📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আচরণগত বিষয়াদি

📄 আচরণগত বিষয়াদি


ভোক্তা আচরণের প্রচলিত তত্ত্বে ভোক্তাকে ধরা হয় “হোমো-একোনোমিকাস”, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পণ্য ও সেবা থেকে নিজের উপযোগ সর্বাধিককরণ করা। প্রান্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোক্তার নির্লিপ্ততা ও আয় রেখাদ্বয়ের স্পর্শবিন্দুতে এই লক্ষ্য অর্জিত হয়। ধরা হয় যে, এই অবস্থানে ভোক্তা সাম্যাবস্থায় থাকে।

এই আচরণ-তত্ত্বকে পরার্থবাদী অর্থনীতিবিদরা সমালোচনা করেন। তাদের মতে-বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ভোক্তার সামাজিক দায়দায়িত্বের ওপর। পারিপার্শ্বিক জনসমাজের স্বার্থের প্রতি থাকবে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব। এর বদলে তারা প্রস্তাব করেন একটি সামাজিক মনোভাব, যেখানে ভোক্তা হলো "হোমো-একোনোমিকাস-হিউম্যানাস"। তার থাকবে এমন নৈতিক মূল্যবোধ, যা ভোক্তা আচরণের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে। যে তুষ্টিকে সে সর্বাধিককরণ করতে চায়, এর ফলে সেটা প্রভাবিত হয় (McKee, 1982)। নৈতিক মূল্যবোধের সকল উৎসের মাঝে ধর্মকে বিশেষভাবে পরিপূর্ণ একটি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অমুসলিম ভোক্তাদের কাছে অন্যান্য নৈতিক উৎসের তুলনায় ধর্মের গুরুত্ব কতখানি, তা এখানে আলোচিত হবে না। তবে এতটুকু বলা যথেষ্ট যে, মুসলিম ও মুসলিম ভোক্তাদের কাছে ধর্ম হলো আচরণবিধি নির্ধারণের সর্বোচ্চ একটি মানদণ্ড। তার মানে এই না যে, ভোগ-সন্তোষ (Consumption satisfaction) অর্জনের ক্ষেত্রে সকল মুসলিম ভোক্তাই হুবহু একইরকম আচরণ প্রদর্শন করবে। কেউ কেউ অন্য কারও চেয়ে বেশি ধার্মিক। তাই ভোক্তার উপযোগ ফাংশনের স্বরূপ নির্মাণ এবং তাদের আচরণ নির্ধারণে ধার্মিকতার মাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক।

মুসলিমদের কাছে সুবিদিত যে, ধর্ম, রাজনীতি, এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদির মাঝে ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্নতা স্বীকার করে না। মুসলিমদের কাছে এটি একটি সর্বব্যাপী জীবনব্যবস্থা। কুরআনে আল্লাহ তাঁর নবিকে উদ্দেশ্য করে আদেশ দেন, "বলো, আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমাকে এরই আদেশ করা হয়েছে এবং আমিই প্রথম মুসলিম” (সূরা আনআম, ৬: ১৬২-১৬৩)। তবে ইসলামি অর্থনৈতিক বিষয়াদিকে দেখতে হবে নৈতিক মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে। ধর্মের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি অপরিহার্য। কারণ এর আগমন হয়েছে সার্বিকভাবে জীবনপদ্ধতির উন্নয়ন, ব্যক্তির আত্মিক উন্নতি বৃদ্ধি, এবং সমাজে আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যহীনতাকে সংশোধিত করে একে সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে ধাবিত করার জন্য।

