঘ) প্রযুক্তিগত-সহ সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন ক্ষমতা-ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রচনায় বেশ প্রভাব ফেলবে।
(ক) ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা: অন্য যে-কোনো দর্শনের মতো অর্থনৈতিক দর্শনও সমৃদ্ধ হয় সেগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের জোরে। বিশেষত সে ব্যবস্থা যদি নৈতিক মূল্যবোধ হয়ে থাকে এবং ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর গড়ে উঠে থাকে, তাহলে এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। এসব মূল্যবোধ থেকে যত সরে যাওয়া হবে, ততই সেগুলোর ওপর ব্যবস্থাটির নির্ভরতা কমে যাবে। ততই ধ্যানধারণাগুলোর প্রয়োগ দুর্বলতর হয়ে পড়বে। ইসলামি অর্থব্যবস্থার সমৃদ্ধি তো বটেই, টিকে থাকার জন্যই এর মুসলিমদের সমর্থন দরকার হবে। আর তা আসবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামি রীতিনীতির প্রতি তাদের আনুগত্য থেকে। যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ইসলামি ও পশ্চিমা ধাঁচের ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ইসলামি ব্যাংকগুলো টিকে থাকতে পারবে যদি গ্রাহকদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বাড়ে। সেটা বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই। গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভর করবে। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ইসলামি রীতি ও আদর্শের প্রতি আনুগত্য। সংক্ষেপে বললে, সমাজে আর্থিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি চর্চা না থাকলে বিশেষভাবে ইসলামি ব্যাংকিং ও সাধারণভাবে ইসলামি অর্থনীতি কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আর ইসলামি অর্থনৈতিক চর্চা যত বিস্তৃত ও গভীর হবে, ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং-এর বৃদ্ধি ও টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পাবে। তার মানে এই না যে, ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ না দিয়ে শুধুই গ্রাহকদের ধার্মিকতার ওপর নির্ভর করবে। ক্রমাগত বাজে কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করতে থাকলে গ্রাহকরা ফিরে যাবেন। ইসলাম, ধর্মের নামে কোনো আলস্যের অনুমোদন দেয় না। তাই ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উপযুক্ত সমস্যা ও সমালোচনার ব্যাপারটিকে এর চেয়ে আর জোর দিয়ে বোঝানো সম্ভব না।
(খ) রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র: একটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আর্থিক ও উপকরণগত সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সূচনা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এটি খুব দরকারি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এরকম এক রাষ্ট্রের শক্তি থাকার মানে হলো প্রতিবেশী অর্থনীতির প্রতি কম নির্ভরশীলতা, যেগুলো ইসলামি আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য অনৈসলামিক সমাজের প্রতি ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, এরকম কোনো ইসলামি অর্থনীতি কল্পনা করাটাও দুষ্কর। বাইরের সাহায্যের ওপর এরকম নির্ভরশীলতা সেই ব্যবস্থাকে বাহ্যিক শক্তির অধীন করে দেয়। ফলে অনৈসলামিক প্রভাবের সামনেও অরক্ষিত হয়ে পড়ে এটি।
(গ) অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় সরকার এবং বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মতো রাজনৈতিক কলকব্জার পক্ষ থেকে ইসলামের প্রতি শত্রুতার অনুপস্থিতি: ইসলামি অর্থনীতির প্রতি রাষ্ট্রের ভেতর থেকে শত্রুতার উত্থান হওয়ার কারণ হলো এই দুশ্চিন্তা যে, ইসলামি শক্তিগুলো রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণ বা ক্ষমতা দখল করে ফেলতে চায়। কোনো মুসলিম সংস্থা তাদের এই লক্ষ্য গোপন রাখে না। তাই নিজস্ব ব্যবস্থায় ইসলামি নীতিমালা প্রয়োগ না-করা সরকারগুলো পশ্চিমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইবাদতের বাইরে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ইসলামি ধ্যানধারণার প্রয়োগের বিরোধিতা করে তারা। আন্তর্জাতিক চাপও একই দিক অভিমুখী। তারা মনে করে, প্রতিবেশী কোনো ইসলামি সরকার তাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। সেক্ষেত্রে ইসলামি শাসনের বিরোধিতা করাটাই তাদের মূলধারার আচরণে পরিণত হয়।
(ঘ) সমাজের যে-কোনো রকম পরিবর্তনের সাথে ইসলামের অভিযোজন ক্ষমতা: প্রশ্নের জটিলতার একটা নতুন মাত্রা এই যে, পৃথিবীতে বিশ্বায়ন ঘটে গেছে এবং এই বিশ্বায়নের ব্যাপকতা দিন দিন বেড়েই চলছে। উল্টোদিকে যাওয়ার কোনো নামগন্ধ নেই। মুসলিমরা অনুভব করেছেন যে, এখন অনিবার্যভাবে সেসকল অর্থব্যবস্থার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করতে হয়, যেগুলোর তারা নিজেরাই বিরোধী। আর এসব অর্থনৈতিক শক্তি যখন বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন ইসলামি অর্থনীতির আদর্শ প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক মুসলিম দেশগুলো একঘরে হয়ে পড়ে। তাই বাহ্যিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শরীয়তের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার যে গুরুত্ব, তার কথা বলাই বাহুল্য।
এরকম আরও নানা সমস্যা দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামি অর্থনীতির অগ্রগতি যে-কোনো মানদণ্ডেই বিপুল। মুসলিম বিশেষজ্ঞদের সাথে অমুসলিম বিশেষজ্ঞরাও হাত মিলিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই ময়দানে গবেষণা অব্যাহত রাখার জন্য। ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় অনেক মুসলিম অর্থনীতিবিদ অবদান রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি। পর্যালোচনার ক্ষমতাধারী। কিন্তু কারো একনিষ্ঠতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ নেই যে, নীতিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নতি করার আরও অনেক জায়গা বাকি, যেমনটা চাপরা তার The Futures of Economics-এ দেখিয়েছেন (চাপরা, ২০০০)। কিন্তু মুসলিম অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও চর্চাকারীদের মাঝে একটি সাধারণ ঐক্যমত্য দেখা যায় যে, তারা বহু পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন এবং তারা পরাজিত হওয়ার নন। চাপরার সাথে সুর মেলাতে অনেকেই উদগ্রীব হতে পারেন। তার মতে ইসলামি আর্থিক আন্দোলন বেশ সফল সূচনা করেছে। এটাকে কেউ এখন আর উল্টোদিকে গুটিয়ে দিতে পারবে না (প্রাগুক্ত)। কিন্তু মহান সুফি আল-মুহাসিবি আমাদের যেমনটা বলেছেন, আমাদের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত করে দেওয়া বিষয়গুলো অর্জনে শুধু আশাই যথেষ্ট নয়। হারাকা বা কঠোর পরিশ্রম ও একনিষ্ঠ চেষ্টারও প্রয়োজন। আর ইসলামি ব্যাংকগুলো যদি পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর সাথে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তাহলে তাদের এখন প্রচুর হারাকাহ করা প্রয়োজন। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
“হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের শাস্তিপ্রদান করবেন না।”

টিকাঃ
১. তাদের আলোচনার সাথে সমসাময়িক আলোচনার পার্থক্য এটা নয় যে পূর্ববর্তীগণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা না করে স্বাধীনভাবে জ্ঞানগত সমাধানের দিকে গিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, বর্তমানের আলোচনাগুলো অনেকাংশে অনৈসলামিক চর্চার কোনো বিকল্প উদঘাটন করতে গিয়ে উত্থাপিত হচ্ছে, পূর্ববর্তীদেরগুলো ছিল সরাসরি ও মৌলিকভাবে ইসলামি আইনপ্রণয়ণের প্রচেষ্টা, কোনো বিকল্প উদঘাটনের প্রেরণা থেকে উৎসারিত নয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। -সম্পাদক
১. একবিংশ শতাব্দীতে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ইসলামি অর্থনীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন সুদভিত্তিক অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইসলামি ব্যাংকব্যবস্থা গত কয়েক দশকে প্রতি বছরে গড়ে ১০% হারে উন্নতি করেছে এবং সামগ্রিকভাবে এটি এখন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল এক অর্থনীতি। তবে শরীয়তের কাঙ্ক্ষিত প্রয়োগ ও বাস্তব সুদমুক্ত ব্যাংকিং-এর চর্চার পথে এখনো অনেক বাধাবিপত্তি বিদ্যমান। ইসলামি ব্যাংকব্যবস্থা তাই এখনো বাস্তব অর্থে ইসলামি হয়ে উঠতে পারেনি। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 পরিভাষা

📄 পরিভাষা


আল্ল: ন্যায়বিচার, আদালাহ ইজতিমা'ইয়্যা: সামাজিক ন্যায়বিচার। সামাজিক ন্যায়বিচার ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় মূলনীতি।
আমানাহ (ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ): দায়িত্ব, নিজের কর্মের ভার, মতান্তরে হিদায়াত গ্রহণের স্বভাবজাত ক্ষমতা। মানুষের ব্যাপারে আল-কুরআন বলে, "আমি তো আসমান, জমিন ও পর্বতমালার কাছে এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং শঙ্কিত হলো। কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করে নিল”, (কুরআন, ৩৩: ৭২), এবং "আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুই চোখ? আর জিহ্বা ও ঠোঁট? আর আমি তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি।” (কুরআন, ৯০: ৮-১০)
আমানাহ (অর্থনৈতিক অর্থ): কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিরাপত্তার জন্য গচ্ছিত রাখা টাকা বা অন্য কোনো সম্পদ।
আহলুর রায়: ধর্মীয় চিন্তার একটি ধারা। নবি -এর যুগে যে বিষয়টির অস্তিত্ব ছিল না বা থাকলেও স্বল্প মাত্রায় ছিল, সেসব ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে তারা ফকিহ'র মতামতের ওপর নির্ভর করেন। তারাও কুরআন-সুন্নাহকে বিধান আহরণের প্রধান ক্ষেত্র বিবেচনা করেন। কিন্তু যেসব সমাধান কুরআন-সুন্নাহে প্রত্যক্ষভাবে নেই, সেগুলো উদঘাটনের জন্য রায় তথা কিয়াসের ওপর নির্ভর করেন। এটি ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল।
আহলুল হাদিস: ধর্মীয় চিন্তার একটি ধারা, যারা ফাতওয়া প্রদানের সময় ইস্তিহসান বা কিয়াস থেকে দূরে থাকতেন। নবসৃষ্ট সমস্যার সমাধানে কিয়াসের ব্যবহারকে অপছন্দ করতেন। হাদীসের চর্চাকে অগ্রাধিকার দিতেন।[১]
আহাদিস (একবচন হাদিস): নবি মুহাম্মাদ -এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি। বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক সূত্রের মাধ্যমে এগুলো প্রাপ্ত। সূত্রের এই প্রক্রিয়া ইসনাদ (সনদ) নামে পরিচিত। প্রত্যেক বর্ণনাকারী পূর্বতন একজন বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ-পূর্বক তার কাছ থেকে শুনেছেন বলে বর্ণনা করেন। এভাবে করে বর্ণনাকারীদের ধারাটি এমন একজন বর্ণনাকারীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়, যিনি স্বয়ং নবি -কে সেটা বলতে শুনেছেন বা করতে দেখেছেন।
ইজতিহাদ: সমসাময়িক কোনো পরিস্থিতি, যার অনুরূপ অতীতে ছিল না বা একই মাত্রায় ছিল না, সে ব্যাপারে ধর্মীয় বিধান নির্ণয়ের জন্য কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান, ইস্তিসলাহ ও উরফের সাহায্যে স্বাধীন যুক্তিবুদ্ধি সহকারে সিদ্ধান্তে আসা। ইজতিহাদের জন্য ফকিহকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পারঙ্গম হতে হয়।
ইজমা': সাধারণ ঐক্যমত্য। ফকিহদের মাঝে কোনো মাসআলা বা ফাতওয়ার ব্যাপারে একাত্মতা।
ইজারাহ: লিজ দেওয়া/ভাড়া দেওয়া। এখানে উপকার বিক্রয় হয়। একজন লিজদাতা (মালিক) তার সম্পদ বা উপকরণ কারো কাছে লিজ দেয়। ভাড়ার একটি পরিমাণ ও লিজের সময়সীমা আকদ (চুক্তি)-এর সময়েই নির্ধারিত করা হয়। লিজ দেওয়া জিনিসের মালিকানা লিজদাতার হাতেই থাকে।
ইজারাহ সুম্মা বাই': প্রথমে লিজ দিয়ে পরে পুরোপুরি বিক্রি করা। ইজারাহ'র চুক্তি এমনভাবে করা হয় যে, সম্পদটির মালিকানা পরবর্তীতে ইজারাহ-গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত করে দেওয়াই উদ্দেশ্য। ইজারাহ'র সময়সীমা শেষ হওয়ার পর একটি পূর্বনির্ধারিত লেনদেন ও মূল্যে বিক্রয় নথিবদ্ধ করা হয়। [১]
