📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সুফি আন্দোলনের বিকাশ

📄 সুফি আন্দোলনের বিকাশ


সুফিবাদের কথা যখনই বলা হয়, দুটি নাম সবার মনে আসে: বসরার রাবিআ আল- আদাওয়িয়্যা, এবং বাগদাদের মানসুর হাল্লাজ। রাবিআ (মৃ. ১৮৫/৮০১) আল্লাহকে ভালোবাসতেন শুধুই তাঁর ভালোবাসার খাতিরে। তাঁর প্রতি নিজের ভালোবাসার গীত গাইতেন এই বিখ্যাত গীতিকবিতায়:
“দুইভাবে তোমায় ভালোবাসি: এক তো যুক্তিহীন প্রেমের মতো, আরেক ভালোবাসা হলো তুমি যার উপযুক্ত। আমার মত্ত প্রেমে, আমি শুধু স্মরণ করি তোমাকে আর দ্বিতীয় ভালোবাসা আমার কাছে তোমার পর্দা উন্মুক্ত করেছে এই প্রেম ও সেই ভালোবাসা দুটোতেই আমার কোনো কীর্তি নেই, উভয়টির জন্যই তোমার প্রশংসা হে প্রভু।” (Nicholson, 1993)
মানসুর হাল্লাজ (২৮৫-৩০৯ হি., ৮৯৮-৯২২ খ্রি.) বাগদাদে আলিমগণের অধীনে একটি সংক্ষিপ্ত বিচারকার্যের পর শূলিতে চড়ে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করেন। তার একটি বিশ্বাস বা দাবি হলো, তিনি ও আল্লাহ অভিন্ন সত্তা। তিনি বলেছিলেন, “আনাল হাক্ক” বা “আমিই পরম সত্য।” তিনি এই বিশ্বাস থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তারপরও মৃত্যুদণ্ডের কাষ্ঠ দেখার পর জনগণের দিকে ফিরে একটি প্রার্থনা করেন, যার শেষটা এরকম: “আর এই যে তোমার বান্দারা এখানে আমাকে হত্যা করতে জড়ো হয়েছে তোমারই ধর্মের প্রতি জযবার কারণে এবং তোমারই ভালোবাসা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায়, তাদের ক্ষমা করে দাও হে প্রভু,
তাদের রহম করো (কারণ তুমি আমার কাছে যা প্রকাশিত করেছো, তারা সে ব্যাপারে অজ্ঞ) তুমি যা-ই করো, তার জন্যই সকল প্রশংসা। আর তুমি যা ইচ্ছে করো, তারই জন্য সকল গুণগান।” (Arberry, 1990)1
কিন্তু হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ড ছিল সুফিবাদ আবির্ভাবেরও দুই শতাব্দী পরের ঘটনা। উমাইয়্যা শাসনামলের সময় থেকে নিয়ে যে অতি বিলাসবহুল জীবনধারা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল, কিছু মুসলিম সেটিকে প্রবলভাবে ঘৃণা করেন। উমাইয়্যা আমলে এবং তার চেয়েও বেশি করে আব্বাসি আমলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। পূর্বে ভারত এবং পশ্চিমে ইবেরিয়ান উপদ্বীপ পর্যন্ত ছিল এর বিস্তৃতি। এরই হাত ধরে আসে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং এমন এক জীবনপদ্ধতি, যার সাথে মুসলিমরা আগে কখনো পরিচিত ছিল না।
এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ ছিল না। বিশাল বিশাল বিজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর যেসব অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন এবং তাঁরই ইচ্ছায় যেসব আরাম-আয়েশ এসেছে, সেগুলো ভোগ করতে ও তা থেকে উপকৃত হতে বেদুইনদের কোনো বাধা নেই। কিন্তু কারও কারও কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হলো না। তার সাথে যুক্ত হলো উমাইয়্যাদের অপব্যয়, বিলাসব্যসন দিয়ে সজ্জিত রাজপ্রাসাদ ও ব্যক্তিগত জীবনের চিত্র। নতুন যুগের হাত ধরে জীবনে আসা আরাম-আয়েশকে গ্রহণ করে নেয় অধিকাংশ মুসলিম। এর বিপরীতে অল্পসংখ্যক মানুষের কপালে পড়ে গভীর চিন্তার ভাঁজ। তারা মনে করেন, ইসলামের শিক্ষার মাঝে প্রচারিত দুনিয়াবিমুখী আদর্শের সাথে এটি সাংঘর্ষিক। আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা জেনেছি যে, মধ্যমপন্থায় পার্থিব আনন্দ-উপভোগের বিরোধী ইসলাম নয়। অনেকের চোখে মুসলিমদের রাজদরবার পারস্য বা বাইজেন্টাইনদের সিংহাসনের মতো বিলাসিতায় পূর্ণ মনে হয়। তাই তারা এগুলোকে মধ্যমপন্থা লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন। রাশিদীনের সাদামাটা জীবনযাপন তখনো স্মৃতিতে অমলিন। রাশিদীন তথা মদীনার সমাজের সাথে উমাইয়্যাদের সমাজ খুব বাড়াবাড়ি রকমের বৈপরীত্যমূলক।
