📄 গ্রন্থটির প্রধান উদ্দেশ্য
আল-আহকাম রচনা করার তিনটি উদ্দেশ্য আছে বলে প্রতীয়মান হয়। ➡ প্রথমত, আইন প্রয়োগকারীদের এই আইন সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করা। যাতে ন্যায়বিচার অর্জিত হতে পারে। ➡ দ্বিতীয়ত, আইন প্রণয়নকারীদের শরীয়তের বিধিবিধান বুঝতে সাহায্য করা। যাতে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বিধিবিধান থেকে কোনোরকম বিচ্যুতি না ঘটিয়ে এগুলোর মধ্য থেকেই আইন আহরণ করা যায়। ➡ তৃতীয়ত, সালতানাত যেসব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো বুঝতে ফকিহ ও আলিমগণকে সাহায্য করা। ভবিষ্যতে প্রয়োজনসাপেক্ষে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অবদান রাখতে তাদের আহ্বান জানানো। আর এই সবকিছুর চূড়ান্ত লক্ষ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
আল-মাওয়ারদির ভাষায় এবং আল-আহকামের বর্ণনা অনুযায়ী, এই উদ্দেশ্যগুলো এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে (আল-মাওয়ারদি, ১৯৮৫):
বইটি লেখার মূল যুক্তি হলো: সালতানাত সম্পর্কিত বিধান অন্যদের চেয়ে শাসকশ্রেণিরই বেশি দরকার। ফিকহের সাধারণ কিতাবগুলোতে সালতানাত সম্পর্কিত বিধিবিধান যেহেতু অন্যান্য বিধিবিধানের সাথে মিশ্রিত হয়ে আছে, তাই শাসকগণ রাজনীতি ও প্রশাসনিক দায়িত্বপালনে ব্যস্ত থাকায় তারা এগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন না।
অতএব, আমি এই বিশেষায়িত গ্রন্থটি রচনা করে তার আনুগত্য করেছি, যার আনুগত্য করা আমার জন্য আবশ্যক। যাতে তিনি ফকিহগণের মাযহাব সম্পর্কে জানতে পারেন। নিজের অধিকারসমূহ জেনে, যাতে তা আদায় করতে পারেন। প্রজাদের হকসমূহ জেনে তাদেরকে যেন তা বুঝিয়ে দিতে পারেন।
এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্যে হলো: শাসনক্ষমতার বাস্তবায়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। হক গ্রহণ ও প্রদানের সময় ইনসাফ বজায় রাখা।
তাই অন্তত মাওয়ারদির চোখে, রাষ্ট্রীয় বিধানাবলির ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। সেখানে এসকল মাসআলার শরয়ী ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হবে তাদের উদ্দেশ্যে, যারা এগুলোর প্রয়োগের কাজে সংশ্লিষ্ট। এর লক্ষ্য ছিল বেশ কিছু শ্রেণিকে সাহায্য করা- ➡ ১. শাসক সুলতান: যিনি আদেশগুলো জারি করেন।
• ২. প্রাদেশিক গভর্নর ও কর্মকর্তা: যারা আদেশগুলো বাস্তবায়ন করেন।
➡ ৩. বিচারক ও কাযী: যারা রায় দেন এবং মতামত প্রকাশ করেন। বিশেষত রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ওই সময়টিতে এই বিধানগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
খলিফাগণের ওপর বুওয়াইহিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সত্ত্বেও মাওয়ারদির একটি কৃতিত্ব হলো শাসক (সুলতান)-কে খলিফার ওপর স্থান না দেওয়া। ভূমিকায় তিনি বলেছেন যে, খিলাফত হলো আল্লাহপ্রদত্ত ব্যবস্থা, যেখানে খলিফা স্বয়ং নবি-এর উত্তরসূরি প্রতিনিধি। তা ছাড়া খলিফার নামেমাত্র আধ্যাত্মিক ভূমিকাকেও তিনি সুলতানের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন (আল-মাওয়ারদি, ১৯৮৫)।
আল-আহকাম বিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত, যেখানে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় বিধিমালার বিস্তৃত পরিসরের বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি অধ্যায় রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা-সংক্রান্ত। তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খিলাফত নিয়ে দ্বন্দ্ব ক্রমেই বেড়ে চলছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতার ব্যাপারে মুসলিম জনগণের মধ্যে ছিল বিবাদ এবং এক ধরনের বিরক্তিও। এই বিবাদের আগুনে ঘি ঢেলেছে অনারব শাসকদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা। এমন এক পরিবেশে আল-মাওয়ারদি যথার্থই ইমামত তথা খিলাফতের আলোচনা দিয়ে বই শুরু করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। প্রয়োজনীয়তার ফিকহের প্রতি তার যে সমর্থন, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি একজন শক্তিশালী শাসকের ধারণার পক্ষপাতী। যেই শাসক ইসলামকে সুরক্ষা দিতে ও দ্বীন পালনে সক্ষম হবেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতর অন্য দাবিদার থাকা সত্ত্বেও এই শাসককে অবশ্যই মান্য করতে হবে—এই সমঝোতা নিশ্চয়ই বুওয়াইহি সুলতানকে সন্তুষ্টই করে থাকবে। লেখক এও বলেন যে, দ্বীনের প্রতিরক্ষায় অক্ষম ন্যায়বিচারক শাসকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অবিচারক শাসক উত্তম। একইসাথে ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী শাসক পাওয়ার আগ পর্যন্ত এ অবস্থাই চলমান থাকবে। 'দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব' -এরাখ এ হয়তো একটি নজির।