ই'তিদাল (ওয়াসাত): ভারসাম্য রাখা, ঝুঁকে না পড়া; ওয়াসাত মানে মধ্যমপন্থা। ইসলামের স্বীকৃত মূলনীতি। মধ্যমপন্থা নীতির দাবি এই যে, অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বা অন্য কোনো মানবীয় আচরণ মধ্যমপন্থা অনুযায়ী করতে হবে। অযাচিত বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। প্রান্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়া যাবে না। যেমন, "নিজের হাতকে গলার সাথেও বেঁধে রেখো না (কৃপণতা) আবার সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না (অপব্যয়), নয়তো তুমি নিঃস্ব ও তিরস্কৃত হয়ে পড়বে।” (কুরআন, ১৭:২৯)।
ইত্তিফাক যিমনি: প্রচ্ছন্ন সমঝোতা। যে-কোনো চুক্তির অভ্যন্তরীণ এমন কোনো বিষয়, যেটা উহ্য হলেও উভয় পক্ষের নিকট স্বীকৃত। তারই ভিত্তিতে অন্য কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। যেমন, নিলামের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগেই এই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে যে, দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া ক্রমশ (বাই' আল-মুযাইয়াদাহ) চলতে পারে।
ইবরা': ঋণ কমিয়ে দেওয়া বা মওকুফ করা।
ইসরাফ: উপযুক্ত কারণ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে সম্পদ ব্যবহার করা, যা অপছন্দনীয়। কারণ মুসলিমদের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে খরচ করা উচিত, দ্রষ্টব্য- ই'তিদাল।
ইসলাম: অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ধর্ম হিসেবে ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি: ১. এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল, ২. দিনে পাঁচবার ওয়াক্ত-মাফিক প্রার্থনা তথা সালাত, ৩. আদিষ্ট সম্পদ দান করা তথা যাকাত, ৪. রমাজান মাসে রোজা পালন করা তথা সাওম, এবং ৫. সামর্থ্যবানদের নির্ধারিত ইবাদত-যাত্রা তথা হজ।
ইস্তিসনা': উৎপাদনের আদেশ। কোনো সম্পদ উৎপাদন করে ভবিষ্যতে ক্রেতার কাছে সরবরাহ করার ব্যাপারে চুক্তি। আরেকভাবে বললে, ক্রেতা তার বিক্রেতা বা চুক্তিকারীকে এমন কোনো সম্পদ সরবরাহ বা নির্মাণ করার আদেশ দেবেন, যার নির্মাণকাজ চুক্তিতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভবিষ্যতে শেষ হবে। উভয়পক্ষ দামের বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিবে। দ্রষ্টব্য বাই' আস-সালাম।
ইস্তিসলাহ: জনস্বার্থ। সম্পূর্ণ নবউদ্ভূত বা আগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনস্বার্থ বিবেচনায় এনে নতুন কোনো ফাতওয়া প্রদান করা।
ইস্তিহসান: সাধারণভাবে গৃহীত কোনো যুক্তির চেয়ে বিশেষ সূক্ষ্ম কারণে অন্য যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া।
উজরাহ: মজুরি। সেবা ব্যবহার করার আর্থিক প্রতিদান। বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষিতে এটা হতে পারে বেতন, মজুরি, ভাতা, কমিশন ইত্যাদি।
উম্মাহ: মুসলিম জনগোষ্ঠী।
'উফ: প্রথা, প্রচলন ও রীতিনীতি। ইজতিহাদের একটি ভিত্তি। অভূতপূর্ব কোনো পরিস্থিতিতে ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে আমলে নেওয়া।
'উরবুন: ডাউন পেমেন্ট। পণ্য বা সেবার জন্য অগ্রিম পরিশোধ করা মূল্য হিসেবে জমা রাখা অর্থ, যা লেনদেন বাতিল হয়ে গেলে তুলে নেওয়া হবে। তুলে নেওয়া অর্থ হিবাহ (উপহার) হিসেবে বিবেচিত হয়।
উলামা' (একবচনে আলিম): ইসলামি ফিক্‌হ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি।
উত্তর কর ও উশর (একবচন উন্ন): উশর বলা হয় এক-দশমাংশকে। জমির উৎপন্ন ফসল থেকে এক-দশমাংশ যাকাত প্রদান করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই যাকাতের হার পরিবর্তিত হয়। একেই ফসলের যাকাত বলা হয়। আর উত্তর হলো শুষ্ক মাশুল। এই কর প্রবর্তন করেন খলিফা উমর। মুসলিম বণিকরা বিদেশি রাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম করার কারণে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের থেকে যে কর পরিশোধ করত, তার পাল্টা কর এটি। এই করের হার এক-দশমাংশ বা “উশর”, যার বহুবচন "উত্তর"।
ওয়াকালাহ: উকালতি। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে এমন প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতা প্রদান করা, যে কিনা প্রথমজন জীবিত থাকাকালীন তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সংশ্লিষ্ট কাজটি করবে।
ওয়াদিয়াহ ইয়াদ-যামানাহ: হাতে থাকার নিশ্চয়তা। মালিক নয়, এমন কারো কাছে নিরাপত্তার জন্য জমা রাখা পণ্য বা অর্থ। ওয়াদিয়াহ যেহেতু একটি আমানত, তাই জমা নেওয়া ব্যক্তিটি নিশ্চয়তা প্রদানকারী বলে গণ্য হবে। তাই যখন আমানতকারী দাবি করবে, তখন সেই পুরো পরিমাণটি ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা তাকে দিতে হবে। নিরাপত্তাদাতা আমানতকারীকে লভ্যাংশের কোনো অংশ দিতে বাধ্য হবে না।
কব্য: নগদ টাকা বা চুক্তির বস্তুটি গ্রহণ করা। কব্য অর্থ নিজের দায়িত্বের আওতায় আনা, যা দিয়ে বিনিময়ের চুক্তি বোঝানো হয়। সাধারণত কব্য গৃহীত হওয়া/ না-হওয়া নির্ভর করে স্থানীয় সমাজের 'উরফ বা প্রচলিত রীতিনীতির ওপর। পণ্য কার আওতায় রয়েছে বিবেচিত হবে, তার স্বীকৃতি দেওয়া হয় সেখানকার 'উরফ অনুযায়ী।
কাতাঈ (একবচনে কাতি'আ): কোনো যোগ্যতা বা অবদানের পুরস্কারস্বরূপ প্রদত্ত জমি। উমাইয়্যা ও বিশেষত আব্বাসি খিলাফাত আমলে এসব জমির আকৃতি বাড়তে থাকে এবং কৃষি কর্মকাণ্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে, একে শাব্দিক অর্থে জায়গির বলা যায়।
কাতাবান: ইসলামি-পূর্ব দক্ষিণ আরবের চার রাজ্যের একটি, যার উত্থান সাবা' ও মা'ইনের পর হয়েছিল। এই রাজ্য প্রায় ৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৫০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সাবাই ও মাইনীয় রাজ্যদ্বয়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেলেও মশলা-বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
কাফালাহ: নিশ্চয়তা। যামানের কাছাকাছি অর্থ।
কাবুদ হাসান (করযে হাসানাহ): কল্যণকর ঋণ। সামাজিক কল্যাণ বা ঋণগ্রহীতার কোনো স্বল্পমেয়াদী প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের মাঝে ঋণের চুক্তি। এই ঋণ সুদমুক্ত। যে পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে, ঠিক ততটুকুই ফেরত দিতে হবে। তবে চুক্তিতে উল্লেখ না-থাকা সাপেক্ষে ঋণগ্রহীতা তার ইচ্ছে-মাফিক ঋণদাতাকে বেশি পরিমাণ ফেরত দিতে পারবে।
কিন্দি: এদের উদ্ভব দক্ষিণ আরব থেকে। কিন্দি রাজ্যের স্থায়িত্ব ছিল ৪৮০ থেকে ৫২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। সর্বোচ্চ অবস্থায় থাকাকালীন কিন্দি রাজ্যের বিস্তৃতি ফুরাত নদী পর্যন্ত ছিল। পারস্য সম্রাটের মৃত্যুর পর কিন্দি রাজা ৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রভাব লাখমি রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। লাখমি রাজাকে পরাজিত করে রাজপরিবারের অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেন। ইসলাম গ্রহণের পর কিন্দিরা সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের অসামান্য খেদমত করে। তাদের কাউকে কাউকে প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। কতিপয় কিন্দি প্রসিদ্ধ ইসলামি চিন্তাবিদেও পরিণত হন। যেমন ইয়াকুব ইবনু ইসহাক আল-কিন্দি "আরবদের দার্শনিক" উপাধি লাভ করেন।
কিয়াস: সাদৃশ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। তুলনার মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্তে আসা। অধুনা সৃষ্ট কোনো সমস্যার বিধান নির্ণয় করা হয় অনুরূপ বা শর্ত-পরিস্থিতির দিক দিয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ পূর্বতন কোনো সমস্যার বিধান থেকে। ইস্তিহসান বা ইস্তিসলাহ বিবেচনায় পূর্বতন ফাতওয়ার পরিবর্তন করা এখানে বৈধ হতেও পারে।
খারাজ: ভূমিকর। বিজিত ভূমি মুসলিম সেনাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার নিয়ম পাল্টে খলিফা উমর খারাজ কর প্রবর্তিত করেন। কুরআন ও সুন্নাহর নির্ধারিত করগুলোর বাইরে এই করটিকে তিনি ইসলামি করব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করেন। করটি ভূমির ওপর আরোপিত হতো, ব্যক্তির ওপর নয়। করের ভিত্তি হলো চাষযোগ্য জমি এবং তার সাথে সমানুপাতিক করের হার।
খিলাফত: ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এটি দিয়ে বোঝানো হয় আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এর অর্থ: নবি -এর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হস্তান্তর। আল-কুরআন বলে, "তোমার প্রতিপালক যখন ফেরেশতাদের বললেন, 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি (খলিফা) সৃষ্টি করতে চলেছি”, (কুরআন, ২: ৩০)। "তিনিই তোমাদের পৃথিবীতে খুলাফা বানিয়েছেন”, (কুরআন, ৩৫: ৩৯)। "আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তিনি তোমাদের যা কিছুতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন, তা থেকে দান করো", (কুরআন, ৫৭: ৭)।
খিয়ানত: বিশ্বাসঘাতকতা। সত্য গোপন করা বা গোপনে চুক্তি ভঙ্গ করা বোঝানো হয়। শারীয়তে এটি নিষিদ্ধ।
গনিমত: ফাই' ও আনফাল থেকে পারিভাষিকভাবে আলাদা এমন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যেগুলো সত্যিকারের সামরিক সংঘর্ষ বা অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। গনিমত শুধুমাত্র অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের প্রাপ্য। কারণ তারা এতে তাদের দক্ষতা ও প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়েছে, এবং যুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছে। রাষ্ট্র গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ পাবে।
গারার: ধোঁকা। তথ্য লুকানোর কারণে বা সামগ্রিক কারণে কোনো লেনদেন ধোঁকাপূর্ণ হতে পারে। গারার অজ্ঞতার এমন এক উপাদান, যার কারণ হতে পারে পণ্যের বা মূল্যের ব্যাপারে অজ্ঞতা। অথবা পণ্যের ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনা। এতে লেনদেনের কোনো জরুরি উপাদানের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে এক বা উভয় পক্ষ প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনায় থাকে। গারার তিন প্রকার: ১. গারার ফাহিশ (মাত্রাতিরিক্ত), যাতে লেনদেন দূষিত হয়ে যায়; ২. গারার ইয়াসির (স্বল্প), যা সহনীয়; এবং ৩. গারার মুতাওয়াসসিত (মধ্যম), যা পূর্বের দুই শ্রেণীর মাঝামাঝি। মাত্রাতিরিক্ত গারারের কারণে যেকোনো লেনদেন হারাম হয়ে যেতে পারে।
গাসসানি: মা'রিব বাধ ধ্বংসের পর তৃতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে দক্ষিণ আরব থেকে স্থানান্তরিত একটি গোত্র থেকে গাসসানিদের উদ্ভব। তারা দামিশকের দক্ষিণ-পূর্বে দক্ষিণ-থেকে-উত্তরের বাণিজ্যিক পথে থিতু হয়। খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়া গাসসানিদের দুটি ভাষা ছিল-আরামায়িক ও আরবি। তারা ছিল বাইজেন্টাইনদের মিত্র ও সুবিধাভোগী। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং এর সীমান্তে বেদুইনদের চোরাগুপ্তা হামলার বাফার অঞ্চল হিসেবে কাজ করত তারা। ইসলামি বিজয়ের সময়ে গাসসানিরা ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের পাশে থেকে যুদ্ধ করে। পরে গাসসানি রাজা ইসলাম গ্রহণ করে আবার মুরতাদ হয়ে যান। বিবাদ বেধে যাওয়ার ফলে দ্বিতীয় খলিফা যখন তাকে বেদুইন অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে উদ্যত হন, তখন এই রাজা পালিয়ে যান কন্সটান্টিনোপলে।
জাহিলিয়াত: অজ্ঞতার যুগ। আরব উপদ্বীপের ইসলাম-পূর্ব যুগ। ইসলাম-পূর্ব আরবে কিছু কিছু অংশে সভ্যতার বিস্তার ছিল। তবুও ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার যে সামগ্রিক অবস্থা বিরাজমান ছিল, তার প্রেক্ষিতে একে জাহিলি যুগ বলা হয়েছে।
জু'আলাহ: কমিশন। পুরস্কারের চুক্তি; কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করার জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একপাক্ষিক চুক্তি।
জিযিয়া: সামরিক নিরাপত্তার বিনিময়ে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রদেয় সাধারণ কর।
তাওহীদ: আসমানি একত্ববাদ। একক ও অদ্বিতীয় উপাস্যে বিশ্বাস।
