📄 ইতিদাল বা মধ্যমপন্থার নীতি
মধ্যমপন্থার দাবি হলো, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য যে-কোনো ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। কোনো প্রকারের বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির দিকে সে যাবে না। প্রথমত, ভোগ হতে হবে মধ্যমপন্থার নীতি অবলম্বন করে। সত্যিকারের বিশ্বাসী বা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে কুরআনে বলা হয়েছে যে, তারা অপচয়কারীও নয়, কৃপণও নয়। এ দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রেখে চলে, 'হে আদমসন্তানগণ! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে; কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না', (সূরা আরাফ ৭: ৩১), এবং 'তুমি তোমার হাত ঘাড়ে আটকে রেখো না (অর্থাৎ কৃপণতা), আবার সম্পূর্ণ প্রসারিতও কোরো না (অর্থাৎ অপচয়), তাহলে তোমরা তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে' (সূরা ইসরা, ১৭:২৯)
মধ্যমপন্থার অর্থনৈতিক ধারণাটি ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এটা শুধু অর্থনৈতিক ও বস্তুগত সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, যা আমরা একটু পরেই দেখব, বরং আল্লাহর নির্দেশের প্রতি ধর্মীয় আনুগত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনজন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনটি কাজ করার শপথ করে বসেছিলেন: (ক) একজন আজীবন রোজা পালন করবেন, (খ) আরেকজন সারা রাত নামাজ আদায় করবেন, (গ) তৃতীয়জন জীবনেও বিয়ে ও নারীসঙ্গ করবেন না। নবি তাদের জানিয়ে দেন যে, এই কথিত ধার্মিকতা ভুল। ইসলামে স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর জোরারোপ করে তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে আল্লাহর বেশি অনুগত; অথচ আমি রোজা পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। নামাজ আদায় করি এবং নিদ্রাও যাই। নারীদেরকে বিয়েও করি' (সহীহ বুখারি: ৫০৬৩ এবং সহীহ মুসলিম: ১৪০১)। অর্থনৈতিক ভোগের ক্ষেত্রেও এই মধ্যমপন্থা নীতির বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে, যা আমরা একটু পরই দেখব।
📄 অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতার নীতি
অর্থনৈতিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়াটা পূর্বেকার দুটি ধারণার ফলাফল-তাওহিদ ও খিলাফাত। আধুনিক পরিভাষায় যদি বলি, প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে কার্যকর ও উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে হবে, যেন যোগানের সাপেক্ষে ফলাফল সর্বাধিক করা যায়। যোগানের বেশির ভাগ অংশই আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন প্রাকৃতিক সম্পদ রূপে। এর সাথে উৎপাদনের অন্যান্য বিষয় যুক্ত করার মাধ্যমে জাতিগত সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আবারও আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করলে একে বলা যায় মোট জাতীয় উৎপাদন (Gross National Product/GNP)। ভোগ ও উৎপাদন, উভয় ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে অর্থনৈতিক দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, ইসলাম এক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য করছে: ইসরাফ এবং তাবযির। কুরআনে বিশেষভাবে পার্থক্য উল্লেখিত হয়েছে এ দুটো বিষয়ের মাঝে। যেমন: ভোগের ক্ষেত্রে ইসরাফ অর্থ হতে পারে মৌলিক চাহিদার চেয়ে বাড়তি ভোগ করা। এর মাঝে বিলাসী দ্রব্য ও সেবা ভোগ করাও অন্তর্ভুক্ত। সঞ্চয় ও ব্যয়ের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসরাফের অর্থকে আরও প্রসারিত করা যায়। এক্ষেত্রে সেটা হলো ভবিষ্যতের ভোগ ও সঞ্চয়কে বলি দিয়ে বর্তমানে ভোগ ও ব্যয় করে ফেলা।" ভোক্তা তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আয়ের মাঝে কোন সময়টিতে ভোগ করাকে অগ্রাধিকার দেয়, এটি তারই প্রতিফলন। তাহলে দুটি জায়গাতেই দুই ধরনের ভোগের মাঝে ভারসাম্য বাধাগ্রস্ত হলো। প্রথমটিতে মৌলিক চাহিদা ও বিলাসী ভোগব্যসনের মাঝে ভারসাম্য, দ্বিতীয়টিতে ভবিষ্যৎ ও বর্তমান ভোগের মাঝে ভারসাম্য। অথচ ভালো মুসলিমদের দায়িত্ব ছিলো তা রক্ষা করা। তাই ইসরাফ অপছন্দনীয় এবং আল্লাহর অসন্তোষের কারণ হতে পারে। কিন্তু কুরআনের আয়াত পড়ে ধারণা করা যায় যে, এ ধরনের আচরণের শাস্তি তাবযিরের শান্তির মতো অতটা ভয়াবহ নয়।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে 'তাবযির' মানে হলো, অর্থনৈতিক সম্পদের অপব্যবহার। অর্থাৎ, ভোগের সকল পর্যায়ে বড়-ছোট নির্বিশেষে সকল অর্থনৈতিক সম্পদকে অপাত্রে ব্যবহার করা। তাবযির শুধুমাত্র অধিক ব্যয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রয়োজনীয় শারীরিক-মানসিক মৌলিক চাহিদা নষ্ট করার মতো অতিরিক্ত খরচও এর অন্তর্ভুক্ত। আরেকভাবে বলা যাক। ধরুন, কেউ বাহারি ধরনের পোশাক, খাবার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মালিক। এটাও অপচয় হয়ে থাকতে পারে। আগের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, এটি অপছন্দনীয়। অর্থনৈতিক সম্পদের সামর্থ্য ও পর্যায় অনুযায়ী সে শাস্তির হকদারও হতে পারে। কিন্তু একটা পোশাক বা একবেলা খাবার যার আছে, সে অপ্রয়োজনে কাপড় ও খাদ্য উপাদান নষ্ট করে না। এধরনের ক্ষেত্রে নষ্ট করাটা তাবযিরের একটি উদাহরণ। এমনকি মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রেও এটি নিষিদ্ধ।
অতএব, ইসরাফ অর্থ যেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহার, সেখানে তাবযির অর্থ সম্পদের অপচয়। আর এ দুটির মাঝে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্যকারী সীমারেখা। প্রথমটির ফলে আরাম-আয়েশ বৃদ্ধি, সৌন্দর্যবর্ধন, এবং হয়তো জীবনে সুখ বাড়তে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়টির ফলে উদ্দেশ্যহীনভাবে মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয় না। কোনো কাজের কাজ ছাড়া সম্পদ অপব্যয়িত হওয়ার ফলে সমাজ ও পৃথিবী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। প্রথমটির কারণে কেউ আদর্শ মুসলিমের পর্যায় থেকে নেমে যেতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়টির কারণে মানুষ হয়ে যায় শয়তানের ভাই। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, 'যারা অপচয় করে (মুবাযযিরীন) তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ' (সূরা ইসরা, ১৭: ২৭) তাবযির/অপচয় আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে, যার ফলাফল তাঁর দেওয়া শাস্তি। অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শাস্তিস্বরূপ তারা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী এবং শয়তানের সাথে একই শ্রেণিতে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
এই দুটি ধারণার বদলে আধুনিক অর্থনৈতিক পরিভাষা করলে ইসরাফ-কে বলা চলে সম্প্রসারিত ব্যয় (extensive use of resources), আর তাবযির-এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ অপব্যয় (wasteful use of these resources)। অপব্যয় ও সম্প্রসারিত ব্যয়ের মাঝে পার্থক্য করে দেওয়া-ইসলামি অর্থনীতির এক অনন্য ধারণা, যা স্পষ্ট করে নির্ধারিত হয়েছে। ইসলামের প্রধানতম উৎস স্বয়ং কুরআনে এই ব্যাপারটি রয়েছে। প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী ধরে এই ধারণাটির সাথে পরিচিত আমরা। তা ছাড়া ধারণাটির পরিসর বাড়িয়ে একে যে-কোনো অর্থনৈতিক ও অর্থনীতি-বহির্ভূত কার্যক্রম, ভোগ, উৎপাদন, বিনোদন এবং মাইক্রো ও ম্যাক্রো-ইকোনোমিক্সের যে-কোনো পর্যালোচনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। সময়ের ধারণার (Value of time) সঠিক ব্যবহার এবং সেই ব্যবহারটি বাড়তির পর্যায়ে পড়ে নাকি অপব্যয়ের পর্যায়ে পড়ে, তা বাস্তবে দেখানো সম্ভব। সমাজের উৎপাদন ও ভোগ উভয় ভূমিকাই ইসলামি অর্থনীতির এই মৌলিক নীতি দ্বারা স্পষ্টত প্রভাবিত হয়।
টিকাঃ
[১] সীমার অতিরিক্ত ভোগ করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। তবে কল্যাণকর ক্ষেত্রসমূহে, যেমন দান-সদকার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের চিন্তা না করে অকাতরে সম্পদ বর্তমানে ব্যয় করা ইসলামে অনুমোদিত ও উত্তম ইবাদত, তবে শর্ত হলো ব্যক্তির মধ্যে সেই স্তরের তাওয়াক্কুল থাকতে হবে এবং লক্ষ রাখতে হবে, অভাব যেন তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত না করে। ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সম্পদ সঞ্চয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ও যৌক্তিক। উত্তরাধিকার বণ্টন-সংক্রান্ত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমার ওয়ারিশদের অভাবমুক্ত অবস্থায় রেখে যাওয়া তোমার জন্যে উত্তম, এমন অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে যে, অভাবের তাড়নায় তারা মানুষের নিকট হাত পাতবে।' (সহীহ মুসলিম: ১৬২৮) - সম্পাদক
📄 আদালাহ ইজতিমাইয়্যা বা সামাজিক ন্যায়বিচার
সামাজিক ন্যায়বিচার ইসলামের মৌলিক দাবি। আল্লাহর কাছে সকলে সমান। কুরআন সেই দিনের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়, 'তোমরা আমার নিকট তেমনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় হাজির হয়েছ, যেমনভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, তোমাদেরকে যা (নিয়ামতরাজি) প্রদান করেছিলাম তা তোমরা তোমাদের পেছনে ফেলে রেখে এসেছ', (সূরা আনআম, ৬: ৯৪)। হাদীসে আছে, 'মানুষ চিরুনির দাঁতের মতো সমান।' এবং 'যার চরিত্র সর্বোত্তম, সে-ই সবচেয়ে মর্যাদাবান' (সহীহ বুখারি: ৩৫৫৯)
তবে মানুষের মাঝে যেসব তারতম্যের কারণে তাদের উপার্জনের দক্ষতা ও সম্পদ অর্জনের সামর্থ্য ভিন্ন রকম হয়ে থাকে, সেগুলো ইসলামে স্বীকৃত। আল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে', (সূরা নাহল, ১৬: ৭১)। কিন্তু ইসলাম অলসতা বা নিষ্ক্রিয়তাকে উৎসাহিত করে না। জীবিকা অর্জন ও আল্লাহর অনুগ্রহকে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কঠোর পরিশ্রম করার শুধু উৎসাহই নয়, বরং আদেশ দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য মানেই আলস্য বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তার ফলাফল নয়। এই অবস্থানের কারণে তাই ইসলাম ধনী ও দরিদ্রের মাঝে প্রকট পার্থক্য বজায় রাখার বিরোধী। দরিদ্র ও অভাবীদের দান করা ধনীদের দায়িত্ব। এর মাধ্যমে সম্পর্কের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো বজায় রাখতে হবে সমাজে। কারণ ধনী যা দিচ্ছে, সেটাকে দরিদ্রের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কুরআনের বার্তা একেবারে স্পষ্ট, 'তাদের সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের অধিকার' (সূরা যারিয়াত, ৫১: ১৯), এবং 'ফসল তোলার সময় তার হক আদায় করবে' (সূরা আনআম, ৬: ১৪১)। এখানে কুরআনের বার্তা হলো ধনী ব্যক্তি অহংকার বা বড়াইয়ের ভাব নিয়ে দান করতে পারবে না। দরিদ্রকেও অপমানিত অবস্থায় তা গ্রহণ করতে হবে না। প্রদান ও গ্রহণ হবে সুন্দরভাবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশকৃত পদ্ধতিতে। তবে ধনীদের দানও আবার বৃথা যাবে না। এর জন্য তারা উদারভাবে পুরস্কৃত হবে, তাও আবার স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইহকালে এবং পরকালেও। উপার্জন ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ওপর এই সামাজিক ইনসাফের মূলনীতির বিশেষ প্রভাব রয়েছে, যা নিচে দেখানো হবে。
টিকাঃ
[১] এই হাদীসটি প্রমাণিত নয়। পৃষ্ঠা ৩৭ দ্রষ্টব্য। -সম্পাদক