বিপদটা যেখানে নিহিত, তা হলো বিলাসিতার এই নতুন উন্মোচিত দুয়ার হয়তো ইসলামের মৌলিক চেতনা থেকে সরে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিতে পারে। নিষ্ঠাবান মুসলিম ও নিবেদিতপ্রাণ উলামাদের মনে এ নিয়ে উদ্বেগ দানা বাঁধে। সেই আগুনে আরও ঘি ঢালে খিলাফত নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলে মুসলিম উম্মতের মাঝে ভাঙন, খিলাফত হারানোকে কেন্দ্র করে শিয়া সম্প্রদায়ের উত্তরোত্তর তিক্ততা এবং উমাইয়্যাদের ওপর এব সকল দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের অপতৎপরতা।
কিন্তু এই ঘৃণা উমাইয়্যাদের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে রূপ নেয়নি। সেটা এসেছিল আরও পরে, শিয়াদের অভ্যুত্থান ও খিলাফত দখলের সময়ে। আলোচনাধীন এই আন্দোলন বরং ভেতরের দিকে বাড়তে শুরু করে। এটা ছিল আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার এবং আপন সত্তাকে ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক প্রচেষ্টা। উমাইয়্যাদের দাপটের সামনে রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন এই মুসলিমরা, যারা পরবর্তীকালে সুফি নামে পরিচিতি লাভ করেন। যে জাগতিক প্রভাবের ফলে আত্মিক দূষণ ও ধর্মীয় বিকৃতির উদ্ভব, তা থেকে বিমুখ হওয়ার জন্য অন্তরের দিকে মুখ ফেরান তারা (Armstrong, 2000)।
'সুফি' শব্দটার ব্যুৎপত্তিগত উৎস দুটি। ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ অর্থটির উদ্ভব সুফিদের নরম সুতি কাপড় পরিহার করে খসখসে পশমের কাপড় পরিধানের অভ্যাস থেকে। পশমের আরবি 'সুফ'। দ্বিতীয়টির অর্থ বিশুদ্ধতা, 'সাফা'। এটি সুফিগণ নিজেরা দাবি করে থাকেন। তাদের ব্যাখ্যামতে, “সুফি হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের অন্তরকে আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ/'সাফি' রাখে,” (বিশ্ব আল-হাফি, মৃত্যু ৮৪১ বা ৮৪২) এবং সুফিপন্থা হলো বিশুদ্ধতা বা 'ইস্তিফা'র জন্য নির্বাচিত হওয়া: “যাকে বাছাই করে নিয়ে আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছু থেকে বিশুদ্ধ করে ফেলা হয়, সে-ই প্রকৃত সুফি।” (জুনাইদ আল-বাগদাদি, মৃত্যু ৯০৯ বা ৯১০) (উদ্ধৃত করেছেন Nicholson 1993)। আল্লাহর প্রতি প্রবল ধ্যান সহকারে আত্মসুখ পরিহার করা এবং পার্থিব জগতকে প্রত্যাখ্যান করা: এই ছিল বার্তা। সুফিপন্থা ও সন্ন্যাসবাদের মাঝে পার্থক্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সন্ন্যাসবাদ মানে সবধরনের বস্তুগত চাহিদা পরিহার করা। সুফিবাদও একই জিনিসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিহার করে, তবে সেটা শুধুই আল্লাহকে খুশি করার জন্য, তাঁর ভালোবাসায় তাড়িত হয়ে। এখানে প্রতিদানে কোনো পুরস্কার লাভ বা তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো তাড়না নেই। আল্লাহকে ভালোবাসার ওয়াস্তেই তাঁর প্রতি ভালোবাসা (মহান সুফি