তা'ওয়িয: আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান। চুক্তিকারী পক্ষগুলোর মাঝে সম্মতিপ্রাপ্ত একটি জরিমানার পরিমাণ। ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় বা দেরি করে, তাহলে ঋণদাতা এই ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার রাখে।
তাকাফুল: পারস্পরিক বীমা। এটি তা'আউন বা পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিভিত্তিক এক ধরনের ইসলামি বীমা। এটি সম্পদ ও সম্পত্তির পারস্পরিক নিরাপত্তা প্রদান করে এবং কোনো সদস্যের ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে যৌথভাবে ঝুঁকি ভাগাভাগির প্রস্তাবনা রাখে। মিউচুয়াল ইনশিওরেন্সের সাথে তাফাকুল এই অর্থে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, এখানে সদস্যরাই বীমাকারী ও বীমাভোগী।
তাদলিসুল 'আইব: ত্রুটি গোপন করা। বিক্রেতা ইচ্ছেকৃতভাবে তার পণ্যের দোষ লুকানোকে বোঝায়। শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী এ কাজটি হারাম।
তানাজুশ: ক্রয়ের ভান করা, বিশেষত নিলামে বিক্রির ক্ষেত্রে। এটি বিক্রেতা ও ভুয়া ক্রেতার মাঝে এক ধরনের ষড়যন্ত্র। যেখানে ভুয়া ক্রেতা বেশি দাম হেঁকে সম্ভাব্য ক্রেতাদের বেশি দাম হাঁকাতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি ইসলামে বৈধ নয়।
তাবযির: সম্পদের অপব্যবহার, যা হারাম। আল-কুরআন বলে, “নিশ্চই অপব্যয়কারীরা (মুবাযয্যিরিন) শয়তানের ভাই, আর শয়তান অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ”, (কুরআন ১৭:২৭)।
দিওয়ান: ব্যুরো, অধিদপ্তর বা রেজিস্টার। রাষ্ট্রীয় দিওয়ান প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেওয়া যায় খলিফা উমর-কে। সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের পর সৈনিকদের বৃত্তি প্রদানকে সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যে তিনি দিওয়ানুল জুন্ন্দ বা সৈনিক রেজিস্টার তৈরি করেন। উমাইয়্যা ও আব্বাসিরা এই রেজিস্টারকে সম্প্রসারিত করে এতে অন্তর্ভুক্ত করান-
➡ দিওয়ানুল বারিদ: ডাকবিভাগ।
➡ দিওয়ানুর রাসাইল: সংবাদ আদান-প্রদান ব্যুরো।
➡ দিওয়ানুল খাতাম: সিল বা স্ট্যাম্প অধিদপ্তর।
➡ দিওয়ানুল আস্ল: প্রাদেশিক প্রশাসন ব্যবস্থা।
➡ দিওয়ানুয যিমাম (একবচনে যিম্মাহ): প্রাদেশিক অর্থনিয়ন্ত্রণ ব্যুরো।
➡ দিওয়ানুল মুস্তাগাল্লাত: সরকারি ব্যবসা খাত পরিচালনা ও তদারকি বিভাগ।
নাবাতীয়: ইসলামি-পূর্ব আরবের উত্তর দিকে এরা ছিল প্রথম উদীয়মান আরব রাষ্ট্র। তারা ছিল দেশান্তরিত বেদুইন, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে টান্সজর্ডান ও মধ্য আরবের উত্তর দিক থেকে আগত। পেত্রা, বস্ত্রা ও গেরাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এগুলো দক্ষিণ-থেকে-উত্তর দিকের বাণিজ্যপথের উল্লেখযোগ্য কাফেলা-নগরী। খ্রিষ্টের জন্মের সময় তাদের এলাকা দামিশক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্রাট ট্রাজান ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাদের এলাকা দখল করে সেটিকে রোমান প্রদেশ তথা “প্রোভিন্সিয়া অ্যারাবিয়া” হিসেবে ঘোষণা দিলে তাদের শাসনের ইতি ঘটে। নাবাতীয়রা খুবই উন্নত একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল দুটি প্রধান অর্থনৈতিক উপাদানের সাহায্যে—কৃষি ও বাণিজ্য।
পালমিরীয়: প্রাক-ইসলামি পালমিরাকে আরবিতে তাদমুর ও সেমিটীয় ভাষায় তাদমোর বলে। পালমিরীয়রা সবাই আরব, যাদের কেউ কেউ মা'রিব বাঁধ ধ্বংসের আগে ইয়েমেন থেকে এসেছে। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মাঝে ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পালমিরা নগরী গুরুত্ব লাভ করে। পশ্চিম-থেকে-পূর্ব বাণিজ্যপথের ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণে পালমিরা কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষত নাবাতীয়দের পতনের পর। পালমিরা তার শিখরে আরোহণ করে ১৩০ থেকে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে। তখন রোমানদের নিরাপত্তার অধীনে তারা প্রচুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাপক মাত্রায় উন্নতি সাধন করে। পালমিরীয়রা ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত তাদের সামরিক প্রভাব বিস্তারে সফল হয়। রোমান সাম্রাজ্যকে অমান্য করে তাদের সেনাঘাঁটিকে পেছনে ঠেলতে ঠেলতে এশিয়া মাইনরের আংকারা পর্যন্ত নিয়ে যায়। ২৭২ খ্রিষ্টাব্দে পালমিরীয় রানী পরাজিত হন এবং রোমানরা শহরে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
ফাই' (আনফাল): আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। কষ্ট বা সত্যিকারের যুদ্ধ ছাড়া প্রাপ্ত সম্পদ হলো ফাই'। এটি গনিমত থেকে আলাদা। গনিমত পাওয়া যায় শত্রুর সাথে সত্যিকার যুদ্ধের মাধ্যমে (কুরআন ৫৯: ৬-৮)। আনফালের বণ্টনেও একই বিধান—সবটা যাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তত্ত্বাবধানে। যার ফলে এর বণ্টনও ফাই'য়ের মতো হয়ে যায়। আনফাল আর ফাই'য়ের মাঝে পার্থক্য হলো আনফাল পাওয়া যায় সত্যিকারের সংঘর্ষ সংঘটিত হওয়ার পর। ফাই' লাভ হয় সংঘর্ষ ছাড়াই। তবে আনফালের ঘটনা কমই ঘটত। মুসলিমরা যখন ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টন নিয়ে কলহে লিপ্ত হন, তখনই সকল সম্পদ নবি-এর তত্ত্বাবধানে জমা দেওয়া হয়। তিনি যুদ্ধে অংশ নেওয়া/না-নেওয়া মুসলিমদের মাঝে তা বণ্টন করেন।
ফাতওয়া: ধর্মীয় বিষয়ে পারদর্শী বিজ্ঞ আলিমের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মত বা সিদ্ধান্ত।
ফিক্‌হ: আইনশাস্ত্র, ধর্মীয় পবিত্র আইন সংকলনের অধ্যয়ন ও প্রয়োগ। ইসলামি আইনশাস্ত্রের ভিত্তি আল-কুরআন, সুন্নাহ ও ইজতিহাদ। ইজতিহাদ হলো এমন কোনো পরিস্থিতির ব্যাপারে বিধান নির্ণয়ের চেষ্টা করা, যেটার অস্তিত্ব অতীতে ছিল না। বা থাকলেও, সমমাত্রায় ছিল না। ইজতিহাদ যেসব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হলো—ইজমা বা ঐক্যমত্য, কিয়াস বা বিচারিক যুক্তিপ্রয়োগ, ইস্তিহসান বা অগ্রাধিকার, ইস্তিসলাহ বা জনস্বার্থ, এবং উরফ বা প্রচলন।
ফিতনা: খুলাফায়ে রাশিদিনের শেষদিকে এবং উমাইয়্যা যুগের শুরুর দিকের ধর্মীয় বিভেদ, যার ফলে মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়।
বাই' আদ-দাইন: ঋণের বিক্রি। এমন লেনদেন, যাতে শারীআ-সম্মত ঋণ নিরাপত্তা বা ঋণ সনদের ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। ঋণগ্রস্ততার প্রমাণ হিসেবে ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে দেওয়ার জন্য এই ঋণ নিরাপত্তা বা ঋণ সনদ প্রণয়ন করবে।
বাই' আল-ইনাহ (বাই' আল-মুহতাজ): আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্তের বিক্রয়। এমন এক চুক্তি, যাতে একজন বিক্রেতা কর্তৃক কোনো সম্পদ বিক্রয় ও পুনরায় কিনে নেওয়া জড়িত। একজন বিক্রেতা সম্পদটি একজন ক্রেতার কাছে নগদ টাকায় বিক্রি করবে। সেই ক্রেতা একই সম্পদ বাকিতে পুনরায় কিনে নেবে, যেখানে মূল্যটি উক্ত নগদ মূল্যের চেয়ে বেশি। তেমন বিক্রেতা কোনো সম্পদ ক্রেতার কাছে বাকিতে মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে বিক্রি করলেও তাকে বাইয়ুল ইনা বলা হয়, যখন বিক্রেতা সেই একই সম্পদ পুনরায় নগদ অর্থে কিনে নেবে যা আগের মূল্যের চেয়ে কম। এ ধরনের লেনদেনের ইসলামি বৈধতা নেই। কারণ এতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যে, কোনো পণ্যের আদানপ্রদান ছাড়াই এটি স্রেফ টাকার লেনদেন। লেনদেনটি যাতে সুদের আওতায় না পড়ে, তাই এটিকে একটি "কৌশল” বা হিলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
বাই' আল-ইস্তিজরার: পরবর্তীতে মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে বিক্রিত পণ্য কিস্তিতে সংগ্রহ করা। ভোক্তা ও সরবরাহকারীর মধ্যে এমন চুক্তি, যেখানে সরবরাহকারী কিছু নির্দিষ্ট পণ্য কিস্তিতে (যেমন, মাসে মাসে) সরবরাহ করতে সম্মত হয়। এক্ষেত্রে মূল্য ও তা পরিশোধের ধরন পূর্বনির্ধারিত থাকে।
বাই' আল-ওয়াফা': প্রতিশ্রুত বিক্রয় পূর্ণ করা। এই চুক্তিতে শর্ত থাকে যে, বিক্রেতা যখন বিক্রিত পণ্যের দাম আবার শোধ করে দেবে, ক্রেতা তখন সেই পণ্য বিক্রেতাকে ফিরিয়ে দেবে। এটিকেও আর্থিক লেনদেন গণ্য করা হয়।
বাই' আল-গারার (বহুবচন বুয়ু' আল-গারার): তথ্যের অভাবের কারণে অনিশ্চয়তা-পূর্ণ বিক্রয়। পরিমাণ নির্ধারণ না করে ভবিষ্যৎ চুক্তি করা এর একটি উদাহরণ। তাই একে “অনিশ্চিত বিক্রয়” বা “বুয়ু আল-গারার” বলে, যাকে নবি * তিরস্কার করেছেন।
বাই' আল-মুযাইয়াদাহ: নিলামে বিক্রি। উন্মুক্ত বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি করা, যাতে সম্ভাব্য ক্রেতারা দাম হাঁকতে পারে। বিক্রয়যোগ্য সম্পদটি ওই ক্রেতাকে দেওয়া হবে, যে সর্বোচ্চ মূল্য হেঁকেছে। অন্যভাবে বললে, এটি টেন্ডার-ভিত্তিক ক্রয়বিক্রয়।
বাই' আস-সালাম: ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য তাৎক্ষণিক মূল্য পরিশোধ। এ ধরনের চুক্তিতে চুক্তির সময়েই নগদে মূল্য পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ক্রয়কৃত পণ্যটি সরবরাহ করা হবে চুক্তিতে উল্লিখিত পরবর্তী কোনো এক সময়ে। একে বাই' আল-ইস্তিসনা (উৎপাদিত হবে, এমন পণ্যের বিক্রি)-ও বলা হয়। কারণ অগ্রিম মূল্য পরিশোধিত উৎপাদিত পণ্যের লেনদেনের সাথে এটির মিল রয়েছে।১৯
বাই' বিসামান আজিল: পরবর্তীতে পরিশোধনীয় দামে বিক্রি করা। এটি এমন এক চুক্তি যেখানে ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেন হয়েছে পূর্বসম্মত সময়সীমা ও পূর্বনির্ধারিত মূল্য অনুসারে, যাতে সময়ের বিপরীতে লভ্যাংশও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু পরে বা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করা হবে বলে সময়ের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধিহারে মূল্য বাড়ানো যায় না। বর্তমানে সম্পদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
মা'ইন (বাইবেলে উল্লেখিত মা'ওন, মে'উন ও মে'ইন): শাব্দিক অর্থ ঝর্ণাধারা। প্রাক-ইসলামি দক্ষিণ আরবে সাবা'র পর দ্বিতীয় রাজ্য। মাইনীয় যুগের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৭০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত।
মাইসির: জুয়া। বাজি ধরার সংশ্লিষ্টতা থাকা যে-কোনো কর্মকাণ্ড, যেখানে বিজয়ী ব্যক্তি বাজি ধরা জিনিসটি লাভ করে এবং পরাজিত ব্যক্তি তা আরায়। শরীয়তে এটি হারাম।
মাদরাসা (বহুবচনে মাদারিস): মুসলিম উচ্চতর শিক্ষার প্রতিষ্ঠান যেখানে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞগণ দ্বীনি কিতাবাদির পাঠদান করেন।
মাল: সম্পদ বা উপার্জনের আধার। মূল্যের অধিকারী এবং শারীআ অনুযায়ী উপযোগ লাভে ব্যবহারযোগ্য যে-কোনো জিনিস।
মালিকি: মালিকি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মালিক ইবনু আনাস (৭১৫-৭৯৫)। তিনি বিশেষ জোরারোপ করতেন সুন্নাহ এবং নবি ﷺ-এর যুগে মদিনার প্রচলিত রীতিনীতি ও খুলাফায়ে রাশিদীনের ইজমার প্রতি।
মুকাসসাহ: পাল্টাপাল্টি ঋণ নিষ্পত্তিকরণ। পাল্টা কোনো লেনদেনের মাধ্যমে ঋণের নিষ্পত্তি করা।
মুকাসামাহ: ভাগাভাগি। একটি ভূমিকর ব্যবস্থা, যেখানে কর হিসেব করা হয় আনুপাতিক ফসল-ভাগাভাগি করের হার অনুযায়ী। ইমাম আবূ ইউসুফের মতে, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য উপকারী এবং একই সাথে করদাতার প্রতি অবিচার-প্রতিরোধ করে।
মুজতাহিদ: ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করা ফকিহ, যিনি শারঈ বিষয়ে কোনো ইমাম বা মাযহাবের অনুসরণ না করে, শারীয়তের মূলনীতি অনুসারে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
মুদারাবা (কিরাদ ও মুকারাদাহ): লাভ-ও-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসা। দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে চুক্তি, যেখানে পক্ষ দুই রকমের হতে পারে: (ক) পুঁজি সরবরাহকারী, বিনিয়োগকর্তা, বা রব্বুল মাল, এবং (খ) উদ্যোক্তা, বা মুদারিব, যে কিনা পূর্বসম্মত শর্ত অনুযায়ী ব্যবসার ব্যবস্থাপনা করবে। পূর্বনির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী অংশীদারদের মাঝে লাভের পরিমাণ বণ্টন করে দেওয়া তার দায়িত্ব। আর ক্ষতি হলে সেটা সম্পূর্ণই বহন করবে পুঁজি সরবরাহকারী। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার যে ক্ষতি হবে, তা হলো শ্রম ও সময়ের নিষ্ফল ব্যয়।
মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্ব (শারিকাতুল মুফাওয়াদাহ): পুঁজি ও মূলধন ভাগাভাগির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায় যখন উভয়পক্ষ শর্তহীন কর্তৃত্ব ভোগ করে। মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্বে পক্ষগুলোর মাঝে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক নিশ্চয়তা ও স্বত্বের। মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্বের অংশীদারদের কর্তৃত্ব বা স্বত্ব শর্তাধীন নয়। লাভ ভাগাভাগি হবে অংশীদারদের প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে, যদিও বৃহত্তর অংশটি ব্যবস্থাপকের ভাগে যেতে পারে তার কর্মপ্রচেষ্টার প্রতিদান হিসেবে। ক্ষতি বহন করা হয় প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে। অংশীদারদের আর্থিক দায়ভারও এখানে শর্তহীন।
ইনান অংশীদারিত্ব: সে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব যেখানে সীমিত কর্তৃত্ব ভোগ করা হয় এবং লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি করা হয়। এখানে সম্পর্ক শুধু পারস্পরিক স্বত্বভিত্তিক। মুফাওয়াদাহ'র মতো পারস্পরিক নিশ্চয়তার নয়। ইনান অংশীদারিত্বে অংশীদারদের কর্তৃত্ব বা স্বত্ব শর্তাধীন। অংশীদাররা লভ্যাংশ পায় তাদের প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে, যদিও বৃহত্তর অংশটি ব্যবস্থাপকের ভাগে যেতে পারে তার কর্মপ্রচেষ্টার প্রতিদান হিসেবে। ক্ষতি বহন করা হয় প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে। অংশীদারদের আর্থিক দায়ভার এখানে শর্তাধীন।
মুরাবাহাহ: পণ্য কিনে ক্রয়মূল্যের চেয়ে লাভে বিক্রয়, যেখানে ক্রয়মূল্য স্পষ্ট থাকে। বর্তমানে এই চুক্তিতে কোনো সম্পদের অর্থায়নের জন্য ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তি করা হয়, যেখানে ব্যয়ভার ও লাভের সীমা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে অগ্রিম জ্ঞাত ও সম্মতিপ্রাপ্ত থাকে। ক্রয়ের নিষ্পত্তি পরবর্তীকালে সামষ্টিক মূল্যপরিশোধ বা কিস্তিতে পরিশোধের ভিত্তিতে হতে পারে। চুক্তিতে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে।
মুশারাকাহ; সমান অংশীদারীত্ব। দুই বা ততোধিক অংশীদারের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের জন্য এমন চুক্তি, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নগদ অর্থ বা পণ্যদ্রব্যের মাধ্যমে কিছু না কিছু পুঁজি সরবরাহ করে। ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত যেকোনো লভ্যাংশ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন করে দেওয়া হবে। কিন্তু ক্ষতি ভাগাভাগি করা হবে মূলধনের অনুপাতে।
যাকাত: কুরআনে আদিষ্ট একটি বাধ্যতামূলক দান। এটি ইসলামের মৌলিক ইবাদাত। এতে ব্যয় করার খাত কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত। এর বিস্তারিত বিধিবিধান এবং হিসেবের হার ও ভিত্তি নবি ﷺ-এর সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।
যামান: নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা। অথবা নিশ্চয়তার একটি চুক্তি, যেখানে নিশ্চয়তাদাতা কোনো সম্পদের মালিক কর্তৃক পূরণীয় কোনো দাবি বা দায়িত্বের লিখিত বর্ণনার নিচে স্বাক্ষর করবে। ঋণগ্রহিতা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবে কি না, এরকম নিশ্চয়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও এই ধারণাটি খাটে।
রাশিদুন: সঠিক পথের অনুসারী চার খলিফা, যারা হলেন নবি ﷺ-এর সাহাবি এবং তাঁর অব্যবহিত পরবর্তী খলিফাবৃন্দ: আবু বকর (৬৩২-৩৪), উমর ইবনুল খাত্তাব (৬৩৪-৪৪), উসমান ইবনু আফ্ফান (৬৪৪-৫৬) এবং আলি ইবনু আবী তালিব (৬৫৬-৬১)।
আল-খলিফাতুর রাশিদ: সঠিক পথপ্রাপ্ত খিলাফাত, রাশিদুন খলিফাদের শাসনামল। মুসলিমরা এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল এই অর্থে যে, সৎকর্মশীলতা ও আধ্যাত্মিকতার বিচারে শুধু এই খলিফাগণই আদর্শ। খিলাফাতে রাশিদাহ'র ব্যাপ্তিকাল ছিল ৬৩২ থেকে ৬৬১ সাল পর্যন্ত।
রা'স আল-মাল (বহুবচনে রু'উসুল আমওয়াল): মূলধন। রিবার ব্যাপারে আল-কুরআন বলেন, “যদি তওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) তোমরা পাবে।” (সূরা বাকারা ২: ২৭৯)। এ থেকে বোঝা যায় যে, সরল ও চক্রবৃদ্ধি সুদের মাঝে কুরআন কোনো পার্থক্য করে না।
রাহন: বন্ধক। ঋণের পারিপার্শ্বিক হিসেবে কোনো মূল্যবান সম্পদ ব্যবহার করা। ঋণগ্রহীতা যদি অর্থপরিশোধ না করে, তাহলে সেই বন্ধক রাখা সম্পদটি থেকে যাতে অর্থ উসুল করা যায়।
রিদ্দাহ: ধর্মত্যাগ। নবি ﷺ-এর মৃত্যুর কথা ঘোষিত হতে না হতেই কিছু গোত্র যাকাত পরিশোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। দৃশ্যত নবি ﷺ-এর মৃত্যুর ফলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই বিদ্রোহ মানেই মূর্তিপূজায় ফেরত যাওয়া ছিল না। যদিও এদের মাঝে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদারও ছিল। কার্যত এদের উদ্দেশ্য ছিল মদিনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। খলিফা আবু বকর ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এই ধর্মদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
রিবা: সুদ। ঋণ লেনদেন বা কোনো দ্রব্যের আদানপ্রদানে এমন কোনো বৃদ্ধি, যা ঋণদাতা অপর পক্ষকে সমপরিমাণ কোনো প্রতিমূল্য দেওয়া ছাড়াই লাভ করবে।
বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিক উভয় প্রকার ঋণের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য এবং উভয়টিই শারীয়তে হারাম। রা'স আল-মালের আলোচনায় উল্লিখিত আয়াতটি দ্রষ্টব্য। আল-কুরআন বলে, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং রিবার যা কিছু বাকি আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো। যদি তোমরা না ছাড়ো তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। আর যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) ওপর তোমরা পাবে।” (সূরা বাকারা ২: ২৭৮-২৭৯)।
রিবাউল কুরআন: কুরআনে উল্লিখিত রিবা। বিভিন্ন পরিভাষা দিয়ে এটি বোঝানো হয়, যেগুলো আবার ক্ষেত্রবিশেষে সমার্থক। এগুলো হলো:
➡ ঋণ রিবা: আর্থিক ঋণের সাথে সংশ্লিষ্টতা বোঝাতে,
➡ রিবা আল-জাহিলিয়্যাহ: জাহিলিয়াত বলতে ইসলামের পূর্বের যুগ, তথা অজ্ঞতার যুগ,
➡ রিবা আদ-দুয়ুন, বা রিবা আল-কুরুদ: দুয়ুন ও কুরুদ অর্থ ঋণ,
➡ রিবা আন-নাসি'আ: অর্থাৎ পরিশোধের সময়সীমার সাথে সংশ্লিষ্ট রিবা (যাতে বাকিতে লেনদেন করা হয়)।
রিবা আল-বুয়ু' (পণ্য রিবা): কুরআনে নয়, সুন্নাহতে উল্লিখিত রিবা। এর উদ্ভব হতে পারে (ক) বিলম্বিত সময়কাল-সহকারে ক্রয়বিক্রয় অথবা (খ) উপস্থিত ক্রয়বিক্রয়ে বাড়তি পণ্য প্রদানের ফলে। এই রিবা দুই প্রকার:
➡ (ক) রিবা আল-ফাদল: কোনো জিনিস বা পণ্যকে একই ধরনের অন্য পণ্য বা একই পণ্যের সাথে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সহকারে আদানপ্রদানের সময় 'পরিমাণের বৃদ্ধি'। যেমন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, বা গমের বদলে গম তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য আদানপ্রদান করা।
➡ (খ) রিবা আন-নাসি'আ: কোনো জিনিস বা পণ্যকে একই ধরনের অন্য পণ্য বা একই পণ্যের সাথে 'দেরিতে বা ভবিষ্যতে' সরবরাহ করার সময় আদানপ্রদানের কারণে সৃষ্ট বৃদ্ধি। যেমন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, বা গমের বদলে গম দেরিতে বা ভবিষ্যতে সরবরাহের জন্য আদানপ্রদান করা।
লাখমি: তারা পূর্বদিকে গাসসানিদের মতোই একটি জাতি ছিল। তাদের উদ্ভব তানুখ নামক ইয়েমেনি গোত্র থেকে। তারা উত্তর আরব থেকে তৃতীয় খ্রিষ্টীয় শতকের শুরুর দিকে স্থানান্তরিত হয়। বসতি স্থাপন করে ফুরাতের পশ্চিম দিকে। লাখমিরা পারস্য সাম্রাজ্যের মিত্র ও সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়। গাসসানিদের মতো তারাও পারস্য সাম্রাজ্য ও এর সীমান্তে বেদুইন আক্রমণের মাঝে বাফার হিসেবে কাজ করত। আরবিভাষী লাখমিরা লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করত সিরিয়ান ভাষা। বেশিরভাগই ছিল পৌত্তলিক, অল্পকিছু খ্রিষ্টান। তাদের শেষ রাজা তৃতীয় আন- নুমান (৫৮০-৬০২ খ্রিষ্টাব্দ)-এর শাসনামলে তিনি খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব বাড়তে থাকে।
শাইখ: প্রবীণ। প্রাচীন আরবে বয়স, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত গুণের কারণে কোনো গোত্র কর্তৃক তাদের নেতা হিসেবে বাছাইকৃত ব্যক্তি। তিনি অন্যান্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন কিন্তু গোত্রের সকল বিষয়ের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃপক্ষ নন। বিচারিক ব্যাপার-স্যাপার ও গোত্রের ভেতরকার সংঘাতের ক্ষেত্রে তিনি পরিবার-প্রধানদের নিয়ে গঠিত একটি পর্ষদের সাথে পরামর্শ করবেন।
শাফিয়ি: শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইদরিস আশ-শাফিয়ি (৭৬৭-৮১৯)। তার জন্ম গাযায়। ইমাম মালিক ও ইমাম মুহাম্মাদ -এর ছাত্র শাফিয়ি হানাফী ও মালিকীদের মাঝামাঝি একটি পন্থা অনুসরণ করেন।
শারীআ: কুরআন, সুন্নাহ ও ফিক্হের ভিত্তিতে ইসলামের পবিত্র আইনের সমষ্টি।
সবর: শারীরিক ও মানসিক ধৈর্য ও সহনশীলতা। সেইসাথে ইসলামে সবরের সম্প্রসারিত অর্থ হলো আল্লাহর আদেশ ও নির্দেশ মান্য করার ক্ষেত্রে, বিপথে না গিয়ে সুপথে থাকার ক্ষেত্রে, শত্রুর সাথে সামরিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে, এবং মানুষকে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করার ক্ষেত্রে ভক্তিসমৃদ্ধ ধৈর্য ও সহনশীলতা।
সাফাওয়ি ভূমি: রাষ্ট্রীয় ভূসম্পত্তি বা জায়গির। এই শব্দটি দিয়ে এমন জমিকে বোঝানো হয়, যার মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। কারণ, (ক) ইসলামি বিজয়ের পর মূল মালিক তার জমি ত্যাগ করে শত্রুরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়া, (খ) উত্তরাধিকার-বিহীন কোনো অমুসলিম মালিক মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হওয়া, এবং (গ) মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কোনো মালিক উত্তরাধিকার-হীন অবস্থায় মারা যাওয়া। শুরুর দিকে এসব জমিকে সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যেটাতে রাষ্ট্র প্রতিনিধি হিসেবে থাকে। কিন্তু উমাইয়্যা যুগ থেকে শুরু করে তা পরিবর্তিত হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিদের কাছে জমিগুলোর মালিকানা হস্তান্তরিত করা হয়।
সাবা': বাইবেলীয় শেবা। ইসলামি-পূর্ব আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চার রাজ্যের মাঝে সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজ্য। সাবাঈ যুগের ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫০ খ্রিষ্টপূর্ব বা কারো কারো মতে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১১৫ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত।
সাবুর: সবরকারী ব্যক্তি।
সাফ্ট: টাকা লেনদেন। মুদ্রার ক্রয় বা বিক্রয়।
সুকুক (একবচনে সাক্): জমা সনদ। কোনো নথি বা সনদ, যা দিয়ে সাক (সুকুকের একবচন) বা অন্তর্নিহিত সম্পদের অবিভাজিত আনুপাতিক মালিকানা প্রমাণ করা হয়। এটি সমান মূল্য ধারণ করে, তবে বেশি বা ছাড়প্রদত্ত মূল্যে বিনিময়যোগ্য হয়।
সুন্নাহ: নবি ﷺ-এর পথ ও পদ্ধতি। সুন্নাহ বলতে বোঝানো হয় নবি ﷺ তাঁর জীবদ্দশায় যা কিছু বলেছেন, করেছেন ও সম্মতি দিয়েছেন, তার সবকিছুকে। শারীআর উৎস হিসেবে সুন্নাহ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত: (ক) নবিজির কথা, (খ) তাঁর কাজ এবং (গ) অন্যদের কাজের প্রতি তাঁর সম্মতি। নবিজির কথা আল্লাহর সরাসরি বাণী নয়, যদিও তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। এগুলো কুরআনের আয়াত ও বিধিবিধানের ব্যাখ্যা ও বিশদ বর্ণনা প্রদান করে। কুরআনের সাথে যাতে সুন্নাহ মিশে না যায়, এজন্য কুরআন লিখে রাখার সময় নবি ﷺ তাঁর সাহাবিদের আদেশ দিয়েছেন যেন সুন্নাহ একইভাবে না লিখা হয়। তিনি আদেশ করেন, এগুলো মৌখিকভাবে প্রচার করার জন্য। ফলে মুসলিমরা আল্লাহর কালাম কুরআন এবং নবিজির কথা ও কাজ তথা হাদিসের মাঝে পার্থক্য বুঝতে সমর্থ হয়। লিখিতভাবে হাদীস সংকলনের নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা দেখা যায় উমাইয়্যা খলিফা উমর ইবনু আবদিল আযিযের সময়, অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
