📄 পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির অনুপ্রবেশ
উসমানী আমলে পশ্চিমা প্রভাব শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সাফল্যে উদ্দীপিত হয়ে খ্রিষ্টান মিশনারিগণ পূর্বদিকে নজর দেন। তাদের চোখে সেই পুরনো ক্রুসেডের স্মৃতি। কিছু মুসলিম নেতার গৃহীত উদারনীতি (Liberal policies) সেই পালে আরও হাওয়া দেয়। যেমন, লেবানিজ রাজকুমার দ্বিতীয় ফখরুদ্দীন (১৫৯০-১৬৩৫) ইতালি থেকে শুধু বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীই আমদানি করেননি, ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক চার্চের খ্রিষ্টান মিশনারিদেরও স্বাগত জানান (Hitti, 1963)। বেশিদিন না যেতেই লেবানিজ ও সিরীয় ভূমির প্রধান প্রধান নগরী ও পল্লীতে গড়ে ওঠে ফরাসি ক্যাথলিক ধর্মকেন্দ্র। সিরিয়ার ওপর মিশরীয় দখলদারিত্বের (১৮৩১-৪০) সময় মিশরের মুহাম্মাদ আলির পুত্র সেনাপতি ইবরাহীম স্থানীয় প্রশাসনে অমুসলিমদের পদাধিকার লাভের অধিকার ঘোষণা দেন। প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করেন আইনের চোখে সকল ধর্মের অনুসারীর সমতার ধারণা। তার উদারনীতির যে-কোনো বিরোধিতাকে বল প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখা হয়। সার্বিক নিরাপত্তাপূর্ণ পরিবেশের সাথে সাথে এই বিষয়টি যোগ হওয়ায় অন্যান্য খ্রিষ্টান উপদলও তাদের ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক ভাইদের পদাঙ্ক অনুসরণে উৎসাহ লাভ করেন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝে খ্রিষ্টান মিশনারি কর্মকাণ্ডের হাত ধরে সিরিয়া ও লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু গির্জা। ব্রিটিশ ও আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা লেবাননে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেন। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নেটিভ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ অব সিরিয়া। খাদিভ সাইদের আমলে (১৮৫৪-৬৩) ১৮৫৭ সালে আমেরিকান ইউনাইটেড প্রেসবাইটেরিয়ান মিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে মিশরে (প্রাগুক্ত)।
পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রবেশের আরও লক্ষণ দেখা দিতে থাকে ক্ষয়িষ্ণু উসমানী সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানেও। এটা ছিল শাসকদের নিমন্ত্রণ কিংবা বন্ধুসুলভ আচরণের ফলাফল। সিরিয়া ও লেবাননে যেসব মিশনারি কর্মকাণ্ডের কথা বলা হলো, তার পাশাপাশি শিক্ষাকার্যক্রমেও এর উল্লেখযোগ্য অনুপ্রবেশ ঘটে। বৈরুতে ১৮৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান স্কুল ফর গার্লস। একই শহরে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজ পরবর্তীকালে হয় আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত। জেসুইট শিক্ষাকার্যক্রমের ফলে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট জোসেফ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮১ সালে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আজও তাদের শিক্ষাসেবা প্রদান করে যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এগুলোকে ধরা হয় শিক্ষাজগতের আদর্শ নমুনা হিসেবে। শিক্ষার ভাষা হিসেবে ইংরেজির ব্যবহার এবং আমেরিকান শিক্ষাবিদদের দ্বারা নির্মিত পাঠ্যক্রমের ফলে সিলেবাসে ইসলামি উপাদানকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই ইসলামি শিক্ষার সুদৃঢ় অস্তিত্বের সুযোগ ছিল নগণ্য। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশ পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটামুটি এরকমই থাকে। এরপর ইসলামি বিশ্ব একটি ইসলামি পুনর্জাগরণবাদ প্রত্যক্ষ করে, যার ফলে পাঠ্যক্রমে ইসলামি ভাবধারার উপাদান আরও বেশি করে স্থান করে নিতে থাকে।
📄 সেক্যুলার ধারার অনুকরণে ধর্ম ও ইসলামি সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্নকরণ
