📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মিশরের সংস্কারকবৃন্দ

📄 মিশরের সংস্কারকবৃন্দ


নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তার নৌবাহিনী নিয়ে ১৭৯৮ সালে আলেকজান্দ্রিয়াতে অবতরণ করার আগে উসমানীরা এবং মোটাদাগে পুরো বিশ্ব এই একটি দেশের কৌশলগত গুরুত্ব টের পায়নি। অথচ অল্প কয়েক শতাব্দী আগেই মঙ্গোলদের পরাজিত করতে বড়সড় ভূমিকা রেখেছে দেশটি। মিশরের মামলুকদের পরাজিত করার পরও উসমানীগণ দেশটির প্রতি থোড়াই মনোযোগ দিয়েছেন। একে ছেড়ে দিয়ে গেছেন তার প্রাক্তন মালিক মামলুকদের হাতেই। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে একজন প্রশাসক হিসেবে পাশাকে নিয়োগ দিয়ে তুর্কি জেনিসারির এক সেনাবাহিনীর দখলদারিত্বে একে রেখে চলে যান। দেশটি বারোটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি প্রদেশের নেতৃত্বে ছিলেন 'বেগ' উপাধিধারী একজন করে মামলুক। কেন্দ্রকে বাৎসরিক একটি খাজনা প্রদান করার মাধ্যমে মামলুক বেগগণ সেই ভূমির শাসনকার্যে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করেন। ইচ্ছেমতো কর আরোপ করে গড়ে তোলেন নিজস্ব সেনাবাহিনী। ভাইসরয় ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান কি না, এই ভয়ে তাদের মেয়াদ দুই থেকে তিন বছরের বেশি রাখা হতো না। ফলে ভাইসরয়ের মনোযোগ ছিল ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার দিকে। অচিরেই দেশের ব্যবস্থাপনাকার্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন তারা। ইস্তাম্বুল থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ভাইসরয় অল্পকাল পরেই সেই ভূমি বা সেনাবাহিনীর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারান। দেশটি পুরোদমে চলে যায় মামলুকদের হাতে।
ইস্তাম্বুলের পাশা ও মামলুক বেগদের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের অধীনে স্থানীয়রা ক্রমাগত দরিদ্র হতে থাকে। ছিল করের বিরাট বোঝা, ভঙ্গুর সেচব্যবস্থা, জমির পুনর্দাবি থেকে বিতাড়ণ, যথাযথ চাষাবাদ বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। অপরদিকে শাসকদের কাছ থেকে নিরলস নির্দয়তা-তুর্কি পাশা ও মামলুক বেগ উভয়ের কাছ থেকে। তারা শুধু করের কোটা পূর্ণকরণেই তৎপর ছিলেন। খেটে খাওয়া প্রজারা পড়ে থাকে বঞ্চিত অবস্থায়। করের কোটাপদ্ধতি বা নিযামুল ইলতিযাম প্রবর্তিত হয়েছিল ভূমির ব্যবস্থাপনা একজন প্রতিনিধির হাতে অর্পণ করে দেওয়ার জন্য। এই পদের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হলে বেগ বা প্রাদেশিক প্রশাসকের কাছে কর-রাজস্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রস্তাব করতে হতো। পরে পাশার কাছে বেগ, তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাশা সেই সর্বোচ্চ করের কোটা প্রস্তাব করতেন। দিনশেষে করের বোঝা নিদারুণভাবে এসে পড়ত ভূমি চাষাবাদকারীদের ওপর। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো, মোট কর রাজস্ব সর্বাধিককরণের জন্য প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করতে হতো, যেন ভূমির পেছনে খরচ সর্বনিম্ন রাখা যায়। দুর্নীতি ও ঘুষের উপস্থিতি দেখা যায়। স্থানীয়দের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে আসে নিরাপত্তাহীনতা, দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। রোমানদের অধীনে সে অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় আট মিলিয়নে পৌঁছেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দী শেষ হতে হতে তা আগের আকৃতির এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে (Hitti, 1970)1
মিশরের গভর্নরগিরি নিয়ে মামলুকদের মাঝে অন্তর্কলহ এবং কেন্দ্র সরকার থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কলকৌশল চলমান থাকে। এরই মাঝে ব্রিটেনের সাথে ক্রমাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ফ্রান্স আচমকা মিশরের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর জন্য তাদের খোলাখুলি অজুহাত ছিল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দায়ে মামলুকদের শায়েস্তা করা এবং ইসলামের মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার করা। বোনাপার্টের আরবিতে প্রচারিত যুদ্ধ-প্রোপাগান্ডায় এই কথাগুলোই বলা হয়, যা মামলুকরা অগ্রাহ্য করেন। বোনাপার্ট যখন ১৭৯৮ সালে আলেকজান্দ্রিয়াতে অবতরণ করেন, তখনই কেবল স্থানীয় মিশরীয়দের দুর্দশায় সামরিক বিরতি আসে। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফরাসি অভিযানের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্রিটেন সজাগ হয়ে ওঠে, আর তা ছিল এশিয়া ও পশ্চিমের মাঝে ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যপথকে দখল করা (প্রাগুক্ত)। প্রায় এক শতাব্দী পরে মিশর নিজেকে আবিষ্কার করে ব্রিটিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে দেশটিকে ব্রিটিশদের করদরাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আবদুহু ও আফগানি

📄 আবদুহু ও আফগানি


এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই আবির্ভূত হন একজন মিশরীয় লিবারেল সংস্কারক মুহাম্মাদ আবদুহ (১৮৪৯-১৯০৫)। তার শিক্ষক জামালুদ্দীন আফগানি (১৮৩৯-৯৭)-সহ তারা ছিলেন মিশরের ইসলামে আধুনিকতাবাদের অগ্রনেতা। আবদুহু ও আফগানি রাজনৈতিক ইসলামকে পশ্চিমা দখলদারিত্বের হাতে পর্যুদস্ত হতে দেখে মানুষের মনে
➡ প্রথমত, পশ্চিমা শক্তি ও তার হাত ধরে আসা সবকিছুর প্রতি এক প্রবল ঘৃণার অনুভূতি, এবং
➡ দ্বিতীয়ত, ঈমানের প্রহরী হিসেবে আলিমগণের কাছে এই প্রত্যাশা যে, তারা সামনে থেকে পথ দেখাবেন ও সঠিক কর্মনীতি ঠিক করে দেবেন।
আলিমগণ সাড়া দিয়েছিলেন বটে। কিন্তু তাদের কেউ কেউ দোটানায় ছিলেন। পশ্চিমা শক্তিগুলো আগ্রাসী এবং অবশ্যই তাদের বিতাড়িত করে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক-রাজনৈতিক ধ্যানধারণায় পশ্চিমাদের উন্নতি দেখে মুসলিম দেশগুলোর এক বিরাট অংশ হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করে। তারা নিজেদের পশ্চাৎপদতা টের পায়। তারা ভাবে, মুসলিম দেশগুলোকে অগ্রগতি ও উন্নতি করতে হলে এই পশ্চিমা প্রযুক্তিগুলো আত্মস্থ করতে হবে। হয়তো-বা তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শও গ্রহণ করে নেওয়া লাগতে পারে। কিন্তু সেটা করতে হবে এমনভাবে, যেন মুসলিম দেশগুলোকে পশ্চিমা দখলদার শক্তির কাছে নমনীয় মনে না হয়। এই উভয়সংকটেই পড়েছিলেন মুহাম্মাদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫), এবং তার শিক্ষক ও সহসংগ্রামী জামালুদ্দীন আফগানি (১৮৩৯-৯৭)।