আল-আহকামের গঠনকাঠামো এবং যে পরিস্থিতিতে এটি লেখা হয়েছিল, তা ইমাম আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। দুটো বইয়ের মাঝে কিছু মিল চোখে পড়ে। উভয় গ্রন্থই লেখা হয়েছে শাসকের নির্দেশক্রমে, উভয়টিরই উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ন্যায়ানুগ বিধিবিধান প্রদান করা। উভয়টিরই উদ্দিষ্ট পাঠক রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং উভয়ের রচয়িতা শাসকের নৈকট্যধন্য প্রধান বিচারপতি। কিন্তু প্রধান প্রধান পার্থক্য রয়েছে পাঁচটি:
➡ ১. আবু ইউসুফ যেখানে তার বইটি লিখেছিলেন এক ক্ষমতাশালী খলিফার জন্য, আল-মাওয়ারদি লিখেছেন এক শক্তিশালী সেনাপতির জন্য, যিনি খলিফার অধীনে শাসন করতেন।
➡ আবু ইউসুফের আল-খারাজে বই লেখার অনুরোধের কথা খোলাখুলি বলা হয়েছে। আল-মাওয়ারদির আল-আহকাম থেকে এমনটি অনুমান করে নেওয়া যায়, সরাসরি উল্লেখ নেই।
➡ আল-আহকামের কাঠামো স্পষ্টতর। যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে, সেগুলোর ওপর কিছুটা বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এটা একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কারণ ততদিনে সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষার প্রভাব বেড়েছে এবং রাজনৈতিক জটিলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আলোচনার বিস্তৃত হতে দেখা যায় স্বতন্ত্র কিছু অধ্যায়ে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দিক নিয়ে আলোচনায়। শুরু হয়েছে ইমামত তথা খিলাফত দিয়ে, তারপর এসেছে ওজির বা মন্ত্রীর কার্যাবলি, প্রাদেশিক প্রশাসনব্যবস্থা এবং সাধারণ বা বিশেষ বিশেষ কাজকর্মের দায়িত্ব প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর।
➡ মাওয়ারদির বইটিতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে, যা তার আগের কাজগুলোতে আলাদা করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তা হলো হিসবাহ বা জনগণের দ্বীন-পালন সংশ্লিষ্ট কাজকর্ম। হিসবাহ-সংক্রান্ত কাজকে আল-মাওয়ারদির পর আরও বিকশিত করা হয়। যেমন আমরা দেখতে পাই ইবনু তাইমিয়্যা হিসবাহর ওপর একটি বিশেষায়িত গ্রন্থ রচনা করেছেন।
➡ কোনো বিষয়ে আল-মাওয়ারদির অনুসৃত ফিকহি পদ্ধতি এমন-ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফের মতামত নিরীক্ষা করা। এর সাথে তিনি সহমত বা দ্বিমত পোষণ করা। দ্বিমত হলে তিনি নজর দেন ইমাম মালিক ও ইমাম শাফিয়ির মাযহাবের দিকে। নিজে শাফিয়ি হওয়ায় শাফিয়ি মাযহাবের সপক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে দলিল পেশ করে নিজের মত ব্যক্ত করেন।
ওই সময়কার মানদণ্ডে আল-আহমাকুস সুলতানিয়্যা রচনাজগতে এক বড়সড় সংযোজন। আবু ইউসুফের কিতাবুল খারাজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে যদি দেখা হয়ও, তবুও মাওয়ারদির কাজটি এসেছে আবু ইউসুফের রচনার প্রায় সাড়ে চারশো বছর পরে। তা ছাড়া বইটি লেখা হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল এক সময়ে। আর ইমাম আবু ইউসুফের সমসাময়িক যুগটি ছিল আব্বাসি খিলাফতের স্থিতিশীল সময়কার। এমন এক নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও শরীয়ত রক্ষার জন্য এ ধরনের একটি কিতাব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাওয়ারদির গ্রন্থটিকে দেখা চলে রাষ্ট্রের অর্থায়নে শরীয়তের বিধান রক্ষা করা, কর ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যাপারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান হিসেবে। হিসবাহ নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় সংযোজন করা থেকে বোঝা যায়, জনতার দায়িত্বকে মাওয়ারদি একটি স্বতন্ত্র টপিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মাওয়ারদি ও তার আল-আহকাম এমন একটি মাইলফলক, যা কয়েক শতাব্দী ধরে চলা ইসলামি অর্থনৈতিক রচনার শূন্যতাকে পূরণ করেছে। এই ময়দানের বিশেষজ্ঞদের জন্য এটি একটি প্রধান রেফারেন্স বুক。
টিকাঃ
[১] মাওয়ারদি বলতে চেয়েছেন, খলিফার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি সুলতান হিসেবে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে থাকলে, তাকে মান্য করতে হবে। এটি ফিকহের একটি স্বীকৃত মাসআলা। কারণ যোগ্যতম ব্যক্তির উপস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে খলিফা বা শাসক নিয়োগ দেওয়া বৈধ। এর সঙ্গে বুওয়াইহিদের পক্ষাবলম্বন বা তাদের সঙ্গে সমঝোতার সম্পর্ক নেই। -সম্পাদক
[২] দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব থেকে উদ্দেশ্য হলো দুটি বিকল্পের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম উত্তমটি বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণ কমানো। উক্ত মাসআলায় তেমনটি করা হয়েছে। দুর্বল উত্তম শাসকের চেয়ে সবল অনুত্তম শাসককে বেছে নেওয়া হয়েছে। কারণ দুর্বলের হাতে ক্ষমতা গেলে রাষ্ট্র ধ্বংস বা বেদখল হয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্র ধ্বংস হওয়া ও কিছু জুলুম হওয়ার মধ্যে দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর। কম ভালোটি বেছে নিয়ে বেশি ক্ষতিকে প্রতিহত করা হয়েছে。