ভোক্তাকে ইসলামি সামাজিক মূল্যবোধের আয়নায় দেখলে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের কাছে ভোক্তা আর "হোমো-একোনোমিকাস” থাকবে না, হয়ে উঠবে “হোমো-ইসলামিকাস” (উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য, Zarqa, 1980)। অর্থাৎ, ইসলামি সমাজে একজন ভোক্তা ভোগ, সঞ্চয়, ও বিনিয়োগের ব্যাপারে ইসলামি নৈতিক মূল্যবোধ মেনে চলবে। এটিই তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত। "হোমো-একোনোমিকাস-ইসলামিকাস" ভোক্তার ভোগ-মানসিকতা নিয়ন্ত্রিত হবে চারটি প্রধান নিয়ামকের দ্বারা:
➡ (ক) আমানতদারির মাধ্যমে মালিকানার ধারণা,
➡ (খ) পরকালীন পুরস্কার ও শাস্তির প্রতি বিশ্বাস,
➡ (গ) মধ্যমপন্থার নীতি, এবং
➡ (ঘ) সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাঝে সম্পর্ক (Kahf, 1980)।

মালিকানার ধারণাটি আগেই আলোচিত হয়েছে। ভোগের অন্যান্য নিয়ামকের ভূমিকা নিম্নে আলোচিত হলো。

ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনে পুরস্কার ও শাস্তির প্রতি মুসলিম ভোক্তার বিশ্বাস রয়েছে। এর মাধ্যমে তার ভোক্তা আচরণ, আয় ও ব্যয়ের খাত, তথা কাঙ্ক্ষিত উপযোগ সর্বাধিককরণ প্রভাবিত হওয়ার কথা। তার ব্যয়ের খাতসমূহ শুধুমাত্র শারীরিক-সামাজিক চাহিদা মেটানোর জাগতিক দিকগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং যেসব বিষয় আখিরাতে তার পুরস্কার বৃদ্ধি করবে, সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত। এর মাঝে প্রধানত রয়েছে সমাজকল্যাণে ব্যয় এবং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়। অতএব, ভোক্তা যে উপযোগকে বৃদ্ধি (প্রচলিত পরিভাষায় সর্বাধিককরণ) করতে চায়, তাতে দুটি উপাদান রয়েছে: ইহকালীন এবং পরকালীন উপযোগ। পছন্দসই ধার্মিকতার মাপকাঠি তথা তাকওয়ার মাত্রার ওপর নির্ভর করবে যে, সে প্রতিটি উপযোগকে কতটা গুরুত্ব দেয়। এর ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে তার ব্যয়ের অভ্যাস। গাণিতিকভাবে তুলে ধরলে, তার ব্যয়ের পরিমাণ (যেটা ভোগ থেকে বিয়োগ হবে) হলো পণ্য ও সেবা ভোগ থেকে প্রাপ্ত সন্তুষ্টি, ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণকামিতার ফলে আখিরাতে পুরস্কার লাভের অনুভূতি থেকে প্রাপ্ত সন্তুষ্টি, এবং ধার্মিকতার মাত্রার ফাংশান। এটি অবশ্যই তার আয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ,
(সর্বাধিককরণ করতে হবে) V = U(C, H), F(P) ........(২)
শর্ত হলো Y
যেখানে Y = আয়
V = ব্যয় ফাংশন
C = পণ্য ও সেবা ভোগ
H = ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণমূলক খরচের ফলে আখিরাতে প্রাপ্ত পুরস্কার
P = ধার্মিকতা/তাকওয়া

সমীকরণ (১)-কে বাকি দুই নিয়ামকের আলোকে আরও বিশ্লেষণ করা হবে। সেগুলো হলো মধ্যমপন্থার নীতি এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাঝে সম্পর্ক।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মধ্যপন্থা নীতি