সুফতাজাহ: মানি অর্ডার বা হুন্ডি। অর্থের অধিকারী কাউকে এমন কোনো জমা উপকরণ প্রদান করা, যেটাকে সে ভবিষ্যতের কোনো সময়ে এবং অন্য কোনো স্থানে ব্যবহার বা নগদ টাকায় রূপান্তরিত করতে পারবে। তাছাড়া, সুফতাজাহ প্রণয়ন করা হতো “বাহকের কাছে পরিশোধযোগ্য” হিসেবে।
সুফিবাদ (বিশেষণ সুফি): আত্মিক বিশুদ্ধতা। আল্লাহর ইবাদাতের জন্য পার্থিব জীবনকে প্রত্যাখ্যান করা। সূফ অর্থ পশম। পোশাক পরিধানের বদলে রুক্ষ পশম (সুফ)-এর পোশাক পরিধান করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
হাওয়ালা: টাকা স্থানান্তর। এই চুক্তিতে ঋণগ্রহীতা তার ঋণের ভার কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। হাওয়ালা অনেকটা সুফতাজা'র সাথে সাদৃশ্য রাখে, যেখানে ঋণগ্রহীতা আবার তার নিজের ঋণগ্রহীতার কাছে, বা ঋণ পরিশোধে সক্ষম অন্য কারো কাছে সেই ঋণ হস্তান্তরিত করত। দুইজনের বদলে এতে তিন বা ততোধিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট হয়। এটি আধুনিক হস্তান্তর বিলের (Bill of Exchange) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই হাওয়ালা থেকে ফ্রেঞ্চ পরিভাষা "Aval”-এর উদ্ভব হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া হাওয়ালা জারি করা হতো “বাহকের কাছে পরিশোধযোগ্য” হিসেবে।
হাদরামাওত: ইসলামপূর্ব দক্ষিণ আরবের চার রাজ্যের একটি। অপর তিনটি হলো সাবা’, মা'ইন ও কাতাবান। এর স্থায়িত্বকাল প্রায় ৪৫০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে শুরু করে প্রথম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত। সাবায়ি ও মাইনিয়দের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেলেও এই রাজ্যটি মশলা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
হাক্ক মালি: আর্থিক অধিকার। হাক্ক মালি হলো আর্থিক সম্পদের ওপর অধিকার। এ ধরনের অধিকারের উদাহরণ হলো হাক্কুন্দ দাইন (ঋণ অধিকার), যদি সম্পদটি ঋণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, এবং হাকুত তামাল্লুক (মালিকানা অধিকার)।
হাদিস: দ্রষ্টব্য আহাদিস।
হানাফি: হানাফি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত (৬৯৯-৭৬৭)।
হাম্বলি: হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবনু হাম্বল (৭৮৪-৮৫৫)। তিনি ইজমা ও কিয়াসের সীমা সংকুচিত করে দিয়ে, কঠোরভাবে আক্ষরিক সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। তিনি মধ্যমপন্থী শাফিয়ির শিক্ষার্থী হলেও ইসলামি ফিক্হের ক্ষেত্রে আপসহীন নীতি অনুসরণ করেন। তার অনুসারীরা প্রধানত সৌদি আরব অঞ্চলে অবস্থান করেন।
হিবাহ: উপহার। কোনো ব্যক্তিকে প্রদত্ত উপহার।
হিসবাহ: জবাবদিহিতা, সরকারি দায়িত্ব, জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। এটি ইসলামের একটি ধর্মীয় আদেশ। যার লক্ষ্য হলো, ধর্মীয়ভাবে আদিষ্ট বিষয় তথা মা'রুফের প্রয়োগ, এবং অন্যায় তথা মুনকার-এর প্রতিহত করা। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার এবং বাজার ও সরকারি কর্মকাণ্ড উভয়ই এতে অন্তর্ভুক্ত।

টিকাঃ
১. আহলুর রায়ের সাথে তাদের পার্থক্যের মূল জায়গা ছিল কর্মক্ষেত্রে, আহলুর রায় ইমামগণ অনাগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কিয়াস ও যুক্তি ব্যবহার করে বিধান আহরণ ও লিপিবদ্ধ করতেন, যা আহলুল হাদীসগণ করতেন না। এমন নয় যে আহলুর রায় ইমামগণ যুক্তিকে সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দিতেন বা মাসলাহাত ও জনকল্যাণের মূলনীতিগুলোর আলোকে বিধান পরিবর্তন করতেন। মৌলিকভাবে উভয় দলই সুন্নাহর অনুসারী ও আহলুস সুন্নাহরই অংশ, সালাফের যুগে তাদের মধ্যকার পার্থক্যটি ছিল ইজতিহাদ ও ফিকহকে ঘিরে, ধর্মতাত্ত্বিক কোনো মতবিরোধ ছিল না।
১. একে আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং-এ ইজারা মুনতাহিয়া বিত তামলীক-ও বলা হয়। এর কিছু পদ্ধতি শরয়ী নীতিমালার পরিপন্থী, যেমন লিজ কন্ট্রাক্টে বিক্রয়ের শর্ত জুড়ে দেওয়া। - সম্পাদক।
১. বাই আল-ইস্তিসনার সঙ্গে সালামের পার্থক্য হলো, বাই' সালামে পণ্য সরবরাহ বিলম্বিত হলেও চুক্তির সময়ে পণ্য বাজারে থাকে। কিন্তু বাই আল-ইস্তিসনা'-য় সাধারণত পণ্য প্রস্তুত থাকে না। বানিয়ে দেওয়ার চুক্তি করা হয়।- সম্পাদক

আল্ল: ন্যায়বিচার, আদালাহ ইজতিমা'ইয়্যা: সামাজিক ন্যায়বিচার। সামাজিক ন্যায়বিচার ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় মূলনীতি।
আমানাহ (ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ): দায়িত্ব, নিজের কর্মের ভার, মতান্তরে হিদায়াত গ্রহণের স্বভাবজাত ক্ষমতা। মানুষের ব্যাপারে আল-কুরআন বলে, "আমি তো আসমান, জমিন ও পর্বতমালার কাছে এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং শঙ্কিত হলো। কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করে নিল”, (কুরআন, ৩৩: ৭২), এবং "আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করিনি দুই চোখ? আর জিহ্বা ও ঠোঁট? আর আমি তাকে দুটি পথ দেখিয়েছি।” (কুরআন, ৯০: ৮-১০)
আমানাহ (অর্থনৈতিক অর্থ): কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিরাপত্তার জন্য গচ্ছিত রাখা টাকা বা অন্য কোনো সম্পদ।
আহলুর রায়: ধর্মীয় চিন্তার একটি ধারা। নবি -এর যুগে যে বিষয়টির অস্তিত্ব ছিল না বা থাকলেও স্বল্প মাত্রায় ছিল, সেসব ব্যাপারে ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে তারা ফকিহ'র মতামতের ওপর নির্ভর করেন। তারাও কুরআন-সুন্নাহকে বিধান আহরণের প্রধান ক্ষেত্র বিবেচনা করেন। কিন্তু যেসব সমাধান কুরআন-সুন্নাহে প্রত্যক্ষভাবে নেই, সেগুলো উদঘাটনের জন্য রায় তথা কিয়াসের ওপর নির্ভর করেন। এটি ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই বিদ্যমান ছিল।
আহলুল হাদিস: ধর্মীয় চিন্তার একটি ধারা, যারা ফাতওয়া প্রদানের সময় ইস্তিহসান বা কিয়াস থেকে দূরে থাকতেন। নবসৃষ্ট সমস্যার সমাধানে কিয়াসের ব্যবহারকে অপছন্দ করতেন। হাদীসের চর্চাকে অগ্রাধিকার দিতেন।[১]
আহাদিস (একবচন হাদিস): নবি মুহাম্মাদ -এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি। বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক সূত্রের মাধ্যমে এগুলো প্রাপ্ত। সূত্রের এই প্রক্রিয়া ইসনাদ (সনদ) নামে পরিচিত। প্রত্যেক বর্ণনাকারী পূর্বতন একজন বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ-পূর্বক তার কাছ থেকে শুনেছেন বলে বর্ণনা করেন। এভাবে করে বর্ণনাকারীদের ধারাটি এমন একজন বর্ণনাকারীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়, যিনি স্বয়ং নবি -কে সেটা বলতে শুনেছেন বা করতে দেখেছেন।
ইজতিহাদ: সমসাময়িক কোনো পরিস্থিতি, যার অনুরূপ অতীতে ছিল না বা একই মাত্রায় ছিল না, সে ব্যাপারে ধর্মীয় বিধান নির্ণয়ের জন্য কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান, ইস্তিসলাহ ও উরফের সাহায্যে স্বাধীন যুক্তিবুদ্ধি সহকারে সিদ্ধান্তে আসা। ইজতিহাদের জন্য ফকিহকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পারঙ্গম হতে হয়।
ইজমা': সাধারণ ঐক্যমত্য। ফকিহদের মাঝে কোনো মাসআলা বা ফাতওয়ার ব্যাপারে একাত্মতা।
ইজারাহ: লিজ দেওয়া/ভাড়া দেওয়া। এখানে উপকার বিক্রয় হয়। একজন লিজদাতা (মালিক) তার সম্পদ বা উপকরণ কারো কাছে লিজ দেয়। ভাড়ার একটি পরিমাণ ও লিজের সময়সীমা আকদ (চুক্তি)-এর সময়েই নির্ধারিত করা হয়। লিজ দেওয়া জিনিসের মালিকানা লিজদাতার হাতেই থাকে।
ইজারাহ সুম্মা বাই': প্রথমে লিজ দিয়ে পরে পুরোপুরি বিক্রি করা। ইজারাহ'র চুক্তি এমনভাবে করা হয় যে, সম্পদটির মালিকানা পরবর্তীতে ইজারাহ-গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত করে দেওয়াই উদ্দেশ্য। ইজারাহ'র সময়সীমা শেষ হওয়ার পর একটি পূর্বনির্ধারিত লেনদেন ও মূল্যে বিক্রয় নথিবদ্ধ করা হয়। [১]
ই'তিদাল (ওয়াসাত): ভারসাম্য রাখা, ঝুঁকে না পড়া; ওয়াসাত মানে মধ্যমপন্থা। ইসলামের স্বীকৃত মূলনীতি। মধ্যমপন্থা নীতির দাবি এই যে, অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বা অন্য কোনো মানবীয় আচরণ মধ্যমপন্থা অনুযায়ী করতে হবে। অযাচিত বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। প্রান্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়া যাবে না। যেমন, "নিজের হাতকে গলার সাথেও বেঁধে রেখো না (কৃপণতা) আবার সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না (অপব্যয়), নয়তো তুমি নিঃস্ব ও তিরস্কৃত হয়ে পড়বে।” (কুরআন, ১৭:২৯)।
ইত্তিফাক যিমনি: প্রচ্ছন্ন সমঝোতা। যে-কোনো চুক্তির অভ্যন্তরীণ এমন কোনো বিষয়, যেটা উহ্য হলেও উভয় পক্ষের নিকট স্বীকৃত। তারই ভিত্তিতে অন্য কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। যেমন, নিলামের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগেই এই সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে যে, দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া ক্রমশ (বাই' আল-মুযাইয়াদাহ) চলতে পারে।
ইবরা': ঋণ কমিয়ে দেওয়া বা মওকুফ করা।
ইসরাফ: উপযুক্ত কারণ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে সম্পদ ব্যবহার করা, যা অপছন্দনীয়। কারণ মুসলিমদের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে খরচ করা উচিত, দ্রষ্টব্য- ই'তিদাল।
ইসলাম: অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ধর্ম হিসেবে ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি: ১. এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল, ২. দিনে পাঁচবার ওয়াক্ত-মাফিক প্রার্থনা তথা সালাত, ৩. আদিষ্ট সম্পদ দান করা তথা যাকাত, ৪. রমাজান মাসে রোজা পালন করা তথা সাওম, এবং ৫. সামর্থ্যবানদের নির্ধারিত ইবাদত-যাত্রা তথা হজ।
ইস্তিসনা': উৎপাদনের আদেশ। কোনো সম্পদ উৎপাদন করে ভবিষ্যতে ক্রেতার কাছে সরবরাহ করার ব্যাপারে চুক্তি। আরেকভাবে বললে, ক্রেতা তার বিক্রেতা বা চুক্তিকারীকে এমন কোনো সম্পদ সরবরাহ বা নির্মাণ করার আদেশ দেবেন, যার নির্মাণকাজ চুক্তিতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভবিষ্যতে শেষ হবে। উভয়পক্ষ দামের বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিবে। দ্রষ্টব্য বাই' আস-সালাম।
ইস্তিসলাহ: জনস্বার্থ। সম্পূর্ণ নবউদ্ভূত বা আগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনস্বার্থ বিবেচনায় এনে নতুন কোনো ফাতওয়া প্রদান করা।
ইস্তিহসান: সাধারণভাবে গৃহীত কোনো যুক্তির চেয়ে বিশেষ সূক্ষ্ম কারণে অন্য যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া।
উজরাহ: মজুরি। সেবা ব্যবহার করার আর্থিক প্রতিদান। বর্তমান অর্থনীতির প্রেক্ষিতে এটা হতে পারে বেতন, মজুরি, ভাতা, কমিশন ইত্যাদি।
উম্মাহ: মুসলিম জনগোষ্ঠী।
'উফ: প্রথা, প্রচলন ও রীতিনীতি। ইজতিহাদের একটি ভিত্তি। অভূতপূর্ব কোনো পরিস্থিতিতে ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে আমলে নেওয়া।
'উরবুন: ডাউন পেমেন্ট। পণ্য বা সেবার জন্য অগ্রিম পরিশোধ করা মূল্য হিসেবে জমা রাখা অর্থ, যা লেনদেন বাতিল হয়ে গেলে তুলে নেওয়া হবে। তুলে নেওয়া অর্থ হিবাহ (উপহার) হিসেবে বিবেচিত হয়।
উলামা' (একবচনে আলিম): ইসলামি ফিক্‌হ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি।
উত্তর কর ও উশর (একবচন উন্ন): উশর বলা হয় এক-দশমাংশকে। জমির উৎপন্ন ফসল থেকে এক-দশমাংশ যাকাত প্রদান করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এই যাকাতের হার পরিবর্তিত হয়। একেই ফসলের যাকাত বলা হয়। আর উত্তর হলো শুষ্ক মাশুল। এই কর প্রবর্তন করেন খলিফা উমর। মুসলিম বণিকরা বিদেশি রাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম করার কারণে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তাদের থেকে যে কর পরিশোধ করত, তার পাল্টা কর এটি। এই করের হার এক-দশমাংশ বা “উশর”, যার বহুবচন "উত্তর"।
ওয়াকালাহ: উকালতি। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে এমন প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতা প্রদান করা, যে কিনা প্রথমজন জীবিত থাকাকালীন তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে সংশ্লিষ্ট কাজটি করবে।
