📄 গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস)
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গনিমতের ওপর এক-পঞ্চমাংশ প্রদেয় খুমুসের বিধান কুরআনের আয়াত দ্বারা বিধিবদ্ধ। এটি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নবি ﷺ-এর সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধানে অর্পণ করতে হতো। দ্বিতীয় অধ্যায়ে যেমনটি বলা হলো, এই সম্পদ ব্যয়ের নিয়মও কুরআনে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নবিজির সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাথমিক যুগে যদিও রাষ্ট্রীয় আয়ের পরিমাণ বেশ সীমিত ছিল, দ্বিতীয় খলিফা উমর রা.-এর শাসনামল (৬৩৪-৪৪) থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিসীমা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় আয়ের এই উৎসটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
📄 যাকাত
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায় থেকে আমরা জেনেছি, মুরতাদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম খলিফা আবু বকর রা. যাকাত অস্বীকারকারীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় খলিফা উসমান রা. সিদ্ধান্ত নেন যে, মুসলিমরা আর্থিক সম্পদ বাদে অন্যান্য সম্পদের ওপর প্রদেয় যাকাতের পরিমাণ ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী নিজেরা ঠিক করে নিতে পারবে। উমাইয়্যা ও আব্বাসি খিলাফতের আমলে এই নীতি বহাল থাকে (আত-তাবারি)।
📄 জিযিয়া
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যাকাত মুসলিমদের ওপর এবং জিযিয়া অমুসলিমদের ওপর আরোপিত হয়। কুরআনে এটি বিধিবদ্ধ। কিন্তু জিযিয়া কর নারী ও শিশুদের ওপর প্রযোজ্য নয়, তা তাদের সম্পদের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন। এ ছাড়া কাজ করতে অক্ষম ও সম্পদহীন বৃদ্ধ এবং ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরাও এর আওতার বাইরে। পূর্বোল্লিখিত এই সকল মূলনীতি নবি ﷺ প্রবর্তন করে গেছেন এবং খুলাফায়ে রাশিদীন এর চর্চা করে গেছেন। তবে উমাইয়্যা খিলাফতের সূচনাকাল থেকে জিযিয়া করের প্রয়োগে কিছু পরিবর্তন আসে। অমুসলিম পুরোহিতদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের জিযিয়া আর মওকুফ হয়নি। অবশ্য দরিদ্র ও বৃদ্ধরা তারপরও এর আওতার বাইরে থাকে (আল-মাকরিযি, Hitti, 1963)। তা ছাড়া খ্রিষ্টান থেকে ইসলামে ধর্মান্তরের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াতেও রাষ্ট্র কিছুটা নড়েচড়ে বসে। কারণ এতে জিযিয়া থেকে প্রাপ্ত আয় অনেক কমে যাবে। ধর্মান্তরের পেছনে উদ্দেশ্য বা অন্তত আংশিক উদ্দেশ্য হয়তোবা জিযিয়া ফাঁকি দেওয়া, এই সন্দেহে কিছু প্রশাসক নব্য মুসলিমদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা অব্যাহত রাখেন (প্রাগুক্ত)। তবে উমাইয়্যা খলিফা উমর বিন আবদুল আযীয, দ্বিতীয় উমর (৭১৭-২০) নতুন ধর্মান্তরিতদের প্রতি সুধারণা পোষণের সিদ্ধান্ত নেন। ইসলাম গ্রহণের নিষ্ঠা যেমনই হোক, নব্য মুসলিমদের জিযিয়া পরিশোধের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেন তিনি। এ ব্যাপারে তার এক সুবিখ্যাত উক্তি, “আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ -কে হিদায়াতদাতা করে পাঠিয়েছেন, কর আদায়কারী হিসেবে নয়।” (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।
সন্দেহটি হয়তো অতিরঞ্জিতই হয়ে থাকবে। কারণ ধর্মান্তরের আগে প্রদেয় জিযিয়া এবং ধর্মান্তরের পরে প্রদেয় যাকাতের পরিমাণের মাঝে পার্থক্য সামান্যই। তা ছাড়া নব্য মুসলিমকে সামরিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিতে হবে। সেটা সীমান্ত প্রহরার মাধ্যমেই হোক বা নতুন ভূমি আক্রমণ করার মাধ্যমেই হোক। তাই জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রশ্নে ধর্মান্তর খুব একটা লোভনীয় কিছু হওয়ার কথা নয়। গনিমতের মাল লাভ করার অনিশ্চিত সম্ভাবনা যদি কারও কাছে জীবন বাজি ধরার মতো উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা।