আফগানি ও আবদুহ উভয়ই ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী। আহমাদ ওরাবির অধীনে মিশরীয় সেনাবাহিনীর ব্যর্থ বিদ্রোহের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন তারা। এরই ফলে আবদুহকে সিরিয়ায় নির্বাসিত হতে হয়েছিল। দুজনেই সুন্নি এবং ধর্মীয় পরিসরে উঁচু তবকার। তা ছাড়া মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি হওয়ার কারণে দেশটিতে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় আসনে। দুজনেই পশ্চিমা সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেছেন। ফ্রান্সে ভ্রমণ ও বক্তৃতা প্রদান করেছেন। যৌথভাবে একটি আরবি গবেষণা নিবন্ধ সম্পাদনা করেছেন প্যারিসে। কিন্তু ইসলামের অবহেলিত অবস্থা ও দখলকৃত ভূমির সমস্যার সমাধানে তাদের পদ্ধতিতে ভিন্নতা ছিল। ইসলামকে জীবনযাপনের পদ্ধতি হিসেবে পুনর্জীবিত করা এবং মুসলিম বিশ্বকে দখলদার থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে আফগানি ও আবদুহ একমত। কিন্তু পশ্চিমা বিজ্ঞান ও সামাজিক-রাজনৈতিক ধ্যানধারণা আমদানি করার ব্যাপারে তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।
জামালুদ্দীন আফগানির দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মুসলিমদের সমস্যার নিরাময় বের হতে হবে স্বয়ং ধর্ম থেকেই। মুসলিমদের সমস্যা সমাধানে বা অবস্থার উন্নয়নে পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানি কোনো সর্বরোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করবে না। তার মতে আমদানিকৃত এই আধুনিকায়নের যে-কোনো প্রচেষ্টা উপকারের চেয়ে মারাত্মক ক্ষতি করবে। সমস্যাটির উত্তর ভেতর থেকে, শরীয়ত থেকে আসতে হবে। তবে তিনি এও বলেন যে, পৃথিবীর পরিবর্তনের সাথে তাল মেলানোর জন্য শরীয়তকেও পুনঃনবায়ন করে যেতে হবে। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা প্রত্যাহার করতে হবে, এবং আলিমগণের উচিত ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে যৌক্তিক চিন্তা ও বিবেকবুদ্ধির ব্যবহারকে উৎসাহ করা। এতে করে সেসকল ফতোয়া মুসলিমদের সমসাময়িক প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই দিক দিয়ে তার মতামত শিয়া আলিমগণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যারা ইজতিহাদ ও নবায়নের পক্ষপাতী। রাজনৈতিকভাবে, আফগানি সংস্কার অর্জনের জন্য রাজনৈতিক বিপ্লবের পক্ষে। এই ব্যাপারে মুহাম্মাদ আবদুহ তার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন।
মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি হওয়ার ফলে আবদুহ যে শুধু দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় আসনের অধিকারী ছিলেন, তা না। সেইসাথে তার ফতোয়াও অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে গণ্য হয়। একজন দেশপ্রেমিক মিশরীয় হিসেবে আবদুহ বিদেশি পরাশক্তির হাতে তার দেশের পদানত হওয়াকে ঘৃণা করেন। কিন্তু একজন মুসলিম নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে মিশরের রাজনৈতিক সীমান্তের ঊর্ধ্বে সমগ্র উম্মতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই তাদের সমস্যা ও পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তাকে সকল মুসলিমের স্বার্থ মাথায় রাখতে হবে। মিশরীয় ও আরব হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন যে, আরব জাতীয়তাবাদ নয়, বরং সর্বজনীন ইসলামপন্থাই মুসলিমদের রাজনৈতিক পথ সুগম করবে। তার সংস্কার আহ্বানের মাঝে ইতিহাস ও দূরদর্শিতার এক গভীর বোধের দেখা মেলে। পশ্চিম যে সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানে উন্নতি করতেই থাকবে এবং মুসলিম প্রাচ্য এসব ক্ষেত্রে আরও পিছিয়েই পড়তে থাকবে, এই পরিস্থিতিকে তিনি অবশ্যম্ভাবী হিসেবে দেখেন। তাই তিনি যুক্তি দেন, পশ্চিমের সাথে সাথে আসা সবকিছুই শয়তানি উপাদান না। শয়তানি বিষয়গুলো তো অবশ্যই পরিহার করতে হবে। কিন্তু পশ্চিম থেকে আসা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষাগত উন্নতি এবং রাজনৈতিক নিত্যনতুন নতুন রূপ ও গণতন্ত্রের প্রয়োগ সবকিছুই ইসলামি প্রাচ্যের জন্য উপযুক্ত। তার মতে ইসলাম ও পশ্চিমা বিজ্ঞানের মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, বরং মুসলিমদের উচিত পশ্চিমের বিজ্ঞান শিখে নিয়ে সেটাকে ইসলামি ভূমির জন্য আত্মস্থ করা ও অভিযোজিত করিয়ে নেওয়া (Esposito, 2001)।
তিনি ভাবতেন, ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শকে অবজ্ঞা না করেই জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি পশ্চিমের ব্যবহারিক পদ্ধতিকে ইসলামি শিক্ষা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝে সংযোজিত করা সম্ভব। তিনি বলেন যে, ইসলামি জ্ঞানের সীমানাকে প্রসারিত করে এতে অন্যান্য জাগতিক জ্ঞানের শাখাকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আর মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত আধুনিক বিজ্ঞান (Armstrong, 2000)। লক্ষণীয় যে, ১৯৫০-এর শেষাংশ এবং এমনকি ষাটের দশকের শুরুতেও আল-আযহারের শিক্ষাক্রম শুধুমাত্র ধর্মীয় অধ্যয়নের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। ষাটের দশক থেকে এতে চিকিৎসাবিদ্যা, বিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষার মতো বিষয়াদি যুক্ত হতে থাকে। ১৯৫২ সালের বিপ্লবের হাত ধরে আসা সরকারের অধীনে। শরীয়তের ব্যাপারে মুহাম্মাদ আবদুহ'র মতও আফগানির অনুরূপ। সমাজের দ্রুত অগ্রগতির সাথে যে শরীয়তের তাল মেলানো উচিত, সে ব্যাপারে জোর দেন তিনি। বিশেষত সামাজিক আইনের ব্যাপারে এখান থেকে এমন আইনি ধারণা ও বিধিমালা আহরণ করা উচিত, যা ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি আধুনিকায়নের পথেও কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না।
মুহাম্মাদ আবদুহ তার পরে আগত বহু বুদ্ধিজীবীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। যেমন মুহাম্মাদ রাশিদ রিজা (১৮৬৫-১৯৩৫)। রাশিদ রিজাই এমন এক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেন, যা পুরোপুরি আধুনিকায়িত হওয়ার পাশাপাশি সম্পূর্ণরূপে শরীয়তের ভিত্তিতে চলবে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 হাসান আল-বান্না এবং ইখওয়ানুল মুসলিমীন

📄 হাসান আল-বান্না এবং ইখওয়ানুল মুসলিমীন


মিশরে ১৯২৮ সালে জামাত আল-ইখওয়ানুল মুসলিমীন (মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ) প্রতিষ্ঠিত হয় হাসান আল-বান্নার (১৯০৬-৪৯) হাত ধরে। আল-বান্না বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিকায়নের পশ্চিমা সামাজিক উপাদানগুলো ইসলামি সমাজের জন্য অনুপযুক্ত। সেগুলো মোটাদাগে অবক্ষয় আর পতনই নিয়ে আসছে শুধু (Bari, 1995)। তার প্রতিষ্ঠিত ইখওয়ানের লক্ষ্য হলো মিশরের গণমানুষের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে ধর্মীয় বোধ ও ইসলামি আদর্শ জাগরুক করে তোলা। সংঘটনটির অন্যান্য উদ্দেশ্যও ছিল। তা হলো ইসলামি বিশ্বাসকে পুনরুজ্জীবিত করা, যাকাত ও সদাকার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে অভাবীদের জন্য সামাজিক কল্যাণের ব্যবস্থা করা। আর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য হলো ইসলামি নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত করা (প্রাগুক্ত)। আল-বান্নার মতে, আগে জনগণের অন্তর পরিশুদ্ধি ও তাদের ইসলামি মূল্যবোধের দিকে ফিরিয়ে না আনলে এসব লক্ষ্য অর্জিত হবে না।