সুহরাওয়ার্দি, উদ্ধৃত করেছেন নিকোলসন, প্রাগুক্ত)। [১] সুফিগণ স্বভাবতই কাজ ও উপার্জন করতেন খুব কম। সর্বশক্তিমানের ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু কাজ করা দরকার, সেরকম ছোটখাটো শ্রম ও পেশা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, নেই পার্থিব সম্পদের জন্য গলাকাটা প্রতিযোগিতা। তাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য আসমানি সত্তাকে পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও ভক্তি সহকারে আরাধনা করা।
মুসলিম ইতিহাসের প্রথম তিন শতাব্দী জুড়ে যাদের চিন্তাগুলো কালক্রমে সুফি মতাদর্শে পরিণত হয়েছে, সেই সূচনাকারী হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাদের প্রথমজন হাসান বসরি (মৃ. ১১০ হি./৭২৮ খ্রি.)। আল্লাহর জন্য যুহুদে ফিরে যাওয়া এবং পার্থিব জীবনের ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো পরিত্যাগ করার দিকে আহ্বান জানাতেন তিনি। তার বেড়ে ওঠা মদীনায়, নবি-এর পরিবারের খুব নিকটে থেকে। তৃতীয় খলিফা উসমানের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানে বসবাস করেন। এরপর আসেন ইরাকের বসরায়, যেখানে তিনি নববি পদ্ধতিতে দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপন এবং আল্লাহর জন্য পার্থিব লালসা ত্যাগের বাণী প্রচার করে সুখ্যাতি লাভ করেন। উমাইয়্যা রাজদরবারের বিলাসী জীবনযাপনের বিরোধিতা করেন তিনি। যদিও উমাইয়্যাদের তিনি নতুন খলিফা হিসেবে মেনে নেন, কিন্তু তাদের নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অপরাধীও মনে করেন। হাসান বসরি নিজেকে সুফি বলে দাবি করেননি। কুশাইরির (মৃ. ৪৬৫ হি./১০৭২ খ্রি.) মতে সুফি শব্দটিই বহুল ব্যবহৃত হতে শুরু করে হিজরি দ্বিতীয় শতকের শেষাংশে, ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে (উদ্ধৃত করেন Nicholson 1993)। সেটা বসরির মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরের ঘটনা।
সুফিবাদের শুরুর ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত কিছু নাম হলো: ইবরাহীম ইবনু আদহাম-পারস্যের বাল্ব রাজপরিবারের সদস্য. আবু আলি শাকিক, তিনিও বাল্বের, ফুজাইল ইবনু ইয়াজ-ডাকাতসর্দার থেকে ধর্মান্তরিত মনীষী। কুফার সুফইয়ান আস-সাওরি, এবং বসরার আদি গোত্রের রাবিআ আল-আদাওয়িয়্যা। তারা প্রত্যেকেই হিজরি দ্বিতীয় শতকের মধ্যাংশ থেকে শেষাংশের মধ্যে ইন্তেকাল করেন। ইবরাহীম ইবনু আদহাম আল্লাহর জন্য নিজের রাজকীয় জীবন পরিত্যাগ করে কয়েক মাস এক গুহায় বসবাস করেন। শাকিক তাওয়াক্কুলের ধারণাটির ওপর জোর দেন, অর্থাৎ সকল কথা ও কাজে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা ও আস্থা। ফুজাইল প্রচার করেন, 'মানুষের ভয়ে আমল থেকে বিরত থাকা লৌকিকতা, আর মানুষের জন্য আমল করা শিরক."। সুফইয়ান সাওরি ছিলেন একটি ফিকহি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। সরকারি পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতির কারণে তিনি অত্যাচারের শিকার হন। আর রাবিআ ঘোষণা করেন, 'আল্লাহর ভালোবাসায় আচ্ছন্নতা আমাকে অন্য সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা থেকে বিমুখ করে দিয়েছে." তৃতীয় হিজরি তথা নবম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে আরও কিছু নাম তালিকায় যুক্ত হয়। যেমন মিশরের যুন্নুন আল-মিসরি (মৃ. ২৪৬ হি./৮৬১ খ্রি.)।