বিরূপ জিযিয়া সংগ্রহ নীতি অবলম্বনকারী প্রশাসক ও তাদের প্রতিনিধিবর্গের অস্তিত্ব অবশ্যই ছিল। নাহলে মধ্যযুগের ইতিহাসবিদগণ এ বিষয়টিতে মনোযোগ প্রদান করতেন না। যেমন: উমাইয়্যাদের (খলিফা আবদুল মালিক, ৬৮৫-৭০৫ ও তার ছেলে আল-ওয়ালীদ, ৭০৫-৭১৫) অধীনে ইরাকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হাজ্জাজ (৬৯২-৭১৫) সর্বদাই ইতিহাসবিদদের আক্রমণ ও সমালোচনার প্রধান একটি লক্ষ্য। আর সেটা কিছু ক্ষেত্রে মজাদারও বটে। উদ্ভট আচরণ, চাতুর্য, নিষ্ঠুরতা, নির্দয়তা এবং বাকি মুসলিমদের বিরুদ্ধে উমাইয়্যাদের প্রতি একচোখা আনুগত্যের কারণে হাজ্জাজ নির্বিশেষে ও ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসবিদদের সমালোচনা কুড়িয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি ইতিহাসবিদদের দিয়ে গেছেন প্রচুর ঐতিহাসিক সরঞ্জাম, যদিও তার বেশির ভাগই বিরূপ প্রকৃতির। কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যাপারে উল্লেখিত তথ্যগুলো সমালোচনার উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও তা বিনোদন ও তিক্ততার এক অদ্ভুত মিশ্রণে পরিণত হয়। যেমন: কথিত ভুয়া ধর্মান্তরের ব্যাপারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য হাজ্জাজ নব্য মুসলিমদের থেকে জিযিয়া ও যাকাত উভয়টিই আদায় করেছেন! (প্রাগুক্ত)
📄 খারাজ
খারাজ ছিল রাষ্ট্রের অর্থায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এটি হলো ইসলামি বিজয়ের পর অমুসলিম মালিকদের কৃষি ভূমিগুলোর ওপর আরোপিত কর। তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখে এসেছি যে, নতুন বিজিত ভূমিগুলোর বণ্টনের ব্যাপারে মুজাহিদগণের সাথে দ্বিতীয় খলিফা উমরের মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। যোদ্ধাদের দাবি ছিল রাষ্ট্রের প্রাপ্য এক-পঞ্চমাংশ খুমুস বিয়োগ করার পর বাকিটুকু গনিমত হিসেবে তাদের মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে। আর দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন সেসব ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে রাখার পক্ষপাতী। আগের মালিকেরা সেগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকলেও মূল মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের কাছে। জমির চাষযোগ্যতা অনুযায়ী তারা পরিশোধ করবে খারাজ কর, “আমি তাদের জমির ওপর খারাজ ও ব্যক্তির ওপর জিযিয়া আরোপ করেছি” (আবু ইউসুফ)।
খারাজ ভূমিকে সাওয়াফি ভূমি বা উশরি ভূমির সাথে মিলিয়ে ফেললে হবে না। ইসলামি বিজয়ের আগে যে অমুসলিমরা জমিগুলোর মালিক ছিল, খারাজ কর পরিশোধের বিনিময়ে তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভূমিগুলো খারাজ ভূমি। সাওয়াফি ভূমি হলো যেগুলোর অমুসলিম মালিকরা ইসলামি বিজয়ের পর পালিয়ে গেছে কিংবা কোনো উত্তরাধিকারী না রেখে মারা গেছে। সেগুলো রাষ্ট্রের সরাসরি ব্যবস্থাপনার অধীনে চলে আসে। যাকাত তথা উশর ভূমি মুসলিমদের মালিকানাধীন, যেগুলো ইসলামি বিজয়ের আগে মূলত আরব উপদ্বীপের মধ্যেই ছিল। খারাজ ভূমি থেকে খারাজ কর আর যাকাত ভূমি থেকে যাকাত অর্থাৎ উশর নেওয়া হতো। আর সাওয়াফি ভূমি থেকে পাওয়া যেত লভ্যাংশ। প্রত্যেক ধরনের জমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব রাষ্ট্রের কাছে ওই নামেই পরিচিত লাভ করে: খারাজ, উশর ও সাওয়াফি রাজস্ব (আবু ইউসুফ)।
খারাজ ভূমিগুলোর করসীমা নির্ধারণের জন্য বিশেষভাবে জরিপ করা হতো। আরোপিত করের অনুপাত প্রথমদিকে নির্ভর করত উৎপাদের ধরন, সেচের জটিলতা, এবং ভূমির উর্বরতার ওপর। পরে আল-মাহদির শাসনামলে (৭৭৫-৭৮৫) এই আনুপাতিক হারের পদ্ধতি পরিবর্তন করে ফসল ভাগাভাগি পদ্ধতি প্রবর্তিত করা হয় (আবু ইউসুফ)। পক্ষান্তরে উশরি ভূমির ওপর করারোপ হতো দুটি হারে। সেচের প্রকরণের ওপর ভিত্তি করে একটি হার অপরটির চেয়ে বেশি। এই নিয়ম সুন্নাহর মাধ্যমে বিধিবদ্ধ। তা ছাড়া উশরি ভূমি থেকে প্রাপ্ত আয়কে অন্যান্য ভূমি কর বা রাজস্বের সাথে মেশানো যাবে না। কারণ উশর ও যাকাতের টাকা ব্যয় করতে হবে কুরআনে নির্ধারিত খাত অনুযায়ী। আর অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়ের ব্যয়পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট নয়।