সব পশ্চিমা প্রভাব অবশ্য মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। কোনো কোনোটি স্বয়ং শাসকগণই আমদানি করেছেন আধুনিকায়নের খায়েশে। এই শাসকদের প্রথমেই রয়েছেন মুহাম্মাদ আলি (১৭৬৯-১৮৪৮)। তিনি ১৮০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক মিশরের গভর্নর 'পাশা' হিসেবে নিয়োগ পান। ইতিহাসের বইপত্রে প্রায়শ তাকে আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। আলির আগে, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভিযানের হাত ধরে এমনসব পশ্চিমা প্রভাবের আগমন ঘটে, যেগুলো আগে মুসলিমদের গোচরে ছিল না। এর একটি অনস্বীকার্য উদাহরণ আরবি ছাপাখানা। বোনাপার্টের নিয়ে আসা এই আরবি ছাপাকর্মের উদ্দেশ্য কিন্তু মিশরীয়দের শিক্ষাপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি ঘটানো নয়। বরং এর মাধ্যমে ১৭৯৮ সালের ফ্রেঞ্চ প্রোপাগান্ডার আরবি লিফলেট ছাপানো হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সমর্থন আদায় করা। বোনাপার্ট যুগের পরে এই ছাপাকর্মের হাত ধরেই কায়রোর বুলাক কোয়ার্টারে পুরোদমে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর নাম মাকতাবাত বুলাক (প্রাগুক্ত)।
মিশর-সহ যে-কোনো অঞ্চলের মুসলিমদের কাছে ছাপাখানা ছিল একেবারেই নতুন একটি বিষয়। এটি পশ্চিমা আধুনিকায়নের এক দৃশ্যমান উদাহরণ। তা ছাড়া ফরাসি সেনাবাহিনী তাদের সাথে বিজ্ঞানী ও দোভাষীদেরও নিয়ে আসে। তারা স্টোন অব রাশিদ আবিষ্কারের মাধ্যমে হায়েরোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার করেন। এসব ফরাসি তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছিল মিশরীয় মাটিতে তারা দীর্ঘকাল থাকার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হাতে ফ্রেঞ্চ নৌবহর ধ্বংস এবং ১৮০১ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার যুদ্ধে ফ্রেঞ্চদের পরাজয়ের পর এতে আচমকা ছেদ পড়ে। প্রায় আশি বছরের মধ্যে ব্রিটিশরা মিশরীয় ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোতে অবতরণ করে। যে অবস্থানের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় পঁচাশি বছর।
আধুনিকায়নের ফরাসি দৃষ্টান্তে মুগ্ধ হয়ে মুহাম্মাদ আলি একটি সংস্কারমূলক কার্যক্রমে হাত দেন। অত্যন্ত কঠোর হলেও সেটা দেশটিকে মামলুক পশ্চাৎপদতা (?) থেকে বের করে আনে। আধুনিকায়নের তাড়নায় ১৮১৭ সালে তিনি বিভিন্ন প্রকৌশল বিদ্যালয় এবং ১৮২৭ সালে চিকিৎসা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যেগুলোর শিক্ষকরা ছিলেন মূলত ফ্রান্স থেকে আমদানিকৃত। সামরিক ও শিক্ষাগত প্রতিনিধিদল আনা হয় ফ্রান্স ও ইতালি থেকে। রাষ্ট্রীয় খরচে মিশর থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয় ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডে। স্কুলের ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে যা ‘দুর্গের ভেতর জবাই’ নামে পরিচিত, সে ঘটনা আয়োজন করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে চিরতরে মামলুকদের থেকে মুক্ত করে নেন। কায়রোর শক্তিশালী নিরাপত্তাবিশিষ্ট দুর্গে খোলাখুলি একটি পার্টির আয়োজন করেন তিনি।
আমন্ত্রিত মামলুকদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সংকীর্ণ পথের ভেতর, যেখানে তাদের জবাই করে হত্যা করে প্রহরীরা। খুবই অল্প কয়েকজন বাদে মিশরের সকল মামলুকের জীবনাবসান ঘটানো হয় সেখানে। অর্থনৈতিক নীতিমালাতেও মুহাম্মাদ আলি ছিলেন সমপরিমাণে কঠোর। মিশরের সকল ভূমি বাজেয়াপ্ত করে নেন তিনি এবং নিজেকে ঘোষণা করেন সেগুলোর একচ্ছত্র মালিক। ভূমি ও উৎপাদনের একচেটিয়া মালিক হওয়ার মাধ্যমে তিনিই হয়ে ওঠেন একমাত্র উৎপাদক, নির্মাতা ও চুক্তিকারী। সেচ ও খাল প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমের পরিবেশ এতই অসহনীয় ছিল যে, বহু মানুষ তাদের জীবন হারায়। বাকিদের হাতের অংশবিশেষ কেটে ফেলতে হয় নিজেদেরকে শ্রমের অনুপযোগী হিসেবে দেখানোর স্বার্থে (Armstrong, 2000)। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পশ্চিমা অনুপ্রবেশ পরিণত হয় মিশরে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনে। মুহাম্মাদ আলির নাতি ইসমাঈল ছিলেন ইউরোপিয়ানদের তুলনায় আমেরিকানদের প্রতি বেশি অনুরক্ত। তার শাসনামলে (১৮৬৩-৭৯) উচ্চতর মিশরে ১৮৬৫ সালে একটি আমেরিকান বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর কায়রোতে ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান কলেজ ফর গার্লস。
টিকাঃ
[১] বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: আন-নুজুমুয যাহিরাহ, ৩/১৭৩। - সম্পাদক
📄 আইন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রতি পৃষ্ঠপোষণের অভাব
উসমানী তুর্কিদের শাসনামলে স্থাপত্য ও শৈল্পিক অর্জনের বিপরীতে আইনবিদদের কাজের প্রতি আগ্রহ কম ছিল। অর্থনীতি-সহ অন্যান্য আইনশাস্ত্রীয় বিষয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাকর্মের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে এটিকে আবারও উল্লেখ করা চলে। এটা সত্য যে, উসমানীয়রা বিজিত ভূমি থেকে শ্রেষ্ঠ কিছু প্রতিভাকে সাম্রাজ্যের রাজধানীতে এনে জড়ো করতে উদগ্রীব ছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের গৌরব সমুন্নত করতে এদের মেধা ব্যবহার করা। তবে এটাও সত্য যে, এই উদ্যোগে আইনশাস্ত্রীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সাম্রাজ্যের গৌরব বাড়াতে দরকারি মেধাগুলো ছিল মূলত স্থাপত্য ও শিল্পকারখানার মতো কারিগরি ধাঁচের। শিল্পনৈপুণ্যের প্রয়োজন। ছিলো নতুন সাম্রাজ্যের সামরিক দক্ষতার জন্য, শরীয়তের জন্য নয়। উসমানী প্রশাসন শিল্পনৈপুণ্য অর্জন করতে চেয়েছিল স্থাপত্যকলায়, আইনশাস্ত্রে না। এর পাশাপাশি সাম্রাজ্যটি যেহেতু ছিল সেনানিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, তাই সামরিকীকরণের প্রতি তাদের অন্তর্নিহিত ঝোঁক ছিল। তুর্কি সেলজুকদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ব্যবস্থায় এর স্পষ্ট চিত্রায়ন ঘটেছে। তাই সমসাময়িক আইনবিদদের কর্মবিকাশের জন্য উসমানীরা তাদের তেমন কিছু দিতে পারেননি। তা ছাড়া বেশির ভাগ ফিক্হ ও আইনশাস্ত্রবিদ "আধুনিকায়নে"-র যে-কোনো চেষ্টাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাই নিজেদের সামরিক রাষ্ট্রের উন্নয়নে আগ্রহী উসমানীদের চোখে তারা ছিলেন অতি কঠোর এবং সাম্রাজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় নতুনত্বের গতির সাথে তাল মেলাতে অক্ষম।
উসমানীয়দের শাসনাধীনে আলিমগণের ভূমিকা ছিল মিশ্র ধাঁচের। উসমানী শাসনের প্রথমদিকে নতুন খলিফাদের কাছে উলামায়ে কেরাম ও শরীয়ত খুবই মর্যাদার আসন পেয়েছে। এর কারণ হলো, ইসলামি রাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে তারা সাম্রাজ্যে শরীয়তের প্রবর্তন চেয়েছিলেন। যে কারণেই হোক, শরীয়তের প্রচার-প্রসার উসমানীয়দের হাতে আনুষ্ঠানিক আকৃতি লাভ করে। তারা আলিমগণকে বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত করেন। স্থাপন করেন শরীয়াহ আদালত। সম্ভবত এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত, যেখানে নেতৃত্বধারী বিচারক বা কাযীদের সাথে সহকারী হিসেবে থাকতেন ধর্মীয় পরামর্শবিদ তথা মুফতি। আলোচ্য মামলার ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা ও ফতোয়া প্রদান করার দায়িত্ব ছিল তাদের হাতে। কাযী ও মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত এই আদালতগুলো ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রেরই অংশ, যেখানে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হতো উসমানী প্রশাসকদের দ্বারা। বেতন ও ভর্তুকি প্রদান করা হতো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে (Armstrong, 2000)। তা ছাড়া ধর্মীয় স্কুল বা মাদ্রাসাও স্থাপন করা হয়। এগুলোর শিক্ষকগণ ছিলেন কাযী ও মুফতিদের মতোই সরকারি দপ্তরের অংশ। শরীয়াহ আদালত সুদীর্ঘকাল যাবৎ মিশরে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে থাকে। এমনকি ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও সক্রিয় ছিল এগুলো। তারপর মিশরের সেক্যুলার সরকারের হাতে ১৯৫২ সালে তাদের বিলুপ্তি ঘটে।
