📄 ওহাবি আন্দোলন
ওহাবি আন্দোলনের নামকরণ করা হয়েছে এর প্রতিষ্ঠাতার নামে, যার আবির্ভাব আরব উপদ্বীপের একদম কেন্দ্রস্থানীয় জায়গায়। জীবন ও সমাজ পুনর্নির্মাণের জন্য মুসলিমদের কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামের মৌলিক শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব (মৃ. ১৭৯২) এক আপসহীন মৌলিক সংস্কার হাতে নেন। সুফিবাদ ও অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে আগত যেসব আচার-প্রথাকে তিনি অনৈসলামিক হিসেবে বিবেচনা করতেন, সেগুলো থেকে ইসলামকে পরিশুদ্ধ করার ডাক দেন। এদিক থেকে তাকে তার পূর্বসূরি সংস্কারক ইবনু তাইমিয়্যার (১২৬৩-১৩২৮) অনুসারী হিসেবে দাবি করা চলে।
ইসলামি ভূমিগুলো যখন মঙ্গোল দখলদারিত্বের অধীনে ছিল, তখন ইবনু তাইমিয়্যাও অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অনুরূপভাবে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইবনু আবদুল ওয়াহহাবও ইজতিহাদকে প্রত্যাখ্যান করেননি। কিন্তু ইবনু তাইমিয়্যার সাথে তার পার্থক্য হলো, ইজতিহাদের ভিত্তি হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইবনু আবদুল ওয়াহহাব ছিলেন খুবই কঠোর। ইসলামের মধ্যযুগের সকল (বাতিল) মতাদর্শকে অস্বীকার করেন তিনি। আর নিজে আদতে ছিলেন আগাগোড়া হাম্বলি (ফযলুর রহমান, ১৯৭০)।
নবি -এর কর্মকাণ্ডের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন অনুপ্রবেশকারী রীতিনীতি থেকে ইসলামকে মুক্ত করতে ওহাবি আন্দোলন সফল হয়েছে বটে। কিন্তু ওহাবিগণ শরীয়তকে নতুনত্বের এমনসব মৌলিক উপকরণ থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছেন, যেগুলো ফিকহি বিষয়ে বিদ্যমান ছিল। অবশ্য তারা ইসলামি সাম্যবাদ ও সহযোগিতার নীতিকে সফলভাবে মুক্ত বাতাসে নিয়ে আসেন। সমবায় কৃষিপল্লী প্রতিষ্ঠায় বেশ উন্নতি করেছিলেন তারা (প্রাগুক্ত)।
উসমানী সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা অর্জনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ওহাবিদের। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব উসমানীদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করেন এবং মধ্য আরব ও পারস্য উপসাগরে প্রতিষ্ঠিত করেন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু তুর্কিরা তো সেটা মেনে নেবেন না। এই আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার মিশরের প্রশাসক মুহাম্মাদ আলিকে আরব পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব প্রদান করে। ১৮১১ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া এক যুদ্ধে মুহাম্মাদ আলির সেনাবাহিনী ওহাবিদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়। মধ্য আরবকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে উসমানী শাসনের অধীনে। সামরিক পরাজয় সত্ত্বেও ওহাবি আন্দোলন অনেক মুসলিমদের মাঝে সেই শুরুর দিকের বিশুদ্ধতাবাদী ইসলামের স্মৃতি জাগরুক করে তোলে। দেখিয়ে দেয় ইসলামি রীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র স্থাপনের সম্ভাবনা।
ওহাবি আন্দোলন আবারও প্রাণ ফিরে পায় এবং ১৯৩২ সালে স্থাপিত সৌদি আরব রাজ্যের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশে আস-সউদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আযীয ইবনু সাউদ ক্ষমতায় আরোহণ করেন। আরবের উত্তরাংশে হাইল অঞ্চলে রশিদ পরিবারের শাসনের অবসান ঘটান ১৯২১ সালে। স্বঘোষিত "আরবরাজ” শরিফ হুসাইনের আসন মক্কা দখল করেন ১৯২৪ সালে। তারপর ১৯২৫ সালে এগিয়ে যান মদীনা ও তার নিকটস্থ জেদ্দা দখল করার জন্য। তিনি ১৯৩২ সালে নিজেকে আরবের রাজা ঘোষণা করেন এবং অঞ্চলটির নামকরণ করেন কিংডম অব সাউদি আরাবিয়্যা। এই নাম ও এই রাজবংশ আজও পর্যন্ত বহাল রয়েছে। নতুন রাজ্যে রাতারাতি পরিবর্তন প্রবর্তন করেন তিনি। অবশ্য আজকের দিন পর্যন্ত আরবের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে যে পরিবর্তন, তা সংঘটিত হয়েছে তেলের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর। এর শুরুটা ঘটে আরব অ্যামেরিকান অয়েল কোম্পানিকে ১৯৩২ সালে অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে। ওহাবিদের শিক্ষা সৌদি আরবের জনগণের মাঝে এখনো চর্চিত হচ্ছে এবং রাজপরিবার থেকে এটিকেই রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে আচরণ করা হয়।
📄 ইদরিসি আন্দোলন
ওহাবি আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে উত্তর আফ্রিকায় অনুরূপ আরও আন্দোলনের সূচনা ঘটে। তাদের সকলের বার্তা ও উদ্দেশ্য ছিল একইরকম, ইসলামের পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মানুষকে জাগিয়ে তোলা। মরক্কোতে আহমাদ ইবনু ইদরিস (১৭৬০-১৮৩৬) একজন সুফি সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হন। মানুষকে শিক্ষিত করা এবং ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোয় আলোকিত করার প্রয়োজনীয়তার আহ্বান জানান তিনি। উত্তর আফ্রিকা ও ইয়েমেনে ব্যাপক ভ্রমণ করে তিনি তার শিক্ষণ ও প্রচারণার কাজ চালান। অবশেষে সিদ্ধান্তে আসেন যে, মুসলিম আলিমগণ ফিক্হ নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, জনগণকে তাদের নিজেদের ধর্মের মৌলিক কার্যাবলি শেখানোর মতো সময় তাদের নেই। তার মতে এটি আলিমগণের ব্যর্থতা। মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাবের সাথে আহমাদ ইবনু ইদরিসের পার্থক্য হলো, শেষের জনের কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না।
📄 সানুসি আন্দোলন
সানুসি আন্দোলনের অভ্যুদয় ঘটে পূর্ব লিবিয়ায় মুহাম্মাদ ইবনু আলি আস-সানুসির (১৭৮৭-১৮৫৯) নেতৃত্বে। তার লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজকে নবি-এর আমলের সমাজের আদলে পুনর্গঠন করা। সুফি হিসেবে আস-সানুসি অতিমাত্রার ব্যয় প্রত্যাখ্যান করেন। আহ্বান জানান সাদামাটা, প্রায় মরুভূমির জীবনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য। যেটা প্রাথমিক যুগের মুসলিম জনসমাজের মাঝে দেখা যেত।
রাজনৈতিকভাবে আস-সানুসি ও তার অনুসারীদের সাফল্য ছিল অবাক-করার মতো। পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোকে তিনি তার ধর্মীয় আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হন। ভ্রাতৃসংঘ ও ব্যবসায়িক কেন্দ্রের এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ছিল উত্তর লিবিয়া থেকে সুদান পর্যন্ত বিস্তৃত (Cleveland, 1994)। সানুসি আন্দোলন ১৯১১ সালে ত্রিপোলিতে ইতালীয় আক্রমণকে রুখে দেয়। উত্তর ও মধ্য আফ্রিকায় ফরাসি সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হয় তাদের হাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি ১৯৫০ সালে আস-সানুসির এক নাতির মাঝে লিবিয়ার জন্য উপযুক্ত এক রাজাকে দেখতে পায়। এই অবস্থা বহাল থাকে পয়লা সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ পর্যন্ত। এসময় কর্নেল মুআম্মার আল-গাদ্দাফির নেতৃত্বে এক সামরিক বিপ্লব সানুসি পরিবারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে এবং লিবিয়া রাজ্যকে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
📄 মাহদি আন্দোলন
উত্তর সুদানে আবির্ভূত আরেক আন্দোলনের নেতা ছিলেন মুহাম্মাদ আহমাদ আল-মাহদি (১৮৪৪-১৮৮৫), যিনি নিজেকে প্রতীক্ষিত মাহদি হিসেবে দাবি করেন। তার লক্ষ্য ছিল ধর্মকে পুনর্জীবিত করা এবং ইসলামকে নবি-এর শুদ্ধতাবাদী চর্চায় ফিরিয়ে নেওয়া। পূর্বে উল্লেখিত আন্দোলনগুলোর মতো এরও উদ্দেশ্য ও বার্তা ছিল একই। কিন্তু সুদানে ব্রিটিশ-মিশরীয় দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করার এবং দেশটিকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার শক্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল আল-মাহদির। জিহাদ ঘোষণা করার মাধ্যমে তিনি তার ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে এমন এক বিষয়কে প্রোথিত করে দিতে সক্ষম হন, যা সামরিক সাফল্য অর্জনে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। অচিরেই মাহদিপন্থিগণ উত্তর সুদানের বেশির ভাগ অংশ জয় করেন। স্বয়ং রাজধানী খারতুম দখল করে নেন ১৮৮৫ সালে। মাহদিবাদীরা ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। এরপর কিচেনারের সেনাপতিত্বে অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান সেনাবাহিনী খারতুম পুনর্দখল করে নেয়। স্বল্পায়ু মাহদি আন্দোলন যদিও বিশ বছরের বেশি টেকেনি, কিন্তু অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করা এবং নিজভূমে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাহদির সাফল্য ছিল নজরকাড়া। সর্বত্র মুসলিমদের জন্য তা এক অনুপ্রেরণায় পরিণত হয় যে, পশ্চিমায়নের উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে ইসলামি পুনর্জাগরণ খুবই সম্ভব।