গণ-আন্দোলন হিসেবে ইখওয়ান প্রাথমিক সমর্থন লাভ করে। সদস্যদের শিক্ষাগত ও ধর্মীয় অবস্থা উন্নয়নের একটি আন্দোলন হিসেবে দেখা হয় একে। তা ছাড়া মিশরের মাটিতে ব্রিটিশ দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করায় জাতীয়তাবাদীদের সমর্থনও পায় এটি। কিন্তু ১৯৫২ সালে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লবের পর সরকারের সুনজর-বঞ্চিত হয় ইখওয়ানুল মুসলিমীন। এটির এক সদস্যের বিরুদ্ধে দেশটির রাষ্ট্রনেতাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। ফলে দলটিকে ১৯৫৪ সালে নিষিদ্ধ এবং বিলুপ্ত করা হয়। মিশরের ২০০৫ সালের নির্বাচন চলাকালীনও দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। এ সত্ত্বেও ইসলামপন্থিগণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রায় ২০% আসন জয় করে নেন। তাদের নির্বাচনি স্লোগান ছিল-ইসলামই সমাধান।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভারতবর্ষের সংস্কারকবৃন্দ

📄 ভারতবর্ষের সংস্কারকবৃন্দ


ভারতে বেড়ে ওঠা মুহাম্মাদ ইকবাল (১৮৭৬-১৯৩৮) এমন এক সংস্কারকের দৃষ্টান্ত, যিনি পশ্চিমে শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে ইসলাম ও ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত করেন। তিনি জার্মানি থেকে পিএইচডি এবং ইংল্যান্ডের লন্ডন থেকে আইনের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন (Armstrong, 2000)। আবদুহ ও আফগানির কাছাকাছি বিশ্বাস পোষণ করতেন। আধুনিকতাবাদে তিনি আগ্রহী, কিন্তু বিশ্বাস করতেন এই আধুনিকতা অর্জন করতে গিয়ে ইসলাম ও ইসলামি সংস্কৃতিকে ছুঁড়ে ফেললে চলবে না। আধুনিকতাবাদ ও ধর্মের সম্পর্ক সম্পর্কে তিনি বলেন যে, যে-কোনো ধর্মের চেয়ে ইসলামই আধুনিকতাবাদের আন্দোলনগুলোকে আত্মস্থ করতে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। কারণ এমন এক ধর্ম, যা সর্বদা মুসলিমদেরকে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণ করতে বলে। পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা থেকে শিখতে এবং অপরকে শেখাতে বলে-যাতে জ্ঞানের ভাণ্ডার বৃদ্ধি পায়। ইকবালের মতে, ইসলাম সবচেয়ে যৌক্তিক ধর্ম। আল্লাহ যে চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণের আদেশ দিয়েছেন, তার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি হিসেবে ইসলাম এবং বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিকাশের মাঝে তিনি কোনো সাংঘর্ষ দেখেন না। পশ্চিমের যে অগ্রগতি, তা ইসলামের ওপর খ্রিষ্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়। বরং এর কারণ হলো মুসলিমরা তাদের ধর্মের সম্ভাবনাগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেনি। এই স্বস্তিদায়ক চিন্তা হয়তো মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং নিজেদের ধর্ম ও অতীত ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাস শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00