📄 মধ্যপন্থা নীতি


কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ভিত্তিতে মুসলিম ফকিহগণ মানবীয় শারীরবৃত্তীয় চাহিদাকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এই সবগুলোর ব্যবহার হতে হবে মধ্যমপন্থা অনুযায়ী। এগুলো হলো খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, বিবাহ, এবং কেউ কেউ এর সাথে যোগ করেছেন ধর্মকে। মুসলিমদের আদেশ দেওয়া হয়েছে মধ্যমপন্থা মেনে খরচ করতে। অপব্যয়ী না হয়ে, দানশীল হতে হবে নিজেদের প্রতি, পরিবারের প্রতি এবং অধীনস্থদের প্রতি। আগে যেমনটি বলা হলো, মধ্যমপন্থা মানে কৃপণতা নয়। আর অপচয়ের প্রতি নিষেধাজ্ঞা মানেও কৃপণতার আদেশ নয়। কুরআন এই দুই চরমপন্থার একটিরও আদেশ করেনি, (সূরা আরাফ, ৭: ৩১, সূরা ইসরা, ১৭: ২৯)।

ভোগযোগ্য পণ্য ও সেবার পেছনে এবং দান-খয়রাতের পেছনে টাকা খরচ করার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা নীতি প্রযোজ্য। তেমনিভাবে ব্যয় ও সঞ্চয়ের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহের মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাটা এই নীতির দাবি।

➡ প্রথমত, ভোগযোগ্য পণ্য ও সেবার পেছনে খরচ করা। প্রাথমিক যুগের ফকিহগণ ভোগের তিনটি প্রধান পর্যায় চিহ্নিত করেছেন: অত্যাবশ্যকীয়, প্রয়োজনীয়, এবং আরামপ্রদ (ইমাম শাতিবি; Zarqa, 1980)। অত্যাবশ্যকীয় মানে এমনসব পণ্য ও সেবা, যেগুলো বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক। কারণ এগুলোর মাধ্যমে জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষিত হয়। প্রয়োজনীয় জিনিসের পর্যায়টি টিকে থাকার জন্য অত জরুরি না, তবে মৌলিক। আর আরামপ্রদের পর্যায়ে রয়েছে এমন পণ্য ও সেবা, যার ফলে জীবন আরামদায়ক ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। প্রাথমিক যুগের ফকিহদের মতে অত্যাবশ্যকীয় পর্যায়টিতে রয়েছে: খাদ্য, বাসস্থান, ধর্ম, জীবন, এবং বিবাহের মাধ্যমে বংশধারার সুরক্ষা নিশ্চিত করা (প্রাগুক্ত)। সকল মৌলিক শারীরিক-সামাজিক প্রয়োজন এখানে চলে এসেছে। দ্বিতীয় তথা প্রয়োজনীয় পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে এমনসব পণ্যদ্রব্য, যা মৌলিক হিসেবে পরিগণিত হলেও (প্রকার, পরিমাণ, ও মানের বিচারে) প্রথম পর্যায়ের জিনিসগুলোর মতো খুব বেশি প্রয়োজন পড়ে না। তৃতীয় তথা আরামের পর্যায়ে পড়বে বিলাসী দ্রব্যসমূহ। মধ্যমপন্থি ভোগের বিধিনিষেধ সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য হয় এই শেষের পর্যায়টির প্রতি। এই পর্যায়ের পণ্য ও সেবার মধ্যমপন্থি ভোগ যদিও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে গেলে সেটি অপচয় হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আমাদের আধুনিক জামানায় মধ্যমপন্থার মানদণ্ড কী হবে, তা নির্ণয় করা কঠিন বটে। এক সমাজে, এক সময়কালে যা বিলাসদ্রব্য, অন্য সময়ে অন্য কোনো সমাজে সেটাই হতে পারে প্রয়োজনীয় দ্রব্য। এর কিছু উদাহরণ হলো পোশাক, খাবার, বিনোদন, শিক্ষা ও টেকসই পণ্যের পেছনে খরচ করা। তাই নিয়ম ঠিক করতে হবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিয়ামকের সাহায্যে। এর মাঝে রয়েছে জীবনযাত্রার মান, জাতীয় আয়ের পরিমাণ, উপার্জন বিন্যাসের প্রকৃতি, উন্নয়নের অবস্থা এবং ভোগের বিভিন্ন পর্যায়ের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণের ব্যাপারে প্রচলিত প্রথা। এক্ষেত্রে বিভিন্নতা পরিহার করা সম্ভব না বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কোনো সমাজে গৃহীত রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকলেই সেটার গ্রহণযোগ্যতার পথে আর কোনো বাধা থাকবে না।

➡ দ্বিতীয়ত, দান-খয়রাত এবং জাগতিক প্রয়োজনের পেছনে খরচ করা। কুরআন বলে, “আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়ার নিজের অংশ ভুলে যেয়ো না।” (সূরা কাসাস, ২৮: ৭৭)। তা ছাড়া দানের ক্ষেত্রে কী খরচ করা যায়, সে ব্যাপারে কুরআন বলে, “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তারা কী দান করবে। বলো, যা তোমাদের উদ্বৃত্ত।” (সূরা বাকারা, ২: ২১৯)। অর্থাৎ, মধ্যমপন্থা মেনে জাগতিক প্রয়োজনাদি পূরণ এবং নির্ভরশীল উত্তরসূরিদের দারিদ্র্য থেকে বাঁচাতে যতটুকু দরকার, তা বাদ দিয়ে বাকি উদ্বৃত্ত সম্পদ দান-সদাকা করতে হবে। আবারও দেখুন, দানশীলতার ক্ষেত্রে পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

➡ তৃতীয়ত, ব্যয় এবং সঞ্চয়। ভোক্তাকে তার ব্যয় ও সঞ্চয়ের মাঝে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে। সঞ্চয়ের খাতগুলোর মাঝে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তার নির্ভরশীল উত্তরসূরিদের জন্য রেখে যাওয়াকে। এমনকি দান-খয়রাতেও এমন অতিরিক্ত খরচ করা যাবে না, যার ফলে এই খাতে টান পড়ে। নবি তাঁর এক সাহাবি সাদ-কে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন কল্যাণমূলক খাতে নিজের বেশির ভাগ সম্পদ খরচ করে না ফেলেন। বরং এক- তৃতীয়াংশ দান করে বাকিটা যেন উত্তরাধিকারীদের জন্য রাখা হয়। শুধু তা-ই না, “এক-তৃতীয়াংশও অনেক হয়ে যায়। তোমার ওয়ারিশদের অভাবমুক্ত অবস্থায় রেখে যাওয়া তোমার জন্যে উত্তম, এমন অভাবগ্রস্ত অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে যে, তারা মানুষের নিকট হাত পাতবে”, (সহীহ মুসলিম: ১৬২৮)।

মধ্যমপন্থা নীতি একটি মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়কে স্বীকৃতি দেয়। আর সেটি হলো অভাব। মধ্যযুগীয় মধ্য আরবের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অর্থনৈতিক সম্পদের দুর্লভতা। তৎকালীন বেদুইনদের জীবনপদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করে এটি। আগের অধ্যায়ে এটি আলোচিত হয়েছে। এখান থেকে দাবি করা যায় যে, কুরআনীয় নির্দেশনা না থাকলেও স্বল্প খাবার ও পোশাকবিশিষ্ট বেদুইনের কাছে মধ্যমপন্থা অবলম্বন ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। তবে এটাও উল্লেখ্য যে, ভোক্তাকে বিচ্ছিন্ন একটি সত্তা ধরে একা তার জন্যই মধ্যমপন্থার ধারণাটি আনা হয়নি। বরং এর উদ্দেশ্য হলো সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য একটি সুসংগঠিত ভোগপদ্ধতি প্রদান করা। তাই যার আছে এবং যার নেই, তাদের মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোগ পুনর্বণ্টিত করার একটি ব্যাপার এখানে রয়েছে। দান-খয়রাত ও সামাজিক কল্যাণের পেছনে ব্যয় করার যে নির্দেশনা, তাতে মধ্যমপন্থার অন্তর্ভুক্ত এই পুনর্বণ্টন ব্যাপারটি আরও বেশি জোরদার হয়। তৎকালীন আরবের মতো অর্থনৈতিক সম্পদ-স্বল্পতাবিশিষ্ট কোনো পরিবেশে মধ্যমপন্থার ধারণাটির ওপর জোরারোপ করা ছিল খুবই জরুরি। তা ছাড়া এ সংক্রান্ত কুরআনীয় বিধানগুলোর উদ্দেশ্য হলো জনসমাজে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো প্রদান করা। ইসলামি রাষ্ট্রের পরবর্তী ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, এর ফলে জনসমাজ ভবিষ্যতে প্রাচুর্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও যেতে পারে। এই কাঠামোটিকে প্রশস্ত ও চূড়ান্ত হতে হলে এর মধ্যে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনসমূহকে স্থান দিতে পারার মতো অবকাশ থাকতে হবে।