ওয়াদিয়াহ ইয়াদ-যামানাহ: হাতে থাকার নিশ্চয়তা। মালিক নয়, এমন কারো কাছে নিরাপত্তার জন্য জমা রাখা পণ্য বা অর্থ। ওয়াদিয়াহ যেহেতু একটি আমানত, তাই জমা নেওয়া ব্যক্তিটি নিশ্চয়তা প্রদানকারী বলে গণ্য হবে। তাই যখন আমানতকারী দাবি করবে, তখন সেই পুরো পরিমাণটি ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা তাকে দিতে হবে। নিরাপত্তাদাতা আমানতকারীকে লভ্যাংশের কোনো অংশ দিতে বাধ্য হবে না।
কব্য: নগদ টাকা বা চুক্তির বস্তুটি গ্রহণ করা। কব্য অর্থ নিজের দায়িত্বের আওতায় আনা, যা দিয়ে বিনিময়ের চুক্তি বোঝানো হয়। সাধারণত কব্য গৃহীত হওয়া/ না-হওয়া নির্ভর করে স্থানীয় সমাজের 'উরফ বা প্রচলিত রীতিনীতির ওপর। পণ্য কার আওতায় রয়েছে বিবেচিত হবে, তার স্বীকৃতি দেওয়া হয় সেখানকার 'উরফ অনুযায়ী।
কাতাঈ (একবচনে কাতি'আ): কোনো যোগ্যতা বা অবদানের পুরস্কারস্বরূপ প্রদত্ত জমি। উমাইয়্যা ও বিশেষত আব্বাসি খিলাফাত আমলে এসব জমির আকৃতি বাড়তে থাকে এবং কৃষি কর্মকাণ্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে, একে শাব্দিক অর্থে জায়গির বলা যায়।
কাতাবান: ইসলামি-পূর্ব দক্ষিণ আরবের চার রাজ্যের একটি, যার উত্থান সাবা' ও মা'ইনের পর হয়েছিল। এই রাজ্য প্রায় ৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৫০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সাবাই ও মাইনীয় রাজ্যদ্বয়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেলেও মশলা-বাণিজ্যের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
কাফালাহ: নিশ্চয়তা। যামানের কাছাকাছি অর্থ।
কাবুদ হাসান (করযে হাসানাহ): কল্যণকর ঋণ। সামাজিক কল্যাণ বা ঋণগ্রহীতার কোনো স্বল্পমেয়াদী প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্যে দুই পক্ষের মাঝে ঋণের চুক্তি। এই ঋণ সুদমুক্ত। যে পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে, ঠিক ততটুকুই ফেরত দিতে হবে। তবে চুক্তিতে উল্লেখ না-থাকা সাপেক্ষে ঋণগ্রহীতা তার ইচ্ছে-মাফিক ঋণদাতাকে বেশি পরিমাণ ফেরত দিতে পারবে।
কিন্দি: এদের উদ্ভব দক্ষিণ আরব থেকে। কিন্দি রাজ্যের স্থায়িত্ব ছিল ৪৮০ থেকে ৫২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। সর্বোচ্চ অবস্থায় থাকাকালীন কিন্দি রাজ্যের বিস্তৃতি ফুরাত নদী পর্যন্ত ছিল। পারস্য সম্রাটের মৃত্যুর পর কিন্দি রাজা ৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রভাব লাখমি রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। লাখমি রাজাকে পরাজিত করে রাজপরিবারের অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেন। ইসলাম গ্রহণের পর কিন্দিরা সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের অসামান্য খেদমত করে। তাদের কাউকে কাউকে প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। কতিপয় কিন্দি প্রসিদ্ধ ইসলামি চিন্তাবিদেও পরিণত হন। যেমন ইয়াকুব ইবনু ইসহাক আল-কিন্দি "আরবদের দার্শনিক" উপাধি লাভ করেন।
কিয়াস: সাদৃশ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। তুলনার মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্তে আসা। অধুনা সৃষ্ট কোনো সমস্যার বিধান নির্ণয় করা হয় অনুরূপ বা শর্ত-পরিস্থিতির দিক দিয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ পূর্বতন কোনো সমস্যার বিধান থেকে। ইস্তিহসান বা ইস্তিসলাহ বিবেচনায় পূর্বতন ফাতওয়ার পরিবর্তন করা এখানে বৈধ হতেও পারে।
খারাজ: ভূমিকর। বিজিত ভূমি মুসলিম সেনাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার নিয়ম পাল্টে খলিফা উমর খারাজ কর প্রবর্তিত করেন। কুরআন ও সুন্নাহর নির্ধারিত করগুলোর বাইরে এই করটিকে তিনি ইসলামি করব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করেন। করটি ভূমির ওপর আরোপিত হতো, ব্যক্তির ওপর নয়। করের ভিত্তি হলো চাষযোগ্য জমি এবং তার সাথে সমানুপাতিক করের হার।
খিলাফত: ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এটি দিয়ে বোঝানো হয় আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে এর অর্থ: নবি -এর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হস্তান্তর। আল-কুরআন বলে, "তোমার প্রতিপালক যখন ফেরেশতাদের বললেন, 'আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি (খলিফা) সৃষ্টি করতে চলেছি”, (কুরআন, ২: ৩০)। "তিনিই তোমাদের পৃথিবীতে খুলাফা বানিয়েছেন”, (কুরআন, ৩৫: ৩৯)। "আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তিনি তোমাদের যা কিছুতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন, তা থেকে দান করো", (কুরআন, ৫৭: ৭)।
খিয়ানত: বিশ্বাসঘাতকতা। সত্য গোপন করা বা গোপনে চুক্তি ভঙ্গ করা বোঝানো হয়। শারীয়তে এটি নিষিদ্ধ।
গনিমত: ফাই' ও আনফাল থেকে পারিভাষিকভাবে আলাদা এমন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যেগুলো সত্যিকারের সামরিক সংঘর্ষ বা অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। গনিমত শুধুমাত্র অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের প্রাপ্য। কারণ তারা এতে তাদের দক্ষতা ও প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়েছে, এবং যুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছে। রাষ্ট্র গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ পাবে।
গারার: ধোঁকা। তথ্য লুকানোর কারণে বা সামগ্রিক কারণে কোনো লেনদেন ধোঁকাপূর্ণ হতে পারে। গারার অজ্ঞতার এমন এক উপাদান, যার কারণ হতে পারে পণ্যের বা মূল্যের ব্যাপারে অজ্ঞতা। অথবা পণ্যের ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনা। এতে লেনদেনের কোনো জরুরি উপাদানের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে এক বা উভয় পক্ষ প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনায় থাকে। গারার তিন প্রকার: ১. গারার ফাহিশ (মাত্রাতিরিক্ত), যাতে লেনদেন দূষিত হয়ে যায়; ২. গারার ইয়াসির (স্বল্প), যা সহনীয়; এবং ৩. গারার মুতাওয়াসসিত (মধ্যম), যা পূর্বের দুই শ্রেণীর মাঝামাঝি। মাত্রাতিরিক্ত গারারের কারণে যেকোনো লেনদেন হারাম হয়ে যেতে পারে।
গাসসানি: মা'রিব বাধ ধ্বংসের পর তৃতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে দক্ষিণ আরব থেকে স্থানান্তরিত একটি গোত্র থেকে গাসসানিদের উদ্ভব। তারা দামিশকের দক্ষিণ-পূর্বে দক্ষিণ-থেকে-উত্তরের বাণিজ্যিক পথে থিতু হয়। খ্রিষ্টান হয়ে যাওয়া গাসসানিদের দুটি ভাষা ছিল-আরামায়িক ও আরবি। তারা ছিল বাইজেন্টাইনদের মিত্র ও সুবিধাভোগী। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং এর সীমান্তে বেদুইনদের চোরাগুপ্তা হামলার বাফার অঞ্চল হিসেবে কাজ করত তারা। ইসলামি বিজয়ের সময়ে গাসসানিরা ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের পাশে থেকে যুদ্ধ করে। পরে গাসসানি রাজা ইসলাম গ্রহণ করে আবার মুরতাদ হয়ে যান। বিবাদ বেধে যাওয়ার ফলে দ্বিতীয় খলিফা যখন তাকে বেদুইন অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে উদ্যত হন, তখন এই রাজা পালিয়ে যান কন্সটান্টিনোপলে।
জাহিলিয়াত: অজ্ঞতার যুগ। আরব উপদ্বীপের ইসলাম-পূর্ব যুগ। ইসলাম-পূর্ব আরবে কিছু কিছু অংশে সভ্যতার বিস্তার ছিল। তবুও ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার যে সামগ্রিক অবস্থা বিরাজমান ছিল, তার প্রেক্ষিতে একে জাহিলি যুগ বলা হয়েছে।
জু'আলাহ: কমিশন। পুরস্কারের চুক্তি; কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করার জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একপাক্ষিক চুক্তি।
জিযিয়া: সামরিক নিরাপত্তার বিনিময়ে অমুসলিমদের পক্ষ থেকে প্রদেয় সাধারণ কর।
তাওহীদ: আসমানি একত্ববাদ। একক ও অদ্বিতীয় উপাস্যে বিশ্বাস।
তা'ওয়িয: আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান। চুক্তিকারী পক্ষগুলোর মাঝে সম্মতিপ্রাপ্ত একটি জরিমানার পরিমাণ। ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় বা দেরি করে, তাহলে ঋণদাতা এই ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার রাখে।
তাকাফুল: পারস্পরিক বীমা। এটি তা'আউন বা পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিভিত্তিক এক ধরনের ইসলামি বীমা। এটি সম্পদ ও সম্পত্তির পারস্পরিক নিরাপত্তা প্রদান করে এবং কোনো সদস্যের ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে যৌথভাবে ঝুঁকি ভাগাভাগির প্রস্তাবনা রাখে। মিউচুয়াল ইনশিওরেন্সের সাথে তাফাকুল এই অর্থে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, এখানে সদস্যরাই বীমাকারী ও বীমাভোগী।
তাদলিসুল 'আইব: ত্রুটি গোপন করা। বিক্রেতা ইচ্ছেকৃতভাবে তার পণ্যের দোষ লুকানোকে বোঝায়। শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী এ কাজটি হারাম।
তানাজুশ: ক্রয়ের ভান করা, বিশেষত নিলামে বিক্রির ক্ষেত্রে। এটি বিক্রেতা ও ভুয়া ক্রেতার মাঝে এক ধরনের ষড়যন্ত্র। যেখানে ভুয়া ক্রেতা বেশি দাম হেঁকে সম্ভাব্য ক্রেতাদের বেশি দাম হাঁকাতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি ইসলামে বৈধ নয়।
তাবযির: সম্পদের অপব্যবহার, যা হারাম। আল-কুরআন বলে, “নিশ্চই অপব্যয়কারীরা (মুবাযয্যিরিন) শয়তানের ভাই, আর শয়তান অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ”, (কুরআন ১৭:২৭)।
দিওয়ান: ব্যুরো, অধিদপ্তর বা রেজিস্টার। রাষ্ট্রীয় দিওয়ান প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেওয়া যায় খলিফা উমর-কে। সিরিয়া ও ইরাক বিজয়ের পর সৈনিকদের বৃত্তি প্রদানকে সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যে তিনি দিওয়ানুল জুন্ন্দ বা সৈনিক রেজিস্টার তৈরি করেন। উমাইয়্যা ও আব্বাসিরা এই রেজিস্টারকে সম্প্রসারিত করে এতে অন্তর্ভুক্ত করান-
➡ দিওয়ানুল বারিদ: ডাকবিভাগ।
➡ দিওয়ানুর রাসাইল: সংবাদ আদান-প্রদান ব্যুরো।
➡ দিওয়ানুল খাতাম: সিল বা স্ট্যাম্প অধিদপ্তর।
➡ দিওয়ানুল আস্ল: প্রাদেশিক প্রশাসন ব্যবস্থা।
➡ দিওয়ানুয যিমাম (একবচনে যিম্মাহ): প্রাদেশিক অর্থনিয়ন্ত্রণ ব্যুরো।
➡ দিওয়ানুল মুস্তাগাল্লাত: সরকারি ব্যবসা খাত পরিচালনা ও তদারকি বিভাগ।
নাবাতীয়: ইসলামি-পূর্ব আরবের উত্তর দিকে এরা ছিল প্রথম উদীয়মান আরব রাষ্ট্র। তারা ছিল দেশান্তরিত বেদুইন, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে টান্সজর্ডান ও মধ্য আরবের উত্তর দিক থেকে আগত। পেত্রা, বস্ত্রা ও গেরাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এগুলো দক্ষিণ-থেকে-উত্তর দিকের বাণিজ্যপথের উল্লেখযোগ্য কাফেলা-নগরী। খ্রিষ্টের জন্মের সময় তাদের এলাকা দামিশক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্রাট ট্রাজান ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাদের এলাকা দখল করে সেটিকে রোমান প্রদেশ তথা “প্রোভিন্সিয়া অ্যারাবিয়া” হিসেবে ঘোষণা দিলে তাদের শাসনের ইতি ঘটে। নাবাতীয়রা খুবই উন্নত একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল দুটি প্রধান অর্থনৈতিক উপাদানের সাহায্যে—কৃষি ও বাণিজ্য।
পালমিরীয়: প্রাক-ইসলামি পালমিরাকে আরবিতে তাদমুর ও সেমিটীয় ভাষায় তাদমোর বলে। পালমিরীয়রা সবাই আরব, যাদের কেউ কেউ মা'রিব বাঁধ ধ্বংসের আগে ইয়েমেন থেকে এসেছে। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মাঝে ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পালমিরা নগরী গুরুত্ব লাভ করে। পশ্চিম-থেকে-পূর্ব বাণিজ্যপথের ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণে পালমিরা কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষত নাবাতীয়দের পতনের পর। পালমিরা তার শিখরে আরোহণ করে ১৩০ থেকে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে। তখন রোমানদের নিরাপত্তার অধীনে তারা প্রচুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যাপক মাত্রায় উন্নতি সাধন করে। পালমিরীয়রা ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত তাদের সামরিক প্রভাব বিস্তারে সফল হয়। রোমান সাম্রাজ্যকে অমান্য করে তাদের সেনাঘাঁটিকে পেছনে ঠেলতে ঠেলতে এশিয়া মাইনরের আংকারা পর্যন্ত নিয়ে যায়। ২৭২ খ্রিষ্টাব্দে পালমিরীয় রানী পরাজিত হন এবং রোমানরা শহরে প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