ইস্তাম্বুল সরকার যতদিন শক্তিশালী ছিল, ততদিন পর্যন্ত উলামা ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল সহযোগিতার। কিন্তু যেদিন থেকে কেন্দ্রীয় সরকারে অবক্ষয় দেখা দিতে শুরু করে, তখন থেকেই সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। যেমন, মুহাম্মাদ আলি শাসিত মিশরে আলিমদের সাথে কঠোর আচরণ করা হয়। মুহাম্মাদ আলি যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন, সেগুলোর মাঝে ওয়াকফ সম্পত্তিও ছিল। দরিদ্র, ধর্মীয় উদ্দেশ্য, শরীয়তের ছাত্র ও আলিমগণের সহায়তার জন্য এসব সম্পদ এককালে দান করে গিয়েছিলেন ধর্মানুরাগী বিত্তবান মুসলিমরা (Armstrong, 2000)। উলামাদের জীবিকার উৎস হারিয়ে যায় এভাবে এবং এর লক্ষ্য ছিল তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। তবে ছড়ানো-ছিটানো প্রতিবাদ অবশ্যই জেগে উঠেছিল, মূলত বেসরকারি আলিমগণের পক্ষ থেকে।
আবদুল ওয়াহহাব আশ-শারানি (মৃ. ১৫৬৫) এমনই এক উদাহরণ। তার চিন্তাধারা মূলধারার সাথে কিছু ব্যতিক্রম ছিল। তারপরও তিনি রাষ্ট্রের দৈন্যদশা ও দারিদ্র্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তুর্কি পাশা ও মামলুক বেইয়ের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের জাঁতাকলে এই অবস্থা হয়েছিল মিশরীয় খেটে-খাওয়া মানুষদের। কর আরোপ ও আদায়ে শ্রমিকদের ওপর সরকারি লোকদের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন তিনি। কর পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে যেন কারাগারে যেতে না হয়, সেজন্য তাদের পুরো উৎপাদন এবং এমনকি কখনো কখনো গবাদি-পশুও বিক্রি করে দেওয়া লাগত। লোভনীয় প্রত্যেকটা ব্যবসাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে। এই সবকিছুর ব্যাপারে আশ-শারানি ছিলেন কঠোর সমালোচক। তিক্ত স্বরে তিনি তুলনা করে দেখান যে, তুর্কি শাসনাধীনে কৃষক-শ্রমিকরা কী দুরবস্থায় আছে এবং সে তুলনায় মামলুকদের অধীনে তারা কতটা প্রাচুর্যশালী ছিল (Nicholson 1993)। আশ-শারানি কোনো বেতনভোগী কাযী ছিলেন না, সরকারি জনবলেরও অংশ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইহজগতের প্রতি বিমুখ এক সহজ-সরল সুফি। তবুও তো এহেন বিরোধিতা চলতে দেওয়া যায় না।
আলিমগণের ওপর নিপীড়ন এবং সেক্যুলার-করণের বিপরীতে ধর্মীয় শিক্ষাকে কোণঠাসা করে ফেলার কারণে স্বভাবতই কিছু আলিম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আধুনিকায়নের বেশে আনা পরিবর্তনগুলোর প্রতি হয়ে ওঠেন বীতশ্রদ্ধ।
সাধারণভাবে লেখালেখি এবং বিশেষত আর্থ-সামাজিক গবেষণার অনুপস্থিতির পেছনে উল্লিখিত কোন নিয়ামক কতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তা বলা মুশকিল। কিন্তু এতটুকু বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই নিয়ামকগুলো মোটাদাগে এ ধরনের লেখালেখির জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরি হতে দেয়নি। প্রায় তিন শতাব্দী পরে গিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনীশক্তি আবারও ফুলকি দিয়ে ওঠে। পরিচিতি লাভ করে সংস্কার আন্দোলন নামে, যা আমরা পরে দেখব। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সামরিক শাসক হিসেবে উসমানীরা আইনশৃঙ্খলার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি যদি অনুকূল থাকত, তাহলে তা হয়তো পুঁজিবাদী চেতনার বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারত।