📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 কর কাঠামো

📄 কর কাঠামো


উমরের শাসনামলে পাঁচ ধরনের করের অস্তিত্ব ছিল—খারাজ, উশর, যাকাত, জিযিয়া এবং খুমুস।

আগেই বলা হয়েছে যে, বিজিত ভূমি মুসলিম যোদ্ধাদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার নিয়মটির বদলে উমর খারাজ করের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন। সাধারণ বিতর্কে উমরের প্রস্তাবনা অনুমোদিত হয়। এই করের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
➡ (১) এটি ভূমির ওপর আরোপিত, ব্যক্তির ওপর নয়। তার মানে ওই ভূমিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার তফাতের ভিত্তিতে এই কর বাড়েও না, কমেও না। পক্ষান্তরে, জিযিয়া হলো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ব্যক্তিদের ওপর আরোপিত কর।
➡ (২) এই করের ভিত্তি হলো চাষযোগ্য জমি। এর ফলে করদাতা জমির উৎপাদনশীলতার সর্বাধিককরণে উৎসাহ লাভ করে। কারণ চাষযোগ্য জমিতে চাষাবাদ না করলেও তা থেকে কর দেওয়াই লাগবে।
➡ (৩) করের হার ছিল আনুপাতিক হার। অবশ্য জমির উর্বরতা, উৎপাদনের বাজারমূল্য এবং সেচের কঠিনতার ভিত্তিতে এর তারতম্য হতো।
➡ (৪) এই কর বার্ষিক কর, যদিও কিস্তিতে পরিশোধ করা সম্ভব।
➡ (৫) এটি দ্রব্য বা অর্থের মাধ্যমে পরিশোধ করা হতো।
➡ (৬) কর পরিশোধের দায়দায়িত্ব জমির দখলদারের ঘাড়ে, সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম।
➡ (৭) খারাজ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব যাকাতের সাথে মিশ্রিত করা যাবে না। কারণ যাকাত থেকে প্রাপ্ত আয় কুরআনে বর্ণিত খাতগুলোতেই ব্যয় করতে হবে। আর খারাজের অর্থ কিভাবে ব্যয় করা হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে রাষ্ট্র।

ইতিহাসবিদদের মাঝে একটি আলোচনার উদ্ভব হয়েছে যে, খারাজ আর জিযিয়া একই জিনিস কি না। যেমন, হিট্টি বলেন, "জিযিয়া ও খারাজ নামক দুই প্রকার করের মাঝে পার্থক্য করা হয় উমাইয়্যা যুগের শেষ দিকে এসে” (Hitti, 1963)।

এই আলোচনার গুরুত্ব হলো খারাজ যদি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধিবদ্ধ জিযিয়াই হয়ে থাকে, তাহলে খলিফা উমর সেটাকে ইসলামি করব্যবস্থায় নতুন একটি খাজনা হিসেবে প্রবর্তিত করতে পারতেন না। এতটুকু অন্তত বলা যায় যে, বিজিত ভূমির বণ্টন সংক্রান্ত বিতর্কে উমর যেসব কথা বলেছেন, হিটি প্রমুখ সেগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। খলিফা উমর বলেছেন, "আমি খারাজ আরোপ করছি তাদের জমির ওপর আর জিযিয়া আরোপ করছি ব্যক্তিদের ওপর” (আবু ইউসুফ, মাওয়ারদি, এবং আবু উবাইদ)। খারাজ ও জিযিয়া, এই দুই প্রকার করের মাঝে দ্বিতীয় খলিফা স্পষ্টতই পার্থক্য করেছেন। খারাজকে বিশেষভাবে জমির সাথে এবং জিযিয়াকে সম্পর্কিত করেছেন ব্যক্তির সাথে।

ওপরে যেমনটি উল্লেখ করা হলো, জমির মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে। রাষ্ট্র নিজের পক্ষ থেকে সেই জমির ব্যবহারের দায়িত্ব অর্পিত রাখে আগের মালিক বা রক্ষকের হাতে—তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মালিকানার একটি রূপ। অতএব, খারাজ হলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জমি ব্যবহার করার অধিকার হস্তান্তরিত করার বিনিময়ে জমিরক্ষকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে প্রদেয় একটি অর্থ। তার ওপর খারাজ আরোপ করার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় খলিফা জমি পরিমাপ ও নথিভুক্ত করানোর আহ্বানও জানান।

ইমাম আবু ইউসুফ লিখেছেন যে, উমরের নির্দেশে, “উসমান ইবনু হানিফ জমিগুলো জরিপ করেন। তারপর আঙুরের জন্য প্রতি জারিবো দশ দিরহাম, আখের প্রতি জারিবে আট দিরহাম, গমের প্রতি জারিবে চার দিরহাম, এবং যবের প্রতি জারিবে দুই দিরহাম করে কর আরোপ করেন" (কিতাবুল খারাজ, ৪৯)।

জিযিয়াকে তাই খারাজ হিসেবে বিবেচনা করা যৌক্তিক হয় না। কারণ জিযিয়া হলো মাথাপিছু আরোপিত একটি নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ। পক্ষান্তরে খারাজ আরোপ করা হয় উৎপাদনের পরিমাপের এককের ভিত্তিতে। এর সমর্থনে আবু ইউসুফের উদ্ধৃতির বাকি অংশটি তুলে ধরা যায়, "...এবং বারো দিরহাম, চব্বিশ দিরহাম এবং আটচল্লিশ দিরহাম মাথাপিছু (সামর্থ্য অনুযায়ী)", (আবু ইউসুফ)। এ কথা মাথায় রেখে এবং ওপরে উল্লেখিত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কোনো পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন ছাড়াই বলা যায় যে, খারাজ আর জিযিয়ার পার্থক্যের ব্যাপারে উমরের জানা না থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ভূমিকর খারাজ প্রবর্তিত করার সময় এ দুটির মাঝে পার্থক্য করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিলই।

ইসলামি করব্যবস্থায় খলিফা উমর আরেকটি যে ট্যাক্স গ্রহণ করেন, তা হলো উশর বা শুল্ক মাশুল। উমরের একজন প্রশাসক আবু মূসা আশআরির পরামর্শে এই করের সূচনা হয়। মুসলিম ব্যবসায়ীরা সীমান্ত পারাপারের সময় বিদেশী রাষ্ট্রসমূহকে যে কর প্রদান করত, তার পালটা কর হিসেবে আরোপিত হয় এটি। এই করের হার এক-দশমাংশ, বা উশর, যার বহুবচন উশূর। বিদেশী রাষ্ট্র মুসলিম বণিকদের ওপর যে কর আরোপ করত, তার সমহারে নির্ধারিত হয় এই কর। উমরের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে আবু মূসা বলেন, "আমাদের শাসিত অঞ্চল থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা শত্রুদেশে গেলে তারা তাদের ওপর উশর (এক-দশমাংশ) আরোপ করে।” এর উত্তরে উমর লিখেন, "তারা যেভাবে মুসলিম ব্যবসায়ীদের থেকে কর নেয়, আপনিও সেভাবে তাদের থেকে নিন", (আবু ইউসুফ)। ইসলামি সীমান্ত পারাপারকালে অমুসলিম বণিকদের ওপর এই কর আরোপিত হয়। তবে দ্বিতীয় খলিফা এখানেই থেমে থাকেননি। যত পণ্য সীমান্ত পার হচ্ছে, সবগুলোকে করের ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। মুসলিম ও (খ্রিষ্টান, ইহুদি এবং সাবিঈ) যিম্মিদের ছাড় দেওয়া হয়। "...যিম্মিদের থেকে উশরের অর্ধেক এবং মুসলিমদের থেকে প্রতি চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম করে নেবেন", প্রশাসকের প্রতি এটি ছিল উমর -এর নির্দেশনা। (আবু ইউসুফ)।

উশর কর আরোপের ক্ষেত্রে মুসলিম, যিম্মি, এবং অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন ধর্মের অনুসারীদের মাঝে পার্থক্য করা হয়েছে। ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান ছাড়া অন্যান্য ধর্মের অনুসারী ব্যবসায়ীরা স্থানান্তরিত পণ্যের ওপর ১০% হারে কর দিতে বাধ্য। সেখানে মুসলিম ব্যবসায়ীরা পরিশোধ করবে ২.৫% এবং ইহুদি, খ্রিষ্টান ও সাবিঈ বণিকরা ৫%। তা ছাড়া যিম্মিদের প্রদত্ত ছাড়ের চেয়ে মুসলিমদের ছাড় দেওয়া হয়েছে বেশি। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার ভার অমুসলিমদের চেয়ে মুসলিমদের ওপর বেশি আরোপিত হয়েছে। তাই এই করের অসমতাকে এই বাস্তবতার আলোকে বুঝতে হবে। করব্যবস্থার অন্যান্য দিকের ক্ষেত্রেও একই কথা। সবচেয়ে বড় কথা, রক্ষণাত্মক ও সম্প্রসারণমূলক কোনো ধরনের যুদ্ধেই অমুসলিমরা অংশ নিতে বাধ্য নয়। তা ছাড়া করের হারের এই পার্থক্যের সাংবিধানিক কারণও ছিল:
➡️ (ক) মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত হারকে ব্যবসায়িক দ্রব্যের ওপর আরোপিত যাকাতের হারের সমতুল্য হিসেবে দেখা হয়, যেটি নবি কর্তৃক বিধিবদ্ধ হওয়ায় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
➡️ (খ) খ্রিষ্টান, ইহুদি ও সাবিঈ (আহলুল কিতাব) সম্প্রদায়ের ওপর আরোপিত করকে খারাজ করের সমতুল্য ধরা হয়, যা নবিজির মৃত্যুর পর প্রবর্তিত হয়েছে, আর
➡️ (গ) ইসলামি রাষ্ট্রের প্রজারা অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে যে আচরণ পেত, অন্যান্য ধর্মের ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত করের হার সেই আচরণের পালটা জবাব। উশূর করের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য হলো এর একটি নিম্নসীমা রয়েছে, ২০০ দিরহাম। সীমান্ত পারাপারের সংখ্যা নির্বিশেষে একই পণ্যের ওপর বছরে একবারই আরোপিত হতো এই কর। আর এটি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই শুধু প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ওপর এটি প্রযোজ্য নয় (আবু ইউসুফ)।

যাকাতের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের মনে আছে যে, খলিফা আবু বকর যাকাত সংগ্রহকে রাষ্ট্রীয় অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। উমর -এর শাসনকালে এই চর্চা অব্যাহত থাকে। তবে দ্বিতীয় খলিফা যাকাতের মধ্যে দুটো বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটান:
➡️ (ক) ইসলামি রাষ্ট্র যখন কোনো মারাত্মক অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়, তখন তিনি যাকাত-সহ অন্যান্য কর কালেকশন স্থগিত রাখেন। যেমন- দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে, এবং
➡️ (খ) যাকাতের টাকা ব্যয় করার খাতগুলোতে তিনি একটি পরিবর্তন আনেন। প্রাপকদের তালিকা থেকে অমুসলিম নেতাদের বাদ দিয়ে দেন। তিনি বলেন যে, ইসলাম এখন নিজের প্রতিরক্ষা করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। এখন আর কারও শান্তিচুক্তি বা আনুগত্য ক্রয় করার দরকার নেই।

উমর যে এই পরিবর্তনটি আনলেন, তা থেকে বোঝা যায় তিনি শুধুই পূর্ববর্তী চর্চার শাব্দিক অনুকরণ করে চলা কোনো ব্যক্তি নন। কুরআনে বর্ণিত এবং নবি ও আবু বকর -এর হাতে চর্চিত বিধানের ক্ষেত্রেও তিনি সেটার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ও উদ্দেশ্যকে বিবেচনায় নিয়েছেন। এই পদক্ষেপ-সহ অন্যান্য বিভিন্ন পদক্ষেপে উমর এ দেখিয়েছেন যে, কুরআনের কোনো আয়াত নাযিল হওয়ার উদ্দেশ্য কী। আর্থ-সামাজিক কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত কুরআনি কোনো বিধানকে বোঝা এবং তা থেকে আইন চয়ন করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। ফকিহগণের মাঝে এই মূলনীতি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

নারী ও শিশুদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অমুসলিম পুরুষদের ওপর আরোপিত জিযিয়া করের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন হার ছিল: পরিশোধের সামর্থ্যের ভিত্তিতে ৪৮ দিরহাম, ২৪ দিরহাম এবং ১২ দিরহাম।

যারা কর প্রদানের দায়িত্ব থেকে মুক্ত তারা হলো: হতদরিদ্র (যাদের অর্থ-সহায়তা প্রদান করা হয়), কর্মহীন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, দান-খয়রাতের হকদার, প্রতিবন্ধী কেউ যদি ধনাঢ্য না হয়ে থাকে, মঠে বসবাসকারী সন্ন্যাসী ও গির্জায় বসবাসকারী লোকজন যারা ধনাঢ্য নয়, নারী ও শিশু—এমনকি ধনাঢ্য হলেও, সম্পদহীন ও কাজ করতে অক্ষম বৃদ্ধ, মানসিক প্রতিবন্ধী এবং ইসলাম গ্রহণকারী যিম্মি (ইমাম আবু ইউসুফ র.)। এই জিযিয়া একটি বার্ষিক কর এবং চূড়ান্ত অর্থেই ব্যক্তিগত। অর্থাৎ, কর পরিশোধ করার আগে ওই ব্যক্তি মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরা সেটা পরিশোধ করতে বাধ্য নয়। মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকেও অপরিশোধিত কর বিয়োগ হবে না (প্রাগুক্ত)।

উপর্যুক্ত করগুলোর পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নের আরও দুটো উৎস ছিল: খুমুস এবং সাওয়াফি ভূমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব। খুমুস তথা এক-পঞ্চমাংশ হলো মুসলিম যোদ্ধাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদে রাষ্ট্রের প্রাপ্য (উমরের যুগে জমির কথা বাদে, যা ওপরে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে)। ভূমি থেকে যেসব সম্পদ (এবং খনিজ) আহরিত হয়, সেটাতে রাষ্ট্রের পাওনা অংশও এর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি বিজয়ের পর মালিকেরা যেসব জমি ফেলে পালিয়ে গেছে, সেগুলো হলো সাওয়াফি বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। এসব ভূমি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে আসা হয় এবং রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের দ্বারা তদারক করা হয়。

টিকাঃ
[১] জারিব একটি পরিমাপক। এক জারিব ৪৮ সা'-এর সমান। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাষ্ট্রীয় ব্যয়

📄 রাষ্ট্রীয় ব্যয়


সরকারি অর্থের ব্যয়ের অংশের দিকে মনোনিবেশ করা যাক এবার। আয়ের উৎসের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের খাত বিভিন্নরকম হতে দেখা যায়। যাকাত এবং খুমুস ব্যয়িত হতো কুরআনের বিধান অনুযায়ী। জিযিয়ার রাজস্ব ছিল সাধারণ। কারণ কুরআন ও সুন্নাহতে এর খরচের কোনো পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। শুল্ক মাশুল বা উশর প্রবর্তিত হয়েছিল খলিফা উমরের শাসনামলে। তাই এর অর্থ ব্যয় করা হয় সাধারণ রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিশাল পরিমাণ আয়ের উৎস হলো খারাজ。

দ্বিতীয় খলিফার আমলে সরকারি খরচের একটি পর্যালোচনা থেকে সেটাকে তিন প্রকারে ভাগ করা যায়: সামাজিক কল্যাণমূলক ও ভাতা সংক্রান্ত ব্যয়, চলমান ব্যয় (Current expenditure) এবং বিনিয়োগ ব্যয় (Investment expenditure)। প্রথম প্রকারটি ওপরে বর্ণিত হয়েছে, তাই পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। দ্বিতীয় প্রকারটি দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যেসব রাষ্ট্রীয় ব্যয় রয়েছে, সেগুলোর সাথে সম্পর্কিত। মুসলিম সৈনিক, গভর্নর, স্থানীয় কোষাধ্যক্ষ, বিচারক ও কেরাণীদের প্রদেয় ভাতা এর অন্তর্ভুক্ত। বিনিয়োগ ব্যয়গুলো আরও স্থায়ী প্রকৃতির: সেতু নির্মাণ, রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও নদী খনন, এবং পুঁজির মুখাপেক্ষী উদ্যোক্তাদের সহায়তা (আবু উবাইদ)। জনগণের সুবিধা ও রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে উমর এতই কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন যে, ফুরাত নদী পর্যন্ত পুরো রাস্তায় কোনো খচ্চর একবার হোঁচট খেলেও তিনি সেটার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করতেন।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসন

📄 রাষ্ট্রীয় প্রশাসন


উমর-এর পূর্বসূরিদের যুগে রাষ্ট্র পরিচালিত হতো মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে। উমর-এর আমলে রাষ্ট্র অনেক বেশি প্রশস্ত হয়ে যায়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড হয়ে ওঠে জটিলতর। প্রাদেশিক গভর্নরদের এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার কারণে তারা রাজধানী থেকে আদেশ আসার অপেক্ষা না করেই নিত্যদিনকার প্রাদেশিক বিষয়-আশয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে, ট্যাক্স নির্ণীত ও নির্ধারিত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে। কোনো গভর্নর নতুন কর আরোপ বা করের হার পরিবর্তন করতে পারবেন না। কিন্তু প্রাদেশিক গভর্নররা কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব প্রাদেশিক বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদ্বৃত্ত অংশটুকু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, মিশরের রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ নির্ধারিত ছিল প্রদেশের রাস্তা মেরামত, সেতু নির্মাণ এবং খাল খননের কাজের জন্য (Kettani, 1979)1

যাকাতের আয় প্রথমে প্রদেশের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে। তারপর বাকিটা পাঠিয়ে দিতে হবে মদীনার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। তাই উমরের শাসনামলের ইসলামি প্রশাসনকে বলা চলে একটি কেন্দ্রশাসিত উদার সরকারব্যবস্থা। গভর্নররা ছিলেন উমরের অব্যাহত নজরদারির অধীনে। ক্ষমতার যে-কোনো অপব্যবহারকে চরমভাবে শাস্তি প্রদান করা হতো। কোনো গভর্নর তার পদাধিকার বলে অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হয়ে থাকলে সেটার জবাবদিহিতার নীতি প্রবর্তন করেন দ্বিতীয় খলিফা। দায়িত্বের মেয়াদকাল শেষে কখনো গভর্নরকে ব্যাখ্যা করতে হতো যে, দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নিয়ে অবসরের তারিখের মধ্যে তার সম্পদে কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে থাকলে সেটা কেন ঘটেছে। বিদেশী বা প্রভাবশালী স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে গভর্নরদের কোনো আর্থিক উপহার দেওয়া হলে সেটাকে বিবেচনা করা হতো রাষ্ট্রের প্রতি উপহার হিসেবে। এমনকি সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করা হলেও। যেমন- জনৈক প্রশাসক একবার তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া উপহার এবং রাষ্ট্রকে প্রদত্ত উপহারের মধ্যে পার্থক্য করেন। উমর তাকে তিরস্কার করে জানিয়ে দেন যে, সব উপহারই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। রাগান্বিত খলিফার প্রশ্ন, "তিনি যদি গভর্নর না হয়ে বাপ-মায়ের ঘরে বসে থাকতেন, তাহলে কি এসব উপহার তাকে দেওয়া হতো!" (আস-সুয়ুতি)।

রাষ্ট্রের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রিত হতো বিভিন্ন স্থানীয় কোষাগার এবং একটি কেন্দ্রীয় কোষাগারের মাধ্যমে। প্রতিটি প্রদেশে একটি করে স্থানীয় কোষাগার স্থাপিত হতো, যার প্রধান ছিলেন একজন করে কোষাধ্যক্ষ (Treasurer)। এই কোষাধ্যক্ষ রাষ্ট্রপ্রধানের দ্বারা নিয়োগকৃত এবং গভর্নর ছাড়া অন্য কেউ হতেন। কোষাধ্যক্ষরা প্রদেশের আয় ও ব্যয়ের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। রাজধানীতে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনায় একটি কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপন করা হয়। এর প্রধান ছিলেন একজন কোষাধ্যক্ষ, রাষ্ট্রনেতা নিজে নন। কেন্দ্রীয় কোষাগারের কাজ ছিল দুই রকম: মদীনা ও এর পার্শ্ববতী অঞ্চলসমূহের স্থানীয় কোষাগার হিসেবে ভূমিকা পালন করা এবং স্থানীয় কোষাগারসমূহের মাঝে সমন্বয়কের কাজ করা। যেসব কোষাগারে উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকবে, তারা উদ্বৃত্ত অংশটুকু কেন্দ্রীয় কোষাগারে পাঠিয়ে দেবে, যাতে কোনো স্থানীয় কোষাগারে ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা যায়। অথবা কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হতো ঘাটতিবিশিষ্ট কোনো স্থানীয় কোষাগারে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।

এ ছাড়াও উমর তার শূরার পরামর্শে রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রেশন দপ্তর তথা দিওয়ান প্রবর্তন করেন (প্রাগুক্ত)। সম্ভবত সিরিয়া ও ইরাকের বিজিত ভূমিতে আগে থেকে অস্তিত্বমান নথিব্যবস্থাও এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাতা রেজিস্ট্রেশন ও খারাজ রেজিস্ট্রেশন। প্রথমটির মধ্যে রয়েছে মানুষ, তাদের নাম, গোত্র, স্থান এবং তারা কতটুকু ভাতা পাবে, সেসবের নিবন্ধন। আর দ্বিতীয়টির মাঝে রয়েছে খারাজ ভূমিসমূহের জরিপ, তাদের মালিক, উর্বরতার মাত্রা, উৎপাদ, আরোপিত খারাজের পরিমাণ এবং সরকারি অর্থের কতটুকু সেই ভূমিতে খরচ হয়েছে-রাষ্ট্রের অর্থায়নের প্রধান উৎসের এক বিস্তারিত নিবন্ধন。

দশ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে ইসলামি সাম্রাজ্যের সাংগঠনিক কাঠামোকে অভূতপূর্ব সেবা দেওয়ার পর মর্মান্তিকভাবে খলিফা শাহাদাতবরণ করেন। ৬৪৪ সালে একদিন নামাজের জামাতে ইমামতি করার সময় এক পারসিক দাস বিষমাখা ছুরি দিয়ে তাকে হত্যা করে। ঘাতকের পরিচয় জানার পর তিনি আল্লাহর শুকরিয়া জানান যে, কোনো মুসলিম তাকে ছুরি মারেনি (প্রাগুক্ত)। করে থাকলে সেটা মুসলিমদের মাঝে বিভেদের আশঙ্কা হিসেবে দেখা দিত। অবশ্য তাঁর মৃত্যুর বছর দশেক পর বিভেদ চলেই আসে। খলিফা উমরের আকস্মিক মৃত্যু এক সফল মুসলিম নেতার শাসনকালের অবসান ঘটায়।

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারির (২৫৯৭) হাদীসে রাসূলুল্লাহ একজন যাকাত-সংগ্রাহকের ব্যাপারে এই কথা বলেছেন। প্রশাসক ও সরকারি কর্মচারীদেরকে প্রদানকৃত উপহার, যেগুলো সাধারণত ঘুষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেগুলো রাসূলুল্লাহ-এর যুগ থেকেই অবস্থা বিবেচনায় বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান ছিল। বেশ কয়েকটি হাদীসে এই প্রসঙ্গে আলাপ করা হয়েছে। দেখুন, ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার, সহীহ বুখারির ২৪৫৬ হাদীসের ব্যাখ্যা। - সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00