ফাই' (আনফাল): আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। কষ্ট বা সত্যিকারের যুদ্ধ ছাড়া প্রাপ্ত সম্পদ হলো ফাই'। এটি গনিমত থেকে আলাদা। গনিমত পাওয়া যায় শত্রুর সাথে সত্যিকার যুদ্ধের মাধ্যমে (কুরআন ৫৯: ৬-৮)। আনফালের বণ্টনেও একই বিধান—সবটা যাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের তত্ত্বাবধানে। যার ফলে এর বণ্টনও ফাই'য়ের মতো হয়ে যায়। আনফাল আর ফাই'য়ের মাঝে পার্থক্য হলো আনফাল পাওয়া যায় সত্যিকারের সংঘর্ষ সংঘটিত হওয়ার পর। ফাই' লাভ হয় সংঘর্ষ ছাড়াই। তবে আনফালের ঘটনা কমই ঘটত। মুসলিমরা যখন ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টন নিয়ে কলহে লিপ্ত হন, তখনই সকল সম্পদ নবি-এর তত্ত্বাবধানে জমা দেওয়া হয়। তিনি যুদ্ধে অংশ নেওয়া/না-নেওয়া মুসলিমদের মাঝে তা বণ্টন করেন।
ফাতওয়া: ধর্মীয় বিষয়ে পারদর্শী বিজ্ঞ আলিমের দেওয়া আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মত বা সিদ্ধান্ত।
ফিক্‌হ: আইনশাস্ত্র, ধর্মীয় পবিত্র আইন সংকলনের অধ্যয়ন ও প্রয়োগ। ইসলামি আইনশাস্ত্রের ভিত্তি আল-কুরআন, সুন্নাহ ও ইজতিহাদ। ইজতিহাদ হলো এমন কোনো পরিস্থিতির ব্যাপারে বিধান নির্ণয়ের চেষ্টা করা, যেটার অস্তিত্ব অতীতে ছিল না। বা থাকলেও, সমমাত্রায় ছিল না। ইজতিহাদ যেসব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হলো—ইজমা বা ঐক্যমত্য, কিয়াস বা বিচারিক যুক্তিপ্রয়োগ, ইস্তিহসান বা অগ্রাধিকার, ইস্তিসলাহ বা জনস্বার্থ, এবং উরফ বা প্রচলন।
ফিতনা: খুলাফায়ে রাশিদিনের শেষদিকে এবং উমাইয়্যা যুগের শুরুর দিকের ধর্মীয় বিভেদ, যার ফলে মুসলিমদের মাঝে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়।
বাই' আদ-দাইন: ঋণের বিক্রি। এমন লেনদেন, যাতে শারীআ-সম্মত ঋণ নিরাপত্তা বা ঋণ সনদের ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। ঋণগ্রস্ততার প্রমাণ হিসেবে ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে দেওয়ার জন্য এই ঋণ নিরাপত্তা বা ঋণ সনদ প্রণয়ন করবে।
বাই' আল-ইনাহ (বাই' আল-মুহতাজ): আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্তের বিক্রয়। এমন এক চুক্তি, যাতে একজন বিক্রেতা কর্তৃক কোনো সম্পদ বিক্রয় ও পুনরায় কিনে নেওয়া জড়িত। একজন বিক্রেতা সম্পদটি একজন ক্রেতার কাছে নগদ টাকায় বিক্রি করবে। সেই ক্রেতা একই সম্পদ বাকিতে পুনরায় কিনে নেবে, যেখানে মূল্যটি উক্ত নগদ মূল্যের চেয়ে বেশি। তেমন বিক্রেতা কোনো সম্পদ ক্রেতার কাছে বাকিতে মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে বিক্রি করলেও তাকে বাইয়ুল ইনা বলা হয়, যখন বিক্রেতা সেই একই সম্পদ পুনরায় নগদ অর্থে কিনে নেবে যা আগের মূল্যের চেয়ে কম। এ ধরনের লেনদেনের ইসলামি বৈধতা নেই। কারণ এতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যে, কোনো পণ্যের আদানপ্রদান ছাড়াই এটি স্রেফ টাকার লেনদেন। লেনদেনটি যাতে সুদের আওতায় না পড়ে, তাই এটিকে একটি "কৌশল” বা হিলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
বাই' আল-ইস্তিজরার: পরবর্তীতে মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে বিক্রিত পণ্য কিস্তিতে সংগ্রহ করা। ভোক্তা ও সরবরাহকারীর মধ্যে এমন চুক্তি, যেখানে সরবরাহকারী কিছু নির্দিষ্ট পণ্য কিস্তিতে (যেমন, মাসে মাসে) সরবরাহ করতে সম্মত হয়। এক্ষেত্রে মূল্য ও তা পরিশোধের ধরন পূর্বনির্ধারিত থাকে।
বাই' আল-ওয়াফা': প্রতিশ্রুত বিক্রয় পূর্ণ করা। এই চুক্তিতে শর্ত থাকে যে, বিক্রেতা যখন বিক্রিত পণ্যের দাম আবার শোধ করে দেবে, ক্রেতা তখন সেই পণ্য বিক্রেতাকে ফিরিয়ে দেবে। এটিকেও আর্থিক লেনদেন গণ্য করা হয়।
বাই' আল-গারার (বহুবচন বুয়ু' আল-গারার): তথ্যের অভাবের কারণে অনিশ্চয়তা-পূর্ণ বিক্রয়। পরিমাণ নির্ধারণ না করে ভবিষ্যৎ চুক্তি করা এর একটি উদাহরণ। তাই একে “অনিশ্চিত বিক্রয়” বা “বুয়ু আল-গারার” বলে, যাকে নবি * তিরস্কার করেছেন।
বাই' আল-মুযাইয়াদাহ: নিলামে বিক্রি। উন্মুক্ত বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি করা, যাতে সম্ভাব্য ক্রেতারা দাম হাঁকতে পারে। বিক্রয়যোগ্য সম্পদটি ওই ক্রেতাকে দেওয়া হবে, যে সর্বোচ্চ মূল্য হেঁকেছে। অন্যভাবে বললে, এটি টেন্ডার-ভিত্তিক ক্রয়বিক্রয়।
বাই' আস-সালাম: ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য তাৎক্ষণিক মূল্য পরিশোধ। এ ধরনের চুক্তিতে চুক্তির সময়েই নগদে মূল্য পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ক্রয়কৃত পণ্যটি সরবরাহ করা হবে চুক্তিতে উল্লিখিত পরবর্তী কোনো এক সময়ে। একে বাই' আল-ইস্তিসনা (উৎপাদিত হবে, এমন পণ্যের বিক্রি)-ও বলা হয়। কারণ অগ্রিম মূল্য পরিশোধিত উৎপাদিত পণ্যের লেনদেনের সাথে এটির মিল রয়েছে।১৯
বাই' বিসামান আজিল: পরবর্তীতে পরিশোধনীয় দামে বিক্রি করা। এটি এমন এক চুক্তি যেখানে ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেন হয়েছে পূর্বসম্মত সময়সীমা ও পূর্বনির্ধারিত মূল্য অনুসারে, যাতে সময়ের বিপরীতে লভ্যাংশও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু পরে বা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করা হবে বলে সময়ের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধিহারে মূল্য বাড়ানো যায় না। বর্তমানে সম্পদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়।
মা'ইন (বাইবেলে উল্লেখিত মা'ওন, মে'উন ও মে'ইন): শাব্দিক অর্থ ঝর্ণাধারা। প্রাক-ইসলামি দক্ষিণ আরবে সাবা'র পর দ্বিতীয় রাজ্য। মাইনীয় যুগের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৭০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৭০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত।
মাইসির: জুয়া। বাজি ধরার সংশ্লিষ্টতা থাকা যে-কোনো কর্মকাণ্ড, যেখানে বিজয়ী ব্যক্তি বাজি ধরা জিনিসটি লাভ করে এবং পরাজিত ব্যক্তি তা আরায়। শরীয়তে এটি হারাম।
মাদরাসা (বহুবচনে মাদারিস): মুসলিম উচ্চতর শিক্ষার প্রতিষ্ঠান যেখানে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞগণ দ্বীনি কিতাবাদির পাঠদান করেন।
মাল: সম্পদ বা উপার্জনের আধার। মূল্যের অধিকারী এবং শারীআ অনুযায়ী উপযোগ লাভে ব্যবহারযোগ্য যে-কোনো জিনিস।
মালিকি: মালিকি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মালিক ইবনু আনাস (৭১৫-৭৯৫)। তিনি বিশেষ জোরারোপ করতেন সুন্নাহ এবং নবি ﷺ-এর যুগে মদিনার প্রচলিত রীতিনীতি ও খুলাফায়ে রাশিদীনের ইজমার প্রতি।
মুকাসসাহ: পাল্টাপাল্টি ঋণ নিষ্পত্তিকরণ। পাল্টা কোনো লেনদেনের মাধ্যমে ঋণের নিষ্পত্তি করা।
মুকাসামাহ: ভাগাভাগি। একটি ভূমিকর ব্যবস্থা, যেখানে কর হিসেব করা হয় আনুপাতিক ফসল-ভাগাভাগি করের হার অনুযায়ী। ইমাম আবূ ইউসুফের মতে, এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য উপকারী এবং একই সাথে করদাতার প্রতি অবিচার-প্রতিরোধ করে।
মুজতাহিদ: ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করা ফকিহ, যিনি শারঈ বিষয়ে কোনো ইমাম বা মাযহাবের অনুসরণ না করে, শারীয়তের মূলনীতি অনুসারে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
মুদারাবা (কিরাদ ও মুকারাদাহ): লাভ-ও-ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসা। দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে চুক্তি, যেখানে পক্ষ দুই রকমের হতে পারে: (ক) পুঁজি সরবরাহকারী, বিনিয়োগকর্তা, বা রব্বুল মাল, এবং (খ) উদ্যোক্তা, বা মুদারিব, যে কিনা পূর্বসম্মত শর্ত অনুযায়ী ব্যবসার ব্যবস্থাপনা করবে। পূর্বনির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী অংশীদারদের মাঝে লাভের পরিমাণ বণ্টন করে দেওয়া তার দায়িত্ব। আর ক্ষতি হলে সেটা সম্পূর্ণই বহন করবে পুঁজি সরবরাহকারী। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার যে ক্ষতি হবে, তা হলো শ্রম ও সময়ের নিষ্ফল ব্যয়।
মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্ব (শারিকাতুল মুফাওয়াদাহ): পুঁজি ও মূলধন ভাগাভাগির ভিত্তিতে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায় যখন উভয়পক্ষ শর্তহীন কর্তৃত্ব ভোগ করে। মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্বে পক্ষগুলোর মাঝে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক নিশ্চয়তা ও স্বত্বের। মুফাওয়াদাহ অংশীদারিত্বের অংশীদারদের কর্তৃত্ব বা স্বত্ব শর্তাধীন নয়। লাভ ভাগাভাগি হবে অংশীদারদের প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে, যদিও বৃহত্তর অংশটি ব্যবস্থাপকের ভাগে যেতে পারে তার কর্মপ্রচেষ্টার প্রতিদান হিসেবে। ক্ষতি বহন করা হয় প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে। অংশীদারদের আর্থিক দায়ভারও এখানে শর্তহীন।
ইনান অংশীদারিত্ব: সে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব যেখানে সীমিত কর্তৃত্ব ভোগ করা হয় এবং লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি করা হয়। এখানে সম্পর্ক শুধু পারস্পরিক স্বত্বভিত্তিক। মুফাওয়াদাহ'র মতো পারস্পরিক নিশ্চয়তার নয়। ইনান অংশীদারিত্বে অংশীদারদের কর্তৃত্ব বা স্বত্ব শর্তাধীন। অংশীদাররা লভ্যাংশ পায় তাদের প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে, যদিও বৃহত্তর অংশটি ব্যবস্থাপকের ভাগে যেতে পারে তার কর্মপ্রচেষ্টার প্রতিদান হিসেবে। ক্ষতি বহন করা হয় প্রদত্ত পুঁজির অনুপাতে। অংশীদারদের আর্থিক দায়ভার এখানে শর্তাধীন।
মুরাবাহাহ: পণ্য কিনে ক্রয়মূল্যের চেয়ে লাভে বিক্রয়, যেখানে ক্রয়মূল্য স্পষ্ট থাকে। বর্তমানে এই চুক্তিতে কোনো সম্পদের অর্থায়নের জন্য ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তি করা হয়, যেখানে ব্যয়ভার ও লাভের সীমা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে অগ্রিম জ্ঞাত ও সম্মতিপ্রাপ্ত থাকে। ক্রয়ের নিষ্পত্তি পরবর্তীকালে সামষ্টিক মূল্যপরিশোধ বা কিস্তিতে পরিশোধের ভিত্তিতে হতে পারে। চুক্তিতে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে।
মুশারাকাহ; সমান অংশীদারীত্ব। দুই বা ততোধিক অংশীদারের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের জন্য এমন চুক্তি, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নগদ অর্থ বা পণ্যদ্রব্যের মাধ্যমে কিছু না কিছু পুঁজি সরবরাহ করে। ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত যেকোনো লভ্যাংশ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন করে দেওয়া হবে। কিন্তু ক্ষতি ভাগাভাগি করা হবে মূলধনের অনুপাতে।
যাকাত: কুরআনে আদিষ্ট একটি বাধ্যতামূলক দান। এটি ইসলামের মৌলিক ইবাদাত। এতে ব্যয় করার খাত কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত। এর বিস্তারিত বিধিবিধান এবং হিসেবের হার ও ভিত্তি নবি ﷺ-এর সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।
যামান: নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা। অথবা নিশ্চয়তার একটি চুক্তি, যেখানে নিশ্চয়তাদাতা কোনো সম্পদের মালিক কর্তৃক পূরণীয় কোনো দাবি বা দায়িত্বের লিখিত বর্ণনার নিচে স্বাক্ষর করবে। ঋণগ্রহিতা ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবে কি না, এরকম নিশ্চয়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও এই ধারণাটি খাটে।
রাশিদুন: সঠিক পথের অনুসারী চার খলিফা, যারা হলেন নবি ﷺ-এর সাহাবি এবং তাঁর অব্যবহিত পরবর্তী খলিফাবৃন্দ: আবু বকর (৬৩২-৩৪), উমর ইবনুল খাত্তাব (৬৩৪-৪৪), উসমান ইবনু আফ্ফান (৬৪৪-৫৬) এবং আলি ইবনু আবী তালিব (৬৫৬-৬১)।
আল-খলিফাতুর রাশিদ: সঠিক পথপ্রাপ্ত খিলাফাত, রাশিদুন খলিফাদের শাসনামল। মুসলিমরা এর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল এই অর্থে যে, সৎকর্মশীলতা ও আধ্যাত্মিকতার বিচারে শুধু এই খলিফাগণই আদর্শ। খিলাফাতে রাশিদাহ'র ব্যাপ্তিকাল ছিল ৬৩২ থেকে ৬৬১ সাল পর্যন্ত।
রা'স আল-মাল (বহুবচনে রু'উসুল আমওয়াল): মূলধন। রিবার ব্যাপারে আল-কুরআন বলেন, “যদি তওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) তোমরা পাবে।” (সূরা বাকারা ২: ২৭৯)। এ থেকে বোঝা যায় যে, সরল ও চক্রবৃদ্ধি সুদের মাঝে কুরআন কোনো পার্থক্য করে না।
রাহন: বন্ধক। ঋণের পারিপার্শ্বিক হিসেবে কোনো মূল্যবান সম্পদ ব্যবহার করা। ঋণগ্রহীতা যদি অর্থপরিশোধ না করে, তাহলে সেই বন্ধক রাখা সম্পদটি থেকে যাতে অর্থ উসুল করা যায়।
রিদ্দাহ: ধর্মত্যাগ। নবি ﷺ-এর মৃত্যুর কথা ঘোষিত হতে না হতেই কিছু গোত্র যাকাত পরিশোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। দৃশ্যত নবি ﷺ-এর মৃত্যুর ফলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই বিদ্রোহ মানেই মূর্তিপূজায় ফেরত যাওয়া ছিল না। যদিও এদের মাঝে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদারও ছিল। কার্যত এদের উদ্দেশ্য ছিল মদিনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। খলিফা আবু বকর ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে এই ধর্মদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
রিবা: সুদ। ঋণ লেনদেন বা কোনো দ্রব্যের আদানপ্রদানে এমন কোনো বৃদ্ধি, যা ঋণদাতা অপর পক্ষকে সমপরিমাণ কোনো প্রতিমূল্য দেওয়া ছাড়াই লাভ করবে।
বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিক উভয় প্রকার ঋণের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য এবং উভয়টিই শারীয়তে হারাম। রা'স আল-মালের আলোচনায় উল্লিখিত আয়াতটি দ্রষ্টব্য। আল-কুরআন বলে, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং রিবার যা কিছু বাকি আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো। যদি তোমরা না ছাড়ো তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। আর যদি তাওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন (রুউসু আমওয়ালিকুম) ওপর তোমরা পাবে।” (সূরা বাকারা ২: ২৭৮-২৭৯)।
রিবাউল কুরআন: কুরআনে উল্লিখিত রিবা। বিভিন্ন পরিভাষা দিয়ে এটি বোঝানো হয়, যেগুলো আবার ক্ষেত্রবিশেষে সমার্থক। এগুলো হলো:
➡ ঋণ রিবা: আর্থিক ঋণের সাথে সংশ্লিষ্টতা বোঝাতে,
➡ রিবা আল-জাহিলিয়্যাহ: জাহিলিয়াত বলতে ইসলামের পূর্বের যুগ, তথা অজ্ঞতার যুগ,
➡ রিবা আদ-দুয়ুন, বা রিবা আল-কুরুদ: দুয়ুন ও কুরুদ অর্থ ঋণ,
➡ রিবা আন-নাসি'আ: অর্থাৎ পরিশোধের সময়সীমার সাথে সংশ্লিষ্ট রিবা (যাতে বাকিতে লেনদেন করা হয়)।
রিবা আল-বুয়ু' (পণ্য রিবা): কুরআনে নয়, সুন্নাহতে উল্লিখিত রিবা। এর উদ্ভব হতে পারে (ক) বিলম্বিত সময়কাল-সহকারে ক্রয়বিক্রয় অথবা (খ) উপস্থিত ক্রয়বিক্রয়ে বাড়তি পণ্য প্রদানের ফলে। এই রিবা দুই প্রকার:
➡ (ক) রিবা আল-ফাদল: কোনো জিনিস বা পণ্যকে একই ধরনের অন্য পণ্য বা একই পণ্যের সাথে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সহকারে আদানপ্রদানের সময় 'পরিমাণের বৃদ্ধি'। যেমন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, বা গমের বদলে গম তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য আদানপ্রদান করা।
➡ (খ) রিবা আন-নাসি'আ: কোনো জিনিস বা পণ্যকে একই ধরনের অন্য পণ্য বা একই পণ্যের সাথে 'দেরিতে বা ভবিষ্যতে' সরবরাহ করার সময় আদানপ্রদানের কারণে সৃষ্ট বৃদ্ধি। যেমন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, বা গমের বদলে গম দেরিতে বা ভবিষ্যতে সরবরাহের জন্য আদানপ্রদান করা।
লাখমি: তারা পূর্বদিকে গাসসানিদের মতোই একটি জাতি ছিল। তাদের উদ্ভব তানুখ নামক ইয়েমেনি গোত্র থেকে। তারা উত্তর আরব থেকে তৃতীয় খ্রিষ্টীয় শতকের শুরুর দিকে স্থানান্তরিত হয়। বসতি স্থাপন করে ফুরাতের পশ্চিম দিকে। লাখমিরা পারস্য সাম্রাজ্যের মিত্র ও সুবিধাভোগীতে পরিণত হয়। গাসসানিদের মতো তারাও পারস্য সাম্রাজ্য ও এর সীমান্তে বেদুইন আক্রমণের মাঝে বাফার হিসেবে কাজ করত। আরবিভাষী লাখমিরা লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করত সিরিয়ান ভাষা। বেশিরভাগই ছিল পৌত্তলিক, অল্পকিছু খ্রিষ্টান। তাদের শেষ রাজা তৃতীয় আন- নুমান (৫৮০-৬০২ খ্রিষ্টাব্দ)-এর শাসনামলে তিনি খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব বাড়তে থাকে।
শাইখ: প্রবীণ। প্রাচীন আরবে বয়স, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত গুণের কারণে কোনো গোত্র কর্তৃক তাদের নেতা হিসেবে বাছাইকৃত ব্যক্তি। তিনি অন্যান্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন কিন্তু গোত্রের সকল বিষয়ের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃপক্ষ নন। বিচারিক ব্যাপার-স্যাপার ও গোত্রের ভেতরকার সংঘাতের ক্ষেত্রে তিনি পরিবার-প্রধানদের নিয়ে গঠিত একটি পর্ষদের সাথে পরামর্শ করবেন।
শাফিয়ি: শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইদরিস আশ-শাফিয়ি (৭৬৭-৮১৯)। তার জন্ম গাযায়। ইমাম মালিক ও ইমাম মুহাম্মাদ -এর ছাত্র শাফিয়ি হানাফী ও মালিকীদের মাঝামাঝি একটি পন্থা অনুসরণ করেন।
শারীআ: কুরআন, সুন্নাহ ও ফিক্হের ভিত্তিতে ইসলামের পবিত্র আইনের সমষ্টি।
সবর: শারীরিক ও মানসিক ধৈর্য ও সহনশীলতা। সেইসাথে ইসলামে সবরের সম্প্রসারিত অর্থ হলো আল্লাহর আদেশ ও নির্দেশ মান্য করার ক্ষেত্রে, বিপথে না গিয়ে সুপথে থাকার ক্ষেত্রে, শত্রুর সাথে সামরিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে, এবং মানুষকে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করার ক্ষেত্রে ভক্তিসমৃদ্ধ ধৈর্য ও সহনশীলতা।
সাফাওয়ি ভূমি: রাষ্ট্রীয় ভূসম্পত্তি বা জায়গির। এই শব্দটি দিয়ে এমন জমিকে বোঝানো হয়, যার মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। কারণ, (ক) ইসলামি বিজয়ের পর মূল মালিক তার জমি ত্যাগ করে শত্রুরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়া, (খ) উত্তরাধিকার-বিহীন কোনো অমুসলিম মালিক মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হওয়া, এবং (গ) মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কোনো মালিক উত্তরাধিকার-হীন অবস্থায় মারা যাওয়া। শুরুর দিকে এসব জমিকে সাধারণভাবে মুসলিম জনগণের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যেটাতে রাষ্ট্র প্রতিনিধি হিসেবে থাকে। কিন্তু উমাইয়্যা যুগ থেকে শুরু করে তা পরিবর্তিত হয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিদের কাছে জমিগুলোর মালিকানা হস্তান্তরিত করা হয়।
সাবা': বাইবেলীয় শেবা। ইসলামি-পূর্ব আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চার রাজ্যের মাঝে সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজ্য। সাবাঈ যুগের ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫০ খ্রিষ্টপূর্ব বা কারো কারো মতে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১১৫ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত।
সাবুর: সবরকারী ব্যক্তি।
সাফ্ট: টাকা লেনদেন। মুদ্রার ক্রয় বা বিক্রয়।
সুকুক (একবচনে সাক্): জমা সনদ। কোনো নথি বা সনদ, যা দিয়ে সাক (সুকুকের একবচন) বা অন্তর্নিহিত সম্পদের অবিভাজিত আনুপাতিক মালিকানা প্রমাণ করা হয়। এটি সমান মূল্য ধারণ করে, তবে বেশি বা ছাড়প্রদত্ত মূল্যে বিনিময়যোগ্য হয়।
সুন্নাহ: নবি ﷺ-এর পথ ও পদ্ধতি। সুন্নাহ বলতে বোঝানো হয় নবি ﷺ তাঁর জীবদ্দশায় যা কিছু বলেছেন, করেছেন ও সম্মতি দিয়েছেন, তার সবকিছুকে। শারীআর উৎস হিসেবে সুন্নাহ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত: (ক) নবিজির কথা, (খ) তাঁর কাজ এবং (গ) অন্যদের কাজের প্রতি তাঁর সম্মতি। নবিজির কথা আল্লাহর সরাসরি বাণী নয়, যদিও তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। এগুলো কুরআনের আয়াত ও বিধিবিধানের ব্যাখ্যা ও বিশদ বর্ণনা প্রদান করে। কুরআনের সাথে যাতে সুন্নাহ মিশে না যায়, এজন্য কুরআন লিখে রাখার সময় নবি ﷺ তাঁর সাহাবিদের আদেশ দিয়েছেন যেন সুন্নাহ একইভাবে না লিখা হয়। তিনি আদেশ করেন, এগুলো মৌখিকভাবে প্রচার করার জন্য। ফলে মুসলিমরা আল্লাহর কালাম কুরআন এবং নবিজির কথা ও কাজ তথা হাদিসের মাঝে পার্থক্য বুঝতে সমর্থ হয়। লিখিতভাবে হাদীস সংকলনের নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা দেখা যায় উমাইয়্যা খলিফা উমর ইবনু আবদিল আযিযের সময়, অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
সুফতাজাহ: মানি অর্ডার বা হুন্ডি। অর্থের অধিকারী কাউকে এমন কোনো জমা উপকরণ প্রদান করা, যেটাকে সে ভবিষ্যতের কোনো সময়ে এবং অন্য কোনো স্থানে ব্যবহার বা নগদ টাকায় রূপান্তরিত করতে পারবে। তাছাড়া, সুফতাজাহ প্রণয়ন করা হতো “বাহকের কাছে পরিশোধযোগ্য” হিসেবে।
সুফিবাদ (বিশেষণ সুফি): আত্মিক বিশুদ্ধতা। আল্লাহর ইবাদাতের জন্য পার্থিব জীবনকে প্রত্যাখ্যান করা। সূফ অর্থ পশম। পোশাক পরিধানের বদলে রুক্ষ পশম (সুফ)-এর পোশাক পরিধান করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
হাওয়ালা: টাকা স্থানান্তর। এই চুক্তিতে ঋণগ্রহীতা তার ঋণের ভার কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। হাওয়ালা অনেকটা সুফতাজা'র সাথে সাদৃশ্য রাখে, যেখানে ঋণগ্রহীতা আবার তার নিজের ঋণগ্রহীতার কাছে, বা ঋণ পরিশোধে সক্ষম অন্য কারো কাছে সেই ঋণ হস্তান্তরিত করত। দুইজনের বদলে এতে তিন বা ততোধিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট হয়। এটি আধুনিক হস্তান্তর বিলের (Bill of Exchange) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই হাওয়ালা থেকে ফ্রেঞ্চ পরিভাষা "Aval”-এর উদ্ভব হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া হাওয়ালা জারি করা হতো “বাহকের কাছে পরিশোধযোগ্য” হিসেবে।
হাদরামাওত: ইসলামপূর্ব দক্ষিণ আরবের চার রাজ্যের একটি। অপর তিনটি হলো সাবা’, মা'ইন ও কাতাবান। এর স্থায়িত্বকাল প্রায় ৪৫০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে শুরু করে প্রথম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত। সাবায়ি ও মাইনিয়দের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেলেও এই রাজ্যটি মশলা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
হাক্ক মালি: আর্থিক অধিকার। হাক্ক মালি হলো আর্থিক সম্পদের ওপর অধিকার। এ ধরনের অধিকারের উদাহরণ হলো হাক্কুন্দ দাইন (ঋণ অধিকার), যদি সম্পদটি ঋণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, এবং হাকুত তামাল্লুক (মালিকানা অধিকার)।
হাদিস: দ্রষ্টব্য আহাদিস।
হানাফি: হানাফি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত (৬৯৯-৭৬৭)।
হাম্বলি: হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ ইবনু হাম্বল (৭৮৪-৮৫৫)। তিনি ইজমা ও কিয়াসের সীমা সংকুচিত করে দিয়ে, কঠোরভাবে আক্ষরিক সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। তিনি মধ্যমপন্থী শাফিয়ির শিক্ষার্থী হলেও ইসলামি ফিক্হের ক্ষেত্রে আপসহীন নীতি অনুসরণ করেন। তার অনুসারীরা প্রধানত সৌদি আরব অঞ্চলে অবস্থান করেন।
হিবাহ: উপহার। কোনো ব্যক্তিকে প্রদত্ত উপহার।
হিসবাহ: জবাবদিহিতা, সরকারি দায়িত্ব, জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। এটি ইসলামের একটি ধর্মীয় আদেশ। যার লক্ষ্য হলো, ধর্মীয়ভাবে আদিষ্ট বিষয় তথা মা'রুফের প্রয়োগ, এবং অন্যায় তথা মুনকার-এর প্রতিহত করা। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার এবং বাজার ও সরকারি কর্মকাণ্ড উভয়ই এতে অন্তর্ভুক্ত।

টিকাঃ
১. আহলুর রায়ের সাথে তাদের পার্থক্যের মূল জায়গা ছিল কর্মক্ষেত্রে, আহলুর রায় ইমামগণ অনাগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কিয়াস ও যুক্তি ব্যবহার করে বিধান আহরণ ও লিপিবদ্ধ করতেন, যা আহলুল হাদীসগণ করতেন না। এমন নয় যে আহলুর রায় ইমামগণ যুক্তিকে সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দিতেন বা মাসলাহাত ও জনকল্যাণের মূলনীতিগুলোর আলোকে বিধান পরিবর্তন করতেন। মৌলিকভাবে উভয় দলই সুন্নাহর অনুসারী ও আহলুস সুন্নাহরই অংশ, সালাফের যুগে তাদের মধ্যকার পার্থক্যটি ছিল ইজতিহাদ ও ফিকহকে ঘিরে, ধর্মতাত্ত্বিক কোনো মতবিরোধ ছিল না।
১. একে আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং-এ ইজারা মুনতাহিয়া বিত তামলীক-ও বলা হয়। এর কিছু পদ্ধতি শরয়ী নীতিমালার পরিপন্থী, যেমন লিজ কন্ট্রাক্টে বিক্রয়ের শর্ত জুড়ে দেওয়া। - সম্পাদক।
১. বাই আল-ইস্তিসনার সঙ্গে সালামের পার্থক্য হলো, বাই' সালামে পণ্য সরবরাহ বিলম্বিত হলেও চুক্তির সময়ে পণ্য বাজারে থাকে। কিন্তু বাই আল-ইস্তিসনা'-য় সাধারণত পণ্য প্রস্তুত থাকে না। বানিয়ে দেওয়ার চুক্তি করা হয়।- সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00