পরকালীন পুরস্কার বা শাস্তির সাথে মধ্যমপন্থা নীতির সমন্বয় ঘটালে দেখা যায় যে, বিভিন্ন পর্যায়ের ভোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের পুরস্কার বা শাস্তি রয়েছে। উপার্জনের ওপর ভিত্তি করে ভোগের প্রথম পর্যায়ে খরচ না করলে শাস্তি প্রযোজ্য হয়। কিন্তু ভোক্তা সেখানে খরচ যত বাড়াবে, শাস্তি তত কম হবে। বাড়াতে বাড়াতে সে দ্বিতীয় পর্যায়ে তথা প্রয়োজনীয়ের স্তরে উন্নীত হবে। এখানে সে যত বেশি খরচ করবে, পুরস্কার তত বাড়বে। এভাবে সে উন্নীত হবে তৃতীয় তথা আরামের পর্যায়ে, যেখানে রয়েছে বিলাসী দ্রব্যাদি। এই স্তরে মধ্যমপন্থা সবচেয়ে বেশি বাঞ্ছনীয়। এটা ঠিক রাখতে পারলে ভোক্তা সর্বাধিক পর্যায়ের আসমানি পুরস্কার লাভ করে। সেটা ছাড়িয়ে গেলে তা হবে অপচয়, যা নিষিদ্ধ。

ভোগের প্রথম স্তর তথা অত্যাবশ্যকীয়ের পর্যায়ে ফিরে আসা যাক। এই পর্যায়ে পুরস্কার বা শাস্তির কোনো প্রয়োজন নেই বলে দাবি করা যায়। কারণ বেঁচে থাকতে হলে এই পর্যায়ে ভোক্তাকে খরচ করতেই হবে। কিন্তু ভোক্তা শুধু নিজের জন্যই দায়িত্বশীল না। তার ওপর তার স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্বও রয়েছে, এমনকি স্ত্রী নিজে ধনী হলেও। এ ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য নির্ভরশীল ব্যক্তি, যেমন- পিতামাতা। এই ব্যাপারগুলো বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ভোগের প্রথম স্তরেও পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা থাকাটাই যৌক্তিক।

ওপরের বিশ্লেষণকে সমীকরণ (২)-এর সাথে সমন্বিত করলে বোঝা যায়, আখিরাতের পুরস্কার আসলে দুটি পুরস্কারমূলক উপাদানের ফল: একটি হলো ধর্মীয়-সামাজিক কল্যাণকর্মে খরচের ফলে প্রাপ্ত পুরস্কার (H), এবং পণ্য ও সেবা ভোগের পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট পুরস্কার (T), অতএব, সমীকরণ (৩)-কে নতুনভাবে সাজিয়ে লেখা যায়:
(সর্বাধিককরণ করতে হবে) V = U(C, H, T), F(P)........ (৩)
শর্ত হলো Y (যেখানে অন্যান্য সংকেতের অর্থ আগের মতোই একই)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00