সুফি মতাদর্শের বিকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় এটি বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা পায় বাগদাদে। সুফিবাদের ওপর প্রথম বই লেখা ব্যক্তি আবদুল্লাহ আল-হারিস ইবনু আসাদ আল-মুহাসিবি (মৃ. ২৪৩/৮৫৭)। বইটির নাম আর-রিয়ায়া লি হুকুকিল্লাহ (আল্লাহর অধিকারসমূহ সংরক্ষণ)। এখানে তিনি আধ্যাত্মিকতার 'শাস্ত্র' হিসেবে সুফিবাদের ভিত্তি রচনা করেন। পরবর্তী লেখকদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে বইটি (Arberry, 1990)। আল-মুহাসিবিকে গোঁড়াপন্থি সুফিদের থেকে, বিশেষত অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যে জিনিসটা আলাদা করে, তা হলো তিনি সুফিপন্থা এবং ইচ্ছাকৃত দারিদ্র্যের মধ্যকার পার্থক্যটি সংজ্ঞায়িত করে দেন। তিনি দারিদ্র্যের সমর্থক নন। তার রিসালাতুল মাকাসিব ওয়াল ওয়ারা বইয়ে তিনি বলেন, তাওয়াক্কুল অর্থ এই নয় যে মানুষ জীবিকা উপার্জনের জন্য হালাল পন্থা গ্রহণ না করে বসে থাকবে। অন্যের ওপর নির্ভর করে নিজে অলস থাকাও তাওয়াক্কুল নয় (Smith, 1977)। তার মানে মঠবাসী সন্ন্যাসী ও পরনির্ভরশীল দরিদ্র মুসলিম বৈরাগীদের থেকে সত্যিকার সুফিদের কিভাবে আলাদা হওয়া উচিত, তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার বর্ণনায় ফুটে উঠেছে, এই দুই দলের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসার জন্য পার্থিব কামনা-বাসনা থেকে দূরে থাকার নাম করে অলস হয়ে বসে থাকা যাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য তরবারি তুলে নেওয়াও সুফিবাদী চেতনার অংশ।
একইসাথে বৈরাগী জীবনযাপন এবং হালাল জীবিকা উপার্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করার কারণে আল-মুহাসিবিকে মুসলিম অর্থনীতিবিদদের একজন গণ্য করা হয়। ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে তার চিন্তাগুলোও একটি অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত (উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য, আইদিত গাযালি, ১৯৯২, সিদ্দিকি, ১৯৯২, এবং ইউসরি, ১৯৮৭)। মূল আলোকপাত করা হয়েছে দুনিয়াবিমুখ ভোগ এবং বৈধ উপার্জন সংক্রান্ত তার শিক্ষার ওপর। বলাবাহুল্য, নিজের কোনো লেখালেখিকে অর্থনৈতিক রচনার শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো উদ্দেশ্য আল- মুহাসিবির ছিল না। বরং তার আলোচ্য ছিল নফসের পরিশুদ্ধি, আত্মার বিশুদ্ধতা, পার্থিব চাহিদা প্রত্যাখ্যান এবং সম্পদ পরিত্যাগ (যেমনটা তিনি নিজেই করেছেন)।
আর এর সবকিছুই হবে এক আল্লাহর জন্য, পাশাপাশি রয়েছে সাদামাটা ও সংযমী ভোগের প্রতি আহ্বান। তার মানে তিনি সুফিপন্থার ওপরই লেখালেখি করছিলেন, অর্থনীতির ওপর নয়। উপার্জন ও যুহুদ সংক্রান্ত তার রচনাগুলো সুফিবাদের কাঠামোর ভেতরেই রচিত। সেখানে তিনি বেশ জোরেসোরে দেখিয়েছেন তাওয়াক্কুল এবং তাওয়া-কুলের মাঝে পার্থক্য। বানানের পার্থক্যটি খেয়াল করুন। তাওয়া-কুল অর্থ পরনির্ভরশীলতা। এর আলোচনা সামনে আসবে। সুফি চিন্তার ওপর তার প্রভাব এবং এরকম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে সুফিদের চিন্তাকে ঠিক করার জন্য তার যে অক্লান্ত প্রচেষ্টা, সেজন্য আমরা তার গ্রন্থটি নিয়ে পরবর্তীকালে পর্যালোচনা করব।
আল-মুহাসিবির পর আসেন জুনাইদ বাগদাদি (মৃ. ২৮৯/৯১০), যিনি আল-মুহাসিবিরই একজন শিষ্য। তিনি সুফি চিন্তার পরিশুদ্ধিকরণে তার শিক্ষকের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। ফানা ('ব্যক্তিসত্তা'র বিলীনতা), বাকা' (আল্লাহর সাথে একত্র হয়ে চিরস্থায়িত্ব), মিসাক (আল্লাহর সাথে চুক্তি) এবং এরও পরে আবির্ভূত আরও নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা সহকারে সুফিবাদ একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রূপকাঠামো গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এটি ছিল সেই সময় যখন সুন্নি এবং স্বেচ্ছায় অরাজনৈতিক সুফিবাদ তৎকালীন ধর্মদর্শনের সংস্কৃতিতে অবদান রাখতে আরম্ভ করে।

টিকাঃ
[১] সন্ন্যাস ও সুফিবাদের মৌলিক পার্থক্য হলো, সুফিবাদ বা তাসাউফ বিকশিত হয় শরীয়ত ও ফিকহের ছায়ায়। এখানে নিছক আবেগ ও ভাববাদের চেয়ে শরীয়তের আলোকে আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করাই প্রাধান্য পায়। তাই সুফিগণ জিহাদ করেছেন, রাজনীতি করেছেন, দেশ শাসন করেছেন, লেখালেখি ও পাঠদান করেছেন। শরীয়তের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা সবই করেছেন, মনের ঝোঁককে রেখেছেন সব পঙ্কিলতার উর্ধ্বে। লেখক যে পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন সেগুলো মূলত ভণ্ড সুফিবাদের বৈশিষ্ট্য। দ্র: তাসাউফ তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ। - সম্পাদক
[১] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান: ৬৮৭৯। এই বর্ণনাটির সনদ দুর্বল - সম্পাদক
[২] ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ৪/৩৬০। রাসূল -এর ভালোবাসার ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এই উত্তর দেন। বিষয়টি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, কারণ রাসুলুল্লাহ -কে ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাবিআর উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ই এটি ছিল না যে তিনি রাসূল-কে ভালোবাসেন না, কেবল আল্লাহকে ভালোবাসেন; কারণ আল্লাহর ভালোবাসা রাসূল-কে ভালোবাসা ব্যতীত পূর্ণ হতে পারে না। সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সুফিবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব

📄 সুফিবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব


সুফিবাদকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আপাত একটি সমস্যা দেখা দেয়। সুফিরা যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রচলিত জীবনধারাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভোগ ও উপার্জনের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব সংযমী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, তাহলে ম্যাক্রো পর্যায়ে কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হওয়ার কথা না। কিন্তু দুনিয়াবিরাগে ফিরে যাওয়ার আহ্বানটা যদি প্রকাশ্যে গণপরিসরে করা হয় এবং এটিকেই আল্লাহর আরাধনার আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুফিবাদের কিছু না কিছু প্রভাব থাকাটা অপরিহার্য। এর ওপর এভাবে আলোকপাত করা যায়:
➡ প্রথমত, স্ফীতিমূলক অর্থনীতিতে যেখানে সংযম নীতি পছন্দনীয় বা কখনো কখনো বাঞ্ছনীয়ও বটে, হ্রাসমূলক অর্থনীতিতে সেটা আবার কাঙ্ক্ষিত নয়। স্ফীতিমূলক অর্থনীতিতে সংযম চাহিদা-আকর্ষণের শক্তি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। প্রাপ্য পণ্য ও সেবার সামষ্টীক চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে এর উদ্ভব হয়। কিন্তু অর্থনীতি যখন প্রাপ্য পণ্য ও সেবার জোগানের প্রতি যথেষ্ট চাহিদা না থাকার ফলে হ্রাসমূলক অবস্থায় থাকে, তখন অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকা সাপেক্ষে সুফি অর্থনীতির প্রভাবে হ্রাসমূলক প্রভাবের আরও অবনতি হওয়ার কথা। সেখানে বরং সামষ্টিক চাহিদা সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে সরকার প্রায়শ এমন এক বা একাধিক নীতি অনুরসণ করে, যার ফলে চাহিদা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে ভাউচার মানির সরাসরি প্রবেশন, যার বিশেষ লক্ষ্য হয় ভোগ বৃদ্ধি করা, সঞ্চয় বৃদ্ধি না করে।
➡ দ্বিতীয়ত, পণ্য ও সেবার জন্য সামষ্টিক চাহিদা সীমিত হয়ে গেলে বিক্রি কমবে। এর ফলে উদ্যোগের মুনাফা কমবে এবং ক্ষতি উৎপন্ন হবে। এমনটা চলতে থাকলে উদ্যোগসমূহ ব্যবসার ময়দান থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবে। কারণ তারা তাদের খরচ পোষাতে পারছে না। সেইসাথে পুঁজির খরচের তুলনায় মুনাফা কম। এর ফলাফল হবে উৎপাদন হ্রাস। বিক্রি কমে যাওয়ার ফল হিসেবে একটা সময় পর উৎপাদন কমে আসবে। উৎপাদনকারী উদ্যোগগুলো বাজার থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হওয়া এবং টিকে থাকা উদ্যোগের উৎপাদন কমে যাওয়ায়-অর্থনীতির সাকুল্য উৎপাদন কমে যাবে। অতএব, পণ্য ও সেবার সামষ্টিক জোগানও কমবে। সামষ্টিক চাহিদা ও সামষ্টিক জোগান উভয়টিই কমে আসায় দামও কমে আসতে পারে বটে। কিন্তু সেটা হবে দরিদ্র অর্থনীতিতে দাম কমার ঘটনা।
➡ তৃতীয়ত, বেশির ভাগ সুফির কথামতো সমাজ যদি তাদের উপার্জনক্ষমতাকে কোনোমতে বেঁচে থাকার পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তাহলে উৎপাদনের পরিমাণ আরও কমে যাবে। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, বিকাশের জন্যও তেমন সুযোগ থাকবে না।
➡ চতুর্থত, যাকাত যেহেতু প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে, ফলে কোষাগারে আদৌ কিছু রাজস্ব এলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্যান্য সরকারি সেবা এবং সমাজের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গঠনের জন্য যথেষ্ট তহবিল ইসলামি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে না। প্রতিরক্ষা-বাজেট প্রায় শূন্য বা যৎসামান্য হওয়ার কারণে প্রতিরক্ষার অস্তিত্বও থাকবে না থাকার মতো। ফলে প্রতিবেশী কোনো অনৈসলামি, বা অ-সুফি শক্তির আক্রমণের সামনে ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে পড়বে একেবারেই দুর্বল।
➡ পঞ্চমত, খাদ্য ও মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের পেছনে খরচ করার মতো যথেষ্ট অর্থ না থাকলে ব্যক্তি অসুস্থতা ও দুর্বলতার শিকার হবে। তখন পূর্ণ ভালোবাসা সহকারে আল্লাহর ইবাদত করার পথে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই শাইবানির (৭৫০-৮০৪) মতো ব্যক্তিদের প্রান্তিক সুফিদের ভোগ ও উপার্জন সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণের সমালোচক হয়ে ওঠাটা খুব স্বাভাবিক। তেমনি এটিও স্বাভাবিক ব্যাপার যে, আল-মুহাসিবির মতো একজন সুবিখ্যাত সুফি তার রচিত গ্রন্থে অন্যান্য সুফির থেকে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00